রণরঙ্গিনী একাত্তরের কুড়িগ্রাম

আমানুর রহমান খোকন

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ ;

রণরঙ্গিনী একাত্তরের কুড়িগ্রাম

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। দিনে দিনে আমাদেও স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী অনেকের কাছেই শুধুমাত্রই থাকছে মুক্তিযুদ্ধের কল্পনা প্রসূত গল্প হিসেবেই। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে সেসবের পার্থক্য অনেক বেশি। অসীম সাহস নিয়ে শত্রæ মোকাবেলা করতে যারা বীরত্ব পূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের অনেকের লেখার হাত নেই। না বলতে বলতে, না লিখতে লিখতে, না আলোচনা করতে করতে নিজেদের অসম কৃতিত্বের কাহিনী ভুলে যাচ্ছেন বীরযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালে সম্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন বহু মুক্তিযোদ্ধা আর

বহু মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের দ্বারা অত্যাচারিত নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে বীরদের আত্মত্যাগ আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করে, ব্যথিত করে গর্বিত করে। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত যাওয়ার পর দীর্ঘ ১৯০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে এই উপমহাদেশের মানুষ পেয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তানি শাসকরা যখন বাঙালিদের নতুন করে শোষণ পরাধীনতার শৃঙ্খলের বেঁধে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, ঠিক তখনই জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার অভ্যুদ্বয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বাঙালিদের লৌহ কঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছিল। মাস রক্তক্ষয়ী গৌরবোজ্জল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বাংলার মানুষ অর্জণ করে স্বাধীন বাংলার লালসবুজের পতাকা। বাংলার এই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে দীর্ঘ ২৪টি বছর। সংগ্রামের একমাত্র নেতা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সফলতার দুঃসাহসীক কাহিনী সমন্ধে জাতি আজও রয়ে গেছে অজ্ঞ। যুদ্ধের মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের রণকৌশল, প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার আলোকিত ঘটনাসমূহ বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের সহযোগীদের দ্বারা যে নির্যাতন গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শোকাবহ হৃদয় বিদায়ক ইতিহাস। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির ২৩ বছরের রক্তঝরা সংগ্রাম শেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে সারা বাংলার জনগণকে অপরিসীম ত্যাগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একাত্তরের রণাঙ্গনের কোন সমন্বিত চিত্রাবলী আমাদের নেই। ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠীর চেতনার যে বিচ্ছিন্ন চিত্র আছে তার সমন্বয় সাধনের চেষ্টাও আশানুরুপ নয়। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ আজও মৃত্যুর বেদনা বহন করছি বুক ভরে। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলার কুলাঙ্গার রাজাকার আলবদর বাহিনীর অনাচার অত্যাচারের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছি চলচ্চিত্র, গল্প, কবিতা অথবা স্মৃতি কথায়। মুক্তিযোদ্ধারা সারা বাংলার মানুষের পক্ষেই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তাদেও একটাই লক্ষ ছিল বাংলার স্বাধীনতা অর্জন করা। বঙ্গবন্ধুর আহŸানে সাড়া দিয়ে বাংলার সর্বস্তরের জনগণ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধেও সমর্থনে থাকা মানুষগুলো ভালোবাসতো মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে খাওয়াতেন, বিশ্রাম এর ব্যবস্থা করতেন। হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আলবদরদের খবরা খবর গতিবিদি সম্পর্কে সর্তক করে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ এর রণাঙ্গনে সারা বাংলার ন্যায় কুড়িগ্রাম তৎকালীন মহুকুমা জেলার আনাচে কানাচে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিলো। বিভিন্ন বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প তৈরী করেছিলেন। স্বাধীন দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারীদের অবদান কোন অংশে কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কুড়িগ্রাম মহুকুমা জেলা শহরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মজিবর রহমান তাঁর বাবা মরহুম মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডার সাহেবের সাথে পরামর্শক্রমে নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প স্থাপন মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের অসামান্য অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাএবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামপাওয়ার পরেই মফিজ উদ্দিন ভেন্ডার তার বড় ছেলে মজিবর রহমানের সাথে পরামর্শ ক্রমে বাড়ি ফাঁকা করে তাদের পরিবারের শিশুনারী বৃদ্ধদেরকে নিয়ে নাগেশ্বরীতে আত্মীয়র বাসায় উঠেছে। সাংবাদিক মজিবর রহমান মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে যুক্ত থেকে পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় যুবকদের একত্রিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প তৈরি করেন।

১০ মার্চ কুড়িগ্রামে ঘোষপাড়ায় আহমেদ আলী বকসীর গোডাউনে স্বাধীনতাকামী কুড়িগ্রামের সকল রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী এবং ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো এক সভা। সভায় গঠিত হলো ৫১ সদস্য বিশিষ্ট মহুকুমা সংগ্রাম কমিটি। এক সপ্তাহের মধ্যেই কুড়িগ্রামের আট থানা (লালমনিরহাট সহ) গঠিত হলো থানা সংগ্রাম কমিটি। আহমেদ আলী বকসীর গোডাউনে জেলা সংগ্রাম কমিটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হলো। আহমেদ হোসেন সরকারের টগরাইহাটের বাড়িতে গড়ে তোলা হলো প্রতিরোধ দুর্গ। কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়া, পুরাতন পোষ্ট অফিস পাড়া এবং পুরাতন স্টেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোদ্ধা তৈরির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হলো। ক্যাম্পগুলোতে অনেকেই সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে তত্ত¡াবধানে একদিকে চালাতে থাকলো ছাত্র যুবকদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, অন্যদিকে চালাতে থাকলো মিছিল মিটিং সহ ব্যাপক গণসংযোগ। অনুরূপ কর্মসূচি চলতে থাকলো প্রতিটি থানা সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে। ১৭ মার্চ কুড়িগ্রাম চিলড্রেন পার্কে ছাত্র সংগ্রাম কমিটির আহŸানে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। সমাবেশের পরিকল্পনা করলেন সংগ্রাম কমিটিকে সাথে নিয়ে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার। সমাবেশে সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মাঝে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হলো। ছাত্রনেতা আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, রওশন উল বারী, সিরাজুল ইসলাম টুকু, রোকনুদৌলা মন্ডল, মোকাররম হোসেন সাচ্চু সহ অনেকের নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্র জনতা নিজ নিজ শরীরের সুঁচ ফুটিয়ে রক্তে ভিজে স্বাধীনতার জন্য রক্ত শপথ উচ্চারণ করলো। ১৭ মার্চ কুড়িগ্রামের চিলড্রেন পার্কের ছাত্র সমাবেশের পর অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার গ্রামের বাড়ি রুঙ্গামারী শিংঝাড়ে চলে এলেন। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের বড় ভাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ তালুকদারের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা করে স্থানীয় ছাত্র জনতাকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করার কাজ শুরু করলেন। অধ্যাপক গ্রামের বাড়ির এলাকায় ইপিআর, আনসার, ছাত্র জনতাকে সাথে নিয়ে ভূরুঙ্গামারীর আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। প্রথমে মাস খানেক মানিক কাজী গ্রামে শ্বশুর মরহুম মোসলেম উদ্দিন মাস্টারের বাড়িতে আস্থানা থাকলো সংগঠক অধ্যাপকের। এই আস্থানায় থেকে আশপাশের যুবকদেও সংগঠিত করার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। শ্বাশুরী মরিয়ম বেগম নিয়মিত রান্না কওে খাওয়াতেন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের। সামাদ তালুকদার চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলো। ২৫ শে মার্চ রাত ১২টায় শুরু হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট। শুরু করা হয় ঘুমন্ত নিরস্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর হামলা। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র চট্টগ্রামের কালুরঘাট অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার প্রচার করা হলো। আকাশ বাণী, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা বেতারের সংবাদের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলার গণহত্যা নৃশংস ঘটনা প্রচার হতে থাকে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ওই দিন কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটি ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ঘোষপাড়াস্থ বকসী সাহেবের গোডাউনে এক জরুরী সভায় মিলিত হয়ে সুদীর্ঘ কর্মপন্থা নির্ধারণ করলো। ২৮ মার্চ কুড়িগ্রাম গহরপার্ক মাঠে জনসভায় সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখলেন এড. আমান উল্লাহ, সাংবাদিক মজিবর রহমান, মনছুর আলী টুনকু, ছাত্র নেতা আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু সহ অনেকেই। বক্তারা সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহŸান জানায়। মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির নেতারা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মর্মকথা তুলে ধরলেন সাধারণ মানুষের মাঝে।যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রæ মোকাবেলা করতে হবে এই উৎসাহ প্রদান করলে জনসভায় উপস্থিত সাধারণ জনগণ মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ¯øাগান দিতে থাকলো।

গহরপার্কের ওই দিনের জনসভায় কুড়িগ্রামের এসডিও মামুনুর রশিদ, এসডিপিও জালাল উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে। ২৮ মার্চ রংপুরের ইপিআরের ১০নং উইং সদর দপ্তরের বাঙালি সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন বিদ্রোহ করে সুবেদার বোরহান উদ্দিন, সুবেদার আরব আলী নায়েব সুবেদার নুর মোহাম্মদ সহ দলবল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোগদানের উদ্দেশ্যে তিস্তা নদী পাড় ঘেষে কাঁচা রাস্তা ধওে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রবেশ করে। উলিপুরের থেতরাই এলাকার পানি আয়ালের ঘাট দিয়ে তিস্তা নদী পাড় হয়ে কুড়িগ্রামে প্রবেশ করে মহুকুমা সংগ্রাম কমিটিতে যোগ দেন। মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধরলা নদীর তীরবর্তী স্থানে পুরাতন স্টেশনে আনসার কমান্ডার সাংবাদিক মজিবর রহমানের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে উঠেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন। রংপুর ইপিআর ১০নং উইং সদর দপ্তরে বিদ্রোহ করে আসা সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন তার দলবল নিয়ে মফিজ উদ্দিন ভেন্ডার সাহেবের বাড়িতে অবস্থান করেই প্রতিরক্ষার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নির্দেশে কুড়িগ্রাম সীমান্তের সকল ইপিআর ক্যাম্পে অবাঙালি সৈনিকদের হত্যা করে অস্ত্র গোলা বারুদ সংগ্রহ করা হলো। কুড়িগ্রামের সীমান্তে সকল বাঙালি ইপিআর সৈনিকরা অস্ত্র গোলা বারুদ নিয়ে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর তীরবর্তী এলাকার চরে সমবেত হলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সাথে নিয়ে ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মোজাহিদ এবং প্রশিক্ষিত ছাত্র জনতার সমন্বয়ে গঠন করলেন শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী। তিস্তা ব্যারেজ কুড়িগ্রাম লালমনিরহাটের প্রবেশদার। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ চেষ্টা করতে লাগলেন এই ব্যারেজ পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেন এই অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি তার গঠনকৃত শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী দিয়ে তিস্তার পারে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করার পরিকল্পনা নিলেন। মার্চের শুরুতেই ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রæ রংপুর আশপাশের অঞ্চলের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নেতৃত্বে সিরাজুল ইসলাম টুকু, সেনাবাহিনীর সদস্য আবুল কাশেম (ড্রাইভার), সাংবাদিক মজিবর রহমান, আবুল কাশেম কমিশনার, মানিক, আব্দুস সামাদ, হবিবর, আমানুর রহমান, মোকছেদ, নুরুজ্জামান, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আব্দুল করিম মধু, নজরুল ইসলাম, সেকেন্ড লে. ইউসুফ আলী, বাবর আলী ড্রাইভার, নুরল ইসলাম নোলেসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। কুড়িগ্রাম সীমান্তের ইপিআর ক্যাম্প থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র গোলা বারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন করা হলো। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্বে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হওয়া ছাত্রজনতা প্রশিক্ষিত ইপিআর, পুলিশ, আনসার মোজাহিদের মাধ্যমে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে যুদ্ধেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন অস্ত্র গোলাবারুদ বরাদ্দ দিলে কুড়িগ্রাম পোস্ট অফিস পাড়াস্থ সম্ভ্রান্ত নাজির আব্দুল গফুর সাহেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র রিভার ভিউ হাই স্কুলের ছাত্রলীগ সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু বাবার লাইসেন্সকৃত পয়েন্ট টু টু রাইফেল জমা দিয়ে থ্রি নট থ্রি রাইফেল বরাদ্দ পান। একই সাথে থ্রি নট থ্রি রাইফেল বরাদ্দ পেয়েছেন মোল্লা পাড়ার আমানুর রহমান, মুন্সি পাড়ার মো. নুরুজ্জামানসহ অনেকেই। কুড়িগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নিলেন, যাতে করে পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে সহজে প্রবেশ করতে না পারে। কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নেয়ার পূর্ব মুহুর্তে মো. নুরুজ্জামানের বরাদ্দ পাওয়া রাইফেলটির ট্রিগার আটকে যায়। মাধবরাম মুন্সি পাড়া গ্রামের নিধি মামুদের সাহসী ছেলে যুবক নুরুজ্জামান বরাদ্দ পাওয়া তার রাইফেলটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নেয়ার উদ্দেশ্যে তরিঘরি করে অচল রাইফেলটি নিয়ে পুরাতন রেল স্টেশনের মফিজ উদ্দিন ভেন্ডারের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে হাজির হলেন নুরুজ্জামান। সে সময় ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন, সুবেদার বোরহান উদ্দিন সহ অন্য ইপিআর সদস্যরা বিশ্রাম করছিলেন। নুরুজ্জামান ব্যস্ত হয়ে উঠেন তার অচল রাইফেলটি সচল করার জন্য। বিশ্রামে থাকা ইপিআর সদস্য ঘুমন্ত আনিছ সাহেবকে জাগিয়ে তুললো সাহসী যুবক নুরুজ্জামান। ভেন্ডার সাহেবের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা আনসার কমান্ডার সাংবাদিক মজিবর রহমান শাসন মুলক একটু ক্ষিপ্ত হলেন নুরুজ্জামানের প্রতি। মজিবর রহমান নুরুজ্জামানকে উদ্দেশ্য করে কড়াগলায় বকাঝকা করলেন। তিনি নুরুজ্জামানকে বললেন, ‘বন্দুক চালাতে পারিস না, যুদ্ধ কেমন করে করবি। তোকে কে এই বন্দুক দিয়েছে। তুই এতো তাড়াতাড়ি বন্দুকটি নষ্ট করে ফেললি কেন।

নুরুজ্জামান দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে– ‘বড় ভাই আমাকে শিখিয়ে দিলে আমি পারবো। বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছে দেশ স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি শোষকের কবল হতে মুক্ত করতে হবে।যুবক নুরুজ্জামানের সাহস মনোবল দেখে মজিবর রহমান ইপিআর সদস্য আনিছ সাহেব খুশি হয়ে একটি রড রাইফেলের নলায় বিশেষ কায়দায় ঢুকে দিয়ে ট্রিগারটি সচল কওে দিলেন। তারা নুরুজ্জামানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যা ভাই বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করবি। পাকিস্তানি সেনাদের কবল থেকে এই দেশকে মুক্ত করবি বন্দুক সচল হওয়ায় নুরুজ্জামান আনন্দিত হয়ে প্রতিরক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ চেষ্টা করতে লাগলেন এই ব্রীজ পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেন এই অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি তিস্তার পাড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করলেন। এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে কুড়িগ্রাম লালমনিরহাটকে নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে তিস্তা ব্রিজের উত্তর প্রান্তে মুক্তিবাহিনী প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধ হলো তিস্তার উত্তর প্রান্তে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পিছু হটে যায় পাকিস্তানি বাহিনী।

এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কৌশলে হারাগাছ হয়ে লালমনিরহাটে প্রবেশ করল। অনেক ভারী অস্ত্রে সস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তি বাহিনীর তিস্তা ব্রিজের প্রতিরোধের উপর তীব্র থেকে তীব্রতর আক্রমণ শুরু করল। তীব্র চাপের মুখে ডিফেন্স প্রত্যাহার করে এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহরে ফিরে আসলো মুক্তিযোদ্ধারা। এসেই চিলড্রেন পার্কে এক জনসভার মাধ্যমে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে আহŸান জানালো। শহর ছেড়ে জনগণ নিরাপদ স্থানে চলে গেলে কুড়িগ্রাম শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর কুড়িগ্রামের হেড কোয়ার্টার ধরলা নদীর উত্তরে নাগেশ্বরী থানায় স্থানান্তর করা হলো। এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সাঁজোয়া বহর নিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে কুড়িগ্রামের দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর অপ্রতুল প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে এলোপাতারি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। কুড়িগ্রাম জেলখানার ইনচার্জ সহ পাঁচ জন কারারক্ষীকে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করলো। ব্রাশে তৎক্ষনাৎ শহিদ হয় জন। আহত জেল ইনচার্জ ঐদিন দিবাগত রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পাকিস্তানি সেনারা এদিন কুড়িগ্রাম দখলে না নিয়ে কুড়িগ্রামের অভিমুখে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফেরত গেল। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা টগরাইহাটের বড় ব্রীজ ছোট ব্রিজের আশপাশের এলাকা সহ বেলগাছা, কাঁঠালবাড়ী কুড়িগ্রাম নতুন শহর এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। ১৪ই এপ্রিল কুড়িগ্রাম দখলে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশের চেষ্টায় উপনীত হলো। মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের

মুখে শহরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী টগরাইহাট বড় ছোট পুলের পাড়ে ইটভাটার আশপাশ এলাকায় অবস্থান নিল। দিনের মধ্যভাগ হতে সারারাত ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। তুমূল গোলাগুলির মধ্য দিয়ে রাত অতিবাহিত হলে যুদ্ধে আরো জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন। পরের দিন হানাদার বাহিনী প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হতাহত নিয়ে তিস্তা অভিমুখে ফেরার পথে রেল লাইনের দুপাশের ইটভাটা আশপাশের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ করে জ্বালাও পোড়াও সহ অনেক অসহায় গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করলো। মুক্তিযোদ্ধার হেড কোয়ার্টার নাগেশ্বরী থেকে ভূরুঙ্গামারীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ এর নির্দেশে নতুন শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ সাধ্য অনুযায়ী আরো শক্তিশালী করা হলো। ২০ এপ্রিল টগরাইহাট ছোট পুলের পাড়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিলো। ট্রেনে করে পাকিস্তানি বাহিনী শহরে ঢোকার সময় মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে তুমূল যুদ্ধ চললো প্রায় ঘণ্টা ব্যাপি। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হলো। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বোমা ফেটে অনেকে ঝলসে গেল। নতুন শহরে প্রতিরোধে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে পাঁচগাছী ঘাট দিয়ে ধরলা নদীর ওপারে চলে আসতে লাগলো। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গরুর গাড়িমহিষের গাড়ি করে পাঁচগাছীযাত্রাপুর হয়ে চিকিৎসার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হেড কোয়াটার ভুরুঙ্গামারীতে নেয়া হয়। দিকে পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহর পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে তারা কয়েকটি স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করলো। মুক্তিযোদ্ধা ভূরুঙ্গামারী হেড কোয়াটারের সাথে সমন্বয় করে ধরলা নদীর এপাড়ওপাড় যুদ্ধ চালাতে থাকলেন মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা পাঁচগাছী উত্তর নওয়াবশ ধরলা নদীর পাড়ে মতিয়ার রহমান সরদারের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ চালাতে থাকলেন। এই বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত ছিল। ধরলা নদীর পাশে ছড়া নদী বেষ্টিত থাকায় পাকিস্তানি বাহিনী খুব সহজেই ধরলা নদী পাড় হয়ে এই জায়গায় আসা দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। প্রতি রাতে তুমূল গুলি ছোড়াছুড়ির মধ্যদিয়ে চলছিল যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনী শহরের এপাড় থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। পাল্টা জবাবে মুক্তিযোদ্ধারা মতিয়ার রহমানের বাড়ি এবং বাড়ির আশপাশ এলাকা থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। ক্রমশ যুদ্ধ বাড়তে থাকায় গ্রামের মানুষ এই এলাকা ছেড়ে যাত্রাপুর সহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে যেতে শুরু করে। মতিয়ার রহমান সরদার পাঁচগাছী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে তিনি সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। উত্তর ধরলা শত্রæ মুক্ত রাখতে পাটেশ্বরী বিএস কোয়াটার, আলমআজাদের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার অস্থায়ী ক্যাম্প, নাগেশ্বরী ক্যাম্প রুঙ্গামারী কলেজ এবং পাইলট স্কুলের মুক্তিযোদ্ধারা ধরলা নদীর বাম তীরে অবস্থান নিয়ে প্রতি রাতে কুড়িগ্রামে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দীর্ঘ সোয়া মাস ব্যাপী চলমান ছিল ধরলা নদীর এপাড়ওপাড়ের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুক্তিসেনারা জীবনকে বাজি রেখে উত্তর ধরলা যথাক্রমে নাগেশ্বরী রুঙ্গামারীকে হানাদার মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ এর ২৫ মে রাজাকারদের সহযোগিতায় ড্রামের ফারাজ তৈরি করে পাকিস্তানি সেনারা কৌশলে ধরলা নদী পাড় হতে সক্ষম হয়। শত্রæ পক্ষ ধরলা নদীর পাড় হলে প্রতিরোধে থাকা মুক্তিসেনারা শত্রæ পক্ষের প্রচন্ড আক্রমণের কবলে পড়ে যায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুক্তিসেনার দল ছত্র ভঙ্গ হয়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ২৬ মে হানাদাররা তাদের আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর করতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সরঞ্জাম ফুরিয়ে এলে ভোগডাঙ্গার প্রতিরক্ষা অবস্থান ভেঙ্গে যায়। যুদ্ধে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ ভাবে পিছু হটতে হটতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কওে ফেললেন। রাজাকারের মাধ্যমে ভোগডাঙ্গার একটি পুরাতন বিল্ডিংয়ে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ার্লেস অপারেটরকে হাতে নাতে ধরে ফেললেন পাকিস্তানি সেনারা। ছলচাতুরী করে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেটরকে দিয়ে ভুরুঙ্গামারীতে মুক্তিযোদ্ধার হেড কোয়ার্টারে বার্তা পাঠানো হলো যুদ্ধে থাকা ভোগডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা প্রয়োজন। এই বার্তা পেয়ে নাগেশ্বরী হতে বসন্ত নির্মলের সাদা জিপে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভোগডাঙ্গা আসতে থাকলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এম্বুশে পরে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন। আহত হলেন অনেকেই। বড় ট্রাকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের ২য় গাড়িটি রকেট লেন্সে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে গেলো। এতে করে আরো শহিদের সংখ্যা বাড়লো। বাড়লো আহতের সংখ্যাও। ভোগডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা করতে চাওয়া তৃতীয় বাসটি পথিমধ্যে থেমে যাওয়ায় হতাহতের হাত থেকে বেঁচে যায় সিরাজুল ইসলাম টুকু, ফজলুল সহ অর্ধ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। ২৭ মে ওঁৎপেতে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর এম্বুশে পরে মোট ১৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসনাবাদ এলাকায় আব্দুল ওয়াহাব প্রধান, আসাদ আলী, রইচ উদ্দিন, আব্দুল জব্বার, আবুল কালাম আজাদ, আবুল কাশেম, সেকেন্দার আলী, আব্দুল আলী, এস.এম আবুল কাশেম, আনছার আলী, আবুল ড্রাইভার, খয়বর আলী, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আফজাল হোসেন ড্রাইভার, দেলোয়ার হোসেন, আতিকুর রহমান মোজাম্মেল হক শহিদ হন। ২৭ মে নাগেশ্বরী দখলে নিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নির্দেশ সিরাজুল ইসলাম টুকু সহ ১৫১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শত্রæকে সহজে রুঙ্গামারী দখলে নেয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে রায়গঞ্জ ব্রিজটি বম্পিং করে গুঁড়িয়ে দিলো। এরপর ২৮ মে ভূরুঙ্গামারী দখলে নিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের প্রচেষ্টায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিমবঙ্গে কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জে সমবেত হলো। পরে সাহেবগঞ্জে স্থাপন করা হলো মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়াটার। কুড়িগ্রাম কলেজের ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার সহযোগিদের সাথে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের প্রচেষ্টায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জে সমবেত হলো। পরে

সাহেবগঞ্জে স্থাপন করা হলো মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়ার্টার। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার সহযোগিদের সাথে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন। ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম কালমাটিতে বড়ভাই আজিজ তালুকদারের শ্বশুর আলহাজ্ব শামসুদ্দিন সাহেবের বাড়িতে এবং তার অন্যান্য আত্মীয়দের বাড়িতে অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুললেন। বাংলাদেশের আশপাশের গ্রামের ছাত্র জনতাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণের কাজ পুরোদমে শুরু করা হলো। কালমাটি গ্রাম একেবারেই সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল হতে

মুক্তিযোদ্ধা শিবিরকে দেড় কিলোমিটার দূরে বামনহাটের বিজয় বাবুর বাড়িতে স্থানান্তর করলেন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। ৭১এর পহেলা মে থেকে অধ্যাপক বামনহাট যুব শিবিরের ক্যাম্প অধিনায়ক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছেন। ক্যাম্পকে সহযোগিতা করছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শামসুল হক চৌধুরীসহ স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিকরা। বামনহাট যুব শিবির হতে মানিক কাজী গ্রামের শ্বশুর বাড়ি শিংঝাড় গ্রামের নিজ বাড়ি এবং কালমাটি গ্রামের আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নিয়মিত নিতেন এই বুদ্ধিজীবি। ১২ জুলাই কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সুশৃঙ্খল নিয়মাতান্ত্রিক ভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রত্যেক সেক্টরের সীমানা নির্ধারণ সেক্টর অধিনায়ক মনোনীত করা হল। কুড়িগ্রাম সীমানা নির্ধারণ সেক্টর অধিনায়ক মনোনীত করা হল। কুড়িগ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম দিকের (চিলমারী উলিপুরের কিয়দাংশ ছাড়া) এলাকা সমূহ ৬নং সেক্টরে সাহেবগঞ্জ সাব সেক্টর এবং উলিপুর আংশিক চিলমারী শহর পূর্ব পাশ্বের এলাকা সমূহ ১১নং সেক্টর মানকারচর সাব সেক্টরে অন্তর্ভূক্ত হল। ৬নং সাব সেক্টরের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন মনোনিত হয়েছে। ১১ নং সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হলেন মেজর আবু তাহের এবং মানকারচর সাব সেক্টর কমান্ডার হলেন উইং কমান্ডার হামিদুল্ল্যাহ খান। ৬নং সেক্টরের অধিনায়ক এম কে বাশারের নির্দেশে বামনহাট যুব শিবিরের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। বিশিষ্ট শিক্ষক এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হওয়ার সুবাদে বামনহাট মুক্তিযোদ্ধার যুব শিবির হতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে অধ্যাপক স্থানীয় যুবক জনতাকে রিক্রুট করা এবং মোটিভেশনের কাজ করছেন। যুদ্ধ শিবিরে বেশ কিছু শিক্ষক এবং ছাত্র যোগদান করায় ভারতীয় সেনা বাহিনী বামনহাট ক্যাম্পকে হেড মাস্টার্স ক্যাম্প ওয়াহাব তালুকদারকে ক্যাম্পের অধিনায়ক না বলে অধ্যক্ষ বলে সম্বোধন করতো। ওয়াহাব তালুকদার ক্যাম্পের বয়োজ্যৈষ্ঠ যোদ্ধাদের রেকি পেট্রোল নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ অপারেশনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতেন। বাংলাদেশের ভিতরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে উপদেশ দেওয়া অসুবিধা দূরীকরণের কাজ করছেন অধ্যাপক। আগস্ট একটি অপারেশনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন ওয়াহাব তালুকদার। ৯টায় সকালের নাস্তা (পান্থাভাত) খেয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াহাব তালুকদার বেড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করতে রওনা হলেন তিনি। পথিমধ্যে বড়ভাই সামাদ তালুকদারের সাথে দেখা হয় এবং তাকে ঐদিন কোথাও যেতে নিষেধ করলেও তিনি শোনেননি। যাত্রাসঙ্গী ছিলেন আবুল কাশেম মাস্টার, ডা: মজিবর রহমান, কালমাটি গ্রামের পঞ্চায়েত আব্দুর হামিদ হামু, সর্বকনিষ্ঠ যোদ্ধা মোজাম্মেল হক খোকা। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ভিতরে অবস্থানরত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা তাদের সহযোগিতা করা। মুক্তিযোদ্ধার গেরিলা দলটিকে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার যুদ্ধের বিষয়ে সেক্টর সদর দপ্তর প্রণীত নির্দেশ ব্যক্তিগত পরামর্শ দিচ্ছেন। গেরিলা দলের সবাই ক্ষুধার্ত। দীর্ঘক্ষণ জঙ্গলে অবস্থান করায় খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেনি তাদের দলনেতা। অধ্যাপকের সাথে থাকা কয়েকজন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাকে নিকটবর্তী গ্রাম থেকে খাদ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দিলেন। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্রাম করছে। পুরো দলের নিরাপত্তার জন্য তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ফরহাদকে তাদেও অবস্থানের কিছুদূরে বগনী ব্রিজের পূর্ব পার্শ্বে একটি উঁচু গাছে উঠিয়ে দিয়ে পাহারায় নিয়োজিত করলেন। দোসরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বগনী ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের তথ্য জানতে পারলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল অতি গোপনে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পরিত্যক্ত রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান নেয়। সময় ফরহাদ তাদের এগুতে দেখে চিৎকার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই শত্রæ দলের একজন সৈনিক ফরহাদের উপর গুলি চালায়। সাথে সাথেই ফরহাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে গাছ থেকে নিচে পড়ে শহিদ হন। গুলির শব্দে অন্যন্য মুক্তিযোদ্ধারা সতর্ক হলেও তাদের কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই পাকিস্তানিরা তাদের উপর প্রচন্ডভাবে মর্টার মেশিনগানের গুলি অতর্কিতভাবে চালাতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ছত্রভঙ্গ হয়ে হতভম্ভ হয়ে যান। সময় অধ্যাপক আব্দুর ওয়াহাব তালুকদার মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পিছনে নিরাপদ স্থানে হটে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পিছনে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি নিজে রেল লাইনের পাশ দিয়ে নিরাপদ অবস্থান খোঁজার জন্য দ্রæ দৌড়াতে থাকেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনী যেন কোন ক্রমেই অন্য কোন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুসরণ করতে না পারে। সময় তার সহযোগি যোদ্ধারা তাকে রেল লাইন দিয়ে সোজা না গিয়ে পাশের কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়ার কথা বললেও তা তিনি শুনলেন না। হয়তোবা তিনি ভেবেছিলেন হানাদার বাহিনী ভারতে প্রবেশ করবে না। তাই তিনি সোজা দৌড়াতে থাকেন এবং শত্রæ পক্ষ ব্রাশ ফায়ার করতে করতে তাকে অনুসরণ করে প্রায় / (আধা) কিলোমিটার ভারতের ভিতরে প্রবেশ করে। তখন তাকে লক্ষ্যকৃত পাকিস্তানিদের ছোঁড়া গুলি প্রথমে তার পায়ে লাগলো। তিনি আহত অবস্থায় জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেন। হানাদার বাহিনী তাকে অতিক্রম করে আরো ভিতরে প্রবেশ করে। অধ্যাপক আহত অবস্থায় তীব্র যন্ত্রণা কাতরাতে থাকেন। একজন মৃত্যু পথের যাত্রীর জীবনে বেঁচে থাকাই শেষ সাধ হলেও বেঁচে থাকার সাধ্য যে থাকে না তা ঘটেছে এই মুহুর্তে, এটা যে কতো মর্মস্পর্শী এবং হৃদয় বিদারক তা শুধু তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। নরপিচাশের দলটি জঙ্গল থেকে শব্দ শুনে তাকে ধরে ফেলে। সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র পেয়ে রক্ত পিপাসু হানাদাররা আক্রোশে ফেঁটে পড়ে এবং হাতের ঘড়িসহ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়। ব্যায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অধ্যাপকের বুকটাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের পড়নের লুঙ্গি শার্ট রক্তে ভিজে মাটিতে চুয়ে চুয়ে পড়লো। শহিদ অধ্যাপকের রক্তে ভিজে গেলো বাংলার মাটি। এই রক্তে ভেজা মাটি আগাম জানিয়ে দিলো স্বাধীন বাংলার বিজয়ের শুভ বার্তা। শত্রæপক্ষ মৃত্যু নিশ্চিত করে শহিদ বুদ্ধিজীবির রক্তাক্ত দেহটিকে পার্শ্ববর্তী ডোবায় ফেলে দিয়ে চলে আসে। স্থান ত্যাগ করার সময় আশপাশের গ্রামের উপর লক্ষ্যহীনভাবে অনবরত মর্টার মেশিনগান ফায়ার করতে থাকে। আশপাশের গ্রামের প্রায় ৩২ জন নারী, পুরুষ শিশু লক্ষ্যহীন ফায়ারে আহত হলো। আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার বন্দোবস্ত না থাকায় গ্রামবাসী তাদের ভারত সীমান্তে অবস্থানরত বিএসএফ এর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বিএসএফের সংবাদের ভিত্তিতে কিছুক্ষণ পর কুচবিহার সেনানিবাস থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জোশী আসেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কিছু সামরিক গাড়ী এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে আহতদের কুচবিহার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেয়। অধ্যাপক ওয়াহাবের মরদেহ তার সহযোদ্ধা স্থানীয় জনগণ গোলাগুলি বন্ধ হলে ডোবা থেকে উদ্ধার করে ভারতের কুচবিহার জেলার দিনহাটা মহুকুমার কালমাটি (ভারতবাংলাদেশ বর্ডার পিলার নং৯৫৪ সংলগ্ন) নামক স্থানীয় মসজিদ চত্ত¡রে নিয়ে আসে। অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদারের পরিবার এই গ্রামের আত্মীয়ের বাড়িতে যুদ্ধকালীন সময়ে অবস্থান করছিল। মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডার সাহেবের পুত্র মজিবর রহমান, আজিজুল ইসলাম বড় খোকা, আনিসুর রহমান বাবুল, জামাতা কফিল উদ্দিন হারুন উর রশিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রণাঙ্গণে সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। পুরাতন রেল স্টেশনের আশপাশ গ্রামের প্রায় সকল বাড়ি থেকেই অনেক যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে ক্রীড়াবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কেষ্ট সরখেল, হোসেন আলী মংলা, ওছমান গনী, আবুল কাশেম, ফয়জার রহমান, বদিউল আলম সাজু, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আয়নাল হক, গোলাম রব্বানী, মানিক মিয়া, হানিফ মিয়া, মাহফুজার রহমান মাফু, মোস্তাফিজার রহমান মধু, নুরল ইসলাম নোলে, আব্দুল মজিদ, আজিজুল ইসলাম, মো. নুরুজ্জামান, মো. আফজাল হোসেন, আব্দুল জব্বার ড্রাইভার, আব্দুল জব্বার ছক্কু, আব্দুর রহমান, একেএম সাইফুল আলম জিলু, মহির উদ্দিন ড্রাইভার, একাব্বর আলী, আফজাল হোসেন (ট্যানারী), আব্দুল জলিল, আব্দুস সবুর বাবুল, মো. রিয়াজুল ইসলাম, আব্দুল আহাদ, এবিএম মুসা, আব্দুস সামাদ সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কুড়িগ্রাম শহর ছাড়া মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে। পাকিস্তানি সেনাদের সমর্থনে থাকা শহরের বেশ কয়েকটি বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়েছিল। পাকিস্তানের দোসরেরা তাদের নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সেখানেও পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছিল। উত্তাল একাত্তুরে সারা বাংলার মুক্তিকামী মানুষগুলো পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং স্বাধীনতা পেতে সামর্থ অনুযায়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কুড়িগ্রাম মহুকুমার থানার মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক দুঃসাহসীক যুদ্ধ কলায় কোনঠাসা ছিল পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। কুড়িগ্রাম মহুকুমার সদর, নাগেশ্বরী, রুঙ্গামারী, রাজারহাট লালমনিরহাট ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৬নং সেক্টরের অধীনে এবং উলিপুরচিলমারী রৌমারী থানা ১১নং সেক্টরের আওতাধীনে থাকা মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনী গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ব্যুহ তৈরি করে। মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডারের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়া ২য় পুত্র আজিজুল ইসলাম বড় খোকা বড় জামাতা মো. কফিল উদ্দিন ভারতে মুক্তিযোদ্ধা হায়ার ট্রেনিং করে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, রুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর লালমনিরহাট তিস্তাপাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করতে থাকে। কনিষ্ঠ পুত্র আনিছুর রহমান বাবুল ভারতে হায়ার ট্রেনিং শেষ করে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও দিনাজপুর এলাকায় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২য় জামাতা হারুনঅররশিদ ভারতের হায়ার ট্রেনিং শেষে লালমনিরহাট, বুড়িমারী, ফুলবাড়ী, তিস্তা হারাগাছ এলাকায় মুক্তিবাহিনীর সাথে যুক্ত থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। জ্যেষ্ঠ পুত্র সাংবাদিক মজিবর রহমান মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনীতে থেকেই কুড়িগ্রাম মহুকুমার থানায় মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপন লড়াই করতে থাকেন বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন করতে প্রথম পাকিস্তানি সেনা মুক্ত করা হয় কুড়িগ্রামের রুঙ্গামারী বাগভান্ডার। মরণাপন যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নতি স্বীকার করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ এর ১৪ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারী হানাদার মুক্ত করে। ২৩ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী, মিত্র বাহিনী বিমান বাহিনীর যৌথ সারাষী আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং রাজাকার বাহিনীর রায়গঞ্জ ব্রিজের শক্ত প্রতিরক্ষা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় রায়গঞ্জ ব্রীজ হানাদার মুক্ত হলো। মুক্তিযোদ্ধারা ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী শত্রæমুক্ত কওে স্বাধীন করা হয়। নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, উলিপুর, রাজারহাট সহ আশপাশ এলাকায় যুদ্ধেরত মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনী গেরিলা বাহিনীর কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে থাকে। প্রবল চাপের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে পালিয়ে রংপুরে পিছু হঠতে থাকে। ১৯৭১ইং ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের ওভার হেড পানির ট্যাংকিতে কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে হাই কোম্পানি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম পাকিস্তানি শত্রæমুক্ত হয়ে পানির ট্যাংকিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা পত্পত্ করে উড়তে থাকে। টগরাইহাটরাজারহাট অপরদিকে কাঁঠালবাড়ীছিনাই এবং উলিপুরদলদলিয়া হয়ে তিস্তায় ঢুকে পরে মুক্তিবাহিনী। তিস্তায় ১০ দিন টানা যুদ্ধ চলে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নির্মমভাবে নির্যাতন করে অসহায় গ্রামবাসীকে হত্যা করে। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পরাস্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে বিভিন্ন এলাকায় নির্মম গণহত্যা চালায়। এর মধ্যে ১৪ এপ্রিল সদরের বেলগাছা টগরাইহাটে গণহত্যা, জুন কাঁঠালবাড়ী গণহত্যা, অক্টোবর রৌমারীকোঁদালকাটি গণহত্যা, ১৩ নভেম্বর উলিপুর, হাতিয়া গণহত্যাকান্ত ছিল নির্মম। বেদনাবহ এসব গণহত্যায় শহিদ হয়েছে অসংখ্য নারীপুরুষ। পাকিস্তান বাহিনীর কুড়িগ্রাম হেড কোয়ার্টার, চিলমারী, উলিপুর ভূরুঙ্গামারী ক্যাম্পে অসংখ্য অবলা নারী পাশবিক লালসার শিকার হয়ে সম্ভ্রম হারিয়েছেন। পাকিস্তানের দোসর, দালাল, কুলাঙ্গার মানুষ ব্যতিত সমগ্র কুড়িগ্রামের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। কুড়িগ্রামের সন্তান ৯৯ জন শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা গণহত্যার শিকার হাজারহাজার নরনারীর আত্মত্যাগ এবং সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে ১৯৭১ ইং সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত হয়।

মুক্তিবাহিনী ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে হতভম্ভ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্ম সমর্পণ করে। পাকিস্তান সেনাদের আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ মাসের রক্তক্ষয়ি মুক্তিযুদ্ধেও অবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র:

) দেশটাকে ভালোবেসেকাজী সাজ্জাদ জহির রায়হান

) কুড়িগ্রাম আমার কুড়িগ্রামমোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

) রক্তে ভেজা মাটি স্বাধীনতাআমানুর রহমান খোকন

) সংকল্পে মহান মুক্তিযুদ্ধআমানুর রহমান খোকন

মন্তব্য করুন