গল্প-সংখ্যা

গল্প-সংখ্যা

শাহেদুজ্জামান লিংকন

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০২ অপরাহ্ণ

সদৃশ

হবিউল্লাহ পর্ব

গলাটা খুসখুস করে শ্বাসে টান পড়ার পূর্বাভাস দেয়। স্পঞ্জে পানি ঢুকলে যেমন করে- বুকে; ফুসফুসের মধ্যে তেমন একটা শব্দের অনুভূতি। হবিউল্লাহ সচল ডান হাতটা বালিশের তলায় ঢুকিয়ে ইনহেলারটা খোঁজে। জায়গা মতো না পেয়ে ক্ষোভ ঝাড়ে তার স্ত্রীর উপর। হারামজাদী মাগি মোক মারি ফেলার জন্যে উঠিপড়ি নাগিছে। তোর কোন ইয়ার ভিতরত থুছিস। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে ঘরে নেই বলে গালটা দিয়ে কোনো মজা পায় না হবিউল্লাহ। তা না হলে আরো কিছুক্ষণ চলতো। মাথাটা কাত করতেই দেখতে পায় বিছানার এককোণে পড়ে আছে ইনহেলারটা। সেটা হবিউল্লাহর হাতের নাগালের বাইরে। তাও ভালো যে ডানপাশেই আছে। নিশ্চল শরীরটাকে বিছানা-সংলগ্ন খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে কাত করতে দু’হাতের উপর ভর দিয়ে পাছাটা ছেঁচরিয়ে কোনোমতে সফল হয় সে। বুকের মধ্যে বাঁশির মতো শব্দ হতে থাকে। ডান হাতটা বাড়িয়ে ইনহেলারটা ছোঁয়ার চেষ্টা করে। অস্থিতিস্থাপক হাতের তালু বিছানায় ঠেকিয়ে আঙ্গুলগুলোকে রাবারের মতো বাড়াতে চেষ্টা করে। এদিকে বুকের টানটা বাড়তে থাকে। ইনহেলারটা একসময় ধরা দেয়। পাফ নিলে কষ্টটা কমে।

হবিউল্লাহর স্ত্রী আছিয়া সালাম সর্দারের বাড়ি থেকে ফেরে হাতে একশো টাকার দশটা নোট নিয়ে। টাকাটা সর্দারের ছেলে রতনের হাতে পাঠিয়েছে তার মেয়ে জীবন্নেছা। ঘরে ফিরে দেখতে পায় হবিউল্লাহ খুঁটিতে হেলান দিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। আবারও উঠচেলো? হবিউল্লাহ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আছিয়ার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করে। এই মুহূর্তে গাল দেওয়া যাচ্ছে না তাই চোখ দু’টিই ভরসা। কিন্তু সে চোখে ক্রোধের পরিবর্তে ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব। স্বামীকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আছিয়া বলে, রতনের হাতোত একহাজার টাকা পাঠাইছে। চান রাইতোত আসপে। তোমার জন্যে বোলে সোন্দর একটা পাঞ্জাবী কিনছে। শেষোক্ত কথাটা বাড়িয়েই বলে আছিয়া। তবে একদিকে ভাবলে কথাটা মিথ্যে নয়। জীবন্নেছা বাড়ি ফিরলে বাবার জন্য পাঞ্জাবী আর মায়ের জন্য শাড়ি তো আনবেই। আছিয়া সবসময় চেষ্টা করে মেয়েকে হবিউল্লাহর ক্রুর সন্দেহ থেকে রক্ষা করতে । হবিউল্লাহ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না কী করে জীবন্নেছা এতো ঘন ঘন টাকা পাঠায়। এতো টাকা সে কোথায় পায়? তাই সে এমন একটা সন্দেহ করে বসে যা বাপ হয়ে মেয়ের প্রতি কেউ করে না। কথাটা মনে মনে সে রাখে না। ঝেড়ে শুনিয়ে দেয় আছিয়াকে।

–           ফির টাকা পাঠাইছে? 

–           হয়। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে আছিয়া।

–           কোটে পায় উয়া এতো টাকা? বেইশ্যাগিরি করে? হবিউল্লাহর কণ্ঠস্বর উঁচু হতে থাকে।

–           থুক্কু থুক্কু। তোমার আরো যতো কথা। গারমেন্টত চাকরি করে না জীবন্নেছা?

–           থো তোর চাকরি। আর মানুষ বুঝি গারমেন্টত চাকরি করে না। হারেছ না চাকরি করে গারমেন্টত। তা উয়ার বউ-ছাওয়ার টিকা শ্যাও ক্যা?

হবিউল্লাহকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাইরে চলে আসে আছিয়া। হবিউল্লাহ তখন আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে। তার দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পারার কারণ যে তার মেয়ে জীবন্নেছা তা সে মেনে নিলেও মনে নিতে পারে না। মেয়ের উপার্জনের টাকায় কেনা চালের ভাত তার পেটপূর্তি করতে পারলেও মনপূর্তি করতে পারে না কোনোদিন। ভাতগুলো ধান হয়ে বুকের ভিতরে খচখচ করতে থাকে। একবার সে ভাবে- খাবে না মেয়ের উপার্জনের টাকা। কিন্তু নিমকহারাম উদর সে কথা মানতে চায় না। মেয়ের গীবত গাইতে গাইতেই সে একসময় বলে ওঠে, আনেক তো চাইরটা ভাত। প্যাটটা চো চো করেছোল।

হবিউল্লাহ প্রায়ই আছিয়াকে পরামর্শ দেয়- জীবন্নেছাক বাড়ি ডাকাও। বিয়া-শাদী দিয়া সোয়ামীর বাড়িত পাটে দে। আছিয়া বলে, বিয়াও দিলে খাইমেন কী? সোয়ামীর বাড়িত থাকলে কী আর হামাক টাকা-পাইসা দিবার পাইবে? মেয়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পায় না আছিয়া। হবিউল্লাহ বলে, ভিক্ষা করি খামো। তেপথির মাথাত মোক শুতি থুয়া তুই ভিক্ষা চাবু। মোক দেকলে তো কতজনে ভিক্ষা দিবে। ভিক্ষার কথা শুনে জিহবা কাটে আছিয়া। থুক্কু থুক্কু কী কন এইল্লা। হামার চৌদ্দ গুষ্টিত কাও ভিক্ষা করে নাই। হবিউল্লাহ  তখন বলে, ওর জমিদারের বেটি তোর বেটির কামাই কি সারাজীবন খাবু? বিয়াও দিবু না? আছিয়া তখন হাসে। সেটা তকন দেখা যাইবে। না হয় দুইজনে বিষ খায়া মরমো। মৃত্যুর কথা শুনতেই কতোগুলো দৃশ্যপট ঘুরপাক খায় হবিউল্লাহর চোখের সামনে।

একাত্তরে যুদ্ধের সময় যখন পাকি বাহিনী হামলা করলো তাদের গায়ে তখন হবিউল্লাহরা বাড়ির সকলে আঙ্গিনায় বসে ভাত খাচ্ছিলো। হঠাৎ শুরু হলো গোলাগুলি। ছাৎ করে একটা গুলি হবিউল্লাহর কানের পাশ দিয়ে চলে গিয়ে ফুটো করে দিলো টিনের বেড়া। মাথাটা কাত না করলেই মরছিল সে। তারপর সবাই মাটিতে শুয়ে পড়লো।

আর একবার কী যেন একটা বিষয় চিন্তা করতে করতে সে হাঁটছিল বড় রাস্তা ধরে। সাথে ছিল নজু মিয়া। পিছনেই আসছিল একটা দানব ট্রাক। নজু মিয়া সেদিন টেনে না ধরলে ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়ে তার হাড়-হাড্ডি কিছুই খুঁজে পাওয়া যেতো না।

এরপর হবিউল্লাহর মনে পড়ে তিন বছর আগের ঘটনাটা। শামছুল মণ্ডলের বাড়িতে তখন কারেন্ট নেয়ার কাজ চলছিল। এ তল্লাটে শামছুল মণ্ডলের বাড়িতেই প্রথম বিদ্যুতের আগমন। শামছুল মণ্ডলের পক্ষে এটা ছিল মামুলি ব্যাপার। তারপরেও তার বাড়িতে কারেন্ট আসলো অনেক দেরিতে। লোকজন বলতো এটাও একটা চাল। শামছুল মণ্ডল বাড়ি পাকা করতে সময় নিয়েছিল এক বছর। একসাথে এতোগুলো টাকার উৎস কোথায় তা সম্বন্ধে যাতে কেউ সন্দেহ না করে তাই এমন উপায় অবলম্বন। শামছুল মণ্ডল চাকরি করতো জেলা প্রশাসকের অফিসে। অনেক ফাইল তার হাত দিয়ে পার হয়। আর ফাইল পার করার জন্য টেবিলের তল দিয়ে কিছু কচকচে নোট উড়ে এসে পড়ে তার পকেটে। কারো কাজ হয়, কারো হয় না। যাদের কাজ হয় না তারা টাকা ফেরত চাইলে ‘পরের বার হবে, আমি থাকতে চিন্তা কি’ বলার অজুহাতে সময় অতিবাহিত করে সে। একসময় ধার করে নেয়া কিংবা জমি-জমা বিক্রি করে দেওয়া টাকাটা পানিতে চলে গেলে সর্বশান্ত লোকগুলো সরকারের লোক শামছুল ম-লের সাথে পেরে ওঠে না। তখন কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু এলাকার লোকজনের কাছে ‘শোনা কথা’ ছাড়া কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায় তলে তলে বাড়তে থাকে শামছুল মণ্ডলের প্রতিপত্তি ও প্রভাব।

উপজেলা সদর থেকে আসা মিস্ত্রি বিদ্যুতের লাইন ঠিক করছিল শামছুল মণ্ডলের বাড়িতে। গ্রামের উৎসুক ছেলে-মেয়েরা দল বাঁধিয়েছিল সেখানে। যেখানে একটা মোটরসাইকেল দেখলে সবাই পিছনে পিছনে দৌড়াতে শুরু করে সেখানে কারেন্ট আরেক বিস্ময়! বাচ্চাদের দলে মিশে গিয়েছিল হবিউল্লাহও। কারেন্টের মিস্ত্রি টেস্টার দিয়ে চেক করছিল বিদ্যুত আসছে কিনা। একসময় মিস্ত্রি নাস্তা করতে গেলে অতি উৎসাহী হবিউল্লাহ একটা তার ছুঁয়ে দেখতেই শক খেলো। তৎক্ষণাৎ ঝটকিয়ে হাত সরিয়ে নিলো সে। ওরে বাপো চিন্নিত করি উঠিলরে। পাশে বসে পেপার পড়ছিল শামছুল মণ্ডল। হবিউল্লাহর চিৎকার শুনে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগলো- হলো কী? পাশে থাকা অবোধ বালক-বালিকার দল আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে নালিশ জানালো- ওমা হাত দিছলো। পাশে পড়ে থাকা একটা বাঁশের খুঁটা হবিউল্লাহর দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল শামছুল ম-ল। মরির আসছিস এটে কনা? মইরবার আর জাগা পাইস না? সেই খুঁটা ঘুরে ঘুরে এসে সরাসরি লাগলো হবিউল্লাহর পিঠে। ডানহাতে চেপে ধরা বাহাত সরিয়ে নিয়ে দু’হাতেই এবার সে চেপে ধরলো কোমর। ককিয়ে উঠলো সে। বসে পড়লো মাটিতে। তারপর মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলো। মরনু রে মুই মরনু। ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত শামছুল মণ্ডল। তারপর হবিউল্লাহকে নিয়ে যাওয়া হলো উপজেলা সদর হাসপাতালে। সেখানকার ডাক্তার সবকিছু শুনে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে বললো, রোগীকে রংপুর মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া লাগবে। শামছুল মণ্ডলের বেশ কিছু টাকা গচ্ছা গেল সেখানে। কিন্তু হবিউল্লাহর কোনো উন্নতি হলো না। শরীরের নিম্নাংশ অকেজো হয়ে গেল। আর হাঁপানী রোগটা তাকে উপহার দিয়ে গেছে পরলোকগত পিতা।

পিঠের সেই আঘাতের সাথে পায়ের কী সম্পর্ক তা আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি হবিউল্লাহ। মাঝে মাঝে সে ডাক্তারকেই গাল দিয়ে বসে, চ্যাটের ডাক্তার এইল্লা। খালি গরিব মাইনষার টাকাগুলা মারি খায়। কিন্তু ডাক্তার নয়, তার বেশির ভাগ টাকা গেছে কোর্ট-কাচারিতে। সমুন্ধির কথা শুনে সে কেস করেছিল শামছুল মণ্ডলের বিরুদ্ধে। কোর্টের টাকা যোগাতে ধানী জমিটুকু বেচে দিতে হয়েছিল। তারপর সেই টাকা তুলে দিয়েছিল সমুন্ধি ছাবের আলীর হাতে। ছাবের আলী তাকে আশ্বস্ত করেছিল- দুলাভাই চিন্তা করবেন না। শামছুল মণ্ডলক এবার দেখি ছাড়মো। শেষ পর্যন্ত শামছুল মণ্ডলের কিছুই করা গেল না। টাকা শেষ হয়ে গেলে ছাবের আলীরও আর দেখা মিললো না। সে যে তিন বছর থেকে বিছানায় পড়ে আছে একটাবারও যদি তাকে দেখতে আসে নিমকহারাম ছাবের আলী। হবিউল্লাহ ভাবে একবার যদি সে হেঁটে গিয়ে ধরতে পারতো ছাবের আলীর গলাটা। নিরুপায় হয়ে তাই সে প্রায়ই উড়ন্ত গাল ছুঁড়ে দেয় ছাবের আলীর উদ্দেশ্যে- চুদির ভাই মাইনষার পাছা মারা বুদ্ধি দিয়া বেড়ায়। অথচ ওইসব টাকা যদি সে নিজের চিকিৎসার পিছনে ব্যয় করতো তাহলে এতোদিনে দিব্যি ভালো হয়ে যেতো বলে তার বিশ্বাস।

সমুন্ধির কথা ভাবতে গিয়ে নিজের মেয়েদের কথা মনে পড়তেই হবিউল্লাহর মনের আগুনে ঘি পড়ে । তার বড় তিন তিনটা মেয়ে যাদের সে বিয়ে দিয়েছে হাড়-ভাঙ্গা পরিশ্রমের টাকায়, তারা বুড়ো বাপের কথা ভুলেই গেছে। এমন নিমকহারাম মেয়ের সে জন্মদাতা ভাবতেই একেকবার নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বসে হবিউল্লাহ। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তারা আর আসতেই চায় না। আসলেও বেশিক্ষণ থাকে না। কাজের অজুহাত দেখায়। হবিউল্লাহ তখন চেঁচিয়ে বলে, যা যা তোর ফির পোরধান মন্ত্রীর সাথে জরুরী মিটিং আছে। বাবার কথার অন্তর্নিহিত গুরুত্বের কথা ভেবে সময় নষ্ট না করে মেয়েরা ফিরে যায় প্রতিদিন পেটানো স্বামীর ঘরে। তখন ছোট মেয়ে জীবন্নেছাকে পূজা করতে ইচ্ছে হয় হবিউল্লাহর। জীবন্নেছাকে নিয়ে বিপরীতমুখী দুই ভাবনার  স্রোতকে এক করতে গিয়েও পারে না সে।

পুরনো এসব কথা ভাবতে ভাবতে মাথাটা ধরে আসে হবিউল্লাহর। পেটের ভিতরে খিদাটা চাড়া দিয়ে উঠলে সে হাঁক ছাড়ে- কোটে গেলুরে আছিয়া? তুই ওজা আছিস দেখি কি মোক খাবার দিবু না? আছিয়া ঘরে ফেরে আরো কিছুক্ষণ পর। আছিয়া এক জব্বর খবর নিয়ে এসেছে। খবরটা শুনছেন? হবিউল্লাহ খেই খুঁজে পায় না। কীসের খবর জিজ্ঞাসা করলে আছিয়া জানায়- আইজ বিয়ানবেলা লেপটিন যাবার ধরিয়া শামছুল মণ্ডল বেলে উল্টি পড়ি গেছলো। তারপর থাকি হাত-পা নড়ের পায় না। একনা আগোত মাইক্রোত করি অংপুর নিয়া গেল। খবরটা শুনে হবিউল্লাহর মনটা খারাপ হলো না খুশি হলো তা স্বামীর  মুখ দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না আছিয়া। আর সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ভেবে আছিয়া স্বামীকে প্রশ্ন করে, তোমার কাছোত কেমন নাগিল খবরটা? হবিউল্লাহ নিজেও ঠিক তা ঠাহর করতে পারে না। তার চোখ দুটো পিটপিট করতে থাকে।   

জীবন্নেছা পর্ব

জীবন্নেছাকে ইদানীং একটা দুঃশ্চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখে সারাক্ষণ। জিতু ফ্যাব্রিকসের ম্যানেজার রবিন পনের লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা। এখন এসেছে নতুন ম্যানেজার। রবিন না থাকায় অনিশ্চয়তার মাঝে পড়ে আছে সে। অবশ্য গারমেন্টসের ইফতার মাহফিলে নতুন ম্যানেজার মিজান খন্দকার বলেছে, ঈদের আগে সবাই যাতে বেতন-বোনাস পায় সে ব্যবস্থা সে করবে। সে গরিব ঘর থেকে উঠে এসেছে তাই গরিবের দুঃখ বোঝে। যতোই দুঃখ বুঝুক নতুন ম্যানেজার, জীবন্নেছা আর আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না।  রবিন থাকাতে বেতন-বোনাস নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না তার। অন্য সবার কী হয় হোক জীবন্নেছার কোনো সমস্যা ছিল না রবিন থাকাতে।

বেতন-বোনাস ছাড়াও প্রতিমাসে একটা বাড়তি টাকা জুটতো। এর বিনিময়ে জীবন্নেছাকে যা করতে হতো তা তার কাছে এখন কিছুই মনে হয় না। শুধু প্রথমদিন একটু কষ্ট হয়েছিল। যেন শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। তারপর ফ্রি হয়ে গেলে সে রবিনের দুর্বলতাটা খুঁজে পায়। রবিনও কাপুরুষের মতো স্বগতোক্তি করতো, তোমাকে দেখলেই আমার পড়ে যায়। বলেই একটা হাসি দিতো রবিন। কিন্তু সে হাসিতে বিজয় নয় পরাজয়ের গ্লানিই স্পষ্ট হয়ে উঠতো। জীবন্নেছাও হাসির সাথে তাল দিতো। রবিন তখন একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ভরসা করার মতো উত্তরের আশায় চোখ রাখতো জীবন্নেছার চোখে- হারবাল খাইলে মনে হয় ঠিক হবে। না? কিন্তু আশাব্যঞ্জক কোনো উত্তর পাওয়া যেতো না জীবন্নেছার কাছে। আমি কী জানি! খায়া দেখেন একবার। উঠতে উঠতে জীবন্নেছার গালটা টিপে দিয়ে রবিন বলতো, তুমি যে সেক্সি সেই জন্যে বুঝি এমন হয়। জীবন্নেছা লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে বলতো, যাঃ। রবিন তখন বলতো, তোমার মতো সুন্দরী আর সেক্সি মেয়ে এই গার্মেন্টসে ক্যান বাংলাদেশের আর কোনো গার্মেন্টসে যদি আরেকজন থাকে তাইলে আমি আমার কান কেটে কুত্তাকে খাওয়াবো। অতিরঞ্জিত করে কথা বলায় পটু সেই রবিন গারমেন্টসের পনের লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা। এখানে-সেখানে রবিনের ছবি সম্বলিত পোস্টার সেঁটে দিয়েছে গারমেন্টসের মালিক। ‘একে ধরিয়ে দিন। ধরিয়ে দিতে পারলে বিশেষ পুরষ্কার আছে।’ রবিন কেন এমন একটা কাজ করলো তা ভেবে পায় না জীবন্নেছা। বেতনও তো ভালো ছিল। একদিকে রবিন যেমন তার উঠতি সম্ভাবনাকে ধুলিস্মাৎ করে দিয়ে গেছে নিজে, তেমনি জীবন্নেছার কল্পিত একটা ভবিষ্যতকেও গলা টিপে হত্যা করেছে। তবু জীবন্নেছার কাছে রবিন দেবতা। এখনো সে স্বপ্নে দেখে রবিনকে। একেকবার  সে ভাবে- রবিন যদি টাকাগুলো ফেরত দিয়ে গার্মেন্টসের মালিকের পা ধরে ক্ষমা চায় তাহলে রবিন ক্ষমা পেয়ে চাকরিটাও পায় আর জীবন্নেছার বুকের উপর থেকে একটা পাথরও সরে যায়।

নতুন ম্যানেজার মিজান খন্দকার সবার কাছে কাছে গিয়ে কাজের খোঁজ খবর নেয়। মেয়েরা প্রশংসা শুরু করে মিজানের। কী সুন্দর চেহারা! এক্কেবারে নায়কের মতোন। জীবন্নেছারও তাই মনে হয়। কোথায় যেন এমন একজন নায়ক দেখেছে সে। পরে টিভিতে ছেলেদের একটা ক্রিমের বিজ্ঞাপন দেখার সময় তার অনুমানটাকে মিলিয়ে নেয়। হাসিনা বলে, শাকিব খানের মতোন চেহারা। অন্যরাও তাতে সায় দেয়। কেউ একজন ‘তোর সাথে জোড়া মিলবে’ বললে জীবন্নেছা বলে, মাগি তোর ভাতার নাই তুই বিয়া বস। ‘তোর সাথে জোড়া মিলবে’ এই কথাটা নিয়ে রাতের বেলা অনেক ভাবে জীবন্নেছা। রবিন ও তার ব্যাপারে কিছু জানতো নাকি মেয়েগুলো? যদি জানে তাহলে তো মুখ বন্ধ করে থাকার মতো অতো মানসিক শক্তি ওদের নেই। কতোদিনে তা রাষ্ট্র হয়ে যেতো। এভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি প্রয়োগ করে সন্দেহের সমূহ সম্ভাবনাকে অসার প্রমাণ করে জীবন্নেছা।

জীবন্নেছা তার ব্লকে কাজ করছিল। তার কাজের পরিমাণ কম। এটাও রবিনের বদৌলতে। কাপড়ের ফিনিশিং দেখে সে। যেগুলোর ফিনিশিং ঠিক হয়নি সেগুলো আলাদা করে রাখে। ম্যানেজারের পিয়ন এসে বলে যায়, মিজান স্যার যাওয়ার সময় দেখা করতে বলছে। জীবন্নেছা রবিনের দেওয়া হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে। এখনো একঘণ্টা বাকি আছে ডিউটির।

ডিউটি শেষে জীবন্নেছা ম্যানেজারের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। রুমের ভিতরে রুম। এসি আছে সে রুমে। কাঁচের দরজাটা একটু ঠেলে জীবন্নেছা প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করে, আসতে পারি স্যার। মিজান খন্দকার ল্যাপটপে টেপাটিপি করছিল। জীবন্নেছার মিহি কণ্ঠস্বর একবারেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। জী জী আসো। কণ্ঠটা শুনতেই খটকা লাগে জীবন্নেছার। একদম রবিনের মতো! রবিনও এভাবে দুইবার ‘জী জী’ বলতো। বসো। নির্দেশ শুনে সামনের চেয়ারটাতে বসে পড়ে জীবন্নেছা। মিজান খন্দকার হাতের আঙ্গুলের ইশারায় তার ডানপাশের চেয়ারটাতে বসার নির্দেশ দিলে জীবন্নেছা কিছুটা সংকোচবোধ করে। মিজান খন্দকারের দোদুল্যমান আঙ্গুলের সাথে নিজেও দোলাচলে দুলে অবশেষে ডান পাশের চেয়ারটাতেই বসতে বাধ্য হয় সে। জীবন্নেছা একবার চোখ তুলে নতুন ম্যানেজার মিজান খন্দকারের দিকে তাকায়। বুকের দুইটা বোতাম খোলা। বিজ্ঞাপনের সেই মডেলের সাথে মেলানোর চেষ্টা করে সে। কাছ থেকে দেখতে ওরকম লাগছে না। হাসিনার কথাই ঠিক। শাকিব খানের মতো। পরক্ষণে ভাবে না শাকিব খানের বুক তো এতো চওড়া না। ইন্ডিয়ান নায়ক সালমান খানের মতো। মিজানের চোখের সাথে চোখ পড়তেই চোখটা নিচু করে সে। নতুন ম্যানেজার মৃদু হাসে। জীবন্নেছা  তার জীবনে দেখা হাসিগুলোর অভিধান থেকে এ হাসির অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে। সঠিক অর্থ খুঁজে পেতে তেমন একটা বেগ পেতে হয় না যখন একটা হাতের হাঁটার দৃশ্য সে দেখতে পায়। পিলপিল করে একটা হাত এগিয়ে আসে। হাতের গন্তব্য কোথায় স্থির তা খেয়াল না করে হাতটির দিকে একমনে তাকিয়ে থাকতেই জীবন্নেছা দেখতে পায় এ হাত রবিনের! ঐ তো মধ্যমায় রবিনের সেই আংটিটা। কোথায় গেল বিজ্ঞাপনের মডেল, আর কোথায় গেল শাকিব খান কি সালমান খান এ যে সাক্ষাৎ রবিন! জীবন্নেছা চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায় না। পাছে রবিন আবার চলে যায় জীতু ফ্যাব্রিক্স ছেড়ে। হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ও আস্থা ফিরে পায় জীবন্নেছা। তাই সে অস্ফূট স্বরে বলে ওঠে, রবিন ভাই আপনি?!

সদৃশ

এটিএম মোর্শেদ

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০১ অপরাহ্ণ

ঝড়

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে খুব ব্যস্ত ভাবে টাইয়ের নট বাঁধছিল রাইসুল। রিমি কোটটা হাতে নিয়ে তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। রিমি ভেবেছিল হয় বুয়ার ছেলে এসেছে না হয় কোনো ভিক্ষুক, তাছাড়া এত সকালে কে আসবে? রিমি একটু জোরেই বলল দেখতো বুয়া কে এসেছে?

দরজার ওপাশ থেকে একজন বললো এক্সকিউজমি বাসায় কেউ আছেন? ভদ্রলোকের গলা শুনে রিমি নিজেই গিয়ে দেখতে পেলো এক যুবক অত্যন্ত স্মার্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। কয়েক মুহুর্তের জন্য দুজনেই নিরব। যুবকটি প্রথম মুখ খুললো।

এখানে রাইসুল থাকে? আইমিন জার্নালিস্ট রাইসুল ইসলাম?

রিমি মুখে কোন কথা না বলে শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে দরজা চাপিয়ে দিয়ে ভিতরে চলে আসে। রাইসুল তাকে বললো, কে এসেছে? রিমির জবাব, চিনি না দেখো গিয়ে কে এসেছে? রাইসুল দরজা খুলে চিৎকার করে বলে, আরে দিদার! তুমি কোত্থেকে এই সকালে, আর বাসার ঠিকানা কোথায় পেলে? একটা ফোন করলেও তো পারতে, এসো ভিতরে এসো। দিদার রাইসুলের পিছনে পিছনে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো তোমার মত ফেমাস সাংবাদিক এই ঢাকা শহরে ক’জন আছে যে বাসা খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে? আর ফোন করে এলে এমন সারপ্রাইজটা কি হতো? এদিক ওদিক তাকিয়ে দিদার বললো একটু আগে অপরূপা সুন্দরী এক মহিলাকে দেখলাম তাকে দেখছিনা যে, সে নিশ্চয় তোমার…… রাইসুল বলে, রিমির কথা বলছো? রিমি আমার ওয়াইফ। রাইসুল উচ্চ স্বরে ডাকলো রিমি এখানে এসো। রিমি ধীর পায়ে এসে রুমে ঢুকলো। রাইসুল দু’জনের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেয়। দিদার একটু দুষ্টুমি করে বলল সুখেই আছো বন্ধু, বাইরে নাম-যশ সাফল্য আর ঘরে অপরূপা সুন্দরী বউ। সারা পৃথিবী ঘুরেও আমার ভাগ্যে ওসব কিছুই জুটলো না। রাইসুল দিদারকে বলল, নিউইয়র্ক থেকে কবে দেশে এলে? উঠেছো কোথায়? দিদার বললো, গতকাল এসেছি। উঠেছি একটা হোটেলে। ঢাকায় আমার কিছু পার্সোনাল কাজ আছে। দু’তিন দিন সময় লাগবে, তারপর গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে এসে মুম্বাই যাব। রাইসুল বললো, তা বেশতো হোটেলে না থেকে দু’তিন দিন সময় এখানেই থাকতে পার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাইসুল বললো আমাকে এক্ষুনি বেরুতে হবে, আজ অনেক কাজ আছে, রাত বারটায় ফ্লাইট। দিনের মধ্যে কাজগুলো সারতে না পারলে খুব অসুবিধা হবে। দিদার বললো বারটায় ফ্লাইট মানে, তুমি আবার কোথায় যাচ্ছ? রাইসুল বললো, পি.এম এর সফরসঙ্গী হয়ে তিন দিনের জন্য চীনে যাচ্ছি। দিদার বললো, তোমার ভাগ্য বটে প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হয়ে বিদেশে সফর কজন সাংবাদিকের ভাগ্যে জোটে?

রাইসুল যাক ফিরে এসে বিস্তারিত কথা বলা যাবে আমি এখন আসি। দিদার বললো নিয়ম হলো তোমার ওয়াইফকে আপনি বলা এবং ভাবী সম্বোধন করা কিন্তু আমি ওসব পারবো না। রিমিকে রিমি বলেই ডাকবো। রাইসুল হেসে বললো, সে তোমার ইচ্ছে। তবে একটা কথা মাথায় রাখিও এটা নিউইয়র্ক নয়, বাংলাদেশ আর রিমি বাঙালি ললনা। রাইসুল বললো নো প্রবেলেম, তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। তুমি এখন আসতে পার। রিমি ইশারায় রাইসুলকে ভিতরের রুমে ডাকে। কাছে যেতেই বললো, তুমি বাইরে যাচ্ছ, চেনা নাই জানা নাই অপরিচিত একজনের সামনে আমি সারাদিন ঘুরতে পারবো না। তুমি বরং ওকে বলে দাও তুমি যখন বাসায় থাকবে তখন আসতে। রাইসুল হেসে বললো এই কথা? দিদার খুব ভালো ছেলে, দেখবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার মনে হবে কতদিনের চেনা। দিদার খুব ভালো জোকস করতে পারে, দেখবে ও সারাক্ষণ তোমাকে হাসিয়ে মারবে। রিমির নাকে একটা টোকা দিয়ে বাই বলে রাইসুল চলে গেল।

রয়া এতক্ষণ বাথরুমে কাপড় কাঁচছিল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে বললো, আফা লন আমি অহন যাইগা। ঐ বাসার মেম সাহেব যা খাঁইসটা, দেরি হইলে আমারে ছিড়্যা খাইবো। রিমি বললো, ছিঃ বুয়া ওভাবে বলে না। বুঝিয়ে বললে উনি নিশ্চয় রাগ করবেন না। তাছাড়া তোমার আজকে দুপুরে কোথাও যাওয়া হবে না। বাসায় মেহমান আছে, উনি দুপুরে খাবেন। অবশ্য আমি তোমাকে পান খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত একশত টাকা বখশিস দিবো। একশ টাকার কথা শুনে বুয়া আর কথা বাড়ালো না।

ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রিমি বুয়াকে বললো দেখতো মেহমান কী করছে? বুয়া পর্দা সরিয়ে এক নজর দেখে হাফাতে হাফাতে রিমির কাছে এসে বললো, মেহমানের মতে হয় মাথা খারাপ, রিমি বললো, কেন কী করেছে? বুয়া বললো, দ্যাখেন গিয়া জাইঙ্গা পইরা সামনে ইঠ-বস করতাছে। রিমি হেসে বললো মাথা খারাপ টাথা খারাপ ওসব কিছু না, উনি হয়তো ব্যায়াম করছেন। রিমি গিয়ে পর্দার একপাশ থেকে বললো দিদার ভাই, ডাইনিং এ আসেন চা দেওয়া হয়েছে? কিছুক্ষণ পর দিদার পোশাক পরে ডাইনিং এ চলে এসে বললো, এত খাবার? কতদিন এসব খাওয়া হয় না। রিমি তুমিও বসো। খেতে বসে দিদার বললো, জানো রিমি, গত ছয় বছর পূর্বে নিউইর্য়ক পাড়ি জমাই, জীবিকার সন্ধানে। অনেক স্বপ্ন অনেক আশা নিয়ে গিয়েছিলাম। রাতদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছি প্রথম দিকে। অর্থকষ্ট থাকলেও পরবর্তীতে অর্থের কোন অভাব ছিল না। কিন্তু, জীবনে যাকে বলে সুখ, শান্তি ওসব কিছুই পাইনি। একটু সুখের জন্য ওদেশীয় একটি মেয়েকে বিয়ে করলাম, ভেবেছিলাম ভিনদেশে একজন আপনজন পাবো কিন্তু ওটাই ছিল আমার জীবনের মস্ত বড় ভুল। বিয়ের পর তিন-চার মাস লিন্ডার সঙ্গে আমার আন্ডারস্টান্ডিং মোটামুটি থাকলেও পরবর্তীতে ও আমাকে পাত্তা না দিয়ে বয়ফেন্ড, অতিরিক্ত ড্রিংকিং, কোন কোন রাতে বাসায় না ফেরা এসব ওর নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে আপত্তি করাটা ওর কাছে ছিল হাস্যকর ব্যাপার। বিয়ের এক বছর পর আমাদের একটা মেয়ে সন্তান হলো। ভেবেছিলাম এবার ও শান্ত হবে। সন্তানের বয়স ছয় মাস হলো। আমার শত আপত্তি থাকা সত্ত্বেও একি চাইল্ড কেয়ার হোমে রেখে দিল। স্নেহ, মমতা আমার অস্থিমজ্জায় থাকায় বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারলাম না। উপরন্ত ও আবার উশৃঙ্খল জীবন-যাপন শুরু করলো। একদিন গভীর রাতে ওর সঙ্গে প্রচন্ড ঝগড়া কথা কাটাকাটি হলো, আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে রেগে গিয়ে ওর দু’গালে দুটা চড় বসিয়ে দেই। পরদিন ও সেপারেশন চেয়ে আদালতে মামলা করলো। খুব সহজেই আমাদের সংসার ভেঙ্গে গেল। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু সন্তানটির সঙ্গে যোগাযোগ করার আমার কোনো অধিকার থাকলো না। আমেরিকার মত দেশে অনেক বেপরোয়া জীবন যাপন করে জীবনটাকে উপভোগ করে থাকে জন্মগত ভাবেই মনে হয় আমি সে স্বভাবের ছিলাম না, তাই স্ত্রী সন্তানকে হারিয়ে ভীষণ ভেঙ্গে পড়ি। কাজ-কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রেখে যেকোন ভাবে আরও দুটি বছর কাটিয়ে দিয়ে দেশে ফিরে এলাম। এখন কি করব? স্থির করতে পারছি না। রিমি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল এবার মুখ খুললো। তাহলে আমেরিকায় আর ফিরে যাচ্ছেন না? বেশতো, একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে এদেশেই সেটেল্ড হয়ে যান। চাইলে আমরা এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবো। দিদার বললো, আবার বিয়ে! না না, বলে উঠে পড়লো। দিদার রিমিকে ডেকে বললো, আমি একটু বাইরে যাব তুমি দরজাটা লাগিয়ে দাও। দিদার বাইরে গেলে দরজা বন্ধ করে রিমি দিদারের কথাগুলো ভাবছিল। তার সরল স্বীকারোক্তি এবং দুঃখময় জীবনের কথা শুনে দিদারের প্রতি তার কেমন যেন একটা মায়া হলো এবং মায়া থেকে সৃষ্টি হলো বিশ্বস্ততা। কিছুক্ষণ পরে দিদার ফিরে এসে বললো রিমি তৈরী হও। ঘরে বসে না থেকে ঢাকা শহরটা একটু ঘুরে দেখি। বাইরে গেলে গাড়ি গেলে গাড়ি রেডি। রাত দশটা পর্যন্ত কনট্রাক্ট করেছি। আজ সারাদিন ঘুরবো, ফিরবো, বেড়াবো, গল্প করবো, রাতে ডিনার শেষে বাসায় ফিরব অবশ্য তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে। রিমি কিছুক্ষণ ভেবে বললো দিদার ভাই, আপনি গাড়িতে গিয়ে বসুন আমি পনের বিশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে আসছি।

খুব সাধারণ ভাবে সেজে দশ মিনিটের মধ্যেই রিমি নিচে এলো। দিদার বললো তোমার হয়ে গেছে, আমি তো ভেবেছিলাম কমপক্ষে এক ঘন্টা লাগবে। রিমি গাড়িতে উঠে বসলে গাড়ি চলতে শুরু করলো। রিমির বুকটা হঠাৎ একটু কেপে উঠলো। দু’দিন আগেও যার সঙ্গে পরিচয় পর্যন্ত ছিল না অথচ কত নিশ্চিন্তে তার পাশে বসে অজানার উদ্দেশ্যে চলেছি। কত অদ্ভুদ সম্মেহনী শক্তি লোকটার। দিদার মনে হয় রিমির মনে ভাবটা বুঝতে পারে। রিমিকে চুপ চাপ দেখে বলে, কী অত ভাবছো ভয় নাই, আমার উপর ভরসা রাখতে পার। রিমি হেসে বলে, ভরসা না থাকলে কি আর আসতাম?

সারাদিন গাড়িতে করে সমস্ত ঢাকা শহর ঘুরলো তারা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন পার্কে-রেষ্টুরেন্টে ঢুকে সময় কাটিয়েছে। সারাক্ষণ দিদার অনেক কথা বললেও রিমি তেমন কোন কথা বলেনি। দুপুরে লান্সের পর দিদার জিজ্ঞেস করেছিল, শুনেছি তোমাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো, কোন সন্তানাদি নাওনি কেন? রিমির সংক্ষিপ্ত জবাব, আমরা তো নিতেই চাই কিন্ত হচ্ছে না। দিদার এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ায়নি। তখন বিকেল চারটা। হাতে এখনও অনেক সময়। রিমি বললো দিদার ভাই, আর ভালো লাগছে না। চলুন বাসায় ফেরা যাক। দিদার ভাবলো এখন বাসায় গেলে রাতের খাবারের জন্য রিমিকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে, তার চেয়ে ভালো হবে ডিনারটা বাইরে সেরে যাওয়া। তাই দিদার বললো, চলো ওয়ান্ডার ল্যান্ডটা ঘুরে আসি। দুজনে গাড়িতে উঠলো ওয়ান্ডার ল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

কিছুটা শীতকাল হলেও হঠাৎ আকাশ খারাপ হয়ে আসছে। বৃষ্টি হতে পারে। রাত নটা নাগাদ তারা বাসায় ফিরলো। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর দুজনেই খুব ক্লান্ত। রিমি বললো, দিদার ভাই আপনি কিছু মনে না করলে আজ আর কোন কথা নয়, আমি খুব টায়ার্ড। এখন আমি ঘুমাবো। দিদার বললো, নিশ্চই, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি টিভিতে বিবিসি ওয়ল্ড নিউজটা একটু দেখবো। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিমি ঘুমিয়ে পড়ে। রাত এগারোটার দিকে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি শরু হয়। বাতাসের ঝাপটা এসে জানালার পর্দাগুলো উড়াচ্ছে তার সাথে হিমশীতল বাতাস। দিদার রিমির ঘরে এসে দেখে সে ঠান্ডায় কুন্ডুলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। দিদার জানালাগুলো বন্ধ করে রিমির গায়ে একটা কম্বল টেনে দিল। কি মনে করে রিমির হাতটা ধরে কাছে নিল। দিদারও যন্ত্রের মত রিমির শরীরের পাশে এসে পড়লো। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুজনের অস্থিরতা বেড়ে গেল। সেই সঙ্গে শরীরের উত্তাপও। বাহিরের ঝড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ঘরেও ঝড় উঠলো। এক সময় ঝড় থেমে গেলে হঠাৎ রিমি আত্মস্থ হয়ে ঝট করে বিছানায় উঠে বসে। এই আকস্মিক ঝড়ের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। লজ্জায়, ঘৃণায় নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকলো সে। ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো। বাইরে তখনও বৃষ্টি ও বাতাস চলছে। বাতাসের ঝাপটায় পানি এসে তার গায়ে পড়ছে। রিমি ভাবছে এই পানিতে যদি সব পঙ্কিলতা ধুয়ে মুছে যেত। এখন আমি রাইসুলকে মুখ দেখাবো কী করে? তার এত ভালোবাসা, এতো বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করলাম? না, বিশ্বাসঘাতক হয়ে তার সঙ্গে আমি অভিনয় করতে পারবো না। একটাই উপায় আছে। হ্যাঁ, আমি আত্মহত্যা করবো। পরক্ষণে মনে হলো আত্মহত্যা মহাপাপ, একটা পাক ঢাকতে গিয়ে আর একটা পাপ আমি করতে চাই না। তার চেয়ে এই পাপের শাস্তি যেন আল্লাহ আমাকে দেন এবং সেটা অবশ্যই মৃত্যু। রাতে মিমি আর এক মুহুর্তও ঘুমায়নি। এদিকে দিদারও আকস্মিক এমন ঘটনার জন্য লজ্জিত ও মর্মাহত। রিমির সামনে দাঁড়ানোর মতো সাহস তার নেই। উভয়ের লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য দিদার একটি চিরকুট লিলে ডাইনিং টেবিলে রেখে ভোর হওয়ার আগেই দরজা অটোলক করে বেরিয়ে যায়।

চিরকুটে লেখা, রিমি নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বাস করবে না যে, আমি একটা অমানুষ আর বিশ্বাসঘাতক নই। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বা দেখানোর মতো মুখ আমার নেই। তাই পালিয়ে গেলাম। দুঃখ পাবে নাকি খুশি হবে জানি না। ডাক্তার বলেছে, এ পৃথিবীতে আমার আয়ু বড়জোড় আর এক বছর।

চিরকুটের শেষের লাইনটা পড়ে রিমি আঁতকে ওঠে। দিদার এইচ.আই.ভিতে আক্রান্ত? তাই যদি হয়, দিদারের পরিণতি তো আমাকেও বহন করতে হবে। রিমির মনের ভিতর থেকে কে যেন একজন বলে উঠে, ঠিক হয়েছে, তোমার মতো বিশ্বাসঘাতক, পাপিষ্ঠার জন্য এমন পরিণতি হওয়াই উচিৎ।

ঝড়

মুগ্ধতা.কম

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০১ অপরাহ্ণ

রেইনলিলি ও ঘাসফুল

মোবাইলটা হাত থেকে ফসকে নিচের দিকে না পড়ে উপরের দিকে উঠল প্রথমে। পরে নিচের দিকে পড়তে শুরু করল। অমনি কমোডের উপর থেকে ড্রাইভ দিয়ে লাফিয়ে পড়ল নাহিদ। দুর্দান্ত একটা ক্যাচ লুফে নিল যেন। কিন্তু এই ক্যাচে কোন উইকেটের পতন ঘটল না । তবে এ যাত্রায় মোবাইলটা সেভ হলো আরকি। কিন্তু নাহিদের অবস্থা অনেকটা শোচনীয়। ডান হাতে এবং কোমড়ে ব্যাথা পেয়েছে বেশ ভালোই। আর ভেজা ফ্লোরে পড়েও পুরো শরীরও ভিজে গেছে। সবকিছুই এতই ডিজিটাল হয়েছে যে ওয়াশরুমে গিয়েও ডিজিটালাইজ কর্মকান্ড সম্পাদন করতে হয়। নাহিদ কমোডে বসে রেইনলিলি নামের ফেইসবুক আইডির সাথে চ্যাটিং করছিল। কমোডে বসে চ্যাটিং! বিষয়টা হাস্যকর হলেও প্রেম বলে কথা। আইডিটা ফেক না। ছদ্ধনাম ব্যবহার করা একটি মেয়ের আইডি নিশ্চিত হয়ে প্রেমে পড়ে নাহিদ। নাহিদ এর নিজের আইডিটাও অবশ্য ছদ্ধ নামে ব্যবহার করা। ওর আইডির নাম ঘাসফুল। রেইনলিলি ও ঘাসফুল আইডির সম্পর্ক এতই গভীর হয়েছে যে যখন তখন যে কোন মূহুর্তে চ্যাটিং-এ জড়িয়ে পড়ে তারা। রোমান্টিক রোমান্টিক সব বাক্যের ডালি যেন ঘুরে বেড়ায় দুজনের ইনবক্সে। আইডি ছদ্ধ নামে হলেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হওয়ার কারণে একে অপরের নামটাও জেনেছে তারা। প্রোফাইল পিকচারের মতো নামেরও মিল আছে তাদের। রেইনলিলির নাম নিনা। নাহিদ ওয়াশরুমে থেকে বেড়িয়ে অন্য একসেট পোশাক নিয়ে আবার ওয়াশরুমে ঢুকে।

রেইনলিলি ও ঘাসফুল এর বন্ধুত্ব হয় প্রায় ছয় মাস আগে। শুরুটা অবশ্য নাহিদই করেন। নাহিদ রেইনলিলি আইডিতে প্রোফাইল পিকচারে পিংক কালারের রেইনলিলি ফুলের ছবি দেখে কিছুটা চমকে উঠেছিল। তাঁর ঘাসফুল নামের আইডিতেও প্রোফাইল পিকচারে সেম কালারের ঘাসফুলের একটা ছবি আপলোড করা আছে। ফুলের জাত কিংবা গাছ আলাদা হলেও ফুল দুটি দেখতে একই রকম। কৌতুহল হয়ে রিকোয়েস্ট পাঠায় সে। কিন্তু রেইনলিলি সে রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করে ঝুলায় রাখে। এক সপ্তাহ পরে ইনবক্সে নক করে নাহিদ। নাহিদ লিখেছিল,

‘আপনার ফ্লওয়ার কত?’

‘অনেক। জুই,চামেলি,গোলাপ,বেলি,টগর,সন্ধ্যা মালতী, রজনীগন্ধ্যা—- আরও লিখব?’

‘সরি, লিখতে একটু ভুল হয়েছে। আসলে আপনার ফলোয়ার কত?’

‘৬১৩৪ জন। কিন্তু কেন? আমার ফলোয়ার কি আপনি কিনে নিবেন নাকি সরায় ফেলবেন?’

‘না, কিছুই করব না। শুধু বলব ঐ ৬১৩৪ জনের মধ্যে আমিও একজন। বন্ধু হতে না পেরে না হয় ঝুলেই থাকলাম। ফলোয়ার হয়ে থাকলাম তো।’

এটা দেখার পর রেইনলিলি একটা হাসির ইমো সেন্ড করে। ক্ষণিক পরে বন্ধুত্ব হওয়ার নোটিফিকেশনও চলে আসে। এরপর এই পথ চলা।

ইনবক্সে চ্যাটিং এর মধ্যেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। এরপর একে অপরকে বুঝে নেয় তারা। দুজনের বিভিন্ন বিষয়ে মিলও অনেক। মতেরও মিল অধিকাংশ সময় হয়। দুজন দুজনকে ভালো বুঝতে পারাটা প্রেমের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তবে এই সম্পর্ক তৈরির কিছু শর্তাবলীও ছিল। ভয়েস কল, ভিডিও কল, ছবি শেয়ার করা,আরও ইত্যাদি ইত্যাদি শর্তাবলীর মধ্যে ছিল। সব শর্তাবলী খুব সহজে মেনে নিয়েছিল নাহিদ। যে কারণে কিছু শর্তাবলী মাঝে মাঝে শিতিল হয়ে যাচ্ছিল। যার মধ্যে তারা কোন কোন সপ্তাহে একবার করে ম্যাসেঞ্জারে ভয়েস কলে কথা বলে। কিন্তু ভিডিও কলের সুযোগ হয়নি কখনো। নাহিদ অবশ্য ভুল করে কখনো চেষ্টাও করেনি।

ওয়াশরুমে পড়ে যাওয়ার পর হাত আর কোমড় প্রচন্ড ব্যথা করছিল। যে কারণে পোশাক পরিবর্তন করে এসে পেইন কিলার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। এরপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি ও। এক ঘুমে বিকাল। ঘুম ভাঙ্গলো তাও মায়ের ডাকে। সকালের ওয়াশরুমের দুর্ঘটনার কথা শুধু মা জেনেছে। যে কারণে ছেলের রুমে খবর নিতে আসা। মা অবশ্য আরও দুইবার এসে নাকি ফিরে গিয়েছে ছেলেকে ঘুমানো দেখে। এবার এসে আর না ডেকে পারল না। বিছানা থেকে উঠে অবশ্য অনেকটা ভালো লাগছে এখন। খুব সাবধানে আবার ওয়াশরুমে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল হাতে নেয়। ফোন হাতে নিয়ে দেখে রেইনলিলি হোয়াটসঅ্যাপে ৫বার এবং ম্যাসেঞ্জারে ৫ বার ভয়েস কল দিয়েছিল। দেখে যেন মাথায় হাত দেয় ও। এর পর দেখতে পায় রেইনলিলি’র লেখা। ও পরে লিখেছে,

‘এতবার কল দেওয়া দেখে পুনরায় ভয়েস কল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। খুব খুশি হয়ে কল দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম না লিখে সরাসরিই বলি। যা হোক কোন কারণে হয়তো ধরতে পারোনি। অনলাইনে অর্ডার করা তোমার দেওয়া গিফট আমার হাতে এসে পৌঁছে্ছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

ইনবক্সে লেখাটা দেখে মনটা ভালো হয়ে যায় নাহিদের।

গত ছয় মাসে কোনভাবেই কোন গিফট দিতে পারেনি রেইনলিলিকে মানে নিনাকে। কিভাবে পাঠাবে? ঠিকানা নেই। ঠিকানা চাওয়ার সাহসও দেখায় নি নাহিদ। সেদিন অনলাইনে একটা পিংক কালারের শাড়ি খুব পছন্দ হয় নাহিদের। শাড়ির ক্যাটালগ ডাউনলোড করে ইনবক্সে দিয়ে খুব রিকোয়েস্ট করে নাহিদ। নিনা রাজি হয়। পরে একটা মোবাইল নাম্বার এবং বসুন্ধরা গেট,ঢাকা লিখে ঠিকানা দেয়। তার সাথে লিখে দেয় এই ফোন নাম্বারে শুধু হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করা হয় এবং ঐ ফোনটি সবসময় ঘরে থাকে। কাজেই অফলাইনে এই নাম্বারে যোগাযোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করিও না। এরপর এই ঠিকানা দিয়ে অনলাইনে বিল পেইড করে অর্ডার করে গত পরশু। আর আজকেই হাতে চলে গিয়েছে তার। নাহিদ আন্দাজ করতে পেরেছে বসুন্ধরার-ই কোন বøকে থাকে নিনা। নাহিদের ফ্লাটও তো বসুন্ধরা এ বøকেই। অতকিছু ভাবতে চাইল না ও। একদিন না একদিন দেখা তো হবেই। ফোন রেখে মাকে ডাকতে ডাকতে রুম থেকে বের হলো নাহিদ। মার কাছ থেকে চায়ের আবদার করল ও। মা চা এনে দিল ওকে। মা বলল, আজকে আর বাইরে বের হওয়ার কোন দরকার নেই। মায়ের কথা রাখতেই হলো। সচরাচর নাহিদ ছাদে যায় না কিন্তু চা খেয়ে ছাদে চলে এলো ও।

ছাদের উপরটা কারা যেন সবুজ করে ফেলেছে। বিভিন্ন ফলের গাছ। সবজির গাছ। অবাক হলো দুইটা কলা গাছও আছে। সে গাছে আবার কলাও ধরেছে। ছাদে উঠে অনেক ভালো লাগল ওর। হঠাৎ ছাদে অন্য কারো উপস্থিতি অনুভব করল নাহিদ। ঘার ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে দেখে ছয় তলার ফ্লাটের মেয়েটি। যার সাথে নাহিদের প্রায়ই গেটে দেখা হয়। কিন্তু কখনো কথা বলা হয় নি। দেখেই চোখ সরিয়ে নেয় ও। চোখ সরিয়ে নেয়ার পরও মনে হলো কি যেন অবাক করার মত কিছু দেখেছে। বাধ্য হয়ে চোরের মত পূনরায় তাকানোর চেষ্টা করে। তাকিয়েই যেন অবাক হয়ে যায়। মেয়েটি শাড়ি পড়ে এসেছে। পিংক কালারের শাড়ি। শুধু পিংক কালারের না। এই শাড়িটাই সেই শাড়ি যে শাড়িটা ঘাসফুল রেইনলিলিকে অনলাইনে গিফট পাঠিয়েছিল।

রেইনলিলি ও ঘাসফুল

মাসুম মোরশেদ

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০১ অপরাহ্ণ

বাড়াবাড়ি

দু’ভাই। 

এক সংসার।

বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে বাড়ির ছোট বউ বুঝলেন তার বড় জা সংসারে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। কারণ, তার তিনটি সন্তান। তাদের খাওয়া-পরা আর লেখাপড়ার পিছনে সংসারের অনেক টাকাই খরচ হয়ে যাচ্ছে।

ছোট বউ মানতে পারেন না সেসব। 

তার গা জ্বলে। 

সহ্য হয় না সেসব।

রাতে তার স্বামী বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় উঠলে বউ পান সাজিয়ে দিতে দিতে স্বামীকে বোঝালেন, “এই সংসারে আমরা ঠগছি।”

“কিভাবে?” জর্দাপান মুখে দিতে দিতে স্বামী জিজ্ঞেস করলেন।

“বোঝ নাই?” ছোট বউও জর্দাপান মুখে দিয়ে কসর কসর করে চিবাতে চিবাতে বললেন।

“না।” ছিলিমচিতে পানের পিক ফেলে দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে বললেন। “বুঝাই কও।”

“শোন, বড় ভাই-ভাবির কয়টা বাচ্চা?”

“রহিম, করিম আর সখিনা…” গুনছেন তিনি।

“কয়টা হইল?” ছোট বউ জিজ্ঞেস করলেন।

“তিনটা।”

“আর তারা দুই মানুষ মিলে কতজন হইল?”

“পাঁচ জন।”

“ভাব, খেয়াল কর, একটু হিসেব কষ।” থেমে বললেন, “সেসবের পিছনে কত খরচ?” 

“হুমম, অ-নে-ক যায়…”

“আমাদের তো বাচ্চা নাই। আমরা ঠগছি না-কি?” ছোট বউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।

“হুমম। তাহলে?”

“আমাদেরও বাচ্চা দরকার।”

“আচ্ছা! আচ্ছা! না, আর ঠগাঠগি নাই। বাতি নেভাও। আসো। ”

কিছুদিন পর ছোট বউয়ের জমজ সন্তান হলো।

এখন,

বড় বউ তিন।

ছোট বউ দুই।

হলো, তিন ইস্টু দুই।

কিছুদিন যায়। 

তখনও ছোট বউ মানতে পারেন না। ভাবেন, তিনি ঠগছেন সংসারে।

তার গা জ্বলে। 

সহ্য হয় না সেসব।

বুকে নিমপাতা ঘষে ছোট বউ। সন্তান দু’টি আস্তে আস্তে বুকের দুধ ছাড়ে।

তার পর এক রাতে বিছানায় সুযোগ বুঝে ছোট বউ স্বামীর কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে বলেন, “তাদের তিন। আমাদের দুই।” 

“মানে?”

“তাদের তিনটা বাচ্চা আর আমাদের দুইটা বাচ্চা। সমান হইল কি?”

“না।”

“তাহলে আমরা ঠগছি।”

“হয় হয়।”

“শোন, আমাদের আরও একটা বাচ্চা দরকার। তাহলে সমান সমান হবে। এই সংসারে সবার সমান অধিকার থাকবে, হিসাব বরাবর, না-কি?” 

স্বামীকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ছোট বউ আরও বললেন, “তিনি তার বড় জায়ের সমান হবেন।”

স্বামী তার স্ত্রীর কথা বুঝলেন। 

বললেন, আচ্ছা!

পরের বছর ছোট বউ আবারও জমজ সন্তান জন্ম দিলেন।

এখন,

বড় বউয়ের তিনটা।

ছোট বউয়ের চারটা।

হলো, তিন ইস্টু চার।

তার পর সংসারে চুলোচুলি বাড়ল।

রান্নার চুলা বাড়ল। তার পর বাড়ির মাঝ বরাবর প্রাচীর উঠল।

বাড়াবাড়ি

সোহানুর রহমান শাহীন

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০১ অপরাহ্ণ

স্বপ্নচারিনী

মেয়েটির চোখের পাতা যেন কিছুতেই নামছে না, কেমন মেয়ে গো বাবা! এমন ভাবে কেউ অপরিচিত কারো দিকে তাকিয়ে থাকে নাকি? কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নাহ, ঠিক তেমনভাবে মনেও পড়ছে না যে, কোথায় দেখা হয়েছিল তার সাথে! আজকালকার মেয়েদের স্বভাবেই মনে হয় এমন! আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকের দিকে ধাবিত হচ্ছে আর ইচ্ছেগুলিকে লালন করছে একা একা। আচ্ছা, সে কি আমাকে চেনে? নাকি এমন ভাবে দেখে দেখে চিনবার চেষ্টা করছে যে, গত জন্মে পাখি হয়ে এসেছিলাম আর সেই পাখির লালনকর্তা ছিল এই মেয়েটি। মাঝে মাঝে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উদাস হচ্ছে, যেন কতো কালের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সে।
অপরিচিত মানুষের এমন তাকিয়ে থাকা দেখে মাথাটা আরো ভনভন্ করতে থাকে রুদ্রের। রুদ্র, অবসরপ্রাপ্ত পিতার মধ্যবিত্ত পরিবারে মাস্টার্স করা বেকার ছেলে। চাকরি নামে হরিণের কস্তুরি খুঁজতে প্রতিনিয়ত ঢাকা যেতে হয় চিড়িয়াখানার টিকিট হাতে নিয়ে। নিরাশ হয়ে ফিরে আসে, আবার যায়, আবার…।

নিরাপত্তার জন্য বাসের চেয়ে ট্রেনে যাতায়ত করে বেশি, তাছাড়া ভাড়াও কম, এই আর কি। তবে বৃটিশ নিয়মের ভিতর আজো সময়কে বন্দি করে রেখেছে ট্রেন, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা থেকে ট্রেনের অপেক্ষা। স্টেশনে ঝুলানো সময়সূচী মতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ছেড়ে যাবে ট্রেন কিন্তু রাত ন’টার কাঁটা ছুঁইছুঁই করছে ট্রেনের খবর নেই রংপুর স্টেশনে। প্লাটফার্মের পিলারের নিচে সানবাঁধানো গোল বেঞ্চে বসে আছে সেই মেয়েটি। এবার সে আরো গভীরভাবে তাকাতে শুরু করেছে। ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখার জন্য চোখে চোখ রাখতেই চোখ ফিরিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মেয়েটি। সেই সুযোগে দূর থেকে ভালো করে দেখে নেয় রুদ্র। নাহ্ তার পাশে তেমন কাউকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যারা আছেন, তারা কেউ আপন বলে মনে হলো না। যে যার মতো যাত্রী হয়ে আপন খেয়ালে অপেক্ষা করছে ট্রেন আসার জন্য। বাদাম বিক্রেতা এসে রুদ্রের গা ঘেঁষে দাঁড়ি বলে-‘স্যার বাদাম খাইমেন?’ ‘না’, সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে সামনের দিকে এগিয়ে যায় বাদাম বিক্রেতা। হঠাৎ করে বসে থাকা মানুষগুলো আড়মোড় ভেঙে উঠে দাঁড়াতে উদ্যাত, মনে হয় ট্রেন আসার খবর হয়েছে। রুদ্র নিজেও মানুষিকভাবে প্রস্তুতি নিতে নিতে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন বাবাজি স্টেশনের প্লটফার্মে। অপেক্ষার প্রহর থেকে মুক্ত যাত্রীরা। গোল বেঞ্চের দিকে এগিয়ে এসে চোখ আটকে যায় রুদ্রের। আর দেখা যাচ্ছে না মেয়েটিকে, মনে হয় বগির দিকে চলে গেছে। যাক বাঁচা গেল।

ট্রেনে উঠে নিজ সিটে কার যেন হাতব্যাগ লক্ষ্য করে রুদ্র। কোনো নারীর ব্যাগ নিশ্চয়ই। পাশের সিটে বসে মাথা নিচু করে মোবাইল ফোনে কারো সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে এক সুন্দরী মেয়ে। ‘ব্যাগ কার’, বাতাসে কথা ছুড়ে দিয়ে টিকিট হাতে রুদ্র আবার সিট নাম্বার মিলিয়ে নিশ্চিত হয়- এই সিটই হয়। কোনো সাড়া না পেয়ে আবার বলে- ‘ব্যাগ কার, এই সিটটা আমার’। মোবাইলের ভিতর থেকে আস্তে করে মাথা তুলতে তুলতে মেয়েটি বলে- ‘সরি, এটা আমার ব্যাগ’। ব্যাগটি নিজের আয়ত্বে নিয়ে আবার ডুবে যায় মোবাইল মোহনায়। মেয়েটি তার মাথা পুরোটা তুলতেই অবাক হয়ে যায় রুদ্র। আরে, এ তো সেই মেয়ে! যে আমাকে নিরলস ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো প্লাটফর্মে। কি যে আবিস্কার করলো আমাথেকে এখনো তো বুঝতে পারিনি। তার উপর পাশের সিটে সিট পড়েছো ট্রেনের। জানিনা আজ কপালে কি আছে। আরো কতো কি যে আবিস্কার করবে আমায় দেখে দেখে। কবি, নাকি চিত্রশিল্পী। আমাকে দেখে দেখে কবিতা লিখবে- নাকি ছবি আঁকবার পাঁয়তারা! আমায় দেখে যদি তার মনে এমন মন-ভাবনা জাগে তাহলে অনায়াসে সে পাগল, নয়তো এই লাইনে নতুন এসেছে। কারণ, তার আবিস্কারের জন্য মনে হয় আমার মতো বেকার বালক যথেষ্ট নই। সিগন্যালম্যানের সবুজ পতাকার ইশারায় ট্রেন ছেড়ে দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। লোহার চাকাগুলো রেল লাইনের উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ঘুরতে শুরু করে। একটু একটু করে গতি বাড়ে, গতি বাড়তে বাড়তে দ্রুত চলতে থাকে ট্রেন।

‘হ্যালো বাবা। হ্যাঁ, বাবা তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছো না? বাবা এইমাত্র ট্রেন ছেড়েছে, আমি আসছি বাবা, না তেমন কোনো সমস্যা নেই, তুমি কোনো চিন্তা করবে না। রাখছি বাবা, ট্রেন থেকে নেমে তোমাকে ফোন দেবো।’ মেয়েটি তার বাবার সাথেই ফোনে কথা বলেছে বলে মনে করে রুদ্র। ছুটে চলা ট্রেনের সাথে সাথে ছুটছে গাছপালা খাল-বিল, ফসলি জমি। যেন ট্রেনের সাথে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে সব কিছুকে। ট্রেনের ভিতরে যার যার মতো আসনে বসে যাত্রীরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, কেউ পত্রিকা মেলে নিজেকে আড়াল করে নিজ মনে পত্রিকা পড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ ঝিমোচ্ছে অভ্যাসের বসবর্তী হয়ে। কারো কোলের সন্তানকে আঁচলের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে দুগ্ধপান করাচ্ছেন মা।
কাকে যেন ভালোবেসে প্রায়শ্চিত্বের অন্ধকার গিলে খাচ্ছে চাঁদ। সম্ভবত আজ পূর্ণিমা। রুদ্রর পাশে বসে থাকা মেয়েটিও জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয় বিচ্ছুরিত প্রকৃতির চলমান সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত। তার ছেড়ে দেওয়া রেশমী দীঘল চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় নৃত্য করতে করতে রুদ্রর শরীর স্পর্শ করে। কথনো কখনো বেওয়ারিশ বাতাসে ওড়না উড়ে এসে ছুঁয়ে যায় মুখাবয়ব। রুদ্র এক প্রকার বিরক্ত বোধ করে। মেয়েটি জানালার বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে, রুদ্রের দিকে আড় চোখে তাকায় বারবার। অন্যমনস্ক রুদ্র বুঝতে পারে তাকেই দেখছে, কিছু বলে না, ধীরে ধীরে চিনবার চেষ্টা করে আবারো। হঠাৎ মেয়েটির হাত ফসকে মোবাইল ফোন পড়ে যায় সিটের নিচে। মোবাইল ফোন তুলতে নিচে ঝুঁকে পড়ে মেয়েটি। সিটের নিচে অস্পষ্ট আলোয় হাতড়াতে থাকে। মোবাইল ফোন খুঁজে না পেয়ে মাথা তোলে মেয়েটি, ইস্কুজমি, আমার মোবাইল ফোন হাত থেকে নিচে পড়ে গেছে, খুঁজে পাচ্ছি না, আপনার কাছে কি টর্চ হবে, অথবা এজাতীয় কিছু?’ মেয়েটির কণ্ঠে বেশ অনুযোগ। রুদ্র কোনো কথা না বলে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে মেয়েটির মোবাইল ফোন খুঁজে দেয় সিটের নিচ থেকে। ‘ধন্যবাদ’ বলে মোবাইল হাতে নিয়ে মেয়েটি ঝুঁকে পড়ে মোবাইলের স্ক্রীনে। বেশ কিছুক্ষণ পর মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে সরাসরি রুদ্রকে প্রশ্ন করে বসে- ‘আপনি আজব মানুষ তো! সেই রংপুর স্টেশনের প্লাটফার্ম থেকে আপনাকে চিনবার চেষ্টা করছি, বারবার তাকাচ্ছিলাম আপনার চোখের দিকে অথচ কিছুতেই আপনার পরিচয় জানাতে আমাকে সাহায্য করছেন না’। হঠাৎ মেয়েটির এমন কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠে রুদ্র।‘জ্বী, মানে, আমাকে বলছেন?’

‘জ্বী, আপনাকে বলছি। আপনি ছাড়া আমার পাশে আর কে আছে? দেখছেন না সামনের সিট দুটি খালি।’ চটপট জবাব দিয়ে আগের প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় থাকে মেয়েটি। রুদ্র পুরাই ‘থ’ হয়ে যায়। মেয়ে তো নয় যেন কাঁচালঙ্কা। তার পরও ভদ্রতার খাতিরে পরিচয়টুকু দেবার কথা ভাবে, ‘আমি রুদ্র, রংপুর শহরে থাকি, ঢাকায় যাচ্ছি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে। আপনি আমাকে চিনবার চেষ্টা করছেন! কেন, বলবেন কি?’

‘কেন আবার, মনে হলো কোথায় যেন দেখেছিলাম, তাই আবিস্কার করার চেষ্টা, এই আর কি। আবার কাকতলীয় ভাবে পাশাপাশি সিটও মিলে গেছে। কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পাচ্ছিনা। মেয়েটির কথা শুনে হতবাক রুদ্র- ‘আপনি বলবেন কি? আপনাকে কোথায় দেখেছিলাম? কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনতে পাচ্ছিনা আর ভাবছিও না, যে কোথায় আমাকে দেখেছেন।’ কারণ আপনার ভাবনা আপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ভাবতে থাবেন, আমি আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারছি না। রুদ্র একটানা কথাগুলো বলে চাঁদের আলো দেখতে দৃষ্টি নিয়ে নিয়ে যায় জানালার বাইরে।

‘আপনি তো আজব লোক জনাব!

‘কেন? এবার সরাসারি মেয়েটির দিকে তাকায় রুদ্র।

‘কেন আবার, জানতেও চাইলেন না আমি কে, কোথা থেকে এসেছি কোথায় যাবো, কি করি। আপনি জানতে না চাইলেও আমাকে বলতে হবে কারণ, আপনি যেহেতু আপনার পরিচয়টা বলেছেন। ‘আমি নিশীথা, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ি, বাড়ি ঢাকাতেই, রংপুর এসেছিলাম আপার বাসায় বেড়াতে।’ নিজ থেকে কথাগুলো বলে রুদ্রকে।

মেয়েটির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ব্যাঙ্গ করে রুদ্র বলে- ‘আজ চলে যাচ্ছেন, তাই তো? আর কিছু বলার আছে আপনার?’

‘হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। দেখুন, পাশাপাশি সিটে বসে যেহেতু ঢাকা পর্যন্ত যেতে হবে, সেহেতু মাঝপথে ছোট্ট করে একটা বন্ধুত্ব করাই যায়, কী বলেন? জার্নি বাই ফ্রেন্ডস। তাছাড়া সেই সময়ের মধ্যে যদি আপনাকে চিনে ফেলতে পারি, তাহলে তো আরো ভালো। তাই নয় কী?’

মেয়েটি, অর্থাৎ নিশীথার কথা শুনে রুদ্রের মনে হলো- এতো করে যখন বলছে, তাছাড়া যদি বের করা যায় যে, নিশীথা সত্যিই কারো সাথে আমাকে মিলানো বৃথা চেষ্টা করছে। ‘আচ্ছা নী- মানে…’

‘নিশীথা, আপনি আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। বলুন কি বলতে চাইছেন।’

‘আসলে যদি খোলাখুলি ভাবে বলতেন- কার খোঁজে আমাকে রিমান্ডে নিলেন? কে সেই মহাপুরুষ, কি নাম তার, কোথায় থাকেন, কি করেন, কবে-কোথায় তাকে দেখেছেন, কিভাবে হারিয়ে ফেলেছেন, কথা হয়েছে কি না, কথা হলে- কি ধরনের কথা বলেছেন এবং কেন খুঁজতে চাইছেন তাকে। আচ্ছা, আপনি কি তার প্রেমে পড়েছিলেন?কেন বলুন তো’, প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নিশীথা। ‘না, বলতে চাইছিলাম আপনার সেই মানুষকে চিনছেন না কেন।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, সেবার চট্টগ্রাম মামার বাসা থেকে ফেরার সময় ট্রেনে আপনার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। কথা হয়েছিল, কতোভাবে আমাকে জেনে নিলেন, বগিতে আলো কম থাকার কারণে ঠিক মতো আপনাকে মনে রাখতে পারিনি, তবে কথা বলার ভঙ্গি, বাড়ি ঠিকানা, বেকার, চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন দিগি¦দিক, আপনার শহরে এলে দেখা করতে বলেছিলেন, আবার ঢাকায় আমার সাথে দেখা করার জন্য কথা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য বসতঃ সেদিন আপনার নামটা আমার জানা হয়নি, তার আগেই তো ট্রেন লইনচ্যুত হয়ে আমাদের বগিসহ চারটি বগি উল্টে গিয়েছিল, সেই যে হারিয়ে গেলেন আর খোঁজ পেলাম না আপনার। সেই থেকে অনেক অনেক খুঁজেছি আপনাকে। দুর্ঘটনায় আপনার কিছু হলো কিনা তা জানার জন্য। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি। আর আজ কাকতলীয় ভাবে পেয়ে গেলম আপনাকে। প্রকৃতির কি এক মায়ার খেলায় হারিয়ে যাবার আড়াই বছর পর আপনাকে পেলাম ষ্টেশনের প্লাটফার্মে। আবার একই ট্রেনে পাশাপাশি যাত্রী হয়ে ঢাকা যাচ্ছি। আপনি যাচ্ছেন চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে আর আমি যাচ্ছি বাসায়, কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না?’ রুদ্রের দিকে না তাকিয়ে খুব সহজ ভাবে ফিরিস্তি দিয়ে গেল নিশীথা, যেন হারিয়ে যাওয়া কতো আপন মানুষকে খুঁজে পেয়েছে। তাকে কিভাবে বোঝাবো যে, তার গল্পের চরিত্রে এই রুদ্র ছিল না। তবুও পরিষ্কার করা দরকার। নিশিথাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে যায় রুদ্র। দেখুন আপনি কোথাও ভুল করছেন হয়তো। সেই ভুল থেকে ভুলভাল বলে যাচ্ছেন, তাও আবার আমাকে নিয়ে। আপনার নাম না জানা সেই মানুষ আসলে আমি নই। আমি তো আপনার সাথে কেন- কোনো নারীর সাথে একই ট্রেনে করে পাশাপাশি বসে যাত্রা করিনি। কখনো ট্রেন দুর্ঘটনায় পরিনি, আর সব চেয়ে বড় কথা হলো, আমার জীবনে আমি কখনো চট্টগ্রাম যাইনি। এবার বুঝতে পেরেছেন?

দেখুন আমার কোনো ভুল হচ্ছে না, ভুল আপনি করছেন রুদ্র, যে স্মৃতি আড়াই বছর থেকে বয়ে নিয়ে চলছি তা কেমন করে ভুল হয়। তাছাড়া আমি তো আপনার কাছে অধিকার নিয়ে আসিনি যে, আপনার সেই দিনের কথা মতো আমাকে গ্রহণ করতেই হবে। আপনি বলেছিলেন সম্পর্ক করা যায় কিনা, আমি ভবতে চেয়েছি, ক্যাম্পাসে দেখা করতে চেয়েও দেখা করেননি। ট্রেন দুর্ঘটনার পর আপনাকে না দেখে ভেবেছিলাম…। তারপর অপেক্ষা করেছি, এই বুঝি পিছন থেকে কেউ নিশীথা বলে ডাক দিয়ে বলবে- আমি সেই, ট্রেনে পরিচয় হয়েছিল! কিন্ত না, আজ আপনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসলেন! যাক, আপনাকে দেখলাম, আপনি বেঁচে আছেন, ভালো আছেন তাতেই আমি তৃপ্ত’। বলেই দু’হতে মুখ লুকিয়ে ফোঁপতে থাকে নিশীথা।

রুদ্র এবার বাকরুদ্ধ। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে যায় তার। হাসবে না কাঁদবে তারও হিসাব ঠিক মিলাতে পারে না। ‘নিশীথা, আপনি শান্ত হোন প্লীজ, আমি কথা দিচ্ছি ঢাকায় আমার চাকরিটা হয়ে গেলে নাম না জানা আপনার সেই লোকটিকে খুঁজে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আমাকে নিয়ে অযথা ভুল ভাবনায় নিজেকে আর জড়াবেন না। আমি অত্যন্ত নিরীহ এবং অবসরপ্রাপ্ত বাবার বেকার ছেলে।’

কথাগুলো বলে জনালার বাইরে ছুড়ে দেয় আপন দৃষ্টি। চাঁদ ঢলতে শুরু করেছে তার ঝলকিত আলো বিলিয়ে দিয়ে। আগের মতো আলো আর দেখা যাচ্ছে না, বাইরের রূপ সৌন্দর্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে আসছে, বনভূমিতে নেমে আসতে চাইছে অন্ধকারের থাবা, ভোর হয়ে আসার পাঁয়তারা চালায় নির্ঘুম রাত। হালকা বাতাস ঢুকছে জানালা ভেদ করে, সেই বাতাস থেকে একটু একটু ঠাণ্ডা বোধ হতে থাকে রুদ্রের, তাই জানালা বন্ধ করে দিয়ে নিশীথার দিকে তাকায়, এখনো ঠিক আগের মতো দু’হাতে মুখ ঢেকে সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমার কথায় মনে হয় বেশি কষ্ট পেয়েছে মেয়েটি। হঠাৎ নিশীথার মোবাইল থেকে রিংটোন বেজে উঠে, তড়িঘড়ি করে সাইটব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে রিসিভ করে, জড়ানো কণ্ঠে কথা বলার ধরণ শুনে মনে হলো, তার বাবা ফোন করেছে। হয়তো কোথায় আছে তার কুশলাদি জানার জন্যই ফোন করে থাকতে পারে। তবে পথ যে আর বেশি নেই জানালা খুলে বাইরে দেখে তার বাবাকে জানান দেওয়ার মাধ্যমে বুঝতে কষ্টহলো না। নিশীথা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ছুটে চলা ট্রেনের ভিতর ডালিম ফোটা ভোরের কুশমিত আলো ফেলেছে নতুন সূর্য। হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনের গতি একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। আবারও হুইসেল। দীর্ঘ যাত্রা শেষ করে কমলাপুর রেল ষ্টেশনে প্রবেশ করে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি। ততক্ষণে আড়মোড় ভেঙেছে অনেক যাত্রী। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে নিশীথা। তার চোখ দুটি ফুলে উঠেছে, হয়তো রাত জেগে ট্রেনে জার্নি করার কারণে হতে পারে হয়তো, নয়তো ভুলের ভারে কেঁদেছে কিছু সময়।

রুদ্র প্রস্তুতি নিতে নিতে নিশীথা কোনো কথা না বলে কানে ফোন লাগিয়ে হন্ হন্ করে নেমে যায় ট্রেন থেকে। নিশীথার পিছু নিয়ে ষ্টেশনের প্লাটফার্মে নেমে আসে রুদ্র। ততক্ষণে এক বয়ষ্ক ভদ্রলোকের পাশে দাঁড়িয়েছে নিশীথা। রুদ্রকে দেখে রেগে যায়, বলে- আপনি, আপনি একটা স্বার্থপর মানুষ, মানুষকে মূল্যায়ন করতে জানেন না, এতোদিন পর দেখেও আমাকে সারাসরি অস্বীকার করেছেন। আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেননি উল্টো আমাকে টেনশনে রেখেছেন আড়াই বছর থেকে। বাবা, এই সেই ছেলে, ট্রেন দুর্ঘটনার পর থেকে যাকে অনেক খুঁজেছি, এই ছেলেকেই খুঁজে দিতে বলেছিলাম তোমাকে। আজ ট্রেনে দেখা হবার পর সে বলছে, সে নাকি আমাকে চেনেই না’। নিশ্চুপ রুদ্রের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, ভদ্রলোকেই নিশীথার বাবা। মেয়ের কথা শুনে ভদ্রলোক মুখ খোলেন। ‘আপনি কে বাবা? কি হয়েছে নিশীথার সাথে, নিশীথা আমারই মেয়ে।’

‘আমি রুদ্র, রংপুর থেকে চাকরির পরীক্ষা দিতে এসেছি, তাকে আমি কখনো দেখিনি কিংবা নাম পর্যন্ত জানতাম না, অথচ কার সাথে যেন বর্ণনায় মিলিয়ে আমাকে জড়ালেন, আমি খুবই বিব্রত বোধ করেছি’।

‘দেখেন বাবা, আমি সব বুঝতে পেরেছি, আপনার সাথে এমন করাটা মোটেও ঠিক হয়নি। মেয়েটা আমার এমন ছিল না, পড়াশুনায় অনেক ভালো ছিল। সেবার ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হবার এক সপ্তাহ পরে, অর্থাৎ দেড় বছর আগে প্রচন্ড জ্বর হয়েছিল, প্রতিদিন নিয়ম মতো ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর কিছুতেই নামছিল না, সপ্তাহ পেরিয়ে দশদিন যায় অথচ জ্বর কমানোর কোনো নাম নেই, বড় ডাক্তার দেখিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করার পর টাইফয়েড ধরা পরে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

বাবার কথাগুলো শুনে নিশীথা চুপসে যেতে থাকে ঘঁষা খাওয়া বেলুনের মতো। রুদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে বলে- ‘তারপর’। ‘তারপর সব শেষ। তারপর, মাথায় আঘাত হানে টাইফয়েড। সেই থেকে মাথা এলোমোলো। যখন মনে যা আসে তাই বলে, তখন তাই করে। তবে সব কিছুই গুছিয়ে বলতে পারে- করতে পারে,। যেখানে যাবে সেখানকার গল্পই সে তৈরি করে বলতে পারে। অপরিচিত কারো বুঝবার উপায় নেই যে, সে এমন রোগ বহন করে চলছে দীর্ঘদিন থেকে। আর এই এলোমেলো মাঝে মাঝে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। অল্প কিছু দিনের জন্য আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, কিন্তু তখন আগের কোনো কিছু মনে করতে পারেনা। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও কোনো কাজ হয়নি। পথে আপনাকে এমন বিভ্রান্ত করার জন্য সত্যি আমি লজ্জিত। ওর হয়ে আপনার কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

চোখ বেয়ে জল নেমে আসতে চাইছে ভদ্রলোক- অর্থাৎ নিশীথার বাবার। ‘না, না ঠিক আছে, ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। তাছাড়া সবই যখন জানলাম, তখন দুঃখিত হওয়া ছাড়া আমারই বা আর কি করার আছে।’

বাবা পারলে পাগল মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিবেন।’ বলে নিশীথার হাত ধরে প্লাটফার্মের বাইরে বড় রাস্তার দিকে পা বাড়ায় দু’জনে। তাদের দিকে অপলক তাকিয়ে চলে যাওয়া দেখে রুদ্র। দেখতে দেখতে এক সময় রাজধানীর হাজরো মানুষের ভীরে মিলিয়ে যায় তারা।।

স্বপ্নচারিনী

মুগ্ধতা.কম

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

প্রশ্নবোধক

তন্দ্রা কয়েকদিন থেকে আকাশের কিছু বিষয় লক্ষ্য করছে যা তাকে দ্বিতীয়বার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভাবাচ্ছে।

বান্ধবী নিরা বারবার করে বলেছিল, ছেলেরা হলো ভ্রমরের মতো, যতদিন মধু ততদিন তারা আছে, যখন মধু শেষ তখন তারা হাওয়া।

তন্দ্রা পাত্তা দেয়নি নিরার কথায়। বরং নিরাকেই সংকীর্ণমনা বলেছে। যৌবন, মধু এই শব্দগুলো তন্দ্রা ভীষণ অপছন্দ করে। তবে আকাশের পরিবর্তনও সে মেনে নিতে পারছে না। একে অপরকে ভালোভাবে জানার জন্য একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। এতে দুজনের পরিবারই বাধ সেধেছিল। কিন্তু তারা কারো বাধা শোনেনি। নিজেদের জীবন নিজেরা যাপন করবে ভেবে বেছে নিয়েছিল লিভ ইন এর পথ।

কলিগ হিয়া বলেছিল, ভালোবাসা মানেই তো প্রিয় মানুষটির ভালো থাকাকে প্রাধান্য দেওয়া, তার পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন করা, পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। পরস্পরকে যদি ভালোই বাসো তাহলে লিভ ইনে থেকে একে অন্যকে জানার কী আছে? যতটুকু জানো তাতে কি একটা জীবন পার করে দেওয়া যায় না?

স্মিত হেসে হিয়াকেও পাশ কেটে গেছে তারা। বেশ ভালোই যাচ্ছিল তাদের জীবন। দুজনে সারাজীবন একসাথে থাকারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই তো গতমাসে দুজনে মিলে প্ল্যান করছিল যে আকাশের চলমান প্রজেক্টটা শেষ হলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নিবে। তখন পরিবার বা সমাজ কারোরই কিছু বলার থাকবে না।

সমস্যা শুরু হলো দিন পনেরো আগে আকাশের এক পিসি মারা যায়। সেই খবর পেয়ে সে গ্রামে গিয়েছিল। সেখান থেকে আসার পর থেকে আকাশ কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে, তন্দ্রার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না। তন্দ্রা কিছু বললেও মেজাজ দেখায়। তন্দ্রা ভাবে পিসির শোকে এমন করছে সে।

কিন্তু দিন দিন তন্দ্রার প্রতি আকাশের বিরক্তি বেড়েই যাচ্ছে। যে আকাশ তন্দ্রার ন্যাওটা ছিল সেই এখন তন্দ্রা একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পাশে বসলেও বিরক্ত হয়। যতক্ষণ বাসায় থাকে সারাক্ষণ ফোন নিয়েই পড়ে থাকে। তন্দ্রা কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে, তোমাকে সব বিষয়ে জানতে হবে না। এত প্রশ্ন করো কেন?

আকাশ একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখে তন্দ্রার মা বাসায় এসেছে। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে চা পান করছেন তিনি। আকাশ কোনো সৌজন্যতা না দেখিয়ে বেডরুমে চলে যায়। তন্দ্রাও আকাশের পিছে পিছে যায়। ফিসফিস করে বলে, মাকে দেখে তুমি কিছু না বলেই ভেতরে চলে এলে? কী ভাববে মা?

-আমার প্রচন্ড মাথাব্যথা করছে, কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তোমার মা এসেছে তুমি গিয়ে গল্প করো।

শান্ত শীতল কণ্ঠে কথাগুলো বলল আকাশ। তন্দ্রাও আর কথা না বাড়িয়ে মায়ের কাছে চলে গেল। মা-মেয়ে আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পর তন্দ্রার মা চলে গেল। মা চলে যাওয়ার পর তন্দ্রা ঘরে প্রবেশ করে দেখে আকাশ বাইরের কাপড় না ছেড়েই উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তন্দ্রা আকাশের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, বাইরের কাপড়টা এখনো ছাড়োনি যে?

মাথা তুলে আকাশ বলে, মাথা ব্যথায় আমি মারা যাচ্ছি আর তুমি আছো বাইরের কাপড় নিয়ে? বাইরের কাপড় পরে বিছানায় শুলে কি তা অচ্ছুৎ হয়ে যাবে?

-তুমি জানো আমি এসব ছুৎ অচ্ছুৎ মানি না। দাও তোমার মাথা টিপে দেই, ব্যথা কমে যাবে।

-এসব আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। তোমার মাকে যেতে দিলে কেন? আজ তিনি থেকে যেতেই পারতেন।

সারারাত দুজনে মিলে গল্প করতে।

আকাশের কণ্ঠ শুনেই তন্দ্রা বুঝতে পারে তার মা আসাতে সে খুশি হয়নি।

-আকাশ তুমি দিন দিন কেমন বন্য হয়ে যাচ্ছ। আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করছ ইদানীং। আর আজ মায়ের সাথেও কোন কথা বললে না। কী হয়েছে আমাকে বলবে তুমি?

উঠে বসে আকাশ। বালিশে হেলান দিয়ে বলে- তোমাকে বলার কী আছে? তুমি তো ভালোই আছো? তোমার মা বাসায় আসছে, অফিসে যাওয়ার পথে তোমার বাবার সাথেও দেখা হয়। তোমার সবই ঠিক আছে। শালা, আমারই কিছু ঠিক নেই। বাবা-মা আমার মুখ দেখতে চায় না, ফোন করলে ফোন রিসিভ করে না, ভুলে রিসিভ করলেও কথা বলে না। তোমাকে তো কিছুই হারাতে হয়নি তাই তুমি বুঝবে না। আমাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হারাতে হয়েছে। আমার পরিবারের একজন মানুষ মারা গেছে সেই কথাটাও তারা আমাকে জানায়নি। বুঝতে পারছো আমি তোমার জন্য কি হারিয়েছি? তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোই আমার জীবনের সব থেকে বড় ভুল ছিল।

আকাশের কথা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না তন্দ্রা। সে ভাবে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে।

অবাক বিস্ময়ে সে বলে, এসব কী বলছো আকাশ? আমি তোমাকে বাধ্য করেছি এসব করতে? আমি তোমাকে বলেছিলাম, শুরু করার আগেই শেষ করতে। আমাদের ধর্ম ভিন্ন, দুই পরিবারের জীবন দর্শন ভিন্ন। আমরা এক হতে পারবো না কখনো। কী বলেছিলে তখন তুমি? বলেছিলে, ভালোবেসে নিজের জীবনেই যদি এতটুকু পরিবর্তন আনতে না পারি তাহলে কিসের প্রগতিশীলতা, কোন অসাম্প্রদায়িকতার জন্য লড়াই করছি আমরা। ভুল তো সেদিন আমিও করেছিলাম তোমার কথায় মুগ্ধ হয়ে। তুমি বলছো, আমাকে কিছু হারাতে হয়নি। তুমি জানো আমি কি কি হারিয়েছি? আমার বাবাকে প্রতিদিন অফিসে, পাড়ার রাস্তায় কত কথা শুনতে হয়, কতটা হেনস্থা হতে হয়? আমার মা বাসা থেকে বেরনো বন্ধ করে দিয়েছে মানুষের কথায়। মানুষের কথা সহ্য করতে না পেরে বাবা আমাকে ত্যাজ্য করার জন্য আইনী প্রসেস করছে দেখে মা আজ এসেছিল আমাকে ফিরিয়ে নিতে। তোমার কথা ভেবে আমি মাকে ফেরত দিলাম। আর তুমি কি না এসব কথা বলছ?

বিছানা থেকে নামে আকাশ। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলে তাহলে, আছ কেন এখনো? যাও। আর আমাকেও মুক্তি দাও।

আকাশের শার্টের কলারের নিচটা চেপে ধরে তন্দ্রা বলে, এই যদি তোমার শেষ কথা হয় তাহলে আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করলে কেন?

কলার ছাড়িয়ে নিতে নিতে আকাশ বলে, তোমার জীবন নষ্ট হওয়ার কী আছে? চেহারা-ছুরত তো ভালোই তোমার। চাইলেই আমার মতো যে কাউকে পটাতে পারবে। আর হ্যাঁ এবার নিজের ধর্মের কাউকে পটিও তাহলে সুখে থাকতে পারবে।

এই কথা শোনার পর তন্দ্রা পাগল প্রায় হয়ে যায়। আকাশের বুকে এলোপাথারি কিল ছুড়তে ছুড়তে বলে, কী বললে? আমি তোমাকে পটিয়েছি? যে কাউকে পটাতে পারব? আমার ভালোবাসার কোন দাম নেই তোমার কাছে?

তন্দ্রার দুহাত চেপে ধরে আকাশ বলে-আমার জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়ে এখন ড্রামা করছ? যত্তসব!

তন্দ্রাকে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় সে। কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে পেছনে ফিরে দেখে ড্রেসিং টেবিলের এককোণায় পড়ে আছে তন্দ্রা। তার হাত লেগে কয়েকটি কসমেটিকস মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আবারও ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে কী ভেবে ফিরে আসে তন্দ্রার কাছে। তন্দ্রার হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে। তন্দ্রা ওঠে না, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আকাশ দেখে তন্দ্রার মাথার পেছন দিক থেকে টকটকে লাল রক্তের স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে।

পরদিন সকল নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ প্রচারিত হয়- অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে তরুন-তরুণীর মরদেহ উদ্ধার।

প্রশ্নবোধক

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

সুমাইয়ার একদিন

এই সময়টা সুমাইয়ার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে খেয়াল করে দেখেছে প্রতিদিন ঠিক একই সময় তার এমন লাগে।

প্রতিদিন ঠিক ৩.৪৫ মিনিটে তার এমন লাগে। সকালে একটু দেরী করে ওঠার অভ্যাস সুমাইয়ার ছোটকাল থেকেই। এজন্য কতো সমস্যা হয়েছে। সকালের প্রথম ক্লাসটা খুব কমই করা হয়েছে।

বরাবরই মেধাবী ছাত্রী সুমাইয়া। প্রথম, দ্বিতীয় না হলেও ভালোভাবেই পাশ করেছে বোর্ডের সব পরীক্ষাগুলোয়। এখন মাষ্টার্স করছে শহরের একটা নামকরা কলেজে।

কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। বাড়িতে চলে আসতে হয়েছে।

এ শহর, এ কোলাহল ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। এ শহরে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, ঘুরা যায় ইচ্ছে মতো। এ শহরে তার প্রেমিক থাকে।

ঘুম থেকে উঠে সংসারের টুকটাক কাজে মাকে সাহায্য করা, ভাতিজা, ভাতিজির সাথে খেলা করা তারপর গোসল করে খাওয়া। সবাই যে যার ঘরে চলে যায়।

দোতলার উত্তরের ঘরটায় আসার পর আর সময় কাটে না।

শুয়ে মোবাইলে ফেসবুক চালাতে-চালাতে ঠিক ৩.৪৫ মিনিটে দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন জানলার পাশে দাঁড়াতে হয়।

অনেকদিন আগে তখন সুমাইয়ার বয়স নয় বছর। দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সুমাইয়া। ঈদের ছুটি। সব চাচাতো ভাইবোনেরা দুপুরে বাড়ির পিছনে পুকুরে গেল গোসল করতে। মা কে না বলে সুমাইয়াও গিয়েছিল। সাঁতার না জানা সুমাইয়া কিছুক্ষণ পর টের পায় তার পায়ের নিচে আর মাটি নাই। একটা আতংক চেপে ধরে, মনে কোন চিন্তা নাই, চিন্তা নাই মায়ের কথা, প্রিয় জামা এসব কিছুই মাথায় আসছিল না। শুধু নিজের অজান্তে হাত- পা ছুঁড়তে থাকে। তার এমন হাত-পা ছোঁড়া দেখে চাচাতো বড়বোন লতা এগিয়ে আসে। ধাক্কা দিয়ে নিয়ে আসে পাড়ের কাছে।

৩.৪৫ মিনিটে সুমাইয়ার ঠিক একই অনুভূতি হয়। পানিতে পড়ার অনুভূতি।

ছোটবেলায় এই দমবন্ধ থেকে বাঁচানোর জন্য বড় বোন ছিলো আজ কেউ নেই। জানলার কাছে এসে দাঁড়ালে সুমাইয়ার ভালো লাগে।

জানলার ওপাশে সজনা গাছ। গাছটাতে একটা-দুটা পাখি সবসময় কিচিরমিচির করে। বড় ভালো লাগে। কিছুক্ষণ পর শ্বাসকষ্ট কমে যায়। তারপর কিছুক্ষণ গল্পের বই পড়া।

অনিকের সাথে গত কয়েকদিন ধরে মনোমালিন্য চলছে। বিষয়টা খুবই সাধারণ ছিল। যেদিন হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেল সেদিন অনিককে সুমাইয়া বলেছিল যেন সে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। অনিক কী একটা কাজের কথা বলে আর যায়নি। বিষয়টাকে হালকা ভাবে দেখলেও চলতো কিন্তু সুমাইয়ার মন খারাপ এজন্য যে অনিকের সাথে আবার কবে দেখা হবে তার নেই ঠিক। অনিক কি পারতো না রেখে আসতে?

বিকাল হয়ে এলো। বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে শিশু কন্ঠে আযান শোনা যাচ্ছে। হয়তো মাদ্রাসার ছাত্রের আযান দেবার হাতেখড়ি হচ্ছে। সুমাইয়া মন দিয়ে শোনে। কি কোমল আর মিষ্টি কন্ঠ! নামাজের জন্য ডাকছে কিন্তু কেউ যেতে পারছে না করোনার কারণে। সবাই ঘরে বন্দী।

কে কবে ভেবেছিল এমন হবে?

সুমাইয়ার ভালো লাগে না। রাতে মায়ের সাথে টিভি দেখার সময় ফোনটা এলো। কফিল চাচা অসুস্থ। কফিল চাচা গ্রামে থাকে। দুপুর থেকে বুকে ব্যথা। পল্লী চিকিৎসক গ্যাসের ঔষধ দিয়েছে কিন্তু একটুও কমে নি।

সন্ধ্যায় আর না থাকতে পেরে ফোন দিয়েছে শেফালি। কফিল চাচার একমাত্র সন্তান। সব শুনে সুমাইয়া কফিল চাচাকে হাসপাতালে আনতে বললো।

সন্ধ্যা ছয়টা, বাইরে বের হওয়া নিষেধ। তারপরও সুমাইয়া হাসপাতালে রওনা দিল। বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সুমাইয়া এসে দেখে কফিল চাচা ভ্যানে শুয়ে আছে।

শেফালি কেঁদে কেঁদে বললো, ডাক্তার সাহেব রংপুর মেডিকেল কলেজে রেফার্ড করেছেন। হার্টের সমস্যা। দ্রুত নিয়ে যেতে হবে। সুমাইয়া কী করবে বুঝতে না পেরে মোবাইলের লক খুলে সজলকে ফোন দেয়।

সজল রংপুর মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নি করছে। সজল সব শুনে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলে। এ্যাম্বুলেন্স নষ্ট বাধ্য হয়ে তিনগুণ বেশী ভাড়ায় তারা দুই নারী আর তাদের আধিয়ার মানিক রওনা হলো মাইক্রোবাসে।

মাইক্রোবাসের সিটে কফিল চাচাকে কোনোমতে শুইয়ে তারা গাদাগাদি করে বসে। মাঝপথে কফিল চাচার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। ড্রাইভার সাহেব আর একটু জোরে যান বলে সুমাইয়া চাতক চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো, হায় আজ হাসপাতাল এত দূরে কেন?

[করোনার দুঃসময়ে লেখা গল্প]

সুমাইয়ার একদিন

প্রমথ রায়

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

খড়কুটো লাশ

তার সাথে আমার পরিচয় জয়নুল গ্যালারিতে। সেদিন সব্যসাচী হাজরার চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছিল। তার পরনে ছিল কলাপাতা শাড়ি। কপালে কালো টিপ। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। সাউথইস্টে বিবিএ করছে। শখের চিত্রশিল্পী। আমি বাউন্ডুলে। তবুও আমাদের বন্ধুত্ব হয়। আমি নাকি তার কাছে চিত্রশিল্পী ফিদা মকবুলের মতো। আমার উসকো খুসকো চুলগুলো নাকি তার খুব পছন্দ। আমি কবি না হলেও নিজেকে কবি ভাবতে ভালোবাসি। আর এ জন্যই মনে হয় এ বাউন্ডুলে জীবন। যদিও আমি কোনো কবিতা লিখিনি তবে মুখস্থ করেছি অনেক। কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলে দেই, হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে! 

তাকে শোনালাম, তুমি মোর প্রিয়া হবে দুই জন্ম পরে…….। তার নাম ইপ্সা।

ইপ্সা একদিন আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। তার ইচ্ছে বড় করে আমার পেইন্টিং এঁকে তার ঘরে টাঙিয়ে রাখবে। আমার হাসি পায়। এভাবে দিন এগিয়ে চলে। প্রতি বিকেলে আড্ডা চলে টিএসসি চত্বর, ধানমন্ডি লেক কিংবা সংসদ ভবনে। কখনো কখনো সাভারের সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে বসি কিংবা বুড়িগঙ্গার দুষিত জলে নৌকা বাই। নৌকোয় পা দুলোতে দুলোতে গল্প করি। সুখের গল্প, দুখের গল্প। দেশের গল্প বিদেশের গল্প। হাতে হাত ধরি। কখনো কখনো বাদামের খোসা খুলতে খুলতে দূর অজানায় হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। অথচ আমরা কেউ কারো নই। অন্যের হয়ে যাবো। কৃপান্তির কথা মনে পড়ে।কৃপান্তির কথা ইপ্সার কাছেই শুনেছি। আমাদের গল্পের বিশাল অংশ জুড়ে থাকে কৃপান্তি। আমি তাকে দেখিনি, অথচ কখনো তা মনে হয় না। আমার আপন হয়ে উঠেছে। কৃপান্তি কবিতা ভালোবাসে। জীবনানন্দের। ইপ্সার হাত দিয়েই ‘জীবনানন্দ কবিতাসমগ্র’ পাঠিয়েছি। একদিন দুটো কাঠগোলাপের চারা পাঠালাম। তার নাকি খুব ইচ্ছে বাড়ির মেইন গেটের দুপাশে দুটি কাঠগোলাপ গাছ লাগাবে।

কৃপান্তির সাথে খুব দেখা করতে ইচ্ছে করে।কিন্তু ইপ্সা করায় না। অনেক বলার পর একদিন সে রাজি হলো, মোবাইলে কথা বলাবে। রাত নয়টায় মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য।

রাত নয়টা।সমস্ত ঢাকা শহর অন্ধকারে নিমজ্জিত। লোডশেডিং চলছে। অথচ আমার হৃদয়ে জ্বলে আছে অজস্র ইলেট্রিক বাতি। ডায়াল করলাম। একটি মিষ্টি স্বর বলে উঠলো, আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে কয়েকবার চেষ্টা করলাম। অবশেষে সংযোগ পেলাম। সে দেখি ইপ্সার সাথে আমার বলা সব কথা জানে। বলল, আপনার খুব কষ্ট না? আমি বললাম, কিসের কষ্ট? সেতো জীবনের পরশপাথর। আপনাকে পেয়েছি! 

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আবার ডায়াল করলাম। আবার সেই মিষ্টি স্বর বলে উঠলো, সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

পরদিন ইপ্সাকে সবকিছু বললাম। সে শুধু হেসে আমাকে শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক দেখাতে নিয়ে গেল। শেকসপিয়ারের হ্যামলেট। কিছুতেই মন বসাতে পারলাম না। সে আমার মনের বিমর্ষতা বুঝতে পেরে বলল, শুক্রবার ভাদুনে এসো। কৃপান্তির সাথে দেখা হবে। এবার ইলেট্রিক বাতি নয়; মনের আকাশে জ্বলে উঠলো অজস্র তারকারাজি। নাটকে মন দিলাম। ওফেলিয়া জলে ডুবে মারা যাচ্ছে।  নদীর বুকে নেমে আসা একটি শাখায় ভর দিয়ে সে একটি উইলো গাছের মাথায় বনমুকুট পরাতে যাচ্ছিল। হঠাৎ শাখাটি তার ভারে ভেঙে যেতেই সে জলে পড়ে গেল। তার পোশাক তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো। তখন তাকে দেখাচ্ছিল মৎসকন্যার মতো।

শুক্রবার ভাদুনে গেলাম। পুব দিকে লাল মেঠো পথ। মিনিট দশেক হাঁটলে  একটা ছোট্ট ব্রিজ। সেই ব্রিজ পেরিয়ে প্রাইমারী স্কুল। সেখানে কৃপান্তির সাথে দেখা হবে। পরনে থাকবে কলাপাতা শাড়ি। অপেক্ষায় আছি। কিন্তু সে আসে না। ইপ্সার নাম্বারও বন্ধ। অবশেষে সন্ধ্যার একটু আগে ঢাকা থেকে একটা লাশ আসলো। ধর্ষিত নারীর লাশ। পরনে ছিল কলাপাতা শাড়ি। কপালে কালো টিপ। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা নেই। পাখির নীড়ের মতো চক্ষু মুদে আছে অনন্তকালের যাত্রায়। আমি মরামাছের চোখ দিয়ে দেখলাম। ইপ্সার লাশ। খড়কুটো লাশ। পুড়ে ছাই হবে। হায় কৃপান্তি তুমি কোথায়? তুমি কি ইপ্সা? যে আমায় সবসময় বলতো, আমরা কেউ কারো নই। আমরা চলে যাবো দু’জনার পথে। তুমিতো তোমার পথে চলে গেলে। আর আমি উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়াই টিএসসি চত্বর, ধানমন্ডি লেক, সংসদ ভবন। কখনো কখনো সাভারে সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমি কিংবা বুড়িগঙ্গার দুষিত জলে তোমাকে খুঁজি। কৃপান্তিকে খুঁজি।  আর বার বার শুনি, আমি হবো তোমার প্রিয়া দুই জন্ম পরে……..।

খড়কুটো লাশ

মজনুর রহমান

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

আজান

চারদিকে এশার নামাজের আজান হচ্ছে। বসন্তের উদাস বাতাস জানালা দিয়ে ঢুকে শরীর স্পর্শ করে যাচ্ছে। একজন যুবক ঘরের ভেতরে একা। গত এক সপ্তাহ থেকে অনেকটা একাই থাকতে হচ্ছে তাকে। আজানের ধ্বনিতে যখন লম্বা টান পড়ছে, হঠাৎ করে তার ভেতরে একটা হাহাকার তিরতির করে বইতে লাগল। পুরো শরীর কাঁপিয়ে কান্নার গমক আসতে লাগল। যুবক মানুষটা একলা ঘরের ভেতরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। মনে হচ্ছে, মুয়াজ্জিন মাইকে আজান দিচ্ছে না, দীর্ঘ সময়জুড়ে গভীর আর্তনাদ করে চলেছে। আজানকে কেন আহাজারি মনে হচ্ছে, আর কান্নাই বা কীসের জন্যে পাচ্ছে পরিস্কার করে বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো বেশ কিছুদিনের বন্দিত্বের বেদনা, মসজিদের জামাতে শরিক হতে না পারা- এসবই তার ভেতরে কোন ভাঙন এনে দিচ্ছে। যুবক নিজেও ঠিক করে বুঝে উঠতে পারে না কান্নার কারণ। 

এক সময়ে আযান শেষ হয়। মুয়াজ্জিন এর কিছুক্ষণ পরে অদ্ভুত একটা ঘোষণা দেয়। এমন ঘোষণা যুবক এই জীবনে কোনোদিন শোনেনি, কোনোদিন কল্পনা করেনি। মুয়াজ্জিন যেন তার ভারী গলায়, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকে, সম্মানিত মুসল্লিবৃন্দ, আজ থেকে আপনারা পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত মসজিদে আসবেন না। সবাই নিজ নিজ জায়গায় নামাজ আদায় করে নিন। আগামী শুক্রবারও শুধু দশজন মুসল্লিকে নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করা হবে। সবাই ঘরে থাকুন, সাবধানে থাকুন।

শহরের অন্য প্রান্ত থেকে এই ঘোষণা শুনতে পান একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ঘোষণাটি শুনতে পান একজন ডাক্তার, গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে তিনি চোখের কোণের পানি মোছেন। ঘোষণা শুনতে পান একজন পুলিশ সদস্য, তিনি অদূরে ঘুমিয়ে থাকা শিশু সন্তানের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকেন।

[করোনার দুঃসময়ে লেখা গল্প]

আজান

এস এম সাথী বেগম

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

ভাগ 

ছেলেটাকে শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেললো? রক্তে পুরো দেহ চোখের পাশ দিয়ে পিঁপড়া ওঠানামা করছে। মেইন রোডের ধারে সামান্য জঙ্গলের নিচে ফেলে রেখেছে। রকির নামটা কে রেখেছিলো কেউ জানে না। রকির মা আধা পাগল রমা। রকির বড় মামা জলিল মিয়া দোকানের পুরোনো কর্মচারি মনুমিয়াকে ধরে এনে বিয়ে দিলেন আধাপাগল বোনটাকে। বিয়ে সাত মাস না যেতেই রকির জন্ম। রকির জন্ম নিয়ে নানা কথা উঠেছিলো আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে। মনু মিয়ার ছেলে নয় অন্য  কারো সন্তান রকি। 

রমার মানে রকির মায়ের তিনভাই। রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রেই রকির নানাবাড়ি। রকির মেঝো মামা বিয়ে করেনি। মেঝো মামা মারা যাওয়ার আগে তার ভাগের পাঁচ শতাংশ জমি রকির নামে লিখে দিয়ে গেছেন। মায়ের আছে আড়াই শতক। এই মোট সারে সাত শতক জমির মালিক রকি। কিন্তু বাকি দুই মামা এটা মানতে রাজি নয় তারা কোনোভাবেই রকিকে মেঝো মামার দেওয়া পাঁচ শতক জমিতে দিতে দিবে না বা দখল করতেও দেয়নি। রকির জন্মের পর মনু মিয়াকে দোকানের মালামাল চুরির অপবাদে বের করে পুলিশে দেবার পর আর মনু মিয়ার কোনো খোঁজ কেউ করেনি।  এ শহরে সারে সাত শতক জমির দাম তিন কোটি টাকার উপরে। এ জমি অন্য দুই মামার দখলে।

পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়ার বোন ফাতেমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসার পর মামিদের আরও অত্যাচার বেড়ে গেল। ফাতেমা গার্মেন্ট কর্মী এ নিয়ে অশ্লিল ভাষায় গালাগাল। গরীবের মেয়ে ফাতেমার দোষ। নীরবে সেও সব কাজ করে যায়। রকির স্ত্রী পরিচয় নয় যেন বাসার গৃহকর্মী।গ বড় মামার ছেলে যেদিন ফাতেমার ঘরে যায় সেদিন ফাতেমা বাসা থেকে রকিকে নিয়ে বের হয়ে যায়।

অল্প সময়ে ফাতেমা বুঝেছে যার কিছু নেই সেই ভালো থাকে যার অনেক আছে তারা ভালো থাকার ভান করে। জমজ ছেলেমেয়ে নিয়ে ফাতেমার দিন কোনরকমে যাচ্ছিলো। রকি বড় একটি হোটেলে দিন হাজিরার কাজ করে। ফাতেমা ফেইসবুক চালায়। ছুটির দিন চিড়িয়াখানা, ওয়াটার পার্কে যায় ফেইসবুকে ছবি আপলোড করে।

প্রতিশোধ নিবে, পরিকল্পনা করে। সে স্বামীর ন্যায্য পাওয়া উদ্ধার করবেই।সোজা পথে না হলে বাঁকা পথে এগুবে।মাঝে মধ্যে বড় মামার ছেলের সাথে ফোনে কথা বলে। ম্যাসেঞ্জারে কথা আদান প্রদান হয়।

রকির ক্লান্ত দেহটার বুকে মাথা রেখে বলে তুমি চিন্তা করো না আমি তোমার সব নিয়ে দেবার বুদ্ধি করছি। রকি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ভীড়ের মধ্যে গিয়ে রকির লাশ দেখে ষ্টাচুর মত দাঁড়িয়ে যায় ফাতেমা। চোখে কোন পানি নেই।একবার শুধু বড় মামার ছেলের দিকে তাঁকিয়ে ছিলো। সে চাহনীতে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করছিলো—

পাশ থেকে শুনতে পেলো এই বউটাই মেরেছে সম্পত্তির লোভে—-।

ভাগ