» রমাদান

» রমাদান

হাফেজ মাওলানা মাহমুদুর রহমান

৮ এপ্রিল, ২০২২ , ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

রমজান মাস কীভাবে কাটাব?

মূল: জাস্টিস আল্লামা মুফতি তাক্বী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ 

এক.

রমজানে শুধু রোযা রাখা এবং তারাবিহ পড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকা অনুচিত। বরং রমজানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল প্রকার গুনাহ থেকে গুরুত্ব সহকারে বেঁচে থাকা, তো ইনশাআল্লাহ এটা ব্যক্তি জীবনে বড় সুন্দর পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

দুই. 

এই রমজান মাসে আমরা এ বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই এ মাসে ইনশাআল্লাহ কোনো গুনাহ করব না। আপনি ভেবে দেখুন, রমজান মাসে আল্লাহর হুকুমের সম্মানার্থে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়, পান করে না সে। খাওয়া দাওয়া হালাল ছিল নাকি হারাম ছিল? হালাল ছিল, তবুও হালাল হওয়া সত্ত্বেও ছেড়ে দিয়েছে। পানি পান করা হালাল ছিল না হারাম? হালাল ছিল, কিন্তু আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তিন.

যে কাজ আগে থেকেই হারাম, যা রোযা আর রোযার বাইরে, সব সময়ই হারাম, সেটা যদি না ছাড়া হয় তাহলে রোযা কী কাজের? যেমন মিথ্যা কথা বলা হারাম, রমজানে মিথ্যা কথা বলা বাদ দেওয়া হলো না। গীবত করা হারাম ছিল, রমজানে গীবত করা বাদ দেওয়া হয়নি। না মাহরামের দিকে অবৈধ কামনার দৃষ্টি হারাম ছিল, সেটা ছাড়া হলো না।

চার.

কারো সাথে লড়াই ঝগড়া-ফাসাদ করা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া সবসময়ই হারাম ছিল, এ গুনাহ ছাড়া হলো না। তো ভাই! যেসব ব্যপারে হালাল ছিল, রমজানে তো সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যেসব বিষয় আগে থেকেই হারাম ছিল, সেগুলো ছাড়া হয়নি।  তাহলে এটা কেমন রোযা হল? এর মাধ্যমে তাকওয়া কীভাবে হাসিল হবে?

পাঁচ. 

তাকওয়া তখনই অর্জন হবে, যখন হালাল বিষয়গুলোর পাশাপাশি আগে থেকেই হারাম বিষয়গুলোও ছেড়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হও, যে কমপক্ষে এ রমজান মাস চোখ ভুল দিকে যাবে না। জিহ্বা কোনো ভুল কথা বলবে না, কান কোনো ভুল কথা শুনবে না। এবং মুখে কোনো হারাম লোকমা যাবে না।

ছয়.

এটা কেমন কথা হলো, সারাদিন তো রোযা রাখলাম আর ইফতার করলাম হারাম খাবার খেয়ে। এমন উপার্জন যা  হারাম ছিল, তা দিয়ে ইফতার করল। ধরা যাক, ধোঁকা দিয়ে উপার্জন করল, তা হারাম। জুয়া খেলে উপার্জন করল অথবা অন্য কোন শরীয়তে নিষিদ্ধ কাজ করে উপার্জন করল, সেটা হারাম।

সাত.

সারাদিন রোযা রেখে ইফতার করল হারাম দিয়ে। এটা  কেমন রোযা হবে? এ রোযা দিয়ে কীভাবে তাকওয়া হাসিল হবে? এজন্য বলছি এদিকে মনোযোগ দাও। রমজান মাস এভাবে কাটাব যে, কোন গুনাহ হবে না। এজন্য দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিতে হবে। যেভাবে প্রবল তৃষ্ণার্ত হওয়ার পরও পানি পান থেকে বেঁচে থাক। একইরকম গুনাহ করা থেকেও বেঁচে থেকে দেখ, তাহলে এ রমজান মাস আল্লাহর তা’আলার সাথে সম্পর্ক মজবুত করার উত্তম উপায় হবে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে নিজ অনুগ্রহে তাওফিক দিয়ে দিন।

রমজান মাস কীভাবে কাটাব

হাফেজ মাওলানা মাহমুদুর রহমান

৫ এপ্রিল, ২০২২ , ২:৩২ অপরাহ্ণ

রোজার আধুনিক মাসআলা

মূল: আল্লামা জাস্টিস ত্বাকি উসমানী (দা:বা:)

আধুনিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এসেছে। সেগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগবালাই। আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ফলে সেসব রোগের নানা প্রতিষেধক ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। এসময়ে মানুষের মনে এক বড় প্রশ্ন হলো রোজা রাখা অবস্থায় এগুলোর ব্যবহারে রোজার কোনো ক্ষতি হবে কি না।

এসব বিষয়ে মাসআলা দিয়েছেন শায়খুল ইসলাম খ্যাত পাকিস্তানের জগদ্বিখ্যাত আলেম আল্লামা জাস্টিস ত্বাকি উসমানী (দা:বা:)। আসুন আজ জেনে নিই সেই বিষয়গুলো।

১. ইনজেকশন (Injection):

ইনজেকশন নিলে রোজা ভাঙবে না। (জাওয়াহিরুল ফতওয়া)

২. ইনহেলার (Inhaler):

শ্বাসকষ্ট দূর করার লক্ষ্যে তরল জাতীয় একটি ওষুধ স্প্রে করে মুখের ভিতর দিয়ে গলায় প্রবেশ করানো হয়, এভাবে মুখের ভিতর ইনহেলার স্প্রে করার দ্বারা রোজা ভেঙে যাবে। (ইমদাদুল ফতওয়া)

৩. এনজিওগ্রাম (Angio Gram):

হার্ট ব্লক হয়ে গেলে উরুর গোড়া দিয়ে কেটে বিশেষ রগের ভিতর দিয়ে হার্ট পর্যন্ত যে ক্যাথেটার ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয় তার নাম এনজিওগ্রাম। এ যন্ত্রটিতে যদি কোনো ধরনের ওষুধ লাগানো থাকে, তারপরেও রোজা ভাঙবে না।

৪. এন্ডোসকপি (Endos Copy):

চিকন একটি পাইপ, যার মাথায় বাল্ব জাতীয় একটি বস্তু থাকে। পাইপটি পাকস্থলিতে ঢুকানো হয় এবং বাইরে থাকা মনিটরের মাধ্যমে রোগির পেটের অবস্থা নির্ণয় করা হয়। এই নলে যদি কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় বা পাইপের ভিতর দিয়ে পানি/ওষুধ ছিটানো হয়ে থাকে তাহলে রোজা ভেঙে যাবে, আর যদি কোন ঔষধ লাগানো না থাকে তাহলে রোজা ভাঙবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৫. নাইট্রোগ্লিসারিন (Nitro Glycerin):

এরোসল জাতীয় ওষুধ, যা হার্টের জন্য দুই-তিন ফোঁটা জিহ্বার নিচে দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখে। ওষুধটি শিরার মাধ্যমে রক্তের সাথে মিশে যায় এবং ওষুধের কিছু অংশ গলায় প্রবেশ করার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। অতএব এতে রোজা ভেঙে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৬. লেপারোসকপি (Laparoscopy):

শিক্ জাতীয় একটি যন্ত্র দ্বারা পেট ছিদ্র করে পেটের ভিতরের কোনো অংশ বা গোশত ইত্যাদি পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বের করে নিয়ে আসার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র। এতে যদি ওষুধ লাগানো থাকে তাহলে রোজা ভেঙে যাবে অন্যস্থায় রোজা ভাঙবে না। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)

৭. অক্সিজেন (Oxzgen):

রোজা অবস্থায় ওষুধ ব্যবহৃত অক্সিজেন ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে শুধু বাতাসের অক্সিজেন নিলে রোজা ভাঙবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৮. মস্তিষ্ক অপারেশন (Brain Operation):

রোজা অবস্থায় মস্তিষ্ক অপারেশন করে ঔষধ ব্যবহার করা হোক বা না হোক রোজা ভাঙবে না। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)

৯. রক্ত নেওয়া বা দেওয়া:

রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের করলে বা শরীরে প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। (আহসানুল ফতওয়া)

১০. সিস্টোসকপি (cystoscop):

প্রসাবের রাস্তা দিয়ে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে যে পরীক্ষা করা হয় এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না। (হেদায়া)

১১. প্রক্টোসকপি (proctoscopy):

পাইলস, পিসার, অর্শ, হারিশ, বুটি ও ফিস্টুলা ইত্যাদি রোগের পরীক্ষাকে প্রক্টোসকপি বলে। মলদ্বার দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষাটি করা হয়। রোগি যাতে ব্যথা না পায় সে জন্য নলের মধ্যে গ্লিসারিন জাতীয় কোনো পিচ্ছিল বস্তু ব্যবহার করা হয়। নলটি পুরোপুরি ভিতরে প্রবেশ করে না। চিকিৎসকদের মতানুসারে ঐ পিচ্ছিল বস্তুটি নলের সাথে মিশে থাকে এবং নলের সাথেই বেরিয়ে আসে, ভেতরে থাকে না। আর থাকলেও তা পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে। যদিও শরীর তা চোষে না কিন্তু ঐ বস্তুটি ভিজা হওয়ার কারণে রোজা ভেঙে যাবে। (ফতওয়া শামী)

১২. কপার-টি (Coper-T):

কপার-টি বলা হয় যোনিদ্বারে প্লাস্টিক লাগানোকে, যেন সহবাসের সময় বীর্যপাত হলে বীর্য জরায়ুতে পৌঁছাতে না পারে। এ কপার-টি লাগিয়েও সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে। কাযা কাফফারা উভয়টাই ওয়াজিব হবে।

১৩. সিরোদকার অপারেশন (Shirodkar Operation):

সিরোদকার অপারেশন হল অকাল গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে জরায়ুর মুখের চতুষ্পার্শ্বে সেলাই করে মুখকে খিচিয়ে রাখা। এতে অকাল গর্ভপাত রোধ হয়। যেহেতু এতে কোনো ওষুধ বা বস্তু রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য খালি স্থানে পৌঁছে না তাই এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না।

১৪. ডি এন্ড সি (Dilatation and Curettage):

ডি এন্ড সি হল গর্ভধারণের আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে ঔষধের মাধ্যমে জীবিত কিংবা মৃত বাচ্চাকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে নিয়ে আসা। এতে রোজা ভেঙে যাবে। অযথা এমন করলে কাযা কাফফারা উভয়টি দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে। (হেদায়া)

১৫. এম আর (M.R):

এম আর হল গর্ভ ধারণের পাঁচ থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে যোনিদ্বার দিয়ে জরায়ুতে এম আর সিরিঞ্জ প্রবেশ করিয়ে জীবিত কিংবা মৃত ভ্রণ নিয়ে আসা। যার পর ঋতুস্রাব পুনরায় হয়। অতএব মাসিক শুরু হওয়ার কারণে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাযা করতে হবে। কিন্তু যদি রাতের বেলা করা হয় তাহলে দিনের রোজা কাযা করতে হবে না। (ফতহুল কাদীর)

১৬. আলট্রাসনোগ্রাম (Ultrasongram):

আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় যে ঔষধ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় সবই চামড়ার উপরে থাকে, তাই আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোজা ভাঙবে না। (হেদায়া)

১৭. স্যালাইন (Saline):

স্যালাইন নেওয়া হয় রগে, আর রগ যেহেতু রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা নয়, তাই স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙবে না, তবে রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য স্যালাইন নেয়া মাকরূহ। (ফতওয়ায়ে দারুল উলূম)

১৮. টিকা নেওয়া (Vaccine):

টিকা নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ, টিকা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তায় ব্যবহার করা হয় না। (আপকে মাসায়েল)

১৯. ঢুস (Douche):

ঢুস মলদ্বারের মাধ্যমে দেহের ভিতরে প্রবেশ করে, তাই ঢুস নিলে রোজা ভেঙে যাবে। ঢুস যে জায়গা বা রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে এ জায়গা বা রাস্তা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য স্থান । (ফতওয়ায়ে শামী)

২০. ইনসুলিন গ্রহণ করা: (Insulin):

ইনসুলিন নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ, ইনসুলিন রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে না এবং গ্রহণযোগ্য খালি জায়গায় প্রবেশ করে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

২১. দাঁত তোলা:

রোজা অবস্থায় একান্ত প্রয়োজন হলে দাঁত তোলা জায়েজ আছে। তবে অতি প্রয়োজন না হলে এমনটা করা মাকরূহ। ঔষধ যদি গলায় চলে যায় অথবা থুথু থেকে বেশি অথবা সমপরিমাণ রক্ত যদি গলায় যায় তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। (আহসানুল ফতওয়া)

২২. পেস্ট, টুথ পাউডার ব্যবহার করা:

রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় টুথ পাউডার, পেস্ট, মাজন ইত্যাদি ব্যবহার করা মাকরূহ। কিন্তু গলায় পৌঁছালে রোজা ভেঙে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

২৩. মিসওয়াক করা:

শুকনা বা কাঁচা মিসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজার দ্বারা রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। চাই যখনই করা হোক না কেন। (ফতওয়ায়ে শামী)

২৪. মুখে ওষুধ ব্যবহার করা:

মুখে ওষুধ ব্যবহার করে তা গিলে ফেললে বা ওষুধের অংশ বিশেষ গলায় প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে। গলায় প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙবে না। (ফতওয়ায়ে শামী)

২৫. রক্ত পরীক্ষা:

রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে খুব বেশি পরিমাণে রক্ত দেওয়া যার দ্বারা শরীরে দুর্বলতা আসে, তা মাকরূহ।

২৬. ডায়াবেটিস পরীক্ষা:

ডায়াবেটিসের সুগার মাপার জন্য সুঁচ ঢুকিয়ে যে একফোঁটা রক্ত নেওয়া হয়, এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।

২৭. নাকে ওষুধ দেওয়া:

নাকে পানি বা ওষুধ দিলে যদি তা খাদ্যনালীতে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাযা করতে হবে। (ফতওয়ায়ে রাহমানিয়া)

২৮. চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার করা:

চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার করার দ্বারা রোজা ভাঙবে না। যদিও এগুলোর স্বাদ গলায় অনুভব হয়। (হেদায়া)

২৯. কানে ওষুধ প্রদান করা:

কানে ওষুধ, তেল ইত্যাদি ঢুকালে রোজা ভেঙে যাবে। তবে গোসল করার সময় অনিচ্ছায় যে পানি কানে ঢোকে তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না। অবশ্য এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন পানি গলায় না চলে যায়। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)

৩০. নকল দাঁত মুখে রাখা:

রোজা রেখে নকল দাঁত মুখে স্থাপন করে রাখলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। (ইমদাদুল ফতওয়া)

হে আল্লাহ সবাইকেই আমল করার তৌফিক দিন।আমিন।

রমাদান প্রতিদিন ০৩ - রোজার আধুনিক মাসআলা

হাফেজ মাওলানা মাহমুদুর রহমান

৪ এপ্রিল, ২০২২ , ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ

রমাদানের গুরুত্ব ও অফুরান ফজিলত 

ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রমজান মাসের রোজা অন্যতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় হিজরিতে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মতের উপর রোজা ফরজ করেছেন।

রমজানের রোজা কেউ অস্বীকার করলে— সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এছাড়াও শরিয়ত সমর্থিত ওজর (অপারগতা) ছাড়া ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গকারী— মৌলিক ফরজ লংঘনকারী ও ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারীরূপে গণ্য। নবীজি (সা.) বলেন, ‘’যে ব্যক্তি কোনো ওজর বা অসুস্থতা ছাড়া রমজানের একটি রোজা পরিত্যাগ করবে— সে যদি ওই রোজার পরিবর্তে আজীবন রোজা রাখে তবু ওই এক রোজার ক্ষতিপূরণ হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭২৩)

রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘…সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রমজান) পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময় সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

রমজান মাস সারা বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ

নবীজি (সা.) বলেন, ‘’আল্লাহর কসম! মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনরা এ মাসে (সারা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের

উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।’’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮৩৬৮)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘’হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী হতে পারো।’’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘’যখন রমজান মাসের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্ট জিন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে— হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের প্রার্থী! থেমে যাও। আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দান করেন।” (তিরমিজি, হাদিস : ৬৮২)

রমজান বরকতময় মাস

আবু হুরায়রা (রা) বলেন, যখন রমজান মাসের আগমন ঘটল, তখন নবীজি (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন…।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৭১৪৮)

রমজানের রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার রোজার বিনিময়ে অনেক বড় পুরস্কারেরও ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন, “আল্লাহ্ তাআলা বলেন- ‘রোজা আমারই জন্য। আমি নিজে এর প্রতিদান দেব। আমার বান্দা আমার জন্য পানাহার ছেড়ে দেয়, কামনা-বাসনা ছেড়ে দেয়। রোজাদারের জন্য দু’টি খুশি। একটি খুশি ইফতারের সময়। আরেকটি খুশি আমার সঙ্গে তার সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট  মিশকের সুগন্ধের চেয়েও উত্তম।” (বুখারি, হাদিস : ৭৪৯২)

এ মাসে মানুষের প্রত্যেকটি আমল বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। একটি নেকি ১০ গুণ থেকে (ক্ষেত্র বিশেষে) ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কিন্তু রোজার ব্যাপারটি ভিন্ন। কারণ, রোজা আমার জন্য। সুতরাং তার প্রতিদান আমি নিজেই প্রদান করব।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৯৪)

রোজাদারদের জন্য বিশেষ দরজা

জান্নাতে একটি ফটক আছে। তার নাম রাইয়্যান। কেয়ামতের দিন রোজাদারগণ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অন্য কেউ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে- ‘রোজাদারগণ কোথায়? তখন তারা উঠবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ যাবে না। যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন রাইয়্যান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হবে। সুতরাং আর কেউ এ ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৯৬; মুসলিম, হাদিস: ১১৫২)

আর যে ব্যক্তি সে রাইয়ান গেট দিয়ে প্রবেশ করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রমজান মাস লাভকারী ব্যক্তি, যিনি উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম পালন করে, তার প্রথম পুরস্কার— রমজান শেষে গুনাহ থেকে ওই দিনের মতো পবিত্র হয়— যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৮৯৬৬)

দোয়া কবুল ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি

এ মাসে অসংখ্য মানুষের দোয়া কবুল করা হয়। আবেদন মঞ্জুর করা হয়। জাহান্নামির নাম জাহান্নামের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়, দোখজ থেকে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই এ মাসে বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইতে হবে। যাবতীয় দরখাস্ত দয়াময় আল্লাহর দরবারে পেশ করতে হবে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমজান মাসের প্রত্যেক দিন ও রাতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দোয়া কবুল করেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৭৪৫০)

হাদিসে আছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না : রোজাদারের দোয়া, ইফতার পর্যন্ত। ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। মজলুমের দোয়া।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৪২৮)

রমজান পাপ মোচন ও গুনাহ থেকে ক্ষমা লাভের মাস। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমআ এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহগুলো মুছে দেয় যদি সে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

রমজানে দান-খায়রাত বেশি করা

নবী কারিম (সা.) এমনিতেই প্রচুর দান করতেন। আর এ মাসে দানের পরিমাণ আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলে আকরাম (সা.) ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তার দানশীলতা অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমজান মাসে; যখন জিবরাঈল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। জিবরাঈল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে আগমন করতেন এবং তারা পরস্পর কোরআন শোনাতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) তখন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল। (মুসলিম, হাদিস : ২৩০৮)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোজাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে। তবে রোজাদারের প্রতিদান থেকে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

আল্লাহ তাআলা আমাদের রমজানে বেশি থেকে বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রমাদানের গুরুত্ব ও অফুরান ফজিলত

হাফেজ মাওলানা মাহমুদুর রহমান

৩ এপ্রিল, ২০২২ , ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

রমাদানের ফযিলত

সবাইকে পবিত্র রমাদানের শুভেচ্ছা। শুরু হয়ে গেল তাকওয়া অর্জনের গোনাহ মাফের মাস। আসুন প্রথম দিনে জেনে নিই মহাপবিত্র এই মাসের ফজিলতসমূহ।

“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যেন তোমরা তাক্বওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করো”(সূরা বাক্বারা- ১৮৩)

“যে কেউ রামাদ্বানের রোজা রাখে, ঈমান ও সওয়াবের আশায়, তার বিগত জীবনের সব পাপ মাফ করে দেওয়া হয়” (বুখারী-৩৮)

“রোজা হলো (পাপাচার থেকে) রক্ষার ঢাল স্বরূপ। তাই তোমাদের কেউ রোজা রাখলে অশ্লীল কথা বলবে না, চিৎকার ঝগড়াঝাঁটি করবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে মারামারি করে, তাকে বলবে – আমি তো রোজাদার! আমি তো রোজাদার!” (বুখারী-১৮৯৪)

‘‘আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু রোজা শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দিবো।” (বুখারী-১৯০৪)

‘‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন- মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। কিন্তু রোজার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা রোজা শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিবো।” (মুসলিম-১১৫১)

‘‘রোজা ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারে।’’ (আহমাদ-১৫২৯৯)

‘‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য) একদিন রোজা পালন করবে, তাদ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তী স্থানে রাখবেন” (বুখারী-২৮৪০; মুসলিম-১১৫৩)

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও নেকির আশায় রামাদ্বান মাসে ক্বিয়াম করবে (তারাবীহ পড়বে) তার পূর্বেকার পাপ সমূহ মাফ করে দেয়া হবে” (বুখারী-৩৫; মুসলিম-৭৬০)

“যে ব্যক্তি মিথ্যা পরিত্যাগ করলো না, আল্লাহ তা’য়ালা তার পানাহার ত্যাগ কবুল করেন না” (বুখারী-১৯০৩)

“রোজা পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে – একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়” (বুখারী-৭৪৯২)

“জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন শুধু রোজা পালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, রোজা পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। তারা প্রবেশ করার পর ঐ দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ আর সেই দরজা দিয়ে জান্নাতে ঢুকতে পারবেনা” (বুখারী-১৮৯৬; মুসলিম-১১৫২)

রমাদানের ফযিলত