জাকির আহমদ

৮ মে, ২০২০ , ১:৫০ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-শেষ পর্ব

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

শেষ পর্ব মূল দ্বীপে পৌঁছে গেছে। একটা সুন্দর হুড খোলা ফোর হুইল জিপে পাহাড়িয়া পথ বেয়ে ওপরে উঠেছে তারা। জিপটা বেশ লম্বা। ড্রাইভারের পাশে বসেছে ক্যাপ্টেন। পেছনে একটা লম্বা সিটে একাই বসেছে মেয়েটি। বিপরীত...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - শেষ পর্ব

জাকির আহমদ

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে। ‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পেরে আর প্রশ্ন করল না তাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্য ডুবতে বসেছে। সারা দিন দুজনে ভালোই...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

২৪ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৮) ‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে মুখ না খোল, তাহলে তোমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হবে।’ ছেলেটি যতই শুনছে ততই ঘামছে। ‘টাইম বোমাটি তোমার সিটের ঠিক...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

১৭ এপ্রিল, ২০২০ , ১২:০৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৭) ‘হয়তো পারব। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ায় ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি। কোনো কিছু না বলে রাইফেলে ভর দিয়ে উঠতে গেল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুক। ‘আপনি আমাদের ধরে উঠুন।’ ‘যখন...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭ 3

জাকির আহমদ

১১ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৬

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব – ৬) ‘তার মানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। ছেলেটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বলে উঠল মেয়েটি, ‘ও! বুঝেছি। এ কাপড়ের গন্ধে কুকুর খুব তাড়াতাড়ি আমাদের খুঁজে বের করবে।’ ওপরে-নীচে মাথা দোলাল...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী

জাকির আহমদ

৩ এপ্রিল, ২০২০ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৫) ‘না, কেন?’ ‘কিছু না।’ বলল ছেলেটি। চিহ্নিত। ‘তবে প্রথম যে দুজন তোমাকে গাড়ির পেছনে বসিয়ে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল আর যে তোমাকে চাবুক মেরেছিল এ তিনজন জাহাজে ছিল’, বলল পাহারাদার। ‘আচ্ছা, মেয়েটি কোন...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

জাকির আহমদ

২৭ মার্চ, ২০২০ , ১:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৪) চিন্তাভাবনা শুরু করল জাহাজটাকে নিয়ে। তাতে হয়তো কোনো বুদ্ধি মাথায় আসতেও পারে। প্রথমে জাহাজের যে ব্যাপারটি তার মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল তা হলো জাহাজের সমস্ত বাতি নেভানো। নেভিগেশন লাইট না জ্বেলে নেভিগেশন আইনের...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

জাকির আহমদ

২১ মার্চ, ২০২০ , ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৩

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব – ৩) পরদিন ভোরবেলা পুকুর পাড়ে এসে সেখানে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে অপেক্ষা করছে ছেলেটি। তবে প্রকাশ্যে নয়, গাছের আড়ালে থেকে। অত্যন্ত সতর্ক আছে সে। পুকুর পাড়ের আশপাশে মেয়েটির সাড়া-শব্দ পেলে সে...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী

জাকির আহমদ

১৩ মার্চ, ২০২০ , ৪:২৪ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

পর্ব – ২ ‘মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর, তা কখনোই সম্ভব না। এতে তুমিও ডুবে মরবে।’ বলল ডাক্তার। ‘আপনি শুধু ভেসে থাকবেন। আপনাকে আমি হাত দিয়ে টেনে নিয়ে যাব।’ যেন অনুরোধ ঝরে পড়ল ছেলেটির...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২ 4

জাকির আহমদ

৬ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব – ১) সময়টা বসন্তের মাঝামাঝি। চৈত্রের এক সকাল। সেই সকালটা কাছে টানার মতো। মায়ের মনের মতো সেই সকালের আকাশটাও পরিষ্কার। বাতাস মুক্ত ও নির্মল। কোনো ক্লান্ত দেহকে প্রশান্তি দিতে এর জুড়ি নেই। বসন্তের...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১ 5
আমি ক্ষমাপ্রার্থী - শেষ পর্ব

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-শেষ পর্ব

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
শেষ পর্ব মূল দ্বীপে পৌঁছে গেছে। একটা সুন্দর হুড খোলা ফোর হুইল জিপে পাহাড়িয়া...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - জাকির আহমেদ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে। ‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-জাকির আহমেদ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৮) ‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭ 8

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৭) ‘হয়তো পারব। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ায় ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি।...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৬

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ৬) ‘তার মানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। ছেলেটি কিছু বলতে যাবে,...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৫) ‘না, কেন?’ ‘কিছু না।’ বলল ছেলেটি। চিহ্নিত। ‘তবে প্রথম যে দুজন তোমাকে গাড়ির...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৪) চিন্তাভাবনা শুরু করল জাহাজটাকে নিয়ে। তাতে হয়তো কোনো বুদ্ধি মাথায় আসতেও পারে। প্রথমে...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৩

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ৩) পরদিন ভোরবেলা পুকুর পাড়ে এসে সেখানে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২ 9

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
পর্ব – ২ ‘মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর, তা কখনোই সম্ভব না। এতে তুমিও...

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১ 10

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ১) সময়টা বসন্তের মাঝামাঝি। চৈত্রের এক সকাল। সেই সকালটা কাছে টানার মতো।...

জাকির আহমদ

৮ মে, ২০২০ , ১:৫০ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-শেষ পর্ব

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
শেষ পর্ব মূল দ্বীপে পৌঁছে গেছে। একটা সুন্দর হুড খোলা ফোর হুইল জিপে পাহাড়িয়া পথ বেয়ে ওপরে উঠেছে তারা।...

জাকির আহমদ

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে। ‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পেরে আর...

জাকির আহমদ

২৪ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৮) ‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে মুখ না খোল, তাহলে তোমাকে...

জাকির আহমদ

১৭ এপ্রিল, ২০২০ , ১২:০৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৭) ‘হয়তো পারব। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ায় ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি। কোনো কিছু না বলে রাইফেলে...

জাকির আহমদ

১১ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৬

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ৬) ‘তার মানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। ছেলেটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বলে উঠল মেয়েটি,...

জাকির আহমদ

৩ এপ্রিল, ২০২০ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৫) ‘না, কেন?’ ‘কিছু না।’ বলল ছেলেটি। চিহ্নিত। ‘তবে প্রথম যে দুজন তোমাকে গাড়ির পেছনে বসিয়ে পাহারা দিয়ে নিয়ে...

জাকির আহমদ

২৭ মার্চ, ২০২০ , ১:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব-৪) চিন্তাভাবনা শুরু করল জাহাজটাকে নিয়ে। তাতে হয়তো কোনো বুদ্ধি মাথায় আসতেও পারে। প্রথমে জাহাজের যে ব্যাপারটি তার মনে...

জাকির আহমদ

২১ মার্চ, ২০২০ , ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৩

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ৩) পরদিন ভোরবেলা পুকুর পাড়ে এসে সেখানে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে অপেক্ষা করছে ছেলেটি। তবে প্রকাশ্যে...

জাকির আহমদ

১৩ মার্চ, ২০২০ , ৪:২৪ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
পর্ব – ২ ‘মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর, তা কখনোই সম্ভব না। এতে তুমিও ডুবে মরবে।’ বলল ডাক্তার। ‘আপনি...

জাকির আহমদ

৬ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
(পর্ব – ১) সময়টা বসন্তের মাঝামাঝি। চৈত্রের এক সকাল। সেই সকালটা কাছে টানার মতো। মায়ের মনের মতো সেই সকালের...

জাকির আহমদ

৮ মে, ২০২০ , ১:৫০ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-শেষ পর্ব

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

শেষ পর্ব

মূল দ্বীপে পৌঁছে গেছে। একটা সুন্দর হুড খোলা ফোর হুইল জিপে পাহাড়িয়া পথ বেয়ে ওপরে উঠেছে তারা। জিপটা বেশ লম্বা। ড্রাইভারের পাশে বসেছে ক্যাপ্টেন। পেছনে একটা লম্বা সিটে একাই বসেছে মেয়েটি। বিপরীত দিকের সিটটিতে পাশাপাশি বসেছে লর্ড ও ছেলেটা। সবাই চুপ করে আছে।

সেই বিভীষিকাময় রাতের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছেলেটির। আল্লাহর অশেষ করুণায় আজো বেঁচে আছে সে। সেই মহান আল্লাহর ইশারায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। যাদের ভয়ে তারা পালিয়েছিল, তারাই আজ তাদের অতিথি করে নিয়ে যাচ্ছে। এই তো দুনিয়ার খেলা। এসব মানুষের সহজে বোধগম্য হয় না। এই দ্বীপের নাম ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড রাখা হয়েছে কেন, কে রেখেছে? এক সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করে নীরবতা ভাঙল মেয়েটি।

‘এ নাম আমিই রেখেছি। ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি আমার একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল। আমি বাগানে কাজ করতে ভালোবাসতাম। তাই এই দ্বীপের বাসিন্দাদের বলে দিয়েছিলাম, তারা যেন তাদের বাড়িতে ছোট হলেও একটা বাগান করে। তাই এ দ্বীপের প্রায় সব বাড়িতেই ফুলের বাগান আছে। সেই থেকে আমি এই দ্বীপের নাম রেখেছি ‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড’, বলেই আনমনা হয়ে গেল লর্ড।

‘ফুলের সঙ্গে মানুষের জীবনের চমৎকার সাদৃশ্য আছে। কলি থেকে ধীরে ধীরে ফুল ফোটে। সেই ফুল কিছু সময় সুন্দর হয়ে ফুটে থাকে। এক সময় ঝিমিয়ে যায়, ঝরে পড়ে যায়। আবার কোনো কোনো ফুল কলি অবস্থাতেই বোঁটা থেকে খুলে পড়ে যায়। আবার কোনো কোনো ফুল পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রস্ফুটিত হওয়ার পর ঝড়ো বাতাসে তার পাপড়িগুলো পড়ে যায়। ফুল বলতেই সুন্দর। তবে কতগুলো ফুল দেখতে সুন্দর, কিন্তু সুগন্ধ ছড়ায় না। সেসব ফুলকে মানুষ দূর থেকে উপভোগ করে কিন্তু নাকের কাছে নিয়ে আসে না। আর কিছু ফুল আছে, সুগন্ধ ছড়িয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে। মানুষ সেসব ফুলের সৌন্দর্যও উপভোগ করে সেই সঙ্গে নাকের কাছে এনে তার সুগন্ধ নিয়ে থাকে। এসব ফুলই সার্থক। ফুল কখনোই নিজের রূপ, সৌন্দর্য, সুগন্ধ নিজের উপকারে লাগাতে পারে না। সে সব বিলিয়ে দেয় সর্বসাধারণের জন্য। সত্যি, এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে খুবই খারাপ লাগছে।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল লর্ড। কেউ কিছু বলল না। একসময় পৌঁছে গেল বাংলোর সামনে। ঘড়িতে দুটো দশ বাজে।

বিকেলে দ্বীপটা ঘুরে দেখতে বেরোল, ক্যাপ্টেন তাদের ঘুরিয়ে আনবে। সে-ই গাড়ি ড্রাইভ করছে। তার পাশের সিটে বসেছে মেয়েটি। পেছনের সিটে ছেলেটি। দ্বীপের মার্কেট, আবাসিক এলাকা, বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রভৃতি ঘুরিয়ে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে তাদের নিয়ে এলো। সৈকতটা ছোট কিন্তু মনোরম। সৈকতে আরামে হেলান দিয়ে বসার জন্য কয়েকটা চেয়ার পাতা আছে আর তার ওপর আছে বিশাল ছাতা এখানকার পানি গাঢ় নীল, টলটলে পরিষ্কার। বিলল ঢেউগুলো তীরে এসে শান্তভাবে ভেঙে যায়, আবার ফিরে আসে।

সূর্যটা যেন পানির ওপর এসে পড়েছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে সূর্যের প্রতিচ্ছবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। সূর্যের প্রভাবে পশ্চিমাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। আকাশে নানা ধরনের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। একটু একটু ঠান্ডা লাগছে। দূর দিয়ে পাখির ঝাঁক উড়ে চলেছে। সবমিলে এক অপূর্ব পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। তিনজনেই কিছুক্ষণ সমুদ্রের হাঁটু পানিতে হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বিশ্রাম করছে। তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ছেলেটি ও মেয়েটির মাঝের চেয়ারে ক্যাপ্টেন বসেছে। সূর্যের অর্ধেকটা যেন পানির মধ্যে ডুবে গেছে। যেন একটা বিশাল আগুনের থালা হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। একসময় ডুবে গেল পুরোটাই। পশ্চিমাকাশ এখনো রক্তিম আছে। একটু পরেই নামাজে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি। ছেলেটি নামাজে দাঁড়াতেই উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন।

‘ম্যাডাম, আসুন আমরা গাড়িতে বসি, ততক্ষণে উনি আসুক’, বলে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল ক্যাপ্টেন।

মেয়েটিও পিছে পিছে এলো। বুঝতে পারছে না ক্যাপ্টেন কেন তাকে নিভৃতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। গাড়িটা পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড় করানো। দুজনই সামনে উঠে বসল। কেশে গলাটা পরিষ্কার করে মেয়েটির দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন। ‘ম্যাডাম, আমিও আমার ভাইয়ের সঙ্গে এখান থেকে চলে যাব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই দ্বীপে একটা স্কুল আছে। সেখানকার হেডমাস্টার খুব জ্ঞানী-গুণী লোক। চিন্তা করছি আমার বদলে তার হাতে এ দ্বীপের ভার তুলে দিতে বলব ভাইকে। আমার মনে হয়, এসব দায়িত্ব পালনে আমার চেয়ে তিনিই বেশি উপযুক্ত।

ভাইয়া আমাকে বলে দিয়েছে, তার রেখে যাওয়া সম্পদগুলো আমি যেন মানুষের বিশেষ করে মেয়েদের কল্যাণার্থে কাজে লাগাই। আমার মনে হয়, আমার চেয়ে তিনিই এ কাজের জন্য বেশি উপযুক্ত হবেন। এসব কাজের আনজাম তিনিই ভালো দিতে পারবেন। আমি আপনার প্রতি যথেষ্ট অন্যায় করেছি, কষ্ট দিয়েছি, আমাকে মাফ করবেন’, বলে কান্না ঢাকার জন্য অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ক্যাপ্টেনকে কথা শেষ করার সুযোগ দিয়েছিল মেয়েটি। ‘আপনি এভাবে বলছেন কেন?’ ক্যাপ্টেনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য মুখে যা এলো তাই তাড়াতাড়ি বলে ফেলল মেয়েটি।

‘আপনিও চলে যাবেন কেন, খুলে বলুন তো।’

‘শুধু আপনার জন্য’, সামনে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন।

‘আমার জন্য?’ কিছুটা হলেও অবাক হলো মেয়েটি। ক্যাপ্টেন যে তাকে পছন্দ করে তা সে আগেই জানে। কিন্তু সে যে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে এটা সে জানে না।

‘হ্যাঁ, আপনার জন্য। কারণ আমি আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমার সেই স্বপ্ন অর্থহীন। আমি জানি আপনি আমাকে ঘৃণা করেন। আপনি আমাকে কখনো পছন্দ করবেন না। আপনি চাইলে আমি আপনার জন্য পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় যেতে রাজি আছি, কিন্তু আমি জানি তা কখনো হবে না। এ দ্বীপে থাকলে আপনাকে আমার খুব মনে পড়বে, তাতে শুধু দুঃখই বাড়বে। তাই আমি আমার ভাইয়ে সঙ্গে চলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাই’, একনাগাড়ে দ্রুত কথাগুলো বলে থামল ক্যাপ্টেন। ‘সরি, বিয়ে করব না’, বলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল। পকেট থেকে রুমাল বের করল। মেয়েটিরও মন খারাপ হয়ে গেল। ‘আমি আপনার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছি, কিন্তু…’ বলে থেমে গেল মেয়েটি। ‘আপনি বলতে চান যে, কিন্তু আমি ওই ছেলেটিকে আমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি’, বলে নামাজরত ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। ‘ঠিক, বলিনি?’

ক্যাপ্টেনের অনুমান ক্ষমতা দেখে থ’ বনে গেল মেয়েটি। শুধু এতটুকু বলতে পারল ‘আপনি বুঝলেন কেমন করে?’ আর বলতে পারল না। লজ্জায় মুখ ঢাকল সে।

‘আমি সাইকোলজির ছাত্র ছিলাম’, বলল ক্যাপ্টেন। যেন এতেই সব ব্যাখ্যা আছে। কিছু বলতে যাবে মেয়েটি, হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ছেলেটি আসছে বলে।

ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে গেল ক্যাপ্টেন। সামনে দাঁড়াল ছেলেটি। ছেলেটির আগেই ক্যাপ্টেন মুখ খুলল।

‘শুনুন, আমি আপনার ওপর অনেক নির্মম অত্যাচার করেছি, আমাকে আপনি আপনার ছোট ভাই মনে করে ক্ষমা করে দেবেন’, হাত জোড় করল ক্যাপ্টেন।

‘আরে, কী করছেন?’ বলে ক্যাপ্টেনের জোড় করা হাত দুটো পৃথক করে দিল সে। দৃশ্য দেখে গাড়িতে বসেই কেঁদে ফেলল মেয়েটি। একটু পর তাদের ঘুরতে দেখে মুখ লুকাল মেয়েটি।

‘আমি কিছুই মনে করিনি, আপনি শান্ত হোন’, বলে ক্যাপ্টেনের কাঁধে হাত রাখল ছেলেটি। চোখ মুছল ক্যাপ্টেন। ছেলেটিও নিজের চোখ মুছল। এগোতে যাবে ছেলেটি, থামাল ক্যাপ্টেন।

‘এটা নিন’, জিপের চাবির রিং বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। সামনে শূন্যে দুহাত স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল ‘প্লিজ…’, হেসে চাবির রিংটা হাতে নিল ছেলেটি। হাসি ফুটে উঠল বাকি দুজনের মুখেও।

পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছে জিপ। খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে ছেলেটি। পাশের সিটে বসেছে মেয়েটি। পেছনের সিটে ক্যাপ্টেন। মৃদু-মন্দ হাওয়া বইছে। মেয়েটির চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। মনোরম পরিবেশের মধ্য দিয়ে ছুটছে গাড়ি। উইন্ডশিল্ডের মধ্য দিয়ে হেডলাইটের আলোয় উদ্ভাসিত রাস্তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটি।

‘আপনি খুব সুন্দর করে গাড়ি চালাতে পারেন, স্বীকার করতে আপত্তি নেই, আমিও এতটা পারি না’, পিছনে থেকে মৃদু হেসে বলল ক্যাপ্টেন।

‘যাহ!’ লজ্জা পেল ছেলেটি। এরপর আর কোনো কথা হলো না। পেছন থেকে ক্যাপ্টেন দেখছে, মেয়েটি কিছুক্ষণ পরপর ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটি একবারও তাকায়নি। ডাইনিং রুমে বিশাল টেবিলে খেতে বসেছে লর্ড, ক্যাপ্টেন, ছেলেটি ও মেয়েটি। খাবার পরিবেশন করছে একজন ওয়েটার।

‘আপনাদের আমেরিকা যাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছি’, খেতে খেতেই বলল লর্ড। কাল সাড়ে চারটায় জাহাজ নোঙ্গর তুলবে, আপনারা প্রস্তুত থাকবেন।’

‘আচ্ছা’ দুজনে একই সঙ্গে সাড়া দিল। খাওয়া শেষে টুকটাক গল্প করে সবাই উঠল।

‘দুজনের জন্য দুটো সুন্দর সাজানো-গোছানো কামরা দেয়া হয়েছে, বাথরুম বারান্দাতে আছে। যার যার কামরায় এসে ঢুকল দুজনে।

পরদিন সকালে গোসল করে সব গুছিয়ে প্রস্তুত হলে গেল দুজনে। তাদের দুজনকে লর্ড একটি করে সুন্দর চামড়ার ব্যাগ দিয়েছে। আর দিয়েছে ছেলেটির জন্য এক জোড়া শার্ট-প্যান্ট। মেয়েটিকে দিল একটি থ্রি-পিস। কাপড়গুলো অত্যন্ত দামি। আরো দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। গতকাল মূল দ্বীপে পৌঁছে ইঞ্জিনিয়ার তাদের কমপক্ষে কাপড়ের ব্যাগ দুটো নেয়ার জন্য খুব অনুরোধ করল।

‘আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না, ঠিক আছে আপনার কথা রাখছি’, ছেলেটি তার জন্য একজোড়া শার্ট-প্যান্ট বের করে নিয়েছে। মেয়েটিও তাই করেছে। তারপর আর কিছু বলেনি। বাকি মালপত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছে। সব চামড়ার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। আমেরিকায় ঢুকলেই প্রয়োজন হবে বলে কিছু ডলার দিয়েছে। বাকি সময়টা বাংলো ঘুরে, লর্ড কোয়ার্টার ও আশপাশটা ঘুরে কাটিয়ে দিল। তাদের সঙ্গে ছিল ক্যাপ্টেন।

লর্ডের রুচির তারিফ করতে হবে। সে বাংলোটাকে রাজপ্রাসাদতুল্য করে বানিয়েছে। নীচতলায় একটা মিউজিয়ামও গড়ে তুলেছে। সেখানে তার সব সংগ্রহের জিনিস সাজানো আছে। তার সংগ্রহের কতগুলো অনেক দামি জিনিস।

আজ দুপুরের আগেই খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য ঘুরে-ফিরে কেবল বিছানায় শুয়েছে। এই সময় বেড লকারের ওপর রাখা টেলিফোন সারা ঘরে মৃদু মিউজিকের আওয়াজ ছড়িয়ে দিল। রিসিভার কানে ঠেকাল ছেলেটি। ‘হ্যালো!’ ওপাশ থেকে ভেসে এলো, আমি অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, চিনতে পারছেন?’

‘পারছি, অবসরপ্রাপ্ত কেন?’

‘একটু জোক করলাম, মাফ করবেন। শুনুন আজ বিকেলে আপনাদের বিদায় বেলায় কিন্তু আমিও উপস্থিত থাকব।’

‘অবশ্যই।’

‘আপনাদের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, রাখি গুডলাক।’

‘মানে?’ লাইন কেটে যাওয়ায় জবাব মিলল না।

একইভাবে মেয়েটিকেও ফোন করল ইঞ্জিনিয়ার।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে প্রস্তুত হয়ে ব্যাগ হাতে ঠিক আড়াইটায় নীচে নেমে এলো ছেলেটি। নীচে তাদের জন্য চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে লর্ড ও ক্যাপ্টেন। তাদের দুজনের জন্যও দুটো চেয়ার আছে।

‘বসুন, উনি ততক্ষণ আসুক’, ছেলেটিকে বলল ক্যাপ্টেন। কিন্তু বসল না ছেলেটি। একটু দূরে চৌদ্দ-পনেরজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে এগোলো সে। সেখানে ছেলেটির পরিচিত অনেক মুখ আছে। প্রথমেই দাঁড়াল সেই দুজনের সামনে, যারা তাকে প্রথমদিন খুব কষ্ট দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিল।

‘আমাদের মাফ করবেন’, মাথা নীচু করে বলল দুজনই। ‘এসব বলে লজ্জা দেবেন না’, বলে তাদের মাথা উঁচু করে দিল। আর কিছু না বলে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরে গেল।

এবার দাঁড়াল তাদের সামনে যাদের বন্দী করে সে মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়েছিল। তাদের কেউ তাকে কিছু বলল না বা বলতে পারল না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এলো আরেকজনের সামনে। এ লোকটি প্রথম দিন তাকে রুটি খাইয়ে দিয়েছিল। তাকে নামাজের জন্য ডেকে দিয়েছিল।

‘তুমি, তুমি আমার ছেলের মতো’, লোকটি যে অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে তা বুঝতে কষ্ট হলো না ছেলেটির। তার চোখের কোণগুলো চিক চিক করছে।

‘হ্যাঁ’, সায় দিল ছেলেটি। আর কিছু বলতে পারল না লোকটি। হাত মেলাল আর সঙ্গে। কিন্তু লোকটি যেন তার হাতটা ছাড়তে চাচ্ছিল না। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতটা সরিয়ে নিল ছেলেটি। ডান হাতটা তার কাঁধে রাখল, কিছু বলতে পারল না। তার চোখেও পানি এসে গেল। কান্না লুকানোর জন্য ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল লোকটি।

আরো কয়েকজনের মুখ চেনে ছেলেটি। কিন্তু তারা এখানে উপস্থিত নেই। বাকি সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাথা নীচু করে ফিরে এলো সে।

ততক্ষণে মেয়েটি বেরিয়ে এসেছে। চেয়ারে বসেছিল। এতক্ষণ সবাই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে ফিরে আসতেই উঠে দাঁড়াল।

‘পৌনে তিনটা বাজে। সময় কম; রওনা হওয়া যাক, কি বলেন?’ দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে বলল লর্ড।

‘ঠিক আছে’, বলে সামনে এগোলো ছেলেটি। ‘দুটো গাড়ি কেন?’

‘সামনেরটায় আপনারা দুজন, পেছনেরটায় আমরা’, বলেই ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল ক্যাপ্টেন।

‘একটাতেই তো যাওয়া যেত’, এগিয়ে এসে বলল ছেলেটি।

‘কেন, কোনো অসুবিধা আছে? ওই যে উনি উঠে বসেছেন, আপনিও উঠুন।’ নরম গলায় বলে ক্যাপ্টেনের বামপাশে উঠে বসল লর্ড। অগত্যা ছেলেটি ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। পাশে বসে আছে মেয়েটি। গাড়ি এগোতে শুরু করতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর উদ্দেশে হাত নাড়ল, ছেলেটি, সেই সঙ্গে মেয়েটিও। তাদের গাড়িটা সামনে আছে। পেছনে আসছে আপনারটা। চুপচাপ সামনের দিকে গাড়ি চালাচ্ছে ছেলেটি। নীচে নামছে। ‘এদের ছেড়ে যেতে আমার খুব খারাপ লাগছে’, নীরবতা ভাঙল মেয়েটি।

‘আমারও’, সামনে তাকিয়েই জবাব দিল ছেলেটি।

দ্বীপের ছোট্ট শহরটার মধ্য দিয়ে দ্রুত ছুটছে গাড়ি দুটো। চারটার একটু পরই তারা বন্দরে পৌঁছে গেল। গাড়ি দুটো পার্ক করে নেমে পড়ল সবাই। পাশেই নোঙর করে আছে ছোট জাহাজটা।

কাঠের লম্বা সিঁড়ি দিয়ে জাহাজে উঠতে যাবে এমন সময় একটা গাড়ি হার্ড ব্রেক করে থেমে গেল। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে লাফিয়ে নামল ইঞ্জিনিয়ার।

ড্রাইভারকে ‘গুডলাক’ বলে তাদের উদ্দেশে হাত নেড়ে তাদের কাছে এলো। নীরবে চওড়া সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। সবার মনই ভারাক্রান্ত। জাহাজে উঠতেই একজন তাদের স্বাগত জানাল। লর্ডকে দেখে স্যালুট করল। পরিচয় করিয়ে দিল লর্ড ‘ইনি এই জাহাজের ক্যাপ্টেন, আর এনারা আমার সম্মানিত বিদায়ী অতিথি’, তাদের দেখিয়ে বলল।

তারা এসে দাঁড়াল জাহাজের ডেকে। ক্যাপ্টেনের হাতের প্যাকেটটা এ প্রথম দেখতে পেল। সময় কম, কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই শুরু করল লর্ড ‘আমি আগামী তিন দিনের মধ্যে যারা এই দ্বীপে বন্দী আছে তাদের নিজ নিজ দেশের তীরে নামিয়ে দেয়ার জন্য পাঠিয়ে দেব, হয়তো আগামী দশ-বারো দিনের মধ্যে তারা বাড়িতে ফিরতে পারবে। তাদের মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।’ থামল লর্ড। এরপর বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত আমার এজেন্টের সঙ্গে ও অন্যান্য চক্রের সঙ্গে দেনা-পাওনা মিটিয়ে বাকি কাজ শেষ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে আমি এ দ্বীপাঞ্চল ত্যাগ করব। আমার সঙ্গে নাকি এও যাবে।’ বলে ক্যাপ্টেনকে দেখাল লর্ড। তাহলে আমার একজন সঙ্গী বাড়বে, ভালোই হলো। সবাই মাথা নীচু করে কথা শুনছে। ‘সে প্রস্তাব করছে এ দ্বীপের স্কুলের হেডমাস্টারকে এ দ্বীপের দায়িত্বভার দিয়ে যেতে, আমি রাজি হয়েছি। কারণ লোকটি সৎ, নীতিবান ও জ্ঞানী। আমি এ দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই আমেরিকায় প্রবেশ করবেন। তাই আপনাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আপনারা কি রাখবেন?’ বলে ক্যাপ্টেন বাদে সবার মুখের দিকে তাকাল লর্ড। লর্ডকে থামতে দেখে সবাই মুখ তুলে তাকাল।

‘আপনারা হয়তো ভাবছেন, অনুরোধটা হয়তো কঠিন হবে আসলে তা না’, সবাইকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল লর্ড।

‘অনুরোধটা হলো, আপনারা ভালোভাবে আমেরিকায় পৌঁছে প্রথমে পাঁচ-সাত দিন আমাদের সম্পর্কে কাউকে কিছু জানাবেন না। কারণ তাতে বিভিন্ন দেশ তাদের কোস্টগার্ডদের সতর্ক করে দিলে আমরা হয়তো ধরা পড়ে যাব। ফলে আমাদের আর নতুন জীবন শুরু করা যাবে হবে না। বিশ্বাস করুন, আমরা আর কখনোই নিজেদের অপরাধের সঙ্গে জড়াব না’, যেন কেঁদে ফেলবে লর্ড।

‘ঠিক আছে, আমরা আপনার কথা রাখব’, মুখ ফসকে বলে ফেলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি তো এখানেই থাকছেন, আপনার তো কথা রাখার প্রশ্নই ওঠে না’, কথাটা ধরল মেয়েটি।

‘তাই তো! কিন্তু আপনারা কিছু বলছেন না, এদিকে লর্ডের অবস্থা দেখে মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।’ কাঁচুমাচু করে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘উহু। আপনি দুপুরে টেলিফোন করে বলেছিলেন যে, আপনি আমাদেরকে সারপ্রাইজ দেবেন, সেটা কী?’ বলল ছেলেটি।

‘তাহলে তো ওটাও মুখ ফসকে বলে ফেলেছি’, যেন কৈফিয়ত নিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘উহু। আমাকেও বলেছিলেন, দুবার মুখ ফসকাতেই পারে না’, বলল মেয়েটি।

‘আমার মনে হয় আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। তার কারণ আপনি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ আপনার দাঁড়ানোর কথা ওনাদের পাশে’, বলল ছেলেটি।

‘আমি তো দেখছি, আপনারাই আমাকে সারপ্রাইজ দিলেন’, এ কথায় সবাই হেসে উঠল।

হাসি থামিয়ে মেয়েটি বলল, ‘আপনি কেন আমাদের সঙ্গে যাবেন?’

‘পরে খুলে বলব’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। হাসিতে মুখ ভরে গেছে।

‘ঠিক আছে, আপনার অনুরোধ রাখার চেষ্টা করব’, বলল ছেলেটি। মেয়েটিও বলল।

‘আপনাদের ঋণ শোধ করার নয়, তাই বিনিময় নয়, ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আপনাদের বিদায়কালে যৎসামান্য উপহার দেয়া হবে প্লিজ গ্রহণ করে আমাদের ধন্য করুন’, বলল লর্ড।

ক্যাপ্টেন বাম হাতে কাগজের প্যাকেটটা রেখে ডান হাতে খুলে ফেলল কভারটা। প্যাকেটের ভেতর থেকে একটা বড় টকটকে লাল গোলাপ বের করল। সেটি ধরিয়ে দিল মেয়েটির হাতে। এরপর ছেলেটির, তারপর ইঞ্জিনিয়ারের হাতে একটা করে গোলাপ ফুল গুঁজে দিল।

‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের শেষ উপহার ফুল, আর অফুরন্ত ভালোবাসা’, বলল ক্যাপ্টেন।

‘আমাদের তিনজনের পক্ষ থেকেও’, বলল মেয়েটি। ‘আপনাদের দুজনকে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের সব বাসিন্দার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি’, বাকি দুজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

‘আপনাদেরও ধন্যবাদ’, বলল লর্ড।

ঘড়ির দিকে তাকাল ছেলেটি। চারটা পঁচিশ বাজে। হাত থেকে ঘড়িটা খুলে ফেলল। বাড়িয়ে ধরল ক্যাপ্টেনের দিকে। ‘এই যে আপনার ঘড়ি, নিন এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে ছেলেটির হাত থেকে নিল ঘড়িটা। আবার বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। ‘সেদিন আপনার মৃত্যুর কত সময় বাকি আছে তা দেখার জন্য দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ আপনাকে এটা আমার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দিচ্ছি, প্লিজ নিন’, নিয়ে নিল ছেলেটি। হাসি ফুটে উঠল সবার মুখে। হাতে পরে নিল ঘড়িটি। বিদায় নেয়ার সময় হয়ে এলো, হয়তো আপনাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না’, বলতে বলতে তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে নিল ক্যাপ্টেন ও লর্ড। ‘আপনারা সুখে থাকুন, শান্তিতে থাকুন, চলি গুডলাক’, বলেই আর দাঁড়াল না লর্ড। ঘুরে পা বাড়াল। তার পেছন পেছন ক্যাপ্টেন। আশপাশে তারা ছাড়া আর কেউ নেই।

একটু পর নোঙর তুলল জাহাজ। জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়াল তিনজন। নীচে দাঁড়িয়ে আছে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের লর্ড ও তার সহযোগী ক্যাপ্টেন। তাদের দেখে হাত নাড়ছে। তারাও প্রতিউত্তর দিচ্ছে। ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে জাহাজটি। পেছনে কারো কাশির আওয়াজ পেয়ে তিনজনই ঘুরে দাঁড়াল। দেখল এ জাহাজের ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি তিনজনই চোখ মুছল। ‘চলুন, আপনাদের থাকার ঘর দেখিয়ে দিই’, বলে হাঁটতে শুরু করল ক্যাপ্টেন তার পেছনে চলল তিনজন।

সেদিনই সন্ধ্যার পর জাহাজের ছাদে তাদের বিকেলের চা-নাশতা দেয়া হয়েছে। বিকেলটা তাদের নিজ নিজ ঘর গোছাতেই কেটে গেল। বড় একটা ছাতার নীচে একটা গোলটেবিল ঘিরে সবাই বসেছে। তাদের সামনে গরম স্যান্ডউইচ চলে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার একটা স্যান্ডউইচ কেবল হাতে নিয়েছে এমন সময় ক্যাপ্টেন এলো, তবে বসল না।

‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনাদের সঙ্গে অন্য সময় বসব, আপনারা ভালোভাবে খাবেন, কোনো সমস্যা হলেই আমাকে জানাবেন’, এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন। ‘আর আপনাদের সময় কাটানোর জন্য লর্ড কিছু বই দিয়েছে ইচ্ছে করলেই সেগুলো নিয়ে পড়তে পারেন, গুডবাই’, বলে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে দুষ্টুমি করে চোখ টিপে চলে গেল। তারা দুজনে যে বন্ধু মানুষ, তাই। বাকি দুজনও খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই যেন ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পরপর সাগর থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাসে কেঁপে উঠল। নীরবতা ভাঙল মেয়েটি। শেষ স্যান্ডউইচটা তুলে নিতে নিতে ইঞ্জিনিয়ারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এবার আপনার কাহিনি শুরু করুন।’

এক গ্লাস পানি শেষ করে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে শুরু করতে যাবে ইঞ্জিনিয়ার, এমন সময় কফি নিয়ে এলো ওয়েটার। কফিতে দুই চুমুক দিয়ে শুরু করল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমি আমেরিকান একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, তবে কোথাও চাকরি করি না।’ কফির কাপে আবার চুমুক দিল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমি একজন ফ্রিল্যান্স ক্রাইম রাইটার’, যেন বোমা ফাটাল ইঞ্জিনিয়ার। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, এসব পত্রিকায় মাঝেমধ্যেই আমার লেখা প্রকাশ পায়’, সহজে সাধারণভাবে বলে চলেছে লোকটি। ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডের লর্ডের জাহাজে চাকরি নেয়ার পর থেকে পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশ পায়নি, তবে ফিরতে পারলে এক মাসের মধ্যে নারী পাচারের ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন লেখা শুরু করব। হয়তো সেগুলো নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশ পাবে’, কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখে কয়েক চুমুকেই শেষ করল। ‘প্রায় এক বছর আগে জানতে পারি আফ্রিকা থেকে অনেক নারী পাচার হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা ডিভোর্স হয়েছিল অনেক আগে, আমি একাই থাকতাম’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি বিয়ে করেননি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘না। যা-ই হোক তারপর চলে এসেছিলাম আফ্রিকায়, প্রায় এক মাস খোঁজখবর করে অনেক কিছু জানতে পারলাম। শেষে ঠিক করলাম এদের আস্তানার সবকিছু জানতে হবে, বলতে গেল একদিন ভাগ্যক্রমে সুযোগ পেয়েও গেলাম। যে জাহাজে করে আপনাদের প্রথম দ্বীপ থেকে মূল দ্বীপে আনা হয়েছিল, সে জাহাজটা দক্ষিণ আফ্রিকার এক তীরে ভেড়ে। খবর পাই, সে জাহাজের ফার্স্ট মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আসার পথে রাতে প্রচুর ড্রিংক করে জাহাজ থেকে পানিতে পড়ে মারা গেছে। এই সুযোগে আমি ছদ্ম পরিচয়ে জাহাজে চাকরি নিই।’

‘ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ডে পৌঁছে থাকার জন্য লর্ড আমাকে ওই বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িটা দিয়েছিল। তারপর থেকে আমি সব খোঁজখবর নিতে থাকি। গত তিন মাস থেকে আমিও এদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কারণ পালালেই ওরা আমাকে ধাওয়া করত। আমার মুখ বন্ধ করে দিত। আজ আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে আমারো সৌভাগ্যের দ্বার খুলে গেছে’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘গতকাল এই দ্বীপে লর্ডের কাছ থেকে সব শোনার পর, মূল দ্বীপে ফিরে লর্ডকে সুকৌশল আরো যাচাই করি। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হই যে, লর্ড তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে না। তখন আমি লর্ডকে আমার পরিচয়ও দিয়ে দিই। প্রথমে আমার কথা শুনে তিনি অবাক হয়ে যান। আমি তাকে আপনাদের সঙ্গে আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার কথা বললে তিনি একবাক্যেই রাজি হয়ে যান এবং আমার সব বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দেন। তবে তিনি আমাকে এমনভাবে প্রতিবেদন লেখার অনুরোধ জানান যেন পরবর্তীতে দ্বীপ বাসিন্দাকে কোনো ঝামেলায় জড়াতে না হয়’, বলে থামল লোকটি।

মুখে হাসি ফুটে উঠল ইঞ্জিনিয়ারের। ‘গতকালই আপনাদের সারপ্রাইজ দেয়ার ব্যাপারটা লর্ড-ক্যাপ্টেনকে জানাই, কিন্তু আপনারাই আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছেন’, বলে হো হো করে হেসে উঠল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আর কিছু বলার নেই’, হাসি থামিয়ে বলল সে।

‘এখন ওঠা যায়’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। দীর্ঘক্ষণ পর সে মুখ খুলল।

‘প্লিজ, বসুন, আর কিছুক্ষণ গল্প করি’, মেয়েটির কণ্ঠে অনুরোধের ছোঁয়া আছে।

‘ঠিক আছে, আপনারা গল্প করুন’, বলে পা বাড়াল ছেলেটি। মন খারাপ হয়ে গেল মেয়েটির। উঠে পড়ল দুজনে।

নীচে নামছে তিনজনই। ছেলেটির পাশে আছে ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটি পেছনে আছে।

‘আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?’ হঠাৎ করেই ছেলেটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বলুন’, বলল ছেলেটি।

‘উম’, যেন জিজ্ঞেস করতে দ্বিধাবোধ করছে ফ্রিল্যান্স রাইটার। আপনি যে গার্ডদের কাছ থেকে রাইফেল নিয়েছিলেন, তো আপনি কি রাইফেল চালাতে জানেন?’

‘জি’, নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল।

‘কীভাবে জানলেন? আই মিন কোথায় শিখেছেন?’

‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যেন তারা সঙ্কটকালে দেশ বাঁচাতে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারে’, বলে থামল ছেলেটি। কী ভেবে, আপনি কি মনে করেছিলেন, আমি কোনো মুজাহিদ গ্রুপের সদস্য?’ প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘না’, অপ্রস্তুত হয়ে গেল রাইটার। ‘শুধু কৌতূহল মেটানোর জন্যই আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি।’

আর ওই ব্যাপারে কোনো কথা হলো না। দেখা হয়ে গেল জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে।

‘চলুন, জাহাজের কোথায় কী আছে তা আপনাদের ঘুরিয়ে দেখাই’, বলল ক্যাপ্টেন।

 

পরদিন কেবল সূর্য উঠেছে। সুন্দর এক সকাল। মেয়েটি জাহাজের রেলিংয়ের ধারে চেয়ারে বসে আছে। তার পাশের কামরাটা ছেলেটির। তার পরেরটা ইঞ্জিনিয়ারের। দুজনের কেউই এখনো বাইরে বের হয়নি।

ছেলেটি কে? তার পরিচয় কী? তার নাম, ঠিকানা এখনো তার পক্ষে জেনে নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কেন যেন ছেলেটির সামনে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত কথা বলতে তার মুখের কথা জড়িয়ে যায়। বেশ কয়েক দিন চেষ্টা করেও সে তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে পারেনি। ছেলেটিও তার সম্পর্কে কোনোদিন কিছু শুনতে চায়নি। যেন তার প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই। এ জন্যই হয়তো সে পারেনি।

বিমানবন্দরের ওই ঘটনার পর থেকে সে ছেলেটির সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করত। নিজে বাঁচার জন্য তার সঙ্গে অনেক দুর্ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাংলো থেকে পালিয়ে বের হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তার আগের ধারণা পাল্টে যেতে থাকে। সে অনেকভাবে খেয়াল করে দেখেছে, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তার দিকে ছেলেটি তাকায়নি, আর তাকালেও এক পলকের জন্য। সবসময় চোখ নীচের দিকে রেখেছিল। বিশেষ করে ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড থেকে পালানোর সময় নৌকা উল্টে অন্য দ্বীপে ওঠার পর যেন এ ব্যাপারে সে আরো সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। আজ পর্যন্ত তার হাত পর্যন্ত সে স্পর্শ করেনি। অথচ সে অনেক যৌক্তিক সুযোগ পেয়েছিল। চতুর্থ দ্বীপে মোমের আগুনে হাত দেয়ার ঘটনাটাও সে অনুমান করে নিয়েছে। এসবের কারণেই কি সে তার প্রতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে? বাংলো থেকে পালানোর পর যখন ঢাল বেয়ে দুজনে গড়িয়ে পড়ার সময় যা ঘটেছিল তারপর থেকেই সে তাকে পছন্দ করতে শুরু করে। কিন্তু সে ছেলেটিকে এখনো তার হৃদয়ের কথা কোনোভাবেই জানাতে পারেনি। কেন পারেনি তা নিজেও ভালোভাবে জানে না। সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে ভাবনার রাজ্যে বিচরণ করতে শুরু করেছিল তা নিজেও বলতে পারবে না। কারো গলার আওয়াজে ভাবনায় বাধা পড়ল।

‘গুড মর্নিং। কেমন আছেন?’

তাকালো মেয়েটি। ঘর থেকে কেবল বের হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার। তাকেই উদ্দেশ করে বলছে। আশপাশে আর কেউ নেই।

‘গুড মর্নিং, ভালোই আছি। আপনি কেমন আছেন?’

‘ভালো’, হেসে জবাব দিল। পাশে এসে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। ঘরে ঢুকে আর একটা চেয়ার এনে তাকে বসতে দিল মেয়েটি।

‘এতদিন এক সঙ্গে থাকলাম, এখনো ছেলেটির নাম জানতে পারিনি’, কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই বলল মেয়েটি।

‘আমিও জানি না’, বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘প্লিজ, আপনি কি তার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি জেনে নিতে পারবেন?’ বলতে বলতে রক্তিম হয়ে উঠল তার মুখখানা, ব্যাকুল ভাবটা লুকাতে পারল না।

‘কেন, খুবই দরকার?’ হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার। আবার কিছু বলতে যাবে এমন সময় এলো ক্যাপ্টেন।

‘ব্রেকফাস্ট রেডি, যেতে হবে।’

সেদিনই বিকেলবেলা। জাহাজের ছাদে ছাতির নীচে আবার তাদের বিকেলের নাশতা দেয়া হয়েছে।

‘ম্যাডাম, আমেরিকায় পৌঁছতে পারলে আপনি যাবেন কোথায়?’ হঠাৎ করেই প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘নিউ ইয়র্কে।’

‘সেখানে কে আছে?’ প্রশ্নটা করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আমার বাবা-মা, বড় ভাই-ভাবি।’

‘আপনারা কি বাংলাদেশি’, আবার জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘জি।’

‘আমেরিকায় কত দিন থেকে আছেন?’ প্রশ্ন করেই চলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আমার ভাই আমার চেয়ে সাত বছরের বড়, আমার ভাইয়ের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখনই বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসেন। ওখানকার এক বড় ফার্মে চাকরি নেন। একপর্যায়ে আমরা আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়ে যাই। তারপর বাবা সেখানে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে বাবা-ভাই দুজনে ব্যবসা দেখাশোনা করছেন’, সংক্ষেপে খুলে বলল মেয়েটি।

‘এত প্রশ্ন করায় কিছু মনে নেবেন না, আসলে পত্রিকায় লেখার জন্যই এত প্রশ্ন করছি’, জানাল রাইটার।

‘ঠিক আছে, আপনি প্রশ্ন করুন’, আশ্বস্ত করল মেয়েটি।

‘আপনি বাংলাদেশে কেন গিয়েছিলেন?’

‘ছুটিতে, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে।’

‘ওহ হো, এখনো আপনার নামটাই…’ শেষ করতে পারল না ইঞ্জিনিয়ার।

‘এক্সকিউজ মি, আপনারা গল্প করুন, আমি উঠছি’ বলে আর দাঁড়াল না ছেলেটি। অবাক হয়ে বাকি দুজন চেয়ে থাকল তার গমনপথের দিকে।

পরদিন সন্ধ্যার অনেক পর বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় ভরে গেছে চারদিক। বাংলাদেশে থাকা মায়ের কথা ভাবছে সে।

মা কি জানে তার ছেলে এখনো বেঁচে আছে? আমেরিকায় বড় ভাই কি জানে তার ভাই তার কাছে ফিরছে? তার কাহিনি শুনে কি তাকে এত পরে ভর্তি করে নেবে। তা না হলে লেখাপড়ায় সে এক বছর পিছিয়ে যাবে।

কারো পদশব্দে ফিরে তাকাল ছেলেটি। মেয়েটি এদিকেই আসছে। ঘরে ঢুকে পড়ল ছেলেটি।

দুদিন পর সকাল বলে আমেরিকান উপকূল থেকে অনেক দূরে জাহাজ থেমে গেছে। আর এগোনো যাবে না। তিনজনই তৈরি। বোট নামানো হয়েছে পানিতে। বোটটা জাহাজের গায়ের সঙ্গেই লাগানো আছে। এ কদিন তাদের দেখতে দেখতেই চলে গেল। প্রতিদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করত। দুপুরের আগেই গোসল করত। তারপর লাঞ্চ করে ঘুমাত। বিকেল বেলা চা-নাশতা করত। রাতে ডিনার করত। রাতে ঘুম দিত। বাকি সময়টা বিভিন্ন কাজে কেটে যেত। ছেলেটা বেশিরভাগ সময় ঘরে থাকত। বইপত্র পড়ত। মেয়েটাও পড়ত। তবে কখনো কখনো বারান্দায় বসে থাকত। বিশেষ করে সকাল বেলা। এ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারের আগে থেকেই খাতির ছিল। দুজনে প্রায় গল্প-গুজবে মেতে থাকত। ইঞ্জিনিয়ার মাঝে মধ্যে মেয়েটিকেও সঙ্গ দিত।

তবে ছেলেটির সঙ্গে আর কোনো কথাবার্তা হয়নি। সেই সুযোগই সৃষ্টি হয়নি। যেন ছেলেটি হঠাৎ করেই তাদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

জাহাজ থেকে তিনজনই বোটে নামল। তাদের লাগেজ আগেই বোটে তোলা হয়েছে।

‘আপনাদের হয়তো তেমন আতিথেয়তা করতে পারিনি, মাফ করবেন’, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন।

‘যথেষ্ট করেছেন’, জবাব দিল ছেলেটি।

‘বন্ধু, হয়তো আর দেখা হবে না, বিদায়’, ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্দেশ করে বলল ক্যাপ্টেন। আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এ জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার।

‘বিদায়’, বলতে জাহাজের সঙ্গে বোটকে বেঁধে রাখা বাঁধনটা খুলে দিল ইঞ্জিনিয়ার। স্রোতের ধাক্কায় জাহাজ থেকে খানিকটা সরে গেল বোটটা।

বোটের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল ইঞ্জিনিয়ার। তারপর স্টিয়ারিং ধরে গিয়ার দিল। যেন প্রাণ ফিরে পেল বোট। এগোতে শুরু করল। সবার চোখ ভিজে গেছে। বোট থেকে তারা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে আর জাহাজ থেকে তার প্রতিউত্তর আসছে।

একটু পর জাহাজের লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এক সময় বিন্দুতে পরিণত হলো স্বয়ং জাহাজটাই।

বোটটা বেশ বড়। আর ইঞ্জিনটা বেশ শক্তিশালী। সাগরের বড় বড় ঢেউ কেটে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। লাগেজগুলোকে যতদূর সম্ভব আড়াল করে রাখা হয়েছে। যাতে সাগরের ছিটকে আসা পানিতে না ভেজে।

বোটের পেছনে স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে ইঞ্জিনিয়ার। বোট সামলাতে ব্যস্ত।

বোটের মাঝামাঝি বসে আছে মেয়েটি। আশপাশে তাকানো ছাড়া তার আর কিছু করার নেই। একবার তাকাল সামুুদ্রিক মাছে পূর্ণ পাত্রটার দিকে। তার পাশে আছে তিনটা ছিপ। এসবও তাদের বোটে তুলে দেয়া হয়েছে। বোটের একদম সামনে বসে আছে ছেলেটি। তাকিয়ে আছে সামনে খোলা সাগরের দিকে। দুপুর নাগাদ পূর্বপরিকল্পিত একটা ছোট্ট দ্বীপে নামল তারা। কিছু নারকেল গাছ ছাড়া এ দ্বীপে আর কিছুই নেই। আশপাশে কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ আছে।

জোহরের নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। এর মধ্যে বোট থেকে হটপট তিনটা দ্বীপের ছোট সৈকতে আনা হয়েছে। খাওয়া শেষ হলে বিশ্রাম নিতে বসল।

ইঞ্জিনিয়ার বোট চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একটা নারকেল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বিশ্রাম নিতে শুরু করল। ছেলেটি বসে আছে। তারও চোখ বন্ধ।

মেয়েটি যে কখন তার সামনে এসে বসেছে টেরই পায়নি সে। মেয়েটি খেতে খেতেই ঠিক করে রেখেছে, যেভাবেই হোক ছেলেটিকে বলতে হবে। সময় শেষ হয়ে আসছে।

‘আপনি ঘুমাচ্ছেন?’ দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল মেয়েটি।

কাছেই মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে চোখ খুলে তাকাল ছেলেটি। তার থেকে তিন-চার হাত সামনে বসে আছে মেয়েটি।

‘আপনাকে কিন্তু আমাদের নিউ ইয়র্কের বাসায় যেতে হবে’, এভাবেই শুরু করতে চাইল মেয়েটি।

‘কেন, আপনি একাইবা ওনাকে নিয়ে বাসায় পৌঁছতে পারবেন না?’ ইঙ্গিতে ইঞ্জিনিয়ারকে দেখাল ছেলেটি।

একটু ঘুরিয়ে জবাব দিল মেয়েটি। ‘আমি একাই যেতে পারব, তবে আপনাদের দুজনকেও আমাদের বাসায় যেতে হবে।’

কিছু না বলে মৃদু হাসল ছেলেটি।

এবার কী বলবে ভেবে পেল না মেয়েটি। হার্ট-বিট বেড়ে গেছে। বুক কাঁপছে। এমনকি শরীরটাও যেন থরথর করে কাঁপছে। আগেও এ ধরনের অবস্থা হওয়ায় বলতে পারেনি। এবার তাকে যে বলতেই হবে।

লাজ-লজ্জা সব ফেলে এবার সরাসরি বলার জন্য প্রস্তুত হলো মেয়েটি। অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রেখে ‘আপনি কি কাউকে মানে কোনো মেয়েকে পছন্দ করেন?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি নীচের দিকে তাকিয়ে। রাঙা হয়ে উঠেছে মুখ।

হতভম্ব হয়ে গেল ছেলেটি। মেয়েটি যে হঠাৎ এ ধরনের প্রশ্ন করবে তা কল্পনাও করেনি সে। সেই সঙ্গে সতর্কও হয়ে উঠল। কেটে গেল এক সেকেন্ড।

‘না’, সত্য কথাটাই বলল ছেলেটি। ‘হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?’

থমকে গেল মেয়েটি। ছেলেটি যে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করবে, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না সে।

‘না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম’, হঠাৎ মুখ দিয়ে বলে ফেলল মেয়েটি।

ঝট করে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি ‘চলুন, রওনা দেই, সময় কম’, এগোলো ইঞ্জিনিয়ারের দিকে।

ছেলেটিকে বসে পড়ার জন্য বলবে মেয়েটি। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। সূর্য অনেকটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। এগিয়ে চলেছে বোট। বোটে সবাই বসে আছে আগের মতোই। সবাই যেন বড় বেশি চুপচাপ আছে। দূরে একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। খুব ছোট।

চোখে দুরবিন লাগাল ইঞ্জিনিয়ার। ‘একটা আমেরিকায় কোস্টাল ডেস্ট্রয়ার, আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।’

‘আমাদের কাছে তো পাসপোর্ট, ভিসা নেই, এখন কী হবে?’ বলল মেয়েটি। দীর্ঘক্ষণ পর মুখ খুলল সে।

‘দেখা যাক, কী হয়’, জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার।

বোট এখন জাহাজটার দিকে ছুটছে। দুটো জলযান দ্রুত কাছাকাছি হচ্ছে। একসময় জাহাজ থেকে একটা স্পিডবোট তাদের দিকে রওনা দিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার বোটের ইঞ্জিন চালু রেখেই বোট থামিয়ে দিয়েছে।

স্পিডবোটটাও দূরেই ইঞ্জিন থামিয়ে ধীরে ধীরে তাদের পাশে এসে থামল। স্পিডবোটে একজন অফিসার, একজন ড্রাইভার ছাড়াও দুজন অস্ত্রধারী আছে। বোটে এসে উঠল অফিসার ‘আপনারা কে, কোথা থেকে আসছেন?’

স্টিয়ারিংয়ের পেছন থেকেই অফিসারকে বলল ইঞ্জিনিয়ার, ‘আমরা আমেরিকান, একটু বেরিয়েছিলাম।’

 

ইঞ্জিনিয়ারের কথা শুনতে শুনতে সবার মুখের দিকে একবার করে তাকাল অফিসার। ‘আপনারা তীর থেকে অনেক দূরে আছেনÑ সন্দেহজনক, আপনাদের পরিচয়পত্র?’ ভদ্রভাবেই বলল অফিসার।

‘এদিকে’, বলে ইঞ্জিনিয়ার তার পরিচয়পত্রটা বের করে ধরল।

পরিচয়পত্রটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাতে লাগল অফিসার। ধীরে ধীরে মুখের ভাব বদলে গেল। হাসি ফুটে উঠল মুখে, ‘আপনিই নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের সেই ফ্রিল্যান্স রাইটার? দেড় বছর আগে আপনার এক ক্রাইম রিপোর্ট রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল।’ পরিচয়পত্রটা ফেরত দিতে দিতে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল অফিসার।

‘জি’, শান্ত স্বরে জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনার প্রায় সব লেখাই পড়েছি’, জানাল অফিসার। ‘আপনাদের জাহাজে নিয়ে গিয়ে অহেতুক হয়রানি করতে চাই না, আপনারা চলে যান’, বলেই স্পিডবোটে ওঠার জন্য ঘুরল অফিসার।

‘শুনুন’, ডাকল ইঞ্জিনিয়ার। ‘যেতে যেতে একটু দূরেই চলে গিয়েছিলাম, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, তাই আমাদের যেন আর কোথাও না থামায় তার জন্য যদি…’

শেষ করতে দিল না অফিসার ‘ঠিক আছে, আমি সে ব্যবস্থা করব’, বলেই স্পিডবোটে লাফিয়ে নামল অফিসার। স্টার্ট দিল স্পিডবোট। ‘গুডবাই’, বলে চলে গেল তারা।

বিকেল হয়ে এসেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আকাশে নানা রঙের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। সবাই আগের মতোই নির্বাক হয়ে বসে আছে। অথচ প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলার আছে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। তারা এখন আমেরিকার ভূ-খণ্ডের নিকটবর্তী। আমেরিকায় পৌঁছার পর প্রথমেই ভাইয়াকে সংবাদ দিতে হবে ফোনের মাধ্যমে লসঅ্যাঞ্জেলেসে। তারপর কী কী করতে হতে তা ঠিক করে নিল। আর কয়েক ঘণ্টা পর সহযাত্রী দুজনের কাছ থেকে সে পৃথক হয়ে যাবে। ইঞ্জিনিয়ার তাদের জন্য যা করেছে তা সত্যিই অতুলনীয়। লোকটি চমৎকার। লোকটির সঙ্গে তার ভাব হয়ে গেছে। তাকে ছেড়ে যেতে তার খুবই খারাপ লাগবে।

আর মেয়েটি? মেয়েটির সঙ্গে সে দীর্ঘদিন ছিল। মেয়েটি অত্যন্ত ভালো ছিল। সে তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। মেয়েটিকে সে বোনের মতো দেখেছে। তার নিজের এক ছোট বোন ছিল। সে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। এ মেয়েটিকে সে কোনো দিন ভুলতে পারবে না, তা সম্ভব নয়।

বোটের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে মেয়েটি। তাকিয়ে আছে নীল আকাশের দিকে। শুরু করেও তাকে বলতে পারল না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন বলবে, নাহ, এখন পারবে না। দুজনকেই সে তাদের বাসায় নিয়ে যাবে। তারপর সুযোগ মতো বলবে ছেলেটিকে। সামনাসামনি বলতে না পারলেও নাম-ঠিকানা জেনে নিয়ে যোগাযোগ করবে।

একটা জিনিস কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। তা হলো ছেলেটির সঙ্গে সে অনেক দিন ছিল। অনেক কথাও বলেছে, অবশ্য প্রয়োজনীয়। তারপরও তাদের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে। ছেলেটিকে তার মনের কথা বলতে না পারার কি এটাই কারণ? শেষ পর্যন্ত তাকে জানাতে পারবে তো?

স্টিয়ারিং ধরে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে ইঞ্জিনিয়ার। পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে বোট। সামনে বসে থাকা দুজনের দিকেই একবার করে তাকাল। মেয়েটি খুবই সহজ, সরল, ভদ্র, মিশুক, তার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যই সে নিয়েছে। আর এখন পর্যন্ত ছেলেটির নামটি পর্যন্ত জানতে পারেনি। বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার। আসলে ছেলেটিই অদ্ভুত। সে কিছুতেই তার সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে পারেনি। ছেলেটি তো পরিবেশ সৃষ্টিরই সুযোগ দেয়নি। তারপরও তিন-চারবার তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আর সে কী করেছিলÑ উত্তর দেয়ার বদলে এমন প্রসঙ্গ তুলে তাকে তার প্রশ্নের কথা একটু পরে বেমালুম ভুলিয়ে দিয়েছিল। এরূপ তার আগে কখনো হয়নি। এখন সে বোট সামলানোতে ব্যস্ত। সে তো পালাচ্ছে না। নিউ ইয়র্কে পৌঁছে সব জেনে নেবে। তা না হলে… চিন্তায় ছেদ পড়ল। একটা বিশাল ঢেউ তেড়ে আসছে। শক্ত করে ধরল স্টিয়ারিং। অনেক আগেই সূর্য অস্ত গেছে। বোটেই নামাজ আদায় করে নিয়েছে ছেলেটি। রাত সাড়ে আটটা বাজে। চমৎকার জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারদিক; কিন্তু চাঁদের এই নির্মল স্নিগ্ধ আলো অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে দূরে নিউ ইয়র্ক মহানগরীর আলোকসজ্জার কাছে। তারপরও সেসব চাঁদের আলোর মতো নয়। আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাবে নিউ ইয়র্ক পোর্টে। বহির্নোঙ্গরে রাখা জাহাজগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের ক্ষুদে জলযান।

কিছুক্ষণ পর নোঙর করা বড় বড় জাহাজের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে জেটির গায়ে এসে ভিড়ল তাদের বোট। আশপাশে লোকে লোকারণ্য। বোটটা জেটির সঙ্গে বেঁধে রেখে লাগেজ নিয়ে নামল তিনজনে। ট্যাক্সিতে করে ছুটছে তিনজনে। ছেলেটি ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। ঠিক তার পেছনে বসেছে মেয়েটি। তার থেকে একহাত তফাতে জানালার ধারে বসেছে ইঞ্জিনিয়ার।

ইঞ্জিনিয়ার বলল, ‘ম্যাডাম, আমি সামনে নেমে পড়ব, আজ ওনাকে বাসায় নিয়ে যান, কাল সকালেই আমি আপনাদের বাসায় আসব।’

‘না, আপনাকেও যেতে হবে’, দৃঢ় কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে’, রাজি হলো ইঞ্জিনিয়ার।

কিছুক্ষণ নীরব রইল সবাই। গাড়ি ছুটে চলেছে ব্যস্ত সড়ক ধরে। ডানে-বাঁয়ে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। চারধারে আকাশচুম্বী ভবনগুলোর কারণে ভালোভাবে আকাশ চোখে পড়ছে না। চারদিকে নানা ধরনের বাতির আলোয় আলোকিত সামনে কোথাও টেলিফোন বুথের থামবেন’, ড্রাইভারকে বলল মেয়েটি।

‘কেন?’ প্রশ্ন করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বাবা-মা, ভাই-ভাবি ওরা আগের অ্যাপার্টমেন্টে আছে কি না জেনে নিই, তা নাহলে এক ঘণ্টা ছুটেও কোনো লাভ হবে না।’

‘আগের অ্যাপার্টমেন্টে না থাকলে?’ আবার প্রশ্ন করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘সে ক্ষেত্রে আমার দুই চাচা ও এক খালু এই নিউ ইয়র্কে থাকে, একই সঙ্গে সবাই অ্যাপার্টমেন্ট বদলাবে না, তাদের কাছে চলে যাব।’

‘আপনি যে সশরীরে ফিরেছেন এটা তাদের জানাবেন না, কৌশলে জেনে নেবেন, নিজে তাদের সামনে হাজির হয়ে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দেবেন’, হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার। কথাটা মনে ধরল মেয়েটির।

একটু পরই রাস্তার ধারে পার্কিং করল ড্রাইভার। প্রায় দুশো গজ দূরে বুথটা।

‘আপনি নামবেন না?’ ছেলেটিকে গাড়িতে বসে থাকতে দেখে নামতে নামতে বলল মেয়েটি।

‘আপনারা যান, তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন।’

ইঞ্জিনিয়ারও নামল, তাকেও এক জায়গায় ফোন করতে হবে। লোকের ভিড়ে হারিয়ে গেল দুজনই। ড্রাইভারও গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে এক ম্যাগাজিন শপের দিকে গেল।

ট্যাক্সিতে চড়ার পর থেকে ভাবনার ঝড় বয়ে গেছে ছেলেটির মাথায়। সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে। দ্রুত নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। দ্বীপে মেয়েটি তাকে কী বলতে চেয়েছে তা সে অনুমান করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এখনই তার সরে পড়া উচিত। তবে কি সে মেয়েটির প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছে, তার সঙ্গে আগে খারাপ ব্যবহার করার জন্য? না, তা নয়, তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ খারাপ ব্যবহার ক্যাপ্টেন করেছিল, তাকেও মাফ করে দিয়েছে। আর মেয়েটির প্রতি তার কোনো অভিযোগ ছিল না।

তার জন্য পরবর্তী সময়ে যা করেছে তা তো অতুলনীয়। মেয়েটির কাছে সে ঋণী, যা কখনো শোধ করার মতো নয়। তাহলে মেয়েটির হৃদয়ে আঘাত দিয়ে সে গোপনে সরে পড়বে কেন? কারণ… এমন সময় ট্যাক্সিতে মেয়েটি কথা বলে ওঠায় তার ভাবনায় বাধা পড়ল। গাড়ি থামার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাকে পালাতে হবে চোরের মতো। যদিও তা তার কাছে খুবই খারাপ লাগবে। অবশ্যই তাদের কাছ থেকে সে বিদায় নেবে। তবে অন্যভাবে বলবে কিন্তু সে শুনবে না।

খালি হাতে ফিরে এলো। দোকান খুঁজে পেতে দেরি হয়েছিল। প্রায় পনের মিনিট পর ছেলেটি এলো। তবে তার পকেটে আছে একটা কলম আর একটা হলুদ খাম তার ভেতর একটা ভাঁজ করা কাগজ। দোকানে বসে দ্রুত লিখেছে। সে কীভাবে সরে পড়বে তার পরিকল্পনাও করে ফেলেছে। গাড়ির কাছে এসে দেখল ড্রাইভারসহ তিনজনেই উদ্বিগ্ন হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বেশি অস্থির হয়ে পড়েছে মেয়েটি। তাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না ছেলেটি। ‘আপনার বাবা-মা কি আগের অ্যাপার্টমেন্টেই আছে?’

‘জানা হয়নি, ফোনটা নাকি আজই সন্ধ্যার পর বিকল হয়ে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি। অস্থিরতা এর মধ্যেই কেটে গেছে তার। প্ল্যান বদলে ফেলেছে ছেলেটি।

একটু পরই আবার গাড়ি থামল। এবারো পেছনের দুজন নেমে গেল। দূরে টেলিফোন বুথটার দিকে এগোলো তারা, তবে ড্রাইভার নামল না।

‘শুনুন’, ড্রাইভারকে বলল ছেলেটি। ইংরেজিতে। ঘুরে তাকাল ড্রাইভার, ‘আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, ক্ষুধা পেয়েছে, এখন নেমে খাওয়ার মতো সময় নেই।’ বলতে বলতে পকেটে হাত ঢুকাল ছেলেটি ‘আপনি দয়া করে, তিনটা ভালো স্যান্ডউইচ নিয়ে আসুন’, বলে ডলার ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিল। ‘গাড়িতে বসেই খাব, আর সেই সঙ্গে তিন বোতল সফট ড্রিংকস।’

একটু অবাক হলেও কিছু বলল না ড্রাইভার। নেমে গেল গাড়ি থেকে। কালবিলম্ব না করে নিজের ব্যাগটা নিয়ে ঝট করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ছেলেটি। তারও দুই মামা এই নিউ ইয়র্কে থাকে। আগে তাদের কাছে যাবে। ঠিক করেছে, আর আমেরিকায় পড়বে না, দেশে চলে যাবে। কিছুক্ষণ পরই ফিরে এলো দুজনে। এবারো বাকি দুজনের কাউকেই কাছে-পিঠে পাওয়া গেল না। দুই মিনিট পরই ফিরে এলো ড্রাইভার। হাতে ছোট একটা খাবারের প্যাকেট।

‘স্যার, পাঠিয়েছিল’, যেন কৈফিয়ত দিল সে।

‘প্যাকেটে কী?’ জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

‘তিনটা বার্গার, তিনটা সফট ড্রিংকস।’

ইঞ্জিনিয়ারও একটু অবাক হলো। মনে মনে ভাবল, ড্রাইভারকে বাদ রেখে খাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত হয়নি ছেলেটির। কিন্তু মেয়েটির এদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে চারদিকে তাকিয়ে ছেলেটিকে খুঁজছে।

প্যাকেট রাখার জন্য গাড়ির ভেতরের লাইট জ্বালাল ড্রাইভার। হঠাৎ পেছনের সিটে যেখানে মেয়েটি বসে ছিল, সেখানে হলুদ কী যেন পড়ে থাকতে দেখল। তুলে নিল।

‘একটা খাম’, বলে মেয়েটির দিকে সেটি এগিয়ে ধরল ড্রাইভার।

‘এটা আপনার সিটে পড়ে ছিল।’

রোবটের মতো হলুদ খামটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। অনুমানও করতে পারছে না। এর ভেতর কী আছে? এক ভাঁজ করা কাগজটা বের করে আনল। স্ট্রিট লাইটের উজ্জ্বল আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটি চিরকুট। ইংরেজিতে লেখা। রুদ্ধশ্বাসে পড়তে শুরু করল মেয়েটি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে বাকি দুজন।

‘আপনাদের কাছ থেকে চোরের মতো এভাবে পালানোর জন্য আমি লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। বিদায় বেলা আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আমাদের চরম বিপদে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য আমি তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আর আপনি বিপদের দিনগুলোতে আমার জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি চিরঋণী। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাদের ছোট করতে চাই না। আপনাদের সঙ্গে বিশেষ করে আপনার সঙ্গে যদি কোনোরকম অন্যায় করে থাকি, তবে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। আর এ অধমকে ভুলে গেলেই ভালো করবেন।’

চিরকুটটা পড়া শেষ হতেই কাঁপা হাতে তা এগিয়ে ধরল ইঞ্জিনিয়ারের দিকে। অনেক আগেই গাল বেয়ে অশ্রু ঝরা শুরু হয়েছিল। এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সারা দেহে যেন তার ঝড় শুরু হয়ে গেছে। নিজের পতন ঠেকানোর জন্য গাড়িতে হেলান দিল মেয়েটি। কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।

ইঞ্জিনিয়ার চিরকুটটা মেয়েটিকে নীরবে ফেরত দিল। সেও অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে গেছে। মাথাটা নীচু করে রেখেছে। সেও হয়তো চোখের পানি লুকাচ্ছে। ড্রাইভার এতটুকু বুঝে নিয়েছে যে, ছেলেটি তাদের দুজনকে ফেলে চলে গেছে। তাই তাকে তিনটা বার্গার আনতে বলেছে। সেও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

‘মনে হয় এতক্ষণে সে বেশি দূরে যায়নি, চারদিকে খুঁজে দেখা যায় না?’ নীরবতা ভাঙল কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়েটি। ভঙ্গিতে আকুলতা।

মাথা তুলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘এত লোকের ভিড়ে কোথায় খুঁজব, আর কোন দিকেইবা খুঁজব?’ বলে থামল। সেও চারদিকে তাকিয়ে খুঁজছে।

‘আর কোনোভাবে তার খোঁজ করা যায় না?’ মরিয়া হয়ে বলল মেয়েটি।

‘সে কোনো অপরাধী নয় যে পুলিশের সাহায্য নেব, তার কোনো ছবিও নেই যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেব, বড় কথা হলো এত দিনে নাম-ঠিকানা পর্যন্ত জানা হয়নি।’

এ বিশাল আমেরিকার কোন শহরে সে থাকবে, তাও জানি না যে একটা বা দুটো নির্দিষ্ট শহরে খুঁজব, তাকে আমারো দরকার। নাহ, তাকে আর খুঁজে পাওয়ার কোনো পথ নেই’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

‘আমি তাকে প্রথমদিকে ভুল বুঝেছি, তার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করেছি। সে যদি কমপক্ষে আমাকে তার কাছে যেসব দুর্ব্যবহারের জন্য মাফ চাওয়ার সুযোগ দিত, আসলেÑ আসলে আমি এখনো তাকে মানুষ হিসেবেই চিনতে পারিনি’, বলে থামল মেয়েটি।

‘আপনি শান্ত হোন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘তাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ হয়তো তাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাবেন না, অন্তত আমার তাই বিশ্বাস।’

‘আমিও জানি তাকে আর কখনোই খুঁজে পাব না, তারপরও তাকে আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না’, বলেই দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটি।

‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলুন রওনা হওয়া যাক’, কেশে বলল ড্রাইভার। মেয়েটিকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা চালাল। যেন ড্রাইভারের কথা মেয়েটির কানেই ঢোকেনি। ‘আমার এক কাজিন আমাকে ছোটবেলা থেকেই খুবই পছন্দ করত, অবশ্য আমিও তাকে কিছুটা পছন্দ করতাম, এবার বাংলাদেশে যাওয়ার আগে সে আমাকে প্রথম তার কথা জানায়, ফিরে এসে তাকে উত্তর দেয়ার কথা, হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

‘কিন্তু ছেলেটির সঙ্গে বাংলো থেকে পালানোর পর থেকে তার মাঝে আমি এমন কিছু আবিষ্কার করলাম, যা আগে কারো মাঝে খুঁজে পাইনি। তার চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা সবকিছুই ছিল ব্যতিক্রম, তাকে বারবার নতুন দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে হয়েছিল। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, অনেকভাবে চেষ্টা করেও তাকে আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারিনি।’ এর মধ্যে কান্না থেমে গেছে মেয়েটির। তবে মাঝেমধ্যে হিঁচকি উঠছে। একনাগাড়ে সে বলে চলেছে। ইঞ্জিনিয়ার আর ড্রাইভারও তার কথা আগ্রহ সহকারে শুনছে। আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ। তাদের তিনজনের সঙ্গে যেন তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।

‘আমি চেয়েছিলাম আপনাদের দুজনকে আমাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে আমার ভাবিকে দিয়ে তাকে আমার মনের কথা জানতাম। আমার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল, সে আমাকে পছন্দ করে, যদিও কোনো লক্ষণ কখনো তার মাঝে দেখিনি। এখন বুঝতে পারছি এসব আমার স্রেফ কল্পনা ছিল, ছিল দিবাস্বপ্ন।’ আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। দুহাতে মুখ ঢাকল দ্রুত। ইঞ্জিনিয়ার তাকে সামলে নেয়ার সুযোগ দিল। দুহাতে চোখ মুছে, ‘সে আমাকে ফেলে চলে গেছে, এতে তার কোনো দোষ নেই, আসলে দোষটা এবারো আমার যে, আমি তাকে জানাতে পারিনি। আসলে এমন কিছু সহজ কথা আছে, যা কাউকে জানানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, কখনোবা অসম্ভব হয়ে দেখা দেয়।’

 

গাড়ি ছুটে চলছে ব্যস্ত সড়ক ধরে। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে মেয়েটির। কতগুলো চুল মুখের ওপর এসে বিরক্ত করছে। কিন্তু সরানোর প্রয়োজন বোধ করল না সে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। তার চোখ এখন কেবল খুঁজে ফিরছে সেই সে যুবককে। যে কি না তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। অথচ তারই সেই যুবকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ার কথা। এখন তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে সে কেন আমিই ক্ষমাপ্রার্থী। আর হঠাৎই সে গেয়ে উঠল  ‘পুবাল হাওয়া পাও যদি বন্ধুর দেখা বইলো তুমি তারে/ আমার মনের কথা হয়নি বলা হয়নি বলা তারে…

 

-সমাপ্ত-

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে। আগামী শুক্রবার চোখ রাখুন মুগ্ধতা ডট কমে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - শেষ পর্ব

জাকির আহমদ

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে।

‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পেরে আর প্রশ্ন করল না তাকে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্য ডুবতে বসেছে। সারা দিন দুজনে ভালোই বিশ্রাম নিয়েছে। ফলে খুবই ভালো লাগছে তাদের। অন্ধকার হয়ে আসতেই সৈকতে চলে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল। এক সময় সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নৌকা নিয়ে এলো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, সহাস্যে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, হেসে জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে আছে ছেলেটি।

‘আপনাদের দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে। তবে দূরত্ব বেশি হয়েছে’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। হাসি মুখে লেগেই আছে। দুজনের কেউই কিছু বলল না। তবে আরো সরে গেল ছেলেটি। দেখেও আর কিছু বলল না ইঞ্জিনিয়ার। শুধু তার হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো।

‘তারপর, আজ সারাদিনে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯ 19

‘না’, দুজনেই উত্তর দিল।

‘আপনারা নতুন দ্বীপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত?’

‘জি’, ছেলেটি জবাব দিল।

‘তবে আসুন’, বলে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার।

লোকটির পেছনে পেছনে নৌকায় এসে উঠল দুজনে।

‘এগুলোতে কী?’ নৌকার পাটাতনে রাখা পোঁটলা-পুঁটলিগুলোর দিকে ইশারা করে বলল মেয়েটি।

‘সবই জানতে পারবেন, এগুলো পরে নিন, তাহলে ঠান্ডা লাগবে না’, বলে দুজনের দিকে দুটো জ্যাকেট এগিয়ে দিল।

‘আপনি এ অন্ধকারে দ্বীপে পৌঁছতে পারবেন তো?’ জ্যাকেটের চেন টেনে দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন আপনার সন্দেহ আছে?’ বৈঠা বাইছে ইঞ্জিনিয়ার।

‘না নেই।’

‘আপনারা ওই দ্বীপে পৌঁছলেন কেমন করে?’ জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

সংক্ষেপে সব বলল ছেলেটি। তবে তাদের মধ্যকার ঘটনাগুলো এড়িয়ে গেল। মেয়েটিও ধরিয়ে দিল না।

অবশেষে পৌঁছে গেল নতুন দ্বীপে। রাতের আঁধারেও বোঝা গেল, অত্যন্ত সুন্দর এই দ্বীপটা।

দ্বীপটা যে ছোট তা দেখেই বোঝা যায়। ছোট ছোট টিলা আছে অনেক। কতগুলো বিশাল পাথরের চাঁই আছে ছোট সৈকতে, যেন সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে। ঢেউয়ের পানিতে এগুলোর একাংশ ডুবে যাচ্ছে। কিছু গাছপালাও আছে এ দ্বীপে। কিন্তু কোনো কেবিন চোখে পড়ছে না। নৌকা থেকে মালপত্রগুলো সৈকতে নামিয়ে রেখে নৌকাটা ডাঙায় তুলে রাখল দুজনে। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে চারদিকে দেখছে।

এরপর প্রত্যেকে যতটুকু সম্ভব মালপত্র নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের পেছনে পেছনে চলল। টিলার পাথর কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে। সিঁড়িটা ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠেছে। হঠাৎ থেমে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। ডানে হাত তুলেÑ ‘ওইটা থেকে বালতির সাহায্যে পানি তুলবেন। কেবিনে দড়ি লাগানো বালতি আছে।’

‘এটা রাতেও কুয়ার মতো মনে হচ্ছে। ‘কুয়া নাকি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘না, ওটাকে বলা চলে পানির আধার’, ব্যাখ্যা করে বলছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘ওপরে বাংলার চাল এমনভাবে তৈরি করা যাতে সব বৃষ্টির পানি পাইপ দিয়ে এই ট্যাংকে এসে জমা হয়, সব সময় বৃষ্টি হয় না, তাই খুব হিসাব করে পানি খরচ করতে হবে। কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘কয়েক দিন আগেও এসেছিলাম।’ আর দাঁড়াল না। ওপরে উঠে এলো। এতক্ষণ কেবিনটা নজরে পড়ল। দুটো উঁচু টিলার ওপরে ছোট কেবিনটা কাঠের তৈরি। আসলে অন্ধকারে টিলার ওপর কেবিনটাকে একটা উঁচু টিলা বলেই মনে হয়েছিল। পকেট থেকে একটা মাস্টার কী বের করে দরজা খুলে ফেলল। চার ব্যাটারির টর্চ বাম হাতে।

‘আমি এর আগে এখানে তিন দিন একাকী থেকে গেছি’, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল লোকটি। ‘তবে সাধারণত এই দ্বীপে কেউ আসে না।’

ঘরে ঢুকল সবাই। কেবিনের ভেতরটা আরো সুন্দর। ঘরটির দরজা ওপর দিক দিয়ে। চারদিকে তাকাতে তাকাতে ‘এই দ্বীপে এ কেবিন কে বানিয়েছে, কেন বানিয়েছে?’ এক সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘তা তো বলতে পারব না, এর আগে এখানে দুইবার এসেছিলাম, একাই’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘লর্ডও বানিয়ে থাকতে পারে’, মেয়েটি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

দরজা দিয়ে ঢুকেই ডান দিকে জানালার ধারে একটা ডাবল খাট। অবশ্য বিছানা পাতা নেই। খাটের পেছনে আর একটা জানালার ধারে একটা টেবিল। তিন দিকে তিনটি সুন্দর চেয়ার। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের গায়ে একটা ওয়াল হ্যাঙ্গার টাঙানো। ঘরটিতে আসবাবপত্র বলতে এই। টর্চের আলোয় দেখলো সেগুলোতে ধুলো জমেছে। আবার বেরিয়ে এলো তিনজনে। এবারো তিনজনের কিছু মালপত্র নিয়ে এলো।

একটা বস্তার মুখ খুলে বড় একটা মোমের প্যাকেট বের করল ইঞ্জিনিয়ার। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে দুটোই মেয়েটির হাতে দিল। ‘মোম জ্বালিয়ে গোছানোর কাজ শুরু করে দিন। আর আমরা দুজনে বাকি মালপত্রগুলো নিয়ে আসি।’

‘নতুন জায়গায় একা থাকতে ভয় লাগবে’, মেয়েটি বলল।

‘ঠিক আছে, তাহলে আসুন’, হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

সব জিনিস আনা হয়েছে। পূর্ব দিকের দেয়ালে দুটো জানালা। পশ্চিমের মতো জানালার মধ্যে একটা দরজা। দরজা খুলে দিল ইঞ্জিনিয়ার।

বারান্দায় হাফ রেলিং দেয়া। অনেক ফুলের টবও আছে। তবে যত্নের অভাবে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তারপর দক্ষিণে উত্তরের দরজা বরাবর একটি দরজা দিয়ে বের হয়ে একটা সরু প্যাসেজ। প্যাসেজের দক্ষিণে কিচেন ও বাথরুম পাশাপাশি। কিচেনটা খুবই ছোট। চুলার সঙ্গে কিছু শুকনো খড়িও আছে। তাদের সব দেখল ইঞ্জিনিয়ার।

‘সেসব মালপত্র আনা হলো, তার মধ্যে এখানে আপনাদের থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব আছে, আমার মনে হয় আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আবার কয়েক দিন পরে আসব, ওহ হো আর একটা কথা বলা হয়নি, প্রয়োজন হতে পারে, তাই মালপত্রগুলোর মধ্যে দুটো লাইফ জ্যাকেটও আছে। সাবধানে থাকবেন, চলি’, বলে বেরিয়ে গেল লোকটি। পেছনে বেরিয়ে এলো দুজনে। নৌকার কাছে এসে দাঁড়াল তিনজন।

কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল, ‘এটা আপনার নিজের সঙ্গে রাখেন, প্রয়োজন হতে পারে’, এক মুহূর্ত থামল। চালাতে পারেন তো?’

দুজনই তার হাতে একটা ছোট কালো পিস্তল দেখতে পেল।

‘হ্যাঁ, পারি’, হাত বাড়ায়নি ছেলেটি।

‘হাতে নিন’, হাতটা আরো বাড়িয়ে ধরল ছেলেটির দিকে। একবার দ্বিধা করে ছেলেটি হাত বাড়িয়ে পিস্তলটা নিল।

নৌকাটা ঠেলে পানিতে নামানোর জন্য ঘুরল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি যদি মনে কিছু না নেন, তাহলে বলি’, জানাল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি আপনার জন্য আমাকে কিছু করতে দেবেন, এত ঋণ মাথায় বহন করার শক্তি নেই’, মাথা নীচু করে বলল ছেলেটি।

‘আমি যদি বলি, আপনাদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি আনন্দ পাচ্ছি, তবে কি আপনি আমার আনন্দে বাধা দেবেন?’ একটু ঘুরিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘না’, সংক্ষেপে জবাব দিল ছেলেটি।

‘তাহলে আজ চলি, হয়তো আবার দেখা হবে’, বলে এগোলো নৌকার দিকে। নৌকাটি পানিতে নামাতে ছেলেটিও সাহায্য করল।

‘গুড লাক’, বলে নৌকায় চড়ে বসল ইঞ্জিনিয়ার। এক সময় চলে গেল চোখের আড়ালে।

দুজনে ফিরে এলো কেবিনে। যে মোমটি জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল তার এক-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে। এখানে মোমই রাতের আলোকবর্তিকা। ক্যাপ্টেনের দেয়া ঘড়িটা এখনো ছেলেটির হাতে আছে। রাত প্রায় এগারটা বাজে। এশার নামাজ আদায় করে নিল ছেলেটি। অ্যারোসল বের করে সারা ঘর স্প্রে করল ছেলেটি। ততক্ষণে মেয়েটি তাদের আনা একটি বক্স থেকে তোশক, কাঁথা, চাদর, দুটো বালিশ বের করে বিছানা করে ফেলল। আজো তাদের জন্য খাবার তৈরি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। খেয়ে নিল দুজনে।

‘আজ রাতে ঘুমিয়ে শরীরটা সরস করে নেই, কাল দিনে সব গোছানো যাবে’, খাওয়া শেষে ছেলেটির কথা ভেবে প্রস্তাব দিল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে’, সায় দিল ছেলেটি।

দুজনের জন্য দুটো করে বালিশ ও দুটো কম্বল আছে। কম্বলটা মেঝেতে বিছাতে গেল ছেলেটি।

‘আরে আপনি তো বিছানায় শোবেন’, বাধা দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘আমি মেঝেতে শোব।’

‘না আমি শোব।’

‘না, আমি।’

‘ঠিক আছে, আজ আমি মেঝেতে শুই, কাল আপনি, পরশু আবার আমি, এভাবে চলবে’, প্রস্তাবটা দিল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘উম ঠিক আছে’, রাজি হলো মেয়েটি।

মেঝেতে কম্বলটা নিজের ভাগের বালিশটা নিয়ে খাটের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।

মেয়েটিও শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ ধরে অন্ধকার ছাদের দিকে চেয়ে আছে। নানা কথা ভাবছে, গত রাত থেকে টানা বিশ্রাম নেয়ায় তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। তাই চোখে ঘুম আসছে না।

দরজা-জানালা ভালোভাবে লাগানো আছে। তারপরও রাতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় তার একটু শীত করছে। ঘরটা অন্ধকার হওয়ায় তা হয়তো বেশি অনুভব হচ্ছে।

খেয়াল হলো ছেলেটি তার কম্বল মেঝেতে বিছিয়েছে, গায়ে দেয়নি। বালিশের নীচে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা রেখেছে। মোম ধরাল। তার কম্বলটা ছেলেটির গায়ে দিয়ে দিল। আর নিজে বিছানার চাদর তুলে গায়ে দিল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা বলতে পারবে না।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। উঠে দেখল তার গায়ে কম্বল, মেয়েটি বিছানার চাদর গায়ে দিয়ে জড়সড় হয়ে ঘুমিয়েছে। ফজরের নামাজ পরেও দেখল মেয়েটি ঘুমাচ্ছে। কম্বলটা তার গায়ে দিয়ে দিল।

মেয়েটি হয়তো মুসলমান, তাকে নামাজ পড়তে বলতে হবে।

বসে না থেকে কেবিন গোছানোর কাজে লেগে গেল। তার ঘড়িতে যখন পৌনে সাতটা বাজে, তখন ঘুম ভাঙল মেয়েটির।

উঠে দেখল ছেলেটি কাজ করছে। বাথরুম থেকে ফিরে হাত-মুখ মুছছে মেয়েটি।

‘আপনি রান্না করতে জানেন তো?’ কাপড়গুলো ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘জি, পারি।’ ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটে না তার।

‘তাহলে আপনি নাস্তা বানাতে যান, আর আমি ততক্ষণে গোছানোর কাজ শেষ করি’, বলল ছেলেটি।

‘আমি বেশি ঘুমিয়েছি, আমার জন্যও কিছু কাজ রাখুন’, যেন অনুরোধ করল ছেলেটিকে।

‘সে পরে দেখা যাবে’, বলে কাজে মনোযোগ দিল ছেলেটি।

আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল মেয়েটি। সেও কাজে লেগে গেল। যখন মেয়েটি নাশতা নিয়ে ঘরে ঢুকল তার কিছুক্ষণ আগে গোছানোর কাজ শেষ করে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এক নাগাড়ে দুই ঘণ্টা ধরে কাজ করায় হাঁপিয়ে উঠেছে। ‘আপনি তো সব কাজ শেষ করেছেন। এমনকি আমার বিছানাটাও গুছিয়ে রেখেছেন’, অনুযোগের সুর ফুটে উঠল মেয়েটির কণ্ঠে।

‘এ দ্বীপে আমাদের কতদিন থাকতে হবে, তার কোনো ঠিক নেই’, বলছে ছেলেটি।

‘এখানে আমাদের কাজ ভাগ করে নিয়ে করতে হবে, আপনি একাই বেশি কাজ করতে চাইলে আমি কী করব? সময় কাটানোর জন্য আমাকেও কাজ করতে হবে’, বলে থামল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘ঠিক আছে, তবে আমি কাজ বণ্টন করব’, বলল মেয়েটি।

‘না, আমি করব।’

‘ঠিক আছে আপনিই বলুন’, মুখ গোমড়া করে বলল মেয়েটি।

‘নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে তারপর বলি।’

গমের আটার রুটি, আলু ভাজি দিয়ে ভালোই খেল দুজনে।

ছেলেটি মেঝেতে বসে নাশতা করতে চাইলে মেয়েটিও মেঝেতেই বসে পড়েছে। খাওয়া শেষ হয়েছে।

কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করল ছেলেটি ‘প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ে আমি নিচ থেকে পানি নিয়ে আসব, আর…’

কথা শেষ করতে পারল না ছেলেটি ‘অত সকালে নীচে নামলে আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে’, বলল মেয়েটি।

‘লাগবে না।’ আগের কথা ধরল ছেলেটি। ‘বরং সকালে পানির পাত্র নিয়ে কয়েকবার ওঠানামা করলে ব্যায়াম হবে। এদিকে আপনি নাশতা তৈরি করবেন, নাশতা করে আমি বড়শি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাব, আপনি ঘর গোছাবেন এরপর আপনি দুপুরের রান্না শুরু করবেন, এরই মধ্যে আমি মাছ নিয়ে ফিরব। তারপর গোসল করে নামাজ পড়ে নেব, আমার পর আপনি গোসল করবেন, সেই ফাঁকে আমি খাওয়ার আয়োজন করে ফেলব। আর একটা কথা, আমরা নিজেরাই নিজেদের কাপড় ধোব।’ এক মুহূর্ত থেমে দম নিল ছেলেটি। ‘দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নেব, আসরের নামাজের পর আমি রাতের জন্য আবার মাছ ধরতে যাব, আর আপনি বারান্দায় বসে থাকতে পারেন, দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে পারেন অথবা টবগুলোর যত্ন নিতে পারেন, তা না হলে কোনো ফাঁকে আমিই নিব, মাগরিবের নামাজের পর আপনি রাতের জন্য রান্না করবেন, আর আমি…’ মাথা চুলকালো ছেলেটি। সে কী করবে ভেবে পেল না।

‘আপনি তখন বসে বিশ্রাম নেবেন, তারপর খেয়ে-দেয়ে ঘুম’, মেয়েটি শেষ করে দিল।

‘তুলনামূলকভাবে আপনি নিজের ভাগে বেশি কাজ নিয়েছেন, পানি আপনাকেও আপনি ব্যায়াম হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু আসলেই খুব পরিশ্রমের কাজ। আর অনেক সময় মাছ ধরতে বিরক্ত লাগে, আর আমার ভাগে শুধু রান্না করা, আর ঘর গোছানো’, যেন অভিযোগ করল মেয়েটি।

‘তিন বেলা রান্না করাও কঠিন। আর অনেক সময় বিরক্তিকর কাজও’, বলল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে হয়েছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। নিজে নিজের ঘাড়ে বেশি বোঝা চাপালে আমি কি করতে পারি?’ অভিমানের সুরে বলল মেয়েটি।

‘আজ দুপুর থেকে এ রুটিন কার্যকর হবে’, যেন ঘোষণা করল ছেলেটি।

‘আপনার কথা মানলাম, তবে আমারও একটি কথা আপনাকে মানতে হবে’, মেয়েটিও যেন ঘোষণা দিল।

‘কী কথা?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘অতগুলো মালপত্র কমপক্ষে দুজনে মিলে গোছাতে হতো, অথচ খুব সকাল থেকে আমাকে না জানিয়ে একাই সব গুছিয়েছেন, যেহেতু এখনো রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়নি, সেহেতু আমি এখন নিচ থেকে পানি আনব। আর আপনি মাছ ধরতে যেতে পারেন’, বলেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কী ভেবে বাধা দিল না ছেলেটি।

রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে বালিশ নিয়ে পড়ল ছেলেটি। কিচেন থেকে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ‘আরে আপনি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন’, উঠে বসল ছেলেটি। ‘যেদিন রাতে আমি বিছানায় থাকব, তার পরদিন দুপুরে বিছানায় বিশ্রাম নেব। একই কথা আপনার জন্যও প্রযোজ্য। বলে শুয়ে পড়ল আবার। অগত্যা মেয়েটি শুয়ে পড়ল বিছানায়।

তৃতীয় রাতে মেঝেতে শুয়েছে মেয়েটি। দুপুরে খেয়ে ভালোই ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে আছে ঘুম আসছে না। ভাবছে অনেক কিছু। মেয়েটি হয়তো এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। গায়ে বিছানার চাদর। গত রাতে ছেলেটিও চাদর গায়ে দিয়েই ঘুমিয়েছিল। মেয়েটি তাকে দ্বিতীয় কম্বলটা নেয়ার জন্য চাপাচাপি করেছে। সে নেয়নি।

কী মনে হতেই বালিশের তলা থেকে দিয়াশলাই বের করে মোম ধরাল।

মেঝেতে বসিয়ে দিল মোমটা। ঘরটায় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হলো। কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারবে না। তবে হঠাৎ মেয়েটির গলার আওয়াজ গেয়ে ঝট করে মোমের আগুনের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল।

ছেলেটির আগেই শুয়ে পড়েছে মেয়েটি। ঘুম আসছে না। বাবা-মা, ভাইয়ের কথা ভাবছে। কবে তাদের কাছে ফিরতে পারবে?

ঘরে আলো জ্বলে উঠল। এই তো একটু আগে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল ছেলেটি। একদম চুপ করে পড়ে আছে মেয়েটি। একটু পর প্রায় নিঃশ্বাসে পাশ ফিরল। খানিক পর মাথা তুলে দেখল ছেলেটি মোমের পেছনে বসে এক অদ্ভুত কাণ্ড করছে। ভালোভাবে দেখার জন্য চুপচাপ উঠে বসল বিছানায়। অনেকক্ষণ ধরে তার কাণ্ড দেখল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। ছেলেটি পাগল হয়ে যায়নি তো?

ছেলেটি প্রথমে তার ডান হাতটা মোমের আগুনের প্রায় একহাত ওপরে রাখছে। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা আগুনের ওপর নামিয়ে আনছে। আগুনের একদম কাছাকাছি হতেই ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিচ্ছে একটুক্ষণ হাতটাকে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তারপর আবারো একই কাজ করছে।

‘আপনি কী করছেন?’ অকস্মাৎ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘চমকে উঠে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল ছেলেটি। মেয়েটি যে তারই সামনে বিছানায় বসে দেখছিল, তা সে খেয়ালই করেনি। মহা অস্বস্তিতে পড়ে গেছে ছেলেটি।

‘কি, জবাব দিন’, আবার বলল মেয়েটি।

তবুও চুপ করে থাকল ছেলেটি।

‘কী করছিলেন?’ আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আপনি তো দেখছেন।’ কোনো মতে বলল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে মুখ খুলল ছেলেটি। জানে, চুপ করে থেকে কোনো লাভ নেই। সে প্রশ্ন করতেই থাকবে। শুনলে হয়তো পাগল ভাববে। ভাবুক তাতে আমার কিছু আসে-যায় না।

‘আমি পরীক্ষা করছিলাম দুনিয়ার আগুন কতক্ষণ সহ্য করা যায়, দেখলাম এক সেকেন্ডও সহ্য করা যায় না, অথচ দোজখের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে বহুগুণ তেজি, আল্লাহতাআলা মানুষের গুনাহর কারণে মানুষকে দোজখে দেবেন। সেই আগুন সহ্য করব কীভাবে?’ আর বলতে পারল না ছেলেটি, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

‘আপনি মুসলমান, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল ছেলেটি। ‘আপনি জানতেন না?’

‘আমেরিকায় জন্ম, সেখানেই বড় হয়েছি, এর আগে কখনো তেমনভাবে মুসলমানের সংস্পর্শে আসিনি, তবে এটুকু জানি যে, তারা আল্লাহয় বিশ্বাস করে।’

‘আপনি মুসলমান নন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘না, আর ধর্ম নিয়ে আমার অত মাথাব্যথাও নেই’, জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে রইল ছেলেটি।

‘হঠাৎ এ ধরনের খেয়াল হওয়ার কারণ কী?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘এমনি’, বলে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ছেলেটি।

ছেলেটি উত্তর দিতে চায় না বুঝতে পেরে আর জিজ্ঞেস করল না মেয়েটি। সেও শুয়ে পড়ল।

কেটে গেল আর দুদিন। সূর্য ডোবার প্রায় দুই ঘণ্টা পর এস হাজির হলো ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটি সে সময় কিচেনে রান্না করছিল। আর ছেলেটি বিছানায় চুপচাপ বসে ছিল।

দরজায় হঠাৎ ঠক ঠক আওয়াজে প্রথমে চমকে উঠল ছেলেটি। রাতে আবার কে এলো? ইঞ্জিনিয়ার নাকি ক্যাপ্টেন বাহিনী?

‘কে?’ দরজ খুলতে ইতস্তত করছে।

‘আমি’, ওপাশ থেকে সাড়া দিল।

গলা চিনতে কষ্ট হয়নি। খুলে দিল দরজা। চেয়ার এগিয়ে বসতে দিল।

‘ম্যাডাম কোথায়?’

‘কিচেনে।’

‘হ্যালো ম্যাডাম, এদিকে আসুন’, হাঁক ছাড়ল ইঞ্জিনিয়ার।

একটু পরে হাসি মুখে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। তার জন্য ইঞ্জিনিয়ার অবশ্য শার্ট-প্যান্টের বদলে জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করেছে। আজ সে গোলাপি রঙের একটা থ্রিপিস পরেছে। ডিজাইনটা আকর্ষণীয়।

‘এ কয়েক দিন কেমন কাটল?’ ছেলেটির উদ্দেশে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ভালোই।’

চেয়ার টেনে নিয়ে বসল মেয়েটি। ছেলেটি আছে বিছানায়।

‘আমি আপনাদের একটা সংবাদ দিতে এসেছি’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ‘সেটা হলো, কাল সকালে আমরা জাহাজে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছি। চৌদ্দ-পনের দিনের মধ্যে ফিরব, তাই আপনাদের জন্য আরো চাল, আটা, আলু, শুকনো খাসির গোশত, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি এনেছি। সেই সঙ্গে বিস্কুট, চানাচুর, চিনি, কফিও এনেছি; যাতে খাদ্য সঙ্কট না হয়। এগুলো নৌকায় আছে। ও ভালো কথা, এর মধ্যে কি কোনো কিছুর সঙ্কট হয়েছিল?’ বলে পালা করে দুজনের দিকেই তাকাল। মেয়েটি তাকালো ছেলেটির দিকে। সে মুখ নীচু করে চুপচাপ বসে আছে।

‘না।’ একবার দ্বিধা করে জবাব দিল মেয়েটি। তাদের আর একটা কম্বল ও সময় কাটানোর জন্য কিছু বইয়ের দরকার ছিল। কিন্তু লোকটিকে হয়রান করাতে ইচ্ছে হলো না।

‘সময় কম, আবার দ্বীপে ফিরে রাতে লম্বা ঘুম দিতে হবে’, লোকটির ইঙ্গিত বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে। আপনারা দুজনে থাকুন, আমি নৌকা থেকে ওগুলো নিয়ে আসছি’, বলে উঠে দরজার দিকে এগোতে গেল ছেলেটি।

‘থাকুন’, বলতে বলতে উঠে এগিয়ে এলো ইঞ্জিনিয়ার। ‘ম্যাডাম, আপনি থাকুন আমরা আসছি।’

প্রতিবাদ করল ছেলেটি। কিন্তু তার কথা শুনল না লোকটি।

তিনবারে সব নিয়ে এলো দুজনে। পথে ইঞ্জিনিয়ার জানতে চাওয়ায় এ কয়দিন তাদের কীভাবে কাটল, সংক্ষেপে জানালো ছেলেটি।

তিনবার বোঝা নিয়ে ওঠানামা করায় দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছে।

দুজনেই বিছানায় বিশ্রাম করছে। এমন সময় ট্রে হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। টি টেবিল নেই। অগত্যা চেয়ারে নাশতার ট্রে-টা নামিয়ে রাখল।

‘এসব করলেন কেন?’ মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এ আর কী কষ্ট, নিন, শুরু করুন’, বলল মেয়েটি।

‘আপনি আগে শুরু করুন’, মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

নাশতা শেষ হতেই কফি নিয়ে এলো মেয়েটি।

লোকটিকে বিদায় দিতে তার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের দিকে চলছে দুজনে।

‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কী আনতে যাচ্ছেন?’ এমনিতেই জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘মেয়ে মানুষ’, কোনো দ্বিধা না করেই বলল ইঞ্জিনিয়ার।

ঝট করে লোকটির দিকে তাকাল ছেলেটি। ‘তার মানে?’

‘এখানকার মহামতি লর্ড একজন আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম গডফাদার’, চমকে উঠল দুজনে। সৈকতের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে চলেছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘অন্য গডফাদারদের সঙ্গে এই গডফাদারের সুসম্পর্ক আছে। এই লর্ডের কিছু বিশ্বস্ত এজেন্ট আছে আফ্রিকা ছাড়াও আরো অনেক দরিদ্র দেশে। সেই এজেন্টের আবার কতগুলো চ্যালা এজেন্ট আছে, যারা এ লর্ডকে চেনে না। যা-ই হোক, আফ্রিকা মহাদেশে অনেক দরিদ্র দেশ আছে সেই বস দেশের মেয়েদের কৌশলে ধরে আফ্রকার বিভিন্ন সমুদ্র তীর থেকে ওই দ্বীপে…’ ইঙ্গিতে মূল দ্বীপ দেখাল। ‘পাঠানো হয়। এখানে মেয়েদের বন্দিশালায় রাখা হয়, তাদের ওপর অনেক সময় অত্যাচার করা হয়। তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দরিদ্র দেশ থেকে সংগৃহীত মেয়েরাও বিভিন্নভাবে এখানে পৌঁছেÑ এই হচ্ছে লর্ডের ব্যবসা।

‘অপরাধের আর কোনো দিক নেই তো লর্ডের?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। মেয়েটি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

‘না, নেই’, একটু থামল। ‘আমি লক্ষ্য করে দেখেছি লর্ড এমনিতে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো। কিন্তু কেন যেন তার নারী জাতির প্রতি একটা বিদ্বেষপূর্ণ ভাব আছে। এর কারণ আজো বুঝতে পারিনি’, থামল লোকটি। তারা কখন যে ডাঙায় তোলা নৌকার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।

‘অনেক রাত হলো’, বলে নৌকায় হাত লাগাল ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেটিও এগিয়ে এসে হাত লাগাল। মেয়েটি সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্র থেকে আসা ঢেউ পদযুগল ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

‘চলি গুডলাক’, বলে বৈঠা হাতে তুলে নিল ইঞ্জিনিয়ার।

দ্বীপে দশম রাতে বারান্দায় একটা চেয়ার এনে বসেছে ছেলেটি। আকাশে চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারিদিকে। মেঘ আর চাঁদের আলোয় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে আসছে। কিছুটা হলেও রাতের নীরবতাকে খান খান করে দিচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। সব মিলে অনিন্দ্য সুন্দর এক রাত। নীচে ট্রাউজার পরেছে। ওপরে জ্যাকেট চাপিয়েছে। গলায় মাফলার পেঁচিয়েছে। তারপরও একটু ঠান্ডা লাগছে। কিন্তু ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। নানা ধরনের ভাবনা যেন আজ রাতে তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে লর্ডের অপরাধ কাহিনি শোনার পর থেকে তার কোনো কিছুতেই ভালো লাগছে না। সে কি পারবে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে? যদিও পারে, তবে কীভাবে?

খাওয়া শেষ করেই চেয়ার নিয়ে বারান্দায় চলে এসেছিল অনেক্ষণ হলো। মেয়েটি এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে? তার পেছনের দরজা খোলা আছে। পিছনে ফিরলেই ঘরে আলো জ্বলছে কিনা দেখতে পাবে। তাকাল না। চেয়ারে বসে বারান্দার রেলিংয়ে দুহাত দিয়ে তার ওপর থুঁতনি রেখে সামনে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে।

কখন যে তার পাশে মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি ছেলেটি।

‘বারান্দার ঠান্ডায় বসে থেকে কী করছেন? ঘুমাবেন না? অনেক রাত হয়েছে’, ছেলেটির থেকে তিন হাত দূরে রেলিংয়ে ভর দিয়ে বলল মেয়েটি। খাওয়া শেষ করে প্লেট-গ্লাস-বাটি ধুয়ে রেখে ঘরে এসে ঢুকেছিল মেয়েটি। দরজা খোলা থাকায় বারান্দায় ছেলেটিকে বসে থাকতে দেখল। মোম জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়ল মেয়েটি। চোখে ঘুম আসছে না। ঘরে ফেরেনি ছেলেটি। বাইরে কুয়াশা পড়ছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ঠান্ডা লাগবে ছেলেটির। উঠে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বারান্দায়।

হঠাৎ পাশে মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল, সোজা হয়ে বলল ছেলেটি। ‘ও, আপনি এখনো ঘুমাননি?’

‘আপনিও তো ঘুমাননি’, বলল মেয়েটি।

‘তা ঠিক, চলুন ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলে উঠতে গেল ছেলেটি।

‘প্লিজ একটু বসুন’, গলায় স্পষ্ট অনুরোধ। বসে পড়ল ছেলেটি। যেন বাধ্য ছেলে।

‘আপনাকে একটা কথা বলব?’ ইতস্তত করে অবশেষে বলে ফেলল মেয়েটি।

‘বসুন’, একটু ভেবে বলল ছেলেটি।

‘বাংলা ভাষায় আপনি সম্বোধনে পরস্পরের মধ্যে একটা দূরত্ব বজায় থাকে। তুমি সম্বোধনে তা থাকে না’, বলে থামল মেয়েটি।

‘একটু পরিষ্কার করে বলুন’, সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকল ছেলেটি।

‘আমরা সম্বোধনে আপনি শব্দটি বাদ দিয়ে তুমি ব্যবহার করতে পারি না?’ বলে থামল মেয়েটি। মাথা নীচু করে রেখেছে।

‘কেন?’ অবাক হয়েছে ছেলেটি।

এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল ছেলেটি। দ্রুত কথা গুছিয়ে নিয়ে ‘আমার মনে হয় আমরা সমবয়সী বা দু-এক বছরের বড়-ছোট হতে পারি, এ ক্ষেত্রে আপনি…’ আর বলতে পারল না মেয়েটি, লজ্জায় কথা জড়িয়ে গেল।

কিছু একটা বলা দরকার। কিন্তু কী বলবে। একবার দ্বিধা করে ‘আমার মনে হয় আপনি সম্বোধনটাই ঠিক আছে।’ বলতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেটি। ছেলেটির জবাবে একটু বলেও আহত হয়েছে। মুখ দিয়ে আর কথা ফুটছে না তার।

‘অনেক রাত হয়েছে, চলুন শুয়ে পড়ি।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। বলার কিছু না পেয়ে মেয়েটিও ঘরে এসে ঢুকল। এরপর আরো পনের দিন কেটে গেল। এর মধ্যে তিন দিন ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে তাদের কাছে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। দুদিন আগে সন্ধ্যার পর। বেশিক্ষণ দেরি করেনি। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে গেছে।

প্রথমেই তাদের খোঁজখবর নিয়েছে। এবারো তাদের জন্য নানান কিছু নিয়ে এসেছিল। বলে গেছে তাদের আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করার সুযোগ খুঁজছে সে। আরো জানিয়েছে, এবার তারা পঁয়ত্রিশ জন নারীকে ধরে এনেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই কুমারী। তাদের বন্দিশালায় রাখা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের বিক্রি করে দেয়া হবে। এসব শুনে দুজনেরই মন খারাপ হয়েছিল। সকাল নয়টা পার হয়েছে। বড়শি হাতে সৈকতে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি। সাগরের পানি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠেছে। জোরে বাতাস বইছে। আকাশ ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়, সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাতের লক্ষণ। সূর্য অনেক আগেই অদৃশ্য হয়েছে আকাশ থেকে। আজ আর মাছ মারা হবে না। কেবিনের দিকে পা বাড়াল ছেলেটি।

মেয়েটি জানাল আজ মাছের বদলে গোশত, সেই সঙ্গে ডাল থাকবে। মেয়েটি কিচেনে রান্না করছে।

ছেলেটি ঘরের সব জানালা-দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। এই ঝড়ো বাতাসে টিলার মাথায় বসানো কেবিনটা টিকবে তো?

নাকি তাদের নিয়ে উড়ে যাবে? গত তিন দিনের চেয়ে আজকের অবস্থা শোচনীয়।

ঘরে মোম জ¦ালালেও নিভে যাচ্ছে। কোনদিক দিয়ে যেন বাতাস ঢুকছে।

অন্ধকারে ঘরে শুধু শুধু বসে থাকতে ভালো লাগছে না ছেলেটির। শার্ট খুলে শুধু প্যান্ট পরে বারান্দায় বের হয়ে এলো আল্লাহর কুদরত দেখার জন্য। বাতাসে আপনাআপনি দরজা লেগে গেল। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বারান্দায়। তা না হলে বাতাসে পড়ে যাবে। সাগর ফুঁসে উঠেছে। দ্বীপের অনেক ওপরে এসে একেকটা বিলাল ঢেউ ভাঙাচ্ছে। ঢেউগুলোর মাথায় দুধের মতো ফেনা। যেন এগুলো ঢেউয়ের মুকুট। বাতাসে যেন যে কোনো সময় তাদের কেবিনটা উড়ে যাবে। বিদ্যুৎ চমকানোর পরপরই বাজ পড়ার বিকট শব্দে যেন কানের পর্দা ফেটে যেতে চাচ্ছে। দিনের বেলাই যেন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকায় ভিজে গেল সে। তবুও ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে হলো না। দাঁড়িয়েই রইল।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর ঝলকানিতে একটু ডানে দূরে এক পলকের জন্য কী যেন দেখতে পেল ছেলেটি। পরক্ষণে আবার বিদ্যুৎ চমকালো। এবার এক সেকেন্ডের জন্য হলেও দেখতে পেল জিনিসটি। ছাউনি দেয়া একটা বড় বোট। নিশ্চয়ই ইঞ্জিনচালিত। তীর থেকে মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে আছে। তীরে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা চলছে কিন্তু কথা শুনছে না বোটটি। নিশ্চয়ই যাত্রীরা চরম বিপদে পড়েছে। সে কী তাদের জন্য কিছু করতে পারে? হাতল ধরে একটানে খুলে ফেলল দরজা। ঘরে ঢুকে দ্রুত হাতে একটা লাইফ জ্যাকেট পরে নিল। আর একটা হাতে নিল। মেয়েটি ঘরে নেই। তাই কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো না।

আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সৈকতে পৌঁছে গেল আধ মিনিটের মাথায়। বাতাস বার বার তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন সুচের মতো আঘাত হানছে শরীরে।

ছেলেটি বেরিয়ে যাওয়ারও একটু পরেই ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ছেলেটিকে দেখতে পেল না। তার বদলে মূল দরজা খোলা অবস্থায় পেল। তবে দরজার পাল্লা বন্ধই আছে। দরজা লাগিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে খোঁজ করেও ছেলেটিকে পেল না। এই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টিতে গেল কোথায় ছেলেটি? বারান্দায় নেই তো? বারান্দায় এসে দাঁড়াল। না এখানেও নেই। ফিরতে যাবে এমন সময় চোখ পড়ল সৈকতে। দেখতে পেল ছেলেটিকে। বাতাসে উড়ে আসা বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাচ্ছে মেয়েটি। সেদিকে তার খেয়াল নেই। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। তাকিয়ে থাকল সৈকতের দিকে। বড় বোটটা দেখতে পেয়েছে। এতদূর থেকে ডাকলে শুনতে পাবে না ছেলেটি। তারপরও ডাকল। কিন্তু শুনতে পেল না সে। ছোট্ট সৈকতটা দ্রুত পেরোচ্ছে ছেলেটি। তীরের খুবই কাছে এসে গেছে বোটটি। আর মাত্র বিশ-ত্রিশ গজ দূরে আছে। হঠাৎ করে বিশাল এক ঢেউয়ের ধাক্কায় অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে এলো বোটটি। একটা বিরাট বড় পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। সংঘর্ষের শব্দটা মেয়েটিও শুনতে পেল। দুমড়ে-মুচড়ে গেল বোটের অগ্রভাগ। ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে গেল। বোটে মাত্র দুজনকে দেখতে পেল ছেলেটি। বৃষ্টির কারণে চেহারা চিনতে পারল না। তার এ মুহূর্তে চেহারা চেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বোটটা দ্রুত ডুবে যাচ্ছে। লোক দুটো একে অপরকে চিৎকার করে কী যেন বলছে। বুঝতে পারছে না বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে। ছেলেটি লাফ দিল অশান্ত সাগরে। সাগরের দুষ্ট ঢেউ তাকে নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। একবার তাকে ঢেউয়ের মাথায় তুলছে পরক্ষণে অনেক নীচে নামিয়ে দিচ্ছে। কখনো তার ওপর দিয়ে যাচ্ছে বিশাল ঢেউ, তবে ডুবে যাচ্ছে না। অন্য লাইফ জ্যাকেটটা কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছে। নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি ঢুকে যাওয়ায় মুখের ভেতর যেন লবণে ভরে গেছে। সেই সঙ্গে হাঁচি পাচ্ছে।

প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটি। এই অবস্থায় তার সাগরে নামাটা উচিত হয়নি তা সে ভুলেই গেছে। বোটটা এর মধ্যে আবার দূরে সরে গেছে। বোটটা একবার সামনে এগোচ্ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ডুবে যাচ্ছে সেটি। একটু পরই সাগরের বুকে নিমজ্জিত হবে। বোটটার কাছে চলে এসেছে ছেলেটি। তাকে দেখতে পেয়ে দুজনই লাফ দিল সাগরে। এতক্ষণে তাদের চিনতে পেল ছেলেটি। একজন লর্ড, অপরজন ক্যাপ্টেন। এখন কী করবে ছেলেটি? যে উদ্দেশ্যে এসেছে তাই করবে নাকি তাদের ছেড়ে চলে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এখন অত ভাবার সময় নেই? এগিয়ে গেল তাদের দিকে। হাবুডুবু খাচ্ছে দুজনই। তাকে ওরা দেখতে পেয়েছে।

‘আপনি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘হ্যাঁ, আমি’, নির্দ্বিধায় জবাব দিল ছেলেটি।

দ্রুত কোমর থেকে অপর লাইফ জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। ‘কাকে দেব?’

লর্ড ইঙ্গিত করল ক্যাপ্টেনের দিকে। দিয়ে দিল ছেলেটি। অনেক কষ্টে পরে নিল। এখন লর্ডের ভাসতে কষ্ট হচ্ছে। ডাঙ্গা মাত্র পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে। এই দূরত্বই তাদের কাছে পঞ্চাশ-ষাট মাইল মনে হচ্ছে। ইশারায় কথা হলো তাদের। ডানদিকে ছেলেটি, বামদিকে ক্যাপ্টেন আর মাঝখানে লর্ড। লর্ডের গায়ে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। ঠিক হলো লর্ড তাদের মাঝখানে সাঁতার কাটবে। বড় কোনো ঢেউ এলে তারা লর্ডকে আঁকড়ে ধরবে। এভাবেই পাশাপাশি তিনজন এগোতে লাগল। মাঝেমধ্যেই তারা ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওপরে উঠছে আর নামছে। কখনো কখনো বিশাল ঢেউ তাদের ঢেকে দিচ্ছে। তার আগেই দুপাশ থেকে দুজন লর্ডকে আঁকড়ে ধরছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মেপে মেপে এগোচ্ছে তারা।

কোনো অবস্থাতেই তিনজন বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে একবার এগোচ্ছে আবার পিছিয়ে আসছে। সমুদ্রের অশান্ত পানিতে ঢেউয়ের কারণে ডাঙায় উঠতে পারছে না। ছেলেটির খেয়াল হলো দ্বীপের বেশ ওপরে পানি উঠেছে। দাঁড়িয়ে গেল। পায়ে মাটি ঠেকল। অন্য দুজনও তার দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। ডাঙায় উঠেই শুয়ে পড়ল তিনজনেই। কেউই কোনো কথা বলছে না। শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। প্রথমে ছেলেটিই উঠে দাঁড়াল। ‘চলুন, এবার কেবিনে যাওয়া যাক।’ নীরবে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তিনজনই। ছেলেটির মাথায় চিন্তার ঝড় বইছে। এরপর কী হবে? অবশ্য দুজনের কেউই এখনো পিস্তল বের করেনি। দরজার সামনে পৌঁছে গেল তারা।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে মেয়েটি সবই দেখল। ছেলেটির আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। দূর থেকে আগন্তুক দুজনকে চিনতে পারল না। তবে যখন ডাঙায় উঠে এলো তখন চিনতে পারল। ভয় পেয়ে গেল মেয়েটি। তাদের এখন কী হবে? দ্রুত ঘরে ঢুকে কাপড় পাল্টাল। কাপড় পাল্টাতে যেতে খেয়াল হলো পিস্তলের কথা। গুলি ভর্তি আছে। টেবিলের ওপর থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়ে তাদের আসার অপেক্ষা করতে লাগল।

দরজায় ঠক ঠক শব্দ হতেই মেয়েটি দরজা খুলে দিয়ে দ্রুত বাম পাশে সরে গেল। প্রথমে ঘরে ঢুকল ছেলেটি। তারপর বাকি দুজন।

‘মাথার ওপর হাত তুলে স্থির হয়ে যান, আমার হাতে পিস্তল আছে।’ ঝট করে লোক দুটোর পেছনে এসে তাদের দিকে পিস্তল তাক করে আঙুল ট্রিগারে রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

বিনা বাক্য ব্যয়ে হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল দুজন। ছেলেটি এর মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল। যাক মেয়েটি ভালোই করেছে। তাকে আর বলতে হলো না। দুজনকে সার্চ করে পাওয়া গেল দুটি পিস্তল। আর লর্ডের কাছে পাওয়া গেল অতিরিক্তভাবে একটি ওয়্যারলেস সেট।

পিস্তল দুটো নিজের দুই পকেটে ঢুকিয়ে রাখল ছেলেটি। আর ওয়্যারলেস সেটটি টেবিলে রেখে এসে মেয়েটির হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে নিল। দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি।

‘এবার আপনার হাত নামাতে পারেন, আশা করি আপনারা সুযোগ কাজে লাগাবেন না। আপনারা এখন থেকে আমাদের অতিথি।’ বলেই দুজনের দিক থেকে পিস্তল সরিয়ে নিল ছেলেটি।

হাত নামাল দুজনে। মেয়েটি কিছু বলল না।

ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝোলানো ইঞ্জিনিয়ারের তাকে দেয়া শার্ট-প্যান্ট, দুটো এনে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিল। ‘বাথরুম থেকে তাড়াতড়ি কাপড় বদলিয়ে আসুন।’

‘আপনি আগে যান, আপনার গায়ে এমনিতেই কিছু নেই’, এতক্ষণে মুখ খুলল লর্ড।

‘অতিথি আগে’, বলে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করল ছেলেটি। কথা না বাড়িয়ে চলে গেল দুজনেই।

‘আপনি এটা রাখুন, আর সাবধান থাকবেন। কী হবে কিছুই এখন বলা যাচ্ছে না।’ পিস্তলটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল ছেলেটি। নিজে লর্ডের ছোট পিস্তলটা কাছে রেখে অন্যটি কিচেনে রাখা চালের বস্তার মধ্যে লুকিয়ে রাখল।

কিছুক্ষণ পর কাপড় পাল্টে ফিরল দুজনেই।

‘আপনারা বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন, আমি কাপড় পাল্টে আসছি।’ বলেই কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে গেল ছেলেটি।

দুু’জনেই বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিছানায় শুয়ে পড়ল।

পাশে চেয়ার নিয়ে বসে রইল মেয়েটি। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ফিরে এলো।

অতিথিদের জন্য আবার রান্না করতে কিচেনে গেল মেয়েটি। ছেলেটি বসে পড়ল চেয়ারে। মাথায় চিন্তার বোঝা। সময় কেটে যাচ্ছে দ্রুত। দুপুর দেড়টা বাজে। এর মধ্যে ঝড় বৃষ্টির প্রকোপ একটু কমে গেছ, তবে থামেনি। উঠে পড়ল ছেলেটি। নামাজ পড়ে নিল। ততক্ষণে রান্নার কাজ শেষ হয়েছে। মেঝেতে বসে খাবারের আয়োজন করতে লাগল দুজনে।

বিছানায় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

‘উঠুন, দুটো বেজে গেছে, খেয়ে নিন’, ডাকল ছেলেটি।

ঘরে ফিরে দেখল দুজনই ঘর থেকে উধাও। তবে দরজা দিয়ে দেখা গেল, দুজনেই চেয়ার নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসে আছে। বাতাসের বেগ কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি আর বারান্দায় এসে পৌঁছাচ্ছে না। দুজনই নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন। তাদের বিরক্ত করতে চাচ্ছে না দুজন। ছেলেটি বসে পড়ল বিছানায়, মেয়েটি বসল চেয়ারে। দুজনের একই প্রশ্ন, ‘এরপর তাদের কী হবে?’ অবশ্য তারা খুব খারাপ অবস্থাতে নেই। কারণ, লর্ড ও ক্যাপ্টেন দুজনেই বলতে গেলে তাদের হাতের মুঠোয়। এ অবস্থায় ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করা যায়। এখন তাদের একটা নৌকা বড়ই প্রয়োজন ছিল। কাল দিনে কিছু একটা করতে হবে, আজ সময় নেই। তবে লর্ড ও ক্যাপ্টেনের চুপ করে থাকার বিষয়টা বুঝতে পারছে না।

সূর্যাস্তের অনেক পরে দুজনে ঘরে ফিরল। এর মধ্যে ছেলেটি তাদের দুজনকে দুটো সোয়েটার দিয়ে এসেছিল।

তারা দুজনে ঘরে ঢুকলে বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসল ছেলেটি।

‘আরে থাকুন না’, ছেলেটিকে বিছানা থেকে উঠতে দেখে লর্ড বলল।

‘ঠিক আছে, আমি চেয়ারেই বসছি’, বলল ছেলেটিকে। তর্ক না করে দুজনে বিছানায় বসল।

‘বলুন তো, আমাদের আপনি কীভাবে দেখতে পেলেন?’ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পর লর্ডই প্রথম নীরবতা ভাঙল। সংক্ষেপে খুলে বলল ছেলেটি।

‘আপনারা বুঝি ওই দ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিলেন?’ ইঙ্গিতে দ্বীপটার দিকে দেখাল ছেলেটি।

‘আপনি কীভাবে জানলেন ওই দ্বীপের কথা?’ কৌতূহল ফুটে উঠল স্বভাবগম্ভীর লর্ডের কণ্ঠে।

‘জেনে নিয়েছি।’

‘কার কাছে?’

‘বলা যাবে না।’

এমন মুহূর্ত চুপ করে থাকল লর্ড। ‘হ্যাঁ, ওই দ্বীপেই গিয়েছিলাম’, হেসে বলল।

‘যখন দেখলেন ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, তখন এত ঝুঁকি না নিয়ে ওখানে থাকলেই ভালো করতেন’, বলল মেয়েটি। এতক্ষণ পর মুখ খুলল সে। বসে আছে অন্য চেয়ারে।

‘আজ খুব সকালেই দুজনে বের হয়েছিলাম। তার আগে বলি, ‘ও আমার কাজিন’, ক্যাপ্টেনকে দেখিয়ে বলল লর্ড। ‘দুই ভাই যখন দ্বীপের কাছে এসে পৌঁছলাম তখন দেখি সাগর অশান্ত হতে শুরু করেছে, খুব জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে, আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মূল দ্বীপে ফেরার জন্য বোট ঘোরালাম, কাটা ঘায়ে নুন ছিটানোর মতোই মাঝপথে বোটের ইঞ্জিন থেমে গেল, ঠিক করে আবার স্টার্ট করতে সময় লেগে গেল। ততক্ষণে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। খুব দ্রুতই সাগরের পানি অশান্ত হয়েছে। তখন ঠিক করলাম এ দ্বীপে উঠব। কারণ মূল দ্বীপে ফেরার চেষ্টা করাটা বোকামি হয়ে যাবে। সাগর অশান্ত থাকায় সেই সঙ্গে তীব্র বাতাসের কারণে এই দ্বীপে নৌকা পৌঁছাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম’, থেমে আবার শুরু করল লর্ড। ‘যখন তীরের কাছে পৌঁছে গেছি, তখন আপনাকে সৈকতে দেখতে পাই, তারপর বিশাল এক ঢেউয়ের কবলে পড়ে একটা বড় পাথরে ধাক্কা লাগল বোটটি। অবশ্য এসব আপনি দেখেছেন’, ছেলেটিকে বলল লর্ড। ‘তারপর যখন দেখলাম, আপনি সমুদ্রে, আশার আলো দেখতে পেয়ে দিলাম লাফ, আপনি ছাড়া আজ আমরা বাঁচতেই পারতাম না, আপনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ’, বলল লর্ড। সংক্ষেপে সব খুলে বলল লর্ড।

‘আমি নই, আমার মাধ্যমে আল্লাহই আপনাদের বাঁচিয়েছেন’, বলল ছেলেটি। কিছু বলল না লর্ড।

‘আপনি যে বেঁচে আছেন, এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না’, এতক্ষণে মুখ খুলল ক্যাপ্টেন। যদিও বিধ্বংস গাড়িতে আপনার কোনো চিহ্ন পাইনি, আমরা ভেবে নিয়েছিলাম যে আপনি ভস্মীভূত হয়ে গেছেন, কারণ টাইম বোমাটা আপনার নীচেই ছিল। এরপর শুধু আপনাকে…’ মেয়েটিকে বলল ক্যাপ্টেন।

‘আপনাকে খোঁজা অব্যাহত ছিল, কিন্তু পাঁচ-সাত দিন পরও আপনার সন্ধান না পেয়ে আপনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম’, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিসের বিধ্বংসী গাড়ি, কিসের টাইম বোমা, একটু খুলে বলুন’, কৌতূহলী হয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন উনি আপনাকে কিছু বলেননি?’ কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলল ক্যাপ্টেন।

‘না তো!’

তিন জোড়া অদ্ভুত দৃষ্টি বিদ্ধ করে ফেলেছে ছেলেটিকে।

‘আপনি ওনাকে বলেননি কেন?’ বলে থামল। ‘এক্সকিউজ মি’, বলে উঠে গেল ছেলেটি।

বাথরুম থেকে অনেক দেরি করে ফিরল সে। ততক্ষণে ক্যাপ্টেন মেয়েটিকে সব খুলে বলেছে। সব শুনে কেমন যেন হয়ে গেল মেয়েটি। উঠে দাঁড়াল ‘রাতে কী খাবেন?’

এক মুহূর্ত ভেবে ‘রুটি, গোশত’, জবাব দিল লর্ড ‘যদি ঘরে থাকে’, যেন শর্ত লাগাল।

রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরল মেয়েটি। ঠিক এমন সময় ছেলেটি ঘরে ঢুকল। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিল ছেলেটি।

‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘রুটি বানাতে’, কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে। কিছু বলল না ছেলেটি। নামাজে দাঁড়িয়ে গেল সে।

এর মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে সাগর এখনো অশান্ত আছে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। দুই ভাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন শোয়ার পালা। অনেক চাপাচাপির পর দুই ভাই বিছানায় শুতে রাজি হলো। যখন দুজনের কেউ বিছানায় শুতে রাজি হচ্ছিল না তখন ছেলেটি কৌতুক করে বলল, ‘দেখুন আপনারা আমাদের হাতে বন্দী, আর আমরা যা বলব আপনাদের তাই করতে হবে।’ হেসে রাজি হয়ে গেল দুজনে। তবে ঠিক হলো তারা কম্বল গায়ে দেবে না। ছেলেটি একদিকে, মেয়েটি অন্যদিকে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। তারা দুজনই বালিশ ছাড়া শুয়ে পড়েছে, তা দুই ভাইয়ের কেউই খেয়াল করল না। মোম নিভিয়ে দিল ছেলেটি।

পরদিন কেবল সূর্য উঠি উঠি করছে। দুই অতিথি বারান্দায় চেয়ারে বসে ছিল। ছেলেটি পানি আনছে, ক্যাপ্টেন তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল কিন্তু ছেলেটি তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। অগত্যা সে তার বড় ভাইকে সঙ্গ দিচ্ছে। মেয়েটি কিচেনে নাশতা বানাচ্ছে।

নাশতা খেতে বসেছে সবাই। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হতেই উঠে দরজা খুলে দিল ছেলেটি। ঘরের ভেতর পা রাখল ইঞ্জিনিয়ার। ফিরে তাকাল দুজনই। দরজাতেই সে যেন বরফের মতো জমে গেল।

‘ও, বুঝেছি আপনিই তাহলে এদের দ্বীপে এনেছেন, এতসবের ব্যবস্থা করেছেন?’ বলল লর্ড হাসিমুখে।

‘ওভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভেতরে আসুন।’

আতঙ্কের মেঘ অনেকটা কেটে গেল ইঞ্জিনিয়ারের। ছেলেটির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে লর্ডের পাশের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ল সে।

‘কাল যা ঝড়-বৃষ্টি হলো, তাতে মনে হলো কেবিনটা বহাল তবিয়তে আছে তো, সন্ধ্যার পরপরই যখন একেবারে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন আসার জন্য বের হয়েও আসা হয়নি, কারণ তখনও সাগর অশান্ত ছিল। তাই আজ খুব ভোরেই বেরিয়ে পড়ি; কিন্তু লোকের চোখ এড়ানোর জন্য ঘুরপথে আসতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। যেন আসতে দেরি হওয়ায় কৈফিয়ত দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘নাশতা খেয়ে নিন’, বলল মেয়েটি। খাওয়ার সময় কোনো প্রকার কথা হলো না।

‘আপনারা এখানে কেন?’ খাওয়া শেষে এই প্রথম মুখ খুলল ইঞ্জিনিয়ার। সংক্ষেপে সব বলল ক্যাপ্টেন। কিছু বলতে যাবে ইঞ্জিনিয়ার এর আগেই ‘সত্য কথা বলতে কি, এরা আমার চোখ খুলে দিয়েছে’, হঠাৎ করে বলল লর্ড। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই।

‘তার মানে?’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বলছি বলছি, কাল থেকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এ ব্যাপারেই আলাপ করছি। এ দুজনের ওপর বিশেষ করে ওনার ওপর চরম নির্যাতন করা হয়েছে। যেন জাদুমন্ত্র বলে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। কেমন করে সে বেঁচে গেছে যদিও সে কাহিনি এখনো শোনা হয়নি। নৌকায় যেতে যেতে সে কাহিনি শুনব আমরা। বলছিলাম, এত কিছুর পরও এরা দুজন আমাদের বিপদে আপনজনের মতো বা তার চেয়েও ভালো ব্যবহার করেছে। ‘উনি’ ছেলেটাকে দেখাল লর্ড। ‘হয়তো অন্য মানুষ মনে করে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের দেখে ফেলে আসেনি। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল লর্ড। সবাই মাথা নীচু করে শুনছে। এ লোকটির অনুমান ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হলো ছেলেটি। এরা আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়েও নেয়নি। অথচ আমি আজ পনের বছর ধরে নারী জাতির ওপর প্রতিশোধ নিয়ে আসছি’, বলে থামল লর্ড। যেন কথা আটকে গেছে।

‘খুলে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আমি অনেক কিছুই জানি না।’

‘আজ থেকে পনের বছর আগেও আমি মানুষ ছিলাম’, দম নিয়ে শুরু করল লর্ড। ‘কিন্তু এখন আমি একজন অমানুষ, আমার বাবা একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।’ সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে লর্ডের অতীত কাহিনি। ‘বিশ বছর আগে ভালোবেসে একজনকে বিয়ে করি। সে আমার কাছে মাত্র তিন বছর ছিল। আমাদের একটি মেয়ে হয়েছিল। এর মধ্যে আমার বাবা মারা যাওয়ায় বাবার ব্যবসা দেখার জন্য প্রায় বাইরে থাকতে হতো। সেই ফাঁকে আমার স্ত্রী একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একদিন আমার অনুপস্থিতিতে সে পালিয়ে যায়। একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল, আমি যেন তাকে ভুলে যাই। সে সময় মেয়েটির বয়স ছিল ছয় মাস। মা ছাড়া মেয়েকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলাম। তার তিন মাস পর সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মেয়েটি মারা যায়। তাতে আমি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাই। একের পর এক আঘাতে আমি পাগলপ্রায়।’ লর্ডের গাল দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসছে। ‘এরপর থেকে নারী জাতির প্রতি আমার প্রবল ঘৃণা জন্মে ওঠে। একসময় অপরাধ জগতে পা দেই। তারপর জড়িয়ে পড়ি নারী পাচার ব্যবসায়। এ দ্বীপগুলো লিজ নেই ইংল্যান্ড সরকারের কাছ থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। কোনো অপরাধ দমন সংস্থাই আমাদের ঘাঁটতে সাহস পায় না। তবে মাঝেমধ্যে পত্র-পত্রিকাগুলো আমাদের নিয়ে অযথা নাক গলায়’, থামল লর্ড। ‘কিন্তু এতদিন পর কালই প্রথম বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। এতদিন বিবেক সুপ্ত অবস্থায় ছিল। গতকাল বুঝতে পারি, যে মেয়ে আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল, তার প্রতি তো প্রতিশোধ নেইনি। শুধু শুধু মায়ের বুক থেকে কন্যাকে, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে সরিয়ে তাদের ওপর চরম অন্যায় করেছি। আমি এর মধ্যে এসব থেকে মনে মনে বেরিয়ে এসেছি। আমি ঠিক করেছি এই ভাইটিকে হাতে…’ ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেনকে দেখাল। ‘দ্বীপের দায়িত্বভার তুলে দিয়ে চলে যাব, এমন কোনো জায়গায় যেখানে আমাকে কেউ চিনবে না। আবার নতুন করে জীবন শুরু করব। তবে একা, ও শুধু দ্বীপটার দেখাশোনা করবে। নারী পাচার বা অন্য কোনো অপরাধমূলক ব্যবসা করবে না। সে আমাকে এ ব্যাপারে শুধু কথা দেয়নি, শপথ করে বলেছে’, বলে থামল লর্ড। চোখের পানি মুছল। আমি পরিবেশটা ভারী করে ফেলেছি। দুঃখিত।’ মুখে হাসির ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল লর্ড।

‘না, না আমরাই তো শুনতে চেয়েছিলাম’, তাড়াতাড়ি বলে উঠল মেয়েটি।

‘কেন আপনিও এখানেই থেকে যান’, বলল ছেলেটি।

‘এই দ্বীপে আমি অপরাধ করেছি। এখানে আমি থাকতেই পারব না। এখানে থাকলেই আমি বিবেকের তাড়নায় পাগল হয়ে যাব। নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে আমার অপরাধ জীবন ভুলে থাকার চেষ্টা করব, আর কখনোই এখানে ফিরব না।’

‘আপনাকে কি এখানকার বাসিন্দারা যেতে দেবে?’ শেষ চেষ্টা করল ছেলেটি।

‘হয়তো যেতে দেবে না। কারণ এদের ওপর কখনোই অত্যাচার করিনি। তাছাড়া এখানে থাকার জন্য তাদের কোনো প্রকার কর দিতে হয় না। তবে হয়তো তাদের কাঁদিয়ে যেতে হবে, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

‘কোথায় যাবেন?’ হঠাৎ প্রশ্নটা করল মেয়েটি।

‘তা কাউকে জানাব না, পরিচিত সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাব।’

‘মানুষের চোখ এড়িয়ে কীভাবে যাবেন?’ আবার প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘এ নিয়েও ভেবেছি, আমি একটা ছোট জাহাজ নিয়ে একাই খোলা সাগরে বেরিয়ে পড়ব, কোন দিকে যাব এর মধ্যে ঠিক করে রেখেছি, তবে বলব না। ইঞ্জিনের জাহাজ একাই সামলানো কোনো সমস্যা না। খাবার-দাবার আগেই নিয়ে নেব, আর বাবার কিছু ব্যবসার টাকা এখনো আলাদাভাবে আছে, সেগুলো নেব। প্রথমে সাগরে ঘোরাঘুরি করে দেখব, কেউ আমার পিছু নিয়েছে কিনা। তারপর নির্দিষ্ট রুটে এগিয়ে যাব। উপকূল থেকে দূরে থাকতেই তলা ফুটো করে দিয়ে জাহাজ ডুবিয়ে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় তীরের দিকে যাব। তীরে পৌঁছে নৌকাটিও ডুবিয়ে ফেলব। কোস্টগার্ডদের ফাঁকি দেয়া আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না, তারপর ঢুকে পড়ব কোনো ভূ-খণ্ডে। ফলে কেউ আমার অবস্থান জানতে পারবে না’, বলে থামল লর্ড। সবার দিকে তাকিয়ে হাসল।

‘আর আমাদের কী হবে?’ প্রশ্নটা করল ছেলেটি।

‘তার আগেই আপনাদের কাক্সিক্ষত দেশে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেব।’

‘আমরা কালই রওনা হতে চাই’, বলল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে, তাই হবে’, তাদের আশ্বস্ত করল লর্ড।

ওয়াটার প্রুফ, গোল্ডেন কালারের ঘড়িটার দিকে তাকালো লর্ড। সাড়ে এগারটা বাজে। দ্বীপে পৌঁছা দরকার।

‘আপনার নৌকাটা ছোট’, ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্দেশ করে বলল লর্ড।

‘একজনের জায়গা হবে, তাছাড়া ওনাদের অবশিষ্ট মালপত্রগুলোও নিয়ে যেতে হবে’, বলতে বলতে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে ওয়্যারলেস সেটটা তুলে নিয়ে একট বড় বোট পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে ফিরে এলো লর্ড।

‘ইঞ্জিনচালিত বোট আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে, সব গুছিয়ে নেয়া দরকার।’

সবাই মিলে গুছিয়ে নিল। সব নিয়ে নীচে নেমে এলো। বোট পৌঁছে গেছে। নীচে নামতে নামতে ‘হিরো সাহেব, নৌকায় যেতে যেতে আপনার টাইম বোমা থেকে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি বলতে হবে’, ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ক্যাপ্টেন।

‘ঠিক আছে’, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো ছেলেটি।

সবাই বোটে উঠে পড়েছে ইঞ্জিনিয়ারের ছোট নৌকাটাকে বেঁধে নেয়া হলো বড় নৌকার সঙ্গে। পানি কেটে এগোতে শুরু করেছে জলযান।

এই দ্বীপটা ছেড়ে যেতে তাদের দুজনের বড় কষ্ট হচ্ছে। এই দ্বীপে তারা কোনো বিপদে পড়েনি। মায়া জন্মে গিয়েছিল দ্বীপটার প্রতি। হয়তো আর কোনো দিন এখানে আসা হবে না। মেয়েটি হাত নাড়তে লাগল দ্বীপটির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এর কোনো প্রতিউত্তর এলো না।

‘শুরু করুন আপনার কাহিনি’, ছেলেটিকে বলল ক্যাপ্টেন। কাহিনি শোনায় মগ্ন হয়ে গেল মেয়েটি।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

২৪ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৮)

‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে মুখ না খোল, তাহলে তোমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হবে।’

ছেলেটি যতই শুনছে ততই ঘামছে।

‘টাইম বোমাটি তোমার সিটের ঠিক নীচেই থাকবে’, বলে থামল। টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেল। যেন ছেলেটির চেয়ে সেই বেশি বিপদে পড়েছে।

‘তবে এত কিছুর পরও বাঁচতে পারবে, যদি পাহাড়ি পথে নীচের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারো। ওখানে আমার দুজন লোক থাকবে, তারা টাইম বোমাকে অচল করে দেবে। তাহলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে। তা হলো, নিজের প্রাণটাও বেঁচে যাবে, মুখও খুলতে হবে না। এটাই হলো এই খেলার প্রধান আকর্ষণ। আকর্ষণটা কি বুঝতে পেরেছো?’ এক মুহূর্ত থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার শুরু করল।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮ 20

‘ঠিক আছে খুলেই বলি।’ যেন এসব বলে দারুণ মজা পাচ্ছে ক্যাপ্টেন। ভাব দেখে তাই মনে হয়।

‘তা হলো সন্ধ্যার পর পাহাড়িয়া পথ এমনিতেই অন্ধকার হয়ে যাবে, আকাশে চাঁদও থাকবে না, অন্ধকারে ভয়ঙ্কর দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় নীচে নামতে হবে। বোমা বিস্ফোরণের নির্দিষ্ট সময়ের অর্ধেক অতিক্রম হওয়ার আগেই যদি মুখ খুলতে রাজি হও, তবে তো ওয়াকিটকিতে জানিয়ে দেবে। এদিকে রিমোট টিপে টাইম বোমাকে অচল করে দেব। তুমি সেখানেই গাড়িতে বসে থাকবে, আমরা গিয়ে তোমাকে গাড়ি থেকে নামাব। আর যদি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাও, তবে দ্রুত গাড়ি চালাতে হবে। তুমিই জানো ব্রেক ছাড়া এই পাহাড়ি পথে শুধু ক্লাচ, গিয়ার আর এক্সিলেটরের ওপর দ্রুত গাড়ি চালাতে পারবে কি না। তবে আমি যেভাবে সময়ের হিসাব করেছি, তাতে এক যুগের অভিজ্ঞ ড্রাইভারও আমার মনে হয় পারবে না। তুমি যদি পারো তবে প্রথম বারেই হেরে যাব, তুমি চেষ্টা করতে পারো। কারণ, আমি এমনিতে খারাপ হতে পারি কিন্তু কথা দিয়ে তা ভঙ্গ করি না। বলতে পারো, আমার এই একটি ভালো গুণ আছে। আমার কথা বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি তুমি যদি নীচে নির্দিষ্ট জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছতে পারো, তবে প্রথমত তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে, দ্বিতীয়ত মেয়েটির সম্পর্কে মুখ খুলতে হবে না’, শেষের বাক্যগুলো জোর দিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘কিন্তু আমি নিশ্চিত, তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে না’, এ বাক্যটা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন। যেন ছেলেটির দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। কারণ জোরে চালাতে গেলে তুমি নির্ঘাত গাড়িসহ খাদে পড়ে যাবে। ফলে বোমা বিস্ফোরণের আগেই তুমি পরপারে পাড়ি জমাবে।’

কিন্তু ছেলেটি তা গ্রহণ করল কিনা বোঝা গেল না তাকে দেখে। বেশ কিছুক্ষণ আগে ঘাম মুছে শান্ত হয়ে বসেছে সে। থেমে আবার পানি খেলো ক্যাপ্টেন। ‘কি ভয় লাগছে, তোমার মতে হিরোর তো ভয় পাওয়া সাজে না’, একটু থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল।

‘কি মুখ খুলবে? শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলাম। এরপর বাঁচতে চাইলে নিজে থেকে জানাতে হবে।

‘এক কথা বারবার ভালো লাগে না। আমি আমার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিচ্ছি, আর নতুন কিছু বলার নেই’, বিরক্তি প্রকাশ পেল ছেলেটির কণ্ঠে।

‘ও ঠিক আছে। তুমি যদি তোমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেল তাতে আমার আপত্তি নেই।’ যেন হতাশ হয়েছে ক্যাপ্টেন। ‘আচ্ছা, অহেতুক একটা গাড়ি ধ্বংস করার ভূতটা আপনার মাথা চাপল কেন, বলুন তো?’ ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বেশি কিছু তো ধ্বংস করছি না। পুরনো বাতিল-প্রায় এক জিপ গাড়িকে গ্যারেজে ফেলে না রেখে ধ্বংস করে দেয়া অনেক ভালো। তাছাড়া তোমার মতো একজন হিরোর জন্য একটা সামান্য জিপ ধ্বংস, এটা তো কোনো ব্যাপারই নয়’, বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতে লাগল ক্যাপ্টেন।

‘থামুন, এসব কথাবার্তা আমার মোটেও ভালো লাগছে না।’ বিরক্ত হয়ে বলল ছেলেটি। ‘আপনাদের লর্ড কোথায়? তার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।’ এ ক্যাপ্টেনের চেয়ে লর্ড হয়তো তার ব্যাপারে কিছুটা উদার হবে। অন্তত তার তাই মনে হয়। মনে মনে সাহায্য চাচ্ছে আল্লাহর কাছে।

‘ওহ হো, তুমি তো জানো না, আমাদের মহামান্য লর্ড তার বিশেষ কাজে গতকাল বাইরে গেছে, ফিরতে কয়েকদিন দেরি হবে। তোমার বিচার আমাকেই করতে বলেছে।’

ছেলেটি এর মধ্যে বুঝে গেছে এ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তার কোনো আপস হবে না, তাই অহেতুক কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল।

‘সন্ধ্যা হয়ে এলো, এখন ওঠা যাক। গাড়ির কাছে গিয়ে আর কিছু বলে, তোমাকে বিদায় জানাব।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন।

পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। মাথার ওপর দিয়ে মাঝে মধ্যে নানা ধরনের পাখি উড়ে যাচ্ছে।

‘আমার একটা কথা রাখবেন?’ বসেই বলল ছেলেটি।

‘আগে বল।’ সতর্ক হয়ে গেছে ক্যাপ্টেন।

‘আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য অস্ত যাবে, আমাকে শুধু মাগরিবের নামাজ পড়ার সুযোগ দেবেন?’ বলে জবাবের আশায় তাকালো ক্যাপ্টেনের দিকে।

একটু ভেবে ক্যাপ্টেন, ‘উম, ঠিক আছে, আর কিছু?’

‘না।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি।

আবার চেয়ারে বসল ক্যাপ্টেন। সময় হলে নামাজের দাঁড়িয়ে গেল সে। নামাজ শেষে দুই হাত তুলল মহান আল্লাহর দরবারে ‘হে আল্লাহ। তুমি আমার জানা, অজানা, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় করা সব ধরনের গুনাহ মাফ করে দিও। …হে আল্লাহ, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা আদৌ ঠিক হয়েছে কিনা তা আমার ভালোভাবে বোধগম্য হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে থাকলে আমাকে তুমি মাফ করে দিও। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করো। হে আল্লাহ, তুমিই তো রিজিকের মালিক, তুমি আমার রিজিক বৃদ্ধি করে দাও। হে আল্লাহ, এটাই যেন আমার শেষ নামাজ না হয়।’ তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

তাকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে প্রায় জোর করে জিপের কাছে নিয়ে আসা হলো। পাশেই এলএমজি হাতে তিনজন তাকে পাহারা দিচ্ছে। তাছাড়া সে বিকেল থেকেই লক্ষ্য করছে, ক্যাপ্টেনের প্যান্টের ডান পকেটটা বেঢপ উঁচু হয়ে আছে। আর ক্যাপ্টেন যে কী ধরনের ক্ষিপ্র তা তার জানা আছে। যদিও পালানোর উপায় নেই আর এরপর তা পাবেও না। শেষ চেষ্টা কি করে দেখবে? কীভাবে? সে ইচ্ছায় ইস্তফা দিল। কারণ তা চরম বোকামি হয়ে যাবে। খালি হাতে এতগুলো অস্ত্রের সামনে সে কিছুই করতে পারবে না। শুরু করতেই তাকে শেষ করে দেয়া হবে। তাই নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল।

‘সময় হয়ে গেছে। এবার বাকি তথ্যগুলো জানিয়ে তোমাকে বিদায় দেব, হয়তো তা হবে চির বিদায়।’ জিপটা থেকে হাত কয়েক দূরে এসে থামতেই কৌতুক করে বলল ক্যাপ্টেন। নীরবে শুনতে লাগল ছেলেটি।

‘এই দুর্গম পাহাড়িপথে মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ ত্রিশ কিলোমিটার বেগে নামা যাবে। বেশিরভাগ সময় বিশ কিলোর বেশি চালানো যায় না। কখনোবা গতিবেগ পাঁচ কিলোমিটারে নামাতে হয়। এভাবে এখান থেকে সাড়ে দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক জায়গায় পাহাড়ি পথটা নিচ থেকে অনেকটা খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আবার তেমনি বিপজ্জনকভাবে নীচের দিকে নেমে গেছে। ওখানে পৌঁছতে হবে, বোমা বিস্ফোরণের সর্বনিম্ন সময় পাঁচ মিনিট পর। ওখানে আমি এর মধ্যে দুজনকে পাঠিয়েছি। তারা পথে তোমার পৌঁছার অপেক্ষায় আছে। ওই একই পথ তোমাকেও এই জিপে পাড়ি দিতে হবে। তুমি গাড়িতে স্টার্ট দেবে, তারপর আমি নিজ হাতে দেড় ঘণ্টা সময় দিয়ে টাইম বোমা অ্যাডজাস্ট করাব, ঠিক দেড় ঘণ্টা পড়ে ঘটবে বিস্ফোরণ।’ লোকটির কথা শুনতে শুনতে দর দর করে ঘামছে ছেলেটি। বুঝতে পারছে সে, তাকে কী ভয়ানক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

‘তোমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে না। কারণ, ব্রেক না থাকায় তোমাকে পুরো আধা ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে তোমার একটা দুর্বল দিক হলো ওই পথের সঙ্গে তোমার একদম পরিচিতি নেই, অথচ আমরা কোনো বাঁকে গাড়ি থামতেই সামনের পথ ডানে গিয়েছে, না বামে তা বলে দিতে পারি। তারপরও ও পথে গাড়ি চালাতে এখনো আমার বুক কাঁপে’, একটু দম নিল ক্যাপ্টেন।

‘যা বলার ছিল এর মধ্যে বলেছি, শুধু এতটুকু বলা বাকি আছে, অহেতুক নিজের জীবন বাজি রাখছ। তারচেয়ে বরং…… থাক, তুমি যদি মৃত্যুর পেছনে ছুটো তাহলে আমার কী করার থাকতে পারে?’ বলে থামল ক্যাপ্টেন।

‘ড্রাইভিং সিটে উঠে বসো। সময় বয়ে যাচ্ছে, বিদায় বেলা এসে গেল।’

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি বাঁচার উপায় ভাবছে।

‘স্বেচ্ছায় না উঠলেও অনিচ্ছায় উঠতে হবে, উঠতে না চাইলেও শেষ সময়ে কিন্তু আদর করতে ছাড়ব না’, যেন হুমকি দিল ক্যাপ্টেন।

একবার ভাবল, বলে দেবে মেয়েটির কথা। পরক্ষণে ভাবলাম তাহলে মেয়েটিকে বাকি জীবন মানুষরূপী এ পশুর নির্যাতন সইতে হবে, হয়তো আর কোনো দিন বাবা-মা, ভাই-বোনদের মুখ দেখাতে পারবে না। মেয়েটি তাকে বিশ্বাস করেছে। সে বিশ্বাসঘাতক হতে পারবে না।

ক্যাপ্টেনের হুমকিপূর্ণ কথাগুলো তার কানে না পৌঁছলেও তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আল্লাহর নাম নিয়ে জিপের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল।

ক্যাপ্টেন তাকে সিটের বাঁধার জন্য এগোল। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বলল, ‘বসো, আপনার কষ্ট করার দরকার নেই, আমিই বদমাইশটাকে বাঁধছি। আপনি পিছিয়ে দাঁড়ান।’ গলায় অনুরোধ ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠে।

ঝট করে ছেলেটি তাকাল সেদিকে। দেখল, একটু দূরে দাঁড়ানো কয়েকজনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে একজন। রাতে চত্বরে জ্বালানো লাইটের হালকা আলোতেও লোকটিকে চিনতে কষ্ট হলো না। এ লোকটিই তাকে প্রথম দিন চাবুক মেরে ছিল।

‘আপনার এর সঙ্গে পরিচয় আছে?’ লোকটিকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

কোনো জবাব দিল না ছেলেটি। ক্যাপ্টেনকে তার অসহ্য লাগছে।

‘এ হচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজ সি কুইন ওয়ানের ফাস্ট ইঞ্জিনিয়ার।’ পরিচয় করিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। চুপ করে থাকল ছেলেটি।

লোকটি এমনভাবে ছেলেটির কাছে এসে দাঁড়াল যে ক্যাপ্টেন পিছিয়ে যেতে একরকম বাধ্য হলো।

 

গাড়ির বাঁ দিকে একটু দূরে তিনজন গার্ড আছে। জিপের ড্রাইভিং সিঠ ডান দিকে। লোকটা জিপের পেছন থেকে মোটা রশির বান্ডিলটা নিয়ে সিটের সঙ্গে ছেলেটিকে পেঁচিয়ে বাঁধতে শুরু করল। একবার পেছনে ঘুরে দেখল, হাত কয়েক দূরে তাদের দিকে চেয়ে আছে ক্যাপ্টেন। তার পেছনে আছে দুজন গার্ড। একটু দূরে আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। একবার ছেলেটির খুব কাছে সরে এলো ইঞ্জিনিয়ার। বুঝল এভাবে নিরাপদ নয়। পেছনে গিট দেয়ার জন্য জিপের পেছনে চড়ে ছেলেটির সিটের পেছনে বসল। তার ধীরে ধীরে গিট দিতে শুরু করল।

‘শান্ত থাক’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দেখল শান্তই আছে সে।

‘আমার কমেন্ট বুঝতে পারছ?’ জিজ্ঞেস করে তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘পারছি।’ দুজনই ইংরেজিতে অতি নীচুস্বরে কথা বলছে। যেন দুহাত দূরের কেউ শুনতে না পায়।

ছেলেটি বুঝতে পারছে না লোকটি তাকে কী বোঝাতে চায়।

‘যদি কোনোভাবে বাঁচতে পার, তবে পূর্ব দিকে সমুদ্রের ধারের বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িতে এসো, আমি অপেক্ষা করব’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ঠিক আছে’ বলে সায় দিল ছেলেটি। আর কিছু বলল না লোকটি। কারণ পাশেই আছে ক্যাপ্টেন। ধরা পড়তে পারে।

তাহলে দুজনকেই করুণ পরিণতির শিকার হতে হবে। গিট দেয়া শেষ হলে গাড়ি থেকে নেমে গেল ইঞ্জিনিয়ার।

ক্যাপ্টেন এগিয়ে এসে প্রথমে ছেলেটিকে বাঁধা ঠিক হয়েছে কিনা তা দেখল। তারপর ছেলেটিকে সার্চ করে তার কোমরে গোঁজা কাঁচির অংশটা পেল। দূর থেকে ভেসে আসা লাইটের আলোয় ছেলেটি সিটে বসে যতদূর নাগাল পেতে পারে তার সবখানে সার্চ করে কিছুই পেল না।

‘চাবি লাগানো আছে, স্টার্ট দাও’ যেন নরম সুরে আদেশ করল ক্যাপ্টেন।

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি। বাক্য ব্যয় না করে ছেলেটির দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে চাবিতে নিজেই মোচড় দিল ক্যাপ্টেন। স্টার্ট নিল গাড়ি।

‘চেষ্টা করে দেখ তো তোমার সিটের নীচে হাত দিতে পারো কিনা’, হেসে বলল ক্যাপ্টেন। তাকে এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যে ডানে, বাঁয়ে, সামনে কোনো দিকেই হেলতে পারল না। তার পেট থেকে বুক পর্যন্ত রশি দিয়ে পেঁচানো কোনোভাবেই তার হাত সিটের নীচে পৌঁছতে পারল না। পকেট থেকে একটা ইলেকট্রনিক্সের ঘড়ি বের করে ছেলেটির ডান হাতে পরিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। তারপর কোনো কথা না বলে একটা ক্ষুদে বোতামে টিপে মুখে দিকে তাকাল।

‘আমি তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না, তার আগেই বিদায় নিতে চাই। সময় মানব জীবনের যে কত অমূল্য সম্পদ, তা আজ বুঝতে পারবে। আমি টাইম অ্যাডজাস্ট করেই উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে শুরু করবে। তাই আগেই গাড়িতে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে রাখ’, থামল ক্যাপ্টেন।

‘হয়তো তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল ছেলেটির দিকে। কিন্তু ছেলেটি হাত না বাড়ানোয় ফিরিয়ে নিল হাতখানা।

‘আমি জানি তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রাখবে, তবু মুখ খুলবে না। আমি নিশ্চিত তুমি বাঁচতে পারবে না, তাই জানিয়ে দিচ্ছি। এখন যে অপমান করলে এর জন্য না হলেও আমাকে চড় মারার প্রতিশোধ অবশ্যই নিতাম। তুমি সত্যি বুদ্ধিমান, থাক আর কথা না বাড়াই, এখন দেখ ঘড়িতে ক’টা বাজে। বোতাম টিপে দেখল সাড়ে ছয়টা বাজতে দুই মিনিট বাকি। এদিকে ক্যাপ্টেন নিজের ঘড়ি দেখে বসে পড়ল তার পাশে। তার সিটের নীচে রাখা টাইম বোমায় টাইম অ্যাডজাস্ট করতে লাগল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে ক্লাচ চেপে রেখে, পা এক্সিলেটরের ওপর আলতোভাবে রাখল। একটু পরই ঝট করে উঠল ক্যাপ্টেন। ততক্ষণে নড়ে উঠেছে ঝরঝরে পুরনো জিপ।

‘গুড লাক’ বলে চেঁচাল ক্যাপ্টেন। কিন্তু শুনল কিনা ক্যাপ্টেন তা বুঝতে পারল না। এর মধ্যে তার কাছ থেকে জিপ সরে গেছে। সবাই জিপটিকে পাহাড়ের ওধারে হারিয়ে যেতে দেখল। যখন এক্সিলেটরের চেপে ধরে ক্লাস ছাড়ছে ছেলেটি তখন একবার দূরে দাঁড়ানো ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল লোকটি।

সেকেন্ড গিয়ার দিয়ে ফেলেছে ছেলেটি। এর মধ্যে বুঝে ফেলেছে গাড়ির বডিটা ঝরঝরে হলেও এর ইঞ্জিনের কন্ডিশন এখনো যথেষ্ট ভালো। ব্রেক ছাড়া গাড়ি কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয় তা জানা আছে তার, যদিও খুব কঠিন কাজ। লোকগুলোকে বেশ পেছনে ফেলে এসেছে সে। পথ এতই দুর্গম যে, থার্ড গিয়ার দেয়া যাচ্ছে না।

একটু পরই ফার্স্ট গিয়ারে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়। গতিবেগ দশ-বার কিলো। দ্রুত স্টিয়ারিং কাটাতে হচ্ছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। তাকে অবশ্যই জিততে হবে। সে জন্য সে ঝুঁকি নিতে রাজি আছে। কারণ ঝুঁকি নেয়া ছাড়া সাফল্য আসে না। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছে সে।

ঘড়িতে দেখল এর মধ্যে বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে। মাইল মিটারে দেখল এখন পর্যন্ত অর্ধ-কিলোমিটার এসেছে। ঘামতে শুরু করল ছেলেটি নিজের অজান্তেই। আরো দ্রুত এগোতে হবে। তাতে ঝুঁকি অনেক বাড়বে। সেকেন্ড গিয়ার থেকে এ প্রথম থার্ড গিয়ারে দিল ছেলেটি। একটু ডানে-বাঁয়ে তীক্ষè মোড় নিতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে একধারে পাহাড় অন্য ধারে গভীর খাদ পেরোতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ইঞ্চি পেরোতে হচ্ছে তাকে মৃত্যুর আশঙ্কা মাথায় নিয়ে।

দ্রুত ডানে-বাঁয়ে বাঁক নিতে হলে এক্সিলেটর থেকে পা সরিয়ে দ্রুত স্টিয়ারিং কাটছে। মাঝেমধ্যেই খাদের কিনারায় গিয়ে পড়ছে বা পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে যেন প্রতিবারে পার পেয়ে যাচ্ছে সে। নিজেও বুঝতে পারছে না। তবে ছেলেটি মাথা ঠান্ডা রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগোচ্ছে। চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষè হয়ে উঠেছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সজাগ হয়ে আছে। অত্যন্ত সতর্ক আছে সে। গতি বেশি থাকা অবস্থায় তীক্ষè মোড় নিলে মাঝেমধ্যেই চাকা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। হঠাৎ ডানে দ্রুত বাঁক ঘুরতে গিয়ে বাঁয়ে চাকা দুটি মাটি থেকে একটু ভেসে উঠল। অল্পের জন্য এ যাত্রায় খাদে পড়া থেকে বেঁচে গেল।

পরের দশ মিনিটে এবার প্রায় এক কিলো এগিয়েছে। কিন্তু এভাবে চালাতে গিয়ে কোনো সময় সমস্ত সম্ভাবনার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এভাবে মরতে চাচ্ছে না ছেলেটি। কিন্তু তারইবা কী করার আছে?

এখন একটাই উপায় আছে তা হলো হার মানা, ক্যাপ্টেনের আছে মুখ খোলা। তার ওপর যদিও প্রতিশোধ নেয়, তারপরও কমপক্ষে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। হঠাৎ খেয়াল হলো তার তো জলাতঙ্কও হতে পারে। ক্যাপ্টেনের কাছে মাফ চেয়ে নিলেই হয়তো সে তার এআরভির ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তো সে আরো কিছুদিন বাঁচতে পারবে। হঠাৎ যেন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে ব্যাকুল হলো ছেলেটি। গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে।

স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে লাগানো ওয়াকিটকিটা খুলে তা হাতে নিল। কী মনে করে কয়েক মুহূর্ত সে তাকিয়ে থাকল হাতে এন্টিনা যুক্ত যন্ত্রটির দিকে। তারপর ছুড়ে দিল দূরে। হারিয়ে গেল অন্ধকারে। এখনো ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার পনের মিনিট সময় আছে। এই সময়টা বড় বিরক্ত করত ওই যন্ত্রটি। সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। যদি না সত্য মিথ্যার সামনে মাথা নত না করে। সে মরবে, কিন্তু সত্যকে পদানত হতে দেবে না। আবার গাড়ি চালানোয় মন দিল। ঝুঁকি নিয়ে এবার বেশ জোরেই চালাচ্ছে গাড়ি।

থার্ড গিয়ারে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডে চলছে গাড়ি। উত্তেজনায় রাতের ঠান্ডা বাতাস টেরই পাচ্ছে না। আগে বুঝতে পারেনি ছেলেটি। যখন বুঝল তখন সময় শেষ হয়ে গেছে। ডানে পাহাড় তা সে আগেই দেখেছে। পাহাড়ের ওপাশে যে পথ হঠাৎ ডানে মোড় নিয়েছে তা বুঝতে পারেনি। মোড়ে রাস্তায় বাঁয়ে গভীর খাদ। গাড়িটা কীভাবে কন্ট্রোল করল নিজেও বলতে পারবে না। তবে প্রথমেই এক্সিলারেটর ছেড়ে দিয়ে ক্লাচ করেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপরই ক্লাচ ছেড়ে দিতেই মাটিতে চাকা ঘর্ষণের কর্কশ আওয়াজ পাওয়া গেল। এক ধাক্কায় পঁচিশ কিলো থেকে দশ কিলোতে নেমে এত গতি।

তারপর আবার এক্সিলারেটর হালকাভাবে চেপে ধরে দ্রুত ডানে স্টিয়ারিং কাটাল সে। গাড়ির সামনের ডান চাকা খাদে পড়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। এ যাত্রাও বেঁচে গেল। আবার থার্ড গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। এভাবে কোনো গাড়ি পঞ্চাশ কিলো চললেই সেই গাড়িকে কোনো গ্যারেজের সামনের শোপিস হিসেবে পাঠাতে হবে ভাবল ছেলেটি।

তাকে ওই জায়গায় পৌঁছতেই হবে, যেখানে দুজন লোক তার টাইম বোম নিষ্ক্রিয় করার জন্য অপেক্ষা করছে। তারপর যেভাবেই হোক সে ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে কিন্তু কীভাবে তা এখনো ঠিক করেনি, সময় নেই।

পরবর্তী আধা ঘণ্টায় চার কিলো এগোল। আর বাকি আছে আধা ঘণ্টা। এখনো পাঁচ কিলো পথ বাকি আছে। কিছুটা হলেও সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। এবারো থার্ড গিয়ারে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডি পাহাড় বেয়ে নীচে নামছে জিপ। বাঁয়ে পাহাড়ের সারি রেখে ছুটছে গাড়ি। ডানে খাদ। হেডলাইটের আলোয় বেশি সামনে দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টি তীক্ষè রেখে গতি বজায় রেখেছে। হঠাৎ ডানে তীক্ষè মোড় নিল পথ। বায়ে খাদ। এবার আর কোনো কথাই শুনল না। সোজা নেমে গেল খাদে। খাদটা বিপজ্জনকভাবে ঢালু হলে অনেক নীচে নেমে গেছে। সোজা নীচে নামতে লাগল গাড়ি। এই স্পিডে কোথাও ধাক্কা খেলে মুহূর্তে সব চুরমার হয়ে যাবে। মাথা ঠান্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল সে। প্রথমেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপর ক্লাচ, এক্সিলারেটর দুটি থেকেই পা সরিয়ে নিয়ে দুই হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরল। গতি কমে এসেছে। এখন ঘণ্টায় দশ কিলো স্পিডে নীচে নামছে। এ স্পিডে ধাক্কা খেলে তেমন ক্ষতি হবে না। হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা স্মরণ হতেই শিউরে উঠল ছেলেটি। তা হলো এ ঢাল থেকে যদি এমন কোনো খাদে পড়ে যার কোনো ঢাল নেই, তাহলে সোজা কয়েকশ’ ফুট নীচে…। আর ভাবতে চাইল না সে। এখন কী করা যায় তাই ভাবতে লাগল। একটাই উপায় আছে। ডানে কাটল গাড়ি। সোজ হলো বটে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গাড়িয়ে পড়তে লাগল গাড়িসহ। প্রথমে বামে কাত হয়ে পড়ে গেল। তারপর চারটা চাকাই ওপরে চলে গেল। এরপর ডানে কাত হলো। তারপরই সোজা হলো; কিন্তু স্থির হলো না। গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল। কত পাক খেয়েছে হিসাব করেনি। তার তেমন কোথাও লাগেনি। জিপে বর্ষাকালে প্লাস্টিকের হুড দেয়ার জন্য স্টিলের ফ্রেম করাই ছিল। সেগুলোর ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেল। তবে সেগুলো দুমড়ে-মুচড়ে একাকার। সে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা থাকায় ছিটকে পড়েনি।

এমন সময় একটি বড় টিলার গায়ে ধাক্কা লেগে থেমে গেল জিপ। তবে ডানে থেমেছে। ফলে সে নীচে আছে।

গাড়ির স্টার্ট অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছ। হেডলাইট নিভে গেছে। হয়তো ভেঙেও গেছে।

ঘড়িতে দেখল আর দশ মিনিট আছে বিস্ফোরণের। কী করবে বুঝতে পারছে না। বারবার ঢোক গিলছে। ঘামছে দরদর করে। আল্লাহর কাছে শুনাহ মাফ চাচ্ছে, সাহায্য প্রার্থনা করছে। নিজেকে শান্ত রাখার জন্য নিজের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাকে।

গড়িয়ে নীচের নামার সময় টাইম বোমটি কোথাও পড়ে যায়নি তো। কিন্তু তা তো সে নিশ্চিত হতে পারছে না। যদি গাড়িতে তারই ছিটের নীচে থেকে থাকে তাহলে……। আর ভাবতে চাচ্ছে না সে। জানে তারপর কী হবে। তার চিহ্নও হয়তো পাওয়া যাবে না। গাড়ির বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে যাবে নানা দিকে। তারপর বিজয়ীর হাসি হাসবে ক্যাপ্টেন।

পানিতে পড়ে মানুষ খড়কুুটোকেও ভেসে থাকার অবলম্বন মনে করে। ছেলেটিরও অবস্থা তাই হয়েছে। এখন একটাই উপায় আছে, দড়িটা যদি কোনোভাবে কাটা যায়। কিন্তু কী দিয়ে কাটবে? এপাশ-ওপাশ হাতড়াচ্ছে সে কিছু পাওয়ার আশায়। ঘড়িতে দেখল আর সাত মিনিট আছে। ব্যস্ত হয়ে উঠল সে। হঠাৎ দেখল উইন্ডশিল্ডের কাচ ভাঙা। কতগুলো টুকরো ফ্রেমের সঙ্গে এখনো আটকে আছে। ঝট করেই বুদ্ধিটা মাথায় এলো। শুয়েই কোনোমতে সামনে ঝুঁকল। গড়িয়ে নীচে পড়ার সময় বাঁধন একটু ঢিলে হয়েছিল বলেই হয়তো শেষ পর্যন্ত উইন্ডশিল্ডের ফ্রেমে হাত নিয়ে যেতে পারল। এক ঝটকায় ফ্রেমে আটকে থাকা কাচের একটা টুকরো ভেঙে নিল। ভাঙতে গিয়ে হাত কেটে গেল। টেরই পেল না সেটা। দ্রুত রশি কাটতে শুরু করল। ঘড়িতে দেখল পাঁচ মিনিট বাকি আছে। দ্রুত হাত চালাতে লাগল। এক সময় একটা রশি কেটে গেল। এত রশি এক এক করে কাটতে যাওয়া হবে বোকামি। পেঁচানো রশি খুলতে লাগল দ্রুত হাতে। ঘড়িতে দেখল আর দেড় মিনিট আছে। সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহর নাম নিচ্ছে। অবশেষে এক সময় মুক্ত হয়ে গেল। রক্তাক্ত হয়ে গেছে হাত দুইখানা। দড়িগুলোতেও রক্ত লেগেছে। সেদিকে খেয়াল নেই। আগে গাড়ি থেকে বের হয়ে সরে যেতে হবে।

এরপর ছেলেটি কীভাবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো জানে না। তারপর দুকানে আঙুল ঢুকিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে দিল দৌড়। পেছনের প্রচণ্ড শব্দে হোঁচট খেয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সে। কানের পর্দা ফেটে গেল কিনা বুঝতে পারছে না। তবে দ্রুত উঠে বসে পেছন ফিরে তাকাল।

যা দেখল তাতে শিউরে উঠল নিজের অজান্তেই। দেখল জিপের মধ্যে আগুন ধরে গেছে। সে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশমুখে উঠছে। এত দূর থেকেও আগুনের তাপে যেন চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। গাড়িতে থাকলে এতক্ষণে তার কী অবস্থা হতো ভাবতেই দ্বিতীয়বার শিউরে উঠল। এবারো মহান আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। সে যেন নতুন জীবন পেল।

এখানে অপেক্ষা না করাই নিরাপদ। যতদূর সম্ভব দ্রুত ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে হবে। একটু ভেবেই নীচে নামতে শুরু করল। এতকিছুর পর শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। বাম হাত অনেকটা কেটে গেছে। ডান হাত দিয়ে কাটা জায়গায় টিপে ধরেছে যাতে রক্ত না বের হয়। তবুও রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না দেখে পায়জামার ডান পায়ের নীচের একাংশ ছিঁড়ে কাটা জায়গাটা বেঁধে ফেলল। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। এই সামান্যর ওপর দিয়ে যে তার জানটা বেঁচে গেছে তাই ঢের। অনেকক্ষণ পর নীচে পৌঁছে গেল সে। পথিমধ্যে এবার সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়েছে।

যেখানে এসে পৌঁছেছে তা থেকে বেশ দূরে গ্রাম। বাড়িগুলোর ভেতর থেকে মিটিমিটি আলো আসছে। ডানে-বাঁয়ে দুই দিকেই সমুদ্র বেশ দূরে। পূর্ব ধারে আছে সেই ভদ্রলোকের বাড়ি, যে তার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু কেন? কোনো সন্তোষজনক উত্তর নিজেকে দিতে পারল না। তার ডানদিকে পূর্ব দিক। সতর্ক থেকে পা বাড়াল। চিন্তা করছে যে, যে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটছে হয়তো তার শব্দ এ দ্বীপের সবাই শুনতে পেয়েছে। ক্যাপ্টেন হয়তো এ ক্ষণে বিজয়ীর হাসি হাসছে। নাকি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঘটনাস্থল দেখতে বেরিয়ে আসছে? বিস্ফোরণ কোথায় হয়েছে তা হয়তো হেডকোয়ার্টার্স থেকেই দেখা গেছে। রাতে না গিয়ে হয়তো দিনেই দেখতে যাবে। তবে এতটুকু ধরে নেয়া যায়, এ অন্ধকার রাতে গার্ডরা তাকে দেখলে ভূত ভাবতে পারে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সে পূর্ব দিকে পৌঁছে গেল। পাশেই গ্রাম। বাড়িগুলোর বাইরে তেমন লাইট জ্বালা নেই। পথঘাট একরকম অন্ধকারেই ডুবে আছে। তবে বাড়ির ভেতরে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্রের ধারের বাড়িগুলোর নম্বর দেখছে। বেশি খুঁজতে হলো না, একটু পরেই পেয়ে গেল বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িটা। ছিমছাম সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো কাঠের বাড়িটা। বাড়ির সামনে বাগান। তাতে নানা ধরনের ফুলের গাছ, অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বড় করা হয়েছে তার ছাপ স্পষ্ট। আবার তাকালো বাড়িটার দিকে। বাড়িটার কোনো নাম নেই। এ বাড়িই তো? নম্বর তো ঠিকই আছে।

আল্লাহর নাম নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠক ঠক করে দুবার শব্দ করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল দরজা। যেন জানত যে সে এখনই আসবে। ঘরের ভেতরের আলো তার ওপর এসে পড়ল। চোখে হঠাৎ আলো পড়ায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দেখল তার সামনে ইঞ্জিনিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। তাকেই অবাক হয়ে দেখছে। আপনি স্বয়ং এসেছেন! আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আসুন আসুন, ভেতরে আসুন, কেউ দেখে ফেলবে। সরে ছেলেটিকে ঢোকার জায়গা করে দিল। ঘরের ভেতরে ঢুকল ছেলেটি। বসতে বলায় একটা চেয়ারে বসে পড়ল সে। সুন্দর সাজানো ঘরটি। লোকটির রুচির তারিফ করল মনে মনে।

‘পথে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’ ছেলেটির পাশে বসতে বসতে বলল ইঞ্জিনিয়ার। তাকাল ছেলেটির দিকে। প্রথমেই চোখ পড়ল তার বুকের ক্ষতগুলোর দিকে। এখনো শুকায়নি।

তারপর হতের দিকে তাকিয়ে ‘আপনি বসুন’ আমি আসছি। বলে চলে গেল সে। ফিরে এলো স্যাভলন, তুলা ও ব্যান্ডেজ নিয়ে। বসে গেল ডাক্তারের ভূমিকায়। হাতে প্যাঁচানো রক্তাক্ত কাপড়টা খুলেইÑ ‘ইস, কতদূর কেটেছে!’ বলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। এই প্রথম ছেলেটি তার হাতের অবস্থা দেখল। নাহ লোকটি বাড়িয়ে বলেনি।

‘তারপর, আপনি কীভাবে পালালেন, তারপর কী হলো, আবার ধরা পড়ার সময় মেয়েটি ছিল না কেন, সব খুলে বলুন। আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন।’ স্যাভলন, তুলা দিয়ে কেটে যাওয়া জায়গায় পরিষ্কার করতে করতে বলল লোকটি।

সংক্ষেপে সব খুলে বলল ছেলেটি। এমনকি, কী মনে করে জেলের কথাটাও বলল। কোনো কিছুই বলেনি লোকটি। শুধু শুনেছে। ততক্ষণে ব্যান্ডেজ করা শেষ হয়েছে। ব্যথা কিছুটা কমে গেছে।

‘পরে আরো কথা হবে, এবার গোসল করে নিন’, চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল লোকটি।

‘গোসল করলে তো ভালোই হয়।’ তার সারা গায়ে ধুলাবালি লেগে থাকায় তার অস্বস্তি লাগছে। বাথরুমে এসে ঢুকল ছেলেটি। দেখল নতুন এক সেট শার্ট-প্যান্ট। বুঝতে পারল তারই জন্য রাখা হয়েছে এগুলো। এ দ্বীপে পায়জামা-পাঞ্জাবি পাওয়া যাওয়ার কথা না। তাছাড়া তার পরিধেয় বস্ত্র বলতে একমাত্র পায়জামাটি। তাও তাকে ছিঁড়তে হয়েছে আজ। অনেক দিন ধরে পরে থাকায় এমন অবস্থা হয়েছে যে যখন-তখন ছিঁড়ে যেতে পারে। গোসল করে শার্ট-প্যান্ট পরে বের হলো সে।

‘ভালোই মানিয়েছে, আজ ফেরার পথে দুই সেট কিনে এনেছি।’ তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বসে থাকা ইঞ্জিনিয়ার বলে উঠল।

এরপর এশার নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। তারপর খেতে বসল দুজনে। এক সময় খাওয়ার পর্ব সমাপ্ত হলো।

‘আমি আর বিশ্রাম করব না, মেয়েটি হয়তো ঠান্ডায় কাঁপছে, আমি গিয়ে তাকে এ শার্টটা পরতে দেব’, বলে নিজের শার্টটা দেখাল। ‘আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি, আর…’ একটু দ্বিধা করে বলেই ফেলল। ‘আমাদের যদি কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দিতেন, তবে বেঁচে যাই। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতে গেল ছেলেটি।

তাকে আবার বসিয়ে দিল ইঞ্জিনিয়ার, আরে বসুন না, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, আমি আপনাকে দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে আসব।’ আপনি দ্বীপে পৌঁছে দিতে যাবেন, এ রাতে?’ বিস্ময়ের সঙ্গে বলল ছেলেটি।

‘কেন আপনি যদি রাতে সুদূর আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাতে পারেন, তবে কি আমি এই রাতে আপনাকে পাশের দ্বীপে পৌঁছে দিতে পারব না?’ হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এত রাতে নৌকা কোথায় পাবেন?’

‘আমার নিজের সৈকতে ডাঙ্গায় তুলে রাখা আছে। এখন কাজের কথায় আসি, আর নৌকায় যেতে আপনার টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা শুনব। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন কথা গুছিয়ে নিয়ে শুরু করল ইঞ্জিনিয়ার। আপাতত কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। যতদিন কোনো ব্যবস্থা করতে না পারি, ততদিন আপনাদের কোনো দ্বীপে লুকিয়ে থাকতে হবে। অবশ্য আপনারা যে দ্বীপে আছেন, সেটা এ দ্বীপের কাছে হওয়ায় সেখানে থাকা চলবে না। বলে দম নিল ইঞ্জিনিয়ার।

তাহলে কোথায় থাকব?’ ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বলছি, বলছি। এ দ্বীপের দক্ষিণে দূরে আরো একটি দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপটা এ মূল দ্বীপ থেকে দেখতে পাওয়া যায় না। তাছাড়া সহজে ওদিকে কেউ যায় না। ওই দ্বীপটায় ছোট ছোট টিলা আছে, গাছপালা আছে, আর আছে একটা কেবিন; যাতে আপনারা থাকতে পারবেন। এছাড়া এ অঞ্চলে আপনাদের লুকিয়ে থাকার মতো আর ভালো জায়গা নেই। কাল রাতে আমি আপনাদের ওই দ্বীপে নিয়ে আসব। কোনো চিন্তা নেই, ওখানে আপনারা বাড়ির মতোই থাকতে পারবেন।’

‘এত ঝামেলায় না গিয়ে আমাদের একটা ছোট নৌকা জোগাড় করে দিলে হয় না!’ কথাটা শেষ করতে পারল না ছেলেটি।

‘উহু! কখনোই না, কোনো দেশের উপকূল এখান থেকে দেড় হাজার কিলোমিটারের কম নয়। জাহাজের রুটগুলোও অনেক দূরে। তাছাড়া আপনারা যে অভিজ্ঞ নাবিক নন, তা হলফ করে বলতে পারি। নৌকায় সমুদ্রে খুব জোর দুই দিনের বেশি টিকবেন না। নিত্যন্ত ভাগ্যক্রমে এ দ্বীপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগেই আপনাদের নৌকাটি উল্টে গিয়েছিল। বলে এক মুহূর্ত থামল। যদিও সম্মুখে করা ঠিক না তারপরও আপনার সাহসের প্রশংসা করতেই হচ্ছে। অবশ্য আপনার সাহসের পরিচয় জাহাজেই পেয়েছিলাম।’

‘তার মানে?’ নিজের অজান্তে গলায় স্বর উঁচু হলো ছেলেটির। তার মানে আপনি জাহাজে আমাকে ওঠানোর জন্য দড়ি নামিয়ে দিয়েছিলেন, দরজার আড়াল থেকে আপনিই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।’

‘জি, আমিই’, মাথা নীচু করে জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার। যেন লজ্জা পেয়েছে।

‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। যেন নিজের প্রতি অভিমান করেছে সে।

ঘটনাটা খুলে বলুন তো, আমি তারপর থেকে এ ব্যাপারে উদগ্রীব ছিলাম।’

‘সেই দ্বীপে যেখান থেকে মেয়েটিকে ধরে আনা হয়, সেই দ্বীপের কথা বলছি, মেয়েটিকে নিয়ে আসছে এমন সময় আমি আপনাকে একটা পাহাড়ের আড়াল থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে সমুদ্রে পড়ে ডুবে যেতে দেখি, তখন আমি জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তারপর যখন একটা লোক আপনাকে দেখে ক্যাপ্টেনকে ডাকে তখন আমিও ক্যাপ্টেনের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এরপর বিকেলে একবার দেখতে গিয়েছিলাম, একটা মানুষের একটি কাঠকে আঁকড়ে ধরে এতক্ষণ জাহাজের সঙ্গে লেগে থাকতে পারাটা কঠিন ব্যাপার। বলতে পারেন, তখনই আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। তাছাড়া আমি জানতাম, আপনারা দুজনেই ক্যাপ্টেনের নির্যাতনের শিকার, তাই আমি তখনই ঠিক করি সন্ধ্যার পর পর্যন্ত যদি টিকে থাকতে পারেন, তবে আপনাকে তোলার ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওদিকে জাহাজের ইঞ্জিনের একটু সমস্যা দেখা দেয়ায় আপনার কাছে আসতে দেরি হয়ে যায়। আপনি রশি দিয়ে ওপরে উঠে আসার পর আপনাকে ওই কথাগুলো জানানোর জন্য লুকিয়ে আপনার ওপর নজর রেখেছিলাম’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এরপর জাহাজ থেকে নেমে জিপে করে হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করার জন্য যাওয়ার পথে আপনার ওপর ওদের অত্যাচার দেখতে পাই। আমি ওদের সঙ্গে কাজ করলেও মাঝে মধ্যে অন্যের জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে ছাড়ি না। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে আপনাদের জন্য আমি এগিয়ে যাব। এরপর হেডকোয়ার্টারে যখন আপনাকে এগোতে বলছিল, আমি তখনই বুঝেছিলাম যে ওরা আপনাকে প্রচণ্ড কষ্ট দেবে। তাই এগিয়ে আপনাকে আমার আওতায় নেই এবং কৌশলে আমার বাড়ির নম্বর আপনাকে জানাই, যদি আপনি বুঝতে পারেন। আর পরিষ্কার করে বলাটা সে সময় আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইঙ্গিত দেয়ারও সুযোগ ছিল না। আমি চাইছিলাম, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে যেন আমার কাছে চলে আসেন। যা-ই হোক, অবশেষে আপনি এসেছেন, আর সেদিন আপনাকে যে চাবুক কষেছিলাম, তার কারণ ছিল ওরা যাতে সন্দেহ করতে না পারে। আমি আস্তেই চাবুক কষেছিলাম; কিন্তু আপনি অত্যন্ত দুর্বল থাকায় দ্বিতীয় চাবুকে জ্ঞান হারান। অবশ্য তাতে আপনার ভালোই হয়েছিল। কিছুক্ষণের জন্য আপনি সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, থামল লোকটি।

‘এতক্ষণ ধরে লোকটির কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিল ছেলেটি।

‘আসলে খুব টেনশন থাকায়, আপনার ওই ইঙ্গিতটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পাইনি’, লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল ছেলেটি।

‘কমপক্ষে চাবুক মারার দিন আপনার গলা চিনতে পারা উচিত ছিল।

‘আর আজকে যদিও আপনার এখন এখানে থাকার কথা ছিল না, তারপরও ক্ষীণ একটু আশা বুকে ধরে, ঝুঁকি নিয়ে আপনাকে আজকে পরিষ্কার করেই বলেছি, তা না হলে আজ এ সময় আপনি এখানে থাকতেন না।’

‘খুবই ভালো করেছেন, তা না হলে অবশ্য জেলের বাড়িতে চলে যেতাম, সত্যিই আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম।’

‘আমি তো ভেবেছি আমি আপনার শিষ্য হব। এ কয়দিন আপনি যা দেখালেন না!’ হেসে বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘আরে কী যে বলেন!’ লজ্জা পেয়েছে ছেলেটি। ঘড়ির দিকে তাকাল।

‘ইয়া আল্লাহ, প্রায় ভোর হয়ে গেছে, এখনই রওনা হওয়া দরকার।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাই তুলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে রাত যে কোন দিক দিয়ে শেষ হলো টেরই পেলাম না, হ্যাঁ এবার ওঠা যাক’, বলেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল লোকটি।

‘আপনি একটু বসুন, আমি আসছি’, বলে ভেতরে চলে গেল লোকটি। একটু পরেই একটা প্যাকেট হাতে ফিরে এলো ‘চলুন, বেরিয়ে পড়ি।’

নৌকায় সময় কাটানোর ছলে টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটা বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে। নৌকা তীরে পৌঁছে গেল। তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল দিয়েছে লোকটি। প্যান্টটা একটু তুলে হাঁটা পানিতে নামল ছেলেটি। লোকটি তার আগেই তার হাতে প্যাকেটটা দিয়েছে। এই প্যাকেটটা মেয়েটার জন্য, এর মধ্যে সে তার কাপড় পাবে, আর আমি সন্ধ্যার পরপরই আসব আপনার এখানে। আশপাশেই থাকবেন, যেন ডাকলেই শুনতে পান, গুড লাক’, চলে গেল লোকটি। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি দ্বীপের দিকে। সূর্য ওঠার আর বেশি বাকি নেই। ফজরের নামাজ আদায় করে পা বাড়াল সে।

সকালের সূর্যের আলো চোখে পড়েছে। ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। প্রথমেই চোখ কচল চারদিকে তাকাল। ছেলেটিকে কোথাও গেল না। হয়তো আশপাশেই আছে। দিনের বেলা পাথরের পেছনে আরো জড়সড় হয়ে বসল সে। ক্ষুধা লেগেছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটি পৌঁছে যাবে। অনেকক্ষণ কেটে গেল। সূর্য অনেক ওপরে উঠে গেছে। এখনো ছেলেটি ফিরছে না দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল মেয়েটি। কোথায় গেছে সে? এখন এ অবস্থায় সে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাল রাত যেখানে অগ্নিকুণ্ডটা জ্বালানো হয়েছিল, সেখানে এখন ছাই পড়ে আছে। বেশি দূরে নয়। গত রাতে ছেলেটি আগুন জ্বালিয়ে তার বামে বসেছিল। তার স্পষ্ট স্মরণ আছে। তারপর কখন যে চোখের পাতা বুজে এসছিল তা সে বলতে পারবে না। কিছু একটা জিনিস চোখে ধরা পড়েও পড়ছে না। ছাইগুলোর এপাশে মাটিতে কিসের যেন আঁকি বুকি দেখা যাচ্ছে। কোনো ধরনের ম্যাসেজ বুঝতে পারছে না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। প্রায় মাথার ওপর সূর্য উঠে এসছে। নাহ, দেখতেই হচ্ছে। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। জড়সড় হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোলো সামনে।

‘আপনার কাপড়ের সন্ধানে আমি মূল দ্বীপে যাচ্ছি। আপনার চিন্তা করার কোনো কারণ নেই, আমি সাবধানে থাকব ইনশাআল্লাহ। আর ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই, আমি ধরা পড়লেও তাদের কাছে আপনার ব্যাপারে মুখ খুলব না। আমি তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব, ভাল থাকুন, খোদা হাফেজ।’ মাটিতে সুন্দর করে বাংলায় লেখাগুলো পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়ল মেয়েটির।

তার জন্য ছেলেটি আবার বাঘের গুহায় পা দিতে গেল! হয়তো এ মুহূর্তে সবাই পুরস্কারের আশায় তাদের খুঁজছে, ছেলেটির ধরা পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এতক্ষণে কি সে ধরা পড়ে গেছে? হয়তো পড়েনি। কী জানি? সে এত দূর থেকে কীভাবে জানবে? আচ্ছা, এ দ্বীপে কি তাকে খুঁজতে আসবে? আসতেও পারে। এ অবস্থায় কোনো লোকের সামনে পড়লে তার কী হবে ভেবে শিউরে উঠল সে। অথচ ছেলেটি…। তাড়াতাড়ি কোথাও লুকিয়ে পড়ার তাগিদ অনুভব করছে সে। কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। কী খাবে চারদিকে নারকেল বা কোনো ফলের গাছ নেই। এ অবস্থায় দ্বীপে খুঁজে বেড়াতে পারবে না। অগত্য ছেলেটি ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। আশপাশে লুকানোর ভালো জায়গা নেই। একটু আশপাশ ঘুরে দেখবে কি? সামনে আড়াআড়িভাবে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আশপাশটা খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। একখানে বসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটি ফিরে এলে আগের জায়গায় যাবে। তাকে ওখানে না পেলে, এপাশ-ওপাশ খুঁজেও না পেয়ে যদি তাকে ধরে নিয়ে গেছে ভেবে আবার মূল দ্বীপে ফিরে যাব! এছাড়া এখন পর্যন্ত লুকানোর মতো ভালো জায়গা পায়নি। ভাবতে ভাবতে আবার আগের জায়গাটায় ফিরে এলো।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এখনো ছেলেটির দেখা নেই। হয়তো রাতে ফিরবে। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল মেয়েটি। সূর্যের রক্তিম আভা পূর্বাকাশে ফুটে উঠেছে। চারদিকে দিনের আলো ফুটে উঠেছে ধীরে ধীরে। তবে এখানে অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্য দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

প্যাকেটটা খুব ভারী। শুধু কাপড়ের ওজন এত হতে পারে না। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ছেলেটি। তাছাড়া বাঁ হাতে ব্যথা পাচ্ছে। সামনের বাঁকটা ঘুরলেই পৌঁছে যাবে। মেয়েটি আছে তো! নাকি ধরে নিয়ে গেছে এর মধ্যে?

মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে আনল ছেলেটি। পাঁচ হাত সামনেও দেখছে না। ঢুকে পড়েছে খোলা জায়গায়।

‘আপনি কোথায়? আমি আপনার জন্য কাপড় নিয়ে এসেছি’, চেঁচিয়ে বলল সে।

কিন্তু কোনো জবাব এলো না। আর একবার বলল। এবারো জবাব এলো না। এবার আরো জোরে চেঁচিয়ে বলল। জবাব নেই। তবে কি…?

মুখ তুলে তাকাল। দেখল দূরে পাথরের আড়ালে মেয়েটি আছে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে। বুঝে নিল সে। হয়তো মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি ‘পেছন দিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে এলো।’

একটু দূরে আছে মেয়েটি। ‘এই যে, শুনছেন, আমি…’ বলে শেষ হলো না। মাথার ওপর দিয়ে কর্কশ আওয়াজ করতে করতে একটা সামুদ্রিক পাখি উড়ে গেল। আবার বলতে যাবে কিন্তু এবারো বলা হয় না।

‘কে আপনি?’ পাখিটার কর্কশ আওয়াজে চোখ খুলেই একটু দূরে, ওপাশে ঘুরে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল মেয়েটি। বলেই চিনতে পারল।

‘আমি ফিরে এসেছি’, একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল ছেলেটি।

‘দুঃখিত। এখন চিনতে পেরেছি’, অপ্রস্তুত হয়ে বলল ছেলেটি।

‘এই বাক্সে আপনার কাপড় আছে, নতুন। পরে নিন’, বলে প্যাকেটটা মাটিতে রেখে ছাইগুলোর পাশে বসে পড়ল।

তাকিয়ে থাকল পূর্ব দিকের রক্তিম আকাশের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর তার থেকে একটু দূরে বসে পড়ল মেয়েটি।

‘কীভাবে যে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, ভেবে পাচ্ছি না’, আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

‘আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়োজন নেই, একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এসবের ব্যবস্থা করেছেন।’

‘একটু খুলে বলুন তো।’

ইঞ্জিনিয়ার সম্পর্কে সংক্ষেপে সব খুলে বলল। তবে তার ধরা পড়ার কথা, টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা কৌশলে এড়িয়ে গেল। আজ সন্ধ্যার পর সে যে এসে তাদের অন্য দ্বীপে নিয়ে যাবে সে কথাও বলল।

সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল মেয়েটি। উঠতে গেল ছেলেটি।

‘বসুন, বসুন, বলতে ভুলে গেছি। প্যাকেটের মধ্যে একটা করে শার্ট-প্যান্ট, এক জোড়া কমন স্যান্ডেল, সেই সঙ্গে খাবারো আছে। আমি খাবার আনতে যাচ্ছি’, বলে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। একটু পরই একটা বড় প্লাস্টিকের টিফিন বাটি নিয়ে এসে বসল।

বেশ তফাতে বসে নীরবে খেয়ে চলেছে দুজনে। বেশ বেলা হয়েছে। ‘এই খাবারে দুপুরও চলবে।’ নীরবতা ভাঙল মেয়েটি। তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘আরে আপনার হাতে কী হয়েছে, ব্যান্ডেজ করা কেন?’ একবারে দুটো প্রশ্ন করল সে।

এতক্ষণ হাতটা লুকিয়ে রেখেছিল, কখন যে প্রকাশ্যে এসে গেছে তা খেয়াল করেনি ছেলেটি।

‘একটু কেটে গেছে, ও এমন কিছু না।’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-জাকির আহমেদ

জাকির আহমদ

১৭ এপ্রিল, ২০২০ , ১২:০৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৭)

‘হয়তো পারব। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ায় ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে’, জবাব দিল মেয়েটি।

কোনো কিছু না বলে রাইফেলে ভর দিয়ে উঠতে গেল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুক।

‘আপনি আমাদের ধরে উঠুন।’

‘যখন প্রয়োজন হবে, আমি নিজেই বলব’, ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে সে।

নৌকাটা কাছে আনার জন্য চলে গেল আগন্তুক। রাইফেলে ভর দিয়ে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছে ছেলেটি। তার একটু দূর দিয়ে হাঁটছে মেয়েটি।

নৌকা এগিয়ে চলেছে সমুদ্রে ঢেউয়ে দুলতে দুলতে। নৌকার পেছনে বসে দাঁড় বাইছে আগন্তুক। স্বল্প পরিসরে পাটাতনে দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে দুজনে। নৌকার গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে ছেলেটি। মেয়েটি সোজা হয়ে বসে আছে। ‘আপনি আমাদের দেখতে পেলেন কীভাবে?’ হঠাৎ করেই আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। ডানদিক থেকে মুখ ফেরাল আগন্তুক। ‘মৎস্য শিকার আমার পেশা। সারাদিন সমুদ্রে থাকতে হয়, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। আজ ওদিক থেকে ফিরছিলাম’, বলে যেদিকে তারা যাচ্ছে তার উল্টো দিক দেখাল লোকটি। ‘সন্ধ্যার আবছা আলোয় হঠাৎ আপনাদের অস্পষ্ট দেখতে পেলাম। সাধারণত ওই জায়গার আশপাশে কেউ যায় না।’

‘কেন কেউ যায় না?’ লোকটির কথার মধ্যে প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘কোনো কারণ নেই, এমনিতেই কেউ ওদিকে সহজে যায় না। ওই জায়গাটা সব সময় নির্জন দেখি, তাই দূর থেকে মানুষ দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আমি আবার বরাবরই কৌতূহলী। সৈকতে নেমে পড়লাম, তারপরই তো প্রথম ওনার সঙ্গে দেখা’, বলে ছেলেটির দিকে ইঙ্গিত করল লোকটি।

পাশে একটা ঝুড়িতে মাছ চোখে পড়ল মেয়েটির। ঝুড়ির অর্ধেকটা কয়েক ধরনের সামুদ্রিক মাছে ভর্তি। ছেলেটির মতো সেও হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। একসময় পথ ফুরিয়ে গেল। নৌকা থেকে সবাই নামল। লোকটি নৌকাটিকে ডাঙায় তুলে রাখল, যাতে সমুদ্রের ঢেউয়ে পানিতে নৌকাটি ভেসে না যায়। আশপাশে আরো দুটো নৌকা আছে।

মাথায় মাছের ঝুড়িটি নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল লোকটি। পেছনে দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি লোকটির পেছন পেছন চলছে দুজনে। ছেলেটি মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।

‘আমাদের আবার ধরিয়ে দেবে না তো?’ বাংলায় জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আল্লাহই ভালো জানেন, দেখা যাক কী হয়।’ দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি। আর কিছু না বলে হাঁটায় মন দিল। নৌকায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিল বলে এখন হাঁটতে পারছে। তা না হলে হয়তো পারত না। মাঝে মধ্যে পেছনে ঘুরে তাদের দেখছে লোকটি। আর কতদূরে যেতে হবে ভাবছে ছেলেটি। রাইফেলে ভর দিয়ে আর এগোতে পারছে না। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল সামনে একটা বাড়ির ভেতর থেকে আলো আসছে। বাড়িটার খুব কাছাকাছি আর কোনো বাড়ি চোখে পড়ল না। যেগুলো আছে সেগুলো একটু তফাতে।

কী মনে হতেই যতদূর সম্ভব দ্রুত এগিয়ে লোকটির পাশে গিয়ে বলল মেয়েটি, ‘আমাদের কথা আপনার বাড়ির বাইরে যাতে না যায়, সে জন্য ব্যবস্থা করবেন।’

‘তা আমাকে বলতে হবে না’, হেসে বলল লোকটি।

প্রথমে দুজনকে একটা ঘরে এনে বসাল। এরপর তাদের হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করে দিল।

হাত-মুখ ধুয়ে উভয়ে কেবল ঘরে গিয়ে বসেছে, এমনি সময় লোকটি একটা ছোট টিনের কৌটা হাতে ঘরে ঢুকল।

‘আপনি নাকি পায়ে আঘাত পেয়েছেন? খুব ব্যথা হচ্ছে, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে তার কথায় সায় দিল ছেলেটি।

‘এই মালিশটা লাগান, আধা ঘণ্টার মধ্যে ব্যথা একদম কমে যাবে, পা ফেলে হাঁটতে পারবেন। যাওয়ার সময় এটি হাতে নিয়ে যাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ছোট ছেলে খাবার নিয়ে আসবে, খেয়ে নেবেন। আমি সারাদিন সমুদ্রে ছিলাম, তাই গোসল করব।’ ‘গুডলাক’ বলে লোকটি চলে গেল।

ততক্ষণে কৌটাটির ঢাকনা খুলে ফেলেছে ছেলেটি। মালিশ লাগাতে শুরু করল।

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ছোট ছেলে গমের আটার গরম গরম রুটি, সেই সঙ্গে গরম আলু ভাজি নিয়ে এলো।

খাবার দেখে দুজনে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকায় কেউই বেশি খেতে পারল না। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকল লোকটি।

‘কি, ভালোভাবে খেয়েছেন তো?’

মাথা কাত করে জবাব দিল দুজনেই।

‘আমি আপনাদের পালানোর ব্যবস্থা করছি, আপনারা ততক্ষণে বিশ্রাম নিন’, বলে চলে গেল লোকটি। মেয়েটি চুপচাপ বিশ্রাম নিতে লাগল। আর ছেলেটি তার পায়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে গেল। তারপর এশার নামাজ পড়ে বিশ্রাম নিতে বসল। এদিকে সময় বয়ে চলল তার আপন গতিতে।

অনেকক্ষণ পর ঘরে ঢুকল লোকটি। তার আগমনের শব্দ পেয়ে দুজনেই মুখ তুলে তাকাল। মেয়েটির তন্দ্রাভাব এসেছিল। লোকটির কথা শুনে তা কেটে গেল।

‘আপনাদের পালানোর জন্য আপাতত নৌকা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। তাই নৌকাই জোগাড় করেছি’, বলে একমুহূর্ত থামল লোকটি।

‘তাই যথেষ্ট’, বলল ছেলেটি।

‘কিন্তু একটু সমস্যা আছে।’

‘কী সমস্যা?’ এবার মেয়েটি জানতে চাইল।

‘আমি বা আর কেউ তো আপনাদের সঙ্গে যাবে না, নৌকা চালাবে কে?’ কাঁচুমাচু করে বলল লোকটি। যেন সে যাবে না বলে লজ্জিত হয়েছে।

‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম আমার। আমি শখ করে পদ্মায় নৌকা চালিয়েছি। হয়তো সমুদ্রে নৌকা চালাতে খুব বেগ পেতে হবে না’, বলল ছেলেটি।

আপনি নৌকা চালাতে পারেন? মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বলল ছেলেটি।

‘না, কখনো চালাইনি, তবে অনেকবার নৌকায় চড়েছি।’

‘তাহলে আর দেরি কেন, উঠে পড়ি। কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ ছেড়ে অনেক দূরে যাওয়া উচিত’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। এর মধ্যে পায়ের ব্যথাটাও প্রায় উধাও হয়ে গেছে। মালিশের কৌটাটা রেখেই দুপায়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে বের হয়ে এলো। কাঁধে রাইফেল, গায়ে চাদরটি জড়িয়ে নিচ্ছে। বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল তারা।

‘আমার অতিরিক্ত কাপড় থাকলে আপনাকে দিতাম।’ বলেই মুখ নীচু করে ফেলল লোকটি। ছেলেটির গায়ে তেমন কাপড় নেই, তা আগেই দেখেছে লোকটি।

‘না, না, ঠিক আছে, আমার আর কাপড়ের প্রয়োজন নেই’, লোকটির লজ্জিত ভাব দেখে তাড়াতাড়ি বলল ছেলেটি। লোকটির স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে দুজনেরই খুব খারাপ লাগল। এই বিপদগ্রস্ত অবস্থায় এই অল্প সময়ে তারা তাদের জন্য যে আতিথেয়তা করেছে তা সত্যিই স্মরণীয়। যখন তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে, তখন সবাই চুপ করে ছিল। সবাইকে ভারি ক্লান্ত মনে হয়েছিল মেয়েটির।

লোকটির পাশে হেঁটে চলেছে ছেলেটি। বেশ দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পাশাপাশি এগোচ্ছে মেয়েটি। লোকটি তাদের জানাল, সে ও তার দুই ছেলে সমুদ্রে মাছ ধরে। তাদের তিনজনের তিনটা নৌকা। তার মধ্যে বড় ছেলেটির নৌকা তুলনামূলকভাবে বেশি মজবুত ও বড়। সেটাই তাদের দেয়া হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটির হাতে একটা টর্চ ও বল্লম ধরিয়ে দিল। আরো জানাল, তারা যদি পশ্চিম দিকে নৌকা চালিয়ে যায়, তবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের কোনো উপকূলে পৌঁছে যাবে। পথ ফুরিয়ে গেল। নৌকার কাছে এসে পৌঁছাল তারা।

‘নৌকার পাটাতনে দুই টিন বিস্কুট, বেশ কিছু রুটি, সাত-আটটা নারকেল, একটা বড় পাত্রে খাওয়ার পানি, সেই সঙ্গে আপনার পায়ের মালিশের কৌটা রাখা আছে। এসব হিসাব করে খরচ করবেন’, বলে থামল লোকটি।

‘আপনি যে আমাদের পালানোর সাহায্য করলেন, ক্যাপ্টেন জানতে পারলে আপনাদের ওপর অত্যাচার করবে না তো?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘সে বিষয়ে আমরা সতর্ক থাকব।’

‘আপনারা নৌকায় উঠুন’, বলল লোকটি।

এগিয়ে এলো মেয়েটি। ‘প্লিজ, হাত বাড়ান।’ বলে হাতের মুঠো খুলে ধরল সে। হাতের তালুতে রাখা স্বর্ণের চেনে হীরার কাজ করা। রাতের আলোতেও হীরা থেকে জ্যোতি বের হচ্ছে। লোকটি একবার সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল।

‘আমার আর দরকার নেই তো, নেই, নেব না। যে অবস্থায় আছি, তাতেই সন্তুষ্ট।’

‘আমার বাবা আমার ১৫তম জন্মদিনে এটা আমাকে উপহার দিয়েছেন। আপনি আমাদের উপকার করেছেন, তার বিনিময় হিসেবে নয়, বরং আপনাকে আমি এটা উপহার হিসেবে দিচ্ছি’, বলে দেয়ার জন্য হাত বাড়াল মেয়েটি।

‘নিন’, হাত বাড়াচ্ছে না দেখে আবার বলল, ‘হাত বাড়ান, প্লিজ নিন।’

কাঁপা কাঁপা হাত বাড়াল লোকটি। হাতে নিয়ে পকেটে রেখে দিল সেটা। আর দেরি না করে দুজনেই নৌকায় উঠে বসল। নৌকার নোঙরের বাঁধন খুলে দিয়ে নৌকাটা ঠেলে পানিতে নামানোর জন্য লোকটি নৌকায় হাত দিল।

‘আমি জানি আপনাদের এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য এ ডিঙ্গি নৌকা মোটেও উপযোগী নয়। তারপরও দিলাম। কারণ এর চেয়ে ভালো নৌকার ব্যবস্থা করে দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন’, বলল লোকটি। ‘আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করলেন। আপনাদের কথা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না।’ লোকটির কথা শেষ হলে বলল ছেলেটি। কিছু না বলে লোকটি ঠেলে নৌকাটি কোমর সমান পানিতে নামিয়ে দিল। ছেলেটি হাতে বৈঠা তুলে নিল।

তীর থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে নৌকা। পালওয়ালা ছোট ডিঙ্গি নৌকা। খুব জোর আট-দশজনের মতো জায়গা হবে। পাটাতনে মাত্র একজনের শোয়ার জায়গা হবে। তবে নৌকাটি বেশ মজবুত বলে ছেলেটির মনে হলো। একটু পর পাল তুলে দিল সে। পালে বাতাস লাগতেই বৈঠা রেখে হাল ধরল। বাতাস পড়ে গেলে বৈঠা কাজে লাগাবে। কাজটা এমনিতেই কঠিন, তার ওপর সে নৌকা চালানোয় আনাড়ি। নৌকা সামলানো তার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণও করেছে। তীর থেকে তারা বেশ দূরে সরে এসেছে। অর্থাৎ লোকটি তাদের বিদায় দিয়ে অনেকক্ষণ তীরে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ ফেরাল। নৌকা সামলানোয় মন দিল। বড় বড় ঢেউ নৌকাটিকে যেন ভেঙে চুরমার করে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। একটু এদিক-ওদিক হলে উল্টে যাবে নৌকা।

এ বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে মনে মনে প্রার্থনা করছে সে, ‘হে আল্লাহ! অনিশ্চিত এক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছি। তুমি আমাদের যাত্রা নিশ্চিত করো।’ এক পাখিডাকা ভোরে আমাদের কোনো এক তীরে পৌঁছে দিও…।’

নৌকা সমুদ্রে ভাসার পর হাত নেড়ে লোকটিকে বিদায় জানিয়েছিল মেয়েটি। তারপর নৌকার পাটাতনে সাজিয়ে রাখা জিনিসগুলো দেখায় মন দিয়েছিল। লোকটি যা বলেছিল তার সবই, তার মধ্যে একটি জিনিস বেশি দিয়েছে, কিন্তু তাদের বলেনি। হয়তো বলতে ভুলে গিয়েছিল। তা হলো এক বাক্স দিয়াশলাই। এ দিয়াশলাই তাদের কী কাজে আসবে তা বুঝতে পারল না সে। বোঝার জন্য মাথাও ঘামাল না। এখন ছেলেটিকে সাহায্য করা দরকার।

‘লোকটি দিয়াশলাইও দিয়েছে’, বলতে বলতে ছেলেটির দিকে ঘুরে তাকাল সে।

ভালোই হয়েছে’, বলে আবার নৌকা সামলানোয় মন দিল। পাশে রাখা বৈঠাটা হাতে তুলে নিল মেয়েটি।

‘বৈঠাটা রেখে এখন ঘুমিয়ে নিন। এক সঙ্গে দুজনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ব, তখন আপনি আমার জায়গায় আসবেন’, মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একবারে বলে থামল ছেলেটি।

ভেবে দেখল, ছেলেটি ঠিকই বলেছে। বৈঠাটা জায়গামতো রেখে পাটাতনে শুয়ে পড়ল। গায়ে টেনে দিল চাদর।

আকাশে চাঁদ নেই। তবে অসংখ্য তারা আছে। তারাগুলো রাতের অন্ধকারকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে। রাতের আকাশের অপূর্ব সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছে অনেক কথা। কী ভাবছে সে?

তীর থেকে নৌকা অনেকদূর সরে এসেছে। এখন নৌকার গতিপথ ঠিক করা দরকার। তারা পশ্চিম দিকে যাবে। টর্চের আলোয় কম্পাস দেখে দিক নির্ণয় করে নৌকার গলুই পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে দিল। দেখা গেল তারা মূল দ্বীপের পাশ দিয়েই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই বড় বড় ঢেউয়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে তারা, আবার পরক্ষণেই নীচে নেমে আসছে। ঢেউগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে নৌকা ঠিক রাখাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।

‘আচ্ছা, কী পুরস্কার ঘোষণা হতে পারে?’ হঠাৎই জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘তা তো বলতে পারব না, এমন কোনো আভাস ওই লোক দুটোর কাছে পাইনি। তারা শুধু বলেছে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে’, পরিষ্কারভাবে উত্তর দিল মেয়েটি। এখনো সে ঘুমায়নি। এক মুহূর্ত ভেবে, ‘আপনার স্বর্ণের চেনের মূল্য কত?’ আবার প্রশ্ন করল মেয়েটিকে।

‘তিনশ পনের ডলার’, জবাব দিল মেয়েটি। ‘এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?’

‘এমনি’, অন্যমনস্কভাবে বলল ছেলেটি।

নীরব হয়ে গেল দুজনেই। কিছুক্ষণের মধ্যে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়ল। সময় কেটে গেছে অনেকক্ষণ। কত রাত হয়েছে আন্দাজ করতে পারছে না ছেলেটি। কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ থেকে তারা নাগালের বাইরে চলে যেতে পারবে তো! এখন পর্যন্ত তেমন বিপদ ছাড়াই এসেছে। হাই উঠেছে। মুখে হাত দিয়ে হাই বন্ধ করছে। খেয়াল হলো- ‘হাই শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর হাঁচি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।’ হাই উঠলে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে; ঘুম ঘুম ভাব আসে। ইতোমধ্যে তারও ঘুম ঘুম ভাব এসে গেছে। মেয়েটি কি জেগেই আছে! তাকে ডাকবে কি না ভাবছে। চিন্তা করল, মেয়েটি অনেক পরিশ্রম করেছে। হয়তো এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন থাক, যখন একদম পারবে না তখন ডাকবে। চোখ ডলে ঘুম দূর করার চেষ্টা চালাল। তারপর চাদরটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। হিমশীতল বাতাস মাঝেমধ্যেই তার কাঁপুনি তুলে দিচ্ছে। বাঁ দিকে মূল দ্বীপ রেখে এগিয়ে চলেছে। দূর থেকে দ্বীপটাকে ভুতুড়ে মনে হচ্ছে তার।

হঠাৎ ডান দিকে দূরে কিছু দেখতে পেল। মনে হলো কোনো কিছুর অবয়ব। ভালোভাবে তাকাতেই বুুঝল, একটা দ্বীপ। দ্বীপটাতে হয়তো ছোট পাহাড়-টিলা আছে। রাতের ম্লান আলোতে ছেলেটির তাই মনে হলো। দ্বীপের দিক থেকে সরিয়ে নৌকা। বেশ কিছুক্ষণ আগে ডানে যে দ্বীপটা দেখে ছিল তা এখন পাশে রেখে এগিয়ে চলেছে। দুই দ্বীপের মাঝ দিয়ে চলেছে। ডানদিকের দ্বীপটার দিকে মূল দ্বীপটাই তাদের আছে। দুই দ্বীপের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এলো। দূরে মূল দ্বীপের বাতিগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে। এসব দেখতে এগিয়ে চলছে ছেলেটি।

এখন খরস্রোতা নদীতে খেলনা নৌকা যেমন, এই মহাসাগরে তাদের ডিঙি নৌকাটিও তেমন। পরিষ্কার বুঝতে পারল এ ঢেউয়ের প্রবল ধাক্কা তাদের এ নৌকা সামলাতে পারবে কিনা। এ সময় তার পক্ষে কী করা সম্ভব তা মাথায় ঢুকল না।

সামনে বিপদ দেখে মস্তিষ্ক যেন অসাড় হয়ে পড়েছে। কিন্তু সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। ঢেউটি আঘাত হানল নৌকাটির গায়ে। মুহূর্তে উল্টে গেল নৌকাটি। অবশ্য তার আগেই ছেলেটি ছিটকে খোলা সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। নিজেকে সামলে নিয়েই ঘুরে তাকাল। দেখল, নৌকাটি উল্টে গেছে। নৌকার তলাটি ওপরে এসেছে। গায়ে চাদর জড়িয়ে থাকায় ভেসে থাকতে তার অসুবিধা হচ্ছে, তাই খুলে পানিতে ফেলে দিল। চাদরটা যে পরে কাজে লাগতে পারে তা এ সময় তার খেয়ালই হলো না। ডুবে গেল চাদরটি।

আশপাশে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। তবে কি…. আর ভাবতে চাইল না সে। মেয়েটির জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কীভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় তা বুঝতে পারল না। নিজেকে ধমক দিল নিজেইÑ ‘তুমি অহেতুক মাথা গরম করছ, পদে পদে মাথা গরম করলে লাভ না হয়ে বরং ক্ষতি হয়, মাথা ঠান্ডা রেখে চিন্তা কর।’

ঘুমিয়ে পড়েছিল মেয়েটি। ঢেউয়ের আঘাতে যখন নৌকা বাঁ দিকে হেলে গিয়েছিল, তখন সেও বাঁ দিকে গড়িয়ে পড়ার সময় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। যখন তাকেসহ নৌকাটি উল্টে যায়, তখনো সে কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু এতটুকু বুঝেছিল, কোনো কারণবশত তাকে নিয়ে নৌকাটি উল্টে যাচ্ছে। উল্টে গেল নৌকা। সে পানির মধ্যে ডুবে গেল। নৌকাটি তাকে ঢেকে ধরল। মেয়েটি বুঝতে পারলে, তার ওপর নৌকাটি আছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যাতে না ঢোকে সেজন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল, বাঁ হাতে নাক টিপে ধরল। এ অবস্থায় যে কোনো দিকে ডুব দিয়ে কিছুদূর গিয়ে ভেসে উঠতে হবে। সে ডুব-সাঁতারও দিতে পারে। দম ফুরিয়ে আসছে, দ্রুত বের হতে হবে। যখন সে পানিতে পড়ে যাচ্ছিল, তখন গা থেকে চাদরটা সরিয়ে ফেলেছিল। ডুব দিয়ে এগোতে শুরু করল। মাথায় চোট লাগল নৌকার গায়ে। দম প্রায় শেষ। শ্বাস নেয়ার জন্য মৃদু অস্থির হয়ে উঠেছে সে। বেশি নীচে ডোবার সময় নেই। সামান্য একটু নীচে নেমে আবার এগোতে লাগল। কতটুকু ডুবে ছিল বলতে পারবে না। তবে এগোতে গিয়ে বুঝল তার ঘাড়ের ওপরে জামার গলায় কী যেন আটকে গেল। সেদিকে মন দেয়ার সময় নেই। শ্বাস নেয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সামনে এগোল। একসময় বের হয়ে এলো খোলা সাগরে। বুক ভরে সমুদ্রের তাজা বাতাসে শ্বাস নিল। এই প্রথম খেয়াল হলো তার গায়ে জামা নেই। ওপরের অংশ একেবারে অনাবৃত। থমকে গেল সে। বুঝতে পারল নৌকার তলা থেকে বের হওয়ার সময় নৌকার কোনো বর্ধিত কাঠের সঙ্গে আটকে গিয়ে ছিঁড়ে গেছে তার জামাটি। তারপর তা গা থেকে এমনিতেই খুলে গেছে। পানির ওপরে ভেসে ওঠার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় তা সে খেয়াল করেনি। এখনো কি ছেঁড়া জামাটা পাওয়া যাবে? ঝট করে ঘুরে গেল নৌকার দিকে। দেখল, নৌকাটি ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি নৌকার কাছে সরে এলো সে। পানির ওপর জামাটি নেই। তবে কি একদম ডুবে গেছে, নাকি নৌকার গায়ে আটকে আছে? যে দিক দিয়ে বের হয়েছে সে জায়গায় ডুব দিয়ে নৌকার গায়ে খুঁজল, কিন্তু পেল না। দম ফুরিয়ে যাওয়ায় ভেসে উঠল। বুঝল, পাওয়া যাবে না। অনর্থক মরীচিকার পেছনে ছুটে লাভ নেই।

হঠাৎ ছেলেটির কথার খেয়াল হতেই চারদিকে তাকিয়ে কোথাও তাকে দেখতে পেল না। ছেলেটি কি তাহলে… ভাবনাটা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটিকে ভুশ করে পানির ওপরে ভেসে উঠতে দেখল সে।

সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছে নৌকাটি। মাথা ঠান্ডা রেখে দ্রুত চিন্তার জগতে প্রবেশ করল ছেলেটি। অবশ্য এ রকম পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা দুরূহ কাজ। মেয়েটি তখন পাটাতনে ঘুমিয়ে ছিল। তার এখন নৌকার নীচে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে… যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু হাত দিয়ে দেখল, এভাবে পানিতে ভেসে থেকে নৌকা উল্টিয়ে সোজা করা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। এদিকে সময় ব্যয় না করে অন্য উপায় বের করে ফেলল। প্রথমে নৌকার গা ধরে ডুব দিল লবণাক্ত পানির মধ্যে। তারপর ঝুঁকি নিয়ে নৌকার তলায় ঢুকে পড়ল। এখানে মেয়েটিকে পেলে তাকে কীভাবে সাহায্য করবে এখনো তা নিয়ে চিন্তা করেনি। আগে তাকে তো খুঁজে পেতে হবে। দম ফুরিয়ে আসছে। ছোট নৌকার ভেতরটা খুঁজতে বেশি সময় লাগল না। সে অনেকক্ষণ দম ধরে রাখতে পারে। তাই একেবারে খোঁজা শেষ করে বের হয়ে এলো। দম নেয়ার জন্য ভেসে উঠতে এক অজানা ভয়ানক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল ছেলেটি। তবে কি সত্যিই মেয়েটি নৌকায় প্রচণ্ড বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে সমুদ্রে ডুবে গেছে? এখন সে কী করবে? নিজে বাঁচার চেষ্টা করবে নাকি আর কিছুক্ষণ মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করবে? উত্তর ঠিক করার আগে ভেসে উঠে দম নিয়ে চোখ মেলল।

‘আমি এখানে।’ বলে উঠল মেয়েটি নৌকার অপর দিক থেকে।

মেয়েটির গলার আওয়াজ শুনে চমকে ঘুরে তাকাল ছেলেটি। মেয়েটিকে চোখে পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মাথা থেকে যেন এক বিরাট বোঝা সরে গেল। মনে মনে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’

এবার কোন দিকে যাবে সে ভাবনায় ডুবে গেল ছেলেটি। বাম দিকে মূল দ্বীপ কাছে হলেও এখন আবার সেদিকে যাওয়া হবে চরম বোকামি। অতএব, ‘আমরা সামনের ওই দ্বীপে উঠব ইনশাআল্লাহ।’ হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল ছেলেটি। ‘আপনি সাঁতার কাটতে পারবেন তো?’ মেয়েটি যাতে দূর থেকে তার কথা শুনতে পায় সে জন্য চেঁচিয়ে কথা বলছে ছেলেটি।

‘পারব।’ জবাব দিল মেয়েটি।

‘তাহলে এগোনো যাক।’ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে এগোতে শুরু করল। মেয়েটি কিছু না বলে সারা শরীর পানির নীচে ডুবিয়ে শুধু মাথাটা ভাসিয়ে রেখে সাঁতরাতে শুরু করল। নদীতে সাঁতার কাটার চেয়ে সমুদ্রের সাঁতার কাটা সহজ। নদীর পানিতে পানিই প্রধান উপাদান হওয়ায় নদীর প্লাবতা কম। ফলে নদীর পানিতে ভেসে থেকে সাঁতার কাটা কষ্টকর। অপরদিকে সমুদ্রের পানিতে নানা ধরনের উপাদান দ্রবীভূত থাকায় সমুদ্রের পানির প্লাবতা বেশি হওয়ায় সমুদ্রের পানিতে ভেসে তাকা সহজ বলে সাঁতার কাটাও সহজ। সমুদ্রের পানি থেকে নদীর পানির প্লাবতা কম হওয়ার কারণে যখন কোনো জাহাজ সমুদ্র থেকে নদীতে প্রবেশ করে তখন সে জাহাজ থেকে কিছু মালপত্র সরিয়ে ফেলা হয়।

বেশ দূরত্ব বজায় রেখে দুজনে নীরবে এগিয়ে চলেছে। পানিতে ঠান্ডায় দুজনেই জমে যাওয়ার উপক্রম। দ্রুত সাঁতার কেটে শরীর গরম রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে উভয়ে। যতই দ্বীপের কাছে হচ্ছে, ততই দ্বীপের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্বীপে পৌঁছতে এখনো অনেক সময় লাগবে। মেয়েটি ভাবছে, শেষ অবধি পারবে তো তারা দ্বীপে পৌঁছতে? যদি দ্বীপে পৌঁছে যায়, তারপরে তার কী হবে?

সময় প্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটু দূর দিয়ে প্রায় সমান গতিতে এগোচ্ছে দুজনেই। একটু পরপর মেয়েটি ডানে তাকিয়ে দেখছে, ছেলেটি আছে কিনা। ছেলেটিও দেখছে, তবে প্রথমত অনেকক্ষণ পরপর, দ্বিতীয়ত একবার তাকিয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে।

যদিওবা এ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার মতো একটা নৌকা পেল, তাও তো ডুবে গেল। এখন মূল দ্বীপের অদূরেই আরেকটি দ্বীপে উঠতে যাচ্ছে তারা। কাল দিনে অনুসন্ধানীরা এ দ্বীপে হানা দেবে না তো! দিলেইবা কী করার আছে! লোকটি নৌকায় যা যা তুলে দিয়েছিল, সব ডুবে গেছে। তার একমাত্র অস্ত্র রাইফেলটা পাটাতনে রাখা ছিল, তাও ডুবে গেছে। এমনকি তাকে দেয়া টর্চ, কম্পাসটাও। এ দুটো সে তার পাশেই রেখেছিল। তারা একরকম নিঃস্ব হয়ে গেছে। মাথার ওপর দিয়ে একটা অ্যালবাট্রোস উড়ে যেতেই ভাবনায় ছেদ পড়ল ছেলেটির। অ্যালবাট্রোস একটা সামুদ্রিক পাখি। প্রাচীন যুগের নাবিকরা এ পাখিকে তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। সাঁতার কাটায় মনোনিবেশ করল ছেলেটি। ধীরে ধীরে হাঁপিয়ে উঠছে দুজনেই। এখনো বেশ কিছুদূর সাঁতরাতে হবে। তীরের কাছে এসে পড়েছে। ফিরতি ঢেউ ভেঙে এগোতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। সব কষ্টের অবসান ঘটিয়ে একসময় পৌঁছে গেল তীরে।

তারার আলোয় রাতের আঁধার ফিকে হয়ে গেছে। তাছাড়া অন্ধকারে থাকতে থাকতে এখন বেশ দূরেও দেখা যায়। চার হাতে-পায়ে ভর দিয়ে পানির নাগালের বাইরে সৈকতে পা ছড়িয়ে বসে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল ছেলেটি। একটু পর চোখ খুলে আশপাশে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। তার সঙ্গেই তো তীরে এসে পৌঁছল। তাহলে গেল কোথায়? সমুদ্রের দিকে তাকাতেই তাকে দেখতে পেল ছেলেটি। তীর থেকে দূরে একটা পাথর ধরে পানিতে ভাসছে মেয়েটি। শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির এ ধরনের আচরণের মর্ম বুঝতে পারল না সে। তীরে গিয়ে দাঁড়াল। একটু দূরে মেয়েটিকে সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে শুধু মাথা ভাসিয়ে মাথা নীচু করে থাকতে দেখল সে।

‘আপনি এখনো পানি থেকে উঠে আসেননি কেন?’

এ অবস্থায় কী করা যায় তাই ভাবছিল মেয়েটি। ছেলেটির সাড়া পেয়ে চমকে উঠল। দেখল ছেলেটি বেশ দূরে আছে। কী উত্তর দেবে তা ভেবে পাচ্ছে না।

‘কী ব্যাপার, চুপ করে আছেন কেন? ঠান্ডা লাগবে, তাড়াতাড়ি উঠে আসুন’, মেয়েটির কোনোরকম সাড়া না পেয়ে বলল ছেলেটি।

মেয়েটি ঠিক করল, লজ্জা ফেলে সত্যটাই প্রকাশ করবে। এছাড়া তো কোনো উপায় তার জানা নেই। এখন পর্যন্ত ছেলেটিকে দেখে যা মনে হয়েছে তাতে যে সে তার কোনো ক্ষতি করবে না এ বিষয়ে সে নিশ্চিত। কিন্তু কীভাবে বলবে, এক মুহূর্ত ভেবে সরাসরি বলে ফেলল, ‘আমার শরীরের ওপরের দিকে অনাবৃত’, বলেই থেমে গেল।

‘তার মানে?’ বুঝতে না পেরে বলল ছেলেটি।

‘নৌকার তল থেকে বের হতে গিয়ে হয়তো কোনো কিছুতে লেগে…’, বলেই থেমে গেল মেয়েটি। আর বলতে পারল না। ঠান্ডায় গা থরথর করে কাঁপছে।

মেয়েটি থামতেই, ‘থাক, আর বলতে হবে না, বুঝেছি। এখন কী করা যায়, হুম’ বলে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ ভাবল। ‘আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনে এগোচ্ছি। আপনি পানি থেকে উঠে আমার পেছনে পেছনে আসবেন। সাবধানে এগোবেন যেন কোনো বিপদে জড়িয়ে না পড়েন। আর কোনো অসুবিধা হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন, তখন দেখা যাবে।’ মেয়েটির উদ্দেশ্য দীর্ঘ এ বক্তৃতা দিয়ে ঘুরে একটু সামনে এগিয়ে দাঁড়াল ছেলেটি। মেয়েটির সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। বোকামি করে চাদরটি পানিতে ফেলে দেয়ার জন্য মনে মনে নিজেকে একশত একটা জুতোর বাড়ি মারল ছেলেটি।

ছেলেটির কথায় আশ্বস্ত হলো মেয়েটি। উঠে এসে ছেলেটির বেশ পেছনে দাঁড়াল।

‘উঠে এসেছি।’ এ অবস্থায় খোলা আকাশের নীচে দাঁড়াতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তার। লক্ষ্য রেখেছে ছেলেটির দিকে।

সামনে এগোচ্ছে ছেলেটি। হাঁটতে হাঁটতেই নিজেকে আদেশ করছে সেÑ ‘তোমাকে এ অবস্থায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। তোমাকে এ দুনিয়ায় পরীক্ষা দেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে। তোমাকে অবশ্যই পাস করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। হে আল্লাহ্, আমাকে তৌফিক দাও।’

দ্বীপটা কত বড় তা রাতের বেলায় আন্দাজ করা গেল না। এ দ্বীপে ছোট আকারের অনেক পাহাড়-টিলা আছে। তবে গাছপালার সংখ্যা খুবই নগণ্য। দ্বীপে বসতি আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। লাগাতার প্রচণ্ড পরিশ্রমে শরীর অবসন্ন হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় কমপক্ষে এক পক্ষের বিশ্রাম প্রয়োজন। পা দুটো আর চলতে চাইছে না। সৈকতেই বসে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটির; কিন্তু এখানে ঠান্ডা বেশি লাগবে। তার চেয়ে পাহাড়ের মধ্যে কোথাও আশ্রয় নিলে ঠান্ডা কম লাগবে। তীর থেকে বেশ দূরে দুটি টিলার মধ্যে পথ ঢুকে গেছে। পথ তো নয়, পথের মতো। সেদিকে তারা ঢুকে পড়ল। ছেলেটির কী পরিমাণ ঠান্ডা লাগছে তা নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারল মেয়েটি। তার তো জিন্সের প্যান্ট পরা আছে। ছেলেটির পাজামা নিশ্চয়ই এ জিন্সের মতো নয়। অবশ্য তার প্যান্টটা ভেজা বলে খুবই ঠান্ডা লাগছে। একটু পরপরই দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠক ঠক করে কেঁপে উঠছে সে। হঠাৎ খেয়াল হলো তার প্যান্টের পকেটে গ্যাস লাইটার আছে। ডালপাতা জোগাড় করে পাহাড়ের ভেতরে আগুন জ্বালালে কারো চোখে পড়বে না। সে আগুনে শীত অনেকটা নিবারণ করা যাবে। তারপরই স্মরণ হলো, সে আগুনের সামনে বসতে পারবে না। তাহলে… তাহলে ছেলেটিকে গ্যাস লাইটারটা দিয়ে দেবে। আগুনে তার শীত নিবারণ হলেও চলবে।

এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি। যেখানে দাঁড়িয়েছে তার চারদিকে পাহাড়-টিলায় ঘেরা। মাঝে অল্প পরিসরের সমতল জায়গা। এখানেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। ‘আমরা এখানেই বিশ্রাম নেব, আপনি কী বলেন?’ সামনে তাকিয়েই কথা বলছে ছেলেটি।

‘আমার আপত্তি নেই’, বলতে গলাটা কেঁপে উঠল মেয়েটির। দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠক ঠক শব্দ ছেলেটির কান অব্দি পৌঁছাল।

‘আপনার কি খুবই ঠান্ডা লাগছে?’ নিজেই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ছেলেটি। বেশ কিছুদিন থেকে খালি গায়ে থেকে ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেড়েছে তার। তারপরও সে ঠান্ডায় মৃদু কেঁপে চলেছে। সমুদ্রের তীরে খোলা সৈকতে থাকলে আরো বেশি ঠান্ডা লাগত।

‘লাগছে, তবে সহ্য করতে পারব’, সত্য কথাটাই ক্লান্ত গলায় বলল মেয়েটি।

একটু ভাবল ছেলেটি। ‘আপনার কাছে লাইটারটা আছে?’

‘আছে’, কোনোরকমে জবাব দিল। তার অনাবৃত শরীরে রাতের ঠান্ডা বাতাস যেন হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আপনি আপাতত ওই পাথরটির আড়ালে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকুন, আমি আসছি’, বলেই মেয়েটিকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে যে পথে তারা এসেছিল সে পথে পা বাড়াল ছেলেটি। সে কী করতে যাচ্ছে তা মেয়েটি বুঝে ফেলল। তাকে থামানোর জন্য হাত বাড়িয়ে ডাকতে গেল। কিন্তু ঠান্ডায় মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। অদৃশ্য হয়ে গেল ছেলেটি। অগত্যা ছেলেটির কথামতো বড় পাথরটির পেছনে গুটিসুটি হয়ে বসল। একটু পরেই বুঝতে পারল, পাথরটির পেছনে থাকায় একদিকে তার সামনে পাথরটি পর্দা হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে ঠান্ডাও একটু কম লাগছে।

যাওয়ার সময় পথের ধারে একটা মৃত গাছ চোখে পড়েছিল। সেটার কাছে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। গাছটা ছোট। দাঁড়িয়েই হাতে ভাঙার মতো সব ডাল ভেঙে একত্রে বোঝা করে ফিরল সে। ছেলেটির দেরি দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল মেয়েটি। কোনো ধরনের বিপদে পড়েনি তো? ছেলেটিকে ফিরতে দেখে খুশি হয়ে উঠল সে। মেয়েটিকে যেখানে বসতে বলেছে, সেখান থেকে বেশ দূরে বোঝাটি রাখল।

‘আপনি কোথায় আছেন?’ উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘এখানে’, পাথরের পেছন থেকে সাড়া দিল মেয়েটি।

‘শুনুন, আমি কিছুক্ষণের জন্য এখান থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আপনি এখানে এসে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিজেকে গরম করে নিন। ডালগুলোতে হয়তো সহজে আগুন ধরবে না। আমি যতক্ষণ না ফিরব ততক্ষণ আপনি আগুনের পাশেই থাকবেন। আমি ফিরলে বুঝতে পারবেন। অহেতুক অস্বস্তিতে থাকার দরকার নেই।’ মেয়েটিকে উদ্দেশ করে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামল ছেলেটি। যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই মেয়েটির কথায় থামতে হলো।

‘আমার দরকার নেই। লাইটার দিচ্ছি, আপনিই আগুনের পাশে বসে বিশ্রাম নিন’, বলতে বলতে লাইটার বের করার জন্য পকেটে হাত ঢুকাল। উল্টো দিকে ঘুরে আছে ছেলেটি। ‘এদিকে ঘুরুন, আমি লাইটার ছুড়ে দিচ্ছি। আমার চেয়ে আপনার অনেক বেশি ঠান্ডা লেগেছে।

উল্টো দিক থেকেই বলছে ছেলেটি, ‘প্লিজ জেদ করে কথা বাড়াবেন না। আপনি আগে…’, বলে আর দাঁড়াল না সে। দ্রুত সরে যেতে লাগল সেখান থেকে।

জানে, ছেলেটিকে ডেকে কোনো লাভ হবে না, তাই আর ডাকল না মেয়েটি। ঠান্ডায় কাঁপছে সে। তারপরও উঠতে দ্বিধা করছে। এ অবস্থায় সে কীভাবে আগুনের আলোয় বসবে! ছেলেটিকে সে অবিশ্বাস করছে না। তারপরও এক অজানা অস্বস্তি তাকে চেপে ধরেছে। অবশেষে ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে সমস্ত দ্বিধা-অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে উঠল। প্রথমে শুকনো ডালগুলোকে দুভাগ করে লাইটার দিয়ে একটা সরু ডালে আগুন ধরানোর চেষ্টা শুরু করল। অনেকক্ষণ পর ডালটাতে আগুন ধরাল। তারপর বাকি ডালগুলোতে আগুন ধরিয়ে অগ্নিকুণ্ড বানাতে খুব বেশি সময় লাগল না। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে শরীর। আগুনের পাশে বসে থাকতে খুবই ভালো লাগছে তার। শরীরটা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। ঠান্ডা দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্তিও অনেকটা দূর হয়ে গেল। সে এখন পর্যন্ত ছেলেটিকে যতটুকু দেখেছে তাতে তার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, ছেলেটি এখান থেকে অনেক দূরে আছে, আর দূর থেকে এদিকে তাকিয়েও নেই। তাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে তা হলোÑ সে এ দ্বীপে উঠে আসার পর থেকে ছেলেটি তার দিকে ফেরেনি, আর তার দিকে তাকানোর তো প্রশ্নই উঠে না। এর আগেও নিত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া সে তার দিকে চোখ তোলেনি। অথচ এ পর্যন্ত কত ছেলেই না তার পেছনে ধরনা দিয়েছে। আর ক্যাপ্টেন তো তার জন্য একরকম পাগল হয়েছে বলে তার মনে হয়। নাহ, ছেলেটি সত্যি বড়ই অদ্ভুত। এ ধরনের মানুষের কাছে সর্বাবস্থায় যে কোনো মানুষ নিরাপদ, ছেলেটির সম্পর্কে তার এমনই ধারণা জন্মেছে। ডালগুলো ধীরে ধীরে পুড়ছে। পট পট শব্দে ডাল ফুটছে। সেই সঙ্গে আগুনের তেজও কমে আসছে। একসময় আগুন নিভু নিভু পর্যায়ে চলে এলো। বাকি অর্ধেক ডাল ছেলেটির জন্য রাখল।

উঠে আগের জায়গায় গিয়ে আগের মতো পাথরটির আড়ালে বসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলোÑ এখন তো রাত। পাথরের আড়ালে গুটিসুটি মেরে থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু কাল দিনে সে কোথায় লুকাবে? দূরে আবছার মতো কিছু এদিকে আসতে দেখে ভালোভাবে তাকাল। আরো কাছে এলে ছেলেটির কাণ্ড দেখে একটু আগের ভাবনার কথা বেমালুম ভুলে গেল। ছেলেটি যে রীতিমতো উল্টো দিকে হাঁটছে।

পাহাড়-টিলায় পরিবেষ্টিত জায়গাটি থেকে ছেলেটি দূরে চলে এসেছে। সৈকতের যেখানে তারা উঠেছে, সেখানে পৌঁছে গেছে। সমুদ্রের দিক থেকে বয়ে আসা হিমশীতল বাতাসে ঠক ঠক করে কাঁপছে। খানিকক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করে সৈকত ধরে পা বাড়াল। নৌকা থেকে দ্বীপটাকে তেমন বড় মনে হয়নি। তাকে আগে জানতে হবে এ দ্বীপে জনবসতি আছে কিনা। যেহেতু এ দ্বীপটা পাহাড়-টিলায় ভরপুর তাই তা জানার সহজ উপায় বের হলো দ্বীপের সৈকত ধরে চতুর্দিক ঘুরে দেখা। এখানে বাড়িঘর থাকলে তা সৈকতের পাশে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তানা হলে তীরে কমপক্ষে একটা হলেও মূলদ্বীপে যাতায়ের জন্য নৌকা থাকবে। দ্বীপের জনবসতি সম্পর্কে খোঁজখবরটা বিশ্রাম নিয়ে পরে করলেও হতো, তাকে যখন ওখান থেকে সরে আসতেই হয়েছে, তখন একেবারেই খোঁজা শেষ করে ফিরবে।

ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে কোনোমতে দ্রুত এগোনোর চেষ্টা করছে ছেলেটি। কত সময় গত হয়েছে জানে না। তবে দ্বীপের সৈকত ধরে হেঁটে হেঁটে একসময় যেখানে বিশ্রাম নিয়েছিল সেখানে পৌঁছে গেল। মধ্যে দুবার খানিক বিশ্রাম নিয়েছিল। না, এ দ্বীপে জনবসতির কোনো চিহ্ন পেল না।

ঠান্ডায় তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন বিরতিহীনভাবে সে কেঁপেই চলেছে। এখন গিয়ে আগুনের পাশে বসা দরকার। কিন্তু শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নিজেকে বোঝাল, এখানে থাকার চেয়ে আগুনের পাশে গিয়ে বসাই ভালো হবে। ফিরতি পথ ধরল। ডানের পাহাড় পেরোলেই সে বিশ-পঁচিশ গজ দূরে মেয়েটিকে হয়তো আগুনের পাশে দেখতে পাবে। তাই ঘুরে পেছন দিক দিয়ে এগোতে লাগল। তবে ধীরে ধীরে, যেন কোনো কিছুতে হোঁচট খেয়ে না পড়ে। যেখানে আগুন জ্বালার কথা তা থেকে একটু দূরে থাকতেই বুঝতে পারল আগুন জ্বালা নেই। তাহলে হয়তো মেয়েটিও আশপাশে নেই। ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল, মেয়েটির জ্বালানো আগুন প্রায় নিভে এসেছে। তার মানে বেশ কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটি এখানে ছিল। ভালোই হয়েছে, এখন নেই। বাকি কাঠগুলো দিয়ে আবার আগুন জ্বালিয়ে ফেলল। আগুনের আলোয় লাইটারটা কুড়িয়ে নিয়ে দেখল, তাতে গ্যাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। যা আছে, তা দিয়ে খুব জোর আর দুবার জ্বালানো যাবে। লাইটারটা মাটিতে রেখে দিয়ে নিজেকে উষ্ণ করার কাজে লেগে গেল। যখন সে মেয়েটির ওই অবস্থার কথা শুনেছে, তখন থেকেই ভাবছে, এর কী ব্যবস্থা করা যায়? এতক্ষণ ভালোভাবে ভাবার সুযোগ পায়নি। তবে এবার পেল। এখনতো অনেক রাত। দিনের আলো ফুটলে তার কী অবস্থা হবে। তার কাছ থেকে এমনিতে দূরে সরে থাকলেও কোনো প্রয়োজনে তার কাছে যেতে পারবে না। দিনে পালাতে হলে সে তার সঙ্গে পথ চলবে কীভাবে? তাছাড়াও বড় কথা হলো সন্ধানী দল এসে পড়লে তার কী অবস্থা হবে, একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। অথচ তাকে দেয়ার মতো তার কোনো কাপড়ই নেই। অবশেষে অনেক চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিল, আবার সে মূল দ্বীপে ফিরে যাবে। জেলেকে বলে তার মাধ্যমে মেয়েটির কাপড়ের ব্যবস্থা করবে সেই সঙ্গে আর একটা নৌকা জোগাড়ের চেষ্টা করবে।

অনেকক্ষণ আগুনের পাশে থেকে বিশ্রাম নিয়ে অনেকটা ভালো লাগছে তার। দিনের বেলা দ্বীপে যাওয়াটা বোকামি হবে। দেরি না করে এখনই রওনা দেয়া উচিত। রাতের আর বেশি বাকি নেই। পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখল সুবহে কাজিব শুরু হয়েছে। উঠতে গিয়েও কী ভেবে বসে পড়ল। মেয়েটিকে বলে যাওয়া দরকার। তা না হলে চিন্তা করবে। কারণ তার ফিরতে দেরি হতে পারে। হয়তো মেয়েটি গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তার খুবই পরিশ্রম হয়েছে কিনা! তাকে না ডেকে বরং একটা সরু শক্ত ডাল নিয়ে মাটিতে লিখে উঠে দাঁড়াল।

যখন মূল দ্বীপে পৌঁছল তখন সূর্য ওঠার আর অল্প বাকি। ফজরের নামাজ আদায় করে নিল সৈকতে। এতক্ষণ সাঁতার কেটে আর এগোতে শক্তি পাচ্ছে না। তাছাড়া প্রচণ্ড ক্ষিধেও লেগেছে। কিন্তু এখানে পড়ে থাকলে চলবে না। পূর্বাকাশ থেকে টকটকে লাল সূর্যটা বেরিয়ে আসছে। তার এখান থেকে এখনই সরে পড়া দরকার। কারণ পাশেই গ্রাম। এতক্ষণে পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়ে থাকলে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে। তার গা এখনো ভেজা আছে। ঠান্ডায় কাঁপছে। তাকে এখানে যে কেউ দেখলে সহজেই বুঝে ফেলবে যে, সে কোনো দ্বীপ থেকে এসেছে। তখন মেয়েটি পড়বে মহাবিপদে। তা ছাড়া ওই জেলের বাড়ি এখান থেকে দক্ষিণ দিকে। যত কষ্টই হোক এগোনো দরকার। অবশেষে নিস্তেজ শরীর নিয়ে এগোতে লাগল। গ্রামের পাশ থেকে অনেকদূর সরে গেছে। দ্বীপটাও পেছনে এসেছে। সূর্য আধ-বাঁশ পরিমাণ ওপরে উঠে গেছে। আরো বেলা হওয়ার আগেই তার জেলের বাড়িতে পৌঁছতে হবে। এখন সে মাতালের মতো পা ফেলছে। এক সময় অতি ক্লান্ত হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সৈকতের ওপর। চেষ্টা করেও উঠতে পারল না।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের ফলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বলতে পারবে না সে। যখন ঘুম ভাঙল তখন অনেক ওপরে উঠে গেছে সূর্য। চোখ মেলে দেখল তার চারপাশে অনেক লোক। হয়তো তাদের কথায় তার ঘুম ভেঙে গেছে। হঠাৎই বুঝতে পারল যে সে বন্দী হয়ে গেছে। উঠে বসল সে। পালানোর চেষ্টা করল না। জানে, লাভ হবে না। চুপ থাকাই শ্রেয়। তাকে কেউ কিছু বলছেও না। তারা নিজেদের মধ্যেই তার ব্যাপারে নীচু গলায় কথা বলছে। চারদিকে তাকাতে গিয়ে চোখ পড়ল সেই জেলের ওপর। চুপ করে আছে। চোখাচোখি হতেই দুজনেই চোখ সরিয়ে নিল। তার চোখে-মুখে অবাক হওয়ার ছাপ। হয়তো সে ভাবছে এ ছেলে আবার ফিরে এলো কেন? মেয়েটিইবা কোথায়? তার গা এর মধ্যে শুকিয়ে গেছে বলে মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল। লোকগুলোর কথায় বুঝল ছেলেটিÑ তাদের উভয়কে বা যে কোনো একজনকে ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে একশত ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। হেড কোয়ার্টারে সংবাদ দেয়া হয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা জিপ এসে গেল। তাকে জিপের পেছনে তোলা হলো। জিপে সে ছাড়াও একজন ড্রাইভার, একজন অফিসার ও চারজন অস্ত্রধারী আছে। স্টার্ট নিল গাড়ি।

‘আমাকে সঙ্গে নিন, আমি ওকে আগে পেয়েছি’, বলতে বলতে একজন জিপের পাশে এসে দাঁড়াল।

‘আমি আগে দেখেছি’, বলে আর একজন এগিয়ে এলো।

‘থাম তোমরা’, ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে ধমকে উঠল অফিসার। ‘আগে এর ব্যবস্থা হোক।’ হাত দিয়ে ছেলেটিকে দেখাল। ‘তারপর তোমাদের ব্যবস্থা হবে, এখন চেঁচামেচি করো না, যাও।’

আর কেউ এগিয়ে এলো না। চলতে শুরু করল গাড়ি। হেড কোয়ার্টারের সামনের চত্বরে পৌঁছে গেল। টেনেহিঁচড়ে ছেলেটিকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। সামনে একটা টি টেবিলের পেছনে চেয়ারে বসে আছে ক্যাপ্টেন শান্তভাবে। মুখ দেখে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল ছেলেটি। কিন্তু তেমন কিছু বুঝতে পারল না। ক্যাপ্টেনের ডান দিকে রাখা একটা টুলের ওপর তাকে বসানো হলো। তার পেছনে স্থির হয়ে দাঁড়াল দুজন অস্ত্রধারী গার্ড।

‘তারপর কেমন আছেন হিরো সাহেব?’ নিষ্ঠুর হেসে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘আলহামদুলিল্লাহ।’

‘তার মানে?’

‘আল্লাহ যেভাবে রাখেন, তাতেই সন্তুষ্ট।’

‘ওহ, তার মানে তুমি পাক্কা মুসলমান!’ গম্ভীর হয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘ভালোই জানেন দেখছি।’

‘একসময় ক্যামব্রিজের ছাত্র ছিলাম, যাক গে তো হিরোইন কেমন আছে?’

কিছু বলল না ছেলেটি।

‘এটার উত্তর না হয় নাই দিলে, এটার উত্তরÑ তা হলো, সে কোথায় আছে?’

এবারো কিছু বলল না ছেলেটি।

‘তুমি খুবই চালাক মানুষ।’

‘আমি চালাক নই।’ মুখের ওপর জবাব দিল ছেলেটি।

কিন্তু রেগে গেল না ক্যাপ্টেন। বরং অট্টহাসি দিয়ে উঠল। হাসি থামিয়ে বললÑ

‘দুঃখিত, আমারই বলতে ভুল হয়েছে। তুমি চালাক নও, চালাক হয় শিয়াল। তুমি শিয়াল নও অতি ভদ্র মানুষ। শেষ তিনটিতে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল।

‘ভদ্র মানুষ কখনো চালাক হয় না, হয় বুদ্ধিমান। সশব্দে হেসে উঠল।

তাই তুমি অতি বুদ্ধিমান। থামল।

‘তুমি শুধু অতি বুদ্ধিমান নও, ভয়ঙ্কর সাহসীও। আর এ ধরনের বুদ্ধিমান-সাহসীরা মাঝেমধ্যে ফাঁদে পড়ে যায়, তোমারও হয়েছে সেই অবস্থা। কি ঠিক বলেছি?

ছেলেটি চুপ করেই থাকল।

মেয়েটিকে যে কাপড় পরতে দেয়া হয়েছিল, তাতে এক ধরনের সেন্ট দেয়া হয়েছিল। সে কোনোভাবে পালালেও যেন তাকে কুকুরের সাহায্যে দ্রুত ধরা যায়, মেয়েটি সে কাপড় পরেও ছিল। কিন্তু পালানোর সময় সেটি খুলে নিজের জামাটি পরে পালিয়েছে। নিজের জামাটি পরে পালানোর কথা নিশ্চয়ই তুমি তাকে বলেছ। কি, ঠিক বলেছি? জবাব দাও। এবারো কোনো জবাব দিল না ছেলেটি। তবে ক্যাপ্টেনের ক্ষমতা দেখে সে রীতিমতো আশ্চর্য হলো।

ঠিক আছে। জবাব দেয়ার দরকার নেই। কারণ জবাবটা আমার জানা। তবে সেন্ট ব্যবহারের ব্যাপারটা ধরতে পারা বেশ কঠিন ছিল।

ছেলেটি বুঝতে পারছে, তাকে নরম করার জন্য ক্যাপ্টেন চেষ্টা চালাচ্ছে। সতর্ক হয়ে গেল সে।

সকাল বেলা জানা গেল, মেয়েটি পালিয়েছে, বাংলোর পেছনে দুজন গার্ড বন্দী। তারপর দ্রুত খোঁজ নিয়ে জানা গেল তুমিও পালিয়েছ। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে কষ্ট হলো না। তারপর কুকুর নিয়ে সমুদ্রের কাছে পৌঁছেই আমাদের থামতে হলো। কারণ, কুকুর তোমাদের ট্রাস হারিয়ে ফেলেছে। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তোমাদের ট্রাস পাওয়া যায়নি। তারপর বাধ্য হলাম, পুরস্কার ঘোষণা করতে। আজ সকালে সংবাদ পেলাম, তোমাকে সৈকতে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। যাক গে, এখন আসল কথায় আসি। বলে থামল ক্যাপ্টেন।

মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেল ছেলেটি যে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

মেয়েটি কোথায়? চিবিয়ে বলল ক্যাপ্টেন। মুখের ভাবও পরিবর্তিত হলো।

জবাব দিল না ছেলেটি।

বুদ্ধিমানেরা জেনে-শুনে ভুল করে না, তাড়াতাড়ি বল। বলল ক্যাপ্টেন। এর মধ্যে সকালের নাশতা নিয়ে এলো একজন। আগে খেয়ে পরে কথা হবে। গলার স্বর নরম হয়ে এলো।

এতক্ষণে খেয়াল হলো, সে খুবই ক্ষুধার্ত। হাত ধুয়ে হাত বাড়াল ট্রের দিকে। তাকে যত্ন সহকারে বানানো গমের আটার পাঁচটি রুটি, কয়েক টুকরো পনির, কমলা ও আঙুর খেতে দেয়া হয়েছে। তৃপ্তি সহকারে খেল ছেলেটি।

পেট ঠান্ডা হলে নাকি মাথাও ঠান্ডা হয়। তো এবার মাথা ঠান্ডা করে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

মেয়েটি কোথায়, এবার উত্তর দাও। এবার শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটির কাছ থেকে এবারও কোনো জবাব না পেয়ে ধৈর্যচ্যুত হলো ক্যাপ্টেন।

জবাব দাও। চমকে গার্ড দুজন একহাত পিছিয়ে গেল।

আমি বলব না। ছেলেটির কণ্ঠে এমন কিছু যা ক্যাপ্টেনকে স্তব্ধ করে দিল।

আর একবার ভেবে দেখ।

‘ভেবে দেখেছি।’

পেছনের গার্ড দুজনকে কী যেন ইশারা করল ক্যাপ্টেন। দুজনই এগিয়ে এলো। একজন চুল ধরে দাঁড় করাল ছেলেটিকে। অনেকদিন থেকে চুল না কাটানোর ফলে অনেক বড় হয়েছে। ধরতে সুবিধাই হয়েছে লোকটির। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও চেঁচাল না। সহ্য করার চেষ্টা চালাল।

টেনেহিঁচড়ে তাকে সেই দুই খুঁটির মাঝে দাঁড় করাল। দুই হাত খুঁটির সঙ্গে বাঁধল শক্ত করে। বুঝতে পারছে সে তার ওপর কী ধরনের নির্যাতন চালানো হবে।

ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন। হাতে চাবুক। চুল খামচে ধরে ঝটকা দিয়ে মাথাটা সোজা করে ধরল ছেলেটির। এখনো সময় আছে, মুখ খোল, বল মেয়েটি কোথায়। মুখ কুঁচকে বলল ক্যাপ্টেন।

কোনো জবাব দিল না ছেলেটি।

বুঝেছি, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। বলেই শপাৎ করে চাবুক কষল ক্যাপ্টেন ছেলেটির গায়ে।

প্রচণ্ড আঘাত, কোনো রকমে সহ্য করল। মাথা ঝুলে পড়েছে। দ্বিতীয় আঘাতটা কোনোরকমে নীরবে ঠোঁট কামড়ে সহ্য করল। আল্লাহর কাজে এ নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা প্রার্থনা করছে। তা না হলে জ্ঞান হারাতে চাচ্ছে। পরপর দশ-বারোটা চাবুকের ঘা গায়ে পড়তেই জ্ঞান হারাল ছেলেটি।

চাবুক মারা থামাল ক্যাপ্টেন। নিজেও খানিকটা হাঁফিয়ে উঠেছে। ইশারা করতেই চেয়ার এসে গেল। ছেলেটির সামনে চেয়ার নিয়ে বসল। চোখে-মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো তার। অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাল।

কি, এবার মুখ খুলবে?

মাথা এপাশ-ওপাশ করে জবাব দিল ছেলেটি।

তুমি হয়তো জানো না, আমি যত শক্ত তত নরম। আমি তোমাকে শেষবারের মতো ঠান্ডা মাথায় ভাবার জন্য অবকাশ দিচ্ছি। আমি ইচ্ছা করলে তোমার কাছ থেকে কথা আদায় করার জন্য নানা ধরনের নির্যাতন করতে পারি। শুনবে, সেসবের বর্ণনা? থাক সে সব। তুমি অতি বুদ্ধিমান মানুষ, সামান্য একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য নিজের মৃত্যু ঘটাতে চাইবে না, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

তার মনে? ক্যাপ্টেনের কথায় অবাক হয়েছে ছেলেটি।

তার মানে খুব সোজা। এখন সাড়ে বারোটা বাজে। তোমার সময় আজ বিকেল চারটা পর্যন্ত। এর মধ্যে মুখ খুলতে রাজি হলে বেঁচে গেলে, তা না হলে আজ বিকেলে তোমার সাড়ে বারোটা বাজানো হবে। তোমার পেছনে দেয়ার মতো সময় নেই, তাই আজই তোমার ঝামেলা মেটাতে চাই। কারণ তোমাকে ছাড়াও আমরা তাকে খুঁজে পাব। বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল ক্যাপ্টেন। কথা শেষ করে একটু দূরে দাঁড়াল। তিনজন গার্ডের দিকে তাকিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইশারা করল। হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। দুজন গার্ডের কাঁধে ভর দিয়ে এগোতে লাগল। পেছনে আছে একজন। যেসব জায়গায় চাবুকের ঘা পড়েছে, সেসব জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে। রক্ত জমে গেছে, ফেটে বের হলে ভালোই হতো।

বাংলোর নীচতলায় একটা ঘরে এনে ঢুকাল তাকে। একাই রেখে চলে গেল তিন গার্ড। বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়া হলো দরজা। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। বসে মেঝেতেই। চারদিকে তাকাল। এই কামরায় ওপাশে বারান্দা নেই। জানালা আছে, লোহার মোটা শিক লাগানো। দরজা খোলা থাকায় বাথরুমের অংশবিশেষ দেখা যাচ্ছে। এছাড়া এ ঘরে আছে একটা খাট, একটা করে টেবিল-চেয়ার; ঘরের আসবাবপত্র বলতে এই। আর আছে একটা দেয়াল ঘড়ি। মেঝেতে অনেকক্ষণ পর বসে থেকে বিশ্রাম নিল। ঘড়িতে একটা বাজার এলার্ম বাজতেই উঠে পড়ল। বাথরুমে পানি আছে। অনেকক্ষণ পর বের হয়ে এলো বাথরুম থেকে। ঠান্ডা পানিতে গোসল করে ব্যথা, ক্লান্তি, দুর্বলতা অনেকখানি কমে গেছে। জোহরের নামাজ পড়ে শোয়ার জন্য কেবল বিছানায় চড়েছে, এমন সময় দরজা খুলে গেল। দুজন ভেতরে ঢুকল।

একজন খাবার ট্রে হাতে, অন্যজন গার্ড। কাঁধে রাইফেল।

মাছ দিয়ে ভাত দিয়েছে, সেই সঙ্গে আছে শাকসবজি। মাছটা সামুদ্রিক চেনে ছেলেটি। কিন্তু নামটা খেয়াল করতে পারল না। ওয়েটার ও গার্ড পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরও জিজ্ঞেস করল না। খাওয়া শেষে ট্রে নিয়ে বিদেয় হলো দুজন। দরজা ওপাশ থেকে লাগানোর পর জানালার কাছে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। তাকিয়ে দেখল বাইরে দুজন গার্ড এলএমজি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে এই প্রথম এদের কাছে এলএমজি দেখল।

বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ হয়ে গেল একসময়। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসল। ঘড়িতে দেখল, চারটা পাঁচ বাজে। বাথরুমে ঢুকে পড়ল। বাধা দিল না গার্ড তিনজন। প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। বাথরুমে থেকে বেরিয়েই আছরের নামাজ আদায় করে নিল। চারটা বিশে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। দুজন দুপাশে, একজন পেছনে। একবার তাকিয়ে দেখল, পেছনের গার্ড তার অস্ত্র বাগিয়ে ধরে রেখেছে। সকালের মতোই টি-টেবিলের ওপাশে একটা চেয়ারে বসে আছে ক্যাপ্টেন। তবে এবার তার জন্য টুলের বদলে চেয়ার রাখা হয়েছে। কেউ বসতে বলবে তার অপেক্ষা না করে বসে পড়ল ছেলেটি।

বিশ্রাম কেমন হলো? সহজ-সরলভাবে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

ভালো। সংক্ষেপে জবাব দিল ছেলেটি।

চিন্তাভাবনা করার অনেক সময় পেয়েছ। এবার বল কী ঠিক করলে।

আমি মুখ খুলব না, ভেঙে ভেঙে জবাব দিল ছেলেটি।

কোনো ভাবান্তর ঘটল না ক্যাপ্টেনের। বরং হাসতে হাসতে বলল, দুদিনেরও বেশি সময় উভয়ে তো বেশ ভালোই কাটাল, দুদিন অনেক সময়, এবার তাকে আমার কাছে ফেরত দাও। বল এখন সে কোথায়…।

কথা শেষ করতে পারল না ক্যাপ্টেন। পাশেই বসে ছিল ছেলেটি। তার কথা সহ্য করতে না পেরে ঠাস করে চড় মেরে দিল ক্যাপ্টেনের গালে। মুহূর্তে মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল ক্যাপ্টেনের। তবে ছেলেটিকে অবাক করে দিয়ে শান্ত হয়ে বসে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে আঙুলের ছাপ বসে গেছে গালে।

লম্পট, নিজে যে মন-মানসিকতায় থাকে, অন্যকেও তাই ভাবে, নিজে চোর দেখে সবাইকে চোর ভাবে।

মিথ্যা অপবাদ দেয়ায় প্রচণ্ড রেগে গেছে ছেলেটি। দ্রুত রাগ দমিয়ে শান্ত হয়ে গেল।

ছেলেটিকে এভাবে শান্ত হতে দেখে ক্যাপ্টেনও অবাক হলো।

এখনো সময় আছে, ভেবে দেখ। মেয়েটির সন্ধান দিলে তোমাকে মুক্তি দেয়া হবে। তুমি যেখানে যেতে চাও, বহাল তবিয়তে সেখানেই তোমাকে পাঠানো হবে। ছেলেটি শান্ত হতেই তার দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে বলল ক্যাপ্টেন।

এমনিতেই সে মেয়েটির সন্ধান দিত না। তার ওপর ক্যাপ্টেনকে থাপ্পড় মেরেছে, এখন মেয়েটির সন্ধান দিলেও তাকে সে ছাড়বে না। বরং তার অধীনস্থ গার্ডদের সামনে তাকে অপমান করার চরম প্রতিশোধ নেবে। এটা তার চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখ তার প্রতিশোধের আগুনে ধিক ধিক করে জ্বলছে।

‘আবারও বলছি এখনো সময় আছে। সসম্মানে মুখ খোল’, এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

তা না হলে আমার নব উদ্ভাবিত পন্থা তোমার ওপর প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করব, মুখ খোলাব। এ ধরনের পন্থা হয়তো এর আগে আর কেউ আবিষ্কার করেনি। বলেই হো হো করে হেসে উঠল ক্যাপ্টেন। হাসি থামিয়ে বললÑ

সেটা অনেকেই এর মধ্যে জেনে গেছে, হয়তো এখানকার মধ্যে একমাত্র তুমিই জানো না, সেটা হবে তোমার জন্য চমৎকার এক সারপ্রাইজ, বলে আবার হেসে উঠল ক্যাপ্টেন।

কোনো কথাই বলছে না ছেলেটি।

শেষবারের মতো ভেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছি।

ধন্যবাদ, আমি বলব না।

তাহলে ভালোই হলো। তোমার ওপরই মুখ খোলার পন্থাটার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করব। গম্ভীর হয়ে গেল সে।

তুমি গাড়ি চালাতে জানো? প্রশ্নটা করল ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেনের হঠাৎ এ ব্যতিক্রমধর্মী প্রশ্নে বিপদের গন্ধ পেল ছেলেটি। সতর্ক হয়ে উঠল। সে কখনো মিথ্যে বলে না। হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে হয়তো বিপদে পড়বে। কিন্তু সে গাড়ি চালাতে জানে। মিথ্যে বলবে কীভাবে? তবে কি সে এবার সত্য-মিথ্যার পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছে! যা হওয়ার হবে, সত্যই বলবে।

‘কী হলো, জবাব দিচ্ছ না যে?’ ছেলেটির জবাব দিতে দেরি হচ্ছে দেখে বলল ক্যাপ্টেন।

‘হ্যাঁ, পারি’, সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে বলল ছেলেটি।

‘ঠবৎু মড়ড়ফ, ণড়ঁ ধৎব ধ ৎবধষু যড়হবংঃ সধহ, ঃযধহশং.’ আমার নব উদ্ভাবিত পন্থার এটাই একমাত্র দুর্বল দিক, অর্থাৎ কেউ যদি প্রশ্নের জবাবে বলে যে সে গাড়ি চালাতে জানে না, তবেই তার জন্য আমার এ পন্থা অচল। আসলে মানুষের সৃষ্টির মধ্যে একটা না একটা দুর্বল দিক থাকবেই, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মধ্যে দুর্বল দিক নেই’, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

কোনো কিছু বলল না ছেলেটি। তাকিয়ে আছে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা ছাদ-দরজাবিহীন জিপের দিকে। জিপটা যে খুবই পুরনো তা দেখেই বোঝা যায়।

‘এবার শোন আমার নব উদ্ভাবিত মানুষের মুখ থেকে তথ্য বের করার পন্থাটা, এই পন্থা বেশ কিছুদিন আগেই আবিষ্কার করি এবং এর ওপর বেশকিছু দিন রিসার্চও করেছি, তবে প্রয়োগ করার সুযোগ এতদিন পাইনি, আজ তোমার ওপর প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। এ তো গেল ভূমিকা, এখন আসল কথায় আস, বলে এক মুহূর্ত থামল ক্যাপ্টেন।

‘যেহেতু তুমি গিনিপিগ, এতএব তোমার জন্যই বলছি’, আবার থেমে শুরু করল।

‘এই যে পুরনো জিপটা দেখছ, ওটা সেকেলে আমলের হলে কী হবে, এখনো ভালোই চলে, তবে বর্তমানে ওটার ব্রেক ফাংশন ডাউন করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওটা ব্রেকহীন জিপ, কী মজার তাই না?’

এতে ক্যাপ্টেন মজার কী পেল তা বুঝতে পারল না ছেলেটি।

‘তবে জিপটার অন্যান্য ফাংশন ঠিক আছে। আমি তোমার জন্য নিজেই চেক করেছি, চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই জিপটাতে তুমি থাকবে এবং থাকবে একটা টাইম বোম।’

শেষের বাক্যটি শুনে ছেলেটি চমকে উঠল। ক্যাপ্টেনের কথা বিশ্বাস করতে তার কষ্ট হচ্ছে।

‘আরে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, জিপে তোমাকে শুধু বসে থাকতে হবে না, তুমি জিপটা চালিয়ে এখান থেকে নীচে নামাবে।’

এবারের শেষ বাক্যটা শুনে ঘামাতে শুরু করল ছেলেটি। ব্রেকহীন গাড়ি নিয়ে সে কীভাবে পাহাড়ি পথ ধরে নীচে নামাবে! ‘নীচে নামার সময় তোমাকে জিপের ক্লাচ, গিয়ার ও এক্সিলেটরের সাহায্যে নামাতে হবে। তাও সন্ধ্যার পর, তোমাকে অবশ্যই গাড়ির সিটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হবে এমনভাবে, যাতে তুমি গাড়ি থেকে নেমে যেতে না পারো।’ শান্তভাবে বলে চলেছে ক্যাপ্টেন, যেন ছোট বাচ্চাকে মিছেমিছি ভয় দেখাচ্ছে।

‘আর জিপে যে টাইম বোম থাকবে ওটার আরো একটা দিক আছে। সেটা হলো, বোমা বিস্ফোরণের যে সময়সীমা থাকবে তার অর্ধেকের মধ্যে যদি তোমার মতের পরিবর্তন হয়, তবে জিপে ওয়াকিটকি আছে, তার আছে, তার মাধ্যমে আমাকে জানাতে পারবে যে, তুমি মুখ খুলবে তাহলে……।’ বলে পকেট থেকে এন্টিনা লাগানো ছোট যন্ত্রটি বের করে আনল ক্যাপ্টেন।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৭ 21

জাকির আহমদ

১১ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৬

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব – ৬)

‘তার মানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি। ছেলেটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বলে উঠল মেয়েটি, ‘ও! বুঝেছি। এ কাপড়ের গন্ধে কুকুর খুব তাড়াতাড়ি আমাদের খুঁজে বের করবে।’

ওপরে-নীচে মাথা দোলাল ছেলেটি। সত্যি, মেয়েটির বুদ্ধি আছে।

‘বাথরুমে ঢুকে কাপড় বদলাই।’ বলল মেয়েটি।

‘আমিই বাথরুমে ঢুকছি, আপনি এখানে কাপড় বদলান। কাপড় বদলানো হলে দরজায় দুবার টোকা দেবেন।’ বলেই বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল ছেলেটি। ছেলেটি বাথরুমে ঢুকতেই বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল মেয়েটি। এপাশ থেকে দরজা লক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে স্প্রিংয়ের সাহায্যে দরজা সবসময় বন্ধ থাকে। শুধু ভেতর থেকে লাগানো যায়। এক মুহূর্ত ভেবে বারান্দা থেকে তার নিজের কাপড় এনে ঘরের বাতি নিভিয়ে অন্ধকারে কাপড় বদলাতে শুরু করল। দরজায় টোকা পড়ার একটু পরে বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো ছেলেটি। চোখ পড়ল দেয়াল ঘড়িতে। পেন্ডুলাম তার আপন নিয়মে দোল খাচ্ছে। দেখল, ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁই ছুঁই করছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি তার আগের পোশাকে।

‘সঙ্গে নেয়ার মতো আর কাপড় আছে কি?’

মাথা নাড়ল মেয়েটি।

‘চলুন তাহলে।’

প্রথমে ছেলেটি ফাঁক গলে বের হয়ে গ্রিল ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর কোমরে প্যাঁচানো কাপড়ের দড়িটা খুলে গ্রিলের একটা মোটা কাঠের সঙ্গে বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দিল। দেখল, নীচের প্রান্ত মাটি ছুঁই ছুঁই করছে। এরপর মেয়েটিকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করল।

ছেলেটির মতো মেয়েটিও বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রথমে গ্রিল ধরে ওপরে উঠেছে, তারপর টালির ছাদে দুহাত দিয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে নিজেকে বাইরে বের করে এনেছে। তারপর গ্রিলে ঝুলে পড়া কোনো সমস্যা হয়নি।

‘এখন ঝুলে নীচে নামতে পারবেন?’

‘পারব।’ জবাব দিল মেয়েটি। হয়তো বাইরের ঠান্ডা বাতাসে তার গলা কেঁপে গেল।

‘ঠিক আছে, সাবধানে নামুন। তারপর আমি নামব।’

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে দুই হাতে দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর কাঠের দেয়ালে পা ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো নীচে। মেয়েটি মাটিতে পা রাখতেই গ্রিল থেকে কাপড়ের দড়ির বাঁধন খুলে দিল ছেলেটি। তারপর লাফ দিয়ে নীচে। মাটিতে পা পড়তেই বসে পড়ল। পতনের শব্দটা বেশ জোরেই হলো। কাপড়ের রশি গুছিয়ে নিয়েছে ছেলেটি। এমন সময় মাথার ওপর সশব্দে জানালা খুলে গেল। জানালা থেকে প্রায় তিন হাত দূরে আবছা অন্ধকারে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। জানালা খুলে যেতে দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেল। ভীত হরিণীর মতো তাকাল ছেলেটির দিকে।

হঠাৎ ‘মেঁও ও’ ডাক শুনে আশপাশে তাকিয়ে কোনো বিড়াল দেখতে পেল না মেয়েটি। বুঝল এটা ছেলেটির কাজ।

‘ধ্যুত!’ বলেই জানালাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল অজ্ঞাত লোকটি। মনে মনে ছেলেটির উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করল মেয়েটি। আরো কয়েক মুহূর্ত যে যার যার জায়গায় স্থির হয়ে রইল। তারপর ছেলেটি কাপড়ের দড়ির বান্ডিলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই নড়ে উঠল মেয়েটি। বিনাবাক্যে পিছু নিল ছেলেটির। অল্পের জন্য বেঁচে গেল। তা না হলে বন্দী হতো দুজনেই। গাছপালার মাঝে ঢুকে পড়েছে। বাংলো এখনো চোখে পড়ে। অন্ধকারে বেশি দূরে দৃষ্টি যায় না।

চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। মাঝেমধ্যে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা হিম শীতল বাতাসে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। খালি গায়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। বাংলো থেকে আর একটু দূরে সরে গিয়ে বিছানার চাদরের টুকরো ও পর্দার কাপড়ের গিট খুলে সেগুলো গায়ে জড়িয়ে ঠান্ডা কিছুটা নিবারণ করা যাবে। একটা ঠান্ডা দমকা হাওয়ায় দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ করে উঠল ছেলেটির। সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হলো, ওই লোকটিও তো খালি গায়ে মাটিতে পড়ে আছে। সেও নিশ্চয়ই তার মতোই কাঁপছে। নাহ, লোকটিকে এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। সে অহেতুক ঠান্ডায় কষ্ট পাবে। লোকটির জন্য সে কী করতে পারে তা নতুন করে ভাবার দরকার হলো না। বাংলো থেকে বেশি দূরে আসেনি তারা। এখন ফিরে যাওয়া ঝুঁকিবহুল হলেও লোকটিকে ওভাবে ফেলে যেতে মন সায় দিল না ছেলেটির। দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘আমার একটু কাজ আছে, দয়া করে এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ান। আমি একটু পরেই ফিরে আসব। আর আমার বিপদ হয়েছে বুঝতে পারলে, আপনি চলে যাবেন।’ এক নিঃশ্বাসে বলে থামল ছেলেটি।

‘কী কাজ?’

‘আপনার না শুনলেও চলবে।’

‘আমার একা থাকতে ভয় লাগবে।’

হেসে ফেলল ছেলেটি। ‘চালাকি, না! আচ্ছা, আসুন আমার সঙ্গে।’ আবার গম্ভীর হয়ে গেল সে।

পৌঁছে গেল লোকটির কাছে। লোকটিকে এ অবস্থায় দেখে যা বোঝার বুুঝে নিল মেয়েটি। একবার লোকটির দিকে, আর একবার ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না, ছেলেটি তার ওই জখমওয়ালা দুর্বল শরীর নিয়ে কীভাবে এ লোকটিকে বন্দী করেছে? আবর এ লোকটির কাছে ফিরেইবা এলো কেন?

কারো আসার শব্দে চোখ মেলল লোকটি। ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটিকে দেখে খুব অবাক হয়েছে। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। তাকে কি আরো কষ্ট দেয়ার জন্য ছেলেটি আবার এসেছে?

ছেলেটির কাজ দেখে মেয়েটি। গিট খুলে পর্দা, চাদরের টুকরো আলাদা করে ফেলল। এক মুহূর্ত থামল। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর একটা দরজার পর্দা মাটিতে বিছিয়ে দিল। উঠে লোকটির কাছে এসে ‘ম্যাডাম, আমাকে একটু সাহায্য করুন।’ বলে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল কী করতে হবে। এক মুহূর্ত আবাক হয়ে মেয়েটি তাকিয়ে থাকল তার দিকে।

দুজনে মিলে ধরাধরি করে লোকটিকে কাপড়ের পর্দার ওপর শুইয়ে দিল। আর একটা পর্দা দিয়ে লোকটিকে ঢেকে দিতে যাবে, এমন সময় যেন তাদের দুজনকে চমকে দিয়ে ভেসে এলো কণ্ঠটি।

‘ও দোস্ত, বেরিয়ে আস, মাফ করো, আসতে দেরি হয়ে গেল।’ এক মুহূর্ত থামল।

‘কী ব্যাপার বেরিয়ে এসো, এখন আমার পালা, যাও ঘুমিয়ে পড়।’

কথা কানে আসতেই প্রথমে স্থির হয়ে গেল দুজনেই। বিমূঢ় ভাবটি প্রথমে ছেলেটিই কাটিয়ে উঠল। কথা বলার সময়, সুযোগ কোনোটাই নেই। লোকটি কাছেই আছে। এদিকেই আসছে।

‘এদিকে আসুন।’ চাপা গলায় বলে ছেলেটি একটা বড় গাছের নীচে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও তার পাশে এসে দাঁড়াল। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

‘কোনো শব্দ করবেন না’, বলল ছেলেটি। চোখ পড়েছে একটু দূরে থাকা রাইফেলটির ওপর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল দ্রুত। পা টিপে টিপে দ্রুত সেখানে পৌঁছে গেল। রাইফেল হাতে নিয়ে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তার একটু পাশ দিয়ে লোকটি চলে গেল। কিন্তু সামনে নজর থাকায় তাকে দেখতে পায়নি। এগোতে এগোতেই বলছে, ‘আরে দোস্ত, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পাহারা দেয়া হচ্ছে নাকি?’

কয়েক কদম এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল আগন্তুক। আন্দাজ করে ফেলেছে কী ঘটেছে। ঘুরে দাঁড়াতে যাবে, কিন্তু তার আগেই রাইফেলের নল পিঠে ঠেকে গেল এবং শুনল, ‘হাত দুটো মাথার ওপরে তুলুন, ঝামেলা বাধালে গুলি করতে দ্বিধা করব না।’ শীতল গলায় বলল ছেলেটি। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম পালন হলো। হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল আগন্তুক।

‘প্রথমে বসে পড়ুন, তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন’, নির্দেশ করল ছেলেটি। নির্দেশ পালন করতে করতে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল লোকটি, ‘কে আপনি, কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন?’

‘যাকে আজ বিকেলে বনে নির্বাসন দিয়েছিলেন’, জবাব দিল ছেলেটি।

‘আপনি!’ অবাক হয়েছে লোকটি। ‘এ কী করে সম্ভব?’ উত্তেজনায় আওয়াজ একটু উঁচুই হয়ে গেল।

রাইফেলের নল পিঠে একটু বেশি চেপে ধরে, ‘আস্তে, কোনো চালাকির চেষ্টা করলে মরতে হবে।’

উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে লোকটি।

‘ম্যাডাম, একটু এদিকে আসুন’, নীচু গলায় ডাকল ছেলেটি।

এতক্ষণ তন্ময় হয়ে গাছের আড়ালে থেকে সব দেখছিল মেয়েটি। লোকটি যখন এগিয়ে আসছিল, তখন ঘুরে দৌড় দেয়ার ইচ্ছেটা অনেক কষ্টে দমন করেছিল। ডাকতেই কাছে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটি।

‘এটা ধরুন, নড়াচড়ার চেষ্টা করলেই টিপে দেবেন ট্রিগার। এটা এখন সেমিতে আছে।’ বলে মেয়েটির হাতে রাইফেল ধরিয়ে দিয়ে কাজে গেল। প্রথমে একটা জানালার পর্দা টুকরো টুকরো করে আগের লোকটির মতো এ লোকটারও হাত-পা বাঁধল। বাধা দিল না লোকটা।

‘আপনাদের ভাগ্য বড়ই ভালো যে, সকাল ছ’টায় আমার ডিউটি শেষ। তার আগে এদিকে হয়তো কেউ আসবে না। আর ও রাতে কোয়ার্টারে না ফিরলেও কেউ তা পাত্তা দেবে না।’ ছেলেটি তার হাত-পা বাঁধতে বাঁধতে বলল লোকটি।

তার ক্যাপ্টেনের পকেট থেকে রুমাল বের করে তার মুখে গুঁজে দিয়ে মুখ বেঁধে দিল। তারপর মেয়েটির হাত থেকে রাইফেল নিয়ে পাশে রাখল। আর একট পর্দার কাপড় আছে, তা বিছিয়ে এ লোকটিকেও আগের মতো একজন সামনে আর একজন পেছনে ধরে তার ওপর শুইয়ে দিল। এ আগন্তুকের কাপড় পরাই আছে, তাই অবশিষ্ট দুটো জানালার পর্দা দিয়ে প্রথম লোকটিকে ভালোভাবে ঢেকে দিল। মুখ বাইরে রাখল। কী মনে হতে আগন্তুকের রাইফেলের ম্যাগাজিন খুলে নিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা পর্দার ছেঁড়া এক অংশ দিয়ে তা প্রথম পাহারাদারের রাইফেলের সঙ্গে ভালোভাবে বেঁধে নিল। আগন্তুকের হাত বাঁধার আগেই তার কাঁধ থেকে রাইফেল খুলে রেখেছিল।

মখমলের চাদরের একাংশ নিজের গায়ে পেঁচিয়ে নিল। অপর অংশ মেয়েটিকে। তারপর কাঁধে রাইফেল ফেলে এগোতে যাবে এমন সময় প্রথম পাহারাদারের গ্যাস লাইটারটার কথা স্মরণ হলো। বেঁচে থাকার জন্য পানির মতো আগুনও প্রয়োজন। যেখানে প্রথম লোকটার শার্ট ছিঁড়ে ছিল, সেখানে এখনো সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার পড়ে আছে। লাইটারটা হাতে নিয়ে তার মালিকের কাছে এলো ছেলেটি। মাথা নামিয়ে আনল নীচে লোকটির জবাব পাওয়ার আশায়। ‘আমি কি এই লাইটারটা নিয়ে যেতে পারি?’ লোকটার কাত করা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল ছেলেটি। ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ল লোকটি। আবছা অন্ধকারেও লোকটির চোখের পানি দেখতে পেল ছেলেটি। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি।

‘আপনি কাঁদছেন? আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল ছেলেটি।

এবার ‘না’ বোধক মাথা নাড়ল সে।

‘ওনার এ কান্না কৃতজ্ঞতার’, বলল মেয়েটি। যেন মেয়েটির কথার সমর্থনে আবার মাথা নাড়ল লোকটি।

হঠাৎ করেই মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেল ছেলেটির। উঠে দাঁড়াল। একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে ‘ম্যাডাম, এটা আপনার কাছে রাখুন’, বলে লাইটার বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। তাকিয়ে আছে অন্যদিকে। মেয়েটি লাইটারটা হাতে নিতেই কাঁধে রাইফেল ভালোভাবে ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করল। পিছু নিল মেয়েটি।

সময় বয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দুজনে নীচে নেমে চলেছে। অনুমান আর দুই-আড়াই ঘণ্টা পর সূর্য উঠবে। পূর্বাকাশ ফর্সা হবে তারও আগে। সময় খুব কম। তার আগেই পৌঁছাতে হবে। দূরত্ব কখনো কমে যাচ্ছে পাহাড়িয়া অচেনা পথের কারণে। তার ওপর আবার আঁধার রাত্রি। আকাশের তারকারাজির আলোয় এ অন্ধকার দূর হচ্ছে না। বনে নানারকম কীটপতঙ্গের একটানা কর্কশ শব্দ। পেছনে নিরাপদ দূরত্বে তাকে অনুসরণ করছে মেয়েটি। একটু পিছিয়ে পড়লেই জানিয়ে দিচ্ছে। তখন দাঁড়িয়ে দূরত্বটা কমিয়ে আনছে ছেলেটি পেছনে না তাকিয়েই। হাঁটছে আর ভাবছে মেয়েটি। এই অল্প সময়েই বুঝতে পেরেছে যে ছেলেটি সত্যিই অদ্ভুত। আচ্ছা, কোথায় চলেছে ছেলেটি?

‘সমুদ্রের দিকে’, হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল ছেলেটি।

‘কেন?’

‘আমার মনে হয় আজ রাতে না হলেও কাল সকালেই কুকুরের সাহায্যে আমাদের পিছু ধাওয়া করা হবে।’

‘তাতে কী? সৈকতে কি নৌকা পাওয়া যাবে?’

‘হয়তো যাবে না, কিন্তু আমরা সৈকতে হাঁটু পানি দিয়ে কিছুদূর হেঁটে আবার এ দ্বীপের কোথাও আপাতত লুকিয়ে থাকব। ফলে তারা কুকুরের সাহায্যে আর আমাদের পিছু নিতে পারবে না। আমাদের ট্রাক হারাবে, পরে সময়-সুযোগমতো আমরা এই দ্বীপ থেকে পালাব। আর ততদিন এই পাহাড়িয়া বনেই কোথাও লুকিয়ে থাকব।’ একনাগাড়ে বলে থামল মেয়েটি। ‘হ্যাঁ’ সত্যিই আপনার বুদ্ধি আছে।’ প্রশংসা না করে পারল না ছেলেটি। প্রশংসায় মেয়েটির সুন্দর গোলাপি ফর্সা মুখখানি লাল হয়ে উঠল। তা দেখার জন্য ঘুরে তাকাল না ছেলেটি। হেঁটে চলেছে একইভাবে।

প্রায়ই গাছের ডালপালা হাত দিয়ে সরিয়ে, ঝোপের পাশ দিয়ে, পাহাড়ের ধার দিয়ে, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে চলেছে দুজনে। কখনোবা অগভীর খাদে লাফিয়ে নামতে হচ্ছে। আঁকাবাঁকা দুর্গম পথে অন্ধকারে হাঁটতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে দুজনেই। তার ওপর যতই নীচে নামছে ততই গাছপালার ঘনত্ব কমে আসছে। এর ফলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধার মাত্রাই বেশি। গাছপালার পরিমাণ কমে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা হিমশীতল বাতাসের প্রকোপ বেশি হচ্ছে। একটু পরপর ঠান্ডায় কেঁপে উঠছে মেয়েটি। দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঠান্ডাটা অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার জিন্সের প্যান্ট ভেদ করে ঠান্ডা তেমন কাবু করছে না। তবে ওপরের অংশে জামার ওপর চাদর থাকার পরও তার ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা। হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটির ওপরের অংশে চাদর জড়ানো ছাড়া আর কিছুই নেই; আর নীচে যে পায়জামাটা আছে তাও ঠান্ডা ঠেকানোর উপযোগী নয়। তাহলে তো ছেলেটির অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।

একটি পাহাড়ের ধার বেয়ে নীচে নেমে গেল ছেলেটি। ব্যাপারটি তারও খেয়াল হয়েছে যে, যতই নীচে নামছে ঠান্ডার প্রকোপও বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে। নীচে নামা যদিও খুব পরিশ্রমের কাজ না, তারপরও এতক্ষণ একনাগাড়ে হাঁটতে যা পরিশ্রম হয়েছে তাতে মোটেও গা গরম হয়নি। বরং মরা মানুষের মতো গা ঠান্ডা আছে। ভাবছে, সমুদ্র আর কত দূরে? সূর্য ওঠার আগেই লুকিয়ে পড়তে পারবে তো! নাকি ধরা পড়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। পথের দিকে মনোযোগ থাকায় সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে। হয়তো হাতে সময় খুব কম।

‘শুনুন।’

শব্দটা কানে যেতেই থেমে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি। দেখল গায়ের চাদর খুলছে মেয়েটি।

‘কী করছেন?’

‘আপনার চাদরের নীচে কোনো কাপড় নেই, হয়তো খুব ঠান্ডা লাগছে। আমার ততটা লাগছে না।’ বলতে বলতে চাদরের অংশটা বাড়িয়ে ধরল ছেলেটির দিকে।

‘এটা গায়ে জড়িয়ে নিন।’

মেয়েটিকে কী বলবে ঠিক করতে সময় লাগল তার। তার যে ঠান্ডা লাগছে তা সত্যি। তাই বলে মেয়েটির যে কম ঠান্ডা লাগছে তা নয়। হতে পারে মেয়েটি তার আসল অবস্থা ঢেকে রেখে তাকে চাদরটি দিতে হচ্ছে। হাত বাড়াল না ছেলেটি। ‘লাগবে না, ধন্যবাদ।’

‘নিন’, আবার বলল সে। ‘আপনার ঠান্ডা লাগলে অসুখ হবে’, মেয়েটির কণ্ঠে আকুতি। এমন সময় দমকা হাওয়া বয়ে গেল। কেঁপে উঠল ছেলেটি। গায়ে চাদর না থাকায় মেয়েটি তার চেয়েও আরো বেশি কেঁপে উঠল, তা পরিষ্কার দেখল ছেলেটি।

‘এটা আমাকে দিলে আপনার আমার চেয়ে বেশি ঠান্ডা লাগবে, আর আপনি অসুস্থ হলে আমাদের পালানো কঠিন হবে। অতএব…’

কথা শেষ করতে দিল না মেয়েটি। ‘আমার গায়ে যে কাপড় আছে, তাতেই ঠান্ডা কেটে যাবে, নিন এটা’, বলে আরো বাড়িয়ে ধরল চাদরটি।

‘আপনি একটু আগে যেভাবে কেঁপে উঠেছিলেন, চাদরটি গায়ে থাকলে কি ওভাবে কেঁপে উঠতেন?’

‘না’, মাথা নীচু করে সত্য জবাব দিল।

‘তাহলে, ওটা আমার বদলে আপনি গায়ে জড়িয়ে নিন, সময় খুব কম।’

মেয়েটি গায়ে আবার চাদরটি জড়িয়ে নিল একরকম বাধ্য হয়ে। কারণ সে তর্কে হেরে গেছে।

দুজনেই নীচে নেমে চলেছে। হাঁপিয়ে উঠেছে দুজনেই, বিশ্রাম নেয়ার সময় নেই, তাই থামছে না। তবে ছেলেটির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পা বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। দুজনেই ভাবছে নানা কথা।

একটা ঢাল বেয়ে অতি সাবধানে নীচে নামছে। হেঁটে নামার গতি বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে দুজনেই। এ রকম আরো কয়েকটা বিপজ্জনক ঢাল বেয়ে নেমেছে। হঠাৎ করেই ঢালের একটা গর্তে পা দিয়ে ফেলল ছেলেটি। আগে দেখতে পায়নি। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল ঢালের রপর। কাঁধ থেকে ছিটকে পড়ল ভারী রাইফেল। গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল ছেলেটি।

অকস্মাৎ ছেলেটিকে পড়ে যেতে দেখে দিশা হারিয়ে ফেলল মেয়েটি। ভুলেই গেল, ঢালু জায়গায় দৌড় দেয়া কতটা বিপজ্জনক। ছেলেটির সাহায্যে দৌড়ে এগোতে গেল সে। কিন্তু এক মুহূর্ত পর সেও গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল। নীচে একটি টিলার গোড়ায় পৌঁছে থেমে গেল ছেলেটি। গড়িয়ে নামার সময় বুঝতে পেরেছিল, তার পেছন পেছন মেয়েটিও গড়িয়ে নামছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সেখান থেকে লাফিয়ে সরে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর মেয়েটিও একই জায়গায় এসে টিলার গোড়ায় মৃদু ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। নিথর হয়ে পড়ে রইল মেয়েটি। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ছেলেটি।

‘আপনি ঠিক আছেন তো, নাকি আঘাত পেয়েছেন?’ কথা কানে যেতেই ধীরে ধীরে উঠে বসল মেয়েটি। মুখের ওপরে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে তাকাল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। দৃষ্টি যে নীচের দিকে তা এ আঁধার রাতেও বোঝা যায়। তাছাড়া আশপাশটা ফাঁকা বলে তারকারাজি কিছুটা হলেও আঁধার দূরীভূত করেছে।

‘আপনি কি আঘাত পেয়েছেন?’ জবাব না পেয়ে এবার তার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

‘না’, কোনোমতে উচ্চারণ করতে পারল মেয়েটি। এখনো কাঁপছে।

‘আলহামদুলিল্লাহ’, কী যেন ভাবল ছেলেটি।

‘ঢালে রাইফেলটা পড়ে আছে, নিয়ে আসি। আপনি ততক্ষণে বিশ্রাম নিন’, বলেই আর দাঁড়াল না সে।

সব বুঝে ফেলেছে মেয়েটি এরই মধ্যে। এত সুন্দর মন-মানসিকতার, এত সুন্দর চরিত্রের, এত আদর্শবান কি আসলেই কেউ হতে পারে! নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল মনে মনে, ‘হ্যাঁ পারে, তার প্রমাণ এ ছেলেটি। এ ছেলেটি তাকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জের দরজায় ধাক্কা দেয়নি, দিতে পারে না। হয়তো ওটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল। ছেলেটির সম্পর্কে তার ভুল ধারণা আজ সত্যি ভেঙে গেল।

রাইফেল নিয়ে ফিরে এলো ছেলেটি। তারপর আবার পা ফেলা শুরু হলো। সুবহে সাদিকের কিছু আগে সমুদ্রের গর্জন শুনে বিনাবাক্যে খুশি হয়ে উঠল দুজনেই। এক সময় সৈকতে এসে পৌঁছল। ঢেউ আসছে, ফিরে যাচ্ছে, আবার আসছে। বিরামহীনভাবে চলছে এ খেলা। কোনো কোনো ঢেউ সৈকতের অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে, আবার নেমে যাচ্ছে দ্রুত। হাঁটু পানি দিয়ে এগিয়ে চলল পূর্ব দিকে। দুজনেরই হাঁটু পর্যন্ত কাপড় ভিজে গেছে। পানি যেন বরফ শীতল। ঠান্ডায় দুজনেই ঠকঠক করে কেঁপে চলেছে। কোনো কোনো ঢেউ হাঁটুর ওপরেও খানিক ভিজিয়ে দিচ্ছে। ডানে সমুদ্র। বাঁয়ে কিছুদূর বালিয়াড়ি, তারপর পাহাড়, গাছপালার শুরু। বেশ কিছুদূর হেঁটে এসেছে। সামনে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু টিলা। সেগুলো যেন সমুদ্র থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে। ওপাশে গেলে সাঁতরিয়ে যেতে হবে। টিলাগুলোর কাছে এসে থামল ছেলেটি। আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য উঠবে।

ছেলেটি দাঁড়িয়ে গেল ফজরের নামাজে। একটু দূরে বসে পড়ল মেয়েটি। মুখে ক্লান্তির ছাপ।

‘এখন কোনদিকে যাওয়া যায়?’ খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। সকালের সোনালি রোদের সোনালি রং যেন সাগরের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

‘বুঝতে পারছি না, কোনদিকে যাওয়া যায়’, একমুহূর্ত ভেবে বলল মেয়েটি।

‘সময় কম, আর কিছুক্ষণের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে পড়তে না পারলে ধরা পড়ে যেতে পারি। একটা উপায় বের করতেই হবে’, বলল ছেলেটি। ঝরনার দিকে লুকানোটা বোকামি হবে ভাবল ছেলেটি। ওদিকেই প্রথম খুঁজবে একটু পর।

‘আবার জঙ্গলে ঢুকে পড়া ছাড়া তো কোনো উপায় দেখছি না’, মুখ খুলল মেয়েটি।

‘এছাড়া আপাতত আমিও কোনো উপায় দেখছি না’, বলল মেয়েটি।

‘তাহলে উঠে পড়ি।’

একটু পরই যেখান থেকে পাহাড় শুরু হয়েছে, সেখানে পৌঁছে গেল ওরা। উঠতে শুরু করল ওপরের দিকে। নামা যত সহজ ছিল, ওঠা ততই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সৈকত থেকে একটা ছোট্ট টিলায় উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল দুজনেই। এখনো তারা জায়গায় আছে। দূর থেকে যে কেউ দেখতে পাবে। একটু ওপর থেকে গাছপালা-জঙ্গল শুরু হয়েছে। সেখানে পৌঁছলে নিজেকে কোনোমতে লুকানো যাবে। ভালোভাবে লুকাতে হলে আরো অনেক ওপরে উঠতে হবে। তবে সে জন্য গায়ে শক্তি দরকার। এরই মধ্যে অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে তার। ক্ষুধায় কাতর দুজনেই। ছেলেটি গতদিন দুপুরে কয়েকটা রুটি খেয়েছে মাত্র। তারপর থেকে পানি ছাড়া আর কিছুই পেটে যায়নি। আর মেয়েটি গত রাতে খেলেও দুশ্চিন্তার কারণে পেট ভরে খায়নি। তারপর আর কিছুই খায়নি। বাঁচার তাগিদে দুর্বল শরীর নিয়েই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছে। আগে আছে ছেলেটি। কয়েক হাত পেছনে আছে মেয়েটি। একসময় গাছপালার ভেতরে ঢুকে পড়ল। এদিকে গাছপালা কম। আরো ওপরে উঠতে হবে। মেয়েটির সঙ্গে অন্য কোনো বোঝা নেই। কিন্তু ছেলেটির রাইফেলটি বয়ে নিয়ে উঠতে দ্বিগুণ কষ্ট হচ্ছে। ভাবছে, রাইফেলটি সঙ্গে রেখে কী হবে? সে অকারণে মানুষের ক্ষতি করতে চায় না। দু-একজনকে ঠেকানোর জন্য রাইফেল ব্যবহার করতে গেলে যে বিকট শব্দ হবে তাতে বাকি সবাই তাকে ঘিরে ফেলবে। তাছাড়া হয়তো এটার প্রয়োজন নাও হতে পারে। কারণ যারা তার পেছনে লাগবে তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আর কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরলে বন্দুক চালিয়ে কী হবে? তারাও খালি হাতে থাকবে না। এসব যুক্তি দিয়েও রাইফেলটি ফেলে যেতে ইচ্ছে হলো না। হাতে একটা অস্ত্র তো আছে!

আচ্ছা, মেয়েটিও কি তার মতো কিছু নিয়ে ভাবছে? কী নিয়ে ভাবছে? ধ্যুত! এসব কী সে ভাবছে? সে কী ভাবে ভাবুক। ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে মেয়েটির। অথচ খাবার পাওয়ার বিষয়টা অনিশ্চিত। ক্ষুধা নিবারণের কি কোনো ব্যবস্থা করা যায় না? এ ব্যাপারে সে কি ছেলেটিকে কিছু বলবে? না থাক, ছেলেটিরও হয়তো আমার মতো অবস্থা হয়েছে।

ছেলেটি যে থেমে দাঁড়িয়েছে তা আগে দেখতে পায়নি সে। যখন দেখতে পেল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলাতে পারল। তা না হলে ছেলেটির গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তা হতো এক লজ্জাজনক ঘটনা। কী জন্য ছেলেটি দাঁড়িয়েছে এতক্ষণে দেখতে পেল সে। তিন হাত সামনে দিয়ে চওড়া এক খাদ ডানে-বাঁয়ে চলে গেছে। কতদূর গেছে দেখা যায় না। কোনো কথা না বলে একটু ডানে সরে গেল ছেলেটি। খাদটি দেখল। আশপাশের তুলনায় এ জায়গাটার চওড়া কম, লাফিয়ে পার হওয়া যবে। আগে আমি পার হচ্ছি, তারপর আপনি।

ওপাশে পৌঁছে দাঁড়াল ছেলেটি। লাফ দিতে দ্বিধা করছে মেয়েটি। ছেলেটি কোনোমতে পার হয়েছে। আর মেয়েটি কম গভীরতা নেই বরং বেশি আছে। আর খাদ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে তা খুঁজে বের করার সময়ও নেই।

‘আমাকে তোলার ব্যবস্থা করুন’, কেঁপে গেল তার কণ্ঠ।

ছেলেটি হাত বাড়িয়ে তাকে তুলে আনতে পারে। এটাই সবচেয়ে সহজ। কিন্তু কিছুতেই বিবেক সায় দিচ্ছে না। জোর চেষ্টা চালাচ্ছে অন্য কোনো উপায় বের করার। খাদের কিনারে বসে খাদের অপর পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির কথা কানে যেতেই যেন বাস্তবে ফিরে এলো ছেলেটি।

‘ওহ! কিছু বললেন?’

মেয়েটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটির কথা শুনে অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে।

‘আমাকে ওপরে তোলার কথা বলেছিলাম।’

‘আমিও এতক্ষণ সে কথাই ভাবছিলাম’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি।

‘এখানে ভাবার কী আছে?’ ছেলেটির কথা বুঝতে পারল না সে।

সূর্য অনেক ওপরে উঠেছে। উঠে দাঁড়াতে যেতেই গা থেকে চাদরের একাংশ পড়ে গেল। হঠাৎই যেন উপায়টা বের হয়ে এলো। ফলে মেয়েটির কথা তার কানে ঢুকেও ঢুকল না। চাদরের একাংশ নামিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘এটা ধরে ওপরে উঠতে পারবেন না?’ ‘পারব।’

‘তাহলে উঠে আসুন’, বলে চাদরের অপর মাথা শক্ত করে ধরে খাদের কিনার থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল, যেন মেয়েটিকে তুলতে গিয়ে সেও না পড়ে। ওপরে উঠে এলো মেয়েটি। দুটি চাদরই দুজনের ঘাড়ে শোভা পাচ্ছে। নীরবে এগিয়ে চলছে দুজনে। এর মধ্যে মাত্র দুবার বিশ্রাম নিয়েছে। ওপরে উঠছে বলে দ্রুত হাঁপিয়ে উঠছে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্রাম নিতে থেমেছে। একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়েছে ছেলেটি। বুকের ওপর মাথা নামিয়ে এনেছে। খানিক দূরে একটি বড় পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে মেয়েটি।

মাথা তুলল ছেলেটি। ‘আপনার কি খুব ক্ষিদে লেগেছে?’

ক্ষিদেয় নাড়িভুঁড়ি সব হজম হওয়ার উপক্রম। তারপরও মাথা দুলিয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিল মেয়েটি।

‘আমার কিন্তু খুব ক্ষিদে লেগেছে, আপনারও হয়তো লেগেছে, কিন্তু তবুও অস্বীকার করলেন।’

‘লেগেছে, তবে এখন পর্যন্ত তো কোনো খাদের সন্ধান পাওয়া গেল না।’

‘পেটে কিছু না পড়লে তো আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শক্তি ফুরিয়ে যাবে’, আশপাশে তাকাতে তাকাতে বলল ছেলেটি।

‘আচ্ছা, আর ওপরে না যেয়ে এখানে থেকে গেলে হয় না?’ বলল মেয়েটি।

‘এখানে আশপাশে ঘন জঙ্গল নেই। ঘন জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে, আরো কিছু ওপরে ঘন জঙ্গল আছে।

‘কেন? নীচেও তো ঘন জঙ্গল থাকতে পারে।’

‘তাহলে অনেক খুঁজতে হবে। আর আমার মনে হয় নীচের দিকেই ওরা বেশি খুঁজবে। আমরা যে ওদের কাছেই যাব এমনটা হয়তো ওরা চিন্তাও করবে না।’

‘তাহলে ওঠা যাক।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। দুজনেই মুখ বুজে ক্ষিদে সহ্য করছে। উভয়েই খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ছেলেটির ইচ্ছে হচ্ছে এখানেই থেকে পড়ে। কিন্তু বুঝতে পারছে এখানে থামলে আত্মঘাতীর শামিল। সে নিজেই যখন অনেকদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে, তখন এখানে থামা বোকামি হবে। সে যতটুকু জানে আরো ওপরে লুকানোর মতো গাছপালা-পাহাড়ের আড়াল পাবে। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক তাদের সেখানে পৌঁছতেই হবে। তাহলে পুনরায় ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকবে।

কোনদিক দিয়ে গেলে তুলনামূলকভাবে সহজে ওপরে ওঠা যাবে তা দেখার জন্য আশপাশে দেখতে দেখতে পা ফেলছে ছেলেটি। পেছনে আছে মেয়েটি। একটু দূর দিয়ে একটি বড় গাছ অতিক্রম করছে। মাটির ওপরে থাকা গাছটির মোটা শিকড়ে পা বেঁধে গেল ছেলেটির। আছড়ে পড়ল মাটিতে।

দৌড়ে পাশে এসে বসল মেয়েটি। উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। কী করবে বুঝতে পারছে না। এখনো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

‘আপনার কি খুব লেগেছে?’

মুখের জবাব পাওয়া না গেলেও ততক্ষণে নড়ে উঠেছে। উঠে বসল। নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল।

ছেলেটি কিছুই বলল না। মুখ দেখেও কিছু বোঝা গেল না। ছেলেটি খুব ব্যথা পেয়ে থাকলে যাত্রায় এখানেই ইতি। পাশে এসে আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটিÑ ‘আপনি খুব ব্যথা পেয়েছেন?’ চেষ্টা করেও মুখে উৎকণ্ঠার স্বরটা লুকাতে পারল না। অনেক কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল ছেলেটি। সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খুব একটা পাইনি।’ মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টাটা বলা চলে এখানেই হলো। খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে ছেলেটির কাছ থেকে দূরে সরে গেল।

একটু এগিয়েই ছেলেটি বুঝতে পারল বাম পায়ে সে ভালোই আঘাত পেয়েছে। ব্যথায় মাটিতে পা ফেলাই দায় হয়ে পড়েছে। পা-টা ধীরে ধীরে ফুলে যাচ্ছে। নাহ, আর পারছে না সে। বসে পড়ল মাটিতে। দুই পা ছড়িয়ে বসল সামনে। তাকে হঠাৎ বসতে দেখে মেয়েটিও একটু দূরে হাঁটু গেড়ে বসল। ছেলেটির দিকে একবার তাকিয়েই বুঝতে পারল, সে খুব কষ্টে ব্যথা সহ্য করছে। দুহাত দিয়ে তার বাম পায়ের গোড়ালি চেপে ধরেছে।

‘আপনি তো খুবই আঘাত পেয়েছেন, ভেঙে যায়নি তো?’

আবারও মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার জন্য অনেক কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল, তবে হাসিটা বড়ই বিষণ্ন দেখাল। মুখে বলল ‘মনে হয় ভাঙেনি।’

‘আমরা তবে আপাতত এখানেই থামব?’

‘না। কারণ হয়তো এতক্ষণে আমাদের বিশেষ করে আপনাকে ধরার জন্য ক্যাপ্টেন তার দলবল মাঠে নামিয়েছে। এ রকম ফাঁকা জায়গায় থামাতো দূরের কথা, হাঁটাও নিরাপদ নয়।’

‘আপনি কি এ অবস্থায় হাঁটতে পারবেন?’

মাথা দুলিয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিল ছেলেটি।

‘তবে কীভাবে এগোবেন?’ এক মুহূর্ত থামল মেয়েটি।

‘যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলি।’ বলে থামল মেয়েটি।

‘বলুন’, মাথা নীচু করে রেখেছে ছেলেটি।

‘আপনি আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে পারেন।’

ধন্যবাদ দিয়ে তাকে ছোট করতে চাইল না ছেলেটি।

‘তার হয়তো দরকার হবে না, আমি এ রাইফেলে ভর দিয়ে হাঁটতে পারব। মেয়েটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাইফেলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে শুরু করছে সে।

রাইফেলে ভর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে যে কী রকম কষ্ট হচ্ছে, তা মেয়েটি ভালোই বুঝতে পারছে। সে এর মধ্যে বুঝে ফেলেছে, ছেলেটি সাধারণ আর দশটা ছেলে থেকে একদম ভিন্ন। ছেলেটি তাকে খাদ থেকে হাত বাড়িয়ে সহজে তুলতে পারত। তাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তা না করে সে তাকে স্পর্শ না করেই তোলার উপায় বের করার জন্য ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল। ছেলেটি যে রকম ব্যথা পেয়েছে, তাতে রাইফেলে ভর দিয়ে হাঁটার চেয়ে তার সাহায্যে হাঁটলে অনেক কম কষ্ট পেত। কিন্তু ছেলেটি যে কিছুতেই তা করবে না তা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। বলে কোনো লাভ হবে না, তাই বলছেও না। তাছাড়া ছেলেটির সামনে সে খুবই অস্বস্তি বোধ করে। সে যে ছেলেটির ব্যথায় ব্যথিত। তারও যেন কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটি যে বিপজ্জকভাবে ওপরে উঠছে তাতে তার ভয়ই হচ্ছে, কখন যে ছেলেটি গড়িয়ে পড়ে। ছেলেটি অচল হলে সে না পারবে পালাতে, না পারবে ছেলেটির তেমন উপকারে আসতে। আশ্চর্যের বিষয় যে ছেলেটি ডান পা আর রাইফেলের ওপর ভর দিয়ে বাম পা ঝুলিয়ে ওপরের দিকে উঠে চলেছে, উঠেই চলেছে। তবে গতি শামুকের মতো মন্থর।

সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। অনেক ওপরে উঠে এসেছে তারা। এর মধ্যে ঘন গাছপালার এলাকায় ঢুকে পড়েছে। পাহাড়-টিলার সংখ্যাও অনেক। প্রায় সমতল এক জায়গায় বসে পড়ল ছেলেটি। অনেক আগেই হাঁটায় বিরতি দিত সে। পায়ে আঘাত লাগার পর থেকে নিজের ওপর একরকম অত্যাচার করে এতদূর এসেছে। সে একা হলে অনেক আগেই থামত। কিন্তু মেয়েটির জন্যই থামেনি। ধরা পড়লে তার নিজের চেয়ে যেন মেয়েটির শাস্তি বেশি হবে। মেয়েটির শাস্তি তার বাকি জীবন। পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে চারবার বিশ্রাম নিয়েছে তারা। ক্লান্তির শেষসীমায় পৌঁছে গেছে দুজনেই।

‘আর এগোনোর দরকার নেই, এখানেই থামব’, দুর্বল কণ্ঠে বলতে বলতে পাতায় ঢাকা মাটির ওপর বসে পড়ল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে সামনে একটু দূরে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসল মেয়েটি। চোখ বুজে ফেলল সে। বসেই ক্লান্তিতে ছেলেটিও চোখ বুজে ফেলেছিল। একটু পর চোখ খুলে কিছু দূরে মেয়েটিকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখল। চোখ ফেরাতে গেল কিন্তু পারল না। তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। ক্যাপ্টেন মেয়েটির জন্য কেন পাগল হয়েছে তা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারল। এত পরিশ্রমের পরও শান্ত, ক্লান্ত মুখটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো সমুজ্জ্বল। সত্যি! অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়েটি। এর চেয়ে সুন্দর মেয়ে এর আগে চোখে পড়েছে কিনা স্মরণ করতে পারল না সে, হয়তো পড়েছে, হয়তো পড়েনি। কারণ সে সামনে বা আশপাশে মেয়ে আছে তা উপলব্ধি করতে পারলেই দৃষ্টি নীচু করে ফেলে। দুর্ঘটনাবশত অনেক মেয়ে তার চোখে পড়লেও এ মেয়েটির চেয়ে সুন্দরী যে তার চোখে পড়েনি তা সে নিশ্চিত। উ™£ান্ত চুলগুলো মেয়েটির মুখের ওপর এসে পড়েছে। তা যেন তার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কেউ তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ভুলে যাবে।

দূরে নাম না জানা এক পাখির কর্কশ কণ্ঠ কানে ঢুকতেই কয়েক মুহূর্তের ঘোরভাবটা নিমিষে উবে গেল। সম্বিত ফিরে পেতেই বুঝতে পারল সে এতক্ষণ কোন দিকে তাকিয়ে ছিল আর কী ভাবছিল। নিজের ওপর প্রচণ্ড রেগে উঠল সে। মনে মনে নিজেকে কতবার যে লাথি মারল তার হিসাব নেই। নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। মেয়েটি না হয় চোখ বন্ধ করে আছে। কিন্তু মহান আল্লাহ তো চোখ বন্ধ করে নেই। তওবা করতে লাগল এ মহাজগৎ নিয়ন্তার মহাদরবারে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তাকাল সূর্যের দিকে। জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। আশপাশে হয়তো পানিও নেই। এ অবস্থায় পানি সন্ধান করাও প্রায় অসম্ভব। তায়াম্মুম করে বসেই নামাজ আদায় করে নিল। তারপর শুয়ে পড়ল খোলা আকাশের নীচে। মেয়েটি অনেক আগেই ঘুমের জগতে বিচরণ করা শুরু করেছে।

কীভাবে ঘুমটা ভেঙে গেল বলতে পারবে না ছেলেটি। চোখ খুলেই বুঝল শেষ বিকেল উপনীত। আসরের নামাজ পড়ে বলে ঝট করে উঠে বসল। দাঁড়াতে যেতেই গোড়ালিটা ব্যথা করে উঠল। এতক্ষণ ব্যথাটার কথা ভুলে ছিল। বাধ্য হয়েই বসে পড়ল। তাকালো চারপাশে। কিন্তু কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। কোথায় আছে মেয়েটি? হয়তো আশপাশে কোথায় আছে। জোহরের মতো আছরের নামাজও আদায় করে নিল। মোনাজাত শেষে ডানে কারো উপস্থিতি অনুভব করল। তাকিয়ে দেখল, মেয়েটি এসে দাঁড়িয়ে।

‘কীসের যেন আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল, উঠে দেখি আপনি শুয়ে ঘুমাচ্ছেন। অনেকক্ষণ ঘুমানোর ফলে শরীরটা ঝরঝরে লাগছিল। তাই আপনাকে বিরক্ত না করে আশপাশে খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম’, যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে মেয়েটি। ‘আপনি উঠে আমাকে খোঁজাখুঁজি করেননি তো?’

‘না, আমি ধরেই নিয়েছিলাম আপনি হয়তো আশপাশেই আছেন’, পায়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে ছেলেটি।

‘খাবার না পেলেও লুকিয়ে থাকার মতো একটা গুহার সন্ধান পেয়েছি’, নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলল মেয়েটি। যেন গুহা খুঁজে পাওয়ায় সে তেমন খুশি নয়।

‘গুহা খুঁজে পেয়েছেন!’ বলতে বলতে আনন্দে দাঁড়াতে যেতেই ব্যথায় বসে পড়ে দুহাতে গোড়ালি চেপে ধরল।

‘এ রকম খোলা জায়গায় থাকার চেয়ে গুহায় থাকা নিরাপদ।’ হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যথায় মুখটা বিকৃত হয়ে গেল।

‘আচ্ছ, গুহাটা কি বড়?’ অত ব্যথা সহ্য করে সে কীভাবে কথা বলছে তা বুঝতে পারছে না মেয়েটি।

‘হ্যাঁ, বেশ বড়।’ বিষণ্ন কণ্ঠে জবাব দিল সে। হাত দিয়ে দক্ষিণ দিক নির্দেশ করল মেয়েটি। মাথা নীচু করে থাকায় দেখতে পেল না ছেলেটি। সেটা বুঝতে পেরে মুখে বলল ‘দক্ষিণে।’

‘কত দূরে?’

‘বেশি না, সামান্য।’

‘তাহলে আর দেরি নয়, সূর্য ডোবার আগেই সেখানে পৌঁছা যাবে তো?’

‘হয়তো যাবে।’

রাইফেলের বাঁটে ভর দিয়ে কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। একটু দূর দিয়ে পাশে পাশে চলেছে মেয়েটি। যখন গুহায় পৌঁছল, তখন মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেছে। রাতের আঁধার নেমেছে অনেক আগেই। তার ওপর অন্ধকার আরো প্রকট হয়েছে। গুহাটা পছন্দ হয়েছে ছেলেটির। গুহার মুখটি ছোট। গুহামুখের কাছে জঙ্গল আছে। কাছে না এলে গুহাটা কারো চোখে পড়বে না, যদি না তার আগে জানা থাকে। আর গুহার ভেতরটা বেশ বড়। মেঝে প্রায় সমতল। তবে ছাদ অত্যন্ত নীচু। পুরোপুরি দাঁড়ানো যায় না।

‘আমি গুহার বাইরে শোবো, আপনি ভেতরে শোবেন’, গুহাটা দেখে বলল ছেলেটি।

‘কেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আপনার ঠান্ডা লাগলে গোড়ালির ব্যথা বেশি হবে।’

‘হবে না, আমি বাইরেই ভালো থাকব’, বলল ছেলেটি।

‘তাহলে আমি বাইরে থাকি, আপনি ভেতরে থাকুন।’

‘তা হয় না’, বলল ছেলেটি।

‘তাহলে আপনিও ভেতরে থাকবেন’, বলে থামল মেয়েটি।

আর কথা বাড়াল না ছেলেটি।

চাদরটা বিছিয়ে শুয়ে আছে গুহামুখের কাছে। মেয়েটি তার কাছ থেকে বেশ দূরে আছে। ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে জর্জরিত মেয়েটি এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটি প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করছে, তবে ক্ষিদে অনুভব করছে না। তার ক্ষুধা অনুভূতি শক্তি লোপ পেয়েছে বিকেল থেকে, যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। সে যেন অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে আছে। চোখ দুটো এর মধ্যে বন্ধ হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের সাগরে ডুব দিল সে।

নানা জাতের, নানা ধরনের পাখির কলরবে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চোখ কচলিয়ে ঘুম দূর করার চেষ্টা করছে। বাম পায়ের ব্যথাটা এরই মধ্যে অনেকাংশে কমে এসেছে। তারপরও বাধ্য হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো। ভোরের তরতাজা নির্মল হিমশীতল বাতাসে তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ পড়ে নিয়ে গুহায় এসে ঢুকল। বাইরে যে ঠান্ডা তাতে গায়ের চাদরে ঠান্ডার অর্ধেকও কাটে না। গুহায় ঢুকে দেখল মেয়েটি তখনো ঘুমিয়ে আছে। আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি তার জায়গায়।

ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ শুয়ে থাকল মেয়েটি। সে একই সঙ্গে দুটো বিষয় উপলব্ধি করতে পারছে, তা হলোÑ প্রথমত তার শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। হয়তো লম্বা ঘুমের কারণেই। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার ক্ষুধা পাচ্ছে না। উঠে বসে দেখল ছেলেটি ঘুমিয়ে আছে। এবারো ছেলেটিকে বিরক্ত না করে পা টিপে টিপে ছেলেটির পাশ দিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো সে। দেখল, বেশ বেলা হয়েছে। আশপাশটা দেখার জন্য মেয়েটি পা বাড়াল।

কারো হাঁপানোর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে দেখল, একটু দূরে বসে মেয়েটি হাঁপাচ্ছে। প্রথমে বুঝতে পারল না কী কারণে সে হাঁপাচ্ছে।

‘আপনি হাঁপাচ্ছেন কেন, কী হয়েছে?’

দৌড়ে এসে গুহায় ঢুকেছে মেয়েটি। খুব বেশি দূর দৌড়ায়নি। গুহার কাছে এসে দৌড়ানো শুরু করেছে। তার আগে পা টিপে টিপে পালিয়ে এসেছে। যতটা না পরিশ্রম তার চেয়েও বেশি উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে সে। ছেলেটির গলার আওয়াজ কানে যেতেই মুখ তুলে তাকাল মেয়েটি।

‘ওরা আমাদের পাশেই আছে, খুঁজছে’, হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে বলল সে। চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

‘একটু খুলে বললে ভালো হয়’, শান্ত স্বরে বলল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত দম নিয়ে শুরু করল মেয়েটি।

‘ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, আপনি ঘুমাচ্ছেন। আরো লক্ষ্য করলাম ক্ষিধে উড়ে গেছে। বুঝলাম দীর্ঘক্ষণ কিছু পেটে না দেয়ার ফল। লক্ষণ ভালো নয়, কিছু খেতে না পারলে এর ফলে ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তাই খাবরের খোঁজে বের হয়েছিলাম। একসময় গুহার বাঁয়ে কিছু নীচে হঠাৎ কারো গলার আওয়াজ পেয়ে লুকিয়ে যাই। তাদের দেখেছিÑ দুজন লোক কাঁধে রাইফেল ফেলে একটা পায়ে চলা পথ ধরে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে, আর কী বিষয়ে যেন কথা বলছে। তার একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারলাম, আমাদের নিয়েই কথা বলছে। শোনার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কাছাকাছি চলতে লাগলাম। তাদের কথায় যা বুঝলাম, গতকাল আমাদের সমুদ্রের দিকে ও নীচের দিকে খোঁজা হয়েছে। আর আজকে এ দ্বীপের সব সম্ভাব্য জায়গায় হানা দেয়া হবে। আজকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না পেলে সারা দ্বীপে আমাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হবে। বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের জন্য লর্ড কত সিরিয়াস হয়েছে’, বলে থামল মেয়েটি। এর মধ্যে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে সে।

‘আমার মনে হয়, লর্ড নয়। ক্যাপ্টেন সিরিয়াস হয়েছে বেশি, আপনার জন্য’, বলল ছেলেটি। এতক্ষণ মেয়েটির গোছানো কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছে সে। ‘মনে হয় আমাদের এ গুহাটিও সম্ভাব্য জায়গার অন্তর্ভুক্ত। এটার কথা ক্যাপ্টেনের বাহিনীর অজানা থাকার সম্ভাবনা খুব কম। অর্থাৎ যে কোনো সময় তারা এখানে হামলা চালাতে পারে’, বলে থামল ছেলেটি।

‘হ্যাঁ, তার মানে আমাদের এখনই এখান থেকে সরে পড়তে হবে।’ এক মুহূর্ত থেমে কী ভেবে, ‘হিসাবমতো আমাদের কাল সূর্য ওঠার আগেই এ দ্বীপ থেকে পালানো উচিত। কারণ সন্ধ্যার মধ্যে আমাদের না পেলে হয়তো আজ রাতেই বা কাল সকালে পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হবে। ফলে পুরস্কারের আশায় সারা দ্বীপের মানুষ আমাদের খোঁজে লেগে যাবে। তখন আমাদের পালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, একদল নৌকা নিয়ে সমুদ্রে যাবে, আর একদল সারা দ্বীপ চষে ফেলবে। আমরা ধরা পড়তে বাধ্য। এখনই আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত। আপনি কী বলেন?’ বলে থামল মেয়েটি।

এতক্ষণ প্রায় বুকের ওপর মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিল ছেলেটি। মাথাটা একটু তুলে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়।’

‘তাহলে এখনই বেরিয়ে পড়ি। আপনি কি হাঁটতে পারবেন?’ বলল মেয়েটি।

‘ইনশাআল্লাহ পারব’, বলেই ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। পায়ের ব্যথাটা অনেক কমে গেছে। রাইফেলটা কাঁধে তুলে নিল। আর চাদরটা কোমরে জড়িয়ে নিল।

একটু পরেই গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো তারা। পায়ে হাঁটতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। পেটে খিদের অনুভূতি নেই, আর কী চাই! অত্যন্ত সতর্ক হয়ে নীচে নামছে তারা। যে কোনো সময় ক্যাপ্টেন বাহিনীর সামনে পড়ে যেতে পারে। ছেলেটি চাইছে যদি ওরা গুহায় খোঁজ করতে আসে তবে সঙ্গে যেন কুকুর নিয়ে না আসে, তাহলে তাদের পিছু নিতে পারবে না।

ছেলেটির পেছনে মেয়েটি নামছে। কখনোবা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, কখনো পাশ দিয়ে। গাছপালা, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তারা যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। মেয়েটি ভাবছে, ছেলেটি যেন অচল হয়ে না পড়ে, পুনরায় আহত হয়ে না পড়ে। আর ক্যাপ্টেন বাহিনীর সম্মুখে না পড়েই যেন এই দ্বীপ ছেড়ে পালাতে পারে। তবে কীভাবে পালাবে এখনো তা ঠিক হয়নি। এমনকি উপায় পর্যন্ত বের হয়নি। যেন অজানা-অচেনার উদ্দেশে তারা পাড়ি জমিয়েছে। তাদের পরিণতি কী? ধরা পড়বে, নাকি শেষ পর্যন্ত এই ভয়ঙ্কর দ্বীপ থেকে পালাতে পারবে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই নিজেকে দিতে পারছে না মেয়েটি।

এতক্ষণ কষ্ট করে হেঁটেছে, আর পারছে না ছেলেটি। পায়ের ব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তারপরও হেঁটে চলেছে। একসময় অসহ্য হয়ে উঠল ব্যথা। পা আর মাটিতে ফেলতে পারছে না। তাছাড়া এরই মধ্যে হাঁপিয়ে উঠেছে সে, শ্বাস নিচ্ছে বড় করে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য দুই পাহাড়ের মধ্যে একটা গাছপালা আবৃত সমতল জায়গায় থামল দুজনে। খানিক বিশ্রাম নিয়ে রাইফেলে ভর দিয়ে ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। কিছু বলল না মেয়েটি। ছেলেটির অবস্থা সে বুঝতে পারছে।

নীচে নামছে তো নামছেই। এ নামার যেন শেষ নেই। সময় বয়ে যাচ্ছে দ্রুত। রাইফেলে ভর দিয়ে নীচে নামা বিপজ্জনক। যে কোনো সময় ভারসাম্য হারিয়ে নীচে গড়িয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই একটা পা প্রায় অচল। তাই সাবধানতার সঙ্গে ধীরে ধীরে নীচে নামছে। অবশ্য এখনো কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়নি, তবে হতে কতক্ষণ।

এখন কিছুদূর যেতে না যেতেই দ্রুত হাঁপিয়ে উঠছে দুজনে। তাই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে বারবার। এতে সময় বেশি যাচ্ছে। দ্বিপ্রহর হতে আর অল্প বাকি। বিশ্রাম নিচ্ছে দুজনেই। হঠাৎ দূরে রক্ত হিম করা কুকুরের ডাক ভেসে এলো। যেন আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল দুজনেই। খোলা জায়গায় বেশ তফাতে বসে ছিল দুজনেই। প্রথমে ছেলেটি নড়ে উঠল। তার পরপরই মেয়েটি। একলাফে ঘন গাছপালার মাঝে ঢুকে পড়ল। আবার ডেকে উঠল কুকুর। গাছপালার ভেতর দিয়ে দেখল বেশ দূর দিয়ে তিনজন অস্ত্রধারী লোক একটা কুকুর সঙ্গে নিয়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে চলছে। একটা গাছের আড়ালে দুহাত তুলে হাঁটু গেড়ে বসল ছেলেটি, ‘হে মহান রক্ষাকারী, ত্রাণকর্তা, তুমি আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা কর…।’

মেয়েটি অন্য একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

ধীরে ধীরে চার সদস্যের সন্ধানী দলটি চোখের আড়াল হয়ে গেল। আবার পা-বাড়ানো শুরু হলো। এক সময় দ্বিপ্রহর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। জোহরের নামাজ আদায় করে আবার মন্থর গতিতে যাত্রা শুরু হলো। ক্লান্ত দুর্বল শরীর নিয়ে পা ফেলা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। যতই এগোচ্ছে ধীরে ধীরে গতি ততই কমছে।

একসময় দূরে সমুদ্রের গর্জন শোনা গেল। অস্পষ্ট আওয়াজ। তার মানে সমুদ্র আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু এর মধ্যে ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়তে চাচ্ছে। দুজনেই পা ফেলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। শুয়ে চোখ বুজে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিজের ওপর একরকম অত্যাচার করে মাতালের মতো ঢুলতে ঢুলতে পা ফেলছে দুজনেই। সমুদ্রের অস্পষ্ট গর্জন শুনে মনে আশার জোয়ার এলো। কিন্তু দেহে শক্তির জোয়ার এলো না। এগোতে তিনগুণ সময় লাগছে।

বিকেল হয়ে এসেছে। এখন সমুদ্রের গর্জন অনেকটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমুদ্র কাছেই। আসরের নামাজ আদায় করে উঠে দাঁড়াতে যাবে ছেলেটি, কিন্তু পারল না।

মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘আপনি দাঁড়াতে পারবেন না?’

‘না।’ কোনোমতে দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি।

‘তাহলে এগোবেন কীভাবে?’

‘হামাগুড়ি দিয়ে।’

কিছু বলতে গিয়েও বলল না মেয়েটি। কারণ জানে বলে কোনো লাভ হবে না। এর মধ্যে ছেলেটি কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করেছে। কিছুদূর নীচে নামার পর মেয়েটিও ছেলেটির পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে নামা শুরু করল। সেও আর হাঁটতে পারছে না।

মেয়েটি পেছনে আছে কিনা, কতটা পেছনে পড়েছে দেখার জন্য ঘুরে তাকাল। একনজর দেখেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল, সেও হামাগুড়ি দিয়ে নামছে। কিছুই বলল না। কিছু বলতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। অবশেষে যেন দীর্ঘ একযুগ পর নীচে পৌঁছল। সামনে সৈকত। শেষ বিকেল। সূর্য অস্ত যেতে এখনো কিছু সময় বাকি। রক্তিম সূর্যের আলোয় সৈকতের বালিগুলো চিকচিক করছে। অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার মতো মনমানসিকতা এখন কারোরই নেই। দুজনেই আশপাশে তাকাচ্ছে। না, কোথাও নারকেল গাছ দেখতে পেল না। এখন পেটে কিছু দিতে না পারলে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে। কমপক্ষে নড়াচড়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেলবে। এ অবস্থায় এ দ্বীপ থেকে পালানো তো দূরের কথা, আশপাশে কারো উপস্থিতি টের পেলে লুকাতে পর্যন্ত পারবে না। দুজনেই খোলা জায়গায় আছে। এখন ফিরে পাহাড়ের কোথাও আশ্রয় নেয়া উচিত। কিন্তু ফেরার মতো শক্তি নেই।

মেয়েটি বালির ওপরেই শুয়ে পড়েছে। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। শরীরের সর্বশেষ শক্তি একত্রিত করে বসেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। মেয়েটির থেকে বেশ দূরে যাবে, এমন সময় পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব হতেই ঝট করে ঘুরে তাকাল। দেখল, একজন মধ্যবয়স্ক লোক খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রাখা রাইফেলের দিকে হাত বাড়াতে যাবে, তার আগেই লোকটি ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘কে আপনারা?’

কী উত্তর দেবে প্রথমে ভেবে পেল না ছেলেটি। এক মুহূর্ত ভেবে বলল, ‘আমরা ক্ষুধার্ত, বিপদগ্রস্ত।’ কী মনে হতে রাইফেল থেকে হাত সরিয়ে নিল।

‘তার মানে?’ জিজ্ঞেস করল আগন্তুক। ‘খুলে বলুন।’

ততক্ষণে মেয়েটি উঠে বসেছে।

‘আমরা বিদেশি। ক্যাপ্টেন আমাদের বন্দী করেছিল। তার কবল থেকে মুক্ত হয়ে এখন আমরা পালানোর পথে। আমরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত, প্লিজ আমাদের কিছু খাবার দিন, সে সঙ্গে এ দ্বীপ থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে দেবেন।’ কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা না করে অবলীলায় সত্য কথা বলে গেল ছেলেটি। সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, আর মিথ্যা হয় ধ্বংস।

‘আপনি জানেন, ক্যাপ্টেন অত্যাচারী।’ দুর্বল কণ্ঠে যতদূর সম্ভব দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলে জবাব দিল ছেলেটি।

‘জানি।’ একবার দ্বিধা করে বলল আগন্তুক।

‘তাহলে কেন তার হাতে আমাদের তুলে দেবেন?’ এতক্ষণ পর এবার মেয়েটি মুখ খুলল।

‘আপনারও নিশ্চয়ই ছেলে-মেয়ে আছে।’ মেয়েটির কথার পিঠে বলল ছেলেটি।

‘আছে। আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই, তোমাদের ধরিয়ে দিলে নিশ্চয়ই ক্যাপ্টেন কিছু পুরস্কার দেবে, এদিক থেকে ক্যাপ্টেন খুবই…।’

তাকে শেষ করতে দিল না মেয়েটি। ‘আমাদের খাবার ও পালানোর ব্যবস্থা করে দিলে আমরাও আপনাকে পুরস্কৃত করব।’

‘কী পুরস্কার?’ চট করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল আগন্তুক। ছেলেটিও অবাক হয়েছে।

‘আমার গলায় দামি একটা স্বর্ণের চেন আছে, সেটা আপনাকে দিয়ে দেব। কি রাজি?’ বলল মেয়েটি।

‘দেখি।’

চেনটা খুলে হাতে নিয়ে দেখাল মেয়েটি। এক মুহূর্ত ভেবে মুখ খুলল আগন্তুক।

‘আমি রাজি।’ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার মুখখানা।

‘আমি রাজি’, আবার বলল সে। ‘আমার বাড়িতে চলুন, খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে আপনাদের পালানোর ব্যবস্থা করে দেব…।’

‘আমরা খুবই দুর্বল। হাঁটার শক্তি পর্যন্ত নেই। বিশেষ করে আমি প্রায় অচল। পায়ে আঘাত পেয়েছি’, লোকটির কথায় বাধা দিয়ে বলল ছেলেটি।

ছেলেটি থামতেই শুরু করল আগন্তুক, ‘আমার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়, এই পাহাড়ের মোড় ঘুরে ওই পাশে একটু দূরে, প্রায় সমুদ্রের ধারেই’, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল।

‘তাছাড়া আপনাদের নৌকায় করে নিয়ে যাব। ওই তো আমাদের নৌকা।’ দক্ষিণে একটু দূরে নোঙ্গর করা ডিঙি নৌকাটার দিকে ইশারা করল। তার ভাবে বোঝা গেল যে, সে ওই নৌকার মালিক হওয়ায় গর্বিত।

‘একটু কষ্ট করে নৌকায় উঠতে পারলে হয়। না পারলে আমি সাহায্য করব।’

এক মুহূর্ত ভেবে ‘আপনি নৌকায় উঠতে পারবেন?’ ছেলেটিকে উদ্দেশ করে বলল মেয়েটি।

‘আপনি পারবেন?’ দুর্বল কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী

জাকির আহমদ

৩ এপ্রিল, ২০২০ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৫)

‘না, কেন?’

‘কিছু না।’ বলল ছেলেটি। চিহ্নিত।

‘তবে প্রথম যে দুজন তোমাকে গাড়ির পেছনে বসিয়ে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল আর যে তোমাকে চাবুক মেরেছিল এ তিনজন জাহাজে ছিল’, বলল পাহারাদার।

‘আচ্ছা, মেয়েটি কোন ঘরে আছে?’

হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলে যে কেউ দেখে ফেলতে পারে, তাই চোখের ইশারায় দেখিয়ে বলল, ‘দোতলার ওই রুমে।’

‘এরপর আমাকে নিয়ে এরা কী করবে?’

উত্তর দেয়ার জন্য মুখ খুলেও বন্ধ করতে হলো। কারণ আর একজন এদিকে এগিয়ে আসছে। ছেলেটি অপরিচিত। কাছে এসে লোকটি বলল, ‘তুমি যাও, এখন আমার পালা।’

উঠে দাঁড়াল পাহারাদার। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটিকে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হচ্ছে। চোখের কোণে এরই মধ্যে পানি জমে গেছে। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলেও বলতে পারল না। একবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে চলে গেল।

নতুন পাহারাদার একটু দূরে বসে পড়ল। চোখ ছেলেটির দিকে। হাত রাইফেলে। নির্বিকারভাবে বসে আছে। হেলান দিয়ে বসে থাকায় তন্দ্রা এসে গেল ছেলেটির। কেটে গেল কিছুক্ষণ। হঠাৎ সামনে কোলাহলের শব্দ শুনে চোখ খুলে দেখল বাংলোর সামনে সামরিক কায়দায় অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। বাংলোর দোতলার বারান্দায় একাধিক পদশব্দে সেদিকে মুখ তুলে তাকাল ছেলেটি। পাহারাদারও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে সারি বেঁধে দাঁড়ানো লোকগুলো একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেন থমকে দাঁড়াল সবকিছু।

ক্যাপ্টেন, মেয়েটি এবং একজন অপরিচিত কিন্তু মার্জিত পোশাক পরা লোককে বারান্দার সামনে এসে দাঁড়াতে দেখল সে। মেয়েটি একটু পেছনে দাঁড়িয়েছে। তার পেছনে যে একজন পাহারাদার দাঁড়িয়ে আছে তাও দেখা যাচ্ছে দূর থেকে।

‘ক্যাপ্টেনের পাশে ওই লোকটি কে?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘আমাদের মহামান্য লর্ড।’ মাথা না ঘুরিয়েই নীচু স্বরে জবাব দিল পাহাড়াদার। এর মধ্যে একজন লোক লর্ডের পাশে লাউড স্পিকার নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। হ্যান্ড সেট হাতে নিয়েছে লর্ড। ছেলেটি এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না।

পাহারাদারকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, এমন সময় লাউড স্পিকারে লর্ডের কণ্ঠ ভেসে আসতেই থেমে গেল ছেলেটি। তোমাদের সবার জন্য এই দ্বীপবাসী এক শুভ সংবাদ আছে’, ভরাট গম্ভীর গলায় বলছে লর্ড। অনেকের সামনে কথা বলার সময় যেসব আনুষ্ঠানিকতা আছে, তার ধার দিয়ে গেল না সে। ‘সেই শুভ সংবাদটি হলো, আগামীকাল রবিবার রাত আটটায় চার্চ অব ফ্লাওয়ার্সে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আমাদের এই নব অতিথিনীর বিবাহ হবে।’ দুজনকেই হাত দ্বারা ইঙ্গিত করল লর্ড। ‘তোমরা সবাই আমন্ত্রিত’, থামল লর্ড।

‘না, কখনোই এ বিবাহ হতে পারে না।’ প্রচণ্ড রাগে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি। সব দুর্বলতা যেন উবে গেছে।

‘ম্যাডাম, আপনি কখনোই এ বিয়েতে রাজি হবেন না, কোনো কিছুর বিনিময়েই না। কারণ এরা মানুষের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করে। এরা মানুষরূপী পশু।’ দোতলার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলছে ছেলেটি উচ্চকণ্ঠে। ‘যে কোনোভাবেই হোক আল্লাহ আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করবেনই।’

মেয়েটি বাংলা ভাষাভাষী, তাই ছেলেটি বাংলায় কথাগুলো বলতে পারত। কিন্তু ছেলেটি জানে মেয়েটি কিছুতেই রাজি হয়নি। কারণ মেয়েটিকে সে এর মধ্যে তিনবার চোখ মুছতে দেখেছে। লর্ডের দিকে তাকাতে গিয়েই চোখে পড়েছে। প্রচণ্ড রাগে ও ঘৃণায় শাস্তি, অত্যাচারের কথা ভুলে ইংরেজিতে প্রতিবাদ করেছে ছেলেটি।

ছেলেটি কথা বলতে শুরু করতেই সামনে দাঁড়ানো সবাই মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটিকে দেখছে। পাশে দাঁড়ানো পাহারাদার ছেলেটির বুক বরাবর রাইফেল তাক করে এর মধ্যে দুবার তাকে চুপ করতে বলেছে। কিন্তু ছেলেটি থামেনি। গুলি করার অর্ডার পায়নি বলে গুলিও করতে পারছে না। অবশ্য সে গুলি করতেও চায় না।

লর্ড থামতেই কথা বলা শুরু করেছিল ছেলেটি। ছেলেটির সাহস দেখে বিস্ময়ে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সে। নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলেটির কথা থামতেই শুরু করল লর্ড। ‘তোমরা কি দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছ, থামাও ব্যাটাকে।’ রাগে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে লর্ড। শীতল চক্ষু দ্বারা ছেলেটিকে যেন ভস্মীভূত করার চেষ্টা করছে ক্যাপ্টেন। মেয়েটি এ অবস্থায় ছেলেটির সাহস দেখে যেন চোখের পানি মুছতে ভুলে গেছে। লর্ডের উত্তেজিত কথা শুনে যেন সবাই সম্বিত ফিরে পেল।

প্রথমেই ছেলেটির পাশে দাঁড়ানো পাহারাদার লাথি চালাল ছেলেটির বুক বরাবর। দুর্বল শরীর নিয়ে লাথি থেকে আত্মরক্ষার জন্য তড়িৎ গতিতে পিছিয়ে যেতেই পা ফসকে পেছন দিকে পড়ে গেল ছেলেটি। লাথির ছোঁয়াও তার বুকে লাগেনি। পড়ে যেতেই দ্রুত উঠে বসতে গিয়েও পারল না। ততক্ষণে তার কাছে পৌঁছে গেছে আরো চারজন। ছেলেটি অর্ধেক উঠে বসেছিল। কিন্তু চারজন মিলে তাকে আবার শুইয়ে দিয়ে মাটির সঙ্গে ঠেসে ধরেছে। পাহারাদার দুই খুঁটির ওপরে আটকানো কাঠের টানা থেকে রশি খুলতে লাগল। লর্ডের কথা শুনে সবাই তাকিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে ছেলেটির দিকে ছুটে যেতেই অনেকেই আবার পেছনে ঘুরে দেখতে লাগল।

দোতলায় সবাই চুপ করে রুদ্ধশ্বাসে ছেলেটির পরিণতি দেখছে।

‘তোমরা কাপুরুষ ছাড়া আর কিছুই না। একজন দুর্বল নিরস্ত্র লোকের বিরুদ্ধে তোমরা এতগুলো লোক লেগেছ, তোমাদের সবারই লজ্জা থাকা উচিত।’ চারজন চেপে ধরে তাকে মাটিতে শুয়ে দিতেই বলল ছেলেটি। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ততক্ষণে একজন পকেট থেকে রুমাল বের করে তার মুখে পুরে দিতে শুরু করেছে। মুখে যাতে রুমাল ঢুকতে না পারে, সে জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাল ছেলেটি। কিন্তু মুখে রুমাল ভালোভাবে পুরে দিতে আর একজন সাহায্য করল। মুখে ভালোভাবে রুমাল পুরে দিয়েই ক্ষান্ত হলো না। যাতে ছেলেটি মুখ থেকে রুমাল বের করে আবার কথা বলতে না পারে সে জন্য একজন মুখ চেপে ধরে থাকল। আর একজন টেপ আনার জন্য গেল।

ততক্ষণে পাহারাদারের দড়ি খোলা হয়ে গেছে। সেই দড়ি দিয়ে প্রথমে ছেলেটির পা দুটো বাঁধল। তারপর হাত দুটো পিঠমোড়া করে বেঁধে ছেলেটিকে শুইয়ে দিল। এর মধ্যে লোকটি টেপ নিয়ে এলো। সেই টেপ মুখে মেরে দিল। ছেলেটিকে তারা বন্দী করে উঠে দাঁড়াল। সে না পারবে মুখ খুলতে, না পারবে নড়াচড়া করতে। আগেরজনই রাইফেল হাতে ছেলেটির পাহারায় থাকল। বাকি সবাই ফিরে গেল সারিতে।

ক্যাপ্টেনের চোখ এখনো ধিক ধিক করে জ্বলছে। তবে লর্ড এর মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তার গলার স্বরেই তা বোঝা গেল।

‘তোমাদেরকে যা বলতে চাচ্ছিলাম তা হলো, ক্যাপ্টেনের বিয়ের অ্যারেঞ্জমেন্ট তোমাদেরকেই করতে হবে, সময় কম কাজে লেগে যাও। একটু আগে যেন কিছুই ঘটেনি গলায় এমনি ভাব ফুটে উঠেছে তার কণ্ঠে।

‘আর একটু আগেই ছেলেটি যে আবেদন করেছে তা বোকামি ও দুঃখজনক। সে এখন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য, আমি একটু পরই বাইরে যাব, তাই ক্যাপ্টেনের হাতে তার বিচারের দায়িত্ব দিলাম। ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে।’

কথা শেষ করেই পাশে লাউড স্পিকার নিয়ে দাঁড়ানো লোকটির হাতে হ্যান্ডসেট দিয়ে মেয়েটির দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ‘বাই’ বলে ঘুরে চলে গেল লর্ড। তার পেছনে চলল একজন প্রহরী। উচ্চস্বরে বলছে ক্যাপ্টেন যাতে সবাই শুনতে পায়Ñ ‘তোমরা এখন সবাই এখন যার যার জায়গায় চলে যাও। তবে তিনজন থাক। ওর শাস্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে। ওর শাস্তির পর বিয়ের অ্যারেঞ্জমেন্টের কাজ শুরু হবে। প্রয়োজন হলে বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দেয়া হবে, তবে ওর শাস্তি হবে ভয়ঙ্কর। তিলে তিলে মৃত্যু।’ শেষ বাক্যটা ক্যাপ্টেন বলল চিবিয়ে চিবিয়ে।

সারি দিয়ে দাঁড়ানো সবাইকে চলে যেতে দেখল মেয়েটি। তাদের মধ্যে তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। ঘুরে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন। মেয়েটিকে চোখ মুছতে দেখল। মেয়েটির ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন। তার চোখে শীতল চাহনি। প্যান্টের ডান পকেট ফোলা। ক্যাপ্টেন জানে সেখানে কী ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে। এছাড়া আশপাশের আর কেউ জানে না। মেয়েটির দিকে একবার তাকিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো ক্যাপ্টেন। কিন্তু থেমে দাঁড়াতে হলো মেয়েটির জন্য।

মেয়েটি ভাবল, তার জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছেলেটির এ দুরবস্থা। এরপর তাকে যে শাস্তি দেয়া হবে যার পরিণতি ক্যাপ্টেনের কথামতো ভয়ঙ্কর। বেশি ভাবার সময় নেই। ক্যাপ্টেন চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। হাত তুলে থামার ইশারা করল ক্যাপ্টেনকে। থেমে তার দিকে ঘুরল ক্যাপ্টেন।

‘প্লিজ, যা শাস্তি হয় আমাকে দিন। তাকে কোনো শাস্তি দেবেন না’, অনেক কষ্টে কথাগুলো মুখ দিয়ে বের করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেয়েটি। হাতজোড় করল ক্যাপ্টেনের দিকে। চোখ থেকে গাল গড়িয়ে নেমে আসছে অশ্রু।

এক মুহূর্তে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকল ক্যাপ্টেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ওই ছেলেটির প্রতি এত দরদ কেন?’

এর উত্তর কী দেবে মেয়েটি তা ভেবে পেল না। তাকে ভাবতেও দিল না। তার আগেই বলে উঠল, ওকে ভুলে যাও, ওর শাস্তি ওকে পেতেই হবে।’ বলেই আর দাঁড়াল না ক্যাপ্টেন, ঘুরেই চলে গেল।

আবার থামানোর জন্য হাত তুলল সে। কিন্তু ততক্ষণে ক্যাপ্টেন ঘুরে গেছে। ডেকে থামতে চাইলেও মুখ দিয়ে কথা ফুটল না। বসে পড়ে দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুজে কাঁদতে লাগল সে।

ছেলেটির পাশে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে পাহারাদার। আর একটু দূরে ক্যাপ্টেনের নির্দেশে অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন। ক্যাপ্টেনকে এদিকে আসতে দেখে চারজনই সতর্ক হয়ে দাঁড়াল। ছেলেটির পাশে এসে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন। কয়েক মুহূর্ত নীরবে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে যেন তার শাস্তি নির্ধারণ করল।

‘ওকে মুক্ত করে দাও।’ বেশ উচ্চকণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন। অপর তিনজনও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে তাদের মধ্যে দুজন ছেলেটির হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল। শক্ত করে বাঁধা থাকায় হাত-পা অবশ হয়ে এসেছিল। মুক্ত হয়ে প্রথমে বসে হাত-পা নাড়ানাড়ি করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে নিল। তারপর মুখ থেকে টেপ খুলে রুমাল বের করে উঠে দাঁড়াল। বাকি সবাই চুপচাপ দেখছে।

প্রথমে ছেলেটিই নীচুস্বরে শুরু করল, ‘এরপর আমাকে নিয়ে কী করতে চান?’

‘এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠেছে ক্যাপ্টেনের। ‘এই খেলায় ধীরে ধীরে তুমি মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যাবে’, উচ্চস্বরে বলে চলেছে ক্যাপ্টেন। ‘খেলাটা এ রকম…’ এক মুহূর্ত থামল। ‘ওই যে ঢালু পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে…’ বলতে বলতে বাংলোর ঠিক সামনে একটা ঢালু পাহাড়ের দিকে হাত নির্দেশ করল। ঢালু বলতে দৌড়ে ওঠা যায়। তবে পা পিছলে নীচে গড়িয়ে পড়ার খুব আশঙ্কা আছে। পাহাড়টা চার-পাঁচতলা পরিমাণ উঁচু। গাছপালা নেই, এক রকম পরিষ্কার ‘সেদিকে এখান থেকে তোমাকে দৌড় দিতে হবে, আর তোমাকে পেছন থেকে ধাওয়া করবে হাউন্ড প্রজাতির এক কুকুর, কুকুরের গলায় নাইলন কর্ড দিয়ে বাঁধা থাকবে। সে পাহাড়ের অর্ধেক পর্যন্ত উঠতে পারবে, তার আগেই যদি তুমি ওই সীমানা…’ হাত দিয়ে পাহাড়ের মাঝে খাড়া খুঁটি দেখিয়ে দিল। ‘পেরিয়ে যাও তবে সে তোমার কোনো অনিষ্ট করবে না। তুমি যদি বেঁচে যাও তবে এরপর তোমাকে আর কোনো শাস্তি দেয়া হবে না।’ ছেলেটির মুখে ঘাম জমে উঠেছে। ‘আরে অত ঘাবড়ে যাওয়ার দরকার নেই। তোমার দৌড় শুরুর ঠিক এক মিনিট পর কুকুর ছাড়া হবে, কথা দিচ্ছি। অনেক সময়, তারপরও তুমি বাঁচতে পারবে না।’ নিষ্ঠুর হয়ে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখ। ‘তুমি যদি কুকুরের আক্রমণের শিকার হও, তবে তোমার কপাল মন্দ। তোমার জলাতঙ্ক হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে কোনো চিকিৎসা করা হবে না, এই পাহাড়িয়া জঙ্গলে কোনো হিংস্র প্রাণী নেই, নীচে জঙ্গলের কোথাও গাছের সঙ্গে তোমাকে বেঁধে রাখা হবে, তবে জলাতঙ্ক হলে এক সময় ঢলে পড়বে মৃত্যুর মুখে। এই হচ্ছে তিলে তিলে মৃত্যু নামক খেলা।’ এক মুহূর্ত থামল তারপর কী মনে হতেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার সারামুখে। ‘তবে কালকে আমার বিয়ে ভোজের খাবার তোমাকে পরিমাণ মতোই পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

এসব শুনতে ছেলেটির মাথা গরম হয়ে গেছে, তবে অনেক কষ্টে মাথা ঠান্ডা রেখে আল্লাহকে স্মরণ করে চলছে। তার এ মুহূর্তে কিছুই করার নেই। পাঁচজনের বিরুদ্ধে এই দুর্বল শরীর নিয়ে লাগতে যাওয়া হবে বোকামি। তার ওপর এদের কাছে আছে অস্ত্র। এরপর ক্যাপ্টেন তাদের একজনকে নাইলন কর্ড লাগিয়ে কুকুর এবং স্টপওয়াচ আনার নির্দেশ দিল। আর একজনকে নির্দেশ দিল তিনটা রাইফেল আনার। পাহারাদার আর অপর একজন দাঁড়িয়ে রইল ছেলেটির পাহারায়। চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে ক্যাপ্টেন। কারো মুখে কোনো কথা নেই। এর মধ্যে আসরের নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় নামাজে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি। কেউই বাধা দিল না। প্রথমে নড়াচড়ায় পাহাড়াদার বাধা দিতে গেলেও যখন দেখল সে পালাচ্ছে না, তখন আর কিছু বলল না। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল।

একটু পরই তিনটি রাইফেল নিয়ে ফিরে এলো দ্বিতীয়জন। তারপর পর ফিরে এলো প্রথমজন।

‘হাই’ কেমন আছিস?’ ক্যাপ্টেনের গা ঘেঁষে দাঁড়াতেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে গরগর করল। কুকুরটিকে বেঁধে ফেলা হলো খুঁটির সঙ্গে। ‘আরে, থাম, থাম, ওর সঙ্গেই তো তোর দৌড় প্রতিযোগিতা হবে।’ কৌতুক করে বলতে বলতে স্টপওয়াচ হাতে নিল লোকটির কাছ থেকে। কিছু বলতে যাচ্ছিল ক্যাপ্টেন, এমন সময় গাড়ির শব্দে থেমে গেল। জিপে করে বাইরে গেলেন লর্ড।

‘তো শুরু করা যায়।’ জিপের সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে না যেতেই বলল ক্যাপ্টেন। ‘তোমার কি কিছু বলার আছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘বল।’

‘আমি কিছুক্ষণ আগে যা বলেছি, বিশেষ করে আপনি তার চেয়েও খারাপ।’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ক্যাপ্টেন। হাসি থামিয়ে চারজনের প্রত্যেককে নীচুস্বরে নির্দেশ দিল ক্যাপ্টেন। নির্দেশ মোতাবেক তিনজনের প্রত্যেকেই রাইফেল হাতে তুলে নিয়ে যার যার জায়গার দিকে রওনা হলো। একজন পাহাড়ের মাথায় অবস্থান নিল। একজন পাহাড়ের গোড়ায় আর একজন ক্যাপ্টেনরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে একটু সামনে অবস্থান নেবে। পাহারাদার ক্যাপ্টেনের সঙ্গেই থাকবে। আপাতত বন্দুক হাতে ছেলেটির পাহারায় থাকলেও ছেলেটি ছোটা শুরু করতেই সে কুকুর সামলানোর কাজে নামবে। আর ক্যাপ্টেন স্বয়ং তত্ত্বাবধান করবে। তিনজনে রওনা হতেই শুরু করল ক্যাপ্টেন,

‘ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, তাই মন দিয়ে শোন; রেডি ওয়ান, টু, থ্রি বলতেই তুমি এ দুই খুঁটির মাঝখান থেকে সোজা পাহাড়ের দিকে দৌড় দেবে। যদি তোমার পথের ডানে, বামে দশ গজের বেশি সরে যাও তবে তোমার ওপর গুলি চালানো হবে। তোমার দৌড় শুরুর ঠিক এক মিনিট পর স্টপওয়াচ অনুযায়ী কুকুরটিকে ছাড়া হবে, তার নাইলন কর্ড মাপ অনুযায়ীই লাগানো আছে, অর্ধেক পাহাড়ের বেশি অতিক্রম করতে পারবে না। নাগালের বাইরে যেতে পারলেই বেঁচে যাবে। এর আগেও এ রকম ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে। তাই তোমার পাহারাদার ও ধাওয়াকারী কুকুরকে আজ আর নতুন করে কিছু নির্দেশ দেয়ার নেই। কাজেই সাবধান।’

আবার নিষ্ঠুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখে।

‘তবে এর আগেও এ খেলায় কেউ জয়ী হতে পারেনি, শেষ পর্যন্ত সবাই পড়েছে জলাতঙ্কে। কারণ এ ধরনের শাস্তির জন্য আমরা এ ধরনের কুকুর পুষি। আর দেরি করে লাভ নেই, কথা শেষ, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।’ এক মুহূর্ত থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন। সেই মুখ দেখে কিছুই বুঝতে পারল না। ‘রেডি ওয়ান’ থেমে বলছে ক্যাপ্টেন। ছেলেটিকে প্রস্তুতির সুযোগ দিচ্ছে। ‘টু।’ ‘থ্রি।’ বলতেই ছেলেটি তার সর্বশক্তি একত্রিত করে দৌড় শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে স্টপওয়াচ চালু করে দিয়েছে ক্যাপ্টেন।

অর্ধ মিনিট অতিক্রমের আগেই ছেলেটি পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছে গেল। দুর্বল শরীর নিয়ে এত দ্রুত ছেলেটিকে দৌড়াতে দেখে অবাক হলো ক্যাপ্টেন। তবে শঙ্কিত হলো না, কারণ আর অর্ধমিনিটের মধ্যে কিছুতেই ছেলেটির অর্ধ পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। ইতিপূর্বে সবল লোকও পারেনি।

দৌড়ে তেমন সুবিধা করতে পারছে না ছেলেটি। খুব দ্রুত শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কুকুরটিকে ছেড়ে দেয়ার আর কতক্ষণ বাকি আছে তা ঠিকভাবে অনুমান করতে পারছে না। পাহাড়ের কাছে পৌঁছে গেছে। এখন ওপরে ওঠার পালা। কিন্তু উঠবে কীভাবে? এর মধ্যে তার দম ফুরিয়ে গেছে। বুক এত জোরে ওঠানামা করছে যে, তা দূর থেকেও বোঝা যায়। অনেক কষ্টে মুখ বন্ধ রেখে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। যে কোনো সময় ছাড়া হবে কুকুরটিকে। তার একটু পরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। আর ভাবতে চাইল না।

এ অবস্থায় পাহাড়ে না চড়ে অন্যদিকে পালানোর চেষ্টা করা যায়। সে ক্ষেত্রে ঘোষিত বুলেটের আঘাতে তাকে ঝাঁঝরা হতে হবে। একাধিক বন্দুককে যে কোনোভাবেই সে ফাঁকি দিতে পারবে না। তাছাড়া পালিয়েইবা যাবে কোথায়? সবাই তার পিছে ছুটবে। আর পাহড়ের ওপরে চড়ে কুকুরের হাত থেকে রক্ষা না পেলেও অন্তত কিছুক্ষণ বেঁচে থাকা যাবে। আল্লাহ হয়তো বাঁচার কোনো পথ বেরও করে দিতে পারেন। কয়েক মুহূর্ত এসব ভাবতে ভাবতে পাহড়ের গোড়ায় পৌঁছে গেল। অবশেষে উঠতে শুরু করল সে। গতি ক্রমেই মন্থর থেকে মন্থর হয়ে গেল। যখন কুকুরের কলজে হিম করা ডাক শুনতে পেল তখন সে পাহাড়ের এক-চতুর্থাংশ উঠেছে। মনে হলো, সে কিছুতেই ওই খুঁটি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। সে প্রায় হেঁটে হেঁটে উঠেছে, আর এর মধ্যে কুকুর ছাড়া পেয়েছে। তাই এ অবস্থায় অবশিষ্ট শক্তি ব্যয় করে ওপরে না উঠে বরং কুকুরটির সঙ্গে লড়াই করাই উত্তম। কিন্তু এ চিন্তাটা আগে করতে হতো। এখন বাধ্য হয়েই ওপরে উঠতে হবে। কারণ এ ঢালু জায়গায় লড়াই করার প্রশ্নই ওঠে না। এসব ভাবতে ভাবতে প্রায় থেমে দাঁড়িয়ে ছিল সে। আবার উঠতে শুরু করল। কয়েক কদম এগিয়ে কুকুরটি কত কাছে এসে পড়েছে তা দেখার জন্য পেছনে মাথা ঘুরিয়ে সামনে পা বাড়াতেই ছোট পাথরে পা পড়ে পা ফস্কে গেল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়তে লাগল পাহড়ের ঢাল বেয়ে।

কুকুরটির নাইলন কর্ডের এক মাথা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা আছে। গলার বেল্ট আঁকড়ে ধরে আছে পাহারাদার। ছেলেটিকে ধাওয়া করার জন্য ছটফট করছে কুকুরটি। ক্যাপ্টেন একাধারে স্টপওয়াচ ও ছেলেটির দিকে লক্ষ্য রেখেছে। স্টপওয়াচ এক মিনিট পার হয়েছে নির্দেশ করতেই ‘ছেড়ে দাও।’ চাপা স্বরে বলল ক্যাপ্টেন। পাহারাদারের হাত থেকে ছাড়া পেতেই ক্রুদ্ধ গর্জন ছেড়ে নাইলন কর্ড ছাড়তে ছাড়তে দৌড় শুরু করল কুকুরটি পাহাড়ের দিকে।

মাথা ঘুরিয়ে দেখার আগেই তার পতন ঘটেছে বলে কুকুরটির অবস্থান জানতে পারেনি। গড়িয়ে পড়তে পড়তে দেখে নিল এখন পাহাড়ে এসে পৌঁছেছে। অনেক কষ্টে মাথা ঠান্ডা রেখে হিসাব কষছে কীভাবে কুকুরটিকে কুপোকাত করা যায়। তাকে আক্রমণকারীর সঙ্গে লড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে সে। সমতলে পৌঁছে তৃতীয়বার গড়ানোর আগেই নিজেকে সামলে নিয়ে যতদূর পারা যায় এটা জানে সে, সে জন্য কিছুটা উত্তেজিতও। এর আগেই কুকুরটির পৌঁছে যাওয়ার কথা। হয়তো নাইলন কর্ডের জন্য তার দ্রুত দৌড়াতে ব্যাঘাত ঘটছে। পৌঁছে গেল কালো কুকুরটি। গড়গড় করছে ভয়ঙ্করভাবে। চোখ দুটোতে যেন হিংস্র আগুন জ্বলছে। কয়েক হাত দূরে থেকেই শূন্যে ছেলেটির দিকে লাফ দিল কুকুরটি। সঙ্গে সঙ্গে উভয়েই আবার মুখোমুখি হলো। এবার হেঁটে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই ডান পা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাথি হাঁকাল কুকুরটির মুখে। ঘেউ ঘেউ করে দ্রুত কয়েকহাত দূরে সরে গেল। কুকুরটির ভাবভঙ্গি দেখেই এবার ঝট করে প্রথমে বসে পড়ল, তারপর মাথা নীচু করে প্রায় ড্রাইভ দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। ততক্ষণে ছেলেটির ওপর দিয়ে অপর পাশে উড়ে গিয়ে পড়ল কুকুরটি। দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। আগের চেয়ে আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে কুকুরটি; তা তার গলার স্বরেই বোঝা যাচ্ছে।

শুয়ে পড়েই চিত হয়ে দ্রুত উঠতে গেল ছেলেটি। কিন্তু ততক্ষণে আবার লাফ দিয়েছে কুকুরটি। দ্রুত বাঁয়ে সরে গেল। তবে যত দ্রুত সরতে চেয়েছিল, তত দ্রুত পারল না। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। দুর্বল শরীর নিয়ে কতক্ষণইবা এমন লড়াইয়ে টেকা যায়। এত মুহূর্ত আগে সে যেখানে ছিল সেখানে এসে পড়ল কুকুরটি। আধ শোয়া অবস্থায় ডান পা দিয়ে প্রচণ্ড এক লাথি কষল কুকুরটির পেটে। ঘেউ ঘেউ করে সরে গেল কয়েক হাত। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। শরীরটা কাঁপছে থরথর করে। এবার কুকুরটি আছে পাহাড়ের দিকে আর ছেলেটি আছে বিপরীতে। কুকুরটি হয়তো বুঝে গেছে যে, সে তার এ প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তেমন সুবিধা করতে পারছে না। তাই এবার পা টিপে টিপে চাপা স্বরে গরগর করতে করতে এগোচ্ছে ছেলেটির দিকে। আর ছেলেটিও এক পা এক পা করে পেছাচ্ছে। কুকুরটির পরবর্তী উদ্দেশ্য বোঝার জন্য দূরত্ব রাখতে চায়। হঠাৎ করেই ঘটল বিপত্তি। কুকুরের গলায় লাগানো নাইলন কর্ডের একাংশ নীচে প্যাঁচানো অবস্থায় পড়েছিল। তাতে পা বিঁধে ভারসাম্য হারিয়ে পেছন দিক দিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে গেল ছেলেটি। প্রতিদ্বন্দ্বীকে পড়ে যেতে দেখেই এক বিরাট লাফ দিল কুকুরটি। দুর্বলতার কারণেই এবার আর ইচ্ছার সঙ্গে শরীর কাজ করল না। তাছাড়া পাথুরে ভূমিতে পড়ে পিঠে ভালোই ব্যথা পেয়েছে। তবে মাথায় চোট লাগেনি; কারণ যখন দেখল যে সে তার পতন ঠেকাতে পারছে না, তখন মাথার নীচে হাত দিয়েছিল। কুকুরটি প্রায় উড়ে এসে ছেলেটির ওপর পড়ল। প্রথমে কুকুরটি তার দুই পা দ্বারা বুক খামছে ধরল। ব্যথায় ছেলেটির চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল। তারপর কুকুরটি মুখ নামিয়ে আনছিল ছেলেটির মুখ বরাবর। ততক্ষণে ছেলেটি কুকুরটিকে গা থেকে ফেলে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে। এত বড় ভারী কুকুরকে নড়ানোর মতো শক্তিও নেই। অবস্থা শোচনীয়। ছেলেটি তার মাথা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে গুঁতো মারল কুকুরটিকে থুঁতলিতে। এতে কিছুটা লাভ হলো। সে তার কাছে এমনটি আশা করেনি। ভড়কে গিয়ে মুখ তুলে ফেলল। তবে এখনো বুক খামছে ধরে আছে। কপালে ভালোই ব্যথা পেয়েছে। তবে তাকে পাত্তা না দিয়ে দেখল কুকুরটিকে কুপোকাত করার এটাই সুযোগ। দুহাত তুলতে গেল একসঙ্গে কিন্তু ডান হাতটি উঠছে না। যেন অবশ হয়ে গেছে। পড়ে যাওয়ার সময় মাথাকে বাঁচাতে গিয়ে হাতের তালুটি পাথুরে জমিতে প্রচণ্ড জোরে ছেলেটির বাম হাতে। নখ বসিয়ে দিল। ব্যথায় চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে গেল। অস্ফুট আওয়াজ বের হলো গলা দিয়ে। ছেড়ে না দিয়ে সর্বশক্তি একত্রিত করে আরো জোরে চেপে ধরল তার শ্বাসনালি। থাবা শিথিল হয়ে গেল। জিহ্বা বের হয়ে গেছে।

এর মধ্যে ক্যাপ্টেনসহ বাকি চারজন ঘিরে দাঁড়িয়ে তাদের তামাশা দেখছিল। ক্যাপ্টেন ইশারা করতেই পাহারাদার কুকুরটির বেল্ট ধরে টান দিল। হাত থেকে কণ্ঠনালি ছুটে গেল। নেমে গেল কুকুরটি ছেলেটির ওপর থেকে। ঘন ঘন দম নিতে লাগল কুকুরটি। ভয়ার্ত চোখে তাকাতে লাগল ছেলেটির দিকে। কুকুরটিকে নিয়ে চলে গেল পাহারাদার। পাথুরে ভূমিতে শুয়ে থাকায় পিঠে ব্যথা হচ্ছে। শুয়ে থেকে রক্ত বের হয়ে গেঞ্জির কিয়দংশ ভিজে গেছে। খানিকটা ছিঁড়ে গেছে আর বাম হাতে থাবা মেরেছে সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। অজুু নষ্ট হয়েছে।

‘সত্যিই, তুমি অপূর্ব বীরত্ব দেখিয়েছ, কুকুরটিকে হারিয়ে দিয়েছ।’ ছেলেটি উঠে বসতেই আবেগ জড়িত গলায় বলল ক্যাপ্টেন। এতক্ষণে সবাই নির্বাক হয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে ছেলেটিকে দেখছিল। ‘স্বীকার করতে আপত্তি নেই, ইতিপূর্বে কেউ কোনো কুকুরকে কাবু করতে পারেনি।’

‘প্রশংসা থামান।’ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তারপরও বলছে। ‘যদি জিতে থাকি তবে এবার আমাকে ছেড়ে দিন, নাকি আরো কোনো খেলা আছে?’ ছেলেটির প্রথম বাক্য শুনতেই মুখে আবার নিষ্ঠুর একটা ভাব ফুটে উঠল ক্যাপ্টেনের। কুকুরটিকে কুপোকাত করলেও তুমি তার মৃত্যু থাবা থেকে বাঁচতে পারোনি, ইতিপূর্বে অর্ধ ডজন নারী-পুরুষ মরেছে, তুমিসহ সাতজন হবে অর্থাৎ লাকি সেভেন।’ শেষ শব্দ তিনটি বলে হাসতে লাগল উন্মাদের মতো। ‘নিয়ে যাও একে।’ হাত ঝাপটা দিয়ে যেন ছেলেটিকে তাড়িয়ে দিল ক্যাপ্টেন। সঙ্গে সঙ্গে বাকি তিনজন এগিয়ে এলো তার দিকে।

‘নিয়ে যাওয়ার আগে আমার একটি কথা রাখুন। আমাকে অজু করার জন্য এক জগ পানি দিন।’ বলল ছেলেটি।

‘না,’, তার কথা নাকচ করে দিল ক্যাপ্টেন।

‘তোমরা দাঁড়িয়ে কী দেখছ? নিয়ে যাও একে।’ রেগে গেছে ক্যাপ্টেন। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজন এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ছেলেটিকে তুলে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিল। অপরজন বন্দুকের নল দিয়ে পেছনে, সামনে এগোনোর জন্য গুঁতো দিল। পুনরায় গুঁতো খেয়ে এগোতে যাবে ছেলেটি, এমন সময় ক্যাপ্টেনের কথায় দাঁড়াল। ‘তোমাদের ফিরতে রাত হবে, চাঁদ নেই, তাই গার্ড কোয়ার্টার থেকে দড়ি নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে টর্চলাইট নিও। আর হ্যাঁ, ভালোভাবে বেঁধে রাখবে।’ আবার তার পিঠে নলের গুঁতো পড়ল। অনেকটা নীচে নেমে এসেছে। নীচের দিকে নামছে বলে হয়তো অতটা কষ্ট হচ্ছে না। তারপরও ধীরে ধীরে পা দুটো ভারী হয়ে আসছে। কুকুরটির নখ বড়ই ছিল। এখনো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বের হচ্ছে। আগের চেয়ে গেঞ্জিতে লাল দাগের পরিধি আরো বেড়ে গেছে। তার দুপাশে কয়েক হাত দূর দিয়ে চলছে দুজন। পেছনে একজন। তবে পিঠে রাইফেলের নল ঠেকানো নেই। একবার থেমে দাঁড়িয়েছিল। পেছনের লোকটি বলেছে দ্বিতীয়বার থেমে দাঁড়ালে অসুবিধা আছে। কী অসুবিধা আছে বলেনি।

পশ্চিম দিক দিয়ে নামছে। আর অল্প পরেই ডুবে যাবে সূর্য। সামনে মাগরিবের নামাজ। অজু করতে হবে। এবার এদের কাছে বলে দেখা যাক কী হয়।

‘প্লিজ, একটু পানির ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে?’

সবাই নীরবে হাঁটছিল। কারো কাছ থেকেই কোনো জবাব এলো না। বুঝল, এরাও তার কথা শুনবে না। তাকে সামনে যে কোনো জায়গায় বেঁধে রাখবে। তখন আর তায়াম্মুমও করতে পারবে না। এখনই নেমে তায়াম্মুম করতে হবে। থামলে হয়তো দু-চারটা লাথি তার পিঠে পড়বে। তাতে কিছু আসে-যায় না। কয়েক পা এগিয়ে থেমে দাঁড়াল।

‘আমাকে এক মিনিট সময় দিন।’ বলে বসতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে লাথি এসে পড়ল ছেলেটির পিঠে। এত জোরে লাথি হাঁকাল, তাও আবার না বলে, কল্পনাও করেনি ছেলেটি। প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল ছেলেটি। ভোঁ করে ঘুরে উঠল মাথাটা। পড়ে গেল পেছন দিক দিয়ে। জ্ঞান হারাল সঙ্গে সঙ্গে। গালি দিয়ে উঠল তিনজনেই। তিনজন মিলে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলল ছেলেটিকে। সামনেই তাদের গন্তব্য।

ক্যাপ্টেনের গলার আওয়াজ কানে ঢুকতেই চোখ-মুখ মুছতে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কয়েক পা এগিয়ে এসে রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। দেখল দুজন লোক ছেলেটির হাত-পায়ের বাঁধন খুলছে। প্রথমে ছেলেটিই কী যেন বলল। তবে শোনা গেল না। এরপর ক্যাপ্টেন বলতে শুরু করল। তার কথা শোনা যাচ্ছে। শুনতে শুনতে মেয়েটির গায়ে মৃদু কাঁপুনি শুরু হলো। একটু পরেই কালো রোমশ বড় একটা কুকুর এসে হাজির হলো। সব শুনছে ও দেখছে মেয়েটি। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। একটু পরেই শুরু হলো ছেলেটির দৌড় পর্ব। তার হাতে যদিও ঘড়ি নেই, তারপরও অনুমান করল তুলনামূলকভাবে অল্প সময়েই পাহাড়ের ওপর চড়তে শুরু করেছে। মনে মনে প্রার্থনা করছে, কুকুর তার কাছে পৌঁছানোর আগেই যেন অর্ধ পাহাড়ের ওপরে উঠে যায় সে। ছেলেটি যেভাবে ওপরে উঠছে তাতে হয়তো সে পারবে, ভাবল সে। মুখে হাসি ফুটে উঠল তার। চোখে অশ্রু। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। কুকুরটির রক্তহিম করা ডাক শুনেই যেন সম্বিত ফিরে পেল সে। অদৃশ্য হয়ে গেল হাসিমুখ থেকে। ছুটতে শুরু করেছে কুকুরটি। একসময় প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটি। শরীরে কাঁপুনি থেমে গিয়েছিল, আবার শুরু হলো। কারণ কুকুর আর ছেলেটির মাঝে দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে। গলা থেমে অস্ফুট আওয়াজ বের হয়ে যাবে, এমন সময় আবার দৌড়াতে শুরু করেছে ছেলেটি। কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ করেই গড়িয়ে পড়তে দেখল ছেলেটিকে। মুখ শুকিয়ে গেল তার। ছেলেটি যখন সমতলে পৌঁছেছে তখন কুকুরটি মাত্র কয়েক গজ দূরে। এরপর যা ঘটবে তা দেখতে পাবে না বলে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত পরে যা দেখল তাতে খুশিতে তালি দিয়ে উঠল। ক্যাপ্টেনসহ পাঁচজনে এগোতেই শুরু করেছে। তালির শব্দ শুনে ঘুরে তাকাল ক্যাপ্টেন। কিছু না বলে আবার হাঁটতে লাগল। হঠাৎ করেই কীভাবে যেন পড়ে গেল ছেলেটি। এতদূর থেকে সব স্পষ্ট দেখা যায় না। মুহূর্তে সব হাসি আনন্দ যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল তার। কুকুরটি যে ছেলেটির ওপর চড়েছে তাও দেখা যাচ্ছে। তার থাবা বসিয়েছে কিনা তা দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ব্যাপার চোখে পড়তেই কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল বারান্দায়। ছেলেটির গলা বা মুখে কুকুরটি তার সদন্ত বসিয়ে দেবে তা সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। বলে চোখ বন্ধ করতে যাচ্ছিল, এমন সময় যা দেখল তাতে চোখ বন্ধ না করে বরং চোখের পানি মুছে হাসিমুখে ধীরে ধীরে আবার উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। মাথা দিয়ে গুঁতো মেরেছে ছেলেটি কুকুরটির মুখে। শেষ বিকেলের আলোয় দেখা যাচ্ছে কম। হাত দিয়ে ছেলেটি কুকুরটির গলা টিপে ধরেছে। কয়েক মুহূর্ত পর যখন কুকুরটিকে ছেলেটির ওপর থেকে সরিয়ে নেয়া হলো তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল মেয়েটি। চোখের পানি মুছছে। সে দেখতে না পেলেও ভাবল হয়তো কুকুরটি কমপক্ষে নখ বসিয়েছে ছেলেটির শরীরে। এজন্য খুব খুশি হতে পারছে না সে। তারপর খানিক কথোপকথন হলো বলে মনে হলো মেয়েটির তাদের মুখ-হাত নাড়া দেখে। তবে দূরত্বের জন্য কিছুই শুনতে পেল না। অবশেষে একরকম বন্দী করে নিয়ে চলল ছেলেটিকে। এক সময় হারিয়ে গেল দৃষ্টি থেকে। ছেলেটি চোখের আড়াল হতেই বিষণ্ন মনে বসে পড়ার চেয়ারে। হাতের পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছছে। কোথায় নিয়ে গেল ছেলেটিকে? শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে তার কপালে? আর তার নিজের কী হবে?

ক্যাপ্টেন এদিকেই আসছে। আবার ক্যাপ্টেনের সামনে সে পড়তে চায় না। সে তাকে ঘৃণা করে। লোকটা মানুষ নয়, পিশাচ। তাই কালবিলম্ব না করে তার ঘরে এসে শুয়ে পড়ল বিছানায়। এখন তার কিছুই করার নেই। শরীর-মন উভয়ের ওপর অনেক ধকল গেছে। ঘুমানো দরকার। তাতে বরং কিছুটা উপকার হবে। বেশি দেরি করতে হলো না, খানিক পরই তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।

কোনো কিছুর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। প্রথমে ঘুমের ঘোরে বুঝতে পারল না কোনো শব্দে তার ঘুম ভেঙেছে। পর মুহূর্তে দলজায় ঠক ঠক শব্দ হতেই তন্দ্রাভাবে কেটে গেল তার। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে গিয়ে খুলে দিল দরজা। দরজার সামনে দুপুরের সেই ওয়েটারকে চিনতে পড়ল। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে পাহারাদার।

‘গুড ইভিনিং, ম্যাডাম। ঘুম ভালো হয়েছে তো?’ হেসে জিজ্ঞেস করল ওয়েটার। মাথা নেড়ে জবাব দিল মেয়েটি। বাইরে তাকিয়ে দেখল রাত হয়েছে।

‘হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আসুন’, বলেই চলে যেতে উদ্যত হলো লোকটি।

‘খেতে ইচ্ছে করছে না, খাব না।’ লর্ড বা ক্যাপ্টেন কারো সামনেই যেতে ইচ্ছে করছে না বলে তাড়াতাড়ি বলল সে। ঘুরে দাঁড়াল লোকটি।

‘রাতে না খেয়ে থাকা ঠিক না, কিছু না কিছু খেতে হয়। লর্ড আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আর ক্যাপ্টেন বিয়ে অনুষ্ঠানের তদারকি করতে গেছেন, আপনাকে খেয়ে নিতে বলেছেন।’

মেয়েটি ধৈর্য ধরে লোকটির কথাগুলো শুনল। ‘ঠিক আছে, তাহলে এখানেই খাবার নিয়ে আসুন, যেতে ইচ্ছে করছে না।’

এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল ওয়েটার। তারপর ‘ঠিক আছে’ বলে চলে গেল।

হাত-মুখ ধুয়ে বের হতে না হতেই খাবার ট্রে নিয়ে ওয়েটার নিজেই এলো। দরজা খোলাই রেখেছিল মেয়েটি। রিডিং টেবিলেই খেতে বসল। মেয়েটির থালায় খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, ‘সন্ধ্যার পর একবার এসে দরজায় নক করেছিলাম, কয়েকবার নক করার পরও যখন কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না, তখন ভাবলাম হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই বিরক্ত না করে চলে গিয়েছিলাম।

‘কেন ডেকেছিলেন?’ যেন কথার কথা জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘চা নিয়ে এসেছিলাম’, হেসে জবাব দিল ওয়েটার।

আর তেমন কোনো কথা হলো না। খাওয়া শেষ হলে সব নিয়ে গেল ওয়েটার। ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল দেয়াল ঘড়ির দিকে। দেখল রাত প্রায় সাড়ে এগারটা বাজে। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। এখন আর সহজে ঘুম ধরবে না। সময় কাটানোর জন্য বসে পড়ল রিডিং টেবিলের সামনে। টেনে নিল একটা ম্যাগাজিন। পাতা উল্টিয়ে চলেছে। পড়ার মতো অনেক কিছুই আছে, কিন্তু পড়তে ইচ্ছে করছে না। ম্যাগাজিনটা রেখে রিডিং লাইট অফ করে চেয়ারের নরম ফোমে হেলান দিল। লম্বা ঘুম দিয়ে খেয়ে দেয়ে শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। ঘুম নেই চোখে। কিন্তু মাথায় রাজ্যের ভাবনা ভিড় জমিয়েছে।

ওই লোক তিনজন কোথায় নিয়ে গেল ছেলেটিকে? নিয়ে গিয়ে কি আবারো নির্যাতন করবে তার ওপর? আরো অমানুষিক নির্যাতন? শেষ পর্যন্ত ছেলেটির পরিণতি কী হবে? আর তার নিজেরইবা কী হবে? তবে কি তাকে বাকি জীবন এ দ্বীপে, এ নরপশুদের মাঝে কাটিয়ে দিতে হবে? এখান থেকে কি আদৌ মুক্তি পাওয়া যাবে না? মুক্তির কি কোনো পথ নেই? কোনো প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পেল না সে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে বারটা পার হয়েছে। জেগে থেকে কোনো লাভ হচ্ছে না বরং দুশ্চিন্তা বাড়ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে এলো বারান্দায়। বাংলোর চারদিকে সিকিউরিটি লাইট জ্বালানো। তার সোজা সামনে নীচে গাছপালার আড়ালে আবছা অন্ধকারে একজন লোক দাঁড়ানো। সিগারেটের আগুন দেখতে পেল। তা না হলে তার উপস্থিতি বুঝতে পারত না সে। কাঁধে রাইফেল। মেয়েটি বারান্দায় আসতেই নড়েচড়ে দাঁড়াল সে। বারান্দায় লাইট জ্বালানো নেই। তবে ঘরের আলো দরজা-জানালার পর্দা ভেদ করে বারান্দাটিকে ঈষৎ আলোকিত করেছে। হয়তো তাতেই তাকে সতর্ক হয়ে গেছে পাহারাদার। বোঝা যাচ্ছে শুধু তার জন্যই এ পাহারার ব্যবস্থা। আরো পাহারাদার আছে কিনা কে জানে।

হঠাৎ কোনো কিছুর শব্দে তার তন্দ্রা টুটে গেল। ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল। বারান্দা থেকে শব্দটা এসেছে বলে মনে হলো। বেড সুইচ হাত দিয়ে বাতি জ্বালাল। কী হয়েছে দেখার জন্য বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল মেয়েটি। বারান্দার দিকে এগোতে যাবে এমন সময় দরজার পর্দা সরে গেল। যা দেখল তাতে হতভম্ব হয়ে গেল সে। সময়মতো নিজের মুখ নিজে চেপে না ধরলে হয়তো বিস্ময়ের চিৎকারটা মুখ দিয়ে বেরিয়েই আসত।

নড়ে উঠল ছেলেটি। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। চোখ খুলল। সব অন্ধকার দেখতে লাগল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ পরে আবার খুলল। এবার আর বন্ধ করল না। তার ক্ষতস্থানগুলো ব্যথা করছে আর মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চোখ খোলা রেখেছে। তারপরও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তবে কি সে অন্ধ হয়ে গেছে? হঠাৎ করেই বুঝতে পারল, রাত হয়ে গেছে। নানা পোকার কোলাহলে চারদিক মুখরিত। কান পাতা দায়। উঠে দাঁড়াতে যেতেই দেখল তাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তারপর সবকিছুই এক এক করে স্মৃতিতে ভেসে উঠল। তবে পেছন থেকে কোনো কিছুর ধাক্কা খেয়ে বসে পেছন দিকে পড়ে যাওয়ার পর আর কিছুই মনে নেই। তবে কি সে সেই সময় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল? তাই হবে। তবে তো তার মাগরিব নামাজ কাজা হয়েছে। আবার হয়তো এশার নামাজেরও সময় হয়েছে। এখন নামাজ আদায় করার অজু নচেৎ তায়াম্মুম করতে হবে কিন্তু সে তো বন্দী আছে। তাকে একটা গাছের সঙ্গে হেলান অবস্থায় রেখে হাত দুটো পিঠমোড়া করে গাছের পেছনে বেঁধেই। শরীরের ওপরের যে অংশ গাছের গায়ে হেলান আছে, সে অংশ গাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে বেঁধেছে। পা দুটো সামনে ছড়ানো অবস্থায় একত্র করে বেঁধেছে। সব বাঁধনই অত্যন্ত শক্ত করে বেঁধেছে। নড়াচড়ার উপায় নেই। তবে কি তাকে ওই অবস্থায়ই থাকতে হবে? কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ চিন্তা করল। হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেল। দেরি না করে কাজ শুরু করে দিল। হাত দুটো বাদেই তার ওপরের অংশ গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধেছে। হাত দুটো আংশিক নড়াচড়া করা যায়। হাতের কব্জিতে বেঁধেছে। ফলে হাতের নখগুলো মুক্ত আছে।

প্রথমে হাত দুটো বাঁধা অবস্থায় ধীরে ধীরে ডানে কোমরের দিকে সরিয়ে আনতে লাগল। এতে বাম হাতে প্রচণ্ড চাপ পাওয়ায় ব্যথা করতে লাগল। কিন্তু ব্যথায় পাত্তা না দিয়ে দুটো হাতই কোমর স্পর্শ করল। ডান পাশে কোমরে পাজামায় সেই কাঁচির একাংশ গোঁজা অবস্থায় আছে। তার গায়ে গেঞ্জি আর পাজামা ছাড়া আর কোনো কাপড় নেই। তার কাছে কিছু নেই মনে করে হয়তো তার দেহে তল্লাশি চালায়নি। ফলে কাঁচির অংশটি এখনো বহাল তবিয়তেই আছে। অনেক কষ্টে আঙুল দিয়ে কাঁচির অংশটি বের করল। কিন্তু দুই আঙুলে ধরার আগেই মাটিতে পড়ে গেল। যেখানে পড়েছে সেখানে কিছুতেই আঙুল নিয়ে যেতে পারবে না। অথচ তার প্রায় দেহের সঙ্গেই তা লেগে আছে। কিন্তু তা নিতে পারছে না।

এর মধ্যে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করেছে। দমে গেল সে। এখন কী করবে? অন্ধকারে তাকাতে তাকাতে চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। ফলে সবকিছু আবছা দেখতে পাচ্ছে। মাথা ঘুরিয়ে কাঁচির অংশটিও দেখতে পেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা বুদ্ধি মাথায় এলো। প্রথমে গাছের পেছনে হাত দুটো মাটিতে নামিয়ে এনে আঙুল দিয়ে খুঁজতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পরই যা খুঁজছিল পেয়ে গেল। ছোট চিকন করা ডালটা বাঁ হাতের দুই আঙুলে ধরে আবার হাত দুটো ডানে সরিয়ে আনল। কাঁচির যে গোল অংশে আঙুল ঢুকিয়ে ধরে সেখানে ডালটি ঢুকিয়ে অত্যন্ত ধীরে ধীরে কাঁচির অংশটিকে তার পেছনে গাছের গোড়ায় নিয়ে এলো। এবার ডালটি ফেলে দিয়ে সহজেই তা ডান হাতে তুলে নিল।

প্রথমেই হাতের বাঁধন কাটতে হবে। তাহলে দ্রুত বাকি সব বাঁধন খুলতে পারবে। দেরি না করে কাজে লেগে গেল। অতি কষ্টে ডান হাতের আঙুল দ্বারা কাঁচির অংশটিকে ধরে হাতের কব্জির বাঁধন কেটে চলল। কাঁচির অংশটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার এমনিতেই ভোঁতা হয়ে এসেছিল, তার ওপর ফলাটি মোটে দেড় ইঞ্চি। তা দিয়ে অত শক্ত দড়ি কাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ।

ডান হাত ব্যথা হয়ে যাওয়ায় বাম হাত দিয়ে কাটতে শুরু করল। মধ্যে দুবার বিশ্রাম নিয়ে কয়েকবার হাত বদল করে দীর্ঘ সময় পর অবশেষে হাত দুটো মুক্ত করতে পারল। বসে কিছুক্ষণ দম নিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু তা না করে দ্রুত বাকি বাঁধন খুলে একদম মুক্ত হলো। কাঁচির অংশটিকে আবার কোমরে গুঁজে উঠে দাঁড়াল।

এখন তার প্রথম কাজ হচ্ছে অজু বা তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া। তাকে অনেক নীচে নামানো হয়েছে। আর কিছু নীচে নামলেই হয়তো সমুদ্র পাওয়া যাবে। কারণ শেষ বিকেলে নীচে নামার সময় গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরে সমুদ্রের নীল পানি চোখে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত পর নীচে নেমে চলেছে ছেলেটি। গতি খুব বেশি নয়। কারণ এমনিতে এসব জায়গা তার অচেনা। তার ওপর আকাশে চাঁদ নেই। আবার পড়ে গিয়ে কোনো বিপত্তি ঘটাতে চায় না। নামার সুবিধার জন্য বেশ ডানে সরে এসেছে। সোজা নীচে নামা কঠিন, কারণ পথ খুব দুর্গম। এখনো সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে না। হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটা গাছতলায় বসে লম্বা লম্বা শ্বাস ছাড়ছে।

বাম হাতে যেখানে কুকুরটি থাবা মেরেছিল সেখান থেকে প্রচুর রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। তবে এখন আর রক্ত বের হচ্ছে না। ডান হাত দিয়ে নেড়ে দেখল রক্ত এখনো পুরোপুরি জমাট বাঁধেনি। বুকের যে দুই জায়গায় থাবা মেরেছে সেখানকার রক্তও এখনো ভালোভাবে জমাট বাঁধেনি। গেঞ্জি রক্তে ভিজেই আছে। অর্থাৎ রাত এখনো গভীর হয়নি। আবার উঠে দাঁড়াতে গিয়েও থেমে পড়ল। একটা শব্দ এই প্রথম কানে এসেছে। এতক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকায় হয়তো শুনতে পায়নি। অবশ্য শব্দ খুব জোরে শোনা যাচ্ছে না। ভালোভাবে শোনার জন্য কান পাতল।

দূরে পানি পড়ার শব্দ মনে হলো। অস্পষ্ট। তবে কি কাছে-পিঠে কোথাও ঝরনা আছে? এ রকম পাহাড়ি এলাকায় ঝরনা থানা অস্বাভাবিক কিছু নয়। খুশি হয়ে উঠেছে সে। হয়তো ঝরনাটা বেশি দূরে নয়। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে এগোলেই হবে। আর দেরি করল না। প্রায় দৌড়াতে শুরু করল। রাতে অচেনা জায়গা পাড়ি দেয়া খুবই কঠিন। তার ওপর এই জঙ্গলে হিংস্র প্রাণী আছে কিনা কে জানে? হয়তো নেই। কারণ তাদের উপস্থিতির কোনো ইঙ্গিত সে পায়নি। যত দ্রুত ছুটতে চাইছে তত দ্রুত পারছে না। ক্লান্তির কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে।

অবশেষে একসময় শব্দ খুব স্পষ্ট শুনতে পেল। ঝরনাই। কোনো সন্দেহ নেই। তার পরিশ্রম বিফলে যায়নি। আর একটু পরেই পৌঁছে গেল ঝরনার ধারে। দাঁড়িয়ে পড়ল খোলা জায়গায়। রাতের অন্ধকার। অবশ্য অন্ধকারে চলতে চলতে তার কাছে অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। তাকিয়ে দেখতে লাগল চারদিকে। হয়তো আরো অনেক ওপরে দুর্গম পর্বতসঙ্কুল কোনো স্থানে এ ঝরনার উৎপত্তি হয়েছে। সেখান থেকে পাহাড় টিলার পাশ কাটিয়ে এঁকে বেঁকে নীচে নেমে এসেছে। এ ঝরনার পানি দিয়েই হয়তো ছোট্ট এক নদীর জন্ম নিয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে একটু দূরে অনেক ওপর থেকে পানি পড়ছে প্রচণ্ড বেগে। যার ফলে শব্দের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই পানি তার সামনে দিয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে নামছে প্রচণ্ড গতিতে। পানি চলার পথে ছোট-বড় পাথরের চাঁইয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ফেনার সৃষ্টি করছে। এসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দিনে অথবা জ্যোৎস্না রাতে দেখতে হয়। অন্ধকার রাতে দেখার কিছুই নেই। খেয়াল হলো যে সে দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি একটা সুবিধাজনক জায়গায় বসে পড়ল। তৃষ্ণা পেয়েছে।

প্রথমে দুহাত পরিষ্কার করে দুই হাতে আঁজলা ভরে পানি পান করল। ক্ষুধা লেগেছিল। তাও কিঞ্চিৎ পরিমাণ নিবৃত্ত হলো। তারপর গা থেকে গেঞ্জি খুলে প্রথমে তার রক্ত ধুয়ে ফেলল। এরপর গেঞ্জিটা ভালোভাবে ধুয়ে শুকানোর জন্য দেবে। কিন্তু ধুতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। প্রচণ্ড স্রোতে গেঞ্জিটা হাত থেকে ছুটে চোখের পলকে হারিয়ে গেল পানির স্রোতে। এখন তার বস্ত্র বলতে পায়জামা ছাড়া কিছুই নেই। কয়েক মুহূর্ত ভেবেও কোনদিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে বুঝতে পারল না। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগল। হঠাৎ করেই ধ্রুব তারকাটি চোখে পড়ল তার। কয়েক মুহূর্ত পরই দাঁড়িয়ে পড়ল নামাজে। মোনাজাত শেষে একটা বড় পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল ছেলেটি। মাথায় রাজ্যের চিন্তা।

সময় বয়ে চলল নিজস্ব গতিতে। ভাবছে, বর্তমানে সে মুক্ত আছে। তবে শিগগিরই তাকে খোঁজা শুরু হবে। তার হাতে সময় আছে। সে ইচ্ছে করলেই আপাতত এ দ্বীপের কোথাও আত্মগোপন করে থাকতে পারে। তবে তাকে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। কারণ একই স্থানে বেশি সময় থাকলে ধরা পড়ে যাবে। তারপর পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হলেই সময়-সুযোগমতো যেভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে হবে। কারণ তাকে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা নিতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই এখান থেকে সরে পড়তে হবে। অবশ্য তার একার পক্ষে এসব খুব কঠিন হবে না। কিন্তু সে একা সরে পড়বে কীভাবে? সে মেয়েটিকে চোখ মুছতে দেখেছে। বিয়েতে নিশ্চয়ই তাকে জোর করে রাজি কআিছে। ওরা বাকি জীবন তাকে এ দ্বীপে একরকম বন্দী করে রাখবে। সে হয়তো অত্যাচারের শিকার। শারীরিক না হোক, মানসিক তো। সে একজন অত্যাচারিতকে অত্যাচারীদের মধ্যে ফেলে রেখে কীভাবে স্বার্থপরের মতো পালাবে?

ভেবে দেখল, মেয়েটিকে নিয়ে এখান থেকে পালানো তার পক্ষে খুব কঠিন ও বিপদসঙ্কুল হবে। আবার ধরাও পড়ে যেতে পারে। তাকে নিয়ে এখান থেকে পালাতে গেলে হয়তো দেরি হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে সে জলাতঙ্কে মরতেও পারে। কিন্তু কিছুতেই একা পালানোর কথা ভাবতে পারল না ছেলেটি। দুহাত তুলল সেই মহাপরাক্রমশালী এ বিশ্বজগৎ নিয়ন্তা মহান আল্লাহপাকের দরবারে।

হে আল্লাহ্, তুমি জানো আমি সিদ্ধান্তটি সঠিক নিয়েছি কিনা। ভুল হয়ে থাকলে তুমি আমাকে মাফ করে দিও, তুমিই তো অপরাধ মার্জনাকারী। হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। আমাদেরকে এ বিপদ থেকে মুক্তির জন্য সাহস, মনোবল ও দেহবল দান কর। হে আল্লাহ, তুমি তোমার এ দাসানুদাসের অন্তরের খবরও জানো, তুমি আমাকে সব ধরনের পাপ, অশ্লীল কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখ।

ওপরে উঠে এসেছে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে হাঁপাচ্ছে। সকাল থেকে কতক্ষণ বাকি তা জানা নেই। দিনের আলো ফুটে উঠলেই তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। বেশ দূরে ঘরগুলোর জানালার শার্ষি ভেদ করে ঘরের আলো আবছাভাবে বাইরে আসছে। সমতল চত্বরে আলো আছে, বাংলোর বারান্দায় আলো আছে। জায়গায় জায়গায় রাইফেল হাতে পাহারাদাররা পায়চারি করছে। একবার দেখলেই যে কোনো অনভিজ্ঞ লোকও অনুমান করতে পারবে, এদের পাহারা ব্যবস্থায় কোনো খুঁত নেই। বরং তা যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তা একটু পরেই বুঝতে পারল ছেলেটি।

চত্বর থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে অন্ধকারে একটা টিলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে সে। যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে বাংলোর সামনের দিকটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে বুঝতে পারল সামনে দিয়ে কারো চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলোর কাছে পৌঁছার কোনো উপায় নেই। তার ওপর এত দূর থেকেও মেয়েটার ঘরের সামনে একজনকে পায়চারি করতে দেখল। সামনে দিয়ে যাওয়া চরম বোকামি। বাংলোর পেছনে গিয়ে ওখানকার অবস্থা দেখতে হবে। কারণ তার ধরা পড়াতে কোনো লাভ হবে না।

ঘুরতে যাবে এমন সময় কুকুরের ক্রুদ্ধ ধ্বনিতে যেন বরফের মতো জমে গেল ছেলেটি। পরমুহূর্তে নিজের অজান্তে শব্দের উৎস লক্ষ্য করে আবার সামনে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল চত্বরের বাম দিক থেকে একটা রোমশ বড় কুকুর একটা রাইফেলধারী লোককে তার দিকে টেনে নিয়ে আসছে। কুকুরটির গলায় পরানো শিকলের আংটা লোকটির হাতে ধরা। এগিয়ে আসছে এরা দ্রুত পায়ে। খুব জোর পাঁচশ’ গজ দূরে আছে। হঠাৎ করেই বুদ্ধিটা মাথায় এলো।

‘মেঁও, মিঁয়াও।’ বিড়ালের স্বর নকল করে ডেকে উঠল ছেলেটি উচ্চকণ্ঠে। যেন কুকুরের ডাক ছাপিয়ে দূর থেকেই লোকটি শুনতে পায়। প্রথমবারে থামল না লোকটি। হয়তো শুনতে পায়নি। বরং এখন তারা প্রায় দৌড়ে আসতে লাগল। দ্রুত দূরত্ব কমছে। লোকটি আলোতে আছে আর সে অন্ধকারে আছে বলে হয়তো তাকে এখন দেখতে পায়নি। আর প্রায় পঞ্চাশ গজ এগোলে লোকটিও অন্ধকারে এসে পড়বে। পাহাড়ের জায়গায় জায়গায় সিকিউরিটি লাইটের ব্যবস্থা করা, বা চত্বরের দিকে তাক করা। লোকটি একটি সিকিউরিটি লাইটের কাছে চলে এসেছে। ফলে তীব্র আলো থেকে চোখ বাঁচানোর জন্য কপালে বাম হাত তুলেছে।

সে জানে, দৌড়ে কোনো লাভ নেই বরং বিপদ আরো বাড়বে। সে যে শুধু কুকুরের হাতে আবার পড়তে যাচ্ছে তা-ই নয় বরং পুনরায় বন্দীও হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, তৃষ্ণাও পেয়েছে। মরিয়া হয়ে অনেক কষ্টে আবার ডেকে উঠল, ‘মেঁও, মিঁয়াও।’ হয়তো বিড়ালের ডাক কানে গেছে লোকটির। থেমে দাঁড়াল। হয়তো ভালোভাবে শোনার জন্য। আবার ডেকে উঠল ছেলেটি প্রায় নিখুঁতভাবে। অট্টহাসি হেসে শিকল টেনে কুকুরটিকে থামাল পাহারাদার। গর্জন বন্ধ করে দিয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে গড়গড় করতে লাগল কুকুরটি। সে সঙ্গে সামনে এগোতে চাইল। তবে তাকে এগোতে না দিয়ে বরং প্রায় টেনে নিয়ে ফিরে চলল লোকটি। মনিব তার শিকারের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি বলে হয়তো রাগ হয়েছে কুকুরটির। তারই ফলে হয়তো গড়গড় করতে করতে মনিবের পিছু পিছু বাধ্য ছেলের মতো হাঁটতে লাগল।

এতক্ষণে যেন নড়াচড়ার শক্তি ফিরে এলো। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে প্রশংসা করল সেই মহাত্রাণকর্তা আল্লাহ্র। এতক্ষণে কী হতো ভেবে তার শরীর কেঁপে গেল। আর দেরি করল না। পা বাড়াল নীচের দিকে। প্রথমে বেশ খানিকটা নীচে নেমে এলো। যেন আবার আগের অবস্থার সৃষ্টি না হয়। তারপর অনুমান নির্ভর হয়ে চলল। একসময় ওপরের দিকে উঠতে লাগল। দূর থেকেই দেখল তাকে আরো ডানে সরতে হবে। আবার নীচে নেমে ডানে সরে ওপরে উঠে এলো। হ্যাঁ, এবার বাংলোর ঠিক পেছনে এসে উপস্থিত হয়েছে। তবে বেশ দূরে আছে। তার আন্দাজ সামনে বা আশপাশে পাহারাদার না থেকে পারে না। কুকুর থাকলে তো আরো বিপদ। সে যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখানে ঘন গাছপালায় পূর্ণ এবং অন্ধকার।

এদিকে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু বোঝার সম্ভাবনা কম। ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগোতে হবে। পা টিপে টিপে এগোতে শুরু করল সে। প্রায় বিশ-পঁচিশ গজ এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল। তার একটু বাঁয়ে ঘুমন্ত এক পাহারাদার বাংলোর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশব্দে আলো-অন্ধকারে কয়েক গজ পিছিয়ে এসে চারদিকে তীক্ষè চোখে তাকাল ছেলেটি। আশপাশে আর কাউকে দেখতে পেল না। ছেলেটি বুঝতে পারল না বাংলোর পেছনে মাত্র একজন পাহারাদার রাখার হেতু কী? আরো ভালোভাবে পরিস্থিতি বোঝার জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কর্তব্য স্থির করে নিল। সে যা করতে চাচ্ছে এছাড়া অন্য কোনো সহজ উপায় আর নেই। তবে তাও হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এগোতে যাবে, এমন সময় পাহারাদার নড়ে উঠল। ডানে-বাঁয়ে, পেছনে ফিরে তাকিয়ে আবার আগের মতো সামনে নজর দিল। পা টিপে টিপে এগিয়ে পাহারাদারের প্রায় দশ গজ পেছনে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়াল। এখন পেছনে ফিরে তাকালে পাহারাদার তাকে দেখতে পাবে। উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ডের গতি অনেক বেড়ে গেছে। জোর করে নিজেকে শান্ত রাখতে হচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে সে ধরা পড়ে যেতে পারে। পাহারাদার ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘুম ধরতে পারে হয়তো এ কারণে কোনো গাছের গায়ে হেলান দেয়নি বা বসে পড়েনি। বাছাই করা পাহারাদার।

দেরি করার সময় নেই। কারণ কিছুক্ষণ পরপর পাহারাদার চারদিকে তাকায়। যে কোনো মুহূর্তে পেছনে তাকাতে পারে এ আশঙ্কায় আর দেরি না করে আল্লাহর নাম নিয়ে পাহারাদারের সোজা পেছন বরাবর দাঁড়াল। তারপর প্রায় শামুকের গতিতে নিঃশব্দে এগোতে লাগল। লোকটির প্রায় এক গজ পেছনে এসে দাঁড়াল। হাঁপাচ্ছে। হয়তো নিঃশ্বাসের শব্দ কানে গেছে লোকটির। ঘুরে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটি দেহের সর্বশক্তি একত্রিত করে পা দুটো ভাঁজ করে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে শূন্যে লোকটির প্রায় পিঠ পর্যন্ত লাফিয়ে উঠল। তারপর শূন্যে থাকা অবস্থায় ভাঁজ খুলে দুপা দিয়ে লাথি হাঁকাল লোকটির পিঠে। অবশ্য লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটিকে দেখেছে। কিন্তু তার সম্পর্কে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাথির আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। লোকটি ওঠার চেষ্টা শুরু করার আগেই বস্তা পতনের শব্দে তার পিঠে চেপে বসল ছেলেটি। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলটি লোকটির ঘাড় থেকে খুলে ফেলল।

‘চুপচাপ শুয়ে থাকুন, বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে গুলি করতে বাধ্য হব’, শীতল গলায় বলল ছেলেটি। লোকটি তাকে বাঁধা দিচ্ছে না দেখে সন্দেহ হলো। উল্টিয়ে দেখল তার সন্দেহই ঠিক, জ্ঞান হাআিছে লোকটি। তার জন্য এটাই ভালো হয়েছে। ঝুঁকি কমে গেছে। দ্রুত কাজে লেগে গেল। শীতকাল। মোটা কাপড়ের শার্ট পরেছে লোকটি। লোকটার গা থেকে শার্টটা খুলতে যেতেই পকেট থেকে বেরিয়ে পড়ল এক প্যাকেট সিগারেট ও একটা গ্যাস লাইটার। সতর্ক আছে ছেলেটি। জ্ঞান ফিরলে যেন লোকটি তাকে কাবু করতে না পারে।

শার্টটা টুকরো করে ছিঁড়ে লোকটির দুই হাত পিঠমোড়া করে ভালোভাবে বাঁধল। তারপর বাঁধল পা দুটো। গা থেকে গেঞ্জি ছিঁড়তে যাবে এমন সময় চোখ মেলল লোকটি। এক মুহূর্ত উভয়ে উভয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।

‘তুমি! ছাড়া পেলে কীভাবে?’ সব বিষয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটি।

‘দুঃখিত, আপনাকে কষ্ট না দিয়ে উপায় ছিল না।’ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল ছেলেটি। যে কোনো মুহূর্তে যে কেউ এসে পড়লেই বিপদ। একটানে গেঞ্জিটা ছিঁড়ে ফেলল।

‘আশা করি, কাল সকাল পর্যন্ত মুক্ত হওয়ার চেষ্টা না করে চুপচাপ শুয়ে থাকবেন।’

যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে লোকটি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। লোকটির প্যান্টের পকেট হাতড়ে রুমাল বের করে তার মুখে ঢুকিয়ে দিল। গেঞ্জি ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখটা বাঁধল যাতে মুখ থেকে রুমাল বের করতে না পারে। হাত পেছনে বাঁধা থাকায় চিত করে শুইয়ে রাখলে লোকটির অযথা কষ্ট হবে ভেবে তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে আর একটু পেছনে অন্ধকারে টেনে এনে রাখল। তারপর এসে দাঁড়াল আগের জায়গায়, তাকাল বাংলোর দিকে।

বাংলোর দেয়ালে লাগানো সিকিউরিটি লাইটের আলোয় চারদিক আলোকিত হলেও বাংলোর ধারে কয়েক হাত জায়গা আবছা অন্ধকার আছে। বাংলোর দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরেই বুঝতে পারল, যে লোকটি মেয়েটির কামরার নীচে ঠিক পেছন বরাবর দাঁড়িয়ে ছিল, সেও আছে। বাংলোর দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগল মেয়েটার ঘরের লাইট নেভানো। সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। সামনে বারান্দা আছে বলে মনে হচ্ছে। ওপরে উঠতে পারলে বারান্দা দিয়ে ঢুকা যাবে। হঠাৎ একটা ব্যাপার নজরে আসতেই কয়েক লাফে পৌঁছে গেল দেয়ালের কাছে। তারপর পাইপ বেয়ে উঠতে শুরু করল। পৌঁছে গেছে। তার দুহাত ডানে বারান্দা। কাঠের মোটা করে গ্রিল দেয়া। যা ভেবেছিল তা নয়। দমে গেল। কিন্তু পিছিয়ে গেলে হবে না। আবার পাইপ ধরে ঝুলে থাকাও বিপজ্জনক।

এখন যা করা যায় তা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া উপায়ও নেই। বাঁ হাতে পাইপ ধরে ডান হাত বাড়িয়ে দিল বারান্দার গ্রিল ধরার জন্য। শেষ পর্যন্ত নাগাল পেল। এর পরে গ্রিলে ঝুলে পড়া তেমন কঠিন হল না। জানালা-দরজা খোলা থাকলেও পর্দা ফেলা। ভেতরে কিছুই দেখা যায় না। এখন এখান থেকে ডানা যায় মেয়েটিকে। নাম যে কি জানে না। ‘এই যে, শুনছেন’ বলে ডাকার আগেই স্মরণ হলো ওই পাশে পাহারাদার আছে। তার গলা শুনতে না পেলেও মেয়েটি যদি ঘুমের ঘোরে উচ্চস্বরে ‘কে’ বলে ডেকে ওঠে, তাহলেই বিপদ। নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে। তাহলে উপায়? উপায় বের করার জন্য এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছে। মাথার ওপর টালির ঢালু ছাদ নেমেছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই উপায়টা বের হলো। বেশিক্ষণ ঝুলে থাকা সম্ভব নয়। কাজ শুরু করে দিল। প্রথমে আরো ওপরে উঠে এলো। বাম হাতে গ্রিল ধরে ঝুলে ডান হাত দিয়ে অনেক জোরাজুরি করে প্রথম টালিটা খুলে ফেলল। তারপর যত জোরে সম্ভব তা দূরে ছুড়ল। দূরে থ্যাপ করে পড়ে ভেঙে গেল। না, ওই শব্দে কেউ সাড়া দিল না। দ্বিতীয়টাও একইভাবে খুলল। মাথার ওপরটা ফাঁকা হতেই আরো ওপরে উঠে ছাদের ওপরে মাথা বের হয়ে এলো। এরপর একের পর এক টালি খুলে চলল। টালিগুলো প্রায় নিঃশব্দে অপর টালিগুলোর আকর্ষণ ছেড়ে খুলে আসছে। এখন আর ওগুলো দূরে ফেলে দিচ্ছে না। কারণ ক্রমাগত একই শব্দ বিপদ ডেকে আনবে, তাই বাকিগুলো ছাদের ওপরেই কোনোভাবে আটকিয়ে রাখল। ছ’টা টালি সরাতেই বারান্দায় নামার জায়গা হলো। দুই বিমের মধ্য দিয়ে কোনোরকমে বারান্দায় নেমে এলো। পতনের মৃদু শব্দটা গোপন থাকল না। দরজার দিকে এগুলো। পর্দা সরানোর আগেই কথাটা খেয়াল হলো যে, কারো ঘরে হঠাৎ ঢুকে পড়া ঠিক নয়। কিন্তু এখন মাথার ওপর বিপদ মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। সময় খুব কম। যে কোনো সময় তার অস্তিত্ব ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ঘরটা অন্ধকার।

হঠাৎ করেই ঘরটা আলোকিত হলো। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে পর্দা সরিয়ে দরজা জুড়ে দাঁড়াল। সামনে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি নীচু করে ফেলল।

‘দুঃখিত, চোরের মতো ঢুকে পড়েছি।’ নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে অত্যন্ত নীচু গলায় বলল ছেলেটি। মেয়েটির অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি।’

‘আপনি…’ বলে কথা হারিয়ে ফেলল মেয়েটি। গলার আওয়াজ একটু উঁচুই হয়ে গেল। প্রমাদ গুনল ছেলেটি। মনে হলো শেষের বাক্যটি প্রথমে বলতে হতো।

‘বললাম তো, আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি।’ আবার বলল ছেলেটি। মেয়েটি এখন মুখ থেকে হাত সরিয়ে তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

‘বরং আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’ মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে তার অস্বস্তি লাগছে।

‘আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?’ বলে জবাবের আশায় তার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল তার ক্ষতস্থানগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে সে। নীচের দিকে তাকাল। সে যে খালি গায়ে আছে এতক্ষণ ভুলেই ছিল। অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল।

‘যাবেন?’ এবার তাকাল না তার দিকে।

এবারো জবাব না পেয়ে ‘ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি।’ বলে ঘুরে দাঁড়াতে গেল।

যেন এতক্ষণে বাস্তবে ফিরে এলো মেয়েটি। ‘দাঁড়ান।’ তবে এবার গলার আওয়াজ নীচু হলো। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি।

আমি এখান থেকে পালাতে চাই।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল মেয়েটি। ‘আপনার সঙ্গে যাব।’

‘তাহলে আসুন, এখানে দেরি করা নিরাপদ নয়।’ চাপা গলায় বলে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি। যেদিক দিয়ে বারান্দায় নেমেছিল তার নীচে এসে দাঁড়াল। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি। একটা সুগন্ধ ছেলেটির নাকে এসে লাগল।

‘আপনি ওপরের এই ফাঁক গলে বেরিয়ে গ্রিল ধরে ঝুলে লাফিয়ে নীচে নামতে পারবেন।’ ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল ছেলেটি।

‘না। পড়ে হাত-পা ভাঙতে পারে’, ফ্যাকাসে গলায় বলল মেয়েটি।

‘তাহলে…’ বলে থামল ছেলেটি।

‘তাহলে কী?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

কয়েক মুহূর্ত পর জবাব দিল, ‘তাহলে নীচে নামার একটা ব্যবস্থা করতে হয়।’ বলেই আর দাঁড়াল না। ঘরে ঢুকে পড়ল। প্রথমে বিছানার মখমলের দামি চাদর টেনে দুই টুকরো করে ফেলল। তারপর জানালা-দরজার পর্দা খুলে পরস্পরের সঙ্গে জোড়া দিয়ে টেনে দেখল, ছিঁড়বে কিনা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ছেলেটির কাজ দেখছিল।

কাজ করতে করতে একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকেছে। সেটা নিয়ে চিন্তা করারও সুযোগ পেয়েছে ছেলেটি। হাতের কাজ শেষ করে ছেলেটি ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটির দিকে। নীচের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি কোনো ধরনের পারফিউম ব্যবহার করেছেন?’

‘না।’

‘তাহলে আপনাকে আপনার পরনের কাপড়গুলো পাল্টাতে হবে।’

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৫

জাকির আহমদ

২৭ মার্চ, ২০২০ , ১:৪৮ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব-৪)

চিন্তাভাবনা শুরু করল জাহাজটাকে নিয়ে। তাতে হয়তো কোনো বুদ্ধি মাথায় আসতেও পারে। প্রথমে জাহাজের যে ব্যাপারটি তার মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল তা হলো জাহাজের সমস্ত বাতি নেভানো। নেভিগেশন লাইট না জ্বেলে নেভিগেশন আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করছে। এর একটাই কারণ হতে পারে। এরা সমুদ্রে তাদের উপস্থিতি অন্য কাউকে জানতে দিতে চায় না। হয়তো এ জাহাজ কম্পাস ও পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে। তা না হলে নেভিগেশন লাইটের সাহায্য না নিয়ে যে কোনো সময় যে কোনো দ্বীপের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। তাহলেই সব শেষ হয়ে যাবে।

জাহাজের ভেতরটা অন্ধকার হওয়াতে তার সুবিধাই হয়েছে। তা হলে নিশ্চয়ই জাহাজে পাহারাদার আছে। না থাকাটা অস্বাভাবিক। অন্ধকার থাকায় তাদের সামনে সহজে পড়বে না, যদি সে তাদের আগেই দেখতে না পারে, তাহলে নিশ্চিত বন্দী হতে হবে। কারণ লড়াই করার শক্তি তার নেই। এখনো কোনো বুদ্ধি বের হয়নি তার মাথা থেকে। মাথাটা কেমন ভার লাগছে। হঠাৎ কোথা থেকে যেন চাপা গলায় ইংরেজিতে ভেসে এলো, ‘বাইরেও আলো আছে।’ আর কিছুই শোনা গেল না।

চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। খুঁজে বের করারও ইচ্ছে করল না। জানে এ জাহাজেরই কোনো লোকের কাজ হবে। কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল তার মন। ‘বাইরে আলো আছে’ বলতে সেই অজ্ঞাত সাহায্যকারী কী বুঝতে চেয়েছে, কয়েক মুহূর্ত পরই বুঝতে পারল। হয়তো দরজার সামনে আলো আছে। হ্যাঁ, তাই হবে। আর দেরি করল না সে। কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল।

জাহাজটা খুব বড় নয়, মধ্যম আকৃতির। তবে দ্রুতগামী। জাহাজের পেছনের সামান্য একটু জায়গা ফাঁকা। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। সেখান খেকেই দেখতে পেল, লম্বা দুধার দিয়ে বেশ প্রশস্ত প্যাসেজ চলে গেছে। ডানের প্যাসেজ ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল। পা টিপে টিপে এগোতে শুরু করল হাতের বাঁয়ের প্যাসেজ। মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তীক্ষè দৃষ্টি হানছে। কান দুটোকে যে কোনো শব্দ শোনার জন্য প্রস্তুত রেখেছে। সমস্ত অনুভূতি শক্তিকে জাগ্রত রেখেছে। দ্রুত নিজেকে লুকিয়ে ফেলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আছে। প্রায় বিশ গজের মতো এগিয়েছে। হঠাৎ করেই সামনে আগুন জ্বলতে দেখল। এক মুহূর্ত পরই সে আগুনের আলোয় একজন মানুষের মুখায়ব দেখতে পেল। বুঝতে পারল লোকটি সিগারেট ধরাচ্ছে। তবে এগিয়ে আসছে এদিকেই। কী করবে প্রথমে ঠিক করতে পারল না। ততক্ষণে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়েছে ছেলেটি। ঠিক সেই সময় অগ্রসরমান লোকটির সামনে একটা দরজা খুলে একজন লোক ভেতরের লাইট বন্ধ করে বাইরে বের হলো। তিনজনে গল্প জুড়ে দিল। ছেলেটিকে কেউ দেখেনি।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দেয়াল ঘেঁষে যতদূর পারা যায় দ্রুত পেছাতে থাকল। বারবার মনে হলো, সামনে আবার কেউ দরজা খুলে তার পথ রোধ করে না দাঁড়ায়। তবে পিছিয়ে আসতে গিয়ে যে তিনটা কামরা পড়ল, তার সব নীরব মনে হলো। কিছুক্ষণ পরই পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় এসে বিশ্রাম নিতে লাগল। শুয়ে পড়ার ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করল। এবার বাঁয়ের প্যাসেজ ধরে এগোচ্ছে। কিছুদূর যেতেই হাত কয়েক দূরে একটি দরজা ফাঁক হয়ে একটি হাত তাকে ডাকতে লাগল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল ছেলেটি। আতঙ্কে চিৎকার দিতে চাইল। ঘুরে দৌড় দেয়ার জন্য পা দুটো ছটফট করে চলছে। কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। এর মধ্যে মাথা ঠান্ডা রেখে ভালোভাবে তাকাতেই বুঝতে পারল তাকে কাছে ডাকছে। ওই লোকটিই হবে। কাছে আসতেই দরজা আগের মতো ফাঁক রেখে বলতে লাগল, ‘একটু সামনে ডানে সরু প্যাসেজ আছে। নীচতলায় গিয়ে ঘরের সামনে বাতি পাবেন, তবে সাবধান। আপনার মঙ্গল হোক।’ বলে দরজা লেগে গেল। বুঝল, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। সত্যি দুটো নীরব কামরা পেরোনোর পর ডানে সরু প্যাসেজ পেল। কয়েক হাত এগিয়েই বুঝতে পারল, এই প্যাসেজ দুই ধারের প্যাসেজের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে। আরো কয়েক গজ। এগোনোর পর হাতের ডানে নীচে নামার সিঁড়ি দেখতে পেল।

হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটি। বুঝল, ধরা পড়ে গেছে। মাত্র কয়েক হাত দূরে হাতে রাইফেল নিয়ে টুলে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে লোকটি। তাকে উঠে আসতে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেটি। ঘুমিয়ে পড়েছে, মৃদু নাক ডাকছে। অতি সাবধানে কাঠের সিঁড়িতে পা রাখল। কয়েক ধাপ নীচে নামতেই দুর্বলতার কারণে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগল ছেলেটি। অনেক কষ্টে রেলিং ধরে পতন ঠেকালেও সিঁড়িতে জোরে পা ঠোকার শব্দ রোধ করতে পারল না। এবার বুঝি টের পেয়ে গেছে লোকটি। কারণ নাক ডাকার শব্দ থেমে গেল। আবার কয়েক মুহূর্ত পর শুরু হতেই চেপে ধরা নিঃশ্বাস ছাড়ল ছেলেটি। নীচে এসে দাঁড়াল। দেখল, তার সামনে-পেছনে একমাত্র প্যাসেজ চলে গেছে। দুপাশে কামরা। বেশ খানিকটা সামনে প্যাসেজে একটা বাল্ব জ্বলছে। দূর থেকে আলোর সুবাদে দেখতে পেল, আলোর নীচে দরজার সামনে একজন পাহারাদার হাতে রাইফেল নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোভাবে তাকাতেই বুঝতে পারল সে জেগে আছে। আর বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কোথায় আছে মেয়েটি। এখন কাজ একটাই, পাহারাদারকে ফাঁকি দিয়ে মেয়েটির ঘরে যাওয়া।

প্যাসেজের অন্য কোথাও আলো নেই। ওই একমাত্র বাল্বের আলোয় প্যাসেজের অন্ধকার সামান্যই কেটেছে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাটা এমন অন্ধকার যে পাহারাদার ভালোভাবে লক্ষ না করলে তার উপস্থিতি টেরই পাবে না। পাহারাদারের মাথাটা তার বুকের ওপর নেমে এসেছে। হয়তো ঝিমাচ্ছে। পাহারাদারের সঙ্গে লড়ে তাকে কাবু করার মতো শক্তি তার নেই। এখন বুদ্ধি দিয়ে তাকে কাবু করতে হবে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চিন্তা করল। কয়েকটি বুদ্ধিই মাথায় এলো। কিন্তু কোনোটাই ঝুঁকিহীন না হওয়ায় মনমতো হলো না। অগত্যা তার মধ্য থেকেই একটা তুলনামূলকভাবে ভালো উপায় বেছে নিল। এটাতেও ধরা পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তারপরও তাকে চেষ্টা করতেই হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।

====

বসতে চেষ্টা করল। অর্ধেক উঠে আর উঠতে পারছে না। এবার আস্তে করে মাথার নীচে দুহাত দিয়ে শুয়ে পড়ল। তাকে উঠতে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলো না। বুঝতে পারল সে উঠে বসতে পারবে না। তাই গড়িয়ে খাবারের কাছে চলে এলো। হাত ধুয়ে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে ধীরে ধীরে গিলতে লাগল শুধু কয়েকটি শুকনো রুটি।

‘আরো দেয়া যাবে?’ খাওয়া শেষে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। দুজনেই ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল।

আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শক্তি অর্জন করতে চায়। দ্রুত সময় কেটে যাচ্ছে। ক্লান্তিতে দুচোখ বুজে আসছে। চোখ বন্ধ করেই ফেলেছিল। হঠাৎ ফজরের নামাজের কথা স্মরণ হতেই তন্দ্রা টুটে গেল।

‘এখন সময় কত?’ ছেলেটি শুয়ে থেকেই দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। কোনো জবাব এলো না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব পেল না ছেলেটি। ক্ষুধা অনেকটাই মিটে গেছে। এখন মাথার পেছন দিকে ব্যথা হলেও পরিষ্কারভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারছে। চিন্তা করে ঠিক করল কী করবে?

প্রথমে উপুড় হলো। তারপর দুহাতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দুর্বলতার কারণে শরীর মৃদু কাঁপলেও পাত্তা দিল না সে। আগের চেয়ে শরীরে এখন বেশি শক্তি আছে। সে জানে তাকে দরজার দিকে যেতে দেবে না। তাই বিপরীত দিকে গেল ধীরে ধীরে। এদিকেই জানালা থাকতে পারে। একটু খুঁজতেই পেয়েও গেল। জানালা খুলে বাইরে তাকাল। জানালায় লোহার গরাদ লাগানো। মাথা বের করার মতো ফাঁক নেই। বাইরে তাকিয়ে দেখল খানিক আগে সূর্য উঠেছে। সকালের সোনালি রোদ চারদিকে ঝলমল করছে। ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেছে। তাই আফসোস হতে লাগল তার। কিন্তু এখন করার কিছু নেই। কাজা পড়তে হবে।

অজু করার জন্য চারদিকে তাকাতে লাগল। এ ঘরের মধ্যে কোনো আসবাবপত্র নেই। ঘরটা ধুলায় ধূসরিত। মাকড়সার জাল যত্রতত্র। দেখেই বোঝা যায়, এ ঘর ব্যবহার হয় না। বাথরুম খুঁজে চলল ছেলেটির দৃষ্টি। একপাশে দরজা দেখতে পেল। পা পা করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখল, বাথরুমই। ঢুকে পড়ল ভেতরে। পানিও আছে। লোক দুজন কোনো বাধা দিল না। বেশ কিছুক্ষণ পর বের হয়ে এসে জানালা খুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিক ঠিক করে নিল। গা কাঁপছে। তারপর সে দাঁড়িয়ে গেল তার প্রভুর সামনে।

দরজা বন্ধ হতেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল মেয়েটি। খিড়কি লাগানোর শব্দে সম্বিত ফিরে পেল। আছড়ে পড়ল দরজার ওপর। দম দম কিল-ঘুষি মেরে চলল দরজায়। ‘তোমরা আমায় কেন বন্দী করেছ, কী দোষ করেছি আমি? তোমরা আমায় ছেড়ে দাও, বের করো এ কারাগার থেকে।’ কাঁদতে কাঁদতে বলল মেয়েটি। একটু পর বুঝল, এভাবে কিছু হবে না। তাই দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বালিশের অনেকখানি জায়গা ভিজে গেল চোখের পানিতে।

বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে চোখ মুছে পানি দিতে লাগল। তারপর বাথরুমে রাখা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নায় দেখল তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। হঠাৎ খেয়াল হলো, লোকটি তাকে ছেলেটিকে ভুলে গিয়ে তার কথা ভাবতে বলছে কেন? বন্দী করেও তার সঙ্গে মেহমানের মতো আচরণ করছে কেন? ব্যাপারটি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতেই সে যা আন্দাজ করল তাতে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। অনেক ভেবেও এদের হাত থেকে পালানোর কোনো উপায় বের করতে পারল না। ছেলেটি এখন কী অবস্থায় আছে? তার ওপর কি অত্যাচার চলছে? সে কি নিজেই এদের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারবে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেল না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল নরম বিছানায়।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে জানে না। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। দুজন লোক ঘরে ঢুকল। দুজনের হাতেই রাইফেল। একজন ইংরেজিতে বলল, ‘ম্যাডাম, আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। ক্যাপ্টেন আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে বলেছেন। চলুন।’ বলেই মেয়েটির জন্য পথ করে দিল দুজনে। মেয়েটি বুঝল, ক্যাপ্টেন এদের তার সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এদের ফাঁকি দিয়ে পালানো যাবে না। তাই বিলম্ব না করে দরজার দিকে এগোল।

সামনে একজন পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে, মাঝে মেয়েটি, পেছনে অপর পাহারাদার। ছাদে নিয়ে এলো মেয়েটিকে। সকাল হয়ে গেছে। সূর্য অনেক আগেই উঠেছে। ছাদের মাঝখানে বিরাট এক ছাতার নীচে টেবিল-চেয়ার পাতা। একটা চেয়ারে ক্যাপ্টেন দামি শার্ট-প্যান্ট পরে বসে আছে। তাকে সুদর্শনই বলা চলে। তবে তার চোখে যেন নিষ্ঠুর শীতলতা বিরাজ করছে। চেহারায় কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। ছাদে উঠতেই সামনে থাকা লোকটি সরে পেছনে চলে এসেছে। ক্যাপ্টেনকে বসে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল মেয়েটি। বুকের কাঁপুনি তিনগুণ বেড়ে গেল। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। আন্দাজ করতে পারছে না সে এরপর কী ঘটবে।

থমকে দাঁড়াতেই পেছন থেকে একজন বলল, ‘সামনে চলুন, ক্যাপ্টেন অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।’ তারপরও থেমে আছে দেখে আবার বলল, ‘তাড়াতাড়ি এগোন।’ অগত্যা আবার এগোতে হলো। দুপায়ে বারবার বাড়ি লাগছে। এতক্ষণ কী যেন পড়ছিল ক্যাপ্টেন। মেয়েটি টেবিলের কাছাকাছি আসতেই মুখ তুলে উঠে দাঁড়াল সে।

‘স্বাগতম, বসুন।’ তার সামনের চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করল। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বসে পড়ল মেয়েটি। সে বসতেই ক্যাপ্টেনও বসে পড়ল। ইশারা করতেই চলে গেল দুই পাহারাদার। এখন ছাদে দুজন ছাড়া কেউ নেই।

‘এর মধ্যে আপনার কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘না।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল মেয়েটি।

‘আমার ওপর রাগ করেছেন?’

কিছু বলল না মেয়েটি। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আপনি আমাদের নিয়ে কী করতে চান?

এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখে। ‘পরে বুঝতে পারবেন।’

‘আপনি আমাদের কখন মুক্তি দেবেন?’ গলায় ঘৃণার ভাব ফুটে উঠেছে।

‘এখানে মুক্তির কথা আসছে কেন? আপনি তো বহাল তবিয়তেই আছেন।’

‘আমি বহাল তবিয়তে থাকলেও মুক্ত নই, বন্দী।’

কিছু বলল না ক্যাপ্টেন।

‘ছেলেটি কোথায়, কেমন আছে?’

‘সে আপাতত ভালোই আছে।’

কিছুটা আশ্বস্ত হলো মেয়েটি। তার কথায় যেন বিশ্বাস করার মতো কিছু ছিল।

‘ঠিক আছে, পরেও কথা বলা যাবে, এখন খেয়ে নিই। তা না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।’ বলে টেবিলে রাখা নানা প্রকার নাশতা, ফলমূলের দিকে হাত বাড়াল সে। মেয়েটিও হাত বাড়াল, নীরবে খেতে লাগল দুজনে। কফি দিয়ে শেষ করল। খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়াতে গেল মেয়েটি।

‘প্লিজ, আর একটু বসুন।’ অনুরোধের বাক্য হলেও আদেশের মতো লাগল শুনতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসে পড়ল মেয়েটি। ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওইখানে পৌঁছব।’ ডান দিকে হাত তুলে দেখাল। ‘ততক্ষণ এখানেই থাকুন। যে দুজন আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে তারাই আপনাকে পথ দেখিয়ে হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাবে। আমি এদিকে একটু ব্যস্ত থাকায় আপনাকে সঙ্গ দিতে পারব না বলে দুঃখিত।’ এক মুহূর্ত থামল।

তারপর বলল, ‘আপনার ডান হাতটা একটু বাড়িয়ে দিন তো।’ মেয়েটি তার উদ্দেশ্য আন্দাজ করতে পারছে না। ক্যাপ্টেন টেবিলের নীচে কী যেন করছে।

‘দিন না হাতটা বাড়িয়ে।’ অনুরোধ ফুটে উঠল তার কণ্ঠে। ইতস্তত করে বাড়িয়ে ধরল ডান হাতটা টেবিলের ওপর। হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। দুহাতই টেবিলের নীচ থেকে বেরিয়ে এলো। বাম হাত ফাঁকা। ডান হাতে মুক্তোখচিত সুন্দর একটা সোনার আংটি, যা মেয়েটি আগে তার হাতে দেখেছে। মেয়েটি মুহূর্তেই বুঝে গেল ক্যাপ্টেন কী করতে চাচ্ছে। ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে মুখে বলল, ‘ওসব এখন থাক।’ লজ্জায় নীচের দিকে নামিয়ে নিল মুখটি। ভয়ে কড়া কথা বলতে পারল না।

হাসি মুছে গেছে ক্যাপ্টেনের মুখ থেকে। তবে নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। অপমানে মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। ‘ঠিক আছে, অনুষ্ঠান করেই পরাব।’ আবার বাম হাতে আংটিটি পরতে পরতে বলল সে। ‘চলে গেলাম, আমাকে এখন যেতে হচ্ছে।’ বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল সে। কিন্তু মেয়েটি না দেখার ভান করে হাত বাড়াল না। এ অপমানও নীরবে হজম করল ক্যাপ্টেন। প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল সে। বের করে আনল মিনি ওয়াকিটকি। একটা বোতাম চেপে ধরে মুখের কাছে যন্ত্রটি এনে বলল, ‘চলে এসো।’

ওয়াকিটকি পকেটে ঢোকাতে না ঢোকাতেই ছাদে উঠে এসেছে সেই গার্ড দুজন।

‘আপনি বসুন। সময় হলেই এরা আপনাকে নিয়ে যাবে।’ বলেই দ্রুত চলে গেল ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন নীচে নেমে যাওয়ার আগেই লোক দুজন তিন হাত পেছনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটি ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝে গেছে। পেছনে লোক দুটির উপস্থিতি তার ভেতরে অস্বস্তির সৃষ্টি করছে।

এখন ছোট্ট বন্দরের গুটিকয়েক মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। বন্দরে আরো কয়েকটি জলযান নোঙ্গর করা। একটু পরেই জাহাজটি নোঙ্গর করল। ‘ম্যাডাম, চলুন’ বলল পেছনের একজন। উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। এবারো একজন মেয়েটির সামনে, অপরজন পেছনে।

নামাজ শেষ করে আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি। ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়েই ভাবছে এদের হাত থেকে পালানোর উপায়। এ অবস্থায় সে একা পালানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সে মেয়েটিকে এ নরপশুদের হাতে ছেড়ে একা পালানোর কথা ভাবতেই পারছে না। এরা মেয়েটিকে নিয়ে কী করতে চায় তা তার জানা নেই। শুধু এতটুকু আন্দাজ করে নিয়েছে, ভয়ঙ্কর কিছু। সে ঠিক করে ফেলল, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক মেয়েটি যদি রাজি থাকে তবে তাকে না নিয়ে কখনোই সে একা পালানোর চেষ্টা করবে না। যদি তা আপাতত তার কাছে প্রায় অসম্ভব লাগছে। এক সময় তন্দ্রা এসে গেল। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ঘুমজড়িত চোখ মেলে সেদিকে তাকাল। দেখল, ক্যাপ্টেন ঢুকছে গম্ভীর মুখে।

ভেতরে এসে দাঁড়াতেই তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়াল পাহারাদার দুজন। স্থির হয়ে ক্যাপ্টেনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। নীচু গলায় তাদের কিছু নির্দেশ দিয়ে একবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বের হয়ে গেল দরজা খোলা রেখে।

‘উঠে পড়ুন, আমরা পৌঁছে গেছি।’ বলল একজন। ‘তাড়াতাড়ি।’ বলল অপরজন।

ওঠার ইচ্ছা না থাকলেও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শরীর এখনো অত্যন্ত দুর্বল আছে। দাঁড়ালেই সর্বশরীর কাঁপছে। হাঁটতে গিয়ে যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে। পেছনে রাইফেলের বাঁটের মৃদু খোঁচা দিল একজন। সামনে এগোনোর ইঙ্গিত। ছেলেটি ধীরপায়ে এগোলো দরজার দিকে। পেছন থেকে একজন বলল, ‘বীরত্ব দেখার বা পালানোর চেষ্টা করবেন না। সোজা গুলি করে দেয়ার নির্দেশ আছে। কখনোই থেমে দাঁড়াবেন না। থামলেই রাইফেলের বাঁটের গুঁতো বা লাথি উপহার পাবেন। আর পেছন থেকে ডানে-বাঁয়ে বলে পথ নির্দেশ করা হবে, সেদিকে এগোবেন।’ একনাগাড়ে বলে থামল অপরজন। দরজা দিয়ে প্যাসেজে বের হয়ে এলো ওরা। জাহাজ থেকে সরু কাঠের ঢালু সিঁড়ি বেয়ে ডাঙায় নামার সময় পা ফসকে কোমর পানিতে পড়ে গেল ছেলেটি ধপাস করে। এ অকস্মাৎ পতনের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। হাতে-পায়ে বেশ আঘাত পেল।

‘তাড়াতাড়ি ডাঙায় উঠুন।’ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিল একজন। উঠতে দেরি দেখে ওপর থেকে ছেলেটির পিঠে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করল। আঘাতের চোটে কুঁকড়ে গেল সে। আবার আঘাত হানতে পারে, এ ভয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনোরকমে উঠে এলো। রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর এগিয়েই দাঁড়িয়ে দম নিতে লাগল। পেছন থেকে পিঠে লাথি চালাল একজন। পড়ে গেল ছেলেটি মেঠো রাস্তায়।

‘হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দিয়ে চল। তবুও থামা চলবে না। থামলেই শাস্তি’ বলল অপরজন।

হামাগুড়ি দিয়েই এগিয়ে চলল অবশেষে। একবার পেছনে তাকাল। সামনে-পেছনে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। শামুকের গতিতে এগোচ্ছে। থেমে লাথি, গুঁতো খেতে চায় না সে। একসময় সে শক্তিও নিঃশেষ হয়ে গেল। থেমে শুয়ে পড়েছে। আশপাশে অনেকেই তার দুরবস্থা দেখছে। কিন্তু সবাই শেষ পর্যন্ত তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। পিঠে রাইফেলের বাঁটের গুঁতো খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল ছেলেটি। জ্ঞান হারাল সঙ্গে সঙ্গেই। অজ্ঞান দেহটা দুজনে মিলে একটা গাড়িতে করে নিয়ে চলল।

কাঠের ঢালু সিঁড়ি দিয়ে জাহাজ থেকে ডাঙায় নেমে এলো মেয়েটি। সামনে কুলি, শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন লোক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। চারদিকে তাকিয়ে কোথাও ছেলেটিকে দেখতে পেল না। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আরো একটি মধ্যম আকৃতির জাহাজ, তিনটি মাছ ধরার ট্রলার, চারটি ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা, সাতটা ডিঙি নৌকা নোঙ্গর করা অবস্থায় দেখতে পেল। আরো কোনো জলযান সমুদ্রে আছে কিনা তা সে জানে না। উল্টো দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখল দুটো কাঠের গুদাম ঘর। তার সামনে একটা একতলা কাঠের ঘর। ফটকের ওপরে লেখা ‘গার্ডরুম।’ কোনো অফিস চোখে পড়ল না। গার্ডরুমের পাশ দিয়ে মেঠো রাস্তা চলে গেছে। তবে পিচঢালা রাস্তার ন্যায় মসৃণ। রাস্তার এক পাশে লোহার ফলকে ডিজাইন করে লেখা, ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড।’

এসব দেখতে দেখতে কখন যে তার পাশে ছাদবিহীন খোলা জিপ এসে দাঁড়িয়েছে তা টের পায়নি মেয়েটি।

‘ম্যাডাম, প্লিজ উঠে পড়ুন।’ ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার। চমকে ফিরে তাকাল মেয়েটি। গাড়ির দিকে খেয়াল পড়তেই বুঝল কিসে চড়তে বলছে লোকটি।

‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?’ ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘গেলেই দেখতে পাবেন।’ হাসিমুখে জবাব দিল ড্রাইভার।

‘প্লিজ, আপনারা আমাকে ছেড়ে দিন। পৌঁছে দিন আমার বাবা-মার কাছে।’ যেন আর একটু হলেই কেঁদে ফেলবে সে।

‘ভয় পাচ্ছেন কেন, উঠে পড়ুন।’

‘আমি যাব না।’

‘আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ আছে আমার ওপর। অতএব কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ুন। প্লিজ।’ যেন অনুরোধ ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠ থেকে। পাহারাদার দুজন চুপ করেই আছে।

জানে, এদের সঙ্গে সে পারবে না। তাই এরপর কথা না বাড়িয়ে উঠে বসল ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে। পেছনে উঠে বসল অন্য দুজন। গাড়িতে স্টার্ট দিল ড্রাইভার। এগিয়ে চলল গাড়ি মধ্যম গতিতে।

‘ম্যাডাম, আপনি দুপাশে দেখতে থাকুন, মাঝে মধ্যে আমি আপনাকে এ দ্বীপ সম্পর্কে বলব।’ সামনের দিকে তাকিয়ে বলল ড্রাইভার। বলার আগে থেকেই ডানে-বাঁয়ে দেখছিল মেয়েটি। রাস্তার দুধারেই চাষাবাদের জমি দেখতে পেল। কোনো জমি চাষ করা, কোনোটাতেবা ধান রোপণের জন্য চারা গজিয়েছে বা বড় হয়েছে। জমিতে কৃষকরা কাজ করছে। ‘ম্যাডাম, আমাদের কৃষকরা নিজেরাই কম্পোস্ট সার তৈরি করে, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে। পাহাড়ের ঝরনা দ্বারা সৃষ্ট ছোট নদী থেকে পানি সেচের ভালো ব্যবস্থা আছে। এসব জমি থেকে যে শস্য পাওয়া যায়, তাতে এ দ্বীপবাসীর সারা বছর হয়ে যায়। কখনো খাদ্য সঙ্কট হয় না। দ্বীপের এ অংশটাই সমতল। বাকি অংশ পর্বতসঙ্কুল।’ দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামল ড্রাইভার। এতক্ষণ চুপচাপ শুনল মেয়েটি।

কয়েক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার শুরু করল ড্রাউভার। ‘এ পথ এ দ্বীপের একমাত্র গ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে। গ্রাম না বলে শহরও বলা যেতে পারে। এ দ্বীপ শহরটি ছোট ছোট টিলার ওপর অবস্থিত। এই দ্বীপের ঘরবাড়ি কাঠের তৈরি। এসব বলতে বলতে তারা শহরের কাছাকাছি চলে আসল। রাস্তার পাশে ফলকে লেখা ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স টাউন।’ গাড়ি ঢুকে পড়েছে শহরের আবাসিক এলাকার মধ্যে। ড্রাইভার ঠিকই বলেছে। একে গ্রাম না বলে শহর বলাই উচিত। মেয়েটি যেন ভালোভাবে দেখার সুযোগ পায় সে জন্য ধীরে ধীরে চালাচ্ছে গাড়িটি। মেয়েটি দেখছে, কোনো কোনো বাড়ি টিলার ওপর, কোনোটি বা নীচে কোনো কোনো বাড়ি দোতলা তবে অধিকাংশই একতলা। প্রতিটা বাড়ির সামনে বাগান আছে। কোনো কোনো বাড়ির সামনে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে।

যে রাস্তা ধরে তারা চলছে, সে রাস্তায় বেশ লোক চলাচল করছে। এ রাস্তা থেকে শাখাা রাস্তা শহরের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে। রাস্তায় লাইট পোস্ট দেখা যাচ্ছে। রাস্তা ধরে মাঝে মধ্যে বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ি যাচ্ছে। এক দুটো জিপও চোখে পড়ছে। সব মিলে সুন্দর সাজানো-গোছানো একটা ছোট শহর মনে হলো মেয়েটির। ডান দিকে হাত তুলে দিক নির্দেশ করল ড্রাইভার। ‘এ বাড়িগুলোর পেছনে আছে গোচারণ ভূমি। সেখানে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলল ড্রাইভার। হাত তুলে ডান দিকে মেয়েটিকে দেখাল সাইনবোর্ডে লেখা, ‘ফ্লাওয়ার্স সুপার মার্কেট।’ ‘এটি এ দ্বীপের একমাত্র মার্কেট। এখানে সবকিছু পাওয়া যায়।’ মার্কেটের ভেতরে অনেক লোক দেখা গেল। এবার বাঁয়ে হাত তুলল ড্রাইভার। মেয়েটি দেখল একটি কাঠের বিরাট দোতলা বাড়ি। প্রধান ফটকের ওপর লেখা ‘ফ্লাওয়ার্স হসপিটাল’, ‘অন্য সবকিছুর মতো এটাও এ দ্বীপের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে মোটামুটি সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তবে বড় জটিল রোগের জন্য রোগী বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে বিনা টাকায় সব চিকিৎসা করা হয়। এ হাসপাতালের সব ব্যয় বহন করে এ দ্বীপের মহমান্য লর্ড। এ দ্বীপবাসীর জন্য বিভিন্ন খাতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তাঁর কথাই এ দ্বীপের আইন। সবাই তাঁকে মান্য করে।

এর মধ্যে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে গাড়ি। ডানে আবার হাত তুলল ড্রাইভার। মেয়েটি কাঠের একটি বড় বাড়ির সামনে বড় একটা টাওয়ার দেখতে পেল। এ বাড়ির সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ‘টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ এক্সচেঞ্জ’। তার পাশে একটি টাওয়ার বাড়ির সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ‘পোস্ট অফিস’। ‘এ দুবাড়ির মাধ্যমে আমরা সারা দুুনিয়ার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করি। এবার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল ড্রাইভার। মাঝে মধ্যেই ছোট ছোট পাহাড়ের ওপর উঠছে, নামছে গাড়ি। ‘ওই পাশে’, হাত তুলে দিক নির্দেশ করল ড্রাইভার। ‘একটা পাহাড়ি ঝরনা আছে। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আছে। ঝরনার পানির সাহায্যে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তা দ্বীপের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে। সেটা অবশ্য আমরা যাওয়ার পথে দেখতে পাব না।

এরপর গাড়ি ওপরের দিকে উঠবে, তাই গাড়ির ফোর হুইল ফিট করল ড্রাইভার। সিট বেল্ট বেঁধে নিল চারজনেই। ওপরে উঠতে শুরু করল গাড়ি। চারদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল মেয়েটি। পাহাড়ের গায়ে কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা গাছপালা। প্রায় অধিকাংশ গাছের সঙ্গেই পরিচয় নেই মেয়েটির। পাখি ছাড়া অন্য প্রাণী চোখে পড়ছে না। গাড়ি যে রাস্তা ধরে ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমনিতে রাস্তা বেশ সরু, তার ওপর ডানে-বাঁয়ে মাঝে মধ্যে গভীর খাদ দেখে মেয়েটি বারবার চোখ বন্ধ করে ফেলছে।   একবার নীচে গড়িয়ে পড়লে হাড়গোড় খুঁজে বের করা মুশকিল। মাঝেমধ্যে রাস্তার দুপাশে বা একপাশে পাহাড় পড়েছে। একটু পরপর রাস্তা তীক্ষè বাঁক নিচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বাঁকেই পাহাড়ের কারণে অপর পাশ দেখা যায় না। সে ক্ষেত্রে হর্ন দিতে হচ্ছে। অকস্মাৎ অপরদিক থেকে একটা গাড়ি আসলে নির্ঘাত মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটবে। কারণ গাড়ি দ্রুত সাইড করার মতো জায়গা নেই রাস্তায়।

মাঝে মধ্যে দেখ যাচ্ছে ডানে পাহাড়, বাঁয়ে গভীর খাদ, ঠিক তার মাঝ দিয়ে তীক্ষè বাঁক নিয়েছে রাস্তা। চালাতে একটু কম-বেশি হলেই, একটু অসতর্ক হলেই করুণ দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। তবে মেয়েটির পাশে বসা ড্রাইভার অত্যন্ত ঝানু। তা ছাড়া সে সবসময় এ রাস্তা ধরে চলাচল করে। রাস্তার প্রতিটি অংশ তার নখদর্পণে। সে গাড়ি চালাচ্ছে ধীরগতিতে। তারপরও কয়েকবার তাকে গাড়ির সঙ্গে লড়তে দেখেছে মেয়েটি। অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে চালাচ্ছিল ড্রাইভার। কোনো কথা বলেনি। মেয়েটি মাঝে মধ্যে চোখ বন্ধ করে অস্পষ্ট শব্দ করছে দেখে মুখ খুলল। ‘আমি এই রাস্তায় প্রায় চৌদ্দ বছর থেকে গাড়ি চালাই। কখনই তেমন গুরুতর অ্যাক্সিডেন্ট করিনি। ছোটখাটো করেছি। আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমরা নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাবই। তাছাড়া আমি এমনিতে এ রাস্তায় ঘণ্টায় ত্রিশ কিলোমিটার স্পিডে চালাই। এখন আপনাকে নিয়ে বিশ-পঁচিশ কিলোর ওপরে চালাচ্ছি না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। তবে খুব জরুরি হলেও চল্লিশ কিলোর ওপরে চালাই না।’ কথা বলার সময় গতি কমিয়ে এনেছিল। আবার আগের গতি ফিরিয়ে আনল। কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। ‘এ পাহাড়ি জঙ্গলে নানা ধরনের পশু-পাখি আছে, তবে কোনোটাই হিংস্র, মানুষ খেকো নয়।’ মেয়েটি যাতে ভয় না পায় সে জন্য তার চিন্তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য বলল ড্রাইভার।

‘আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাব’, বলল ড্রাইভার।

‘আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন?’ প্রশ্নটা আবার করল মেয়েটি।

‘এ দ্বীপের এক হাজার মানুষের শাসকের প্রাসাদ।’ কৌতুক করে জবাব দিল লোকটি।

‘কেন নিয়ে যাচ্ছেন?’ উদ্বেগ ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।

‘গেলেই জানতে পারবেন।’ সংক্ষিপ্ত জবাব এলো ওপাশ থেকে।

ডানে পাহাড়ের ওপাশে একটা রাস্তা অদৃশ্য হতে দেখে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘ওই রাস্তাটা কোথায় গেছে?’

‘একটা বাড়ির দিকে।’

আর কোনো কথা হলো না। একটু পরে ডানে মোড় নিয়ে প্রায় সমতল জায়গায় এসে পড়ল তারা। সামনে পাহাড়ের গায়ে কাঠ দিয়ে তৈরি সুন্দর দোতলা বড় একটা বাংলোর সামনে বাগানে নানা ধরনের ফুল ফুটেছে। ফুলের গন্ধ চারদিকে ম-ম করছে। গাড়ি থেমে দাঁড়াতেই পেছনের লোক দুজন লাফ দিয়ে নামল। তারপর নামল ড্রাইভার। এরপর সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে এ অপরিচিত অথচ সুন্দর জায়গাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল মেয়েটি। সমতল জায়গাটার মাখখানে পাশাপাশি দুটি খুঁটি পোঁতা। খুঁটির বিষয়টি মেয়েটি বুঝতে পারল না। একটু দূরে পাহাড়ের গায়ে কাঠের একতলা দোতলা কয়েকটি বাড়ি দেখতে পেল। দু-একজনকে বাইরে দেখতে পেল।

‘ওই যে বাঁয়ে পাহাড়ের গায়ে যে দুটি বাড়ি দেখছেন, তার একটি স্টাফ কোয়ার্টারগার্ড। আর ডানে পাহড়ের ধারে যে সুন্দর বাতিগুলো দেখছেন তা এ দ্বীপের অফিসারদের বাড়ি’, বলল ড্রাইভার। ‘এবার ভেতরে চলুন, বিশ্রাম নিন। পরে আরো জানতে পারবেন।’ বাংলোর দিকে ইশারা করে সামনে এগোলো ড্রাইভার পেছনে মেয়েটিকে আসতে বলল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাগানের মধ্যবর্তী রাস্তা ধরে বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল মেয়েটি। পেছনে চলল পাহারাদার। প্রধান ফটকের সামনে এসে পড়ল। ফটকের ওপরে সোনালি রঙে লেখা ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স প্যালেস’। ড্রাইভারের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দোতলায়। অনেক কামরা আছে এ বাংলোর সামনের দিকে প্রশস্ত বারান্দা। সেই বারান্দা ধরে বাংলোর ডান ধারে একটা কামরার সামনে এসে দাঁড়াল তারা। ড্রাইভার দরজা খুলে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, আপাতত এটা আপনার কামরা। এটা গেস্ট রুম। পরে অন্য বাংলোয় থাকবেন। আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে ভেতরে আপনার বিছানার পাশে কলিং বেলের বোতামে চাপ দিলেই হবে।’ লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ‘গুডবাই’ বলে চলে গেল। মেয়েটি ধৈর্য সহকারে লোকটির কথা শুনল। লোকটি চলে যেতেই তার গমন পথের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল।

প্রথমে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত ঘরটির দিকে দৃষ্টি ফেরাল মেয়েটি। মুগ্ধ হয়ে গেল ঘরটির দিকে তাকিয়ে। ঘরটি সুন্দর করে সাজানো-গোছানো। ঘরের দেয়াল মেঝে ছাদ থেকে শুরু করে প্রতিটি আসবাবপত্র দামি কাঠের তৈরি। ঘরের ছাদ ও দেয়াল শিল্পীর নিপুণ হাতের কারুকাজ করা। তারপর বার্নিশ করা হয়েছে। মেঝের হাঁটাচলার জায়গায় মখমলের কার্পেট বিছানো, যেন রাস্তা। বাকি অংশে কাঠ দেখা যাচ্ছে তবে তাও পালিশ করা।

ঘরের দেয়াল পেইন্টিংগুলো ঘরের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছে। ঘরের যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে তার বিপরীত দিকে দরজা ও জানালা দেখতে পেল। হাতের ডানে ছোট আর একটা দরজা দেখতে পেল। সব দরজা-জানালায় দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলে যায় এমন রঙের পর্দা টানা। তাই দরজার ওপাশে কী আছে তা সে বুঝতে পারল না। জানালার ধারেই একটা ডাবল বক্সখাট সুন্দর মখমলের চাদর দ্বারা আবৃত।। বালিশের কভারও মখমলের। খাটের দুপাশের বেড লকারের ড্রয়ারগুলোতে তালায় চাবি লাগানো। তার পাশে রিডিং টেবিল চেয়ার। টেবিলের ওপর কাঠের রিডিং ল্যাম্প ও কিছু পত্র-পত্রিকা আছে। তার পাশে একট ড্রেসিং টেবিল। আয়না কাপড় দিয়ে ঢাকা। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে একটা মেকআপ বক্স রাখা। দূর থেকেই বোঝা যায় তা অত্যন্ত দামি। তার পাশে কাপড় রাখা আলনায় কোনো কাপড় নেই।

যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে তার বাঁ ধারে সোফা সেট। সোফার পেছনে কোনো জানালা নেই। ডান ধারে সুইচ বোর্ড। ঘরে হয়তো পারফিউম স্প্রে করা হয়েছে। সুন্দর গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই সব দেখল মেয়েটি। গোসল করা দরকার। ডানের দরজার পাশে লাইটের সুইচ দেখে বুঝে নিল দরজার ওপাশেই বাথরুম। সুইচ দিয়ে পর্দা সরাতেই দেখল দরজা খোলাই আছে। বাথরুমটাও সুন্দরভাবে সাজানো। উন্নত রুচির পরিচয় সর্বত্র।

ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে কাপড় খুলতে খুলতে দেখল, এদের পানি সাপ্লাইও আছে। হঠাৎ খেয়াল হলো গোসলের পর এসব কাপড় পরা যাবে না। কারণ বহুদিন ধরে ধোয়া হয়নি, অন্য কাপড় তার চাই। কাপড় নেয়ার জন্য আবার কাপড় পরে ঘুরে দরজার দিকে দাঁড়াতেই দরজার পাশে হুকে কাপড় দেখতে পেল। কাপড় থেকে সুগন্ধ বের হচ্ছে। কাপড়ে কী জন্য সুগন্ধি দেয়া হয়েছে বুঝতে পারল না সে। বাথরুম থেকে বের হয়েই সামনে দেয়ালে আটকানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, দশটা বেজে পাঁচ। অর্থাৎ সে প্রায় আধা ঘণ্টা বাথরুমে ছিল। ঝরনার পানিতে গোসল করার পর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। এগিয়ে গেল অপর দরজাটির দিকে। পর্দা সরাতেই বারান্দা দেখতে পেল।

বারান্দার ডানে-বাঁয়ে কাঠের দেয়াল। অপর পাশে কী আছে দেখার উপায় নেই। সামনের সম্পূর্ণ খোলা অংশ কাঠের রেলিং দেয়া। রেলিং ভাঙা ছাড়া এ পথে পালানোর কোনো উপায় নেই। বারান্দাতে টবে নানা ধরনের ফুলের গাছে ফুল শোভা পাচ্ছে। বারান্দা পশ্চিমমুখী হওয়ায় দুপুরের পর বারান্দায় রোদ পাওয়া যাবে। তার পরিধেয় কাপড় ধুয়ে বাথরুমেই শুকাতে দিয়েছে। দুপুরের পরের রোদে যেন তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এজন্য বারান্দায় এনে শুকাতে দিল। ক্ষুধা লেগে গেছে। আবার বিশ্রামও নেয়া দরকার। ক্ষুধা নিয়ে বিশ্রাম হবে না। তার দরজা খুলে আগের বারান্দায় বেরিয়ে মেয়েটি দেখল দরজার পাশেই একজন লোক পকেটে ডান হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি বুঝতে পারল, সে তার পাহারায় আছে।

মেয়েটির দরজা খোলার শব্দ শুনেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটি। ‘ম্যাডাম, এখানে আপনার নাশতা দেয়া হয়েছে। বসে খেয়ে নিন। এর আগে আপনাকে ডাকার জন্য দরজায় দুবার নক করেছি, কিন্তু আপনার কোনো জবাব পাইনি। আপনি বের না হলে হয়তো এতক্ষণে আবার নক করতাম।’ বিনয়ের সঙ্গে বলল লোকটি। সামনেই চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। টেবিলে নানারকম নাশতা, ফলমূল সাজানো। বসে পড়ল মেয়েটি। অর্ধেক খাওয়া হয়ে গেছে এমন সময় সামনের সমতল চত্বরে একটি গাড়ি এসে থামল। তারপর যা দেখল, তাতে খাওয়া বন্ধ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

হেডকোয়ার্টারে পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে জ্ঞান ফিরে পেল ছেলেটি। প্রথমে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে ঘোর ঘোর ভাবটা কাটিয়ে ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলল। দেখতে পেল সে একটা বড় হুড খোলা জিপের পেছনে মেঝেতে শুয়ে আছে চিত হয়ে। দুপাশের সিটে সেই পাহারাদার দুজন রাইফেল হাতে বসে আছে। দুজনের একজন তাকিয়ে আছে তার দিকে। গাড়ি যে ওপরের দিকে উঠছে তা বোঝা যায়। মাঝে মধ্যে ঝাঁকুনি খাচ্ছে। এমনিতে সারা শরীরে ব্যথা, তার ওপর শক্ত ধাতব মেঝেতে ব্যথা ঝাঁকুনির কারণে দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে। উঠে বসলে হয়তো কিছুটা আরাম পাওয়া যাবে। শরীর নড়ানোর উপায় নেই। রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় হাত-পায়ের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। অগত্যা হাতের সাহায্য ছাড়াই বসার জন্য উঠতে শুরু করল। অর্ধেক উঠেছে। হঠাৎ বুকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে বাড়ি মারল একজন। আগে দেখতে পায়নি। তাই তাল হারিয়ে পড়ে গেল আবার। ঠুকে গেল মাথা শক্ত মেঝেতে। ভালোই আঘাত লেগেছে। জ্ঞান হারাল না, তবে চোখে সবকিছু অন্ধকার দেখতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করছে। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। দুই পাহারাদারের কেউ কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সব ঝাপসা দেখতে লাগল। মাথার পেছনটা দপ দপ করে ব্যথা করছে। চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও খুলে রাখল। একটু পর ওয়াকিটকিতে ড্রাইভারকে কথা বলতে শুনল ছেলেটি। ধীরে ধীরে চোখের ঝাপসা ভাবটা কেটে গেলেও ড্রাইভারের দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখার জন্য যদি আবার রাইফেলের বাঁটের গুঁতো খেতে হয়, এ ভয়ে আর তাকাল না। মাথাটা খুব একটা ভালো কাজ করছে না। ওয়াকিটকিতে ড্রাইভার কার সঙ্গে সংক্ষেপে কথা বলল, তাও সে বুঝতে পারল না। তবে গাড়ি যে দাঁড়িয়ে গেল তা পরিষ্কার বুঝতে পারল। কতক্ষণ থেমে ছিল বলতে পারবে না সে। তবে আবার ওয়াকিটকিতে কথা বলার পর ড্রাইভার গাড়ি চালু করল।

বেশ কিছুক্ষণ ওপরে ওঠার পর গাড়ি যে একটা সমতল জায়গায় থেমে দাঁড়াল তা বুঝতে পারল ছেলেটি। তবে খোলা আকাশ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। প্রথমে ড্রাইভার নামল গাড়ি থেকে। এর মধ্যে পাহাদারদের একজন ছেলেটির পাঁয়ের বাঁধন খুলে দিল। তার হাত দুটো খুলে পেছন দিকে বেঁধে দিল। তারপর দুজনে মিলে ছেলেটিকে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিল। কিন্তু বাঁধা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকার কারণে তার হাত-পা অবশের মতো। ছেড়ে দিতেই ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটু ভেঙে পড়ে যেতে শুরু করল ছেলেটি। পাহাদার দুজন তাকে ধরলও না। হাঁটু ভেঙে প্রথমে বসে পড়ল। তারপরও তাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। হাত পেছনে বাঁধা থাকায় ঠেকাতে পারল না সে। ‘সামনে এগোও, তা না হলে আবার আগের অবস্থা হবে’, বলল পাশে দাঁড়ানো একজন। ছেলেটি জানে এরা যা বলল তা করবে। কিন্তু এ অবস্থায় কীভাবে সামনে এগোবে প্রথমে বুঝতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত পর বুদ্ধিটা মাথায় এসেই গিয়েছিল; এমন সময় পিঠের ওপর একটা লাথি পড়ল। লাথির আঘাতে ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। কিন্তু এখন তার কিছু করার নেই। পা দুটো মুক্ত থাকায় কিছুটা নড়াচড়া হওয়ায় এর মধ্যে পায়ের বোধশক্তি কিছুটা ফিরে এসেছে। আরো দেরি করলে আরো আঘাত হানবে তারা। তাই আর দেরি না করে বুকের ওপর ভর দিয়ে পায়ের সাহায্যে হেঁচড়ে হেঁচড়ে সামনে এগোতে লাগল পাহাদারের নির্দেশিত দিকে। খুব জোর দশ গজ এগিয়েছে ওভাবে। কিন্তু এর জন্য কমপক্ষে পঁচিশবার থামতে হয়েছে তাকে। তবে থেমেছে এক মুহূর্তের জন্য। আর লাথি মারেনি দুজনের কেউই। ছেলেটি পৌঁছে গেছে নিকটবর্তী দুটো কাঠের খুঁটির মাঝখানে। ওপরে মাথা উঠিয়ে দেখল। খুঁটি দুটোর ওপরে একটা কাঠের টানা দেয়া। তবে কি এরা আমাকে ফাঁসি দেবে? শিউরে উঠল ছেলেটি নিজের অজান্তেই।

‘এই, উঠে দাঁড়াও তাড়াতাড়ি’, বলল একজন। হাত এখনো পিঠের ওপর বাঁধা। এ অবস্থায় উঠে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব ছেলেটির জন্য। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুললেও বলতে পারল না সে পাশ থেকে ছুটে আসা পদশব্দ শুনে। মুখ তুলে তাকাল। দেখল তার পাশে এসে দাঁড়াল এক লোক। তাকে চেনে না ছেলেটি।

‘আরে, আমার জন্য ভাগ রাখ। তোমরা অনেক করেছ, এখন ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও’, বলল নতুন আগন্তুক। সরে দাঁড়াল আগের দুজন।

‘তোমরা দুজনে গুনবে’, বলে শপাং করে ছেলেটির শরীরে চাবুক কষল আগন্তুক।

‘আল্লাহ’ শব্দটি বের হয়ে এলো ছেলেটির মুখ থেকে। ব্যথায় চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে উঠল।

এরপর চাবুক কষতে শুরু করল আগন্তুক। এক, দুই করে গোনা শুরু করল দুই পাহারাদার।

প্রথম চাবুকের আঘাতে শপাং করে শব্দ হতেই চাপা আর্তনাদ করে দুহাতে মুখ ঢেকে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। এতক্ষণ খাওয়া বাদ দিয়ে সব দেখেছে; তবে কথা ভালোভাবে শুনতে পায়নি।

‘ম্যাডাম, আপনি উঠতে পারবেন না। এখানে থেকেই যা দেখার দেখুন; তা না হলে সরে গিয়ে বিশ্রাম করুন’, মেয়েটিকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বলল পেছনে দাঁড়ানো পাহারাদার। লোকটি অনুরোধের সুরে বললেও তার কথা আদেশের মতোই লাগল মেয়েটির কাছে।

ওখানে বসে এ দৃশ্য দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে টালমাটাল পায়ে দরজার কাছে পৌঁছেছে, এমন সময় গাড়ির শব্দ শুনে ফিরে তাকাল মেয়েটি। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ভেজা চোখে প্রথমে ঝাপসা দেখল। তারপর চোখ মুছে পরিষ্কার দেখতে পেল। যা দেখল তাতে আবার বারান্দার রেলিংয়ের ধারে এসে দাঁড়াল মেয়েটি।

দ্বিতীয় চাবুকের আঘাতেই জ্ঞান হারাল ছেলেটি। চাবুক কষা থামাল আগন্তুক। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। একটি সুন্দর ছাদওয়ালা জিপ এসে থেমে দাঁড়াল। গাড়ি থামার আগমুহূর্তেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল ক্যাপ্টেন। নেমেই চাবুক মারা থামানোর জন্য হাত তুলল ক্যাপ্টেন। কিন্তু তার আগেই থেমে গেছে আগন্তুক। ক্যাপ্টেন ইশারা করতেই গাড়ি নিয়ে চলে গেল ড্রাইভার।

‘কি, অজ্ঞান হয়ে গেছে?’ জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল আগন্তুক।

‘জাহাজ থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত ছেলেটির ওপর কী শাস্তি হয়েছে?’ দুই পাহাদারের কাছে জানতে চাইল ক্যাপ্টেন।

সংক্ষেপে বলল একজন। কথা ধরিয়ে দিল অপরজন।

‘হুম, শোনা শেষ হলে গম্ভীর হয়ে বলল ক্যাপ্টেন। এক মুহূর্ত ভেবে বলল, ‘থাক, যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে। এখন একে এ অবস্থায় রেখে সবাই চলে যাও, বিশ্রাম নাও, যদিও এ অবস্থায় পালাতে পারবে না, তারপরও দূর থেকে লক্ষ্য রেখ’, বলে ছেলেটির দিকে নজর বুলিয়ে বাংলোর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল মেয়েটির দিকে। মেয়েটি দৃষ্টি নামিয়ে নিল বলে মনে হলো। তারপরও সেদিকে তাকিয়ে এগোতে লাগল বাংলোর দিকে।

ছেলেটিকে আর মারতে হবে না ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আগন্তুক। তবে তা উপস্থিত কেউই বুঝতে পারল না। ক্যাপ্টেন চলে যেতেই তিনজনে হাঁটতে শুরু করল তাদের গন্তব্যের দিকে।

‘হাই, কেমন আছেন? ভালোভাবে পৌঁছেছেন তো?’ মেয়েটির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে দূর থেকে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মুখে বিস্তৃত হাসি।

ছেলেটির দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাল চোখ মুছতে মুছতে, তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না।

‘আপনি কাঁদছেন কেন?’ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। এর মধ্যে পাহারাদার সরে বেশ দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারো কোনো উত্তর দিল না মেয়েটি। ক্যাপ্টেন বুঝে ফেলল কেন কাঁদছে সে।

‘আচ্ছা, বলেন, কী হলে আপনার মুখে হাসি দেখতে পাব? আপনার কান্না দেখতে চাই না’, কোমল সুরে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘ওকে’ হাত তুলে ছেলেটিকে নির্দেশ করল মেয়েটি। ‘এবং আমাকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে’, অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে কথাগুলো বের করলে সে।

‘কে বলল, আপনাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে? আপনার তো হাত-পা বাঁধা হয়নি। ওকে তো হাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আচ্ছা, আপনি যদি খুশি হন, তো ওর হাতের বাঁধন খুলে দিতে বলি।’

মেয়েটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দূরে দাঁড়ানো পাহারাদারকে কাছে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল।

পাহারাদার চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই ‘ওহ হো, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বললাম, খেয়ালই করিনি’, বলেই মেয়েটিকে অপর চেয়ারে বসার ইঙ্গিত করে ক্যাপ্টেন নিজে বসে পড়ল অন্য একটি চেয়ারে। বসে দুজনেই নীরবে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। তবে ক্যাপ্টেন মাঝে মধ্যে আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে।

ছেলেটি এখনো অজ্ঞান হয়ে দড়িতে হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলে আছে। একটু পরেই সেই পাহারাদার পানির পাত্র নিয়ে পৌঁছল ছেলেটির সামনে, পাত্র থেকে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিল ছেলেটির চোখে-মুখে। কয়েক মুহূর্ত পরই নড়ে উঠল ছেলেটি। ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আবার বন্ধ করে আবার খুলল। এরপর আর বন্ধ করল না।

একহাত দিয়ে ছেলেটিকে ধরে অপর হাতে ধরা ধারালো ছুরি দিয়ে হাতের বাঁধন সাবধানে কেটে দিয়েই ছুরি ফেলে দিয়ে দুই হাতে পাঁজা করে ধরল পাহারাদার, যাতে ছেলেটি পড়ে না যায়। আস্তে করে একটা খুঁটির পাশে বসিয়ে দিল ছেলেটিকে। তারপর পানির পাত্রটি ছেলেটির মুখের সামনে এগিয়ে ধরল। পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি খেল ছেলেটি। অনেকটা স্বস্তি বোধ করল। তবে দুহাতের রক্ত চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। শরীর এত দুর্বল যে তার বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আস্তে করে পাথুরে চত্বরে শুয়ে পড়ল। তার পাশে রাইফেল হাতে পাহারাদার। রোদটা বেশ ভালো লাগছে তার।

কেন, তাকে কোনো একটা ঘরে এনে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়া যায় না, আমার মতো? ছেলেটি মাটিতে শুয়ে পড়ার পর ক্যাপ্টেনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল মেয়েটি। সে ভেবেছিল ছেলেটির জন্যও ঘর বরাদ্দ করা হবে। কোনো উত্তর দিল না ক্যাপ্টেন। যেন মেয়েটির কথা শুনেইনি এমনি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কি আপনি খুশি?’ মেয়েটি কোনো উত্তর না দিয়ে মুখখানা নীচের দিকে নামিয়ে নিল। জানে এদের ছেলেটির প্রতি সামান্য পরিমাণ দরদ নেই। তাই পুনরায় আর প্রশ্ন না করে চুপ করে থাকল।

‘আমাদের এই দ্বীপ দেশ আপনার কেমন লাগল? ড্রাইভার সব দেখিয়ে বলে দিয়েছ তো?’ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলল ক্যাপ্টেন।

‘ভালো।’ মেয়েটি বুঝল ক্যাপ্টেনই ড্রাইভারকে বলে দিয়েছিল, যাতে তাকে এই দ্বীপের সব দেখানো হয়, সেই সঙ্গে সব জানানোও হয়।

‘এটাকে দ্বীপ দেশ কেন বললাম জানতে চাইলেন না যে।’ মেয়েটি চুপ করে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মেয়েটির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিজেই বলতে লাগল, ‘এই দ্বীপটা ইংল্যান্ডের। এই দ্বীপের অধিকাংশই ইংরেজ। আমাদের মহামান্য লর্ড ইংল্যান্ডের কাছ থেকে এ রকম কয়েকটা দ্বীপ প্রথমে বার বছরের জন্য লিজ নেয়। এরপর তার মেয়াদ বর্ধিত করে নিরানব্বই বছর করেছে, লিজ নেয়ার প্রায় পনের বছর হয়ে গেছে। লর্ড লিজ নেয়ার পর থেকে একরকম স্বাধীনভাবে এসব দ্বীপ শাসন করছেন। ইংল্যান্ডকে শুধু কর দিতে হয়, এছাড়া তারা এসব দ্বীপের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে না। যথাসময়ে কর জমা দেয়া হয়। যার ফলে কখনো কোনো গোলমালের সৃষ্টি হয়নি। শুধু এই দ্বীপেই মানুষের বসতি আছে, আর বাকি কোনো দ্বীপে মানুষ বাস না করলেও সেসবও মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হয়। আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন, দেখতে পারবেন। কারণ আপনি তো এখানকার বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছেন।’ শেষ বাক্যটা মুখভরা হাসি নিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘তার মানে?’ মেয়েটি ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্য জানে, তারপরও নিজের অজান্তে প্রশ্ন করে বসল।

‘তার মানে খুব সহজ, লাঞ্চে লর্ডের মুখ থেকেই শুনবেন।’ মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হলো।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মেয়েটি; কিন্তু সামনের চত্বরে একটা সুন্দর হুড খোলা জিপ সামনে থামতেই সেদিকে ফিরে তাকালো দুজনে। ড্রাইভারের সিট থেকে নামল একজন।

সুপুরুষই বলা চলে। লম্বা-চওড়ায় বেশ। লাল চুল। মাথা নীচু করে এগিয়ে আসছে বাংলোর দিকে।

‘ইনিই হলেন আমাদের মহামান্য লর্ড। বাইরে বেরিয়ে ছিলেন। প্রায়ই বাইরে যান দ্বীপের হালহকিকত দেখার জন্য।’ গাড়ি থেকে নামতেই বলল ক্যাপ্টেন। কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। এর মধ্যে বাংলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে লর্ড। ‘ঠিক আছে, আপনি না হয় এখানে বসে থাকুন। তা না হলে ঘরে গিয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিন। আমি তো কেবল জাহাজ থেকে এলাম। এখন গিয়ে গোসল করব, কিছুক্ষণের মধ্যে লাঞ্চের জন্য ডাকবে, তখন দেখা হবে, এখন চলি’, বলেই উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে দুবার তালি দিল।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একজন লোককে এদিকে আসতে দেখল মেয়েটি। লোকটির প্যান্টের ডান পকেট একটু ফোলা। লোকটি কাছে এসে দাঁড়াতেই ‘আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে ও থাকল।’ বলেই আর দাঁড়াল না ক্যাপ্টেন। হাসি মুখে ‘বাই’ বলে চলে গেল।

মেয়েটি চেয়ারে বসেই থাকল। তার থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। মেয়েটির দৃঢ়বিশ্বাস তাকে পাহারা দেয়ার জন্যই সে আছে। মেয়েটি চোখ ফেরাল চত্বরের দিকে। দেখল, ছেলেটি তেমনই পড়ে আছে। আর তার পাশেই আছে পাহারাদার।

ছেলেটির প্রতি কেমন যেন একটা মায়া জন্মে গেছে পাহারাদারের। এই প্রথম সে ছেলেটির কাছে এলো। কাছে এসে ছেলেটির দিকে তাকিয়েই কেন যেন ছেলেটিকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। তার একটা এরই বয়সী ছেলে ছিল যে জ্বরে মারা গেছে। ছেলেটিকে সে খুব স্নেহ করত। এই ছেলেটি অনেকটা তার ছেলের মতোই। এটাও ভালোলাগার একটা কারণ হতে পারে। আসার সময়ই ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মোতাবেক ছেলেটির জন্যও খাবার পাঠানোর কথা বলে এসেছে। এখনো খাবার নিয়ে কেউ আসছে না দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে পাহারাদার। ছেলেটা যে ক্ষুধায় দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেটা সে বুঝতে পারছে। হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে ভাবনায় বাঁধা পড়ল পাহারাদারের। গাড়িতে লর্ডকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে বাংলোর ভেতরে লর্ড ঢুকে পড়তেই আবার বসে পড়ল।

কেটে গেল আরো অনেকক্ষণ। একবার চোখ পড়ল দোতলার বারান্দার দিকে। দেখল, মেয়েটি এদিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকাল। দেখল, তার চোখ বন্ধ। বুক ছন্দময়ভাবে ওঠানামা করছে। খানিক পরেই একজনকে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে এদিকে আসতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পাহারাদার। ট্রে-টা নামিয়ে রেখেই চলে গেল লোকটি।

‘তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? তোমার খাবার এসেছে।’ কোমল কণ্ঠে বলল পাহারাদার। আশপাশে যে কেউ নেই তা আগেই দেখে নিয়েছে।

কথা শুনেই চোখ মেলল ছেলেটি। সে ঘুমায়নি বুঝল পাহারাদার।

‘শুয়ে খেতে অসুবিধা হবে, উঠে এ খুঁটিতে হেলা দিয়ে খাও।’ বলতে বলতে ছেলেটিকে তুলে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল।

‘তুমি খুব দুর্বল হয়ে গেছ, নিজে খেতে পারবে না, আমি খাইয়ে দিচ্ছি’, বলতে বলতে গরম রুটি ছিঁড়ে গরম গোস্তের ঝোলে চুবিয়ে তার মুখের কাছে ধরল পাহারাদার। মুখ সরিয়ে নিল ছেলেটি।

‘কিসের গোস্ত?’

থমকে গেল পাহারাদার। ‘খাসির।’

‘সত্যি তো?’ আবার প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘হ্যাঁ, সত্যি।’ বিস্মিত হয়ে গেল পাহারাদার। সে যথেষ্ট পড়াশোনা করে অবসরে। ছেলেটিকে দেখেই বুঝে ফেলেছে যে সে মুসলমান। বুঝার আরো একটা কারণ, শুয়ে শুয়ে কয়েকবার সে ‘আল্লাহ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে। সে বিস্মিত হলো এ জন্য যে, এ অবস্থায়ও ছেলেটি তার ধর্মীয় অনুভূতিকে আশ্চর্যজনকভাবে জাগ্রত রেখেছে।

‘আজ শুধু মুরগি আর খাসি জবাই হয়েছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি।’

‘আমার তো মনে হয় কোনো মুসলমান জবাই করেনি।’ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ছেলেটির।

‘হ্যাঁ।’ বলল পাহারাদার।

‘তবে শুধু রুটিই দিন।’

‘গোস্ত ও তার ঝোল দিয়ে রুটি খাওয়ার আর চেষ্টা করল না। জানে এ ছেলে খাবে না। তাই শুধু রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে তার মুখে পুরে দিতে লাগল সে। তবে বিস্মিত হয়েছে আগের চেয়ে বেশি। ছেলেটির প্রতি মায়া আরো বেড়ে গেল তার। মাঝেমধ্যে শুকনো রুটি গলায় আটকে যাচ্ছে। তাই পানিতে ভিজিয়ে দিতে লাগল। পাঁচটা রুটি ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।

‘আরো খাবে?’

‘না।’ বলল ছেলেটি।

‘তুমি এখন পারলে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নাও।’

‘তবে আমাকে দ্বিপ্রহরের আগে জাগিয়ে দেবেন, নামাজ পড়ব।’

‘ঠিক আছে।’

ছেলেটিকে শুইয়ে দিয়ে পাশে বসে থাকল পাহারাদার। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল ছেলেটি।

অনেক সময় কেটে গেছে। ছেলেটি এখনো শুয়ে আছে। ঘুমিয়েছে কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে না দূর থেকে। এমন সময় পায়ের শব্দে ফিরে তাকাল মেয়েটি। দেখল হাসিমুখে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ক্যাপ্টেন। গোসল করে ধোয়া প্যান্ট-শার্ট পরে ভ্রমণের ছাপ চেহারা থেকে কিছুটা দূর হওয়ায় ভালোই লাগছে তাকে। বেশ স্মার্ট মনে হচ্ছে।

‘চলুন। লাঞ্চ টেবিলে লর্ড অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য।’ মেয়েটিকে তার দিকে তাকাতে দেখে বলল ক্যাপ্টেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। তারা নীচতলায় ক্যাপ্টেনের পেছনে একটা বিরাট ঘরে এসে ঢুকল। মেয়েটির ঘরের মতোই এটার দেয়াল, ছাদ কারুকাজ করা, সম্পূর্ণ মেঝে কার্পেটে ঢাকা। ঘরের মাঝে একটা বিরাট পিতলের ঝাড়বাতির নানা রঙের লাইটের আলোয় আলোকিত ঘরখানা। দুটো শোকেসে যেন রাজ্যের জিনিস সাজানো। একটা বড় অ্যাকুয়ারিয়ামে নানা ধরনের মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। ঝাড়বাতির ঠিক নীচে বিরাট ডাইনিং টেবিল। তার চারদিকে চেয়ার আছে।

‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম মাই ক্যাপ্টেন্স ডার্লিং।’

এতক্ষণে কথা শুনে চোখ পড়ল টেবিলের ওধারে দাঁড়িয়ে থাকা লর্ডের দিকে।

‘আসুন, বসে পড়ুন।’ লর্ড তার সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে বলল।

দুজনেই এসে লর্ডের সামনের চেয়ারে পাশাপাশি বসে পড়ল। ভদ্রতার খাতিরেই ক্যাপ্টেনের পাশে বসল মেয়েটি।

‘হও! ক্যাপ্টেন, সত্যিই তোমার পছন্দ আছে।’ হাসি মুখে বলল লর্ড। ‘তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে।’ শুনেই ধক করে কেঁপে উঠল মেয়েটির বুক। হয়তো মেয়েটির কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েছে লর্ডের।

‘তুমি তাকে ও ব্যাপারে কিছু জানাওনি?’

‘সরাসরি জানাইনি’ মুখ নীচু করে বলল ক্যাপ্টেন। মনে হলো খানিকটা লজ্জা পেয়েছে।

‘ঠিক আছে। আমি সব বলব তোমার পক্ষ থেকে।’ এক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার বলল, ‘খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে বলা যাবে খান।’

এর মধ্যে ওয়েটার এসে গেছে। পরিবেশন করা শুরু করল।

‘আপনি নিশ্চয়ই সাব-কন্টিনেন্টের মানুষ।’ মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে বলল লর্ড, তাই আপনাদের খাবারই রান্না করা হয়েছে। আমাদের রাঁধুনি অনেক ধরনের রান্না জানে’, যেন কথার কথা বলল লর্ড।

‘আপনি কীভাবে জানলেন?’ এই প্রথম বসার পর চোখ তুলে তাকাল লর্ডের দিকে। লর্ডও চোখ তুলে তাকাল, মুখে হাসি। তার চোখগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষè।

‘অনুমান’, সংক্ষেপে জবাব দিল লর্ড। আপনার দেশ?

‘বাংলাদেশ’, চোখ নামিয়ে বলল মেয়েটি। ‘তবে থাকি আমেরিকার নিউ ইয়র্কে।’ মেয়েটি দেখল সত্যিই সব খাবার তাদের দেশীয়। খানিকক্ষণ নীরবে খেয়ে চলল তিনজনে। একজন ওয়েটার তদারকি করছে হঠাৎ খেয়াল হতেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘এটা তো মুরগির গোস্ত, অন্যটা কিসের?’

‘খাসির’, পাশ থেকে জবাব দিল ক্যাপ্টেন।

আরো কয়েক মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর মুখ খুলল লর্ড। ‘আমি প্রায় সবসময় ব্যস্ত থাকি। আলাদা করে, বিশেষভাবে কথা বলার সুযোগ কম। তাই এখনই খেতে খেতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি কী বলেন?’

মাথা কাত করে সায় জানাল মেয়েটি। ক্যাপ্টেন মুখ নীচু করে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে মুখের খাবার গিলে পানি খেয়ে শুরু করল লর্ড, ‘আমি তার হয়ে (ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেনকে দেখাল) সংক্ষেপে আপনার সঙ্গে কথা বলব। আপনি আস্তে আস্তে খেতে থাকুন। সেই সঙ্গে আমার কথা শুনুন।’ এক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার শুরু করল। ‘গতকাল সকাল বেলা জাহাজ থেকে ও আমাকে ফোন করে জানায় যে, তার জাহাজের এক লোক বাইনোকুলার দিয়ে এক দ্বীপে পাহাড়ের ওপর একটি মেয়েকে সাদা কাপড় হাতে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দেখে অর্থাৎ মেয়েটি তাদের সাহায্য চাইছে, এ কথা ওকে জানানোর পর সে নিজে বাইনোকুলার দিয়ে আপনাকে ওই দ্বীপ থেকে তুলে আনার অনুমতি চাইলে আমি সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি দেই। আপনাকে এমন সময় জাহাজের লোকজন দেখতে পায়, যখন জাহাজ অনেকদূর এগিয়ে যায়। আপনাকে নেয়ার জন্য পুনরায় জাহাজকে ঘুরতে হয়। একনাগাড়ে অনেক কথা বলে থেমে কিছুক্ষণ খেল লর্ড। মেয়েটি লর্ডের কথামতো এতক্ষণ খেয়েই যাচ্ছিল, সেই সঙ্গে শুনছিলও।

লর্ড কী বলতে চাচ্ছে তা মেয়েটির কাছে আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তারপরও গায়ে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল তার। এর মধ্যে তার প্লেট ফাঁকা হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলে আরো একটু খেতে পারবে কিন্তু গলা দিয়ে আর কিছু নীচে নামবে না।

‘কি, খাওয়া শেষ হলো? আর কিছু নেবেন না?’ জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন তার দিকে তাকিয়ে।

‘খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, আর কিছু নেব না’, তাড়াতাড়ি বলল মেয়েটি। হাত দিয়ে প্লেট ঢেকে ধরল। কারণ, ওয়েটার তার প্লেটে কিছু দিতে ধরেছিল।

‘ঠিক আছে, হাত ধুয়ে এসে বসুন। তারপর বাকি কথা বলি’, বলল লর্ড।

একপাশে ঝকঝকে সাদা বেসিন, তাতে ঠান্ডা গরম দুই ধরনের পানি কল। হাত ধুয়ে এসে আবার আগের জায়গায় বসল মেয়েটি। এরপর এক এক করে ক্যাপ্টেন ও লর্ড উভয়েই হাত ধুয়ে এসে বসল। লর্ড সামান্যই খেয়েছে।

চেয়ারে বসেই শুরু করল লর্ড, ‘আপনি হয়তো এর মধ্যেই বুঝে গেছেন, আমি এরপর কী বলব?’ থামল। আবার শুরু করল, ‘ঠিক করা হয়েছে, আগামীকাল রবিবার ফ্লাওয়ার্স টাউনে অবস্থিত ও দ্বীপের একমাত্র গির্জায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাপ্টেন ও আপনার বিবাহ হচ্ছে। আশা করি আপনি অমত করবেন না।’

‘আমি রাজি না। আমাকে আমার বাবা-মার কাছে যেতে দিন।’ গলায় দৃঢ়ভাবে ভাব ফুটিয়ে তোলার শক্তি খুঁজে পেল না সে।

‘আপনাকে রাজি হতেই হবে।’ বলল লর্ড দৃঢ়স্বরে। আপনি চাইলেই এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে পারবেন না।’

মেয়েটি মুখ দিয়ে কিছু বলতে চাইলেও মুখে কথা জোগাল না। নিরুপায় হয়ে কান্না লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাল।

‘আপনি রাজি না হলেই ভুল করবেন।’ আবার শুরু করল লর্ড। আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের জন্য সে অনুপযুক্ত নয়। তাছাড়া সে আমার চাচাতো ভাই, আমার আর অন্য কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাই আমার পরে সেই এখানকার লর্ড হবে, তাহলে কথা এখানেই শেষ। আশা করব, আর অমত করবেন না’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল লর্ড। তারপর ক্যাপ্টেন। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল চোখ মুছতে মুছতে। দরজার দিকে এগোতে শুরু করল তিনজন।

দ্বিপ্রহরের পর মৃদু ঝাঁকি দিয়ে ছেলেটিকে জাগিয়ে দিল পাহারাদার।

‘নামাজের সময় হয়ে গেছে।’

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল ছেলেটি। চোখ কচলে পাহারাদারের দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলে সামনে জগের পানি দিয়ে অজু করল। দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা কেমন যেন করে ওঠায় আবার বসে পড়ল। বসেই নামাজ পড়ল। মোনাজাতের পর খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে বসল। শক্ত চত্বরে শুয়ে থাকা কষ্টকর।

‘এখন কি কিছুটা সুস্থ লাগছে?’ জিজ্ঞেস করল পাহারাদার।

‘হ্যাঁ।’ জাহাজের ব্যাপারটা খেয়াল হলো ছেলেটির। ‘আপনি কি জাহাজে ছিলেন?’ নীচু স্বরে জানতে চাইল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

জাকির আহমদ

২১ মার্চ, ২০২০ , ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৩

Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

(পর্ব – ৩)

পরদিন ভোরবেলা পুকুর পাড়ে এসে সেখানে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে অপেক্ষা করছে ছেলেটি। তবে প্রকাশ্যে নয়, গাছের আড়ালে থেকে। অত্যন্ত সতর্ক আছে সে। পুকুর পাড়ের আশপাশে মেয়েটির সাড়া-শব্দ পেলে সে এখান থেকে দ্রুত চুপিসারে সরে পড়বে। সে জন্য সে প্রস্তুত আছে।

সূর্য উঠেছে। সকালে পূর্ব দিকের সূর্যের রক্তিম আভা পুকুরের পানিতে অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছে। আরো কিছুক্ষণ কেটে গেল। ছেলেটি পুকুরের পূর্ব ধারের উত্তর পাশে দাঁড়িয়ে আছে গাছের সঙ