অপূর্ব চৌধুরী

৮ জুলাই, ২০২০ , ৩:১১ অপরাহ্ণ

মৃত্যুর গল্প, জন্মের মৃত্যু

বছরে কত লোক মারা যায় গোটা পৃথিবীতে ? ৬৫ মিলিয়নের মতো । বছরে কতগুলো মানুষের বাচ্চা জন্ম গ্রহণ করে ? ঠিক তার ডাবল – ১৩০ মিলিয়নের মতো ।

প্রতি মিনিটে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে ২৫০ টি শিশু । প্রতি মিনিটে কত জন মানুষ মারা যায়, জানেন ? প্রায় ১২০ জন ।

প্রতি ঘন্টায় মানুষ মারা যায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার । প্রতিদিন গোটা পৃথিবীতে মরে যায় প্রায় পৌনে দুই লক্ষের মতো । তার মানে যে বাক্যটি পড়ছেন, যে শব্দটি পড়ছেন, সেটি পড়তে যদি এক সেকেন্ড লাগে, সেই এক সেকেন্ডে পৃথিবীতে ২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে ।

জন্মটা আবার ঠিক তার বিপরীত । প্রতি সেকেন্ডে জন্মে চারজনের বেশি । প্রতি সেকেন্ডে মরে যায় ২ জন । তার মানে – প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীতে মানুষ বেড়ে যায় ২ জন বেশি ।

রাতের খাবার শেষে হেঁটে এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম । কি করে যেন ঘুম ভেঙে গেলো । কেন ভেঙে গেলো জানি না । হঠাৎ মনে হলো – জন্মটা কত সহজ, কারণ, জন্মের সময়টি বুঝের আওতায় থাকে না । যা দেখি না, তার সহজ কঠিনের হিসেবে জানা থাকে না, কিন্তু মৃত্যুটি থাকে । মৃত্যুটি নিজ হাতে যেন দেখতে পাই, মৃত্যুর কাছাকাছি টা নিজেরাই দেখতে পাই । নিজেদের জন্ম নিজেরা দেখি না, কিন্তু মৃত্যুটি যেন দেখি । মৃত্যুর কাছাকাছি বসে থেকে নিজেদের দেখতে পাই ।

উঠে চা বানালাম । হারবাল টি । সাথে ডার্ক চকলেট । অনেকসময় লেখা একটি ভালো ওষুধ । লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে যাই ।

লিখতে বসলাম মৃত্যু নিয়ে ।

প্রথম প্যারাটি লিখে ফোনের স্টপ ওয়াচ ধরে পরীক্ষা করে দেখলাম – উপরের প্যারাগ্রাফের শুরুর শব্দ ‘বছর’ থেকে শেষের শব্দ ‘২ জন’ পড়তে সময় লেগেছে ৪৮ সেকেন্ড । হিসেবে করলাম, ততক্ষণে ১৯২ জন শিশু পৃথিবীতে এসে গেছে, ৯৬ জন মানুষ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মরে গেছে । পাশে আরো নতুন ৯৬ জন মানুষ যুক্ত হয়েছে । অদ্ভুদ এক জীবন চক্র ।

সংখ্যাগুলোর ভগ্নাংশ হিসাব না লিখে মোটা দাগের একটি পূর্ণ সংখ্যা লিখবো হিসাবগুলো সহজে বুঝতে ।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হার্টের সমস্যার কারণে । প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ । এরপরে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ক্যান্সারে । সকল ধরনের ক্যান্সারে প্রতি বছর মারা যায় ১০ মিলিয়নের মতো । তৃতীয় মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের সমস্যা । ফুসফুস রোগের কারণে বছরে প্রায় ৬ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় ।

চতুর্থ মৃত্যুর কারণটি খুব ইন্টারেস্টিং । অনেকে ভাবতেই পারবেন না । কারণ, হিসেবগুলো একজায়গায় না করলে এমন মজার জিনিসগুলো চোখে পড়ে না । চতুর্থ যে কারণে বছরে প্রায় তিন মিলিয়নের কাছাকাছি মানুষ মারা যায় তা হলো – Dementia । এটির মানে হলো – স্মৃতিভ্রংশ রোগ !

এর পরে পঞ্চম, ষষ্ট, সপ্তম এবং অষ্টমে আছে যথাক্রমে : পেটের সমস্যা, ডায়াবেটিস, লিভার এবং কিডনির রোগে । প্রতিটিতেই এক মিলিয়নের বেশি থেকে দুই মিলিয়নের বেশি মারা যায় ।

নবম মৃত্যুর কারণ – সড়ক দুর্ঘটনা । রোড একসিডেন্টে বছরে মারা যায় ১.২ মিলিয়নের মতো । দশম, একাদশে আছে : যক্ষা রোগে ১ মিলিয়নের মতো এবং তার পরেই এইডস রোগে মারা যায় এক মিলিয়নের চেয়ে কম প্রতি বছরে ।

বছরে ৮ লক্ষ মানুষ সুইসাইড করে পৃথিবীতে । সামাজিক বা কোনো কারণে বছরে ৬ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা হয় । প্রথমটা Suicide, পরেরটাকে বলে Homicide ।

বছরে তিন লক্ষ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, কিন্তু না খেয়ে পুষ্টির অভাবে মারা যায় আড়াই লক্ষ মানুষ । যদিও পুষ্টির অভাবজনিত মৃত্যুর হিসেবটি একটু গড়বড় আছে হয়তো ।

শুধু অত্যাধিক মদ খেয়ে মারা যায় দেড় লক্ষের উপরে । আবার ভুল কিংবা বেশি ওষুধ খেয়ে মারা যায় দেড় লক্ষের কম ।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো না কোনো যুদ্ধ লেগেই আছে । এইসব যুদ্ধে বছরে মারা যায় প্রায় এক লক্ষ পঁচিশ হাজারের মতো । অন্যদিকে আগুন লেগে বছরে মারা যায় এক লক্ষের বেশি মানুষ ।

আত্মহত্যা নয়, কিন্তু ভুল করে অথবা খাদ্যের বিষ ক্রিয়ায় বছরে সত্তর হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় । গরম কালে গরমে পুড়ে এবং শীতকালে শীতে জমে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিবছর মারা যায় ।

দ্বিতীয় সবচেয়ে কম মানুষ মারা যায় কিসে – জানেন ? উত্তরটি বলার আগে একটা সূত্র দেই যে, বছরে কোন খবরটি সবচেয়ে বেশি জুড়ে থাকে কাগজে ! উত্তর হলো – টেরোরিজম । ওর্য়াল্ড টেরোরিজম । পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন টেরোরিস্ট সংগঠনের কথা, বিশেষত এই শতকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পশ্চিমের অযথা বিদ্বেষ এবং বিষেদগার ভরা নিউজ অত্যাধিক থাকে । পানিতে ডুবেও যত মানুষ মারা যায় পৃথিবীতে প্রতি বছর, টেরোরিস্টদের হাতে মারা যায় তার দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র । প্রতিবছর যে কোনো ধরনের টেরোরিজমের কারণে মাত্র পঁচিশ হাজার মানুষ মারা যায় সারা পৃথিবীতে । অথচ লিড খবরের এক চতুর্থাংশ এই পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরী নিউজ হিসাবে থাকে টেরোরিস্টদের কর্মকান্ডের খবর !

সবচেয়ে কম মারা যায় কিসে ? ভাবুন তো মনে মনে । জানি, মাথায় আসবে না । সবচেয়ে কম মানুষ মারা যায় প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা : ঝড়, ভূমিকম্প, সাইক্লোন কিংবা বন্যার কারণে ! এসব কারণে মারা যায় মাত্র দশ হাজারের মতো বছরে ।

পৃথিবীতে এখন মানুষ আছে আট বিলিয়নের কাছাকাছি ।

বারো মাসে সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা যায় ৬৫ মিলিয়ন । জুলাই মাসের আজকে পর্যন্ত ২১৬ টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন – পাঁচ লক্ষের বেশি । হয়তো বাকি ছয় মাসে আরো পাঁচ লক্ষ মারা যেতে পারে । বারো মাসে করোনার কারণে মৃত্যু গিয়ে দাঁড়াবে দশ লক্ষ বা ১ মিলিয়ন মাত্র ।

৬৫ মিলিয়ন মৃত্যুকে স্বাভাবিক ধরে ১ মিলিয়ন মৃত্যুকে থামাতে ৮ বিলিয়ন মানুষের জীবন স্তব্দ হয়ে আছে ।

সূত্র

1. The Lancet : The Global Burden of Diseases Study
2. World in Data : Cause of Death by Hannah Ritchie & Max Roser
3. WHO – World Health Organization
4. Scientific American

মৃত্যুর গল্প, জন্মের মৃত্যু

মুগ্ধতা.কম

৬ জুন, ২০২০ , ৫:৫৮ অপরাহ্ণ

ক্রাউড ফান্ডিং বা গণতহবিল

ক্রাউড ফান্ডিং পাশ্চাত্য দুনিয়ায় একটি বহুল প্রচলিত অর্থায়ন পদ্ধতি। বাংলায় আমরা একে গণতহবিল বলতে পারি। এর মূল বিষয় হলো, যে কোন কাজে অনেক মানুষের কাছ থেকে ছোট ছোট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে বড় কাজ সম্পন্ন করা। মূলত ইন্টারেনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত হিসাব অনুসারে, এই পদ্ধতিতে ২০১৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল।

গণতহবিল সংগ্রহের ধারণা বহু পুরাতন। জানা যায়, ১৭৩০ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গণতহবিল গঠন করে তারল্য সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছিল! ১৮৮৫ সালে আমেরিকা সরকার স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভিত্তির ব্যয় সংস্থান করতে পারছিল না। তখন একটি সংবাদপত্রের আহ্বানে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অনুদান নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এভাবে যুগেযুগে ব্যবসা, অনুদান বা শিল্পের রক্ষার কাজে গণতহবিলের মাধ্যমে মানুষ এগিয়ে এসেছে।

গণতহবিল কোন ব্যবসার জন্য যেমন হতে পারে, তেমনি কোন জনকল্যাণমুখী কাজের জন্যও হতে পারে। ইদানিং গণতহবিলের আরেকটি ব্যবহার বেশ দেখা যাচ্ছে তা হলো, সৃজনশীল কোন কাজ যেমন শিল্প সাহিত্য বা চিত্রশিল্পের কোন কাজ প্রদর্শনের বিনিময়ে শিল্পীর পক্ষ থেকে তার জন্য সম্মানী সংগ্রহ করা।

এই মত অনুসারে, একজন শিল্পী তার মূল্যবান সময় ও মেধা ব্যয় করে একটি কাজ করেন। সেক্ষেত্রে সেই শিল্পের ভোক্তা সন্তুষ্ট হয়ে নিজের ইচ্ছেমত শিল্পীকে অর্থ দিয়ে সম্মানিত করতে পারেন। কারণ, সবাই জানে যে সৃজনশীল কাজগুলোতে শিল্পী বা উদ্যোক্তারা তাদের মেধা বা সময়ের মূল্য যথাযথভাবে পান না। অথচ দিনরাত খেটে যে শিল্পী একটি গান তৈরি করলেন, বা কবিতা লিখলেন তারও কিন্তু খেয়ে পরে বাঁচতে হয়, পরিবার চালাতে হয়। এই যুক্তি অনুসারে বাংলা ভাষাভাষী কিছু সিনেমা পরিচালক সিনেমা তৈরির কাজে গণতহবিল সংগ্রহ করেন। এমনকি কয়েকজন বাঙালি কবিও ইদানিং এই চর্চা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতহবিল নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার উদ্যোগ। সবার অংশগ্রহণে যে কাজ হয়, সেগুলোর প্রতি কাজের উদ্যোক্তা বা স্রষ্টার একটা দায়বোধ তৈরি হয়। সেইসাথে সম্পন্ন হয় একেকটি চমৎকার কাজও।

 

রেদওয়ান শুভ

নির্বাহী সম্পাদক
মুগ্ধতা.কম

 

ক্রাউড ফান্ডিং বা গণতহবিল 5