উপভাষা, ভালোবাসা

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ৭:০৫ অপরাহ্ণ ; 170 Views

ভাষা মানব সভ্যতার আদি বাহন। সময় ও সভ্যতার বিবর্তনে ভাষারও বিবর্তন ঘটে। একটি বিরাট জাতি একক মানবগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত হলেও অঞ্চলভেদে সে জাতির ভাষার মধ্যে তারতম্য পরিলক্ষিত হতে পারে। আর এ কারণেই প্রতিটি জাতি  তার আঞ্চলিক ভাষাকে সামনে রেখে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সিলেট, ময়মনসিংহ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চল ছাড়া বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকেই তাদের একমাত্র ভাষা বলে জানে। এতদসত্বেও বাংলাদেশ নামে ভূখন্ডে বসবাসকারী অসংখ্য বাংলাভাষী মানুষ সযত্নে লালন করছে নিজ অঞ্চলের ভাষার বৈশিষ্ট্যিকে। এক ভাষাভাষী জনগাষ্ঠী হয়েও অঞ্চলভেদে ভাষার তারতম্য অনেক ক্ষেত্রে এমন দাঁড়ায় যে , মনে হয় না তারা একই মানব গোষ্ঠীর, একই মূল ভাষার লোক। একটি ভাষা বহু সালের ধারাবাহিকতায় এবং বহু দেশি-বিদেশি প্রাচীন ভাষার সংস্পর্শে এসে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আর এ কারণেই আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো ঐ অঞ্চলে প্রচলিত প্রাচীন ভাষার হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বকে বহন করে চলে।

রংপুর বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এক বিরাট ভূখণ্ড। শতভাগ লোকের ভাষা বাংলা হলেও আঞ্চলিক ভাষার অঙ্গনে রংপুরী ভাষার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এ এলাকার প্রাচীন ভাষার হারানো অস্তিত্বের ধারক ও বাহক। অনেক ক্ষেত্রে রংপুরী আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার রংপুরের বাইরের মানুষ অবজ্ঞার চোখে দেখে এবং বাহের দেশের মানুষ বলে অভিহিত করে। বাহে শব্দটি যতই অবজ্ঞার চোখে দেখা হোক না কেন ভাষার ব্যুৎপত্তিতে এর এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বিরাজমান। এ প্রবন্ধে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের সাথে রংপুরী আঞ্চলিক ভাষার ঘনিষ্ঠতা ও প্রভাব সম্পর্কে আলোচনাসহ ‘বাহে’  শব্দের প্রচলনের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

বহিরাঞ্চলের মানুষের ধারণা ‘বাহে’ ব্যবহারকারী অঞ্চলের মানুষেরা বোকা। অমার্জিত আর সভ্যতার অগ্রযাত্রা থেকে পশ্চাৎপদ। বাস্তবে এ ধারণা অপূর্ণ এবং অসঙ্গত। রংপুর অঞ্চলের প্রচলিত ভাষার আছে রীতিসম্মত ধারাবহিকতা আর এ ভাষা বাংলা ভাষার আদি স্তরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ‘বাহে’ শব্দটিও ধারাবাহিকতার ফল। ‘বাহে’ শব্দটি সাধারণত সম্বোধনসূচক। যেমন ‘কোটে গেছনেন বাহে?’ কি বাহে কেমন আছেন? সম্বোধন ব্যতিরেক বাহে শব্দের প্রয়োগ নেই তা নয়, তবে সংখ্যা খুব কম। ‘বাহে’- এ শব্দটি বাবা, মা, চাচা, চাচি, জেঠা, খালা, খালু, ফুফা, ফুফু এরকম সম্পর্কের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। ‘বাপুহে’ এ শব্দটির বিবর্তিত, পরিবর্তিত বা সংক্ষিপ্ত রূপ ‘বাহে’। ভাই, ভাবি, দাদা, দাদি, নানা, নাতি, দেবর-ভাশুর, বোন, জা, ভগ্নিপতি এমন সম্পর্কে সম্পর্কিত যারা তাদের বেলায় বাহে শব্দটি প্রয়োগ হয় না। বাস্তবতা হলো ‘বাহে’ শব্দটির সাথে গভীর মমত্ব আর স্নেহের আন্তরিক অনুভূতির প্রকাশ সম্পর্কিত।

ভাষার ধারাবহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং বিকাশের সঙ্গে রংপুরের ভাষা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিশেষ করে মধ্যভারতীয় আর্যভাষা যেমন পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের সাথে (খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী) রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার  গভীর অন্বয় খুঁজে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত আলোকপাত করা যায় – বাংলা ভাষার বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত দিক সম্পর্কে। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তুর্ভুক্ত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণায় এ মূল ভাষার অস্তিত্ব ছিল আধুনিক খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভাষা জন্ম নেয়, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান ভাষা আর্য। এর কাল ১২শ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। ভারতীয় আর্যভাষার স্তর তিনটি-

(১)          প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা- বৈদিক সংস্কৃত ( খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দী থেকে থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী)।

(২)          মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা- পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ (খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী হতে খ্রিষ্টিয় দশম শতাব্দী পর্যন্ত)।

(৩)         নব্য ভারতীয় আর্যভাষা-বাংলা, হিন্দী, আসামী, মারাঠী (১০ম শতাব্দী মতান্তরে ১২শ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত)।

স্তর বিন্যাসগত দিক থেকে পালি স্তরের সাথে রংপুর অঞ্চলের ভাষার বহুবিধ সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। পালির মতো রংপুরের ভাষায় ‘স্থ’ জায়গায় ‘থ’ হয় ( স্থল- থল, স্থান-থান), ‘ষ্ঠ’ স্থলে ‘ট্ঠ’ (জ্যেষ্ঠ- জেট্ঠো), ‘ক্ষ’ হয় ‘খ’-( পক্ষী-পাখি, চক্ষু-চউখ), ‘ঋ’ স্থানে ‘ই’ (ঋষি-ইসি; মৃত্যু-মিত্যু), ‘ভ’ স্থানে ‘ব’ (লাভ-লাব, লোভ-নোভ), ‘থ’ স্থানে ‘টঠ্’(কোথায়- কোট্ঠে, সেথায়- সেট্ঠে) উচ্চারিত হয়ে থাকে। পালি ভাষার ন্যায়  ‘র্  ’ (রেফ)  উচ্চারিত না হয়ে বর্ণের দ্বিত্ব হয়। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বর্জিত হয়। যেমন- বর্ষা-বস্সা, বর্ণ-বন্ন, চৈত্র-চৈত, কর্তা-কত্তা। রংপুরের ভাষায় আনুনাসিক ‘ঞ’ এর উচ্চারণ বহুল যা পালির সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত। উদাহরণ- কে-কাঞ, যে-যাঞ, তুই-তুঞ।

রংপুরের ভাষার সঙ্গে ‘প্রাকৃত’ স্তরের ভাষার নৈকট্য অধিক। প্রাকৃত এবং রংপুর অঞ্চলের কিছু শব্দ পাশাপাশি দেখলে বিষয়টি নিশ্চিত হবে।

প্রাকৃত                                                             রংপুর অঞ্চল

—-                                                                                    ——–

নঙ্গল                                                                               নাঙ্গল

হত্থী                                                                                 হাথী,হাত্তী

এত্তক                                                                              এত্ত

 

প্রাকৃতের আম্ভি, তুম্ভি প্রভৃতি রূপ রংপুরের স্থানীয় কবিগণের কাব্যাদিতে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্রিয়াপদের দিক থেকেও ‘প্রাকৃত’ রংপুরের ভাষার নিকটবর্তী। প্রাকৃতে ‘অচ্ছি’র সঙ্গে অনেক ধাতু যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ নিষ্পন্ন হয়। যেমন করোচ্ছে, করোচ্ছি, মারচ্ছে, মারচ্ছি ইত্যাদি। প্রাকৃত ‘করোম’ যা সর্বত্রই ভবিষ্যতার্থে ব্যবহৃত রংপুর অঞ্চলে এর ব্যবহার ‘করিম’ রূপে। এরকম-খাইম,যাইম, নেইম, দেইম, প্রভৃতি শব্দ ভবিষ্যতকালে প্রযুক্ত। প্রাকৃতে প্রথমা বিভক্তিতে ‘এ’ সংযুক্ত, এ নিয়ম রংপুরের ভাষাতেও বর্তমান। যেমন: রাজা ডাকে(রাজা)-এ ডাকে, চোর সব নিয়েছে- চোরে (এ) সউগ নিছে। প্রাকৃতের ন্যায় দ্বিতীয়াতে ‘ক’ বিভক্তির চিনহো যুক্ত হয়, যথা: তোক, মোক, হামাক,তোমাক। কারণ কারকে যুক্ত হয় ‘ত-দি’ যেমন -দাও দি হাত কাটচে, নাওত চড়ি আচ্চে। অধিকরণেও ‘ত’ যুক্ত হয়- হাতত পাইসা নাই, মাতাত তেল নাই, বাবা হাটত গেইচে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদেও এরকম ‘ত’ এর প্রয়োগ দৃষ্ট হয়। যেমন:

‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী

হাড়িত ভাত নাই নিতি আবেশী।’

বাংলায় নিশ্চিত অর্থে ‘ই’ব্যবহৃত হয়। যেমন: আমরাই যাব, ভালো কাজটি তোমরাই করেছ। ‘ই’ এর পরিবর্তে রংপুরের ভাষায় সংযুক্ত হয় ‘এ’। যথা: হামরাএ যামো, কামটা তোমরাএ করচেন। বহুবচনে ‘ঘর,‘গুলা’ শব্দ যোগ হয়- ছাওয়ারঘর=ছেলেরা, পাখিগুলা=পাথিগুলো।

‘অসীৎ’ শব্দটির অপভ্রংশ ‘আছিল’। এ শব্দ রংপুরের ভাষায় অবিকল প্রচলিত- রহীমের একনা বেটা আছিল।    আছিল অর্থ ‘ছিল’-যা অতীতকাল জ্ঞাপক।

রংপুরের ভাষার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমান বাংলা ভাষার সঙ্গে মিলযুক্ত। বাংলা ‘খেলা’, ‘বেলা’, ‘মেলা’, শব্দগুলো আদিবর্ণে একার-‘এ’ কার এর মতো উচ্চারিত না হয়ে খ্যালা, ব্যালা, ম্যালা এরকম উচ্চারিত হয়ে থাকে। রংপুর অঞ্চলের ভাষাতেও আদি বর্ণে এ-কার ‘এ্যা’ এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন: – শেষ- শ্যাষ , বেশ-ব্যাশ, কেশ-ক্যাশ। মধ্য কিংবা শেষ বর্ণে ‘’ে একারের উচ্চারণ অপরিবর্তিত – দেশে-দ্যাশে, শেষে-শ্যাষে।

রংপুর অঞ্চলের  আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো – ‘র’ স্থলে ‘অ’ এবং ‘অ’ এর স্থলে ‘র’ বর্ণের উচ্চারণ(ব্যবহার)। এ বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিনের এবং আঞ্চলিক উচ্চারণে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহৃত।

এ বৈশিষ্ট্য রীতিগত দিক থেকে এরকম – ‘র’ বর্ণের সঙ্গে স্বরবর্ণ অ, আ, উ, ঊ,ও ,ঔ যুক্ত থাকলে ‘র’ এর পরিবর্তে ওই স্বরগুলোই অবিকল উচ্চারিত হয়। যেমন: রসি-অসি(র+অ),রাম-আম(র+আ), রূপবান-উপবান(র+উ),রোগ-ওগ(র+ও) ইত্যাদি। অন্যদিকে ঐ স্বরবর্ণগুলোর সাথে যদি কোনো ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত না হয়ে থাকে এবং ওই স্বরগুলো একাকি শব্দের আদিতে থাকে তবে তাদের উচ্চারণ ‘র’ এর মতো হয়। যথা: আম-রাম, ওঝা-রোঝা, ঔষধ-রৌষধ। রংপুরের ভাষাতত্ত্ব কবিতায় রংপুরের বর্ষীয়ান  কবি মতিউর রহমান বসনিয়া লিখেছেন-

‘রংপুর হইলো অমপুর মোদের

আমি হইলাম মুই

আমরার বদল হামরা বলি

তুমির বদল তুঁই ।

রোদকে মোর অইদ বলি

ছায়াকে বলি ছ্যাঁয়া

গিন্নিকে মাইয়া বলি

কেমন মজার ভায়া।

————

কুল হইলো বড়াই ভাইরে

সুপারি হইলো গুয়া

রক্ত হইলো অক্ত মোদের

ফাাঁকা হইলো ধূয়া।

————

*অনেক নাটকে রংপুরের ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একজন নারী হাটে নিজের ছাগল বিক্রি করলে অন্যরা মন্দ কথা বললে সে নারীর প্রতিবাদ- ‘মোর ছাগল মুই ব্যাচাইচো, তা সবার মুক কালা ক্যা—–’

*হাটে নারীর দোকান করা যাবে না। কিন্তু পরে নানা ঘটনার পর খাজনা পাবার আশায় ইজাদারের লোক বলে- -‘ভাল কবি ব্যাচাও ঠিকঠাক খাজনা দিবু। না হইলে আর দোকান দিবার পাবু না। কয়া দিনু কিন্তুক।

*নারীর উত্তর-: দেইম দেইম খাজনা ঠিকঠাকে দেইম। তোমারগুলাক চিন্তা করা নাইগবার নয়।’

রংপুরের ভাষার আছে এক সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার। বাংলা ভাষার পাশাপাশি রংপুর অঞ্চলের ভাষা নানাভাবে নিজের বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। রংপুরের ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে দৃষ্ট হয়। প্রাচীন কোনো কবি রংপুরের, এমন মত পোষণ করেন কোনো কোনো গবেষক । আবার ড. গ্রীয়ার্সন রঙ্গপুর, বগুড়া, দিনাজপুরের কতক অঞ্চল এবং সমগ্র কোচবিহার রাজ্যের জনগণের কথিত ভাষাকে রঙ্গপুর বা রাজবংশী ভাষা আখ্যা দিয়েছেন। ওই সমস্ত স্থানে প্রধানত রাজবংশী জাতিরই বাস আর তাদের কথিত সসীম রঙ্গপুর অঞ্চলের ভাষাকে রংপুরের দেশীয় ভাষা বলা হয়। বৌদ্ধ রাজারা রাজবংশী হিসেবে পরিচিত। এক সময় বঙ্গসহ অন্যান্য প্রদেশে পাল রাজত্ব ছিল। এদেশের বৌদ্ধ স্থপতি ছিলেন ধর্মপাল। ধর্মপালের সঙ্গে তার মৃত ভ্রাতা মানিক চাঁদের পত্নী ময়নামতির যুদ্ধের কাহিনী যুগীদের মুখে মুখে শুনতে পাওয়া যায়। ময়নামতি ও তাঁর পুত্র গোপীচন্দ্রের কাহিনী অবলম্বনে রচিত গানের প্রথম সংগ্রহ করেন জর্জ গ্রীয়ার্সন, ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর থেকে। ১৯০৭-১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য রংপুর থেকেই তিনজন যুগী ভিখারির কাছ থেকে সমস্ত পালাটি লিখে নেন । ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে , ময়নামতি গানের ভাষা পূর্ববর্তী যুগের প্রাকৃত প্রধান বাংলা। যেহেতু প্রাকৃত স্তরের সাথে রংপুর অঞ্চলের ভাষা নানা বৈশিষ্ট্যে নিকটবর্তী, ময়নামতির গানের ভাষার সঙ্গে রংপুর এলাকার ভাষার মিল থাকবে এটাই স্বভাবিক।

ময়নামতির কোট এবং ধর্মপালের গড় রংপুরের দুটি বিখ্যাত স্থান। এ তথ্য থেকে অনুমিত হয়  রংপুর জেলা ছিল বৌদ্ধদের শেষ লীলাভূমি। বঙ্গের অন্যান্য প্রদেশ হতে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে পালিভাষা বিতাড়িত হলেও কামরূপে তা জায়গা করে নিয়েছিল। হিমাচলের পরপারে যাত্রা সময়ে এই ভাষার যে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি তা থেকেই রাজবংশী ভাষার উৎপত্তি। অন্যান্য স্থানের মতো রংপুর অঞ্চলেও রাজবংশী ভাষা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়। এ সূত্রেই পালি ও প্রাকৃত ভাষার সঙ্গে রংপুরের ভাষা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বর্তমানেও রাজবংশী ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লালিত হচ্ছে রংপুরের ভাষায়। এ ভাষায় রচিত হয়েছে মানিক চাঁদ ও গোপী চাঁদ রাজার গান, সত্যপীর, নিজাম পাগলা এমন কুশান গান, পালাগান, মাইষা যাত্রা, করিম বিলাপসহ আরও বহু রচনা।

রংপুরের ভাষার অনন্য সৃষ্টি ভাওয়াইয়া গান। উত্তরাঞ্চল থেকে সংগৃহীত অধিকাংশ ভাওয়াইয়া গানই রংপুর অঞ্চলের। রংপুরের প্রকৃতি, মানুষ, জীবনযাত্রা, সুখ, বিরহ-বেদনা, মিলন-বিচ্ছেদ ভাওয়াইয়া গানে মিলে মিশে একাকার। এ কারণে ভাওয়াইয়া গানে রংপুর অঞ্চলের কথ্য ভাষার ব্যবহার স্পষ্টতর রূপলাভ করেছে।  রংপুরের কথ্য ভাষার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ভাওয়াইয়ার ভাষায় ব্যবহৃত। ‘র’ এর বদলে ‘অ’ , ‘অ’ এর পরিবর্তে ‘র’ শব্দের আদ্যাক্ষরে  এ-কার  ‘এ্যা’ কার এর মতো উচ্চারণ ভাওয়াইয়ায় বহুল।

‘ পতি একনা (এ্যাকনা) কতা কনু হয়

বাপের বাড়ী নাইওর গেনু হয়

দিনা চারি পতি থাকিয়া আনু হয়। ’

এ ছাড়াও রংপুরের কোনো কোনো এলাকায় ক্রিয়া পদের শেষে ‘ব’ ধ্বনি ‘ম’ অথবা ‘প’ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়।

‘কানাইরে

আমার বাড়ী যাইয়ো কানাই

বসতে দেমো (দেবো) মেড়া

দুই চরুত হেলানী দিয়া

বাজান গো দোতরা কানাইরে।’

রংপুরের কথ্য ভাষায় ‘ছ’ কে ‘চ’ উচ্চারণ করা হয়-

‘বুড়া মাচ (মাছ) মারে রে

ধইচ্ছে একটা(্এ্যাকটা) পুটি

দুই সতীন বুদ্দি করি

ধইচ্ছে বুড়ার টুটি।’

 

বাক ধ্বনি বিন্যাসে রংপুরী ভাষার শব্দের মধ্যে এবং শব্দের শেষে অতিরিক্ত ‘ই’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়-

‘বাপই চ্যাগেরা রে

গচত চড়িয়া দুইটা হা

ও মোক জলপই পাড়েয়া হা দে।’

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার আরও বৈশিষ্ট্য:

ক. ক্রিয়া পদের আগে নঞ্চর্থক অব্যয়ের ব্যবহার: যেমন- না যামো, না নেমো, তোমর সাতে না যাই। চর্যাপদে এমন অনেক প্রয়োগ দৃষ্ট হয়-

*‘ভুসুকু ভনই মূঢ়া-হিঅহি ন পইসই॥’

*আপনা মাশে হরিণা বৈরী

খনহ ন ছাড়ই ভুসুকু অহেরী॥

*‘ দুলি দুহি ধরন ন যাই।’

খ. ব্যঞ্জন ঘোষধ্বনির অঘোষ অল্পপ্রাণ উচ্চারণ হয়- কাছ- কাচ, মাছ- মাচ, গাছ- গাচ, বন্ধু- বন্দু।

গ. শব্দের আদি, মধ্য ও অন্ত স্বরধ্বনির কিছুটা পরিবর্তন হয়- যৌবন- যৈবন, নুতন- নউতন।

ঘ. কখনো কখনো ‘দ’ ধ্বনি ‘ড’ উচ্চারিত হয়- দাড়িয়া – ডারিয়া।

ঙ. ক্রিয়া পদের অন্তে ং, ঙ, ঞ ধ্বনির সংযুক্ততা- নেও- নেং, যাই- যাং, শোনো- নোনোং।

ভাওয়াইয়াগানে -‘ ও মুই না শোনং না শোনং তোর বৈদেশিয়ার কতা রে।’

ধ্বনিতাত্বিক রূপতাত্ত্বিক ও শব্দতাত্ত্বিক হাজারো দৃষ্টান্তে প্রমাণ করা যায় যে , রংপুরের কথ্য ভাষার নিখুঁত ব্যবহার রয়েছে ভাওয়াইয়া গানে।

চ. শব্দের মধ্যে অতিরিক্ত স্বরবর্ণ – গেলে>গেইলে, (তোমরা গেইলে কি আর আসপেন? বোন>বইন(কাইল বইনের বাড়িত যাইম)।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত অনেক কবিতা, ছড়া. নাটকে, গল্পে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে ষোড়শ শতকে নেজাম পাগলার কেচ্ছা’য় কবি মুহম্মদ কালা, পীরগঞ্জে ঝাড় বিশলার অষ্টাদশ শতকের কবি হেয়াত মামুদ, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রখ্যাত নাট্যকার নলডাঙ্গার তুলসী লাহিড়ী ‘ছেঁড়াতার’ নাটকে সফলভাবে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা উপস্থাপন করেছেন। এ ছাড়াও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ কাব্য নাটকে, ছান্দসিক কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ ‘হামার অমপুর’ কাব্যগ্রন্থে, আনিসুল হক ‘নাল পিরান’ নাটকে, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ‘মরা মানুষের মিছিল’ নাটকে মকসুদুল হক এর গীতিনাট্য ‘শঙ্খমারীর ঘাট’, নাসিমুজ্জামান পান্না’র ‘নাকফুল’ নাটকে, মুহম্মদ আলীম ্উদ্দীনের ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে উপন্যাসসহ অনেকের লেখায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা বহুল ব্যবহৃত।

নুরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যে আঞ্চলিক সংলাপ কবিত্বময় ও জীবন্ত। নুরলদীন ও আম্বিয়ার সংলাপাংশ-

নুরলদীন-

‘এ দ্যাশে হামার বাড়ি উত্তরে না আছে হিমালয়

উয়ার মতন খাড়া হয় য্যান মানুষেরা হয়।

এ দ্যাশে হামার বাড়ি দক্ষিণেতে বংপোসাগর

উয়ার মতন গর্জি ওঠে য্যান মানুষের স্বর।’

আম্বিয়া-

‘….ঘোর চিন্তা আসে

চাটি অন্তরে পরাণে

অন্তরে কি হয় তার জংগে যদি পায় পতিধন

ইয়ার চেয় শান্তি যে নিজের মরণ।’

 

রংপুরের বিয়ের গীতেও রংপুরের উপভাষা বহুল ব্যবহৃত। গ্রামীণ নারীরা সমবেত অথবা একক কণ্ঠে গীত গায় বিয়ের বিবধ আনুষ্ঠানিকতায়।

* ‘ওরে হলুদি না হলুদি রে কাইনচা বাড়ির হলোদি

হলুদি না হলুদি রে বাঁশের তলার হলুদি।

কাঁয় আছে দরদী তাঁয় তুলবে হলুদি,

হামার দাদি আছে দরদি তাঁয় তুলবে হলুদি।

কাঁয় আছে দরদী তাঁয় বাটপে হলুদি,

হামার ভাবী আছে দরদি তাঁয় বাটপে হলুদি। ’

 

*‘অংপুরিয়া ডালা, তার মধ্যে কালা ডোরা

সই ডালা নাইরো না

এই ডালাতে আছে, সকিনা বিবির জোড়া

সই ডালা নাইরো না।

সেই ডালা দেকিয়া সকিনার মাও কান্দে বসিয়া

সই ডালা নাইরো না।’

 

ধ্বনিগত ব্যঞ্জনায়, বলিষ্ঠতায় এবং জীবন আদর্শ প্রকাশে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা গতিময় ও স্বতঃস্ফুর্ত। সাহিত্যেও এ ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। রংপুর অঞ্চলের জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যথাযথ তুলে ধরতে রংপুরের ভাষার বিকল্প নেই। এ ভাষা বাংলা ভাষা সমীক্ষায় সহায়ক, চলিত ভাষার রূপ এখানে সংরক্ষিত। এ ভাষার অনেক শব্দ সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়ে নতুন আবহ সৃষ্টি করতে পারে।

চলমানকালে অঞ্চলভেদে বদলে যাচ্ছে রংপুরের ভাষাগত রূপরীতি। ‘যাওয়া’ বিষয়ক বাক্যে কোথাও ‘যাওয়া নাগে’ কোথাও ‘যাওছি’ ‘যাওয়া খায়’ যাইছোল, যাচ্ছোল উচ্চারণ শ্রুত হয়।

শিক্ষা প্রাসারের কারণে মিশ্রণ ঘটছে শুদ্ধ বাংলার সাথে। শিক্ষিতের হার বৃদ্ধির জন্য রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার অনেকটাই হ্রাসমান, অন্যদিকে শিক্ষিতজন অনেকেই স্থানীয় ভাষা ব্যবহার মর্যদা হানিকর বিষয় ভেবে কুণ্ঠিত হন রংপুরের ভাষা ব্যবহারে। বাস্তবে এ কুণ্ঠা নিতান্তই অমূলক এবং আত্মশ্ল¬াঘার।  রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা গানে বা অন্যান্য রচনায় অধিক ব্যবহার করা দরকার, বাক্য বিনিময়েও আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ বিশেষ প্রয়োজন। রংপুরের ভাষা নিয়ে অধিক গবেষণা হওয়া সময়ের দাবী। উপভাষা সংরক্ষণে সিডি, অডিও , চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র নির্মাণ আবশ্যক। আয়োজন করা উচিৎ আঞ্চলিক ভাষায় বিতর্ক, কবিতা আবৃত্তি, বক্তব্য প্রতিযোগিতা।  শহর জীবনে শিশুদের রংপুরের ভাষা সম্পর্কে আলোকপাত করে তাদের এ ভাষা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা আবশ্যক। রংপুরের ভাষ্রা অভিধান রচনাও সময়ের দাবী।

কুণ্ঠার সব দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসা উচিৎ। যথাযথ গবেষণা ও অধিক চর্চায় মনোযোগী হলেই স্বচ্ছ হবে রংপুরের ভাষার আছে গর্বিত ভাষাতাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা, আছে বিপুল শব্দসম্ভার। বাংলা ভাষা গঠনে এ ভাষার প্রভাবের কথা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ , দীনেশ চন্দ্র সেন প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব নানা উদাহরণে প্রমাণ করেছেন। কাজেই কোনো দিক থেকেই উপেক্ষা করা যায় না রংপুরের আঞ্চলিক ভাষাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট দেশের উপভাষা অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও বিকাশে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তার অংশ হিসেবে গত ১৩ নভেম্বর রংপুরে বিভাগীয় পর্যায়ে রংপুরের উপভাষা অনুসন্ধান, সংরক্ষণ এবং সাফল্য বিষয়ে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।  আশা কারা যায় এমন উদ্যোগ রংপুর অঞ্চলের উপভাষার সংরক্ষণ ও  বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করতে অনবদ্য ভূমিকা রাখবে।

** রংপুরের কিছু আঞ্চলিক শব্দ ও আধুনিক বাংলা-

হামার>আমার, মুই>আমি, আকাল>অভাব. ঢ্যানা>অবিবাহিত যুবক, আইগনা/খুলি>উঠান, এত্তকোনা>এতটুকু, এমতোন>এমোন, ইতি>এদিক, উতি>ঐদিক, দুড়া>কচ্ছপ, কইতর>কবুতর, চুয়া>কুয়া, কস্টিয়া>কৃপণ, বাড়–ন>ঝাটা, ঠ্যাল>ডাল, গাবরু>রব,পাত্র, গুদাম>বোতাম, টেটিয়া>হিংসুটে,  নাাকারি,দাড়িয়াঘর,খানকা>বৈঠকখানা, চ্যাংড়া>ছেলে, চেংড়ি>মেয়ে, ছাওয়া, ছাওয়াল>সন্তান,  কোষ্টা>পাট,  রশি>দড়ি, বাাইগন>বেগুন, আন্দন>রান্না, বাড়ন>পরিবেশন, ধলা>সাদা, আকালি>মরিচ, ঢাংগা>লম্বা, ভোক>ক্ষুধা, আংগা,পিরান>জামা, আন্দারৎ>অন্ধকারে, দোপর>দুপুর, আইত>রাত, সাঞ্জেরবেলা>সন্ধ্যাবেলা, কাউয়া>কাক, চিলা>চিল, ভূঁই>ভূমি/জমি, মাইঞা>গিন্নি, তাংকু>তামাক, সুঁই>সুঁচ, চাইলোন>চালুনি, বড়াই>কুল, অক্ত>রক্ত, ধূয়া>ফাঁকা, দেওয়া>আসমান/আকাশ, ঝরি>বৃষ্টি, ধলা>সাদা, ঘাটা>রাস্তা, হেঁউত>আমন, ভ্যাটা>শাপলা, দলান>দালান,  ইচলা>চিংড়ি।

তথ্য সহায়তা:

ক. বাঙলা ভাষা (২য় খ- ) সম্পাদনা- হুমায়ুন আজাদ, বাংলা একাডেমি, প্রকাশক-মোাহাম্মদ ইবরাহিম-১৯৮৫।

খ. ভাষাতত্ত্ব- অতীন্দ্র মজুমদার।

গ. একুশের প্রবন্ধ’৯২- বাংলা একাডেমি-প্রকাশক- শামছুজ্জামান খান।

ঘ. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম- প্রকাশক – এম.এ ফারুক, তৃতীয় সংস্করণ-১৩৯১।

ঙ. লোকসংস্কৃতি ২য় ও ৩য় সংখ্যা), সম্পাদক-ড. মুহাম্মদ আব্দুল জলিল, লোকসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, রাজশাহী- ১৪০২।

 

লেখক:

ভূতপূর্ব অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর

**

মন্তব্য করুন