মুগ্ধতা.কম

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৫৫ অপরাহ্ণ

শনিবারের চিঠি – বন্ধু সংখ্যা

ঘোষণা-১:

‘শনিবারের চিঠি’ বিভাগটি আগামী শনিবার প্রকাশিত হবে না। এর পরিবর্তে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি, বুধবার মুগ্ধতা ডট কমের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হবে।

বিশেষ এই সংখ্যার জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, ভ্রমণগল্প, মুগ্ধতা নিয়ে আপনার প্রত্যাশা ও পরামর্শ লিখতে পারেন নিচের মেইল ঠিকানায়।

[email protected] (সম্পাদক)

[email protected] (সহযোগী সম্পাদক)

ঘোষণা-২:

অনলাইন ম্যাগাজিন মুগ্ধতা ডট কমের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুগ্ধতা ব্লাড ব্যাংক রক্তদাতা তথ্য প্রদান প্রতিযোগিতা’ ঘোষণা করা হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি, বুধবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি রক্তদাতার তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে বিশেষভাবে। উল্লেখ্য, রক্তদাতার এতে যথাযথ সম্মতি থাকতে হবে। এছাড়া লেখক ও পৃষ্ঠপোষক সম্মাননাও থাকবে যথারীতি। অনুষ্ঠানস্থল ও সময় আমাদের ফেসবুক পেজে (মুগ্ধতা ডট কম-পেজ) জানানো হবে।

সাপ্তাহিক সংখ্যা সম্পাদনা: আহমেদ অরণ্য, অলংকরণ: রেদওয়ান শুভ

শনিবারের চিঠি - বন্ধু সংখ্যা

মুগ্ধতা.কম

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৫৫ অপরাহ্ণ

প্রিয় বন্ধু রকিব আর ফিরবে না আড্ডায়

বন্ধু রকিবুল ইসলামের সাথে পরিচয় ১৯৮৯ সালে। আমরা তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। প্রথম ক্লাসেই আমাদের পরিচয় হয় এবং বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগল না। বিষয়টা এমন, পরিচয় পূর্ব জনমের আর নতুন করে বন্ধুত্ব এ জনমে।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ওর চুল অনেক লম্বা আর সিলকি হওয়ায় যখন সে হাঁটত তখন মনে হতো কোনো ঘোড়া লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। সামান্য বাতাসে ছন্দ মিলিয়ে লাফাত। কাব্যময় অনুভুতি হতো চোখজুড়ে। আ. কাদের স্যার ও আ. সামাদ স্যার প্রায়ই তার চুল ধরে টানতেন। খুব চাপে পড়ে সে মাঝে মাঝে কিছুটা ছোট করত।

এস এস সি পাশ করার পূর্বেই আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। আমরা তিন বন্ধু আমি রকিব ও মামুন হয়ে উঠি মরমি। মরমি ‘র’ হারিয়ে হয়ে গেছে মমি। যেন স্থির।

এইচ এস সি পাশ করার পর আমি আর মামুন কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হই আর রকিব ভর্তি হয় রংপুর সরকারি কলেজে। কলেজে আমাদের  দেখা না হলেও প্রতিদিন  বিকেলে দেখা হতো কামাল কাছনায়। সেখানে থাকত মামুন। ওর বাসার আশেপাশে আমাদের আড্ডা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। আড্ডায় মাঝে মাঝে যোগ হতো মিথি, সম্পা, ছন্দা, তিথি ও রোজী। আড্ডায় মাঝে নতুন কিছু যোগ করত চায়না ভাবি। সেই দিনগুলো ছিল অনেক মধুর।

আমাদের বন্ধুদের মধ্যে রকিব বিয়েটাও সময়ের পূর্বেই করে। তার বিয়েতে সে নিজেসহ কেউ-ই রাজি ছিল না। তার সাথে সম্পর্ক ছিল আমাদের একজন সহপাঠী রিপার। সেই রিপার বিয়ে হয়ে যাওয়ার ভয়ে ওরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের কাপড় কেনাকাটা করতে হয় বন্ধুদেরকেই। রাত বারোটায় দর্জিকে বাসা থেকে ডেকে এনে কাপড় তৈরি করে বন্ধুরাই। বন্ধুরা ওর ছিল প্রাণ। জীবনের সব ঘটনা দূর্ঘটনার রাজসাক্ষী বন্ধুরা।

এক ঈদে রকিবের পরিবার ঢাকায় ঈদ করে। ঈদের নামাজ পড়ার পর তার আর মন টিকল না। ঢাকায় বাসায় মা বাবা ভাই এবং স্ত্রীকে না বলে বাসে উঠে বসে। গন্তব্য রংপুর।

এরকম আমাদের বন্ধুদের নিয়ে হাজারো পাগলামো আছে এই বন্ধুকে ঘিরে।

মামুন বুয়েটে চাঞ্চ পাওয়ার পর যোগাযোগ অনেক কমে গেল। ব্যস্ততা আমাদের শারীরিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিলেও মনের দূরত্ব ছিল পূর্বের মতোই।

যখন মোবাইল নেটওয়ার্ক এল। তিনজন তিন স্থানে থাকলেও যোগাযোগ হতো প্রায়ই। রকিব রংপুরে, আমি ছিলাম কুড়িগ্রামে আর মামুন ঢাকায়। একদিন মামুন ঢাকা থেকে এল কুড়িগ্রামে আমার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে নিয়ে।

বারো বছর আগে মামুন রংপুরে পলিটেকনিক্যাল কলেজ দেওয়ার পর আমাদের তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হলো। আমাদের শারীরিক দূরত্ব কমে গেল। আবারও প্রায়ই দেখা হতো। কথা হতো। হতো জমজমাট আড্ডা। আমার চাকরির ধরনের কারণে মামুনকে কলেজে সহযোগিতা করতে পারিনি। কিন্তু সেটা রকিব পারল। সে রেলওয়েতে কর্মরত থাকায় যেটুকু সময় পেত মামুনকে সাহায্য করেছে তার কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য। মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত রকিব সেটা করেছে।

সাধারণত ছেলেদের বন্ধুত্বে ভাটা পড়ে প্রধান দুটি কারণে। এক টাকা দুই নারী। এই প্রধান দুই কারণ আমাদের তিনজনের মাঝে বন্ধুত্বের ফাটল ধরাতে পারেনি।

সর্বশেষ:

২৩ ডিসেম্বর ২০২২ সন্ধ্যায় মামুনের ফোন পেয়ে আমি তার কলেজ রোডের নতুন স্থায়ী ক্যাম্পাসে এলাম। সেখানে মামুনের সাথে রকিবকেও পেলাম। তিন বন্ধু শেষ বারের মতো মিলিত হলাম। আমরা কি কেউ জানতাম! এটাই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ! জানার কথাও না। আমরা তিনজনই খুব জটিল রোগে আক্রান্ত নই। বেশ কিছুক্ষণ আমাদের আড্ডা হলো। তারপর মামুন আর রকিব চলে গেল তাদের নিয়মিত খেলার স্থান বিয়াম স্কুলের মাঠে। শীতকালে ওরা নিয়মিত ব্যাটমিন্টন খেলত। আমি খেলতে কিংবা আড্ডা দিতে যেতাম মাঝে মাঝে।

২৪ ডিসেম্বর ২০২২ সন্ধ্যায় কামালের ফোন পেয়ে দেখা হলো রংপুর সিটি কর্পোরেশন মার্কেটে। এরপর পলাশ এলো সেখানে। পলাশ ঢাকা থেকে কয়েকদিন পূর্বে এসেছে।

পলাশসহ আমরা তিনজন অন্য আরো বন্ধুদের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে জিলা স্কুলের সামনে গেলাম।

তখন বাজে রাত ৯.৫০ মি। মামুনের ফোন পেলাম। রিসিভ করতেই বলল, আমি বগুড়ায় এসেছি আজ রাতে। তুই এখন রংপুর মেডিকেলে যা। ওখানে রকিবকে বন্ধু ফেমাস ও ডা. ফারুক নিয়ে গেছে । খেলতে গিয়ে পড়ে গেছে। বলে রাখি আমাদের আরেক বন্ধু ফেমাস। ব্যাপারটা খুব জটিল ভাবলাম না। খেলতে গিয়ে সামান্য দূর্ঘটনা হতেই পারে। তবুও সময় নষ্ট না করে আমি পলাশ, কামাল তিনজনে মেডিকেলে দ্রুত পৌছালাম। জিলা স্কুল থেকে মেডিকেলের দূরত্ব পাঁচ মিনিটের। এর  মধ্যে ফেমাসের আবারও ফোন। তুই দ্রুত রিপাকে খবর দে। রিপা হচ্ছে রকিবের স্ত্রী। বুঝলাম না কী এমন হলো?  ওর স্ত্রীকে আসতে হবে! আমি চলতি পথেই আবার মামুনকে ফোন দিলাম। বললাম, তুই রিপাকে মেডিকেলে আসতে বল আমরা মেডিকেলে ঢুকছি। গ্যারেজ তখন বন্ধ করার আয়োজন চলছে। গ্যারেজ পরিচিত হওয়ায় অনুরোধ করে মোটরসাইকেল রাখলাম। পলাশ আর কামাল আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ইমার্জেন্সিতে। গ্যারেজে মোটরসাইকেল রেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম মেডিকেল ইমার্জেন্সির দিকে। বন্ধু হারানোর ভয় কাজ করছিল মনে মনে। কিন্তু ভয়কে পাত্তা না দিয়ে পলাশ আর কামালসহ আমরা দ্বিতীয় তলার কার্ডিয়াক ইউনিটের সামনে এলাম। ডা. ফারুক আমাদের দেখে কান্নাকাটি শুরু করল। আমাদের বুঝে উঠতে বেশ সময় লাগল। ফারুক বলেই ফেলল রকিব আর নেই। সার্জারির ডাক্তার হওয়ায় অনেক মৃত্যুই ওদের হাতে হয় কিন্তু ফারুক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না রকিবের মৃত্যু। বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমরা সিসিইউতে ঢুকলাম। বন্ধু নিশ্চুপ শুয়ে আছে। মাথার উপর কোনো মেশিন কাজ করছে না। চিরঘুমে আমাদের বন্ধু। অবিশ্বাস নিয়ে করিডরে এলাম। কান্নাগুলো বুকের ভিতর জমাট বাঁধতে শুরু করছিল। চোখে মুখে উৎকন্ঠা ভয় ভীড় করছিল। অব্যক্ত কষ্টগুলো ঘুরছিল ব্রেনের শরীর ঘেঁষে। একে একে অনেক বন্ধু এল। কার্ডিয়াক ইউনিটের করিডোর ভর্তি হয়ে গেলো নিমিষেই। বন্ধুপ্রিয় রকিব বন্ধুর কোলেই মৃত্যুর স্বাদ নিল।

প্রিয় বন্ধু রকিব আর ফিরবে না আড্ডায় - আসহাদুজ্জামান মিলন

রবীন জাকারিয়া

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৫৪ অপরাহ্ণ

হাবিব মানেই বন্ধু নয়

প্রথম অধ্যায়

আমাদের স্কুলটা ছিল বেশ বড়ো৷ বিরাট খেলার মাঠ৷ বড়ো বড়ো ক্লাশরুম৷ চারিদিকে ফলের গাছ আর একদিকে একটা বিশাল পাইকর গাছ৷ এত বড়ো যে প্রায় পুরো মাঠটাকেই যেন ছায়ায় আচ্ছাদিত করেছে৷ কোনো সীমানা প্রাচীর নেই৷ সরকারি বাদে এতদাঞ্চলে যেহেতু বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয় আর নেই তাই বহু দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে৷ আমার বাসাটা স্কুল সংলগ্ন এবং সত্যি বলতে কি আমার আর্থিক ও সামাজিক অবস্থাও অনেক সমৃদ্ধ৷ তাই কোনো সমস্যা হয়নি৷ কিন্ত ঐসব ছাত্রদের বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্রদের কষ্টটা বেশ চোখে পড়ে৷ সেই সকালে কিছু খেয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে আসা৷ বিকেল অবধি না খেয়ে আবার বাড়ি ফেরা চাট্টিখানি কথা নয়৷ শিক্ষার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছাড়া এটা অসম্ভব৷

তখনও শিক্ষার্থী তথা শিশুদের মধ্যে সামাজিক-আর্থিক বিভাজন রচিত হয়নি বলেই হয়তো আমাদের মতো সমাজের সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীরা একই স্কুলে এবং একই সাথে পাঠগ্রহণ করেছি৷

তবে যতই সাম্যর কথা বলি না কেন! পরিবার, পোষাক-পরিচ্ছদ, জীবনাচার এমনিতেই বিভাজন টেনে দেয় কিংবা বলা যায় শিক্ষকরাই ইনিয়ে বিনিয়ে তা অন্যদের বুঝিয়ে দেয়, “এরা তোদের প্রভু আর তোরা এদের ভৃত্য”৷

আমি খুব ডানপিটে আর মিশুক ছিলাম৷ তাই আমার বন্ধুও ছিল বেশি৷ অবশ্য ছাত্র হিসেবেও ভালো ছিলাম৷ তবে একজন ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু৷ ওর নাম হাবিব৷ যদিও হাবিব অর্থ বন্ধু৷

হাবিবের সাথে আমার বন্ধুত্বটা কিন্ত শত্রুতা দিয়ে শুরু৷ সেদিন স্কুলের পাশের বাড়ির গাছ থেকে আম চুরির প্ল্যান করছিলাম৷ চুরির সময় কে কী দায়িত্ব পালন করবে সেটা বোঝাচ্ছিলাম৷ সকলে রাজী৷ কিন্ত হাবিব বাধা দিলো৷ অন্যদেরকেও নিষেধ করল যেন এ সমস্ত অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে৷ ওর কথা শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলাম৷ আজ পর্যন্ত কেউ আমার কথার অবাধ্য হয়নি৷ যা বলেছি তাই শুনতে বাধ্য হয়েছে৷ আমি হলাম দলনেতা৷ অথচ এই মলিন পোষাকে আচ্ছাদিত এক গেঁয়ো ছেলে আমাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে? নিজের সামন্তবাদী কুৎসিত চেহারা বেরিয়ে পড়ল৷ রাগে-অপমানে অন্ধ হয়ে ওকে ভীষণভাবে মারলাম৷ ওর নাক ফেটে রক্ত ঝরছে৷ এটা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম৷ তাড়াতাড়ি ‘ফার্স্ট এইড’ বক্স নিয়ে এসে সকলে মিলে সেবা-শুশ্রূষা করলাম৷ সেদিন টিফিন পিরিয়ডটা এভাবেই কেটে গেল৷ আমার একদিকে প্রচণ্ড ভয় আর অন্যদিকে অপরাধবোধ জাগ্রত হলো৷

দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ক্লাশেই শ্রেণি শিক্ষক হাবিবকে প্রশ্ন কলেন কী করে হলো? সে বললো টিউবয়েলের হ্যান্ডেল লেগে ব্যাথা পেয়েছে৷ ওর উত্তরে আমি নীরবেই কেঁদে ফেললাম৷ ছুটির পর ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম ‘সরি’৷

এরপর থেকে ওর প্রতি একটা আলাদা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা কাজ করত৷ ক্রমে ক্রমে তা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে রূপ নেয়৷

টিফিন পিরিয়ডে আমি বাড়িতে ভাত খেয়ে আসি৷ ওকে বহুবার চেষ্টা করেও খাওয়াতে পারিনি৷ কেননা ওর আত্মমর্যাদা ছিল প্রখর৷ নিজের সীমাবদ্ধতাকে সে মিথ্যার চাদরে না ঢেকে বরং বীরের মতো গ্রহণ করেছে৷

এর কিছুদিন পর অষ্টম শ্রেণির রেজাল্ট প্রকাশ হলো৷ সবাইকে ডিঙিয়ে হাবিব প্রথম হলো আর আমি দ্বিতীয়৷ এই প্রথমবার আমি ক্লাশ পরীক্ষায় প্রথম হতে পারলাম না৷ নবম শ্রেণিতে যথারীতি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম৷ হাবিবও তাই৷ বাহিরে যতই গভীর বন্ধুত্ব থাকনা কেন ভেতরে ভেতরে চলতে থাকল ওর সাথে আমার তীব্র প্রতিযোগিতা৷ কে কাকে ছেড়ে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে৷ আমাদের স্কুলের বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিগুলো ছিল খুবই সমৃদ্ধ এবং বিশাল৷ তাই সেখানে গবেষণা করতে সমস্যা হতো না৷ মনে পরে বায়োলজির স্যার ব্যাঙের এনাটমি করার পর যখন আবার ব্যাঙের পেট সেলাই করে ছেড়ে দিত৷ তখন নিজেকে ডাক্তার ডাক্তার মনে হতো৷ অবসরে নিজে একাই ল্যাবরেটরিতে ব্যাঙের বক্ষচ্ছেদ করতাম৷ এত প্রাচুর্য, বিলাসিতা, সুবিধা পাওয়ার পরও সত্য বলতে কি আমি কখনোই হাবিবকে টপকাতে পারিনি৷ দ্বিতীয় হয়েই থাকতে হয়েছে৷

মেট্রিক পরীক্ষায় হাবিব পাঁচটি বিষয়ে লেটার মার্কসসহ বোর্ডে ষষ্ঠ স্টান্ড করেছিল আর আমি চারটি বিষয়ে লেটার মার্কসসহ অষ্টম৷

এরপর দু’জনে ভিন্ন ভিন্ন কলেজে ভর্তি হই৷ সম্ভবত এখানেই সূচনা হয় বিত্ত দিয়ে মানুষে মানুষে বিভাজন৷ এরপর ধীরে ধীরে হাবিবের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়৷ তখনতো মুঠোফোন ছিল না!

দ্বিতীয় অধ্যায়

বায়োগ্রাফি:-

বায়োগ্রাফি আমার পরিবার: আমার পিতা কলেজ ছাত্রাবস্থায় আওয়ামী ছাত্রলীগ করতেন৷ তাই ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন৷ ৭০’র নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সকল স্বাধীনতাকামী মানুষের মতো আওয়ামী লীগের পক্ষে, স্বাধীকারের পক্ষে কাজ করেন৷ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন এবং গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট পাবার পর তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য তৈরি হন৷ এমতাবস্থায় আমার দাদা তাঁর পরিবারের সকলকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন৷ যুদ্ধ শেষ হলে তাঁরা পুনরায় দেশে ফিরে আসেন৷

স্বাধীন দেশে নতুন কাঠামো, নতুন স্বপ্ন আর জীবন-জীবিকাকে নব উদ্যমে ঢেলে সাজাবার অবিরাম যাত্রা—বন্ধুর পথ—যেতে হবে বহুদূর৷ পাশাপাশি দেশের বীর সন্তানদের—যাঁদের আত্মত্যাগে আজ এই স্বাধীনতা৷ তাঁদেরকে দেওয়া হলো বীরত্বের সনদ৷ বাবার যেহেতু প্রশিক্ষণের সনদ ছিল তাই তিনি পেয়ে গেলেন “বীর মুক্তিযোদ্ধার সনদ”৷

এই একটি সনদ একটি পরিবারকে কীভাবে সম্মানিত করে, কীভাবে বদলিয়ে দিতে জীবন-জীবিকা৷ তা শুধু আমরাই জানি৷ এই সনদের জন্য বাবা সরকারি চাকুরি পেলেন৷ আমরা কোটা পেলাম৷ সেই কোটায় ভালো স্কুল/কলেজ পেলাম৷ সরকারি চাকুরি পেলাম৷ মাসিক মাসোহারাসহ বিশেষ উৎসব ভাতা পেলাম৷ আমাদের সন্তানেরা দাদার সনদের দাপটে ভালো স্কুল/কলেজ পেলো৷ সরকারি চাকুরিতে কোটা পেল৷ আমার মা আমৃত্যু মাসোহারা পাচ্ছেন৷ আরো কত কী!

বায়োগ্রাফি হাবিবের পরিবার: হাবিবের বাবা বামপন্থী রাজনীতিক ছিলেন৷ ডাকসাইটে না হলেও নিবেদিত কর্মী ছিলেন৷ তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জীবনকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে পুঁজিবাদের এই নোংরা খেলা একদিন শেষ হবে৷ ভোগবাদী আর বিলাসী জীবনের মোহ ত্যাগ করে মানুষ একদিন ঠিকই উপলদ্ধি করবে শাশ্বত সত্য৷ বিশেষ করে প্রলেতারিয়েত বা মজদুর শ্রেণি৷ একদিন যখন দেখবে তাদের হাড্ডিচর্মসার দেহটা বাদে আর অবশিষ্ট নেই কিছুই৷ সেদিন বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী৷ মানুষ নিশ্চয়ই রচিত করবে এক সাম্যবাদী সমাজ৷

তিনি জানেন পাকিস্তানের দুই অংশের এ লড়াই হলো পুঁজিবাদের নোংরা কৌশল৷ মানুষের মর্যাদা, সমাজ, সম্পদ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের কোনো প্রবেশাধিকার না থাকা৷ তথা  চাপিয়ে দেওয়া এক অসম যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাধ্যমে জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে জনতার বিপ্লব৷

তাই তিনি বসে থাকেননি৷ শুধু নিজে একাই নয় বরং সমমনা ব্যক্তিদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন৷ জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন৷ তিনি কোন সেক্টর কমান্ডার কী বলেছেন এটা না জেনে বরং “হয় স্বাধীনতা আনবো কিংবা জীবন দেবো” এই মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করে যুদ্ধ করেছেন৷ দেশ স্বাধীন হলে তিনি নিজের সংসার, আয়-রোজগার এসব বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷ কোনো সনদ পাবেন এমন চিন্তাই তাঁর ছিল না৷ বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনে পৈতৃকভাবে প্রাপ্ত সম্পদ জনকল্যাণমূলক কাজে দান করেন৷

তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিলেন জাসদের আব্দুল জলিল৷ ১৯৮১ সালে যখন উনি সমাজতন্ত্রিক দর্শন ছেড়ে ইসলামী দর্শনে বিশ্বাসী হন৷ তিনিও ইসলামী মূল্যবোধে আকৃষ্ট হন এবং আরো বেশি বেশি জনহিতকর কাজ করতে থাকেন৷ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ইয়াতীমখানা ইত্যাদি৷ এমনিভাবে একদিন তাঁর নিজের সম্পদ প্রায় শেষ হয়ে গেল৷ উপায়ান্তর না পেয়ে ঐ মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে আমৃত্যু চাকরি করেন৷ সেই সামান্য রোজগারে সন্তানদের মানুষ করেন৷ আর হাবিবদের হার না মানার জীবন সংগ্রাম শিখিয়ে দেন৷

তৃতীয় অধ্যায়

আমি এখন সচিবালয়ে কর্মরত আছি৷ ঢাকাতেই সেটলড৷ বাবা মারা গেছেন৷ মা আমার সাথে থাকেন না৷ তবে ঢাকাতেই থাকেন৷ আলাদা ফ্ল্যাটে৷ মুক্তিযোদ্ধার কোটায় মা একটা ফ্ল্যাট পেয়েছেন৷ বাবার মাসোহারাটা মা তোলেন৷ বেশ ভালোই আছেন৷ তাছাড়া এখনকার বৌমারা শাশুড়ির যে যত্ন নেয় তারচেয়ে সামর্থ থাকলে আলাদা থাকাই ভালো৷ অবশ্য মাসে মাসে আমি টাকা পাঠাই৷ ঢাকায় বর্তমানে আমার ১৪টি বাসা আছে৷ বিভিন্ন শপিং মলে গোটা দশেক দোকান আছে৷ এছাড়া আমাদের এক ছেলে৷ সে সস্ত্রীক থাকে আমেরিকায়৷ আর মেয়ে স্বামীসহ থাকে কানাডায়৷ মাশাআল্লাহ্ ওখানেও দুটি করে চারটি বাড়ি করেছি৷ রিটায়ারমেন্টের আর বছর তিনেক বাকি৷ ভাবছি অবসরের পর প্রবাসেই বাকী জীবন কাটাব৷

হয়তো মন সায় দেবে না৷ তবুও এদেশে কি আর থাকা যায়? মানুষ এত সহিংস আর অসৎ হয়ে গেছে ভাবতেই খারাপ লাগে!

পেপার খুললেই খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, দুর্নীতি ভাল্লাগে? ক’দিন আগে দেখলাম ওয়াসার এমডি’র নাকি বিদেশে ১৪টি বাড়ি৷ ভাবা যায়! এত অসৎ হয় কী করে মানুষ? আরে বাবা চুরিরওতো একটা লিমিট আছে!

আজ ব্যক্তিগত বিশেষ একটা কাজে রংপুরে যাচ্ছি৷ ঢাকা এয়ারপোর্টে বসে আছি তো আছি! বিমান লেট৷ ডমেস্টিক বিমান৷ ৫০ মিনিটের পথ৷ তোর আবার কীসের লেট? রাবিশ! দেশটা শেষ করে দিলো কিছু অসভ্যরা৷ এদের না আছে কমিটমেন্ট, না আছে দেশপ্রেম৷

অবশেষে দু’ঘন্টা পর সৈয়দপুরে নামলাম৷ গেট পেরিয়ে সামনে ট্যাক্সি, উবার খোঁজ করেও ব্যর্থ হলাম৷ গাড়ি না আনতে বলাটা ভুলই করেছি৷ একটা মাইক্রো পেলাম৷ এসি নেই৷ গাদাগাদি মানুষ৷ ১২জন না হলে ছাড়বে না৷ জনপ্রতি ৫০০/- টাকা৷ আরে ব্যাটা এই খোঁয়াড়ে ১২ জন বসবে কোথায়? নাহ্ দেশটা শেষ হয়ে গেল৷ সবাই ধান্ধাবাজ!

ঠিক করলাম এভাবে যেতে পারব না৷ তারচেয়ে একটা অটোরিক্সা রিজার্ভ করলে তো হাওয়া খেতে খেতে যাওয়া যায়! এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে বেড়িয়ে একটা টিস্টলে এককাপ চা আর সিগারেট খেতে খেতে অটোরিক্সা রিজার্ভ করে রওয়ানা দিলাম৷ লাগেজ তেমন কিছু নেই একটা একটা ট্রলি ব্যাগ আর এটাচি৷ মাঝবয়সি অটোচালক যাত্রা শুরু করলো৷ চারিদিক থেকে হাওয়া যেন ক্লান্ত শরীর মনকে শীতল করে দিলো৷ ঘুম ঘুম ভাব আসছে৷ দূর করার জন্য চালকের সাথে গল্প করতে চেষ্টা করলাম৷ কিন্ত চালক বেশ স্মার্ট উত্তরে আমাকে আশাহত করল৷ সে বলল আমরা হাইওয়ে পথ চলছি তাই কথা বলে আমার এটেইনশন নষ্ট করবেন না দয়া করে৷ অগত্যা চুপ করে গেলাম৷

এক-দেড় ঘন্টা পর আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে অটো বিদায় দিলাম৷ প্রচন্ড ক্লান্তির কারণে রুমে ঢুকে ফ্রেস হয়ে একটা লম্বা ঘুম দিলাম৷

ঘুম ভাঙল বিকেলে৷ সতেজ শরীরে এক কাপ ব্ল্যাক কফি আর একটা লেক্সাস বিস্কুটে বিকেলের নাস্তা সারলাম৷ ঠোঁটে একটা সিগারেট লাগিয়ে ডেস্কে বসে পড়লাম৷ যে জন্য আসা এখন সেই কাজটা শেষ করতে হবে৷ বেডের পাশে গেলাম এটাচীটা আনতে৷ কিন্ত একী! এটাচী কোথায়? মাথা ঘুরতে লাগল! ভয়ানক বিপদ৷ সর্বনাশ হয়ে যাবে! নিজের চাকরির৷ ক্যারিয়ারের৷ এ টাকা দিতে হবে মন্ত্রীর শ্যালককে৷ বিশাল এমাউন্টের একটি ঠিকাদারি কাজের ৩%৷ অর্থাৎ কয়েক কোটি টাকা৷ যা ঐ এটাচিতে আছে৷ এখন কী হবে? ঐ হারামজাদা অটোচালক চুরি করেছে৷ ওকে এখন কোথায় পাব? তাছাড়া এটা পুলিশকে জানানো যাবে না৷ এটা অবৈধ টাকা৷ মাথা আউলায় যাচ্ছে! বমি বমি লাগছে! আচ্ছা আমার কি হার্ট এটাক করছে? আমি কি মরে যাচ্ছি? হায় আল্লাহ্ আমি এত অসৎ কাজ, অপরাধ করে শেষে জাহান্নামী হয়ে মরছি! এত সম্পদ, এত টাকা কিছুইতো কাজে লাগবে না৷ হে আল্লাহ্ তুমি মাফ করো৷ সেই ছেলেবেলায় শেখা দু’চারটি সুরা যেগুলো এখনো মুখস্থ আছে কাঁদতে কাঁদতে সেগুলোই পড়তে থাকলাম৷

দরজায় কলিং বেলের অনবরত কর্কশ শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম৷ দরজা খুললাম৷ দেখলাম এক মলিন অথচ দৃঢ়চেতা অপরিচিত ব্যক্তি দাঁড়িয়ে৷ কর্কশ গলায় বললাম কী চাই? সাহায্য-টাহায্য হবে না যান৷ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল-

আপনি কি আকবর সাহেব? আপনি কি আজ সৈয়দপুর থেকে এসেছেন? আপনি কি কোনো কিছু হারিয়ে ফেলেছেন?

সম্মতি সূচক মাথা নাড়া দেখে বলল,  তাহলে এই নিন বলে এটাচিটা আমার হাতে তুলে দিলো৷ আমি স্তম্ভিত! মুখ দিয়ে কিছু বেরুচ্ছিল না৷ অবশেষে সম্বিত ফিরে পেয়ে বললাম, তুমি কি জানো এতে কী আছে?

সে বলল জানার ইচ্ছে না থাকার পরও শুধু ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে দেখেছি “প্রচুর টাকা” আর জীবন বৃত্তান্ত৷

এতো টাকা নিলেনা কেন?

উত্তরে বলল, কিছু মানুষের জন্ম হয়েছে শুধু নেওয়ার জন্য আর কিছু মানুষের দেবার জন্য, আমি দ্বিতীয় দলের।

কিছু মনে কোরো না তুমি কি একটু ভেতরে আসবে? সে ঢুকলে তাকে জোর করে বসালাম৷ তার ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়চেতা আর সততার জন্য নিজে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও এই প্রথম একজন অতি সাধারণ মানুষ যে কিনা একটা সামান্য অটোচালক তাকে অনেকটা অনুনয়ের সুরে বললাম, তোমার সততার জন্য আমি পুরষ্কৃত করতে চাই৷ তুমি নিলে খুব খুশি হবো৷ তাছাড়া তোমার পরিবার, ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগবে৷ সে প্রচণ্ডভাবে রেগে গেল৷ তারপর যা বলল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না৷

শুনুন মি. আকবর শিক্ষা আপনাদের আলোকিত না করে বরং নির্লজ্জ বানিয়েছে৷ আপনারা মানুষকে আন্ডারমাইন্ড করেন৷

আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার যোগ্যতা পরিমাপ না করে তাকে ভিক্ষুক মনে করছেন? আমার অটোটা আপনার বাবা কিনে দেয়নি যে তাকে তুমি সম্বোধন করবেন৷

দেশটা আপনার বাবার তালুক নয় আপনারা ইচ্ছেমতো বেচে দেবেন৷ আর পরিবারের এবং সন্তানের কথা বললেন না? আপনার জ্ঞাতার্থে বলছি আমাদের ছেলে বুয়েট থেকে পাশ করে এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার৷ আমাদের মেয়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার৷ আর আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি বোটানিতে মাস্টার্স করে আপনাদের মত ঘুষখোর লোকদের চাহিদা মেটাতে পারেনি বলে চাকরি পায়নি৷

আমার বাবা দেশের জন্য যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছিল৷ অথচ তাকে মরতে হয়েছে কীভাবে জানেন? তাঁকে জঙ্গী বানিয়ে হত্যা করে গুম করা হয়েছে৷ কী আজব তাই না? এখানে কার্ল মার্কসের নামে রাজনীতি করা যায়৷ এখানে মাও সেতুং, আব্রাহাম লিংকন, মুজিব, জিয়া, এরশাদ এমনকি মওদুদীর আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করা যাবে৷ যাবে না শুধু মুহাম্মদের নামে৷ আমার বাবা যখন সমাজতন্ত্র করেছে তা করেছে তৎকালীন তার বিশ্বাস থেকে৷ আবার যখন ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য সাংবিধানিক অধিকার বলে ইসলামী দল করেছে তখন পরিপূর্ণ ইসলামী মূল্যবোধ থেকেই৷ অথচ যে কি না জঙ্গীবাদ কিংবা রাজাকারদের ঘৃণা করত তাকেই মরতে হলো জঙ্গীর তকমা নিয়ে৷ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সনদ৷

আমি বললাম যদি সত্যিই তোমার সন্তানেরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে থাকে তাহলে তুমি এখনো অটো চালাও কেন? এতে তোমার সন্তান ডিগনিটি নষ্ট হচ্ছে না?

সে উত্তরে বললো, না আমাদের সন্তানদের আমরা সেভাবেই তৈরি করেছি৷ তারা প্রথমে মানুষ হয়েছে৷ তারপর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার৷ ওরা ওদের কলিগসহ মিডিয়াতেও দৃঢ়ভাবে বলতে পারে আমাদের বাবা অটোচালক৷ কারণ এটা আমার আইডেনটিটি৷ আপনারা ইউরোপ-আমেরিকার সমাজের কথা বলেন না! তারা তাদের আইডেনটিটি অস্বীকার করে না৷ যাহোক আপনি ভালো থাকুন৷ ধন্যবাদ৷ বলে লোকটি চলে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ কী মনে করে গেটের কাছে একটু দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যভরা হাসি দিয়ে বলল আকবর তুমি জীবনে কোনোদিনই আমাকে টপকাতে পারলে না৷ আমি হাবিব৷ গুড বাই৷

আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলতে চাচ্ছিলাম হাবিব আমার শৈশবের হাবিব৷ আমার প্রিয় বন্ধু৷

ও হাতটা তুলে আমাকে থামিয়ে দিলো৷ বলল যারা শিক্ষিত হয়েও নিজের সততা নষ্ট করে, যারা সেবা প্রদানকারীর দায়িত্ব পেয়ে গণমানুষের অধিকার লুন্ঠন করে, যারা এত রক্তের বিনিময়ের অর্জিত স্বাধীনতার চেতনা বিকিয়ে দেয় ক’আনা পয়সায় তারা কখনোই কারো বন্ধু হতে না৷

আর মনে রাখবেন হাবিব মানেই বন্ধু নয়৷

হাবিব মানেই বন্ধু নয় - রবীন জাকারিয়া

মুগ্ধতা.কম

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৫৩ অপরাহ্ণ

মজনুর রহমান

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৫৩ অপরাহ্ণ

বন্ধু বিষয়ক

বন্ধু-১

কোনো বিপ্লব চাইনি। শুধু সামান্য বিদ্রোহ ঠেকাতে চেয়েছি জীবনে। এরকম ছোটোখাটো যুদ্ধ-টুদ্ধ করতে করতে নানান উঠোন পেরিয়ে কাদের জানি বাড়ির কাছে গিয়ে পড়ি।

জামরুল গাছের নিচে আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। হাত ধরে বললেন, চলেন বটতলায় যাই। তখন দুপুরবেলা। মেঘ ও রোদ পরস্পরের সাথে খেলা করছিল। আমরা ছায়া আর বৃষ্টির যুগপৎ সম্ভাবনা নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলাম।

বন্ধু-২

একটা নার্সিং হোমে শুয়ে তোমাদের কথা ভাবি।পৃথিবীর সমস্ত পাখি কি মরে গেছে গতকাল পর্যন্ত? কেবল একাকী একটা সারস জানালার পাশের গাছে বসে। প্রত্যেক পাখির ডানার নিচে কয়েকটা হারিয়ে যাওয়া দিন লুকোনো থাকে। সেইসব মৃত পাখির সাথে মরে যায় সেইসব দিন। তারপর অন্যদের অসুখ হলে তারা নার্সিং হোমে যায়। বসে থাকে জানালার পাশে। শুশ্রূষা পাবার বদলে তারা একা হয়ে থাকে?

একটা নার্সিং হোমে শুয়ে তোমাদের কথা ভাবি। মনে হয় পৃথিবীর বুকে আর কোনো নার্সিং হোম নেই।

বন্ধু-৩

আমাদের ঘনিষ্টতার ফাঁক দিয়ে দূরত্ব উঁকি মেরে নেয়

বন্ধু বিষয়ক

জাকির আহমদ

২১ জানুয়ারি, ২০২৩ , ২:৪০ অপরাহ্ণ

বন্ধু

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কাল (২০০৪) সকালে রংপুর ছেড়ে যাবে! ভুল বললাম, ও আসলে শুধু রংপুর নয় দেশটাই ছেড়ে যাবে!! অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম, ঠিক আড্ডা নয়-পাশাপাশি বসে থাকা। স্মৃতি নিয়ে কথা বলা। তার সাথেতো অনেক স্মৃতি! টানা৭২ ঘন্টা কিংবা তারও বেশি সময় একসাথে থাকা, ফুটপাতে রাত কাটানো, সেতারা হোটেলে দিনেরপর দিন ভাত খাওয়া, কবিতা-উপন্যাস-নাটক লেখা, বই প্রকাশ, প্রেম-ভালোবাসা কতোকিছুর স্মৃতি!

সকালে তাকে বিদায় জানাতে ঢাকা কোচ স্টান্ডে যাবো-এমন কথা হয়ে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরে আসি।
ওর বিদায়টা মানতে পারছিলাম না। ও না থাকলে আমি কিভাবে কী করবো!? টেনশনে আমি অস্থির। কিছুই ভাবতে পারছিলাম না।

সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে, মোবাইলফোনে তখন রিং হচ্ছিলো, রিসিভ করেই ওর গলা শুনতে পাই-‘কিরে শেষ সময়ে তোর সাতে দেখা হবে না?’

-আমি আসছি, বলেই ফোন রেখে দৌড়।

শেষ পর্যন্ত ওর সাথে চোখাচোখি হয়েছিল, কথা হয়নি।

পরে দেখেছি মোবাইল ফোনে অনেকগুলো মিসকল!

স্মৃতিকথা - বন্ধু - জাকির আহমদ