শিল্প ও সাহিত্য

শিল্প ও সাহিত্য

সোহানুর রহমান শাহীন

১০ জানুয়ারি, ২০২২ , ৯:০১ পূর্বাহ্ণ

সোহানুর রহমান শাহীন এর একগুচ্ছ কবিতা

‘র’ এর গল্প

তার সাথে আর কথা হয় কার, যার
কথা ভেবে বারবার কাঁধে উঠে ভার
ভাবনায় যতবার সে ছিল আমার
তার চেয়ে বেশি তার সাজের বাহার
সাঁঝের বেলায় অবেলার সাথী তার
কাছে সঙ্গী হয়ে আসে পেলে অবসর,
আমি তার ভুলের ভেজানো দরজার
ওপারে পড়ে থাকি কিছুটা অগোচর।

ফিরবার যার নেই আর তাড়াতাড়ি
তার সাথে কেন খায়ালের বাড়াবাড়ি
সে এখন যার থাক ভেসে তার, হার
জিতের জীবন হোক তুচ্ছ আহামরি।

আমি আর তার প্রেম না হবার জ্বর
নিয়ে অবসর খুঁজবার আশা ছাড়ি
প্ররোচনার কবল থেকে পেছনের
সময়ের কথা ভুলে ফিরে যাই বাড়ি।

ঘুম

জলরাত্রির ঘুম ফুরিয়ে এলে আবার অবাঞ্চিত হব
সবরাত্রি পড়ে থাক নদীরবাঁক ফিরে আসা ঢেউয়ে
সাঁতার কাটতে থাকা রমণীর ভেজা আঁচল ঘিরে,
ধীরে ধীরে কামুক বীরে, নামুক নীড়ে খেলাচ্ছলে।

কতো জলের উগ্রতা নিম্ন-তা জানে বিরস মৌনতা
শূন্যতা ভরে কী আজো, সাজো বেহাতের সজনী
দিবস রজনী ভাবো কাম খেয়ালে, নিষিদ্ধ দেয়ালে
ফিরে ফিরে চাও, যা ছিল সঞ্চয় খোয়ালে সকালে।

বিকলে পড়ে থাক! থাক, পড়ে থাক নপুংসক শিশ্ন
জলরাত্রির ঘুম ফুরিয়ে এলে আবার অবাঞ্চিত হব।

শিরোনামহীন পঙক্তি

দূষিত জলের কাছে শুদ্ধতা চেয়ে
একবার জলে নামতে চেয়েছিলাম

বন্দি জলের উঁচুপাড়ে দাঁড়িয়ে যখন
ভাবছিলাম তার গভীরতা নিয়ে,
তখন জল বলেছিল—
ঝড়ের তান্ডব আর ভয়াবহ কম্পনের
ক্ষতে যে গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে
তার পরিমাপ হয় না।

নিঃসীম জলের বুকে নেই কুলের প্রকাশ।

নৈশব্দে ঘিরে থাকা সে জল—
পরিশুদ্ধ করে শ্মশানপ্রিয় শবদেহ।

শিরোনামহীন বসন্তের সুবোধ

চুমুর দাগে যেখানে গর্ভবতী হয়
ক্ষুধার্ত কুটুম, সেখান থেকে ভেসে আসে
পরনিন্দার বর্ণনায় শামুকের গান!
মানপতনের সনাক্তপত্র হাতে রেখে
বন্দনাবাক্য সাজায়—
বৃত্তাকার আশ্রমের পোড়াঘরে।

আহা, মরা মাছিদের মহাসম্রাট,
বহুকালের অভ্যাসের দাসত্বে দাম্ভিক!

চেনা মানুষের শহর,
মনুষ্যত্ব বিকানো খোলস ভেঙে
নক্ষত্রের জ্বলজ্বলে আলোয়
পরিশুদ্ধ হও, ফিরতি পথে।

নামকাটা করাত

বড় নামের বড়ো মানুষগুলো আজকাল
নাম ছেঁটেছুটে ছোট হয়।
হাঁকডাকহীন বড়ো নাম অচল প্রায়!
কে ফেরাবে তাদের রুক্ষ প্রলেপ থেকে,
নামসর্বস্ব মানুষের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
ঘাটতে ঘাটতে সীমানা অতিক্রম করা হয় না।
মাঝপথে নিজের বড়ো নামের অক্ষরগুলো
আষ্টেপৃষ্টে জড়ায় নিজেকে।
বাধা দেয়—
বাঁধহীন বড়ো নাম কেটেফেলার করাত।
ছোট ছোট নামে মানুষের ভীত থেকে
ফিরে এসে ভুলে যেতে চায়, পোশাকী পরিচয়।

পলাতক ঋতুর যোজন

চিহ্নহীন অস্থিরতার পরবাস থেকে উঠে এসে
ঝিমধরা শেষ ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরবো ভাবছি;
নিকানো উঠোন বিকানো বিবেক ঝুলে রেখে
আপদামস্তক ফিরে আসি কাপালিক আশ্রমে।

সোহানুর রহমান শাহীন এর একগুচ্ছ কবিতা

রবীন জাকারিয়া

৭ জানুয়ারি, ২০২২ , ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

বাবার প্রতিচ্ছায়া-গল্প

করোনার থাবায়৷ হঠাৎ করে সারা বিশ্ব যেন থমকে দাঁড়িয়েছে৷ চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল৷ লক ডাইন৷ শাট ডাউন৷ প্রথম পর্যায়েতো বলা যায় কার্ফ্যু জারির মত অবস্থা৷ রাস্তা ঘাট৷ দোকান পাট৷ হাট বাজার৷ রিকসা, ভ্যান, বাস, ট্রেনসহ যোগাযোগের সবই প্রায় বন্ধ৷ এক অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে নিস্তব্দ চারিদিক৷ ক’দিন আগে যে ব্যক্তিটা বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেকে বস্তবাদী-ইহলৌকিক দর্শনবাদী হিসেবে জাহির করতো৷ আজ সেই ব্যক্তিই সুন্নতি দাড়ি-পোষাক পরে নিজেকে ইসলামী দর্শনের অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে প্রকাশ করছে৷ সন্দেহ আছে যে করোনা নির্মূলের অষুধ বের হবার পরও এ অবস্থানে থাকবে কি-না!

বিশ্ব জুড়ে করোনার করাল থাবায় মরছে মানুষ৷ কী করুণ মৃত্যু! শেষ কৃত্যে পাশে থাকছে না প্রিয় স্বজন৷ যাদের জন্য যন্ত্রের ন্যায় শুধু উপার্জন করে গেছে নিরন্তর৷ বৈধ অথবা অবৈধ উপায়ে৷ জীবনের শেষ লগ্নে প্রিয়জনকে কাছে না পেয়ে কত হৃদয়বিদারক কথা বলে গেল সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর বিত্তবান ব্যক্তি! ভাবতে অবাক লাগে এত সম্পদ কিংবা ক্ষমতা তার কোন কাজেই আসেনি৷ আঞ্জুমান মফিদিন কিংবা কিছু সাহসি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠণের গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া কেউ ছিলনা শেষ বিদায়ে৷

সন্তান জঙ্গলে ফেলে আসছে করোনায় আক্রান্ত পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন৷ কোন মৃত্যুই কাম্য নয়৷ কাম্য নয় মহামারী৷ কিন্ত তবুও কেন যেন সাদিক সাহেব এটাকে অবশ্যাম্ভাবী একটা বিষয় বলে মনে করেন৷ তার কাছে এটা একটা আশির্বাদ৷  বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ যে নিজেই একটা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে৷ মানবিক মূল্যবোধ আজ ভূলন্ঠিত৷ সমাজ, রাষ্ট্র তথা নিজেকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এটাইতো সময়৷ মন্ত্রী, আমলা, শিল্পপতি যারা ভেবে এসেছিলেন নিজেদের স্বাস্থ্যসেবা কিংবা চিকিৎসা প্রয়োজন হলে বিদেশে যাবেন৷ তাই চিরকাল অবহেলিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আজ তাদের কাছে অন্ধের ষষ্ঠি৷ প্রচুর অর্থ ছিল৷ ক্ষমতা ছিল৷ হয়তো ভিআইপি পাসপোর্টও ছিল৷ কিন্ত পরিশেষে মরতে হয়েছে এখানেই৷ বেঁচে থাকার কী করুণ আর্তনাদ! কাজে লাগেনি৷

সাদিক সাহেবের কাছে জীবন মানে কিছু দায়বদ্ধতা৷ সামর্থ্য অনুসারে সকলে নিজ দায়িত্বটুকুই পালন করুক৷ তাতেই দেশ-সমাজ পাল্টে যাবে৷ আর মৃত্যু? এটা একদিন হবেই৷ ভয়ের কিছু নাই৷ বরং এটাকে গৌরবান্বিত করাটাই বড় কথা৷

সাদিক সাহেব একটা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন৷ অফিস ঢাকায়৷ গুলশান এমবাসি পাড়ায়৷ রাশান এমবাসির পাশেই৷ দেশব্যাপি লক ডাউনের কারনে সকল স্ট্যাফকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে অফিস করার আদেশ করেন অফিস কর্তৃপক্ষ৷ যেহেতু ডোনার পার্ট৷ সেহেতু পার্টনার অর্গানাইজেশনের কার্যক্রমের রিপোর্টগুলো সামারাইজ করে হেড অফিসে পাঠাতে হবে৷ সপ্তাহে একদিন ভার্চুয়াল মিটিং হবে৷ এভাবেই চলছে অফিস৷ ভার্চুয়াল লাইফ৷

প্রথমদিকে ভালই লাগছিল৷ বাড়িতে শুয়ে বসে থাকা৷ পরিবারের সাথে একসাথে থাকা৷ আবার মাস ফুরোলে একগাদা বেতন৷ মন্দ কী! মনে হলো করোনা যেন মহা সুবিধা এনে দিয়েছে তাকে৷ যদিও অনেক কলিগ৷ অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্খি কর্মচ্যুত হয়ে পড়লো৷ ধীরে ধীরে হাহাকার বাড়ছে৷ এর শেষ কোথায় জানা নেই৷

নিজের বাড়ি মানে পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত একখন্ড জায়গায় একতলা একটা বাড়ি৷ অবশ্য শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত৷ বাসা নং ৫০, রোড নং-১৷ বাড়ি থেকে অফিস করা৷ এত সুবিধা৷ কিন্ত সাদিক সাহেবকে বিচলিত করে৷ ভাল লাগে না৷ আসলে এভাবে তিনি অভ্যস্থ নন৷ নিয়মানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলাবোধের ভেতরেই তার বসবাস৷ অফিসে যাওয়ার সময় নেই৷ পোষাক পরিচ্ছদের বিষয় নেই৷ কেমন যেন একটা অগোছালো জীবন৷ কোন চ্যালেঞ্জ নেই৷ নেই কোন থ্রিল৷

ইদানিং সাদিক সাহেব লক্ষ করছেন তিনি যেন বুড়িয়ে যাচ্ছেন৷ অফিসে কিংবা বাহিরে বের হতে হয়না৷ তাই প্রতিদিন দাড়ি শেভ করা, নিয়মিত চুল কাঁটা কিংবা হেয়ার কালারের প্রয়োজন পড়েনা৷ এতদিন একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মেয়েরাই শুধু সাজুগুজু করে৷ কিন্ত এখন বুঝতে পারছেন নিজেরা কম করেন না৷ নিজেটে পরিপাটি আর স্মার্ট রাখতে কত কৌশল আর প্রসাধন ব্যবহার করতে হতো তা তিনি টের পাচ্ছেন৷ সেলুনে যেতে না পারার কারণে চুল আর দাড়িগুলো যেমনি বড় হয়েছে৷ তেমনি হেয়ার কালার না করার কারণে সফেদ শুভ্র চুল-দাড়িতে নিজেকেই অচেনা মনে হয়৷ বেসিনের আয়নায় নিজেকে মনে হয় এক মধ্য বয়স্ক লোক৷

সাদিক সাহেবের বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন৷ অবসর নেয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন৷ অনেক আগে৷ ২০০০ সালে৷ সুস্থ্য একটা মানুষ৷ রাতে ডাইনিং টেবিলে সকলে একসাথে গল্পগুজব করে খাওয়া-দাওয়া করলো৷ সোফায় বসে বিটিভির খবর দেখছিলেন৷ হঠাৎ শুধু একটা হিচকি দিয়ে পড়ে গেলেন৷ হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা গেলেন৷ অবিশ্বাস্য! বেদনাদায়ক৷ মানতে কষ্টকর হলেও এটাই বাস্তবতা৷ জীবন রেখা একেবারেই ঠুনকো৷ বাবার মৃত্যু কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয় তাদেরকে৷ তখন তিনি লেখাপড়া শেষ করে চাকরি খুঁজছিলেন৷ তার বয়স ছিল ঊনতিরিশ৷ আর বাবার বয়স পঞ্চাশ৷ মায়ের বয়স ছিল চুয়াল্লিশ৷ অর্থাৎ সাদিক সাহেবের সাথে তার বাবার বয়সের পার্থক্য হলো একুশ বছরের আর মায়ের সাথে পনেরো বছরের৷ অন্যদিকে বাবা-মার বয়সের পার্থক্য হলো ছয় বছরের৷ অর্থাৎ কুড়ি বছর বয়সি  বাবা বিয়ে করেছিলেন চৌদ্দ বছর বয়সি মাকে৷ সে সময় এটাই স্বাভাবিক ছিল৷ কেননা বাল্য বিবাহ বলে কোন বিষয় ছিলনা৷

সময় পাল্টেছে৷ রুচির পরিবর্তন, শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইন প্রবর্তিত হলো৷ অর্থ উপার্জন আর ক্যারিয়ার সচেতনতা মানুষকে বিত্ত-বৈভব আর চাকরি নামক সোনার হরিণের পিছে এমন ভাবে ছোটাতে লাগলো যে সে নিজেই ভুলে বসলো নিজের সার্টিফিকেটের নয় সত্যিকারের বয়স৷ সে হোক নারী অথবা পুরুষ৷ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সংসার জীবন থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকলো ভীষণভাবে৷ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের অবাধ যৌণ সম্পর্ক স্থাপন করার বিধি বিধান থাকার পরেও তারা এত বিলম্বিত বিয়ে করেনা৷ কিংবা এত কম সন্তানও নেয়না৷

সাদিক সাহেব যখন বিয়ে করলেন তখন তার বয়স চল্লিশ৷ আর তার স্ত্রীর বয়স পঁচিশ৷ তাদের দুটো সন্তান৷ বড়টি মেয়ে৷ বয়স প্রায় নয়৷ আর ছোটটি ছেলে৷ বয়স চার৷

বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন৷ তাই তার মা পেনশন পান৷ বাড়ি ভাড়া পান৷ তা দিয়ে তিনি স্বচ্ছন্দে চলেন৷ সাদিক সাহেবের মত একজন মধ্য বয়স্ক সন্তানকে নিয়ে তাকে ভাবতে হয়না৷ সাদিক সাহেব অবশ্য মায়ের কাছ থেকে কোন টাকা নেন না৷ বরং নিজেই মাঝে মাঝে বাজার হাট করে দেন৷ মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ অস্বীকার করা কোন সন্তানের উচিৎ নয়৷

আজ কদিন ধরে কেন যেন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বড্ড বয়স্ক লাগে৷ একটু সময় ধরে নিজেকে গভীরভাবে লক্ষ্য করেন৷ আয়নায় ভেসে উঠা মুখটা নিজের বলে মনে হয়না৷ কিন্ত খুব চেনা চেনা লাগে৷ হঠাৎ মনে হয় এ মুখটা আর কারো নয়৷ বাবার৷ সাদিক সাহেব ভীত হন৷ চোখ সরিয়ে নেন আয়না থেকে৷

কদিন ধরে সাদিক সাহেব আয়না দেখেন না৷ এমনকি চুল আঁচরানোর সময়ও তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ান না৷ কেননা ইদানিং তিনি প্রতিনিয়ত  আয়নায় বাবার প্রতিচ্ছবি দেখেন৷

চুল-দাড়ি বড় আর সাদা রাখার কারণে প্রতিদিন মেয়ে রাগ করে৷ বলে বাবা তুমি শেভ করতো৷ চুল কালার করো৷ বিশ্রী লাগে! তুমি না করলে দেখবে ঘুমন্ত অবস্থায় আমি চুল-দাড়ি কেঁটে কলপ লাগিয়ে দেবো৷ তুমি টেরই পাবে না৷ তাছাড়া সামনে তোমার জন্মদিন৷

সাদিক সাহেব অভিভূত হয়৷ এই ছোট্ট মেয়েটা তার জন্মদিন মনে রেখেছে৷ একটা ভাল লাগা অনুভূতি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে৷ তিনি জানেন তার প্রত্যেকটা জন্মদিনে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা বিশাল আয়োজন করে৷ নিজের হাতে কেক বানানো৷ গিফট কেনা৷ সারপ্রাইজড দেয়া৷ তিনি ভীষণ এনজয় করেন৷ অন্যদিকে নিজের চরম ভুলটাও ধরতে পারে৷ বিয়েটা যদি সঠিক সময়ে করতে পারতেন৷ তাহলে এই সন্তানদের মমতাভরা মুখগুলো আরো বেশি বেশি দেখতে পারতেন৷

বাসা ন-৫০, রোড নং-১৷ আজ এ বাড়ির সামনে প্রচুর লোক সমাগম৷ ডেকোরেটর থেকে বিশাল সামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছে৷ তার নীচে অনেক চেয়ার৷ চেয়ারগুলো ফাঁকা নেই৷ সকলে শৃঙ্খলা আর পরিশালীনভাবে আসীন৷ একটু দূরে একটা জটলার ভেতর থেকে চার বছর বয়সী শিশুর নির্মল হাসির শব্দ উপস্থিত সকলকে ইমোশনাল করছে৷ শিশুটির এক হাতে জন্মদিনের কেক খন্ড অন্যহাতে গোলাপ জলের কনটেইনার৷ দুহাত নাড়াচ্ছে আর সেখান থেকে ছলাৎ ছলাৎ করে গোলাপ জল বেড়িয়ে বাবার গায়ে পড়ছে৷ তা দেখেই সে মজা পাচ্ছে৷ সে এখনো বুঝতে শেখেনি যে সামনে চিরতরে শুয়ে আছে তার বাবা৷ সাদিক সাহেবের আজ পঞ্চাশতম জন্মদিন৷

বাবার প্রতিচ্ছায়া-গল্প - রবীন জাকারিয়া 

রবীন জাকারিয়া

২৭ ডিসেম্বর, ২০২১ , ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

ভাই-শেষ পর্ব

(এই ধারাবাহিক গল্পের প্রত্যেকটি পর্বই স্বতন্ত্র৷ বলা যায় একেকটি গল্প৷ তাই একটি পর্বের পর অন্য পর্ব না পড়লেও পাঠকদের অসুবিধা হবেনা৷ তবে প্রত্যেকটি পর্ব পাঠ করলে একটা উপন্যাসের স্বাদ পাবেন বলে আশা করি৷)

বড়দার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারটা যেন একেবারে ভেঙ্গে পড়লো৷ বিশেষ করে মা আর যেন স্বাভাবিক হতে পারলো না৷ একদিকে বড়দা’র অভাব আর অন্যদিকে আর্থিক সংকট৷ আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটা মস্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল৷ নিকটাত্মীয়রা একটু টিটকিরি মারতে শুরু করলো৷ এটাই আমাকে আর মাকে প্রচন্ডভাবে জাগিয়ে তুললো৷ যুদ্ধ করতে হবে নিরন্তর৷ হয় লড়ে যাও নয় মরে যাও৷ সমস্ত প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে আবারো লড়াইয়ে নেমে পড়লাম৷ এ লড়াই আমার একার নয়৷ আমার বাবা আর বড়দা’র আত্মত্যাগ৷ আমার মায়ের অধরা স্বপ্ন৷ যাকে লালন আর পূরণ করার জন্য তার এত সংগ্রাম৷ এ স্বপ্ন আমাকে পূরণ করতেই হবে৷ দেশ মাতৃকার জন্য যদি এত মানুষ নিজের জীবন অকাতরে দিতে পারে৷ সেই স্বাধীন দেশের সন্তান হয়ে কেন আমি মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না?

আমাদের এই দূর্দিনে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখলো জোতদার তারেক চাচা৷ নিয়তির কী অদ্ভূত ঘটনা! বড়দা’র সাথে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ের কথা যখন পাকাপাকি৷ বড়দা তখন অন্যলোকে পাড়ি জমালো! জয়িতা৷ আমার ভাবি৷ যদিও বয়সে আমার ছোট৷ কিন্ত সে আমাদের এই ক্রান্তিকালে সবচেয়ে সাহস জুগিয়েছে৷ যে মেয়ে তার হবু স্বামীকে চিরতরে হারালো৷ তাকেতো আমাদেরই সহানুভূতি জানানো প্রয়োজন৷ নতুবা কিছুই হয়নি ভাব দেখিয়ে তার কেটে পড়বার কথা৷ নিজের ভবিষ্যত চিন্তা করেই৷ অথচ সে সারাদিন মাকে সান্তনা দেয়৷ রান্না-বান্না করে৷ সেবা যত্ন করে৷ এখনো সে মাকে মা বলে ডাকে৷ আর মার এককথা ও হলো আমার বৌমা৷ আমার মেয়ে৷ জোতদার চাচা মেয়েকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে৷ লাভ হয়নি৷

ইদানিং মা একটু চলাফেরা করে৷ আশে পাশে হাঁটে৷ গল্প করে৷ ভাল লাগে৷ সময় পাল্টায়৷ পরিবর্তিত সময়ের সাথে মানুষ খাপ খাইয়ে নেয়৷ এটাই জীবন৷ আসলে সব কিছুই এক সময় স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ কিংবা হতে হয়৷ কথায় আছে না Time is the best sealer, killer also. সময় সব ক্ষত মুছে দেয়৷
ধীরে ধীরে আমরাও নতুন স্বপ্নের বাতিঘরের দিকে নাও ভাসিয়ে দেই৷ জীবনের আখেরী লক্ষ যে পূরণ করতেই হবে৷

সমস্ত প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে অবশেষে আমি ডাক্তার হলাম৷ বিসিএস কমপ্লিট করে সরকারী চাকরী পেলাম৷ কর্মএলাকাও আমার পাশের জেলার লাগোয়া উপজেলার হাসপাতালে৷ তাই বাড়ি যাতায়াত প্রতিদিনই বলা যায়৷ মা এখন ভীষণ খুশী৷ তার আচরণে বোঝা যায় জীবন যুদ্ধে জয়ী এক জয়িতা৷ নিজের অজান্তে মাকে স্যালুট জানাই৷ এ শুধু আমার মা নয়৷ হার না মানা এক সংগ্রামী৷ এক বীরঙ্গণা৷

চাকরী পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মা আমার বিয়ে ঠিক করলেন৷ পাত্রী তিনি নির্বাচন করেছেন৷ বড়দা’র মত আমিও বললাম “তুমি যাকে ঠিক করবে আমি তাকেই বিয়ে করবো৷” অবশেষে মার পছন্দের মেয়েকেই আমি বিয়ে করলাম৷ সে আর কেউ নয়৷ আমার হবু ভাবি রেবেকা৷

মা যে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷ সেটা ঘুনাক্ষরে বুঝতে পারিনি৷ একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি৷ একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে৷  কেন যেন মনে হতে থাকলো৷ বড়দা’র সবকিছুই আমরা হাতিয়ে নিচ্ছি৷ জীবদ্দশায় তার উপার্জন, ত্যাগ এমনকি শরীরের একটা অঙ্গ নিয়েও থেমে থাকলাম না৷ বরং মৃত্যুর পর তার হবু স্ত্রীকেও ছিনিয়ে নিচ্ছি৷ কী লজ্জা!

বিষয়টা নিয়ে মা’র সাথে কথা বললাম৷ এ পর্যন্ত জীবনে ঐ একরারই মা’র মুখোমুখি দাঁড়ালাম৷ কিন্ত সে যে ব্যাখ্যা দিল৷ তা আমার সমস্ত অনুভূতি নাড়া দিল৷ মা বললো আমাদের সমাজে ঐ মেয়েকে আর কে বিয়ে করতে চাইবে? আমাদের সবচেয়ে বিপদের সময় যে মেয়েটি এত সাহসের সাথে সহযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছে৷ সাহস আর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে৷ দিন রাত আমার সেবা করেছে৷ তাকে কি ফেলে দেয়ার নাম মানবতা বাবা? তোর বড়দা”র সাথে বিয়ের কথা ছিল৷ বিয়েতো হয়নি৷ তাছাড়া ধর্মীয় বা আইনী কোন বাঁধা নেই যে তুই অপরাধবোধে ভুগবি৷

তবুও বিয়ের প্রথম দিকে আমাদের দু’জনের ভেতরে একটা জড়তাবোধ কাজ করতো৷ পরে সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে যায়৷
আমাদের দুটি সন্তান৷ দুটিই ছেলে৷ মা দুই নাতিকে নিয়ে এখন সারাদিন ব্যস্ত৷ আমার ধারণা রেবেকার চেয়ে মা-ই ওদের বেশি তদারকি করে৷ আমরা দুজনেও চাই মা ওদেরকে নিয়ে একটু হৈ-হুল্লোর, আনন্দ-স্ফূর্তি করুক৷ জীবনটাকে উপভোগ করুক৷ সারাটা জীবনতো শুধু কষ্টই করলেন৷ এটুকু তো তিনি প্রত্যাশা করতেই পারেন৷

দাদাবাড়িতে অবহেলিত আর অসম্মানে পড়ে থাকা কবর থেকে বাবার কবরটাকে বড়দা’র কবরের পাশে স্হানান্তরিত করেছি৷ কবরের পাশের আতা গাছটা বেশ বড় হয়েছে৷ যেন মমতা ভরা ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে৷ গাছ ভর্তি কাচা-পাকা আতা৷ ডালে অনেক পাখির বসতি৷ মন ভরা দৃশ্য৷ ভাল লাগে৷ মনে হয় এইতো আমাদের মাঝেই আছে সে৷ আমি দেখছি না৷ কিন্ত সে নিশ্চয়ই দেখছে৷ ভাল থাক তোমরা৷ মানুষের জন্য, নীতির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা দুই যোদ্ধার কবর আর অবহেলিত হতে দেবো না৷ এ আমার অঙ্গীকার৷ এরা আগামীর বিপ্লবীর প্রেরণা৷ এদের মৃত্যু নেই৷

আমার শশুর আর আমি দুজনে মিলে একটা ফাউন্ডেশন তৈরি করেছি৷ নাম দিয়েছি “মানব সেবা ফাউন্ডেশন৷” শশুর একটি বড় পুকুরসহ পাঁচ বিঘা জমি দান করেছেন৷ ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ সম্পৃক্ত হয়৷ যা অভাবনীয়৷ এমনকি দরিদ্র ও প্রান্তিকগোষ্ঠির লোকজন মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে সহযোগীতা করে আসছে৷ এছাড়াও বড়দা’র বন্ধু-সহপাঠিরা দেশ-বিদেশ থেকে আর্থিক সহায়তা অব্যহত রেখেছে৷ বিদেশি বেশ কিছু শুভাকাঙ্খি ও দানশীল ব্যক্তি দরিদ্র কিছু শিশুর Sponsorship child এর নামে অর্থ পাঠান৷ আসলে ভাল উদ্যোগ কখনো বিফলে যায় না৷ পৃথিবীতে এখনো ভাল লোক আছে অনেক৷ শুধু আমরা জানি না৷ সকলের সহযোগীতায় নির্মাণ করেছি ইয়াতীমখানা, আধুনিক মাদ্রাসা৷ স্পোর্টস ক্লাব৷ কারিগরি শিক্ষা৷ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র৷ যেখানে সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে নিজের ও দেশের কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে পারে৷ হয়তো ক্ষুদ্র পরিসরে৷ কিন্ত একদিন এটাকে মানুষ আরো এগিয়ে যাবে৷ কেননা সহজাতভাবেই মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন চায়৷

চাকরীর পাশাপাশি আমি গ্রামে ছোট্ট পরিসরে একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছি৷ একেবারে দাতব্য বলাটাও ঠিক হবে না৷ কেননা ১০০/- টাকা ভিজিট নেয়া হয়৷ সবটাকাই দেয়া হয় ফাউন্ডেশনে৷ যাদের সামর্থ নেই৷ তাদেরকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা ও ঔষধ দেয়া হয়৷ উদ্দেশ্য একটাই যেন অবহেলিত মানুষগুলো চিকিৎসা সেবাটা পায়৷ এটা মায়ের শুধু স্বপ্ন নয় আদেশও বটে৷

অফিস, ফাউন্ডেশনের কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে স্ত্রী-সন্তান-মা সকলকে নিয়ে ঘুরতে বেড়াই৷ এখন রাস্তা ঘাট আগের মত নেই৷ গ্রামের রাস্তাও পাকা৷ তাই গাড়ি নিয়ে ঘুরতে সমস্যা হয়না৷

আজ সকলে এসেছি আমাদের সেই স্কুলে৷ স্কুলটার একপাশে নতুন তিন তলা বিল্ডিং হয়েছে৷ অন্যপাশে স্মৃতি বিজড়িত সেই স্কুল ঘর এখনো আছে৷ বিরাট খেলার মাঠ৷ মাঠের এক কোণে গাড়িটা দাঁড় করলাম৷ সবাই নামলাম৷ মাঠে নেমেই আমার ছেলে দুটো ছোটাছুটি শুরু করে দিল৷ কে কাকে ধরতে পারে! মা ওদের পেছনে ছুটতে চাচ্ছিল৷ মানা করলাম৷ কেননা তাকে সংযত থাকতে হবে৷ তিনি হচ্ছেন এক কিডনীওয়ালা মানুষ৷ আমাদেরকে বানোয়াট গল্প বানিয়ে যেটি দান করেছে আমার বড়দা৷ যেটা আজো মা জানে না৷ আমি জানাইনি৷ কেননা তাতে মা আহত হবে৷

মাঠে ঘুরতে ঘুরতেই কখন যে মন্ত্রমুগ্ধের মত পুরাতন স্কুল ঘরের সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি৷ যেখানে একদিন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলাম৷ পাশে মমতা আর ভালবাসায় ভরা বড়দা’র অশ্রুসজল মুখ৷ হেল্যুশিনেশন তৈরি হয়ে আমি যেন নিমিষে সেই মূহুর্তকে দেখতে পাচ্ছি৷ বড়দা বলছে চল বাড়ি যাই৷ মা জিজ্ঞেস করলে বলবি পড়ে গিয়ে মাথা ফেটেছে৷

“তোর খুব ক্ষেদে লেগেছেরে ছোট৷ এই নে আতা ফল৷ খেয়ে নে৷ ভাল লাগবে৷” পিছন থেকে কেউ একজন কথাগুলো বললো৷ আরে এটাতো বড়দা’র কথা৷ তবে কি…৷ ঘুড়ে দেখা মা দাঁড়িয়ে৷ হাতে এক জোড়া আতা ফল৷ মার চোখে ভাল করে তাকিয়ে থাকি৷ কিন্ত একি সেখানে দেখতে পাই বড়দা’র প্রতিচ্ছবি৷ আবেগ আপ্লুত হই৷ মা জিজ্ঞেস করে৷ কিরে ছোট কাঁদছিস কেন? কিন্ত কিছুতেই বলতে পারি না যে ইদানিং আমি মায়ের চোখে দুটো মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাই৷ একটি মা স্বয়ং৷ অন্যটি হলো বড়দা৷

আচ্ছা আমি কি “সাইকো” হয়ে যাচ্ছি? ইদানিং আমি সবকিছুতেই বড়দাকে দেখি৷ মায়ের চোখে৷ রেবেকার মাঝে৷ এই যে মাঠে সন্তান দু”টো ছুটোছুটি করছে৷ একজন আরেকজন ধরে ফেলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা৷ আসলে ওরা কারা? আমাদের সন্তান নাকি কুড়ি বছর আগের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আকাশচুম্বি স্বপ্ন দেখা সেই সাজু-রাজু! আমি এবং বড়দা৷ প্রিয় দুই ভাই?

ভাই – পর্ব ১

ভাই – পর্ব ২

ভাই – পর্ব ৩

ধারাবাহিক গল্প - ভাই-শেষ পর্ব - রবীন জাকারিয়া

রবীন জাকারিয়া

২২ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

ভাই – ৩য় পর্ব

আমাদের পরিবারের উপর দিয়ে একটা বড় ঝড় বয়ে গেল৷ আলহামদুলিল্লাহ্ এর পরেও মার সুচিকিৎসা হলো৷ আমরাতো মার বেঁচে ফেরার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম৷ কিন্ত স্বপ্নের মত সব কিছু ঠিক ঠাক মিলে গেল৷ আমার আশ্চর্য লাগে আল্লাহ্ কোথা থেকে কিডনীর ব্যবস্থা করে দিলেন৷ বড়দা পারেও ম্যানেজ করতে সবকিছু৷ ওকে বলবো মাকে কিডনী দানকারী ঐ ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে যেতে৷ ওনার জন্য দোয়া করবো সারা জীবন৷

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর মা ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠছে৷ তবে শক্ত কাজ করা বারণ৷ আর ক’দিন পর বড়দা চলে যাবে৷ ইউনিভার্সিটি ফাঁকি দিয়ে ইতিমধ্যে অনেকদিন কাটালো৷ সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা৷ যদিও পরীক্ষা হয় হয় করে আর হয় না৷ সেশন জট বেড়ে যাচ্ছে৷ আমাদের মত পরিবারের সন্তানদের জন্য এটা জুলুম ছাড়া কিছু নয়৷ অবশ্য শুধু সরকার নয়৷ নোংরা ছাত্র রাজনীতি করে যারা ফায়দা লুটতে চায়৷ তারাও কম দায়ি নয়!
কিছুদিন ধরে বড়দাকে খুব মলিন আর নিস্তেজ মনে হয়৷ জিজ্ঞেস করলে বলে পরীক্ষায় চিন্তা করছিরে ছোট৷ তাছাড়া চাকরি বাকরি না করলে তোর আর মা”র কী হবে? মা’র স্বপ্ন পূরণ করতে হবে না? বলে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “শোন ছোট আমি যদি না-ও পারি৷ কথা দে তুই মা’র স্বপ্ন পূরণ করবি!” বললাম করবো৷ তবে তুই আগে বড় হ বড়দা৷ তুই যে আমার প্রেরণা৷

বড়দা চলে যাবার পর বাড়িটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে৷ মা সারাদিন কান্নাকাটি করে৷ মাকে বোঝাই এ শরীরে বেশি টেনশন না করতে৷ শোনে না৷ বোঝে না৷ যতই দিন মা যেন অবুঝ হচ্ছে৷ মায়া হয়৷ রাগ লাগে৷ কিন্ত রাগ হইনা৷ বরং সংসারের টুকিটাকি কাজ করি৷ মাকে সাহায্য করি৷ এ বাড়িতে কোন মেয়ে নেই৷ ইদানিং মা বৌমার মুখ দেখতে চায়৷ বড়দার বিয়ের পাত্রিও ঠিক করে রেখেছে৷ আমাদের গ্রামের জোতদারের মেয়ে৷ বড়দা হ্যা-না কিছুই বলেনি৷ বলেছে মা যা চাবে, তাই হবে৷ কনে পক্ষকে বড়দার চাকরি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে৷ ওরা খুশি৷ মাঝে মাঝে এটা ওটা পাঠায় হবু বেয়াইনির বাড়িতে৷ আমার হবু ভাবি সুযোগ খুঁজে প্রায়ই মা’র সাথে দেখা করে৷

বড়দা অনেকদিন ধরে আসে না৷ বলেছে সামনে পরীক্ষা৷ পড়ার চাপ৷ পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে আসবে৷ আর যাবে না৷

নব্বই এর দশক৷ চারিদিকে আন্দোলন৷ ঢাকা ইউনিভার্সিটির অবস্থাও দিন দিন খারাপ হতে থাকলো৷ ছাত্রদের আন্দোলন চলমান৷ সংঘাত প্রকট আকার ধারণ করলো৷ হত্যা, খুন, হল দখল আর পুলিশের গুলির সংবাদ প্রতিদিন আসতে থাকলো৷ কর্তৃপক্ষকে পুনরায় পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিতে থাকলো ছাত্র সংগঠণগুলো৷ এমন অবস্থায় বড়দার মতো সাধারণ ছাত্র-ছাত্রিরা পরীক্ষা আয়োজনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আহ্বান করলো৷ এটা ছাত্র সংগঠণগুলো ভাল ভাবে গ্রহণ করলো না৷ হুশিয়ার করলো৷ এদের উপযুক্ত শাস্তি দিবে৷ কিন্ত বড়দার মত সত্যিকারের শিক্ষার্থিরা ক্ষেপে উঠলো৷ সংগঠিত হলো৷ প্রতিবাদ করতে থাকলো৷ এমনিতেই বড়দার উপর ছাত্র নেতাদের একটা পূর্ব আক্রোশ আছে৷ কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই বিভিন্ন সংগঠণ তাকে দলে ঢুকানোর চেষ্টা করেছে৷ বিশেষ করে ভাল ছাত্রদের সব দল দলে টানতে চায়৷ কিন্ত বড়দা বিনয়ের সাথে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখান করে৷ তার একটাই কথা৷ পড়তে এসেছি৷ পড়বো৷ লেখাপড়া শেষ করে যদি রাজনীতি পছন্দ হয়৷ রাজনীতি করবো৷ না হলে অন্য পেশায় যাবো৷ এখন স্বপ্ন একটাই লেখাপড়া শেষ করে দেশের কাজে লাগাবো৷

প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে৷ মা, আমি, আমরা টেনশন করি৷ ভয়ে মা খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে৷

প্রতিদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রতিবেদন দেখায়৷ বাজারের চায়ের দোকানগুলো নতুন কৌশল চালু করেছে৷ সব সময় টেলিভিশন চালু থাকে৷ এতে বেচা বিক্রি বাড়ে৷ শুধু শুধু বসে টিভি দেখা যাবে না৷ কিছু খেতে হবে৷ আমি ক’দিন ধরে নিয়মিত টিভি দেখি৷ চা খাই৷ শেষ হলে আরো চা খাই৷ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি বিভিন্ন ছাত্রের সাক্ষাৎ নিচ্ছে৷ পরীক্ষা নিয়ে ভাবনার কথা বলছে৷ এমন সময় হঠাৎ দেখলাম বড়দা তার নিজস্ব বক্তব্য তুলে ধরলো৷ তার মতে “পরীক্ষাটা যথা সময়ে হওয়া দরকার৷ না হলে আমাদের মত দরীদ্র ছাত্ররা ঝরে পরবে৷ তারা শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবেনা৷ আমরা শিক্ষা লাভের জন্য বিশ্ব বিদ্যালয়ে এসেছি৷ রাজনীতি করতে নয়৷” টেলিভিশনে বড়দাকে দেখাচ্ছে শুনে দোকানে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল৷ সকলে গর্ব করলো৷ আমিতো বেজায় খুশি৷ আমার গুরু৷ আমার অহংকার বড়দাকে টিভিতে দেখা গেছে৷ ছুটে এসে মাকে বললাম৷ সব শুনে মা কেমন ভীত হয়ে গেল৷ তাকে আতঙ্কিত মনে হলো৷ মা ওকে চিঠি লিখতে বললো৷ যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে৷ তাই করলাম৷

চিঠিটা পেয়েছে কি-না জানিনা৷ কেননা দু’দিন পর এক মহা দুঃসংবাদ পেলাম৷ ছাত্র সংগঠণের নেতা দাবী করা গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা বড়দাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে৷ তার অপরাধ ছিল সে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করার পক্ষে মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়েছে৷ ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে এবং সরকারের পক্ষে দালালি করেছে৷ কিন্ত সাধারণ ছাত্ররা জানে কেন তাকে প্রাণ দিতে হলো৷

বড়দাকে তারা ক্যাম্পাস থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায় একটি হলে৷ সেখানে ছাত্রবেশী সন্ত্রাসীরা আটকিয়ে রাখে৷ ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে দফায় দফায় মারতে থাকে৷ বড়দা প্রাণ চেয়েছে৷ ওরা শোনেনি৷ পালাক্রমে নির্যাতন চালায়৷ ব্যথায় কাতরাতে থাকে৷ প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়ায়৷ কিছুটা সুস্থ্য হলে আবার পেটাতে থাকে৷ শেষে রাতের বেলা মৃত্যু নিশ্চিত জেনে লাশটা গায়েব করার চেষ্টা করে৷ কিন্ত অন্যদের হাতে ধরা পরে৷ লাশ ফেলে তারা পালিয়ে যায়৷ এরমধ্যে সারাদেশে জঘণ্য হত্যার খবর ছড়িয়ে পরে৷

কী করে এতো নির্মম আর বিভৎস হয় মানুষ৷ বিশেষ করে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থি৷ যারা আগামীতে এক বৈষম্যহীন, উন্নত আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করবে৷

আমাদেরকে পরেরদিন খবরটা নিশ্চিত করে স্থানীয় প্রশাসন৷

বাড়িতে শোকের ছায়া৷ মা বার বার “সাজুরে, আমার সাজু” বলে চিৎকার করে মূর্ছা যাচ্ছে৷ আমার বুকের ভেতর কেন জানি কোন আবেগ দেখতে পাচ্ছি৷ কাঁন্না বেরুচ্ছে না৷ আমার সবচেয়ে প্রিয়জন৷ গুরু৷ নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল৷ স্বপ্নের বাতিঘর৷ বড়দা আর নেই৷ বিশ্বাস হচ্ছে না৷ শুধু মা’র কথা ভাবছি৷ এবার বোধ হয় মাকে আর বাঁচানো যাবে না৷ বুকের ভেতর হাহাকার৷ তীব্র ক্ষোভ৷ প্রকাশ করতে পারছি না৷ তবে কি আমিও বেঁচে নেই? নাকি এ কষ্ট আর যন্ত্রনার জন্য একটা যন্ত্র হয়ে গেলাম!

বিকেলের দিকে ভার্সিটির কয়েকটি গাড়ি আসলো৷ ছাত্র-শিক্ষক ভরা গাড়ি৷ সাথে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি৷ যে গাড়িতে শুয়ে আছে আমার প্রিয় বড়দা৷ দৌড়ে গেলাম গাড়িটার কাছে৷ চিৎকার ডাকলাম বড়দা উঠনা বড়দা৷ চল গাছে কত ফল ধরেছে৷ পেড়ে আনি৷ দু”ভাই পেট ভরে খাব৷ আমরা যে অনেক গরীব৷ দ্যাখ আজকে যে পেটে কোন ক্ষিদে নেই৷ বুকে ক্ষিদে৷ বড্ড ক্ষিদেরে বড়দা৷ আর কান্না আটকাতে পারলাম না৷ কখন মা এসে জড়িয়ে ধরেছে জানিনা৷ মাকে পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম৷ বুকের ভেতর যেন মস্ত পাথর চাপা দিয়েছে৷

বাড়ির চারিদিকে লোকারণ্য৷ দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে৷ চিনি না৷ বড়দার কারণে এমন দৃশ্য অনেকবার হয়েছে৷ বৃর্ত্তি পাওয়ার সময়৷ এসএসসি ও এইচএসসি-তে স্ট্যান্ড করার সময়ও অনেক লোক এসেছিল৷ সাংবাদিক এসেছিল৷ আজ বড়দার লাশ এসেছে৷ আজও অনেক লোক৷ শুধু পার্থক্য হলো৷ অন্যদিনগুলোতে আনন্দ করেছি আর মায়ের মুখে ছিল বিজয়ের হাসি৷ আজ অত্যন্ত বেদনার দিন এবং মাকে দেখে মনে হচ্ছে পরাজিত এক সৈনিক৷

ফুলে ভরা লাশের গাড়ি থেকে বড়দাকে বের করে আনলো৷ চারিদিকে প্ল্যাকার্ড আর ব্যানারে লেখা “শহীদ সাজু আহমেদ” হাতে নিয়ে ভার্সিটির বন্ধু, সহপাঠি, শিক্ষকরা সম্মান জানালো৷ বিশাল জানাজা শেষে বাড়ির পাশের একটা আতা গাছের নীচে সমাধিস্থ করা হলো৷
মা কবরের উপর মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেল৷ তাকে বাড়িতে নেয়া হলো৷

ভার্সিটি থেকে আগত সকলেই বিদায় নিয়ে নিজ নিজ গাড়িতে বসলো৷ কান্নামাখা কন্ঠে বিদায় জানিয়ে মা’র কাছে চলে আসবো৷ এমন সময় একজন শিক্ষক আমাকে ডাকলেন৷ কাছে গেলাম৷ তিনি আমার হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে বললেন এটা পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের কাগজ পত্র৷ যত্ন করে রেখে দিয়ো৷ এসব কোন কাজে লাগবে না৷ তাছাড়া বুঝিও না৷ তবুও হাতে নিলাম৷ চলে আসবো এমন সময় উনি বিশ্মিত করার মতো একটা তথ্য দিলেন৷ তোমার বড়দার শরীরে দুটি নয়৷ একটি কিডনীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে৷ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম দূর দিগন্তের দিকে৷ কতক্ষণ জানিনা৷ সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলাম কেউ নেই৷ আমি দাঁড়িয়ে আছি একা৷ এই প্রথম নিজেকে একলা একা মনে হলো৷ ভয় পেলাম৷ প্রচন্ড ভয়! বড়দা ছাড়া একা আমি পারবোতো টিকে থাকতে? বাবা-মা আর বড়দা অধরা স্বপ্নকে পূরণ করতে? অজান্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে খেল৷ ভর করলো জেদ আর অভিমান৷ তাই বিড়বিড় করে ভীষণ অভিমান মাখা কন্ঠে শুধু বললাম বড়দা তুই মিথ্যুক৷ আমাদের জন্য তুই নিজের জীবনের সবটাই যে বিলিয়ে দিলি বড়দা৷ তুই সারা জীবন বেঁচে থাকবি৷ হয়তো শারীরিকভাবে নয়৷ আত্মিকভাবে৷ বিমূর্তরুপে৷

ভাই – পর্ব ১

ভাই – পর্ব ২

ভাই – পর্ব ৪

ভাই-৩য় পর্ব (ধারাবাহিক গল্প)
72 Views

রবীন জাকারিয়া

১৩ ডিসেম্বর, ২০২১ , ২:২৩ অপরাহ্ণ

ভাই

২য় পর্ব

আমার বড়দা জেলা শহরে পড়তে যাওয়ায় মা অনেক খুশি৷ তিনি ভাবেন তাঁর লালিত স্বপ্নগুলো পূরণ হতে চলেছে৷ ছেলে দু’টি অনেক মেধাবী৷ নিশ্চয় মানুষের মত মানুষ হবে ইনশা’আল্লাহ্৷ কিন্ত মনের ভেতর চাঁপা বেদনা৷ ওদের জন্য কিছুই করতে পারছেন না৷ না দিতে পারলেন ভাল খাবার-দাবার৷ আর না ভাল জামা কাপড়৷ এতটুকু বয়স থেকেই ওরা শুধু কষ্টই করে গেল৷ পিতৃহীন এই দু’টি ছেলেকে সহায়তা করতে কেউ এগিয়ে এলো না৷ এমন কি চাচা-ফুফু, মামা-খালা কেউ নয়৷ যতদূর এগিয়েছে৷ ওদের নিজস্ব যোগ্যতা আর কঠোর পরিশ্রমে৷ খুব কষ্ট হয়৷ মা হয়ে এর চেয়ে কষ্ট আর কী আছে? বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে৷

ক’দিন থেকে মাকে খুব মলিন মনে হচ্ছে৷ চোখগুলো লালটে বর্ণের৷ মাকে কাছে ডেকে বলি, “কী হয়েছে মা? আমায় খুলে বলতো?” কিছু না বলে মা এড়িয়ে যায়৷ আমি অভিমান করে বলি যদি না বলো তাহলে কিছু খাবোনা৷ আমার জেদ দেখে মা মলিন একটা হাসি দিয়ে খুলে বললো সাজুটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছেরে বাবা৷ বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেমানুষের কাঁদতে শুরু করলো৷ তাঁকে সান্তনা দিতে না পেরে আমিও কাঁদতে লাগলাম৷ আমার সব সহ্য হয়৷ কিন্ত মায়ের কান্না দেখলে নিজের কান্না রোধ করতে পারিনা৷ তাছাড়া মা’র এখন বয়স হয়ে যাচ্ছে৷ আগের মতো মামাদের সংসারের সব কাজ করতে পারে না৷ তাই মামারা এখন আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে৷ আমরা এখন আলাদা থাকি৷ নানাজান বোধ হয় জীবদ্দশায় তাঁর সন্তানদের চরিত্র বুঝতে পেরেছিলেন৷ তাই মৃত্যুর পূর্বে সম্পত্তি বাটোয়ারা করে গেছেন৷ পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত মায়ের অংশে নতুন বাড়ি করেছি৷ এবার আর খড়ের ঘর নয়৷ টিনের ঘর বানিয়েছি৷ আমি এইটেও স্কলারশীপ পেয়েছি৷ আমাদের দু’ভাইয়ের বৃত্তির টাকা, বড়দার মত আমারও টিউশনির টাকা দিয়ে বাড়ি বানিয়েছি৷ আর কোনভাবেও আমরা মাকে আর দাসী বানাতে দেব না৷ এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা৷

বড়দা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বায়ো কেমিস্ট্রিতে পড়ছে৷ থার্ড ইয়ার৷ আর কিছুদিনের মধ্যে ও বের হয়ে আসবে৷ ওর যে মেধা আমি নিশ্চিত ও ভাল একটা চাকুরি পেয়ে যাবে৷ মাকে বোঝাই আর ক’টা দিন অপেক্ষা করো৷ তোমার স্বপ্নের দিন এলো বলে৷ কথা শুনে মা হাসে৷ বলে ছোটরে তুই এখনো ছোটই থেকে গেলি৷ আমি কপট রাগ দেখাই৷ বলি দেখ মা আমি আর মোটেও ছোট না৷ এবার এসএসসি দিব৷ তারপর বড়দার মতো আমিও শহরের ভাল কলেজে পড়াশুনা করবো৷ আমাকে যে ডাক্তার হতে হবে মা৷ অনেক বড় হতে হবে৷ তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে৷

একথা শুনে মা খুব রিএক্ট করলো৷ মুখটা কাল করে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো৷ তুইও যদি শহরে চলে যাস৷ তাহলে আমি এখানে কাকে নিয়ে থাকবো?
মা’র কথা শুনে আমারও বোধোদয় ঘটলো৷ আসলেতো মা-তো কার সাথে থাকবে? এখানেতো তাঁকে রাখা ঠিক হবে না৷ তাছাড়া শরীরের অবস্থাও ভাল নয়৷ খেতে পারে না৷ শরীরটা ফোলা ফোলা মনে হয়৷ ভাল ডাক্তার দেখানো দরকার৷ বড়দাকে আসতে বলি৷ কিছুদিন পর বড়দা চিঠি পাঠায়৷ গ্রামেতো ভাল ডাক্তার নেই৷ তাই মাকে নিয়ে আমাকে ঢাকায় আসতে বললো৷ ঢাকায় যাওয়ার কথা শুনে আমিতো ভীষণ খুশি৷ কখনো সেখানে যাইনি৷ বন্ধুদের কাছে কত গল্প শুনেছি৷ কত বড় আর সুন্দর শহর৷ কিন্ত মনের আশা মনেই চেঁপে রেখেছি৷ এখন সুযোগ এসেছে বলে খুশি লাগছে৷ কিন্ত মা যেতে চাচ্ছে না৷ তাঁর নাকি ভয় লাগে৷

কিছুদিন পর মাকে নিয়ে ঢাকায় গেলাম৷ বড়দা ডাক্তার দেখালো৷ অনেক টেস্ট করানো হলো৷ রিপোর্ট দেখে ডাক্তার মাকে হাসপাতালে এডমিট করতে বললেন৷ আমরা দু’ভাই ভয়ে অস্থির৷ কী হয়েছে মায়ের? কিডনী জনীত রোগ৷ কিছুদিন ডাক্তাররা দেখবেন অসুধে কাজ হয় কী-না! তা নাহলে কিডনী প্রতিস্থাপন করতে হবে৷ কী ভয়ংকর ব্যাপার! আমরা এত টাকা পাবো কই? তাছাড়া কিডনীই বা কে দেবে? হাসপাতালের বেডে মায়ের মলীন মুখ দেখতে ইচ্ছে করে না৷ কান্না পায়৷ মা বুঝে গেছে সে আর বেশিদিন বাঁচবে না৷ তাই দু’ভাইকে ডেকে বললো, ” বাবা কেউই চিরকাল বেঁচে থাকে না৷ মরে যেতে আমার একটুও ভয় নেইরে সোনা৷ আমিতো মরে গেছি সেদিনই, যেদিন তোদের বাবা মরে গেছে৷ মানুষটার অনেক স্বপ্ন ছিল তোদেরকে মস্ত মানুষ বানানোর৷ দেখে যেতে পারেনি৷ আমিতো বেঁচে আছি শুধু ওঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য৷ আর আমাকে বাঁচতেই হবে৷ তোরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না বাবারা৷”
মায়ের এসব কথা শুনে বুকে মোচড় দিয়ে উঠে৷ কিন্ত মুখে হাসি হাসি মুখটা ধরে রাখি৷ মা যেন কিছুই বুঝতে না পারে৷

দুই ভাই ভীষণ চিন্তা করছি৷ কী হবে! মাকে কীভাবে বাঁচাবো! কিডনী কেনার মত টাকা নেই৷ হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা আমার চেক আপটা করে দেখি না? যদি ম্যাচ করে? ভাই ও মাকে গোপন করে আমি ডাক্তারের সাথে কথা বললাম৷ তিনি চেক আপের পর হতাশ করলেন৷ ম্যাচ করেনি৷ ভীষণ কান্না পাচ্ছে৷ কাঁদতে পারছি না৷ শেষে মা-ভাইয়ের কাছে ধরা খাই৷

পরেরদিন বড়দা হঠাৎ করে এসে বললো কিডনী পাওয়া গেছে৷ একজন মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি নাকি নিজের অঙ্গ দান করেছেন৷ কিন্ত নিজের পরিচয় গোপন করতে চান৷ বড়দা’র কাছে এসব কথা শুনে  দু’ভাই দু’জনকে জড়িয়ে ধরলাম৷ কিছুক্ষণ চিৎকার করে হাসলাম৷ তারপর কেন যেন কান্না চলে এলো৷ নিজেদের সামলাতে পারলাম না৷ কাঁদতে কাঁদতেই আল্লাহ্’র দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে বললাম আলহামদুলিল্লাহ্৷
ক’দিন পর বড়দা বললো মায়ের অপারেশনের দিন সে থাকতে পারবে না৷ তাকে সপ্তাহখানিকের জন্য বাহিরে যেতে হবে৷ যে লোক কিডনী দিচ্ছে৷ তার গ্রামের বাড়ি৷

বড়দা ছাড়া আমার অনেক দৌড় ছুট করতে হলো৷ তবুও অবশেষে মায়ের অপারেশনটা সাকসেসফুল হলো৷ ধীরে ধীরে মা সুস্থ্য হয়ে উঠলো৷ কিন্ত বড়দা’র কোন পাত্তা নেই৷ একদিকে ওর উপর রাগ জন্মাচ্ছে৷ অন্যদিকে চিন্তাও হচ্ছে৷ ওর খারাপ কিছু ঘটলো নাতো? কী-যে করি! মাথা আউলায় যাচ্ছে৷
অবশেষে সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটিয়ে একদিন বড়দা এসে হাজির৷ ওকে পেয়ে মা আর আমি যেন  প্রাণ ফিরে পেলাম৷ কিন্ত ওকে দেখতে কেমন ফ্যাকাসে আর অসুস্থ মনে হচ্ছে৷ বিষয়টা কী? জানতে চাইলে বললো, অচেনা জায়গা আর গ্রামের পরিবেশটা নাকি ওকে স্যুট করেনি৷ তাই কিছুদিন অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিল৷ এখন ভাল৷” যাক বাবা সব কিছুই ভালই ভালই হয়ে গেল৷ ভীষণ একটা শান্তির বাতাস যেন শরীর আর মনকে চাঙ্গা করে দিল৷ ভুলেই গেলাম কতটা দিন না ঘুমে, না খেয়ে কাটিয়ে দিলাম৷ শুধু মায়ের সেবা করেই৷

আজ মাকে রিলিজ দিয়েছে৷ মাকে নিয়ে দু’ভাই বাড়ি ফিরছি৷ মাঝখানে মা বসে আছে৷ তার দুই দিকে আমরা দু’ভাই৷ ভাড়া মাইক্রোবাসটা শহর পেরিয়ে এখন আমাদের গ্রামের মেঠোপথ বেয়ে চলছে৷ চারিদিকে ধুলোর মেঘ৷ ভাল করে দেখা যাচ্ছেনা কিছুই৷ পিছনে চিৎকার আর চেচামেচির শব্দ বলে দেয় গাড়ি দেখে গ্রাম্য কিশোরদের দূরন্তপনার কথা৷ উইন্ডশীল্ডের ভেতর দিয়ে নেমে আসে শেষ বিকেলের সূর্য্যের রক্তিম আলোচ্ছটা৷ আজকের সূর্য্যটাকে কেন যেন বড্ড মায়াবী আর সুন্দর লাগছে৷ না কি এভাবে কখনো দেখা হয়নি প্রকৃতি? এখনো মা তার দুই হাত দিয়ে ধরে রেখেছে দুই ছেলের হাত৷ শক্ত করে৷ মাথাটা ঘুরিয়ে তাদের দিকে তাকাই৷ আরো গভীর ভাবে দেখি৷ অনুভব করি ঐ সূর্য্যটার চেয়ে অনেক অ-নে-ক বেশী সুন্দর আর মায়াবী আমার বড়দা এবং মা৷

ভাই – পর্ব ১

ভাই – পর্ব ৩

ভাই – পর্ব ৪

ভাই পর্ব-২ - রবীন জাকারিয়া

রবীন জাকারিয়া

৬ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

ভাই

(১ম পর্ব)

আমরা দুই ভাই৷ সাজু এবং রাজু আমাদের নাম৷ বড় ভাই আমার চেয়ে সাত বছরের বড়৷ ওকে আমি বড়দা বলে ডাকি৷ ও আমাকে “ছোট” বলে৷ ভাই হলে হবে কী? আমরা হচ্ছি গুরু-শিষ্য৷ ও যা বলবে আমাকে তাই শুনতে হবে৷ ব্যতিক্রম হলে আমার খবর করে ছাড়ে৷

আমাদের বাবা নেই৷ খুব ছোট বেলায় মারা গেছেন৷ আসলে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন৷ সার্টিফিকেট নামক এক খন্ড কাগজের জন্য যুদ্ধ করেননি৷ যুদ্ধ করেছেন দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য৷ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন৷ কোন উপঢৌকনের জন্য নয়৷ কোন্ সেক্টর কমান্ডার কী আদেশ দিয়েছেন তাঁর জানা ছিল না৷ বরং গ্রামের কিছু সংগঠিত মানুষের সাথে তিনিও বল্লম হাতে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে গিয়ে শহীদ হন৷ যেহেতু তাঁর কোন সার্টিফিকেট নেই তাই তাঁর নামের সামনে শহীদ নয় মরহুম বসে৷ আমরা গর্ব করি বাবাকে নিয়ে৷ উনি আমাদের অনুপ্রেরণা৷ আমাদের অমানিশায় ভরা জীবনের বাতিঘর৷ বাবার কবরটা দাদার ভিটের খুলিবাড়ির এককোণে৷ আমাদের তাড়িয়ে দেয়ার কারণে বাবার কবরটা জিয়ারত করতে পারি না৷ তবে দোয়া করি৷ আল্লাহ্”র কাছে দু”হাত তুলে বলি “রব্বির হাম হুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগীরা”

বাবার মৃত্যুর পর চাচা-ফুপুরা মা’কে স্থান দেননি৷ তাই আমরা নানা বাড়িতেই মানুষ৷ নানার আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল নয়৷ অন্যদিকে মামা-মামিরা খুব বেশি আন্তরিক নয়৷ আমাদেরকে আপদ মনে করে৷ আমার মা দাসীর মত সংসারের সকল গৃহস্থালি কাজ করে পুষিয়ে দেয়৷ মা শুধু স্বপ্ন দেখেন আমরা যেন লেখাপড়া শিখে মস্ত কিছু হতে পারি৷ কিন্ত নিরাশ হন আমাদের কান্ড কারখানা দেখে৷ লেখাপড়ায় ভাল হলেও দু”জনে খুব দুষ্টু৷ মা বোঝান৷ স্বপ্ন দেখান৷ কিন্ত কে শোনে কার কথা? তাই মা প্রায় সময় মুখ গোমরা করে থাকেন৷

আমার খারাপ লাগে৷ কিন্ত বড়দা’র কথার অবাধ্য হওয়া যাবেনা৷ ও খুবই দূরন্ত৷ আবার স্বার্থপর আর বদরাগি৷ তাই আমি সমীহ করে চলি৷ প্রায় সময়েই আমাদের সকালের নাস্তা হলো ছোট একবাটি মুড়ির সাথে একখন্ড গুড়, খই-মুরখি, বাসি ভাত হলুদ-মরিচ দিয়ে বানানো ভূনা ভাত অথবা শীতের সময় একটা ভাঁপা পিঠা৷ সঙ্গে টিনের কাপে এক কাপ চা৷ কিন্ত বড়দা এখান থেকে ভাগ বসাতো৷ উপায় নেই৷ অন্যদিকে আমি যেন না নিতে পারি৷ সেজন্য ও নিজেরটাতে থুথু ছিটিয়ে দিত৷ এটা খেয়েই স্কুলে যাই৷ আমাদের কাপড় ছিল খুবই সীমিত৷ সেগুলোও খুব মানসম্মত নয়৷ স্পঞ্জের স্যান্ডেল৷ বয়স কত হবে জানিনা৷ শুধু জানি এগুলোকে আরো অনেকদিন চালাতে হবে৷ ছিঁড়ে যায়৷ জোড়া দেই৷ কুপির আগুনে বোতামের দুই মাথা গলিয়ে লাগিয়ে দেই৷ জোড়া লাগে৷ আবার ছেঁড়ে৷ তার দিয়ে বাঁধি৷ বড়দা সব সময় পকেটে তার ভাঁজ করে রাখে৷ পথে যদি স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায়?

আমাদের স্কুলটা গঞ্জে৷ বাড়ি থেকে অনেক দূর৷ দুভাই হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাই৷ বড়দা স্কুলে যাওয়ার শর্টকাট একটা রাস্তা বের করেছে৷ গ্রামের পাশ দিয়ে যে ছড়া নদীটা চলে গেছে৷ ওটা পার হলে পথটা অনেক কমে যায়৷ বেশিরভাগ সময় নদীতে এক কোমর পানি থাকে৷ আমরা দুই ভাই পাট ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আইল ধরে ধরে পথ চলি৷ ওই সময়টুকু আমার ভয় লাগে খুব৷ কেমন অন্ধকার গা ছমছমে নিঝুম পরিবেশ৷ কোথাও কেউ নেই৷ যদি বাঘ ধরে? আবার মনকে সান্তনা দেই বড়দাতো আছে৷

নদীটা অদ্ভূত উপায়ে পার হই৷ বড়দা পকেট থেকে রুমালের মতো ভাঁজ করা একটা শাড়ির টুকরা বের করে৷ লুঙ্গির মতো পড়ে৷ ওর প্যান্ট আর বইগুলো আমাকে ভাল করে ধরতে বলে৷ তারপর আমাকে কাঁধে করে আস্তে আস্তে নদী পার হই৷ ওপাড়ে পোষাক পাল্টে স্কুলের পথ ধরি৷ প্রচন্ড খিদে নিয়েই কাটিয়ে দেই স্কুল টাইম৷ তবে বেশির ভাগ সময় বড়দা স্কুলের কিংবা আশেপাশের গাছ থেকে ফল পেড়ে নিয়ে আসে৷ দু’ভাইয়ে মনের সুখে খাই৷ ক্ষুধার কষ্ট ভয়ঙ্কর কষ্ট৷ খুধা স্বাদ বোঝেনা৷ বোঝে পেটে কিছু দিতে হবে৷ পেটের জ্বালা মিটলে ভাল লাগে৷ মনে হয় আহ্ জীবন কত সুন্দর! তখন বড়দা’কে আপন মনে হয়৷ ও অবশ্য আমাকে ছাড়া খাবেনা৷ কান্না পায়৷ ভাল লাগে৷ আর বড়দা’র প্রতি ভালবাসা বাড়তে থাকে৷ আসলে ও ছাড়া আমি অচল৷ ও বাঁনরের মত গাছে উঠতে পারে৷ বড়দা যখন গাছে উঠে তখন আমাকে বলে “ছোট” তুই নীচে দাঁড়িয়ে থাকবি৷ আমি ফল ফেললে তুই ধরে ফেলবি৷ তাহলে শব্দ হবে না৷ মালিকও টের পাবে না বুঝলি৷ আমার খুব ভয় ভয় করে৷ কিন্ত বড়দা’র অবাধ্য হতে পারিনা৷ একদিন একটা লম্বা গাছ থেকে বড়দা ডাব ফেললো৷ কথামতো আমি সেটা ধরতে পারলাম না৷ বরং মাথার সামনের অংশে লাগলো৷ আমি জ্ঞান হারিয়ে পরে গেলাম৷ এরপর কিছু বলতে পারি না৷ জ্ঞান ফিরলে দেখি বড়দা ওর স্যান্ডো গেঞ্জি দিয়ে আমার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে৷ আমরা স্কুলের বারান্দায় বসে আছি৷ মেঝেতে রক্ত দেখে ভয় পেলাম৷ শরীর কাঁপতে থাকলো৷ বড়দা বললো চল এখন বাড়ি যাই৷ মা জিজ্ঞেস করলে বলবি৷ পড়ে গিয়ে মাথায় লেগেছে৷ আমি মলিন কন্ঠে বললাম ঠিক আছে৷ সেদিন আমার প্রচন্ড জ্বর এলো৷ প্রলাপ বকতে থাকলাম৷ সারারাত ঘুমাতে পারলাম না৷ ঘোরের মধ্যে যেন বসবাস৷ মাঝে মাঝে চোখ খুলে দেখি৷ মা আর বড়দা জেগে আছে পাশে৷ ওদের দেখে সাহস পাই৷ ভাল লাগে৷ ওদের ভালবাসায় কেঁদে ফেলি৷ মনে মনে বলি শুধু মাকে নয়৷ বড়দা তোমাকেও খুব ভালবাসি৷

এভাবেই দিন কাটতে লাগলো৷ মেঘে মেঘে অনেক বেলা৷ এসএসসি পরীক্ষায় বড়দা বোর্ডে থার্ড স্ট্যান্ড করে পাশ করলো৷ ও অবশ্য ফাইভ ও এইটেও বৃর্ত্তি পেয়েছিল৷ বাড়িতে লোকের ভীড়৷ ওকে দেখতে দূর গ্রাম থেকেও লোক সমাগম হলো৷ খবরের কাগজের লোকেরা রিপোর্ট করলো৷ কাগজে ছবি ছাপা হলো৷ সে এক এলাহী কান্ড৷ মা’র সাক্ষাতকার নিতে গেল৷ কিন্ত মা কিছুই বলতে পারলো না শুধু কান্না ছাড়া৷ আমার ভেতর একটা জেদ তৈরি হলো৷ আমাকেও বড়দা’র মতো হতে হবে৷ আমার মায়ের দুঃখ ঘোচাতেই হবে৷

কিছুদিন পর বড়দা কলেজে পড়তে জেলা শহরে চলে গেল৷ আমাদের যে আর্থিক অবস্থা তাতে করে বড়দাকে শহরে পড়ানোর খরচ দেয়া অসম্ভব৷ তাই বড়দা একটা বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকবার একটা ব্যবস্থা করে ফেললো৷ স্কলারশীপের টাকা ও দু’একটা টিউশনি করে চালিয়ে নিতে পারবে বলে মাকে আশ্বস্থ করলো৷ শহরে থাকবে৷ কলেজে যাবে৷ তাই ভাল কিছু জামা কাপড় লাগবে বলে মা তার হাতের একমাত্র সোনার চুরিটা বেচে দিলো৷ জামা-কাপড়, মশারি, বেডিংসহ প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে কিছু টাকা বড়দা’র হাতে দিয়ে বললো, “এটা রেখে দে৷ বই-পত্র কিনতে ও প্রয়োজনে কাজে লাগবে৷” একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম মামা-খালারা কেউ কেন যেন খুশি নয়৷ তারা কোন সহায়তাই করলো না বরং বলতে লাগলো দাসীর ছেলের আবার লেখাপড়া! ছোটলোকের ঘোড়ারোগ!

দু’দিন ধরে মা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে৷ শুধুই কাঁদে৷ মা’র কান্না দেখে বড়দা’র মতো শক্ত মনের ছেলেটাও কাঁদে৷ আমি অবশ্য কাঁদছি না৷ বরং খুশিই লাগছে! কেননা ও চলে গেলে আমি ওর রুমটা দখল করতে পারবো৷

আমরা যে ঘরটাতে থাকি৷ সেটা পাটখড়ির বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ উপরে খড়ের দোচালা ছাউনি৷ সামনে বারান্দা৷ বারান্দায় নানার আমলের একটা জলচৌকি৷ গরমে ওখানেই বসি৷ মা বারান্দাসহ পুরো ঘরের পিড়ালি সব সময় মাটি দিয়ে লেপে রাখে৷ সাদা৷ চকচকে৷ পরিষ্কার৷ ঘরটাতে একটা পার্টিশন দিয়ে করা হয়েছে বড়দা’র রুম৷ আমি ছোট তাই মায়ের বিছানায় এক সাথে থাকি৷ আমাদের বিছানা মানে একটা কাঠের চৌকি৷ তার উপর শুধুমাত্র একটা কাঁথা বিছানো৷ দিনের বেলা কাঁথাটা তুলে রাখা হয়৷ যাতে নোংরা না হয়৷

অন্যদিকে বড়দা’র বিছানা হলো বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচা৷ বড়দা খড় বিছিয়ে কাঁথা দিয়ে এমনভাবে গুছিয়ে রাখে৷ শুইলে কী আরাম! এখন মা’র সাথে শক্ত চৌকিতে থাকতে ভাল্লাগেনা৷ তাছাড়া বড়দা রুমটাকে কী যে সুন্দর করে সাজিয়েছে! দেখলে লোভ হয়৷ মায়ের শাড়ির ছেঁড়া টুকরোগুলো সেলাই করে ছাদ বানিয়েছে৷ চারিদিকে বাঁশের বাতা দিয়ে বক্ম করে সেখানে ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন ছবি লাগিয়েছে৷ পুঁই শাকের বিঁচি ফাটিয়ে রং নিয়ে বাতাগুলো রং করেছে৷ এটাই সুযোগ আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বড়দা’র রুমটা দখলে নেয়ার৷ তাই আমি কাঁদছি না৷ বরং খুশি৷

বড়দা চলে যাওয়ার কিছু দিন পার হয়ে গেল৷ এ ক’দিন রুমের প্রেমে মুগ্ধ হয়ে খুশিতে কাটালাম৷ আজ কেন জানি খারাপ লাগছে৷ খুব খারাপ৷ কাউকে বলিনি৷ আজ অনেক্ষণ একা একা কেঁদেছি৷

মা খেতে ডাকছে৷ কিন্ত ক্ষিদে নেই৷ আমার এখন স্কুলে যেতে ভাল লাগে না৷ ভীষণ ক্ষিদে লাগে৷ কেউ আর এসে বলে না, “ছোট এই নে আঁতা ফল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে৷ খুব ক্ষিদে লেগেছে তাই নারে ছোট?”

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি৷ বিড়বিড় করে বলতে থাকি, “বড়দা তুই চলে আয়৷ তুই ছাড়া আমি অচল৷ তোকে আমি বড্ড ভালবাসি৷” কখন যে মা এসেছে টের পাইনি৷ মা আমাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা কী দেবে বরং নিজেও জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকলো৷ আর বলতে বলতে থাকলো, “কাঁদিস না ছোট৷ সোনা বাবা তোদেরকে অনেক বড় হতে বাবা৷ অনেক বড়৷ বল্ আমার এই স্বপ্নটা তোরা দুই ভাই পূরণ করবি? মায়ের কথাটা বুকে তীরের মতো লাগলো৷ আসলেতো আমার মা-তো জীবনে কিছুই পেল না! দুঃখ, কষ্ট আর লাঞ্চনা ছাড়া৷ নিজেকে শক্ত করলাম৷ মনে মনে লক্ষ্য স্থীর করলাম৷ যে করেই হোক মায়ের এই স্বপ্নটা পূরণ করতেই হবে৷

আবেগকে ঝেড়ে ফেলে পুরোদমে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করলাম৷ ফলাফল হাতেনাতে৷ ফাইভের বৃর্ত্তি পেলাম৷ মা ভীষণ খুশি৷ বড়দা আমার জন্য একটা জামা পাঠিয়েছি৷ দামি জামা৷ তাই খুব কম পরি৷

সামনে পহেলা বৈশাখ৷ আর বেশিদিন নেই৷ পহেলা বৈশাখে আমাদের এখানে মাছ ধরা প্রতিযোগিতা হয়৷ এদিন ছড়া নদীটাতে সকলেই একযোগে মাছ ধরবে৷ যে সবচেয়ে বেশি ধরে তার জন্য পুরষ্কার থাকে৷ তবে শর্ত একটাই শুধু পলাই দিয়ে মাছ ধরতে হবে৷ প্রতিবার বড়দা’ই ফার্স্ট হয়৷ ও যে চালাক আর ডানপিঠে? ও জানে কোথায় মাছ বেশি পাওয়া যাবে৷ তাই ওর সাথে কেউ পারে না৷ আমি খলাই (বাঁশের পাতলা বাতা দিয়ে তৈরি মাছ রাখার পাত্র) আর একটা ব্যাগ নিয়ে পাড়ে বসে থাকি৷ ও মাছ ছুঁড়ে দেয়৷ আর আমি টপাটপ খলাইয়ে রেখে দেই৷ বড়দাকে চিঠি পাঠিয়েছি৷ তাড়াতাড়ি চলে আসতে৷

বড়দা বহুদিন পর বাড়ি আসবে৷ এজন্য মা খুশি৷ আমি খুশি৷ মা ওর পছন্দের বেশ কিছু খাবার তৈরি করে রাখলো৷ আমি সময় গুনি৷ এখনো আসে না কেন? মাছ ধরার জিনিষ পত্র ঠিক ঠাক করতে হবে৷ নাহলে তো ফার্স্ট হতে পারবো না!

পয়লা বৈশাখের দু’দিন আগে একটা চিঠি আসলো৷ বড়দা লিখেছে ও আসতে পারবে না৷ নতুন বছরের বর্ষপূর্তি কলেজ থেকে করা হবে৷ তাই কলেজের অনুষ্ঠানে তাকে থাকতে হবে৷ চিঠিটা পড়ে মা এবং আমার দু’জনেরই মন খারাপ হয়ে গেল৷ কিন্ত কিছু করার নেই৷

আজ পয়লা বৈশাখ৷ নদীতে মাছ ধরা উৎসব চলছে৷ আমি একটা পলাই ও খলাই নিয়ে নদীর পাড়ে৷ কয়েকবার নদীতে নামার চেষ্টা করলাম৷ মাছ ধরবো বলে৷ কিন্ত পানি অনেক বেশি৷ আমিতো ঢুবে যাবো৷ তাই বিষন্ন মনে নদীর পাড়ে বসে আছি একাকী৷ পাশে পড়ে আছে অব্যবহৃত পলাই আর খলাই৷ যেগুলো গতবার শেষ ব্যবহৃত হয়েছিল বড়দার চৌকষ হাতে৷ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি৷ আজ গরমটা খুব বেশি৷ এই রোদ কিংবা গরম কোনটাই আমার ভাল লাগে না৷ কিন্ত কেন যেন আজ লাগছে৷ কেননা চোখের জলগুলো গোপনে মুছে ফেলার আগেই তা সহজেই শুকিয়ে যাচ্ছে৷ পানিতে মাতামাতি করবার এই দিনে নোনা পানিটুকু থাক না চোখের গহ্বরে৷

ভাই – পর্ব ২

ভাই – পর্ব ৩

ভাই – পর্ব ৪

ভাই - রবীন জাকারিয়া 

মুগ্ধতা.কম

১১ নভেম্বর, ২০২১ , ১:৫৯ অপরাহ্ণ

রংপুর অঞ্চলের কবিদের লেখা নিয়ে বিশেষ আয়োজন – রংপুরের কবিতা

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করা গেল ‘রংপুরের কবিতা’। আমরা ঘোষণাটি দিয়েছিলাম বিশেষ একটি সময়ে। আমরা চাচ্ছিলাম, রংপুর অঞ্চলের কবিতাগুলো সকল বাংলাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। নানা কারণে আমাদের এই অঞ্চলের ভালো কবিতাগুলো পাঠকের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে না বলে আমরা মনে করি। এরই প্রেক্ষিতে এই বিশেষ সিদ্ধান্ত।

এখানে রংপুরসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার কবিদের কবিতা বাছাই করে প্রকাশ করা হয়েছে। বাছাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তিনজন বিচারক। কাজেই এবারের মতো বেশকিছু কবিতা বাদ পড়েছে যৌথ সিদ্ধান্তে। তবে আমরা কথা দিচ্ছি বিশেষ সংখ্যায় যাদের কবিতা বাদ পড়েছে সেই কবিতাগুলো ধারাবাহিকভাবে অন্য সময়ে প্রকাশ করবে মুগ্ধতা। অনেক চেষ্টার পড়েও ভালো কিছু কবির নাম এই তালিকায় পাওয়া যাবে না। এর কারণ ধরে নিতে হবে, আমরা তাঁদের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি। ভালো কোনো কবির কবিতা যদি সত্যিই যোগাযোগ ছাড়াই বাদ পড়ে থাকে, তাহলে সেগুলো পেলে আমরা নিশ্চয়ই এই সংখ্যায় যুক্ত করে দেবো। আরেকটি বিশেষ ঘোষণা হলো, প্রকাশিত এই কবিতাগুলো প্রিন্ট ভার্সনে পড়া যাবে ‘বিভাগীয় লেখক পরিষদ, রংপুর’-এর একাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিতব্য স্মারকগ্রন্থে। স্মারকগ্রন্থটি আগামী ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হবে।

সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি রংপুরের সেইসব ঋদ্ধ কবির প্রতি, যারা সংখ্যাটিতে নিজেদের কবিতা দিয়ে এটিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

উপদেষ্টা সম্পাদক: ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ
সম্পাদক: মজনুর রহমান
সহযোগী সম্পাদক: আহমেদ অরণ্য
অলংকরণ: রেদওয়ান শুভ

রংপুর অঞ্চলের কবিদের লেখা নিয়ে বিশেষ আয়োজন রংপুরের কবিতা

মুগ্ধতা.কম

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ , ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

বায়জীদ বোস্তামী বাপ্পীর যুগল কবিতা

জোড়া শালিক

দুটো ভেঙে যাওয়া মানুষ জোড়া লাগে-

কাছে রাখা অতীত ভুলে, এঁটে বসে শরীরে;

গন্ধ ভুলে যায়, বসন্ত ছিঁড়ে খায় মগজ-

বৈরী মন, খোলা চাবুকের ছেঁকা হয় ।

 

সমুদ্র স্নান, চোখে ভাসা রোদ্দুর শহর,

শয্যাশায়ী প্রাক্তন, বিছানায় রোজকার ক্লান্তি-

অসুখের বারান্দায় ঝুপড়ি খেলাঘর সব

মুখ বুজে সয়ে যাওয়া খেয়ালি বায়না।

 

কুড়ি বছরের জমে যাওয়া ভুতুড়ে শরীর-

মেঝে-করিডোরে খেলা করে সুখ উল্লাসে।

ছায়ানীড়ে ভরা যৌবন স্মৃতি, সাড়া দেয়;

ভিজে যায় দুটো ভেঙে যাওয়া মানুষ।

পুরনো সংসার, সাজানো বাগান বিলাস-

নিমিষেই, ঘুনে ধরা নিছক স্বপ্ন লাগে।

লিখে রাখা ডায়রির পাতা খসে পড়ে জানালায়-

ক্লান্ত পথিক খুঁজে নিয়েছে ঠিকানা।

 

অসুস্থ আহ্লাদী, নালা-নর্দমায় ভেসে যায়-

পানির কলে নতুন রিংটোন বাজে, মাঝ রাতে;

পাড়ার গলি-গতরে লাল-নীল বাতি জ্বলে

ভ্রমর জুটেছে-গো জোড়া শালিকের দলে।

কবিও খোরাক হয় কবিতার

কবির খেয়ালি খোরাক হয় ‘কবিতা’

না না সে কবিতার কথা বলিনি;

কেউ কবি হয়, কেউ ‘কবিতা’!

 

কখনও শরীর হইনি কারোর-

শরীরী উম্মাদনা লোভ দেখায় কবিতার,

অশরীরী কবিতার!

 

বেঁচে থাকা হয় ডিম-কুসুমের খোলসে

বেঁচে থাকাটাই কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কবি শরীরে খোয়া যেতে পারে না,

আলগা সুখ দুয়ারে কাঁটা হয়।

 

যা ছিল তা শরীরী ‘কবিতায়’ অস্ত যায়-

কবিও খোরাক হয় ‘কবিতার’।

আহসান লাবিব

১৯ আগস্ট, ২০২১ , ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

একগুচ্ছ শুভ্র কবিতা: আহসান লাবিব

১.
উত্তর পত্র

আমার একটা অন্যায় খামের ভিতর
ডাকপিওনের ব্যাগে ঝুলতে ঝুলতে যাচ্ছে;
১০/১১ হাবিবুল্লাহ স্ট্রিট,  রাজধানী __

নিজেকে অপেক্ষার শেকলে বাঁধলাম,
লাম বলে মীম’এ যাওয়ার সাথে সাথেই শেকলে জং ধরে গেলো।

তবুও কোনো কবুতরের ডানা-
আমার বাড়ির দিকে ঝাপটায়নি আজ পর্যন্ত।

২.
বিচ্ছেদের কোনো দু’আ থাকলে

আমাদের কোনো কথা ছিল না
কাগজে কলম শুয়ে থাকতো__

আমি শব্দহীন ঠোঁট নড়াতাম,
সক্কাল সন্ধ্যা তুমি রেলিংয়ে মুখ ঝুলিয়ে রাখো
হাওয়া তোমাকে চিনে ফেললেই বইতে শুরু করে
তুমি মক্কার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে।

মুয়াজ্জিন তোমার কানে আযান পৌঁছে দিলে
তুমি সিজদায় খোদার সাথে কথা বলতে,
আমি দূর থেকে আমিন বলতাম।

তারপর থেকে__
আমাদের এখন আর কোনো কথাই হয় না।

৩.
মনগড়া কবিতা

টেবিলে আঙুল ঠকঠকিয়ে অপেক্ষা গুণন করার পর
কেনো যেনো তুমি ভাগ হয়ে যাও__
ছাদ পেটা ঘরে ঝুলে থাকা সিলিংফ্যানে টলছে
তোমার জন্য লেখা মনগড়া কবিতার কোলাজ।
আজ তুমি নেই,
মনে হয়
দূর কোনো গলির পথে অচেনা ফেরিওয়ালার ঠোঁট।

আমার ঘরের
খুলে রাখা জানালা’র পাঁজর দিয়ে নক্ষত্রের নীড় দেখে
খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকা জোড়া কোয়েল
চেঁচিয়ে যাচ্ছে রাতের কানের কাছে;
প্রেম হোক সবার মুক্তির পথ, হে জেলার মুক্তি দাও।

৪.
হাবিবুন নাজিরা

আম্মার মুখটা নরম মাটির আঁচড়ে আঁকা
আমার শেষ ঠিকানা;
তার চোখ জুড়ে বাছুর ছানার দুরন্ত শৈশব
চুল মেঘলা আকাশে ঢেকে যাওয়া বর্ষাকাল
ঠোঁটে ঘাসের গায়ে জন্ম নেওয়া শিশিরের ফুল
হাতের তালুতে পুকুরের চঞ্চল ঢেউয়ের রেখা
কপালে যেন কৃষকের সোনালি ধানের ক্ষেত
গায়ে যেন জড়িয়ে নিয়েছেন পূর্ণিমার চাদর
পায়ের কদমে কেঁপে ওঠা আমার হৃদ স্পন্দন
আঁচলের গিটে ঝনঝন করা বুধবারের নয়ার হাট
হাঁটু গেড়ে বসা মুনাজাতের অক্ষর, পশ্চিম মুখ

এসব কিছু জড়োসড়ো করে আম্মা
শীতল পাটির মতো
কোল বিছিয়ে বসে থাকা সরল ছায়াবৃক্ষ।