উপভাষা, ভালোবাসা

ন্যাম্পোত ত্যাল নাই

রবীন জাকারিয়া

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২৬ অপরাহ্ণ ; 242 Views

—১—

আইজক্যা মফিজের মনট্যা খুপ ভাল৷ ম্যালাদিন পর আইজক্যা একখান ভাল যাত্রা পালা দেখতোছে৷ এলা আর সেই দিনগুল্যা নাই৷ কী দিনগুল্যা ছিলোরে বাবা৷ আহ্! মনখান ভরি গেইতো৷ এলা বলে কায়ো আর যাত্রা দ্যাখে না! ক্যানে বাহে! ইয়ার চ্যায়্যা কি টকিজ দেখিয়া মজ্যা পান? আসলে সগারগুলার একন্যা ঢগ হইছে৷ মুই কী হনুরে!

আইজক্যার পালার নাম হইল “গরীব ক্যানে কান্দে”৷ সগায়গুল্যা ভালই পাঠ করতোছে৷ তয় নায়িক্যাট্যা সব্যার চ্যায়্যা ভাল পাঠ করে৷ চেংরিকোনার নাম বলে লাইলি৷ দেখপ্যারো সুন্দর৷ আইজ ধরা পরাপর চাইরদিন ধরি মফিজ পালাট্যা দেখতোছে৷ জানা কতা শ্যাষদিন পয্যন্ত অয় এই পালাট্যা দেখপে৷ এটা উইয়ার পুরান্যা ব্যারাম৷ এই কয়দিনে মফিজ লাইলির পিরিতত পড়ি গেইছে৷ গেরামের সবায় জানে শ্যাষ পয্যন্ত মফিজ লাইলিক নিয়্যা কয়দিন রাইত কাটাইবে৷ কায়ো কিছু কবান্নায়৷ উইয়্যার যেমন আছে ট্যাকা তেমন ক্ষমত্যা৷ গেরামের মোড়ল৷

মফিজের মেজাজটা বিগড়ি গেইসে৷ কয়দিন ধরি চেষ্টা করিয়াও লাইলির সাথোত এলাও ভাব জমাবার পায়নাই৷ পালার মালিক পাইস্যা নিতোছে৷ আর কইতোছে হইবে হইবে৷ ধুর শাল্যা কিছুই হবোন্যায় কইতে কইতে মফিজ বাড়ির ঘাটা ধরিল৷

—২—

পইস মাস৷ এব্যার ক্যানব্যা জার পইড়ছে বেশি৷ কী আর করিম৷ তাওতো বিয়ানবেলা উঠপ্যার নাগবে৷ বাড়ির কী আর কামের অভাব আছে? গায়োত একনা পুরান কাপড়া ভাঁজ করি আলোয়ানের নাকান পরিয়া চকিত থাকি নামি পড়িল ওকেয়া৷ কইতর, হাঁস, মুরগি ছাড়ি দিয়্যা কয়ল্যা দিয়্যা দাঁত মাজিয়া হাত মুখ ধুইল৷

এক সানকি পান্তা ভাত আর নুন-আকালি নিয়্যা সোয়ামিক ডাকে তুলিল৷ বিয়ান বেলা উঠি খাবার না পাইলে এই ম্যানশেটা এলা চিল্লাচিল্লি করবে৷ খারাপ খারাপ গাইলাইবে৷

সোয়ামি দোলা বাড়ি গেইলে ওকেয়া ধান উশা শুক্যা করবে৷ সেইগল্যা ফির উরুন গাইন দিয়্যা চাউল বানেয়া দোপরের ভাত আন্না করা নাগবে৷ ওকেয়া জানে ম্যানশেটা দোলাবাড়ি থাকি আসিয়্যা ভাত না পাইলে বাপ-মাও ধরি গাইলাইবে৷ হালুয়্যা পেন্টি দিয়া মাইরাবারো পারে৷ ওমাক খুব ডর লাগে৷

ওকেয়া ওমার ছোট বউ৷ বড় সতীন মরি গেইছে৷ তামারগুল্যার চাইরট্যা ডাঙ্গর ডাঙ্গর ব্যাটা আছে৷ সগায়গুল্যা ওকেয়ার চায়্যা বয়সে বড়৷ সগায় বিয়্যা করিয়্যা মাইয়া, ছাওল-পোল নিয়্যা আলদা খায়৷ ওকেয়া এই বুড়্যা সোয়ামিক নিয়্যা পড়ছে এক জ্বালাত৷ ম্যানশেটার চরিত্রটা যেমন ভাল না তেমন বদমেজাজী৷ কতক সময় সোগ কিছু থুয়্যা পালে যাবার মন চায়৷ কিন্ত যাইবে কোনটে৷ উইয়ারতো কায়ো নাই৷ ফির ম্যানশেটার জন্যে মায়া হয়৷ যতই মারুক৷ গাইল্যাক তাওতো সোয়ামী৷

ওকেয়া জানে বাইরের দুনিয়্যাটা কত খারাপ৷ এই প্যাটটার জন্যে কতনা কিছু করতে হইছে ওয়্যাক৷ কায়ো কোনকিছু ছাড়া এক আনাও হেলেপ করে নাই৷ সারা গতরে এলাও ঐ পাপ নাগি আছে৷ শ্যাষে একটা সার্কেস পার্টিতে ঢুকি যায়৷ স্যাটে থাকি যাত্রা পার্টিত৷ তখন দেখতে শুনতে ছিল মাশাআল্লাহ্৷ উইয়ার জন্যেই লোকজন যাত্রা দেইখপার আসতো বেশি৷ ওকেয়ার দাম আর ঢক দুইটায় বাড়ি গেইল৷ সেই যাত্রা পালা দেখিয়াই ওই ম্যানশেটা পিছ পিছ লাগিল৷ শ্যাষে বিয়্যা করিল৷ ওকেয়াও মাথা গোঁজার একনা জায়গা পাইল৷

হায়রে জনম৷ হায়রে কপাল৷ মাইয়্যা হয়্যা জনমিবার শাস্তি৷

ওকেয়া এইটাকেই মানি নিছে৷ তাছাড়া ম্যানশেটা যে একনাও পিরিত করে না তাও নোয়ায়৷ এলাও মাঝে মাঝে চুড়ি, গয়না, শাড়ি নিয়্যা আসি দ্যায়৷ ত্যাল-সাবুনের কথা না হয় না-ই ধরনু৷

গঞ্জত শুননু যাত্রা নাকছে৷ ম্যানশেটা পতিদিন স্যাটে যায়৷ নয়া ধান নামছে৷ এমার কোন চিন্তা নাই৷ খালি বস্তায় বস্তায় ধান বেচতোছে৷ আর পাইস্যা নষ্ট করতোছে৷ কুনদিন যে হায়্যা হইবে আল্লাহ্ই জানে৷

আইজ সাঁজের ব্যালা ম্যানশেটা একখান নয়া পিরান আর নয়া তবন পরি ব্যাড় হইছে৷ গায়োত আঁতরও লাগাইছে৷ ভাবসাব একনা অন্য রকম৷ কী জানো! কী করতোছে এই বুড়্যা বয়সোত ওকেয়া ভাবে৷

অনেক রাইত পর্যন্ত ওকেয়া বসি থাকিল৷ ম্যানশেটা যদি আইসে৷ ঐ অবস্থায় কখন যে নিন্দ আসছে টের পায় নাই ওকেয়া৷

—৩—

দুয়ারোত জোরে জোরে আওয়াজ শুনিয়া ওকেয়া ধরপর করি উঠি বসিল৷ জারের রাইতেও ওকেয়া ঘামবার লাগিল৷ দুয়ারোত ন্যাদাই দিতোছে আর চিল্লি চিল্লি গাইলাইতোছে ওইয়ার সোয়ামি৷ কইতোছে ওই হারামজাদী৷ শশুরের বেটি৷ মাগীর বেটি তুই কি মরণের নিন্দ পারতোছিস৷

ওকেয়া ধরপর করি উঠিয়্যা ন্যাম্পোটা জ্বলাইল৷ আইজক্যা ক্যানবা ন্যাম্পোটা ক্যামন ভুকুত ভুকুত করতোছে৷ এলায় বুঝি নিভি যায় নাকি! ওকেয়া ডর ডর ভাব নিয়্যা দুইয়্যারটা খুলি দ্যায়৷ ঘরোত ঢুকিয়ায় মফিজ চিল্লি চিল্লি গাইলা গাইলি শুরু করি দেইল৷ ওকেয়া কোন কতা না কয়া পাক ঘরোত থাকি ভাত আইনব্যার গেইল৷ ওয় জানে এলা কতা কইলে মাইরব্যার পারে৷

মফিজ চুয়ার পাড় থাকি হাত মুখ ধুয়্যা আসিল৷ চোকির এক কোনাত ওকেয়া সানকি, খোরা, মগ দিয়্যা কইল আইসো ভাত খায়্যা ন্যাও৷ মফিজ ভাত খাইতে খাইতেও চিল্লাইতোছে৷ থামতোছে না৷ ওকেয়া শাড়ির আঁচলটা দিয়্যা মুখ ঢাকি হাসতোছে৷ এই চিল্লাচিল্লির মানে ওয় বুঝপ্যার পায়৷ কারণ ওয় একজন মাইয়্যা মানুষ৷

ভাত খাওয়া শ্যাষ হইলে ওকেয়া থালি-খোরা চোকি থাকি সারে ফ্যালে৷ বিছন্যাটা ঠিক করে৷ ন্যাম্পোটা গচার উপর থুয়্যা দ্যায়৷ ন্যাম্পোটা এলাও ভুকুত ভুকুত কোরতোছে৷

মফিজ চোকির উপর আগ হয়্যা এলাও বসি আছে৷ ওকেয়া মুখোত একনা হাসি নিয়্যা চিৎ হয়্যা শুয়্যা পড়ে৷ তারপর সোয়ামির দিকে চায়্যা ফিশফিশ করি কয়্যা উঠিল ‘তোমরা কী করমেন করো, ন্যাম্পোত ত্যাল নাই৷’

 

লেখক: কবি ও গল্পকার, রংপুর।

2 responses to “ন্যাম্পোত ত্যাল নাই”

  1. রবীন জাকারিয়া says:

    ভালবাসা

মন্তব্য করুন