উপভাষা, ভালোবাসা

নাল পিরান

মো. আব্দুছ ছালাম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২০ অপরাহ্ণ ; 187 Views

বৈশাখের শেষের কয়দিন। কিশোরীর মনের মতো আকাশের রূপ।ইচ্ছে হলেই বরিষণ আবার দিনের বেলায় আলোর মারাত্বক ঝলকানি।সন্ধার পরই প্রায়শ শুরু হয় বজ্রপাত, দমকা বাতাস,ঝড়,বৃষ্টি যেন নৈমিত্তিক ভীতিকর রজনী।গত কয়েক দিনের ঝড়ের তাণ্ডবে উপড়ে পড়ে গাছপালা, ভেঙে যায় কাঁচা বাড়ি, লণ্ডভণ্ড হয় বিদ্যুৎ সংযোগ। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পর বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া জাওরানী গ্রামের মানুষ সামান্য বৃষ্টি হলে অন্ধকারেই থাকে।বৃষ্টির সাথে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলার সাথে মানিয়ে নিয়েছে ভুক্তভোগীরা। কর্তৃপক্ষের প্রতি আঙুল তোলা দূরের থাক টু শব্দও করে না।দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপদাহ আর রাতে ঠাণ্ডা এমন বিরূপ আবহাওয়ার সাথে পরিচিত নয় এখানকার সাধারণ মানুষ।

এ গ্রামের উত্তর পূর্বে বড়দল বিল।বিল দিয়ে বর্ষার পানি  গড়িয়ে প্রতিবেশি দেশ ভারতে ঠাঁই নেয়।বিলে রকমারি জলজ প্রাণী বাস করে।প্রতিদিনের মতো রাখী ও রাহী বিকেলে হাঁসের ছানা ঘরে আনার জন্য বিলের ধারে গিয়ে পানকৌড়ির মাছ শিকার ও জলকেলি দেখে ভুলে যায় বাড়ি ফেরার কথা।আকাশ মেঘলা হলেও সেদিকে লক্ষ্য থাকে না তাদের। মা রহিমা ডাকতে ডাকতে নাকাল হয়ে অবশেষে বিলের কাছ থেকে আদরের সন্তানকে নিয়ে এসে স্বস্থি পায়।রাখী  পঞ্চম ও রাহী তৃতীয় শ্রেণিতে পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। মা গৃহিণী বাবা প্রান্তিক কৃষক।

বাবা রহিম সন্ধার পূর্বে বাড়ি ফিরেই নিয়ম করে দুকন্যার মুখ দেখে শান্তি পায়।আজ স্বভাবজাত হাসি দিয়ে রাহীর হাতে চকলেট আর রাখীর হাতে লাল কাঁচের চুরি তুলে দেয়।রহিমার হাতে দেয় বাজারের ব্যাগ আর পলিথিনের প্যাকে ইফতারি আর কাগজে মোড়ানো পানেরখিলি।দু’ বোন খুশি মনে হাসতে হাসতে পড়ার টেবিলে চলে যায়।পড়ার ফাঁকে দু’ বোনের খুনসুটি,গল্প, এবং আগামি ইদে বাবার কাছে বায়না  ঠিক করে।এবার তারা  একই রকম লাল জামা ও নুপূর  নিয়েই ছাড়বে। রাখী রাহীকে বলে-

আহী, এবার রিদোত বাবার কান্ঠ্যাত নাল পিরান আর নূপুর নেঈম কিন্তু।দু’ জনে এক্টে হয়া বায়না ধরমো।আর তুই বায়নাটা আগোত ধরবু।বাবা তোক বেশি ভাল্বাসে।ফম থুইস বইনো?
-ঠিকি ফম থাইকপে বুবু।

মাইকে এশার আযান হয়ে গেল।বাবা- মা দু’ জনেই রোযা ছিল বলে রাতের খাবার নামাযের আগেই সেরে ফেলতে চায়।রহিম দম্পতির দু’ কন্যা দুনয়নের মতো প্রিয়। তাদের স্বপ্ন কন্যাদ্বয় ঘিরে। তারা রান্নাঘরে কাঁচা মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে এক সাথে খাওয়া করে। যথারীতি কন্যাদ্বয়কে নিয়ে বাবা-মা মাদুরে বসলেন। রাহী বাবার কোলে বসে গলা ধরে বলতে থাকে-
– বাবা, ওযা বেড়াইলে রিদ। এইবার হামাগুলাক একে মতোন নাল পিরান আর নূপুর গড়ে দিবার নাগবে।হামা রিদের দিন পরি বেড়ামো। বাবা বলে-
– মা রে মোর তো কস্টে কোন মতোন দিন চলে।তোমা গুলার মুখের ভিতি চ্যায়া বায়নাকোনা পুরন করিম, মাওও। দুই দোন জমির ধান পাকি গেইছে।ধান কাটি বাজারোত বেচে কিনি আনমো।তোমার গুলা চিন্তা না করেন,মাও,ভাল্ করি পড়া পড়েন।

রহিম -রহিমা কর্মঠ দম্পতি। রহিমা  ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েই পাঠ চুকে যায়।তাকে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সে রান্নার কাজ করেও হাঁস- মুরগী পালন এমনকি ফাঁকা যায়গায় সবজি চাষ করে।নিজের চাহিদা পুরণ করেও বাজারে মাঝেমধ্যে বিক্রি করতে পারে।তবে বিলের ধারে থাকলেও মাছ ধরার সুযোগ নেই।কারণ বিল এখন উন্মুক্ত নয়, বিলের মালিকরা ইজারা দিয়ে থাকে।চোখর সামনে মাছের খেলা দেখলেও উদরপুর্তি করার কোন সুযোগ নেই।যদ্বরুন দু’ কন্যার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে  বাবা- মা কে হিমশিম খেতে হয়।

পুরোদিন পরিশ্রম ও কাজের ক্লান্তি শেষে সন্ধার পর স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে খোশগল্প,সাংসারিক পরামর্শ,ভালোলাগা,ভালোবাসা ভাগাভাগি হয়।রহিমা স্বামীকে বলে-
– আখির বাপ,ছাওয়াগুলা তরতর করি বড় হবার নাকছে।দুই বইনে কাজে কামে মোক মেল্লা সাহায্য করে।সকাল সইন্ধাত পড়ির বইসে।ছাওয়া দুইকনা খিব ভাল্।আরেকখান কতা,সামনের রিদোত তোমা মোক কি দিমেন?
রহিমা স্বামীর কাছে বায়না ধরতে ধরতে তার পছন্দের পান -জর্দা   মুখে পুরে দেয়।স্বামী- স্ত্রীর মুচকি হাসিতে ঘরটাই আলোকিত হয়ে পরে।রহিম অভ্যাস বশত রহিমাকে আলতো করে কাছে টানতে চাইলে সরে গিয়ে বলে-
– তোমার স্বভাব ভাল্ হইল না।এ্যালা ছাওয়া পাওয়া বড় হইছে, অমতোন না করেন তো।এ্যকনা ভাল্ হন।আচ্ছা,তোমাক যা কইনে শুনির পাইছেন কি?
– কি?
– রিদোত মোক কি কিনি দিমেন?
– শোনেক বউ,ভাল্ করে জানিস মোর হাউস থাকলেও টাকা পাইসা তেমন নাই।মন তো চায় ম্যল্লা কিছু কিনি দিবার।দেখিস না পাশের বাড়ির পুলিশের বউ দেখতে তোর মতো সুন্দরীও নোমায় ওই ভাবি নয়া দামী শাড়ি আর গয়না পিন্দিয়া কেমন করি ঘুরি বেড়ায়। মোরও তো মন চায়।

– ওরে মোর ওইল্যা কতা থোন তো।তোমা মোক ভালবাসেন তাতেই মোর চইলবে।মোর কিছু নাগবে না। ঐ ভাবি ভাল্ শাড়ি গয়না পিন্দিলে কি হইবে উমার দিনাং কাজিয়া।শুনছুং আইতোত বেগল থাকে,ছাওয়া পাওয়াও নাই।
– মাইনসের ভিতি দেখার হামার টাইম নাই। হামাক দিছে আল্লায় দুইকোনা মাই ছাওয়া মুই বাচি থাকতে মানুষ করিম।হামার সময় বাড়ির কাইন্ঠাত ইশকুল কলেজ না আছলো।হামা খেলা খেলাছি আর ঘুরি বেড়াছি।বাপ মাও হাল চাষোত নাগে দিছে।এ্যালা থিত পাছুং না পড়ি কি বিপদ।পদে পদে ঠগা নাগে।আর শোনেক,ঐ যে মদাতি ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাদের চেয়ারম্যনের বেটি দুইকোনা, শুনছুং মেল্লা বড় অপিছার।কিসের বলে ম্যজিস্টেট।মুইও বাচি থাকলে বেটি দুইকনাক মানুষের মতো মানুষ করিম।
– তোমার যত স্বপন।হামা গরীব মানুষ।হামার বেটি কি ওমার মতো হইবে?
– ক্যা না হইবে? মুই চেস্টা করিম।সরকার তো টাকা পাইসা দেয়, সমইস্যা কী?
-আরেকখান কতা, সামনের সেমাই খাওয়া রিদোত মুই সেমাই কিনিম না। হামার সিয়ামের বাপ কলেজের মাস্টার ওমরা কইছে সেমাইয়োত ভেজাল বেড়াইছে।ফমে নাই আরো মেল্লা কিছোত ভেজালের কতা কইছে।মুই তো নেকাপড়া জানংনা কোনটা ভেজাল আর কোনটা ভাল্ বুজির পাইম না।ছাওয়া গুলার ভবিষ্যতের ভিতি চ্যায়া ওইল্যা  সেমাই আনমো না টাকাও নস্ট করমোনা। বাড়িত হাতের সেমাই গড়ে থুইস, বউ।
– তোমা চিন্তা না করেন।মোর মাও আলো চাইল দিয়া পাঠাইছে।উরুন- গাইনোত আটা কুটি হানে সেমাই আর পিঠা বানে থুইম।-
– ম্যল্লা কতা কইনেন।এ্যলা ছাওয়া গুলাক নিয়া খেয়া শুতি পরি নিন যাই,,,

সন্তানদের ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে রহিম- রহিমা।সব পরিশ্রমের ক্লান্তি দূরীভূত হয় দু’ কন্যার চাঁদবদন দেখে। ওদের স্কুল যাবার বেলায় নিজ হাতে সাজিয়ে দেয় এবং  টিফিনটা সাথে দিতেও ভুলে না রহিমা।যাবার বেলায় যতক্ষণ দেখা যায় পথপানে তাকিয়ে থাকে।আবার ফেরার সময় হলে অপেক্ষার প্রহর গুণে।

রাখী -রাহীর ইদের আব্দারের কথা ভুলে যায় নি স্নেহময়ী পিতা।নিত্য ধানক্ষেতে যাওয়া আসা করে আর ভাবে কবে সোনালি বরণ ধারন করবে।এই সোনালি ধানের সাথে প্রিয় সন্তানের আব্দার পুরণ যেন একাকার হয়ে মিশে আছে।ধানী জমির চারিদিকে পায়-চারি করে আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে তার মনোবাসনার কথা।মনে হয় ধানক্ষেত তৃতীয় সন্তানের মতো পরম মমতায় ঘিরে রেখেছে রহিম দম্পতিকে।

ধীরে ধীরে ধানের সোনালি আভা চলে আসে।খুশিতে পুলকিত হয় রহিম।বাড়িতে ধান পাকার গল্প করে রহিমার  কাছে। রহিমা স্বামীকে দরদমাখা কণ্ঠে বলে-

– আখির বাপ,বোশেক মাসের দেয়ার ঠিক ঠিকানা নাই।কখন যে তুফান আর ঝড়ি আইসে।তোমা ২/৩ জন লোক নিয়া ধান কোনা কাটি ফেলান।আর ধনতলা পুলের কাইন্ঠাত পাকা আস্তাত তুলেন।মেশিনোত ডাংগেয়া ওটেই শুকির দিমো।
– শোনেক বউ,আরেকনা ভাল করি পাকুক।অংকোনা ভাল্ হইলে বাজারোত বেচাইতে সুবিদা হইবে।শুনবার নাকচং  এবারে ধানের দাম খুপ কম।
–  মুই আর কি কং।তোমরা যা ভাল্ বোজেন,,,,,।

সন্ধা ঘনিয়ে আসতেই উত্তর আকাশর ঘনকাল মেঘের আনাগোনা।মেঘ আকাশের গায়ে নয় ঠিক যেন রহিম- রহিমার গায়ে।ঝোড়ো হাওয়া মেঘমালা তাদের স্বপ্নের সলিল সমাধী দিতে আসবে।এমনিতে ধানক্ষেত নিচু জমিতে হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে তলিয়ে যাবে।তাদের চিন্তার অন্ত নাই।

কিছুক্ষণেরর মধ্যেই ভারী বর্ষণ আর ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল।প্রতিটি বিজলি চমক যেন রহিম রহিমার বুকে সেলের মতো বিঁধতে লাগল।রাখী ও রাহীকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পারালেও তাদের দু’ জনের নির্ঘুম রাত যেন স্বপ্ন হত্যার নিরব স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হল।সেহরীর সময় বাইরের ঝড় থামলেও রহিম- রহিমার ঝড় কবে থামবে উপরওয়লাই জানেন।

ভোরের আলো ফুটতেই দু’ জনেই ছুটে চলে সন্তানসম লালন করা ধানক্ষেতে।ক্ষেতের কিনারে দাঁড়িয়ে দেখে ধানক্ষেতের কোন আলামত নেই যেন থৈ থৈ জলে ভড়া নদী।।ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা কারো মুখে টু শব্দও নেই,শুধুই দীর্ঘশ্বাস! রাখী ও রাহী হাঁসের ছানা নিয়ে ভাবলেশহীন পিতা- মাতার মুখপানে তাকিয়ে। অমন করুণ মুখ তারা কোন দিন দেখে নি।হাঁসের ছানা বৃষ্টির জলে যতটা আনন্দে নাচতে থাকে অপরদিকে ততটা নিরানন্দ তারা।অনেকক্ষণ চুপ থেকে রহিম বলতে থাকে-

– হায়রে মেঘের পানি! মোর ছাওয়ার রিদের নাল পিরান আর নুপূর ভাসে নিলু? মুই ক্যংকরি ছাওয়া দুইকনার বায়না পুরণ করিম।সরকার তো মেল্লা উন্নয়ন করিল।মোক কি কিছু দিবে?

 

লেখক:
সহকারী অধ্যাপক
দইখাওয়া আদর্শ কলেজ
হাতীবান্ধা, লালমনিরহাট।

মন্তব্য করুন