» গল্প

» গল্প

রবীন জাকারিয়া

১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ , ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

সুন্দরী তরুনী

(লেখক কর্তৃক আপলোড করা লেখা। অসম্পাদিত।)

তরুনীটির বাবা স্থানীয় একটা মাদরাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম ছিলেন৷ সৎ আর ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী লোকটা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন তাঁর মাদরাসাতেই৷ স্ত্রী সন্তানদের ধর্মীয় বিধি বিধান, পোষাক-পরিচ্ছদ, নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন৷ পরিবারের সকলেই তা হাসিমুখেই পালন করতো৷ বড় মেয়েটি বিজ্ঞান বিভাগে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে৷ মাস্টার্সের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছে এমন সময় গত বছর তরুনীটির বাবাকে জঙ্গী সন্দেহে পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়৷ পরদিন থানায় বাবার খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলো পুলিশ গতকাল কাউকেও তুলে আনেনি৷ হয়তো কেউ ভূয়া পরিচয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে৷ তাদেরকে বলা হলো একটা মিসিং কেস করে রাখতে৷ পুলিশ তদন্ত করে এর সমাধান দিতে পারবে৷

বাবা হারানো দরিদ্র পরিবারের তরুনীটি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো৷ মা, ছোট দুই ভাই-বোন, আর তার লেখাপড়া খরচ এবং সংসার চালাবে কী করে?
বাবা বেঁচে থাকতেই মাদরাসায় যাওয়া ছাড়া বাহিরে তেমন একটা বের হতোনা৷ বের হলেও হিজাব পড়তো সব সময়৷ ফর্সা, লম্বা আর আকর্ষনীয় তরুনী বের হলেই পাড়ার বখাটেরা টোন করতো৷ শিষ দিতো৷ বলতো ইরানী গোলাপ কিংবা কাশ্মিরি সুন্দরী আরো কত কী৷ সে এড়িয়ে যেত৷

কিন্ত এখন এতসব ভাববার সময় তার নেই৷ সংসারের হাল ধরতে হবে৷ সংসার, ছোট ভাই-বোনদের লেখাপড়ার খরচ, বাড়ি ভাড়া৷ তাই সে প্রথমের দিকে কিছু বাড়িতে কুরআন শিক্ষার প্রাইভেট পড়ানো শুরু করলো৷ কিন্ত বেতন খুবই কম৷ মাসে পাঁচশত টাকার বেশি কেউ দিতে চায়না৷ তাতে সংসার চলেনা৷ তাই সে গণিত, ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয়ের উপর কয়েকটা টিউশনি করাতে লাগলো৷ বাঁধ সাধলো স্টুডেন্টরা৷ হিজাব পড়া থাকলে নাকি তারা ভয় করে৷ তরুনীটি নেকাবটা খুলে পড়াতে লাগলো৷ স্টুডেন্টদের বাবাদের বাজে দৃষ্টি তার এড়ায় না৷ এড়ায়না শিক্ষার্থির মায়েদের চোখ৷ কিছুদিন যেতে টিউশনিগুলি হারিয়ে ফেলে৷ কেননা সে সুন্দরী তরুনী৷

দারিদ্য মানুষকে জেদী করে তোলে৷ ফলশ্রুতিতে তরুনীটি একটি প্রতিষ্ঠানে সেলস গার্ল হিসেবে চাকুরি পায়৷ প্রতিষ্ঠানের ড্রেসকোড অনুসারে তাকে শুধু নেকাব নয় হিজাবটাও খুলতে হয়৷ এখানে সুন্দর করে শাড়ি ও প্রসাধন ব্যবহার করে কাস্টমারদের আকর্ষন করতে হয়৷ বেতন ভালই ছিলো৷ তবে অফিসটাইমটা বেশি৷ সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত৷ তবুও তাকে করতেই হবে৷ তা নাহলে সবাইকে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে৷
প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস আর সততার সাথেই সে চাকরিটা করছিলো৷ কিন্ত ম্যানেজার প্রতিদিন তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বাজে ইঙ্গিত করে৷ সে এড়িয়ে যেতো৷ কিন্ত একদিন অফিস ছুটির পর ম্যানেজার তাকে শারিরীক লাঞ্চিত করতে উদ্যত হওয়ায় কোনভাবে পালিয়ে বাঁচে সুন্দরী তরুনীটি৷

ভাগ্যক্রমে একদিন এক বড় কর্পোরেট অফিসে বসের পিএস হিসেবে চাকরি পেয়ে যায় সে৷ বেতন এতবেশি হবে তা কখনো কল্পনাই করেনি তরুনীটি৷ নতুন অফিস৷ নতুন আইন৷ নতুন ড্রেস কোড৷ এখানে পিএসের ড্রেস কোড হলো স্কাট ও টপস কিংবা প্যান্ট ও শার্ট/টিশার্ট৷
তরুনীটি নতুন আদলে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে থাকে৷ কেননা তার হাতে কোন অপশন নেই৷ আধুনিক আর বাহারি সজ্জায় সজ্জিত অফিস৷ অভিজাত আর কেতাদূরস্ত পোষাকে আবৃত পরচুলায় ঢাকা এক মধ্য বয়সি পৌঢ় যেন জোর করে নিজেকে যুবক প্রমাণে সদা তৎপর৷ কাজে অকাজে নিজের চেম্বারে ডেকে গুলতানি আলাপটাই যেন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ৷ কথার ফাঁকে বস কিছু যেন ইঙ্গিত দেয়৷ না বোঝার ভান করে তরুনীটি৷ ক্ষিপ্ত বস চোখের ইশারায় যেন বোঝাতে চান এর বদলা নেবো৷

কিছুদিন পর অফিসে বিদেশি একটা ডেলিগেট টিম আসলো৷ তারা এই প্রতিষ্ঠানের ফিসিবিলিটি, ভিজিবিলিটি ও সক্ষমতা যাচাই করবেন৷ ইতিবাচক হলে জয়েন ভেঞ্চার ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করবে৷ অফিসে সাজ সাজ রব৷ সকলে ব্যতিব্যস্ত৷ কনফারেন্স রুমে ডেলিগেট টিমের সাথে বস মিটিং করছেন৷ ইন্টারকমে টেলিফোন পেয়ে তরুনীটি সকলের জন্য স্ন্যাক্স ও ব্ল্যাক কফি পরিবেশন করে চলে আসবে কিন্ত বস বসতে বললেন৷ তরুনীটি বসলো৷ পরিচিতি পর্বের ভাষাটা বুঝতে পারলেও পরের সংলাপগুলো বুঝতে পারেনা তরুনী৷

বস বিদেশিদের আস্বস্থ করে যে তাঁদের সমস্ত এন্টারটেইনের ব্যবস্থা করা আছে৷ আর এই দায়িত্বটা পালন করবেন আমাদের পিএস৷ সেদিন রাতে আর বাড়ি ফিরতে পারেনা তরুনীটি৷

পরেরদিন খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় ছোট্ট একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়৷ মৈত্রি সেতুর রেলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় বস্তাবন্দী এক সুন্দরী তরুনীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ৷

সুন্দরী তরুনী
131 Views

মাসুম মোরশেদ

৪ জুন, ২০২২ , ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

সাবালক

ডিগ্রীতে পড়ি। বয়স কুড়িমতো হইবে। দুরবিন দিয়া খুঁজিয়া সারা মুখে কতক বাদামী পশম দেখিতে পাই। আমার নাকের নিচে, ডানে বামের অনুর্বর অঞ্চলে কিছুই জন্মায় না। নিজেকে বড় নাবালক লাগে। ডিগ্রীতে পড়া ছেলেদের কারো কারো ঝাঁকড়া চুল তাহাতে আবার খোঁচা খোঁচা দাড়িতে কেতাদুরস্ত ভাব লইয়া প্যান্টের ব্যাকপকেটে ভাঁজ করা রেখা খাতা লইয়া যখন কলেজে আসে, মাঠে ঘোরে, কলেজের পুকুরপাড়ে তাসের আড্ডায় চুল ঝাঁপিয়ে ট্রাম্পকার্ড ছুঁড়ে বিপক্ষকে ঘায়েল করে কিংবা মেয়েদের দলে বসে বাদাম খুলটে ফুঁ দেয়- আমি ছেলে মানুষটা সেইসব ছেলেদের প্রেমে পড়িয়া যাই। ভাবি, আমার ইহজীবনে কিছুই হইবে না। ক্লিনশেভড মুখ আর সাথে তেমন ঝুলপি চুল যদি রাখিতে পারিতাম তবে আমার মতো সুখী মানুষ বুঝি কমই হইত। কিন্তু তেমন করিয়া রাখিতে পারিব না, কারণ বাবা তাহা পছন্দ করিবেন না। তিনি কঠিন ধাতের মানুষ। অতিবাস্তববাদী লোক। তিনি নিজে সর্বদা ক্লিন শেভ করিয়া থাকেন। তাই সেটাতে অসুবিধা হইবার কথা নহে। তাই সাবালকত্ব লাভের জন্য সেটার চিন্তা করিতেছি।

দোয়ানী বাজারের আজিজুল আমার বাল্যবন্ধু। ও যখন ক্লাশ নাইনে পড়ে তখন ওর সারামুখে ঘনকালো দৃশ্যমান দাড়ি, মোচ। আমি তখন ইন্টারমিডেয়েট সেকেন্ড ইয়ার। খুব বড়রা বাদ দিয়ে পাড়ায় কোন সিনিয়র জুনিয়র নাই। সবাই ভাইভাই, বন্ধু বা বন্ধুর মতো। কীভাবে যেন তাহার সাথে খুব ঘনিষ্ট হইলাম, জানি না। সেই স্বল্পবয়সেই তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতাম। ঠিক সেসময়ই আফসোস করিতাম, আহা, আমার যদি এই মুখখানা হইত! শুধু হাপিত্যেস করিতাম আর ভাবিতাম, কখনো কী আমার তেমন হইবে? ডানহস্তে, বাঁহস্তে নিজের বদনখানি নাড়িচাড়ি আর ভাবি, আমি কি তবে বড় হইবো না?

সেইসবদিনে হকবাজারের বিখ্যাত ভোলা নাপিত যখন বন্ধুর চুল, দাড়ি কাটে আমি অপলক চাহিয়া থাকিতাম। অন্য চেয়ারে বসিয়া মাঝেমধ্যে প্রমানসাইজ আয়নায় আমার নিরসবদনখানি দেখিতাম আর মনে মনে প্রার্থনা করিতাম যেন দ্রুত আমারো তাহার মতো হয়।

কিন্তু যাহা তাহাই! যাহার হয় তাহারই হয়। আমার তাহা নহে।

বন্ধু আমার দুঃখ বোঝে। আমি তখন বি, এ ফার্স্ট ইয়ার। আর সে পড়ালেখা বাদ দিয়া বাড়ির সামনে মুদিখানা দিলো। বিকাল, সন্ধ্যায় তাহার দোকানে আড্ডা মারি আর তাহার সোনাবদনখানি দেখে দেখে কতশত গল্প করি। কথাচ্ছলে সে-ই একদিন বলিল, “শেভ কর্। দুই-চারিবার ক্ষুর পড়িলে প্রচুর গজাইবে।” কথাখানা একান্তই আমার মনের কথা। তাই মনে ধরিল। এই না হইলে বন্ধু কিসের! বন্ধুই তো বন্ধুর গোপন কথা, মনের ব্যথা বুঝিবে, স্বাভাবিক।

ভাবিলাম, তথাস্তু!

বন্ধু যেহেতু মুদিখানা সামলাইতে ব্যস্ত। তাহার আর আমাকে সঙ্গ দেবার সময় নাই বা অযথা ঘোরাঘুরি তাহার শোভা পায় না। তাহার সাথে প্লান প্রোগ্রাম ঠিক করিলাম বটে, কিন্তু একাই যাইতে হইবে এবং তা-ই সাব্যস্ত করিলাম।

বাড়ি হইতে তিন কিলোমিটার দূরে খানসামা হাট। সেইদিকে যাইব। শুক্কোরবার আর সোমবার হাটবার। হাট শুরু হয় দুপুরের নামায বাদ। সেই হাট জমাইয়া তুলিবার জন্য কাজকারবার শুরু হয় সকালবেলা থাকিয়া। ধোয়ামোছাসহ ইত্যকার কাজ। বাঁশের ফোল্লা (ব্যাঙ্ক) কাটিয়া লুঙ্গির খোঁটে ত্রিশ টাকা রাখিলাম। আমাদের বাজারের নাপিত চুলদাড়ি শেভ করা পাঁচ, ছয় টাকা নেয়। শুধু দাড়ি শেভ করিতে তিন টাকা লাগিত। কেউ কেউ দুই টাকাও দিয়া থাকেন। নাপিতরাও সেই টাকা কপালে ঠেকাইয়া ক্যাশবাক্সে রাখিতেন। খানসামায় যদি অনেক বেশি চায় বা নেয়, তাই অপদস্ত হইবার ভয়ে ত্রিশ টাকাই লুঙ্গির কোঁচে রাখিলাম। এখানে বলিয়া রাখি, আমাদের ছাত্রাবস্থায় গ্রামাঞ্চলে তখনো ফুলপ্যান্ট পরে ঘোরার চল শুরু হয়নি। শহরে চলে সেটা বেশ। তবে দুইএকজন, যাহারা শহরে পড়িত, হোস্টেলে বা মেসে থাকিত, সেই সময় তাহাদের কেউ কেউ গ্রামে আসিলে প্যান্ট পরিয়া বেড়াইত। অবশ্য আরামকে ভুলিয়া সেটা মেয়েদের দেখানো বা উন্নতজাতের ছাত্র হিসেবে নিজেকে তুলিয়া ধরিতে তাহা করিত। কিন্তু আমরা যাহারা নিয়মিত গ্রামে থাকি তাহারা কখনো নয়। এমনকি শহরে সিনেমা দেখিতে যাইতাম লুঙ্গি পরিয়া। অন্য আরেকটা সত্য হইল আমাদের কেহ কেহ লুঙ্গি পরেই কলেজে ক্লাশ করিত পিছনে বসিয়া।

যাইহোক, বিভিন্ন ঘোরা পথ ব্যবহার

মাসুম মোরশেদের রম্যগল্প -মাসুম মোরশেদ

রবীন জাকারিয়া

৪ জুন, ২০২২ , ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

কোডাক ক্যামেরা

শাহেদ ভীষণ বিরক্ত হয়ে আছে৷ সারাটা বাড়ি তন্ন তন্ন করেও সে তার অত্যন্ত একটা জরুরি ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না৷ ভয়াবহ ব্যাপার! ওটার ভেতরে নিজের সমস্ত একাডেমিক সার্টিফিকেট, বাড়ির মূল দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রাখা আছে৷ ফাইলটার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই সে ফাইলের কভারে মার্কার পেন দিয়ে বড় বড় হরফে লিখে রেখেছে “কাগজপত্রের মূলকপি”৷ অথচ এখন উধাও৷ সে কখনো এতো দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়৷ জীবনে এমন ঘটনা ঘটেনি৷ সে এত পরিপাটি যে কোন জিনিস কোথায় আছে তা অন্ধকার বা বিদ্যূত চলে গেলেও বের করতে পারবে৷ কয়েল, মোমবাতি, দিয়াশলাই কিংবা টর্চলাইটটা কোথায় রাখা আছে তা ওর নখদর্পনে৷ কিন্ত এখন সে কোনোটাই জায়গামত পায় না৷ এটা শুরু হয়েছে বিয়ের পর থেকে৷ এখনকার বউরা কোনো কাজই সঠিকভাবে করতে চায় না৷ শুধু দায়সারা কাজ৷ দরজার চাবিটা ঠাশ করে কোথায় রাখল সেটাই খুঁজতে নষ্ট করে ফেলে আধা ঘন্টা৷ শাহেদ এত বলে সঠিক স্থানে রাখ দেখবে তোমারই সুবিধা হবে৷ কিন্ত কে শোনে কার কথা৷ গত তিরিশ বছর ধরে একই চিত্র৷ বদলায় না কিছুই৷ না অভ্যাস আর না ভোগান্তি৷ অথচ আমাদের মায়েরা কত কষ্ট করে সংসার চালাত৷ সীমিত আয় আর অনেক সন্তানসহ যৌথ পরিবারের সীমাহীন কাজ শেষেও সবকিছু ছিল তাদের নখদর্পণে৷ তাঁরা সংসারটাকে Own করতেন৷ কিন্ত এখনকার মেয়েরা তা করে না বোধ হয়৷

শাহেদ কিছুটা সময় খোঁজাখুঁজিতে ক্ষান্ত দিলো৷ মেজাজটাকে ঠান্ডা করে চিন্তা করল৷ নতুন করে খুঁজতে হবে৷ যেভাবেই হোক ফাইলটা তাকে পেতেই হবে ৷ কারণ ঐ ফাইলে রাখা কিছু কাগজপত্র তার খুবই জরুরি৷ আর কিছুদিনের মধ্যে তাকে LPRএ যেতে হবে৷ সরকারি প্রসিডিউর মেইনটেইন আর কাগজপত্র সাবমিট করতে করতে এমনিতেই তার ত্রাহি অবস্থা৷ এর মধ্যে ফাইল খোঁজাটা যেন গোঁদের উপর বিষফোঁড়া৷

বেশ কিছু পর শাহেদ আবারো ফাইলটা খোঁজা শুরু করল৷ বইয়ের আলমারি, ফাইল কেবিনেট এবং অবশেষে স্টিল আলমারি৷ পাওয়া গেল সিন্দুকের ভেতর৷ নিশ্চয়ই এটা তার স্ত্রী শেলী এখানে এনে রেখেছে৷ এটা নিশ্চিত আর যাই হোক সিন্দুকে সে ফাইলটা রাখেনি৷ রেখেছিল স্টিল আলমারিতে৷ যাক পাওয়াতো গেল৷ টেনশন কমলো৷ সে ফাইলটা বের করতে যাবে এমন সময় তার চোখে পড়ল ক্যামেরাটা৷ অনেক পুরোনো দিনের কোডাক ক্যামেরা৷ যেগুলো দিয়ে ছবি তুলতে ‘ফিল্ম রোল’ এর প্রয়োজন হতো৷ সেসময় ফুজি ফিল্ম জনপ্রিয়তার তুঙ্গে৷ এখনতো সব ডিজিটাল৷ আর সকলের হাতেই ক্যামেরা৷ মোবাইলে ক্যামেরা৷ ডিজিটাল ক্যামেরা কত কী! কিন্ত সে সময় একটা ক্যামেরা মানে একটা এসেট৷ আভিজাত্য৷ লোকে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে দর্শনীয় স্থানে ভ্রমন করত অনেকটা গর্বের সাথে৷ পিকনিক কিংবা কোন অনুষ্ঠানে বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের কাছ থেকে ক্যামেরা ধার করে সকলে চাঁদা তুলে ফিল্ম কেনা হতো৷ এরপর সকলে সমানুপাতিক হারে ছবি তুলত৷ গ্রুপ ছবি৷ সিঙ্গেল ছবি৷ সবচেয়ে মজার ব্যাপার হতো ক্যামেরা সামনে ধরার আগে পর্যন্ত সকলে নরমাল থাকত৷ কিন্ত ছবি তোলার সময় কেন যেন সকলেই নার্ভাস হয়ে যেত৷ দাঁড়ানো, হাত দুটো সঠিকভাবে রাখা কিংবা মুখের হাসি সবকিছুই অস্বাভাবিক হতো৷ সে সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টাইলটা ছিল দুই বন্ধু হ্যান্ডশেকরত অবস্থায় ছবি তোলা৷ যার কারণে বেশিরভাগ ছবি ভাল হতো না৷ অবশ্য সে মূল্যায়ন করবার সক্ষমতাও ছিল না৷

একটা রিল ফিল্ম দিয়ে ৩০-৩৫টি ছবি তোলা যেত৷ তারপর ফিল্ম ডেভেলপ৷ পরিশেষে ল্যাবে ছবি ওয়াশ৷ আহ্ কী সময় ছিল৷ শাহেদ ক্যামেরাটা দেখতে পেয়ে নস্ট্রালজিক হয়ে পড়লো৷ মনে পড়লো কীভাবে সে ক্যামেরাটা কিনেছিল৷ স্বপ্ন থাকলেও বেকার শাহেদের পক্ষে ক্যামেরা কেনা অসম্ভব ছিল৷ একদিন এক বন্ধু ওকে সেটা কিনতে বলায় সে হাসি দিয়ে বলেছিল “আমাকে বিক্রি করলেও ওটা কিনতে পারব না৷ অসম্ভব! তখন বন্ধুটি জোর করে ওর হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে বলেছিল তুই যা পারিস তাই দে৷ দরকার হলে পরে টাকা দিস৷ তবুও এই অলক্ষুণে জিনিসটা তুই নিয়ে নে৷ শাহেদ বলল, অলুক্ষণে মানে কী? বন্ধুটি বললো এটা অভিশপ্ত ক্যামেরা৷ এটা দিয়ে প্রথম যে ছবিটা তুলেছি সেটা হলো আমার মায়ের৷ ছবি তোলার দু’দিন পর মা হঠাৎ মারা গেলেন৷ শাহেদ হেসে বলল এতে কি প্রমাণ হয় এটা অভিশপ্ত? বন্ধুটি বলল আরেকটি কারণ আছে৷ সেটা হলো এর লুকিংটা কেমন ভূতুরে আর মাঝে মাঝে নিজে থেকেই “ক্লিক” শব্দ করে উঠে৷ আমার ভয় করে৷ এখন তুই নিলে নে৷ নাহলে এটা ভেঙে ফেলব৷ শাহেদ এসব আজগুবি আর ভূতুরে গল্পে বিশ্বাসী নয়৷ তাই সে ক্যামেরা নিল৷

মনে পড়ে সেই বিশেষ দিনের কথা৷ যেদিন শাহেদ ফিল্ম লোড করে ক্যামেরাটা নিয়ে বাড়িতে এলো৷ তা দেখে আব্বা-মা, ভাই-বোন সকলে খুশি৷ আমার একটা ছবি তোল, আমার একটা ছবি তোল বলে সবাই হুড়োহুড়ি৷ কিন্ত শাহেদের এক কথা এটা দিয়ে প্রথম ছবি তুলবো আব্বা-মা’র যুগল ছবি৷ তারপর অন্যদের৷ আব্বা কেবল অফিস থেকে ফিরেছেন৷ তাঁদেরকে বলা হলো ভাল ড্রেস আর একটু মেকআপ করার জন্য৷ বাবা স্যুট-টাই পরলেন৷ আর মাকে শাহেদের বোন সুন্দর একটা লাল শাড়ি পরিয়ে আর সাজিয়ে নিয়ে এলো৷ সব রেডি৷ ছবি তোলার স্পট পছন্দ হচ্ছিল না৷ অবশেষে বাড়ির ভেতর ছোট্ট গোলাপ বাগানের মাঝে তাঁদের বসানো হলো৷ ছবি তোলার ঠিক আগ মূহুর্তে তার বাবা বলে উঠলেন, তোল৷ ভাল করে ছবিটা তুলে রাখ৷ এটাই জীবনের শেষ ছবি৷ এ কথা শোনামাত্রই শাহেদের মা ভীষণ রাগান্বিত হলেন৷ বললেন, এসব কী অলুক্ষণে কথা বলো? মন খারাপ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি উঠে চলে গেলেন৷ বললেন তিনি আর ছবিই তুলবেন না৷ শত চেষ্টা করেও তাঁর ছবি তোলা হলো না৷ আচমকা এমন ঘটনার ফলে সেদিন ঐ একটি ছবি ছাড়া আর কারোরই ছবি তোলা হলো না৷ আনন্দটা নষ্ট হয়ে গেল৷

দু’দিন পর শাহেদের বাবা হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা গেলেন৷ বাবার মৃত্যুর পর সংসার, জীবন-জীবিকার তাগিদে সকলে ক্যামেরার কথা ভুলেই গেল৷ এমনকি শাহেদও৷ আজ প্রায় তিরিশ বছর পর ক্যামেরাটা দেখে সবকিছু যেন ছবির মত ভেসে উঠল৷ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো৷ কৌতুহল বশে শাহেদ ক্যামেরাটাকে হাতে নিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল৷ আজ বন্ধুর কথাটা সত্য মনে হলো৷ আসলেই এটা দেখতে কেমন ভূতুরে৷ সে এগুলো পাত্তা দেয় না৷ পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই৷ এমন সময় ক্যামেরার সাটারটা একাই ক্লিক করে উঠলো৷ যেন কেউ একজন একটা চোখ টিপে দিলো৷ শাহেদ মজা পেল৷ ফিল্ম না থাকার পরও সে তাই মোবাইলে সেলফি তোলার মতো করে একবার ছবি তোলার বাটন চাপলো৷ এরপর খুঁজে পাওয়া ফাইলটা বের করল৷ আর আলো বাতাসে রাখবে বলে ক্যামেরাটা ড্রইং রুমের খোলা বুক শেলফে রেখে দিলো৷

দু’দিন পর শাহেদের বাড়িতে প্রচুর লোকের সমাগম৷ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, কলিগ, পাড়া-প্রতিবেশিতে ভরপুর৷ হঠাৎ স্ট্রোক করে শাহেদ আজ মারা গেছে৷ অস্বাভাবিক ব্যাপার৷ কেউ মানতে পারছে না৷ সকালেও সুস্থ্ একটা মানুষ ফজরের নামাজের পর জগিং শেষে ফ্রেকফাস্ট সারল৷ হালকা রসিকতা আর কথাবার্তায় পরিবারের সকলকে আনন্দে ভরে দিলো৷ অথচ হঠাৎ নেই হয়ে গেল৷

চারিদিকে কান্না আর হাহাজারিতে সারাটা বাড়ি বেদনায় ভরপুর৷ লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ এসময়ে কান্নার বাঁধ যেন আরো ভেঙে পড়ল৷ কত লোক যে শেষকৃত্যের জন্য এসেছে তার হিসাব নেই৷ সকলেই পরিচিত নয়৷ বেশিরভাগই অচেনা৷ লাশ কাঁধে তোলার সময় চিৎকার শুনে এক তরুণ ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে এলো৷ হাতে একটা শপিং ব্যাগ৷ লাশের পিছু পিছু এলোমেলোভাবে পা ফেলে হাঁটছে তরুণ৷ ওকে দেখে সকলে দুঃখ পাচ্ছে এই ভেবে যে সে হয়তো মরহুম শাহেদের নিকটাত্মীয়৷ তাই সে কষ্টটা নিতে পারছে না৷ ধীরে ধীরে সেই তরুন একটা সময় লাশ দাফনের লাইন থেকে বেরিয়ে অন্য পথ ধরে৷ হাতে থাকা শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে “ক্লিক” শব্দটি কানে পৌছায় না মাদকাসক্ত সেই তরুণের৷ যার ফলে সে বুঝতে পারলো না শপিং ব্যাগে করে চুরি করা জিনিসটা শুধু কোডাক ক্যামেরা নয় বরং অদ্ভূতুরে ও অভিশপ্ত এক সিরিয়াল কিলার৷ আর যার পরবর্তী নিশানা হয়তো সে-ই৷

 

রবীন জাকারিয়ার গল্প - কোডাক ক্যামেরা

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

২৯ মে, ২০২২ , ১০:১৭ অপরাহ্ণ

প্রযত্নে নীলা

লোকটার বয়স কত হবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। চুল, দাড়ি এমনকি ভ্রু পর্যন্ত সাদা। মারুফের ধারণা বয়স ৭৫ বছর তো হবেই। কথা বলার সময় দাঁত দেখা যাচ্ছে না, তাই দাঁত আছে না নাই, তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে উচ্চারিত কথা ভেসে আসার সময় শব্দই বলে দিচ্ছে সামনের দাঁত কয়েকটা তার নাই। এই খেলাটা খেলতে মারুফের ভালো লাগে।  সামনের যে কোনও একজন লোক সম্বন্ধে ধারণা করতে। সবসময় মেলে না তবে মারুফ দেখেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলে যায়। লোকটা রসিক, লোক না বলে বৃদ্ধ বলাই মনে হয় ভালো। বৈকুন্ঠপুরের এই জৈষ্ঠের দুপুরে কাঁঠাল গাছের নিচে টং এ বসে লোকটার কথা শুনছে মারুফ। এদিকে কখনো আসা হয়নি আগে, যদিও রংপুর শহর থেকে বারো -তেরো কিলোমিটার দূর, তারপরও। সে এসেছে একটা বইয়ের পার্সেল ডেলিভারি দেবার জন্য।

প্রযত্নে,
নীলা, বৈকুন্ঠপুর, রংপুর।

এটুকুই ঠিকানা, সাথে মোবাইল নম্বর। প্রেরকের ঠিকানাটাও অদ্ভুত, শুধু লেখা-

প্রেরক,
নীল আর মোবাইল নম্বর।

নাম দুটো দেখে হাসি পায় মারুফের। নিশ্চিত নকল নাম। আসলে সম্পর্ক দানা বাঁধে না বলেই গোপন নাম প্রকাশ্যে চলে আসে। গোপন নামে সেও তো ডাকত সুলতানাকে, নয়না নামে। নয়না কেমন আছে? কতদিন পর তার নাম মনে পড়ল। পেটভাতে একটা চাকরি করে আর যাই হোক মনে প্রেম আসে না।

আহ,আজ এত গরম। বৃদ্ধ এখন সাপের গল্প বলছে। বুঝলা মিয়া, বলাটা কানে মনে হলো, ভুজলা মিয়ারা। মুই সাপের মনি দেখছুনু একবার বাঁশের ঝাঁড়োত। চইত মাস, মুই তখন চেংড়া মানুষ। রাইত বারোটার সম কতাকলি সিনেমা হলোত রুপবান ছিনেমা দেখি আসছুনু। মোর বাড়ির গোড়ত একখান বড় বাঁশের ঝাড় আছিল। ওটা পার হয়ে মোর বাড়ি। এলাও নাম আচে ওটার, আন্ধার বাঁশের তল। দিনের বেলাতো ওটে সূর্যের আলো ঢুকছিল না। ডাকাতের ভয়ত লোকজন এটে রাইতোত আইসে না। মুই তখন তাগড়া জোয়ান, এক বসাত একখান কাডোল খায়া খেলবার পারছুনু। মোর অতো ভয় আছিল না। বাঁশের আড়াতের মাজের রাস্তা দিয়া যাওছুনু। এটুকু বলেই মারুফের মুখের দিকে তাকায় বৃদ্ধ। একটু ঘোলা চোখ।চোখে কি ছানি আছে? মনে হয় আছে। চোখ পিটপিট করে জিজ্ঞেস করে,তোরা ক্যায় বাহে? তোমাক তো চিননো না?

আমি কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করি। একটা পার্সেল ডেলিভারি দিতে আসছি, বলে মারুফ। আপনার গল্প শুনছি, খুব মজা করে গল্প বলতে পারেন আপনি।

এই ছ্যামড়া কয় কি? এগুলা গল্পো নোয়ায় সত্যি ঘটনা।

পাশে বসা লোকজন অধৈর্য হয়ে ওঠে, আরে তোরা থোন তো আন্দাসুন প্যাচাল। গল্পোটা শ্যাষ করেন।

বৃদ্ধ মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে। নিশ্বাস নেয় শব্দ করে, মাথা কাঁধ ওঠানামা করে দ্রুত।

কী হইল তোমার বাহে? ঘুমাইনেন নাকি?কতা কন না কেন তা?

বৃদ্ধ মাথা নিচু করে আরও, চিবুক মিশে যায় বুকের সাথে। কোনও দিকে খেয়াল নাই।

টং এর সামনের চায়ের দোকানদার বলে, বুড়া ঘুমি গেইছে। এলা উয়াক চা, বিস্কুট, পান না খওয়াইলে কতা কবার নয়।

ধান কাটামারা শেষ। লোকজনের হাতে টাকা আছে। বিকালে নতুন চামড়ার সেন্ডেল আর প্রিন্টের শার্ট পরে শ্যামপুর বন্দরে যায়। চায়ের দোকানে বসে আলোচনা করে দেশ, ধর্ম আর নারীদের নিয়ে। শ্যাখের বেটি কী করলো, কী করা  দরকার ছিল এসব নিয়ে জোর আলোচনা হয়। চৈত্রের এই দুপুরে বাসায় থাকা কঠিন, আড্ডা বসেছে তাই এই টং এ।

রহিমুদ্দিন গজগজ করে লুঙ্গির কোচায় হাত দিয়ে টাকা বের করে। চা দিতে বলে দোকানদারকে।

বেশ জোরেই চায়ের অর্ডার দেবার কারণেই কি না, বৃদ্ধ জেগে ওঠে। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, মাঝ ঘাটাত আসি দ্যাকো আলো আর আলো, বাঁশের তলা উজাল হয়া গেইছে। একনা আগে গিয়া দেখো, দুইটা সেইরম বড়ো সাপ মারামারি করোচে আর একখান পাথর থাকি সেই আলো বেরাওচে। মুই বুঝবার পারনু এটা সাপের মাথার মনি। মুই আগবার গেনু, সেই শব্দ করোচে, ফোঁস ফোঁস শব্দোত, কান তালা নাগি যাবার অবস্থা। দৌড়ি বাড়ি চলি গেনু। হুড়োহুড়ি করি একখান ডালি নিয়া ফির আসি দ্যাকো কোনো কিছুই নাই। খালি ঐ জায়গাটা পুড়ি কালা হয়া গেছে। মুই ছুটাছুটি করনু, এপাক, ওপাক, কিছুই নাই। গলা জড়িয়ে আসে বৃদ্ধের, আবারও মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে পরে। কয়েক মুহুর্তেই আবার গা ঝাড়া দিয়ে, চায়ে চুমুক দিয়ে শব্দ করে, আহ্। মাথা দোলায়, চোখ বন্ধ করে।

তারপর কী হলো? মারুফ অধৈর্য হয়ে বলে বসে। বলেই লজ্জা পায় কিন্তু কেউ বিষয়টা খেয়াল করে না, যেন এ প্রশ্নটা সবার।

মোবাইল বেজে ওঠে, লক্ষ্য করে দেখে নীলা ফোন দিয়েছে।

হ্যালো, ম্যাম আর কতক্ষণ বসে থাকব?

আপনি কোথায়?  এই তো বৈকুন্ঠপুর, পুটিমারিতে একটা চায়ের দোকানে।

আরে ওখানে গেছেন কেন? আপনাকে না বললাম, জোদ্দার পাড়ায় আসেন।

ওহ্, আমি তাহলে শুনতে ভুল করেছি।

আসেন, তাড়াতাড়ি। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

মারুফ তবুও বসে থাকে, অধীর আগ্রহে তাকিয়ে সবার মতো বৃদ্ধের দিকে। তার তাড়া আছে আরও একটা প্যাকেট ডেলিভারি দিতে হবে। নীলা অপেক্ষা করছে নীলের পাঠানো প্যাকেটের জন্য। জনা দশেক লোক আর চায়ের দোকানদার সবাই চুপ করে আছে। সবাই অপেক্ষা করছে, গল্প শুরুর। বৃদ্ধ মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

প্রযত্নে নীলা - ফেরদৌস রহমান পলাশ

মুগ্ধতা.কম

২৯ মে, ২০২২ , ১০:০৬ অপরাহ্ণ

পরমাণু গল্প

করোনা পজিটিভ

বাবা, আমার করোনা পজিটিভ হলে কি আমাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসবে?
ছেলের এমন প্রশ্ন শুনে বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে, ‘না বাবা, কোনদিনও না, কখনোই না। বাবারা কখনোই ছেলে-মেয়েদের বোঝা মনে করে জঙ্গলে ফেলে আসে না। বাবা তুমি বাড়ি থেকে বের হবে না, তাহলে তোমাকে করোনা ধরতেই পারবে না।’

_______________________________

এন্ড্রয়েড মোবাইল 

শিলা ও সাগরের ডিভোর্স হয়ে গেলো আজ। সাগরের উপহার গুলো ফেরত দিলো শিলা। ফেরত উপহারের মাঝে  স্বামীর দেওয়া শেষ উপহার এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটিও ছিলো। যা ডিভোর্সের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

___________________________

ঘুষখোরের লাশ

সারাজীবন ঘুষ খেয়ে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন জামাল উদ্দিন সাহেব। কিন্তু ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে পারেননি।
জামাল উদ্দিনের লাশ বিশাল অট্টলিকা বাড়ির আঙ্গিনায়। ৩ ছেলে ও ২ মেয়েরা জামাইসহ  এসেছেন। লাশ দাফন করার আগেই ছেলে মেয়েদের মাঝে মারামারি লেগে গেলো বাসার ভিতর। তুমুল মারামারি। আত্বিয়স্বজন সেই মারামারি থামাতে ঘরে ছুটলেন।
লাশ পড়ে রইলো একা।

সেই সুযোগে একদল কুকুর লাশকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেললো নিমিষেই। এলাকাবাসীর কেউ-ই আগে কখনো কুকুরগুলোকে দেখেছেন বলে মনে পড়লো না কারোই।
______________________________

সতীনের ছেলে

সতীনের একমাত্র ছেলেকে ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়ায় শবনম।

দ্বিতীয় স্বামীর ঘর ভাঙার ভয়ে সতীনের ছেলেকে খাওয়ানো শুরু করলেও তার মুখ দেখতে চায় না সে।
________________________

পরীক্ষায় পাশ

ছাত্র: স্যার, দেখি আমায় আপনি কিভাবে ফেল করান!

স্যার: গুড, তাহলে এবার তুমি ভালোই পরীক্ষা দিয়েছো?

ছাত্র: আমি এবার পরীক্ষাই দেইনি।
__________________

নতুন সকাল

সারারাত অপেক্ষায় থাকলো রাশেদ। গতকাল সকলে বলেছে, আগামীকাল একটি নতুন সকাল আসবে, সব দুঃখ কষ্ট চলে যাবে। সম্ভবনাময় আলোকিত হবে সব।

কিন্তু কোথায়? তার যেভাবে সকাল শুরু হয় সেভাবেই শুরু হলো। জীর্ণশীর্ণ  ছেঁড়া কাঁথায় বেড়িয়ে যাওয়া পা আজও বেড়িয়েছে। বিকট যান্ত্রিক আওয়াজে ঘুম না আসা সকাল সেই-ই। তবে নতুন সকাল কই?
___________________________

একটু হাসি

আকবর সাহেবের বিয়ে হয়েছে দশ বছর। মাত্র দুই দিন হলো তিনি প্রথম বাবা হলেন। কিন্তু বাবা হয়েও তিনি তার সন্তানকে কোলে তুলে নিতে পারছেন না। জন্মের পর হতেই তার সন্তান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের. … তে।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রতিদিন দুপুরে আসে আর একটি কথাই বলে- আকবর সাহেবকে ‘বাবু হেসেছিলো একবার’। ডাক্তার ১০ দিন যাবত এই একই প্রশ্ন করছেন আকবর সাহেবকে। যতবারই তিনি প্রশ্নটি শোনেন ততবারই তার কান্না পায়।
__________________

ত্রাণের চাল

চালের বস্তা দুর্বল হলে যা হয়। এক পাশে ফুটো হয়ে ধড়-ধড় করে পড়তে শুরু করলো। মাথা থেকে নামাতে নামাতে বেশ কিছু চাল রাস্তায় ইট পাথরে মিশে গেলো।

রহিমা শাড়ির আঁচল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নিলো। তাতে ঠিকমতো ঢাকা হলো না বুকটা।

ইজ্জত! হায়রে গরীবের ইজ্জত!

সাতদিন পর আজ পেলে ত্রানের চাল। তিনদিন অভুক্ত ছেলে মেয়েরা পথ চেয়ে আছে তার।

রোদে তপ্ত পিচ ঢালা রাস্তায় জোড়ে জোড়ে পা চালায় রহিমা।
_______________________

সুদের টাকার বাড়ি

মহিবর চাচা সুদের ব্যবসা করেন। উনি মনে করেন তিনি অভাবী মানুষকে প্রয়োজনের সময় টাকা দিয়ে সাহায্য করছেন। বিনিময়ে কিছু টাকা নিচ্ছেন। তিনি এই সুদের টাকা দিয়ে একটি তিনতলা বাড়ি বানালেন। এলাকার লোকজন সেই বাড়ির নাম দিলো ‘সুদের টাকার বাড়ি’।
________________________

পরিষ্কার হাত

আবুল সাহেব এক পুরোনো দোকানে একটি মজার আয়না পেলেন। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পর আয়নার সামনে ধরলে সহজেই বোঝা যাবে হাত পরিষ্কার হয়েছে কিনা?

অফিস থেকে বাসায় ফিরে বার বার হাত ধোয়ার পরেও আবুল সাহেবের হাত পরিষ্কার হচ্ছে না!

উনি স্পষ্টই বুঝলেন ঘুষখোরের হাত কখনই পরিষ্কার হয়না।
__________________________

মায়ের মৃত্যু

মায়ের মৃত্যু সইতে পারলো না টগবগে যুবক শাহজাদা। মাত্র সতেরো ঘন্টার মধ্যে নিজেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো সে।
___________________________

ইচ্ছের মৃত্যু

টুটুল আর সিমু পাশাপাশি নির্জনে বসে থাকার সময় টুটুলের খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো সিমুর গালে চুমু খেতে। কিন্তু ইচ্ছের মৃত্যু হলো অঙ্কুরেই। ইচ্ছের বাস্তবায়ন করতে যদি পাঁচ বছরের ভাল বন্ধুত্বই নষ্ট হয়ে যায়!

____________________

বন্যা শিশু

বানের জল এক্কা দোক্কা খেলে

অভুক্ত থেকে যায় সদ্য জন্মনেয়া শিশুটি

যেখানে জন্মদেয়ার পর জ্ঞান না ফেরা মা আর কষ্ট পায় না।

প্রসব বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছিলো ক্ষুদার জ্বালা, আর কোন কষ্ট নেই মায়ের

সব কষ্ট দিয়ে গেছে সদ্য জন্মনেয়া শিশুটিকে।

কোথায় আজ সমাজ?

তাকে কী ঠাঁই দেবে বানের জলে ভেসে যাওয়া ভিটে?

১৯৮৮ সালের বন্যায় জন্মনেয়া মা

২০১৭ সালে জন্মদিল মেয়ের।

বানের জলের মতো ভাসতে-ভাসতে শেষ ঠাই হয়েছিল কছিম উদ্দিনের কুঁড়ে ঘরে,

বানের জলের সাথে চলে যাওয়া মায়ের প্রাণটা তছনছ করে দিলো আরেকটি শিশু কন্যার জীবন।

বানের জল এক্কাদোক্কা খেলে

খেলে যায়-দূর দিগন্ত কাছে দেখা যায় না,

শুধু দেখা যায় অবাধ্য জলময় দেশ।

পরমাণু গল্প - আসহাদুজ্জামান মিলন

মুগ্ধতা.কম

২৭ মে, ২০২২ , ১২:৪৩ অপরাহ্ণ

সাবালক

ডিগ্রীতে পড়ি। বয়স কুড়িমতো হইবে। দুরবিন দিয়া খুঁজিয়া সারা মুখে কতক বাদামী পশম দেখিতে পাই। আমার নাকের নিচে, ডানে বামের অনুর্বর অঞ্চলে কিছুই জন্মায় না। নিজেকে বড় নাবালক লাগে। ডিগ্রীতে পড়া ছেলেদের কারো কারো ঝাঁকড়া চুল তাহাতে আবার খোঁচা খোঁচা দাড়িতে কেতাদুরস্ত ভাব লইয়া প্যান্টের ব্যাকপকেটে ভাঁজকরা রেখা খাতা লইয়া যখন কলেজে আসে, মাঠে ঘোরে, কলেজের পুকুরপাড়ে তাসের আড্ডায় চুল ঝাঁপিয়ে ট্রাম্পকার্ড ছুঁড়ে বিপক্ষকে ঘায়েল করে কিংবা মেয়েদের দলে বসে বাদাম খুলটে ফু দেয়- আমি ছেলে মানুষটা সেইসব ছেলেদের প্রেমে পড়িয়া যাই। ভাবি, আমার ইহজীবনে কিছুই হইবে না। ক্লিনশেভড মুখ আর সাথে তেমন ঝুলপি চুল যদি রাখিতে পারিতাম তবে আমার মতো সুখী মানুষ বুঝি কমই হইত। কিন্তু তেমন করিয়া রাখিতে পারিব না, কারণ বাবা তাহা পছন্দ করিবেন না। তিনি কঠিনধাতের মানুষ। অতিবাস্তববাদী লোক। তিনি নিজে সর্বদা ক্লিন শেভ করিয়া থাকেন। তাই সেটাতে অসুবিধা হইবার কথা নহে। তাই সাবালকত্ব লাভের জন্য সেটার চিন্তা করিতেছি।

দোয়ানী বাজারের আজিজুল আমার বাল্যবন্ধু। ও যখন ক্লাশ নাইনে পড়ে তখন ওর সারামুখে ঘনকালো দৃশ্যমান দাড়ি, মোচ। আমি তখন ইন্টারমিডেয়েট সেকেন্ড ইয়ার। খুব বড়রা বাদ দিয়ে পাড়ায় কোন সিনিয়র জুনিয়র নাই। সবাই ভাইভাই, বন্ধু বা বন্ধুর মতো। কিভাবে যেন তাহার সাথে খুব ঘনিষ্ট হইলাম, জানি না। সেই স্বল্পবয়সেই তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতাম। ঠিক সেসময়ই আফসোস করিতাম, আহা, আমার যদি এই মুখখানা হইত! শুধু হাপিত্যেস করিতাম আর ভাবিতাম, কখনো কী আমার তেমন হইবে? ডানহস্তে, বাঁহস্তে নিজের বদনখানি নাড়িচাড়ি আর ভাবি, আমি কি তবে বড় হইবো না?

সেইসবদিনে হকবাজারের বিখ্যাত ভোলা নাপিত যখন বন্ধুর চুল, দাড়ি কাটে আমি অপলক চাহিয়া থাকিতাম। অন্য চেয়ারে বসিয়া মাঝেমধ্যে প্রমানসাইজ আয়নায় আমার নিরসবদনখানি দেখিতাম আর মনে মনে প্রার্থণা করিতাম যেন দ্রুত আমারো তাহার মতো হয়।

কিন্তু যাহা তাহাই! যাহার হয় তাহারই হয়। আমার তাহা নহে।

বন্ধু আমার দু:খ বোঝে। আমি তখন বি, এ ফার্স্ট ইয়ার। আর সে পড়ালেখা বাদ দিয়া বাড়ির সামনে মুদিখানা দিল। বিকাল, সন্ধ্যায় তাহার দোকানে আড্ডা মারি আর তাহার সোনাবদনখানি দেখে দেখে কতশত গল্প করি। কথাচ্ছলে সে-ই একদিন বলিল, “শেভ কর্। দুই-চারিবার ক্ষুর পড়িলে প্রচুর গজাইবে।” কথাখানা একান্তই আমার মনের কথা। তাই মনে ধরিলো। এই না হইলে বন্ধু কিসের! বন্ধুই তো বন্ধুর গোপন কথা, মনের ব্যথা বুঝিবে, স্বাভাবিক।
ভাবলাম, তথাস্তু!

বন্ধু যেহেতু মুদিখানা সামলাইতে ব্যস্ত। তাহার আর আমাকে সঙ্গ দেবার সময় নাই বা অযথা ঘোরাঘুরি তাহার শোভা পায় না। তাহার সাথে প্লান প্রোগ্রাম ঠিক করিলাম বটে, কিন্তু একাই যাইতে হইবে এবং তা-ই সাব্যস্ত করিলাম।

বাড়ি হইতে তিনকিলোমিটার দূরে খানসামা হাট। সেইদিকে যাইবো। শুক্কোরবার আর সোমবার হাটবার। হাট শুরু হয় দুপুরের নামাযবাদ। সেই হাট জমাইয়া তোলার জন্য কাজকারবার শুরু হয় সকালবেলা থেকে। ধোয়ামোছাসহ ইত্যকার কাজ। বাঁশের ফোল্লা ( ব্যাঙ্ক) কেটে লুঙ্গির খোঁটে ত্রিশ টাকা রাখিলাম। আমাদের বাজারের নাপিত চুলদাড়ি শেভ করা পাঁচ, ছয় টাকা নেয়। শুধু দাড়ি শেভ করিতে তিন টাকা লাগিত। কেউ কেউ দুই টাকাও দিয়া থাকেন। নাপিতরাও সেইটাকা কপালে ঠেকাইয়া ক্যাশবাক্সে রাখিতেন। খানসামায় যদি অনেক বেশি চায় বা নেয়, তাই অপদস্ত হইবার ভয়ে ত্রিশ টাকাই লুঙ্গির কোঁচে রাখিলাম। এখানে বলিয়া রাখি, আমাদের ছাত্রাবস্থায় গ্রামাঞ্চলে তখনো ফুলপ্যান্ট পরে ঘোরার চল শুরু হয়নি। শহরে চলে সেটা বেশ। তবে দু’একজন, যারা শহরে পড়িত, হোস্টেলে বা মেসে থাকিত, সেসময় তাহাদের কেউ কেউ গ্রামে আসিলে প্যান্ট পরিয়া বেড়াইত। অবশ্য আরামকে ভুলে সেটা মেয়েদের দেখানো বা উন্নতজাতের ছাত্র হিসেবে নিজেকে তুলিয়া ধরিতে তাহা করিত। কিন্তু আমরা যাহারা নিয়মিত গ্রামে থাকি তাহারা কখনো নয়। এমনকি শহরে সিনেমা দেখিতে যাইতাম লুঙ্গি পরিয়া। অন্য আরেকটা সত্য হইল আমাদের কেহ কেহ লুঙ্গি পরেই কলেজে ক্লাশ করিতো পিছনে বসিয়া।

যাইহোক, বিভিন্ন ঘোরা পথ ব্যবহার করিয়া হাঁটিয়া হাঁটিয়া খানসামা হাটের দিকে যাই আর পিছন ফিরিয়া দেখি কেউ আমাকে দেখিতেছে কি না। চেনাশোনা কাউকে দেখিলে বড়সড় কোন গাছের আড়ালে বা পথের ধারে বাঁশঝাড়ে লুকাইয়া পড়িতাম।

কুড়ি মিনিটের পথকে ঘন্টা বানাইয়া অবশেষে হাটে এসে বিক্ষিপ্তভাবে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করিয়া দেখি তুলে বসিয়া পাশাপাশি দুইজন নাপিত বিরসবদনে বসিয়া আছে খদ্দেরের আশায়। না, তাহাদের নিকট যাইবো না। রাস্তার পাশে চাকচিক্যময় এক নাপিতের দোকানে সুযোগ নিলাম। দোকান ছিল ফাঁকা। সাহস করিয়া চেয়ারে বসিলাম। বলিলাম, চাচা, আমাকে শেভ করিয়া দিন। শরীরখানা একটু নড়াচড়া করিলেই আয়নায় মুখখানা এমনভাবে উঠানামা করিতেছিল মনে হইল যেন আমাকে ব্যঙ্গ করিতেছে। তখন চেয়ারটাকে তপ্ত উনুন মনে হইতেছিল। নাপিত চাচা দ্রুতই সাদা কাপড়ে পেঁচাইয়া মুখে পানি মাখিলে, ক্রীম ঘষে ব্রাশে ফেনা তুলিলে একটা স্বর্গীয় আবেশ ভর করিল। বারবার কৌশল করিয়া চক্ষু ঘুরাইয়া দোকানের বাহিরে দেখি, কেউ আবার দেখিতেছে কিনা। ভেতরে একটা ছটফটানি কাজ করিতেছিল। যাইহোক, নাপিতের নিকট প্রত্যাশিত কাজটা করাইয়া শেষে বিপদে পড়িলাম। এই মুখ নিয়া কেমনে গ্রামে ঢুকিবো? সবাই যে দেখিতে পাইবে। সে আর এক ভীষণ জ্বালা হইলো। বুকে সাহস আনিয়া নাকে হাত দিয়া, কখনো গাল চুলকাইয়া চুলকাইয়া মুখখানা আড়াল করিয়া আগেরমতো করিয়া বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করিলাম। আবার সাবালকত্ব লাভে মনে মনে পুলকিত হইতেছিলাম। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত পুরুষতো হইলাম! মেয়েদের কারো কারো মুখ মনে ভাসে তখন। শরীরটা চনমন করে। সারাবিকাল দিগ্বিদিক ঘোরাঘুরি করিয়া সন্ধ্যার অন্ধকারে বাড়িতে আসিয়া হাত-মুখ ধুইয়া খাবার চাইলাম। মা হারিকেনের আলোতে টের পায় নাই। তারপরও মুখ ঢাকিয়া খাইলাম। পড়িতে বসিলাম। পড়া ভাল্লাগে না। আমার মানিব্যাগের ছোট একটা আয়নায় নিজের সোনাবদন দেখি আর পুলকিত হই। ভাবি, বালিকা মহলে বুক উঁচু করিয়া কথা বলিবার অধিকার পাইলাম।

যাইহোক, সেইসব প্রেমপ্রীতির কথা বা কাহিনি অন্য একদিন বলিব। যে দাড়ি, মোচের জন্য এত কাণ্ড আজ তাহারই জন্য বিরক্ত বোধ করি। দাড়ি, মোচ শেভ করিবার মতো অসহ্য কাজ আর দ্বিতীয়টি নাই।

রম্যগল্প - মাসুম মোরশেদ - সাবালক

রবীন জাকারিয়া

৩০ মার্চ, ২০২২ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ

বইমেলা দর্শন

(বর্ণিত স্থান, কাল, পাত্র কাল্পনিক৷ প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের এ গ্রামটাতে কাকতালীয়ভাবে কিছু মিলে গেলে সেটার দায়ভার লেখকের নয়৷)

আয়াজ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে৷ এ সেক্টরে চাকরি হলো কচু পাতার পানি৷ এই আছে, এই নেই৷ সঙ্গত কারণে তার চাকরি আর কর্ম এলাকা কম দেখা হলো না৷ বিষয়টাকে সে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে৷ কেননা সে হতাশাবাদী নয় বরং বাস্তববাদী৷ এটা একটা বড় গুণ৷ একটা দক্ষতা৷ এটা জ্ঞানের প্রকাশ৷ আর জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠাভ্যাস জরুরি৷ সে প্রচুর বই পড়ে৷ বলা যায় বইয়ের পোকা৷

প্রতিবছর বইমেলায় মানুষের ঢল দেখলে তার ভালো লাগে৷ সে চায় সকলে বই পড়ুক৷ লেখক তৈরি হোক৷ কেননা যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি ততো উন্নত৷ কিন্ত ইদানীং মনে হচ্ছে এটা মিথ্যা কথা৷ শ্রীলংকায় প্রায় ৯৯% শিক্ষিত হওয়ার পরও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতই করুণ যে সরকার কাগজের অভাবে পরীক্ষা স্থগিত করে দিয়েছে৷ নিজেদের মূদ্রার দাম এতই কমে গেছে যে চালের দাম ৫০০ শ্রীলংকান রুপি৷ ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশংকায় দেশ ছাড়ছে মানুষ৷ আয়াজ ভেবে পায় না কারণটা কী? তবে কি শিক্ষা ব্যবস্থাটা বাস্তব উপযোগী ছিল না? না কি শিক্ষার হারের তথ্যটা সঠিক নয়?

আয়াজের কখনো বই মেলায় যাওয়া হয়নি৷ অবশ্য ইচ্ছেও করেনি৷ তবে গত বছর চাকরির সুবাদে ঢাকায় ছিল৷ তাই ভেবেছিল এবার সে বইমেলায় যাবে৷ কিন্ত করোনার কারনে সরকার মেলা বন্ধ করে দেওয়ায় যাওয়া হয়নি৷

এ বছর মেলা চলেছে পুরোদমে৷ সে কী তোলপাড়! গণজোয়ার! তার বেশ কিছু বন্ধু লেখক৷ তারা নতুন বই ছেপেছে৷ মেলায় উম্মোচন করবে৷ বন্ধুদের বেশিরভাগ বইয়ের প্রুফ দেখার কাজ যেহেতু আয়াজকে দিয়ে করানো হয়৷ তাই লেখক বন্ধুরা তাকে ঢাকায় যেতে অনুরোধ করে৷ সে বিনয়ের সাথে প্রত্যাখান করে৷ তবে ফেসবুকে লাইভে সে নিয়মিত বইমেলার হাল হকিকত জানতে পারে৷ কিছুদিন ধরে সে লক্ষ্য করছে ফেসবুক লাইভে দিবা নিশি একজন বান্দরের মত লাফালাফি আর ঝাপাঝাপি করে প্রকাশ করছেন তার লেখা বইগুলো নাকি অত্যন্ত ভালো৷ শুধুমাত্র বইমেলায় নাকি তার বইয়ের শততম এডিশন হয়েছে৷ এমনকি এমন কথাও বলছেন যে তার বইয়ের দাম একটু বেশি৷ কারণ ভাল লেখকের বইয়ের দামটাও বেশি হয়৷ উনি কমদামি বই লেখেন না! আয়াজ পরে জানতে পারল এই বান্দরটা নাকি বর্তমানে দেশের একজন নামজাদা লেখক! ভয়ঙ্কর অবস্থা৷ তবে কি বর্তমানের লেখকরা ম্যানার বা শালীনতা বোধটুকুও নষ্ট করে ফেলেছেন? এদের বই পড়া যাবে না৷ এই আচরণের লেখকদের বইয়ে কী-ই বা থাকবে যা দেশ-সমাজ উন্নয়নে কাজে লাগবে? এসব দেখে বই মেলা দর্শনের ইচ্ছেটুকুই নষ্ট হয়ে গেল৷

আয়াজ এখন নিজ শহরেই থাকেন৷ করোনার কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানেই কিছু একটা করছেন৷ অনেক হয়েছে চাকরি৷ আর গোলামি না করে সে নিজে একটা এগ্রো ফার্ম প্রতিষ্ঠা করছে৷ তাছাড়া ছেলে-মেয়ে দুটোর লেখাপড়ার জন্য তার এখন নিজ শহরে থাকা দরকার৷ তার স্ত্রীর একার পক্ষে সম্ভব নয়৷ একে যদি স্কুলে নিয়ে যাও তো ওকে কোচিং-য়ে৷

গত দুদিন আগে শুরু হয়েছে জেলা ভিত্তিক বই মেলা৷ আয়াজ ফেসবুক পোস্ট থেকে জেনেছে৷ এ বিষয়ে তার কোন কৌতুহল নেই৷ তার কিছু বন্ধু লেখক তাকে মেলায় আসার নিমন্ত্রণ করেছে৷ ঠিক আছে যাব বলে পাশ কাটিয়েছে৷

আগামী পরশু আয়াজের সন্তানদের ১ম সেমিস্টার পরীক্ষা৷ তাই তার মেয়ে তাকে একটা বাংলা ব্যাকরণ বই কিনে আনতে বলল৷ সে বই কিনে ফেরার পথে কী মনে করে অথবা বলা যায় কৌতুহল বসে বই মেলার সামনে দাঁড়াল৷ ভেতরে যাবে কি যাবে না দোটানায় পড়ল৷ শেষে ঢুকেই পড়ল৷ চারিদিকে সাজ সাজ ভাব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তীব্র গানের আওয়াজ আর হৈ হুল্লোর দেখে মনে হলো মেলা বেশ জমে গেছে৷ ভাল লাগলো৷ সে একটা গেট দিয়ে ঢুকে তো অবাক! কীসের বই মেলা! বিশাল এলাকা জুড়ে স্টলে ভরপুর৷ এটা আসলে SME মেলা৷ ও ঘুরে ঘুরে দেখল৷ কারুপণ্য৷ সেলাইয়ের কাজ থেকে শুরু করে মেয়েদের অন্তর্বাস পর্যন্ত কিনিবিকি চলছে৷ প্রতিটি স্টলে দাঁড়িয়ে আছে সাজুগুজু করা সুন্দরি ললনা৷ মানুষের ভীড় বেশ৷

মেলার গেট পেরিয়ে আয়াজ দেখতে পেল বিশাল এক মঞ্চ৷ যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে৷ আর পুরো এলাকা জুড়ে আবালবৃদ্ধবণিতার ঢল৷ কিছু ছেলে মেয়ে মিউজিকের তালে তালে প্যান্ডেলের বাহিরে নাচে উম্মত্ত৷ কিছুটা সময় সেখানে কাটাল৷ তার মনে হলো গানগুলো আর শ্রুতি মধুর নেই যেন শব্দদুষণ৷

আয়াজ অবশেষে খুঁজে পেল তার কাঙ্খিত বইমেলা৷ ছোট্ট গেট৷ ভেতরে ঢুকে বহু কারণে সে অবাক! এত ছোট্ট জায়গায় গাদাগাদি করে ছোট ছোট স্টল৷ আচ্ছা তবে কি এটা বই মেলার জন্য মেলা করেছে! নাকি SME মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নামক সোনার সোহাগা হিসেবে বই মেলা আয়োজন করেছে৷ আরো আজব বিষয় এখানে প্রায় সব স্টলে সুন্দরি ললনারা দাঁড়িয়ে৷ পেশাদার বিক্রয়কর্মীর ন্যায় মুখে হাসি নিয়ে অপেক্ষায় আছে ক্রেতার আগমনের জন্য৷ যদিও প্রায় ফাঁকা প্রতিটি স্টল৷ আচ্ছা এ শহরে কি পুরুষ লেখক নেই? যদি না-ও থাকে তথাপিও একজন লেখিকাকে মঞ্চের অভিনেত্রীর মতো উগ্র সাজে আর আবেদনময়ী ভঙ্গিমায় বই বিক্রি করতে হবে কেন? একজন লেখক আর SME মেলার একজন বিক্রয় প্রতিনিধির কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না৷ আয়াজ লেখক নয় তাই সে বলতে পারছে না বই বিক্রি করা আসলে লেখকের নাকি প্রকাশকের দায়! জীবনের প্রথম বই মেলা দর্শনে হতাশ হয়ে লেখক বন্ধুদের ফোন করে জানতে পারে তারা চলে গেছে৷ আয়াজ রসিকতা করে বলল, আসলাম ঠিকই কিন্ত তোমাদের সুন্দর মুখগুলো দেখা হলো না৷ একজন মজা করে বললো অসুবিধা নেই সুন্দরীরা আছে৷ সে বললো, “আমি সুন্দর পছন্দ করি, শুধুই সুন্দরী নয়”৷

হতাশ হয়ে আয়াজ ফিরে আসছে এমন সময় গেটে এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালার সাথে দেখা৷ ঠিকমতো চলতে পারছে না৷ সে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো চাচা এগুলো কী বিক্রি করছেন? চাচা বলল, খেলনা, বাঁশি, হেড ব্যান্ড, পতাকা এই সব ব্যাটা৷ তারপর বলতে লাগল, সে বিহারী৷ বয়স নব্বই বছর৷ স্টেশনের পাশে থাকে৷ ১৯৭১ সাল থেকে সে এই ফেরি ব্যবসার সাথে জড়িত৷ তিন ছেলে দুই মেয়ে৷ সকলেই বিবাহিত৷ আলাদা থাকে৷ বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী৷

ছেলেরা দেখাশোনা করে না?

অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে কান্নামাখা কন্ঠে বলল, “বাবারে বউরা রূপ যৌবন দিয়ে ওদের ভুলিয়ে দিয়েছেরে বাবা! নাহলে কি এই বয়সে আমাকে ফেরি করতে হয়?”

আয়াজ নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিরতি পথে হাঁটতে লাগল৷ আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল চাচা শুধু আপনার বউমারা নয় আমরা সবকিছুকেই, এমনকি সম্পর্কটাকেও পণ্য বানিয়েছি৷  আর হয়ে গেছি Sex appeal এ ঠাসা একেকজন নষ্ট ফেরিওয়ালা৷

গল্প - বইমেলা দর্শন - রবীন জাকারিয়া

রবীন জাকারিয়া

২২ মার্চ, ২০২২ , ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

পরকীয়া

জয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থায় সহপাঠী জয়িতাকে গোপনে বিয়ে করে৷ তিন বছরের প্রণয়ের সম্পর্ক রূপ পায় পরিণয়ে৷ তার পরিকল্পনা ছিল পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে একটা চাকরি জোগাড় করার পর বাবা-মাকে জানাবে৷ যদিও হৃদয় কোণে একটা সুক্ষ্ম অপরাধবোধ কাজ করে৷ তবুও কিছু করার নেই৷

জয়িতা এক অতি সাধারণ পরিবারের মেয়ে৷ বাবা গৃহস্থালী কাজ করেন৷ দুই ভাই টেনেটুনে মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে৷ জয়িতা মাঝারি টাইপের মেধাবী হলেও উচ্চাকাঙ্খি৷ অত্যন্ত বৈষয়িক আর সংগ্রামী৷ যে কোনো মূল্যেই সে তার স্বপ্ন পূরণে বদ্ধ পরিকর৷ এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা প্রাইভেট স্কুলগুলোর একটায় স্বল্প বেতনের চাকরি করত৷ চাকরির বেতনের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্কুলের ব্র্যান্ডটাকে কাজে লাগিয়ে টিউশনির ফি-টা বেশি পাওয়া৷ কয়েকটি টিউশনি, স্কুলের বেতন আর নিজের স্কলারশিপের টাকা আয় হিসাবে মন্দ নয়৷ সুন্দরী হবার কারণে অনেকের ক্রাশ ছিল৷ স্থানীয় কলেজের মেধাবী সহপাঠী ও বড় ভাইদের সাপোর্টটুকু কৌশলে নিতে পারত৷ সকলের সাথে সাবলীল মেলামেশার কারণে জনপ্রিয়তার কমতি ছিল না৷ তাই বিত্তবান বন্ধুরাও তাকে আর্থিক সাহায্য করত৷ সে ‘‘এসব চাই না, শুধু দোয়া কোরো তোমরা’’-এসব বললেও কখনও তা প্রত্যাখান করেনি৷

গৃহস্থ বাবা-মা সহজভাবেই মেয়ের এসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করেনি৷ শুধু দোয়া করেছে আর হাহাকার করেছে তাদের মেয়ের জন্য তেমন কোন সাহায্য না করার অপরাধে৷ ভেবেছে ইশ! মেয়েটাকে যদি আরো একটু খরচাপাতি দিতে পারত!

মাধ্যমিক থেকে ভার্সিটির পরীক্ষা পর্যন্ত ওকে সবচেয়ে সহায়তা করেছে রাশেদ৷ ওর এক ক্লাশ সিনিয়র৷ ও বড়লোকের ছেলে এবং ভীষণ মেধাবী৷ রাশেদ জয়িতাকে ভালোবাসত৷ পাগলের মতো ভালবাসতো৷ ওকে হারানোর ভয়ে রাশেদ ওর সমস্ত ব্যয়ভার বহন করত৷ শুধু পড়াশুনার খরচ নয়৷ হাত খরচ, কাপড়-চোপড়, গহনা-পাতি সব৷ জয়িতার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করার জন্য সে তার সাথে পুনরায় পরীক্ষা দিত এবং একসাথে ফরম ফিলাপ করত যেন পাশাপাশি সিট বসে৷ আর সে জয়িতাকে সাহায্য করতে পারে৷ প্রেমিক রাশেদের অফুরান ভালোবাসা আর সাপোর্টে জয়িতা অবশেষে চান্স পেয়ে গেল ভার্সিটিতে৷ কিন্ত দুঃখজনকভাবে রাশেদ ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেলেও জয়িতা পেল রাজশাহী ভার্সিটিতে৷ রাশেদ এরপরও খরচ চালিয়ে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ জয়িতাই তাকে আর টাকা পাঠাতে নিষেধ করল৷ জানাল এখন সে নিজে বহন করতে পারবে৷

এ সময়ে জয়িতার সাথে জয়ের পরিচয় হয়৷ সে জানতে পারে জয়ের বাবা পুলিশ অফিসার৷ শহরে তাদের চারটি বাড়ি৷ গ্রামে কয়েক একর আবাদি জমি৷ সেখানে খামার বাড়ি আছে৷ মাঝে মাঝে বিনোদনের জন্য তারা সকলে মিট টুগেদার করে৷ এলাকায় তাদেরকে জমিদার হিসেবে মান্য করে৷ জয়রা দুভাই-বোন৷ বাবা পুলিশ অফিসার আলতাব হোসেন৷

জয়কে দেখেই ভালো লেগে যায় জয়িতার৷ অন্যদিকে জয়িতার জীবন সংগ্রাম জয়কে মুগ্ধ করে৷ তাই করুণা নয় বরং ভালোবেসেই জয় জয়িতার পড়াশুনাসহ যাবতীয় খরচের দায়ভার নিয়ে নেয়৷ এভাবেই চলতে থাকল তিন বছর৷ হঠাৎ একদিন জয়িতা তাকে বিয়ে করতে বলে৷ তা না হলে বাবা-মা তাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেবে৷ এমনকি পড়াশুনাটাও বন্ধ করে দিতে হবে বলে জয়িতা কাঁদতে শুরু করে৷ ওর কান্না দেখে জয় কোনো কিছু চিন্তা না করেই সেদিন কাজী অফিসে বিয়ে করে ফেললো৷

পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে জয় একটা চাকরির জন্য ছুটে বেড়াতে লাগল৷ জয়িতা আর এক বছর পর বেরিয়ে আসবে৷ হাতে মোটে একটা বছর৷ অবিরাম চেষ্টার পরও কোনো চাকরি জুটল না৷ জয়িতা পড়াশুনা শেষ করে বের হলো৷

কোনো উপায় না দেখে অবশেষে জয় জয়িতাকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে এলো৷ সকলে ভীষণ খুশি৷ উচ্চ শিক্ষা শেষ করার জন্য বাবা পার্টি দিলো৷ হৈ হুল্লোর হলো৷ এরপর একদিন যায়৷ দুদিন যায়৷ এমনিভাবে প্রায় মাস শেষ হতে চলল৷ কিন্ত মেয়েটা কেন এখনো চলে যাচ্ছে না! মহা মুশকিল৷ এতদিন বন্ধুর বাড়িতে একটা মেয়ের যেমন থাকাটা শোভনীয় নয় তেমনি আলতাব সাহেব নিজে থেকে চলে যাবার কথাও বলতে পারছেন না৷ তিনি স্ত্রীকে ডেকে বিষয়টা হ্যান্ডল করতে বললেন৷

এক ফাঁকে জয়কে ওর মা জয়িতা চলে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন৷ জয় মাথা নিচু করে শুধু বললো “ও তোমাদের বৌমা”৷ আমি তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছি৷

আলতাব সাহেব এটা শুনে কিছুদিন ছেলের সাথে কথাই বন্ধ করে দিলেন৷ বন্ধুসুলভ বাবার এমন গম্ভীর আচরণে জয় অবাক! কিন্ত ভয়ে কিছু বলতে পারছে না৷

এর মধ্যে আলতাব সাহেব স্হানীয় থানা থেকে জয়িতার জীবনবৃত্তান্ত যোগাড় করেন৷ তাঁর মতে দরিদ্রতা অপরাধ নয়৷ সকলেই অভিজাত পরিবারের হবে এমন কোনো কথা নাই বরং জয়িতাদের পরিবারের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানাটাই উদ্দেশ্য ছিল৷ কারণ একজন পুলিশ অফিসার হয়ে কোনো ক্রিমিনালদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাটা নীতি বহির্ভূত৷ কিন্ত তিনি জয়িতার লাইফ স্টাইল দেখে আশ্চর্য হয়েছেন৷ মেয়েটি নিজের স্বার্থে যে কাউকে যেমন ব্যবহার করতে পার, তেমনি যে কোনো জঘণ্য কর্মকাণ্ডও ঘটাতে কুন্ঠিত হবে না৷

একদিন আলতাব সাহেব জয়কে ডেকে পুরো কাহিনিটা তুলে ধরলেন৷ রাগ করলেন না বরং যৌক্তিক বিশ্লেষণ করতে বললেন৷ অবশেষে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তটা ছেলেকে জানিয়ে দিলেন৷ বললেন তোমার কাছে দুটো অপশন: প্রথমত যদি আমাদের সাথে থাকতে চাও তাহলে তোমার স্ত্রীকে আইনগতভাবেই ত্যাগ করতে হবে৷ দ্বিতীয়ত তোমার স্ত্রীর সাথে থাকতে চাইলে আমাদের ত্যাগ করতে হবে৷ তুমি যে সিদ্ধান্তই নাও না কেন তা আগামী তিনদিনের মধ্যেই জানাবে৷

তিনদিন পর আজ বাড়িতে ভীষণ কান্নাকাটি৷ একদিকে মা চিৎকার করে কাঁদছে৷ অন্যদিকে ছোট বোন৷ ব্যালকনিতে একটি রকিং চেয়ারে বসে আলতাব সাহেব দূর আকাশে চেয়ে আছেন৷ অভিব্যক্তি বোঝা দায়৷ জয় বাড়ি ছেড়ে একেবারে চলে যাচ্ছে জয়িতাকে নিয়ে৷ কোনো ঠিকানা জানাবে না সে৷ সেওতো কম জেদি নয়৷

জয় জয়িতাকে নিয়ে অন্য এক জেলা শহরে সংসার গড়ে৷ এক রুমের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে৷ কয়েকটি টিউশনি করে চালাতে থাকে সংসার৷ মাস ছয়েকের ভেতর একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকুরি পায়৷ বেতন মন্দ নয়৷ তবুও টিউশনিগুলোও চালাতে থাকে৷ তার জেদ যে করেই হোক প্রতিষ্ঠিত হতে হবে৷ জয়িতার জন্য যারা বাড়ি ছাড়া করেছে৷ একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েই তাঁদের সামনে দাঁড়াব৷ বলব সংগ্রাম করে নিজেও প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়৷

এভাবে দিন গড়াতে থাকে৷

জয়-জয়িতার সংসারের সমৃদ্ধি আসতে থাকে৷ এখন তারা একটা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে৷ এলাকাটা অভিজাত৷ সুন্দর আর গোছানো সংসার৷ আল্লাহ্ যখন দেয় তখন বেহিসাবি দেয়৷ তাইতো বছর দেড়েক পর তাদের ঘর আলোকিত করে এলো ভালোবাসার সন্তান৷ একটি নয়, দুটি৷ যমজ সন্তান৷ একটি পুত্র আরেকটি কন্যা৷ ভালোবাসা আর সুখে ভরে উঠলো তাদের সংসার৷

বছর দুয়েক পর জয় জাপানে যাবে বলে ঠিক করল৷ তখন বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো৷ যে কেউ টুরিস্ট ভিসা নিয়ে সেখানে যেতে পারে৷ সকলেই যাচ্ছে৷ প্রথমে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে ঢুকতে হবে৷ এরপর কোনো জাপানি নারী বিয়ে করে বিশেষ কায়দায় দীর্ঘদিন থাকা যায়৷ নতুবা পালিয়ে বিভিন্ন কারখানায় চাকরি করা যায়৷ পারিশ্রমিক মন্দ নয়৷ বিষয়টা নিয়ে জয়িতার সাথে আলাপ করলো৷ আর জানাল যে করে হোক দশটা বছর কাটাতে পারলে নিজেরাই গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যাব৷ জয়িতা নিষেধতো করলই না বরং উৎসাহ যোগালো৷ 

অবশেষে একদিন জয় তাদের ছোট্ট দুটি যমজ সন্তানকে রেখে আকাশচুম্বি স্বপ্ন পূরণের জন্য দেশ ত্যাগ করল৷ প্রথম প্রথম জয়িতার খারাপ লাগলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে যায়৷ জয় যাবার আগেই তার নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলে সেখানে বেশ কিছু টাকা রেখে দিয়েছে৷ বলেছে টাকা পাঠানো শুরু করা পর্যন্ত এই টাকা দিয়ে চলতে৷ আর মাঝে মাঝে ব্যাংক একাউন্ট চেক করতে৷ টাকা পাঠালাম কি না জানতে৷

মাস তিনেক পর থেকে জয় টাকা পাঠাতে লাগল৷ বাড়িতে টেলিফোন লাগানো হলো৷ প্রায় দিন জয় টেলিফোন করে৷ কথা বলে৷ স্বপ্ন দেখায়৷ জয়িতা বিভোর হয়৷ জয় বলেছে একটা জমি কিনতে৷ সেই জমিতে জাপানের বৌদ্ধ টেম্পলগুলোর মতো একটা বাড়ি বানাতে৷ নাম হবে টোকিও হাউজ৷ জয়িতা একটা জিনিস বুঝতে পারে না৷ প্রবাসিরা যে দেশে থাকে তারা নিজ দেশে সাধারণত: সেই দেশের কিংবা রাজধানীর নামে বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করে৷ যেমন সিঙ্গাপুর হাউজ, সৌদি ভিলা, নিপ্পন কার, নিপ্পন ভিডিও ইত্যাদি৷ এটা অবশ্য বাহিনীর লোকদের মধ্যেও দেখা যায়৷ যেমন সেনা হোটেল, সৈনিক স্টোর, রাইফেলস স্টোর ইত্যাদি৷ 

দিন বদলে যেতে লাগল৷ বদলাতে লাগল জয়িতা৷ প্রবাসী স্বামীর পাঠানো অর্থ আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক আধিপত্য তাকে লোভী করে তুলল৷ 

এ সময়ের মধ্যে হঠাৎ করে তার পুরোনো প্রেমিক রাশেদের সাথে দেখা হয়৷ কাকতলীয়! বসন্ত বরণ উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জয়িতা দেখল রাশেদ নামে এক কবি স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন৷ চমকে উঠল সে। রাশেদ এখানে কেন? অনুষ্ঠানের শেষে সে তার সাথে দেখা করে৷ কথা হয়৷ জানতে পারে রাশেদ বিসিএস কমপ্লিট করে একটা সরকারি কলেজের প্রভাষক৷ ওর পোস্টিংটা হয়েছে এ জেলাতে৷ বাংলার শিক্ষক, তাই যথারীতি সাহিত্যচর্চার সাথে জড়িত৷ ইতিমধ্যে বেশ ক’খানা বই প্রকাশ করেছে৷ জনপ্রিয় লেখকের তকমা পেয়ে গেছে৷ জেলার বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নিয়মিত৷ এখনো বিয়ে করেনি৷ প্রতিষ্ঠিত, সুদর্শন আর অবিবাহিত এক জনপ্রিয় লেখকের জন্য অনেক মেয়েই ক্রাশ খাবে এটাই স্বাভাবিক৷ রাশেদের পিছনে অন্য নারীর সম্পর্ক জয়িতা মানতে পারে না৷ ঈর্ষা হয়! প্রচণ্ড রাগ লাগে৷ ভুলেই যায় যে সে অন্যের স্ত্রী এবং তাদের দু’টো সন্তান আছে৷

সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে জয়িতা আর রাশেদের  যোগাযোগ নিয়মিত হতে থাকে৷ অবশ্য টেলিফোনেই বেশি কথা বলা হয়৷ কারণ এখন বাইরে বেশি সময় দেওয়ার সময় নেই৷ বাচ্চা দুটো বড় হয়েছে৷ প্রায় আট বছর৷ ভালো স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির জন্য চাপ আরো বেড়ে গেছে৷ স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট  পড়াতে নিয়ে যাওয়া৷ আবার বাড়িতে এসে হোম ওয়ার্কগুলো করানো৷ রান্না-বান্নাসহ সংসারের সব কাজ একাই সামলানো৷ ওদের বাবা প্রবাসে থাকার কারণে সেই তাদের বাবা৷ সেই তাদের মা৷ তাছাড়া বাচ্চা দুটো হয়েছেও মা ঘেঁসা৷ সবকিছুতেই আম্মু৷ এখনো ওদের না খাইয়ে দিলে নিজ হাতে খাবে না৷ ঘুমানোর সময় দুজনকে দুদিকে রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে গুনগুন করে গান না গাইলে ঘুমাবেই না৷ মাঝে মাঝে ভালো লাগে৷ কিছু সময় বিরক্ত লাগে৷ জয়িতা অনেক সময় ধমক দিয়ে বলে তোদের আম্মু যদি মরে যায়? ওরা বলবে আমরা মরে যাব তবু তোমাকে মরতে দিব না৷ তুমি না থাকলে ভয় করে আম্মু৷ মনে হয় কারা যেন আমাদের মেরে ফেলছে

জয়িতা ধমক দিয়ে চুপ করে দেয়৷

আস্তে আস্তে রাশেদের সাথে ওর সম্পর্ক আরো গভীর হতে থাকে৷ একদিকে পুরোনো প্রেমের জাগরণ আর অন্যদিকে প্রবাসীর স্ত্রী—যে কি না বায়োলোজিক্যাল ডিমান্ড থেকে বঞ্চিত—এক ডেজার্ট ফক্স৷ যা তার নৈতিক ও চারিত্রিক স্খলন ঘটায়৷ যার ফলশ্রুতিতে রাশেদ এখন নিয়মিত তার বাসায় যাতায়াত শুরু করে৷ 

বাচ্চারা প্রতিদিন আংকেলের বাসায় আসাটা অপছন্দ করতে থাকে৷ জয়িতা রাশেদকে কিছু একটা সমাধানের পথ বের করতে বলে৷ রাশেদের এক কথা জয়িতাকে সে বিয়ে করতে রাজি কিন্ত বাচ্চাদের ছাড়তে হবে৷ জয়িতা দোটানার মধ্যে পড়ে যায়৷ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না৷ 

হঠাৎ একদিন কোচিং থেকে এসে বাচ্চারা জয়িতা এবং রাশেদকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে৷ জয়িতা হতবাক এ সময়ে তো ওদের ছুটি হয় না৷ পরে জানা গেল মিস অসুস্থ্য তাই ছুটি দিয়েছে৷ প্রজনন বিষয়ে ওদের গভীর জ্ঞান না থাকলেও এটা যে পচা কাজ তা তারা বুঝতে পারে৷ বিব্রতকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জয়িতা আর রাশেদ ওদের সাথে রাগ না করে বরং চাইনিজ খেতে নিয়ে যায়৷ বিষয়টা যেন এখানেই শেষ হয়ে যায়৷

রাতে জয় টেলিফোন করল৷ জয়িতা আদুরে গলায় অনেক কথা বলতে লাগল৷ বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে চাইলে বলল ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কিন্ত বাচ্চারা দৌড়ে এসে টেলিফোন ধরে বললো ওরা ঘুমায়নি৷ অগত্যা জয়িতাকে টেলিফোনটা ছেড়ে দিতে হলো৷ সবই ঠিক ছিল কিন্ত হঠাৎ ওরা রাশেদের সাথে ঘটনাটা তাদের আব্বুকে বলে দিলো৷ ভয়ের একটা শীতল স্রোত জয়িতার মেরুদণ্ড বরাবর নামতে থাকল৷ রাগে আর ভয়ে কাঁপতে থাকল৷ এতদিন যে দোটানার মধ্যে ছিল৷ তা ঝেড়ে ফেলল৷ এক পৈশাচিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো৷

পরের দিন রাশেদকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানাল৷ জয়িতা ভাবলো ব্যাংকে জয়ের পাঠানো প্রচুর টাকা৷ ইচ্ছে করলেই এগুলো আমার হতে পারে৷ আর একটা কঠিন কাজ করলে রাশেদও আমার৷ জয়িতার সুন্দর মুখে ফুটে উঠে ক্রুর হাসি৷ যে হাসিটাকে জয়িতা নিজেই কখনো দেখেনি৷

সারাদেশ হঠাৎ করে একটা তোলপাড় করা খবর জানতে পারল৷ জ্বর নাশক ঔষধ সেবনে একই পরিবারের দুটি শিশুর মৃত্যু৷ সরকার নিমিষের মধ্যেই সেই ঔষধটি বিক্রয়-বিপণন বন্ধ করা শুধু নয়, বাতিল করে দিলো৷ নির্দিষ্ট ঔষধের নির্দিষ্ট ব্যাচ নম্বর নিয়ে গবেষণাগারে গবেষণা করা হতে থাকল৷ কী ক্ষতিকর কারণ থাকতে পারে যার জন্য দুটো শিশুর প্রাণহানী ঘটল? রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতামূলক বার্তা দিতে থাকল৷ সকলেই বিশেষ করে যাদের ছোট শিশু আছে তারা আতঙ্কিত৷

দুইদিন পর সবাই সত্যটা জানল৷ আসলে ঔষধের কারণে নয়৷ বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ঘটেছে তাদের৷ নিজের মা, গর্ভধারিণী, একইসাথে হত্যা করেছে দুই সন্তানকে৷ প্রথমে বিষ খাইয়েছে৷ তারপর তাদেরকে ঔষধ খাইয়েছে৷ যাতে সকলকে মিসগাইড করা যায়৷ কিন্ত বিধিবাম৷ ডাক্তাররা সেই মায়ের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখে পুলিশকে খবর দেয়৷

প্রাণচঞ্চল আলতাব সাহেব এখন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষে পরিণত হয়েছেন৷ তাঁর একমাত্র ছেলে আজ প্রায় দশ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে গেছে কিন্ত কোনো যোগাযোগ নেই৷ সে কি বেঁচে আছে নাকি…

প্রমোশন পেয়ে তিনি এই জেলার পুলিশ সুপার হয়ে এসেছেন৷ এই কিছুদিন আগে৷ এর মধ্যে এই জেলায় ঔষধ খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু৷ ভাইরাল৷ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, মিনিস্ট্রি থেকে চাপ আসছে৷ হালনাগাদ রিপোর্ট করতে করতে বেহাল অবস্থা৷ তার ভাবতে অবাক লাগে সমাজের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এতটাই? সকলেই বিশ্বাস করি যে একজন স্ত্রী খারাপ হতে পারে৷ একজন নারী খারাপ হতে পারে৷ কিন্ত একজন মা কখনো খারাপ হতে পারে না৷ পারে না বলেই আমরা মায়ের জন্য জীবন দিই৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য নয় মাসে তিরিশ লক্ষ প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছি৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতা এনেছি জনযুদ্ধে৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি সবচেয়ে কম সময়ে৷ অথচ আজ একি ঘটছে?

আলতাব সাহেব ড্রাইভারকে বললেন মর্গে যেতে৷ এমন দৃশ্য দেখতে ইচ্ছে না করলেও তাঁকে শিশু দুটির লাশ দেখতে হবে৷ বেডে সাদা কাপড়ে ঢাকা দুটো লাশ৷ চাদর সরানো হলো৷ তিনি দেখলেন ছোট্ট দুটি যমজ শিশুর নিথর দেহ৷ দুজনের চোখগুলো খোলা৷ তিনি চিন্তা করলেন মরার আগে হয়তো ওরা খোলা চোখে তাদের মাকে খুঁজছিল৷ বিশ্বাস ছিল মা আসলে ওদের কিচ্ছু হবে না৷ কিন্ত ওরা জানে না ওদের মা-ই হত্যাকারী৷

আলতাব সাহেব বাইরে এলেন৷ একটু সময় নিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন৷ গাড়িতে উঠলেন৷ উনি এখন থানায় যাচ্ছেন৷ নিজের যমজ দুটি সন্তান হত্যাকারী মাকে দেখতে৷ গাড়ি চলছে৷ পুলিশ সুপার ঘামছেন৷ তাঁর প্রচণ্ড রাগ লাগছে৷ তবে আলতাব সাহেব এখনও জানেন না যমজ শিশু দুটি কিংবা হত্যাকারী আসলে কে!

গল্প - পরকীয়া - রবীন জাকারিয়া

মুগ্ধতা.কম

২৪ জানুয়ারি, ২০২২ , ১১:১৯ অপরাহ্ণ

অন্ন

লোকটা ভিখেরি নয়; বেশভূষায় মনে হলো খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। দিনমজুর।  ঘরে তার পাঁচ পাঁচটি মেয়ে। আছে প্রিয়তমা স্ত্রী। সবার মুখে অন্ন তুলে দেবার বাসনায় আর অভাবের তাড়নায় ঢাকা শহরে এসেছে একটা কাজের সন্ধানে। এসেছে সুনামগঞ্জের কোন এক হাওর থেকে।

আমি বসে আছি কমলাপুর রেলস্টেশনে ৯.১০ এর রংপুর এক্সপ্রেসে চেপে মায়ের কাছে ফিরব বলে। মলিন মুখে ঘুম মরা দুটি চোখ নিয়ে মুখে কি ভীষণ আকুতি ঝরিয়ে আদ্র গলায়- সালাম ঠুকে লোকটা বললো-স্যার, কিছু মনে করবেন না। আমি ভিক্ষা করিনা। সুনামগঞ্জ থেকে এসেছি একটা কাজের জন্য। গাবতলি যাব। পকেটে টাকা নাই। নাস্তাও খায় নাই। গাবতলিতে আমার মত আরও লোকজন আছে। তাদের কাছে গিয়ে একটা কাজ খুঁজে নিব। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালায় নড়তে পারতেছি না। কিছু খাব। খেয়ে গাবতলি যাব। যদি কিছু সাহায্য করতেন। আমি বললাম- এই মুহুর্তে আমি যেটা দিতে পারব তা দিয়ে আপনার একবেলার খাবার হবে, তারপর?

স্যার, তাই দেন। খেয়েই ওখানে চলে যাব। আমার লোকজন আছে। সে গরীব কিন্তু ভিক্ষুক নয় কিছু টাকা ধরিয়ে দিতেই খুশির বাষ্প ছড়িয়ে সালাম ঠুকে লোকটা গেট পেরিয়ে মিলিয়ে গেল চোখের পলকে! আমি অপলক সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। বুকের ভেতর থেকে একটা তপ্ত নিশ্বাস বেরিয়ে এলো মনের অজান্তে। হঠাৎ খেয়াল করলাম- চোখ দুটো আমার আদ্র হয়ে আসছে। নিজেকে সামলিয়ে নিলাম। শুধু ভাবনার আকাশে একটি বেখাপ্পা ঘুড়ি ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল- হায়! আমার সোনার বাংলা; অন্ন যদি নাই-ই দিবার পারো তবে কেন ধারণ করেছিলে নিষ্ঠুর জঠরে?!

নূরনবী বেলাল
কমলাপুর || ২৩.০১.২০২২

অন্ন - নূরনবী বেলাল

রবীন জাকারিয়া

৭ জানুয়ারি, ২০২২ , ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

বাবার প্রতিচ্ছায়া-গল্প

করোনার থাবায়৷ হঠাৎ করে সারা বিশ্ব যেন থমকে দাঁড়িয়েছে৷ চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল৷ লক ডাইন৷ শাট ডাউন৷ প্রথম পর্যায়েতো বলা যায় কার্ফ্যু জারির মত অবস্থা৷ রাস্তা ঘাট৷ দোকান পাট৷ হাট বাজার৷ রিকসা, ভ্যান, বাস, ট্রেনসহ যোগাযোগের সবই প্রায় বন্ধ৷ এক অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে নিস্তব্দ চারিদিক৷ ক’দিন আগে যে ব্যক্তিটা বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেকে বস্তবাদী-ইহলৌকিক দর্শনবাদী হিসেবে জাহির করতো৷ আজ সেই ব্যক্তিই সুন্নতি দাড়ি-পোষাক পরে নিজেকে ইসলামী দর্শনের অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে প্রকাশ করছে৷ সন্দেহ আছে যে করোনা নির্মূলের অষুধ বের হবার পরও এ অবস্থানে থাকবে কি-না!

বিশ্ব জুড়ে করোনার করাল থাবায় মরছে মানুষ৷ কী করুণ মৃত্যু! শেষ কৃত্যে পাশে থাকছে না প্রিয় স্বজন৷ যাদের জন্য যন্ত্রের ন্যায় শুধু উপার্জন করে গেছে নিরন্তর৷ বৈধ অথবা অবৈধ উপায়ে৷ জীবনের শেষ লগ্নে প্রিয়জনকে কাছে না পেয়ে কত হৃদয়বিদারক কথা বলে গেল সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর বিত্তবান ব্যক্তি! ভাবতে অবাক লাগে এত সম্পদ কিংবা ক্ষমতা তার কোন কাজেই আসেনি৷ আঞ্জুমান মফিদিন কিংবা কিছু সাহসি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠণের গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া কেউ ছিলনা শেষ বিদায়ে৷

সন্তান জঙ্গলে ফেলে আসছে করোনায় আক্রান্ত পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন৷ কোন মৃত্যুই কাম্য নয়৷ কাম্য নয় মহামারী৷ কিন্ত তবুও কেন যেন সাদিক সাহেব এটাকে অবশ্যাম্ভাবী একটা বিষয় বলে মনে করেন৷ তার কাছে এটা একটা আশির্বাদ৷  বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ যে নিজেই একটা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে৷ মানবিক মূল্যবোধ আজ ভূলন্ঠিত৷ সমাজ, রাষ্ট্র তথা নিজেকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এটাইতো সময়৷ মন্ত্রী, আমলা, শিল্পপতি যারা ভেবে এসেছিলেন নিজেদের স্বাস্থ্যসেবা কিংবা চিকিৎসা প্রয়োজন হলে বিদেশে যাবেন৷ তাই চিরকাল অবহেলিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আজ তাদের কাছে অন্ধের ষষ্ঠি৷ প্রচুর অর্থ ছিল৷ ক্ষমতা ছিল৷ হয়তো ভিআইপি পাসপোর্টও ছিল৷ কিন্ত পরিশেষে মরতে হয়েছে এখানেই৷ বেঁচে থাকার কী করুণ আর্তনাদ! কাজে লাগেনি৷

সাদিক সাহেবের কাছে জীবন মানে কিছু দায়বদ্ধতা৷ সামর্থ্য অনুসারে সকলে নিজ দায়িত্বটুকুই পালন করুক৷ তাতেই দেশ-সমাজ পাল্টে যাবে৷ আর মৃত্যু? এটা একদিন হবেই৷ ভয়ের কিছু নাই৷ বরং এটাকে গৌরবান্বিত করাটাই বড় কথা৷

সাদিক সাহেব একটা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন৷ অফিস ঢাকায়৷ গুলশান এমবাসি পাড়ায়৷ রাশান এমবাসির পাশেই৷ দেশব্যাপি লক ডাউনের কারনে সকল স্ট্যাফকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে অফিস করার আদেশ করেন অফিস কর্তৃপক্ষ৷ যেহেতু ডোনার পার্ট৷ সেহেতু পার্টনার অর্গানাইজেশনের কার্যক্রমের রিপোর্টগুলো সামারাইজ করে হেড অফিসে পাঠাতে হবে৷ সপ্তাহে একদিন ভার্চুয়াল মিটিং হবে৷ এভাবেই চলছে অফিস৷ ভার্চুয়াল লাইফ৷

প্রথমদিকে ভালই লাগছিল৷ বাড়িতে শুয়ে বসে থাকা৷ পরিবারের সাথে একসাথে থাকা৷ আবার মাস ফুরোলে একগাদা বেতন৷ মন্দ কী! মনে হলো করোনা যেন মহা সুবিধা এনে দিয়েছে তাকে৷ যদিও অনেক কলিগ৷ অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্খি কর্মচ্যুত হয়ে পড়লো৷ ধীরে ধীরে হাহাকার বাড়ছে৷ এর শেষ কোথায় জানা নেই৷

নিজের বাড়ি মানে পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত একখন্ড জায়গায় একতলা একটা বাড়ি৷ অবশ্য শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত৷ বাসা নং ৫০, রোড নং-১৷ বাড়ি থেকে অফিস করা৷ এত সুবিধা৷ কিন্ত সাদিক সাহেবকে বিচলিত করে৷ ভাল লাগে না৷ আসলে এভাবে তিনি অভ্যস্থ নন৷ নিয়মানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলাবোধের ভেতরেই তার বসবাস৷ অফিসে যাওয়ার সময় নেই৷ পোষাক পরিচ্ছদের বিষয় নেই৷ কেমন যেন একটা অগোছালো জীবন৷ কোন চ্যালেঞ্জ নেই৷ নেই কোন থ্রিল৷

ইদানিং সাদিক সাহেব লক্ষ করছেন তিনি যেন বুড়িয়ে যাচ্ছেন৷ অফিসে কিংবা বাহিরে বের হতে হয়না৷ তাই প্রতিদিন দাড়ি শেভ করা, নিয়মিত চুল কাঁটা কিংবা হেয়ার কালারের প্রয়োজন পড়েনা৷ এতদিন একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মেয়েরাই শুধু সাজুগুজু করে৷ কিন্ত এখন বুঝতে পারছেন নিজেরা কম করেন না৷ নিজেটে পরিপাটি আর স্মার্ট রাখতে কত কৌশল আর প্রসাধন ব্যবহার করতে হতো তা তিনি টের পাচ্ছেন৷ সেলুনে যেতে না পারার কারণে চুল আর দাড়িগুলো যেমনি বড় হয়েছে৷ তেমনি হেয়ার কালার না করার কারণে সফেদ শুভ্র চুল-দাড়িতে নিজেকেই অচেনা মনে হয়৷ বেসিনের আয়নায় নিজেকে মনে হয় এক মধ্য বয়স্ক লোক৷

সাদিক সাহেবের বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন৷ অবসর নেয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন৷ অনেক আগে৷ ২০০০ সালে৷ সুস্থ্য একটা মানুষ৷ রাতে ডাইনিং টেবিলে সকলে একসাথে গল্পগুজব করে খাওয়া-দাওয়া করলো৷ সোফায় বসে বিটিভির খবর দেখছিলেন৷ হঠাৎ শুধু একটা হিচকি দিয়ে পড়ে গেলেন৷ হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা গেলেন৷ অবিশ্বাস্য! বেদনাদায়ক৷ মানতে কষ্টকর হলেও এটাই বাস্তবতা৷ জীবন রেখা একেবারেই ঠুনকো৷ বাবার মৃত্যু কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয় তাদেরকে৷ তখন তিনি লেখাপড়া শেষ করে চাকরি খুঁজছিলেন৷ তার বয়স ছিল ঊনতিরিশ৷ আর বাবার বয়স পঞ্চাশ৷ মায়ের বয়স ছিল চুয়াল্লিশ৷ অর্থাৎ সাদিক সাহেবের সাথে তার বাবার বয়সের পার্থক্য হলো একুশ বছরের আর মায়ের সাথে পনেরো বছরের৷ অন্যদিকে বাবা-মার বয়সের পার্থক্য হলো ছয় বছরের৷ অর্থাৎ কুড়ি বছর বয়সি  বাবা বিয়ে করেছিলেন চৌদ্দ বছর বয়সি মাকে৷ সে সময় এটাই স্বাভাবিক ছিল৷ কেননা বাল্য বিবাহ বলে কোন বিষয় ছিলনা৷

সময় পাল্টেছে৷ রুচির পরিবর্তন, শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইন প্রবর্তিত হলো৷ অর্থ উপার্জন আর ক্যারিয়ার সচেতনতা মানুষকে বিত্ত-বৈভব আর চাকরি নামক সোনার হরিণের পিছে এমন ভাবে ছোটাতে লাগলো যে সে নিজেই ভুলে বসলো নিজের সার্টিফিকেটের নয় সত্যিকারের বয়স৷ সে হোক নারী অথবা পুরুষ৷ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সংসার জীবন থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকলো ভীষণভাবে৷ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের অবাধ যৌণ সম্পর্ক স্থাপন করার বিধি বিধান থাকার পরেও তারা এত বিলম্বিত বিয়ে করেনা৷ কিংবা এত কম সন্তানও নেয়না৷

সাদিক সাহেব যখন বিয়ে করলেন তখন তার বয়স চল্লিশ৷ আর তার স্ত্রীর বয়স পঁচিশ৷ তাদের দুটো সন্তান৷ বড়টি মেয়ে৷ বয়স প্রায় নয়৷ আর ছোটটি ছেলে৷ বয়স চার৷

বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন৷ তাই তার মা পেনশন পান৷ বাড়ি ভাড়া পান৷ তা দিয়ে তিনি স্বচ্ছন্দে চলেন৷ সাদিক সাহেবের মত একজন মধ্য বয়স্ক সন্তানকে নিয়ে তাকে ভাবতে হয়না৷ সাদিক সাহেব অবশ্য মায়ের কাছ থেকে কোন টাকা নেন না৷ বরং নিজেই মাঝে মাঝে বাজার হাট করে দেন৷ মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ অস্বীকার করা কোন সন্তানের উচিৎ নয়৷

আজ কদিন ধরে কেন যেন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বড্ড বয়স্ক লাগে৷ একটু সময় ধরে নিজেকে গভীরভাবে লক্ষ্য করেন৷ আয়নায় ভেসে উঠা মুখটা নিজের বলে মনে হয়না৷ কিন্ত খুব চেনা চেনা লাগে৷ হঠাৎ মনে হয় এ মুখটা আর কারো নয়৷ বাবার৷ সাদিক সাহেব ভীত হন৷ চোখ সরিয়ে নেন আয়না থেকে৷

কদিন ধরে সাদিক সাহেব আয়না দেখেন না৷ এমনকি চুল আঁচরানোর সময়ও তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ান না৷ কেননা ইদানিং তিনি প্রতিনিয়ত  আয়নায় বাবার প্রতিচ্ছবি দেখেন৷

চুল-দাড়ি বড় আর সাদা রাখার কারণে প্রতিদিন মেয়ে রাগ করে৷ বলে বাবা তুমি শেভ করতো৷ চুল কালার করো৷ বিশ্রী লাগে! তুমি না করলে দেখবে ঘুমন্ত অবস্থায় আমি চুল-দাড়ি কেঁটে কলপ লাগিয়ে দেবো৷ তুমি টেরই পাবে না৷ তাছাড়া সামনে তোমার জন্মদিন৷

সাদিক সাহেব অভিভূত হয়৷ এই ছোট্ট মেয়েটা তার জন্মদিন মনে রেখেছে৷ একটা ভাল লাগা অনুভূতি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে৷ তিনি জানেন তার প্রত্যেকটা জন্মদিনে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা বিশাল আয়োজন করে৷ নিজের হাতে কেক বানানো৷ গিফট কেনা৷ সারপ্রাইজড দেয়া৷ তিনি ভীষণ এনজয় করেন৷ অন্যদিকে নিজের চরম ভুলটাও ধরতে পারে৷ বিয়েটা যদি সঠিক সময়ে করতে পারতেন৷ তাহলে এই সন্তানদের মমতাভরা মুখগুলো আরো বেশি বেশি দেখতে পারতেন৷

বাসা ন-৫০, রোড নং-১৷ আজ এ বাড়ির সামনে প্রচুর লোক সমাগম৷ ডেকোরেটর থেকে বিশাল সামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছে৷ তার নীচে অনেক চেয়ার৷ চেয়ারগুলো ফাঁকা নেই৷ সকলে শৃঙ্খলা আর পরিশালীনভাবে আসীন৷ একটু দূরে একটা জটলার ভেতর থেকে চার বছর বয়সী শিশুর নির্মল হাসির শব্দ উপস্থিত সকলকে ইমোশনাল করছে৷ শিশুটির এক হাতে জন্মদিনের কেক খন্ড অন্যহাতে গোলাপ জলের কনটেইনার৷ দুহাত নাড়াচ্ছে আর সেখান থেকে ছলাৎ ছলাৎ করে গোলাপ জল বেড়িয়ে বাবার গায়ে পড়ছে৷ তা দেখেই সে মজা পাচ্ছে৷ সে এখনো বুঝতে শেখেনি যে সামনে চিরতরে শুয়ে আছে তার বাবা৷ সাদিক সাহেবের আজ পঞ্চাশতম জন্মদিন৷

বাবার প্রতিচ্ছায়া-গল্প - রবীন জাকারিয়া