ঈদ-২০২০

ঈদ-২০২০

তাজনিন মেরিন লোপা

২ জুন, ২০২০ , ৮:০৯ অপরাহ্ণ

করোনা সময়ের ঈদ

গত বছর ঈদের আমেজ পেতে ক্যানবেরা থেকে ছুটে এসেছিলাম বোনের কাছে। সেই দশ ঘন্টার রাস্তা পাড়ি দেয়া। আরমিডেলে বাসিন্দারা ঈদ করে সেই ছোটবেলার মতো রঙ্গিন করে। ঈদ এর নামাজ, দেখা-সাক্ষাত, নতুন জামা পড়ে এই বাড়ি ঐ বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। তবে এবারের চিত্র আলাদা।

কভিড-১৯, সারা বিশ্বের মতো এখানকার জীবনযাত্রায়ও প্রভাব রেখেছে। অবশ্য এখনও পরিস্থিতি বেশ ভালো। তিনটা কেসের পরে এখানে আর কোন পজেটিভ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতির ভালোর দিকে হওয়ায় একেকটা স্টেটে ধীরে ধীরে একেকভাবে শীথিল করছে। নিউ সাউথ ওয়েলসে স্কুল, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠার খোলা, শপিং মল খোলা, পার্কও খোলা। তবে দশজনের বেশি কোথাও সমাগম করতে পারবেন না। ঈদ এর জামাতের জন্য দশজন করে নামাজ পড়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সংখ্যাটা নিশ্চিত করা অন্য সব মিলিয়ে বাসায় নামাজ পড়ার নির্দেশনা দেয়া হলো।

আমরা বাসায় চারজন, তাই দুলাভাই দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ছয়জনকে জামাতে নামাজের জন্য দাওয়াত দিলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন সাউথ আফ্রিকান; যিনি ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেন। খুতবা সহ, সকল নিয়ম মেনে আমরা বাড়িতেই ঈদ এর জামাত শেষ করলাম। আমাদের ছোট্ট নাবহানও খুব খুশি। সবাই যখন চলে যাচ্ছিল সে জিজ্ঞেস করে; “ আম্মু ঈদ  মোবারক কি শেষ?” বিদেশে থাকলে বাচ্চাদের জন্য এরকম একটা পরিবেশ খুব জরুরি। এখানকার প্রধান ধর্ম, সংস্কুতি আমাদের থেকে আলাদা। তাই শিশুরা ক্রিসমাস যতো সহজে শেখে; ঈদ হয়তো শেখে না। তাই নিজের ধর্ম, সংস্কৃতিকে সজীব-সতেজ রাখাটা খুব বেশি জরুরি হয়ে যায়।

আগের রাতেই সবাই মিলে খাবার রান্না করে রাখা হয়েছিল। দেশী ঈদ এর খাবারের বেশ প্রশাংসা পেলো ভিনদেশী বন্ধুর কাছে। অনেকেই বলছিলেন, কিন্তু কারো বাড়ি যাওয়া হয়নি; কারণ একই সময়ে দশেজনের বেশি মানুষ হয়ে গেলে আইন ভঙ্গ হয়ে যাবে। অন্যদের বেলাও তাই। সিডনিতে একই বাড়িতে ঈদ এ চব্বিশজন হওয়ার কারণে সব মিলিয়ে প্রায় সাঁইত্রিশ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে পুলিশ।

ঈদের জন্য ইউনিভার্সিটিরও আয়োজন ছিল। সেখান থেকেই সকালে বাংলাদেশী সংগঠন ঈদ এর খাবার দিয়ে গেছে বাড়ি বাড়ি। বিকেলে পার্কে শিশুদের জন্য ঈদ উপহার আর প্যাকেট খাবারের আয়োজন ছিল। তবে দশজনের বেশি একসাথে হওয়া যাবে না। তাই খাবার আর উপহার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গেলো না। সবাই সবাইকে দেখে আপ্লুত; কিন্তু নিয়ম তো মানতেই হবে। তাই শুভেচ্ছা বিনিময় করেই বিদায় নিতে হলো।

শেষ বিকেলে মনের ক্লান্তি মেটাতে একটু দূরে গাড়ি চালিয়ে ঘুরে এলাম সবাই। করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তুলনা করলে অনেক ভালো ঈদ গেলো এই বিদেশের মাটিতে। কিন্তু আপনজনেরা সবাই দেশে; মনটা ঘুরেফিরে ওখানেই চলে যায়। আর বিষন্ন, ভারাক্রান্ত আর দুঃশ্চিন্তায় ভরে উঠে। প্রতিটা মূহুর্ত কাটে সব কিছুর সাথে ভালো একটা সময়ের প্রর্থনায় প্রত্যাশায়।

 

তাজনিন মেরিন লোপা

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম। ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন ‘ডাইনীর ফলবাগান’, ২০২০ এ ‘অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে। নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে। বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা সময়ের ঈদ - তাজনিন মেরিন লোপা

মুগ্ধতা.কম

৩০ মে, ২০২০ , ১১:০৩ অপরাহ্ণ

বেদনার দিন

আমি ইন্ট্রোভার্ট প্রকৃতির হওয়ায় অবরুদ্ধ থাকতেই ভালো লাগে। ঈদের সময়ও খুব একটা বেশি বের হতাম না। কেউ কেউ অবরুদ্ধ থেকেও অন্যের আনন্দ দেখে আনন্দ অনুভব করে, আমিও সেরকম একজন।

যেমন ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার আনন্দ, কিশোরদের বোমা কেনার আনন্দ, চানরাতে চান দেখে উল্লাস আর বোমা ফুটানোর আনন্দ, ঈদের দিন নতুন পাঞ্জাবি পরে হাতে টাইগার কিংবা স্পিডের বোতল নিয়ে অযথা ঘোরাঘুরির আনন্দ, প্রেমিক প্রেমিকা কিংবা নবদম্পতির ঘোরাফেরার আনন্দ, তার সাথে কালের সেলফি আনন্দ; সব দেখে আমি আনন্দ পাই। সেটা এবার হয়নি।

ঈদ-উল-ফিতরকে আমার কখনোই শুধু ইসলামের উৎসব মনে হয়নি। ইফতার খাওয়ার মধ্যে যতটা তৃপ্তি, তা সত্যিই অতুলনীয়। আমি শৈশব থেকেই যেটাতে আরও বেশি আনন্দ পেতাম তা হলো, ঈদ উপলক্ষে সিনেমা হলে নতুন সিনেমা দেখতে যাওয়া। যদিও কয়েক বছর থেকে সেটা টিভি দেখেই করি। এ বছর সেটাও হচ্ছে না।

টিভি নস্ট হওয়ায় অবরুদ্ধ সময়ে তা ঠিক করতে না পেরে সব আনন্দ নিরানন্দ পরিণত হয়েছে। যাহোক এ সময়ে সবচেয়ে যেটি বেদনার তা হলো অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ। হয়তোবা সামর্থবানরা অবরুদ্ধ হয়েই ঈদ আনন্দ অনুভব করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু যারা অন্যবার খোলা জায়গা থেকে একটি কম দামের শার্ট কিনেও অনেক আনন্দ পেত; তাঁদের জন্য এ ঈদটি সত্যিই অনেক বেদনার!

 

প্রমথ রায় 
কবি, নীলফামারী

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বেদনার দিন - প্রমথ রায়

খলিল ইমতিয়াজ 

৩০ মে, ২০২০ , ১০:৫২ অপরাহ্ণ

আশা জাগানিয়া ঈদ

ছোটবেলায় পড়েছিলাম ‘আজ ঈদ। মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ। পথে পথে শিশুদের কলরব। দলে দলে লোকজন ঈদগাহে চলেছে। তাদের গায়ে নানান রংয়ের পোশাক। বাতাসে আতর গোলাপের সুবাস।’ ঠিক যেভাবে আমাদের ছোটবেলায়ও আমরা নানান রঙের পোশাক পড়ে ঈদগাহে যেতাম।

আব্বা যখন নতুন জামা নিয়ে আসতো আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে যেন আলাদা একটা আগাম আনন্দ কাজ করতো। বিটকেল হতো কার জামা বেশি সুন্দর সেইটা যাচাই নিয়ে। বেশি ভাইবোন হওয়াতে একটা সুবিধা হলো খুনসুটি করে হলেও নতুন জামা লুকিয়ে রেখে ঈদের দিন সকালে কার আগে কে পরবে তার একটা প্রতিযোগিতা। অসুবিধে হলো পছন্দ করা নিয়ে মারামারি।

সবার ছোট হওয়ায় একটা বড় বেনিফিট হল সবার কাছ থেকে সহানুভূতিটা বেশি পাওয়া যায়। সেই ঈদ আনন্দ এখনও অনুভব করি। এখনও আষ্টেপৃষ্ঠে গভীর মমতায় স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। এবারের ঈদ গৃহবন্দি ঈদ। করোনাকালীন এই ভয়তাড়িত সময়ে মদিনার ঘরে ঘরে তথা সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে শিশুদের সেই কলরব নেই। নেই রঙবেরঙের বাহারি পোশাকের আড়ম্বর। নেই ঈদগাহে যাওয়ার আনন্দ কোলাহল। মসজিদে মসজিদে দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ আদায় যেন আন্তরিকতার পরিবর্তে সন্দেহপ্রবণতার এক বিশাল আয়োজন।

শত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কোলাকুলি-করমর্দন বিহীন এক নিষ্প্রাণ আবহ। একই সময়ে করোনার ভয়াল থাবার কোন কিনারা হতে না হতেই আম্ফান এসে হামলে পড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে। বহুগ্রাম তলিয়ে যায় সেসব এলাকার রক্ষাকবচ আধাসুরক্ষিত বাঁধ ভেঙে।

অনেকগ্রামে ঈদের আনন্দ ধুয়েমুছে তলিয়ে যায় আম্ফান কাণ্ডে। আমরা দেখেছি সেইসব গ্রামবাসীর হাঁটু-কোমর পানিতে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। যেন করোনা-আম্ফান কেন এর চেয়েও বড় কোন বিপদও তাদের কাছে নস্যি। ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’- আমরা পাকপরওয়ার দিগারের কাছে প্রার্থনা করি এই অবরুদ্ধ সময় এই আপতকালীন সমান যেন আর দীর্ঘায়িত না হয়। আবারও শিশুদের কলকাকলিতে ঈদগাহ মাঠ ভরে উঠুক।

স্কুল-কলেজ-মাদরাসা মসজিদ মন্দির মাঠ ময়দান আবার মুখরিত হয়ে উঠুক। পৃথিবী আবার বাসযোগ্য হয়ে উঠুক সব মানুষের, সব প্রাণের।

 

খলিল ইমতিয়াজ
কবি ও ছড়াকার, গাইবান্ধা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আশা জাগানিয়া ঈদ - খলিল ইমতিয়াজ

মাসুদ বশীর

৩০ মে, ২০২০ , ১০:২৬ অপরাহ্ণ

প্রাণহীন এবারের আমার ঈদের দিন

ঈদ মুবারক। এবারের রমজান মাসটা যে কি করে নিশ্চুপে ইতি টানলো বুঝতেই পারলাম না। প্রতিবছর রমজানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা অন্যরকম আমেজ মনের মধ্যে দোলা দেয়, কিন্তু এবারের রমজানটা শুধু আতংক, ভয়, উদ্বিগ্নতা, উৎকন্ঠার ভেতরেই কাটলো এবং রমজান পরবর্তী সময় এখনো ওভাবেই কাটছে। আমার তো মনে হয় এখন সারা পৃথিবীর সবার মাঝে একটি কথাই বিরাজ করছে যে, এই বিরুদ্ধ সময়ের ইতি কোথায়? আর কতদিন ঘরে থাকতে হবে? কবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে? কে দেবে এই অশুভ থাবা থেকে বাঁচতে সত্যিকারের উপায়?

আসলেই- কেউ নেই, কেউ ছিল না এবং কেউ থাকবে না! একমাত্র অসীম আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে প্রার্থনা করা ছাড়া কারো মাঝেই আজ এর সঠিক কোন যেন সমাধান জানা নেই। তাইতো বেশিরভাগ মানুষই আজ ভুলে গেছেন দিন, মাস, বছর গণনার হিসেব এবং এর ব্যতিক্রম আমিও নই।

আমার উনিরে প্রায়শই এখন জিজ্ঞেস করি আজ কী বার, মাসের কত তারিখ, ইত্যাদি ইত্যাদি, সে-ও সবসময় উত্তর দিতে পারেনা তখন মোবাইল স্ক্রিনে দেখে এর সমাধান দেয়। এমন কি এই সেদিন আমার মা’কেও জিজ্ঞেস করলাম আজ কত রোজা মা? কিন্তু চট করে মা-ও আমার উত্তর দিতে পারেননি। বয়োবৃদ্ধরা সবসময় রোজার হিসেব রাখেন, অথচ আতঙ্কগ্রস্থ মা আমার এবার যেন রোজার হিসেব ভুলেই বসে আছেন।

আমিতো নিজেই এখন বার গণনা ভুলে গেছি, কেমন যেন প্রতিটা দিনকেই এখন আমার শুধু শুক্রবার শুক্রবার মনে হয়! মসজিদে যাওয়া বন্ধ তাই জুম্মাবার আবার কি জিনিস তা-ও ভুলে গেছি? ছোটদের মতো বড়মনে এখন সেই ছোট্টটিই লাগছে একদম নিজেকে, কী অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার! সেদিন মসজিদের মাইকে আজান হতে শুনে ভাবলাম- কী ব্যাপার বেলা একটা কি বাজতে চললো, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তখন বেলা বারোটা, সেকেন্ড খানেক সম্বিতে হুঁশ ফিরলো ও… আজ মনে হয় শুক্রবার, কি একটা অবস্থা! মনে হয়, মানে এখন যেন আমি স্কুল জীবনের বীজগণিত করছি! যাক এভাবেই বরকতময় মহামূল্যবান মাসটি ইতি টানলো চলে আসলো খুশির ঈদ!

ঈদের সাথে খুশির একটা কমপ্যাক্ট বিষয় জড়িত কিন্তু জীবনে এই প্রথম মনে কোনরকম খুশি অনুভব হয়নি আমার, কেমন যেন প্রাণহীন প্রাণহীন ঈদের দিন! এমনকি এবারে ঈদের নামাজটাও পড়া হয়নি আমার, মানে- আমি মন থেকে একটু পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করি তাই বাড়িতে ঈদের নামাজ পড়িনি, যে বিষয়টা সম্পর্কে আমার যথাযথ জ্ঞান নেই সে বিষয় আমি সহজে চর্চা করিনা, করতে ভালোবাসি না, আর মসজিদে তো যাবোই না কারণ আমি সবক্ষেত্রেই একটু অতি সাবধানতা অবলম্বন করে চলি কিনা। এভাবে বাসাতেই ঈদের সকালটা পার করলাম, যথারীতি গোসল সেরে মাকে সালাম করলাম, আমার উনিসহ বাড়ির সকল ছোট সদস্যরা আমার কাছে সালামি আদায় করলো, দুপুরে যথারীতি ঈদের মধ্যাহ্নভোজ সেরে বিছানায় গা এলিয়ে এন্ড্রয়েডে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে কেটে গেল আমার এবারের প্রাণহীন  ঈদ।

সেই ছোট্ট বেলা থেকে- একটু পড়া, লেখালেখি চর্চা ও ঈশ্বর প্রার্থনায় ব্রত থাকা আমার সহজাত স্বভাব, তাই এই অবাধ্য দুঃসময়ে তা যেন আরো জোরালো হয়ে উঠছে দিনদিন। কী পাব? কী পেলাম? এবং, কিন্তু, বরং- এসব ভাবনা আমাকে তেমন স্পর্শ করে না। আমি আমার মতো, তবে এবারের ঈদটা ‘আমার মতো’ করে পালন করা হয়নি আমার, হয়তো আমার মতো অনেকরই এবারের ঈদটা চাঁদের মাঝেই এভাবেই সীমাবদ্ধ ছিলোঃ

রমজান চলে গেল

ঈদ কি দেখা পেল?

চাঁদেতে ঝরছে ঈদ

ধরাতে দুখের নিদ…

ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সকলকে নিরাপদ রাখুন এই প্রত্যাশায় পুনশ্চ ঈদ মুবারক।

 

মাসুদ বশীর
কবি, রংপুর

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রাণহীন এবারের আমার ঈদের দিন

মুগ্ধতা.কম

২৯ মে, ২০২০ , ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

পেশা

অভি আর খেয়ার ভালোবাসার ছোট্ট আপন নীড় তাদের ছোট্ট সোনা আরিজ কে নিয়ে।

অভি পেশায় বাংলাদেশ আর্মির একজন সিক্রেট এজেন্ট, দেশকে সুরক্ষিত রাখাই তার মূল কাজ, দেশদ্রোহীকে ক্রসফায়ার করতে একটুও হাত কাঁপেনা তার। অন্যদিকে খেয়া পেশায় চিকিৎসক, তার লক্ষ্য বন্ধু-শত্রু বিবেচনায় না রেখে মানুষকে বাঁচানো।

ঈদের চাঁদ উঁকি দিয়েছে, কাল ঈদ। আরিজ বায়না ধরেছে আতশবাজির জন্য, পাড়ার ছেলেমেয়েরা হই-হুল্লোড় করে আতশবাজি ফোটাচ্ছে।

হঠাৎ অভির ফোন বেজে উঠলো তাকে এখনই সিক্রেট মিশনে যেতে হবে, গোপন সূত্রে জানা গেছে কাল ঈদের বড় জামাতগুলোতে বায়োলজিক্যাল বোম ব্লাস্ট করা হবে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশে। অকস্মাৎ অজানা ভাইরাসজনিত রোগে মারা পড়বে অগণিত মানুষ। অভিকে যে করেই হোক এ বায়োলজিক্যাল বোম্ব খুঁজে বের করতে হবে, কোনভাবেই ব্লাস্ট হতে দেয়া যাবেনা।নাহলে যে নামাজ শেষে সবাই ঘরে ফিরে নিজের অজান্তেই পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দিবে এ  ভাইরাস।

আরিজের আবদার রাখতে অনেক কষ্টে খেয়া আর অভি এবার ঈদে ছুটি নিয়েছিল, বাচ্চাটার সাথে একটি ঈদও করা হয়নি তাদের।

খেয়ারও ফোন আসে ছুটি বাতিলের জন্য, তাকে ইমার্জেন্সি মেডিকেল টিমে টিম লিডারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দেশে বিশাল এক মহাবিস্ফোরণ হবার আশঙ্কা রয়েছে, অকস্মাৎ আক্রান্ত হতে পারে লাখ লাখ মানুষ। বাঁচাতে হবে প্রতিটি প্রাণ কোন রকম ভেদাভেদ ছাড়াই।

আরিজ বায়না করতেই থাকে। ওর কথায় কান নেই অভি বা খেয়ার। আজ সবগুলো শয়তানকে মেরে ফেলবে অভি, মাথায় রক্ত উঠে গেছে তার।তার সোনার দেশ, তার দেশের মানুষকে শেষ করে দিতে চায় তারা!

খেয়া ভাবছে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে সকলকে, হোক না সে দেশদ্রোহী কিংবা বিদেশী এজেন্ট।

দুরকম ব্রত নিয়ে অভি আর খেয়া তাদের আপন নীড় থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে বেরিয়ে যায় পেশার তাগিদে…..

পিছনে পরে থাকে আরিজের বায়না আর অবিরত কান্না..।

মোস্তারী বেগম মিতা
লেখক ও চিকিৎসক
রংপুর।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পেশা - মোস্তারী বেগম মিতা

মুগ্ধতা.কম

২৯ মে, ২০২০ , ৯:২৬ অপরাহ্ণ

এলো আবার চলেও গেল 

ঈদ চলে গেল। যেহেতু সে এসেছিল তাই চলে যাওয়াই স্বাভাবিক। যে আসে সেই তো চলে যায়, নাকি? এই ধরেন শনিবার আসে এবং চলে যায়, এপ্রিল আসে এবং চলে যায়। মানুষ আসে আবার চলে যায়। আসে নতুন মানুষ। ঠিক তেমনি ঈদ এসেছিল।

ঈদ যে এসেছিল এটা আমি বুঝতে পারছি। কেমনে? আরে ভাই আমি তো অপেক্ষায় ছিলাম ঈদের। এই ধরেন একেকটা দিন রোজা যায় আর আমি হিসাব করি আর কবে থেকে রোজা থাকতে হবে না। না খেয়ে থাকাটা বড়ই কষ্টের। তারচেয়েও বড় কষ্ট নাকে খাবারের গন্ধ, চোখে খাবার ঝুলছে কিন্তু আমি টুপ করে খাবার মুখে পুরতে পারছি না। গোসলে ট্যাপ ছেড়ে পানি দিয়ে গোসল করছি। পানি মাথা হয়ে চুল গড়িয়ে মুখে আসছে। গিলতে পারছি না। গিললে কী হয়? কেউ তো আর দেখছে না।

দু ঢোক মেরে দিয়ে মাথা মুছতে-মুছতে বের হলে কে টের পায়? তারপরও ঢোক গেলা হয় না। ঐ যে, ইস্ এতক্ষণ থাকলাম আর কিছুক্ষণ হলেই তো ইফতার। মাখিয়ে খাওয়া যাবে। এই দিন দিন না, এই দিনেরে নিব আমি ইফতারির কালে। কীসের সংযম? খেয়ে নে বাবা। বড় কষ্ট গেছে সারাদিন। তো ঊনত্রিশে এসে ইতস্তত।

কাল কি ঈদ? নাকি তিরিশে? মন চায় ঊনত্রিশেই হোক। তা আর হলো কই? পুরো ৩০ টা রোজা শেষ করেই ঈদ এলো,বলে কয়ে। কোন চমক নাই। রাগে আকাশের দিকে আর তাকাই নাই পর্যন্ত। চাঁদ বাঁকা হোক, গোল হোক আমার কী? কাল ঈদ। ঈদ মাঠে পড়া অভ্যাস। কয়েকবার যে মসজিদে নামাজ পড়ি নাই তা কিন্তু না।

একবার ঈদগাঁ মাঠে বৃষ্টি শুরু হলো। সেবার নামাজ মসজিদে হলো। ময়দানে নামাজ পড়ার একবার অভ্যাস হলে আর বদ্ধ ঘরে নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে না। পড়াশুনার কারনে একবার- দুবার ঢাকায় ঈদ করতে হয়েছিল।

আমি খোঁজ করতাম ঈদগাঁ। তো মোহাম্মদপুরে একটা পাওয়া গেল। পাশে তাকিয়ে দেখি অভিনেতা নাদের চৌধুরী । আরে ঐ যে নাটক বারো রকম মানুষ করেছিল। একটু পরপর তারদিকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল। যা হয় আর কি! রংপুরে এসবের বালাই নাই। সবাই আমজনতা। কেউ কাউরে বিশেষ পাত্তা দেয় না। পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে নামাজ পড়তে গেলাম ইসলামবাগ জামে মসজিদ। দুইহাত দূরে-দূরে দাঁড়িয়ে নামাজ।

ছোটবেলায় হুজুর বলছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়বি, নাহলে শয়তান ঐ ফাঁকে ঢুকে যাবে। আমি দুইহাত দূরত্বে কয়টা শয়তান ঢুকে গেল তাই ভাবছি। নামাজ শেষ, আমার এবার অস্বস্তি কম। কোলাকুলি নিয়েও আমার কনফিউশন। প্রথমে ডানে নাকি প্রথমে বামে। প্যাঁচ খেয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমি যা করতাম নিজেকে ছেড়ে দিতাম যে আমার সাথে কোলাকুলি করতে আসছে তার হাতে। সে আমাকে নড়াচড়া করে কোলাকুলি পর্ব শেষ করতো।

এবার সেসবের বালাই নাই। নামাজ পড়ে বাড়িতে ফেরত তারপর খাওয়া আর খাওয়া। খেয়ে ঘুম। বিকালে উঠে মনে হলো, এই যা চলে গেল!

ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ
লেখক ও চিকিৎসক
রংপুর।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঈদ এলো আবার চলেও গেল 

হেলেন আরা সিডনী

২৮ মে, ২০২০ , ৪:৪০ অপরাহ্ণ

ঈদ কেমন কাটলো

শুকরিয়া বলতেই হয় কারণ চারদিকে এতো বিপর্যস্ততার ভিতরেও পবিত্র রমজান মাসের ত্রিশ রোজার পর ভয়ংকর মরণব্যাধী করোনার আতংক – দু:খ – কষ্টকে  বুকে নিয়েও আমরা ঘরে ঘরে ঈদানন্দকে যে যে ভাবে পেরেছি ভাগ্যবিধির শ্রেষ্ঠ উপহার মনে করে ঈদকে হাসি মুখে গ্রহণ করে নিয়েছি। এটাই লাখো শুকরিয়া…।

তবে হ্যাঁ, আমি ব্যক্তিগত অনুভূতিতে বলতে পারি – অব্যক্ত মনে একটা কষ্ট আমায় যেনো কুড়ে কুড়ে যন্ত্রণা দেয় সেটা দীর্ঘ বছর ধরে এই ঈদ সময়গুলোতে। এবার আরো বেশি আর সেটা অন্য মনে..অন্য নিঃসঙ্গতা / একাকিত্বের মানসিকতায় ঈদকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। আহত ব্যথাগুলো চোখ জলে ফোঁটাফোঁটা হয়ে ঝরে পরে নি বললে মিথ্যে হবে। আমি যেখানে থাকি সেই জায়গাটা মেইন শ্বশুরবাড়ি ছিল যদিও সেটা আমি পরে আমার মতো করে ছোট্ট একটা এক চিলতে ঘর করে নিয়ে সেই বাসাটির নাম দিয়েছি শ্বশুর আব্বার নামে ‘ফজলার ম্যানসন’।

বিয়ের পর থেকে এই বাড়ির ঈদের নিয়ম দেখে এসেছিলাম রংপুরে অবস্হানরত যে যেখানে এই বাড়ির ছেলেরা থাক্ না কেনো সকলেই নিজ নিজ বাসায় গোসল সেরে এই বাসায় চলে আসতো এবং এক সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতো। আবার ফিরে এসে এখানে খাওয়া – দাওয়ার আয়োজন পর্ব চলতো।

তখন আমরা ছিলাম পালপাড়া ভাড়া বাসায় এবং যথারীতি নিয়ম আমরাও মেনে চলতাম। একটা সময় সকলে গত হলেও আমি এই বাসায় যখন একাকিত্বের বসত শুরু করলাম তখনও সেই একই নিয়ম যথারীতি অটুট রাখলেন বড় ভাইয়েরা ( মানে ভাসুর-দেবর ) এবং ভাস্তারা। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যতোটুকু ঈদ আপ্যায়ন করতে পেরে আমিও উচ্ছ্বসিত হতাম। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি ছিল ঈদের দিনে। এবার সেই ভালোলাগা – আনন্দ থেকে এই বড় ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে বঞ্চিত হয়েছি বলে মনটা সত্যি খুব ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল।

রাস্তার বড় দরজা খুলে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম মাইকে নিজ নিজ নিরাপত্তা রেখে নিয়ম মেনে নিজ নিজ এলাকার মসজিদে নামাজ পড়ার আন্তরিক আহ্বান। সত্যি কিছু কিছু মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যখন মসজিদে যাচ্ছিল তখন আমার চোখে পানি আসছিল কারন সেই ছোট্ট বেলা থেকেই দেখেছি-বুঝেছি ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানে নতুন জামা, ঈদ মানে ঈদগাহ্ মাঠে নামাজ..বুকে বুক মেলানো কোলাকুলি, কোলাহল অথচ এবার কেমন যেনো নীরবতা – কেবলি ভয়। প্রহর গুণে গুণে মানসিক ভাবে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি যেনো। কিছু মানুষ মসজিদে গেছে। চোখে পানি নিয়ে শুকরিয়া জানাই অত:পর নামাজ পড়ে রাব্বুল আল আমিনের কাছে ক্ষমা চাই। ক্ষমা চাই সারা বিশ্ববাসীর জন্য। কেনো যেনো এবার ঈদ উপলক্ষ্যে কোনো আয়োজনের অনুভূতি অনুভব করি নি হয়তো মন কোন সাড়া দেয় নি। সেটা বুঝে আমার মেজোবোনের পুরো পরিবার এসে ঈদ আয়োজনের খাবার ভর্তি টিফিন ক্যারিয়ার আমার হাতে তুলে দিয়ে বুঝিয়ে গেলো- আজ ঈদের দিন। ওরা অনুভব করেছিল আমি কিছু করবো না।

সত্যি বলতে কি আমার ঈদেরা যেনো বহুদিন আগে নিলাম হয়ে গেছে কোথায় কোনো এক কষ্ট সময়ের কাছে। এবারের ঈদ যেনো আরো গভীর ভাবে হৃদয় নিঃসঙ্গ তেষ্টায় নিমজ্জিত হয়ে গেছে। যদিও দেশ-বিদেশ থেকে বোন, আত্মীয় – স্বজন, সাংগঠনিক আলীম স্যার, মনোয়ারা আপা সকলে যখন মোবাইলে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল মনটাতে তখন খুব ভালো লাগছিল। বাংলার বুকের চারদিক যেনো নির্জনতার দীর্ঘশ্বাসে গোপন তেষ্টায় কম্পিত হচ্ছিল। ২০২০ সালের করোনা নিষ্ঠুর যন্ত্রনা, ঝড়ের ভয়ংকরী আঘাত এমন দুঃসময় যেনো আর কোনোদিন না আসে…এই প্রার্থনা । জীবন ক্যানভাসে আজকের এই ঈদ সময়কে আমার অভিজ্ঞতার শব্দজালে বন্দী করার প্রয়াস বা সুযোগ পেলাম আকস্মিক ভাবে মুগ্ধতা ডট কমের আয়োজনে। অনেক কৃতজ্ঞতা আন্তরিক শুভেচ্ছা মুগ্ধতা ডট কম পরিবার। ঈদ মোবারক। সকলেই ভালো থাকুন…ঘরে থাকুন।

হেলেন আরা সিডনী
কবি, রংপুর।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঈদ কেমন কাটলো -হেলেন আরা সিডনী

মুগ্ধতা.কম

২৮ মে, ২০২০ , ১২:৩২ অপরাহ্ণ

ভয়ভুজঙ্গম

ভয়ভুজঙ্গম যেন মাকড়াসা-জালের মতো বিস্তর ছড়িয়ে আঁকড়ে ধরেছে আমাদের সমূহ যাপন-প্রণালি।

থমকে যাওয়া চাকার মতো সমূহ ঘূর্ণন যেন স্থবির হয়ে পড়েছে নেহাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে। কোনো এক অযাচিত অবরুদ্ধ খাঁচার ভেতর অসহায় প্রাণির মতো স্বপ্ন ও সৌন্দর্য অদ্যাবধি অন্তরীণ। প্রতিটা পা ফেলে পদে পদে বিপদ বিছানো পথে এগুতে হয় সতর্ক যোদ্ধার মতো।

এরকমই এক ভয়দ অন্ধকার-বিবরে গলে গলে পড়ছে রমজানের ম্যাচুউরড চাঁদ। কয়েকদিন পরে এই চাঁদের সাম্পানেই চড়ে আসবে রোজার ঈদ।

ঈদ এলেই এই কাচ ও কংক্রিটের ওজনশীল ঢাকাই নগরে আমার মতো মধ্যবিত্ত নাগরিকদের ছুটতে হয় রূপকথার পঙ্ক্ষিরাজ ঘোড়ার মতো। একটু লাগাম টেনে আস্তাবলে জিরাবার মতো ফুসরত থাকে না বলে মরিয়া হয়ে উঠতে হয় প্রতিটা পদক্ষেপ বাস্তবায়নে। পরিবার-পরিজনদের জন্য শপিং করা। দূরাত্মীয়দের ভালো-মন্দ খোঁজ নেয়া। বিকাশের মাধ্যমে বিশেষ অর্থ-সহায়তা পাঠানো। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সেহরি খেয়ে সুদীর্ঘ লাইনের ঠেস সামাল দিয়ে বাসের টিকিট কাটা। এছাড়া ছোটখাটো কতো কাজ তো রয়েছেই, সেসবের নাম নাইবা লিখলাম।

কিন্তু! হ্যাঁ, কেবল একটা কিন্তু এসবকে আরও দুঃস্বপ্নের দ্রবণে দূরহ ও দুস্কর করে তুলেছে— সেই কিন্তুটা হলো কোভিড-১৯ নামক ভয়ভুজঙ্গম।

এমনিতেই বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ভয়দ নদী সাঁতরে পার হচ্ছি নিদানের দিনলিপি। তার উপর অফিসে চাকরিচ্যুত হবার আরেক নবোদয় ভয় ভয়দভাবে চেপে ধরেছে স্তব্ধতায় লুপ্ত প্রায় স্বর ও শরীর। মেরুদণ্ডের মেরুতে কষাঘাতের মতো দেগে ধরা কদর্য কোভিডে সরকারিভাবে ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষ হতে না হতেই আমাদের অফিসের দরজা খুলে গেছে। নামমাত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিবিধ ভয়ের সুঁড়ঙ্গ হেঁটে হেঁটেই খুঁজে নিতে হচ্ছে অফিসের গলি ও গন্তব্য। রেডিমেড পোশাকের মতো মুখে হাসির ক্রিম মেখে অফিসের অসমাপ্ত কাজসমূহ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এর উপর একটার পর একটা রিপোর্ট দিতে হচ্ছে। একটু বিলম্ব হলেই অকথ্য কথনের যাতাকলে পিষ্ট হতে হচ্ছে। দম ফেলার মতো কোনো ফুসরত নেই। তার সঙ্গে জি-মেইলের ইনবক্সে অন্ধ অশ্বের মতো ছুটে আসা একটার পর একটা পরিপত্র যেন চাবুকের ঘায়ের মতো শপাশপ বসে যাচ্ছে ভয়ে কুঁজে যাওয়া ন্যুব্জ জীবনের পিঠে। শেষ ঘা-টা এসে পড়লো তখনই—যখন পরিপত্রের প্রতাপ থেকে ঘোষিত হলো—

এবার ঈদের ছুটিতে স্টেশন লিভ করা যাবে না। নিজ নিজ কর্ম-এলাকায় অবস্থান করতে হবে। যদি কেউ অজ্ঞাতভাবে দেশের বাড়ি বা অন্যত্র কোথাও ঈদ করতে যান—তাহলে তাকে বিনা নোটিশেই চাকরিচ্যুত করা হবে।

রেনেসাঁসের চাবুক থেকে কর্পোরেট বাক্স অব্দি এই যে পুঁজিবাদের পাপ ও পালকের প্রচার-প্রসারক কোনো এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা—গভীরতার শরবত মিশিয়ে গাম্ভীর্য গলায় তিলাওয়াত ও তরজমা করে যাচ্ছিলেন সেই পাথুরে পরিপত্রের প্রতাপশীলতা। তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো—ফিলাডেলফিয়ার সেই অন্ধ রোমান বিচারপতি, যিনি বহু ঈশ্বরবাদ অস্বীকারকারী প্লুতুনিয়াসকে আগুনে পুড়িয়ে মারার মৃত্যুদণ্ড-রায় ঘোষণা করেছিলেন।

প্লাস্টিক যুগের চেয়ারে আসীনরত আমাদের মতো পুঁজিবাদের হুকুমত মেনে চলা ছা-পোষা অপারগ-আগাছারা কেবল পরস্পরের দিকে বিস্ময়ের বিষাদে তাকাই। আর একের পর এক পুস্পার্ঘ্যর মতো ইশারা বিনিময় মারফত নৈঃশব্দ্যের ময়দানে প্রতিবাদের অনুরণন তুলতে থাকি। কিন্তু প্রকাশ্যে এই প্রতিবাদের স্ফূরণকে উসকে দিতে পারি না আমাদের অপার অক্ষমতার বেড়ি থাকায়।

মায়ের জন্য কেনা নতুন কাপড়গুলো কুরিয়ার করতে না পেরে অনেক খারাপ লাগছে। সবচেয়ে খারাপ লাগছিলো—যখন মা বিরবির সিলাবলে বলছিলেন—তাহলে কি তোমাদের সঙ্গে আমার ঈদ করা হচ্ছে না! ভাইবোন ও সুহৃদের সমূহ মুখ ও মায়ার নহবত ভুলে শূন্যতার মর্মরি উঠে গহিন-গহনে। ভয়দ এইসব মেনে নিয়েই মনের পায়ে বেড়ি পড়িয়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরি রোজকার মতো।

পরদিন যে ঈদ, তা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম, যদি না বাজারের ব্যাগ হাতে গুঁজিয়ে কল্পনা আমাকে সদাই কেনার তাগাদা না দিতো।

সামাজিক দূরত্ব আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের নামাজ পড়বার অনুমতি পেয়েছে উপাসক-শূন্য মসজিদগুলো। খুব জাঁকজমকভাবে না সাজলেও কোনোরকমভাবে তাড়াহুড়োর ভেতর সীমিত পরিসরে প্রস্তুত হয়েই মাইকিংয়ে আহ্বানের তরঙ্গ ছড়াচ্ছে রাত থেকেই। রাতে তাড়াহুড়ো ঘুমানোর সুবিধায় একেবারে প্রচলিত ঘড়ির কাঁটা ধরে সাতটায় ঘুম ভেঙে যায়। অবশ্য এর পেছনে রয়েছে মসজিদের মাইকগুলো আর কল্পনার কঠোর ভূমিকা। পাঁচ বছরের একমাত্র সন্তান রাগিবকে ডাকতে ডাকতে গলা ব্যথা হয়েছে। উপায়ন্তর না পেয়ে শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাই। ঝর্ণাটা ছেড়ে দিয়ে জলের ফোয়ারার নিচে দাঁড়াই। সকালের শীতল জলে কোভিডে দগ্ধ শরীরটা সাময়িকভাবে ঠাণ্ডা অনুধাবন করি। ইচ্ছে করে আরও কিছুক্ষণ মনের মচকানো ডানাগুলো জলের জাফরানে মেলে ধরে থাকি। কিন্তু তা আর হয়ে উঠে না। আরে, আটটা তো বেজে গেলো। নামাজ শেষ হলে তোমার গোসল শেষ হবে নাকি! কল্পনার কঠোর জোরাজুরিতে বাথরুম থেকে বের হয়ে জায়নামাজটা হাতে নিয়ে মসজিদের পথে পা বাড়াই।

আল্লাহু আকবর—আল্লাহু আকবর—তকবির দিই আর হাঁটি। হাঁটি আর তকবির দিই। হাঁটতে হাঁটতে ভাই-ভাতিজাদের কথা মনে পড়ে যায়। এরকম তকবির দিতে দিতে আমরা সমবেতভাবে বায়তুল মামুর জামে মসজিদের ঈদগাহে ছুটে যেতাম। এক জায়নামাজে দাঁড়িয়ে জামাতের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করতাম। নামাজ শেষে কোনো এক এপ্রিলে—আমাদের জানালা বিদীর্ণ করে—শাদা মেঘের রেইনকোট পড়ে— অনন্তর অভিমুখে চলে যাওয়া বাবার গোর জিয়ারত করতাম। কান্না ও করুণার জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যেতাম দোয়া-দরুদ জপতে জপতে।

মাইকের মুখ থেকে মুহুর্মুহু ভেসে আসছে অন্তিম আহ্বান—একটু পরেই জামাত শুরু হয়ে যাবে। পেছনের উজ্জ্বলতা মুছে সামনের কাচ-কুয়াশার অভিমুখে অগ্রসর হই।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে দীর্ঘ কাতারের সারিতে উপাসকদের উপস্থিত দেখে মনটা খুঁতখুঁতিয়ে ওঠে। অনেকেই স্বাস্থ্যমুখোশ না পড়ে এবাদতে এসেছে। এদের এড়িয়ে যেতে না যেতেই কয়েকজন ঘেঁষাঘেঁষি করে আমার ডানে-বাঁয়ে হাঁটুমুড়ে বসেন। একটু সড়ে দাঁড়ান বলতেই নামাজ শুরু হয়ে যায়। নামাজ শেষে হুজুরের খোৎবা আরম্ভ হলে মোনাজাতের জন্য নাতিদীর্ঘ অপেক্ষা করি।

খোৎবা শেষে হুজুরের বিশেষ বয়ানে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়। সেকেলে বয়ানের বিবরে মৃত্যুর ভয়ের ভয়দতা শুনে যেটুকু খুশিবোধ মনের মধ্যে সঞ্চয় করে নামাজ পড়তে এসেছিলাম, তার পালকও পলকের মধ্যে পলেস্তরার মতো খসে খসে নির্মমভাবে নিঃস্ব করে তোলে।

নিঃস্বতার নিকুঞ্জ নিয়ে বাসায় এলে স্ত্রী ও সন্তানের হাস্যোজ্জ্বলতার টুকরাটাকরা দেখে মলিন মুখটা বর্ষাদিনের সূর্যের মতো ঝলকে ওঠে। আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা ব্রেকফাস্টের ট্রে থেকে মিষ্টান্নের বাটিটা হাতে তুলে দেয় ক্লান্ত কল্পনা। কয়েকদিন থেকে ও যে গতর খেটেছে, তা মিনিমাম এক মাসের ইকুয়েশন হবে। ঈদ আসার তিনদিন আগ থেকে আশপাশ পরিস্কার, ঘরদোর ন্যাপাক্যাচা, বেডশিট-মশারি ও অন্যান্য কাপড়চোপড় ওয়াশ করতে মাকে দেখতাম হাফপ্যান্টবেলায়।

এতক্ষণে হয়তো বাবার গোর জিয়ারত শেষে সকলে বাড়িতে ফিরে ঈদ-সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছে। ভিভো ব্রান্ডের ইন্ডিয়ান অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের ছোটকে কল দিলে অনুমানটা সত্যি হয়। একে একে ইমন, জিয়ন ও মায়ের সঙ্গে ফোনালাপ শেষে বুক ফসকে কোনো এক অস্থায়ী তৃপ্তির ঢেঁকুর উঠে হাওয়াই হয়ে যায়।

ঈদের দিনটাও ফুরিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ছাদের কার্নিশে নেমে আসছে অপ্রতিরোধ্য অন্ধকার। কাচ ও কংক্রিটের জানালা থেকে মুছে যাচ্ছে বিকেলের বিভা।

আমাদের মূর্ছা যাওয়া হাসির মতো মা’র কপালের কৃষ্ণচূড়া-টিপ সদৃশ রক্তাভ সূর্যটা পশ্চিমে গড়াতে গড়াতে মাগরিবের সিম্ফনি ভেসে আসে করুণ লিলাবলে। ভয়ভুজঙ্গম আরও ফোঁস ফোঁস করে ওঠে—যখন পুঁজিবাদ প্রলয়ঙ্কর হুঙ্কার তুলে বলে—
‘টিকা না আসা অব্দি কোভিডকে সঙ্গি করেই আমাদের বাঁচতে হবে’
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।
প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভয়ভুজঙ্গম