মুগ্ধতা.কম

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

নারী এবং ভাষা আন্দোলন 

ফেব্রুয়ারি মাস- ভাষার মাস ৷ বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায়  আন্দোলনের মাস ৷ মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে কত কবি কবিতা রচনা করে বিখ্যাত হয়েছেন ৷ প্রবন্ধ লিখে নন্দিত হয়েছেন, পুরষ্কৃত হয়েছেন ৷ `মোদের গরব ,মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা ! তোমার কোলে তোমার বলে কতই শান্তি ভালোবাসা ৷’ ‘ আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা, ভায়ের বোনের আদর মাখা , মায়ের বুকের ভালোবাসা ৷ ‘ বাঙলায় কথা বলতে পারা, লিখতে পারি বলেই মধুর শব্দমালা কলমের খোঁচায় ,কাগজের পাতায় আটকাতে পেরেছি ৷ এও কি কম গৌরবের ! 

বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের ইতিহাসে ভাষার আন্দোলন শুধু এদেশেই হয়েছে ৷ আর কোনো দেশে মায়ের মুখের ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়নি ৷ একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন, উজ্জ্বল বাতিঘর ৷’ ৫২-র ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম স্ফূরণ ভাষা ও মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষার লড়াই ৷ ১৯৪৭ শেষের দিকে  করাচিতে একটি শিক্ষা সম্মেলন হয় ৷ ওই সম্মেলনে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে  উর্দূকে গ্রহণের সুপারিশ করা হয় ৷ এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ হয় ৷ 

মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সৃষ্টির পানি অনেক দূর গড়ালেও ভাষা আন্দোলনে নারীর অবদান বরাবব়ই খুব বড় করে লেখা হয় না ৷ নারীর অর্জন গৌণ, পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকায় থেকেছে সবসময় ৷ অথচ কবির ভাষায় ,” কোনোকালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারী , শক্তি দিয়েছে সাহস দিয়েছে বিজয়লক্ষী নারী৷” নারী সবসময় বিজয়িনীর ভূমিকায় ছিল এবং আছে যেমন তেভাগা থেকে ব্রিটিশ বিরোধী, ভাষা থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে গণজাগরণ মঞ্চ সবগুলোতেই নারীর  অংশগ্রহণ ছিল দুর্বার ৷  

মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ৷ মাতৃভাষা রক্ষায় আন্দোলন শুরু হয় ‘৪৮ সালে আর শেষ হয় ‘৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ৷ ‘৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয় ৷ পাক- ভারত বিভক্তির পরপরই মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে নারীদের জন্য সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা সহজসাধ্য বিষয় ছিল না ৷ কারণ প্রথমত, রক্ষনশীল সমাজ , নারীকে কোনঠাসা করে রাখার অপচেষ্টা দ্বিতীয়ত, নারী শিক্ষা ৷ 

তবে ভাষা আন্দোলন শুরুর প্রেক্ষাপট নারীকে এগিয়ে যাবার সাহস যোগায় ৷ ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ, শিক্ষায় নারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে ৷ নারীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে ছাত্রদের সহযোদ্ধা হিসাবে পাশে ছিলেন ৷ পাকিস্তান পুলিশের তাক করা বন্দুক নারীদের পিছপা করতে পারেনি ৷ মিছিলে আহতদের  সেবাদান , বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহে নারীরাই এগিয়ে, নিজেদের অলংকার বিক্রয়ের অর্থ সহায়তা ফান্ডে জমাদান করেন নারীরা,  শ্লোগান সম্বলিত পোস্টার নারীদের হাতেই লিখিত হয় , আহত ভাইদের নিজেদের কাছে রেখে চিকিৎসাসেবা নারীরাই প্রদান করে ৷ জীবনের মায়া , ঝুঁকির তোয়াক্কা করেনি নারীরা ৷ পরিনামে জেল খেটেছে, সংসার তছনছ হয়েছে ,শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন নারীরা ৷ দেশের বিভিন্ন জেলাসমূহ যেমন ঢাকা , রাজশাহী, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল , সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া , নারায়নগঞ্জ জেলার নারীরা একত্রিত হয়ে অসীম দৃঢ়তা ও সাহস নিয়ে এই আন্দোলনে একাত্নতা ঘোষণা করেন ৷ 

আন্দোলন শুরুর দিকে ৩১ শে জানুয়ারি ১৯৪৮  ঢাকার বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের পক্ষে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে ৷’ একজন ছাত্রীর এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা জাগাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে ৷ 

বাঙালি জাতির কৃষ্টি – সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয় ৷ সংগঠন প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির পর একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয় ৷ এটি ছিল সে সময়কার একটি সাহসী ও উদ্যমী পদক্ষেপ ৷ এই কর্মসুচী সে সময় বাংলা ভাষাভাষী ভাবধারার মানুষের মধ্যে আশার কুসুম প্রস্ফুটিত হয়েছিল ৷ 

নারীদের অনেকেই এর সদস্যভুক্ত হন ৷ তম্মধ্যে ভাষাসৈনিক প্রফেসর চেমন আরা এবং তার ছোট বোন মমতাজ ছিলেন সক্রিয় কর্মী ৷ পোস্টার, ব্যানার বানানোসহ বিভিন্ন কাজে তাঁরা বড়দের সহযোগিতা করতেন ৷ তমদ্দুন মজলিসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জেবুন্নিসা বেগম, দৌলতুন্নেছা বেগম , আনোয়ারা বেগম মজলিসে আসতেন এবং ভাষার দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা রাখতেন  ৷ 

বাংলা ভাষার দাবিতে একনিষ্ঠ এবং দুঃসাহসী কর্মীবাহিনী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওমেন হলের ছাত্রীরা ৷তাদের মধ্যে সুফিয়া খাতুন, সামসুননাহার , রওশন আরা বাচ্চু , সারা তৈফুর, কাজী আমিনা, মাহফিল আরা , খোরশেদী খানম , হালিমা খাতুন, রানু মুখার্জী, আফসারী খানম , সানজিদা খাতুন, সৈয়দা লুৎফুন্নেসা খাতুন, জোবেদা খাতুন, বেগম জাহানারা মতিন , রাবেয়া খাতুন, মিসেস কাজী মোতাহার হোসেন , সৈয়দা শাহরে বানু চৌধুরী , দৌলতুন্নেছা বেগম সহ আরো অনেক নাম না জানা নারী ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ৷ সে সময় ওমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সহসভাপতি ছিলেন ডঃ শাফিয়া খাতুন ৷ ১৯৫০ – ৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওমেন হল ইউনিয়নের জি এস এবং  পরে ভিপি নির্বাচিত হন ৷ তাঁদের সক্রিয় আন্দোলনে আজ আমরা আমাদের মায়ের মধুর ভাষায় কথা বলতে পারছি ৷ 

বেগম সুফিয়া কামাল ,নাদিরা চৌধুরী, নুরজাহান মুরশিদ , ডঃ শাফিয়া খাতুন মিছিলে নেতৃত্ব দেন। পুলিশি হামলার তোয়াক্কা না করে ২১ ফেব্রুয়ারির ঐ দিনে স্কুল কলেজ পড়ুয়া  মেয়েরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমতলায় সভায় যোগ দেয়ার জন্য পায়ে হেঁটে এসেছিলেন ৷ ছিলেন মিছিলের সম্মুখভাগে ৷ মিছিলে ব্যবহৃত পোস্টার , ব্যানার প্রস্তুতে মেয়েরাই দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেদিন ৷ এই আন্দোলনো ভাষাসৈনিক নারীরা অংশগ্রহণ করে প্রমাণ করেছেন নারী কেবল অন্ত:পুরবাসিনী বা ঘটনার অসহায় দর্শকমাত্র নন , আত্নমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রোহী হয়ে ওঠাও তার পক্ষে অসম্ভব কাজ নয় ৷ এই সময়ে নারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জীবন বাজী রেখে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন , পুলিশী নির্যাতন সহ্য করেছিলেন ৷ তাঁদের মধ্যে ড: হালিমা খাতুন, প্রতিভা মৎসুদ্দী, সুফিয়া আহম্মেদ, রওশন আরা বাচ্চু, রানী ভট্টাচার্য, সোফিয়া খানের ভুমিকা ছিল অন্যতম ৷ 

সে সময়কার সামাজিক প্রেক্ষাপট এত সহজ ছিল না ৷ নারী ছিল ভিন্ন গ্রহের মানুষ ৷ বহিরাঙ্গনে নারী পুরুষের একত্রে আলাপচারিতা অকল্পনীয় ৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের পশ্চাদ অনুসরণ করে শ্রেণিতে প্রবেশ এবং ক্লাস শেষে কমনরুম বন্দী অবস্থায় দিনশেষ করতে হতো ৷ সেই অবস্থান থেকে নারীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে মেয়েদের সংগঠিত করে ছেলেদের সম্মুখভাগে মিছিলের নেতৃত্বে আসা সত্যিই  দুঃসাহসিক ! 

ভাষা আন্দোলনের ফলাফল পেতে আমাদের অনেক ত্যাগ, অনেক রক্ত ঝরাতে হয়েছে ৷ রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে ৷ অনেক মা – বোন হারিয়েছে রক্তের ধন ৷ ভাষা আন্দোলন নারীদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে ৷ বাঙালি নারীদের আজকের অবস্থানে আসার পিছনে এই ভাষা আন্দোলন ৷ ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দায়িত্ব নিয়ে জানাতে হবে আমাদের৷ নারীর অবদান ইতিহাসবেত্তাদের উন্মোচন করতে হবে ৷ তাহলে আগামি প্রজন্ম জানবে তাদের স্বজাতি বোনদের গৌরব গাঁথা ইতিহাস ৷  নারীরা  উৎসাহিত হবে, উদ্দীপ্ত হবে সংগ্রামী উদ্দীপনায় ৷ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যেসব অসমসাহসী নারী যোদ্ধা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন সেসব ভাষাজয়িতাদের প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ৷ ২১ শে ফেব্রুয়ারি শোকের মাস, ভাষাশহীদদের চেতনায় দৃপ্ত হওয়ার মাস, সংগ্রামী সাহসে বলীয়ান হওয়ার মাস ৷ এই মাসে তাদের জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ৷ 

নারী এবং ভাষা আন্দোলন

মুগ্ধতা.কম

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

সেই ফাল্গুনের কথা 

ভাষা আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারী ভাইদের স্মরণে 

সেদিন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এর একঝাঁক মেধাবী তরুণ 

হঠাৎ করেই খালি পায়ে হাঁটা শুরু করে। 

কিছুটা পথ অগ্রসর হয়ে তারা স্থাপন করে 

কাগজ আর বাঁশের অস্থায়ী শহিদ মিনার।

হাতে থাকা ফুল দিয়ে তারা শ্রদ্ধা জানাতে থাকে সেথায়। 

যাদের সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ এই মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।

পুলিশের বাধায় বেশিক্ষণ টেকেনি সেই শহিদ মিনার। 

ঐতিহাসিক আমতলার সেই মধুময় ভাষণ 

হৃদয়ে প্রভাব ফেলে, জায়গা করে নেয়

 ছাত্র-জনতার মনে। 

সেদিন এই ছাত্র জনতা একশত চুয়াল্লিশ  ধারা ভেঙে তছনছ করে দেয়। 

অনেকে সেদিন শাহাদাত বরণ করেছিল

হাজারো ছাত্র-জনতাকে তারা 

এক এক করে জেলখানায় ঢুকাচ্ছিল। 

নাম ডাকতে ডাকতে ডেপুটি জেলার সাহেব বিরক্তির সুরে বলে উঠলো উহ্ এত ছেলের জায়গা দেবো কোথায়?

জেলখানা তো এমনিতেই পরিপূর্ণ। 

ওর কথা শুনে কবি রসুল সেদিন চিৎকার করে বলেছিল- 

জেলখানা আরো বাড়ান সাহেব।

 এত ছোট জেলখানায় কী করে 

এত জনের জায়গা হবে? 

আরেকজন বলে উঠলো, 

সামনে ফাগুনে আমরা দ্বিগুণ হব।

সেই ফাল্গুনের কথা

মুগ্ধতা.কম

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

বাংলা ভাষার জন্যে আমার মন আনচান করে

পড়তে গেলাম চায়নাতে

বাবা- মায়ের বায়নাতে

“চুং চাং চিং চু চা চি চি”

এই আগমন মিছেমিছি

পড়াশুনার পাট চুকিয়ে ফিরে এলাম দেশে

ভাষাই কারন বিষণ্ন মন জানায় অবশেষে।

সৌদি গেলাম পেটের দায়

ভাষার তোড়ে পরাণ যায়

“কাইফা হালু ইয়া আখি”

অবাক চোখে চেয়ে থাকি

মানে কী এর বুঝিনা ছাই ভাষারই মারপ্যাঁচে

ফিরে এলাম না হয় আমার ভিটেমাটি গেছে।

ভড়কে গেলাম জাপানে

ব্যস্ত ছিলাম চা পানে

(ফর্সা মেয়ে আমারে কয়)

“ওয়াতাশি ওয়া আনাতা”

মানে কি এর নেই জানা তা

দেইনি জবাব বুঝিনি তাই তাকিয়ে সে রয়

ভাষা ছাড়া কেমনে বলুন ভাবের প্রকাশ হয়!

ভাসিয়েছি কেঁদেই চোখ

ভাব প্রকাশের পাইনি লোক

দিন গিয়েছে বছর সমান

আমার এ মন দেয় সে প্রমান

হিন্দি বলুন! উর্দু বলুন! ভিনদেশিয় ভাষা

কারো মনে জাগাতে কী পারে কোন আশা!

কষ্টগুলো রেখেছিলাম বুকের মাঝে ধরে

বাংলা ভাষার জন্যে আমার মন আনচান করে।

বাংলা ভাষার জন্যে আমার মন আনচান করে
Comments Off
45 Views

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধা জানাই সেইসব বীর শহিদদের-যারা মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, জেল খেটেছেন কিংবা আহত হয়েছেন। আজকের দিনে আমাদের বিশেষ অনুরোধ, আসুন আমরা পারতপক্ষে জীবিত ভাষা-সৈনিকদের সাথে কথা বলি, তাঁদের সাক্ষাৎকার নিই, সবার সামনে তাঁদের কথা তুলে ধরি। কারণ, আর কিছুকাল পরেই অধিকাংশ ভাষা-সৈনিক আর বেঁচে থাকবেন না, তখন আমরা চাইলেও আর একজন ভাষা-বীরকে খুঁজে পাব না।

সবাই মাতৃভাষার প্রতি দরদী হোন, বানান ও উচ্চারণের যত্ন নিন-এই আহবান জানাই।

উপদেষ্টা সম্পাদক: ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মজনুর রহমান

নির্বাহী সম্পাদক: রেদওয়ানুল ইসলাম

সহযোগী সম্পাদক: আহমেদ অরণ্য

বিশেষ সংখ্যা সম্পাদক: মুস্তাফিজ রহমান

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

প্রাণের মাতৃভাষা

এক.

ধরি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি যদি বলতেন, পশ্চিম পাকিস্তানে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে, তারা কি মানতেন? এটা কি তাদের অস্তিত্বে আঘাত হতো না?

আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা চেয়েছিলেন বাঙালিদের অস্তিত্বে আঘাত করতে এবং আজীবন দাবিয়ে রাখতে। তারা ইতিহাস থেকে পাঠ নিয়েছে এবং  জেনেছে কিভাবে একটা জাতিকে দাবিয়ে রাখা যায়।তাই তারা ভাষা ও সংস্কৃতিতে আঘাত করতে তৎপর ছিল। তারা জেনেবুঝে সে কাজটি শুরু করেছিল। তাদের অন্য আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, তা হলো যে কোন মূল্যে উর্দুভাষাটাকে বাঙালীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে উর্দুভাষী সংখ্যাটাকে বিশ্বে বড় করে দেখাতে এবং সেই অনুযায়ী অন্য ভাষাভাষীদের প্রভাবিত করতে। 

দুই.

হাইস্কুল পড়ুয়া আমার ছেলে-মেয়ে ফটর-ফটর করে দু’চার লাইন হিন্দি ভাষার বাক্য অনায়াসেই বলতে পারে। কারণ তারা তাদের অবসর সময়ে বাসার এন্ড্রোয়েড ফোনে, টিভিতে, কম্পিউটারে হিন্দি ছবি, বিভিন্ন সিরিয়াল নাটক কিংবা নাচ-গানের চটকদারি বিভিন্ন শো দেখে থাকে। সেখান থেকে সুন্দর ডায়লগ শুনতে-শুনতে একটা আবেশি চার্জ কাজ করে ওদের ভেতর।

সোজা কথা, সেসব বিষয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। এই ঘোর থেকে তারা কখনও হিন্দিতে বিভিন্ন শব্দ বা বাক্য বলে থাকে। কিন্তু এই ভাষায় কী তারা তাদের মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারবে?

তিন.

১৯৯৬ সালে ঢাকায় ছিলাম। টিকে থাকতে সেখানকার স্থানীয় ভাষা কতকটা আত্মস্ত হয়েছিল। যখন আমার প্রাণের রংপুর শহরে, আমার নাড়িপোতা জায়গা হারাগাছে আসতাম, কী যে শান্তি পেতাম তা প্রকাশের নয়। শান্তিটা আমার হারাগাছি ভাষার জন্য, রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার জন্য। মায়ের এই ভাষা আহা, কী সুমধুর! মন ভরে যেত।

চার.

একটা অনিবার্য লড়াই-সংগ্রাম করতে রফিক শফিক জব্বার বরকতসহ আরও নাম না জানা অনেকে শহিদ হয়েছেন। আরও অনেকের রক্ত গেছে। আরও অনেকের অন্যান্য অনেককিছু ত্যাগ করতে হয়েছিল বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

ভাষার জন্য আর কোন রাষ্ট্রে এমন ঘটনা খুব কি আছে? 

এমন ইতিহাস হয়ত কিছু আছে, কোন কোন দেশের আছে। কিন্তু আমাদের মতো কি তারা ফুঁসে উঠেছিল? এতো রক্ত কি তাদের গেছে?

পাঁচ.

আমরা তাঁদের কখনও ভুলব না। ভুলব না। ভুলব না। কোন বাঙালীর তা ঠিক হবে না। রাষ্ট্রসহ আমাদের সবার উচিত হবে সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু করা, ব্যবহার করার।

শেষ করছি সেইসব ভাষা শহিদদের এবং যাঁদের রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষা আর সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা পেয়েছি, তাঁদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম এবং বিনম্র শ্রদ্ধা।

প্রাণের মাতৃভাষা

প্রমথ রায়

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

মাতৃভাষার প্রতি অনীহা এবং আমাদের স্মার্ট হওয়ার অপচেষ্টা

আমি কিছুদিন আগে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে এক  আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। সাথে ছিলো তাঁর সহধর্মিনী ও ৮/৯ বছরের কন্যা। মেয়েটিকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে ইংরেজিতে করতে হচ্ছে। সে একটি নৃত্য দিলো সেটাও আবার ইংরেজি গানের সাথে। সে ঢাকায় একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়ে। তাঁর সহধর্মিনীর কাছে যখন অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনুভূতি জানতে চাওয়া হলো, তখন তিনি অর্ধেক বাংলায় এবং অর্ধেক ইংরেজিতে অনুভূতি প্রকাশ করলেন। অথচ আইনজীবী প্রমিত বাংলা উচ্চারণে সাবলীল ও মাধুর্যতায় কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনা করলেন। এতে হয়তোবা তাঁদেরকেও দোষ দেওয়া যাবে না। তাঁদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে তাদেরকে হয়তোবা এভাবে অভ্যস্ত হতে হয়। আমার ধারণা আমাদের সমাজের অধিকাংশ উচ্চ শ্রেণির পরিবারগুলোতে এরকম চর্চা হয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দ বা শব্দমালা ব্যবহার করি। না করলে মনে হয়, হয়তোবা আমি উন্নতির অগ্রযাত্রায় এগুতে পারছি না। আমাদের সমাজে ইংরেজি পারাটাকে একটু অগ্রগামীই মনে করা হয়।

আমি নিজে ইংরেজি শিখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। এটা করতে গিয়ে আমাকে ইংরেজির চর্চা করতে হয়। শিক্ষার্থীরা যাতে ইংরেজিতে ভালো করে এ জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যাই।

অথচ আমি যখন গ্রামে থাকি, তখন ইংরেজিতো দূরের কথা প্রমিত বাংলাও ব্যবহার করি না। এতে আমার কোনো রকমের সমস্যা হয় না। অর্থাৎ প্রয়োজনে আমাদের ইংরেজি শিখতে হচ্ছে, কিন্তু কখনো কখনো আমরা সামাজিক অবস্থান বজায় রাখতে গিয়ে অপ্রয়োজনে ইংরেজি বলছি; যা নিশ্চয় কাম্য নয়।

এখন আমরা প্রত্যেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করছি। এসব করতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা ভিডিও বা ছবির সাথে হিন্দি গান ব্যবহার করছি। অথচ আমাদের বাংলাভাষায় রয়েছে অনেক সমৃদ্ধ গান। আমরা সকলে চঞ্চল চৌধুরী ও শাওনের কণ্ঠে গাওয়া ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ এবং হাওয়া চলচ্চিত্রের ‘তুমি বন্ধু কালা পাখি’ গান দুটির জনপ্রিয়তা জানি। তাই জনপ্রিয়তার জন্য আমাদের হিন্দি গানের আশ্রয় নিতে হবে এমন নয়।

ইংরেজি শেখা আমাদের দক্ষতা আবেগ নয়। আমরা অন্যসব বিষয় পড়াশুনা করে যেমন ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। ইংরেজিও ঠিক এরকম। কিন্তু বাংলা এরকম নয়। বাংলায় আমাদের আবেগ জড়িত। রয়েছে ভালোবাসার টান। বাংলায় আমরা যেমন মধুর করে কথা বলতে পারি, অন্যভাষায় তেমন সম্ভব নয়। সুন্দর করে বাংলা বলতে পারা শিল্প। কেউ যদি সুন্দর বাংলায় কথা বলে, আর যদি কেউ বুঝতে না পারে; আমার বিশ্বাস বাংলা স্বর শুনে সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাবে। ভালোমতো বাংলা একজন বাঙালি যতটা স্মার্ট হতে পারে, অন্যভাষায় তা সম্ভব নয়। তাইতো বলতে হয়, তোমার কথায় কথা বলি পাখির গানের মতো’। ফুল, পাখি, নদী, নৌকা সবই যেন বাঙালির প্রাণের ভাষায় কথা বলে।

মাতৃভাষার প্রতি অনীহা এবং আমাদের স্মার্ট হওয়ার অপচেষ্টা

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ভাষা আন্দোলন : প্রেক্ষিত বগুড়া

ভাষা আন্দোলন ছিল এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষা আর অন্যায় শোষনের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন ছিল গণদাবি। ভাষা আন্দোলনের একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আছে। আছে মায়ের ভাষায় কথা বলার মতো মৌলিক অধিকার রক্ষার তীব্রতা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও এর শুরুটা হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান। দুটি অংশের মাঝে ভৌগলিক দূরত্বের মতই প্রকট হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পার্থক্য।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ বইতে অল্প কথায় উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘…অর্থনৈতিক নিপীড়ন থেকে অনেক বড়ো নিপীড়ন হচ্ছে একটি জাতির ভাষা, সংস্কুতি আর ঐতিহ্যের ওপর নিপীড়ন, আর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ঠিক সেটিই শুরু করেছিল। পাকিস্তানের জ্নম হয়েছিল ১৯৪৭ সালে আর ঠিক ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণা করলেন উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তার প্রতিবাদ করে বিক্ষোভ শুরু করে দিল। আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার এবং আরো অনেকে। তারপরেও সেই আন্দোলনকে থামানো যায়নি, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়েছিল। যেখানে আমাদের ভাষাশহীদরা প্রাণ দিয়েছিলেন, সেখানে একন আমাদের প্রিয় শহীদ মিনার, আর ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখটি শুধু বাংলাদেশের জন্যে নয়, এখন সারা পৃথিবীর মানুষের জন্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’

মাতৃভাষাকে ঘিরে যে গণআন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালে তা শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি অঞ্চলে দেশব্যাপি এই আগুনের হল্কার চরম বিস্ফোরণ হয়েছিল রাজধানী ঢাকায়।

ভাষা আন্দোলনই সেই দুর্লভ পটভূমি যা বাঙালিদের এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ নানা রকমের বিভেদকে একপাশে সরিয়ে রেখে সেই মহান আন্দোলন গণমানুষকে দিয়েছিল সংহতি। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিল বাংলার মানুষ। ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে সমসাময়িক বগুড়া জেলায় যেসব তৎপরতা চলে সেসব ঘটনা জাতীয় সংহতিতে ভূমিকা রাখে। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মসচলতা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে শক্তি যোগায় দৃঢ়ভাবে। ভাষা আন্দোলনে বগুড়া জেলার মানুষের ভূমিকা সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল।

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত বগুড়া জেলা নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই এখন থেকে উত্তরাঞ্চলে রাজনৈতিক তৎপরতার বিস্তার ঘটানো সহজেই সম্ভব হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময়ে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষ এগিয়ে এসে শক্তিশালী করেছেন এই আন্দোলনকে। তাদের ডাকে সব শ্রেনীর মানুষ অংশ নিয়ে আন্দোলনকে প্রভাবশালী এবং প্রতিবাদমুখর করে তোলে। ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে বগুড়া জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির একটি ধারাবাহিক রূপরেখা তুলে ধরছি।

বগুড়া শহরে প্রথমবারের মতো প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধের প্রতিবাদ করতে হলে এই আন্দোলনকে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন, এটা বগুড়ার অগ্রগামী মানুষরা বুঝতে পেরেছিলেন। সেই সঙ্গে এই আন্দোলনে সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহনের উপযোগি করা এবং তাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার তাদিগটি তারা অনুভব করেছিলেন। গণমানুষের অংশ্রগহনই শুধু একটি আন্দোলনকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এটা বিশ্বাস করে তারা প্রথমবারের মতো একটি সভার আয়োজন করেন। বিশেষ করে গণ-পরিষদে খাজা নাজিম উদ্দিনের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক ভূমিকার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করা তখন ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই কবি ও অধ্যাপক আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে প্রথমবারের মতো একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয় ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সভা পরিচালনার জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় আযিযুল হক কলেজের প্রাঙ্গন।

১৯৪৮ সালেই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। আযিযুল হক কলেজ থেকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা ও সাহিত্য কর্মী মুহম্মদ আব্দুল মতীনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে সেখানে হামলা চালায় মুসলিম লীগের নেতা ও সমর্থকরা। মিছিলটি কলেজ থেকে বের হবার পরেই তারা হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। মিছিলটি সাতমাথায় এলে তারা দলবেঁধে হামলা চালায়। ফলে বেশ কয়েকজন আহত হয়।

ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। এদিন আযিযুল হক কলেজে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল প্রদেশব্যাপী (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ধর্মঘট পালন সফল করা। কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত সেই কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহন ছিল। গোলাম মজিউদ্দিনের বোন সালেহা খাতুন এবং ডা. মোজাফফর আহমেদের বোন রহিমা খাতুনের সেই কমিটিতে সম্পৃক্ততা ছিল। এদিন আযিযুল হক কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ে। এই মিছিলে প্রথম সারিতে ছিলেন ভাষাসৈনিক গাজিউল হক।

এই মিছিলকে ঘিরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ১১ মার্চ চাত্র-জনতার মিছিল বগুড়া আযিযুল হক কলেজ থেকে বের হয়ে শহরের দিকে যাবার সময় অধ্যক্ষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সামনে পড়ে যায়। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন আযিযুল হক কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তিনি সেসময় কলেজে আসছিলেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্ররা তাকে মিছিলের নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করলে তিনি তা গ্রহণ করেন। পরে মিছিল শেষে বগুড়া জিলা স্কুলের মাঠে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন এবং অসাধারণ এক বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বহুভাষাবিদ এই জ্ঞানতাপসের অংশগ্রহনে বগুড়ায় চলমান ভাষা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।

১৯৪৮ সালের ২৯ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে অবাঙালি জেলা প্রশাসক আবদুল মজিদের হঠকারিতায় এক প্রচণ্ড ছাত্রবিক্ষোভ হয়। ছাত্রনেতা গোলাম রহমান এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও শাহ আজীজপন্থী সরকার সমর্থক ছাত্রদল ব্যাপক বাধা দিতে থাকে। এদের আক্রমণে মারাত্মকভাবে আহত হন জননেতা মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের পুত্র এস,এম নুরুল আলম, গোলাম মোঃ মহিউদ্দিন, আবুল ফজল সিদ্দিকী ও নূর মোহাম্মদ খান।

১৯৪৮ সালের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে আরো যাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন আতিউর রহমান, অধ্যাপক গোলাম রসুল, মুহাম্মদ আব্দুল মতিন, অধ্যাপক আবুল খায়ের, অধ্যাপক পৃত্থিশ দত্ত, আতাউর রহমান, গাজিউল হক, গোলাম মহিউদ্দিন, জালাল উদ্দিন আকবর বুটু, নাজির হোসেন, সাত্তার, তরিকুল খান, নুরুল হোসেন মোল্লা, ইবনে মিজান, শ্যামাপদ সেন ও কবিরাজ মতিয়ার রহমান।

ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে আরো আছেন কবি রোস্তাম আলী কর্ণপুরী, মোশাররফ হোসেন মন্ডল, অ্যাড. হারুন-উর-রশিদ, কমরেড মোখলেসুর রহমান, আব্দুর রহিম সওদাগর মতিন, সাদেক আলী আহমদ, ডা. ননী গোপাল দেবদাস. এ.কে মুজিবুর রহমান, ডা. এনামুল হক, ডা. সি.এম ইদরিস, ডা. আজিজুল হক, আলী আহমদ ও দূর্গাদাস মুখার্জী।

১৯৯১ সালে কবি জিএম হারূন ‘স্মৃতিতে জল পড়ে টুপটাপ’ শিরোনামের একটি স্মৃতিকথার সংকলন সম্পাদনা করেন। ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করেন। স্মৃতিতে জল পড়ে টুপটাপ বইটি এখন দুর্লভ। তাই পাঠকের জন্যে সেখান থেকে ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের লেখার কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-

‘‘.. আজকে বগুড়ায় যে ক্যান্টনমেন্টটি স্থাপন করা হয়েছে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ’৫২র পর পরই। মুসলিম লীগের বুকে বগুড়াই প্রথম ছুরির আঘাত করে। যুক্তফ্রন্ট গড়বার প্রথম পরীক্ষা হয় বগুড়াতেই এবং তা বিপুল সাফল্য লাভ করে। সর্বদলীয় কর্মী শিবিরের প্রথম পদক্ষেপও বগুড়াতেই। অবশ্য ঐ সর্বদলীয় কর্মী শিবিরে যুবলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, বিড়ি শ্রমিক, আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক সমিতিকে নিয়েই সর্বদলীয় কর্মী শিবির গড়ে ওঠে। এর পরে ঢাকায়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে, মুসলিম লীগ বিরোধী সংগ্রমা বগুড়াই প্রথম সূচনা করেছে।

এইসব আন্দোলনের বাস্তব ভিত্তি রচনা করেছিলেন বগুড়ার বিড়ি শ্রমিক ভায়েরা। বগুড়ার বিড়ি শ্রমিক একটি দুর্ধর্ষ শাসকবিরোধী সংগঠন ছিল। আজ আমি এই স্মৃতি সাধনায় তাঁদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। শ্রদ্ধা জানাই মরহুম আকবর হোসেন আকন্দ, মরহুম আলিম মোখতার, মরহুম ডা. ইসহাক উদ্দিন, মরহুম সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, মরহুম নজিবর রহমান (দর্জী বিজ্ঞান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা), মরহুম সিরাজ উদ্দীন (আটাপাড়া), মরহুম সমির উদ্দীন মণ্ডল, মরহুম নসির উদ্দীন মণ্ডল, ডা. ননীগোপাল দেবদাস, ডা. আশুতোষ দত্ত, মরহুম ফজলার রহমান সরকার (ফুলবাড়ী), কবিরাজ আবদুল আজিজ ভীষগরতœ, সুবোধ লাহিড়ী, মরহুম আবদুল লতিফ সরকার, আবদুস শহীদ (বৃন্দাবনপাড়া), কবি আতাউর রহমান, মরহুম সৈয়দ কোব্বাদ হোসেন, শাহ আলম, জালাল উদ্দীন আকবর, গাজীউল হক, আবু মোহাম্মদ, মোজহারুল ইসলাম, প্রণব চৌধুরী, ইকবাল হোসেন, মশাররফ হোসেন মণ্ডল, মোখলেসুর রহমান, হারুনর রশীদ, শ্যামাপদ সেন, পিযূষ রায় এবং আরো অনেককে। এখানে মহিলাদের মধ্যে বিশেষভাবে আমি দু’জন মহিলার নাম উল্লেখ করছি- ১ম জন হলো মরহুম ইব্রাহিম মোখতার (খানবাহাদুর) সায়েবের কন্যা (আমি নাম ভুলে গেছি। যদিও তিনি আমার ক্লঅস ফ্রেণ্ডের মা) আর একজন ওকিমন বেওয়া। এদের সবার প্রতি আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।’’

ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের এই লেখায় ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অনেক মানুষের নাম উঠে এসেছে। উঠে এসেছে সেসময়ের দুর্বার আন্দোলেন অনেক খন্ডচিত্র। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে যে অপূর্ব কর্মসচলতা গড়ে ওঠে ১৯৪৯ সালে এসে সেই সচলতাকে বাধা দেবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে শাসকগোষ্ঠী।

এবছরের প্রথমদিকে আযিযুল হক কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা, বিড়ি শ্রমিক এবং সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা মিছিল করে নিয়মিত বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্কুল পড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীরাও। ১৭ এপ্রিল আযিযুল হক কলেজ থেকে একটি বড়ো আকারের বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করতে বের হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়। এর মূল কারণ ছিল, শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও ছাত্র বহিষ্কার। সেদিন বগুড়ার রাজপথ কাঁপিয়ে বিক্ষোভ মিছিল চলতে থাকলে দ্বিতীবারের মতো মুসলীম লীগ ও অবাঙালিার মিছিলের ওপর লাঠিসোটা হামলা চালায়। মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষক-ছাত্র-শ্রমিকসহ স্কুলের কিশোরীরা পর্যন্ত অত্যাচারের শিকার হন। মিছিলের নেতা আবদুস শহীদ ও ভিএম স্কুলের ছাত্রীনেত্রী সালেহা বেগমসহ কয়েকজন মিছিলকারী মারাত্মক আহত হন।

১৯৫০ সাল বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাবার পক্ষে খুবই দূরহ হয়ে ওঠে। শাসকগোষ্ঠীর দোসররা নানা ভাবে এই আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করে। আন্দোলন যাতে দানা বেধে উঠতে না পারে সে জন্যে তারা পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের ওপর। গ্রেফতার হন অসংখ্য ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। কঠোর দমন-পীড়নের ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মানুষদের সাথে সাধারণ জনগনের যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

১৯৫১ সালের মাঝামাঝি এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। কমিউনিস্ট পার্টি একটি ‘কন্ট্রাক্ট কমিটি’ তৈরি করে এর মাধ্যমে আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। এই কমিটির কাজ ছিল, আন্দোলনকে একটি সর্বদলীয় আন্দোলনের রূপ দেওয়া এবং একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা। এই কমিটির মাধ্যমেই জননেতা মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আন্দোলনকে গতিশীল করে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার থানা রোডে (বর্তমান কবি নজরুল ইসলাম সড়ক) ছাত্রনেতা আবদুস শহীদের পতিা আবদুল ওহাব ভলিফার ক্রিতল বাসার নিচতলার হলঘরে বিপুলসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধি সভায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ মজির উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি, কৃষক নেদা আবদুল আজীজ কবিরাজ ভিষকরতœ-কে সহ-সভাপতি এবং ছাত্রনেতা গোলাম মহিউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি, বগুড়া শাখা গঠন করা হয়।

কমিটির তালিকা উদ্ধৃত করছি। তালিকাটিতে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহনকারীদের ব্যাপকতা ও সংহতি আন্তরিকভাবে ফুটে উঠেছে।

সভাপতি: অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘নিশান’ পত্রিকার প্রবীণ সম্পাদক-সাংবাদিক, জননেতা (যিনি পরে যুক্তফ্রন্ট দলীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন) মজির উদ্দিন আহমেদ।

সম্পাদক: গোলাম মহিউদ্দিন।

অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন শেখ মহিউদ্দিন, শেখ হারুনুর রশীদ, ছমির উদ্দিন মণ্ডল, এ.কে মজিবুর রহমান (পরে এমপি হয়েছিলেন), কবিরাজ শেখ আবুদল আজিজ, সিরাজুল ইসলাম, আবদুস শহীদ, নুরুল হোসেন মোল্লা ( তৎকালীন বগুড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক), মোটরশ্রমিক নেতা সুবোধ লাহিড়ী, আবদুর রহিম সওদাগর মতিন, বিড়ি শ্রমিক নেতা শাহ আহমেদ হোসেন, রিকশা শ্রমিক নেতা মোখলেসুর রহমান, কৃষক নেতা ফজলুর রহমান, তমদ্দুন মজলিসের কবি-সাহিত্যিক খোন্দকার রোস্তম আলী কর্ণপুরি, লুৎফর রহমান সরকার (পরে গভর্নর হয়েছিলেন, তখন ছাত্রাবস্থা), কৃষক প্রজাপার্টির নেতা কবিরাজ মোফাজ্জল বারী।

এই কমিটি গঠন হবার পর পরই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন বেগবান হয়। ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এই কমিটির আহ্বানে জিলা স্কুল ময়দানে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনা জানামাত্র বগুড়ায় দিনব্যাপী হরতাল পালিত হয়। পরের দিনও হরতাল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন চলতে থাকে। সেদিন থেকে টানা ১৮ দিন বগুড়ার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হয়।

এরপর ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত বগুড়া ভাষা আন্দোলনের গতি উজ্জ্বলতর হয়ে উজ্জীবীত থেকেছে।

তথ্যসূত্র:

১.ভাষা আন্দোলনে বগুড়া (আজিজার রহমান তাজ সম্পাদিত)

২.মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল)

৩.স্মৃতিতে জল পড়ে টুপটাপ (জি এম হারূন সম্পাদিত)

৪.বাংলাপিডিয়া

৫.উইকিপিডিয়া-মুক্তবিশ্বকোষ

৬.বিভিন্ন ওয়েব ও ব্লগ সাইট

লেখক: ছড়াকার, সংবাদকর্মী, বগুড়া লেখক চক্র-এর সাধারণ সম্পাদক

ভাষা আন্দোলন প্রেক্ষিত বগুড়া - আমির খসরু সেলিম

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

প্রভাতফেরির গান

আজ সারাদিন সাম্যের উত্তেজনায় কেটেছে। আগামিকাল একুশে ফেব্রুয়ারি, সে জীবনে প্রথম ফুল দিতে যাবে শহিদ মিনারে। সাম্যর বয়স দশ। সে পড়ে বদরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। যদিও সে বদরগঞ্জে থাকে তবে এখন সে আছে রংপুর, তার নানাবাড়িতে। তখনও শহর ঠিক শহর হয়ে ওঠেনি। সময়টা ১৯৮৩। সাম্যর নানাবাড়িটা একতলা হাফ বিল্ডিং। উপরে খাড়া টিনের ছাদ। মামা খালারা সবাই সৌখিন আর সাহিত্য সমজদার। সেজো মামার বইয়ের ঘর ছিল হাতের ডানে। কালো কাঠের বুকসেলফে শুধু বই আর বই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই দরজার ওপরে সাজানো ছিলো কাটা হরিণের মাথা। তখনও বাড়িতে সাজিয়ে রাখা হতো হরিণের মাথা যতদিন না নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ছুটিতে নানাবাড়িতে এলে সারাদিন কাটে সাম্যর সেজো মামার বইঘরে। কত বই যে আছে! দস্যু বনহুর, কুয়াশা, তিন গোয়েন্দা, পড়ে শেষ করার জো নাই। ছুটি হলেই সাম্য বায়না ধরে নানাবাড়ি যাবার জন্য। এবার বইপড়ার চেয়েও মজার ঘটনা ঘটতে চলছে। মামাবাড়ি থেকে সবাই শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাবে। সাম্যর মামা মুক্তিযোদ্ধা রাকিব মামা এবার নিজ উদ্যোগে পারিবারিকভাবে ফুল দিতে যাবেন শহিদ মিনারে। কয়েকদিন ধরেই চলছে তার প্রস্তুতি। ছোট খালা, বন্যা পিসি, বাবু মামা সারাদিন হারমনিয়ামে গান প্রাকটিস করছে। প্রভাতফেরি কী? মামাকে জিজ্ঞেস করায় মামা বললো সূর্য ওঠার আগেই ফুল দিতে যাওয়াকে বলে প্রভাতফেরি। মামা বললেন, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য প্রাণ দিয়েছিল সালাম, রফিক, বরকত ছাড়াও নাম না জানা আরও অনেকে। পৃথিবীতে আর কোনও জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। সেই ভাষা শহিদদের স্মরনে রচনা করা হয়েছে এবং হচ্ছে কত গান, কবিতা। সেসবকে ছাপিয়ে সবচেয়ে পরিচিত গান, যে গানের সুর সবাই জানে। 

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি?

গানটি লিখেছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। মামা বলে জানিস, গাফফার চৌধুরী যখন গানটি লিখেন তখন তিনি নিজেও ছাত্র। সুর করেছেন আলতাফ মাহমুদ। গানের সুরটা শুনলেই কেমন কান্না পেত সাম্যর। আজ আরও বেশি করে কান্না পেল যখন সে শুনল, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী সেই সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যা করেছে। সন্ধ্যা হতেই নানির কাছে বায়না আমাকে ভাত দাও, আমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। সকালে প্রভাতফেরিতে যাব। সবাই সাম্যর কান্ড দেখে হাসে। মামার ঘরে ভাত খেয়ে শুয়ে থাকে সাম্য। ঘুম কি আর আসতে চায়। ছোট মামা বলেছে, ফুল চুরি হতে পারে। মামা বাগান করেছে বাড়ির সামনে। কত ধরনের ফুল সেখানে। গাঁদা, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, সূর্যমুখী। বিকালে নানা বড় একটা ঝাঁঝরি দিয়ে পানি দেয় গাছগুলোর গোড়ায়। ফুলে-ফুলে উড়ে বেড়ায় মৌমাছি। কসমসগুলো বড় দূর্বল, একটুতেই হেলে পরে বাতাসে। সেজো মামা খুঁটি দিয়ে গাছগুলোকে খাড়া করে দিয়েছে। বিকেলে বাগানে ঢুকলেই মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে লাগে। হাত দিয়ে কসমসের রঙিন পাপড়িগুলো নাড়তে কী যে ভালো লাগে! সেই ফুলগুলো যদি আজ চুরি হয়ে যায়। আজ দুষ্টু ছেলেরা ফুল চুরি করতে বের হবে। সেই ফুল নিয়ে যাবে শহিদ মিনারে। ঘুম আসতে চায় না, ফুলদের কথা ভেবে। এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো সাম্য! ঘুম ভাঙে নানীর ডাকে,এই সাম্য,এই সাম্য। কীরে যাবি না? ওঠ বাবা।সবাই তৈরী হয়ে বসে আছে। হুড়োহুড়ি করে তৈরী হয়ে বের হবার সময় মামা বললো, কীরে স্যান্ডেল পরে যাবি নাকি?

হ্যাঁ,স্যান্ডেল পরেই তো যাব। স্যান্ডেল ছাড়া আমাকে হাঁটতে দেখেছেন কখনও?

হা,হা, মা শোনও তোমার নাতি প্রভাতফেরিতে নাকি স্যান্ডেল পরে যাবে বলে মামা অট্টহাসিতে ফেটে পরে।

প্রভাতফেরিতে খালি পায়ে যেতে হয় রে বোকা।শহিদদের সম্মানে পায়ে জুতা পরা হয় না। চল,দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে মামা বের হয়ে আসে।

ফুল বাগান পার হয়ে গেট। আড় চোখে বাগান দেখলো সাম্য। নাহ্,কোনও ফুল চুরি হয়নি। গেটের বাইরে জটলা করা পাড়ার সবাই। শ্যামল কাকার গলায় হারমোনিয়াম, ছোট খালা রেডি গান গাওয়া শুরু করার জন্য। সুমিত স্টোর পার হয়ে, রঞ্জন এক্সরেকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলে প্রভাতফেরি। পথে আরও অনেক মিছিল। ছোট খালা,শ্যামল কাকার হারমনিয়ামের সাথে গান শুরু করে।ছোট্ট সাম্য আর সবার সাথে গলা মেলায়-

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারী

আমি কি ভুলিতে পারি।।

ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু

গড়ায়ে ফেব্রুয়ারী।।

আমার সোনার দেশের

রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী।’

প্রভাতফেরির গান

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

নিজের ভাষা মায়ের ভাষা

আচ্ছা ধরো, পাখির ছানা 

কিচিরমিচির ভুলে,

হুক্ কা হুয়া ডাক ধরলো 

সক্কলে প্রাণ খুলে।

নোটন নোটন পায়রাগুলি

মিঞাও সুরে-সুরে

খুনসুটি আর খুদ খুঁটছে 

উঠান ঘুরে-ঘুরে।

ব্যাঙ ডাকছে, হালুম হালুম 

ডোবায় খালে বিলে,

কাক করছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর 

প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক চিলে।

শিস বাজিয়ে দুষ্টু বিড়াল 

ছুটলো ভীষণ জোরে, 

মোরগগুলো ঘুম ভাঙালো

হা-ম-বা ডেকে ভোরে।

ঝিঁঝিপোকার একটানা ঝিঁ…

ডাকলে জোনাক পোকা,

আচ্ছা দাদু লাগবে কেমন?

—প্রশ্ন করে খোকা।

যার ডাক তার কণ্ঠে মধুর

এটাই তো তার ভাষা,

সে তার ভাষায় স্বপ্ন দেখে

মেটায় সকল আশা।

ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে

বিশ্বে কোথাও পাবি?

নিজের ভাষায় বলবো কথা

এমন ছিল দাবি।

জানিস খোকা রফিক শফিক

অকুতোভয় সেনা,

এই আমাদের বাংলাভাষা 

তাদের খুনে কেনা।

ভাষা মানেই মায়ের ভাষা 

যে যার ভাষায় বাঁচে, 

নিজের ভাষার চেয়ে মধুর 

আর কি কিছু আছে?

নিজের ভাষা মায়ের ভাষা

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

দেশ গান

একুশ হয়ে একাত্তুরে

স্বাধীন হলো দেশ

মুক্তি মাতাল বাঙালিরা

পেলো বাংলাদেশ।। 

মুক্ত হলো রুদ্ধ আকাশ

যুদ্ধ দিনের গান

খোলা বুকে খোলা হাওয়া

খোলা হৃদয় প্রাণ

এইটুকু সুখ পাওয়ার জন্য

মূল্যটা যে বেশ ।। 

হারিয়ে গেল হাজার প্রাণ

ছেলে হারা মা

ভাই হারা বোনেদের বুকে

কান্না থামে না

রক্তমূল্যে কেনা এ সুখ

তুলনা যে অশেষ।।

(২)

আধুনিক গান

একুশ আমার সেই চেতনা

বেঁচে থাকার প্রেরণা

একুশ আমার  মুক্ত আকাশ

ভালোবাসার ঠিকানা ।।

একুশ তুমি  মেঠো পথে

রাখালিয়া সুর

একুশ তুমি মায়ের  ভাষা

মধুর চেয়ে মধুর।

তাইতো তুমি এ হৃদয়ে

অনেক দিনের চেনা।।

একুশ তুমি মন লাটাইয়ে

বাঁধন হারা ঘুড়ি

তোমার জন্যই ওই আকাশে

মুক্ত ডানায় উড়ি

তুমি আমার সবটুকু সুখ

নেই তোমার তুলনা ।।

দেশ গান

সোহানুর রহমান শাহীন

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

বায়ান্ন’র একুশ

একুশ এলে বাংলা ভাষার

গান গেয়ে যাই প্রাণ খুলে

বন্দী বিবেক অতল আঁধার

ভাঙলো সিঁড়ি দীপ জ্বেলে।

একুশ এলে আলোকরেখা

তীব্র আলোয় সুখ ছড়ায়

মাটির সাথে মায়ের দেখা

রাতের তারায় চোখ বুলায়।

একুশ এলে পুষ্প মাল্যে

শহিদ মিনার শীর উঁচায়

প্রাণের ভাষা রক্ত মূল্যে

দিয়ে গেছেন নির্দিধায়।

একুশ এলে ছেলের খোঁজে

বীর শহিদের বৃদ্ধা মায়

অশ্রুসিক্ত নয়ন বুজে

কেঁদে কেঁদে মূর্ছা যায়।

বর্ণনায় বর্ণমালা

শীতল পরান জুড়িয়ে শেষে

ফাগুন মাসে একুশ আসে

বাংলা মায়ের দেশে।

রফিক বরকত লড়াই করে

গর্জে উঠে কন্ঠ ছাড়ে

বাংলা ভাষার তরে।

সালাম জব্বার স্বপ্ন ভরে

বর্ণমালার মিছিল করে

চলে গেছেন দূরে।

কলুষ মুক্ত নীল আকাশে

আজো তাদের ছবি ভাসে

ভাষার ইতিহাসে।

বায়ান্ন'র একুশ

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

অমর একুশ

শহিদ রফিক সালাম নাও আজ

যে আশাতে তুললে আওয়াজ

গগনবিদারী

ফের এসেছে দিবস তা-রি ,

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি।

ক্ষয় হয়েছে ভাষার শোকের ?

যার দাবিতে ‘ধবল’ লোকের

ধার না ধারী ?

সেই কি দিবস ভুলতে পারি ?

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি ।।

শুকিয়ে যাওয়া পলাশ-মালা

যার ছোঁয়াতে ভাংলো ‘কালা-

কানুন’ জারী,

সেই কি দিবস ভুলতে পারি ?

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি ।।

যার ছোঁয়াতে ক্ষোভ দানাদার

শেষে যে বধ পাক-হানাদার

অত্যাচারী,

সেই কি দিবস ভুলতে পারি ?

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি ।।

শিশির কণা শেখালো যার

কোনোক্রমে আমরা তো হার 

মানতে না’রি ,

সেই কি দিবস ভুলতে পারি ?

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি ।।

খেলো যে দিন প্রথম হোঁচট

যার দাবিতে যুগল যে ঠোঁট

এই আমারি,

ফের এসেছে দিবস তা-রি

অমর একুশ ফেব্রুয়ারি ।।

অমর একুশ

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

বসন্ত এবং একুশ

আজ ঘরে ফিরতে মন চায় না, শুধু প্রতিধ্বনি হয় সেই মাথামুহুরীর কুলকুল। নূপুরের রুনুঝুনুতে ভেসে আসা সেই শুকনো পাতার দল। কাঠচোরদের মন খারাপ—স্রোতে ভাসে না আর সেই বাশ ঘাস কাঠের ভেলা। অথচ ভাপা পিঠার হাড়িতে আজও ধোয়া। সেই পিঠাওয়ালা, সেই ভাপার বাটি, সেই ন্যাকড়া,  বসে থাকা বেঞ্চ সব কিছু ঠিকঠাক— শুধু তুমি নেই। ভেতর ভেতর কি যেন ছুটে চলা। তুমি কই?  তুমি কই? ছটপট ছুটে আসা এই সেই কোকিলকূজিত বন। তোমার হাতে লাগানো সেই বাড়ির সেই টব কত ফুলরাশি—যদি থাকতে গুজিয়া দিতাম সেই বাসন্তীর খোঁপায়। তোমরা সকলে ভালো থেকো— বসন্তের সেই শিমুল ফুল কলাগাছের সতরে গাঁথা  সেই টায়ারের ছুটে চলা—সেই নোলক নোলক খেলা।  মনটা ভীষণ খারাপ—সেই দিন নাসিমাদের বাগানে ফুল ছিলো না বলে— কাগজের ফুলে ফুলেল শুভেচ্ছা। সবকিছু ধুয়ে মুছে তুমি ফিরে এসো আমার সেই বাসন্তী। তোমার বুকের তরতাজা সেই ফুল শীতশীত ঘাসে জুতো ছাড়া হেটে যাওয়া একুশের বুকে ফুল দেয়া— আমার সেই বাংলা ভাষা—আমি তোমাকে ভালবাসি। ‘মা মাটি ও দেশ’। ভালো থেকো। সেই আমার বসন্ত—মনের ভেতর এক কুহূ কুহূ ডাকা।

বসন্ত এবং একুশ

শিস খন্দকার

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

ক্ষমা করো হে একুশ

. .. ‘তুমি রোজ যে ভাষায় প্রেম নিবেদন করো আমায়

    এই কর্পোরেট জীবনে প্রযুক্তির ছড়াছড়িতেও

    প্রতি বৃহস্পতিবার পুষ্প পাপড়ি সমেত পত্র লিখ

    লাল কাগজে যে ভাষায়

    সেই ভাষার জন্য একটি কবিতা লিখবে সেই ভাষায়।’

গত বিকেলে এই আবদার করে বসে

এক একুশ বছর বয়সী বাঙালি নারী।

ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে কণ্ঠে ঝড় তুলে,

—‘যদি না পাই তবে আজীবন আড়ি!’

মন পৃষ্ঠায় নিভৃতে একা কবিতা সাজাই—

আমি ভাবি, স্মৃতিরা ভেবে যায়—

চোখ বুজে আওড়াই পাঠ্যজ্ঞানজাত ইতিহাস—

বায়ান্ন এর বায়ান্নতম দিবসের সেই প্রহর

সালাম-রফিক-বরকত-জব্বার

কবিতার কম্পিত কলামে হাতে-হাতে প্ল্যাকার্ড ধরাই

প্রতি লাইনজুড়ে লাল কালিতে লিখে যাই,

—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’

রাস্তার পাশে জীর্ণ দেয়ালে হিন্দি সিনেমার পোস্টার।

মুহূর্তের ভাবনা চকিতে থমকে যায়!

কৃতজ্ঞতা—

               একুশ-বায়ান্ন

               সালাম-রফিক-বরকত-জব্বার

               বাঙালি-বাংলা

               স্বর্ণোজ্জ্বল অমর ইতিহাস।

অতঃপর আমি সব—সব ভুলে যাই।

ক্ষমা করো হে একুশ বছর বয়সী নারী

একুশের প্রতি প্রতারণা আমি কীরূপে পারি!

আমার সব কবিতা উচ্ছন্নে যাক

যতদিন না থামবে পরদেশি ভাষার উৎপাত।

ক্ষমা করো হে একুশ

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

মুগ্ধতা.কম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

একাত্তর

দেখিনি আমি ৭১ এর 

শত্রুদের পাশবিক অত্যাচার 

শুনিনি আমি বুকফাটা কান্না

শত শত মানুষের আর্তনাদ আহাজার।

কত না নির্মম পাকহানাদার বাহিনী

কেপে ওঠে মন আমার 

শুনে একাত্তরের কাহিনী।

মায়ের বুক থেকে, বাছারে নিয়ে কেড়ে

মারছে তারে পায়ে পিষ্ট করে।

শোনেনি তারা মায়ের আর্তনাদ

পাছে তারও করেছে সর্বনাশ।

সম্ভ্রম খানি নিয়েছে তারা কেড়ে

বাঁচতে পারেনি সেও, লাঞ্চিত হয়ে বাড়ি ফিরে।

মা হারিয়েছে বুকের মানিক

বোন হারিয়েছে ভাই

আত্মিয় স্বজন হারিয়ে

দুঃখের সীমা নাই।

ভেঙ্গে দিয়েছে, গুড়িয়ে দিয়েছে

জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ি

প্রাণে মেরেছে, লুট করেছে

জান-মাল, ইজ্জত টাকা-কড়ি।

দেশ মাতার সোনার ছেলেরা 

শক্ত করে তাঁদের মন, করেছে পণ

স্বাধীনতা আনতে ছিনিয়ে

করবে জীবন দান

তবুও রাখবে তাঁরা, মাত্রিভাষার মান।

বাংলা মায়ের সোনার ছেলেরা যুদ্ধে গেল

মুক্তি সেনার বেশে

স্বাধীনতা আনলে ছিনিয়ে

নয় মাস যুদ্ধের শেষে।

এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে 

মা- আছে পথ চেয়ে

পাবে এবার প্রিয় মুখের দেখা

গগণ ভেদে উড়ছে দেখে,

স্বাধীন বাংলার পতাকা।

স্বাধীনতা অর্জীতে কত ক্ষতি সয়েছে, 

কত জীবন করেছে দান

বুঝেছিল তারা মাত্রীভাষার দাম।

এবার-

স্বাধীনতা রক্ষায় যেন হয় মনজোড় সংগ্রাম।

একাত্তর

হাই হাফিজ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

হৃদয়ে বাংলা ভাষা

নদীর বয়ে চলা ভাঙ্গাগড়া পথে
চেয়ে থেকে থেকে বেলা পড়ে আসে,
জানা হয় না কোথায় গন্তব্য তার,
কিংবা সারাবেলা গোপন মিতালী কার সাথে।
কানে কানে বলে দেয় নদী —
আমার মনের যত ভাব, যত কথা
আজস্ম যাই বলে যাই
বাংলায় নিরবধি।

পাখির কাকলি আর সুমধুর সুরে,
ভুলে যাই সব ব্যথা গ্লানি অবসাদ,
কী যে মোহ! কতো সুধা! জানা হয়নি আজো।
প্রশ্নবিদ্ধ হই বার বার, শুধু ভাবি!
গানে গানে বলে বলে দেয় পাখি —
আমার কন্ঠের এ গান সে তো সুর নয়,
যেন বাংলা ভাষায় ডাকাডাকি।

বৃষ্টির ঝরঝর ধারা ঝরে অবিরাম,
ছন্দের তালে তালে একটানা সুর বাজে,
ফোঁটা ফোঁটা শব্দের গভীরতা সীমাহীন,
কী কথা লুকিয়ে আছে তাতে?
যায় না বোঝা কোনমতে।
বৃষ্টি জানায় গর্বভরে–
আমি তো বাংলা ভাষা-ই শুধু জানি,
এ ভাষাতে পথ চলি, যাই গান করে।

পাহাড় সাগর করে ভাব বিনিময়,
মেঘ ডাকে, বায়ু বয়ে যায় বাধাহীন,
রাতেরা কথার পসরা সাজায় থরে থরে,
নিশি জাগে চাঁদ, রাত শেষে ভোর হাসে,
ফুলে ফুলে সোনালী সূর্য ডানা মেলে!
নিসর্গ মেতে ওঠে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে।
বাংলা ভাষার স্নিগ্ধতা
নীলাকাশে,
রাজপথে,
ঘাসে ঘাসে।

হৃদয়ে বাংলা ভাষা

আবু হানিফ জাকারিয়া

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

ভাষার আর্তনাদ 

ভাষা শহিদেরা ওপার থেকে করছে আর্তনাদ।

হাহুতাশ করে জীবিত ভাষা সৈনিক যারা

জীবন দিয়ে আর লড়াই করে আনল যে ভাষা।

সে ভাষার আজ কি যে করুণ দশা।

লৌকিক ভাষাপ্রেমী সুশীলদের নেই অপবাদ।

গুমরে কাঁদে আজ বেদনার্ত আত্মা 

বেহাল মাতৃভাষা করে আর্তনাদ 

লোকদেখানো ভাষাপ্রেম দেখে।

বর্ণমালা খঁচিত  শাড়ি -পাঞ্জাবি,

একুশের প্রথম প্রহরে শহিদ মিনারে ফুল দেয়া,

নাঙা পায়ে প্রভাতফেরি, দিনব্যাপী ভাষার গান,

দেশের গান, সবকিছুই কি মনের টানে?

নাকি সব লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা?

মাতৃভাষার নেই সম্মান, শুধুই অবমাননা।

ইংরেজি ভাষায় দারুণ দখল, 

হিন্দি গানেও  দক্ষতা সমান,

পোশাক আশাকে সাহেবি ঢং

তারো আবার হাজারো রঙ।

সাদাকালোতে বাঙালি সাজার কি আপ্রাণ চেষ্টা।

একদিনের বাঙালি সেজে একি নয় প্রতারণা?

ভাষার আর্তনাদ

মুগ্ধতা.কম

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

মধুময় মাতৃভাষা

মুগ্ধতা.কম

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

একুশ তুমি

একুশ তুমি প্রতিটি বাঙালির অহংকার

তোমার তরে তাজা তাজা প্রাণ অকাতরে

ঝরে ফেললেও,  আদায় করে নিয়েছ,

বাংলা মায়ের আদরমাখা মাতৃভাষার।

বাংলার একুশ আজ নয় শুধু আমার, আপনার

শত বঞ্চনা, গঞ্জনার আহাজারির নিপাত ঘটিয়ে

দেশে-বিদেশে শত কোটি বাঙালির আত্মায়,

শিকড় গজিয়েছ ভালবাসায় বাংলা ভাষার।

মাগো, পাকিস্তানি পিশাচেরা কেড়ে নিতে চেয়েছিল

তোমার আচঁলমাখা মুখের ভাষা, প্রানের ভাষা

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে দামাল ছেলেদের

অগ্নিঝরা রক্তিম সূর্যের ত্যাজ, তাদের উচিৎ শিক্ষা দিলো।

রক্তের অগ্নিশিখায় অন্তর পুড়ে পুড়ে

বাংলা মায়ের নব উত্থানে জাগ্রত সন্তানেরা

মাতৃভাষাকে  বুকের মধ্যে আগলে রেখে,

রক্তে রাঙা হাত নিয়ে উজ্জীবিত করেছে

একুশের বাংলাকে, মাথা উঁচু দাঁড় করিয়েছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশ্ব মায়ের দরবারে।

একুশ তুমি

মুগ্ধতা.কম

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ , ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

বাংলা বর্ণমালা ও বায়ান্নের একুশ

বায়ান্নের একুশ বাংলা ভাষার বর্ণের রূপকার,

ভাষা শহিদের রক্তে জন্য,পেলাম বর্ণমালা উপহার।

একুশ মোদের মায়ের ভাষা জ্ঞানের দীপ্ত বাতি

বাংলা  ভাষায় কথা বলে আজ বাঙালি জাতি।

একুশ মোদের ফাগুন মাসের নানান রঙের ফুল-

সালাম রফিক বরকত জব্বারের রক্ত মাখা চুল।

একুশ শুধু নয় বাঙালির, বিশ্ব মাতৃভাষার চেতনা-

মাতৃভাষার স্বীকৃত দিবস, বিশ্ববাসীর প্রণোদনা।

স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের পঞ্চাশ বর্ণের বাংলা বর্ণমালা-

ভিনদেশি মায়ের ভাষা, যায় না মন খুলে সব বলা।

বর্ণবর্ণে যোগসূত্রে বাংলা মায়ের ভাষা-

ছিলাম যেন মূর্খ বাঙালি দিনমজুর আর চাষা।

অ-আ-ক-খ, যত বাংলা স্বর-ব্যঞ্জনবর্ণ-

শহিদ মিনার স্মৃতিস্তম্ভ ভাষা শহিদের জন্য।

মূর্খ-মজুর যত পণ্ডিত  ভাষার জন্য যাদের অবদান-

তাই এই বাংলার সবখানে এখন বাংলা মায়ের জয় গান।

সাত সকালে প্রভাতফেরি, যায় মিলে সব দলে দলে-

শহিদ মিনার ভরপুর হয় যায়, ফাল্গুনের ফুলে ফুলে।

একুশ মোদের ভাষার বিজয় স্বাধীনতার সূত্রপাত-

বায়ান্ন, একাত্তরে ঐ পাকিরা হয়েছে  কুপকাত।

বাংলার বর্ণমালা মাতৃবর্ণ স্বীকৃত রাষ্টভাষা-

বায়ান্নের একুশ বিশ্বমাতৃভাষা দিবস-

মোরা এখন শিক্ষিত চাষা!

বাংলা বর্ণমালা ও বায়ান্নের একুশ