পল্লব শাহরিয়ার

২৩ অক্টোবর, ২০২০ , ১০:১২ অপরাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮)

(পর্ব-৮)

অনেকক্ষণ আগেই বাড়িতে আলো জ্বেলে উঠেছে। এ সময় কত কী কাজ আছে, সকলেই কিছু না কিছুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রান্নাঘর সামলাতে যায় মা, রাতুলকে পড়াতে বসায় রাত্রি। রাত্রি দূর থেক্ েচিৎকার করে বললো, বাবা, তারুলের পড়ার সময় হয়ে গেছে।

ওই লোকটি, অবাঞ্চিত একটা লোক হয়ে গেছে যে শ্রাবণ, কিছুকাল আগেও এ বাড়িতে এলে জামাই আদর পাক বা না পাক, একটা সৌজন্য দেখাতে কেউ কার্পণ্য করতো না। এখন হয়ে গেছে ্কটা বিব্রতকর শুঁয়োপোকা। ঝাটায় ডগায় তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারলেই যেন শান্তি। শুধু ওই লোকটার উপস্থিতির কারণে সারা বাড়িটাই স্থির হয়ে গেছে। স্থির করে দেওয়া ভিডিও ছবির মতন, চলে গেলেই আবার সচল হবে।

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮) 35

শ্রাবণ চলে যাবার সাথে সাথে রাতুল একটা ব্যাগ হাতে লাফাতে লাফাতে এল, বেশ খুশি। সঙ্গে সঙ্গে রাত্রির সমস্ত মন বিস্বাদ হয়ে গেল।

হাসি হাসি মুখে রাতুল বললো- কাকু কত কী দিয়ে গেল দেখ মা। ব্যাগ থেকে একটা ক্যাডবেরি বের করে বললো- কত বড় দেখ।

রাত্রির মুখ ততক্ষণে ক্রুদ্ধ কঠিন। ক্যাডবেরি আর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে বললো, এসব আমি তোমাকে কিনে দেব, আমি কিনে দেবো।

প্রথম প্রথম এই ভুলটাই তো করতে বসেছিল রাত্রি। ভাবত, রাতুল শুধুই আমার। এত স্নেহ, মমতা ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করে তুলছে, সে তো শুধু আমার। আমাকে সেই ভালবাসা ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার যেন আর কোনো অস্তিত্ব না থাকে। তার ভবিষ্যৎ, তার ভালমন্দ বিচার, সবাই আমার দায়িত্ব।

অথচ শ্রাবণ এলেই কেমন খুশি হয়ে ওঠে রাতুল। বেশ খুশি খুশি ভাবেই একদিন বলেছিল, আজ কাকুর আসার দিন, না মা?

ওর ওই খুশি খুশি ভাব, মুখের হাসি বিষাক্ত তীর হয়ে এসে বিধত রাত্রির বুকে। ওর নিজের মুখটাই বিবর্ণ হয়ে যেত। ভিতরে ভিতরে ছেলের ওপর রেগে যেত। কী অকৃতজ্ঞ, কী অকৃতজ্ঞ। তোকে মানুষ করে তুলব, বড় করে তুলব বলেই এত কষ্ট সহ্য করছি। অথচ তুই….

সেই প্রথম দিন যখন শ্রাবণ এসে রাতুলকে একটা বড় ক্যাডবেরি, আর এক ব্যাগ কত কী উপহার দিয়ে গিয়েছিল, সেদিনই রাত্রি বুঝতে পেরেছিল কোন মানুষই শুধু একজনের সম্পত্তি নয়, হতে পারে না।

অথচ এই রাত্রিই একদিন রেগে গিয়ে বাবা-মাকে বলেছিল, আমি কি তোমাদের সম্পত্তি নাকি, যে যেমনটা চাইবে তেমনই করতে হবে। আমি কারো প্রপার্টি নই।

রাতুলের বেলায় ঠিক সেটাই করে বসেছিল। এখনো ভাবতে পারে না, রাতুল আর কাউকে এক আনা ভালোবাসাও দেবে। কারণ ওর মধ্যে এখন হারানোর ভয়টাই প্রবল।

আমি তোমাকে কালই একটা ক্যাডবেরি এনে দেবো। যা কিছু দিয়ে গেছে, কিছু ছুবি না তুই, আমি সব এনে দেব।

রাতুল সেদিন কিছুই বুঝতে পারেনি। বিভ্রান্তের মতন শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে। ওর চোখে জল এসেছিল কিনা তাও দেখেনি রাত্রি। ধীরে ধীরে সান্তনার স্বরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছে, তুই তো কিছুই বুঝিস না, ও তোকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল।

কিন্তু ছিনিয়ে নেওয়ার অর্থটা রাতুল বুঝতেই পারল না। শুধু ওকে দেখে মনে হয়েছিল একটা উল্লাস আর ফুর্তির মুখে কে যেন একটা প্রকান্ড চড় কষিয়ে দিয়েছে। রাত্রি কেন যে ওর আনন্দটুকু নষ্ট করে দিতে চায় তা কেমন করে বোঝাবে রাতুলকে। শুধুই হারাবার ভয়? নাকি রাতুল আর একজনকে, যাকে ও চায় না, পছন্দ করে না, তাকে একটু ভালবাসা দিয়ে দেবে সেই আশা।

রাতুল এক সময় নিরূপায় হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাত্রিই ঘুম পাড়ালো। জানালার বাইরে বাতাস লাগা নিম গাছ চামরের মতো দুলছে। শব্দটা যেন প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাসের মতো। আজ রাতে রাত্রির পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব। গাছের ডালে ভারি একটু কিছু এসে বসল। হয় প্যাঁচা না হয় বাদুর। রাতুল অকাতরে ঘুমাচ্ছে। রাত্রি এক ফাঁকে উঠে চোরের মতো পা টিপে টিপে অন্য ঘরে গেল। আজ তার মনটা ভীষণ খারাপ। নিলয়ের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। চার মাসের লড়াই শেষ।

রাত্রি পেছন ফিরে তাকাতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। দরজার সামনে রাতুল। বড় বড় চোখ। কপালের ওপর চুল। ফুলের মতো মুখ। রাত্রি তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। রাতুল তাকিয়ে আছে, যেন স্বপ্ন দেখছে।

আমার বাবা কোথায়? নেই তো!

রাত্রি দু’হাতে রাতুলকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল।

রাতুল আবার বলল, আমার বাবা কোথায়? নেই তো! গলা ধরে এসেছে। গলা দিয়ে করুণ চিৎকারের মতো একটা শব্দ বেরুলেঅ – ‘বাবা।’

রাত্রি, রাতুলকে কোলে নিয়ে বসে পড়ল ঘরের লাল মেঝেতে। কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা খুবই কঠিন কাজ; তবুও রাতুলের জন্য হাসতে হবে। রাত্রি ছেলেকে বুকে চেপে ধরে বলল, তোমার বাবা বাইরে গেছে। দেখবে এবার তোমার জন্য কতকিছু নিয়ে আসবে।

ধরা ধরা গলায় রাতুল বলল, পিংকু যে বলে আমার বাবা নেই বলে আমরা নানু বাসায় থাকি। বাবা এবার যাবার সময় আমাকে কিছু বলে যায়নি। তোমাকে কিছু বলেছে কি?

বলে গেছে, রাতুল যেন লক্ষ্মী হয়ে থাকে। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করে। রাতুল স্কুলে কেউ যদি তোমাকে তোমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করে বলবে- বাবা অফিসের কাজে বাইরে গেছে।

রাত্রি উঠে যাবে বাবছিল, হঠাৎ রাতুল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘আমার বাবা মারা গেছে তাই না!’

রাত্রি স্বম্ভিত হয়ে গেল। এত চেষ্টা সব ব্যর্থ! রাত্রি ঘুরিয়ে ছেলেকে প্রশ্ন করল- ‘মরে যাওয়া কাকে বলে তুমি জান বাপি?’

রাতুল ঠিক জানে না। এই তো কয়েক বছর হলো পৃথিবীতে এসেছে। শুনেছে মানুষ মরে যায়। চলে যাওয়াকেই কি মরে যাওয়া বলে! কাকে বলে মা?

রত্রি আবার বিপদে পড়ল। কি উত্তর দিবে এখন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- ‘মানুষ মরে না বাপি। ্ক জায়গা থেকে আর একজায়গায় চলে যায়।’

রাতুল সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘তাহলে চলে যাওয়াকে মরে যাওয়া বলব?’

রাত্রি অবাক হয়ে গেল। এইটুকু ছেলে কি কথা! এখন কী বলব।

রাতুল আবার বলল- তাহলে তুমি দাদু বাসায় গেলে, বলব তুমি মরে গেছ।

রাত্রির আর কোন কথা বলার ক্ষমতা নেই। এ কী! এতো অসম্ভবব ছেলে, রাত্রি উত্তর হাতড়াতে লাগল।

রাতুল বলর, তাহলে সেদিন যে আমার বেড়ালটা মরে গেল, কই সে তো চলে গেল না। বারান্দায় পড়ে রইল। আমাদের রাস্তা দিয়ে যখন মানুষকে ঢেকে নিয়ে যায়, তোমরা বল লাশ যাচ্ছে। মরে গেলেই তো লাশ হয়। তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলছ কেন মা?

রাতুল রাত্রির কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি সব জানি, আমি সব জানি। বাবা ওই বেড়ালটার মতো মরে গেছে। তুমি এতদিন আমাকে মিথ্যে কথা বলেছো।

তোমাকে এসব কথা কে বলেছে?

শ্রাবণ কাকু।

সন্ধেবেলায় নিজের ঘরেই ছিলো রাত্রি।

আট মাস এই বাড়ি, এই ঘরের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না। অবশ্য সেভাবে বললে- বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো না বলা যায় না, তবে ঘরের সঙ্গে ছিলো না। এতদিন পর ফিরে এসে নিজের ঘরটাকে তার নতুন বা অচেনা মনে হয়নি। ঘর তার ঠিকই আছে, যেমন ছিলো। ঘরতো উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। কাজেই যেমন ছিলো তেমনি আছে। আসবাবপত্রও সবই সেইরকম, যেখানে যা যা ছিলো তেমনই আছে। খাট, আলমারি, হাল্কা ছোট টেবিল, আয়না। ঘরে লোক না থাকলে, বসবাস না করলে যে কোথাও ময়লা বসবে, কোথাও ছাপ ছোপ পড়বে, ধুলোর দাগ বসবে – এতো স্বাভাবিক।

নিশি যতটুকু পারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে; তবু ঘরটা জেগে ওঠেনি। মানে রাত্রির নিত্যদিনের স্পর্শ পেলে যেমন সজীব থাকার তেমন দেখাচ্ছে না। খানিকটা বাসী বাসী, ময়লা, অসাড় দেখাচ্ছিল।

নিলয় মারা যাবার পর, রাত্রি যখন এ বাসা থেকে চলে গেল, তারপর থেকে এই ঘরে যে কোনোদিন হাত পড়ত না,  নজরে আনত না কেউ- তা নয়; তবে ওই মাঝেমধ্যে একবার ঝাটপাট দেওয়া, ধুলো ঝাড়া, জানালাগুলো খুলে দেওয়া- তার বেশি কিছু নয়।

সন্ধেবেলায় বাতি জ্বালাতে গিয়ে রাত্রি দেখল- দেওয়াল বাতির দুটোই খারাপ। বাল্ব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পাখাটা অবশ্য সামান্য শব্দ করল বিরক্তির, তারপর চলতে লাগল। এসব নিয়ে ভাবল না রাত্রি। কাল পরশু তরশু- দিন পড়ে আছে; গুছিয়ে নেবে ধীরেসুস্থে।

বাইরের জানালা খোলা। ভেতরেরটা বন্ধ। দরজা খোলা। বাইরে অন্ধকার। বৃষ্টি নেই, বাদলা বাতাস রয়েছে। ঘরের একটা বাতি জোরালেঅ নয় জ্বলছে এই।

ভাবি?

রাত্রি পায়ের শব্দ পায়নি, ডাক শুনল। তাকাল।

নিশি।

এগিয়ে  এল নিশি। াক, ফিরলে শেষ পর্যন্ত। সেই কবে গিয়েছো আর এই এলে। মাসের পর মাস যায় তোমার ফেরার নাম নেই। আমার তো মনে হয় তোমার কেসটা হলো- ফিরতে চাই না আমি পার্থিব সংসারে…।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮)

পল্লব শাহরিয়ার

১৬ অক্টোবর, ২০২০ , ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৭)

(পর্ব-৭)

ইরাও সায় দিয়েছিল

আদর বাড়ে। আদর। শব্দটা উচ্চারণেই কি যেন অর্থ ছিল। রাত্রি তখন শুধুই হেসেছে। কিন্তু এত কিছু মাথায় আসার পরও একটা কথার অর্থ সে কিছুতেই বের করতে পারছে না। কেন তার শ্বশুর শাশুড়িকে ওই কথাটা বলল- রাত্রিকে এখন কিছু বলো না।

রাত্রি কথাটা শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওর বুকের মধ্যে একটা ভারি পাথর। ‘এখন রাত্রিকে কিছু বলো না। তড়তড় করে সিড়ি দিয়ে নেমে এল রাত্রি, শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ডাকলো- মা

হ্যাঁ।

শুধু একটা শব্দ। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল রাত্রি। মনে হল যেন দৃষ্টি কেমন উ™£ান্ত। আর চোখের আড়ালে মনে হয় কান্না থমকে আছে। এক্ষুণি চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে।

একদিন একবারও আয়নার দিকে তাকায়নি রাত্রি। কারো দিকেই তাকায়নি। এমন কি নিজের দিকেও নয়। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে দিনগুলো। এই প্রথম এসে দাঁড়াল আয়নার সামনে। সঙ্গে সঙ্গে যেন বুকের ভেতরটা চমকে উঠলো।

এ কে? একে তো রাত্রি চেনে না, কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ একজন অচেনা মানুষ যেন ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। নিজেকে াহরিয়ে ফেলার জন্য হাহাকার।

একদিন ওর শুধুই মনে হচ্ছিল ওর সব কিছু হারিয়ে গেছে। কিন্তু সে ভাবনা কেমন অস্পষ্ট। এক এক সময় বিশ্বাসই হচ্ছিল না। যেন দুঃস্বপ্ন দেখছে, এখনি ঘুম ভেঙে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেরে হেসে উঠবে।

কিন্তু আয়নায় নিজেকে দেখে ওর চোখ ঠেলে জল এল।

এ কাকে দেখছে ও? সর্বাঙ্গে একটা সাদা কাপড়।

একটা দিনও নিছক একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছিল। যে যা বলেছে করে গেছে। কেউ এনে বসিয়ে দিয়ে গেলে বসেই থেকেছে। শুধু একটা অস্পষ্ট ধারণা, কি যেন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও চমকে উঠল। ওর মুখোমুখি যে দাঁড়িয়ে আছে তাকেও চেনে না, কোনদিন দেখেনি। তার মুখ প্রথম চোখে পড়েনি। শুধু একটা সাদা কাপড়। ক্রমশ তার মুখ স্পষ্ট হয়ে ফুঁটে উঠল। নিস্তেজ প্রাণহীন ধ্বসে পড়া জীবনের একটা মুখ। চোখের নীচে কালি, কপালের শূন্যতা। গলায় দুটি হাতে সর্বাঙ্গ জুড়ে শুধুই নিঃস্ব নিস্তব্ধতা।

ফুপিয়ে কেঁদে উঠল রাত্রি।

ওর কিছুই মনে পড়ছে না। ওকি নিজেই একে একে সব খুলে রেখেছে! নিজেই এই সাদা কাপড়খানা শরীরে জড়িয়েছে। কিছুই মনে পড়ে না। ওতো একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছিল।

না, একটু একটু করে মনে পড়ছে এখন।

এখন সমস্ত বাড়ি আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

রাত্রির শুধু মনে পড়ছে সারা বাড়ি লোকজনে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। আর ঘরের মধ্যে দেয়ালৈ পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসেছিল রাত্রি। ও চোখে কিছুই দেখছিল না, কানে কিছুই শুনছিল না। উঠে দাঁড়াতেও ওর কষ্ট হচ্ছিল। শরীরে কোন শক্তি নেই।

নিলয়ের বাবা বারান্দার ডেক চেয়ারে দু’হাতে চিবুক রেখে বসে আছেন গুম হয়ে। নিলয়ের মা লুটিয়ে পড়ে আছেন মেঝের উপর। মাঝে মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। নিশির অবস্থাও একই রকম। তারপরও মাঝে মাঝে সান্তনা দিচ্ছে মা’কে, গায়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। তমাল এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দিকে উ™£ান্তের মত তাকিয়ে ছিল রাত্রি।

আয়নার সামনে থেকে সরে এল রাত্রি। কেউ দেখতে পেলে কে কি বলে বসবে ও কিছুই জানে না। এখন ওর চারপাশ জুড়ে শুধু কি করতে আছে আর কি করতে নেই। এ ক’দিন ধরে ও শুধু একটা যন্ত্র হয়েগিয়েছিল। এখনও শুধুই একটা কর্তব্য।

ক্ষীণভাবে মনে পড়ছে গোসল করে এসে, ওর শরীরে তখন একটুও জোড় নেই, কার কাছে যেন একটা বিরুনি চাইলো। অভ্যাসবশেই হয়ত। হয়ত নিশির কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বলেছিল, চিরুনি নিতে নেই, আয়না দেখতে নেই।

ওই ঐটুকুই মনে আছে। কে বলেছিল তাও মনে নেই। ওর কাছে তখন বাড়ির সব মানুষগুলোই অর্থহীন।

এখন ওকে শুধুই কর্তব্য হতে হবে।

রাতুল! রাতুল কোথায় কে জানে। ওর গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সেই অনর্গল কথা বলে যাওয়া কবে থেকে যে থেমে গেছে রাত্রি জানেও না। হঠাৎ কেমন শান্ত হয়ে গেছে। কোনও প্রশ্নও করে না। হয়তো প্রশ্ন করে করে কোন উত্তর পায়নি বলে আপনা থেকেই থেমে গেছে। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল, রাতুলকে হয়ত তারাই দেখেছে, গোসল করিয়েছে, খাইয়েছে।

শুধু একবার মনে পড়েছে ও এসে কোলের কাছে বসেছিল, চোখ মেলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো, কাউকে কাঁদতে দেখলে ওর চোখেও জল আসত। কখনো শব্দ করে কেঁদে উঠত। কেন তা স্পষ্ট করে জানেও না। মৃত্যু কি তা তো ওর ধারণার বাইরে। চিরকালের জন্য ওর কি হারিয়ে গেছে তাও জানে না।

রাত্রি এ অবস্থাতেই বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কান্না দেখে ওর শুধু মনে হচ্ছিল, এই বৃদ্ধ মানুষটার বড় কষ্ট।

তুমি এসো না, এসো না, আমার সামনে।

শুনে আহত হয়ে দু’পা সরে এসেছিল রাত্রি। মনে হয়েছিল, বাবা ওকেই কেন দায়ী করছেন। কিন্তু তারপরই বলে উঠলেন, তোমার দুঃখ আমি দেখতে পারবো না। আর সঙ্গে সঙ্গে রাত্রির শরীরে মনে কি এক অ™ভুত ঠান্ডা প্রলেপ পড়ল। সারা শরীর জুড়িয়ে গেল।

মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বললেন, তোমাকে জানাতে বারণ করেছিলাম। মিথ্যে ভয় পাবে মনে করে। একটু থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন- আমার জন্যই হল, কেন যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বললেন- খবর শুনছিলাম, ভাল করে শুনিনি, কোথাও কি কিছুই না, শুধু কানে গেল একটা দুর্ঘটনার খবর। নিলয় যে ঐ বাসে আসবে আমি তাও জানতাম না। তবু কেন যে ভয় পেলাম। হয়তো সেজন্যই-

রাত্রি ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। পালিয়ে এসেছিল।

এখন সব একটু একটু করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

নিশি এসে বলল, রাতুলকে খাইয়ে দিয়েছি, তুমিও খেয়ে নাও। আর রাতুলকে এবার একটু ঘুম পাড়াও।

রাতুল কিন্তু আগের মত রাত্রির পা জড়িয়ে ধরল না। শুধু ওর একটা হাত রাত্রির হাঁটু স্পর্শ করল। ও হয়ত ভাবছে মা দূরে সরে গেছে। সত্যিই তো ও দূরে সরে গিয়েছিল।

নিশির বুদ্ধি নয়, হয়ত মা শিখিয়ে দিয়েছে। রাত্রিকে আবার কাজের মধ্যে ভুলিয়ে দিতে চাইছে। রাতুলের মধ্যে।

এখন আর ওর সামনে কোন কাজ নেই, শুধু কর্তব্য। যা করা উচিত, যা সকলে চায়। এখন আর ওর নিজস্ব বলে কিছু নেই। ওর কোন ইচ্ছে এখন আর ইচ্ছে নয়।

রাত্রির ইচ্ছেও হয় না। এই কর্তব্যগুলোই ওর ইচ্ছে হয়ে গেছে। ও তো এখন একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছে। ও জানে এখন জীবন শুধু নেই। এত বিলাসীতার মাঝেও ওর মনটা এখন দুঃখবিলাসী। তাতে ওর কিছুই যায় আসে না, ওর এখন দুঃখটাই ইচ্ছে।

পাঁচ

মানুষ মানুষে কিভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে,  ভেঙে যায়, আবার কেনই বা অন্য কোনো সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু করে তা কী কেউ জানে। কোনও মানুষই বোধহয় জানে না। অভ্যাস এক ধরনের নেশা। নিলয় মারা যাবার পর রাত্রি আর ও বাসায় থাকেনি, নিজের বাবার বাড়িতে চলে এসেছে। কিন্তু এখানে এসেও ও নিস্তার পাচ্ছে না, কারণ নিলয় মারা যাবার এখনও চার মাস হয়নি, এরই মধ্যে শ্রাবণ রাতুলের পিতৃত্ব দাবি করে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। আর কেউ না জানুক রাত্রি জানে এখানে শ্রাবণের জয় হবে। রাতুল যে শ্রাবণের ছেলে, একথা ও নিলয়কেও জানিয়েছিল।

এতদিন যত দুশ্চিনাতা ছিল ওর ওই রাতুলকে নিয়েই। বাবা ভরসা দিয়েছে, উকিল বাবুর আইনের কচকচি যতই ওকে নিশ্চিন্ত করার চেষ্টা করুক, মাঝে মাঝেই ভয় পেয়েছে কোটের বিচার শেষ অবধি শ্রাবণকেই রাত্রির কাছ থেকে রাতুলকে ছিনিয়ে নেবার অধিকার দেবে নাতো। ওর এই নিঃস্ব শূন্য জীবনে রাতুলই একমাত্র লক্ষ্য, একমাত্র আশ্রয়।

‘আফটার অল বাবা তো’ উকিল বাবুর কথাটা ওকে সচেতন করে দিলেও মনের গভীরে গিয়ে পৌঁছালো না। রাতুলের ওপর যে শ্রাবণের কোন অধিকার থাকতে পারে ওর মন তা স্বীকার করতেও রাজি নয়। আমার শরীরের মধ্যেই ও গড়ে উঠেছে, আমার যত্নে ভালবাসায়, কত বিন্দ্রি রাত আর উৎকণ্ঠায়। রাতুল আমার সন্তান, শুধু আমারই, এমন একটা বোধ ওর সমস্ত শরীর মন আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

একেবারেই যে জানতো না তাও নয়, আগেই অনেকের কাছে শুনেছিল। তবু কথাটা নতুন করে শুনল, আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা তিক্ততায় ভরে উঠল। এই লোকটা, যার সঙ্গে রাত্রি দীর্ঘদিন কাটিয়ে এসেছে, এক ছাদের নিচে, এক বিছানায়কথাটা এখন আর মনেও পড়ে না, ধুসর অস্পষ্ট বিবর্ণ একটা ছবি, ঝড়ে জলে ধুয়ে ধুয়ে যা মুছে গেছে, যে টিকে আছে শুধু এক অসীম ঘৃণা হয়ে। আর সেই লোকটাই কিনা মাঝে মাঝে রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। আইনের অধিকার নিয়ে।

নিলয় বেঁচে থাকতেও শ্রাবণ ও বাসাতে গিয়েছিল, কই তখন তো একবারও বলেনি আমার ছেলে, কিন্তু এখন কেন সে রাতুলকে তার ছেলে বলে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছে। নিলয় থাকতে ও যখন আসতো তখন তেমন অস্বস্তি হতো না, কিন্তু এখন, সঙ্কোচ, লজ্জা, অস্বস্তি মিলে অ™ভুত একটা জড়তা ওকে পেয়ে বসেছে। লোকটার সঙ্গে আবার মুখোমুখি হওয়ার মতো অস্বস্তি আর আছে নাকি। সেজন্য একটা আতঙ্ক ছিলো।

বাবা একদিন বলল- আজ শ্রাবণের আসার কথা, রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবু রাত্রি ভয় পেয়ে বসলো। ভয় না অস্বস্তি ও নিজেও বুঝতে পারলো না।

রাতুলকে নিয়ে গেল বাবা। শ্রাবণের কাছে রাতুলকে রেখেই বাবা ফিরে এল। এসে বললো- বসার ঘরে বাবা-বেটায় যত খুশি গল্প করুক।

রাত্রি সঙ্গে সঙ্গে বাবার মুখের দিকে তাকালো। বাবা যে নির্বোধের মতো এমন একটা কাজ করে বসবে তা ও ভাবতেও পারেনি। ওই রাতুলকে ঘিরেই ওর যত ভয়। এখন আর আমার জীবনে ওই রাতুল ছাড়া কে আছে কী আছে? চোখে মুখে উম্মার ভাব ফুটিয়ে বলল, রাতুলকে তুমি ওর কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে এলে? কেন কাছে বসে থাকতে পারলে না।

আইনমাফিক বাবা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, হয়ত একটু আদর করবে, দুটো কথা বলবে, সে সময় সেখানে আর একজন কি বসে থাকা ভালো দেখায়। কথাই তো বলবে, বলুক না যত খুশি। একটা বড় ব্যাগ এনেছে শ্রাবণ, হয়তো রাতুলের জন্যই। কিছু উপহার-টুপহার। যদি তার মন চায় দিক না।

রাত্রি দেখলো বাবা ওর কথা শুনে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছে। হেসে বললো- রাতুলকে নিয়ে তো পালিয়ে যাবে না।

একটা সহজ কথা বাবার মাথায় ঢোকেনি বলে ও বিস্মিত না হয়ে পারল না।

বলে উঠল, রাতুলকে একা ছেড়ে দিয়ে এলে ওর কাছে, একা পেয়ে কি মন্তর পড়াবে তুমি জানো। সব কিছুর মধ্যে আতঙ্ক তো ওই একটাই। মাঝে মাঝে দেখা করতে আসবে শুনে সেজন্যই ভয় পেয়েছিল। মাকে ছেড়ে থাকার কথারাতুল ভাবতেই পারে না। বরং বাবার প্রতি ওর টান কম। কেন থাকবে সেই ভালোবাসা। নিলয় কি কোনো দিনও ওকে সেই ভালোবাসা দিতে পেরেছে, যা শ্রাবণ দিতে পারতো। কিংবা শ্রাবণও কি পারতো না…

কিন্তু কে জানে, এখন যদি ছেলের ওপর বেশি বেশি ভালোবাসা দেখাতে শুরু করে। ওই বয়েস তো শুধুই ভালোবাসা চায়, আদর পেলেই সেটাকে ভালোবাসা ভেবে বসে। আর সে ব্যাপারে শ্রাবণ কম দক্ষ নয়। রাতুলের কথা কি বলবে, রাত্রি নিজেই কি ওর ভালোবাসাকে চিনতে পেরেছিল? ওর তো সবটাই শুধু অভিনয়।

রাত্রির ভয়, শুধু ওকে জব্দ করার জন্যই হয়ত দেখা করতে আসার নামে একটু একটু করে মায়ের বিরুদ্ধে রাতুলের মন বিষিয়ে দিতে চাইবে শ্রাবণ। ওইটুকু বাচ্চা ছেলে, ও কিবা বোঝে, কি বা জানে। ভয় সেজন্যই। রাত্রি বাবার হাত ধর তুলে বললো, তুমি যাও, তুমি যাও। ওদের কাছে বসো গিয়ে।

রাতুল শ্রাবণের সঙ্গে বসে গল্প করছে, মাঝে মাঝে শব্দ করে হেসে উঠছে। হাসির কথাটা কী তা রাত্রির কাছে পৌঁছাচ্ছিল না।

শ্রাবণের উপস্থিতিটুকু ওর কাছে বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল, চলে গেলেই যেন বেঁচে যায়। আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। তার ওপর রাতুলের অত গল্পে মজে যাওয়া, হেসে ওঠা সে আরেক যন্ত্রণা। রাত্রি কোথায় চাইছে শ্রাবণের সঙ্গে রাতুলের দূরত্ব আরো বেড়ে থাক, তার বদলে তাকে এত কী ভাল লাগছে তার সঙ্গ। রাত্রি চেয়েছে রাতুলকে নিজর মতো করে গড়ে তুলতে; ভেতর থেকে বলে উঠতে চেয়েছে, আমিই তোর বাবা, আমিই তোর মা।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

 

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৭)

পল্লব শাহরিয়ার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬)

(পর্ব-৬)

আবার ওই বাবা-মা’র দিকে তাকিয়েই অনেকেই দিব্যি জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালিয়ে যায়। তবু মনে মনে সব মেয়েই একটু বল পায় ওদের কথা ভেবে।  কোথাও কোন দাঁড়াবার জায়গা না থাক বাপের বাড়ি তো আছে। সেখানে সান্তনা আছে, নিখাদ সমবেদনা আছে।

রাত্রি জানে এত সবের পরও যদি ও গিয়ে দাঁড়ায়, দুঃখ পাবে ওরা ঠিকই, তবে ভরসাও দেবে। মা সেই তেমন করেই বুজে জড়িয়ে ধরবে ছলছল চোখে, বিয়ের পর ঠিক যেভাবে বিদায় দিতে গিয়ে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরেছিল। তাই সবকিছু ভাবার পরও রাত্রি গিয়ে উঠেছিল বাবা-মা’র কাছে।

বাবা একটু আধটু অভিযোগ শোনার পর বলল, দেখ রাত্রি, সব বিয়েই এরকমই। মানিয়ে নিতে হয়।

website

যেন রাত্রি মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি।

মা’ও কাছে বসিয়ে স্তোক দেবার মত করে বললেন, প্রথম প্রথম এ রকম হয়, একটু বাচ্চাকাচ্চা হলেই দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাবা-মা’র কথা শুনতে শুনতেই দেখলো শ্রাবণ আসছে। শ্রাবণকে আসতে দেখেই মনে মনে খুশি হয়েছিল রাত্রি, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করল না। ওর আশঙ্কা ছিল শ্রাবণ হয়ত ওর খোঁজ নিতে আসবে না। তাই দূর থেকে শ্রাবণের বিব্রত মুখটা দেখে ভেতরে ভেতরে খুশি হল। কিন্তু লজ্জা আর সংকোচ ওকে তখন গ্রাস করে ফেলেছে।

শ্রাবণ বেশ রাগত স্বরেই বলল, একটা কান্ড যে করে বসো।

ব্যাস।

যেন কোথাও কিছু ঘটেনি, যেমন ছিল তেমনি আছে। আসলে শ্রাবণের মুখ বিব্রত বাবটা অন্য কারণে। কোথাও কিছু নেই। হঠাৎ অফিসে বসে কাজ করতে করতে রাত্রির ফোন পেয়ে ও বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। ফেরার পথে বলেছিল, কী যে করে সবো, আমার অফিসে একটা প্রেস্টিজ আছে না। কলিগদের কানে গেলে কী বলবে।

চাপা রাগ আসলে অন্য কারণে। স্ত্রী ফোন করে বলেছে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কোথায় তাও জানাচ্ছে না, আশেপাশে অন্যরা শুনতে পাবে বলে নরম নরম তোষামুদে ভাষায় তার মানভঞ্জন করার উপায় নেই। তাই শ্রাবণকে নির্বিকারভাবে বলতে হয়েছে, বাড়ি ফিরে যাও, গিয়ে শুনব। এছাড়া আর কিইবা বলতে পাতো।

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬) 36

বাবা-মা’র কাছে লজ্জার মাথা খেয়ে আসতে হয়েছে, সেখানেও সেই একই উপদেশ মানিয়ে নে; মানিয়ে নে। সেই অসহায়তার মধ্যে নিরূপায় হয়েই ওকে ফিরে যাবার কথা ভাবতে হয়েছে। কিন্তু শ্রাবণের কথাটা শুনেই তিক্ততায় মনটা ভরে গেল। বুঝতে পারল ও চলে এসেছে বলে শ্রাবণের মনে বিব্রত ভাব ফোটেনি। বিব্রত হয়েছে ওর চারপাশের লোকদের কাছে পরিচ্ছন্ন ইমেজটা নষ্ট হবে এই ভয়ে।

রাত্রির কোনও মূল্য নেই ওর কাছে। থাকলেও তা একটা অংশের মত। মানুষটাকে অধিকার করে আছে অনেকে, একা রাত্রির জন্য যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে তা শুধু একটা অংশ। অথচ রাত্রি চেয়েছে গোটা মানুষটাকেই। পেয়েছে শুধু রাতের বিছানা।

মা বলেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে, যায়নি। কোন সম্পর্কই গোটা মানুষটাকে পায় না। অথচ সম্পর্ক যাই হোক সকলেই সেই সম্পর্কের জোরে পুরো মানুষটাকে গ্রহণ করতে চায়। এর চেয়ে বড় বিড়মন্বনা মানুষের জীবনে আর কি আছে।

এতসব চিন্তার মাঝে রাতুল এসে দাঁড়িয়েছে মুখের সামনে। মা মণি আমরা নানুবাসা কবে যাচ্ছি?

– কাল বাবা।

– তোমার কালটা কবে আসবে?

– তুমি জানো নিলয়, তুমি না গেলে আমিও যাবো না।

– আব্বু তুমিও চল না।

– আচ্ছা, আমরা কালই রওনা দিব, তবে একটা শর্তে।

– কিসের শর্ত?

– তোমাকে নামিয়ে দিয়ে, আমি চলে আসবো …

রাত্রি আর রাতুল দুজনেই চুপ।

চার

চৌকাঠ ডিঙিয়ে এ বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে রাত্রি এখন ফুটকি। চার দেয়ালের ঘর নয়, ওর মনে হচ্ছে যেন একটা ছোট্ট সুন্দর দ্বীপে এসে পৌঁছেছে। চোখ শুধু সবুজ দেখছে, চোখ সমুদ্র দেখছে, সমুদ্রের ঢেউ। কোথাও কোন দেয়াল নেই, শুধু ঝড়ো বাতাসের স্পর্শ। সেখানে শুধু গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে।

অনর্গল কথা বলে চলছে ও, আর হাতের কাজ সারতে সারতে মা হাসি হাসি মুখে শুনছে। যেন কত কালের কথা জমা হয়ে আছে। যেন কতকাল কথা বলতে পারেনি। মা এক ফাঁকে বললেন, যা তুই গোসল করে নে, রাতুলকে আমি গোসল করিয়ে দিচ্ছি।

– হবে, হবে।

অর্থাৎ গোসল, খাওয়ার জন্য তাড়া নেই। ফুটকি বলল, আমি তো ওসব ওখানেই সেরে আসতে পারতাম, কিন্তু তা হল আধাবেলা ছুটি কমে যেত। আসতে আসতে দুটো তিনটে বেজে যেত। সেজন্যই শ্বশুরকে দিয়ে ফোন করানো, এসে খাবো।

নিলয় বাইরে যাবার পরও দুটো দিন কাটিয়ে আসতে হয়েছে, সেটুকুতেই অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। তবু চক্ষুলজ্জা। সেই আগে মেযন কোথাও বেড়াতে যাবার কথা থাকলেও বলে উঠতে পারতো না শাশুড়িকে। নিশি তো বলেই বসলো, কেন এতদিন যেতে পারেনি, ভাইয়া যখন ছিল। ভাইয়া যেই গেল, অমনি বাপোর বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। তাই না?

কথাটায় বেশ একটা ইঙ্গিত আছে।

বিয়ে হয়ীন বলেই বিয়ে সম্পর্কে ওর মনে একটা স্বপ্ন আছে। কল্পনায় কি দেখে কে জানে। হয়তো বিয়েল আগে রাত্রিও স্বপ্ন দেখতো। দেখতোই তো। কিন্তু… নিশি ঠিক কি বলতে চেয়েছিল? নিলয়কে ছেড়ে রাত্রি এক মাহূর্ত থাকেত পারে না, নাকি ও থাকলে বাপের বাড়ির কথা ভুলেই থাকে? অথবা বলতে চাইলো নিলয় না থাকলে ওদের বাড়িটাই ওদের কাছে দুঃসহ? নিশিকে তাই ভাল লাগে না আজকাল। একটা কথাও সোজাভাবে বলে না।

মেয়েটা তো প্রেমফ্রেম করে কারো সাথে পালিয়ে গেলেই পারে। বিয়ে যখন হচ্ছেই না, তার নিজের পরিণতির কথা চিন্তা করেই হয়ত কথাটা বলল। দেখে তো মনে হয় এক সময় বেশ সুশ্রী ছিল, হয়ত সুন্দরীই।

প্রেম  করে কাউকে বিয়ে করলেও বাড়িতে কি আপত্তি করত। কই তার সময় তো কোন রকম আপত্তি ওঠেনি। মেয়ের আগে একটি বিয়ে হয়েছিল জানার পরও তারা তাকে এ বাড়ির বউ করে এনেছিল। নিশির কথা টেনে এনে আবার কথা শুরু করেছিল রাত্রি।

মা বলল, তুই যা বাবা, গোসল করে খেয়ে নে, পরে শুনবো। রাত্রি একটু অসন্তুষ্ট হল। ভেতরে একটা চাপা ক্ষোভও যেন গুমড়ে উঠলো। ও কি খেতে এসেছে নাকি এখানে। ও তো অনেক কথা নিয়ে এসেছে উজাড় করে দেবার জন্য। কতদিনের জমা হওয়া কথা। তার মধ্যে হাসিও আছে, আনন্দও আছে, আবার কান্নাও আছে। সব কথা অবশ্য বলবে না, বলা যায় না। তবু হাল্কা হওয়া তো যায়।

কিন্তু এ বাড়ির কথা শুনলেই নিলয় কেমন যেন করত। কখনো রাগত না। কিন্তু এবার রেগে গিয়েছিল। রেগে গিয়ে বলেছিল- ঐ ভাঙাবাড়িটায় কি আছে কি? রেগে ছিল বলেই বলেছিল। অথচ রাগ তো নিয়ে এসেছিল অফিস থেকে। ওকি করে জানবে!

ওর বুকের মধ্যে ক’দিন ধরেই এ বাড়িতে আসার ইচ্ছা হচ্ছিল। বাবা-মা’কে দেখার কিংবা দু’চারদিন এসে থাকার। এক এক সময় সে হাপিয়ে ওঠে। বেশ কয়েকদিন ইচ্ছেটা চেপে রেখে শেষে একদিন বলেই ফেললো- এই শোনো, আমি ভাবছি দু’দিন ও বাড়িতে থেকে আসবো। তার উত্তরে ঐ কথা। রাত্রি মেনে নিচ্ছে কিছু একটা ঘটেছিল অফিসে। রেগে ছিল, হয়ত নিজের ওপরই।

কিন্তু কথা একবার বলে ফেললে তো আর ফেরানো যায় না। যত আদর করে ভোলাবার চেষ্টা করো, স্লেটের দাগ নয় ভিজে কাপড় বুলিয়ে মুছে দেবে। মেয়েদের কেন যে টাকা হয় না। ওরা করতে দেবে না, দিলে চাকরি করত রাত্রি। কিন্তু তাতেই বা ক’টাকা হবে। সত্যি সত্যি যদি কোনদিন ওর অনেক টাকা হয়ে যেত, এই বাড়িটাকে একেবারে বদলে দিত ও। ভেঙে ফেলে একেবারে নতুন না করে ফেলুক, ভেঙে করে সারিয়ে সুরিয়ে এমন করে দিত যে দেখে নতুন মনে হত। বারান্দা সিড়ি সব ঝকঝকে তকতকে। ঘরের লাল সিমেন্ট তুলে ফেলে টাইলস বসানো।

শ্বশুর বাড়িতে যখন মাঝে মাঝে খুব নিঃসঙ্গ লাগে, ভেতরটা কেমন কেমন গুমড়ে ওঠে। কিছু করার না থাকলে, রাতুল হয়ত ঘুমচ্ছে, রাত্রি বিছানায় শুয়ে শুয়ে এখানে চলে আসে। বাপের বাড়িতে, আর টুকরো টুকরো ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে।

এখন আমাদের সব চাই। রাত্রি শুধু হাসল। মনে মনে ভাবলো, বাবা সেই একই রকম আছে। কোন স্বপ্ন নেই, উচ্চাশা নেই, বাঁচার মত করে বাঁচার ইচ্ছেও নেই। চলে গেলেই সন্তুষ্ট, জীবন যেন শুধু চলে যাওয়া। অথচ তার মধ্যেই কী এক তৃপ্তি। রাতুলের স্কুলের সামনে বসে যাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে তাদের অনেকের তো অনেক কিছু আছে। বাড়ি-গাড়ি, কতসব দামী দামী শাড়ি পরে আসে। কিন্তু অতৃপ্তি যায় না। দু’দশ মিনিট আড্ডা দিলেই সব বেরিয়ে আসে। রাত্রি নিজেও বুঝতে পারে না ও সুখী না অসুখী। ওদের সময়টাই বোধহয় অন্যরকম।

শ্বশুর বাড়িটাও যেন এই দু’সপ্তাহে টিভির মতই হয়ে গিয়েছিল। শব্দ আছে, কথা কানে যাচ্ছে না, ছবি আছে চোখ দেখছে না। তেমনই। শুধু আছে  এটুকুই মনে আছে। ফাঁকে ফাঁকে নিলয়ের কথা হয়ত মনে পড়ছে, মনে পড়ছে না। একেবারে অন্য জগতে চলে গিয়েছিল রাত্রি। নিশির ডাকেই সম্বিত ফিরে পেল।

– নিশি! কথা আছে।

রাত্রি চোখের ইশারায় সিড়ির দিকে ইঙ্গিত করল। নিশি সপ্রশ্ন চোখে তাকাল রাত্রির দিকে, তারপর ঈষৎ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। অর্থাৎ অভিযোগ, রাগ আছে, ক্ষোভ আছে, বিরক্তি আছে। আবার প্রয়োজনে কখনো কখনো দু’জনে অন্তরঙ্গ বন্ধু। একান্ত সঙ্গী। পরামর্শ দিতে হলে, সান্তনা দিতে হলে ওরা একাত্ম হয়ে যায়। অথচ তখনই আবার তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে রাগ কিংবা অভিমান।

গোপন হাসাহাসির কথা থাকলে, কিংবা লুকোনো শলাপরামর্শের জন্য ঐ একটাই জায়গা। ছাদে ওঠার সিড়ির একেবারে শেষ ধাপ। বসে গল্প করার জন্য ডাকেনি রাত্রি। শুধু একটা প্রশ্ন। নিশি বলবে কিনা জানে না। একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল। যদি জানা যায়।

সিড়ির শেষ ধাপ অবধি যেতে হল না, মাঝ পথেই দাঁড়িয়ে পড়ল রাত্রি।

– নিশি, কি হয়েছে বলতো? বাবা-মা’র মুখ কেমন থমথমে।

– বিশ্বাস করো ভাবি, কিছু জানি না। তবে একটা কথা শুনেছি- বাবা-মা কি সব বলাবলি করছিল, আমি ঢুকতেই থেমে গেল। শুধু একটা কথা কানে এসেছিল। বাবা মা’কে বলল, রাত্রিকে এখন কিছু বলো না।

এখন বুঝতে পারল কেন বাবা সেদিন ফেরার সময় বলেছিল একটা দুঃসংবাদ আছে। পরক্ষণেই মেয়ে যেন কষ্ট না পায় তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিল, হাসতে হাসতে বলেছিল, বেয়াই ফোন করেছিল। একটু থেমে বিরক্তভাবে বললেন, নিলয় পরশু ফিরছে। কালই ওকে যেতে বললেন। রাত্রি তার পরদিনই ফিরে এসেছিল; কিন্তু নিলয়, তাহলে কি?

রাত্রিকে রেখে যেতে এসেছিল ওর বাবা। পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। শ্বশুর হৈহৈ করে উঠলেন, বেয়াই এসেছেন, বেয়াই। শাশুড়িও ছুটে এসেছিলেন সঙ্গে নিশিও।

বাবা চলে যাওয়ার পর রাত্রি ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল ঘর গোছাতে। মাত্র পনেরো দিন ছিল না, এরই মধ্যে ঘরখানা দেখে মনে হয় যেন পনেরো মাস ছিল না। ধুলো জমেছে আসবাবপত্রে, জানারায়, দরজায়। মেঝে পরিষ্কার হয়নি কতদিন।

পরদিন খুব ভোরবেলাতে ঘুম ভাঙলো রাত্রির। ভোরবেলাতেই ঘুম ভাঙে। তবু দরজা খুলে রেখেছিল, খিল দেয়নি। কি জানি কখন ফিরবে, যদি ঘুমিয়ে পড়ে, দরজায় টোকা দিলেও শুনতে পায় না রাত্রি। সে এক বিশ্রী কান্ড। তাই রাত্রি জেগেই ছিল, আর স্বামীর জন্য জেগে থাকাই বউদের কর্তব্য।

বরং খিল খোলা থাকলে নিলয় এসে ওকে ডেকে তুলতে পারবে, কিংবা গায়ে হাত দিয়ে। এরা কেউ জানতে পারবে না রাত্রি জেগে ছিল, না ঘুমিয়ে ছিল। বিয়ের পর নিলয়কে ছেড়ে কখনও থাকেনি। দুয়েকবার যা থেকেছে সে এ বাড়িতে নয়, বাবা-মা’র কাছে গিয়েছিল বলে। এই প্রথম এ বাড়িতে। দুটো সপ্তাহ ছিল না নিলয়। না থাকলে আদর বারে। মিনা আর ইরা বলেছিল।

মিনা চোখ টিপে ইঙ্গিত করে বলেছিল- দেখিস, দেখিস, ফিরে এলে কি করে। হেসে ফেলেছিল সবাই।

মিনার স্বামীর বেশ ভাল চাকরি, কি চাকরি ঠিক জানে না রাত্রি। তবে মাঝেমধ্যে দুয়েক সপ্তাহ বাইরে যায়। ঐটুকুই ওর ঈর্ষা ছিল। বেশ মজা। রাত্রির ওরকম হলে বাপের বাড়ি যাওয়া কত সুবিধা হত।

ইরা ঠাট্টা করল মিনাকে, তাই বল, মাঝে মাঝে তাই এত খুশি খুশি দেখায় তোকে। শুনে শুনে রাত্রিরও একটু ইচ্ছে হয়েছিল স্বপ্ন দেখার। দরজার খিল খুলে রেখেছিল সে কারণে, নিলয় আসবে, এসে নিঃশব্দে রাত্রির ঘুমন্ত শরীরের পাশে বসবে, কাঁধে কিংবা গানে হাত ঠেকিয়ে ডাকবে ফিসফিস করে।

– দেখিস, দেখিস ফিরে এলে কি করে?

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬) 37

পল্লব শাহরিয়ার

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৪:১৮ অপরাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৫)

(পর্ব-৫)

কেউ বলেনি, এখনও জীবন আছে, ফিরে আয়।

নিলয়কে তখন কত টুকরো টুকরো কথাই না বলেছে। এইসব ছোট ছোট ব্যাপার কেন লাগে, কোথায় লাগে, আর কেন তা এত বড় হয়ে দেখা দেয় রাত্রি নিজেও বুঝতে পারে না। শ্রাবণ কফি ভালবাসে, চা একেবারেই নয়। এদিকে বাপের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা রাত্রির চা না হলে চলে না। এটা এমন কিছু একটা বিপর্যয় নয়, রাত্রি নিজেও জানে।

নিজর দুঃখের প্রসঙ্গ টেনে এনে একদিন সে সব কথা নিলয়কে শোনাতে গিয়ে বলেছিল, কোথায় লাগত জানেন, এই যে আমি মনে করে রেখেছি, ওর কফিতে কতটা দুধ, ক’চামচ চিনি, ক’টার সময় ওর কোথায় কোথায় প্রোগ্রাম, অথচ ও আমার জন্য ….

নিলয় শুধু হেসে চুপ করে গেলেও ভাল ছিল, তার বদলে ও বলে উঠল, আসলে রাত্রি, তুমি আগে থেকেই তোমার ভালবাসার মানুষকে, তার সবকিছুকে অপছন্দ করে ফেলেছো। সে কারণেই ছোটখাটো জিনিসগুলো বড় হয়ে দেখা দিত।

কথাটা হঠাৎ যেন একটা নাড়া দিল রাত্রিকে। ঠিক এভাবে ও কোনদিনও ভেবে দেখেনি। খুঁজে দেখার চেষ্টা করল ঠিক কবে থেকে ও শ্রাবণকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। ভালবাসার পর মানুষটাকেই কী ও অপছন্দ করতে শুরু করেছিল, নাকি ওর ওপর অধিকার খাটাতে চাইতো সেই ব্যাপারটাকেই ও পছন্দ করতে পারতো না। শ্রাবণকে রাত্রি এখন আর তেমন সহ্য করতে পারে না, না পারারই কথা, কারণ এখন ওর মনে হয় এই লোকটা ওর স্বপ্নই ভেঙে  দেয়নি, জীবনটাই নষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখনকার ব্যাপারটা পুরোটাই ভদ্রতা।

তখন রাত্রির মধ্যে আর কী বা ছিল, শুধু নিঃসঙ্গতা ছাড়া।

না, তখন আর বাবা-মা বলত না তুই ভুল করছিস। স্পষ্ট করে ওরা না বললেও, মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারত ওরা বলতে চাইছে, তুই ভুল করেছিলি, এখন বুঝতে পারছিস তো! জীবনে এর চেয়ে আর বড় লজ্জা কি হতে পারে। কী ভুলই না করেছিল ও।

website

তখন ওর যে কী হয়েছিল কে জানে। শ্রাবণের নেশায় পড়ে গিয়েছিল হয়ত। মানুষটাকে আদৌ চিনতে পারেনি। নাকি নিজেকেই চিনতে পারেনি! বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব সকলেই বারণ করেছিল। কারও কথা কানে নেয়নি। মনে হয়েছে ওর চারপাশের সকলেই শত্রু।

শেষ অবধি বাবা বলেছিল, যা ভাল বুঝিস।

কত কি রঙিন স্বপ্ন দেখেছিল। বিয়েটা যে শেষ অবধি এভাবে, এত সহজে ভেঙে যাবে কল্পনাও করিনি। এক ছাদের নিচে না থাকলে কোন মানুষকেই চেনা যায় না। যত দিন না ডিভোর্স হয়ে গেছে, রাত্রির মনে হয়েছে ওকে কে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তখন শুধুই রাগ আর ক্ষোভ তীব্র ঘৃণা। জালে আটকে যাওয়া পাখির মত ছটফঠটানি। কেমন একটা অনিশ্চয়তা আর ভয়। কোন দিক থেকে অচেনা একটা জটিলতা এসে দেখা দেবে সেই আতঙ্ক। ছাড়া পাওয়ার জন্য কি অধৈর্য ব্যাগ্রতা। এক একটা দিন যেন এক একটা বছর। যেন কতকাল রাত্রি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পায়নি। অথচ ওদের বিয়েটা এক মাসও টেকেনি।

বাবার কথাটা কানে গেল- যাঃ সব পিছুটান শেষ।

দূরে দাঁড়ানো শ্রাবণের দিকে একবারেই চোখ পড়েছিল, দ্বিতীয়বার ফিরে তাকায়নি রাত্রি। তখন ওর মনে শুধুই ঘৃণা। একটু আগে পর্যন্ত ছিল একটা দুর্বোধ আতঙ্ক। শেষ মুহূর্তে না কোনও আইনের ফাঁকে সব ভেস্তে দেয় ওই লোকটা। কিন্তু উকিল ভদ্রলোক যেই হেসে হেসে বললেন, শুনলে তো, ডিভোর্স হয়ে গেল, অমনি এক দমকা উজ্জ্বল আনন্দ ওর বুকের মধ্যে তুবড়ি জ্বালিয়েই কেমন নি®প্রভ হয়ে গেল।

হঠাৎ রাত্রির নিজেকে বড় বেশি নিঃশ্ব মনে হল। ক্রোধ আর ঘৃণা সামনে এতদিন একটা লক্ষ্য এনে রেখেছিল। ওই লোকটার হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। অথচ সঙ্গে সঙ্গে মনে হল সামনে আর যেন কোনও লক্ষ্য নেই। শুধুই শূন্যতা। বাবার কথাটাই শুধু কানে বাজছে; যাঃ আর কোন পিছুটান রইল না।

রাত্রি ভেবেছিল ক্রোধ, ক্ষোভ আর ঘৃণা থেকে ও একেবারে মুক্তি পেয়ে যাবে, ছেড়ে আসার পর শ্রাবণের কাছ থেকে একেবারে ছাড়া পেয়ে গেল। যেন সঙ্গে সঙ্গে মানুষটাই পৃথিবী থেকে উবে যাবে, কোনওদিন আর রাত্রির চোখের সামনে পড়বে না, এ রকম একটা ধারণা ছিল।

বাবা ফিরতে ফিরতে পাশে বসা রাত্রিকে বলেছিল- আবার মুখ ভার করে আছিস কেন? প্রাণ খুলে হেসে ওঠ। তোর তো উচিত ছিল ওই কোর্ট রুমেই হেসে হেসে কথা বলা, দ্যাখানো দ্যাট ইউ আর এ ফ্রি ওম্যান্য। স্বাধীন-সুখী। মুখের মত জবাব হত, ওই হাসি।

রাত্রি চুপ করেই ছিল, কোন কথা বলেনি।

বাড়িতে ফিরে বাবা বলেছে, মনে কর আজ থেকেই তোর জীবন শুরু, আগের জীবনটা শুধুই একটা দুঃস্বপ্ন। আমি তোর আবার বিয়ে দেব। আর আমার সেই গরীব বাবা আবার আমার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। এখন আমি নিলয়ের বউ। এবং সুখী। আর সেটা রাতুলের কারণেই। ওর দিকে তাকিয়ে একটাই কথা মনে হয়, আমার ছেলে, আমার রক্তমাংস দিয়ে গড়া। ও চিরকাল আমারই থাকবে।

বাবাকে অনেক অপমান সইতে হয়েছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে। মা হয়ত আরও বেশি, শুধু তার একটি ভুলের জন্য। মাঝে মাঝেই নিজের দুঃখের কথা, কষ্টের  কথা, কোনও অসহ্য ঘটনার কথা এই এক জায়গাতেই ও উজার করতে পারে। নিলয়ের কাছে। এখানেই শুধু কেঁদে হাল্কা হতে পারে। সান্তনা পায় সঙ্গে উপদেশও। এই নিলয়ের কারণেই শ্রাবণ আবার এ বাসায় আসতে শুরু করেছে। এটা নিলয়ের উদারতা নাকি অন্য কিছু রাত্রি তা এখনও জানে না।

নিলয় ফিরেছিল বেশ রাত করেই। রাত্রি জানতো নিলয় দেরি করেই ফিরবে। বিশেষ দিনগুলোতে নিলয়ের এই দেরী করে ফেরা ওর দিক থেকে খারাপই লাগে, কারণ বাড়িতে থাকলে নিলয় দেখতে পেত। সারাক্ষণ ও দূরে দূরে থাকে। রাতুল ডেকে কোনও কথা বললেও দূর থেকে উত্তর দেয়। স্বাভাবিকতা দেখানোর জন্য কোনও না কোনও কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে।

প্রথম প্রথম শ্রাবণকে কি ভয়ই না পেত। ভয় ঠিক শ্রাবণকে নয়, রাতুলকে। ওইটুকু বাচ্চা ছেলেও কী  বোঝে। কোনটা আসল ভালবাসা আর কোনটা নকল ভালবাসা তা বোঝার বয়স কী ওর। কথাটা মনে আসতেই হেসে উঠল। বয়সের কথা ভাবছে কেন, মানুষ চেনা কি এতই সহজ? রাত্রির তো যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, বুদ্ধিসুদ্ধিও কম নয়, তাহলে ওই বা কেন শ্রাবণকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। সেসব দিনের কথা মনে পড়লেই লজ্জায় অনুশোচনায় নিজের মধ্যেই নিজে মুষড়ে পড়ে।

সবচেয়ে ভাল বন্ধু, সেই স্কুল থেকে কলেজ অবধি, কনা আরও কে কে বলেছিল, তুই কী পাগল হয়ে গেছিস, ওকে ওই লোকটাকে তোর এত পছন্দ? বিয়ে করবি?

ও তখন প্রেমে অন্ধ। মানুষ যে প্রেমে অন্ধ হয় তা ও নিজের জীবন দিয়েই বুঝতে পেরেছে। শ্রাবণের কোনও কিছুই ওর খারাপ লাগত না। কেন যে লাগেনি, নিজেই জানে না। সে সময় ওর ভেতর থেকে সব যুক্তিবুদ্ধি যে উবে গিয়েছিল তাই নয়, ভদ্রতা কর্তব্যবোধ এ সবও হয়ত ছিল না। তা না হলে বাবা-মা’র সাথে ওভাবে কথা বলত।

রাত্রি তখন শ্রাবণের প্রেমে পাগল। আর কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারে না। মা বাধা দেওয়ার ফলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিল, কেন, খারাপটা কী দেখলে তোমরা? বাবাকে বলে দিও তোমাদের মত না থাকলে আমি বেরিয়ে গিয়েই ওকে বিয়ে করব।

ব্যাস এ কথার পর আর কোনও কথাই খাটে না।

তবুও বাবা পিঠে স্নেহের হাত রেখে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন। স্নেহের হাতটাকে তখন রাত্রির কাছে বিছুটি মনে হচ্ছে। স্নেহ না ছাই, এসব বাবার পলিসি। মত বদলানোর চেষ্টা। তাই গলার স্বর ঝাঁ ঝাঁ । – যুক্তি দিয়ে বলোনা কী খারাপটা দেখলে ওর মধ্যে।

বাবা তখন বলেছিল, সব কি যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায়। ওকে দেখলেই আমার মনে হয় তুই ওখানে সুখী হতে পারবি না। শুধু মুখ দেখেই মনে হয়েছে।

ঠিক যেন বাবাকে অপমান করার জন্যই অট্টহাসি হেসে উঠেছিল রাত্রি। হাসতে হাসতেই বলেছিল, শুনলে মা, শুধু মুখ দেখেই মনে হয়েছে। সেই বাবার কথাটাই ফলে গিয়েছিল বলে, রাত্ররি বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত। কলেজের বন্ধুরা শ্রাবণকে বিয়ে করতে নিষেধ করেছিল বলে তাদেরকেও রাত্রি অপছন্দ করা শুরু করেছিল। ভেবেছিল, স্রেফ হিংসে। শ্রাবণকে বিয়ে করাই ওরা সহ্য করতে পারছে না। এ সমস্ত কথাই ও দিনে দিনে নিলয়কে বলেছিল। নিলয় সবই জানে।

মানুষে মানুষে সম্পর্ক জিনিসটা বড় অ™ভুত। এক একজনের সঙ্গে সম্পর্ক মানে একজন মানুষের ছোট ছোট অনেকগুলো অংশ। টুকরো টুকরো ভাবে কেউ বাবার, কেউ মায়ের, কখনও স্বামীর কিংবা স্ত্রীর, কখনও সন্তানের কখনও বন্ধু, কখনও সহকর্মীর। আরও কত রকমের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কগুলো থেকেই একজন মানুষের এক এক টুকরো পৃথক চরিত্র বেরিয়ে আসে। তার কোন একটিকে নিয়ে মানুষটাকে বিচার করা যায় না। সম্পর্ক যত গাঢ় আর অন্তরঙ্গ হোকনা কেন গোটা মানুষটার ওপর আমাদের কোনও অধিকার নেই। সেই সম্পর্কটুকুর বাইরে তার আলাদা একটা অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু কেউ সেটা মনে রাখে না। সেই অস্তিত্ব আসলে একজন মানুষের আরও অনেক টুকরো টুকরো অংশ।

রাত্রি নিজেও এসব কথা মাঝে মাঝে ভাবে, বুঝতেও পারে। মুশকিল হল এই যে, কেউই সে কথা বোযে না। সম্পর্ক যাই হোক না কেন সে গোটা মানুষটাকেই নিজের করে নিতে চায়। যেন তার নিজস্ব সম্পত্তি। আমার মতো তোমার এই সম্পর্কের বাইরে তোমার আর কোনও অস্তিত্ব থাকতে পারবে না।

নিলয় তো সবই জানে। কিন্তু সেও কেন রাত্রির সব অস্তিত্ব গ্রাস করে একা ওর সম্পত্তি ভাবতে বসেছে। তাই কি খবরের কাগজ পড়তে পড়তে ঠাট্টা করে বলেছিল সেই ছোট শব্দটি ‘ও’।

যা যেখানে আছে সব পড়ে থাক, ভুল করে থাকা অসুখী জীবনটার মতই। ওর বাবা-মা’র সব আপত্তি, সব যুক্তি যখন রাত্রি উড়িয়ে দিয়েছে তখন বাধ্য হয়েই ওরা এ বিয়েতে রাজি হয়েছিল। আর বিয়ের পরতো বাবা-মা দুজনেই খুশি হয়েছিল। রাত্রি তখনই ভেবে নিয়েছিল ওর একটাই কর্তব্য। শ্রাবণ আর ও যে সঙ্গী হতে পারবে সেটা প্রমাণ করে বাবা-মা’কে সুখী করা। কিন্তু শেষ অবধি পারল না। এমনকি ভেতরের যন্ত্রণা চেপে রেখে এক ছাদের নিচে কাটিয়ে সুখী জীবনের অভিনয় দিয়ে বাবাকে মাকে সুখী করে তুলবে তারও উপায় রইল না। মাত্র এক মাসের মাথায় তারা দুজন একেবারেই আলাদা হয়ে গেল।

আত্মসম্মানে লাগছিল। তবুও রাত্রি রান্নাঘর থেকে বেররিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাতুলের সামনেই শ্রাবণকে বলে বসলো- তোমার কাছে আমার একটাই রিকোয়েস্ট, এ বাড়িতে তুমি আর কখনও এসো না।

তিন

নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল পড়লেও তরঙ্গ ওঠে বইকি। তবে সেই তরঙ্গের স্থায়িত্ব আর কতটুকু? দশ সেকেন্ড, বিশ সেকেন্ড, বড় জোড় এক মিনিট! এ তরঙ্গ বড় মৃদু, শক্তিহীন। দুর্বল বৃত্তাকার ঢেউ হয়তো এক সময় কাঁপতে কাঁপতে পাড়ে এসে পৌঁছায়, কিন্তু তখন তার অস্তিত্বই অনুভব করা কঠিন। স্থির পুকুরের দিকে তাকিয়ে কে তখন বলবে, একটু আগে ঢিল পড়েছিল এখানে।

শ্রাবণের আগমন রাত্রির কাছে অনেকটাই এই গোত্রেরই। শ্রাবণকে নিয়ে এখন সে তেমন একটা ভাবে না। সে ভাবে তার স্বামী, সংসার, ছেলের কথা। তার সময় কাটছে এদের ভাবনাতেই। সময়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পার করছে সময়। অথবা সময় কাটছে না।

তাতেই বা রাত্রির কি এল গেল? সময়তো আর সত্যি সত্যি নিশ্চল, অনড় এক পাহাড় নয়, যেমন ভাবেই হোক সে ঠিক গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যাবে।

যাচ্ছেও তো। একেকজন লোক আছে যাদের হঠাৎ মনে হয় পরম আশ্রয়। নিলয় ঠিক সেরকমই। সেই সময়ের কষ্টের কথাগুলো ও যখন নিলয়কে বলতো, সহানুভূতি, সমবেদনা সব তখন ওর কাছ থেকেই পেত।

বুকের মধ্যে এই অশান্তি আর কষ্ট চাপা রাত্রির কোনও কোনও নির্জন দুপুর সেসব কথা মনে পড়িয়ে দিয়েই ওর চোখে পানি এসে যেত। এমন একটা স্বপ্রসঙ্গের দিন ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে কোনও দিন কল্পনা করেনি। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন, প্রেম ভালবাসা ছাড়াও যে পার্থিব জীবনে আরও কত কী আছে, তার কিছুই তখন চোখে পড়েনি। রাত্রি তখন ভালবাসার অন্ধ গলিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। শ্রাবণকেও ভাল করে বুঝে ওঠার মত দৃষ্টি ছিল না।

ছোট ছোট ঘটনা, একটুকরো বাঁকা কথা, সামান্য তাচ্ছিল্য মেয়েদের মনে কখন কী যে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, নিজের কাছেই নিজেকে ছোট করে দেয় তা বোঝার মত বোধশক্তি শ্রাবণের ছিল কিনা সন্দেহ হয় রাত্রির।

শ্রাবণের কি দোষ দেবে, বিয়ের পর মাত্র এই কটা দিন এর মধ্যেই ওকে কেন সব ছিঁড়ে ফেলে বেরিয়ে আসতে হল তা কি কেউ বুঝবে? অন্য কাউকেও বোঝাতে পারবে! যার বুকের মধ্যে জ্বালা সেই বোঝে, আর সকলেই উপদেশ দেন, মানিয়ে নে, মানিয়ে নে, যেমন রাত্রি নিজেই মানিয়ে নিতে চায়নি।

মদ খেলে মাতলামি করতে করতে বাড়ি ফিরে বউকে ধরে পেটালেই লোকে সেই অসহায় বউটার জন্যই সহানুভূতি জানায়, কষ্ট পায়, সাহস জুগিয়ে বলে, আছিস কেন; বেরিয়ে যা। শারীরিক নির্যাতনই যেন একমাত্র নির্যাতন। আগুনে পোড়া খুব কষ্টের, কিন্তু মনের ভেতরের আগুন যখন কাউকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে থাকে, তার কষ্ট বাইরের কেউ টের পায় না। বোঝেও না হয়ত।

সেই অসহ্য দাহ থেকে মুক্তি পাবার জন্যই তো রাত্রি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আশা করেছিল জ্বালাটা একদিন নিবে যাবে, নেবেনি।

– আমাকে যদি তোমার এত অসহ্য লাগে তা হলে তখন বিয়ে করার জন্য পাগল হয়েছিলে কেন?

এই কথাটাতো রাত্রির নিজেরও প্রশ্ন, নিজেই নিজেকে করেছে বহুবার। কিন্তু শ্রাবণের কাছ থেকে প্রশ্নটা আসতেই রাগে ফেটে পড়ে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিল, কারণ তখন জানতাম না তুমি এত নিচ।

রাত্রি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল এ বিয়ে ভেঙ্গে যাবে, ভেঙ্গে ফেলাই উচিত। তবু একটা সঙ্কোচ, একটা লজ্জা ছিল। কেন সঙ্কোচ, কেন লজ্জা তা হয়ত শ্রাবণও জানতো। তাই হয়ত ওর বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, নতুন বউ, বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে ফিরে যাবার সাহসই হবে না। কারণ এখন আর ওর ফিরে যাবার কোনও ঠিকানা নেই। এক এক সময়ে অবশ্য রাত্রি নিজেরই সন্দেহ হয়েছে, শ্রাবণের এই উদাসীন শান্ত ব্যবহারের মধ্যে আসলে রাত্রির কাছ থেকে ছাড়া পাবার একট আগ্রহ লুকিয়ে নেই তো? এই বাড়িটাকে ও কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিল না। ওরাও কী ভেবেছে রাত্রিকে এ বাড়িতে মানায় না।

রাত্রি এতদিন তার বাবা-মা’র কথা চিন্তা করেই বেরিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু যখন আর সহ্য করতে পারছিল না, তাই বেরিয়ে এসেছিল ও বাড়ি থেকে।

ইচ্ছে করলে শ্রাবণের জন্য একটা ছোট্ট চিঠি রেখে দিয়ে আসতে পারত, কিন্তু সেটা করেনি। বাইরে এসে ফোনের দোকান থেকে ফোন করেছিল। রিসিভারটা মুখের কাছে এনে, দোকানের লোকটাকে দেখে নিয়ে রাত্রি বলল- আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি, ফিরে যাওয়ার আর প্রশ্ন ওঠে না।

ও প্রান্তে শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড একেবারে চুপ। এরকম একটা কথা হঠাৎ শুনতে হবে হয়ত ভাবেনি। তারপর শান্ত গলা- কি পাগলামী করছ।

রাত্রি বলল- আমি বাড়ি থেকে ফোন করছি না, বেরিয়ে এসে রাস্তার বুথ থেকে ফোন করছি। আবার কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর শ্রাবণের গলা। বাড়ি ফিরে যাও, অফিস থেকে ফিরে সব শুনবো।

উত্তরোত্তর রাগ করছিল রাত্রির, অসহায় লাগছিল, কারণ এই সরল কথাটা ও কিছুতেই শ্রাবণকে বিশ্বাস করাতে পারছে না।  রাত্রি নিজেকে সংযত করল, ও একটুও রাগবে না। ধীরে ধীরে বলল, ভুল আমারই। বন্ধুরা, সবাই বারণ করেছিল শুনিনি, বাবা-মা’র কিরকম আপত্তি ছিল তাও তুমি জানো।

শ্রাবণের কণ্ঠস্বর বিব্রত। বলল, অফিস থেকে কথা বলা অসুবিধে, তুমি ফিরে যাও, সব শুনবো তখন।

রাগের মধ্যেও রাত্রির হাসি পেল। লোকটা মানে শ্রাবণ ভাবছে এরপরও আগেরমত ধানাইপানাই করে ওকে শান্ত করা যাবে। রাত্রি এবার গলায় একটু রূঢ়তা আনল। বলল, অত সময় নেই, আমি বাবার বাড়িতে যাচ্ছি না; কোন মুখে যাবো।  কিন্তু যেখানেই যাই তোমার কাছে ফিরে আসবো না। তোমার কাছে একটাই রিকোয়েস্ট, তুমি আমার খোঁজ করবে না। আমি চাই না, বাবা-মা জানুক … এখনই … কষ্ট পাবে।

ওপ্রান্ত এবোরে চুপ।

রাত্রি বলল, কী কথা দিচ্ছ তো?

কোনও উত্তর শোনা গেল না। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে রিসিভার নামিয়ে রাখর রাত্রি। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল ওর চতুর্দিকে শুধু একটা বিরাট শূন্যতা। এতক্ষণ তার আভাসটুকুও পায়নি। কারণ মাথার মধ্যে এতক্ষণ একটাই চিন্তা ঘুরছে। একটাই দুশ্চিন্তা। বাবা-মা। একবার মনে হয়েছিল সটান বাবা-মা’র কাছে ফিরে যাবে। মেয়েদের কাছে ফিরে যাবার জায়গা তো একটাই। সকলে।ি যায়। সংসার ভেঙ্গে গেলে আর কোথায়ই বা যাবে।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৫)

পল্লব শাহরিয়ার

২৪ জুলাই, ২০২০ , ৩:১৬ অপরাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৪)

(পর্ব-৪)

কিন্তু উকিল ভদ্রলোক যেই হেসে হেসে বললেন, শুনলে তো, ডিভোর্স হয়ে গেল, অমনি এক দমকা উজ্জ্বল আনন্দ ওর বুকের মধ্যে তুবড়ি জ্বালিয়েই কেমন নিপ্রভ হয়ে গেল।

হঠাৎ রাত্রির নিজেকে বড় বেশি নিঃশ্ব মনে হল। ক্রোধ আর ঘৃণা সামনে এতদিন একটা লক্ষ্য এনে রেখেছিল। ওই লোকটার হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। অথচ সঙ্গে সঙ্গে মনে হল সামনে আর যেন কোনও লক্ষ্য নেই। শুধুই শূন্যতা। বাবার কথাটাই শুধু কানে বাজছে; যাঃ আর কোন পিছুটান রইল না।

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৪) 38

রাত্রি ভেবেছিল ক্রোধ, ক্ষোভ আর ঘৃণা থেকে ও একেবারে মুক্তি পেয়ে যাবে, ছেড়ে আসার পর শ্রাবণের কাছ থেকে একেবারে ছাড়া পেয়ে গেল। যেন সঙ্গে সঙ্গে মানুষটাই পৃথিবী থেকে উবে যাবে, কোনওদিন আর রাত্রির চোখের সামনে পড়বে না, এ রকম একটা ধারণা ছিল।

বাবা ফিরতে ফিরতে পাশে বসা রাত্রিকে বলেছিল- আবার মুখ ভার করে আছিস কেন? প্রাণ খুলে হেসে ওঠ। তোর তো উচিত ছিল ওই কোর্ট রুমেই হেসে হেসে কথা বলা, দ্যাখানো দ্যাট ইউ আর এ ফ্রি ওম্যান্য। স্বাধীন-সুখী। মুখের মত জবাব হত, ওই হাসি।

রাত্রি চুপ করেই ছিল, কোন কথা বলেনি।

বাড়িতে ফিরে বাবা বলেছে, মনে কর আজ থেকেই তোর জীবন শুরু, আগের জীবনটা শুধুই একটা দুঃস্বপ্ন। আমি তোর আবার বিয়ে দেব। আর আমার সেই গরীব বাবা আবার আমার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। এখন আমি নিলয়ের বউ। এবং সুখী। আর সেটা রাতুলের কারণেই। ওর দিকে তাকিয়ে একটাই কথা মনে হয়, আমার ছেলে, আমার রক্তমাংস দিয়ে গড়া। ও চিরকাল আমারই থাকবে।

বাবাকে অনেক অপমান সইতে হয়েছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে। মা হয়ত আরও বেশি, শুধু তার একটি ভুলের জন্য। মাঝে মাঝেই নিজের দুঃখের কথা, কষ্টের  কথা, কোনও অসহ্য ঘটনার কথা এই এক জায়গাতেই ও উজার করতে পারে। নিলয়ের কাছে। এখানেই শুধু কেঁদে হাল্কা হতে পারে। সান্তনা পায় সঙ্গে উপদেশও। এই নিলয়ের কারণেই শ্রাবণ আবার এ বাসায় আসতে শুরু করেছে। এটা নিলয়ের উদারতা নাকি অন্য কিছু রাত্রি তা এখনও জানে না।

নিলয় ফিরেছিল বেশ রাত করেই। রাত্রি জানতো নিলয় দেরি করেই ফিরবে। বিশেষ দিনগুলোতে নিলয়ের এই দেরী করে ফেরা ওর দিক থেকে খারাপই লাগে, কারণ বাড়িতে থাকলে নিলয় দেখতে পেত। সারাক্ষণ ও দূরে দূরে থাকে। রাতুল ডেকে কোনও কথা বললেও দূর থেকে উত্তর দেয়। স্বাভাবিকতা দেখানোর জন্য কোনও না কোনও কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে।

প্রথম প্রথম শ্রাবণকে কি ভয়ই না পেত। ভয় ঠিক শ্রাবণকে নয়, রাতুলকে। ওইটুকু বাচ্চা ছেলেও কী  বোঝে। কোনটা আসল ভালবাসা আর কোনটা নকল ভালবাসা তা বোঝার বয়স কী ওর। কথাটা মনে আসতেই হেসে উঠল। বয়সের কথা ভাবছে কেন, মানুষ চেনা কি এতই সহজ? রাত্রির তো যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, বুদ্ধিসুদ্ধিও কম নয়, তাহলে ওই বা কেন শ্রাবণকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। সেসব দিনের কথা মনে পড়লেই লজ্জায় অনুশোচনায় নিজের মধ্যেই নিজে মুষড়ে পড়ে।

সবচেয়ে ভাল বন্ধু, সেই স্কুল থেকে কলেজ অবধি, কনা আরও কে কে বলেছিল, তুই কী পাগল হয়ে গেছিস, ওকে ওই লোকটাকে তোর এত পছন্দ? বিয়ে করবি?

ও তখন প্রেমে অন্ধ। মানুষ যে প্রেমে অন্ধ হয় তা ও নিজের জীবন দিয়েই বুঝতে পেরেছে। শ্রাবণের কোনও কিছুই ওর খারাপ লাগত না। কেন যে লাগেনি, নিজেই জানে না। সে সময় ওর ভেতর থেকে সব যুক্তিবুদ্ধি যে উবে গিয়েছিল তাই নয়, ভদ্রতা কর্তব্যবোধ এ সবও হয়ত ছিল না। তা না হলে বাবা-মা’র সাথে ওভাবে কথা বলত।

রাত্রি তখন শ্রাবণের প্রেমে পাগল। আর কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারে না। মা বাধা দেওয়ার ফলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিল, কেন, খারাপটা কী দেখলে তোমরা? বাবাকে বলে দিও তোমাদের মত না থাকলে আমি বেরিয়ে গিয়েই ওকে বিয়ে করব।

ব্যাস এ কথার পর আর কোনও কথাই খাটে না।

তবুও বাবা পিঠে স্নেহের হাত রেখে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন। স্নেহের হাতটাকে তখন রাত্রির কাছে বিছুটি মনে হচ্ছে। স্নেহ না ছাই, এসব বাবার পলিসি। মত বদলানোর চেষ্টা। তাই গলার স্বর ঝাঁ ঝাঁ । – যুক্তি দিয়ে বলোনা কী খারাপটা দেখলে ওর মধ্যে।

বাবা তখন বলেছিল, সব কি যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায়। ওকে দেখলেই আমার মনে হয় তুই ওখানে সুখী হতে পারবি না। শুধু মুখ দেখেই মনে হয়েছে।

ঠিক যেন বাবাকে অপমান করার জন্যই অট্টহাসি হেসে উঠেছিল রাত্রি। হাসতে হাসতেই বলেছিল, শুনলে মা, শুধু মুখ দেখেই মনে হয়েছে। সেই বাবার কথাটাই ফলে গিয়েছিল বলে, রাত্ররি বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত। কলেজের বন্ধুরা শ্রাবণকে বিয়ে করতে নিষেধ করেছিল বলে তাদেরকেও রাত্রি অপছন্দ করা শুরু করেছিল। ভেবেছিল, স্রেফ হিংসে। শ্রাবণকে বিয়ে করাই ওরা সহ্য করতে পারছে না। এ সমস্ত কথাই ও দিনে দিনে নিলয়কে বলেছিল। নিলয় সবই জানে।

মানুষে মানুষে সম্পর্ক জিনিসটা বড় অ™ভুত। এক একজনের সঙ্গে সম্পর্ক মানে একজন মানুষের ছোট ছোট অনেকগুলো অংশ। টুকরো টুকরো ভাবে কেউ বাবার, কেউ মায়ের, কখনও স্বামীর কিংবা স্ত্রীর, কখনও সন্তানের কখনও বন্ধু, কখনও সহকর্মীর। আরও কত রকমের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কগুলো থেকেই একজন মানুষের এক এক টুকরো পৃথক চরিত্র বেরিয়ে আসে। তার কোন একটিকে নিয়ে মানুষটাকে বিচার করা যায় না। সম্পর্ক যত গাঢ় আর অন্তরঙ্গ হোকনা কেন গোটা মানুষটার ওপর আমাদের কোনও অধিকার নেই। সেই সম্পর্কটুকুর বাইরে তার আলাদা একটা অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু কেউ সেটা মনে রাখে না। সেই অস্তিত্ব আসলে একজন মানুষের আরও অনেক টুকরো টুকরো অংশ।

রাত্রি নিজেও এসব কথা মাঝে মাঝে ভাবে, বুঝতেও পারে। মুশকিল হল এই যে, কেউই সে কথা বোযে না। সম্পর্ক যাই হোক না কেন সে গোটা মানুষটাকেই নিজের করে নিতে চায়। যেন তার নিজস্ব সম্পত্তি। আমার মতো তোমার এই সম্পর্কের বাইরে তোমার আর কোনও অস্তিত্ব থাকতে পারবে না।

নিলয় তো সবই জানে। কিন্তু সেও কেন রাত্রির সব অস্তিত্ব গ্রাস করে একা ওর সম্পত্তি ভাবতে বসেছে। তাই কি খবরের কাগজ পড়তে পড়তে ঠাট্টা করে বলেছিল সেই ছোট শব্দটি ‘ও’।

যা যেখানে আছে সব পড়ে থাক, ভুল করে থাকা অসুখী জীবনটার মতই। ওর বাবা-মা’র সব আপত্তি, সব যুক্তি যখন রাত্রি উড়িয়ে দিয়েছে তখন বাধ্য হয়েই ওরা এ বিয়েতে রাজি হয়েছিল। আর বিয়ের পরতো বাবা-মা দুজনেই খুশি হয়েছিল। রাত্রি তখনই ভেবে নিয়েছিল ওর একটাই কর্তব্য। শ্রাবণ আর ও যে সঙ্গী হতে পারবে সেটা প্রমাণ করে বাবা-মা’কে সুখী করা। কিন্তু শেষ অবধি পারল না। এমনকি ভেতরের যন্ত্রণা চেপে রেখে এক ছাদের নিচে কাটিয়ে সুখী জীবনের অভিনয় দিয়ে বাবাকে মাকে সুখী করে তুলবে তারও উপায় রইল না। মাত্র এক মাসের মাথায় তারা দুজন একেবারেই আলাদা হয়ে গেল।

আত্মসম্মানে লাগছিল। তবুও রাত্রি রান্নাঘর থেকে বেররিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাতুলের সামনেই শ্রাবণকে বলে বসলো- তোমার কাছে আমার একটাই রিকোয়েস্ট, এ বাড়িতে তুমি আর কখনও এসো না।

তিন

নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল পড়লেও তরঙ্গ ওঠে বইকি। তবে সেই তরঙ্গের স্থায়িত্ব আর কতটুকু? দশ সেকেন্ড, বিশ সেকেন্ড, বড় জোড় এক মিনিট! এ তরঙ্গ বড় মৃদু, শক্তিহীন। দুর্বল বৃত্তাকার ঢেউ হয়তো এক সময় কাঁপতে কাঁপতে পাড়ে এসে পৌঁছায়, কিন্তু তখন তার অস্তিত্বই অনুভব করা কঠিন। স্থির পুকুরের দিকে তাকিয়ে কে তখন বলবে, একটু আগে ঢিল পড়েছিল এখানে।

শ্রাবণের আগমন রাত্রির কাছে অনেকটাই এই গোত্রেরই। শ্রাবণকে নিয়ে এখন সে তেমন একটা ভাবে না। সে ভাবে তার স্বামী, সংসার, ছেলের কথা। তার সময় কাটছে এদের ভাবনাতেই। সময়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পার করছে সময়। অথবা সময় কাটছে না।

তাতেই বা রাত্রির কি এল গেল? সময়তো আর সত্যি সত্যি নিশ্চল, অনড় এক পাহাড় নয়, যেমন ভাবেই হোক সে ঠিক গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যাবে।

যাচ্ছেও তো। একেকজন লোক আছে যাদের হঠাৎ মনে হয় পরম আশ্রয়। নিলয় ঠিক সেরকমই। সেই সময়ের কষ্টের কথাগুলো ও যখন নিলয়কে বলতো, সহানুভূতি, সমবেদনা সব তখন ওর কাছ থেকেই পেত।

বুকের মধ্যে এই অশান্তি আর কষ্ট চাপা রাত্রির কোনও কোনও নির্জন দুপুর সেসব কথা মনে পড়িয়ে দিয়েই ওর চোখে পানি এসে যেত। এমন একটা স্বপ্রসঙ্গের দিন ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে কোনও দিন কল্পনা করেনি। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন, প্রেম ভালবাসা ছাড়াও যে পার্থিব জীবনে আরও কত কী আছে, তার কিছুই তখন চোখে পড়েনি। রাত্রি তখন ভালবাসার অন্ধ গলিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। শ্রাবণকেও ভাল করে বুঝে ওঠার মত দৃষ্টি ছিল না।

ছোট ছোট ঘটনা, একটুকরো বাঁকা কথা, সামান্য তাচ্ছিল্য মেয়েদের মনে কখন কী যে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, নিজের কাছেই নিজেকে ছোট করে দেয় তা বোঝার মত বোধশক্তি শ্রাবণের ছিল কিনা সন্দেহ হয় রাত্রির।

শ্রাবণের কি দোষ দেবে, বিয়ের পর মাত্র এই কটা দিন এর মধ্যেই ওকে কেন সব ছিঁড়ে ফেলে বেরিয়ে আসতে হল তা কি কেউ বুঝবে? অন্য কাউকেও বোঝাতে পারবে! যার বুকের মধ্যে জ্বালা সেই বোঝে, আর সকলেই উপদেশ দেন, মানিয়ে নে, মানিয়ে নে, যেমন রাত্রি নিজেই মানিয়ে নিতে চায়নি।

মদ খেলে মাতলামি করতে করতে বাড়ি ফিরে বউকে ধরে পেটালেই লোকে সেই অসহায় বউটার জন্যই সহানুভূতি জানায়, কষ্ট পায়, সাহস জুগিয়ে বলে, আছিস কেন; বেরিয়ে যা। শারীরিক নির্যাতনই যেন একমাত্র নির্যাতন। আগুনে পোড়া খুব কষ্টের, কিন্তু মনের ভেতরের আগুন যখন কাউকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে থাকে, তার কষ্ট বাইরের কেউ টের পায় না। বোঝেও না হয়ত।

সেই অসহ্য দাহ থেকে মুক্তি পাবার জন্যই তো রাত্রি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আশা করেছিল জ্বালাটা একদিন নিবে যাবে, নেবেনি।

– আমাকে যদি তোমার এত অসহ্য লাগে তা হলে তখন বিয়ে করার জন্য পাগল হয়েছিলে কেন?

এই কথাটাতো রাত্রির নিজেরও প্রশ্ন, নিজেই নিজেকে করেছে বহুবার। কিন্তু শ্রাবণের কাছ থেকে প্রশ্নটা আসতেই রাগে ফেটে পড়ে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিল, কারণ তখন জানতাম না তুমি এত নিচ।

রাত্রি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল এ বিয়ে ভেঙ্গে যাবে, ভেঙ্গে ফেলাই উচিত। তবু একটা সঙ্কোচ, একটা লজ্জা ছিল। কেন সঙ্কোচ, কেন লজ্জা তা হয়ত শ্রাবণও জানতো। তাই হয়ত ওর বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, নতুন বউ, বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে ফিরে যাবার সাহসই হবে না। কারণ এখন আর ওর ফিরে যাবার কোনও ঠিকানা নেই। এক এক সময়ে অবশ্য রাত্রি নিজেরই সন্দেহ হয়েছে, শ্রাবণের এই উদাসীন শান্ত ব্যবহারের মধ্যে আসলে রাত্রির কাছ থেকে ছাড়া পাবার একট আগ্রহ লুকিয়ে নেই তো? এই বাড়িটাকে ও কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিল না। ওরাও কী ভেবেছে রাত্রিকে এ বাড়িতে মানায় না।

রাত্রি এতদিন তার বাবা-মা’র কথা চিন্তা করেই বেরিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু যখন আর সহ্য করতে পারছিল না, তাই বেরিয়ে এসেছিল ও বাড়ি থেকে।

ইচ্ছে করলে শ্রাবণের জন্য একটা ছোট্ট চিঠি রেখে দিয়ে আসতে পারত, কিন্তু সেটা করেনি। বাইরে এসে ফোনের দোকান থেকে ফোন করেছিল। রিসিভারটা মুখের কাছে এনে, দোকানের লোকটাকে দেখে নিয়ে রাত্রি বলল- আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি, ফিরে যাওয়ার আর প্রশ্ন ওঠে না।

ও প্রান্তে শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড একেবারে চুপ। এরকম একটা কথা হঠাৎ শুনতে হবে হয়ত ভাবেনি। তারপর শান্ত গলা- কি পাগলামী করছ।

রাত্রি বলল- আমি বাড়ি থেকে ফোন করছি না, বেরিয়ে এসে রাস্তার বুথ থেকে ফোন করছি। আবার কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর শ্রাবণের গলা। বাড়ি ফিরে যাও, অফিস থেকে ফিরে সব শুনবো।

উত্তরোত্তর রাগ করছিল রাত্রির, অসহায় লাগছিল, কারণ এই সরল কথাটা ও কিছুতেই শ্রাবণকে বিশ্বাস করাতে পারছে না।  রাত্রি নিজেকে সংযত করল, ও একটুও রাগবে না। ধীরে ধীরে বলল, ভুল আমারই। বন্ধুরা, সবাই বারণ করেছিল শুনিনি, বাবা-মা’র কিরকম আপত্তি ছিল তাও তুমি জানো।

শ্রাবণের কণ্ঠস্বর বিব্রত। বলল, অফিস থেকে কথা বলা অসুবিধে, তুমি ফিরে যাও, সব শুনবো তখন।

রাগের মধ্যেও রাত্রির হাসি পেল। লোকটা মানে শ্রাবণ ভাবছে এরপরও আগেরমত ধানাইপানাই করে ওকে শান্ত করা যাবে। রাত্রি এবার গলায় একটু রূঢ়তা আনল। বলল, অত সময় নেই, আমি বাবার বাড়িতে যাচ্ছি না; কোন মুখে যাবো।  কিন্তু যেখানেই যাই তোমার কাছে ফিরে আসবো না। তোমার কাছে একটাই রিকোয়েস্ট, তুমি আমার খোঁজ করবে না। আমি চাই না, বাবা-মা জানুক … এখনই … কষ্ট পাবে।

ওপ্রান্ত এবোরে চুপ।

রাত্রি বলল, কী কথা দিচ্ছ তো?

কোনও উত্তর শোনা গেল না। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে রিসিভার নামিয়ে রাখর রাত্রি। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল ওর চতুর্দিকে শুধু একটা বিরাট শূন্যতা। এতক্ষণ তার আভাসটুকুও পায়নি। কারণ মাথার মধ্যে এতক্ষণ একটাই চিন্তা ঘুরছে। একটাই দুশ্চিন্তা। বাবা-মা। একবার মনে হয়েছিল সটান বাবা-মা’র কাছে ফিরে যাবে। মেয়েদের কাছে ফিরে যাবার জায়গা তো একটাই।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

 

 

মনের আধাঁর পেরিয়ে

পল্লব শাহরিয়ার

১৭ জুলাই, ২০২০ , ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে

(পর্ব-৩)

সেন্টের শিশিটা নিয়ে নেড়েচেড়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল- কোথায় পেলে? ভাইয়া কিনে দিয়েছে?

রাগ চাপতে হয়েছিল রাত্রিকে- না, বাপের বাড়ি থেকে এনেছিলাম, বিয়েতে দিয়েছিল।

একটু হেসে মিথ্যে করে বলতে হয়েছিল, ভুলে গিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ পেয়ে গেলাম।

নিশি বিশ্বাস করেনি বোধহয়। ভেবেছিল ওর ভাই ভালবেসে কিনে দিয়েছে। রাগ সে কারণেই। বিদেশী? খুব দাম তাই না? একটু থেমে বলেছিল, তবে আজকাল চেনার উপায় নেই, এত জাল বেরিয়েছে এসব।

মনে মনে রাত্রি তখন বলছে, আমার বাপের বাড়ি থেকে দেয়া জাল তো হবেই। ড্রেসিং টেবিলে দুতিনটে সেন্টের শিশি পড়েই থাকতো, কিন্তু তার পর থেকে নিশি মাঝে মাঝেই এসে বলতো, তোমার সেই বিদেশীটা কই!

মনের আধাঁর পেরিয়ে 39

দিতে হত। ঢেলে নিয়েছিল কোন শিশিতে, নাকি যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিল, হঠাৎ একদিন ফেরত দিয়ে গেল, তলানি একটুখানি পড়ে আছে। দেখেই অবাক হয়ে ও নিশির মুখের দিকে তাকিয়েছিল,  তারপর বেশ রাগের গলায় বলেছিল, ওটা আর ফেরত দিচ্ছ কেন, তুমিই নিয়ে নাও।

নেয়নি, ঠিক করে শব্দ হল, ওটা নিশির রাগ, টেবিলে রেখে চলে গিয়েছিল সে। আর রাত্রির চোখে তখন জল এসে গিয়েছিল। মনে পড়ে গেছে হাত খালি হওয়া, বাবার চোখেও যেন জল এসে গিয়েছিল, মার্কেটিং করতে গিয়ে মা-মেয়ে সব টাকা খরচ করে এসেছে শুনে। তখনও কত কি বাকি, বিয়ের রাতটাও।

এখন রাত্রি নিশির ব্যবহার পছন্দ করে না ঠিকই, দুজনের মাঝখানে একটা দূরত্ব গড়ে উঠছে। মাঝে মাঝে নিশির জন্য রাত্রির মায়া হয়। ও তো একটা সাধারণ মেয়ে, না রূপ না গুণ। চেষ্টা করলেও চাকরি পাবে কোথায়। যথেষ্ট বয়স হয়ে গেছে। জীবনটা কাটাবে কিভাবে? নিশি আগে ক্যাসেট ছেড়ে গান শুনতো, আজকাল শোনে না। সবকিছুই যেন ওর কাছে বিষাদ হয়ে গেছে।

রাত্রি হঠাৎ একটা স্বপ্ন দেখতে চাইলো। ওর অনেক টাকা হয়েছে। অনেক টাকা। আঃ সত্যি সত্যি যদি তা হত, ও মনে মনে ভাবলো, তা হলে আর টাকার জন্য নিশির বিয়ে আটকাবে না। ওর বিয়ের জন্য যা লাগে রাত্রি দিয়ে দেবে। নিশির জন্য মায়া, নাকি নিজেই পরিত্রাণ চাইলো? বিয়ে দিতে পারলে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া। শাশুড়ি একদিন বলেছিল, তোমাদের কোন চিন্তা নেই, শ্বশুরের না হয় বয়স হয়েছে তোমরা তো একটু চেষ্টা করতে পারো।

যেন দোষ রাত্রির।  দেখতে তো পাচ্ছে ছেলেকে নিয়ে ও কি রকম নাজেহাল। নিলয়কে যে অফিস যাওয়ার সময় নিজের হাতে খেতে দিবে তারও উপায় নেই। রান্নার লোকের ওপর ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। আর নিলয় ন’টার মধ্যে অফিস, ফেরে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যার পর।

দুয়েকবার বিজ্ঞাপন দিয়েছিল নিশির জন্য। কিছুই তো হলো না। কখনো পছন্দ হয় না, কখনো টাকা পয়সায় আটকায়। দুয়েকজায়গায় নিশি কিংবা শাশুড়ির আপত্তি।

নিশির বিয়ে দিতে পারলে ও নিজেই তো নিস্তার পেত। বিয়ের পর সব মেয়েরই ভেতর একটা স্বপ্ন থাকে, স্বামী পুত্র নিয়ে একটা পৃথক সংসার। রাত্রিরও ছিল। ভেবেছিল কোন একদিন নিলয়কে নিয়ে অন্যত্র উঠে যেতে পারবে। এখন আর ভাবে না। আর্থিক অসুবিধে নেই, কিন্তু জেনে গেছে নিলয় কোনদিনও এই সস্তা ভাড়ার বাড়িটা ছেড়ে যেতে চাইবেনা। রাত্রি নিজেও বোধহয় কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে গেছে। কিংবা মায়া নয়, অভ্যাস।

প্রথম যেদিন নিলয়ের বেতনের টাকা রাত্রির সামনেই শ্বাশুড়ির হাতে তুলে দিয়েছিল সেদিন বুকের কোণে একটু খিচ করে লেগেছিল ঠিকই, তবু মনকে সান্তনা দিয়ে বলেছিল, আমি তো তখন নতুন বউ, এতদিনতো মাকেই দিয়ে এসেছে, হয়তো লজ্জা। ভেবেছিল কোন একদিন বলবে, কিংবা নিলয়ই ওর হাতে তুলে দিয়ে বলবে, যা লাগে মাকে দিয়ে দিও।

বলেনি, স্বামীর উপার্জনের টাকাটা রাখার অধিকারটুকু না থাকলে ভিতরে ভিতরে নিজেকে কত ছোট লাগে ওরা বোধহয় বোঝে না। আর সেজন্যই রাতুলকে গোসল করাতে গিয়ে সাবান ফুরিয়ে গেছে দেখে নিশিকে ডেকে নতুন সাবান চাইতে হয়। প্রথম প্রথম চাইতেও লজ্জা হত, শ্বাশুড়ি না বলে বসে, এইতো সেদিন বের করে দিলাম একটা। সে কথা ওরা বলেনি কোনদিন, তবু একটা আশঙ্কা ছিলই। তাই চাইতে ভয় পেত, এখন আর পায় না। এখন আর ওসব ভাবে না। ও জেনে গেছে এই বাড়িটাই ওর বর্তমান, এটাই ওর ভবিষ্যৎ।

দুই

রাত্রি জানে নিলয় এ সময় বাড়ি ফিরবে না। বেশ রাত করেই ফিরবে, এবং কিছু একটা অজুহাতও দেখাবে। সেটা বিশ্বাসযোগ্য না ঠেকলেও রাত্রির ভ্রু কুচকে উঠবে না, আবার ঠোঁটে একটা অবিশ্বাসের মৃদু হাসিও ঝিলিক দিয়ে যাবে না।

আসলে এই একটি দিন রত্রির কাছে বড় অস্বস্তিকর। সমস্ত ব্যাপারটাকে নিলয় যদি স্বাভাবিক করে নিতে পারতো তাহলে অস্বস্তি থাকতো না। কিন্তু নিলয়ের  এই ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি শুধুই যে অস্বস্তিকর তাও নয়। নিলয় থাকলে ওকে কেমন একটা জড়তা যেন পেয়ে বসে। নিজেকে ঠিক তেমন স্বাধীন মনে হয় না।

দরজার বেল শুনেই বুঝতে পেরেছিল, শ্রাবণ।

বসো, পাঠিয়ে দিচ্ছি।

রাতুলকে ডেকে নিয়ে রান্নাঘরে চলে এসেছে। এ সময়ে কাজের মেয়েটা থাকে না। তাই চা নিজেই বানাতে হয়। নিলয় চা পছন্দ করে, কফি একেবারেই নয়। রাত্রি নিজেও চায়ের ভক্ত, তবে খুব শীত পড়লে কখনও সখনও যে কফি খায় না তাও নয়। একটা ছোট প্যাকেট কফি এনে রাখে মাঝে মাঝে, নিলয়ের হয়তো চোখেও পড়েছে। কী ভেবেছে কে জানে।

না, ওটা মাসকাবারি বাজারের লিস্ট করার সয়ম ও ইচ্ছে করেই লেখে না। কেন লেখে না সেটা ওর কাছে রহস্য। ‘কফি’ শব্দটা দেখলেই কি নিলয় অবাক হবে? কিছু প্রশ্ন করবে? আর করলেই বা! শুনে নিশ্চয়ই মুখ গোমড়া করবে না। তবু ওই ছোট একটা প্যাকেট ও নিজেই কিনে আনে। সকালেই নিলয়কে বলেছে, আজ শ্রাবণের আসার কথা।

খবরের কাগজ থেকে মুখ না তুলে নিলয় শুধুই বলল- ও।

রাত্রি তখনই রান্নাঘরে এসে দেখে নিয়েছে খোলা প্যাকেটে কতটা কফির গুড়া আছে। আছে। দুধ? হ্যাঁ, তাও। রান্নাঘরে স্টোভ জ্বেলে দুধ গরম করতে করতে শ্রাবণ আর রাতুলের অস্পষ্ট গলার স্বর শুনতে পাচ্ছিল ও। ওরা এখন সামনের ছোট্ট গ্রীল বারান্দায় বসে মশগুল হয়ে গল্প করছে। কী এত গল্প করে কে জানে।

এখন আর তেমন ভয় হয় না। প্রথম প্রথম একদিকে লজ্জা আর সংকোচ, আরেকদিকে ভয়। এই রাতুলকে নিয়েই। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা রাগও কী ছিল না।

কফির কাপটা শ্রাবণের সামনে নামিয়ে রাখতেই শ্রাবণ রাত্রির দিকে মুখ তুলে এক পলক তাকিয়ে কফির কাপটার দিকে চোখ নামিয়ে বলল, বসো।

– আসছি। বলেই রাত্রি সরে গেল, যেন ওদিক কোনও সাংসারিক কাজ পড়ে আছে। অথচ একেবারে যে বসার ইচ্ছা হল না তাও নয়।

মাকে চলে যেতে দেখে রাতুল বলে উঠলো, বসো না মা।

– আসছি, আসছি। ফিরে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল রাত্রি। কিছু একটা কাজ নিয়ে নিজেকে তো ব্যস্ত রাখতে হবে, তা না হলে ওখানে গিয়ে না বসার কোনও যুক্তি থাকে না। তাই দড়িতে টাঙানো জামা-কাপড় তুলে এনে ইস্ত্রি করতে শুরু করবে কিনা ভাবল।

একবার মনে হল শ্রাবণ নিশ্চয়ই সোজা অফিস থেকে এখানে চলে এসেছে। ওকে কী একটা ওমলেট করে দেবে? কী আশ্চর্য, এটা তো সাধারণ ভদ্রতা, এতক্ষণ ওর মনে হয়নি কেন। এর আগে যখন এসেছে কফির সঙ্গে যে কিছুই দেয়নি তা তো নয়। তবে?

ওই যে সকালে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে শ্রাবণের আসার কথা শুনে নিলয় মুখ না তুলেই শুধু একটা ছোট্ট ‘ও’ বলেছিল সেটাই কী ওর মাথায় সারাদিন ঘুরছে? ওকে সঙ্কোচে টেনে রেখেছে! প্রথম প্রথম শ্রাবণ যখন আসত, নিলয় বাড়িতে থাকলে রাত্রির বড় অস্বস্তি হত। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারতো না। কিন্তু আজ সে না থাকলেও সকালবেলায় তার নিতান্ত উদাসীন ও উপেক্ষার একটা ছোট্ট ‘ও’ শব্দ রাত্রির হাতে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিচ্ছে কেন। নাকি ওই ছোট্ট ‘ও’ শব্দটার আড়ালে অন্য কোন অর্থ আছে! না, থাকার কথা নয়। আসলে সবই হয়ত ওর নিজেরই মনগড়া সন্দেহ।

নিলয় ভাল করেই জানে যে এখন ওর জীবনে শ্রাবণের কোন অস্তিত্ব নেই। ওর আর শ্রাবণের মধ্যে যে ক’টা বছরের তিক্ত সম্পর্ক ছিল তাও আজ রাত্রি প্রায় ভুলে যেতে বসেছে। কিন্তু এমন একটা দিন ছিল, এই সেদিনও যখন ছোট ছোট দুয়েকটা ঘটনা বা কথা মনে পড়ে গেলেই রাত্রির সারা শরীর কিড়বিড় করে উঠত, অক্ষম রাগে জ্বলে উঠত ওর ভেতরটা। সে সময় এই নিলয়ই সান্তনা হয়ে এসে হাজির হল। রাত্রি সান্তনা খুঁজছিল, না শ্রোতা, ওর ঠিক মনে নেই।

কত ছোট ছোট কথা এক এক সময় কত বড় হয়ে দেখা দেয়। একটা মানুষের পছন্দ-অপছন্দ আরেকজনের যদি ভাল না লাগে, একটু একটু করে গোটা মানুষটাকেই দূরে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। হয়তো একটু একটু করে নিজেই সরে আসে। এমন কী প্রচন্ড ভালবাসার মানুষের কাছ থেকেও।

রাত্রির সেদিনের বিষণ্ন বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়েই কী নিলয় কোন সমবেদনা বোধ করেছিল, করুণা করে এগিয়ে এসেছিল। না, রাত্রির যদ্দুর মনে পড়ে ও তখন ভেঙ্গে পড়া চেহারাটায় শিরদাড় সোজা করে মুখে হাসি আনতে পেরেছে। তবে ভেতরে ভেতরে বোধহয় নিজেকে নিঃস্ব ভাবতে শুরু করেছে। শিশু বয়সের রাতুলের দিকে তাকিয়ে যেমন উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা, তেমনই বড় বেশি অসহায়।

রাত্রির হয়ত এক একদিন ইচ্ছে হত একজন কেউ ওর পাশে এসে দাঁড়াক। অকৃত্রিম কোনও বন্ধু, একখানা বাড়ানো হাত যার নাম সহায়। যার কাছে অকপটে মনের সমস্ত দুঃখের কথা বলা যায়। পিঠে হাত রেখে কেউ সান্তনা দেক তা চায়নি, শুধুই চেয়েছে অসীম ধৈর্য নিয়ে ওর সব কথা কেউ শুনুক। একজন কাউকে তো মানুষের বিশেষ করে দুঃখী মানুষের সব কথা বলতে ইচ্ছা করে। সব কথা শুনে কেউ বলুক তুমি কিছু ভুল করোনি।

আর সকলেই শুধু একটা কথা শুনিয়েছে, তুই ভুল করছিস, ভুল করছিস। এখনও সময় আছে ফিরে যা।

কেউ বলেনি, এখনও জীবন আছে, ফিরে আয়।

নিলয়কে তখন কত টুকরো টুকরো কথাই না বলেছে। এইসব ছোট ছোট ব্যাপার কেন লাগে, কোথায় লাগে, আর কেন তা এত বড় হয়ে দেখা দেয় রাত্রি নিজেও বুঝতে পারে না। শ্রাবণ কফি ভালবাসে, চা একেবারেই নয়। এদিকে বাপের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা রাত্রির চা না হলে চলে না। এটা এমন কিছু একটা বিপর্যয় নয়, রাত্রি নিজেও জানে।

নিজর দুঃখের প্রসঙ্গ টেনে এনে একদিন সে সব কথা নিলয়কে শোনাতে গিয়ে বলেছিল, কোথায় লাগত জানেন, এই যে আমি মনে করে রেখেছি, ওর কফিতে কতটা দুধ, ক’চামচ চিনি, ক’টার সময় ওর কোথায় কোথায় প্রোগ্রাম, অথচ ও আমার জন্য ….

নিলয় শুধু হেসে চুপ করে গেলেও ভাল ছিল, তার বদলে ও বলে উঠল, আসলে রাত্রি, তুমি আগে থেকেই তোমার ভালবাসার মানুষকে, তার সবকিছুকে অপছন্দ করে ফেলেছো। সে কারণেই ছোটখাটো জিনিসগুলো বড় হয়ে দেখা দিত।

কথাটা হঠাৎ যেন একটা নাড়া দিল রাত্রিকে। ঠিক এভাবে ও কোনদিনও ভেবে দেখেনি। খুঁজে দেখার চেষ্টা করল ঠিক কবে থেকে ও শ্রাবণকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। ভালবাসার পর মানুষটাকেই কী ও অপছন্দ করতে শুরু করেছিল, নাকি ওর ওপর অধিকার খাটাতে চাইতো সেই ব্যাপারটাকেই ও পছন্দ করতে পারতো না। শ্রাবণকে রাত্রি এখন আর তেমন সহ্য করতে পারে না, না পারারই কথা, কারণ এখন ওর মনে হয় এই লোকটা ওর স্বপ্নই ভেঙে  দেয়নি, জীবনটাই নষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখনকার ব্যাপারটা পুরোটাই ভদ্রতা।

তখন রাত্রির মধ্যে আর কী বা ছিল, শুধু নিঃসঙ্গতা ছাড়া।

না, তখন আর বাবা-মা বলত না তুই ভুল করছিস। স্পষ্ট করে ওরা না বললেও, মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারত ওরা বলতে চাইছে, তুই ভুল করেছিলি, এখন বুঝতে পারছিস তো! জীবনে এর চেয়ে আর বড় লজ্জা কি হতে পারে। কী ভুলই না করেছিল ও।

তখন ওর যে কী হয়েছিল কে জানে। শ্রাবণের নেশায় পড়ে গিয়েছিল হয়ত। মানুষটাকে আদৌ চিনতে পারেনি। নাকি নিজেকেই চিনতে পারেনি! বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব সকলেই বারণ করেছিল। কারও কথা কানে নেয়নি। মনে হয়েছে ওর চারপাশের সকলেই শত্রু।

শেষ অবধি বাবা বলেছিল, যা ভাল বুঝিস।

কত কি রঙিন স্বপ্ন দেখেছিল। বিয়েটা যে শেষ অবধি এভাবে, এত সহজে ভেঙে যাবে কল্পনাও করিনি। এক ছাদের নিচে না থাকলে কোন মানুষকেই চেনা যায় না। যত দিন না ডিভোর্স হয়ে গেছে, রাত্রির মনে হয়েছে ওকে কে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তখন শুধুই রাগ আর ক্ষোভ তীব্র ঘৃণা। জালে আটকে যাওয়া পাখির মত ছটফঠটানি। কেমন একটা অনিশ্চয়তা আর ভয়। কোন দিক থেকে অচেনা একটা জটিলতা এসে দেখা দেবে সেই আতঙ্ক। ছাড়া পাওয়ার জন্য কি অধৈর্য ব্যাগ্রতা। এক একটা দিন যেন এক একটা বছর। যেন কতকাল রাত্রি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পায়নি। অথচ ওদের বিয়েটা এক মাসও টেকেনি।

বাবার কথাটা কানে গেল- যাঃ সব পিছুটান শেষ।

দূরে দাঁড়ানো শ্রাবণের দিকে একবারেই চোখ পড়েছিল, দ্বিতীয়বার ফিরে তাকায়নি রাত্রি। তখন ওর মনে শুধুই ঘৃণা। একটু আগে পর্যন্ত ছিল একটা দুর্বোধ আতঙ্ক। শেষ মুহূর্তে না কোনও আইনের ফাঁকে সব ভেস্তে দেয় ওই লোকটা।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

 

 

মনের আধাঁর পেরিয়ে

পল্লব শাহরিয়ার

১০ জুলাই, ২০২০ , ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে

(পর্ব-২)

ভাগ্যিস চলে গেছে, পিংকুকে আদর করতে গেলে না জানি খালাটা কী বলে বসত। মুখচোখ দেখলেই বোঝা যায় না। রাত্রি তবু বলল- খারাপ ভাবছিস কেন, হয়তো স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে আত্মীয়স্বনের বাড়িতে ঘাপটি মেরে আছে।

মীনা হাসল- দ্যাখ রাত্রি, ঐ বাচ্চাকে ফেলে কেউ রাগ দেখাতে যায় না। সঙ্গে নিয়ে যেত। কথাটা মিথ্যা নয়। রহস্যতো ঐখানেই। তাছাড়া পিংকুর মাকে দেখে কেমন একটা সন্দেহ সন্দেহ ওদের সকলেরই।

কিন্তু ঘটনাটা রাত্রিকে ভীষণ ভাবিয়ে তুলল, নাড়া দিল। ফেরার পথে ওযে রাতুলের হাত ছেড়ে দিয়েছিল, খেয়ালই ছিল না। রাতুল এমনিতেই হাত ধরতে দেয় না ঐ  বয়সের ছেলেদের ঐ এক দোষ, ভাবে খুব বড় হয়ে গেছি। তবু জোড় করে হাত ধরেই স্কুল ছুটির ভিড় থেকেই বেরিয়ে আসতে হয়, রাস্তা পার হওয়ার সময়ও।

মন কি বস্তু, অপরের ছেলের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের ছেলেকে ভুলে গিয়েছিল। হাত না ধরেই রাস্তা পার হয়েছে। ভাগ্যিস কিছু একটা ঘটে যায়নি। আতঙ্কের সময়টুকু পার হয়ে এসে বুকের ভেতরটা আতঙ্কে কেঁপে উঠল।

বাড়ি ফিরে এসেও কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরছে তো ঘুরছেই। না, বাড়িতে কাউকে বলবে না। বললে বড় জোর তমালকে বলতো। নিলয়ের ছোট ভাই, সে চাকরি পেয়ে চলে গেছে বেশ কিছুকাল। বড় একটা আসেও না। ঐ একমাত্র রাত্রির দুঃখ বুঝত। শ্বশুড়-শাশুড়ি কিংবা রবিনকেও বলবে না। নিলয়কে তো নয়ই। বললে যেন নিজেই ছোট হয়ে যাবে। আর নিলয়কে বললে হয়ত বলে বসবে, তোমরা মেয়েরা সব পারো। কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠবে শুনলে। অথচ একথাই তো মীনা বলেছে মেয়েরা দেখছি সব পারে। তখন নিজেও সাঁয় দিয়েছে।

কথাটা মিথ্যা নয়, বলার মতই। কারণ পিংকুর মায়ের মত একজনই পেরেছে। খবর সেটাই। ছেলেরা যে এরকম কান্ড হামেশাই করছে, বউ ছেলেকে ফেলে রেখে অণ্যত্র সংসার বাঁধছে, সুতরাং সেটা আর খবর হবে কি করে। ছেলেরা যে সব পারে সেটা আর মুখ ফুটে বলতে হয় না।

জুতো দেখতে পেয় বুঝল শ্বশুর এখনও বেরোননি। কবে কখন বেরোবেন তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। সরকারি চাকরিতো। গরমে ঘেমে এসেছে রাত্রি। এসেই পাখাটা জোড়ে চালিয়ে দিল, রাতুলকে বললো, এখানে দাঁড়া। কি ভাগ্য, কারেন্ট আছে।

ছোট্ট একটা কথা, যখন সমস্ত জীবনটাই বিস্বাদ করে দেয়। এখন ওসব বিশেষ শুনতে হয় না, কিন্তু মনে পড়ে যায়। সেই প্রথম প্রথম। এমনই গরম, পাখা ঘুরছিল। শ্বশুড় কাকে শুনিয়ে কে জানে বারান্দা থেকে বলছিলেন তোমাদের কি চব্বিশ ঘণ্টাই পাখা লাগে!

রত্রি ভয়ে ভয়ে পাখা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে তমালের গলা শুনেছিল। হয়তো রাত্রির পক্ষ নিয়ে। পাখা যখন আছে, গরম লাগলে তো চালাবেই।

চালাতে তো বারন করছি না। একটু অসহায় শুনিয়েছিল শ্বশুড়ের কণ্ঠ। বলেছিলেন গত মাসের বিলটা দেখেছিস!

নিলয়ের ছোটভাই তমাল তখনও বেকার, কিন্তু ন্যায়-অন্যায়ে তার গলার জোর বেশি ছিল। নিলয়ের বেতন তখনো খুব একটা বলার মত নয়। নিলয় তখন তার বেতনের টাকাটা তার মা’র হাতে তুলে দিত। কত বেতন, হাতে কত পায় এসব কিছুই জানতো না রাত্রি।

ও পরে জেনেছে। শ্বশুড়ের বেতন যে তেমন নয় তাও জানে। তবু কথাটা তীর হয়ে বিঁধে আছে- তোমাদের কি চব্বিশ ঘণ্টাই পাখা লাগে! এখন আর এসব কথা শুনতে হয় না। তমাল আর বেকার নেই, নিলয়ের উন্নতি হয়েছে চাকরিতে।

তমাল মাসে মাসে কিছু পাঠায় কিনা জানার উপায় নেই। কি করেই বা পাঠাবে। নিজেরটা চালাতে পারলেই যথেষ্ট। বেতন কত তাও বলেনি তমাল, এড়িয়ে গিয়ে হেসে বলেছিল, চায়ের দোকান ছাড়া বসার জায়গা ছিল না, এখন একটা বসার চেয়ার পাবো তাই যথেষ্ট। তার আবার বেতন!

হেসে ফেলেছিল রাত্রি। বুঝেছিল ওটা মুখ ফুটে বলার মত নয়। তা হোক চাকরিতো। কিন্তু পিংকুর মায়ের ঘটনাটা কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছিল না। ছেলেটার জন্য মায়া হচ্ছিল।

রাতুলকে গোসল করাতে করাতে আবার সেই চিন্তাটাই মাথার মধ্যে ঘুরছে ফিরছে। রাতুলের গায়ে পানি দিয়ে সোপ-কেস খুলে দেখে পাতলা এক চিলতে সাবান পড়ে আছে, নতুন সাবান রাখা হয়নি। হয়তো নিলয়ই শেষ করে দিয়ে গেছে। গোসল করতে গেলে সোপ কেসে সাবান শেষ, কি শ্যাম্পুর শিশিতে তলানি পড়ে থাকলে বিরক্তি লাগে। মনে হয় আগে যে ব্যবহার করেছে সে নতুন একটা সাবান কিংবা নতুন একটা শ্যাম্পুর শিশি রেখে যায়নি কেন? বিরক্তির সঙ্গেই সেজন্য রাত্রি চেচিয়ে ডাকলো, নিশি একটা সাবান দিয়ে যাবে।

– নিশি, আবার ডাকলো সাড়া না পেয়ে।

একটু পরেই সাবানের প্যাকেট খুলতে খুলতে এল নিশি, দিয়ে চলে গেল বেশ বিরক্তির সঙ্গে। নিশি, এ বাড়ির ছোট মেয়ে, রাত্রির ননদ।

নিশির এই এক দোষ, সাড়া দেয় না। শুনলো কি শুনলো না তা জানার উপায় নেই। অথচ বেশ শুনতে পেয়েছে, সাবানটা এনেও দিল। সাড়া দিতে কি অসুবিধে কে জানে। আসলে বিরক্তি। কাজ করতে হচ্ছে বলে নয়। বিয়ে হচ্ছে না বলে।

বিয়ের আগে বাবা-মা বেশ ভয় পেয়েছিল। অবিবাহিত ননদ আছে শুনলে মেয়ের বাবা-মা আঁতকে উঠবেই। রাত্রিরও ভয় ছিল, কিন্তু উপায় ছিল না বলেই রাজি হয়েছিল ওরা। রাত্রিও আপত্তি করেনি।

বিয়ের পর কিন্তু নিশিকে ওর ভালই লেগেছিল। সব সময় কাছে কাছে ঘুরতো। রাত্রিও বেশ খুশি, একটা সঙ্গী তো গল্পগুজব করা যায়। বিয়েতে পাওয়া দু’চারটা শাড়ি, সেন্ট, ক্রিম সবই ও ব্যবহার করতে দেয় নিশিকে। অথচ দিনে দিনে কেমন একটা দূরত্ব তৈরি করে ফেলল মেয়েটা। বোধহয় ঐ একটাই কারণ, বিয়ে। কিন্তু সেটা তো রাত্রির দোষ নয়, কেন বোঝে না।

এই বয়েসের মেয়েদের নিয়ে সত্যি বড় সমস্যা। রাত্রিকে নিয়েই ওর বাবা-মা কি কম দুর্ভাবনায় ছিল। নিশি ছোটবেলায় দেখতে খুব ভাল ছিল। যত বয়স হচ্ছে তত দেখতে জানি কেমন হচ্ছে। এত সাজগোজ সত্বেও। দোষের মধ্যে রংটা একটু চাপা। ওখানেই ওর হার, ওখানেই রাত্রির জয়।

শ্বশুরের রিটায়ার করতে দেরি নেই। কি আছে না আছে একদিন আভাসে জানিয়েও দিয়েছেন ছেলেদের। সবকিছু কেটে কুটেনিয়ে যা হাতে পেতেন তা থেকে নাকি আর জমানো সম্ভব ছিল না। ভরসা একমাত্র পেনশন। কিছু হাবেভাবে বোঝা যায় ভরসা একমাত্র নিলয়।

রাত্রির এখানেই আপত্তি, এখানেই আতঙ্ক। ও এখন এ বাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে পারলেই যেন নিশ্চিন্ত। শ্বশুর একদিন রাতে খাওয়ার সময়, ছেলেদের সঙ্গে খেতে বসতেন, ওইটুকুই দেখা সাক্ষাৎ, কথা বলা, দুঃখে হেসে বলেছিলেন- এক সময় চাইলেই ঘুষ খেতে পারতাম, অনেকেই নিত, নিইনি। স্টুপিড ছিলাম তো। ছেলেরা চুপ করে ছিল। কোন কথা বলেনি।

রাত্রির ভাল লেগেছিল। বাঃ মানুষটা সৎ। অর্থ চিন্তায় এখন নিজেকে নামিয়ে আনতে চাইছে, হতাশায় স্টুপিড ভাবছে নিজেকে। বুকের মধ্যে একটা কষ্ট কষ্ট ভাব এসেছিল রাত্রির। শ্বশুরের জন্য মায়া হয়।

বলেছিলেন সেদিনই, ছেলেরা কিছু বললো না দেখে নিজেই ব্যাখ্যা দিলেন। গভর্মেন্ট যখন চায় লোকে ডিজঅনেস্ট হোক… পেনশন তো আধা মাইনে, লোকটা চলবে কি করে তা তো ভাবে না।

নিলয় সায় দিয়ে বলেছিল, জিনিসের দামতো বেড়েই চলছে। আর বেকার তমাল হেসে উঠে বলেছিল, চাকরি একবার পাই, ঘুষ নেয়া কাকে বলে দেখিয়ে দেব।

সবাই হেসে উঠেছে। হাসির কথা হলেও রাত্রি হাসতে পারেনি। শুধু নিশি টিপ্পনী কেটে বলেছিল, সব চাকরিতেই কি ঘুষ আছে, তোর যেমন বুদ্ধি!

নিশি বড় একটা হাসে না। হাসির কোন কথা হলে হেসে ওঠাও যেন অপরাধ। মেয়েটা কেমন যেন দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে। বাড়িতে থেকেও নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চায়। বিয়েটাই কি মেয়েদের সব, রাত্রি বুঝতে পারে না।

বাড়িটাও অদ্ভুত। সব ব্যাপারেই এক ধরনের গা ছেড়ে দেয়া অবস্থা। এক সময় নিশির বিয়ের চেষ্টা অবশ্য হয়েছিল। কিন্তু আজকাল কত কি পড়া যায়, করা যায়। কিছু একটা করলেও তো পারে। চাকরি?  চাকরি আর পাবে কোথায়, কে দেবে! সেজন্যই সবাই ভাবে বিয়েটাই একমাত্র গন্তব্য। সাধারণ মেয়েদের সামনে আর কি বা পথ আছে। যথেষ্ট টাকা থাকলে হয়ত একটা বিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু তার পরের জীবনও সেই অন্ধকারে লাফ দেয়া। কতরকমই তো দেখছে শুনছে। রাত্রির নিজের জীবনই বা কী! সুখী না অসুখী নিজেই বুঝতে পারে না।

রাতুলকে খাওয়াতে বসিয়ে নিশির কথা মনে এল। একটু রাগ এবং একটু বিরক্তি ছিল। রাতুলকে গোসল করার সময় ডেকে সাড়া পায়নি বলে। সাবানটা দিয়ে গেল এমন অবহেলার সঙ্গে যেন বাড়ির লোক নয়, রাত্রির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।

অথচ এক সময় কত ভালবাসতো দুজন দুজনকে।

বিয়ের পর প্রথম প্রথম নিশির আব্দার ওর কসমেটিকসে ভাগ বসাতো। কিছু মনে করত না রাত্রি। দুচারটে শাড়ি পরতেও দিয়েছে, একেবারে দিয়ে দিয়েছে উপহার পাওয়া কয়েকটা ভাল শাড়ি। ও নিজেই দিয়ে দিয়েছিল নাকি শ্বাশুড়ি হাসতে হাসতে বলেছিল বলে, তা অবশ্য মনে নেই।

প্রথম রাগ সেই সেন্টের শিশি নিয়ে। সেন্টের শিশিতো টেবিলের ওপর থাকতো। সিনেমা যাওয়ার আগে সেজেগুঁজে এসে, তখন সাজতো, নিশি ওখান থেকে সেন্ট নিত। রাত্রি কিছু মনে করত না। কিন্তু একটা সেন্ট ছিল, আড়ালে আড়ালে রাখতো রাত্রি। দামি সেন্ট। বিয়ের বাজার করতে গিয়েও নিজেই কিনেছিল। তখন অনেক খরচ হয়ে গিয়েছিল, বাবা একটু হাতটান শুরু করেছে, দামী কিছু কিনলেই মা বিরক্ত হচ্ছে। বাবার কাছে ধমক খাওয়ার ভয়ে, তবু জেদাজেদী করে রাত্রি কিনেছিল ওটা, নিউমার্কেট থেকে, বেশ দামী।

ও জানত, একবার ফুরিয়ে গেলে আর কেনা যাবে না। লুকিয়ে লুকিয়ে কৃপণের মত কদাচিৎ ব্যবহার করত, নিলয়ের সঙ্গে সিনেমা যাওয়ার সময়।

তারপর ধরা পড়ে গেল হঠাৎ। নিশি দেখতে পেয়েই ছুটে এল, দেখি দেখি।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

মনের আধাঁর পেরিয়ে

পল্লব শাহরিয়ার

৩ জুলাই, ২০২০ , ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে

এক

ফুটকী থেকে রাত্রি। এ বাড়িতে কেউ ওকে বৌমা বলে ডাকে না। ঠিক বিয়ের পরে শ্বশুর দুয়েকবার মুখ ফসকে বৌমা বলে ফেলতেন। দুয়েকবারই শুধু। মনে পড়লে রাত্রির এখনও হাসি পায়। সঙ্গে সঙ্গে শাশুড়ির সে কি দাবড়ানি। চোখে কড়া ধমক দিয়ে বলে উঠেছিল, তুমি বুড়ো হতে চাও হও, আমি সেকেলে শাশুড়ি হবো না। একটা কমা না সেমিকোলন দিয়ে, রাত্রির মনে পড়ে, নিলয়ের মা, মানে রাত্রির শাশুড়ি, মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে যেতে বলেছিল, কেন রাত্রি বলে ডাকতে কি জিভে তেতো লাগে… এত সুন্দর নাম।

রাত্রি বলে বাপের বাড়িতে কেউ ডাকতো না। সেখানেও সবার মুখেই ফুটকী। বেশ বাজে নাম। স্কুলের মেয়েরা কেউ কেউ জেনে গিয়েছিল বলে প্রথম প্রথম ক্ষ্যাপাত। ডাক নামগুলোর কি সব সময় কোন ইতিহাস থাকে! বাবা-মা আদর করতে গিয়ে সেই মুখে কথা না ফোটার বয়সে কত যে ইকড়ি-মিকড়ি নাম দিয়ে বসে, সেটাই হয়ে যায় ডাকনাম। আর বেচারী বড় হওয়ার পর সেটাই হয়ে যায় অস্বস্তি। বিয়ের পরে নিলয় ওদের বাড়ি গিয়ে যেদিন জানতে পেরেছিল, রাত্রির কি লজ্জা। ফুটকী ছিল শুধু স্কুল কলেজের গন্ডির মধ্যে, ছেলেবেলাতেই তাকে রাত্রি বানিয়ে নিলে কত ভাল হত। তাহলে নামটা নিশ্চয়ই খুব আপন লাগতো। এখন লাগে না, কেমন একটু দূরত্ব আছে। স্কুল কলেজের রোল নাম্বারের মতো। বড় হওয়ার পর কি নাম বদল হয়!

ফুটকী বা রাত্রি কোনটাই অবশ্য ওর কাছে সুন্দর নাম হয় না। শাশুড়ি যাই বলুক। ও বোধহয় মনরাখা কথা। আর ফুটকী নামটাতে ওর যতই লজ্জা থাক, বাপের বাড়িতে গেলে কেউ যখন ফুটকী বলে ডাকে, কি ভাল লাগে। কত নিজের মনে হয়। ছোটবেলায় একটু ছোটখাটো দেখতে ছিল বলে, নাকি মুখে খই ফুটতো বলে, মা একবার হাসতে হাসতে কাকে যেন বলেছিল। নিলয় জানে না, জানলে বলতো, তখন যদি এত কথা ফুটতো, এখন এত চুপচাপ কেন।

রাত্রি, এখন যে একটু চুপচাপ তা অবশ্য নয়। তবে ওর মডার্ন শাশুড়ির মতো অতিরিক্ত প্রগলভতা, অত্যধিক হাসি মস্করা ওর পছন্দ নয়। শাশুড়ি শাশুড়ির মতো হলেই যেন বেশি মানায়। মীনা বলেছিল, তোর মত শাশুড়ি পেলে আমি বর্তে যেতাম। পেয়েছিস তো, তাই জানিস না তুই কি লাকি। শুনে বিষণ্ন হাসি হেসেছে রাত্রি। – দ্যাখ মীনা, এদের কারো বাইরেরটা মডার্ন, হাসিখুশি, কেউ ব্যাকডেটেড, তারপরও ভেতরে ভেতরে সব এক, শুনতে তো পাস।

মীনার সঙ্গে তুই তোকারিতে নেমে এসেছে এই ক’মাসেই। আরো কয়েকজনের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। কারণ অন্তরের অসন্তোষ বোধহয় সকলেরই এক। একজন শুরু করলেই ভেতরের ক্ষোভ বের করে আনে অন্যজন। শুধু জয়া যা- একটু পৃথক। বেশ চাপা ধরনের। শোনে, কিন্তু পেট থেকে একটা কথাও বের করে না। হাসি হাসি মুখে এমন একটা ভাব করে যেন বেদম খুশির জীবন। সংসারে কোন অতৃপ্তি নেই। অথচ থাকে তো জয়েন্ট ফ্যামিলিতে। জয়েন্ট ফ্যামিলি! বাপরে। শুনে রাত্রি-মীনা দুজনেই বলে উঠেছিল, হেসে ফেলেছিল। তখন খেয়াল হয়নি, ওদের নিজেদেরগুলোও তো তাই, তুলনায় একটু ছোট এই যায়।

জয়াকে সেজন্যই ওরা খুব একটা পছন্দ করে না। দুঃখ এক না হলে কি এক হওয়া যায়। সম্পর্ক গড়ে ওঠে? দুঃখ নেই তা হতে পারে না। তবে এত চাপা স্বভাব কিছুতেই মানতে দেবে না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। মনি, সোমাদের তাও বোঝা যায়। ওরা দিব্যি স্বামী আর বাচ্চা নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে, শ্বশুড় শাশুড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। দুপুরে চট করে বাপের বাড়ি যাওয়া যায়। টেলিফোনে আধাঘণ্টা গল্প করে বলা যায়, মা একটু আমের আচার করো তো, গিয়ে নিয়ে আসবো।

আসলে রাত্রিদের একটা ক্লাব আছে। সে কেজি স্কুলটায় রাতুলকে ভর্তি করেছে তার সামনের মাঠে এই ক্লাব। অনেক মায়েরাই সকালবেলা ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিতে এসে বসে থাকে, গল্পগুজব করে, যাকে বলে আড্ডা। ছুটির পরও তাদের গল্প চলতেই থাকে, ক্ষিধেপেটে ছেলেটার কথা মনেই থাকে না, সে তাড়া দিলে উল্টে ধমক দিয়ে ফেলে।

এটাকেই রাত্রি মীনা ঠাট্টা করে ক্লাব বলে। এখানেই জীবনের যত ক্ষোভ, দুঃখ, অসহায়তা উজাড় করে দেয়। কে.জি পার হলে আবার তো ভর্তির হাঙ্গামা আছে, কোন স্কুলে কখন ফর্ম দেয় সে সব খবরও পায় এখানেই।

রান্নার লোক ছিল না, একটা গেলে আজকাল আরেকটা কাজের লোক পাওয়া যে কি যন্ত্রণা, রাত্রি একমাস আড্ডা দিতে পারেনি, স্রেফ রান্নাঘরে কাটাতে হয়েছে, শাশুড়ি একটু আধটু সাহায্য যে না করেছে তাও নয়, কিন্তু নিলয়ের মুখে একট মাস কী বিরাগ। রাতুলকে শুধু স্কুলে পৌঁছে দেয়া, পৌঁছে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে গোসল-খাওয়া, অফিস যাওয়া। শাশুড়ির আদরের ছেলের কি কষ্ট। রাত্রিকে যে রান্না করে নিলয়কে অফিসে পাঠিয়ে ছুটতে ছুটতে এই চড়া রোদে ঘেমে নেয়ে যেতে হয়েছে রাতুলকে আনতে। সেটা যেন কোন কষ্টই নয়। ঘামশিক্ত শরীরে ফিরে লোডশেডিং বা পানি নেই।

রাত্রির শ্বশুড় অবশ্য সরকারি অফিসে কাজ করেন, সেজন্য অফিস যাওয়ার অত তাড়া নেই। নিলয়ের মতো সেবরকারি নয়, চোখেমুখে গুঁজে ন’টার সময় ছুটতে হয় না।

খবরটা রাতুলের কাছে শুনেছিল, কোন গুরুত্ব দেয়নি, ভাল বুঝতেও পারেনি। শুনতে হল মীনার কাছ থেকেই।

মীনা বললো, সেকী রে শুনিসনি কান্ড!

রাত্রিই প্রশ্ন করেছিল, ‘পিংকুকে নিয়ে গেল, ও আবার কে?’

পিংকু ছেলেটাকে সবাই চেনে, যদিও তার মা’র সঙ্গে তেমন সৌহার্দ্য কোনদিন গড়ে ওঠেনি। বরং তারা একটু এড়িয়েই চলত। ছেলেটাকে চেনার কারণ শুধু দেখতে ফর্সা ফুটফুটে নয়, দারুণ ইনটেলিজেন্ট।

সেটা ওর চোখ আর টিকলো নাকেই স্পষ্ট। দোষের মধ্যে উচ্ছিংড়ের মত ছিটকে ছিটকে বেড়ায়, বড্ডা চঞ্চল। কিন্তু তার জন্য আবার ভালও লাগতো। ঐ যে ইনটেলিজেন্ট, হায়েস্ট মার্ক পায়। গুণ এমন জিনিস, দোষটাও ভালবাসা পেয়ে যায়।

কিন্তু ওর মা’কে ওদের একদম পছন্দ নয়। বয়স ওদের মতই, একটাই তো বাচ্চা, কত আর হবে। শরীরে আট আছে। ওদেরই কি নেই? কে যেন ঠাট্টা করে বলেছিল, ইয়াং মাদার্স ক্লাব। ওদের অবশ্য দু’দশজন আছে, যারা একটু বয়স্ক, কাঁধে কোমরে একটু ভারি, দ্বিতীয় কি তৃতীয় সন্তান, একটু দেরিতে, চাই না চাই না করে হঠাৎ দ্বিতীয় প্রহরে মত বদল, কিংবা নিতান্তই অ্যাকসিডেন্ট। একটু ঘোর সংসারী ধরনের।

কিন্তু পিংকুর মা? চালু মেয়ে। ঠোঁটের লিপস্টিক, নখের নেলপলিশ সব সময় ফিটফাট, মাঝে এক একদিন মনির টিপ্পনী। দেখেছিস রাত্রি, ভেতরের জাম পরেনি, কি বেহায়া। অর্থাৎ ব্্রা। ওটাই নাকি এখন নতুন হাওয়া। এক সময় পরাটাই ছিল দোষের। অসভ্যতা। আর এক সময় তো ছিল চাপা জামা। মেয়েদের ওসব থাকই যেন অপরাধ।

পিংকুর মা অবশ্য ওদের সঙ্গে বড় একটা বসত না, পায়চারি করতে করতে এর ওর সঙ্গে কথা বলত, তারপর কখন যে সরে পড়তো কেউ লক্ষ্যই করত না। ছুটি হয়ে গেছে পিংকুকে আটকে রাখত দারোয়ান, ওর মা ছুটতে ছুটতে এসে, মুখে দেরী হয়ে যাওয়ার জন্য আতঙ্ক, ছেলের হাত ধরে তবে মুখে নিশ্চিত হাসি। ব্যাগ থেকে চিরুনি বের করে চুল ঠিক করত।

মীনা আর রাত্রি চোখাচোখি করে ইঙ্গিতে হাসতো। আরো কেউ কেউ। বিল্লুর মা কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল- পাগল নাকি তোরা? তাও কি সম্ভব, এই কটকটে রোদের সময়!

ওর ধারণা এয়ারকন্ডিশনড পরিবেশ না হলে অ্যাফেয়ার হয় না। বিল্লুর মা মজার লোক। পাঁচ অক্ষরের নাম, ডাকতে গেলে জিভ এলোমেলো হয়ে যায়। তাই বিল্লু’র মা হয়ে গেছে ও।

ওদের অবাক হওয়া দেখে বলেছিল, কেন রে, বেশ তো লাগে, যখন দৌড়াতে দৌড়াতে এল, হাঁফাচ্ছে একেবারে কথকের থালি নাচ …. বলতে বলতে দুহাতের আঙ্গুল ডিমি ডিমি নাচিয়ে দিয়েছিল। ওরা হেসে লুটোপুটি।

বিল্লুর মা বলেছিল, পারলে আমিও পরতাম, মানে পরতাম না। আবার একচোট হাসিহুল্লোড়,. তারপর বিল্লুর মা- শালা যা একখানা বাড়ি না, ঝেটিয়ে বিদায় করে দেবে।

কখনো কখনো ‘শালা’ বলে ফেলে ও। রুচিতে বাধে ওদের। মেয়েদের মুখে ? ছিঃ। ওরা রেগে গেলে মনে মনে বলে বটে, কিন্তু মুখ ফুটে? তবে বিল্লুর মাতো মজার মানুষ, তাই ওরা গায়ে মাখে না, বলুক।

যাকে নিয়ে এত কথা সেই পিংকুর মা কেন আসেনি সেটাই চোখে পড়ল রাত্রির। পিংকুকে নিয়ে গেল ও আবার কে? রাত্রি প্রশ্ন করেছিল। ও তো অনেকদিন আড্ডা দিতে পায়নি যাদের কাজের লোক নেই, কিংবা সংসারে আরো পাঁচটা কাজ থাকে, আবার অনেকের বাবারাই পৌঁছে দিয়ে যায় বাচ্চাকে। মা এসে নিয়ে যায়। কেউ কেউ ধড়িবাজ, নানা বাহানা বানিয়ে সত্যি মিথ্যে গল্প শুনিয়ে শাশুড়ির ঘাড়ে সংসার দিয়ে আসে, আবার গর্ব করে বলেও। উপায়হীন ভালমানুষ শাশুড়িও আছে।

পিংকুর মা সেই দলের কিনা কে জানে।

বিল্লুর মা ও ব্যাপারে নট নড়নচড়ন। বলে, দ্যাখ মীনা, আমাকে শেখান না, অনেক দেখেছি। শালা শাশুড়ি কখনও ভাল হয় না। হতে পারে না। শাশুড়িরা ভাল বউ হতে পারে, ভাল মা হতে পারে, কিন্তু ভাল শাশুড়িত হওয়া ইমপসিবল।

মীনারা জানে ওটা ওর চাপা রাগ। হবে নাই বা কেন, ওর যৌবনকালটা হয়ত নষ্ট করে দিয়েছে। রাত্রি, মীনারাই কি কম ভুগছে। এখন একটু শান্তি পাওয়া যায় এই যা। কিংবা অভ্যাস হয়ে গেছে তাচ্ছিল্য করতে শিখে।

শাশুড়িদের দোষ দিয়ে কী হবে, ছাগল ছেলেগুলোর জন্যই তো মেয়েদের এই অবস্থা। সোমা, হ্যাঁ, সোমা বলেছিল, স্বামীগুলো ঠিক থাকলে সব ঠিক করা যায়… একটু থেমে বলেছিল, সব তো অপদার্থ।

অপদার্থ, শব্দটা কথার কথা নাকি কিছু বলতে চেয়েছিল সোমা, তা বুঝতে পারেনি ওরা। বিল্লুর মা কি বুঝল কে জনে, হেসে উঠে বললো – সেটাই তো বোঝে না শাশুড়িগুলো, জানলে আর এত হিংসে করত না।

– তা কেন, মুঠো থেকে ছেলে বেরিয়ে যাচ্ছে কে চায় বল। মীনা বোধহয় কথা ঘোরাবার জন্যই বলল। ‘অপদার্থ’ শব্দটাতে আর বেশি টানাটানি করা ওর পছন্দ হচ্ছিল না।

– যাই বল, মেয়েদেরও দোষ আছে, এই পিংকুর মা… পিংকুর মায়ের দিকে চোখ সবারই।

রাত্রি এতদিন আসতে পারেনি, ছুটির পর এসে তাড়াহুড়ো করে রাতুলকে নিয়ে যেত। মীনা কিংবা বিল্লুর মা’র সঙ্গে জমিয়ে গল্পও করা হয়নি। ও তাই বললো- পিংকুকে নিয়ে গেল, ও আবার কে?

মীনাই বললো সে কিরে, শুনিসনি কান্ড!

রাতুলকে পড়াতে বসিয়েছে, সন্ধ্যাবেলায়, তখন তো কাজের লোক নেই, এই আড্ডায় আসাও হয়নি। মীনার সঙ্গে যদিও বা দেখা হয়েছে, তাড়াহুড়োয় ওর হয়ত মনেও পড়েনি, তাই জানে না, রাতুল বলেছিল, মা, পিংকু খুব কাঁদছিল।

– কেনরে? রাত্রি ছেলেকেই জিজ্ঞেস করল

– ওর মা হাসপাতালে গেছে

একটু থেমে বলেছিল, ও স্কুল থেকে যেতে চাইছিল না, মা নিতে না এলে যাবে না।

রাত্রি ভেবেছিল, অসুখবিসুখ।

তা নয়।

মীনা বলল, ওটা পিংকুর খালা। রোজ আসে। তারপর হেসে বলল, যা ভেবেছিলাম তাই বোধহয়। হাসপাতালটা বাজে কথা, খালাটা বানিয়ে বানিয়ে বলেছে। পিংকুকে বোধহয় সে কথাই বুঝিয়েছে।

মা, আর আসে না তার খালা এসে পিংকুকে নিয়ে যায়, পৌঁছে দিয়ে যায় তার বাবা। এটাতো চোখে পড়ার মত ঘটনা। কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। সেই কৌতূহলের আশাপ্রদ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কেউ থেমে থাকতে পারে না। অপরের অন্দরমহল সম্পর্কে কৌতূহল ছাড়া অবসর বিনোদনের কি-বা আছে আমাদের।

মীনা বলল, এসব কথা কদিন আর চেপে রাখবে। একটু থেমে বলল, সোমাটা কী ধূর্ত জানিস না। খালাটা যখন বলছিল, ওর চোখমুখ দেখেই সেন্দহ হয় ওর। কি সাহস, ঠিকানাতো জানতো একদিন হোমটাস্ক জেনে আসবে বলে গিয়ে হাজির।

– তারপর? রাত্রির চোখে একই সঙ্গে কৌতুক আর আতঙ্ক। শুনতে আগ্রহ ঠিকই তবে ভয়ও। আমাদেরও কিছু একটা তো গোপন করার মত, লজ্জা পাবার মত কোন বাড়িতে নেই। এসব মেয়েরা ঠিকই খুঁজে বের করে নেবে। তিলকে তাল বানাবে।

মীনা হাসল, তারপর আর কী। খালাটা ছিল না। বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে দেখা। সেই বলেছে।

কী? কী বলেছে সে?

————————

মীনা গম্ভীর হল, এবার আর হাসল না- চলে গেছে, কোথায় কেউ জানে না। একটু থেমে বলল- কী অমানুষ ভাই, ঐ ফুটফুটে ছেলেটাকে ফেলে রেখে যেতে পারল! আত্মধিক্কারের কণ্ঠে, ‘মেয়েরা দেখছি সব পারে’।

রাত্রির চোখের সামনে পিংকুর চঞ্চল ফুটফুটে মুখটা ভেসে উঠল। বুকের ভেতর একটা মোচড়। কি ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিস রে, ক্লাশে হায়েস্ট মার্ক পেলে কী হবে কোথা তোকে এই বয়সেই সারা জীবনের জন্য ফেল করিয়ে দিল। রাত্রির ইচ্ছে হল ছুটে গিয়ে ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সান্তনা দেয়। কিন্তু…

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

মনের আধাঁর পেরিয়ে

জাকির আহমদ

৮ মে, ২০২০ , ১:৫০ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-শেষ পর্ব

শেষ পর্ব

মূল দ্বীপে পৌঁছে গেছে। একটা সুন্দর হুড খোলা ফোর হুইল জিপে পাহাড়িয়া পথ বেয়ে ওপরে উঠেছে তারা। জিপটা বেশ লম্বা। ড্রাইভারের পাশে বসেছে ক্যাপ্টেন। পেছনে একটা লম্বা সিটে একাই বসেছে মেয়েটি। বিপরীত দিকের সিটটিতে পাশাপাশি বসেছে লর্ড ও ছেলেটা। সবাই চুপ করে আছে।

সেই বিভীষিকাময় রাতের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছেলেটির। আল্লাহর অশেষ করুণায় আজো বেঁচে আছে সে। সেই মহান আল্লাহর ইশারায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। যাদের ভয়ে তারা পালিয়েছিল, তারাই আজ তাদের অতিথি করে নিয়ে যাচ্ছে। এই তো দুনিয়ার খেলা। এসব মানুষের সহজে বোধগম্য হয় না। এই দ্বীপের নাম ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড রাখা হয়েছে কেন, কে রেখেছে? এক সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করে নীরবতা ভাঙল মেয়েটি।

‘এ নাম আমিই রেখেছি। ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি আমার একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল। আমি বাগানে কাজ করতে ভালোবাসতাম। তাই এই দ্বীপের বাসিন্দাদের বলে দিয়েছিলাম, তারা যেন তাদের বাড়িতে ছোট হলেও একটা বাগান করে। তাই এ দ্বীপের প্রায় সব বাড়িতেই ফুলের বাগান আছে। সেই থেকে আমি এই দ্বীপের নাম রেখেছি ‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড’, বলেই আনমনা হয়ে গেল লর্ড।

‘ফুলের সঙ্গে মানুষের জীবনের চমৎকার সাদৃশ্য আছে। কলি থেকে ধীরে ধীরে ফুল ফোটে। সেই ফুল কিছু সময় সুন্দর হয়ে ফুটে থাকে। এক সময় ঝিমিয়ে যায়, ঝরে পড়ে যায়। আবার কোনো কোনো ফুল কলি অবস্থাতেই বোঁটা থেকে খুলে পড়ে যায়। আবার কোনো কোনো ফুল পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রস্ফুটিত হওয়ার পর ঝড়ো বাতাসে তার পাপড়িগুলো পড়ে যায়। ফুল বলতেই সুন্দর। তবে কতগুলো ফুল দেখতে সুন্দর, কিন্তু সুগন্ধ ছড়ায় না। সেসব ফুলকে মানুষ দূর থেকে উপভোগ করে কিন্তু নাকের কাছে নিয়ে আসে না। আর কিছু ফুল আছে, সুগন্ধ ছড়িয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে। মানুষ সেসব ফুলের সৌন্দর্যও উপভোগ করে সেই সঙ্গে নাকের কাছে এনে তার সুগন্ধ নিয়ে থাকে। এসব ফুলই সার্থক। ফুল কখনোই নিজের রূপ, সৌন্দর্য, সুগন্ধ নিজের উপকারে লাগাতে পারে না। সে সব বিলিয়ে দেয় সর্বসাধারণের জন্য। সত্যি, এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে খুবই খারাপ লাগছে।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল লর্ড। কেউ কিছু বলল না। একসময় পৌঁছে গেল বাংলোর সামনে। ঘড়িতে দুটো দশ বাজে।

বিকেলে দ্বীপটা ঘুরে দেখতে বেরোল, ক্যাপ্টেন তাদের ঘুরিয়ে আনবে। সে-ই গাড়ি ড্রাইভ করছে। তার পাশের সিটে বসেছে মেয়েটি। পেছনের সিটে ছেলেটি। দ্বীপের মার্কেট, আবাসিক এলাকা, বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রভৃতি ঘুরিয়ে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে তাদের নিয়ে এলো। সৈকতটা ছোট কিন্তু মনোরম। সৈকতে আরামে হেলান দিয়ে বসার জন্য কয়েকটা চেয়ার পাতা আছে আর তার ওপর আছে বিশাল ছাতা এখানকার পানি গাঢ় নীল, টলটলে পরিষ্কার। বিলল ঢেউগুলো তীরে এসে শান্তভাবে ভেঙে যায়, আবার ফিরে আসে।

সূর্যটা যেন পানির ওপর এসে পড়েছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে সূর্যের প্রতিচ্ছবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। সূর্যের প্রভাবে পশ্চিমাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। আকাশে নানা ধরনের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। একটু একটু ঠান্ডা লাগছে। দূর দিয়ে পাখির ঝাঁক উড়ে চলেছে। সবমিলে এক অপূর্ব পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। তিনজনেই কিছুক্ষণ সমুদ্রের হাঁটু পানিতে হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বিশ্রাম করছে। তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ছেলেটি ও মেয়েটির মাঝের চেয়ারে ক্যাপ্টেন বসেছে। সূর্যের অর্ধেকটা যেন পানির মধ্যে ডুবে গেছে। যেন একটা বিশাল আগুনের থালা হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। একসময় ডুবে গেল পুরোটাই। পশ্চিমাকাশ এখনো রক্তিম আছে। একটু পরেই নামাজে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি। ছেলেটি নামাজে দাঁড়াতেই উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন।

‘ম্যাডাম, আসুন আমরা গাড়িতে বসি, ততক্ষণে উনি আসুক’, বলে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল ক্যাপ্টেন।

মেয়েটিও পিছে পিছে এলো। বুঝতে পারছে না ক্যাপ্টেন কেন তাকে নিভৃতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। গাড়িটা পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড় করানো। দুজনই সামনে উঠে বসল। কেশে গলাটা পরিষ্কার করে মেয়েটির দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন। ‘ম্যাডাম, আমিও আমার ভাইয়ের সঙ্গে এখান থেকে চলে যাব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই দ্বীপে একটা স্কুল আছে। সেখানকার হেডমাস্টার খুব জ্ঞানী-গুণী লোক। চিন্তা করছি আমার বদলে তার হাতে এ দ্বীপের ভার তুলে দিতে বলব ভাইকে। আমার মনে হয়, এসব দায়িত্ব পালনে আমার চেয়ে তিনিই বেশি উপযুক্ত।

ভাইয়া আমাকে বলে দিয়েছে, তার রেখে যাওয়া সম্পদগুলো আমি যেন মানুষের বিশেষ করে মেয়েদের কল্যাণার্থে কাজে লাগাই। আমার মনে হয়, আমার চেয়ে তিনিই এ কাজের জন্য বেশি উপযুক্ত হবেন। এসব কাজের আনজাম তিনিই ভালো দিতে পারবেন। আমি আপনার প্রতি যথেষ্ট অন্যায় করেছি, কষ্ট দিয়েছি, আমাকে মাফ করবেন’, বলে কান্না ঢাকার জন্য অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ক্যাপ্টেনকে কথা শেষ করার সুযোগ দিয়েছিল মেয়েটি। ‘আপনি এভাবে বলছেন কেন?’ ক্যাপ্টেনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য মুখে যা এলো তাই তাড়াতাড়ি বলে ফেলল মেয়েটি।

‘আপনিও চলে যাবেন কেন, খুলে বলুন তো।’

‘শুধু আপনার জন্য’, সামনে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন।

‘আমার জন্য?’ কিছুটা হলেও অবাক হলো মেয়েটি। ক্যাপ্টেন যে তাকে পছন্দ করে তা সে আগেই জানে। কিন্তু সে যে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে এটা সে জানে না।

‘হ্যাঁ, আপনার জন্য। কারণ আমি আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমার সেই স্বপ্ন অর্থহীন। আমি জানি আপনি আমাকে ঘৃণা করেন। আপনি আমাকে কখনো পছন্দ করবেন না। আপনি চাইলে আমি আপনার জন্য পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় যেতে রাজি আছি, কিন্তু আমি জানি তা কখনো হবে না। এ দ্বীপে থাকলে আপনাকে আমার খুব মনে পড়বে, তাতে শুধু দুঃখই বাড়বে। তাই আমি আমার ভাইয়ে সঙ্গে চলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাই’, একনাগাড়ে দ্রুত কথাগুলো বলে থামল ক্যাপ্টেন। ‘সরি, বিয়ে করব না’, বলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল। পকেট থেকে রুমাল বের করল। মেয়েটিরও মন খারাপ হয়ে গেল। ‘আমি আপনার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছি, কিন্তু…’ বলে থেমে গেল মেয়েটি। ‘আপনি বলতে চান যে, কিন্তু আমি ওই ছেলেটিকে আমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি’, বলে নামাজরত ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। ‘ঠিক, বলিনি?’

ক্যাপ্টেনের অনুমান ক্ষমতা দেখে থ’ বনে গেল মেয়েটি। শুধু এতটুকু বলতে পারল ‘আপনি বুঝলেন কেমন করে?’ আর বলতে পারল না। লজ্জায় মুখ ঢাকল সে।

‘আমি সাইকোলজির ছাত্র ছিলাম’, বলল ক্যাপ্টেন। যেন এতেই সব ব্যাখ্যা আছে। কিছু বলতে যাবে মেয়েটি, হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ছেলেটি আসছে বলে।

ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে গেল ক্যাপ্টেন। সামনে দাঁড়াল ছেলেটি। ছেলেটির আগেই ক্যাপ্টেন মুখ খুলল।

‘শুনুন, আমি আপনার ওপর অনেক নির্মম অত্যাচার করেছি, আমাকে আপনি আপনার ছোট ভাই মনে করে ক্ষমা করে দেবেন’, হাত জোড় করল ক্যাপ্টেন।

‘আরে, কী করছেন?’ বলে ক্যাপ্টেনের জোড় করা হাত দুটো পৃথক করে দিল সে। দৃশ্য দেখে গাড়িতে বসেই কেঁদে ফেলল মেয়েটি। একটু পর তাদের ঘুরতে দেখে মুখ লুকাল মেয়েটি।

‘আমি কিছুই মনে করিনি, আপনি শান্ত হোন’, বলে ক্যাপ্টেনের কাঁধে হাত রাখল ছেলেটি। চোখ মুছল ক্যাপ্টেন। ছেলেটিও নিজের চোখ মুছল। এগোতে যাবে ছেলেটি, থামাল ক্যাপ্টেন।

‘এটা নিন’, জিপের চাবির রিং বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। সামনে শূন্যে দুহাত স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল ‘প্লিজ…’, হেসে চাবির রিংটা হাতে নিল ছেলেটি। হাসি ফুটে উঠল বাকি দুজনের মুখেও।

পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছে জিপ। খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে ছেলেটি। পাশের সিটে বসেছে মেয়েটি। পেছনের সিটে ক্যাপ্টেন। মৃদু-মন্দ হাওয়া বইছে। মেয়েটির চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। মনোরম পরিবেশের মধ্য দিয়ে ছুটছে গাড়ি। উইন্ডশিল্ডের মধ্য দিয়ে হেডলাইটের আলোয় উদ্ভাসিত রাস্তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটি।

‘আপনি খুব সুন্দর করে গাড়ি চালাতে পারেন, স্বীকার করতে আপত্তি নেই, আমিও এতটা পারি না’, পিছনে থেকে মৃদু হেসে বলল ক্যাপ্টেন।

‘যাহ!’ লজ্জা পেল ছেলেটি। এরপর আর কোনো কথা হলো না। পেছন থেকে ক্যাপ্টেন দেখছে, মেয়েটি কিছুক্ষণ পরপর ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটি একবারও তাকায়নি। ডাইনিং রুমে বিশাল টেবিলে খেতে বসেছে লর্ড, ক্যাপ্টেন, ছেলেটি ও মেয়েটি। খাবার পরিবেশন করছে একজন ওয়েটার।

‘আপনাদের আমেরিকা যাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছি’, খেতে খেতেই বলল লর্ড। কাল সাড়ে চারটায় জাহাজ নোঙ্গর তুলবে, আপনারা প্রস্তুত থাকবেন।’

‘আচ্ছা’ দুজনে একই সঙ্গে সাড়া দিল। খাওয়া শেষে টুকটাক গল্প করে সবাই উঠল।

‘দুজনের জন্য দুটো সুন্দর সাজানো-গোছানো কামরা দেয়া হয়েছে, বাথরুম বারান্দাতে আছে। যার যার কামরায় এসে ঢুকল দুজনে।

পরদিন সকালে গোসল করে সব গুছিয়ে প্রস্তুত হলে গেল দুজনে। তাদের দুজনকে লর্ড একটি করে সুন্দর চামড়ার ব্যাগ দিয়েছে। আর দিয়েছে ছেলেটির জন্য এক জোড়া শার্ট-প্যান্ট। মেয়েটিকে দিল একটি থ্রি-পিস। কাপড়গুলো অত্যন্ত দামি। আরো দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। গতকাল মূল দ্বীপে পৌঁছে ইঞ্জিনিয়ার তাদের কমপক্ষে কাপড়ের ব্যাগ দুটো নেয়ার জন্য খুব অনুরোধ করল।

‘আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না, ঠিক আছে আপনার কথা রাখছি’, ছেলেটি তার জন্য একজোড়া শার্ট-প্যান্ট বের করে নিয়েছে। মেয়েটিও তাই করেছে। তারপর আর কিছু বলেনি। বাকি মালপত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছে। সব চামড়ার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। আমেরিকায় ঢুকলেই প্রয়োজন হবে বলে কিছু ডলার দিয়েছে। বাকি সময়টা বাংলো ঘুরে, লর্ড কোয়ার্টার ও আশপাশটা ঘুরে কাটিয়ে দিল। তাদের সঙ্গে ছিল ক্যাপ্টেন।

লর্ডের রুচির তারিফ করতে হবে। সে বাংলোটাকে রাজপ্রাসাদতুল্য করে বানিয়েছে। নীচতলায় একটা মিউজিয়ামও গড়ে তুলেছে। সেখানে তার সব সংগ্রহের জিনিস সাজানো আছে। তার সংগ্রহের কতগুলো অনেক দামি জিনিস।

আজ দুপুরের আগেই খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য ঘুরে-ফিরে কেবল বিছানায় শুয়েছে। এই সময় বেড লকারের ওপর রাখা টেলিফোন সারা ঘরে মৃদু মিউজিকের আওয়াজ ছড়িয়ে দিল। রিসিভার কানে ঠেকাল ছেলেটি। ‘হ্যালো!’ ওপাশ থেকে ভেসে এলো, আমি অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, চিনতে পারছেন?’

‘পারছি, অবসরপ্রাপ্ত কেন?’

‘একটু জোক করলাম, মাফ করবেন। শুনুন আজ বিকেলে আপনাদের বিদায় বেলায় কিন্তু আমিও উপস্থিত থাকব।’

‘অবশ্যই।’

‘আপনাদের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, রাখি গুডলাক।’

‘মানে?’ লাইন কেটে যাওয়ায় জবাব মিলল না।

একইভাবে মেয়েটিকেও ফোন করল ইঞ্জিনিয়ার।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে প্রস্তুত হয়ে ব্যাগ হাতে ঠিক আড়াইটায় নীচে নেমে এলো ছেলেটি। নীচে তাদের জন্য চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে লর্ড ও ক্যাপ্টেন। তাদের দুজনের জন্যও দুটো চেয়ার আছে।

‘বসুন, উনি ততক্ষণ আসুক’, ছেলেটিকে বলল ক্যাপ্টেন। কিন্তু বসল না ছেলেটি। একটু দূরে চৌদ্দ-পনেরজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে এগোলো সে। সেখানে ছেলেটির পরিচিত অনেক মুখ আছে। প্রথমেই দাঁড়াল সেই দুজনের সামনে, যারা তাকে প্রথমদিন খুব কষ্ট দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিল।

‘আমাদের মাফ করবেন’, মাথা নীচু করে বলল দুজনই। ‘এসব বলে লজ্জা দেবেন না’, বলে তাদের মাথা উঁচু করে দিল। আর কিছু না বলে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরে গেল।

এবার দাঁড়াল তাদের সামনে যাদের বন্দী করে সে মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়েছিল। তাদের কেউ তাকে কিছু বলল না বা বলতে পারল না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এলো আরেকজনের সামনে। এ লোকটি প্রথম দিন তাকে রুটি খাইয়ে দিয়েছিল। তাকে নামাজের জন্য ডেকে দিয়েছিল।

‘তুমি, তুমি আমার ছেলের মতো’, লোকটি যে অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে তা বুঝতে কষ্ট হলো না ছেলেটির। তার চোখের কোণগুলো চিক চিক করছে।

‘হ্যাঁ’, সায় দিল ছেলেটি। আর কিছু বলতে পারল না লোকটি। হাত মেলাল আর সঙ্গে। কিন্তু লোকটি যেন তার হাতটা ছাড়তে চাচ্ছিল না। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতটা সরিয়ে নিল ছেলেটি। ডান হাতটা তার কাঁধে রাখল, কিছু বলতে পারল না। তার চোখেও পানি এসে গেল। কান্না লুকানোর জন্য ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল লোকটি।

আরো কয়েকজনের মুখ চেনে ছেলেটি। কিন্তু তারা এখানে উপস্থিত নেই। বাকি সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাথা নীচু করে ফিরে এলো সে।

ততক্ষণে মেয়েটি বেরিয়ে এসেছে। চেয়ারে বসেছিল। এতক্ষণ সবাই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে ফিরে আসতেই উঠে দাঁড়াল।

‘পৌনে তিনটা বাজে। সময় কম; রওনা হওয়া যাক, কি বলেন?’ দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে বলল লর্ড।

‘ঠিক আছে’, বলে সামনে এগোলো ছেলেটি। ‘দুটো গাড়ি কেন?’

‘সামনেরটায় আপনারা দুজন, পেছনেরটায় আমরা’, বলেই ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল ক্যাপ্টেন।

‘একটাতেই তো যাওয়া যেত’, এগিয়ে এসে বলল ছেলেটি।

‘কেন, কোনো অসুবিধা আছে? ওই যে উনি উঠে বসেছেন, আপনিও উঠুন।’ নরম গলায় বলে ক্যাপ্টেনের বামপাশে উঠে বসল লর্ড। অগত্যা ছেলেটি ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। পাশে বসে আছে মেয়েটি। গাড়ি এগোতে শুরু করতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর উদ্দেশে হাত নাড়ল, ছেলেটি, সেই সঙ্গে মেয়েটিও। তাদের গাড়িটা সামনে আছে। পেছনে আসছে আপনারটা। চুপচাপ সামনের দিকে গাড়ি চালাচ্ছে ছেলেটি। নীচে নামছে। ‘এদের ছেড়ে যেতে আমার খুব খারাপ লাগছে’, নীরবতা ভাঙল মেয়েটি।

‘আমারও’, সামনে তাকিয়েই জবাব দিল ছেলেটি।

দ্বীপের ছোট্ট শহরটার মধ্য দিয়ে দ্রুত ছুটছে গাড়ি দুটো। চারটার একটু পরই তারা বন্দরে পৌঁছে গেল। গাড়ি দুটো পার্ক করে নেমে পড়ল সবাই। পাশেই নোঙর করে আছে ছোট জাহাজটা।

কাঠের লম্বা সিঁড়ি দিয়ে জাহাজে উঠতে যাবে এমন সময় একটা গাড়ি হার্ড ব্রেক করে থেমে গেল। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে লাফিয়ে নামল ইঞ্জিনিয়ার।

ড্রাইভারকে ‘গুডলাক’ বলে তাদের উদ্দেশে হাত নেড়ে তাদের কাছে এলো। নীরবে চওড়া সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। সবার মনই ভারাক্রান্ত। জাহাজে উঠতেই একজন তাদের স্বাগত জানাল। লর্ডকে দেখে স্যালুট করল। পরিচয় করিয়ে দিল লর্ড ‘ইনি এই জাহাজের ক্যাপ্টেন, আর এনারা আমার সম্মানিত বিদায়ী অতিথি’, তাদের দেখিয়ে বলল।

তারা এসে দাঁড়াল জাহাজের ডেকে। ক্যাপ্টেনের হাতের প্যাকেটটা এ প্রথম দেখতে পেল। সময় কম, কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই শুরু করল লর্ড ‘আমি আগামী তিন দিনের মধ্যে যারা এই দ্বীপে বন্দী আছে তাদের নিজ নিজ দেশের তীরে নামিয়ে দেয়ার জন্য পাঠিয়ে দেব, হয়তো আগামী দশ-বারো দিনের মধ্যে তারা বাড়িতে ফিরতে পারবে। তাদের মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।’ থামল লর্ড। এরপর বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত আমার এজেন্টের সঙ্গে ও অন্যান্য চক্রের সঙ্গে দেনা-পাওনা মিটিয়ে বাকি কাজ শেষ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে আমি এ দ্বীপাঞ্চল ত্যাগ করব। আমার সঙ্গে নাকি এও যাবে।’ বলে ক্যাপ্টেনকে দেখাল লর্ড। তাহলে আমার একজন সঙ্গী বাড়বে, ভালোই হলো। সবাই মাথা নীচু করে কথা শুনছে। ‘সে প্রস্তাব করছে এ দ্বীপের স্কুলের হেডমাস্টারকে এ দ্বীপের দায়িত্বভার দিয়ে যেতে, আমি রাজি হয়েছি। কারণ লোকটি সৎ, নীতিবান ও জ্ঞানী। আমি এ দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই আমেরিকায় প্রবেশ করবেন। তাই আপনাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আপনারা কি রাখবেন?’ বলে ক্যাপ্টেন বাদে সবার মুখের দিকে তাকাল লর্ড। লর্ডকে থামতে দেখে সবাই মুখ তুলে তাকাল।

‘আপনারা হয়তো ভাবছেন, অনুরোধটা হয়তো কঠিন হবে আসলে তা না’, সবাইকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল লর্ড।

‘অনুরোধটা হলো, আপনারা ভালোভাবে আমেরিকায় পৌঁছে প্রথমে পাঁচ-সাত দিন আমাদের সম্পর্কে কাউকে কিছু জানাবেন না। কারণ তাতে বিভিন্ন দেশ তাদের কোস্টগার্ডদের সতর্ক করে দিলে আমরা হয়তো ধরা পড়ে যাব। ফলে আমাদের আর নতুন জীবন শুরু করা যাবে হবে না। বিশ্বাস করুন, আমরা আর কখনোই নিজেদের অপরাধের সঙ্গে জড়াব না’, যেন কেঁদে ফেলবে লর্ড।

‘ঠিক আছে, আমরা আপনার কথা রাখব’, মুখ ফসকে বলে ফেলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি তো এখানেই থাকছেন, আপনার তো কথা রাখার প্রশ্নই ওঠে না’, কথাটা ধরল মেয়েটি।

‘তাই তো! কিন্তু আপনারা কিছু বলছেন না, এদিকে লর্ডের অবস্থা দেখে মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।’ কাঁচুমাচু করে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘উহু। আপনি দুপুরে টেলিফোন করে বলেছিলেন যে, আপনি আমাদেরকে সারপ্রাইজ দেবেন, সেটা কী?’ বলল ছেলেটি।

‘তাহলে তো ওটাও মুখ ফসকে বলে ফেলেছি’, যেন কৈফিয়ত নিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘উহু। আমাকেও বলেছিলেন, দুবার মুখ ফসকাতেই পারে না’, বলল মেয়েটি।

‘আমার মনে হয় আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। তার কারণ আপনি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ আপনার দাঁড়ানোর কথা ওনাদের পাশে’, বলল ছেলেটি।

‘আমি তো দেখছি, আপনারাই আমাকে সারপ্রাইজ দিলেন’, এ কথায় সবাই হেসে উঠল।

হাসি থামিয়ে মেয়েটি বলল, ‘আপনি কেন আমাদের সঙ্গে যাবেন?’

‘পরে খুলে বলব’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। হাসিতে মুখ ভরে গেছে।

‘ঠিক আছে, আপনার অনুরোধ রাখার চেষ্টা করব’, বলল ছেলেটি। মেয়েটিও বলল।

‘আপনাদের ঋণ শোধ করার নয়, তাই বিনিময় নয়, ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আপনাদের বিদায়কালে যৎসামান্য উপহার দেয়া হবে প্লিজ গ্রহণ করে আমাদের ধন্য করুন’, বলল লর্ড।

ক্যাপ্টেন বাম হাতে কাগজের প্যাকেটটা রেখে ডান হাতে খুলে ফেলল কভারটা। প্যাকেটের ভেতর থেকে একটা বড় টকটকে লাল গোলাপ বের করল। সেটি ধরিয়ে দিল মেয়েটির হাতে। এরপর ছেলেটির, তারপর ইঞ্জিনিয়ারের হাতে একটা করে গোলাপ ফুল গুঁজে দিল।

‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের শেষ উপহার ফুল, আর অফুরন্ত ভালোবাসা’, বলল ক্যাপ্টেন।

‘আমাদের তিনজনের পক্ষ থেকেও’, বলল মেয়েটি। ‘আপনাদের দুজনকে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের সব বাসিন্দার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি’, বাকি দুজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

‘আপনাদেরও ধন্যবাদ’, বলল লর্ড।

ঘড়ির দিকে তাকাল ছেলেটি। চারটা পঁচিশ বাজে। হাত থেকে ঘড়িটা খুলে ফেলল। বাড়িয়ে ধরল ক্যাপ্টেনের দিকে। ‘এই যে আপনার ঘড়ি, নিন এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে ছেলেটির হাত থেকে নিল ঘড়িটা। আবার বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। ‘সেদিন আপনার মৃত্যুর কত সময় বাকি আছে তা দেখার জন্য দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ আপনাকে এটা আমার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দিচ্ছি, প্লিজ নিন’, নিয়ে নিল ছেলেটি। হাসি ফুটে উঠল সবার মুখে। হাতে পরে নিল ঘড়িটি। বিদায় নেয়ার সময় হয়ে এলো, হয়তো আপনাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না’, বলতে বলতে তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে নিল ক্যাপ্টেন ও লর্ড। ‘আপনারা সুখে থাকুন, শান্তিতে থাকুন, চলি গুডলাক’, বলেই আর দাঁড়াল না লর্ড। ঘুরে পা বাড়াল। তার পেছন পেছন ক্যাপ্টেন। আশপাশে তারা ছাড়া আর কেউ নেই।

একটু পর নোঙর তুলল জাহাজ। জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়াল তিনজন। নীচে দাঁড়িয়ে আছে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের লর্ড ও তার সহযোগী ক্যাপ্টেন। তাদের দেখে হাত নাড়ছে। তারাও প্রতিউত্তর দিচ্ছে। ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে জাহাজটি। পেছনে কারো কাশির আওয়াজ পেয়ে তিনজনই ঘুরে দাঁড়াল। দেখল এ জাহাজের ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি তিনজনই চোখ মুছল। ‘চলুন, আপনাদের থাকার ঘর দেখিয়ে দিই’, বলে হাঁটতে শুরু করল ক্যাপ্টেন তার পেছনে চলল তিনজন।

সেদিনই সন্ধ্যার পর জাহাজের ছাদে তাদের বিকেলের চা-নাশতা দেয়া হয়েছে। বিকেলটা তাদের নিজ নিজ ঘর গোছাতেই কেটে গেল। বড় একটা ছাতার নীচে একটা গোলটেবিল ঘিরে সবাই বসেছে। তাদের সামনে গরম স্যান্ডউইচ চলে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার একটা স্যান্ডউইচ কেবল হাতে নিয়েছে এমন সময় ক্যাপ্টেন এলো, তবে বসল না।

‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনাদের সঙ্গে অন্য সময় বসব, আপনারা ভালোভাবে খাবেন, কোনো সমস্যা হলেই আমাকে জানাবেন’, এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন। ‘আর আপনাদের সময় কাটানোর জন্য লর্ড কিছু বই দিয়েছে ইচ্ছে করলেই সেগুলো নিয়ে পড়তে পারেন, গুডবাই’, বলে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে দুষ্টুমি করে চোখ টিপে চলে গেল। তারা দুজনে যে বন্ধু মানুষ, তাই। বাকি দুজনও খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই যেন ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পরপর সাগর থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাসে কেঁপে উঠল। নীরবতা ভাঙল মেয়েটি। শেষ স্যান্ডউইচটা তুলে নিতে নিতে ইঞ্জিনিয়ারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এবার আপনার কাহিনি শুরু করুন।’

এক গ্লাস পানি শেষ করে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে শুরু করতে যাবে ইঞ্জিনিয়ার, এমন সময় কফি নিয়ে এলো ওয়েটার। কফিতে দুই চুমুক দিয়ে শুরু করল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমি আমেরিকান একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, তবে কোথাও চাকরি করি না।’ কফির কাপে আবার চুমুক দিল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমি একজন ফ্রিল্যান্স ক্রাইম রাইটার’, যেন বোমা ফাটাল ইঞ্জিনিয়ার। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, এসব পত্রিকায় মাঝেমধ্যেই আমার লেখা প্রকাশ পায়’, সহজে সাধারণভাবে বলে চলেছে লোকটি। ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের লর্ডের জাহাজে চাকরি নেয়ার পর থেকে পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশ পায়নি, তবে ফিরতে পারলে এক মাসের মধ্যে নারী পাচারের ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন লেখা শুরু করব। হয়তো সেগুলো নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশ পাবে’, কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখে কয়েক চুমুকেই শেষ করল। ‘প্রায় এক বছর আগে জানতে পারি আফ্রিকা থেকে অনেক নারী পাচার হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা ডিভোর্স হয়েছিল অনেক আগে, আমি একাই থাকতাম’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি বিয়ে করেননি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘না। যা-ই হোক তারপর চলে এসেছিলাম আফ্রিকায়, প্রায় এক মাস খোঁজখবর করে অনেক কিছু জানতে পারলাম। শেষে ঠিক করলাম এদের আস্তানার সবকিছু জানতে হবে, বলতে গেল একদিন ভাগ্যক্রমে সুযোগ পেয়েও গেলাম। যে জাহাজে করে আপনাদের প্রথম দ্বীপ থেকে মূল দ্বীপে আনা হয়েছিল, সে জাহাজটা দক্ষিণ আফ্রিকার এক তীরে ভেড়ে। খবর পাই, সে জাহাজের ফার্স্ট মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আসার পথে রাতে প্রচুর ড্রিংক করে জাহাজ থেকে পানিতে পড়ে মারা গেছে। এই সুযোগে আমি ছদ্ম পরিচয়ে জাহাজে চাকরি নিই।’

‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডে পৌঁছে থাকার জন্য লর্ড আমাকে ওই বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িটা দিয়েছিল। তারপর থেকে আমি সব খোঁজখবর নিতে থাকি। গত তিন মাস থেকে আমিও এদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কারণ পালালেই ওরা আমাকে ধাওয়া করত। আমার মুখ বন্ধ করে দিত। আজ আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে আমারো সৌভাগ্যের দ্বার খুলে গেছে’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘গতকাল এই দ্বীপে লর্ডের কাছ থেকে সব শোনার পর, মূল দ্বীপে ফিরে লর্ডকে সুকৌশল আরো যাচাই করি। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হই যে, লর্ড তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে না। তখন আমি লর্ডকে আমার পরিচয়ও দিয়ে দিই। প্রথমে আমার কথা শুনে তিনি অবাক হয়ে যান। আমি তাকে আপনাদের সঙ্গে আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার কথা বললে তিনি একবাক্যেই রাজি হয়ে যান এবং আমার সব বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দেন। তবে তিনি আমাকে এমনভাবে প্রতিবেদন লেখার অনুরোধ জানান যেন পরবর্তীতে দ্বীপ বাসিন্দাকে কোনো ঝামেলায় জড়াতে না হয়’, বলে থামল লোকটি।

মুখে হাসি ফুটে উঠল ইঞ্জিনিয়ারের। ‘গতকালই আপনাদের সারপ্রাইজ দেয়ার ব্যাপারটা লর্ড-ক্যাপ্টেনকে জানাই, কিন্তু আপনারাই আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছেন’, বলে হো হো করে হেসে উঠল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আর কিছু বলার নেই’, হাসি থামিয়ে বলল সে।

‘এখন ওঠা যায়’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। দীর্ঘক্ষণ পর সে মুখ খুলল।

‘প্লিজ, বসুন, আর কিছুক্ষণ গল্প করি’, মেয়েটির কণ্ঠে অনুরোধের ছোঁয়া আছে।

‘ঠিক আছে, আপনারা গল্প করুন’, বলে পা বাড়াল ছেলেটি। মন খারাপ হয়ে গেল মেয়েটির। উঠে পড়ল দুজনে।

নীচে নামছে তিনজনই। ছেলেটির পাশে আছে ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটি পেছনে আছে।

‘আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?’ হঠাৎ করেই ছেলেটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বলুন’, বলল ছেলেটি।

‘উম’, যেন জিজ্ঞেস করতে দ্বিধাবোধ করছে ফ্রিল্যান্স রাইটার। আপনি যে গার্ডদের কাছ থেকে রাইফেল নিয়েছিলেন, তো আপনি কি রাইফেল চালাতে জানেন?’

‘জি’, নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল।

‘কীভাবে জানলেন? আই মিন কোথায় শিখেছেন?’

‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যেন তারা সঙ্কটকালে দেশ বাঁচাতে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারে’, বলে থামল ছেলেটি। কী ভেবে, আপনি কি মনে করেছিলেন, আমি কোনো মুজাহিদ গ্রুপের সদস্য?’ প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘না’, অপ্রস্তুত হয়ে গেল রাইটার। ‘শুধু কৌতূহল মেটানোর জন্যই আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি।’

আর ওই ব্যাপারে কোনো কথা হলো না। দেখা হয়ে গেল জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে।

‘চলুন, জাহাজের কোথায় কী আছে তা আপনাদের ঘুরিয়ে দেখাই’, বলল ক্যাপ্টেন।

 

পরদিন কেবল সূর্য উঠেছে। সুন্দর এক সকাল। মেয়েটি জাহাজের রেলিংয়ের ধারে চেয়ারে বসে আছে। তার পাশের কামরাটা ছেলেটির। তার পরেরটা ইঞ্জিনিয়ারের। দুজনের কেউই এখনো বাইরে বের হয়নি।

ছেলেটি কে? তার পরিচয় কী? তার নাম, ঠিকানা এখনো তার পক্ষে জেনে নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কেন যেন ছেলেটির সামনে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত কথা বলতে তার মুখের কথা জড়িয়ে যায়। বেশ কয়েক দিন চেষ্টা করেও সে তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে পারেনি। ছেলেটিও তার সম্পর্কে কোনোদিন কিছু শুনতে চায়নি। যেন তার প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই। এ জন্যই হয়তো সে পারেনি।

বিমানবন্দরের ওই ঘটনার পর থেকে সে ছেলেটির সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করত। নিজে বাঁচার জন্য তার সঙ্গে অনেক দুর্ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাংলো থেকে পালিয়ে বের হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তার আগের ধারণা পাল্টে যেতে থাকে। সে অনেকভাবে খেয়াল করে দেখেছে, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তার দিকে ছেলেটি তাকায়নি, আর তাকালেও এক পলকের জন্য। সবসময় চোখ নীচের দিকে রেখেছিল। বিশেষ করে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড থেকে পালানোর সময় নৌকা উল্টে অন্য দ্বীপে ওঠার পর যেন এ ব্যাপারে সে আরো সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। আজ পর্যন্ত তার হাত পর্যন্ত সে স্পর্শ করেনি। অথচ সে অনেক যৌক্তিক সুযোগ পেয়েছিল। চতুর্থ দ্বীপে মোমের আগুনে হাত দেয়ার ঘটনাটাও সে অনুমান করে নিয়েছে। এসবের কারণেই কি সে তার প্রতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে? বাংলো থেকে পালানোর পর যখন ঢাল বেয়ে দুজনে গড়িয়ে পড়ার সময় যা ঘটেছিল তারপর থেকেই সে তাকে পছন্দ করতে শুরু করে। কিন্তু সে ছেলেটিকে এখনো তার হৃদয়ের কথা কোনোভাবেই জানাতে পারেনি। কেন পারেনি তা নিজেও ভালোভাবে জানে না। সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে ভাবনার রাজ্যে বিচরণ করতে শুরু করেছিল তা নিজেও বলতে পারবে না। কারো গলার আওয়াজে ভাবনায় বাধা পড়ল।

‘গুড মর্নিং। কেমন আছেন?’

তাকালো মেয়েটি। ঘর থেকে কেবল বের হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার। তাকেই উদ্দেশ করে বলছে। আশপাশে আর কেউ নেই।

‘গুড মর্নিং, ভালোই আছি। আপনি কেমন আছেন?’

‘ভালো’, হেসে জবাব দিল। পাশে এসে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। ঘরে ঢুকে আর একটা চেয়ার এনে তাকে বসতে দিল মেয়েটি।

‘এতদিন এক সঙ্গে থাকলাম, এখনো ছেলেটির নাম জানতে পারিনি’, কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই বলল মেয়েটি।

‘আমিও জানি না’, বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘প্লিজ, আপনি কি তার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি জেনে নিতে পারবেন?’ বলতে বলতে রক্তিম হয়ে উঠল তার মুখখানা, ব্যাকুল ভাবটা লুকাতে পারল না।

‘কেন, খুবই দরকার?’ হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার। আবার কিছু বলতে যাবে এমন সময় এলো ক্যাপ্টেন।

‘ব্রেকফাস্ট রেডি, যেতে হবে।’

সেদিনই বিকেলবেলা। জাহাজের ছাদে ছাতির নীচে আবার তাদের বিকেলের নাশতা দেয়া হয়েছে।

‘ম্যাডাম, আমেরিকায় পৌঁছতে পারলে আপনি যাবেন কোথায়?’ হঠাৎ করেই প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘নিউ ইয়র্কে।’

‘সেখানে কে আছে?’ প্রশ্নটা করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আমার বাবা-মা, বড় ভাই-ভাবি।’

‘আপনারা কি বাংলাদেশি’, আবার জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘জি।’

‘আমেরিকায় কত দিন থেকে আছেন?’ প্রশ্ন করেই চলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আমার ভাই আমার চেয়ে সাত বছরের বড়, আমার ভাইয়ের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখনই বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসেন। ওখানকার এক বড় ফার্মে চাকরি নেন। একপর্যায়ে আমরা আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়ে যাই। তারপর বাবা সেখানে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে বাবা-ভাই দুজনে ব্যবসা দেখাশোনা করছেন’, সংক্ষেপে খুলে বলল মেয়েটি।

‘এত প্রশ্ন করায় কিছু মনে নেবেন না, আসলে পত্রিকায় লেখার জন্যই এত প্রশ্ন করছি’, জানাল রাইটার।

‘ঠিক আছে, আপনি প্রশ্ন করুন’, আশ্বস্ত করল মেয়েটি।

‘আপনি বাংলাদেশে কেন গিয়েছিলেন?’

‘ছুটিতে, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে।’

‘ওহ হো, এখনো আপনার নামটাই…’ শেষ করতে পারল না ইঞ্জিনিয়ার।

‘এক্সকিউজ মি, আপনারা গল্প করুন, আমি উঠছি’ বলে আর দাঁড়াল না ছেলেটি। অবাক হয়ে বাকি দুজন চেয়ে থাকল তার গমনপথের দিকে।

পরদিন সন্ধ্যার অনেক পর বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় ভরে গেছে চারদিক। বাংলাদেশে থাকা মায়ের কথা ভাবছে সে।

মা কি জানে তার ছেলে এখনো বেঁচে আছে? আমেরিকায় বড় ভাই কি জানে তার ভাই তার কাছে ফিরছে? তার কাহিনি শুনে কি তাকে এত পরে ভর্তি করে নেবে। তা না হলে লেখাপড়ায় সে এক বছর পিছিয়ে যাবে।

কারো পদশব্দে ফিরে তাকাল ছেলেটি। মেয়েটি এদিকেই আসছে। ঘরে ঢুকে পড়ল ছেলেটি।

দুদিন পর সকাল বলে আমেরিকান উপকূল থেকে অনেক দূরে জাহাজ থেমে গেছে। আর এগোনো যাবে না। তিনজনই তৈরি। বোট নামানো হয়েছে পানিতে। বোটটা জাহাজের গায়ের সঙ্গেই লাগানো আছে। এ কদিন তাদের দেখতে দেখতেই চলে গেল। প্রতিদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করত। দুপুরের আগেই গোসল করত। তারপর লাঞ্চ করে ঘুমাত। বিকেল বেলা চা-নাশতা করত। রাতে ডিনার করত। রাতে ঘুম দিত। বাকি সময়টা বিভিন্ন কাজে কেটে যেত। ছেলেটা বেশিরভাগ সময় ঘরে থাকত। বইপত্র পড়ত। মেয়েটাও পড়ত। তবে কখনো কখনো বারান্দায় বসে থাকত। বিশেষ করে সকাল বেলা। এ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারের আগে থেকেই খাতির ছিল। দুজনে প্রায় গল্প-গুজবে মেতে থাকত। ইঞ্জিনিয়ার মাঝে মধ্যে মেয়েটিকেও সঙ্গ দিত।

তবে ছেলেটির সঙ্গে আর কোনো কথাবার্তা হয়নি। সেই সুযোগই সৃষ্টি হয়নি। যেন ছেলেটি হঠাৎ করেই তাদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

জাহাজ থেকে তিনজনই বোটে নামল। তাদের লাগেজ আগেই বোটে তোলা হয়েছে।

‘আপনাদের হয়তো তেমন আতিথেয়তা করতে পারিনি, মাফ করবেন’, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন।

‘যথেষ্ট করেছেন’, জবাব দিল ছেলেটি।

‘বন্ধু, হয়তো আর দেখা হবে না, বিদায়’, ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্দেশ করে বলল ক্যাপ্টেন। আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এ জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার।

‘বিদায়’, বলতে জাহাজের সঙ্গে বোটকে বেঁধে রাখা বাঁধনটা খুলে দিল ইঞ্জিনিয়ার। স্রোতের ধাক্কায় জাহাজ থেকে খানিকটা সরে গেল বোটটা।

বোটের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল ইঞ্জিনিয়ার। তারপর স্টিয়ারিং ধরে গিয়ার দিল। যেন প্রাণ ফিরে পেল বোট। এগোতে শুরু করল। সবার চোখ ভিজে গেছে। বোট থেকে তারা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে আর জাহাজ থেকে তার প্রতিউত্তর আসছে।

একটু পর জাহাজের লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এক সময় বিন্দুতে পরিণত হলো স্বয়ং জাহাজটাই।

বোটটা বেশ বড়। আর ইঞ্জিনটা বেশ শক্তিশালী। সাগরের বড় বড় ঢেউ কেটে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। লাগেজগুলোকে যতদূর সম্ভব আড়াল করে রাখা হয়েছে। যাতে সাগরের ছিটকে আসা পানিতে না ভেজে।

বোটের পেছনে স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে ইঞ্জিনিয়ার। বোট সামলাতে ব্যস্ত।

বোটের মাঝামাঝি বসে আছে মেয়েটি। আশপাশে তাকানো ছাড়া তার আর কিছু করার নেই। একবার তাকাল সামুুদ্রিক মাছে পূর্ণ পাত্রটার দিকে। তার পাশে আছে তিনটা ছিপ। এসবও তাদের বোটে তুলে দেয়া হয়েছে। বোটের একদম সামনে বসে আছে ছেলেটি। তাকিয়ে আছে সামনে খোলা সাগরের দিকে। দুপুর নাগাদ পূর্বপরিকল্পিত একটা ছোট্ট দ্বীপে নামল তারা। কিছু নারকেল গাছ ছাড়া এ দ্বীপে আর কিছুই নেই। আশপাশে কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ আছে।

জোহরের নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। এর মধ্যে বোট থেকে হটপট তিনটা দ্বীপের ছোট সৈকতে আনা হয়েছে। খাওয়া শেষ হলে বিশ্রাম নিতে বসল।

ইঞ্জিনিয়ার বোট চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একটা নারকেল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বিশ্রাম নিতে শুরু করল। ছেলেটি বসে আছে। তারও চোখ বন্ধ।

মেয়েটি যে কখন তার সামনে এসে বসেছে টেরই পায়নি সে। মেয়েটি খেতে খেতেই ঠিক করে রেখেছে, যেভাবেই হোক ছেলেটিকে বলতে হবে। সময় শেষ হয়ে আসছে।

‘আপনি ঘুমাচ্ছেন?’ দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল মেয়েটি।

কাছেই মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে চোখ খুলে তাকাল ছেলেটি। তার থেকে তিন-চার হাত সামনে বসে আছে মেয়েটি।

‘আপনাকে কিন্তু আমাদের নিউ ইয়র্কের বাসায় যেতে হবে’, এভাবেই শুরু করতে চাইল মেয়েটি।

‘কেন, আপনি একাইবা ওনাকে নিয়ে বাসায় পৌঁছতে পারবেন না?’ ইঙ্গিতে ইঞ্জিনিয়ারকে দেখাল ছেলেটি।

একটু ঘুরিয়ে জবাব দিল মেয়েটি। ‘আমি একাই যেতে পারব, তবে আপনাদের দুজনকেও আমাদের বাসায় যেতে হবে।’

কিছু না বলে মৃদু হাসল ছেলেটি।

এবার কী বলবে ভেবে পেল না মেয়েটি। হার্ট-বিট বেড়ে গেছে। বুক কাঁপছে। এমনকি শরীরটাও যেন থরথর করে কাঁপছে। আগেও এ ধরনের অবস্থা হওয়ায় বলতে পারেনি। এবার তাকে যে বলতেই হবে।

লাজ-লজ্জা সব ফেলে এবার সরাসরি বলার জন্য প্রস্তুত হলো মেয়েটি। অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রেখে ‘আপনি কি কাউকে মানে কোনো মেয়েকে পছন্দ করেন?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি নীচের দিকে তাকিয়ে। রাঙা হয়ে উঠেছে মুখ।

হতভম্ব হয়ে গেল ছেলেটি। মেয়েটি যে হঠাৎ এ ধরনের প্রশ্ন করবে তা কল্পনাও করেনি সে। সেই সঙ্গে সতর্কও হয়ে উঠল। কেটে গেল এক সেকেন্ড।

‘না’, সত্য কথাটাই বলল ছেলেটি। ‘হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?’

থমকে গেল মেয়েটি। ছেলেটি যে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করবে, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না সে।

‘না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম’, হঠাৎ মুখ দিয়ে বলে ফেলল মেয়েটি।

ঝট করে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি ‘চলুন, রওনা দেই, সময় কম’, এগোলো ইঞ্জিনিয়ারের দিকে।

ছেলেটিকে বসে পড়ার জন্য বলবে মেয়েটি। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। সূর্য অনেকটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। এগিয়ে চলেছে বোট। বোটে সবাই বসে আছে আগের মতোই। সবাই যেন বড় বেশি চুপচাপ আছে। দূরে একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। খুব ছোট।

চোখে দুরবিন লাগাল ইঞ্জিনিয়ার। ‘একটা আমেরিকায় কোস্টাল ডেস্ট্রয়ার, আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।’

‘আমাদের কাছে তো পাসপোর্ট, ভিসা নেই, এখন কী হবে?’ বলল মেয়েটি। দীর্ঘক্ষণ পর মুখ খুলল সে।

‘দেখা যাক, কী হয়’, জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার।

বোট এখন জাহাজটার দিকে ছুটছে। দুটো জলযান দ্রুত কাছাকাছি হচ্ছে। একসময় জাহাজ থেকে একটা স্পিডবোট তাদের দিকে রওনা দিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার বোটের ইঞ্জিন চালু রেখেই বোট থামিয়ে দিয়েছে।

স্পিডবোটটাও দূরেই ইঞ্জিন থামিয়ে ধীরে ধীরে তাদের পাশে এসে থামল। স্পিডবোটে একজন অফিসার, একজন ড্রাইভার ছাড়াও দুজন অস্ত্রধারী আছে। বোটে এসে উঠল অফিসার ‘আপনারা কে, কোথা থেকে আসছেন?’

স্টিয়ারিংয়ের পেছন থেকেই অফিসারকে বলল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমরা আমেরিকান, একটু বেরিয়েছিলাম।’

 

ইঞ্জিনিয়ারের কথা শুনতে শুনতে সবার মুখের দিকে একবার করে তাকাল অফিসার। ‘আপনারা তীর থেকে অনেক দূরে আছেনÑ সন্দেহজনক, আপনাদের পরিচয়পত্র?’ ভদ্রভাবেই বলল অফিসার।

‘এদিকে’, বলে ইঞ্জিনিয়ার তার পরিচয়পত্রটা বের করে ধরল।

পরিচয়পত্রটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাতে লাগল অফিসার। ধীরে ধীরে মুখের ভাব বদলে গেল। হাসি ফুটে উঠল মুখে, ‘আপনিই নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের সেই ফ্রিল্যান্স রাইটার? দেড় বছর আগে আপনার এক ক্রাইম রিপোর্ট রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল।’ পরিচয়পত্রটা ফেরত দিতে দিতে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল অফিসার।

‘জি’, শান্ত স্বরে জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনার প্রায় সব লেখাই পড়েছি’, জানাল অফিসার। ‘আপনাদের জাহাজে নিয়ে গিয়ে অহেতুক হয়রানি করতে চাই না, আপনারা চলে যান’, বলেই স্পিডবোটে ওঠার জন্য ঘুরল অফিসার।

‘শুনুন’, ডাকল ইঞ্জিনিয়ার। ‘যেতে যেতে একটু দূরেই চলে গিয়েছিলাম, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, তাই আমাদের যেন আর কোথাও না থামায় তার জন্য যদি…’

শেষ করতে দিল না অফিসার ‘ঠিক আছে, আমি সে ব্যবস্থা করব’, বলেই স্পিডবোটে লাফিয়ে নামল অফিসার। স্টার্ট দিল স্পিডবোট। ‘গুডবাই’, বলে চলে গেল তারা।

বিকেল হয়ে এসেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আকাশে নানা রঙের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। সবাই আগের মতোই নির্বাক হয়ে বসে আছে। অথচ প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলার আছে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। তারা এখন আমেরিকার ভূ-খণ্ডের নিকটবর্তী। আমেরিকায় পৌঁছার পর প্রথমেই ভাইয়াকে সংবাদ দিতে হবে ফোনের মাধ্যমে লসঅ্যাঞ্জেলেসে। তারপর কী কী করতে হতে তা ঠিক করে নিল। আর কয়েক ঘণ্টা পর সহযাত্রী দুজনের কাছ থেকে সে পৃথক হয়ে যাবে। ইঞ্জিনিয়ার তাদের জন্য যা করেছে তা সত্যিই অতুলনীয়। লোকটি চমৎকার। লোকটির সঙ্গে তার ভাব হয়ে গেছে। তাকে ছেড়ে যেতে তার খুবই খারাপ লাগবে।

আর মেয়েটি? মেয়েটির সঙ্গে সে দীর্ঘদিন ছিল। মেয়েটি অত্যন্ত ভালো ছিল। সে তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। মেয়েটিকে সে বোনের মতো দেখেছে। তার নিজের এক ছোট বোন ছিল। সে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। এ মেয়েটিকে সে কোনো দিন ভুলতে পারবে না, তা সম্ভব নয়।

বোটের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে মেয়েটি। তাকিয়ে আছে নীল আকাশের দিকে। শুরু করেও তাকে বলতে পারল না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন বলবে, নাহ, এখন পারবে না। দুজনকেই সে তাদের বাসায় নিয়ে যাবে। তারপর সুযোগ মতো বলবে ছেলেটিকে। সামনাসামনি বলতে না পারলেও নাম-ঠিকানা জেনে নিয়ে যোগাযোগ করবে।

একটা জিনিস কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। তা হলো ছেলেটির সঙ্গে সে অনেক দিন ছিল। অনেক কথাও বলেছে, অবশ্য প্রয়োজনীয়। তারপরও তাদের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে। ছেলেটিকে তার মনের কথা বলতে না পারার কি এটাই কারণ? শেষ পর্যন্ত তাকে জানাতে পারবে তো?

স্টিয়ারিং ধরে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে ইঞ্জিনিয়ার। পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে বোট। সামনে বসে থাকা দুজনের দিকেই একবার করে তাকাল। মেয়েটি খুবই সহজ, সরল, ভদ্র, মিশুক, তার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যই সে নিয়েছে। আর এখন পর্যন্ত ছেলেটির নামটি পর্যন্ত জানতে পারেনি। বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার। আসলে ছেলেটিই অদ্ভুত। সে কিছুতেই তার সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে পারেনি। ছেলেটি তো পরিবেশ সৃষ্টিরই সুযোগ দেয়নি। তারপরও তিন-চারবার তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আর সে কী করেছিলÑ উত্তর দেয়ার বদলে এমন প্রসঙ্গ তুলে তাকে তার প্রশ্নের কথা একটু পরে বেমালুম ভুলিয়ে দিয়েছিল। এরূপ তার আগে কখনো হয়নি। এখন সে বোট সামলানোতে ব্যস্ত। সে তো পালাচ্ছে না। নিউ ইয়র্কে পৌঁছে সব জেনে নেবে। তা না হলে… চিন্তায় ছেদ পড়ল। একটা বিশাল ঢেউ তেড়ে আসছে। শক্ত করে ধরল স্টিয়ারিং। অনেক আগেই সূর্য অস্ত গেছে। বোটেই নামাজ আদায় করে নিয়েছে ছেলেটি। রাত সাড়ে আটটা বাজে। চমৎকার জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারদিক; কিন্তু চাঁদের এই নির্মল স্নিগ্ধ আলো অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে দূরে নিউ ইয়র্ক মহানগরীর আলোকসজ্জার কাছে। তারপরও সেসব চাঁদের আলোর মতো নয়। আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাবে নিউ ইয়র্ক পোর্টে। বহির্নোঙ্গরে রাখা জাহাজগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের ক্ষুদে জলযান।

কিছুক্ষণ পর নোঙর করা বড় বড় জাহাজের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে জেটির গায়ে এসে ভিড়ল তাদের বোট। আশপাশে লোকে লোকারণ্য। বোটটা জেটির সঙ্গে বেঁধে রেখে লাগেজ নিয়ে নামল তিনজনে। ট্যাক্সিতে করে ছুটছে তিনজনে। ছেলেটি ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। ঠিক তার পেছনে বসেছে মেয়েটি। তার থেকে একহাত তফাতে জানালার ধারে বসেছে ইঞ্জিনিয়ার।

ইঞ্জিনিয়ার বলল, ‘ম্যাডাম, আমি সামনে নেমে পড়ব, আজ ওনাকে বাসায় নিয়ে যান, কাল সকালেই আমি আপনাদের বাসায় আসব।’

‘না, আপনাকেও যেতে হবে’, দৃঢ় কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে’, রাজি হলো ইঞ্জিনিয়ার।

কিছুক্ষণ নীরব রইল সবাই। গাড়ি ছুটে চলেছে ব্যস্ত সড়ক ধরে। ডানে-বাঁয়ে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। চারধারে আকাশচুম্বী ভবনগুলোর কারণে ভালোভাবে আকাশ চোখে পড়ছে না। চারদিকে নানা ধরনের বাতির আলোয় আলোকিত সামনে কোথাও টেলিফোন বুথের থামবেন’, ড্রাইভারকে বলল মেয়েটি।

‘কেন?’ প্রশ্ন করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বাবা-মা, ভাই-ভাবি ওরা আগের অ্যাপার্টমেন্টে আছে কি না জেনে নিই, তা নাহলে এক ঘণ্টা ছুটেও কোনো লাভ হবে না।’

‘আগের অ্যাপার্টমেন্টে না থাকলে?’ আবার প্রশ্ন করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘সে ক্ষেত্রে আমার দুই চাচা ও এক খালু এই নিউ ইয়র্কে থাকে, একই সঙ্গে সবাই অ্যাপার্টমেন্ট বদলাবে না, তাদের কাছে চলে যাব।’

‘আপনি যে সশরীরে ফিরেছেন এটা তাদের জানাবেন না, কৌশলে জেনে নেবেন, নিজে তাদের সামনে হাজির হয়ে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দেবেন’, হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার। কথাটা মনে ধরল মেয়েটির।

একটু পরই রাস্তার ধারে পার্কিং করল ড্রাইভার। প্রায় দুশো গজ দূরে বুথটা।

‘আপনি নামবেন না?’ ছেলেটিকে গাড়িতে বসে থাকতে দেখে নামতে নামতে বলল মেয়েটি।

‘আপনারা যান, তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন।’

ইঞ্জিনিয়ারও নামল, তাকেও এক জায়গায় ফোন করতে হবে। লোকের ভিড়ে হারিয়ে গেল দুজনই। ড্রাইভারও গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে এক ম্যাগাজিন শপের দিকে গেল।

ট্যাক্সিতে চড়ার পর থেকে ভাবনার ঝড় বয়ে গেছে ছেলেটির মাথায়। সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে। দ্রুত নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। দ্বীপে মেয়েটি তাকে কী বলতে চেয়েছে তা সে অনুমান করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এখনই তার সরে পড়া উচিত। তবে কি সে মেয়েটির প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছে, তার সঙ্গে আগে খারাপ ব্যবহার করার জন্য? না, তা নয়, তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ খারাপ ব্যবহার ক্যাপ্টেন করেছিল, তাকেও মাফ করে দিয়েছে। আর মেয়েটির প্রতি তার কোনো অভিযোগ ছিল না।

তার জন্য পরবর্তী সময়ে যা করেছে তা তো অতুলনীয়। মেয়েটির কাছে সে ঋণী, যা কখনো শোধ করার মতো নয়। তাহলে মেয়েটির হৃদয়ে আঘাত দিয়ে সে গোপনে সরে পড়বে কেন? কারণ… এমন সময় ট্যাক্সিতে মেয়েটি কথা বলে ওঠায় তার ভাবনায় বাধা পড়ল। গাড়ি থামার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাকে পালাতে হবে চোরের মতো। যদিও তা তার কাছে খুবই খারাপ লাগবে। অবশ্যই তাদের কাছ থেকে সে বিদায় নেবে। তবে অন্যভাবে বলবে কিন্তু সে শুনবে না।

খালি হাতে ফিরে এলো। দোকান খুঁজে পেতে দেরি হয়েছিল। প্রায় পনের মিনিট পর ছেলেটি এলো। তবে তার পকেটে আছে একটা কলম আর একটা হলুদ খাম তার ভেতর একটা ভাঁজ করা কাগজ। দোকানে বসে দ্রুত লিখেছে। সে কীভাবে সরে পড়বে তার পরিকল্পনাও করে ফেলেছে। গাড়ির কাছে এসে দেখল ড্রাইভারসহ তিনজনেই উদ্বিগ্ন হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বেশি অস্থির হয়ে পড়েছে মেয়েটি। তাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না ছেলেটি। ‘আপনার বাবা-মা কি আগের অ্যাপার্টমেন্টেই আছে?’

‘জানা হয়নি, ফোনটা নাকি আজই সন্ধ্যার পর বিকল হয়ে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি। অস্থিরতা এর মধ্যেই কেটে গেছে তার। প্ল্যান বদলে ফেলেছে ছেলেটি।

একটু পরই আবার গাড়ি থামল। এবারো পেছনের দুজন নেমে গেল। দূরে টেলিফোন বুথটার দিকে এগোলো তারা, তবে ড্রাইভার নামল না।

‘শুনুন’, ড্রাইভারকে বলল ছেলেটি। ইংরেজিতে। ঘুরে তাকাল ড্রাইভার, ‘আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, ক্ষুধা পেয়েছে, এখন নেমে খাওয়ার মতো সময় নেই।’ বলতে বলতে পকেটে হাত ঢুকাল ছেলেটি ‘আপনি দয়া করে, তিনটা ভালো স্যান্ডউইচ নিয়ে আসুন’, বলে ডলার ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিল। ‘গাড়িতে বসেই খাব, আর সেই সঙ্গে তিন বোতল সফট ড্রিংকস।’

একটু অবাক হলেও কিছু বলল না ড্রাইভার। নেমে গেল গাড়ি থেকে। কালবিলম্ব না করে নিজের ব্যাগটা নিয়ে ঝট করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ছেলেটি। তারও দুই মামা এই নিউ ইয়র্কে থাকে। আগে তাদের কাছে যাবে। ঠিক করেছে, আর আমেরিকায় পড়বে না, দেশে চলে যাবে। কিছুক্ষণ পরই ফিরে এলো দুজনে। এবারো বাকি দুজনের কাউকেই কাছে-পিঠে পাওয়া গেল না। দুই মিনিট পরই ফিরে এলো ড্রাইভার। হাতে ছোট একটা খাবারের প্যাকেট।

‘স্যার, পাঠিয়েছিল’, যেন কৈফিয়ত দিল সে।

‘প্যাকেটে কী?’ জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘তিনটা বার্গার, তিনটা সফট ড্রিংকস।’

ইঞ্জিনিয়ারও একটু অবাক হলো। মনে মনে ভাবল, ড্রাইভারকে বাদ রেখে খাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত হয়নি ছেলেটির। কিন্তু মেয়েটির এদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে চারদিকে তাকিয়ে ছেলেটিকে খুঁজছে।

প্যাকেট রাখার জন্য গাড়ির ভেতরের লাইট জ্বালাল ড্রাইভার। হঠাৎ পেছনের সিটে যেখানে মেয়েটি বসে ছিল, সেখানে হলুদ কী যেন পড়ে থাকতে দেখল। তুলে নিল।

‘একটা খাম’, বলে মেয়েটির দিকে সেটি এগিয়ে ধরল ড্রাইভার।

‘এটা আপনার সিটে পড়ে ছিল।’

রোবটের মতো হলুদ খামটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। অনুমানও করতে পারছে না। এর ভেতর কী আছে? এক ভাঁজ করা কাগজটা বের করে আনল। স্ট্রিট লাইটের উজ্জ্বল আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটি চিরকুট। ইংরেজিতে লেখা। রুদ্ধশ্বাসে পড়তে শুরু করল মেয়েটি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে বাকি দুজন।

‘আপনাদের কাছ থেকে চোরের মতো এভাবে পালানোর জন্য আমি লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। বিদায় বেলা আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আমাদের চরম বিপদে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য আমি তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আর আপনি বিপদের দিনগুলোতে আমার জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি চিরঋণী। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাদের ছোট করতে চাই না। আপনাদের সঙ্গে বিশেষ করে আপনার সঙ্গে যদি কোনোরকম অন্যায় করে থাকি, তবে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। আর এ অধমকে ভুলে গেলেই ভালো করবেন।’

চিরকুটটা পড়া শেষ হতেই কাঁপা হাতে তা এগিয়ে ধরল ইঞ্জিনিয়ারের দিকে। অনেক আগেই গাল বেয়ে অশ্রু ঝরা শুরু হয়েছিল। এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সারা দেহে যেন তার ঝড় শুরু হয়ে গেছে। নিজের পতন ঠেকানোর জন্য গাড়িতে হেলান দিল মেয়েটি। কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।

ইঞ্জিনিয়ার চিরকুটটা মেয়েটিকে নীরবে ফেরত দিল। সেও অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে গেছে। মাথাটা নীচু করে রেখেছে। সেও হয়তো চোখের পানি লুকাচ্ছে। ড্রাইভার এতটুকু বুঝে নিয়েছে যে, ছেলেটি তাদের দুজনকে ফেলে চলে গেছে। তাই তাকে তিনটা বার্গার আনতে বলেছে। সেও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

‘মনে হয় এতক্ষণে সে বেশি দূরে যায়নি, চারদিকে খুঁজে দেখা যায় না?’ নীরবতা ভাঙল কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়েটি। ভঙ্গিতে আকুলতা।

মাথা তুলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘এত লোকের ভিড়ে কোথায় খুঁজব, আর কোন দিকেইবা খুঁজব?’ বলে থামল। সেও চারদিকে তাকিয়ে খুঁজছে।

‘আর কোনোভাবে তার খোঁজ করা যায় না?’ মরিয়া হয়ে বলল মেয়েটি।

‘সে কোনো অপরাধী নয় যে পুলিশের সাহায্য নেব, তার কোনো ছবিও নেই যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেব, বড় কথা হলো এত দিনে নাম-ঠিকানা পর্যন্ত জানা হয়নি।’

এ বিশাল আমেরিকার কোন শহরে সে থাকবে, তাও জানি না যে একটা বা দুটো নির্দিষ্ট শহরে খুঁজব, তাকে আমারো দরকার। নাহ, তাকে আর খুঁজে পাওয়ার কোনো পথ নেই’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

‘আমি তাকে প্রথমদিকে ভুল বুঝেছি, তার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করেছি। সে যদি কমপক্ষে আমাকে তার কাছে যেসব দুর্ব্যবহারের জন্য মাফ চাওয়ার সুযোগ দিত, আসলেÑ আসলে আমি এখনো তাকে মানুষ হিসেবেই চিনতে পারিনি’, বলে থামল মেয়েটি।

‘আপনি শান্ত হোন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘তাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ হয়তো তাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাবেন না, অন্তত আমার তাই বিশ্বাস।’

‘আমিও জানি তাকে আর কখনোই খুঁজে পাব না, তারপরও তাকে আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না’, বলেই দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটি।

‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলুন রওনা হওয়া যাক’, কেশে বলল ড্রাইভার। মেয়েটিকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা চালাল। যেন ড্রাইভারের কথা মেয়েটির কানেই ঢোকেনি। ‘আমার এক কাজিন আমাকে ছোটবেলা থেকেই খুবই পছন্দ করত, অবশ্য আমিও তাকে কিছুটা পছন্দ করতাম, এবার বাংলাদেশে যাওয়ার আগে সে আমাকে প্রথম তার কথা জানায়, ফিরে এসে তাকে উত্তর দেয়ার কথা, হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

‘কিন্তু ছেলেটির সঙ্গে বাংলো থেকে পালানোর পর থেকে তার মাঝে আমি এমন কিছু আবিষ্কার করলাম, যা আগে কারো মাঝে খুঁজে পাইনি। তার চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা সবকিছুই ছিল ব্যতিক্রম, তাকে বারবার নতুন দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে হয়েছিল। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, অনেকভাবে চেষ্টা করেও তাকে আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারিনি।’ এর মধ্যে কান্না থেমে গেছে মেয়েটির। তবে মাঝেমধ্যে হিঁচকি উঠছে। একনাগাড়ে সে বলে চলেছে। ইঞ্জিনিয়ার আর ড্রাইভারও তার কথা আগ্রহ সহকারে শুনছে। আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ। তাদের তিনজনের সঙ্গে যেন তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।

‘আমি চেয়েছিলাম আপনাদের দুজনকে আমাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে আমার ভাবিকে দিয়ে তাকে আমার মনের কথা জানতাম। আমার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল, সে আমাকে পছন্দ করে, যদিও কোনো লক্ষণ কখনো তার মাঝে দেখিনি। এখন বুঝতে পারছি এসব আমার স্রেফ কল্পনা ছিল, ছিল দিবাস্বপ্ন।’ আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। দুহাতে মুখ ঢাকল দ্রুত। ইঞ্জিনিয়ার তাকে সামলে নেয়ার সুযোগ দিল। দুহাতে চোখ মুছে, ‘সে আমাকে ফেলে চলে গেছে, এতে তার কোনো দোষ নেই, আসলে দোষটা এবারো আমার যে, আমি তাকে জানাতে পারিনি। আসলে এমন কিছু সহজ কথা আছে, যা কাউকে জানানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, কখনোবা অসম্ভব হয়ে দেখা দেয়।’

 

গাড়ি ছুটে চলছে ব্যস্ত সড়ক ধরে। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে মেয়েটির। কতগুলো চুল মুখের ওপর এসে বিরক্ত করছে। কিন্তু সরানোর প্রয়োজন বোধ করল না সে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। তার চোখ এখন কেবল খুঁজে ফিরছে সেই সে যুবককে। যে কি না তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। অথচ তারই সেই যুবকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ার কথা। এখন তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে সে কেন আমিই ক্ষমাপ্রার্থী। আর হঠাৎই সে গেয়ে উঠল  ‘পুবাল হাওয়া পাও যদি বন্ধুর দেখা বইলো তুমি তারে/ আমার মনের কথা হয়নি বলা হয়নি বলা তারে…

 

-সমাপ্ত-

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে। আগামী শুক্রবার চোখ রাখুন মুগ্ধতা ডট কমে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - শেষ পর্ব

জাকির আহমদ

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে।

‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পেরে আর প্রশ্ন করল না তাকে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্য ডুবতে বসেছে। সারা দিন দুজনে ভালোই বিশ্রাম নিয়েছে। ফলে খুবই ভালো লাগছে তাদের। অন্ধকার হয়ে আসতেই সৈকতে চলে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল। এক সময় সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নৌকা নিয়ে এলো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, সহাস্যে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, হেসে জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে আছে ছেলেটি।

‘আপনাদের দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে। তবে দূরত্ব বেশি হয়েছে’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। হাসি মুখে লেগেই আছে। দুজনের কেউই কিছু বলল না। তবে আরো সরে গেল ছেলেটি। দেখেও আর কিছু বলল না ইঞ্জিনিয়ার। শুধু তার হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো।

‘তারপর, আজ সারাদিনে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯ 40

‘না’, দুজনেই উত্তর দিল।

‘আপনারা নতুন দ্বীপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত?’

‘জি’, ছেলেটি জবাব দিল।

‘তবে আসুন’, বলে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার।

লোকটির পেছনে পেছনে নৌকায় এসে উঠল দুজনে।

‘এগুলোতে কী?’ নৌকার পাটাতনে রাখা পোঁটলা-পুঁটলিগুলোর দিকে ইশারা করে বলল মেয়েটি।

‘সবই জানতে পারবেন, এগুলো পরে নিন, তাহলে ঠান্ডা লাগবে না’, বলে দুজনের দিকে দুটো জ্যাকেট এগিয়ে দিল।

‘আপনি এ অন্ধকারে দ্বীপে পৌঁছতে পারবেন তো?’ জ্যাকেটের চেন টেনে দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন আপনার সন্দেহ আছে?’ বৈঠা বাইছে ইঞ্জিনিয়ার।

‘না নেই।’

‘আপনারা ওই দ্বীপে পৌঁছলেন কেমন করে?’ জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

সংক্ষেপে সব বলল ছেলেটি। তবে তাদের মধ্যকার ঘটনাগুলো এড়িয়ে গেল। মেয়েটিও ধরিয়ে দিল না।

অবশেষে পৌঁছে গেল নতুন দ্বীপে। রাতের আঁধারেও বোঝা গেল, অত্যন্ত সুন্দর এই দ্বীপটা।

দ্বীপটা যে ছোট তা দেখেই বোঝা যায়। ছোট ছোট টিলা আছে অনেক। কতগুলো বিশাল পাথরের চাঁই আছে ছোট সৈকতে, যেন সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে। ঢেউয়ের পানিতে এগুলোর একাংশ ডুবে যাচ্ছে। কিছু গাছপালাও আছে এ দ্বীপে। কিন্তু কোনো কেবিন চোখে পড়ছে না। নৌকা থেকে মালপত্রগুলো সৈকতে নামিয়ে রেখে নৌকাটা ডাঙায় তুলে রাখল দুজনে। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে চারদিকে দেখছে।

এরপর প্রত্যেকে যতটুকু সম্ভব মালপত্র নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের পেছনে পেছনে চলল। টিলার পাথর কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে। সিঁড়িটা ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠেছে। হঠাৎ থেমে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। ডানে হাত তুলেÑ ‘ওইটা থেকে বালতির সাহায্যে পানি তুলবেন। কেবিনে দড়ি লাগানো বালতি আছে।’

‘এটা রাতেও কুয়ার মতো মনে হচ্ছে। ‘কুয়া নাকি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘না, ওটাকে বলা চলে পানির আধার’, ব্যাখ্যা করে বলছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘ওপরে বাংলার চাল এমনভাবে তৈরি করা যাতে সব বৃষ্টির পানি পাইপ দিয়ে এই ট্যাংকে এসে জমা হয়, সব সময় বৃষ্টি হয় না, তাই খুব হিসাব করে পানি খরচ করতে হবে। কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘কয়েক দিন আগেও এসেছিলাম।’ আর দাঁড়াল না। ওপরে উঠে এলো। এতক্ষণ কেবিনটা নজরে পড়ল। দুটো উঁচু টিলার ওপরে ছোট কেবিনটা কাঠের তৈরি। আসলে অন্ধকারে টিলার ওপর কেবিনটাকে একটা উঁচু টিলা বলেই মনে হয়েছিল। পকেট থেকে একটা মাস্টার কী বের করে দরজা খুলে ফেলল। চার ব্যাটারির টর্চ বাম হাতে।

‘আমি এর আগে এখানে তিন দিন একাকী থেকে গেছি’, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল লোকটি। ‘তবে সাধারণত এই দ্বীপে কেউ আসে না।’

ঘরে ঢুকল সবাই। কেবিনের ভেতরটা আরো সুন্দর। ঘরটির দরজা ওপর দিক দিয়ে। চারদিকে তাকাতে তাকাতে ‘এই দ্বীপে এ কেবিন কে বানিয়েছে, কেন বানিয়েছে?’ এক সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘তা তো বলতে পারব না, এর আগে এখানে দুইবার এসেছিলাম, একাই’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘লর্ডও বানিয়ে থাকতে পারে’, মেয়েটি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

দরজা দিয়ে ঢুকেই ডান দিকে জানালার ধারে একটা ডাবল খাট। অবশ্য বিছানা পাতা নেই। খাটের পেছনে আর একটা জানালার ধারে একটা টেবিল। তিন দিকে তিনটি সুন্দর চেয়ার। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের গায়ে একটা ওয়াল হ্যাঙ্গার টাঙানো। ঘরটিতে আসবাবপত্র বলতে এই। টর্চের আলোয় দেখলো সেগুলোতে ধুলো জমেছে। আবার বেরিয়ে এলো তিনজনে। এবারো তিনজনের কিছু মালপত্র নিয়ে এলো।

একটা বস্তার মুখ খুলে বড় একটা মোমের প্যাকেট বের করল ইঞ্জিনিয়ার। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে দুটোই মেয়েটির হাতে দিল। ‘মোম জ্বালিয়ে গোছানোর কাজ শুরু করে দিন। আর আমরা দুজনে বাকি মালপত্রগুলো নিয়ে আসি।’

‘নতুন জায়গায় একা থাকতে ভয় লাগবে’, মেয়েটি বলল।

‘ঠিক আছে, তাহলে আসুন’, হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

সব জিনিস আনা হয়েছে। পূর্ব দিকের দেয়ালে দুটো জানালা। পশ্চিমের মতো জানালার মধ্যে একটা দরজা। দরজা খুলে দিল ইঞ্জিনিয়ার।

বারান্দায় হাফ রেলিং দেয়া। অনেক ফুলের টবও আছে। তবে যত্নের অভাবে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তারপর দক্ষিণে উত্তরের দরজা বরাবর একটি দরজা দিয়ে বের হয়ে একটা সরু প্যাসেজ। প্যাসেজের দক্ষিণে কিচেন ও বাথরুম পাশাপাশি। কিচেনটা খুবই ছোট। চুলার সঙ্গে কিছু শুকনো খড়িও আছে। তাদের সব দেখল ইঞ্জিনিয়ার।

‘সেসব মালপত্র আনা হলো, তার মধ্যে এখানে আপনাদের থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব আছে, আমার মনে হয় আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আবার কয়েক দিন পরে আসব, ওহ হো আর একটা কথা বলা হয়নি, প্রয়োজন হতে পারে, তাই মালপত্রগুলোর মধ্যে দুটো লাইফ জ্যাকেটও আছে। সাবধানে থাকবেন, চলি’, বলে বেরিয়ে গেল লোকটি। পেছনে বেরিয়ে এলো দুজনে। নৌকার কাছে এসে দাঁড়াল তিনজন।

কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল, ‘এটা আপনার নিজের সঙ্গে রাখেন, প্রয়োজন হতে পারে’, এক মুহূর্ত থামল। চালাতে পারেন তো?’

দুজনই তার হাতে একটা ছোট কালো পিস্তল দেখতে পেল।

‘হ্যাঁ, পারি’, হাত বাড়ায়নি ছেলেটি।

‘হাতে নিন’, হাতটা আরো বাড়িয়ে ধরল ছেলেটির দিকে। একবার দ্বিধা করে ছেলেটি হাত বাড়িয়ে পিস্তলটা নিল।

নৌকাটা ঠেলে পানিতে নামানোর জন্য ঘুরল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি যদি মনে কিছু না নেন, তাহলে বলি’, জানাল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি আপনার জন্য আমাকে কিছু করতে দেবেন, এত ঋণ মাথায় বহন করার শক্তি নেই’, মাথা নীচু করে বলল ছেলেটি।

‘আমি যদি বলি, আপনাদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি আনন্দ পাচ্ছি, তবে কি আপনি আমার আনন্দে বাধা দেবেন?’ একটু ঘুরিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘না’, সংক্ষেপে জবাব দিল ছেলেটি।

‘তাহলে আজ চলি, হয়তো আবার দেখা হবে’, বলে এগোলো নৌকার দিকে। নৌকাটি পানিতে নামাতে ছেলেটিও সাহায্য করল।

‘গুড লাক’, বলে নৌকায় চড়ে বসল ইঞ্জিনিয়ার। এক সময় চলে গেল চোখের আড়ালে।

দুজনে ফিরে এলো কেবিনে। যে মোমটি জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল তার এক-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে। এখানে মোমই রাতের আলোকবর্তিকা। ক্যাপ্টেনের দেয়া ঘড়িটা এখনো ছেলেটির হাতে আছে। রাত প্রায় এগারটা বাজে। এশার নামাজ আদায় করে নিল ছেলেটি। অ্যারোসল বের করে সারা ঘর স্প্রে করল ছেলেটি। ততক্ষণে মেয়েটি তাদের আনা একটি বক্স থেকে তোশক, কাঁথা, চাদর, দুটো বালিশ বের করে বিছানা করে ফেলল। আজো তাদের জন্য খাবার তৈরি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। খেয়ে নিল দুজনে।

‘আজ রাতে ঘুমিয়ে শরীরটা সরস করে নেই, কাল দিনে সব গোছানো যাবে’, খাওয়া শেষে ছেলেটির কথা ভেবে প্রস্তাব দিল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে’, সায় দিল ছেলেটি।

দুজনের জন্য দুটো করে বালিশ ও দুটো কম্বল আছে। কম্বলটা মেঝেতে বিছাতে গেল ছেলেটি।

‘আরে আপনি তো বিছানায় শোবেন’, বাধা দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘আমি মেঝেতে শোব।’

‘না আমি শোব।’

‘না, আমি।’

‘ঠিক আছে, আজ আমি মেঝেতে শুই, কাল আপনি, পরশু আবার আমি, এভাবে চলবে’, প্রস্তাবটা দিল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘উম ঠিক আছে’, রাজি হলো মেয়েটি।

মেঝেতে কম্বলটা নিজের ভাগের বালিশটা নিয়ে খাটের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।

মেয়েটিও শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ ধরে অন্ধকার ছাদের দিকে চেয়ে আছে। নানা কথা ভাবছে, গত রাত থেকে টানা বিশ্রাম নেয়ায় তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। তাই চোখে ঘুম আসছে না।

দরজা-জানালা ভালোভাবে লাগানো আছে। তারপরও রাতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় তার একটু শীত করছে। ঘরটা অন্ধকার হওয়ায় তা হয়তো বেশি অনুভব হচ্ছে।

খেয়াল হলো ছেলেটি তার কম্বল মেঝেতে বিছিয়েছে, গায়ে দেয়নি। বালিশের নীচে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা রেখেছে। মোম ধরাল। তার কম্বলটা ছেলেটির গায়ে দিয়ে দিল। আর নিজে বিছানার চাদর তুলে গায়ে দিল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা বলতে পারবে না।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। উঠে দেখল তার গায়ে কম্বল, মেয়েটি বিছানার চাদর গায়ে দিয়ে জড়সড় হয়ে ঘুমিয়েছে। ফজরের নামাজ পরেও দেখল মেয়েটি ঘুমাচ্ছে। কম্বলটা তার গায়ে দিয়ে দিল।

মেয়েটি হয়তো মুসলমান, তাকে নামাজ পড়তে বলতে হবে।

বসে না থেকে কেবিন গোছানোর কাজে লেগে গেল। তার ঘড়িতে যখন পৌনে সাতটা বাজে, তখন ঘুম ভাঙল মেয়েটির।

উঠে দেখল ছেলেটি কাজ করছে। বাথরুম থেকে ফিরে হাত-মুখ মুছছে মেয়েটি।

‘আপনি রান্না করতে জানেন তো?’ কাপড়গুলো ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘জি, পারি।’ ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটে না তার।

‘তাহলে আপনি নাস্তা বানাতে যান, আর আমি ততক্ষণে গোছানোর কাজ শেষ করি’, বলল ছেলেটি।

‘আমি বেশি ঘুমিয়েছি, আমার জন্যও কিছু কাজ রাখুন’, যেন অনুরোধ করল ছেলেটিকে।

‘সে পরে দেখা যাবে’, বলে কাজে মনোযোগ দিল ছেলেটি।

আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল মেয়েটি। সেও কাজে লেগে গেল। যখন মেয়েটি নাশতা নিয়ে ঘরে ঢুকল তার কিছুক্ষণ আগে গোছানোর কাজ শেষ করে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এক নাগাড়ে দুই ঘণ্টা ধরে কাজ করায় হাঁপিয়ে উঠেছে। ‘আপনি তো সব কাজ শেষ করেছেন। এমনকি আমার বিছানাটাও গুছিয়ে রেখেছেন’, অনুযোগের সুর ফুটে উঠল মেয়েটির কণ্ঠে।

‘এ দ্বীপে আমাদের কতদিন থাকতে হবে, তার কোনো ঠিক নেই’, বলছে ছেলেটি।

‘এখানে আমাদের কাজ ভাগ করে নিয়ে করতে হবে, আপনি একাই বেশি কাজ করতে চাইলে আমি কী করব? সময় কাটানোর জন্য আমাকেও কাজ করতে হবে’, বলে থামল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘ঠিক আছে, তবে আমি কাজ বণ্টন করব’, বলল মেয়েটি।

‘না, আমি করব।’

‘ঠিক আছে আপনিই বলুন’, মুখ গোমড়া করে বলল মেয়েটি।

‘নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে তারপর বলি।’

গমের আটার রুটি, আলু ভাজি দিয়ে ভালোই খেল দুজনে।

ছেলেটি মেঝেতে বসে নাশতা করতে চাইলে মেয়েটিও মেঝেতেই বসে পড়েছে। খাওয়া শেষ হয়েছে।

কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করল ছেলেটি ‘প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ে আমি নিচ থেকে পানি নিয়ে আসব, আর…’

কথা শেষ করতে পারল না ছেলেটি ‘অত সকালে নীচে নামলে আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে’, বলল মেয়েটি।

‘লাগবে না।’ আগের কথা ধরল ছেলেটি। ‘বরং সকালে পানির পাত্র নিয়ে কয়েকবার ওঠানামা করলে ব্যায়াম হবে। এদিকে আপনি নাশতা তৈরি করবেন, নাশতা করে আমি বড়শি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাব, আপনি ঘর গোছাবেন এরপর আপনি দুপুরের রান্না শুরু করবেন, এরই মধ্যে আমি মাছ নিয়ে ফিরব। তারপর গোসল করে নামাজ পড়ে নেব, আমার পর আপনি গোসল করবেন, সেই ফাঁকে আমি খাওয়ার আয়োজন করে ফেলব। আর একটা কথা, আমরা নিজেরাই নিজেদের কাপড় ধোব।’ এক মুহূর্ত থেমে দম নিল ছেলেটি। ‘দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নেব, আসরের নামাজের পর আমি রাতের জন্য আবার মাছ ধরতে যাব, আর আপনি বারান্দায় বসে থাকতে পারেন, দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে পারেন অথবা টবগুলোর যত্ন নিতে পারেন, তা না হলে কোনো ফাঁকে আমিই নিব, মাগরিবের নামাজের পর আপনি রাতের জন্য রান্না করবেন, আর আমি…’ মাথা চুলকালো ছেলেটি। সে কী করবে ভেবে পেল না।

‘আপনি তখন বসে বিশ্রাম নেবেন, তারপর খেয়ে-দেয়ে ঘুম’, মেয়েটি শেষ করে দিল।

‘তুলনামূলকভাবে আপনি নিজের ভাগে বেশি কাজ নিয়েছেন, পানি আপনাকেও আপনি ব্যায়াম হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু আসলেই খুব পরিশ্রমের কাজ। আর অনেক সময় মাছ ধরতে বিরক্ত লাগে, আর আমার ভাগে শুধু রান্না করা, আর ঘর গোছানো’, যেন অভিযোগ করল মেয়েটি।

‘তিন বেলা রান্না করাও কঠিন। আর অনেক সময় বিরক্তিকর কাজও’, বলল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে হয়েছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। নিজে নিজের ঘাড়ে বেশি বোঝা চাপালে আমি কি করতে পারি?’ অভিমানের সুরে বলল মেয়েটি।

‘আজ দুপুর থেকে এ রুটিন কার্যকর হবে’, যেন ঘোষণা করল ছেলেটি।

‘আপনার কথা মানলাম, তবে আমারও একটি কথা আপনাকে মানতে হবে’, মেয়েটিও যেন ঘোষণা দিল।

‘কী কথা?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘অতগুলো মালপত্র কমপক্ষে দুজনে মিলে গোছাতে হতো, অথচ খুব সকাল থেকে আমাকে না জানিয়ে একাই সব গুছিয়েছেন, যেহেতু এখনো রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়নি, সেহেতু আমি এখন নিচ থেকে পানি আনব। আর আপনি মাছ ধরতে যেতে পারেন’, বলেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কী ভেবে বাধা দিল না ছেলেটি।

রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে বালিশ নিয়ে পড়ল ছেলেটি। কিচেন থেকে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ‘আরে আপনি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন’, উঠে বসল ছেলেটি। ‘যেদিন রাতে আমি বিছানায় থাকব, তার পরদিন দুপুরে বিছানায় বিশ্রাম নেব। একই কথা আপনার জন্যও প্রযোজ্য। বলে শুয়ে পড়ল আবার। অগত্যা মেয়েটি শুয়ে পড়ল বিছানায়।

তৃতীয় রাতে মেঝেতে শুয়েছে মেয়েটি। দুপুরে খেয়ে ভালোই ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে আছে ঘুম আসছে না। ভাবছে অনেক কিছু। মেয়েটি হয়তো এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। গায়ে বিছানার চাদর। গত রাতে ছেলেটিও চাদর গায়ে দিয়েই ঘুমিয়েছিল। মেয়েটি তাকে দ্বিতীয় কম্বলটা নেয়ার জন্য চাপাচাপি করেছে। সে নেয়নি।

কী মনে হতেই বালিশের তলা থেকে দিয়াশলাই বের করে মোম ধরাল।

মেঝেতে বসিয়ে দিল মোমটা। ঘরটায় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হলো। কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারবে না। তবে হঠাৎ মেয়েটির গলার আওয়াজ গেয়ে ঝট করে মোমের আগুনের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল।

ছেলেটির আগেই শুয়ে পড়েছে মেয়েটি। ঘুম আসছে না। বাবা-মা, ভাইয়ের কথা ভাবছে। কবে তাদের কাছে ফিরতে পারবে?

ঘরে আলো জ্বলে উঠল। এই তো একটু আগে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল ছেলেটি। একদম চুপ করে পড়ে আছে মেয়েটি। একটু পর প্রায় নিঃশ্বাসে পাশ ফিরল। খানিক পর মাথা তুলে দেখল ছেলেটি মোমের পেছনে বসে এক অদ্ভুত কাণ্ড করছে। ভালোভাবে দেখার জন্য চুপচাপ উঠে বসল বিছানায়। অনেকক্ষণ ধরে তার কাণ্ড দেখল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। ছেলেটি পাগল হয়ে যায়নি তো?

ছেলেটি প্রথমে তার ডান হাতটা মোমের আগুনের প্রায় একহাত ওপরে রাখছে। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা আগুনের ওপর নামিয়ে আনছে। আগুনের একদম কাছাকাছি হতেই ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিচ্ছে একটুক্ষণ হাতটাকে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তারপর আবারো একই কাজ করছে।

‘আপনি কী করছেন?’ অকস্মাৎ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘চমকে উঠে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল ছেলেটি। মেয়েটি যে তারই সামনে বিছানায় বসে দেখছিল, তা সে খেয়ালই করেনি। মহা অস্বস্তিতে পড়ে গেছে ছেলেটি।

‘কি, জবাব দিন’, আবার বলল মেয়েটি।

তবুও চুপ করে থাকল ছেলেটি।

‘কী করছিলেন?’ আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আপনি তো দেখছেন।’ কোনো মতে বলল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে মুখ খুলল ছেলেটি। জানে, চুপ করে থেকে কোনো লাভ নেই। সে প্রশ্ন করতেই থাকবে। শুনলে হয়তো পাগল ভাববে। ভাবুক তাতে আমার কিছু আসে-যায় না।

‘আমি পরীক্ষা করছিলাম দুনিয়ার আগুন কতক্ষণ সহ্য করা যায়, দেখলাম এক সেকেন্ডও সহ্য করা যায় না, অথচ দোজখের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে বহুগুণ তেজি, আল্লাহতাআলা মানুষের গুনাহর কারণে মানুষকে দোজখে দেবেন। সেই আগুন সহ্য করব কীভাবে?’ আর বলতে পারল না ছেলেটি, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

‘আপনি মুসলমান, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল ছেলেটি। ‘আপনি জানতেন না?’

‘আমেরিকায় জন্ম, সেখানেই বড় হয়েছি, এর আগে কখনো তেমনভাবে মুসলমানের সংস্পর্শে আসিনি, তবে এটুকু জানি যে, তারা আল্লাহয় বিশ্বাস করে।’

‘আপনি মুসলমান নন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘না, আর ধর্ম নিয়ে আমার অত মাথাব্যথাও নেই’, জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে রইল ছেলেটি।

‘হঠাৎ এ ধরনের খেয়াল হওয়ার কারণ কী?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘এমনি’, বলে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ছেলেটি।

ছেলেটি উত্তর দিতে চায় না বুঝতে পেরে আর জিজ্ঞেস করল না মেয়েটি। সেও শুয়ে পড়ল।

কেটে গেল আর দুদিন। সূর্য ডোবার প্রায় দুই ঘণ্টা পর এস হাজির হলো ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটি সে সময় কিচেনে রান্না করছিল। আর ছেলেটি বিছানায় চুপচাপ বসে ছিল।

দরজায় হঠাৎ ঠক ঠক আওয়াজে প্রথমে চমকে উঠল ছেলেটি। রাতে আবার কে এলো? ইঞ্জিনিয়ার নাকি ক্যাপ্টেন বাহিনী?

‘কে?’ দরজ খুলতে ইতস্তত করছে।

‘আমি’, ওপাশ থেকে সাড়া দিল।

গলা চিনতে কষ্ট হয়নি। খুলে দিল দরজা। চেয়ার এগিয়ে বসতে দিল।

‘ম্যাডাম কোথায়?’

‘কিচেনে।’

‘হ্যালো ম্যাডাম, এদিকে আসুন’, হাঁক ছাড়ল ইঞ্জিনিয়ার।

একটু পরে হাসি মুখে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। তার জন্য ইঞ্জিনিয়ার অবশ্য শার্ট-প্যান্টের বদলে জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করেছে। আজ সে গোলাপি রঙের একটা থ্রিপিস পরেছে। ডিজাইনটা আকর্ষণীয়।

‘এ কয়েক দিন কেমন কাটল?’ ছেলেটির উদ্দেশে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ভালোই।’

চেয়ার টেনে নিয়ে বসল মেয়েটি। ছেলেটি আছে বিছানায়।

‘আমি আপনাদের একটা সংবাদ দিতে এসেছি’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ‘সেটা হলো, কাল সকালে আমরা জাহাজে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছি। চৌদ্দ-পনের দিনের মধ্যে ফিরব, তাই আপনাদের জন্য আরো চাল, আটা, আলু, শুকনো খাসির গোশত, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি এনেছি। সেই সঙ্গে বিস্কুট, চানাচুর, চিনি, কফিও এনেছি; যাতে খাদ্য সঙ্কট না হয়। এগুলো নৌকায় আছে। ও ভালো কথা, এর মধ্যে কি কোনো কিছুর সঙ্কট হয়েছিল?’ বলে পালা করে দুজনের দিকেই তাকাল। মেয়েটি তাকালো ছেলেটির দিকে। সে মুখ নীচু করে চুপচাপ বসে আছে।

‘না।’ একবার দ্বিধা করে জবাব দিল মেয়েটি। তাদের আর একটা কম্বল ও সময় কাটানোর জন্য কিছু বইয়ের দরকার ছিল। কিন্তু লোকটিকে হয়রান করাতে ইচ্ছে হলো না।

‘সময় কম, আবার দ্বীপে ফিরে রাতে লম্বা ঘুম দিতে হবে’, লোকটির ইঙ্গিত বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে। আপনারা দুজনে থাকুন, আমি নৌকা থেকে ওগুলো নিয়ে আসছি’, বলে উঠে দরজার দিকে এগোতে গেল ছেলেটি।

‘থাকুন’, বলতে বলতে উঠে এগিয়ে এলো ইঞ্জিনিয়ার। ‘ম্যাডাম, আপনি থাকুন আমরা আসছি।’

প্রতিবাদ করল ছেলেটি। কিন্তু তার কথা শুনল না লোকটি।

তিনবারে সব নিয়ে এলো দুজনে। পথে ইঞ্জিনিয়ার জানতে চাওয়ায় এ কয়দিন তাদের কীভাবে কাটল, সংক্ষেপে জানালো ছেলেটি।

তিনবার বোঝা নিয়ে ওঠানামা করায় দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছে।

দুজনেই বিছানায় বিশ্রাম করছে। এমন সময় ট্রে হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। টি টেবিল নেই। অগত্যা চেয়ারে নাশতার ট্রে-টা নামিয়ে রাখল।

‘এসব করলেন কেন?’ মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এ আর কী কষ্ট, নিন, শুরু করুন’, বলল মেয়েটি।

‘আপনি আগে শুরু করুন’, মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

নাশতা শেষ হতেই কফি নিয়ে এলো মেয়েটি।

লোকটিকে বিদায় দিতে তার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের দিকে চলছে দুজনে।

‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কী আনতে যাচ্ছেন?’ এমনিতেই জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘মেয়ে মানুষ’, কোনো দ্বিধা না করেই বলল ইঞ্জিনিয়ার।

ঝট করে লোকটির দিকে তাকাল ছেলেটি। ‘তার মানে?’

‘এখানকার মহামতি লর্ড একজন আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম গডফাদার’, চমকে উঠল দুজনে। সৈকতের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে চলেছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘অন্য গডফাদারদের সঙ্গে এই গডফাদারের সুসম্পর্ক আছে। এই লর্ডের কিছু বিশ্বস্ত এজেন্ট আছে আফ্রিকা ছাড়াও আরো অনেক দরিদ্র দেশে। সেই এজেন্টের আবার কতগুলো চ্যালা এজেন্ট আছে, যারা এ লর্ডকে চেনে না। যা-ই হোক, আফ্রিকা মহাদেশে অনেক দরিদ্র দেশ আছে সেই বস দেশের মেয়েদের কৌশলে ধরে আফ্রকার বিভিন্ন সমুদ্র তীর থেকে ওই দ্বীপে…’ ইঙ্গিতে মূল দ্বীপ দেখাল। ‘পাঠানো হয়। এখানে মেয়েদের বন্দিশালায় রাখা হয়, তাদের ওপর অনেক সময় অত্যাচার করা হয়। তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দরিদ্র দেশ থেকে সংগৃহীত মেয়েরাও বিভিন্নভাবে এখানে পৌঁছেÑ এই হচ্ছে লর্ডের ব্যবসা।

‘অপরাধের আর কোনো দিক নেই তো লর্ডের?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। মেয়েটি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

‘না, নেই’, একটু থামল। ‘আমি লক্ষ্য করে দেখেছি লর্ড এমনিতে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো। কিন্তু কেন যেন তার নারী জাতির প্রতি একটা বিদ্বেষপূর্ণ ভাব আছে। এর কারণ আজো বুঝতে পারিনি’, থামল লোকটি। তারা কখন যে ডাঙায় তোলা নৌকার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।

‘অনেক রাত হলো’, বলে নৌকায় হাত লাগাল ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেটিও এগিয়ে এসে হাত লাগাল। মেয়েটি সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্র থেকে আসা ঢেউ পদযুগল ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

‘চলি গুডলাক’, বলে বৈঠা হাতে তুলে নিল ইঞ্জিনিয়ার।

দ্বীপে দশম রাতে বারান্দায় একটা চেয়ার এনে বসেছে ছেলেটি। আকাশে চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারিদিকে। মেঘ আর চাঁদের আলোয় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে আসছে। কিছুটা হলেও রাতের নীরবতাকে খান খান করে দিচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। সব মিলে অনিন্দ্য সুন্দর এক রাত। নীচে ট্রাউজার পরেছে। ওপরে জ্যাকেট চাপিয়েছে। গলায় মাফলার পেঁচিয়েছে। তারপরও একটু ঠান্ডা লাগছে। কিন্তু ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। নানা ধরনের ভাবনা যেন আজ রাতে তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে লর্ডের অপরাধ কাহিনি শোনার পর থেকে তার কোনো কিছুতেই ভালো লাগছে না। সে কি পারবে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে? যদিও পারে, তবে কীভাবে?

খাওয়া শেষ করেই চেয়ার নিয়ে বারান্দায় চলে এসেছিল অনেক্ষণ হলো। মেয়েটি এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে? তার পেছনের দরজা খোলা আছে। পিছনে ফিরলেই ঘরে আলো জ্বলছে কিনা দেখতে পাবে। তাকাল না। চেয়ারে বসে বারান্দার রেলিংয়ে দুহাত দিয়ে তার ওপর থুঁতনি রেখে সামনে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে।

কখন যে তার পাশে মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি ছেলেটি।

‘বারান্দার ঠান্ডায় বসে থেকে কী করছেন? ঘুমাবেন না? অনেক রাত হয়েছে’, ছেলেটির থেকে তিন হাত দূরে রেলিংয়ে ভর দিয়ে বলল মেয়েটি। খাওয়া শেষ করে প্লেট-গ্লাস-বাটি ধুয়ে রেখে ঘরে এসে ঢুকেছিল মেয়েটি। দরজা খোলা থাকায় বারান্দায় ছেলেটিকে বসে থাকতে দেখল। মোম জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়ল মেয়েটি। চোখে ঘুম আসছে না। ঘরে ফেরেনি ছেলেটি। বাইরে কুয়াশা পড়ছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ঠান্ডা লাগবে ছেলেটির। উঠে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বারান্দায়।

হঠাৎ পাশে মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল, সোজা হয়ে বলল ছেলেটি। ‘ও, আপনি এখনো ঘুমাননি?’

‘আপনিও তো ঘুমাননি’, বলল মেয়েটি।

‘তা ঠিক, চলুন ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলে উঠতে গেল ছেলেটি।

‘প্লিজ একটু বসুন’, গলায় স্পষ্ট অনুরোধ। বসে পড়ল ছেলেটি। যেন বাধ্য ছেলে।

‘আপনাকে একটা কথা বলব?’ ইতস্তত করে অবশেষে বলে ফেলল মেয়েটি।

‘বসুন’, একটু ভেবে বলল ছেলেটি।

‘বাংলা ভাষায় আপনি সম্বোধনে পরস্পরের মধ্যে একটা দূরত্ব বজায় থাকে। তুমি সম্বোধনে তা থাকে না’, বলে থামল মেয়েটি।

‘একটু পরিষ্কার করে বলুন’, সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকল ছেলেটি।

‘আমরা সম্বোধনে আপনি শব্দটি বাদ দিয়ে তুমি ব্যবহার করতে পারি না?’ বলে থামল মেয়েটি। মাথা নীচু করে রেখেছে।

‘কেন?’ অবাক হয়েছে ছেলেটি।

এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল ছেলেটি। দ্রুত কথা গুছিয়ে নিয়ে ‘আমার মনে হয় আমরা সমবয়সী বা দু-এক বছরের বড়-ছোট হতে পারি, এ ক্ষেত্রে আপনি…’ আর বলতে পারল না মেয়েটি, লজ্জায় কথা জড়িয়ে গেল।

কিছু একটা বলা দরকার। কিন্তু কী বলবে। একবার দ্বিধা করে ‘আমার মনে হয় আপনি সম্বোধনটাই ঠিক আছে।’ বলতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেটি। ছেলেটির জবাবে একটু বলেও আহত হয়েছে। মুখ দিয়ে আর কথা ফুটছে না তার।

‘অনেক রাত হয়েছে, চলুন শুয়ে পড়ি।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। বলার কিছু না পেয়ে মেয়েটিও ঘরে এসে ঢুকল। এরপর আরো পনের দিন কেটে গেল। এর মধ্যে তিন দিন ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে তাদের কাছে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। দুদিন আগে সন্ধ্যার পর। বেশিক্ষণ দেরি করেনি। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে গেছে।

প্রথমেই তাদের খোঁজখবর নিয়েছে। এবারো তাদের জন্য নানান কিছু নিয়ে এসেছিল। বলে গেছে তাদের আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করার সুযোগ খুঁজছে সে। আরো জানিয়েছে, এবার তারা পঁয়ত্রিশ জন নারীকে ধরে এনেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই কুমারী। তাদের বন্দিশালায় রাখা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের বিক্রি করে দেয়া হবে। এসব শুনে দুজনেরই মন খারাপ হয়েছিল। সকাল নয়টা পার হয়েছে। বড়শি হাতে সৈকতে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি। সাগরের পানি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠেছে। জোরে বাতাস বইছে। আকাশ ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়, সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাতের লক্ষণ। সূর্য অনেক আগেই অদৃশ্য হয়েছে আকাশ থেকে। আজ আর মাছ মারা হবে না। কেবিনের দিকে পা বাড়াল ছেলেটি।

মেয়েটি জানাল আজ মাছের বদলে গোশত, সেই সঙ্গে ডাল থাকবে। মেয়েটি কিচেনে রান্না করছে।

ছেলেটি ঘরের সব জানালা-দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। এই ঝড়ো বাতাসে টিলার মাথায় বসানো কেবিনটা টিকবে তো?

নাকি তাদের নিয়ে উড়ে যাবে? গত তিন দিনের চেয়ে আজকের অবস্থা শোচনীয়।

ঘরে মোম জ¦ালালেও নিভে যাচ্ছে। কোনদিক দিয়ে যেন বাতাস ঢুকছে।

অন্ধকারে ঘরে শুধু শুধু বসে থাকতে ভালো লাগছে না ছেলেটির। শার্ট খুলে শুধু প্যান্ট পরে বারান্দায় বের হয়ে এলো আল্লাহর কুদরত দেখার জন্য। বাতাসে আপনাআপনি দরজা লেগে গেল। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বারান্দায়। তা না হলে বাতাসে পড়ে যাবে। সাগর ফুঁসে উঠেছে। দ্বীপের অনেক ওপরে এসে একেকটা বিলাল ঢেউ ভাঙাচ্ছে। ঢেউগুলোর মাথায় দুধের মতো ফেনা। যেন এগুলো ঢেউয়ের মুকুট। বাতাসে যেন যে কোনো সময় তাদের কেবিনটা উড়ে যাবে। বিদ্যুৎ চমকানোর পরপরই বাজ পড়ার বিকট শব্দে যেন কানের পর্দা ফেটে যেতে চাচ্ছে। দিনের বেলাই যেন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকায় ভিজে গেল সে। তবুও ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে হলো না। দাঁড়িয়েই রইল।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর ঝলকানিতে একটু ডানে দূরে এক পলকের জন্য কী যেন দেখতে পেল ছেলেটি। পরক্ষণে আবার বিদ্যুৎ চমকালো। এবার এক সেকেন্ডের জন্য হলেও দেখতে পেল জিনিসটি। ছাউনি দেয়া একটা বড় বোট। নিশ্চয়ই ইঞ্জিনচালিত। তীর থেকে মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে আছে। তীরে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা চলছে কিন্তু কথা শুনছে না বোটটি। নিশ্চয়ই যাত্রীরা চরম বিপদে পড়েছে। সে কী তাদের জন্য কিছু করতে পারে? হাতল ধরে একটানে খুলে ফেলল দরজা। ঘরে ঢুকে দ্রুত হাতে একটা লাইফ জ্যাকেট পরে নিল। আর একটা হাতে নিল। মেয়েটি ঘরে নেই। তাই কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো না।

আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সৈকতে পৌঁছে গেল আধ মিনিটের মাথায়। বাতাস বার বার তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন সুচের মতো আঘাত হানছে শরীরে।

ছেলেটি বেরিয়ে যাওয়ারও একটু পরেই ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ছেলেটিকে দেখতে পেল না। তার বদলে মূল দরজা খোলা অবস্থায় পেল। তবে দরজার পাল্লা বন্ধই আছে। দরজা লাগিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে খোঁজ করেও ছেলেটিকে পেল না। এই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টিতে গেল কোথায় ছেলেটি? বারান্দায় নেই তো? বারান্দায় এসে দাঁড়াল। না এখানেও নেই। ফিরতে যাবে এমন সময় চোখ পড়ল সৈকতে। দেখতে পেল ছেলেটিকে। বাতাসে উড়ে আসা বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাচ্ছে মেয়েটি। সেদিকে তার খেয়াল নেই। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। তাকিয়ে থাকল সৈকতের দিকে। বড় বোটটা দেখতে পেয়েছে। এতদূর থেকে ডাকলে শুনতে পাবে না ছেলেটি। তারপরও ডাকল। কিন্তু শুনতে পেল না সে। ছোট্ট সৈকতটা দ্রুত পেরোচ্ছে ছেলেটি। তীরের খুবই কাছে এসে গেছে বোটটি। আর মাত্র বিশ-ত্রিশ গজ দূরে আছে। হঠাৎ করে বিশাল এক ঢেউয়ের ধাক্কায় অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে এলো বোটটি। একটা বিরাট বড় পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। সংঘর্ষের শব্দটা মেয়েটিও শুনতে পেল। দুমড়ে-মুচড়ে গেল বোটের অগ্রভাগ। ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে গেল। বোটে মাত্র দুজনকে দেখতে পেল ছেলেটি। বৃষ্টির কারণে চেহারা চিনতে পারল না। তার এ মুহূর্তে চেহারা চেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বোটটা দ্রুত ডুবে যাচ্ছে। লোক দুটো একে অপরকে চিৎকার করে কী যেন বলছে। বুঝতে পারছে না বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে। ছেলেটি লাফ দিল অশান্ত সাগরে। সাগরের দুষ্ট ঢেউ তাকে নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। একবার তাকে ঢেউয়ের মাথায় তুলছে পরক্ষণে অনেক নীচে নামিয়ে দিচ্ছে। কখনো তার ওপর দিয়ে যাচ্ছে বিশাল ঢেউ, তবে ডুবে যাচ্ছে না। অন্য লাইফ জ্যাকেটটা কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছে। নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি ঢুকে যাওয়ায় মুখের ভেতর যেন লবণে ভরে গেছে। সেই সঙ্গে হাঁচি পাচ্ছে।

প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটি। এই অবস্থায় তার সাগরে নামাটা উচিত হয়নি তা সে ভুলেই গেছে। বোটটা এর মধ্যে আবার দূরে সরে গেছে। বোটটা একবার সামনে এগোচ্ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ডুবে যাচ্ছে সেটি। একটু পরই সাগরের বুকে নিমজ্জিত হবে। বোটটার কাছে চলে এসেছে ছেলেটি। তাকে দেখতে পেয়ে দুজনই লাফ দিল সাগরে। এতক্ষণে তাদের চিনতে পেল ছেলেটি। একজন লর্ড, অপরজন ক্যাপ্টেন। এখন কী করবে ছেলেটি? যে উদ্দেশ্যে এসেছে তাই করবে নাকি তাদের ছেড়ে চলে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এখন অত ভাবার সময় নেই? এগিয়ে গেল তাদের দিকে। হাবুডুবু খাচ্ছে দুজনই। তাকে ওরা দেখতে পেয়েছে।

‘আপনি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘হ্যাঁ, আমি’, নির্দ্বিধায় জবাব দিল ছেলেটি।

দ্রুত কোমর থেকে অপর লাইফ জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। ‘কাকে দেব?’

লর্ড ইঙ্গিত করল ক্যাপ্টেনের দিকে। দিয়ে দিল ছেলেটি। অনেক কষ্টে পরে নিল। এখন লর্ডের ভাসতে কষ্ট হচ্ছে। ডাঙ্গা মাত্র পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে। এই দূরত্বই তাদের কাছে পঞ্চাশ-ষাট মাইল মনে হচ্ছে। ইশারায় কথা হলো তাদের। ডানদিকে ছেলেটি, বামদিকে ক্যাপ্টেন আর মাঝখানে লর্ড। লর্ডের গায়ে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। ঠিক হলো লর্ড তাদের মাঝখানে সাঁতার কাটবে। বড় কোনো ঢেউ এলে তারা লর্ডকে আঁকড়ে ধরবে। এভাবেই পাশাপাশি তিনজন এগোতে লাগল। মাঝেমধ্যেই তারা ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওপরে উঠছে আর নামছে। কখনো কখনো বিশাল ঢেউ তাদের ঢেকে দিচ্ছে। তার আগেই দুপাশ থেকে দুজন লর্ডকে আঁকড়ে ধরছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মেপে মেপে এগোচ্ছে তারা।

কোনো অবস্থাতেই তিনজন বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে একবার এগোচ্ছে আবার পিছিয়ে আসছে। সমুদ্রের অশান্ত পানিতে ঢেউয়ের কারণে ডাঙায় উঠতে পারছে না। ছেলেটির খেয়াল হলো দ্বীপের বেশ ওপরে পানি উঠেছে। দাঁড়িয়ে গেল। পায়ে মাটি ঠেকল। অন্য দুজনও তার দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। ডাঙায় উঠেই শুয়ে পড়ল তিনজনেই। কেউই কোনো কথা বলছে না। শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। প্রথমে ছেলেটিই উঠে দাঁড়াল। ‘চলুন, এবার কেবিনে যাওয়া যাক।’ নীরবে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তিনজনই। ছেলেটির মাথায় চিন্তার ঝড় বইছে। এরপর কী হবে? অবশ্য দুজনের কেউই এখনো পিস্তল বের করেনি। দরজার সামনে পৌঁছে গেল তারা।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে মেয়েটি সবই দেখল। ছেলেটির আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। দূর থেকে আগন্তুক দুজনকে চিনতে পারল না। তবে যখন ডাঙায় উঠে এলো তখন চিনতে পারল। ভয় পেয়ে গেল মেয়েটি। তাদের এখন কী হবে? দ্রুত ঘরে ঢুকে কাপড় পাল্টাল। কাপড় পাল্টাতে যেতে খেয়াল হলো পিস্তলের কথা। গুলি ভর্তি আছে। টেবিলের ওপর থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়ে তাদের আসার অপেক্ষা করতে লাগল।

দরজায় ঠক ঠক শব্দ হতেই মেয়েটি দরজা খুলে দিয়ে দ্রুত বাম পাশে সরে গেল। প্রথমে ঘরে ঢুকল ছেলেটি। তারপর বাকি দুজন।

‘মাথার ওপর হাত তুলে স্থির হয়ে যান, আমার হাতে পিস্তল আছে।’ ঝট করে লোক দুটোর পেছনে এসে তাদের দিকে পিস্তল তাক করে আঙুল ট্রিগারে রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

বিনা বাক্য ব্যয়ে হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল দুজন। ছেলেটি এর মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল। যাক মেয়েটি ভালোই করেছে। তাকে আর বলতে হলো না। দুজনকে সার্চ করে পাওয়া গেল দুটি পিস্তল। আর লর্ডের কাছে পাওয়া গেল অতিরিক্তভাবে একটি ওয়্যারলেস সেট।

পিস্তল দুটো নিজের দুই পকেটে ঢুকিয়ে রাখল ছেলেটি। আর ওয়্যারলেস সেটটি টেবিলে রেখে এসে মেয়েটির হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে নিল। দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি।

‘এবার আপনার হাত নামাতে পারেন, আশা করি আপনারা সুযোগ কাজে লাগাবেন না। আপনারা এখন থেকে আমাদের অতিথি।’ বলেই দুজনের দিক থেকে পিস্তল সরিয়ে নিল ছেলেটি।

হাত নামাল দুজনে। মেয়েটি কিছু বলল না।

ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝোলানো ইঞ্জিনিয়ারের তাকে দেয়া শার্ট-প্যান্ট, দুটো এনে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিল। ‘বাথরুম থেকে তাড়াতড়ি কাপড় বদলিয়ে আসুন।’

‘আপনি আগে যান, আপনার গায়ে এমনিতেই কিছু নেই’, এতক্ষণে মুখ খুলল লর্ড।

‘অতিথি আগে’, বলে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করল ছেলেটি। কথা না বাড়িয়ে চলে গেল দুজনেই।

‘আপনি এটা রাখুন, আর সাবধান থাকবেন। কী হবে কিছুই এখন বলা যাচ্ছে না।’ পিস্তলটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল ছেলেটি। নিজে লর্ডের ছোট পিস্তলটা কাছে রেখে অন্যটি কিচেনে রাখা চালের বস্তার মধ্যে লুকিয়ে রাখল।

কিছুক্ষণ পর কাপড় পাল্টে ফিরল দুজনেই।

‘আপনারা বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন, আমি কাপড় পাল্টে আসছি।’ বলেই কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে গেল ছেলেটি।

দুু’জনেই বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিছানায় শুয়ে পড়ল।

পাশে চেয়ার নিয়ে বসে রইল মেয়েটি। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ফিরে এলো।

অতিথিদের জন্য আবার রান্না করতে কিচেনে গেল মেয়েটি। ছেলেটি বসে পড়ল চেয়ারে। মাথায় চিন্তার বোঝা। সময় কেটে যাচ্ছে দ্রুত। দুপুর দেড়টা বাজে। এর মধ্যে ঝড় বৃষ্টির প্রকোপ একটু কমে গেছ, তবে থামেনি। উঠে পড়ল ছেলেটি। নামাজ পড়ে নিল। ততক্ষণে রান্নার কাজ শেষ হয়েছে। মেঝেতে বসে খাবারের আয়োজন করতে লাগল দুজনে।

বিছানায় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

‘উঠুন, দুটো বেজে গেছে, খেয়ে নিন’, ডাকল ছেলেটি।

ঘরে ফিরে দেখল দুজনই ঘর থেকে উধাও। তবে দরজা দিয়ে দেখা গেল, দুজনেই চেয়ার নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসে আছে। বাতাসের বেগ কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি আর বারান্দায় এসে পৌঁছাচ্ছে না। দুজনই নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন। তাদের বিরক্ত করতে চাচ্ছে না দুজন। ছেলেটি বসে পড়ল বিছানায়, মেয়েটি বসল চেয়ারে। দুজনের একই প্রশ্ন, ‘এরপর তাদের কী হবে?’ অবশ্য তারা খুব খারাপ অবস্থাতে নেই। কারণ, লর্ড ও ক্যাপ্টেন দুজনেই বলতে গেলে তাদের হাতের মুঠোয়। এ অবস্থায় ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করা যায়। এখন তাদের একটা নৌকা বড়ই প্রয়োজন ছিল। কাল দিনে কিছু একটা করতে হবে, আজ সময় নেই। তবে লর্ড ও ক্যাপ্টেনের চুপ করে থাকার বিষয়টা বুঝতে পারছে না।

সূর্যাস্তের অনেক পরে দুজনে ঘরে ফিরল। এর মধ্যে ছেলেটি তাদের দুজনকে দুটো সোয়েটার দিয়ে এসেছিল।

তারা দুজনে ঘরে ঢুকলে বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসল ছেলেটি।

‘আরে থাকুন না’, ছেলেটিকে বিছানা থেকে উঠতে দেখে লর্ড বলল।

‘ঠিক আছে, আমি চেয়ারেই বসছি’, বলল ছেলেটিকে। তর্ক না করে দুজনে বিছানায় বসল।

‘বলুন তো, আমাদের আপনি কীভাবে দেখতে পেলেন?’ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পর লর্ডই প্রথম নীরবতা ভাঙল। সংক্ষেপে খুলে বলল ছেলেটি।

‘আপনারা বুঝি ওই দ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিলেন?’ ইঙ্গিতে দ্বীপটার দিকে দেখাল ছেলেটি।

‘আপনি কীভাবে জানলেন ওই দ্বীপের কথা?’ কৌতূহল ফুটে উঠল স্বভাবগম্ভীর লর্ডের কণ্ঠে।

‘জেনে নিয়েছি।’

‘কার কাছে?’

‘বলা যাবে না।’

এমন মুহূর্ত চুপ করে থাকল লর্ড। ‘হ্যাঁ, ওই দ্বীপেই গিয়েছিলাম’, হেসে বলল।

‘যখন দেখলেন ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, তখন এত ঝুঁকি না নিয়ে ওখানে থাকলেই ভালো করতেন’, বলল মেয়েটি। এতক্ষণ পর মুখ খুলল সে। বসে আছে অন্য চেয়ারে।

‘আজ খুব সকালেই দুজনে বের হয়েছিলাম। তার আগে বলি, ‘ও আমার কাজিন’, ক্যাপ্টেনকে দেখিয়ে বলল লর্ড। ‘দুই ভাই যখন দ্বীপের কাছে এসে পৌঁছলাম তখন দেখি সাগর অশান্ত হতে শুরু করেছে, খুব জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে, আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মূল দ্বীপে ফেরার জন্য বোট ঘোরালাম, কাটা ঘায়ে নুন ছিটানোর মতোই মাঝপথে বোটের ইঞ্জিন থেমে গেল, ঠিক করে আবার স্টার্ট করতে সময় লেগে গেল। ততক্ষণে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। খুব দ্রুতই সাগরের পানি অশান্ত হয়েছে। তখন ঠিক করলাম এ দ্বীপে উঠব। কারণ মূল দ্বীপে ফেরার চেষ্টা করাটা বোকামি হয়ে যাবে। সাগর অশান্ত থাকায় সেই সঙ্গে তীব্র বাতাসের কারণে এই দ্বীপে নৌকা পৌঁছাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম’, থেমে আবার শুরু করল লর্ড। ‘যখন তীরের কাছে পৌঁছে গেছি, তখন আপনাকে সৈকতে দেখতে পাই, তারপর বিশাল এক ঢেউয়ের কবলে পড়ে একটা বড় পাথরে ধাক্কা লাগল বোটটি। অবশ্য এসব আপনি দেখেছেন’, ছেলেটিকে বলল লর্ড। ‘তারপর যখন দেখলাম, আপনি সমুদ্রে, আশার আলো দেখতে পেয়ে দিলাম লাফ, আপনি ছাড়া আজ আমরা বাঁচতেই পারতাম না, আপনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ’, বলল লর্ড। সংক্ষেপে সব খুলে বলল লর্ড।

‘আমি নই, আমার মাধ্যমে আল্লাহই আপনাদের বাঁচিয়েছেন’, বলল ছেলেটি। কিছু বলল না লর্ড।

‘আপনি যে বেঁচে আছেন, এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না’, এতক্ষণে মুখ খুলল ক্যাপ্টেন। যদিও বিধ্বংস গাড়িতে আপনার কোনো চিহ্ন পাইনি, আমরা ভেবে নিয়েছিলাম যে আপনি ভস্মীভূত হয়ে গেছেন, কারণ টাইম বোমাটা আপনার নীচেই ছিল। এরপর শুধু আপনাকে…’ মেয়েটিকে বলল ক্যাপ্টেন।

‘আপনাকে খোঁজা অব্যাহত ছিল, কিন্তু পাঁচ-সাত দিন পরও আপনার সন্ধান না পেয়ে আপনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম’, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিসের বিধ্বংসী গাড়ি, কিসের টাইম বোমা, একটু খুলে বলুন’, কৌতূহলী হয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন উনি আপনাকে কিছু বলেননি?’ কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলল ক্যাপ্টেন।

‘না তো!’

তিন জোড়া অদ্ভুত দৃষ্টি বিদ্ধ করে ফেলেছে ছেলেটিকে।

‘আপনি ওনাকে বলেননি কেন?’ বলে থামল। ‘এক্সকিউজ মি’, বলে উঠে গেল ছেলেটি।

বাথরুম থেকে অনেক দেরি করে ফিরল সে। ততক্ষণে ক্যাপ্টেন মেয়েটিকে সব খুলে বলেছে। সব শুনে কেমন যেন হয়ে গেল মেয়েটি। উঠে দাঁড়াল ‘রাতে কী খাবেন?’

এক মুহূর্ত ভেবে ‘রুটি, গোশত’, জবাব দিল লর্ড ‘যদি ঘরে থাকে’, যেন শর্ত লাগাল।

রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরল মেয়েটি। ঠিক এমন সময় ছেলেটি ঘরে ঢুকল। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিল ছেলেটি।

‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘রুটি বানাতে’, কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে। কিছু বলল না ছেলেটি। নামাজে দাঁড়িয়ে গেল সে।

এর মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে সাগর এখনো অশান্ত আছে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। দুই ভাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন শোয়ার পালা। অনেক চাপাচাপির পর দুই ভাই বিছানায় শুতে রাজি হলো। যখন দুজনের কেউ বিছানায় শুতে রাজি হচ্ছিল না তখন ছেলেটি কৌতুক করে বলল, ‘দেখুন আপনারা আমাদের হাতে বন্দী, আর আমরা যা বলব আপনাদের তাই করতে হবে।’ হেসে রাজি হয়ে গেল দুজনে। তবে ঠিক হলো তারা কম্বল গায়ে দেবে না। ছেলেটি একদিকে, মেয়েটি অন্যদিকে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। তারা দুজনই বালিশ ছাড়া শুয়ে পড়েছে, তা দুই ভাইয়ের কেউই খেয়াল করল না। মোম নিভিয়ে দিল ছেলেটি।

পরদিন কেবল সূর্য উঠি উঠি করছে। দুই অতিথি বারান্দায় চেয়ারে বসে ছিল। ছেলেটি পানি আনছে, ক্যাপ্টেন তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল কিন্তু ছেলেটি তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। অগত্যা সে তার বড় ভাইকে সঙ্গ দিচ্ছে। মেয়েটি কিচেনে নাশতা বানাচ্ছে।

নাশতা খেতে বসেছে সবাই। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হতেই উঠে দরজা খুলে দিল ছেলেটি। ঘরের ভেতর পা রাখল ইঞ্জিনিয়ার। ফিরে তাকাল দুজনই। দরজাতেই সে যেন বরফের মতো জমে গেল।

‘ও, বুঝেছি আপনিই তাহলে এদের দ্বীপে এনেছেন, এতসবের ব্যবস্থা করেছেন?’ বলল লর্ড হাসিমুখে।

‘ওভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভেতরে আসুন।’

আতঙ্কের মেঘ অনেকটা কেটে গেল ইঞ্জিনিয়ারের। ছেলেটির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে লর্ডের পাশের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ল সে।

‘কাল যা ঝড়-বৃষ্টি হলো, তাতে মনে হলো কেবিনটা বহাল তবিয়তে আছে তো, সন্ধ্যার পরপরই যখন একেবারে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন আসার জন্য বের হয়েও আসা হয়নি, কারণ তখনও সাগর অশান্ত ছিল। তাই আজ খুব ভোরেই বেরিয়ে পড়ি; কিন্তু লোকের চোখ এড়ানোর জন্য ঘুরপথে আসতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। যেন আসতে দেরি হওয়ায় কৈফিয়ত দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘নাশতা খেয়ে নিন’, বলল মেয়েটি। খাওয়ার সময় কোনো প্রকার কথা হলো না।

‘আপনারা এখানে কেন?’ খাওয়া শেষে এই প্রথম মুখ খুলল ইঞ্জিনিয়ার। সংক্ষেপে সব বলল ক্যাপ্টেন। কিছু বলতে যাবে ইঞ্জিনিয়ার এর আগেই ‘সত্য কথা বলতে কি, এরা আমার চোখ খুলে দিয়েছে’, হঠাৎ করে বলল লর্ড। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই।

‘তার মানে?’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বলছি বলছি, কাল থেকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এ ব্যাপারেই আলাপ করছি। এ দুজনের ওপর বিশেষ করে ওনার ওপর চরম নির্যাতন করা হয়েছে। যেন জাদুমন্ত্র বলে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। কেমন করে সে বেঁচে গেছে যদিও সে কাহিনি এখনো শোনা হয়নি। নৌকায় যেতে যেতে সে কাহিনি শুনব আমরা। বলছিলাম, এত কিছুর পরও এরা দুজন আমাদের বিপদে আপনজনের মতো বা তার চেয়েও ভালো ব্যবহার করেছে। ‘উনি’ ছেলেটাকে দেখাল লর্ড। ‘হয়তো অন্য মানুষ মনে করে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের দেখে ফেলে আসেনি। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল লর্ড। সবাই মাথা নীচু করে শুনছে। এ লোকটির অনুমান ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হলো ছেলেটি। এরা আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়েও নেয়নি। অথচ আমি আজ পনের বছর ধরে নারী জাতির ওপর প্রতিশোধ নিয়ে আসছি’, বলে থামল লর্ড। যেন কথা আটকে গেছে।

‘খুলে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আমি অনেক কিছুই জানি না।’

‘আজ থেকে পনের বছর আগেও আমি মানুষ ছিলাম’, দম নিয়ে শুরু করল লর্ড। ‘কিন্তু এখন আমি একজন অমানুষ, আমার বাবা একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।’ সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে লর্ডের অতীত কাহিনি। ‘বিশ বছর আগে ভালোবেসে একজনকে বিয়ে করি। সে আমার কাছে মাত্র তিন বছর ছিল। আমাদের একটি মেয়ে হয়েছিল। এর মধ্যে আমার বাবা মারা যাওয়ায় বাবার ব্যবসা দেখার জন্য প্রায় বাইরে থাকতে হতো। সেই ফাঁকে আমার স্ত্রী একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একদিন আমার অনুপস্থিতিতে সে পালিয়ে যায়। একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল, আমি যেন তাকে ভুলে যাই। সে সময় মেয়েটির বয়স ছিল ছয় মাস। মা ছাড়া মেয়েকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলাম। তার তিন মাস পর সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মেয়েটি মারা যায়। তাতে আমি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাই। একের পর এক আঘাতে আমি পাগলপ্রায়।’ লর্ডের গাল দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসছে। ‘এরপর থেকে নারী জাতির প্রতি আমার প্রবল ঘৃণা জন্মে ওঠে। একসময় অপরাধ জগতে পা দেই। তারপর জড়িয়ে পড়ি নারী পাচার ব্যবসায়। এ দ্বীপগুলো লিজ নেই ইংল্যান্ড সরকারের কাছ থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। কোনো অপরাধ দমন সংস্থাই আমাদের ঘাঁটতে সাহস পায় না। তবে মাঝেমধ্যে পত্র-পত্রিকাগুলো আমাদের নিয়ে অযথা নাক গলায়’, থামল লর্ড। ‘কিন্তু এতদিন পর কালই প্রথম বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। এতদিন বিবেক সুপ্ত অবস্থায় ছিল। গতকাল বুঝতে পারি, যে মেয়ে আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল, তার প্রতি তো প্রতিশোধ নেইনি। শুধু শুধু মায়ের বুক থেকে কন্যাকে, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে সরিয়ে তাদের ওপর চরম অন্যায় করেছি। আমি এর মধ্যে এসব থেকে মনে মনে বেরিয়ে এসেছি। আমি ঠিক করেছি এই ভাইটিকে হাতে…’ ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেনকে দেখাল। ‘দ্বীপের দায়িত্বভার তুলে দিয়ে চলে যাব, এমন কোনো জায়গায় যেখানে আমাকে কেউ চিনবে না। আবার নতুন করে জীবন শুরু করব। তবে একা, ও শুধু দ্বীপটার দেখাশোনা করবে। নারী পাচার বা অন্য কোনো অপরাধমূলক ব্যবসা করবে না। সে আমাকে এ ব্যাপারে শুধু কথা দেয়নি, শপথ করে বলেছে’, বলে থামল লর্ড। চোখের পানি মুছল। আমি পরিবেশটা ভারী করে ফেলেছি। দুঃখিত।’ মুখে হাসির ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল লর্ড।

‘না, না আমরাই তো শুনতে চেয়েছিলাম’, তাড়াতাড়ি বলে উঠল মেয়েটি।

‘কেন আপনিও এখানেই থেকে যান’, বলল ছেলেটি।

‘এই দ্বীপে আমি অপরাধ করেছি। এখানে আমি থাকতেই পারব না। এখানে থাকলেই আমি বিবেকের তাড়নায় পাগল হয়ে যাব। নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে আমার অপরাধ জীবন ভুলে থাকার চেষ্টা করব, আর কখনোই এখানে ফিরব না।’

‘আপনাকে কি এখানকার বাসিন্দারা যেতে দেবে?’ শেষ চেষ্টা করল ছেলেটি।

‘হয়তো যেতে দেবে না। কারণ এদের ওপর কখনোই অত্যাচার করিনি। তাছাড়া এখানে থাকার জন্য তাদের কোনো প্রকার কর দিতে হয় না। তবে হয়তো তাদের কাঁদিয়ে যেতে হবে, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

‘কোথায় যাবেন?’ হঠাৎ প্রশ্নটা করল মেয়েটি।

‘তা কাউকে জানাব না, পরিচিত সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাব।’

‘মানুষের চোখ এড়িয়ে কীভাবে যাবেন?’ আবার প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘এ নিয়েও ভেবেছি, আমি একটা ছোট জাহাজ নিয়ে একাই খোলা সাগরে বেরিয়ে পড়ব, কোন দিকে যাব এর মধ্যে ঠিক করে রেখেছি, তবে বলব না। ইঞ্জিনের জাহাজ একাই সামলানো কোনো সমস্যা না। খাবার-দাবার আগেই নিয়ে নেব, আর বাবার কিছু ব্যবসার টাকা এখনো আলাদাভাবে আছে, সেগুলো নেব। প্রথমে সাগরে ঘোরাঘুরি করে দেখব, কেউ আমার পিছু নিয়েছে কিনা। তারপর নির্দিষ্ট রুটে এগিয়ে যাব। উপকূল থেকে দূরে থাকতেই তলা ফুটো করে দিয়ে জাহাজ ডুবিয়ে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় তীরের দিকে যাব। তীরে পৌঁছে নৌকাটিও ডুবিয়ে ফেলব। কোস্টগার্ডদের ফাঁকি দেয়া আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না, তারপর ঢুকে পড়ব কোনো ভূ-খণ্ডে। ফলে কেউ আমার অবস্থান জানতে পারবে না’, বলে থামল লর্ড। সবার দিকে তাকিয়ে হাসল।

‘আর আমাদের কী হবে?’ প্রশ্নটা করল ছেলেটি।

‘তার আগেই আপনাদের কাক্সিক্ষত দেশে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেব।’

‘আমরা কালই রওনা হতে চাই’, বলল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে, তাই হবে’, তাদের আশ্বস্ত করল লর্ড।

ওয়াটার প্রুফ, গোল্ডেন কালারের ঘড়িটার দিকে তাকালো লর্ড। সাড়ে এগারটা বাজে। দ্বীপে পৌঁছা দরকার।

‘আপনার নৌকাটা ছোট’, ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্দেশ করে বলল লর্ড।

‘একজনের জায়গা হবে, তাছাড়া ওনাদের অবশিষ্ট মালপত্রগুলোও নিয়ে যেতে হবে’, বলতে বলতে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে ওয়্যারলেস সেটটা তুলে নিয়ে একট বড় বোট পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে ফিরে এলো লর্ড।

‘ইঞ্জিনচালিত বোট আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে, সব গুছিয়ে নেয়া দরকার।’

সবাই মিলে গুছিয়ে নিল। সব নিয়ে নীচে নেমে এলো। বোট পৌঁছে গেছে। নীচে নামতে নামতে ‘হিরো সাহেব, নৌকায় যেতে যেতে আপনার টাইম বোমা থেকে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি বলতে হবে’, ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ক্যাপ্টেন।

‘ঠিক আছে’, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো ছেলেটি।

সবাই বোটে উঠে পড়েছে ইঞ্জিনিয়ারের ছোট নৌকাটাকে বেঁধে নেয়া হলো বড় নৌকার সঙ্গে। পানি কেটে এগোতে শুরু করেছে জলযান।

এই দ্বীপটা ছেড়ে যেতে তাদের দুজনের বড় কষ্ট হচ্ছে। এই দ্বীপে তারা কোনো বিপদে পড়েনি। মায়া জন্মে গিয়েছিল দ্বীপটার প্রতি। হয়তো আর কোনো দিন এখানে আসা হবে না। মেয়েটি হাত নাড়তে লাগল দ্বীপটির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এর কোনো প্রতিউত্তর এলো না।

‘শুরু করুন আপনার কাহিনি’, ছেলেটিকে বলল ক্যাপ্টেন। কাহিনি শোনায় মগ্ন হয়ে গেল মেয়েটি।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

২৪ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

(পর্ব-৮)

‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে মুখ না খোল, তাহলে তোমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হবে।’

ছেলেটি যতই শুনছে ততই ঘামছে।

‘টাইম বোমাটি তোমার সিটের ঠিক নীচেই থাকবে’, বলে থামল। টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেল। যেন ছেলেটির চেয়ে সেই বেশি বিপদে পড়েছে।

‘তবে এত কিছুর পরও বাঁচতে পারবে, যদি পাহাড়ি পথে নীচের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারো। ওখানে আমার দুজন লোক থাকবে, তারা টাইম বোমাকে অচল করে দেবে। তাহলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে। তা হলো, নিজের প্রাণটাও বেঁচে যাবে, মুখও খুলতে হবে না। এটাই হলো এই খেলার প্রধান আকর্ষণ। আকর্ষণটা কি বুঝতে পেরেছো?’ এক মুহূর্ত থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার শুরু করল।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮ 41

‘ঠিক আছে খুলেই বলি।’ যেন এসব বলে দারুণ মজা পাচ্ছে ক্যাপ্টেন। ভাব দেখে তাই মনে হয়।

‘তা হলো সন্ধ্যার পর পাহাড়িয়া পথ এমনিতেই অন্ধকার হয়ে যাবে, আকাশে চাঁদও থাকবে না, অন্ধকারে ভয়ঙ্কর দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় নীচে নামতে হবে। বোমা বিস্ফোরণের নির্দিষ্ট সময়ের অর্ধেক অতিক্রম হওয়ার আগেই যদি মুখ খুলতে রাজি হও, তবে তো ওয়াকিটকিতে জানিয়ে দেবে। এদিকে রিমোট টিপে টাইম বোমাকে অচল করে দেব। তুমি সেখানেই গাড়িতে বসে থাকবে, আমরা গিয়ে তোমাকে গাড়ি থেকে নামাব। আর যদি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাও, তবে দ্রুত গাড়ি চালাতে হবে। তুমিই জানো ব্রেক ছাড়া এই পাহাড়ি পথে শুধু ক্লাচ, গিয়ার আর এক্সিলেটরের ওপর দ্রুত গাড়ি চালাতে পারবে কি না। তবে আমি যেভাবে সময়ের হিসাব করেছি, তাতে এক যুগের অভিজ্ঞ ড্রাইভারও আমার মনে হয় পারবে না। তুমি যদি পারো তবে প্রথম বারেই হেরে যাব, তুমি চেষ্টা করতে পারো। কারণ, আমি এমনিতে খারাপ হতে পারি কিন্তু কথা দিয়ে তা ভঙ্গ করি না। বলতে পারো, আমার এই একটি ভালো গুণ আছে। আমার কথা বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি তুমি যদি নীচে নির্দিষ্ট জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছতে পারো, তবে প্রথমত তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে, দ্বিতীয়ত মেয়েটির সম্পর্কে মুখ খুলতে হবে না’, শেষের বাক্যগুলো জোর দিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘কিন্তু আমি নিশ্চিত, তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে না’, এ বাক্যটা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন। যেন ছেলেটির দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। কারণ জোরে চালাতে গেলে তুমি নির্ঘাত গাড়িসহ খাদে পড়ে যাবে। ফলে বোমা বিস্ফোরণের আগেই তুমি পরপারে পাড়ি জমাবে।’

কিন্তু ছেলেটি তা গ্রহণ করল কিনা বোঝা গেল না তাকে দেখে। বেশ কিছুক্ষণ আগে ঘাম মুছে শান্ত হয়ে বসেছে সে। থেমে আবার পানি খেলো ক্যাপ্টেন। ‘কি ভয় লাগছে, তোমার মতে হিরোর তো ভয় পাওয়া সাজে না’, একটু থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল।

‘কি মুখ খুলবে? শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলাম। এরপর বাঁচতে চাইলে নিজে থেকে জানাতে হবে।

‘এক কথা বারবার ভালো লাগে না। আমি আমার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিচ্ছি, আর নতুন কিছু বলার নেই’, বিরক্তি প্রকাশ পেল ছেলেটির কণ্ঠে।

‘ও ঠিক আছে। তুমি যদি তোমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেল তাতে আমার আপত্তি নেই।’ যেন হতাশ হয়েছে ক্যাপ্টেন। ‘আচ্ছা, অহেতুক একটা গাড়ি ধ্বংস করার ভূতটা আপনার মাথা চাপল কেন, বলুন তো?’ ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বেশি কিছু তো ধ্বংস করছি না। পুরনো বাতিল-প্রায় এক জিপ গাড়িকে গ্যারেজে ফেলে না রেখে ধ্বংস করে দেয়া অনেক ভালো। তাছাড়া তোমার মতো একজন হিরোর জন্য একটা সামান্য জিপ ধ্বংস, এটা তো কোনো ব্যাপারই নয়’, বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতে লাগল ক্যাপ্টেন।

‘থামুন, এসব কথাবার্তা আমার মোটেও ভালো লাগছে না।’ বিরক্ত হয়ে বলল ছেলেটি। ‘আপনাদের লর্ড কোথায়? তার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।’ এ ক্যাপ্টেনের চেয়ে লর্ড হয়তো তার ব্যাপারে কিছুটা উদার হবে। অন্তত তার তাই মনে হয়। মনে মনে সাহায্য চাচ্ছে আল্লাহর কাছে।

‘ওহ হো, তুমি তো জানো না, আমাদের মহামান্য লর্ড তার বিশেষ কাজে গতকাল বাইরে গেছে, ফিরতে কয়েকদিন দেরি হবে। তোমার বিচার আমাকেই করতে বলেছে।’

ছেলেটি এর মধ্যে বুঝে গেছে এ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তার কোনো আপস হবে না, তাই অহেতুক কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল।

‘সন্ধ্যা হয়ে এলো, এখন ওঠা যাক। গাড়ির কাছে গিয়ে আর কিছু বলে, তোমাকে বিদায় জানাব।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন।

পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। মাথার ওপর দিয়ে মাঝে মধ্যে নানা ধরনের পাখি উড়ে যাচ্ছে।

‘আমার একটা কথা রাখবেন?’ বসেই বলল ছেলেটি।

‘আগে বল।’ সতর্ক হয়ে গেছে ক্যাপ্টেন।

‘আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য অস্ত যাবে, আমাকে শুধু মাগরিবের নামাজ পড়ার সুযোগ দেবেন?’ বলে জবাবের আশায় তাকালো ক্যাপ্টেনের দিকে।

একটু ভেবে ক্যাপ্টেন, ‘উম, ঠিক আছে, আর কিছু?’

‘না।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি।

আবার চেয়ারে বসল ক্যাপ্টেন। সময় হলে নামাজের দাঁড়িয়ে গেল সে। নামাজ শেষে দুই হাত তুলল মহান আল্লাহর দরবারে ‘হে আল্লাহ। তুমি আমার জানা, অজানা, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় করা সব ধরনের গুনাহ মাফ করে দিও। …হে আল্লাহ, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা আদৌ ঠিক হয়েছে কিনা তা আমার ভালোভাবে বোধগম্য হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে থাকলে আমাকে তুমি মাফ করে দিও। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করো। হে আল্লাহ, তুমিই তো রিজিকের মালিক, তুমি আমার রিজিক বৃদ্ধি করে দাও। হে আল্লাহ, এটাই যেন আমার শেষ নামাজ না হয়।’ তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

তাকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে প্রায় জোর করে জিপের কাছে নিয়ে আসা হলো। পাশেই এলএমজি হাতে তিনজন তাকে পাহারা দিচ্ছে। তাছাড়া সে বিকেল থেকেই লক্ষ্য করছে, ক্যাপ্টেনের প্যান্টের ডান পকেটটা বেঢপ উঁচু হয়ে আছে। আর ক্যাপ্টেন যে কী ধরনের ক্ষিপ্র তা তার জানা আছে। যদিও পালানোর উপায় নেই আর এরপর তা পাবেও না। শেষ চেষ্টা কি করে দেখবে? কীভাবে? সে ইচ্ছায় ইস্তফা দিল। কারণ তা চরম বোকামি হয়ে যাবে। খালি হাতে এতগুলো অস্ত্রের সামনে সে কিছুই করতে পারবে না। শুরু করতেই তাকে শেষ করে দেয়া হবে। তাই নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল।

‘সময় হয়ে গেছে। এবার বাকি তথ্যগুলো জানিয়ে তোমাকে বিদায় দেব, হয়তো তা হবে চির বিদায়।’ জিপটা থেকে হাত কয়েক দূরে এসে থামতেই কৌতুক করে বলল ক্যাপ্টেন। নীরবে শুনতে লাগল ছেলেটি।

‘এই দুর্গম পাহাড়িপথে মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ ত্রিশ কিলোমিটার বেগে নামা যাবে। বেশিরভাগ সময় বিশ কিলোর বেশি চালানো যায় না। কখনোবা গতিবেগ পাঁচ কিলোমিটারে নামাতে হয়। এভাবে এখান থেকে সাড়ে দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক জায়গায় পাহাড়ি পথটা নিচ থেকে অনেকটা খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আবার তেমনি বিপজ্জনকভাবে নীচের দিকে নেমে গেছে। ওখানে পৌঁছতে হবে, বোমা বিস্ফোরণের সর্বনিম্ন সময় পাঁচ মিনিট পর। ওখানে আমি এর মধ্যে দুজনকে পাঠিয়েছি। তারা পথে তোমার পৌঁছার অপেক্ষায় আছে। ওই একই পথ তোমাকেও এই জিপে পাড়ি দিতে হবে। তুমি গাড়িতে স্টার্ট দেবে, তারপর আমি নিজ হাতে দেড় ঘণ্টা সময় দিয়ে টাইম বোমা অ্যাডজাস্ট করাব, ঠিক দেড় ঘণ্টা পড়ে ঘটবে বিস্ফোরণ।’ লোকটির কথা শুনতে শুনতে দর দর করে ঘামছে ছেলেটি। বুঝতে পারছে সে, তাকে কী ভয়ানক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

‘তোমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে না। কারণ, ব্রেক না থাকায় তোমাকে পুরো আধা ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে তোমার একটা দুর্বল দিক হলো ওই পথের সঙ্গে তোমার একদম পরিচিতি নেই, অথচ আমরা কোনো বাঁকে গাড়ি থামতেই সামনের পথ ডানে গিয়েছে, না বামে তা বলে দিতে পারি। তারপরও ও পথে গাড়ি চালাতে এখনো আমার বুক কাঁপে’, একটু দম নিল ক্যাপ্টেন।

‘যা বলার ছিল এর মধ্যে বলেছি, শুধু এতটুকু বলা বাকি আছে, অহেতুক নিজের জীবন বাজি রাখছ। তারচেয়ে বরং…… থাক, তুমি যদি মৃত্যুর পেছনে ছুটো তাহলে আমার কী করার থাকতে পারে?’ বলে থামল ক্যাপ্টেন।

‘ড্রাইভিং সিটে উঠে বসো। সময় বয়ে যাচ্ছে, বিদায় বেলা এসে গেল।’

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি বাঁচার উপায় ভাবছে।

‘স্বেচ্ছায় না উঠলেও অনিচ্ছায় উঠতে হবে, উঠতে না চাইলেও শেষ সময়ে কিন্তু আদর করতে ছাড়ব না’, যেন হুমকি দিল ক্যাপ্টেন।

একবার ভাবল, বলে দেবে মেয়েটির কথা। পরক্ষণে ভাবলাম তাহলে মেয়েটিকে বাকি জীবন মানুষরূপী এ পশুর নির্যাতন সইতে হবে, হয়তো আর কোনো দিন বাবা-মা, ভাই-বোনদের মুখ দেখাতে পারবে না। মেয়েটি তাকে বিশ্বাস করেছে। সে বিশ্বাসঘাতক হতে পারবে না।

ক্যাপ্টেনের হুমকিপূর্ণ কথাগুলো তার কানে না পৌঁছলেও তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আল্লাহর নাম নিয়ে জিপের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল।

ক্যাপ্টেন তাকে সিটের বাঁধার জন্য এগোল। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বলল, ‘বসো, আপনার কষ্ট করার দরকার নেই, আমিই বদমাইশটাকে বাঁধছি। আপনি পিছিয়ে দাঁড়ান।’ গলায় অনুরোধ ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠে।

ঝট করে ছেলেটি তাকাল সেদিকে। দেখল, একটু দূরে দাঁড়ানো কয়েকজনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে একজন। রাতে চত্বরে জ্বালানো লাইটের হালকা আলোতেও লোকটিকে চিনতে কষ্ট হলো না। এ লোকটিই তাকে প্রথম দিন চাবুক মেরে ছিল।

‘আপনার এর সঙ্গে পরিচয় আছে?’ লোকটিকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

কোনো জবাব দিল না ছেলেটি। ক্যাপ্টেনকে তার অসহ্য লাগছে।

‘এ হচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজ সি কুইন ওয়ানের ফাস্ট ইঞ্জিনিয়ার।’ পরিচয় করিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। চুপ করে থাকল ছেলেটি।

লোকটি এমনভাবে ছেলেটির কাছে এসে দাঁড়াল যে ক্যাপ্টেন পিছিয়ে যেতে একরকম বাধ্য হলো।

 

গাড়ির বাঁ দিকে একটু দূরে তিনজন গার্ড আছে। জিপের ড্রাইভিং সিঠ ডান দিকে। লোকটা জিপের পেছন থেকে মোটা রশির বান্ডিলটা নিয়ে সিটের সঙ্গে ছেলেটিকে পেঁচিয়ে বাঁধতে শুরু করল। একবার পেছনে ঘুরে দেখল, হাত কয়েক দূরে তাদের দিকে চেয়ে আছে ক্যাপ্টেন। তার পেছনে আছে দুজন গার্ড। একটু দূরে আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। একবার ছেলেটির খুব কাছে সরে এলো ইঞ্জিনিয়ার। বুঝল এভাবে নিরাপদ নয়। পেছনে গিট দেয়ার জন্য জিপের পেছনে চড়ে ছেলেটির সিটের পেছনে বসল। তার ধীরে ধীরে গিট দিতে শুরু করল।

‘শান্ত থাক’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দেখল শান্তই আছে সে।

‘আমার কমেন্ট বুঝতে পারছ?’ জিজ্ঞেস করে তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘পারছি।’ দুজনই ইংরেজিতে অতি নীচুস্বরে কথা বলছে। যেন দুহাত দূরের কেউ শুনতে না পায়।

ছেলেটি বুঝতে পারছে না লোকটি তাকে কী বোঝাতে চায়।

‘যদি কোনোভাবে বাঁচতে পার, তবে পূর্ব দিকে সমুদ্রের ধারের বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িতে এসো, আমি অপেক্ষা করব’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ঠিক আছে’ বলে সায় দিল ছেলেটি। আর কিছু বলল না লোকটি। কারণ পাশেই আছে ক্যাপ্টেন। ধরা পড়তে পারে।

তাহলে দুজনকেই করুণ পরিণতির শিকার হতে হবে। গিট দেয়া শেষ হলে গাড়ি থেকে নেমে গেল ইঞ্জিনিয়ার।

ক্যাপ্টেন এগিয়ে এসে প্রথমে ছেলেটিকে বাঁধা ঠিক হয়েছে কিনা তা দেখল। তারপর ছেলেটিকে সার্চ করে তার কোমরে গোঁজা কাঁচির অংশটা পেল। দূর থেকে ভেসে আসা লাইটের আলোয় ছেলেটি সিটে বসে যতদূর নাগাল পেতে পারে তার সবখানে সার্চ করে কিছুই পেল না।

‘চাবি লাগানো আছে, স্টার্ট দাও’ যেন নরম সুরে আদেশ করল ক্যাপ্টেন।

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি। বাক্য ব্যয় না করে ছেলেটির দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে চাবিতে নিজেই মোচড় দিল ক্যাপ্টেন। স্টার্ট নিল গাড়ি।

‘চেষ্টা করে দেখ তো তোমার সিটের নীচে হাত দিতে পারো কিনা’, হেসে বলল ক্যাপ্টেন। তাকে এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যে ডানে, বাঁয়ে, সামনে কোনো দিকেই হেলতে পারল না। তার পেট থেকে বুক পর্যন্ত রশি দিয়ে পেঁচানো কোনোভাবেই তার হাত সিটের নীচে পৌঁছতে পারল না। পকেট থেকে একটা ইলেকট্রনিক্সের ঘড়ি বের করে ছেলেটির ডান হাতে পরিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। তারপর কোনো কথা না বলে একটা ক্ষুদে বোতামে টিপে মুখে দিকে তাকাল।

‘আমি তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না, তার আগেই বিদায় নিতে চাই। সময় মানব জীবনের যে কত অমূল্য সম্পদ, তা আজ বুঝতে পারবে। আমি টাইম অ্যাডজাস্ট করেই উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে শুরু করবে। তাই আগেই গাড়িতে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে রাখ’, থামল ক্যাপ্টেন।

‘হয়তো তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল ছেলেটির দিকে। কিন্তু ছেলেটি হাত না বাড়ানোয় ফিরিয়ে নিল হাতখানা।

‘আমি জানি তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রাখবে, তবু মুখ খুলবে না। আমি নিশ্চিত তুমি বাঁচতে পারবে না, তাই জানিয়ে দিচ্ছি। এখন যে অপমান করলে এর জন্য না হলেও আমাকে চড় মারার প্রতিশোধ অবশ্যই নিতাম। তুমি সত্যি বুদ্ধিমান, থাক আর কথা না বাড়াই, এখন দেখ ঘড়িতে ক’টা বাজে। বোতাম টিপে দেখল সাড়ে ছয়টা বাজতে দুই মিনিট বাকি। এদিকে ক্যাপ্টেন নিজের ঘড়ি দেখে বসে পড়ল তার পাশে। তার সিটের নীচে রাখা টাইম বোমায় টাইম অ্যাডজাস্ট করতে লাগল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে ক্লাচ চেপে রেখে, পা এক্সিলেটরের ওপর আলতোভাবে রাখল। একটু পরই ঝট করে উঠল ক্যাপ্টেন। ততক্ষণে নড়ে উঠেছে ঝরঝরে পুরনো জিপ।

‘গুড লাক’ বলে চেঁচাল ক্যাপ্টেন। কিন্তু শুনল কিনা ক্যাপ্টেন তা বুঝতে পারল না। এর মধ্যে তার কাছ থেকে জিপ সরে গেছে। সবাই জিপটিকে পাহাড়ের ওধারে হারিয়ে যেতে দেখল। যখন এক্সিলেটরের চেপে ধরে ক্লাস ছাড়ছে ছেলেটি তখন একবার দূরে দাঁড়ানো ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল লোকটি।

সেকেন্ড গিয়ার দিয়ে ফেলেছে ছেলেটি। এর মধ্যে বুঝে ফেলেছে গাড়ির বডিটা ঝরঝরে হলেও এর ইঞ্জিনের কন্ডিশন এখনো যথেষ্ট ভালো। ব্রেক ছাড়া গাড়ি কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয় তা জানা আছে তার, যদিও খুব কঠিন কাজ। লোকগুলোকে বেশ পেছনে ফেলে এসেছে সে। পথ এতই দুর্গম যে, থার্ড গিয়ার দেয়া যাচ্ছে না।

একটু পরই ফার্স্ট গিয়ারে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়। গতিবেগ দশ-বার কিলো। দ্রুত স্টিয়ারিং কাটাতে হচ্ছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। তাকে অবশ্যই জিততে হবে। সে জন্য সে ঝুঁকি নিতে রাজি আছে। কারণ ঝুঁকি নেয়া ছাড়া সাফল্য আসে না। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছে সে।

ঘড়িতে দেখল এর মধ্যে বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে। মাইল মিটারে দেখল এখন পর্যন্ত অর্ধ-কিলোমিটার এসেছে। ঘামতে শুরু করল ছেলেটি নিজের অজান্তেই। আরো দ্রুত এগোতে হবে। তাতে ঝুঁকি অনেক বাড়বে। সেকেন্ড গিয়ার থেকে এ প্রথম থার্ড গিয়ারে দিল ছেলেটি। একটু ডানে-বাঁয়ে তীক্ষè মোড় নিতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে একধারে পাহাড় অন্য ধারে গভীর খাদ পেরোতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ইঞ্চি পেরোতে হচ্ছে তাকে মৃত্যুর আশঙ্কা মাথায় নিয়ে।

দ্রুত ডানে-বাঁয়ে বাঁক নিতে হলে এক্সিলেটর থেকে পা সরিয়ে দ্রুত স্টিয়ারিং কাটছে। মাঝেমধ্যেই খাদের কিনারায় গিয়ে পড়ছে বা পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে যেন প্রতিবারে পার পেয়ে যাচ্ছে সে। নিজেও বুঝতে পারছে না। তবে ছেলেটি মাথা ঠান্ডা রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগোচ্ছে। চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষè হয়ে উঠেছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সজাগ হয়ে আছে। অত্যন্ত সতর্ক আছে সে। গতি বেশি থাকা অবস্থায় তীক্ষè মোড় নিলে মাঝেমধ্যেই চাকা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। হঠাৎ ডানে দ্রুত বাঁক ঘুরতে গিয়ে বাঁয়ে চাকা দুটি মাটি থেকে একটু ভেসে উঠল। অল্পের জন্য এ যাত্রায় খাদে পড়া থেকে বেঁচে গেল।

পরের দশ মিনিটে এবার প্রায় এক কিলো এগিয়েছে। কিন্তু এভাবে চালাতে গিয়ে কোনো সময় সমস্ত সম্ভাবনার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এভাবে মরতে চাচ্ছে না ছেলেটি। কিন্তু তারইবা কী করার আছে?

এখন একটাই উপায় আছে তা হলো হার মানা, ক্যাপ্টেনের আছে মুখ খোলা। তার ওপর যদিও প্রতিশোধ নেয়, তারপরও কমপক্ষে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। হঠাৎ খেয়াল হলো তার তো জলাতঙ্কও হতে পারে। ক্যাপ্টেনের কাছে মাফ চেয়ে নিলেই হয়তো সে তার এআরভির ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তো সে আরো কিছুদিন বাঁচতে পারবে। হঠাৎ যেন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে ব্যাকুল হলো ছেলেটি। গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে।

স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে লাগানো ওয়াকিটকিটা খুলে তা হাতে নিল। কী মনে করে কয়েক মুহূর্ত সে তাকিয়ে থাকল হাতে এন্টিনা যুক্ত যন্ত্রটির দিকে। তারপর ছুড়ে দিল দূরে। হারিয়ে গেল অন্ধকারে। এখনো ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার পনের মিনিট সময় আছে। এই সময়টা বড় বিরক্ত করত ওই যন্ত্রটি। সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। যদি না সত্য মিথ্যার সামনে মাথা নত না করে। সে মরবে, কিন্তু সত্যকে পদানত হতে দেবে না। আবার গাড়ি চালানোয় মন দিল। ঝুঁকি নিয়ে এবার বেশ জোরেই চালাচ্ছে গাড়ি।

থার্ড গিয়ারে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডে চলছে গাড়ি। উত্তেজনায় রাতের ঠান্ডা বাতাস টেরই পাচ্ছে না। আগে বুঝতে পারেনি ছেলেটি। যখন বুঝল তখন সময় শেষ হয়ে গেছে। ডানে পাহাড় তা সে আগেই দেখেছে। পাহাড়ের ওপাশে যে পথ হঠাৎ ডানে মোড় নিয়েছে তা বুঝতে পারেনি। মোড়ে রাস্তায় বাঁয়ে গভীর খাদ। গাড়িটা কীভাবে কন্ট্রোল করল নিজেও বলতে পারবে না। তবে প্রথমেই এক্সিলারেটর ছেড়ে দিয়ে ক্লাচ করেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপরই ক্লাচ ছেড়ে দিতেই মাটিতে চাকা ঘর্ষণের কর্কশ আওয়াজ পাওয়া গেল। এক ধাক্কায় পঁচিশ কিলো থেকে দশ কিলোতে নেমে এত গতি।

তারপর আবার এক্সিলারেটর হালকাভাবে চেপে ধরে দ্রুত ডানে স্টিয়ারিং কাটাল সে। গাড়ির সামনের ডান চাকা খাদে পড়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। এ যাত্রাও বেঁচে গেল। আবার থার্ড গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। এভাবে কোনো গাড়ি পঞ্চাশ কিলো চললেই সেই গাড়িকে কোনো গ্যারেজের সামনের শোপিস হিসেবে পাঠাতে হবে ভাবল ছেলেটি।

তাকে ওই জায়গায় পৌঁছতেই হবে, যেখানে দুজন লোক তার টাইম বোম নিষ্ক্রিয় করার জন্য অপেক্ষা করছে। তারপর যেভাবেই হোক সে ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে কিন্তু কীভাবে তা এখনো ঠিক করেনি, সময় নেই।

পরবর্তী আধা ঘণ্টায় চার কিলো এগোল। আর বাকি আছে আধা ঘণ্টা। এখনো পাঁচ কিলো পথ বাকি আছে। কিছুটা হলেও সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। এবারো থার্ড গিয়ারে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডি পাহাড় বেয়ে নীচে নামছে জিপ। বাঁয়ে পাহাড়ের সারি রেখে ছুটছে গাড়ি। ডানে খাদ। হেডলাইটের আলোয় বেশি সামনে দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টি তীক্ষè রেখে গতি বজায় রেখেছে। হঠাৎ ডানে তীক্ষè মোড় নিল পথ। বায়ে খাদ। এবার আর কোনো কথাই শুনল না। সোজা নেমে গেল খাদে। খাদটা বিপজ্জনকভাবে ঢালু হলে অনেক নীচে নেমে গেছে। সোজা নীচে নামতে লাগল গাড়ি। এই স্পিডে কোথাও ধাক্কা খেলে মুহূর্তে সব চুরমার হয়ে যাবে। মাথা ঠান্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল সে। প্রথমেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপর ক্লাচ, এক্সিলারেটর দুটি থেকেই পা সরিয়ে নিয়ে দুই হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরল। গতি কমে এসেছে। এখন ঘণ্টায় দশ কিলো স্পিডে নীচে নামছে। এ স্পিডে ধাক্কা খেলে তেমন ক্ষতি হবে না। হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা স্মরণ হতেই শিউরে উঠল ছেলেটি। তা হলো এ ঢাল থেকে যদি এমন কোনো খাদে পড়ে যার কোনো ঢাল নেই, তাহলে সোজা কয়েকশ’ ফুট নীচে…। আর ভাবতে চাইল না সে। এখন কী করা যায় তাই ভাবতে লাগল। একটাই উপায় আছে। ডানে কাটল গাড়ি। সোজ হলো বটে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গাড়িয়ে পড়তে লাগল গাড়িসহ। প্রথমে বামে কাত হয়ে পড়ে গেল। তারপর চারটা চাকাই ওপরে চলে গেল। এরপর ডানে কাত হলো। তারপরই সোজা হলো; কিন্তু স্থির হলো না। গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল। কত পাক খেয়েছে হিসাব করেনি। তার তেমন কোথাও লাগেনি। জিপে বর্ষাকালে প্লাস্টিকের হুড দেয়ার জন্য স্টিলের ফ্রেম করাই ছিল। সেগুলোর ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেল। তবে সেগুলো দুমড়ে-মুচড়ে একাকার। সে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা থাকায় ছিটকে পড়েনি।

এমন সময় একটি বড় টিলার গায়ে ধাক্কা লেগে থেমে গেল জিপ। তবে ডানে থেমেছে। ফলে সে নীচে আছে।

গাড়ির স্টার্ট অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছ। হেডলাইট নিভে গেছে। হয়তো ভেঙেও গেছে।

ঘড়িতে দেখল আর দশ মিনিট আছে বিস্ফোরণের। কী করবে বুঝতে পারছে না। বারবার ঢোক গিলছে। ঘামছে দরদর করে। আল্লাহর কাছে শুনাহ মাফ চাচ্ছে, সাহায্য প্রার্থনা করছে। নিজেকে শান্ত রাখার জন্য নিজের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাকে।

গড়িয়ে নীচের নামার সময় টাইম বোমটি কোথাও পড়ে যায়নি তো। কিন্তু তা তো সে নিশ্চিত হতে পারছে না। যদি গাড়িতে তারই ছিটের নীচে থেকে থাকে তাহলে……। আর ভাবতে চাচ্ছে না সে। জানে তারপর কী হবে। তার চিহ্নও হয়তো পাওয়া যাবে না। গাড়ির বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে যাবে নানা দিকে। তারপর বিজয়ীর হাসি হাসবে ক্যাপ্টেন।

পানিতে পড়ে মানুষ খড়কুুটোকেও ভেসে থাকার অবলম্বন মনে করে। ছেলেটিরও অবস্থা তাই হয়েছে। এখন একটাই উপায় আছে, দড়িটা যদি কোনোভাবে কাটা যায়। কিন্তু কী দিয়ে কাটবে? এপাশ-ওপাশ হাতড়াচ্ছে সে কিছু পাওয়ার আশায়। ঘড়িতে দেখল আর সাত মিনিট আছে। ব্যস্ত হয়ে উঠল সে। হঠাৎ দেখল উইন্ডশিল্ডের কাচ ভাঙা। কতগুলো টুকরো ফ্রেমের সঙ্গে এখনো আটকে আছে। ঝট করেই বুদ্ধিটা মাথায় এলো। শুয়েই কোনোমতে সামনে ঝুঁকল। গড়িয়ে নীচে পড়ার সময় বাঁধন একটু ঢিলে হয়েছিল বলেই হয়তো শেষ পর্যন্ত উইন্ডশিল্ডের ফ্রেমে হাত নিয়ে যেতে পারল। এক ঝটকায় ফ্রেমে আটকে থাকা কাচের একটা টুকরো ভেঙে নিল। ভাঙতে গিয়ে হাত কেটে গেল। টেরই পেল না সেটা। দ্রুত রশি কাটতে শুরু করল। ঘড়িতে দেখল পাঁচ মিনিট বাকি আছে। দ্রুত হাত চালাতে লাগল। এক সময় একটা রশি কেটে গেল। এত রশি এক এক করে কাটতে যাওয়া হবে বোকামি। পেঁচানো রশি খুলতে লাগল দ্রুত হাতে। ঘড়িতে দেখল আর দেড় মিনিট আছে। সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহর নাম নিচ্ছে। অবশেষে এক সময় মুক্ত হয়ে গেল। রক্তাক্ত হয়ে গেছে হাত দুইখানা। দড়িগুলোতেও রক্ত লেগেছে। সেদিকে খেয়াল নেই। আগে গাড়ি থেকে বের হয়ে সরে যেতে হবে।

এরপর ছেলেটি কীভাবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো জানে না। তারপর দুকানে আঙুল ঢুকিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে দিল দৌড়। পেছনের প্রচণ্ড শব্দে হোঁচট খেয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সে। কানের পর্দা ফেটে গেল কিনা বুঝতে পারছে না। তবে দ্রুত উঠে বসে পেছন ফিরে তাকাল।

যা দেখল তাতে শিউরে উঠল নিজের অজান্তেই। দেখল জিপের মধ্যে আগুন ধরে গেছে। সে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশমুখে উঠছে। এত দূর থেকেও আগুনের তাপে যেন চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। গাড়িতে থাকলে এতক্ষণে তার কী অবস্থা হতো ভাবতেই দ্বিতীয়বার শিউরে উঠল। এবারো মহান আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। সে যেন নতুন জীবন পেল।

এখানে অপেক্ষা না করাই নিরাপদ। যতদূর সম্ভব দ্রুত ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে হবে। একটু ভেবেই নীচে নামতে শুরু করল। এতকিছুর পর শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। বাম হাত অনেকটা কেটে গেছে। ডান হাত দিয়ে কাটা জায়গায় টিপে ধরেছে যাতে রক্ত না বের হয়। তবুও রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না দেখে পায়জামার ডান পায়ের নীচের একাংশ ছিঁড়ে কাটা জায়গাটা বেঁধে ফেলল। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। এই সামান্যর ওপর দিয়ে যে তার জানটা বেঁচে গেছে তাই ঢের। অনেকক্ষণ পর নীচে পৌঁছে গেল সে। পথিমধ্যে এবার সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়েছে।

যেখানে এসে পৌঁছেছে তা থেকে বেশ দূরে গ্রাম। বাড়িগুলোর ভেতর থেকে মিটিমিটি আলো আসছে। ডানে-বাঁয়ে দুই দিকেই সমুদ্র বেশ দূরে। পূর্ব ধারে আছে সেই ভদ্রলোকের বাড়ি, যে তার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু কেন? কোনো সন্তোষজনক উত্তর নিজেকে দিতে পারল না। তার ডানদিকে পূর্ব দিক। সতর্ক থেকে পা বাড়াল। চিন্তা করছে যে, যে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটছে হয়তো তার শব্দ এ দ্বীপের সবাই শুনতে পেয়েছে। ক্যাপ্টেন হয়তো এ ক্ষণে বিজয়ীর হাসি হাসছে। নাকি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঘটনাস্থল দেখতে বেরিয়ে আসছে? বিস্ফোরণ কোথায় হয়েছে তা হয়তো হেডকোয়ার্টার্স থেকেই দেখা গেছে। রাতে না গিয়ে হয়তো দিনেই দেখতে যাবে। তবে এতটুকু ধরে নেয়া যায়, এ অন্ধকার রাতে গার্ডরা তাকে দেখলে ভূত ভাবতে পারে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সে পূর্ব দিকে পৌঁছে গেল। পাশেই গ্রাম। বাড়িগুলোর বাইরে তেমন লাইট জ্বালা নেই। পথঘাট একরকম অন্ধকারেই ডুবে আছে। তবে বাড়ির ভেতরে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্রের ধারের বাড়িগুলোর নম্বর দেখছে। বেশি খুঁজতে হলো না, একটু পরেই পেয়ে গেল বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িটা। ছিমছাম সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো কাঠের বাড়িটা। বাড়ির সামনে বাগান। তাতে নানা ধরনের ফুলের গাছ, অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বড় করা হয়েছে তার ছাপ স্পষ্ট। আবার তাকালো বাড়িটার দিকে। বাড়িটার কোনো নাম নেই। এ বাড়িই তো? নম্বর তো ঠিকই আছে।

আল্লাহর নাম নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠক ঠক করে দুবার শব্দ করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল দরজা। যেন জানত যে সে এখনই আসবে। ঘরের ভেতরের আলো তার ওপর এসে পড়ল। চোখে হঠাৎ আলো পড়ায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দেখল তার সামনে ইঞ্জিনিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। তাকেই অবাক হয়ে দেখছে। আপনি স্বয়ং এসেছেন! আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আসুন আসুন, ভেতরে আসুন, কেউ দেখে ফেলবে। সরে ছেলেটিকে ঢোকার জায়গা করে দিল। ঘরের ভেতরে ঢুকল ছেলেটি। বসতে বলায় একটা চেয়ারে বসে পড়ল সে। সুন্দর সাজানো ঘরটি। লোকটির রুচির তারিফ করল মনে মনে।

‘পথে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’ ছেলেটির পাশে বসতে বসতে বলল ইঞ্জিনিয়ার। তাকাল ছেলেটির দিকে। প্রথমেই চোখ পড়ল তার বুকের ক্ষতগুলোর দিকে। এখনো শুকায়নি।

তারপর হতের দিকে তাকিয়ে ‘আপনি বসুন’ আমি আসছি। বলে চলে গেল সে। ফিরে এলো স্যাভলন, তুলা ও ব্যান্ডেজ নিয়ে। বসে গেল ডাক্তারের ভূমিকায়। হাতে প্যাঁচানো রক্তাক্ত কাপড়টা খুলেইÑ ‘ইস, কতদূর কেটেছে!’ বলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। এই প্রথম ছেলেটি তার হাতের অবস্থা দেখল। নাহ লোকটি বাড়িয়ে বলেনি।

‘তারপর, আপনি কীভাবে পালালেন, তারপর কী হলো, আবার ধরা পড়ার সময় মেয়েটি ছিল না কেন, সব খুলে বলুন। আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন।’ স্যাভলন, তুলা দিয়ে কেটে যাওয়া জায়গায় পরিষ্কার করতে করতে বলল লোকটি।

সংক্ষেপে সব খুলে বলল ছেলেটি। এমনকি, কী মনে করে জেলের কথাটাও বলল। কোনো কিছুই বলেনি লোকটি। শুধু শুনেছে। ততক্ষণে ব্যান্ডেজ করা শেষ হয়েছে। ব্যথা কিছুটা কমে গেছে।

‘পরে আরো কথা হবে, এবার গোসল করে নিন’, চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল লোকটি।

‘গোসল করলে তো ভালোই হয়।’ তার সারা গায়ে ধুলাবালি লেগে থাকায় তার অস্বস্তি লাগছে। বাথরুমে এসে ঢুকল ছেলেটি। দেখল নতুন এক সেট শার্ট-প্যান্ট। বুঝতে পারল তারই জন্য রাখা হয়েছে এগুলো। এ দ্বীপে পায়জামা-পাঞ্জাবি পাওয়া যাওয়ার কথা না। তাছাড়া তার পরিধেয় বস্ত্র বলতে একমাত্র পায়জামাটি। তাও তাকে ছিঁড়তে হয়েছে আজ। অনেক দিন ধরে পরে থাকায় এমন অবস্থা হয়েছে যে যখন-তখন ছিঁড়ে যেতে পারে। গোসল করে শার্ট-প্যান্ট পরে বের হলো সে।

‘ভালোই মানিয়েছে, আজ ফেরার পথে দুই সেট কিনে এনেছি।’ তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বসে থাকা ইঞ্জিনিয়ার বলে উঠল।

এরপর এশার নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। তারপর খেতে বসল দুজনে। এক সময় খাওয়ার পর্ব সমাপ্ত হলো।

‘আমি আর বিশ্রাম করব না, মেয়েটি হয়তো ঠান্ডায় কাঁপছে, আমি গিয়ে তাকে এ শার্টটা পরতে দেব’, বলে নিজের শার্টটা দেখাল। ‘আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি, আর…’ একটু দ্বিধা করে বলেই ফেলল। ‘আমাদের যদি কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দিতেন, তবে বেঁচে যাই। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতে গেল ছেলেটি।

তাকে আবার বসিয়ে দিল ইঞ্জিনিয়ার, আরে বসুন না, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, আমি আপনাকে দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে আসব।’ আপনি দ্বীপে পৌঁছে দিতে যাবেন, এ রাতে?’ বিস্ময়ের সঙ্গে বলল ছেলেটি।

‘কেন আপনি যদি রাতে সুদূর আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাতে পারেন, তবে কি আমি এই রাতে আপনাকে পাশের দ্বীপে পৌঁছে দিতে পারব না?’ হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এত রাতে নৌকা কোথায় পাবেন?’

‘আমার নিজের সৈকতে ডাঙ্গায় তুলে রাখা আছে। এখন কাজের কথায় আসি, আর নৌকায় যেতে আপনার টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা শুনব। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন কথা গুছিয়ে নিয়ে শুরু করল ইঞ্জিনিয়ার। আপাতত কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। যতদিন কোনো ব্যবস্থা করতে না পারি, ততদিন আপনাদের কোনো দ্বীপে লুকিয়ে থাকতে হবে। অবশ্য আপনারা যে দ্বীপে আছেন, সেটা এ দ্বীপের কাছে হওয়ায় সেখানে থাকা চলবে না। বলে দম নিল ইঞ্জিনিয়ার।

তাহলে কোথায় থাকব?’ ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বলছি, বলছি। এ দ্বীপের দক্ষিণে দূরে আরো একটি দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপটা এ মূল দ্বীপ থেকে দেখতে পাওয়া যায় না। তাছাড়া সহজে ওদিকে কেউ যায় না। ওই দ্বীপটায় ছোট ছোট টিলা আছে, গাছপালা আছে, আর আছে একটা কেবিন; যাতে আপনারা থাকতে পারবেন। এছাড়া এ অঞ্চলে আপনাদের লুকিয়ে থাকার মতো আর ভালো জায়গা নেই। কাল রাতে আমি আপনাদের ওই দ্বীপে নিয়ে আসব। কোনো চিন্তা নেই, ওখানে আপনারা বাড়ির মতোই থাকতে পারবেন।’

‘এত ঝামেলায় না গিয়ে আমাদের একটা ছোট নৌকা জোগাড় করে দিলে হয় না!’ কথাটা শেষ করতে পারল না ছেলেটি।

‘উহু! কখনোই না, কোনো দেশের উপকূল এখান থেকে দেড় হাজার কিলোমিটারের কম নয়। জাহাজের রুটগুলোও অনেক দূরে। তাছাড়া আপনারা যে অভিজ্ঞ নাবিক নন, তা হলফ করে বলতে পারি। নৌকায় সমুদ্রে খুব জোর দুই দিনের বেশি টিকবেন না। নিত্যন্ত ভাগ্যক্রমে এ দ্বীপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগেই আপনাদের নৌকাটি উল্টে গিয়েছিল। বলে এক মুহূর্ত থামল। যদিও সম্মুখে করা ঠিক না তারপরও আপনার সাহসের প্রশংসা করতেই হচ্ছে। অবশ্য আপনার সাহসের পরিচয় জাহাজেই পেয়েছিলাম।’

‘তার মানে?’ নিজের অজান্তে গলায় স্বর উঁচু হলো ছেলেটির। তার মানে আপনি জাহাজে আমাকে ওঠানোর জন্য দড়ি নামিয়ে দিয়েছিলেন, দরজার আড়াল থেকে আপনিই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।’

‘জি, আমিই’, মাথা নীচু করে জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার। যেন লজ্জা পেয়েছে।

‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। যেন নিজের প্রতি অভিমান করেছে সে।

ঘটনাটা খুলে বলুন তো, আমি তারপর থেকে এ ব্যাপারে উদগ্রীব ছিলাম।’

‘সেই দ্বীপে যেখান থেকে মেয়েটিকে ধরে আনা হয়, সেই দ্বীপের কথা বলছি, মেয়েটিকে নিয়ে আসছে এমন সময় আমি আপনাকে একটা পাহাড়ের আড়াল থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে সমুদ্রে পড়ে ডুবে যেতে দেখি, তখন আমি জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তারপর যখন একটা লোক আপনাকে দেখে ক্যাপ্টেনকে ডাকে তখন আমিও ক্যাপ্টেনের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এরপর বিকেলে একবার দেখতে গিয়েছিলাম, একটা মানুষের একটি কাঠকে আঁকড়ে ধরে এতক্ষণ জাহাজের সঙ্গে লেগে থাকতে পারাটা কঠিন ব্যাপার। বলতে পারেন, তখনই আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। তাছাড়া আমি জানতাম, আপনারা দুজনেই ক্যাপ্টেনের নির্যাতনের শিকার, তাই আমি তখনই ঠিক করি সন্ধ্যার পর পর্যন্ত যদি টিকে থাকতে পারেন, তবে আপনাকে তোলার ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওদিকে জাহাজের ইঞ্জিনের একটু সমস্যা দেখা দেয়ায় আপনার কাছে আসতে দেরি হয়ে যায়। আপনি রশি দিয়ে ওপরে উঠে আসার পর আপনাকে ওই কথাগুলো জানানোর জন্য লুকিয়ে আপনার ওপর নজর রেখেছিলাম’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এরপর জাহাজ থেকে নেমে জিপে করে হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করার জন্য যাওয়ার পথে আপনার ওপর ওদের অত্যাচার দেখতে পাই। আমি ওদের সঙ্গে কাজ করলেও মাঝে মধ্যে অন্যের জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে ছাড়ি না। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে আপনাদের জন্য আমি এগিয়ে যাব। এরপর হেডকোয়ার্টারে যখন আপনাকে এগোতে বলছিল, আমি তখনই বুঝেছিলাম যে ওরা আপনাকে প্রচণ্ড কষ্ট দেবে। তাই এগিয়ে আপনাকে আমার আওতায় নেই এবং কৌশলে আমার বাড়ির নম্বর আপনাকে জানাই, যদি আপনি বুঝতে পারেন। আর পরিষ্কার করে বলাটা সে সময় আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইঙ্গিত দেয়ারও সুযোগ ছিল না। আমি চাইছিলাম, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে যেন আমার কাছে চলে আসেন। যা-ই হোক, অবশেষে আপনি এসেছেন, আর সেদিন আপনাকে যে চাবুক কষেছিলাম, তার কারণ ছিল ওরা যাতে সন্দেহ করতে না পারে। আমি আস্তেই চাবুক কষেছিলাম; কিন্তু আপনি অত্যন্ত দুর্বল থাকায় দ্বিতীয় চাবুকে জ্ঞান হারান। অবশ্য তাতে আপনার ভালোই হয়েছিল। কিছুক্ষণের জন্য আপনি সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, থামল লোকটি।

‘এতক্ষণ ধরে লোকটির কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিল ছেলেটি।

‘আসলে খুব টেনশন থাকায়, আপনার ওই ইঙ্গিতটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পাইনি’, লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল ছেলেটি।

‘কমপক্ষে চাবুক মারার দিন আপনার গলা চিনতে পারা উচিত ছিল।

‘আর আজকে যদিও আপনার এখন এখানে থাকার কথা ছিল না, তারপরও ক্ষীণ একটু আশা বুকে ধরে, ঝুঁকি নিয়ে আপনাকে আজকে পরিষ্কার করেই বলেছি, তা না হলে আজ এ সময় আপনি এখানে থাকতেন না।’

‘খুবই ভালো করেছেন, তা না হলে অবশ্য জেলের বাড়িতে চলে যেতাম, সত্যিই আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম।’

‘আমি তো ভেবেছি আমি আপনার শিষ্য হব। এ কয়দিন আপনি যা দেখালেন না!’ হেসে বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘আরে কী যে বলেন!’ লজ্জা পেয়েছে ছেলেটি। ঘড়ির দিকে তাকাল।

‘ইয়া আল্লাহ, প্রায় ভোর হয়ে গেছে, এখনই রওনা হওয়া দরকার।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাই তুলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে রাত যে কোন দিক দিয়ে শেষ হলো টেরই পেলাম না, হ্যাঁ এবার ওঠা যাক’, বলেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল লোকটি।

‘আপনি একটু বসুন, আমি আসছি’, বলে ভেতরে চলে গেল লোকটি। একটু পরেই একটা প্যাকেট হাতে ফিরে এলো ‘চলুন, বেরিয়ে পড়ি।’

নৌকায় সময় কাটানোর ছলে টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটা বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে। নৌকা তীরে পৌঁছে গেল। তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল দিয়েছে লোকটি। প্যান্টটা একটু তুলে হাঁটা পানিতে নামল ছেলেটি। লোকটি তার আগেই তার হাতে প্যাকেটটা দিয়েছে। এই প্যাকেটটা মেয়েটার জন্য, এর মধ্যে সে তার কাপড় পাবে, আর আমি সন্ধ্যার পরপরই আসব আপনার এখানে। আশপাশেই থাকবেন, যেন ডাকলেই শুনতে পান, গুড লাক’, চলে গেল লোকটি। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি দ্বীপের দিকে। সূর্য ওঠার আর বেশি বাকি নেই। ফজরের নামাজ আদায় করে পা বাড়াল সে।

সকালের সূর্যের আলো চোখে পড়েছে। ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। প্রথমেই চোখ কচল চারদিকে তাকাল। ছেলেটিকে কোথাও গেল না। হয়তো আশপাশেই আছে। দিনের বেলা পাথরের পেছনে আরো জড়সড় হয়ে বসল সে। ক্ষুধা লেগেছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটি পৌঁছে যাবে। অনেকক্ষণ কেটে গেল। সূর্য অনেক ওপরে উঠে গেছে। এখনো ছেলেটি ফিরছে না দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল মেয়েটি। কোথায় গেছে সে? এখন এ অবস্থায় সে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাল রাত যেখানে অগ্নিকুণ্ডটা জ্বালানো হয়েছিল, সেখানে এখন ছাই পড়ে আছে। বেশি দূরে নয়। গত রাতে ছেলেটি আগুন জ্বালিয়ে তার বামে বসেছিল। তার স্পষ্ট স্মরণ আছে। তারপর কখন যে চোখের পাতা বুজে এসছিল তা সে বলতে পারবে না। কিছু একটা জিনিস চোখে ধরা পড়েও পড়ছে না। ছাইগুলোর এপাশে মাটিতে কিসের যেন আঁকি বুকি দেখা যাচ্ছে। কোনো ধরনের ম্যাসেজ বুঝতে পারছে না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। প্রায় মাথার ওপর সূর্য উঠে এসছে। নাহ, দেখতেই হচ্ছে। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। জড়সড় হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোলো সামনে।

‘আপনার কাপড়ের সন্ধানে আমি মূল দ্বীপে যাচ্ছি। আপনার চিন্তা করার কোনো কারণ নেই, আমি সাবধানে থাকব ইনশাআল্লাহ। আর ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই, আমি ধরা পড়লেও তাদের কাছে আপনার ব্যাপারে মুখ খুলব না। আমি তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব, ভাল থাকুন, খোদা হাফেজ।’ মাটিতে সুন্দর করে বাংলায় লেখাগুলো পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়ল মেয়েটির।

তার জন্য ছেলেটি আবার বাঘের গুহায় পা দিতে গেল! হয়তো এ মুহূর্তে সবাই পুরস্কারের আশায় তাদের খুঁজছে, ছেলেটির ধরা পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এতক্ষণে কি সে ধরা পড়ে গেছে? হয়তো পড়েনি। কী জানি? সে এত দূর থেকে কীভাবে জানবে? আচ্ছা, এ দ্বীপে কি তাকে খুঁজতে আসবে? আসতেও পারে। এ অবস্থায় কোনো লোকের সামনে পড়লে তার কী হবে ভেবে শিউরে উঠল সে। অথচ ছেলেটি…। তাড়াতাড়ি কোথাও লুকিয়ে পড়ার তাগিদ অনুভব করছে সে। কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। কী খাবে চারদিকে নারকেল বা কোনো ফলের গাছ নেই। এ অবস্থায় দ্বীপে খুঁজে বেড়াতে পারবে না। অগত্য ছেলেটি ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। আশপাশে লুকানোর ভালো জায়গা নেই। একটু আশপাশ ঘুরে দেখবে কি? সামনে আড়াআড়িভাবে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আশপাশটা খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। একখানে বসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটি ফিরে এলে আগের জায়গায় যাবে। তাকে ওখানে না পেলে, এপাশ-ওপাশ খুঁজেও না পেয়ে যদি তাকে ধরে নিয়ে গেছে ভেবে আবার মূল দ্বীপে ফিরে যাব! এছাড়া এখন পর্যন্ত লুকানোর মতো ভালো জায়গা পায়নি। ভাবতে ভাবতে আবার আগের জায়গাটায় ফিরে এলো।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এখনো ছেলেটির দেখা নেই। হয়তো রাতে ফিরবে। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল মেয়েটি। সূর্যের রক্তিম আভা পূর্বাকাশে ফুটে উঠেছে। চারদিকে দিনের আলো ফুটে উঠেছে ধীরে ধীরে। তবে এখানে অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্য দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

প্যাকেটটা খুব ভারী। শুধু কাপড়ের ওজন এত হতে পারে না। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ছেলেটি। তাছাড়া বাঁ হাতে ব্যথা পাচ্ছে। সামনের বাঁকটা ঘুরলেই পৌঁছে যাবে। মেয়েটি আছে তো! নাকি ধরে নিয়ে গেছে এর মধ্যে?

মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে আনল ছেলেটি। পাঁচ হাত সামনেও দেখছে না। ঢুকে পড়েছে খোলা জায়গায়।

‘আপনি কোথায়? আমি আপনার জন্য কাপড় নিয়ে এসেছি’, চেঁচিয়ে বলল সে।

কিন্তু কোনো জবাব এলো না। আর একবার বলল। এবারো জবাব এলো না। এবার আরো জোরে চেঁচিয়ে বলল। জবাব নেই। তবে কি…?

মুখ তুলে তাকাল। দেখল দূরে পাথরের আড়ালে মেয়েটি আছে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে। বুঝে নিল সে। হয়তো মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি ‘পেছন দিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে এলো।’

একটু দূরে আছে মেয়েটি। ‘এই যে, শুনছেন, আমি…’ বলে শেষ হলো না। মাথার ওপর দিয়ে কর্কশ আওয়াজ করতে করতে একটা সামুদ্রিক পাখি উড়ে গেল। আবার বলতে যাবে কিন্তু এবারো বলা হয় না।

‘কে আপনি?’ পাখিটার কর্কশ আওয়াজে চোখ খুলেই একটু দূরে, ওপাশে ঘুরে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল মেয়েটি। বলেই চিনতে পারল।

‘আমি ফিরে এসেছি’, একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল ছেলেটি।

‘দুঃখিত। এখন চিনতে পেরেছি’, অপ্রস্তুত হয়ে বলল ছেলেটি।

‘এই বাক্সে আপনার কাপড় আছে, নতুন। পরে নিন’, বলে প্যাকেটটা মাটিতে রেখে ছাইগুলোর পাশে বসে পড়ল।

তাকিয়ে থাকল পূর্ব দিকের রক্তিম আকাশের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর তার থেকে একটু দূরে বসে পড়ল মেয়েটি।

‘কীভাবে যে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, ভেবে পাচ্ছি না’, আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

‘আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়োজন নেই, একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এসবের ব্যবস্থা করেছেন।’

‘একটু খুলে বলুন তো।’

ইঞ্জিনিয়ার সম্পর্কে সংক্ষেপে সব খুলে বলল। তবে তার ধরা পড়ার কথা, টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা কৌশলে এড়িয়ে গেল। আজ সন্ধ্যার পর সে যে এসে তাদের অন্য দ্বীপে নিয়ে যাবে সে কথাও বলল।

সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল মেয়েটি। উঠতে গেল ছেলেটি।

‘বসুন, বসুন, বলতে ভুলে গেছি। প্যাকেটের মধ্যে একটা করে শার্ট-প্যান্ট, এক জোড়া কমন স্যান্ডেল, সেই সঙ্গে খাবারো আছে। আমি খাবার আনতে যাচ্ছি’, বলে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। একটু পরই একটা বড় প্লাস্টিকের টিফিন বাটি নিয়ে এসে বসল।

বেশ তফাতে বসে নীরবে খেয়ে চলেছে দুজনে। বেশ বেলা হয়েছে। ‘এই খাবারে দুপুরও চলবে।’ নীরবতা ভাঙল মেয়েটি। তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘আরে আপনার হাতে কী হয়েছে, ব্যান্ডেজ করা কেন?’ একবারে দুটো প্রশ্ন করল সে।

এতক্ষণ হাতটা লুকিয়ে রেখেছিল, কখন যে প্রকাশ্যে এসে গেছে তা খেয়াল করেনি ছেলেটি।

‘একটু কেটে গেছে, ও এমন কিছু না।’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

১৭ এপ্রিল, ২০২০ , ১২:০৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭

(পর্ব-৭)

‘হয়তো পারব। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ায় ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি।

কোনো কিছু না বলে রাইফেলে ভর দিয়ে উঠতে গেল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুক।

‘আপনি আমাদের ধরে উঠুন।’

‘যখন প্রয়োজন হবে, আমি নিজেই বলব’, ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে সে।

নৌকাটা কাছে আনার জন্য চলে গেল আগন্তুক। রাইফেলে ভর দিয়ে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছে ছেলেটি। তার একটু দূর দিয়ে হাঁটছে মেয়েটি।

নৌকা এগিয়ে চলেছে সমুদ্রে ঢেউয়ে দুলতে দুলতে। নৌকার পেছনে বসে দাঁড় বাইছে আগন্তুক। স্বল্প পরিসরে পাটাতনে দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে দুজনে। নৌকার গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে ছেলেটি। মেয়েটি সোজা হয়ে বসে আছে। ‘আপনি আমাদের দেখতে পেলেন কীভাবে?’ হঠাৎ করেই আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। ডানদিক থেকে মুখ ফেরাল আগন্তুক। ‘মৎস্য শিকার আমার পেশা। সারাদিন সমুদ্রে থাকতে হয়, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। আজ ওদিক থেকে ফিরছিলাম’, বলে যেদিকে তারা যাচ্ছে তার উল্টো দিক দেখাল লোকটি। ‘সন্ধ্যার আবছা আলোয় হঠাৎ আপনাদের অস্পষ্ট দেখতে পেলাম। সাধারণত ওই জায়গার আশপাশে কেউ যায় না।’

‘কেন কেউ যায় না?’ লোকটির কথার মধ্যে প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘কোনো কারণ নেই, এমনিতেই কেউ ওদিকে সহজে যায় না। ওই জায়গাটা সব সময় নির্জন দেখি, তাই দূর থেকে মানুষ দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আমি আবার বরাবরই কৌতূহলী। সৈকতে নেমে পড়লাম, তারপরই তো প্রথম ওনার সঙ্গে দেখা’, বলে ছেলেটির দিকে ইঙ্গিত করল লোকটি।

পাশে একটা ঝুড়িতে মাছ চোখে পড়ল মেয়েটির। ঝুড়ির অর্ধেকটা কয়েক ধরনের সামুদ্রিক মাছে ভর্তি। ছেলেটির মতো সেও হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। একসময় পথ ফুরিয়ে গেল। নৌকা থেকে সবাই নামল। লোকটি নৌকাটিকে ডাঙায় তুলে রাখল, যাতে সমুদ্রের ঢেউয়ে পানিতে নৌকাটি ভেসে না যায়। আশপাশে আরো দুটো নৌকা আছে।

মাথায় মাছের ঝুড়িটি নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল লোকটি। পেছনে দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি লোকটির পেছন পেছন চলছে দুজনে। ছেলেটি মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।

‘আমাদের আবার ধরিয়ে দেবে না তো?’ বাংলায় জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আল্লাহই ভালো জানেন, দেখা যাক কী হয়।’ দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি। আর কিছু না বলে হাঁটায় মন দিল। নৌকায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিল বলে এখন হাঁটতে পারছে। তা না হলে হয়তো পারত না। মাঝে মধ্যে পেছনে ঘুরে তাদের দেখছে লোকটি। আর কতদূরে যেতে হবে ভাবছে ছেলেটি। রাইফেলে ভর দিয়ে আর এগোতে পারছে না। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল সামনে একটা বাড়ির ভেতর থেকে আলো আসছে। বাড়িটার খুব কাছাকাছি আর কোনো বাড়ি চোখে পড়ল না। যেগুলো আছে সেগুলো একটু তফাতে।

কী মনে হতেই যতদূর সম্ভব দ্রুত এগিয়ে লোকটির পাশে গিয়ে বলল মেয়েটি, ‘আমাদের কথা আপনার বাড়ির বাইরে যাতে না যায়, সে জন্য ব্যবস্থা করবেন।’

‘তা আমাকে বলতে হবে না’, হেসে বলল লোকটি।

প্রথমে দুজনকে একটা ঘরে এনে বসাল। এরপর তাদের হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করে দিল।

হাত-মুখ ধুয়ে উভয়ে কেবল ঘরে গিয়ে বসেছে, এমনি সময় লোকটি একটা ছোট টিনের কৌটা হাতে ঘরে ঢুকল।

‘আপনি নাকি পায়ে আঘাত পেয়েছেন? খুব ব্যথা হচ্ছে, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে তার কথায় সায় দিল ছেলেটি।

‘এই মালিশটা লাগান, আধা ঘণ্টার মধ্যে ব্যথা একদম কমে যাবে, পা ফেলে হাঁটতে পারবেন। যাওয়ার সময় এটি হাতে নিয়ে যাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ছোট ছেলে খাবার নিয়ে আসবে, খেয়ে নেবেন। আমি সারাদিন সমুদ্রে ছিলাম, তাই গোসল করব।’ ‘গুডলাক’ বলে লোকটি চলে গেল।

ততক্ষণে কৌটাটির ঢাকনা খুলে ফেলেছে ছেলেটি। মালিশ লাগাতে শুরু করল।

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ছোট ছেলে গমের আটার গরম গরম রুটি, সেই সঙ্গে গরম আলু ভাজি নিয়ে এলো।

খাবার দেখে দুজনে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকায় কেউই বেশি খেতে পারল না। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকল লোকটি।

‘কি, ভালোভাবে খেয়েছেন তো?’

মাথা কাত করে জবাব দিল দুজনেই।

‘আমি আপনাদের পালানোর ব্যবস্থা করছি, আপনারা ততক্ষণে বিশ্রাম নিন’, বলে চলে গেল লোকটি। মেয়েটি চুপচাপ বিশ্রাম নিতে লাগল। আর ছেলেটি তার পায়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে গেল। তারপর এশার নামাজ পড়ে বিশ্রাম নিতে বসল। এদিকে সময় বয়ে চলল তার আপন গতিতে।

অনেকক্ষণ পর ঘরে ঢুকল লোকটি। তার আগমনের শব্দ পেয়ে দুজনেই মুখ তুলে তাকাল। মেয়েটির তন্দ্রাভাব এসেছিল। লোকটির কথা শুনে তা কেটে গেল।

‘আপনাদের পালানোর জন্য আপাতত নৌকা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। তাই নৌকাই জোগাড় করেছি’, বলে একমুহূর্ত থামল লোকটি।

‘তাই যথেষ্ট’, বলল ছেলেটি।

‘কিন্তু একটু সমস্যা আছে।’

‘কী সমস্যা?’ এবার মেয়েটি জানতে চাইল।

‘আমি বা আর কেউ তো আপনাদের সঙ্গে যাবে না, নৌকা চালাবে কে?’ কাঁচুমাচু করে বলল লোকটি। যেন সে যাবে না বলে লজ্জিত হয়েছে।

‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম আমার। আমি শখ করে পদ্মায় নৌকা চালিয়েছি। হয়তো সমুদ্রে নৌকা চালাতে খুব বেগ পেতে হবে না’, বলল ছেলেটি।

আপনি নৌকা চালাতে পারেন? মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বলল ছেলেটি।

‘না, কখনো চালাইনি, তবে অনেকবার নৌকায় চড়েছি।’

‘তাহলে আর দেরি কেন, উঠে পড়ি। কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ ছেড়ে অনেক দূরে যাওয়া উচিত’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। এর মধ্যে পায়ের ব্যথাটাও প্রায় উধাও হয়ে গেছে। মালিশের কৌটাটা রেখেই দুপায়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে বের হয়ে এলো। কাঁধে রাইফেল, গায়ে চাদরটি জড়িয়ে নিচ্ছে। বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল তারা।

‘আমার অতিরিক্ত কাপড় থাকলে আপনাকে দিতাম।’ বলেই মুখ নীচু করে ফেলল লোকটি। ছেলেটির গায়ে তেমন কাপড় নেই, তা আগেই দেখেছে লোকটি।

‘না, না, ঠিক আছে, আমার আর কাপড়ের প্রয়োজন নেই’, লোকটির লজ্জিত ভাব দেখে তাড়াতাড়ি বলল ছেলেটি। লোকটির স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে দুজনেরই খুব খারাপ লাগল। এই বিপদগ্রস্ত অবস্থায় এই অল্প সময়ে তারা তাদের জন্য যে আতিথেয়তা করেছে তা সত্যিই স্মরণীয়। যখন তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে, তখন সবাই চুপ করে ছিল। সবাইকে ভারি ক্লান্ত মনে হয়েছিল মেয়েটির।

লোকটির পাশে হেঁটে চলেছে ছেলেটি। বেশ দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পাশাপাশি এগোচ্ছে মেয়েটি। লোকটি তাদের জানাল, সে ও তার দুই ছেলে সমুদ্রে মাছ ধরে। তাদের তিনজনের তিনটা নৌকা। তার মধ্যে বড় ছেলেটির নৌকা তুলনামূলকভাবে বেশি মজবুত ও বড়। সেটাই তাদের দেয়া হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটির হাতে একটা টর্চ ও বল্লম ধরিয়ে দিল। আরো জানাল, তারা যদি পশ্চিম দিকে নৌকা চালিয়ে যায়, তবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের কোনো উপকূলে পৌঁছে যাবে। পথ ফুরিয়ে গেল। নৌকার কাছে এসে পৌঁছাল তারা।

‘নৌকার পাটাতনে দুই টিন বিস্কুট, বেশ কিছু রুটি, সাত-আটটা নারকেল, একটা বড় পাত্রে খাওয়ার পানি, সেই সঙ্গে আপনার পায়ের মালিশের কৌটা রাখা আছে। এসব হিসাব করে খরচ করবেন’, বলে থামল লোকটি।

‘আপনি যে আমাদের পালানোর সাহায্য করলেন, ক্যাপ্টেন জানতে পারলে আপনাদের ওপর অত্যাচার করবে না তো?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘সে বিষয়ে আমরা সতর্ক থাকব।’

‘আপনারা নৌকায় উঠুন’, বলল লোকটি।

এগিয়ে এলো মেয়েটি। ‘প্লিজ, হাত বাড়ান।’ বলে হাতের মুঠো খুলে ধরল সে। হাতের তালুতে রাখা স্বর্ণের চেনে হীরার কাজ করা। রাতের আলোতেও হীরা থেকে জ্যোতি বের হচ্ছে। লোকটি একবার সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল।

‘আমার আর দরকার নেই তো, নেই, নেব না। যে অবস্থায় আছি, তাতেই সন্তুষ্ট।’

‘আমার বাবা আমার ১৫তম জন্মদিনে এটা আমাকে উপহার দিয়েছেন। আপনি আমাদের উপকার করেছেন, তার বিনিময় হিসেবে নয়, বরং আপনাকে আমি এটা উপহার হিসেবে দিচ্ছি’, বলে দেয়ার জন্য হাত বাড়াল মেয়েটি।

‘নিন’, হাত বাড়াচ্ছে না দেখে আবার বলল, ‘হাত বাড়ান, প্লিজ নিন।’

কাঁপা কাঁপা হাত বাড়াল লোকটি। হাতে নিয়ে পকেটে রেখে দিল সেটা। আর দেরি না করে দুজনেই নৌকায় উঠে বসল। নৌকার নোঙরের বাঁধন খুলে দিয়ে নৌকাটা ঠেলে পানিতে নামানোর জন্য লোকটি নৌকায় হাত দিল।

‘আমি জানি আপনাদের এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য এ ডিঙ্গি নৌকা মোটেও উপযোগী নয়। তারপরও দিলাম। কারণ এর চেয়ে ভালো নৌকার ব্যবস্থা করে দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন’, বলল লোকটি। ‘আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করলেন। আপনাদের কথা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না।’ লোকটির কথা শেষ হলে বলল ছেলেটি। কিছু না বলে লোকটি ঠেলে নৌকাটি কোমর সমান পানিতে নামিয়ে দিল। ছেলেটি হাতে বৈঠা তুলে নিল।

তীর থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে নৌকা। পালওয়ালা ছোট ডিঙ্গি নৌকা। খুব জোর আট-দশজনের মতো জায়গা হবে। পাটাতনে মাত্র একজনের শোয়ার জায়গা হবে। তবে নৌকাটি বেশ মজবুত বলে ছেলেটির মনে হলো। একটু পর পাল তুলে দিল সে। পালে বাতাস লাগতেই বৈঠা রেখে হাল ধরল। বাতাস পড়ে গেলে বৈঠা কাজে লাগাবে। কাজটা এমনিতেই কঠিন, তার ওপর সে নৌকা চালানোয় আনাড়ি। নৌকা সামলানো তার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণও করেছে। তীর থেকে তারা বেশ দূরে সরে এসেছে। অর্থাৎ লোকটি তাদের বিদায় দিয়ে অনেকক্ষণ তীরে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ ফেরাল। নৌকা সামলানোয় মন দিল। বড় বড় ঢেউ নৌকাটিকে যেন ভেঙে চুরমার করে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। একটু এদিক-ওদিক হলে উল্টে যাবে নৌকা।

এ বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে মনে মনে প্রার্থনা করছে সে, ‘হে আল্লাহ! অনিশ্চিত এক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছি। তুমি আমাদের যাত্রা নিশ্চিত করো।’ এক পাখিডাকা ভোরে আমাদের কোনো এক তীরে পৌঁছে দিও…।’

নৌকা সমুদ্রে ভাসার পর হাত নেড়ে লোকটিকে বিদায় জানিয়েছিল মেয়েটি। তারপর নৌকার পাটাতনে সাজিয়ে রাখা জিনিসগুলো দেখায় মন দিয়েছিল। লোকটি যা বলেছিল তার সবই, তার মধ্যে একটি জিনিস বেশি দিয়েছে, কিন্তু তাদের বলেনি। হয়তো বলতে ভুলে গিয়েছিল। তা হলো এক বাক্স দিয়াশলাই। এ দিয়াশলাই তাদের কী কাজে আসবে তা বুঝতে পারল না সে। বোঝার জন্য মাথাও ঘামাল না। এখন ছেলেটিকে সাহায্য করা দরকার।

‘লোকটি দিয়াশলাইও দিয়েছে’, বলতে বলতে ছেলেটির দিকে ঘুরে তাকাল সে।

ভালোই হয়েছে’, বলে আবার নৌকা সামলানোয় মন দিল। পাশে রাখা বৈঠাটা হাতে তুলে নিল মেয়েটি।

‘বৈঠাটা রেখে এখন ঘুমিয়ে নিন। এক সঙ্গে দুজনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ব, তখন আপনি আমার জায়গায় আসবেন’, মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একবারে বলে থামল ছেলেটি।

ভেবে দেখল, ছেলেটি ঠিকই বলেছে। বৈঠাটা জায়গামতো রেখে পাটাতনে শুয়ে পড়ল। গায়ে টেনে দিল চাদর।

আকাশে চাঁদ নেই। তবে অসংখ্য তারা আছে। তারাগুলো রাতের অন্ধকারকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে। রাতের আকাশের অপূর্ব সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছে অনেক কথা। কী ভাবছে সে?

তীর থেকে নৌকা অনেকদূর সরে এসেছে। এখন নৌকার গতিপথ ঠিক করা দরকার। তারা পশ্চিম দিকে যাবে। টর্চের আলোয় কম্পাস দেখে দিক নির্ণয় করে নৌকার গলুই পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে দিল। দেখা গেল তারা মূল দ্বীপের পাশ দিয়েই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই বড় বড় ঢেউয়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে তারা, আবার পরক্ষণেই নীচে নেমে আসছে। ঢেউগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে নৌকা ঠিক রাখাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।

‘আচ্ছা, কী পুরস্কার ঘোষণা হতে পারে?’ হঠাৎই জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘তা তো বলতে পারব না, এমন কোনো আভাস ওই লোক দুটোর কাছে পাইনি। তারা শুধু বলেছে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে’, পরিষ্কারভাবে উত্তর দিল মেয়েটি। এখনো সে ঘুমায়নি। এক মুহূর্ত ভেবে, ‘আপনার স্বর্ণের চেনের মূল্য কত?’ আবার প্রশ্ন করল মেয়েটিকে।

‘তিনশ পনের ডলার’, জবাব দিল মেয়েটি। ‘এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?’

‘এমনি’, অন্যমনস্কভাবে বলল ছেলেটি।

নীরব হয়ে গেল দুজনেই। কিছুক্ষণের মধ্যে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়ল। সময় কেটে গেছে অনেকক্ষণ। কত রাত হয়েছে আন্দাজ করতে পারছে না ছেলেটি। কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ থেকে তারা নাগালের বাইরে চলে যেতে পারবে তো! এখন পর্যন্ত তেমন বিপদ ছাড়াই এসেছে। হাই উঠেছে। মুখে হাত দিয়ে হাই বন্ধ করছে। খেয়াল হলো- ‘হাই শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর হাঁচি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।’ হাই উঠলে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে; ঘুম ঘুম ভাব আসে। ইতোমধ্যে তারও ঘুম ঘুম ভাব এসে গেছে। মেয়েটি কি জেগেই আছে! তাকে ডাকবে কি না ভাবছে। চিন্তা করল, মেয়েটি অনেক পরিশ্রম করেছে। হয়তো এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন থাক, যখন একদম পারবে না তখন ডাকবে। চোখ ডলে ঘুম দূর করার চেষ্টা চালাল। তারপর চাদরটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। হিমশীতল বাতাস মাঝেমধ্যেই তার কাঁপুনি তুলে দিচ্ছে। বাঁ দিকে মূল দ্বীপ রেখে এগিয়ে চলেছে। দূর থেকে দ্বীপটাকে ভুতুড়ে মনে হচ্ছে তার।

হঠাৎ ডান দিকে দূরে কিছু দেখতে পেল। মনে হলো কোনো কিছুর অবয়ব। ভালোভাবে তাকাতেই বুুঝল, একটা দ্বীপ। দ্বীপটাতে হয়তো ছোট পাহাড়-টিলা আছে। রাতের ম্লান আলোতে ছেলেটির তাই মনে হলো। দ্বীপের দিক থেকে সরিয়ে নৌকা। বেশ কিছুক্ষণ আগে ডানে যে দ্বীপটা দেখে ছিল তা এখন পাশে রেখে এগিয়ে চলেছে। দুই দ্বীপের মাঝ দিয়ে চলেছে। ডানদিকের দ্বীপটার দিকে মূল দ্বীপটাই তাদের আছে। দুই দ্বীপের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এলো। দূরে মূল দ্বীপের বাতিগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে। এসব দেখতে এগিয়ে চলছে ছেলেটি।

এখন খরস্রোতা নদীতে খেলনা নৌকা যেমন, এই মহাসাগরে তাদের ডিঙি নৌকাটিও তেমন। পরিষ্কার বুঝতে পারল এ ঢেউয়ের প্রবল ধাক্কা তাদের এ নৌকা সামলাতে পারবে কিনা। এ সময় তার পক্ষে কী করা সম্ভব তা মাথায় ঢুকল না।

সামনে বিপদ দেখে মস্তিষ্ক যেন অসাড় হয়ে পড়েছে। কিন্তু সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। ঢেউটি আঘাত হানল নৌকাটির গায়ে। মুহূর্তে উল্টে গেল নৌকাটি। অবশ্য তার আগেই ছেলেটি ছিটকে খোলা সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। নিজেকে সামলে নিয়েই ঘুরে তাকাল। দেখল, নৌকাটি উল্টে গেছে। নৌকার তলাটি ওপরে এসেছে। গায়ে চাদর জড়িয়ে থাকায় ভেসে থাকতে তার অসুবিধা হচ্ছে, তাই খুলে পানিতে ফেলে দিল। চাদরটা যে পরে কাজে লাগতে পারে তা এ সময় তার খেয়ালই হলো না। ডুবে গেল চাদরটি।

আশপাশে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। তবে কি…. আর ভাবতে চাইল না সে। মেয়েটির জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কীভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় তা বুঝতে পারল না। নিজেকে ধমক দিল নিজেইÑ ‘তুমি অহেতুক মাথা গরম করছ, পদে পদে মাথা গরম করলে লাভ না হয়ে বরং ক্ষতি হয়, মাথা ঠান্ডা রেখে চিন্তা কর।’

ঘুমিয়ে পড়েছিল মেয়েটি। ঢেউয়ের আঘাতে যখন নৌকা বাঁ দিকে হেলে গিয়েছিল, তখন সেও বাঁ দিকে গড়িয়ে পড়ার সময় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। যখন তাকেসহ নৌকাটি উল্টে যায়, তখনো সে কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু এতটুকু বুঝেছিল, কোনো কারণবশত তাকে নিয়ে নৌকাটি উল্টে যাচ্ছে। উল্টে গেল নৌকা। সে পানির মধ্যে ডুবে গেল। নৌকাটি তাকে ঢেকে ধরল। মেয়েটি বুঝতে পারলে, তার ওপর নৌকাটি আছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যাতে না ঢোকে সেজন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল, বাঁ হাতে নাক টিপে ধরল। এ অবস্থায় যে কোনো দিকে ডুব দিয়ে কিছুদূর গিয়ে ভেসে উঠতে হবে। সে ডুব-সাঁতারও দিতে পারে। দম ফুরিয়ে আসছে, দ্রুত বের হতে হবে। যখন সে পানিতে পড়ে যাচ্ছিল, তখন গা থেকে চাদরটা সরিয়ে ফেলেছিল। ডুব দিয়ে এগোতে শুরু করল। মাথায় চোট লাগল নৌকার গায়ে। দম প্রায় শেষ। শ্বাস নেয়ার জন্য মৃদু অস্থির হয়ে উঠেছে সে। বেশি নীচে ডোবার সময় নেই। সামান্য একটু নীচে নেমে আবার এগোতে লাগল। কতটুকু ডুবে ছিল বলতে পারবে না। তবে এগোতে গিয়ে বুঝল তার ঘাড়ের ওপরে জামার গলায় কী যেন আটকে গেল। সেদিকে মন দেয়ার সময় নেই। শ্বাস নেয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সামনে এগোল। একসময় বের হয়ে এলো খোলা সাগরে। বুক ভরে সমুদ্রের তাজা বাতাসে শ্বাস নিল। এই প্রথম খেয়াল হলো তার গায়ে জামা নেই। ওপরের অংশ একেবারে অনাবৃত। থমকে গেল সে। বুঝতে পারল নৌকার তলা থেকে বের হওয়ার সময় নৌকার কোনো বর্ধিত কাঠের সঙ্গে আটকে গিয়ে ছিঁড়ে গেছে তার জামাটি। তারপর তা গা থেকে এমনিতেই খুলে গেছে। পানির ওপরে ভেসে ওঠার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় তা সে খেয়াল করেনি। এখনো কি ছেঁড়া জামাটা পাওয়া যাবে? ঝট করে ঘুরে গেল নৌকার দিকে। দেখল, নৌকাটি ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি নৌকার কাছে সরে এলো সে। পানির ওপর জামাটি নেই। তবে কি একদম ডুবে গেছে, নাকি নৌকার গায়ে আটকে আছে? যে দিক দিয়ে বের হয়েছে সে জায়গায় ডুব দিয়ে নৌকার গায়ে খুঁজল, কিন্তু পেল না। দম ফুরিয়ে যাওয়ায় ভেসে উঠল। বুঝল, পাওয়া যাবে না। অনর্থক মরীচিকার পেছনে ছুটে লাভ নেই।

হঠাৎ ছেলেটির কথার খেয়াল হতেই চারদিকে তাকিয়ে কোথাও তাকে দেখতে পেল না। ছেলেটি কি তাহলে… ভাবনাটা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটিকে ভুশ করে পানির ওপরে ভেসে উঠতে দেখল সে।

সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছে নৌকাটি। মাথা ঠান্ডা রেখে দ্রুত চিন্তার জগতে প্রবেশ করল ছেলেটি। অবশ্য এ রকম পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা দুরূহ কাজ। মেয়েটি তখন পাটাতনে ঘুমিয়ে ছিল। তার এখন নৌকার নীচে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে… যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু হাত দিয়ে দেখল, এভাবে পানিতে ভেসে থেকে নৌকা উল্টিয়ে সোজা করা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। এদিকে সময় ব্যয় না করে অন্য উপায় বের করে ফেলল। প্রথমে নৌকার গা ধরে ডুব দিল লবণাক্ত পানির মধ্যে। তারপর ঝুঁকি নিয়ে নৌকার তলায় ঢুকে পড়ল। এখানে মেয়েটিকে পেলে তাকে কীভাবে সাহায্য করবে এখনো তা নিয়ে চিন্তা করেনি। আগে তাকে তো খুঁজে পেতে হবে। দম ফুরিয়ে আসছে। ছোট নৌকার ভেতরটা খুঁজতে বেশি সময় লাগল না। সে অনেকক্ষণ দম ধরে রাখতে পারে। তাই একেবারে খোঁজা শেষ করে বের হয়ে এলো। দম নেয়ার জন্য ভেসে উঠতে এক অজানা ভয়ানক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল ছেলেটি। তবে কি সত্যিই মেয়েটি নৌকায় প্রচণ্ড বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে সমুদ্রে ডুবে গেছে? এখন সে কী করবে? নিজে বাঁচার চেষ্টা করবে নাকি আর কিছুক্ষণ মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করবে? উত্তর ঠিক করার আগে ভেসে উঠে দম নিয়ে চোখ মেলল।

‘আমি এখানে।’ বলে উঠল মেয়েটি নৌকার অপর দিক থেকে।

মেয়েটির গলার আওয়াজ শুনে চমকে ঘুরে তাকাল ছেলেটি। মেয়েটিকে চোখে পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মাথা থেকে যেন এক বিরাট বোঝা সরে গেল। মনে মনে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’

এবার কোন দিকে যাবে সে ভাবনায় ডুবে গেল ছেলেটি। বাম দিকে মূল দ্বীপ কাছে হলেও এখন আবার সেদিকে যাওয়া হবে চরম বোকামি। অতএব, ‘আমরা সামনের ওই দ্বীপে উঠব ইনশাআল্লাহ।’ হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল ছেলেটি। ‘আপনি সাঁতার কাটতে পারবেন তো?’ মেয়েটি যাতে দূর থেকে তার কথা শুনতে পায় সে জন্য চেঁচিয়ে কথা বলছে ছেলেটি।

‘পারব।’ জবাব দিল মেয়েটি।

‘তাহলে এগোনো যাক।’ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে এগোতে শুরু করল। মেয়েটি কিছু না বলে সারা শরীর পানির নীচে ডুবিয়ে শুধু মাথাটা ভাসিয়ে রেখে সাঁতরাতে শুরু করল। নদীতে সাঁতার কাটার চেয়ে সমুদ্রের সাঁতার কাটা সহজ। নদীর পানিতে পানিই প্রধান উপাদান হওয়ায় নদীর প্লাবতা কম। ফলে নদীর পানিতে ভেসে থেকে সাঁতার কাটা কষ্টকর। অপরদিকে সমুদ্রের পানিতে নানা ধরনের উপাদান দ্রবীভূত থাকায় সমুদ্রের পানির প্লাবতা বেশি হওয়ায় সমুদ্রের পানিতে ভেসে তাকা সহজ বলে সাঁতার কাটাও সহজ। সমুদ্রের পানি থেকে নদীর পানির প্লাবতা কম হওয়ার কারণে যখন কোনো জাহাজ সমুদ্র থেকে নদীতে প্রবেশ করে তখন সে জাহাজ থেকে কিছু মালপত্র সরিয়ে ফেলা হয়।

বেশ দূরত্ব বজায় রেখে দুজনে নীরবে এগিয়ে চলেছে। পানিতে ঠান্ডায় দুজনেই জমে যাওয়ার উপক্রম। দ্রুত সাঁতার কেটে শরীর গরম রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে উভয়ে। যতই দ্বীপের কাছে হচ্ছে, ততই দ্বীপের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্বীপে পৌঁছতে এখনো অনেক সময় লাগবে। মেয়েটি ভাবছে, শেষ অবধি পারবে তো তারা দ্বীপে পৌঁছতে? যদি দ্বীপে পৌঁছে যায়, তারপরে তার কী হবে?

সময় প্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটু দূর দিয়ে প্রায় সমান গতিতে এগোচ্ছে দুজনেই। একটু পরপর মেয়েটি ডানে তাকিয়ে দেখছে, ছেলেটি আছে কিনা। ছেলেটিও দেখছে, তবে প্রথমত অনেকক্ষণ পরপর, দ্বিতীয়ত একবার তাকিয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে।

যদিওবা এ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার মতো একটা নৌকা পেল, তাও তো ডুবে গেল। এখন মূল দ্বীপের অদূরেই আরেকটি দ্বীপে উঠতে যাচ্ছে তারা। কাল দিনে অনুসন্ধানীরা এ দ্বীপে হানা দেবে না তো! দিলেইবা কী করার আছে! লোকটি নৌকায় যা যা তুলে দিয়েছিল, সব ডুবে গেছে। তার একমাত্র অস্ত্র রাইফেলটা পাটাতনে রাখা ছিল, তাও ডুবে গেছে। এমনকি তাকে দেয়া টর্চ, কম্পাসটাও। এ দুটো সে তার পাশেই রেখেছিল। তারা একরকম নিঃস্ব হয়ে গেছে। মাথার ওপর দিয়ে একটা অ্যালবাট্রোস উড়ে যেতেই ভাবনায় ছেদ পড়ল ছেলেটির। অ্যালবাট্রোস একটা সামুদ্রিক পাখি। প্রাচীন যুগের নাবিকরা এ পাখিকে তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। সাঁতার কাটায় মনোনিবেশ করল ছেলেটি। ধীরে ধীরে হাঁপিয়ে উঠছে দুজনেই। এখনো বেশ কিছুদূর সাঁতরাতে হবে। তীরের কাছে এসে পড়েছে। ফিরতি ঢেউ ভেঙে এগোতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। সব কষ্টের অবসান ঘটিয়ে একসময় পৌঁছে গেল তীরে।

তারার আলোয় রাতের আঁধার ফিকে হয়ে গেছে। তাছাড়া অন্ধকারে থাকতে থাকতে এখন বেশ দূরেও দেখা যায়। চার হাতে-পায়ে ভর দিয়ে পানির নাগালের বাইরে সৈকতে পা ছড়িয়ে বসে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল ছেলেটি। একটু পর চোখ খুলে আশপাশে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। তার সঙ্গেই তো তীরে এসে পৌঁছল। তাহলে গেল কোথায়? সমুদ্রের দিকে তাকাতেই তাকে দেখতে পেল ছেলেটি। তীর থেকে দূরে একটা পাথর ধরে পানিতে ভাসছে মেয়েটি। শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির এ ধরনের আচরণের মর্ম বুঝতে পারল না সে। তীরে গিয়ে দাঁড়াল। একটু দূরে মেয়েটিকে সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে শুধু মাথা ভাসিয়ে মাথা নীচু করে থাকতে দেখল সে।

‘আপনি এখনো পানি থেকে উঠে আসেননি কেন?’

এ অবস্থায় কী করা যায় তাই ভাবছিল মেয়েটি। ছেলেটির সাড়া পেয়ে চমকে উঠল। দেখল ছেলেটি বেশ দূরে আছে। কী উত্তর দেবে তা ভেবে পাচ্ছে না।

‘কী ব্যাপার, চুপ করে আছেন কেন? ঠান্ডা লাগবে, তাড়াতাড়ি উঠে আসুন’, মেয়েটির কোনোরকম সাড়া না পেয়ে বলল ছেলেটি।

মেয়েটি ঠিক করল, লজ্জা ফেলে সত্যটাই প্রকাশ করবে। এছাড়া তো কোনো উপায় তার জানা নেই। এখন পর্যন্ত ছেলেটিকে দেখে যা মনে হয়েছে তাতে যে সে তার কোনো ক্ষতি করবে না এ বিষয়ে সে নিশ্চিত। কিন্তু কীভাবে বলবে, এক মুহূর্ত ভেবে সরাসরি বলে ফেলল, ‘আমার শরীরের ওপরের দিকে অনাবৃত’, বলেই থেমে গেল।

‘তার মানে?’ বুঝতে না পেরে বলল ছেলেটি।

‘নৌকার তল থেকে বের হতে গিয়ে হয়তো কোনো কিছুতে লেগে…’, বলেই থেমে গেল মেয়েটি। আর বলতে পারল না। ঠান্ডায় গা থরথর করে কাঁপছে।

মেয়েটি থামতেই, ‘থাক, আর বলতে হবে না, বুঝেছি। এখন কী করা যায়, হুম’ বলে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ ভাবল। ‘আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনে এগোচ্ছি। আপনি পানি থেকে উঠে আমার পেছনে পেছনে আসবেন। সাবধানে এগোবেন যেন কোনো বিপদে জড়িয়ে না পড়েন। আর কোনো অসুবিধা হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন, তখন দেখা যাবে।’ মেয়েটির উদ্দেশ্য দীর্ঘ এ বক্তৃতা দিয়ে ঘুরে একটু সামনে এগিয়ে দাঁড়াল ছেলেটি। মেয়েটির সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। বোকামি করে চাদরটি পানিতে ফেলে দেয়ার জন্য মনে মনে নিজেকে একশত একটা জুতোর বাড়ি মারল ছেলেটি।

ছেলেটির কথায় আশ্বস্ত হলো মেয়েটি। উঠে এসে ছেলেটির বেশ পেছনে দাঁড়াল।

‘উঠে এসেছি।’ এ অবস্থায় খোলা আকাশের নীচে দাঁড়াতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তার। লক্ষ্য রেখেছে ছেলেটির দিকে।

সামনে এগোচ্ছে ছেলেটি। হাঁটতে হাঁটতেই নিজেকে আদেশ করছে সেÑ ‘তোমাকে এ অবস্থায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। তোমাকে এ দুনিয়ায় পরীক্ষা দেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে। তোমাকে অবশ্যই পাস করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। হে আল্লাহ্, আমাকে তৌফিক দাও।’

দ্বীপটা কত বড় তা রাতের বেলায় আন্দাজ করা গেল না। এ দ্বীপে ছোট আকারের অনেক পাহাড়-টিলা আছে। তবে গাছপালার সংখ্যা খুবই নগণ্য। দ্বীপে বসতি আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। লাগাতার প্রচণ্ড পরিশ্রমে শরীর অবসন্ন হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় কমপক্ষে এক পক্ষের বিশ্রাম প্রয়োজন। পা দুটো আর চলতে চাইছে না। সৈকতেই বসে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটির; কিন্তু এখানে ঠান্ডা বেশি লাগবে। তার চেয়ে পাহাড়ের মধ্যে কোথাও আশ্রয় নিলে ঠান্ডা কম লাগবে। তীর থেকে বেশ দূরে দুটি টিলার মধ্যে পথ ঢুকে গেছে। পথ তো নয়, পথের মতো। সেদিকে তারা ঢুকে পড়ল। ছেলেটির কী পরিমাণ ঠান্ডা লাগছে তা নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারল মেয়েটি। তার তো জিন্সের প্যান্ট পরা আছে। ছেলেটির পাজামা নিশ্চয়ই এ জিন্সের মতো নয়। অবশ্য তার প্যান্টটা ভেজা বলে খুবই ঠান্ডা লাগছে। একটু পরপরই দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠক ঠক করে কেঁপে উঠছে সে। হঠাৎ খেয়াল হলো তার প্যান্টের পকেটে গ্যাস লাইটার আছে। ডালপাতা জোগাড় করে পাহাড়ের ভেতরে আগুন জ্বালালে কারো চোখে পড়বে না। সে আগুনে শীত অনেকটা নিবারণ করা যাবে। তারপরই স্মরণ হলো, সে আগুনের সামনে বসতে পারবে না। তাহলে… তাহলে ছেলেটিকে গ্যাস লাইটারটা দিয়ে দেবে। আগুনে তার শীত নিবারণ হলেও চলবে।

এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি। যেখানে দাঁড়িয়েছে তার চারদিকে পাহাড়-টিলায় ঘেরা। মাঝে অল্প পরিসরের সমতল জায়গা। এখানেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। ‘আমরা এখানেই বিশ্রাম নেব, আপনি কী বলেন?’ সামনে তাকিয়েই কথা বলছে ছেলেটি।

‘আমার আপত্তি নেই’, বলতে গলাটা কেঁপে উঠল মেয়েটির। দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠক ঠক শব্দ ছেলেটির কান অব্দি পৌঁছাল।

‘আপনার কি খুবই ঠান্ডা লাগছে?’ নিজেই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ছেলেটি। বেশ কিছুদিন থেকে খালি গায়ে থেকে ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেড়েছে তার। তারপরও সে ঠান্ডায় মৃদু কেঁপে চলেছে। সমুদ্রের তীরে খোলা সৈকতে থাকলে আরো বেশি ঠান্ডা লাগত।

‘লাগছে, তবে সহ্য করতে পারব’, সত্য কথাটাই ক্লান্ত গলায় বলল মেয়েটি।

একটু ভাবল ছেলেটি। ‘আপনার কাছে লাইটারটা আছে?’

‘আছে’, কোনোরকমে জবাব দিল। তার অনাবৃত শরীরে রাতের ঠান্ডা বাতাস যেন হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আপনি আপাতত ওই পাথরটির আড়ালে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকুন, আমি আসছি’, বলেই মেয়েটিকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে যে পথে তারা এসেছিল সে পথে পা বাড়াল ছেলেটি। সে কী করতে যাচ্ছে তা মেয়েটি বুঝে ফেলল। তাকে থামানোর জন্য হাত বাড়িয়ে ডাকতে গেল। কিন্তু ঠান্ডায় মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। অদৃশ্য হয়ে গেল ছেলেটি। অগত্যা ছেলেটির কথামতো বড় পাথরটির পেছনে গুটিসুটি হয়ে বসল। একটু পরেই বুঝতে পারল, পাথরটির পেছনে থাকায় একদিকে তার সামনে পাথরটি পর্দা হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে ঠান্ডাও একটু কম লাগছে।

যাওয়ার সময় পথের ধারে একটা মৃত গাছ চোখে পড়েছিল। সেটার কাছে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। গাছটা ছোট। দাঁড়িয়েই হাতে ভাঙার মতো সব ডাল ভেঙে একত্রে বোঝা করে ফিরল সে। ছেলেটির দেরি দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল মেয়েটি। কোনো ধরনের বিপদে পড়েনি তো? ছেলেটিকে ফিরতে দেখে খুশি হয়ে উঠল সে। মেয়েটিকে যেখানে বসতে বলেছে, সেখান থেকে বেশ দূরে বোঝাটি রাখল।

‘আপনি কোথায় আছেন?’ উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘এখানে’, পাথরের পেছন থেকে সাড়া দিল মেয়েটি।

‘শুনুন, আমি কিছুক্ষণের জন্য এখান থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আপনি এখানে এসে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিজেকে গরম করে নিন। ডালগুলোতে হয়তো সহজে আগুন ধরবে না। আমি যতক্ষণ না ফিরব ততক্ষণ আপনি আগুনের পাশেই থাকবেন। আমি ফিরলে বুঝতে পারবেন। অহেতুক অস্বস্তিতে থাকার দরকার নেই।’ মেয়েটিকে উদ্দেশ করে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামল ছেলেটি। যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই মেয়েটির কথায় থামতে হলো।

‘আমার দরকার নেই। লাইটার দিচ্ছি, আপনিই আগুনের পাশে বসে বিশ্রাম নিন’, বলতে বলতে লাইটার বের করার জন্য পকেটে হাত ঢুকাল। উল্টো দিকে ঘুরে আছে ছেলেটি। ‘এদিকে ঘুরুন, আমি লাইটার ছুড়ে দিচ্ছি। আমার চেয়ে আপনার অনেক বেশি ঠান্ডা লেগেছে।

উল্টো দিক থেকেই বলছে ছেলেটি, ‘প্লিজ জেদ করে কথা বাড়াবেন না। আপনি আগে…’, বলে আর দাঁড়াল না সে। দ্রুত সরে যেতে লাগল সেখান থেকে।

জানে, ছেলেটিকে ডেকে কোনো লাভ হবে না, তাই আর ডাকল না মেয়েটি। ঠান্ডায় কাঁপছে সে। তারপরও উঠতে দ্বিধা করছে। এ অবস্থায় সে কীভাবে আগুনের আলোয় বসবে! ছেলেটিকে সে অবিশ্বাস করছে না। তারপরও এক অজানা অস্বস্তি তাকে চেপে ধরেছে। অবশেষে ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে সমস্ত দ্বিধা-অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে উঠল। প্রথমে শুকনো ডালগুলোকে দুভাগ করে লাইটার দিয়ে একটা সরু ডালে আগুন ধরানোর চেষ্টা শুরু করল। অনেকক্ষণ পর ডালটাতে আগুন ধরাল। তারপর বাকি ডালগুলোতে আগুন ধরিয়ে অগ্নিকুণ্ড বানাতে খুব বেশি সময় লাগল না। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে শরীর। আগুনের পাশে বসে থাকতে খুবই ভালো লাগছে তার। শরীরটা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। ঠান্ডা দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্তিও অনেকটা দূর হয়ে গেল। সে এখন পর্যন্ত ছেলেটিকে যতটুকু দেখেছে তাতে তার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, ছেলেটি এখান থেকে অনেক দূরে আছে, আর দূর থেকে এদিকে তাকিয়েও নেই। তাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে তা হলোÑ সে এ দ্বীপে উঠে আসার পর থেকে ছেলেটি তার দিকে ফেরেনি, আর তার দিকে তাকানোর তো প্রশ্নই উঠে না। এর আগেও নিত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া সে তার দিকে চোখ তোলেনি। অথচ এ পর্যন্ত কত ছেলেই না তার পেছনে ধরনা দিয়েছে। আর ক্যাপ্টেন তো তার জন্য একরকম পাগল হয়েছে বলে তার মনে হয়। নাহ, ছেলেটি সত্যি বড়ই অদ্ভুত। এ ধরনের মানুষের কাছে সর্বাবস্থায় যে কোনো মানুষ নিরাপদ, ছেলেটির সম্পর্কে তার এমনই ধারণা জন্মেছে। ডালগুলো ধীরে ধীরে পুড়ছে। পট পট শব্দে ডাল ফুটছে। সেই সঙ্গে আগুনের তেজও কমে আসছে। একসময় আগুন নিভু নিভু পর্যায়ে চলে এলো। বাকি অর্ধেক ডাল ছেলেটির জন্য রাখল।

উঠে আগের জায়গায় গিয়ে আগের মতো পাথরটির আড়ালে বসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলোÑ এখন তো রাত। পাথরের আড়ালে গুটিসুটি মেরে থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু কাল দিনে সে কোথায় লুকাবে? দূরে আবছার মতো কিছু এদিকে আসতে দেখে ভালোভাবে তাকাল। আরো কাছে এলে ছেলেটির কাণ্ড দেখে একটু আগের ভাবনার কথা বেমালুম ভুলে গেল। ছেলেটি যে রীতিমতো উল্টো দিকে হাঁটছে।

পাহাড়-টিলায় পরিবেষ্টিত জায়গাটি থেকে ছেলেটি দূরে চলে এসেছে। সৈকতের যেখানে তারা উঠেছে, সেখানে পৌঁছে গেছে। সমুদ্রের দিক থেকে বয়ে আসা হিমশীতল বাতাসে ঠক ঠক করে কাঁপছে। খানিকক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করে সৈকত ধরে পা বাড়াল। নৌকা থেকে দ্বীপটাকে তেমন বড় মনে হয়নি। তাকে আগে জানতে হবে এ দ্বীপে জনবসতি আছে কিনা। যেহেতু এ দ্বীপটা পাহাড়-টিলায় ভরপুর তাই তা জানার সহজ উপায় বের হলো দ্বীপের সৈকত ধরে চতুর্দিক ঘুরে দেখা। এখানে বাড়িঘর থাকলে তা সৈকতের পাশে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তানা হলে তীরে কমপক্ষে একটা হলেও মূলদ্বীপে যাতায়ের জন্য নৌকা থাকবে। দ্বীপের জনবসতি সম্পর্কে খোঁজখবরটা বিশ্রাম নিয়ে পরে করলেও হতো, তাকে যখন ওখান থেকে সরে আসতেই হয়েছে, তখন একেবারেই খোঁজা শেষ করে ফিরবে।

ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে কোনোমতে দ্রুত এগোনোর চেষ্টা করছে ছেলেটি। কত সময় গত হয়েছে জানে না। তবে দ্বীপের সৈকত ধরে হেঁটে হেঁটে একসময় যেখানে বিশ্রাম নিয়েছিল সেখানে পৌঁছে গেল। মধ্যে দুবার খানিক বিশ্রাম নিয়েছিল। না, এ দ্বীপে জনবসতির কোনো চিহ্ন পেল না।

ঠান্ডায় তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন বিরতিহীনভাবে সে কেঁপেই চলেছে। এখন গিয়ে আগুনের পাশে বসা দরকার। কিন্তু শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নিজেকে বোঝাল, এখানে থাকার চেয়ে আগুনের পাশে গিয়ে বসাই ভালো হবে। ফিরতি পথ ধরল। ডানের পাহাড় পেরোলেই সে বিশ-পঁচিশ গজ দূরে মেয়েটিকে হয়তো আগুনের পাশে দেখতে পাবে। তাই ঘুরে পেছন দিক দিয়ে এগোতে লাগল। তবে ধীরে ধীরে, যেন কোনো কিছুতে হোঁচট খেয়ে না পড়ে। যেখানে আগুন জ্বালার কথা তা থেকে একটু দূরে থাকতেই বুঝতে পারল আগুন জ্বালা নেই। তাহলে হয়তো মেয়েটিও আশপাশে নেই। ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল, মেয়েটির জ্বালানো আগুন প্রায় নিভে এসেছে। তার মানে বেশ কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটি এখানে ছিল। ভালোই হয়েছে, এখন নেই। বাকি কাঠগুলো দিয়ে আবার আগুন জ্বালিয়ে ফেলল। আগুনের আলোয় লাইটারটা কুড়িয়ে নিয়ে দেখল, তাতে গ্যাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। যা আছে, তা দিয়ে খুব জোর আর দুবার জ্বালানো যাবে। লাইটারটা মাটিতে রেখে দিয়ে নিজেকে উষ্ণ করার কাজে লেগে গেল। যখন সে মেয়েটির ওই অবস্থার কথা শুনেছে, তখন থেকেই ভাবছে, এর কী ব্যবস্থা করা যায়? এতক্ষণ ভালোভাবে ভাবার সুযোগ পায়নি। তবে এবার পেল। এখনতো অনেক রাত। দিনের আলো ফুটলে তার কী অবস্থা হবে। তার কাছ থেকে এমনিতে দূরে সরে থাকলেও কোনো প্রয়োজনে তার কাছে যেতে পারবে না। দিনে পালাতে হলে সে তার সঙ্গে পথ চলবে কীভাবে? তাছাড়াও বড় কথা হলো সন্ধানী দল এসে পড়লে তার কী অবস্থা হবে, একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। অথচ তাকে দেয়ার মতো তার কোনো কাপড়ই নেই। অবশেষে অনেক চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিল, আবার সে মূল দ্বীপে ফিরে যাবে। জেলেকে বলে তার মাধ্যমে মেয়েটির কাপড়ের ব্যবস্থা করবে সেই সঙ্গে আর একটা নৌকা জোগাড়ের চেষ্টা করবে।

অনেকক্ষণ আগুনের পাশে থেকে বিশ্রাম নিয়ে অনেকটা ভালো লাগছে তার। দিনের বেলা দ্বীপে যাওয়াটা বোকামি হবে। দেরি না করে এখনই রওনা দেয়া উচিত। রাতের আর বেশি বাকি নেই। পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখল সুবহে কাজিব শুরু হয়েছে। উঠতে গিয়েও কী ভেবে বসে পড়ল। মেয়েটিকে বলে যাওয়া দরকার। তা না হলে চিন্তা করবে। কারণ তার ফিরতে দেরি হতে পারে। হয়তো মেয়েটি গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তার খুবই পরিশ্রম হয়েছে কিনা! তাকে না ডেকে বরং একটা সরু শক্ত ডাল নিয়ে মাটিতে লিখে উঠে দাঁড়াল।

যখন মূল দ্বীপে পৌঁছল তখন সূর্য ওঠার আর অল্প বাকি। ফজরের নামাজ আদায় করে নিল সৈকতে। এতক্ষণ সাঁতার কেটে আর এগোতে শক্তি পাচ্ছে না। তাছাড়া প্রচণ্ড ক্ষিধেও লেগেছে। কিন্তু এখানে পড়ে থাকলে চলবে না। পূর্বাকাশ থেকে টকটকে লাল সূর্যটা বেরিয়ে আসছে। তার এখান থেকে এখনই সরে পড়া দরকার। কারণ পাশেই গ্রাম। এতক্ষণে পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়ে থাকলে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে। তার গা এখনো ভেজা আছে। ঠান্ডায় কাঁপছে। তাকে এখানে যে কেউ দেখলে সহজেই বুঝে ফেলবে যে, সে কোনো দ্বীপ থেকে এসেছে। তখন মেয়েটি পড়বে মহাবিপদে। তা ছাড়া ওই জেলের বাড়ি এখান থেকে দক্ষিণ দিকে। যত কষ্টই হোক এগোনো দরকার। অবশেষে নিস্তেজ শরীর নিয়ে এগোতে লাগল। গ্রামের পাশ থেকে অনেকদূর সরে গেছে। দ্বীপটাও পেছনে এসেছে। সূর্য আধ-বাঁশ পরিমাণ ওপরে উঠে গেছে। আরো বেলা হওয়ার আগেই তার জেলের বাড়িতে পৌঁছতে হবে। এখন সে মাতালের মতো পা ফেলছে। এক সময় অতি ক্লান্ত হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সৈকতের ওপর। চেষ্টা করেও উঠতে পারল না।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের ফলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বলতে পারবে না সে। যখন ঘুম ভাঙল তখন অনেক ওপরে উঠে গেছে সূর্য। চোখ মেলে দেখল তার চারপাশে অনেক লোক। হয়তো তাদের কথায় তার ঘুম ভেঙে গেছে। হঠাৎই বুঝতে পারল যে সে বন্দী হয়ে গেছে। উঠে বসল সে। পালানোর চেষ্টা করল না। জানে, লাভ হবে না। চুপ থাকাই শ্রেয়। তাকে কেউ কিছু বলছেও না। তারা নিজেদের মধ্যেই তার ব্যাপারে নীচু গলায় কথা বলছে। চারদিকে তাকাতে গিয়ে চোখ পড়ল সেই জেলের ওপর। চুপ করে আছে। চোখাচোখি হতেই দুজনেই চোখ সরিয়ে নিল। তার চোখে-মুখে অবাক হওয়ার ছাপ। হয়তো সে ভাবছে এ ছেলে আবার ফিরে এলো কেন? মেয়েটিইবা কোথায়? তার গা এর মধ্যে শুকিয়ে গেছে বলে মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল। লোকগুলোর কথায় বুঝল ছেলেটিÑ তাদের উভয়কে বা যে কোনো একজনকে ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে একশত ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। হেড কোয়ার্টারে সংবাদ দেয়া হয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা জিপ এসে গেল। তাকে জিপের পেছনে তোলা হলো। জিপে সে ছাড়াও একজন ড্রাইভার, একজন অফিসার ও চারজন অস্ত্রধারী আছে। স্টার্ট নিল গাড়ি।

‘আমাকে সঙ্গে নিন, আমি ওকে আগে পেয়েছি’, বলতে বলতে একজন জিপের পাশে এসে দাঁড়াল।

‘আমি আগে দেখেছি’, বলে আর একজন এগিয়ে এলো।

‘থাম তোমরা’, ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে ধমকে উঠল অফিসার। ‘আগে এর ব্যবস্থা হোক।’ হাত দিয়ে ছেলেটিকে দেখাল। ‘তারপর তোমাদের ব্যবস্থা হবে, এখন চেঁচামেচি করো না, যাও।’

আর কেউ এগিয়ে এলো না। চলতে শুরু করল গাড়ি। হেড কোয়ার্টারের সামনের চত্বরে পৌঁছে গেল। টেনেহিঁচড়ে ছেলেটিকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। সামনে একটা টি টেবিলের পেছনে চেয়ারে বসে আছে ক্যাপ্টেন শান্তভাবে। মুখ দেখে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল ছেলেটি। কিন্তু তেমন কিছু বুঝতে পারল না। ক্যাপ্টেনের ডান দিকে রাখা একটা টুলের ওপর তাকে বসানো হলো। তার পেছনে স্থির হয়ে দাঁড়াল দুজন অস্ত্রধারী গার্ড।

‘তারপর কেমন আছেন হিরো সাহেব?’ নিষ্ঠুর হেসে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘আলহামদুলিল্লাহ।’

‘তার মানে?’

‘আল্লাহ যেভাবে রাখেন, তাতেই সন্তুষ্ট।’

‘ওহ, তার মানে তুমি পাক্কা মুসলমান!’ গম্ভীর হয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘ভালোই জানেন দেখছি।’

‘একসময় ক্যামব্রিজের ছাত্র ছিলাম, যাক গে তো হিরোইন কেমন আছে?’

কিছু বলল না ছেলেটি।

‘এটার উত্তর না হয় নাই দিলে, এটার উত্তরÑ তা হলো, সে কোথায় আছে?’

এবারো কিছু বলল না ছেলেটি।

‘তুমি খুবই চালাক মানুষ।’

‘আমি চালাক নই।’ মুখের ওপর জবাব দিল ছেলেটি।

কিন্তু রেগে গেল না ক্যাপ্টেন। বরং অট্টহাসি দিয়ে উঠল। হাসি থামিয়ে বললÑ

‘দুঃখিত, আমারই বলতে ভুল হয়েছে। তুমি চালাক নও, চালাক হয় শিয়াল। তুমি শিয়াল নও অতি ভদ্র মানুষ। শেষ তিনটিতে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল।

‘ভদ্র মানুষ কখনো চালাক হয় না, হয় বুদ্ধিমান। সশব্দে হেসে উঠল।

তাই তুমি অতি বুদ্ধিমান। থামল।

‘তুমি শুধু অতি বুদ্ধিমান নও, ভয়ঙ্কর সাহসীও। আর এ ধরনের বুদ্ধিমান-সাহসীরা মাঝেমধ্যে ফাঁদে পড়ে যায়, তোমারও হয়েছে সেই অবস্থা। কি ঠিক বলেছি?

ছেলেটি চুপ করেই থাকল।

মেয়েটিকে যে কাপড় পরতে দেয়া হয়েছিল, তাতে এক ধরনের সেন্ট দেয়া হয়েছিল। সে কোনোভাবে পালালেও যেন তাকে কুকুরের সাহায্যে দ্রুত ধরা যায়, মেয়েটি সে কাপড় পরেও ছিল। কিন্তু পালানোর সময় সেটি খুলে নিজের জামাটি পরে পালিয়েছে। নিজের জামাটি পরে পালানোর কথা নিশ্চয়ই তুমি তাকে বলেছ। কি, ঠিক বলেছি? জবাব দাও। এবারো কোনো জবাব দিল না ছেলেটি। তবে ক্যাপ্টেনের ক্ষমতা দেখে সে রীতিমতো আশ্চর্য হলো।

ঠিক আছে। জবাব দেয়ার দরকার নেই। কারণ জবাবটা আমার জানা। তবে সেন্ট ব্যবহারের ব্যাপারটা ধরতে পারা বেশ কঠিন ছিল।

ছেলেটি বুঝতে পারছে, তাকে নরম করার জন্য ক্যাপ্টেন চেষ্টা চালাচ্ছে। সতর্ক হয়ে গেল সে।

সকাল বেলা জানা গেল, মেয়েটি পালিয়েছে, বাংলোর পেছনে দুজন গার্ড বন্দী। তারপর দ্রুত খোঁজ নিয়ে জানা গেল তুমিও পালিয়েছ। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে কষ্ট হলো না। তারপর কুকুর নিয়ে সমুদ্রের কাছে পৌঁছেই আমাদের থামতে হলো। কারণ, কুকুর তোমাদের ট্রাস হারিয়ে ফেলেছে। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তোমাদের ট্রাস পাওয়া যায়নি। তারপর বাধ্য হলাম, পুরস্কার ঘোষণা করতে। আজ সকালে সংবাদ পেলাম, তোমাকে সৈকতে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। যাক গে, এখন আসল কথায় আসি। বলে থামল ক্যাপ্টেন।

মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেল ছেলেটি যে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

মেয়েটি কোথায়? চিবিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। মুখের ভাবও পরিবর্তিত হলো।

জবাব দিল না ছেলেটি।

বুদ্ধিমানেরা জেনে-শুনে ভুল করে না, তাড়াতাড়ি বল। বলল ক্যাপ্টেন। এর মধ্যে সকালের নাশতা নিয়ে এলো একজন। আগে খেয়ে পরে কথা হবে। গলার স্বর নরম হয়ে এলো।

এতক্ষণে খেয়াল হলো, সে খুবই ক্ষুধার্ত। হাত ধুয়ে হাত বাড়াল ট্রের দিকে। তাকে যত্ন সহকারে বানানো গমের আটার পাঁচটি রুটি, কয়েক টুকরো পনির, কমলা ও আঙুর খেতে দেয়া হয়েছে। তৃপ্তি সহকারে খেল ছেলেটি।

পেট ঠান্ডা হলে নাকি মাথাও ঠান্ডা হয়। তো এবার মাথা ঠান্ডা করে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

মেয়েটি কোথায়, এবার উত্তর দাও। এবার শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটির কাছ থেকে এবারও কোনো জবাব না পেয়ে ধৈর্যচ্যুত হলো ক্যাপ্টেন।

জবাব দাও। চমকে গার্ড দুজন একহাত পিছিয়ে গেল।

আমি বলব না। ছেলেটির কণ্ঠে এমন কিছু যা ক্যাপ্টেনকে স্তব্ধ করে দিল।

আর একবার ভেবে দেখ।

‘ভেবে দেখেছি।’

পেছনের গার্ড দুজনকে কী যেন ইশারা করল ক্যাপ্টেন। দুজনই এগিয়ে এলো। একজন চুল ধরে দাঁড় করাল ছেলেটিকে। অনেকদিন থেকে চুল না কাটানোর ফলে অনেক বড় হয়েছে। ধরতে সুবিধাই হয়েছে লোকটির। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও চেঁচাল না। সহ্য করার চেষ্টা চালাল।

টেনেহিঁচড়ে তাকে সেই দুই খুঁটির মাঝে দাঁড় করাল। দুই হাত খুঁটির সঙ্গে বাঁধল শক্ত করে। বুঝতে পারছে সে তার ওপর কী ধরনের নির্যাতন চালানো হবে।

ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন। হাতে চাবুক। চুল খামচে ধরে ঝটকা দিয়ে মাথাটা সোজা করে ধরল ছেলেটির। এখনো সময় আছে, মুখ খোল, বল মেয়েটি কোথায়। মুখ কুঁচকে বলল ক্যাপ্টেন।

কোনো জবাব দিল না ছেলেটি।

বুঝেছি, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। বলেই শপাৎ করে চাবুক কষল ক্যাপ্টেন ছেলেটির গায়ে।

প্রচণ্ড আঘাত, কোনো রকমে সহ্য করল। মাথা ঝুলে পড়েছে। দ্বিতীয় আঘাতটা কোনোরকমে নীরবে ঠোঁট কামড়ে সহ্য করল। আল্লাহর কাজে এ নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা প্রার্থনা করছে। তা না হলে জ্ঞান হারাতে চাচ্ছে। পরপর দশ-বারোটা চাবুকের ঘা গায়ে পড়তেই জ্ঞান হারাল ছেলেটি।

চাবুক মারা থামাল ক্যাপ্টেন। নিজেও খানিকটা হাঁফিয়ে উঠেছে। ইশারা করতেই চেয়ার এসে গেল। ছেলেটির সামনে চেয়ার নিয়ে বসল। চোখে-মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো তার। অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাল।

কি, এবার মুখ খুলবে?

মাথা এপাশ-ওপাশ করে জবাব দিল ছেলেটি।

তুমি হয়তো জানো না, আমি যত শক্ত তত নরম। আমি তোমাকে শেষবারের মতো ঠান্ডা মাথায় ভাবার জন্য অবকাশ দিচ্ছি। আমি ইচ্ছা করলে তোমার কাছ থেকে কথা আদায় করার জন্য নানা ধরনের নির্যাতন করতে পারি। শুনবে, সেসবের বর্ণনা? থাক সে সব। তুমি অতি বুদ্ধিমান মানুষ, সামান্য একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য নিজের মৃত্যু ঘটাতে চাইবে না, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

তার মনে? ক্যাপ্টেনের কথায় অবাক হয়েছে ছেলেটি।

তার মানে খুব সোজা। এখন সাড়ে বারোটা বাজে। তোমার সময় আজ বিকেল চারটা পর্যন্ত। এর মধ্যে মুখ খুলতে রাজি হলে বেঁচে গেলে, তা না হলে আজ বিকেলে তোমার সাড়ে বারোটা বাজানো হবে। তোমার পেছনে দেয়ার মতো সময় নেই, তাই আজই তোমার ঝামেলা মেটাতে চাই। কারণ তোমাকে ছাড়াও আমরা তাকে খুঁজে পাব। বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল ক্যাপ্টেন। কথা শেষ করে একটু দূরে দাঁড়াল। তিনজন গার্ডের দিকে তাকিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইশারা করল। হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। দুজন গার্ডের কাঁধে ভর দিয়ে এগোতে লাগল। পেছনে আছে একজন। যেসব জায়গায় চাবুকের ঘা পড়েছে, সেসব জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে। রক্ত জমে গেছে, ফেটে বের হলে ভালোই হতো।

বাংলোর নীচতলায় একটা ঘরে এনে ঢুকাল তাকে। একাই রেখে চলে গেল তিন গার্ড। বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়া হলো দরজা। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। বসে মেঝেতেই। চারদিকে তাকাল। এই কামরায় ওপাশে বারান্দা নেই। জানালা আছে, লোহার মোটা শিক লাগানো। দরজা খোলা থাকায় বাথরুমের অংশবিশেষ দেখা যাচ্ছে। এছাড়া এ ঘরে আছে একটা খাট, একটা করে টেবিল-চেয়ার; ঘরের আসবাবপত্র বলতে এই। আর আছে একটা দেয়াল ঘড়ি। মেঝেতে অনেকক্ষণ পর বসে থেকে বিশ্রাম নিল। ঘড়িতে একটা বাজার এলার্ম বাজতেই উঠে পড়ল। বাথরুমে পানি আছে। অনেকক্ষণ পর বের হয়ে এলো বাথরুম থেকে। ঠান্ডা পানিতে গোসল করে ব্যথা, ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকখানি কমে গেছে। জোহরের নামাজ পড়ে শোয়ার জন্য কেবল বিছানায় চড়েছে, এমন সময় দরজা খুলে গেল। দুজন ভেতরে ঢুকল।

একজন খাবার ট্রে হাতে, অন্যজন গার্ড। কাঁধে রাইফেল।

মাছ দিয়ে ভাত দিয়েছে, সেই সঙ্গে আছে শাকসবজি। মাছটা সামুদ্রিক চেনে ছেলেটি। কিন্তু নামটা খেয়াল করতে পারল না। ওয়েটার ও গার্ড পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরও জিজ্ঞেস করল না। খাওয়া শেষে ট্রে নিয়ে বিদেয় হলো দুজন। দরজা ওপাশ থেকে লাগানোর পর জানালার কাছে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। তাকিয়ে দেখল বাইরে দুজন গার্ড এলএমজি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে এই প্রথম এদের কাছে এলএমজি দেখল।

বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ হয়ে গেল একসময়। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসল। ঘড়িতে দেখল, চারটা পাঁচ বাজে। বাথরুমে ঢুকে পড়ল। বাধা দিল না গার্ড তিনজন। প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। বাথরুমে থেকে বেরিয়েই আছরের নামাজ আদায় করে নিল। চারটা বিশে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। দুজন দুপাশে, একজন পেছনে। একবার তাকিয়ে দেখল, পেছনের গার্ড তার অস্ত্র বাগিয়ে ধরে রেখেছে। সকালের মতোই টি-টেবিলের ওপাশে একটা চেয়ারে বসে আছে ক্যাপ্টেন। তবে এবার তার জন্য টুলের বদলে চেয়ার রাখা হয়েছে। কেউ বসতে বলবে তার অপেক্ষা না করে বসে পড়ল ছেলেটি।

বিশ্রাম কেমন হলো? সহজ-সরলভাবে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

ভালো। সংক্ষেপে জবাব দিল ছেলেটি।

চিন্তাভাবনা করার অনেক সময় পেয়েছ। এবার বল কী ঠিক করলে।

আমি মুখ খুলব না, ভেঙে ভেঙে জবাব দিল ছেলেটি।

কোনো ভাবান্তর ঘটল না ক্যাপ্টেনের। বরং হাসতে হাসতে বলল, দুদিনেরও বেশি সময় উভয়ে তো বেশ ভালোই কাটাল, দুদিন অনেক সময়, এবার তাকে আমার কাছে ফেরত দাও। বল এখন সে কোথায়…।

কথা শেষ করতে পারল না ক্যাপ্টেন। পাশেই বসে ছিল ছেলেটি। তার কথা সহ্য করতে না পেরে ঠাস করে চড় মেরে দিল ক্যাপ্টেনের গালে। মুহূর্তে মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল ক্যাপ্টেনের। তবে ছেলেটিকে অবাক করে দিয়ে শান্ত হয়ে বসে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে আঙুলের ছাপ বসে গেছে গালে।

লম্পট, নিজে যে মন-মানসিকতায় থাকে, অন্যকেও তাই ভাবে, নিজে চোর দেখে সবাইকে চোর ভাবে।

মিথ্যা অপবাদ দেয়ায় প্রচণ্ড রেগে গেছে ছেলেটি। দ্রুত রাগ দমিয়ে শান্ত হয়ে গেল।

ছেলেটিকে এভাবে শান্ত হতে দেখে ক্যাপ্টেনও অবাক হলো।

এখনো সময় আছে, ভেবে দেখ। মেয়েটির সন্ধান দিলে তোমাকে মুক্তি দেয়া হবে। তুমি যেখানে যেতে চাও, বহাল তবিয়তে সেখানেই তোমাকে পাঠানো হবে। ছেলেটি শান্ত হতেই তার দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে বলল ক্যাপ্টেন।

এমনিতেই সে মেয়েটির সন্ধান দিত না। তার ওপর ক্যাপ্টেনকে থাপ্পড় মেরেছে, এখন মেয়েটির সন্ধান দিলেও তাকে সে ছাড়বে না। বরং তার অধীনস্থ গার্ডদের সামনে তাকে অপমান করার চরম প্রতিশোধ নেবে। এটা তার চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখ তার প্রতিশোধের আগুনে ধিক ধিক করে জ্বলছে।

‘আবারও বলছি এখনো সময় আছে। সসম্মানে মুখ খোল’, এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

তা না হলে আমার নব উদ্ভাবিত পন্থা তোমার ওপর প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করব, মুখ খোলাব। এ ধরনের পন্থা হয়তো এর আগে আর কেউ আবিষ্কার করেনি। বলেই হো হো করে হেসে উঠল ক্যাপ্টেন। হাসি থামিয়ে বললÑ

সেটা অনেকেই এর মধ্যে জেনে গেছে, হয়তো এখানকার মধ্যে একমাত্র তুমিই জানো না, সেটা হবে তোমার জন্য চমৎকার এক সারপ্রাইজ, বলে আবার হেসে উঠল ক্যাপ্টেন।

কোনো কথাই বলছে না ছেলেটি।

শেষবারের মতো ভেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছি।

ধন্যবাদ, আমি বলব না।

তাহলে ভালোই হলো। তোমার ওপরই মুখ খোলার পন্থাটার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করব। গম্ভীর হয়ে গেল সে।

তুমি গাড়ি চালাতে জানো? প্রশ্নটা করল ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেনের হঠাৎ এ ব্যতিক্রমধর্মী প্রশ্নে বিপদের গন্ধ পেল ছেলেটি। সতর্ক হয়ে উঠল। সে কখনো মিথ্যে বলে না। হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে হয়তো বিপদে পড়বে। কিন্তু সে গাড়ি চালাতে জানে। মিথ্যে বলবে কীভাবে? তবে কি সে এবার সত্য-মিথ্যার পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছে! যা হওয়ার হবে, সত্যই বলবে।

‘কী হলো, জবাব দিচ্ছ না যে?’ ছেলেটির জবাব দিতে দেরি হচ্ছে দেখে বলল ক্যাপ্টেন।

‘হ্যাঁ, পারি’, সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে বলল ছেলেটি।

‘ঠবৎু মড়ড়ফ, ণড়ঁ ধৎব ধ ৎবধষু যড়হবংঃ সধহ, ঃযধহশং.’ আমার নব উদ্ভাবিত পন্থার এটাই একমাত্র দুর্বল দিক, অর্থাৎ কেউ যদি প্রশ্নের জবাবে বলে যে সে গাড়ি চালাতে জানে না, তবেই তার জন্য আমার এ পন্থা অচল। আসলে মানুষের সৃষ্টির মধ্যে একটা না একটা দুর্বল দিক থাকবেই, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মধ্যে দুর্বল দিক নেই’, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

কোনো কিছু বলল না ছেলেটি। তাকিয়ে আছে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা ছাদ-দরজাবিহীন জিপের দিকে। জিপটা যে খুবই পুরনো তা দেখেই বোঝা যায়।

‘এবার শোন আমার নব উদ্ভাবিত মানুষের মুখ থেকে তথ্য বের করার পন্থাটা, এই পন্থা বেশ কিছুদিন আগেই আবিষ্কার করি এবং এর ওপর বেশকিছু দিন রিসার্চও করেছি, তবে প্রয়োগ করার সুযোগ এতদিন পাইনি, আজ তোমার ওপর প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। এ তো গেল ভূমিকা, এখন আসল কথায় আস, বলে এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

‘যেহেতু তুমি গিনিপিগ, এতএব তোমার জন্যই বলছি’, আবার থেমে শুরু করল।

‘এই যে পুরনো জিপটা দেখছ, ওটা সেকেলে আমলের হলে কী হবে, এখনো ভালোই চলে, তবে বর্তমানে ওটার ব্রেক ফাংশন ডাউন করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওটা ব্রেকহীন জিপ, কী মজার তাই না?’

এতে ক্যাপ্টেন মজার কী পেল তা বুঝতে পারল না ছেলেটি।

‘তবে জিপটার অন্যান্য ফাংশন ঠিক আছে। আমি তোমার জন্য নিজেই চেক করেছি, চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই জিপটাতে তুমি থাকবে এবং থাকবে একটা টাইম বোম।’

শেষের বাক্যটি শুনে ছেলেটি চমকে উঠল। ক্যাপ্টেনের কথা বিশ্বাস করতে তার কষ্ট হচ্ছে।

‘আরে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, জিপে তোমাকে শুধু বসে থাকতে হবে না, তুমি জিপটা চালিয়ে এখান থেকে নীচে নামাবে।’

এবারের শেষ বাক্যটা শুনে ঘামাতে শুরু করল ছেলেটি। ব্রেকহীন গাড়ি নিয়ে সে কীভাবে পাহাড়ি পথ ধরে নীচে নামাবে! ‘নীচে নামার সময় তোমাকে জিপের ক্লাচ, গিয়ার ও এক্সিলেটরের সাহায্যে নামাতে হবে। তাও সন্ধ্যার পর, তোমাকে অবশ্যই গাড়ির সিটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হবে এমনভাবে, যাতে তুমি গাড়ি থেকে নেমে যেতে না পারো।’ শান্তভাবে বলে চলেছে ক্যাপ্টেন, যেন ছোট বাচ্চাকে মিছেমিছি ভয় দেখাচ্ছে।

‘আর জিপে যে টাইম বোম থাকবে ওটার আরো একটা দিক আছে। সেটা হলো, বোমা বিস্ফোরণের যে সময়সীমা থাকবে তার অর্ধেকের মধ্যে যদি তোমার মতের পরিবর্তন হয়, তবে জিপে ওয়াকিটকি আছে, তার আছে, তার মাধ্যমে আমাকে জানাতে পারবে যে, তুমি মুখ খুলবে তাহলে……।’ বলে পকেট থেকে এন্টিনা লাগানো ছোট যন্ত্রটি বের করে আনল ক্যাপ্টেন।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭ 42

জাকির আহমদ

১১ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৬

(পর্ব – ৬)

‘তার মানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। ছেলেটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বলে উঠল মেয়েটি, ‘ও! বুঝেছি। এ কাপড়ের গন্ধে কুকুর খুব তাড়াতাড়ি আমাদের খুঁজে বের করবে।’

ওপরে-নীচে মাথা দোলাল ছেলেটি। সত্যি, মেয়েটির বুদ্ধি আছে।

‘বাথরুমে ঢুকে কাপড় বদলাই।’ বলল মেয়েটি।

‘আমিই বাথরুমে ঢুকছি, আপনি এখানে কাপড় বদলান। কাপড় বদলানো হলে দরজায় দুবার টোকা দেবেন।’ বলেই বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল ছেলেটি। ছেলেটি বাথরুমে ঢুকতেই বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল মেয়েটি। এপাশ থেকে দরজা লক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে স্প্রিংয়ের সাহায্যে দরজা সবসময় বন্ধ থাকে। শুধু ভেতর থেকে লাগানো যায়। এক মুহূর্ত ভেবে বারান্দা থেকে তার নিজের কাপড় এনে ঘরের বাতি নিভিয়ে অন্ধকারে কাপড় বদলাতে শুরু করল। দরজায় টোকা পড়ার একটু পরে বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো ছেলেটি। চোখ পড়ল দেয়াল ঘড়িতে। পেন্ডুলাম তার আপন নিয়মে দোল খাচ্ছে। দেখল, ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁই ছুঁই করছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি তার আগের পোশাকে।

‘সঙ্গে নেয়ার মতো আর কাপড় আছে কি?’

মাথা নাড়ল মেয়েটি।

‘চলুন তাহলে।’

প্রথমে ছেলেটি ফাঁক গলে বের হয়ে গ্রিল ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর কোমরে প্যাঁচানো কাপড়ের দড়িটা খুলে গ্রিলের একটা মোটা কাঠের সঙ্গে বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দিল। দেখল, নীচের প্রান্ত মাটি ছুঁই ছুঁই করছে। এরপর মেয়েটিকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করল।

ছেলেটির মতো মেয়েটিও বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রথমে গ্রিল ধরে ওপরে উঠেছে, তারপর টালির ছাদে দুহাত দিয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে নিজেকে বাইরে বের করে এনেছে। তারপর গ্রিলে ঝুলে পড়া কোনো সমস্যা হয়নি।

‘এখন ঝুলে নীচে নামতে পারবেন?’

‘পারব।’ জবাব দিল মেয়েটি। হয়তো বাইরের ঠান্ডা বাতাসে তার গলা কেঁপে গেল।

‘ঠিক আছে, সাবধানে নামুন। তারপর আমি নামব।’

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে দুই হাতে দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর কাঠের দেয়ালে পা ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো নীচে। মেয়েটি মাটিতে পা রাখতেই গ্রিল থেকে কাপড়ের দড়ির বাঁধন খুলে দিল ছেলেটি। তারপর লাফ দিয়ে নীচে। মাটিতে পা পড়তেই বসে পড়ল। পতনের শব্দটা বেশ জোরেই হলো। কাপড়ের রশি গুছিয়ে নিয়েছে ছেলেটি। এমন সময় মাথার ওপর সশব্দে জানালা খুলে গেল। জানালা থেকে প্রায় তিন হাত দূরে আবছা অন্ধকারে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। জানালা খুলে যেতে দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেল। ভীত হরিণীর মতো তাকাল ছেলেটির দিকে।

হঠাৎ ‘মেঁও ও’ ডাক শুনে আশপাশে তাকিয়ে কোনো বিড়াল দেখতে পেল না মেয়েটি। বুঝল এটা ছেলেটির কাজ।

‘ধ্যুত!’ বলেই জানালাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল অজ্ঞাত লোকটি। মনে মনে ছেলেটির উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করল মেয়েটি। আরো কয়েক মুহূর্ত যে যার যার জায়গায় স্থির হয়ে রইল। তারপর ছেলেটি কাপড়ের দড়ির বান্ডিলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই নড়ে উঠল মেয়েটি। বিনাবাক্যে পিছু নিল ছেলেটির। অল্পের জন্য বেঁচে গেল। তা না হলে বন্দী হতো দুজনেই। গাছপালার মাঝে ঢুকে পড়েছে। বাংলো এখনো চোখে পড়ে। অন্ধকারে বেশি দূরে দৃষ্টি যায় না।

চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। মাঝেমধ্যে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা হিম শীতল বাতাসে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। খালি গায়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। বাংলো থেকে আর একটু দূরে সরে গিয়ে বিছানার চাদরের টুকরো ও পর্দার কাপড়ের গিট খুলে সেগুলো গায়ে জড়িয়ে ঠান্ডা কিছুটা নিবারণ করা যাবে। একটা ঠান্ডা দমকা হাওয়ায় দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ করে উঠল ছেলেটির। সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হলো, ওই লোকটিও তো খালি গায়ে মাটিতে পড়ে আছে। সেও নিশ্চয়ই তার মতোই কাঁপছে। নাহ, লোকটিকে এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। সে অহেতুক ঠান্ডায় কষ্ট পাবে। লোকটির জন্য সে কী করতে পারে তা নতুন করে ভাবার দরকার হলো না। বাংলো থেকে বেশি দূরে আসেনি তারা। এখন ফিরে যাওয়া ঝুঁকিবহুল হলেও লোকটিকে ওভাবে ফেলে যেতে মন সায় দিল না ছেলেটির। দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘আমার একটু কাজ আছে, দয়া করে এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ান। আমি একটু পরেই ফিরে আসব। আর আমার বিপদ হয়েছে বুঝতে পারলে, আপনি চলে যাবেন।’ এক নিঃশ্বাসে বলে থামল ছেলেটি।

‘কী কাজ?’

‘আপনার না শুনলেও চলবে।’

‘আমার একা থাকতে ভয় লাগবে।’

হেসে ফেলল ছেলেটি। ‘চালাকি, না! আচ্ছা, আসুন আমার সঙ্গে।’ আবার গম্ভীর হয়ে গেল সে।

পৌঁছে গেল লোকটির কাছে। লোকটিকে এ অবস্থায় দেখে যা বোঝার বুুঝে নিল মেয়েটি। একবার লোকটির দিকে, আর একবার ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না, ছেলেটি তার ওই জখমওয়ালা দুর্বল শরীর নিয়ে কীভাবে এ লোকটিকে বন্দী করেছে? আবর এ লোকটির কাছে ফিরেইবা এলো কেন?

কারো আসার শব্দে চোখ মেলল লোকটি। ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটিকে দেখে খুব অবাক হয়েছে। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। তাকে কি আরো কষ্ট দেয়ার জন্য ছেলেটি আবার এসেছে?

ছেলেটির কাজ দেখে মেয়েটি। গিট খুলে পর্দা, চাদরের টুকরো আলাদা করে ফেলল। এক মুহূর্ত থামল। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর একটা দরজার পর্দা মাটিতে বিছিয়ে দিল। উঠে লোকটির কাছে এসে ‘ম্যাডাম, আমাকে একটু সাহায্য করুন।’ বলে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল কী করতে হবে। এক মুহূর্ত আবাক হয়ে মেয়েটি তাকিয়ে থাকল তার দিকে।

দুজনে মিলে ধরাধরি করে লোকটিকে কাপড়ের পর্দার ওপর শুইয়ে দিল। আর একটা পর্দা দিয়ে লোকটিকে ঢেকে দিতে যাবে, এমন সময় যেন তাদের দুজনকে চমকে দিয়ে ভেসে এলো কণ্ঠটি।

‘ও দোস্ত, বেরিয়ে আস, মাফ করো, আসতে দেরি হয়ে গেল।’ এক মুহূর্ত থামল।

‘কী ব্যাপার বেরিয়ে এসো, এখন আমার পালা, যাও ঘুমিয়ে পড়।’

কথা কানে আসতেই প্রথমে স্থির হয়ে গেল দুজনেই। বিমূঢ় ভাবটি প্রথমে ছেলেটিই কাটিয়ে উঠল। কথা বলার সময়, সুযোগ কোনোটাই নেই। লোকটি কাছেই আছে। এদিকেই আসছে।

‘এদিকে আসুন।’ চাপা গলায় বলে ছেলেটি একটা বড় গাছের নীচে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও তার পাশে এসে দাঁড়াল। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

‘কোনো শব্দ করবেন না’, বলল ছেলেটি। চোখ পড়েছে একটু দূরে থাকা রাইফেলটির ওপর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল দ্রুত। পা টিপে টিপে দ্রুত সেখানে পৌঁছে গেল। রাইফেল হাতে নিয়ে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তার একটু পাশ দিয়ে লোকটি চলে গেল। কিন্তু সামনে নজর থাকায় তাকে দেখতে পায়নি। এগোতে এগোতেই বলছে, ‘আরে দোস্ত, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পাহারা দেয়া হচ্ছে নাকি?’

কয়েক কদম এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল আগন্তুক। আন্দাজ করে ফেলেছে কী ঘটেছে। ঘুরে দাঁড়াতে যাবে, কিন্তু তার আগেই রাইফেলের নল পিঠে ঠেকে গেল এবং শুনল, ‘হাত দুটো মাথার ওপরে তুলুন, ঝামেলা বাধালে গুলি করতে দ্বিধা করব না।’ শীতল গলায় বলল ছেলেটি। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম পালন হলো। হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল আগন্তুক।

‘প্রথমে বসে পড়ুন, তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন’, নির্দেশ করল ছেলেটি। নির্দেশ পালন করতে করতে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল লোকটি, ‘কে আপনি, কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন?’

‘যাকে আজ বিকেলে বনে নির্বাসন দিয়েছিলেন’, জবাব দিল ছেলেটি।

‘আপনি!’ অবাক হয়েছে লোকটি। ‘এ কী করে সম্ভব?’ উত্তেজনায় আওয়াজ একটু উঁচুই হয়ে গেল।

রাইফেলের নল পিঠে একটু বেশি চেপে ধরে, ‘আস্তে, কোনো চালাকির চেষ্টা করলে মরতে হবে।’

উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে লোকটি।

‘ম্যাডাম, একটু এদিকে আসুন’, নীচু গলায় ডাকল ছেলেটি।

এতক্ষণ তন্ময় হয়ে গাছের আড়ালে থেকে সব দেখছিল মেয়েটি। লোকটি যখন এগিয়ে আসছিল, তখন ঘুরে দৌড় দেয়ার ইচ্ছেটা অনেক কষ্টে দমন করেছিল। ডাকতেই কাছে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটি।

‘এটা ধরুন, নড়াচড়ার চেষ্টা করলেই টিপে দেবেন ট্রিগার। এটা এখন সেমিতে আছে।’ বলে মেয়েটির হাতে রাইফেল ধরিয়ে দিয়ে কাজে গেল। প্রথমে একটা জানালার পর্দা টুকরো টুকরো করে আগের লোকটির মতো এ লোকটারও হাত-পা বাঁধল। বাধা দিল না লোকটা।

‘আপনাদের ভাগ্য বড়ই ভালো যে, সকাল ছ’টায় আমার ডিউটি শেষ। তার আগে এদিকে হয়তো কেউ আসবে না। আর ও রাতে কোয়ার্টারে না ফিরলেও কেউ তা পাত্তা দেবে না।’ ছেলেটি তার হাত-পা বাঁধতে বাঁধতে বলল লোকটি।

তার ক্যাপ্টেনের পকেট থেকে রুমাল বের করে তার মুখে গুঁজে দিয়ে মুখ বেঁধে দিল। তারপর মেয়েটির হাত থেকে রাইফেল নিয়ে পাশে রাখল। আর একট পর্দার কাপড় আছে, তা বিছিয়ে এ লোকটিকেও আগের মতো একজন সামনে আর একজন পেছনে ধরে তার ওপর শুইয়ে দিল। এ আগন্তুকের কাপড় পরাই আছে, তাই অবশিষ্ট দুটো জানালার পর্দা দিয়ে প্রথম লোকটিকে ভালোভাবে ঢেকে দিল। মুখ বাইরে রাখল। কী মনে হতে আগন্তুকের রাইফেলের ম্যাগাজিন খুলে নিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা পর্দার ছেঁড়া এক অংশ দিয়ে তা প্রথম পাহারাদারের রাইফেলের সঙ্গে ভালোভাবে বেঁধে নিল। আগন্তুকের হাত বাঁধার আগেই তার কাঁধ থেকে রাইফেল খুলে রেখেছিল।

মখমলের চাদরের একাংশ নিজের গায়ে পেঁচিয়ে নিল। অপর অংশ মেয়েটিকে। তারপর কাঁধে রাইফেল ফেলে এগোতে যাবে এমন সময় প্রথম পাহারাদারের গ্যাস লাইটারটার কথা স্মরণ হলো। বেঁচে থাকার জন্য পানির মতো আগুনও প্রয়োজন। যেখানে প্রথম লোকটার শার্ট ছিঁড়ে ছিল, সেখানে এখনো সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার পড়ে আছে। লাইটারটা হাতে নিয়ে তার মালিকের কাছে এলো ছেলেটি। মাথা নামিয়ে আনল নীচে লোকটির জবাব পাওয়ার আশায়। ‘আমি কি এই লাইটারটা নিয়ে যেতে পারি?’ লোকটার কাত করা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল ছেলেটি। ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ল লোকটি। আবছা অন্ধকারেও লোকটির চোখের পানি দেখতে পেল ছেলেটি। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি।

‘আপনি কাঁদছেন? আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল ছেলেটি।

এবার ‘না’ বোধক মাথা নাড়ল সে।

‘ওনার এ কান্না কৃতজ্ঞতার’, বলল মেয়েটি। যেন মেয়েটির কথার সমর্থনে আবার মাথা নাড়ল লোকটি।

হঠাৎ করেই মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেল ছেলেটির। উঠে দাঁড়াল। একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে ‘ম্যাডাম, এটা আপনার কাছে রাখুন’, বলে লাইটার বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। তাকিয়ে আছে অন্যদিকে। মেয়েটি লাইটারটা হাতে নিতেই কাঁধে রাইফেল ভালোভাবে ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করল। পিছু নিল মেয়েটি।

সময় বয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দুজনে নীচে নেমে চলেছে। অনুমান আর দুই-আড়াই ঘণ্টা পর সূর্য উঠবে। পূর্বাকাশ ফর্সা হবে তারও আগে। সময় খুব কম। তার আগেই পৌঁছাতে হবে। দূরত্ব কখনো কমে যাচ্ছে পাহাড়িয়া অচেনা পথের কারণে। তার ওপর আবার আঁধার রাত্রি। আকাশের তারকারাজির আলোয় এ অন্ধকার দূর হচ্ছে না। বনে নানারকম কীটপতঙ্গের একটানা কর্কশ শব্দ। পেছনে নিরাপদ দূরত্বে তাকে অনুসরণ করছে মেয়েটি। একটু পিছিয়ে পড়লেই জানিয়ে দিচ্ছে। তখন দাঁড়িয়ে দূরত্বটা কমিয়ে আনছে ছেলেটি পেছনে না তাকিয়েই। হাঁটছে আর ভাবছে মেয়েটি। এই অল্প সময়েই বুঝতে পেরেছে যে ছেলেটি সত্যিই অদ্ভুত। আচ্ছা, কোথায় চলেছে ছেলেটি?

‘সমুদ্রের দিকে’, হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল ছেলেটি।

‘কেন?’

‘আমার মনে হয় আজ রাতে না হলেও কাল সকালেই কুকুরের সাহায্যে আমাদের পিছু ধাওয়া করা হবে।’

‘তাতে কী? সৈকতে কি নৌকা পাওয়া যাবে?’

‘হয়তো যাবে না, কিন্তু আমরা সৈকতে হাঁটু পানি দিয়ে কিছুদূর হেঁটে আবার এ দ্বীপের কোথাও আপাতত লুকিয়ে থাকব। ফলে তারা কুকুরের সাহায্যে আর আমাদের পিছু নিতে পারবে না। আমাদের ট্রাক হারাবে, পরে সময়-সুযোগমতো আমরা এই দ্বীপ থেকে পালাব। আর ততদিন এই পাহাড়িয়া বনেই কোথাও লুকিয়ে থাকব।’ একনাগাড়ে বলে থামল মেয়েটি। ‘হ্যাঁ’ সত্যিই আপনার বুদ্ধি আছে।’ প্রশংসা না করে পারল না ছেলেটি। প্রশংসায় মেয়েটির সুন্দর গোলাপি ফর্সা মুখখানি লাল হয়ে উঠল। তা দেখার জন্য ঘুরে তাকাল না ছেলেটি। হেঁটে চলেছে একইভাবে।

প্রায়ই গাছের ডালপালা হাত দিয়ে সরিয়ে, ঝোপের পাশ দিয়ে, পাহাড়ের ধার দিয়ে, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে চলেছে দুজনে। কখনোবা অগভীর খাদে লাফিয়ে নামতে হচ্ছে। আঁকাবাঁকা দুর্গম পথে অন্ধকারে হাঁটতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে দুজনেই। তার ওপর যতই নীচে নামছে ততই গাছপালার ঘনত্ব কমে আসছে। এর ফলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধার মাত্রাই বেশি। গাছপালার পরিমাণ কমে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা হিমশীতল বাতাসের প্রকোপ বেশি হচ্ছে। একটু পরপর ঠান্ডায় কেঁপে উঠছে মেয়েটি। দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঠান্ডাটা অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার জিন্সের প্যান্ট ভেদ করে ঠান্ডা তেমন কাবু করছে না। তবে ওপরের অংশে জামার ওপর চাদর থাকার পরও তার ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা। হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটির ওপরের অংশে চাদর জড়ানো ছাড়া আর কিছুই নেই; আর নীচে যে পায়জামাটা আছে তাও ঠান্ডা ঠেকানোর উপযোগী নয়। তাহলে তো ছেলেটির অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।

একটি পাহাড়ের ধার বেয়ে নীচে নেমে গেল ছেলেটি। ব্যাপারটি তারও খেয়াল হয়েছে যে, যতই নীচে নামছে ঠান্ডার প্রকোপও বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে। নীচে নামা যদিও খুব পরিশ্রমের কাজ না, তারপরও এতক্ষণ একনাগাড়ে হাঁটতে যা পরিশ্রম হয়েছে তাতে মোটেও গা গরম হয়নি। বরং মরা মানুষের মতো গা ঠান্ডা আছে। ভাবছে, সমুদ্র আর কত দূরে? সূর্য ওঠার আগেই লুকিয়ে পড়তে পারবে তো! নাকি ধরা পড়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। পথের দিকে মনোযোগ থাকায় সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে। হয়তো হাতে সময় খুব কম।

‘শুনুন।’

শব্দটা কানে যেতেই থেমে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি। দেখল গায়ের চাদর খুলছে মেয়েটি।

‘কী করছেন?’

‘আপনার চাদরের নীচে কোনো কাপড় নেই, হয়তো খুব ঠান্ডা লাগছে। আমার ততটা লাগছে না।’ বলতে বলতে চাদরের অংশটা বাড়িয়ে ধরল ছেলেটির দিকে।

‘এটা গায়ে জড়িয়ে নিন।’

মেয়েটিকে কী বলবে ঠিক করতে সময় লাগল তার। তার যে ঠান্ডা লাগছে তা সত্যি। তাই বলে মেয়েটির যে কম ঠান্ডা লাগছে তা নয়। হতে পারে মেয়েটি তার আসল অবস্থা ঢেকে রেখে তাকে চাদরটি দিতে হচ্ছে। হাত বাড়াল না ছেলেটি। ‘লাগবে না, ধন্যবাদ।’

‘নিন’, আবার বলল সে। ‘আপনার ঠান্ডা লাগলে অসুখ হবে’, মেয়েটির কণ্ঠে আকুতি। এমন সময় দমকা হাওয়া বয়ে গেল। কেঁপে উঠল ছেলেটি। গায়ে চাদর না থাকায় মেয়েটি তার চেয়েও আরো বেশি কেঁপে উঠল, তা পরিষ্কার দেখল ছেলেটি।

‘এটা আমাকে দিলে আপনার আমার চেয়ে বেশি ঠান্ডা লাগবে, আর আপনি অসুস্থ হলে আমাদের পালানো কঠিন হবে। অতএব…’

কথা শেষ করতে দিল না মেয়েটি। ‘আমার গায়ে যে কাপড় আছে, তাতেই ঠান্ডা কেটে যাবে, নিন এটা’, বলে আরো বাড়িয়ে ধরল চাদরটি।

‘আপনি একটু আগে যেভাবে কেঁপে উঠেছিলেন, চাদরটি গায়ে থাকলে কি ওভাবে কেঁপে উঠতেন?’

‘না’, মাথা নীচু করে সত্য জবাব দিল।

‘তাহলে, ওটা আমার বদলে আপনি গায়ে জড়িয়ে নিন, সময় খুব কম।’

মেয়েটি গায়ে আবার চাদরটি জড়িয়ে নিল একরকম বাধ্য হয়ে। কারণ সে তর্কে হেরে গেছে।

দুজনেই নীচে নেমে চলেছে। হাঁপিয়ে উঠেছে দুজনেই, বিশ্রাম নেয়ার সময় নেই, তাই থামছে না। তবে ছেলেটির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পা বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। দুজনেই ভাবছে নানা কথা।

একটা ঢাল বেয়ে অতি সাবধানে নীচে নামছে। হেঁটে নামার গতি বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে দুজনেই। এ রকম আরো কয়েকটা বিপজ্জনক ঢাল বেয়ে নেমেছে। হঠাৎ করেই ঢালের একটা গর্তে পা দিয়ে ফেলল ছেলেটি। আগে দেখতে পায়নি। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল ঢালের রপর। কাঁধ থেকে ছিটকে পড়ল ভারী রাইফেল। গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল ছেলেটি।

অকস্মাৎ ছেলেটিকে পড়ে যেতে দেখে দিশা হারিয়ে ফেলল মেয়েটি। ভুলেই গেল, ঢালু জায়গায় দৌড় দেয়া কতটা বিপজ্জনক। ছেলেটির সাহায্যে দৌড়ে এগোতে গেল সে। কিন্তু এক মুহূর্ত পর সেও গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল। নীচে একটি টিলার গোড়ায় পৌঁছে থেমে গেল ছেলেটি। গড়িয়ে নামার সময় বুঝতে পেরেছিল, তার পেছন পেছন মেয়েটিও গড়িয়ে নামছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সেখান থেকে লাফিয়ে সরে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর মেয়েটিও একই জায়গায় এসে টিলার গোড়ায় মৃদু ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। নিথর হয়ে পড়ে রইল মেয়েটি। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ছেলেটি।

‘আপনি ঠিক আছেন তো, নাকি আঘাত পেয়েছেন?’ কথা কানে যেতেই ধীরে ধীরে উঠে বসল মেয়েটি। মুখের ওপরে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে তাকাল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। দৃষ্টি যে নীচের দিকে তা এ আঁধার রাতেও বোঝা যায়। তাছাড়া আশপাশটা ফাঁকা বলে তারকারাজি কিছুটা হলেও আঁধার দূরীভূত করেছে।

‘আপনি কি আঘাত পেয়েছেন?’ জবাব না পেয়ে এবার তার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

‘না’, কোনোমতে উচ্চারণ করতে পারল মেয়েটি। এখনো কাঁপছে।

‘আলহামদুলিল্লাহ’, কী যেন ভাবল ছেলেটি।

‘ঢালে রাইফেলটা পড়ে আছে, নিয়ে আসি। আপনি ততক্ষণে বিশ্রাম নিন’, বলেই আর দাঁড়াল না সে।

সব বুঝে ফেলেছে মেয়েটি এরই মধ্যে। এত সুন্দর মন-মানসিকতার, এত সুন্দর চরিত্রের, এত আদর্শবান কি আসলেই কেউ হতে পারে! নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল মনে মনে, ‘হ্যাঁ পারে, তার প্রমাণ এ ছেলেটি। এ ছেলেটি তাকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জের দরজায় ধাক্কা দেয়নি, দিতে পারে না। হয়তো ওটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল। ছেলেটির সম্পর্কে তার ভুল ধারণা আজ সত্যি ভেঙে গেল।

রাইফেল নিয়ে ফিরে এলো ছেলেটি। তারপর আবার পা ফেলা শুরু হলো। সুবহে সাদিকের কিছু আগে সমুদ্রের গর্জন শুনে বিনাবাক্যে খুশি হয়ে উঠল দুজনেই। এক সময় সৈকতে এসে পৌঁছল। ঢেউ আসছে, ফিরে যাচ্ছে, আবার আসছে। বিরামহীনভাবে চলছে এ খেলা। কোনো কোনো ঢেউ সৈকতের অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে, আবার নেমে যাচ্ছে দ্রুত। হাঁটু পানি দিয়ে এগিয়ে চলল পূর্ব দিকে। দুজনেরই হাঁটু পর্যন্ত কাপড় ভিজে গেছে। পানি যেন বরফ শীতল। ঠান্ডায় দুজনেই ঠকঠক করে কেঁপে চলেছে। কোনো কোনো ঢেউ হাঁটুর ওপরেও খানিক ভিজিয়ে দিচ্ছে। ডানে সমুদ্র। বাঁয়ে কিছুদূর বালিয়াড়ি, তারপর পাহাড়, গাছপালার শুরু। বেশ কিছুদূর হেঁটে এসেছে। সামনে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু টিলা। সেগুলো যেন সমুদ্র থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে। ওপাশে গেলে সাঁতরিয়ে যেতে হবে। টিলাগুলোর কাছে এসে থামল ছেলেটি। আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য উঠবে।

ছেলেটি দাঁড়িয়ে গেল ফজরের নামাজে। একটু দূরে বসে পড়ল মেয়েটি। মুখে ক্লান্তির ছাপ।

‘এখন কোনদিকে যাওয়া যায়?’ খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। সকালের সোনালি রোদের সোনালি রং যেন সাগরের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

‘বুঝতে পারছি না, কোনদিকে যাওয়া যায়’, একমুহূর্ত ভেবে বলল মেয়েটি।

‘সময় কম, আর কিছুক্ষণের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে পড়তে না পারলে ধরা পড়ে যেতে পারি। একটা উপায় বের করতেই হবে’, বলল ছেলেটি। ঝরনার দিকে লুকানোটা বোকামি হবে ভাবল ছেলেটি। ওদিকেই প্রথম খুঁজবে একটু পর।

‘আবার জঙ্গলে ঢুকে পড়া ছাড়া তো কোনো উপায় দেখছি না’, মুখ খুলল মেয়েটি।

‘এছাড়া আপাতত আমিও কোনো উপায় দেখছি না’, বলল মেয়েটি।

‘তাহলে উঠে পড়ি।’

একটু পরই যেখান থেকে পাহাড় শুরু হয়েছে, সেখানে পৌঁছে গেল ওরা। উঠতে শুরু করল ওপরের দিকে। নামা যত সহজ ছিল, ওঠা ততই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সৈকত থেকে একটা ছোট্ট টিলায় উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল দুজনেই। এখনো তারা জায়গায় আছে। দূর থেকে যে কেউ দেখতে পাবে। একটু ওপর থেকে গাছপালা-জঙ্গল শুরু হয়েছে। সেখানে পৌঁছলে নিজেকে কোনোমতে লুকানো যাবে। ভালোভাবে লুকাতে হলে আরো অনেক ওপরে উঠতে হবে। তবে সে জন্য গায়ে শক্তি দরকার। এরই মধ্যে অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে তার। ক্ষুধায় কাতর দুজনেই। ছেলেটি গতদিন দুপুরে কয়েকটা রুটি খেয়েছে মাত্র। তারপর থেকে পানি ছাড়া আর কিছুই পেটে যায়নি। আর মেয়েটি গত রাতে খেলেও দুশ্চিন্তার কারণে পেট ভরে খায়নি। তারপর আর কিছুই খায়নি। বাঁচার তাগিদে দুর্বল শরীর নিয়েই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছে। আগে আছে ছেলেটি। কয়েক হাত পেছনে আছে মেয়েটি। একসময় গাছপালার ভেতরে ঢুকে পড়ল। এদিকে গাছপালা কম। আরো ওপরে উঠতে হবে। মেয়েটির সঙ্গে অন্য কোনো বোঝা নেই। কিন্তু ছেলেটির রাইফেলটি বয়ে নিয়ে উঠতে দ্বিগুণ কষ্ট হচ্ছে। ভাবছে, রাইফেলটি সঙ্গে রেখে কী হবে? সে অকারণে মানুষের ক্ষতি করতে চায় না। দু-একজনকে ঠেকানোর জন্য রাইফেল ব্যবহার করতে গেলে যে বিকট শব্দ হবে তাতে বাকি সবাই তাকে ঘিরে ফেলবে। তাছাড়া হয়তো এটার প্রয়োজন নাও হতে পারে। কারণ যারা তার পেছনে লাগবে তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আর কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরলে বন্দুক চালিয়ে কী হবে? তারাও খালি হাতে থাকবে না। এসব যুক্তি দিয়েও রাইফেলটি ফেলে যেতে ইচ্ছে হলো না। হাতে একটা অস্ত্র তো আছে!

আচ্ছা, মেয়েটিও কি তার মতো কিছু নিয়ে ভাবছে? কী নিয়ে ভাবছে? ধ্যুত! এসব কী সে ভাবছে? সে কী ভাবে ভাবুক। ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে মেয়েটির। অথচ খাবার পাওয়ার বিষয়টা অনিশ্চিত। ক্ষুধা নিবারণের কি কোনো ব্যবস্থা করা যায় না? এ ব্যাপারে সে কি ছেলেটিকে কিছু বলবে? না থাক, ছেলেটিরও হয়তো আমার মতো অবস্থা হয়েছে।

ছেলেটি যে থেমে দাঁড়িয়েছে তা আগে দেখতে পায়নি সে। যখন দেখতে পেল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলাতে পারল। তা না হলে ছেলেটির গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তা হতো এক লজ্জাজনক ঘটনা। কী জন্য ছেলেটি দাঁড়িয়েছে এতক্ষণে দেখতে পেল সে। তিন হাত সামনে দিয়ে চওড়া এক খাদ ডানে-বাঁয়ে চলে গেছে। কতদূর গেছে দেখা যায় না। কোনো কথা না বলে একটু ডানে সরে গেল ছেলেটি। খাদটি দেখল। আশপাশের তুলনায় এ জায়গাটার চওড়া কম, লাফিয়ে পার হওয়া যবে। আগে আমি পার হচ্ছি, তারপর আপনি।

ওপাশে পৌঁছে দাঁড়াল ছেলেটি। লাফ দিতে দ্বিধা করছে মেয়েটি। ছেলেটি কোনোমতে পার হয়েছে। আর মেয়েটি কম গভীরতা নেই বরং বেশি আছে। আর খাদ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে তা খুঁজে বের করার সময়ও নেই।

‘আমাকে তোলার ব্যবস্থা করুন’, কেঁপে গেল তার কণ্ঠ।

ছেলেটি হাত বাড়িয়ে তাকে তুলে আনতে পারে। এটাই সবচেয়ে সহজ। কিন্তু কিছুতেই বিবেক সায় দিচ্ছে না। জোর চেষ্টা চালাচ্ছে অন্য কোনো উপায় বের করার। খাদের কিনারে বসে খাদের অপর পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির কথা কানে যেতেই যেন বাস্তবে ফিরে এলো ছেলেটি।

‘ওহ! কিছু বললেন?’

মেয়েটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটির কথা শুনে অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে।

‘আমাকে ওপরে তোলার কথা বলেছিলাম।’

‘আমিও এতক্ষণ সে কথাই ভাবছিলাম’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি।

‘এখানে ভাবার কী আছে?’ ছেলেটির কথা বুঝতে পারল না সে।

সূর্য অনেক ওপরে উঠেছে। উঠে দাঁড়াতে যেতেই গা থেকে চাদরের একাংশ পড়ে গেল। হঠাৎই যেন উপায়টা বের হয়ে এলো। ফলে মেয়েটির কথা তার কানে ঢুকেও ঢুকল না। চাদরের একাংশ নামিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘এটা ধরে ওপরে উঠতে পারবেন না?’ ‘পারব।’

‘তাহলে উঠে আসুন’, বলে চাদরের অপর মাথা শক্ত করে ধরে খাদের কিনার থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল, যেন মেয়েটিকে তুলতে গিয়ে সেও না পড়ে। ওপরে উঠে এলো মেয়েটি। দুটি চাদরই দুজনের ঘাড়ে শোভা পাচ্ছে। নীরবে এগিয়ে চলছে দুজনে। এর মধ্যে মাত্র দুবার বিশ্রাম নিয়েছে। ওপরে উঠছে বলে দ্রুত হাঁপিয়ে উঠছে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্রাম নিতে থেমেছে। একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়েছে ছেলেটি। বুকের ওপর মাথা নামিয়ে এনেছে। খানিক দূরে একটি বড় পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে মেয়েটি।

মাথা তুলল ছেলেটি। ‘আপনার কি খুব ক্ষিদে লেগেছে?’

ক্ষিদেয় নাড়িভুঁড়ি সব হজম হওয়ার উপক্রম। তারপরও মাথা দুলিয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিল মেয়েটি।

‘আমার কিন্তু খুব ক্ষিদে লেগেছে, আপনারও হয়তো লেগেছে, কিন্তু তবুও অস্বীকার করলেন।’

‘লেগেছে, তবে এখন পর্যন্ত তো কোনো খাদের সন্ধান পাওয়া গেল না।’

‘পেটে কিছু না পড়লে তো আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শক্তি ফুরিয়ে যাবে’, আশপাশে তাকাতে তাকাতে বলল ছেলেটি।

‘আচ্ছা, আর ওপরে না যেয়ে এখানে থেকে গেলে হয় না?’ বলল মেয়েটি।

‘এখানে আশপাশে ঘন জঙ্গল নেই। ঘন জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে, আরো কিছু ওপরে ঘন জঙ্গল আছে।

‘কেন? নীচেও তো ঘন জঙ্গল থাকতে পারে।’

‘তাহলে অনেক খুঁজতে হবে। আর আমার মনে হয় নীচের দিকেই ওরা বেশি খুঁজবে। আমরা যে ওদের কাছেই যাব এমনটা হয়তো ওরা চিন্তাও করবে না।’

‘তাহলে ওঠা যাক।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। দুজনেই মুখ বুজে ক্ষিদে সহ্য করছে। উভয়েই খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ছেলেটির ইচ্ছে হচ্ছে এখানেই থেকে পড়ে। কিন্তু বুঝতে পারছে এখানে থামলে আত্মঘাতীর শামিল। সে নিজেই যখন অনেকদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে, তখন এখানে থামা বোকামি হবে। সে যতটুকু জানে আরো ওপরে লুকানোর মতো গাছপালা-পাহাড়ের আড়াল পাবে। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক তাদের সেখানে পৌঁছতেই হবে। তাহলে পুনরায় ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকবে।

কোনদিক দিয়ে গেলে তুলনামূলকভাবে সহজে ওপরে ওঠা যাবে তা দেখার জন্য আশপাশে দেখতে দেখতে পা ফেলছে ছেলেটি। পেছনে আছে মেয়েটি। একটু দূর দিয়ে একটি বড় গাছ অতিক্রম করছে। মাটির ওপরে থাকা গাছটির মোটা শিকড়ে পা বেঁধে গেল ছেলেটির। আছড়ে পড়ল মাটিতে।

দৌড়ে পাশে এসে বসল মেয়েটি। উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। কী করবে বুঝতে পারছে না। এখনো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

‘আপনার কি খুব লেগেছে?’

মুখের জবাব পাওয়া না গেলেও ততক্ষণে নড়ে উঠেছে। উঠে বসল। নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল।

ছেলেটি কিছুই বলল না। মুখ দেখেও কিছু বোঝা গেল না। ছেলেটি খুব ব্যথা পেয়ে থাকলে যাত্রায় এখানেই ইতি। পাশে এসে আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটিÑ ‘আপনি খুব ব্যথা পেয়েছেন?’ চেষ্টা করেও মুখে উৎকণ্ঠার স্বরটা লুকাতে পারল না। অনেক কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল ছেলেটি। সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খুব একটা পাইনি।’ মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টাটা বলা চলে এখানেই হলো। খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে ছেলেটির কাছ থেকে দূরে সরে গেল।

একটু এগিয়েই ছেলেটি বুঝতে পারল বাম পায়ে সে ভালোই আঘাত পেয়েছে। ব্যথায় মাটিতে পা ফেলাই দায় হয়ে পড়েছে। পা-টা ধীরে ধীরে ফুলে যাচ্ছে। নাহ, আর পারছে না সে। বসে পড়ল মাটিতে। দুই পা ছড়িয়ে বসল সামনে। তাকে হঠাৎ বসতে দেখে মেয়েটিও একটু দূরে হাঁটু গেড়ে বসল। ছেলেটির দিকে একবার তাকিয়েই বুঝতে পারল, সে খুব কষ্টে ব্যথা সহ্য করছে। দুহাত দিয়ে তার বাম পায়ের গোড়ালি চেপে ধরেছে।

‘আপনি তো খুবই আঘাত পেয়েছেন, ভেঙে যায়নি তো?’

আবারও মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার জন্য অনেক কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল, তবে হাসিটা বড়ই বিষণ্ন দেখাল। মুখে বলল ‘মনে হয় ভাঙেনি।’

‘আমরা তবে আপাতত এখানেই থামব?’

‘না। কারণ হয়তো এতক্ষণে আমাদের বিশেষ করে আপনাকে ধরার জন্য ক্যাপ্টেন তার দলবল মাঠে নামিয়েছে। এ রকম ফাঁকা জায়গায় থামাতো দূরের কথা, হাঁটাও নিরাপদ নয়।’

‘আপনি কি এ অবস্থায় হাঁটতে পারবেন?’

মাথা দুলিয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিল ছেলেটি।

‘তবে কীভাবে এগোবেন?’ এক মুহূর্ত থামল মেয়েটি।

‘যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলি।’ বলে থামল মেয়েটি।

‘বলুন’, মাথা নীচু করে রেখেছে ছেলেটি।

‘আপনি আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে পারেন।’

ধন্যবাদ দিয়ে তাকে ছোট করতে চাইল না ছেলেটি।

‘তার হয়তো দরকার হবে না, আমি এ রাইফেলে ভর দিয়ে হাঁটতে পারব। মেয়েটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাইফেলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে শুরু করছে সে।

রাইফেলে ভর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে যে কী রকম কষ্ট হচ্ছে, তা মেয়েটি ভালোই বুঝতে পারছে। সে এর মধ্যে বুঝে ফেলেছে, ছেলেটি সাধারণ আর দশটা ছেলে থেকে একদম ভিন্ন। ছেলেটি তাকে খাদ থেকে হাত বাড়িয়ে সহজে তুলতে পারত। তাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তা না করে সে তাকে স্পর্শ না করেই তোলার উপায় বের করার জন্য ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল। ছেলেটি যে রকম ব্যথা পেয়েছে, তাতে রাইফেলে ভর দিয়ে হাঁটার চেয়ে তার সাহায্যে হাঁটলে অনেক কম কষ্ট পেত। কিন্তু ছেলেটি যে কিছুতেই তা করবে না তা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। বলে কোনো লাভ হবে না, তাই বলছেও না। তাছাড়া ছেলেটির সামনে সে খুবই অস্বস্তি বোধ করে। সে যে ছেলেটির ব্যথায় ব্যথিত। তারও যেন কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটি যে বিপজ্জকভাবে ওপরে উঠছে তাতে তার ভয়ই হচ্ছে, কখন যে ছেলেটি গড়িয়ে পড়ে। ছেলেটি অচল হলে সে না পারবে পালাতে, না পারবে ছেলেটির তেমন উপকারে আসতে। আশ্চর্যের বিষয় যে ছেলেটি ডান পা আর রাইফেলের ওপর ভর দিয়ে বাম পা ঝুলিয়ে ওপরের দিকে উঠে চলেছে, উঠেই চলেছে। তবে গতি শামুকের মতো মন্থর।

সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। অনেক ওপরে উঠে এসেছে তারা। এর মধ্যে ঘন গাছপালার এলাকায় ঢুকে পড়েছে। পাহাড়-টিলার সংখ্যাও অনেক। প্রায় সমতল এক জায়গায় বসে পড়ল ছেলেটি। অনেক আগেই হাঁটায় বিরতি দিত সে। পায়ে আঘাত লাগার পর থেকে নিজের ওপর একরকম অত্যাচার করে এতদূর এসেছে। সে একা হলে অনেক আগেই থামত। কিন্তু মেয়েটির জন্যই থামেনি। ধরা পড়লে তার নিজের চেয়ে যেন মেয়েটির শাস্তি বেশি হবে। মেয়েটির শাস্তি তার বাকি জীবন। পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে চারবার বিশ্রাম নিয়েছে তারা। ক্লান্তির শেষসীমায় পৌঁছে গেছে দুজনেই।

‘আর এগোনোর দরকার নেই, এখানেই থামব’, দুর্বল কণ্ঠে বলতে বলতে পাতায় ঢাকা মাটির ওপর বসে পড়ল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে সামনে একটু দূরে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসল মেয়েটি। চোখ বুজে ফেলল সে। বসেই ক্লান্তিতে ছেলেটিও চোখ বুজে ফেলেছিল। একটু পর চোখ খুলে কিছু দূরে মেয়েটিকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখল। চোখ ফেরাতে গেল কিন্তু পারল না। তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। ক্যাপ্টেন মেয়েটির জন্য কেন পাগল হয়েছে তা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারল। এত পরিশ্রমের পরও শান্ত, ক্লান্ত মুখটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো সমুজ্জ্বল। সত্যি! অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়েটি। এর চেয়ে সুন্দর মেয়ে এর আগে চোখে পড়েছে কিনা স্মরণ করতে পারল না সে, হয়তো পড়েছে, হয়তো পড়েনি। কারণ সে সামনে বা আশপাশে মেয়ে আছে তা উপলব্ধি করতে পারলেই দৃষ্টি নীচু করে ফেলে। দুর্ঘটনাবশত অনেক মেয়ে তার চোখে পড়লেও এ মেয়েটির চেয়ে সুন্দরী যে তার চোখে পড়েনি তা সে নিশ্চিত। উ™£ান্ত চুলগুলো মেয়েটির মুখের ওপর এসে পড়েছে। তা যেন তার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কেউ তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ভুলে যাবে।

দূরে নাম না জানা এক পাখির কর্কশ কণ্ঠ কানে ঢুকতেই কয়েক মুহূর্তের ঘোরভাবটা নিমিষে উবে গেল। সম্বিত ফিরে পেতেই বুঝতে পারল সে এতক্ষণ কোন দিকে তাকিয়ে ছিল আর কী ভাবছিল। নিজের ওপর প্রচণ্ড রেগে উঠল সে। মনে মনে নিজেকে কতবার যে লাথি মারল তার হিসাব নেই। নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। মেয়েটি না হয় চোখ বন্ধ করে আছে। কিন্তু মহান আল্লাহ তো চোখ বন্ধ করে নেই। তওবা করতে লাগল এ মহাজগৎ নিয়ন্তার মহাদরবারে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তাকাল সূর্যের দিকে। জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। আশপাশে হয়তো পানিও নেই। এ অবস্থায় পানি সন্ধান করাও প্রায় অসম্ভব। তায়াম্মুম করে বসেই নামাজ আদায় করে নিল। তারপর শুয়ে পড়ল খোলা আকাশের নীচে। মেয়েটি অনেক আগেই ঘুমের জগতে বিচরণ করা শুরু করেছে।

কীভাবে ঘুমটা ভেঙে গেল বলতে পারবে না ছেলেটি। চোখ খুলেই বুঝল শেষ বিকেল উপনীত। আসরের নামাজ পড়ে বলে ঝট করে উঠে বসল। দাঁড়াতে যেতেই গোড়ালিটা ব্যথা করে উঠল। এতক্ষণ ব্যথাটার কথা ভুলে ছিল। বাধ্য হয়েই বসে পড়ল। তাকালো চারপাশে। কিন্তু কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। কোথায় আছে মেয়েটি? হয়তো আশপাশে কোথায় আছে। জোহরের মতো আছরের নামাজও আদায় করে নিল। মোনাজাত শেষে ডানে কারো উপস্থিতি অনুভব করল। তাকিয়ে দেখল, মেয়েটি এসে দাঁড়িয়ে।

‘কীসের যেন আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল, উঠে দেখি আপনি শুয়ে ঘুমাচ্ছেন। অনেকক্ষণ ঘুমানোর ফলে শরীরটা ঝরঝরে লাগছিল। তাই আপনাকে বিরক্ত না করে আশপাশে খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম’, যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে মেয়েটি। ‘আপনি উঠে আমাকে খোঁজাখুঁজি করেননি তো?’

‘না, আমি ধরেই নিয়েছিলাম আপনি হয়তো আশপাশেই আছেন’, পায়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে ছেলেটি।

‘খাবার না পেলেও লুকিয়ে থাকার মতো একটা গুহার সন্ধান পেয়েছি’, নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলল মেয়েটি। যেন গুহা খুঁজে পাওয়ায় সে তেমন খুশি নয়।

‘গুহা খুঁজে পেয়েছেন!’ বলতে বলতে আনন্দে দাঁড়াতে যেতেই ব্যথায় বসে পড়ে দুহাতে গোড়ালি চেপে ধরল।

‘এ রকম খোলা জায়গায় থাকার চেয়ে গুহায় থাকা নিরাপদ।’ হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যথায় মুখটা বিকৃত হয়ে গেল।

‘আচ্ছ, গুহাটা কি বড়?’ অত ব্যথা সহ্য করে সে কীভাবে কথা বলছে তা বুঝতে পারছে না মেয়েটি।

‘হ্যাঁ, বেশ বড়।’ বিষণ্ন কণ্ঠে জবাব দিল সে। হাত দিয়ে দক্ষিণ দিক নির্দেশ করল মেয়েটি। মাথা নীচু করে থাকায় দেখতে পেল না ছেলেটি। সেটা বুঝতে পেরে মুখে বলল ‘দক্ষিণে।’

‘কত দূরে?’

‘বেশি না, সামান্য।’

‘তাহলে আর দেরি নয়, সূর্য ডোবার আগেই সেখানে পৌঁছা যাবে তো?’

‘হয়তো যাবে।’

রাইফেলের বাঁটে ভর দিয়ে কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। একটু দূর দিয়ে পাশে পাশে চলেছে মেয়েটি। যখন গুহায় পৌঁছল, তখন মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেছে। রাতের আঁধার নেমেছে অনেক আগেই। তার ওপর অন্ধকার আরো প্রকট হয়েছে। গুহাটা পছন্দ হয়েছে ছেলেটির। গুহার মুখটি ছোট। গুহামুখের কাছে জঙ্গল আছে। কাছে না এলে গুহাটা কারো চোখে পড়বে না, যদি না তার আগে জানা থাকে। আর গুহার ভেতরটা বেশ বড়। মেঝে প্রায় সমতল। তবে ছাদ অত্যন্ত নীচু। পুরোপুরি দাঁড়ানো যায় না।

‘আমি গুহার বাইরে শোবো, আপনি ভেতরে শোবেন’, গুহাটা দেখে বলল ছেলেটি।

‘কেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আপনার ঠান্ডা লাগলে গোড়ালির ব্যথা বেশি হবে।’

‘হবে না, আমি বাইরেই ভালো থাকব’, বলল ছেলেটি।

‘তাহলে আমি বাইরে থাকি, আপনি ভেতরে থাকুন।’

‘তা হয় না’, বলল ছেলেটি।

‘তাহলে আপনিও ভেতরে থাকবেন’, বলে থামল মেয়েটি।

আর কথা বাড়াল না ছেলেটি।

চাদরটা বিছিয়ে শুয়ে আছে গুহামুখের কাছে। মেয়েটি তার কাছ থেকে বেশ দূরে আছে। ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে জর্জরিত মেয়েটি এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটি প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করছে, তবে ক্ষিদে অনুভব করছে না। তার ক্ষুধা অনুভূতি শক্তি লোপ পেয়েছে বিকেল থেকে, যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। সে যেন অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে আছে। চোখ দুটো এর মধ্যে বন্ধ হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের সাগরে ডুব দিল সে।

নানা জাতের, নানা ধরনের পাখির কলরবে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চোখ কচলিয়ে ঘুম দূর করার চেষ্টা করছে। বাম পায়ের ব্যথাটা এরই মধ্যে অনেকাংশে কমে এসেছে। তারপরও বাধ্য হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো। ভোরের তরতাজা নির্মল হিমশীতল বাতাসে তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ পড়ে নিয়ে গুহায় এসে ঢুকল। বাইরে যে ঠান্ডা তাতে গায়ের চাদরে ঠান্ডার অর্ধেকও কাটে না। গুহায় ঢুকে দেখল মেয়েটি তখনো ঘুমিয়ে আছে। আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি তার জায়গায়।

ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ শুয়ে থাকল মেয়েটি। সে একই সঙ্গে দুটো বিষয় উপলব্ধি করতে পারছে, তা হলোÑ প্রথমত তার শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। হয়তো লম্বা ঘুমের কারণেই। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার ক্ষুধা পাচ্ছে না। উঠে বসে দেখল ছেলেটি ঘুমিয়ে আছে। এবারো ছেলেটিকে বিরক্ত না করে পা টিপে টিপে ছেলেটির পাশ দিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো সে। দেখল, বেশ বেলা হয়েছে। আশপাশটা দেখার জন্য মেয়েটি পা বাড়াল।

কারো হাঁপানোর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে দেখল, একটু দূরে বসে মেয়েটি হাঁপাচ্ছে। প্রথমে বুঝতে পারল না কী কারণে সে হাঁপাচ্ছে।

‘আপনি হাঁপাচ্ছেন কেন, কী হয়েছে?’

দৌড়ে এসে গুহায় ঢুকেছে মেয়েটি। খুব বেশি দূর দৌড়ায়নি। গুহার কাছে এসে দৌড়ানো শুরু করেছে। তার আগে পা টিপে টিপে পালিয়ে এসেছে। যতটা না পরিশ্রম তার চেয়েও বেশি উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে সে। ছেলেটির গলার আওয়াজ কানে যেতেই মুখ তুলে তাকাল মেয়েটি।

‘ওরা আমাদের পাশেই আছে, খুঁজছে’, হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে বলল সে। চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

‘একটু খুলে বললে ভালো হয়’, শান্ত স্বরে বলল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত দম নিয়ে শুরু করল মেয়েটি।

‘ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, আপনি ঘুমাচ্ছেন। আরো লক্ষ্য করলাম ক্ষিধে উড়ে গেছে। বুঝলাম দীর্ঘক্ষণ কিছু পেটে না দেয়ার ফল। লক্ষণ ভালো নয়, কিছু খেতে না পারলে এর ফলে ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তাই খাবরের খোঁজে বের হয়েছিলাম। একসময় গুহার বাঁয়ে কিছু নীচে হঠাৎ কারো গলার আওয়াজ পেয়ে লুকিয়ে যাই। তাদের দেখেছিÑ দুজন লোক কাঁধে রাইফেল ফেলে একটা পায়ে চলা পথ ধরে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে, আর কী বিষয়ে যেন কথা বলছে। তার একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারলাম, আমাদের নিয়েই কথা বলছে। শোনার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কাছাকাছি চলতে লাগলাম। তাদের কথায় যা বুঝলাম, গতকাল আমাদের সমুদ্রের দিকে ও নীচের দিকে খোঁজা হয়েছে। আর আজকে এ দ্বীপের সব সম্ভাব্য জায়গায় হানা দেয়া হবে। আজকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না পেলে সারা দ্বীপে আমাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হবে। বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের জন্য লর্ড কত সিরিয়াস হয়েছে’, বলে থামল মেয়েটি। এর মধ্যে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে সে।

‘আমার মনে হয়, লর্ড নয়। ক্যাপ্টেন সিরিয়াস হয়েছে বেশি, আপনার জন্য’, বলল ছেলেটি। এতক্ষণ মেয়েটির গোছানো কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছে সে। ‘মনে হয় আমাদের এ গুহাটিও সম্ভাব্য জায়গার অন্তর্ভুক্ত। এটার কথা ক্যাপ্টেনের বাহিনীর অজানা থাকার সম্ভাবনা খুব কম। অর্থাৎ যে কোনো সময় তারা এখানে হামলা চালাতে পারে’, বলে থামল ছেলেটি।

‘হ্যাঁ, তার মানে আমাদের এখনই এখান থেকে সরে পড়তে হবে।’ এক মুহূর্ত থেমে কী ভেবে, ‘হিসাবমতো আমাদের কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ থেকে পালানো উচিত। কারণ সন্ধ্যার মধ্যে আমাদের না পেলে হয়তো আজ রাতেই বা কাল সকালে পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হবে। ফলে পুরস্কারের আশায় সারা দ্বীপের মানুষ আমাদের খোঁজে লেগে যাবে। তখন আমাদের পালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, একদল নৌকা নিয়ে সমুদ্রে যাবে, আর একদল সারা দ্বীপ চষে ফেলবে। আমরা ধরা পড়তে বাধ্য। এখনই আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত। আপনি কী বলেন?’ বলে থামল মেয়েটি।

এতক্ষণ প্রায় বুকের ওপর মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিল ছেলেটি। মাথাটা একটু তুলে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়।’

‘তাহলে এখনই বেরিয়ে পড়ি। আপনি কি হাঁটতে পারবেন?’ বলল মেয়েটি।

‘ইনশাআল্লাহ পারব’, বলেই ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। পায়ের ব্যথাটা অনেক কমে গেছে। রাইফেলটা কাঁধে তুলে নিল। আর চাদরটা কোমরে জড়িয়ে নিল।

একটু পরেই গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো তারা। পায়ে হাঁটতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। পেটে খিদের অনুভূতি নেই, আর কী চাই! অত্যন্ত সতর্ক হয়ে নীচে নামছে তারা। যে কোনো সময় ক্যাপ্টেন বাহিনীর সামনে পড়ে যেতে পারে। ছেলেটি চাইছে যদি ওরা গুহায় খোঁজ করতে আসে তবে সঙ্গে যেন কুকুর নিয়ে না আসে, তাহলে তাদের পিছু নিতে পারবে না।

ছেলেটির পেছনে মেয়েটি নামছে। কখনোবা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, কখনো পাশ দিয়ে। গাছপালা, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তারা যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। মেয়েটি ভাবছে, ছেলেটি যেন অচল হয়ে না পড়ে, পুনরায় আহত হয়ে না পড়ে। আর ক্যাপ্টেন বাহিনীর সম্মুখে না পড়েই যেন এই দ্বীপ ছেড়ে পালাতে পারে। তবে কীভাবে পালাবে এখনো তা ঠিক হয়নি। এমনকি উপায় পর্যন্ত বের হয়নি। যেন অজানা-অচেনার উদ্দেশে তারা পাড়ি জমিয়েছে। তাদের পরিণতি কী? ধরা পড়বে, নাকি শেষ পর্যন্ত এই ভয়ঙ্কর দ্বীপ থেকে পালাতে পারবে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই নিজেকে দিতে পারছে না মেয়েটি।

এতক্ষণ কষ্ট করে হেঁটেছে, আর পারছে না ছেলেটি। পায়ের ব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তারপরও হেঁটে চলেছে। একসময় অসহ্য হয়ে উঠল ব্যথা। পা আর মাটিতে ফেলতে পারছে না। তাছাড়া এরই মধ্যে হাঁপিয়ে উঠেছে সে, শ্বাস নিচ্ছে বড় করে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য দুই পাহাড়ের মধ্যে একটা গাছপালা আবৃত সমতল জায়গায় থামল দুজনে। খানিক বিশ্রাম নিয়ে রাইফেলে ভর দিয়ে ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। কিছু বলল না মেয়েটি। ছেলেটির অবস্থা সে বুঝতে পারছে।

নীচে নামছে তো নামছেই। এ নামার যেন শেষ নেই। সময় বয়ে যাচ্ছে দ্রুত। রাইফেলে ভর দিয়ে নীচে নামা বিপজ্জনক। যে কোনো সময় ভারসাম্য হারিয়ে নীচে গড়িয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই একটা পা প্রায় অচল। তাই সাবধানতার সঙ্গে ধীরে ধীরে নীচে নামছে। অবশ্য এখনো কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়নি, তবে হতে কতক্ষণ।

এখন কিছুদূর যেতে না যেতেই দ্রুত হাঁপিয়ে উঠছে দুজনে। তাই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে বারবার। এতে সময় বেশি যাচ্ছে। দ্বিপ্রহর হতে আর অল্প বাকি। বিশ্রাম নিচ্ছে দুজনেই। হঠাৎ দূরে রক্ত হিম করা কুকুরের ডাক ভেসে এলো। যেন আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল দুজনেই। খোলা জায়গায় বেশ তফাতে বসে ছিল দুজনেই। প্রথমে ছেলেটি নড়ে উঠল। তার পরপরই মেয়েটি। একলাফে ঘন গাছপালার মাঝে ঢুকে পড়ল। আবার ডেকে উঠল কুকুর। গাছপালার ভেতর দিয়ে দেখল বেশ দূর দিয়ে তিনজন অস্ত্রধারী লোক একটা কুকুর সঙ্গে নিয়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে চলছে। একটা গাছের আড়ালে দুহাত তুলে হাঁটু গেড়ে বসল ছেলেটি, ‘হে মহান রক্ষাকারী, ত্রাণকর্তা, তুমি আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা কর…।’

মেয়েটি অন্য একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

ধীরে ধীরে চার সদস্যের সন্ধানী দলটি চোখের আড়াল হয়ে গেল। আবার পা-বাড়ানো শুরু হলো। এক সময় দ্বিপ্রহর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। জোহরের নামাজ আদায় করে আবার মন্থর গতিতে যাত্রা শুরু হলো। ক্লান্ত দুর্বল শরীর নিয়ে পা ফেলা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। যতই এগোচ্ছে ধীরে ধীরে গতি ততই কমছে।

একসময় দূরে সমুদ্রের গর্জন শোনা গেল। অস্পষ্ট আওয়াজ। তার মানে সমুদ্র আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু এর মধ্যে ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়তে চাচ্ছে। দুজনেই পা ফেলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। শুয়ে চোখ বুজে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিজের ওপর একরকম অত্যাচার করে মাতালের মতো ঢুলতে ঢুলতে পা ফেলছে দুজনেই। সমুদ্রের অস্পষ্ট গর্জন শুনে মনে আশার জোয়ার এলো। কিন্তু দেহে শক্তির জোয়ার এলো না। এগোতে তিনগুণ সময় লাগছে।

বিকেল হয়ে এসেছে। এখন সমুদ্রের গর্জন অনেকটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমুদ্র কাছেই। আসরের নামাজ আদায় করে উঠে দাঁড়াতে যাবে ছেলেটি, কিন্তু পারল না।

মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘আপনি দাঁড়াতে পারবেন না?’

‘না।’ কোনোমতে দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি।

‘তাহলে এগোবেন কীভাবে?’

‘হামাগুড়ি দিয়ে।’

কিছু বলতে গিয়েও বলল না মেয়েটি। কারণ জানে বলে কোনো লাভ হবে না। এর মধ্যে ছেলেটি কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করেছে। কিছুদূর নীচে নামার পর মেয়েটিও ছেলেটির পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে নামা শুরু করল। সেও আর হাঁটতে পারছে না।

মেয়েটি পেছনে আছে কিনা, কতটা পেছনে পড়েছে দেখার জন্য ঘুরে তাকাল। একনজর দেখেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল, সেও হামাগুড়ি দিয়ে নামছে। কিছুই বলল না। কিছু বলতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। অবশেষে যেন দীর্ঘ একযুগ পর নীচে পৌঁছল। সামনে সৈকত। শেষ বিকেল। সূর্য অস্ত যেতে এখনো কিছু সময় বাকি। রক্তিম সূর্যের আলোয় সৈকতের বালিগুলো চিকচিক করছে। অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার মতো মনমানসিকতা এখন কারোরই নেই। দুজনেই আশপাশে তাকাচ্ছে। না, কোথাও নারকেল গাছ দেখতে পেল না। এখন পেটে কিছু দিতে না পারলে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে। কমপক্ষে নড়াচড়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেলবে। এ অবস্থায় এ দ্বীপ থেকে পালানো তো দূরের কথা, আশপাশে কারো উপস্থিতি টের পেলে লুকাতে পর্যন্ত পারবে না। দুজনেই খোলা জায়গায় আছে। এখন ফিরে পাহাড়ের কোথাও আশ্রয় নেয়া উচিত। কিন্তু ফেরার মতো শক্তি নেই।

মেয়েটি বালির ওপরেই শুয়ে পড়েছে। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। শরীরের সর্বশেষ শক্তি একত্রিত করে বসেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। মেয়েটির থেকে বেশ দূরে যাবে, এমন সময় পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব হতেই ঝট করে ঘুরে তাকাল। দেখল, একজন মধ্যবয়স্ক লোক খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রাখা রাইফেলের দিকে হাত বাড়াতে যাবে, তার আগেই লোকটি ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘কে আপনারা?’

কী উত্তর দেবে প্রথমে ভেবে পেল না ছেলেটি। এক মুহূর্ত ভেবে বলল, ‘আমরা ক্ষুধার্ত, বিপদগ্রস্ত।’ কী মনে হতে রাইফেল থেকে হাত সরিয়ে নিল।

‘তার মানে?’ জিজ্ঞেস করল আগন্তুক। ‘খুলে বলুন।’

ততক্ষণে মেয়েটি উঠে বসেছে।

‘আমরা বিদেশি। ক্যাপ্টেন আমাদের বন্দী করেছিল। তার কবল থেকে মুক্ত হয়ে এখন আমরা পালানোর পথে। আমরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত, প্লিজ আমাদের কিছু খাবার দিন, সে সঙ্গে এ দ্বীপ থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে দেবেন।’ কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা না করে অবলীলায় সত্য কথা বলে গেল ছেলেটি। সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, আর মিথ্যা হয় ধ্বংস।

‘আপনি জানেন, ক্যাপ্টেন অত্যাচারী।’ দুর্বল কণ্ঠে যতদূর সম্ভব দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলে জবাব দিল ছেলেটি।

‘জানি।’ একবার দ্বিধা করে বলল আগন্তুক।

‘তাহলে কেন তার হাতে আমাদের তুলে দেবেন?’ এতক্ষণ পর এবার মেয়েটি মুখ খুলল।

‘আপনারও নিশ্চয়ই ছেলে-মেয়ে আছে।’ মেয়েটির কথার পিঠে বলল ছেলেটি।

‘আছে। আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই, তোমাদের ধরিয়ে দিলে নিশ্চয়ই ক্যাপ্টেন কিছু পুরস্কার দেবে, এদিক থেকে ক্যাপ্টেন খুবই…।’

তাকে শেষ করতে দিল না মেয়েটি। ‘আমাদের খাবার ও পালানোর ব্যবস্থা করে দিলে আমরাও আপনাকে পুরস্কৃত করব।’

‘কী পুরস্কার?’ চট করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল আগন্তুক। ছেলেটিও অবাক হয়েছে।

‘আমার গলায় দামি একটা স্বর্ণের চেন আছে, সেটা আপনাকে দিয়ে দেব। কি রাজি?’ বলল মেয়েটি।

‘দেখি।’

চেনটা খুলে হাতে নিয়ে দেখাল মেয়েটি। এক মুহূর্ত ভেবে মুখ খুলল আগন্তুক।

‘আমি রাজি।’ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার মুখখানা।

‘আমি রাজি’, আবার বলল সে। ‘আমার বাড়িতে চলুন, খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে আপনাদের পালানোর ব্যবস্থা করে দেব…।’

‘আমরা খুবই দুর্বল। হাঁটার শক্তি পর্যন্ত নেই। বিশেষ করে আমি প্রায় অচল। পায়ে আঘাত পেয়েছি’, লোকটির কথায় বাধা দিয়ে বলল ছেলেটি।

ছেলেটি থামতেই শুরু করল আগন্তুক, ‘আমার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়, এই পাহাড়ের মোড় ঘুরে ওই পাশে একটু দূরে, প্রায় সমুদ্রের ধারেই’, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল।

‘তাছাড়া আপনাদের নৌকায় করে নিয়ে যাব। ওই তো আমাদের নৌকা।’ দক্ষিণে একটু দূরে নোঙ্গর করা ডিঙি নৌকাটার দিকে ইশারা করল। তার ভাবে বোঝা গেল যে, সে ওই নৌকার মালিক হওয়ায় গর্বিত।

‘একটু কষ্ট করে নৌকায় উঠতে পারলে হয়। না পারলে আমি সাহায্য করব।’

এক মুহূর্ত ভেবে ‘আপনি নৌকায় উঠতে পারবেন?’ ছেলেটিকে উদ্দেশ করে বলল মেয়েটি।

‘আপনি পারবেন?’ দুর্বল কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭