শাহেদুজ্জামান লিংকন

১ জুলাই, ২০২০ , ১১:০৬ অপরাহ্ণ

একজন চিকিৎসকের করোনামুক্তির অনুভূতি

ব্যাক ফ্রম করোনা…

১১ জুন রাতে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করে উঠলো। কপালে হাত ঠেকিয়ে দেখলাম তাপমাত্রা বাড়েনি। কিন্তু জ্বরজ্বর অনুভূত হচ্ছিল। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। এদিকে জেনে গেছি যে করোনাক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলাম। হার্টবিট বেড়ে গেল। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার কপালে হাত ঠেকিয়ে দেখছিলাম জ্বর আসছে কিনা। মাঝরাতে উঠে একটা প্যারাসিটামল খেলাম। তারপর চোখ বন্ধ করলাম।

ঘুম না আসলেও আমার চোখ বন্ধ করে থাকার অভ্যাস। অনেক সময় এমন হয় যে ঘুম আসছে না; কিন্তু টানা ৬-৭ ঘণ্টা চোখ বন্ধ করে আছি। এতেও কিছুটা বিশ্রাম হয়। যাইহোক অস্থিরতা কাজ করছিল। বুঝতে পারছিলাম আমার শরীর যুদ্ধ করছে। ভয় হচ্ছিল সকালে উঠে যদি দেখি অনেক জ্বর।

কী করবো? আমি একাই থাকি। এর মধ্যে নাকের ডান ছিদ্র দিয়ে দু’তিনবার একফোঁটা করে পানি আসলো। সকালে উঠে দেখি- কোনো জ্বর নেই। একদম স্বাভাবিক লাগছে। পরদিন রাতেও একই ঘটনা। জ্বরজ্বর লাগছিল। সকালে উঠে আবার স্বাভাবিক। সেইদিন ৬-৭ টা হাঁচি হলো। আগেও আমার খুব হাঁচি হতো; বিশেষ করে ধুলা-বালিতে (রংপুরে প্রায় প্রতিদিন এন্টিহিস্টামিন খেতে হতো। বরং ঢাকায় এসে সমস্যাটা নাই বললে চলে)। এরপর একটা এন্টিহিস্টামিন খেলাম। তারপর কয়েকদিন একদম ভালো। করোনাকে মনে মনে বললাম, আসতেই যদি হয়- এভাবেই এসো।

১৬ জুন পরীক্ষা করালাম। আমি মোটামুটি প্রস্তুত যে পজিটিভ আসবে। কলিগরা কয়েকজন জানতো। তারা বললো, আরে কিছু হবে না। নেগেটিভ আসবে। প্রস্তুত থাকলেও যখন মেসেজটা আসলো, তখন বুকটা ধুক্ করে উঠল। কলিগদের ছাড়া কাউকে জানাইনি। এমনকি বাড়িতেও না। একটাই উদ্দেশ্য- জানলে বাড়িতে আব্বা-আম্মা টেনশন করবে। এমনিতেই আমার পিতা কী করে জিজ্ঞাসা করলে- ‘চিন্তা করে’ উত্তরটাই মাথায় আসে। ফেইসবুকেও জানাইনি। বাড়ির কেউ ফেইসবুকে না থাকলেও কে না জানে ফেইসবুক থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব শূন্য কিলোমিটার। এছাড়া কোনো কোনো শুভাকাঙ্খীর উদ্বেগের বিষয় তো আছেই। মানসিকভাবে শক্ত ছিলাম। বরং কলিগরা সান্ত্বনা দিলেই একটু ভয় লাগত।

১৪ দিন কেটে গেল। একদম ভালো ছিলাম। বাড়তি কিছুই করিনি। কালোজিরার ভর্তা? আদা? মধু? গরম পানি? একটাও না। হ্যাঁ, কাঠালের বিচির ভর্তা খেয়েছি :)। আমার ফেভারিট। রং চা দুবেলা আগেও খেতাম। এক বন্ধু মধু খাওয়ার পরামর্শ দেয়ায় মধুবাবদ ৫০০ টাকা বিকাশে আদায় করেছি। আসলে আগে থেকে আপনার ইম্যুনিটি কেমন সেটাই বিবেচ্য। ওসব খেতে উৎসাহ বা বাধা কোনোটাই দিচ্ছি না।

আজ নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। স্বস্তির একটা খবর।

আমার অত্যন্ত কাছের এক ভাইয়ের ছেলে (আমার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র) এরমধ্যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এই বিষাদে এক সপ্তাহ থেকে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। কতো স্মৃতি মনে পড়ছে। এখনো মেনে নিতে পারছি না।

করোনায় ফিরে আসি। এতোসব বলার কারণ একটাই। মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। করোনার সংক্রমণ যে পর্যায়ে চলে গেছে তাতে আমাদের শুভঙ্করের ফাঁকিযুক্ত সতর্কতা এই ভাইরাসের দ্বৈরথে কুলিয়ে ওঠার মতো নয়। তবে সাবধানতা অবলম্বন তো করতেই হবে। আপনার যদি আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদী কিছু রোগ না থাকে, তাহলে অতোটা ভয় পাবেন  না। আপনি জিতবেন।
সবাই ভালো থাকুক।

শাহেদুজ্জামান লিংকন
চিকিৎসক ও লেখক
জন্ম: কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট

একজন চিকিৎসকের করোনামুক্তির অনুভূতি 5

মুগ্ধতা.কম

২৮ মার্চ, ২০২০ , ৫:১৮ অপরাহ্ণ

লক ডাউনের দিনগুলি

আমার ক্লাস পরীক্ষা শেষ। টানা কয়েকদিন পরীক্ষার পর শরীর ক্লান্ত।

ক্লাস চলছে। বসন্তকাল। প্রকৃতি সেজেছে অপরুপ সাজে।

পিকনিকের মওশুম চলে গেলেও অনেকেই এখনো পিকনিকে যাচ্ছে।

নবীন বরণ, নারী দিবস উৎসবের শেষ নাই। বলছিলাম রংপুর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কথা। আমি থাকি তারামন বিবি মহিলা হোস্টেলে।

সরকারি নির্দেশে কলেজ বন্ধ ১৮ মার্চ থেকে। হোস্টেল ছেড়ে বাড়িতে অলস সময় পার করছি। মন পড়ে থাকে রংপুরে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসে।

প্রিয় বন্ধুদের মুখ, রাত জেগে খুনসুটি। গিটারের টুংটাং শব্দ, রাত বারোটায় জন্মদিন পালন।

বন্ধুরা কেমন আছিস তোরা?

কেমন কাটছে তোদের এই লকডাউনের দিনরাত।

২৫ তারিখে হোস্টেল থেকে নির্দেশনা, আমাদের জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে হবে। আমাদের রুমটাকে সরকার কোয়ারান্টাইনের জন্য ব্যবহার করবে।

দেশের জন্য, অন্যের উপকার হবে এজন্য একদিনের নোটিশে এসে রুম খালি করে দেওয়ার জন্য কষ্ট করে এই লক ডাউনের দিনে উপস্থিত হলাম।

আমার মতো সবাই কষ্ট করে উপস্থিত হোস্টেলে রুম খালি করে দেবার জন্য। সারাদিন নীচতলা, উপরতলা করে রুম খালি করে দিলাম।

অবসন্ন শরীর, বন্ধুদের কাছ থেকে সাময়িক বিচ্ছেদ।

প্রিয় রুমমেট যারা আত্মীয় না হয়েও অন্তরে।

রুমটাকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। ছেড়ে যাচ্ছি রুমে ঝুলানো প্রিয় ছবি। মন পড়ে আছে দেওয়ালে লেখা হ্যাপি বার্থডে। বিষন্ন বিকেলে গান শোনার জন্য জানালার পাশের দুটো সাউন্ড বক্স। আবার কবে আসবো। আবার কবে তোদের সাথে দেখা হবে জানিনা।

ভালো থেকো প্রিয় রুম। ভালো থেকো রুমমেটরা। ভালো থেকো বন্ধুরা। ভালো থেকো জুনিয়ররা।

“ভালবাসার কথা গুলো নাইবা হলো মুখোমুখি ফোনে আজ গলা শুনে কাজ চালিয়ে নাওতো দেখি। বন্দি আমি বন্দি তুমি বন্দি থেকে রুখবো মোরা করোনা নামের বজ্রবলি। আতঙ্ক নয় সর্তক থাকি। ”

ভালো থেকো প্রিয় ক্যাম্পাস।

ভালো থেকো প্রিয় বাংলাদেশ।

 

শিরিন আক্তার প্রিয়া

সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, রংপুরের শিক্ষার্থী

মুক্তগদ্য: লক ডাউনের দিনগুলি

মুগ্ধতা.কম

২১ মার্চ, ২০২০ , ১:৩৯ অপরাহ্ণ

একটি অসাম্প্রদায়িক সড়ক দুর্ঘটনা এবং সঙ্গনিরোধ

গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ কিশোরগঞ্জ-তারাগঞ্জ সড়কে চলন্ত অবস্থায় স্লিপ খেয়ে নিজের বাইক উল্টে আমার ডান পায়ের উপরে পড়লো, মাথাটা পড়লো পাকা রাস্তায়।

হেলমেট থাকায় মাথা বেঁচে গেলেও ডান পায়ের হাঁটু এবং পাতা থেতলে গেল।

তো পা যখন গাড়ির নিচে তখন আমি মোটামুটি সঙ্গনিরোধে পড়ে গেলাম।

রাস্তায় শুয়ে আছি কোন গাড়ি থামে না, কেউ কেউ যেতে মন্তব্য ছুঁড়ে চলে যাচ্ছে ।

একজনের মন্তব্য শোনা গেল-হুজুরের এই অবস্থা! (মুখে দাড়ি থাকলে একটা তাচ্ছিল্যের টোনে হুজুর ডাকার প্রবণতা আছে)। দূরের ক্ষেতে কাজ করতে থাকা এক মহিলা তখন চিৎকার করে বলছে- মানুষটাকে কেউ বাঁচান, কেউ বাঁচান! এই সময়ে খেয়াল করে দেখি, এক তরুণ তার বাইক থামিয়ে পেছনের দিকে এসে আমাকে সাহায্য করতে লেগে গেল।

প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল পায়ে। মানুষের রক্তক্ষরণ আমার সহ্য হয় না।

ফলে রক্ত দেখে আমার বিমবিষা হয়ে গেল আর মাথা ঘুরতে থাকলো। সেই তরুণ তখন আমার অনুরোধমতে টিস্যু চাপা দিয়ে রুমাল দিয়ে পা বেঁধে দিলো। বাইকটা তুলে দিল।

পরে আবার ঘাসের মধ্যে শুয়ে পড়লাম। মাথার কাছ দিয়ে সাঁই সাঁই করে বাইক, অটো চলছে।

কাজেই আহত হয়ে পড়ে থাকাটা মনে হলো নিহত হবার পূর্ব প্রস্তুতি। তরুণকে বললাম আপনি এখন চলে যান ধন্যবাদ। সে যায় না। একা ফেলে যাবে না।

তার নাম জানলাম, পরিতোষ। চিৎকার করা সেই গ্রামীণ মহিলাও হিন্দু।

আর আমি হলাম দাড়িসমেত মুসলমান! এভাবে আমি একটি অসাম্প্রদায়িক সড়ক দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার হলাম।

বুঝলাম, মানুষের ভেতরটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখনো মানুষ।

পরে স্থানীয় বন্ধু গোলাম রব্বানীর সহায়তায় এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে ক্ষতস্থানে সেলাই-শুশ্রূষাদি সেরে বহু কষ্টে বাসায় পৌঁছেছি। এখন চিকিৎসকের পরামর্শ মতো সত্যিকারের সঙ্গনিরোধে আছি

[যেহেতু ইচ্ছা বা দরকার থাকলেও প্রচণ্ড ব্যথার চোটে নড়তে পারছি না]!

একটি অসাম্প্রদায়িক সড়ক দুর্ঘটনা এবং সঙ্গনিরোধ - মজনুর রহমান

মুগ্ধতা.কম

১৭ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩২ অপরাহ্ণ

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও বর্তমান করোনা পরিস্থিতি

টাইটানিক সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৭ সালে।

বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরন অসাধারণ পরিচালনা করেন পুরো সিনেমাটাই।

একাডেমিক অ্যাওয়ার্ডের ১৪ টি ক্যাটাগরির মধ্যে ১১ টাই লাভ করে এ মুভি। টাইটানিক সিনেমার শেষের খুব কাছের দৃশ্যে দেখা যায় জাহাজ ডুবছে। চারিদিকে আতংকের পরিবেশ। যে যেভাবে পারছে জীবন বাঁচানোর চেষ্টায়। শুধু দেখা গেল একদল মিউজিশিয়ান নিমগ্নভাবে করুণ সুর তুলে যাচ্ছে ইথারে। জাহাজের ক্যাপ্টেনও তার ডেকে দাঁড়িয়ে বিমর্ষমুখে।

এই ঘটনার প্যাচাল পাড়ার উদ্দেশ্য হলো আমাদের নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই ৭ ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মতো, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো। আমাদের এখন সময়, আমাদের নিজ-নিজ দায়িত্ব পালন করা। জ্বর হলে ঘরে থাকি। রোগ গোপন না করি।

সংবাদপত্রের সূত্রমতে ৯৪ হাজার লোক দেশে চলে এসেছে বিদেশ থেকে। তাদের মাঝে কেউ জ্বরাক্রান্ত হলে ঘরে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে।

জনবহুল এ দেশে যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢাকা কেন্দ্রিক, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন হাবুডুবু খাচ্ছে করোনায় সেখানে আমাদের কিছু নেতা বলছেন বটে আমরা প্রস্তুত।

আমরা অনুরোধ জানাই, এখন কথার কথা না বলে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

সবাই ঘরে থাকলেও চিকিৎসক হিসেবে আমাদের বাইরে থাকতেই হবে।

স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ১৮ মার্চ থেকে। স্কুল বন্ধ হলেই শিশুরা ঘরে থাকবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই। তারা শিশুসুলভ আচরণ করবেই। দৃষ্টি রাখতে হবে তাদের উপর। তাছাড়া শুধু স্কুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার দাবি যারা জানিয়েছিলেন তাদের কাউকেই কলকারখানা বন্ধ করার কথা বলতে শুনলাম না।

ঢাকা চট্টগ্রামের অসংখ্য কলখারখানার শ্রমিকেরা কী করে রক্ষা পাবে তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।

হুজুগে বাঙালি যখন যেটা নিয়ে থাকে তো থাকে।

আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই পরনির্ভরশীল সেটা আরও পরিস্কার হয়েছে পিঁয়াজ ইস্যুতে। ব্যবসায়ী ভাইয়েরা জিনিসপত্রের দাম যেন না বাড়াতে পারে সেজন্য শক্ত মনিটরিং করতে হবে। এরই মধ্যে মাস্কের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দুস্প্রাপ্য হয়ে গেছে। সামনের দুই সপ্তাহ আমাদের জন্য একটা এসিড টেষ্ট।

অনেককেই দেখলাম ফেসবুকে বলছে ঘরে থাকুন, কিন্তু এটা কি সম্ভব? আমাদের দেশের আশিভাগ লোক খেটে খাওয়া। যারা দিন আনে দিন খায়। অসুস্থ হলে তাদের কীভাবে চলবে এ বিষয়ে কেউ কিছু বলছে না।

যেহেতু করোনা ভাইরাসজনিত রোগ এবং মৃত্যুহার অনেক কম তাই আতংকিত হবার প্রয়োজন নেই। আবার ঢিলেঢালা ভাবে সবকিছু ছেড়ে দেবারও প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে বনের বাঘ না মনের বাঘই খায়। সাহস রাখুন মনে। সতর্ক থাকুন। ঘনঘন হাত ধুবেন। অসুস্থ ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলুন। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতে হবে। সর্বোপরি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতেই হবে।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ তিনি হয়তো একথাই বলতেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও বর্তমান করোনা পরিস্থিতি