মুগ্ধতা.কম

১৪ জুলাই, ২০২০ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে করোনা যুদ্ধে শহিদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গত ১২ জুলাই রোববার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত আবুল কাশেম রংপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীন কেল্লাবন্দ সর্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। করোনাভাইরাস ছাড়াও তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

১২ জুলাই রোববার রাত বারোটার দিকে পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন রংপুরের দাফনসেবা টিমের স্বেচ্ছাসেবীরা। দাফনের আগে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

দেশে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। এপ্রিল মাসের শুরুতে করোনায় মৃতদের ব্যাপারে সাধারণের মনে যখন এক ধরণের নেতিবাচকতা কাজ করছিল, তখন করোনায় মৃতকে যথাযোগ্য ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে এগিয়ে আসে কোয়ান্টাম।

দেশব্যাপী এ পর্যন্ত সহস্রাধিক করোনা ও করোনা সন্দেহে মৃতকে সম্মানজনক শেষ বিদায় জানিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। নারীদের জন্যে এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের জন্যেও কোয়ান্টাম দাফনসেবার আলাদা আলাদা টিম রয়েছে।

রংপুরে এ পর্যন্ত ১৪ জন করোনা শহিদকে পরম মমতায় শেষ বিদায় জানায় রংপুরের দাফনসেবার স্বেচ্ছাসেবীরা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এ সেবায় গিয়ে এসেছেন তারা।

ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের এ দাফনসেবা কার্যক্রম পুরোটাই পরিচালিত হয় সদস্যদের অর্থায়নে ও শ্রমে। তারা জানা, রংপুরে দাফনসেবার প্রয়োজনে মো. রাকিব উদ্দিন আল-মামুন, সিনিয়র প্রো-অর্গানিয়ার, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মোবাইলঃ ০১৭১৭৭১৪৭৬৬- এর সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

সিরাজুম মনিরা

২ জুলাই, ২০২০ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একটি বৈশ্বিক দূর্যোগ। আর যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা সংকটে বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই বয়সের ব্যক্তিদের জন্য ডিমেনশিয়া একটি কঠিন মস্তিষ্কের রোগ।

বিশ্বব্যাপী ৫০ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। সমগ্র পৃথিবীতে বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য ডিমেনশিয়া একটি মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। ডিমেনশিয়া এবং কোভিড-১৯ মহামারি উভয়ে একত্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য ও উপাত্ত জানার সুযোগ বেশ সীমিত। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে তাদের জন্য কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সুরক্ষা পদ্ধতি যেমন – বারবার হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা ইত্যাদি মনে রাখা বেশ কঠিন। এছাড়া তাদের কগনেটিভ সমস্যা থাকায় প্রচারিত জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য বোঝা ও বেশ কঠিন। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমে অবহেলা এবং কোয়ারেনটাইনের অপর্যাপ্ত ব্যাবস্থা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সংক্রমনের ঝুঁকি বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তুলতে পারে।


কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধে সরকার লকডাউন, কোয়ারেনটাইন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে। আমাদের দেশে বয়স্ক ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রধানত তাদের পরিবারের সাথেই বাস করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করতে হচ্ছে এবং আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এমনকি বাহিরে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রযুক্তি ব্যবহার সম্পর্কে পারদর্শিতা না থাকায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ নেই বললেই চলে। এর ফলে তারা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখছে এবং নিজেদের পরিত্যাক্ত ভাবছে। এসকল বিষয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে করোনা সংক্রমণের ভয় এবং অন্যদিকে লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন ঘরে অবস্থান করা নিয়ে উদ্বেগ ও বিষন্নতা, একই সাথে দুটি বিষয় নিয়ে বেশ চাপ অনুভব করছে। এছাড়া করোনায় কাছের মানুষের মৃত্যু তাদের মানসিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। একইসাথে পরিবারের সদস্যবৃন্দ যারা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক যত্ন করে তাদের মাঝেও উদ্বেগ ও বিষন্নতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গেছে। এছাড়াও সার্বক্ষণিক যত্ন ও সেবা করার কাজে নিয়োজিত থাকার ফলে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ও বার্ন আউটের শিকার হচ্ছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি জটিল ও কঠিন রোগ থাকে যার জন্য তাদের প্রায়শই হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিকট যেতে হয়। কিন্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি বাড়তি চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সেবার সুযোগ সুবিধা নেই পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও অধিক। এসকল বিষয় ও পরিবারের জন্য বেশ উদ্বেগের কারণ।

বর্তমান বৈশ্বিক মহামারিতে বিশেষজ্ঞগণ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তার উপর জোর দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কাউন্সেলিং সেবার উপরও গুরুত্বারোপ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে এতে কোভিড-১৯ এবং ডিমেনশিয়া উভয়ের জটিল প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। আলঝাইমার ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল নামক সংস্থাটি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য অতি দ্রুততার সাথে নানাবিধ সহায়তা প্রদানেরউপর জোর দিয়েছে। এই সংস্থাটির মতে ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী পেশাজীবি, সমাজকর্মী এবং নানাবিধ সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে যৌথভাবে একত্রে কাজ করা প্রয়োজন।

করণীয়:

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের নিজেদের মানসিকভাবে ভালো থাকা ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতার জন্য নিম্ন লিখিত কাজগুলো চর্চা করতে পারে –

» ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্বলিত তথ্যসমূহ ছবিসহকারে সহজ ভাষায় লিফলেট তৈরি করে বাসার কিছু নিদির্ষ্ট জায়গায় লাগিয়ে রাখা। এতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিধি ভুলেগেলেও লিফলেট দেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ হবে।

» গৃহ পরিমণ্ডলে করা সম্ভব এমন কিছু বিনোদনমূলক কাজ বাসার সকলে মিলে আয়োজন করা। এতে লকডাউনের কারনে দীর্ঘদিন বাসায় অবস্থান করার ফলে সৃষ্ট একঘেয়েমি দূর করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে এবং পরিবারের সকলের সাথে ভালো সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

» আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষজনের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যাবস্থা করে দেয়া।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে বাসার ভিতরে কিছু আনন্দদায়ক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি তাদের বিষন্নতা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।

» চাপ কমানোর উপায় হিসেবে শিথিলায়ন চর্চা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার কেয়ারগিভারের জন্য একটি বেশ ফলপ্রসূ উপায়।

» করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য সহজ ভাষায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে জানানো।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির আচরনগত ও আবেগীয় সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনে চিকিৎসামনোবিজ্ঞানী ও মনরোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা।

» পরিবারের একজন ব্যক্তিই সার্বক্ষণিকভাবে দেখাশোনা করার দায়িত্ব না নিয়ে অন্যান্য সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করা । এতে কেয়ারগিভারের বার্ন আউটের সম্ভাবনা ও চাপ কমবে।

সর্বোপরি বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ চাহিদা ও যত্ন সম্পর্কে পরিবার ও সকলের মাঝে সচেতনতা অতীব জরুরী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন

সাবিনা ইয়াসমিন

৩০ জুন, ২০২০ , ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

করোনা আতঙ্ক ও আত্মহত্যা-প্রবণতা

কোভিড-১৯ সারা বিশ্বে মহামারি আকার ধারণ করেছে। ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে পরাজিত গোটা বিশ্ব এত এত উন্নত প্রযুক্তি একের পর এক গবেষণা তবুও কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, ভয় উদ্বেগ মানুষকে আরও চেপে ধরেছে। মানুষ সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে হাঁফিয়ে উঠেছে দিনের পর দিন। ফলে এইসব মানসিক চাপ, ভয় বা অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। বিগত মহামারিগুলোর (যেমন সার্স, প্লেগ) দিকে তাকালে দেখা যায়, আত্মহত্যার সাথে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। মহামারি বাড়লে বাড়ে। কোভিড-১৯ মাহামারিতেও বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনা দেখা গিয়েছে।

জার্মানীর হোসে প্রদেশের অর্থমন্ত্রী থমাস শেফার, যুক্তরাষ্টের এমিলি এমনকি মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জাহিদুল আত্মহত্যা করে এই করোনার কারনে। মহামারিতে এমনিতেই মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি থাকে সেখানে যদি মানুষ আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তাহলে মহামারির অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথে আত্মহত্যার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। কেন মানুষ আত্মহত্যা করছে তার কারণগুলো জানা দরকার।

আত্মহত্যা-প্রবণতার কারণ

কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, করোনার এই দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা, ভয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একঘেয়েমি ও বন্দি জীবন, বিনোদনের অভাব, মানুষের চাকুরি হারানোর ফলে বাড়তি মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সাথে যখন মানুষের দ্বন্দ্ব দেখা যায় তখন এই ভয়াবহ প্রবণতা আসে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার মানসিক রোগ যেমন বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসওর্ডার পারর্সনালিটি ডিসঅর্ডার, মাদক সেবন বেড়ে যায় ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। আত্মহত্যা একদিনের ফল না। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার ফলে মানুষ একমূহুর্ত এসে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। আত্মহত্যার কারণ জানার পাশাপাশি আত্মহত্যার জন্য কতগুলো পূর্ব সতর্কতামূলক চিহ্ন (ডধৎহরহম ঝরমহ) রয়েছে। তাই একজন মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে কিনা তা নিম্নলিখিত চিহ্ন বা আচরণ দ্বারা আগে থেকেই অনুমান করা যায়।

যেভাবে বুঝবেন কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে

ক. নিজেকে শেষ করে দেয়ার অথবা নিজেকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করা।

খ. সবসময় হতাশ লাগছে বা ভীষণ একা লাগছে, বেঁচে থাকার কোন মানে নাই, মরে যাওয়াই ভালো এসব কথা বললে।

গ. নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা করা যেমন ওষুধ কিনে রাখা, দড়ি কিনে রাখা, ব্লেড সংগ্রহ করে রাখা

ঘ. কোন সমস্যায় পড়লে সমাধান খুঁজে না পাওয়া

ঙ. অন্যদের ওপর বোঝা হয়ে গেছি এমন বললে

চ. প্রায়ই মাদক বা অন্য কোন নেশাজাতীয় দ্রব্য বেশি পরিমানণ সেবন করলে

ছ. সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলে।

জ. উত্তেজিত বা উদ্বিগ্ন আচরণ করলে।

ঝ. সবার কাছ থেকে বিদায় নিলে।

ঞ. নিজের পছন্দনীয় জিনিস বা সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে অন্যদের দান করলে।

ট. অল্পকিছুতেই আত্মহত্যার চেষ্টা করলে।

ঠ. প্রায়ই মরার কথা বললে।

ড. খাওয়া বা ঘুমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসলে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে পরিবার, বন্ধু, সমাজ সবাইকে। করোনা পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষ গৃহবন্দী এবং আতঙ্ক ও ভয় নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কতগুলো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।

আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে যা করতে হবে

» আত্মহত্যার ওয়ার্নিং সাইনগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।

» সারাক্ষণ মোবাইল টিভি, পত্রিকায় করোনার খবর দেখা যাবে না এবং সব তথ্য বিশ্বাস করা যাবে না। গ্রহণযোগ্য মিডিয়া বা সোর্স এর প্রদানকৃত তথ্য বিশ্বাস করতে হবে।

» কারো মধ্যে আগে থেকে মানসিক সমস্যা থেকে থাকলে তাকে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে যে হঠাৎ তার আচরণের কোন পরিবর্তন হয় কি না। যদি হয় তাহলে ততক্ষণাৎ কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

» কারো মধ্যে হঠাৎ হতাশা, মন খারাপ দেখলে তাকে সময় দিতে হবে, তার সাথে কথা বলতে হবে এবং তার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

» যেহেতু বেশিরভাগ সময় বাসায় কাটছে তাই সময়টাকে বিভিন্ন আনন্দদায়ক কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যেমনঃ সিনেমা দেখা, গানশোনা, পরিবারের সবার সাথে গল্প করা, বাচ্চাদের সাথে নিয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে অথবা খেলা করা, শখের কাজ করা, পশুপালন করা, রান্না করা।

» দূরের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধবদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা।

» টিভি/অনলাইনে শারীরিক ও মানসিক সাস্থ্যসেবা দিচ্ছে সেগুলো সম্পর্কে তথ্য গ্রহণ করা বা প্রয়োজনীয় নাম্বার সংগ্রহ করে রাখা।

» যদি কারো পূর্বেই আত্মহত্যার চেষ্টা করার রেকর্ড  থাকে তবে তাদের প্রতি বাড়তি সতর্ক থাকা এবং বাসার ছুরি, দা, ব্লেড, দড়ি ওষুধ সরিয়ে রাখা।

» সবশেষ মহামারি সবসময় একটি মানসিক চাপ। তাই এই চাপে ভেঙে না পড়ে মানসিকভাবে শক্ত থাকার চেষ্টা করা।

আর এই কোভিড-১৯ এর জন্য যেহেতু এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর চিকিৎসা নেই তাই শারীরিক শক্তি বাড়ানো পাশাপাশি মানসিক শক্তিও বাড়াতে হবে যাতে সব ধরনের আতঙ্ক, হতাশা ও আত্মহত্যার মতো বিষয় প্রতিহতো করা সম্ভব হয়।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা আতঙ্ক ও আত্মহত্যা-প্রবণতা

মুগ্ধতা.কম

১৭ জুন, ২০২০ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন আবিষ্কার

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন

সতর্কতা: এই ওষুধ শুধু হাসপাতালে ভর্তি, অক্সিজেন বা ভেন্টিলেটর প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য প্রযোজ্য। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এর ব্যবহার উল্টো সর্বনাশ করতে পারে।

সুখবর। একার নয়। পুরো বিশ্বের। প্রতিটি করোনা আক্রান্তের।

বছরের অর্ধেক হয়ে গেলো। নতুন করোনা ভাইরাস অনেকগুলো মৃত্যু কেড়ে নিলো। অনেকে অসুস্থ হলো। এখনো দেশে দেশে চলছে তার তাণ্ডব নৃত্য।

এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ওষুধ এতদিন পর্যন্ত ছিল না। ভ্যাকসিন এখনো সময়ের ব্যাপার। একমাত্র বিকল্প হলো মেডিসিন।

এতদিন কয়েকটি মেডিসিন নিয়ে কথা বললেও, একটিও এই ভাইরাসের কারণে মৃত্যুকে থামাতে পারছিলো না। মাঝে কয়েকটি মেডিসিন নিয়ে যা কথা হচ্ছিলো, সেগুলো শুধুমাত্র কিছু উপসর্গ কমাচ্ছিলো।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের জন্যে নিয়ে এলো সুখবর। ডাক্তারদের জন্যে সুখবর। করোনা আক্রান্তদের জন্যে সুখবর। সম্ভাব্য করোনা আক্রান্তদের জন্যে নিশ্চিত ভালো খবর। করোনা ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই, এটি আর বলা যাচ্ছে না।

Prof Peter Horby এর নেতৃত্বে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি সহ ইংল্যান্ডের আরো কিছু ইনস্টিটিউশনের একদল চিকিৎসক এবং গবেষক বিজ্ঞানী প্রচলিত একটি মেডিসিনের সন্ধান পেয়েছেন, যা করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যুকে সর্বশেষে থামাতে পেরেছে। Dr. Horby হলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির Nuffield Department of Medicine এর Professor of Emerging Infectious Diseases।

মেডিসিনটির নাম : Dexamethasone।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং ইংল্যান্ডের চিফ মেডিকেল অফিসার Prof Chris Whitty এর উদ্ধৃতি দিয়ে অক্সফোর্ড গবেষক দল এক প্রেস কনফারেন্স গতকাল ১৬ জুন এই ঘোষণা দিয়েছেন।

ইংল্যান্ড, এমেরিকা, ইউরোপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মারাত্মক রোগীদের ক্ষেত্রে Dexamethasone ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

এ নিয়ে WHO ডিরেক্টর জেনারেলের কালকের বিবৃতি হলো :

“The World Health Organization (WHO) welcomes the initial clinical trial results from the United Kingdom (UK) that show dexamethasone, a corticosteroid, can be lifesaving for patients who are critically ill with COVID-19.

This is the first treatment to be shown to reduce mortality in patients with COVID-19 requiring oxygen or ventilator support,” said Dr Tedros Adhanom Ghebreyesus, WHO Director-General. “This is great news and I congratulate the Government of the UK, the University of Oxford, and the many hospitals and patients in the UK who have contributed to this lifesaving scientific breakthrough.”

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের একদল এই বছরের মার্চ মাসের শুরুতে University of Oxford -এর নেতৃত্বে RECOVERY নাম দিয়ে একটি ট্রায়াল টিম তৈরী করেন। RECOVERY মানে Rendomised Evolution of COVID-19 Therapy। এই গবেষক দল নতুন করোনা ভাইরাসের উপর প্রভাব ফেলে এবং করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে উপযুক্ত মেডিসিন অনুসন্ধানের কাজে নেমে পড়ে। তারা পাঁচটি প্রচলিত মেডিসিন সিলেক্ট করেন প্রথমে। এই পাঁচটি হলো :

Lopinavir-Ritonavir

Dexamethasone

Hydroxychloroquine

Azithromycin

Tocilizumab

৫ জুন Hydroxychloroquine এর ট্রায়ালের প্রথম রেজাল্ট প্রকাশ করেন এবং Hydroxychloroquine এর অকার্যকারিতা ঘোষণা করে মেডিসিনটি বাতিল করে দেন । ১৫৪২ জন কোভিড-১৯ আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ করে যে ফলাফল মেলে, তার উপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন যে, Hydroxychloroquine থেকে করোনা আক্রান্তদের সুফল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

১৬ জুন Dexamethasone নিয়ে তাদের কার্যকরী ফলাফলটি প্রথম প্রকাশ করেন।

মার্চ মাসের শুরুতে এই টিম গঠিত হয়েছিল । মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ব্রিটেন সরকার তাদের ১০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে সাহায্য করেন । ব্রিটিশ সরকার ছাড়াও বেসরকারি ওয়েলকাম ট্রাস্ট এবং বিল গেটসের গেটস এন্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন থেকে অর্থ সহায়তা পান ট্রায়াল চালিয়ে যেতে । এই গবেষক দলের সাথে আরো আছেন ইংল্যান্ডের প্রধান রিসার্চ ইনস্টিটিউট NIHR এবং MRC।

২৩ মার্চ প্রথম ট্রায়াল শুরু করেন একজন করোনা আক্রান্তের উপর। জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত UK এর ১৭৫ টি হাসপাতালে ১১৫০০ জনের উপর ট্রায়াল করেন মেডিসিনগুলো।

মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে গত ৮ জুন পর্যন্ত ২১০৪ জন করোনা আক্রান্তের উপর রান্ডমলি দৈনিক ৬ মিলিগ্রাম করে Dexamethasone কেউকে ইনজেকশন এবং কেউকে মুখের ট্যাবলেট দিয়েছেন। তাদের পাশাপাশি সমসাময়িক কালে ৪৩২১ জন করোনা আক্রান্ত রোগীদের Dexamethasone না দিয়ে প্রচলিত চিকিৎসা করা হয়েছে। দুটোর তুলনা করে তারা দেখলো যে – যে সব রোগীদের অবস্থা মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়, মৃত্যু অনিবার্য ভাবা হয়, সাথে ভেন্ট্রিলেটর এবং অক্সিজেন দরকার হয় – সে সব রোগীদের প্রতি আট জনের মধ্যে একজন বেঁচে যায় Dexamethasone নিলে। আরেকটু বিশ্লেষণের আকারে বললে – যাদের ভেন্ট্রিলেটর দরকার পড়ে, তেমন প্রতি তিন জনের একজন মৃত্যু থেকে বেঁচে যায় Dexamethasone খেলে। আর যাদের অক্সিজেন দরকার হয় – তাদের পাঁচজনের একজন বেঁচে যায়।

সাথে একটি সতর্ক বাণী আছে। যারা ফুসফুস জনিত সমস্যায় পড়বেন না, অর্থাৎ মারাত্মক হবে না, তাদের উপর Dexamethasone এর কোনো প্রভাব নেই। সুতরাং, যাদের কেবলমাত্র হসপিটালে ভর্তি হয়ে ভেন্ট্রিলেটর লাগবে বা অক্সিজেন লাগবে, শুধুমাত্র তারাই এই মেডিসিন খাবেন বা ডাক্তাররা তাদের দেবেন। মাইল্ড সিম্পটমের কেউ এই ওষুধটি বাজার থেকে কিনে নিজে নিজে খাবেন না দয়া করে। তাতে উল্টো আপনি মারাত্মক স্বাস্থ ঝুঁকিতে পড়বেন, শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে, এমনকি উল্টো ভাইরাসের আক্রমণ বেড়ে যাবে। কোনো ডাক্তার বা রোগী দয়া করে এই নির্দেশটি মানবেন। কোনোভাবেই এই ওষুধটি করোনা ভাইরাস প্রিভেন্ট করে না।

Dexamethasone মেডিসিনটি মারাত্মক করোনা আক্রান্তকে দেয়ার নিয়ম হলো : প্রতিদিন ৬ মিলিগ্রাম করে ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশান অথবা যে মুখে খেতে পারে, তাকে দৈনিক ৬ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ১০ দিন দিতে হবে।

এবার আসি Dexamethasone নিয়ে।

Dexamethasone একধরনের steroid জাতীয় ওষুধ। আরো স্পেসিফিক হলে Corticosteroid জাতীয় ওষুধ বলে। সহজ করে steroid হলো একধরনের হরমোন। মানুষের শরীরে কিডনির উপরে এড্রেনাল নামের একটি ছোট গ্লান্ড থাকে। এই গ্লান্ড হতে ১৭ কার্বন বিশিষ্ট কিছু হরমোন বের হয়, তাদের Corticosteroid Hormone বলে। Dexamethasone হলো এমন কৃত্রিম Corticosteroid হরমোন। খেলাধুলার জগতে অনেক স্ক্যান্ডাল শুনি আমরা কিছুদিন পর পর। তাতে এই steroid নেয়ার খবর থাকে। ১৯৫৮ সালে রাশিয়ান কিছু এথলেট এই কৃত্রিম হরমোন শরীরে গোপনে ঢুকিয়ে তাদের ক্রীড়া কৌশল বৃদ্ধি করেছিল।

আমেরিকান রসায়নবিদ Percy Julian ১৯৩১ সালে আলাদা ভাবে প্রথম steroid আবিষ্কার করেন গাছে। যদিও ১৯২৯ সালে আরেক আমেরিকান রসায়নবিদ Edward Calvin Kendall মানুষের শরীরে Adrenal gland থেকে Corticosteroid বের হওয়া আবিষ্কার করেন এবং তার এই আবিষ্কারের কারণে ১৯৫০ সালে মেডিসিনে তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

Dexamethasone প্রথম তৈরী করা হয় ১৯৫৭ সালে। বিশ্বব্যাপী ওষুধ হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি পায় ১৯৬১ সালে। যদিও ১৯৫৮ থেকে আমেরিকায় ব্যবহার করা হতো।

এটি মূলত এজমা এবং আর্থ্রাইটিস চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এর বাহিরে স্কিন থেকে ক্যান্সার, চোখের কিছু সমস্যা থেকে ফুসফুসের কিছু সমস্যায়, সাথে এলার্জি থেকে যক্ষা রোগে, এমনকি দাঁতের কিছু অপারেশনের পরে Dexamethasone মেডিসিনটি ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত ইনফ্লামেশন কমিয়ে দেয় এবং শরীরের ইমমিউনিটির উপর কাজ করার মাধ্যমে শরীরের উপর প্রভাব ফেলে।

দেশি স্কয়ারের Dexonex কিংবা বেক্সিমকোর Odeson অথবা এরিস্টোফার্মার Sonexa এমন Dexamethasone জাতীয় মেডিসিন । ওষুদের দাম এতই সস্তা যে, দশ দিনের ওষুদের মোট খরচ মাত্র ৫০০ টাকা !

কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ খাবেন না। এই ওষুধের কিছু পাশ্ব প্রতিক্রিয়া আছে । কেউ কোরোনায় আক্রান্ত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হবার পর শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যায় না ভোগা পর্যন্ত ওষুধটি খাবেন না ।

স্মরণ করিয়ে দেই যে, Times Higher Education World University Rankings -এ লাস্ট তিন বছর University of Oxford হলো নাম্বার 1, এর পরেই আছে আমেরিকান Harvard University।

করোনা তাণ্ডবে ভ্যাকসিনের আগেই অক্সফোর্ডের সৌজন্যে Dexamethasone এর কারণে বিশ্ব যেন খানিকটা মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

সূত্র :

1. WHO

2. University of Oxford : RECOVERY Trial

3. BBC

4. The Pharmaceutical Journal

5. NewScientist

6. NIHR : Oxford Biomedical Research Centre

7. Medical Research Council, UK

8. Health Data Research UK

 

অপূর্ব চৌধুরী।
চিকিৎসক এবং লেখক।
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড।
গ্রন্থ ৭
উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন আবিষ্কার

মুগ্ধতা.কম

২৯ মে, ২০২০ , ৮:২০ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস টেস্ট: কী, কেন, কীভাবে?

করোনা প্যান্ডেমিক কমে গেলে সামনে একটি ব্যাপার নিয়ে সুস্থদের মধ্যে চাহিদা দেখা দেবে। এই মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব এবং যোগাযোগের অসুবিধার কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তা করতে পারছে না। সেটি হলো : টেস্ট ! করোনা ভাইরাস টেস্ট।

অসুস্থ হয়ে যত না টেস্ট করেছে লোকে, সামনে সুস্থ লোকজন টেস্ট করে নিশ্চিত হতে চাইবে – তার হয়ে গেলো কিনা শেষে। কারণ, অনেকেই মাইল্ড কিছু লক্ষণে ভুগে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। অনেকে হয়তো জানেই না তার শরীরে ভাইরাসটি এসে ঘুরে গেছে। অনেকে নিশ্চিত হতে চাইবে তার হবার সম্ভাবনা আছে কিনা। এমনকি যাদের হয়ে গেলো, তারাও চিন্তিত থাকবে – আবার হতে পারে কিনা।

এমনসব জটিলতার কারণে সামনের দিনগুলোতে করোনা টেস্ট যেমন সবচেয়ে বড় বাজার, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, প্রতিটা দেশের সরকারের মাথা ব্যথা, বিশাল সংখ্যক মানুষের টেস্ট করা এই মুহূর্তে করোনা প্রতিরোধের অন্যতম একটি স্ট্রাটেজি বটে।

এ নিয়ে যেমন প্রতারণার বাজার, এ নিয়ে যেমন সাধারণ মানুষের খুব কম জানা, এ নিয়ে ডাক্তার কিংবা চিকিৎসা কর্মীদেরও সঠিক তথ্যটির অনেক বড় অভাব। আজ এ নিয়ে লিখবো।

কথা হলো : কিসের টেস্ট!

COVID-19 হলে নিশ্চিত হতে তিনটি মাত্র টেস্ট আছে।

এক : জীবাণু টেস্ট
দুই. এন্টিজেন টেস্ট
তিন. এন্টিবডি টেস্ট

প্রতিটির বিশদ বলার আগে মজার একটি কাহিনী বলি। শুধু সাধারণ মানুষ ধরা খায় না। ইংল্যান্ডের মতো স্মার্ট সরকারও অনেক সময় ধরা খায়। ২৪ মার্চ ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার জনগণকে সান্ত্বনা দিতে ঘোষণা দিলেন যে – এপ্রিল থেকে করোনা ভাইরাসের এন্টিবডি টেস্ট কীট ঘরে ঘরে পাঠানো হবে। যাতে করে কারা কারা অলরেডি আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছে। আড়ালে সিভিল সার্ভেন্টরা বিশ্ববাজার যাচাই বাছাই করে চায়নার একটা কোম্পানিকে অর্ডার দিলো দুই মিলিয়ন এন্টিবডি টেস্ট কীটস। চায়না বেশ চালাক। সুযোগ বুঝে অগ্রিম দাম চেয়ে বসলো। কীটস পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে বিশ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করে দিলো ব্রিটিশ সরকার। কীটস হাতে আসার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম পরীক্ষা করে দেখলো যে – এই কীটস প্রচুর ভুল রেজাল্ট দিচ্ছে, অনেক ফলস পজিটিভ নেগেটিভ আসছে, মোটেও রিলায়েবল নয়। ব্রিটিশ সরকার চুপি চুপি এই পরিকল্পনা থেকে সরে গেলো আড়ালে। টেস্ট করাতো দূরের কথা, পয়সাটাই গচ্চা গেলো। সরকার আড়ালে চাইনিজ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে এই স্ক্যান্ড্যাল তেমন বাজারে আসছে না। আরো মজার হলো, শুধু একা ব্রিটেন নয়, আমেরিকা, জার্মানি, ইতালি, তুরস্ক এবং নেদারল্যান্ডও এই কীটস নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ধরা খেয়েছে। প্যান্ডেমিক ডামাডোল এসব ব্যর্থতা আড়ালে রাখছে আপাতত। আন্তর্জাতিক প্রতারণার বাজারের সাথে লোকাল বাজারেও প্রতারণা আছে এবং থাকবে। এ নিয়ে অন্য সময় লিখবো। আজ শুধু করোনা ভাইরাসের টেস্টগুলো নিয়ে লেখা। নিজেদের প্রয়োজনেই ব্যাপারটিতে পরিষ্কার ধারনা থাকলে কখন কোন পরীক্ষাটি কার্যকরী, এ সম্পর্কে জানাটুকু পরিষ্কার হবে।

মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র ২.৫ % এর এই টেস্টগুলো করা হয়েছে। সে হিসাবে এখনো পর্যন্ত টেস্ট করা লোকের সংখ্যা মাত্র ২০ কোটি! পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা এই মুহূর্তে ৮ বিলিয়নের চেয়ে একটু কম। মানে ৮০০ কোটি !

প্রতি হাজারে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করেছে এই পর্যন্ত ডেনমার্ক । প্রতি হাজারে ১৭ জনের মতো।

গত মার্চ মাসের ৭ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত কারো সন্ধান পাওয়া যায় টেস্টে। তারপর থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ২.৫ লক্ষের বেশি লোকের টেস্ট করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের চেয়ে বেশি টেস্ট করা হয় সারাদেশের ৪৯ টি টেস্ট ল্যাবে। আঠারো কোটি মানুষের জন্যে ভেন্ট্রিলেটর আছে মাত্র ৫৫০ টি! ICU বেড আছে দেড় হাজারের মতো। প্রতি এক লক্ষের জন্যে একটির চেয়ে কম বেড।

ব্রিটেনে ছয় কোটি মানুষের জন্যে ICU বেড ছিল ছয় হাজারের বেশি, করোনার কারণে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে চল্লিশ হাজারের বেশি। সারাদেশে হাসপাতাল বেড আছে তিন লক্ষের উপরে। ব্রিটেনে এই মুহূর্তে প্রতিদিন গড়ে আশি হাজারের বেশি করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা হয়।

শুরুতে বলেছিলাম – করোনা ভাইরাস SARS-CoV-2 এ আক্রান্ত হলে জানার উপায় তিনটি। মানে তিন ধরনের টেস্ট। আরেকটু সহজ করতে বলা যায় – আসলে দুই ধরনের টেস্ট।

একটি হলো – শরীর জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা – তার টেস্ট।

আরেকটি হলো – শরীর আগে কখনো জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কিনা – তার টেস্ট।

শরীরে জীবাণুটি আছে কিনা তা জানতে দুটো টেস্ট আছে।

► এক . ভাইরাস টেস্ট
► দুই . এন্টিজেন টেস্ট

আগে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কিনা তা জানতে একটি টেস্ট।

► এন্টিবডি টেস্ট

ভাইরাস টেস্ট

করোনা ভাইরাসের মূল টেস্ট টি ভাইরাস টেস্ট বা জীবাণু টেস্ট। সংক্ষেপে এই টেস্টটিকে বলা হয় PCR টেস্ট।

PCR। ভাঙলে হয় Polymerase Chain Reaction। এটি একটি রাসায়নিক পদ্ধতির নাম, যে পদ্ধতিতে একখণ্ড DNA থেকে হাজার হাজার কপি করা যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় PCR কে মজা করে বলে – মলিকুলার ফটোকপি। একখণ্ড DNA খুব ছোট একটি অংশ। কিন্তু পরীক্ষা করতে হাজার হাজার DNA লাগে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এমনিতেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র, তারও হাজারগুন ন্যানো ক্ষুদ্র এই DNA। কোষের এই DNA এর ভেতর কোষের সব বৈশিষ্ট লুকিয়ে থাকে।

আরো চল্লিশ বছর আগে একখণ্ড DNA পৃথক করে তার থেকে হাজার-লক্ষ কপি করতে কয়েকদিন লেগে যেত। ১৯৮৩ সালে আমেরিকান রসায়নবিদ Kary Banks Mullis অল্প সময়ে অনেকগুলো DNA কপি করার এই PCR পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেন। তার এই অসামান্য আবিষ্কার জেনোমিক গবেষণায় আমূল পরিবর্তন করে দিলো। ১৯৯৩ সালে এ কারণে Mullis -কে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। আজ এই PCR পদ্ধতিটাই করোনা ভাইরাস টেস্ট করার সবচেয়ে বেস্ট পদ্ধতি সারা পৃথিবীতে। কেমন করে এটি করা হয়, বলছি সহজ করে।

PCR পদ্ধতিটি যে মেশিনের মধ্যে করা হয় তাকে PCR মেশিন বলে। এই মেশিন নিয়ে একটু পর বলবো। আগে মলিকুলারের এই কঠিন পদ্ধতিটাকে সহজ করে বুঝে নেই।

যে জীবাণুটি পরীক্ষা করা হবে, তার সেম্পল থেকে তার DNA নিয়ে একটি টেস্ট টিউবে রাখা হয়, সাথে DNA Plymerase নামের একধরনের এনজাইম দেয়া হয়, আর একধরনের লবন মিশিয়ে টেস্ট টিউবটি মেশিনে ঢুকানো হয় । পুরো মেশিনের কাজ অটোমেটেড, মানে স্বয়ংক্রিয় সব হয় একের পর এক।

DNA হলো সাপের মতো প্যাচ করে থাকা দুটো দণ্ড। প্রথমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এটাকে আলাদা করা হয়। তারপর প্রতিটি দণ্ডকে বিশেষ ধরনের লবন জলের মধ্যে থাকা নিউক্লিক অ্যাসিডকে পলিমারেজ এনজাইম গুলো জোড়া লাগিয়ে নতুন আরেকটি পূর্ণাঙ্গ DNA বানায়। এই Polymerase উপাদানটি চেইনের মতো হাজার হাজার নতুন DNA কপি করে তৈরী করে ফেলে। তাই এর নাম PCR বা polymerase chain reaction! এরকম দুই তিন ঘন্টায় কয়েকটি সাইকেলে মিলিয়ন মিলিয়ন নতুন DNA তৈরী করা যায় PCR মেশিন দিয়ে, পরে তা পরীক্ষা করে সহজে জীবাণুটিকে ধরা যায়।

কিন্তু সমস্যা হলো করোনা ভাইরাসের ভেতর কোনো DNA থাকে না। শুধু RNA থাকে। তাই শুধু PCR মেশিন দিয়ে করোনা ভাইরাস নির্ণয় একটু সময় সাপেক্ষ। প্রথমদিকে তাই করা হতো। কিন্তু এখন PCR মেশিনগুলো আরো উন্নত মানের। আগে আলাদা করে ভাইরাসের RNA কে একটি বিশেষ উপায়ে DNA -তে রূপান্তরিত করা হয়। প্রতিটা RNA এর ভিতর থাকে আসলে DNA এর একটি কপি বা ছায়া। Reverse Transcriptase নামের একটি এনজাইম দিয়ে RNA থেকে DNA এর ছায়াটিকে বের করা হয়। এই DNA -কে বলে cDNA বা Complementary DNA। পুরো পদ্ধতিটাকে বলে Reverse transcription।

এই পদ্ধতিতে RNA থেকে DNA বের করে PCR মেশিনে নতুন হাজার হাজার DNA করার পদ্ধতিটিকে বলে RT-PCR। RT মানে Reverse transcription। করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা হয় মূলত বেসিক PCR মেশিনের থেকে আরো উন্নতমানের RT-PCR মেশিনে। এখন আরো উন্নত ব্যবস্থা আছে PCR মেশিনগুলোতে। অ্যাডভান্স টেকলোজিতে কম্পিটারাইজড qPCR এবং RT-qPCR।

জার্মানি, মার্কিন, ইংল্যান্ড, চীন, অনেক দেশের বায়োটেকনোলজির কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের PCR মেশিন বানায়। একটি বেসিক PCR মেশিন পাঁচ লক্ষ থেকে পনেরো লক্ষ টাকা। এডভান্স RT কিংবা RT-qPCR মেশিনগুলো কোম্পানিভেদে বিশলক্ষ থেকে এক কোটি টাকা এক একটি মেশিন। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সম্ভবত ৪৯ টি ল্যাবে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করানো হয়। যতটুকু জানি, বেশিরভাগ মেশিন বেসিক PCR! ঢাকায় হয়তো অল্প কয়টি RT-PCR মেশিন আছে। বিস্তারিত পরিসংখ্যান জানা নেই। করোনা বিষয়ক স্বাস্থ্য অধিদফতর নিজেই জানে কিনা সন্দেহ আছে।

PCR পদ্ধতিটিকে করোনা ভাইরাস টেস্টের গোল্ডেন মেথড ধরা হয়। তাই এই পদ্ধতি WHO কর্তৃক স্বীকৃত এবং পৃথিবীর সবদেশেই করোনা ভাইরাসের একমাত্র ল্যাব টেস্ট ধরা হয়। আরো একটি পদ্ধতি আছে। নাম : Isothermal amplification assays। পদ্ধতিটি কম রিলায়েবল, কিন্তু PCR এর চেয়ে সস্তা এবং দ্রুত করা যায়। PCR পদ্ধতিটি করতে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগে। আলোচনা সংক্ষেপ করতে এই পদ্ধতিটি নিয়ে আর আলোচনা করলাম না।

এন্টিবডি টেস্ট :

এমন অনেকে আছেন -লক্ষণ দেখা দিয়েছিলো, কিন্তু টেস্ট করান নি, কিছুদিন পর ভালো হয়ে গেলেন। তবে নিশ্চিত নন যে আপনার শরীর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল কিনা। আবার এমন অনেকেই আছেন বা ছিলেন বা থাকতে পারেন যে – তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা দেয় নি। এমন অবস্থাগুলোতে আপনার শরীরে করোনা ভাইরাসের কারণে তৈরী হওয়া এন্টিবডি আছে কিনা তা জানার মধ্যে দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই এন্টিবডি টেস্টটিতে রক্ত নিয়ে রক্তের মধ্যে দেখা হয়। আরেকটি বিস্তারিত বললে রক্তের সিরাম নামক অংশে এন্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। আমার আরেকটি আর্টিক্যাল “করোনা ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে কি ?” এটায় এই এন্টিবডি টেস্ট নিয়ে আলাদা করে বিশদ লিখেছি। পাবলিক পেইজ ‘অপূর্ব চৌধুরী’ র নোটসে করোনা রিলেটেড আর্টিক্যালগুলো দেয়া আছে। অনুসন্ধানী পাঠক খুঁজে নিয়ে এন্টিবডি টেষ্টের বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন।

বাকি রইলো, এন্টিজেন টেস্ট।

এন্টিজেন টেস্ট:

সহজ করে বললে – করোনা ভাইরাসের জীন চিহ্নিত করতে উপরের PCR টেস্ট, করোনা ভাইরাস এট্যাক করে চলে গেছে, কিন্তু চিহ্ন রেখে গেছে শরীরকে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে যুদ্ধকরা এন্টিবডি তৈরী করে, সেই এন্টিবডি চেক করতে – এন্টিবডি টেস্ট করা হয়।

করোনা ভাইরাস শরীরে ঢোকার সাথে সাথে সিমটম ভালোভাবে প্রকাশ পাওয়ার আগেই অথবা পরে শরীরের B সেল থেকে B cell receptor নামের একধরনের প্রোটিন এসে ভাইরাসগুলোর গায়ে এসে বসে। করোনা ভাইরাসের গায়ে কতগুলো স্পাইকের মতো প্রোটিন থাকে । এই স্পাইক প্রোটিন এবং B cell receptor প্রোটিন মিলে করোনা ভাইরাসটিকে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য দেয়। এটার কারণ হলো পরবর্তীতে B সেল থেকে বের হওয়া এন্টিবডি এবং T সেল ডাইরেক্ট যেন জীবাণুটিকে চিনে মেরে ফেলতে পারে! না হলে ভুলকরে শরীরের ভালো কোষগুলোকে যদি এট্যাক করে বসে এন্টিবডি! তো এই বিশেষ ট্যাগ সম্পন্ন ভাইরাসটিকে তখন বলে এন্টিজেন। এন্টিজেন টেস্টে এই বিশেষ প্রোটিনটিকে চিহ্নিত করার মধ্যে দিয়ে করোনা ভাইরাসটি আছে কিনা শরীরে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।

এন্টিজেন পদ্ধতিটি খুব সস্তা, সহজ এবং অল্প সময় লাগে। মাত্র ১০ থেকে পনেরো মিনিট লাগে। কিন্তু একটা কথা আছে – সস্তার তিন অবস্থা ।

পদ্ধতিটি সহজ করে বললে, কথাটির মর্ম বুঝবেন।

এন্টিজেন টেস্ট পদ্ধতিতে নাক থেকে সোয়াব নিলেই চলে। সেই সোয়াব ল্যাবে নিয়ে বিশেষ ধরনের এন্টিজেন প্রোটিন চিহ্নিত করার মেশিনে কিছু ক্যামিক্যাল সহকারে ঢোকানো হয়। দশ মিনিটের মধ্যে ফলাফল জানিয়ে দেয় করোনা ভাইরাসের সেই বিশেষ এন্টিজেন প্রোটিনটি আছে কিনা!

শুনতে মনে হয় কত সহজ এবং দ্রুত। আসলে টেস্টটি মোটেও রিলায়েবল নয়। প্রচুর ফলস পজেটিভ আসে এবং আসতে পারে। এমনকি পজিটিভ ছিল কিন্তু রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে। কারণ হলো, সেই সয়াবে খুব অল্প করোনা ভাইরাস থাকতে পারে, অথবা সেই ভাইরাসগুলর গায়ে B সেল রিসেপ্টর এসে যুক্ত হয়ে এন্টিজেন প্রোটিন হয়ে উঠে নি! ফলে ফলস রেজাল্ট আসতেই পারে সহজে। কিন্তু PCR পদ্ধতিতে একটি DNA পেলেও তাকে মিলিয়ন কপি বানিয়ে নিশ্চিতহতে হয় ভাইরাসের উপস্থিতি। তাই PCR পদ্ধতিটি তুলনামূলক নির্ভুল।

এন্টিজেন টেস্ট খুব একটা করা হয় না। তাৎক্ষণিক এবং দ্রুততার জন্যে অনেক দেশে এন্টিজেন টেস্ট করার অনুমতি আছে এবং করা হয়। যাদের ৱ্যাপিড টেস্ট বলা হয়। কিন্তু নিশ্চিতকরণের জন্যে পরে PCR পদ্ধতিতে করে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস টেস্টে কোন ধরনের ৱ্যাপিড টেস্টকে অনুমোদন করে না।

বাজারে এ নিয়ে অনেক প্রতারণা আছে। এই প্রতারণার শিকার যাতে না হোন, তার জন্যেই এই সচেতনমূলক লেখা।

করোনা ভাইরাসের টেস্টের নাম করে বিভিন্ন হোম কীটস বাজারে দেখবেন। তাদের বেশিরভাগই এই এন্টিজেন্ট টেস্ট পদ্ধতির কীটস! ৱ্যাপিড টেস্ট কীটস! নাক থেকে সোয়াব নিয়ে তাদের ঠিকানায় পাঠালে চব্বিশ ঘন্টায় রেসাল্ট জানায় তারা ! পুরাই ভুয়া একটি ব্যবসা। এই ফাঁদে পা দেবেন না। তারা PCR পদ্ধতিতে চেক করছে কিনা নিশ্চিত হবেন। ইংল্যান্ড আমেরিকা ইউরোপের অনেক প্রাইভেট কোম্পানিও এসব প্রতারণা করে। তারা দাবি করে ষাট থেকে সত্তর ভাগ সঠিক ফলাফল দেয়! বাস্তবে তা হয় না। প্রতিটা সরকার তাই আলাদা করে ল্যাব বেইজড PCR পদ্ধতি ছাড়া করোনা ভাইরাসের রেসাল্টকে পজেটিভ ধরে না। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে হয়তো এই প্রতারণার বাজার শুরু হয়ে গেছে। দেশে থাকি না বলে, দেশের কিছু জানি না। এ প্রসঙ্গে মজার আরেকটি বিষয় বলি!

সম্প্রতি ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্হ্যে কেন্দ্রের করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের কীটস ‘ডট ব্লট’ নিয়ে মিডিয়াতে হৈচৈ দেখলাম। ওনার কীট্স সম্পর্কে কিছুই তেমন জানি না! শুধু জানি, খুব সস্তা এবং দ্রুত, ৱ্যাপিড টেস্ট দাবি করেছেন তারা। খরচ মনে হয় ৩০০ টাকা। সেনেগালেও একই ধরনের একটি ৱ্যাপিড টেস্ট কীটস বাজারে আছে, খরচ এক ডলার!

ঐদিন দেখলাম, জাফরুল্লাহ সাহেব করোনায় নাকি আক্রান্ত হয়েছেন। কি করে বুঝলেন? খবরটি পড়ে যেটা জানতে পেলাম, ডাঃ জাফরুল্লা তার গণস্বাস্থের ডট ব্লট কীটস দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে – তার শরীরে ভাইরাসটির এন্টিজেন পেয়েছেন!! তার মানে তার কীটস এই এন্টিজেন্ট টেস্ট পদ্ধতির কীটস! যদিও কিছুই জানি না এই টেস্ট কীট্স টি সম্পর্কে, তাদের ওয়েবসাইটেও খুঁজেছি এ সম্পর্কে তথ্য, কিন্তু কিছুই পাই নি । যদি এটি সত্যি সত্যি এন্টিজেন টেস্টের কীটস হয়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই কীটস আরেকটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই না! এটি মানুষকে ভুল রেজাল্ট দেবে অনেক বেশি। যে কারণে এটি অনুমোদন দিলে জনগণের আরো ক্ষতি হবে। আক্রান্ত লোকে ভুল রেজাল্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াবে!

সাময়িক কিছু ভুল হোক, তারপরেও সরকারের দেয়া ল্যাবগুলোর উপর আস্থা রাখুন। সেখানেই টেস্ট করাবেন করোনার। বাজারের বা ক্লিনিকগুলোর প্রতারণায় পা দেবেন না।

নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও সচেতন করুন।

সূত্র :

1. The Lancet

2. BMJ – British Medical Journal

3. EJRadiology – European Journal of Radiology

4. Nature

5. Oxford Academic Clinical Chemistry

6. ACP Journals – Annals of Internal Medicine

7. CEBM – The Centre for Evidence-Based Medicine

 

ডা. অপূর্ব চৌধুরী
চিকিৎসক এবং লেখক
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড
গ্রন্থ ৭
উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাস টেস্ট: কী, কেন, কীভাবে?

মুগ্ধতা.কম

২৩ মে, ২০২০ , ৫:১৭ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস শরীরের কোথায় কি করছে, কেন করছে, কিভাবে করছে ?

নতুন করোনা ভাইরাস পুরো পৃথিবীকে ওলোট পালট করে দিলো। মানুষের উপর তার তাণ্ডবলীলা কিন্তু এখনো থামে নি। কেন থামে নি, বলছি।

বছরের শুরুতে চীনের উহানে যখন ভাইরাসটি দেখা দিলো, লোকে ভাবলো – ফ্লু বা ফ্লু জনিত কিছু একটা হয়তো। একটু জ্বর, খানিক কাশি, বড় জোর নিউমোনিয়া, আর কপাল খারাপ থাকলে পটল তুলে স্বর্গবাসী হওয়া।

না, করোনা ভাইরাস এখানেই থেমে থাকে নি। পুরো মেরে ফেলার চেয়ে আধমরা করেছে আরো বেশি।

কোভিড-১৯ রোগের নাম হয়ে SARS-CoV-2 নামের ভাইরাসটি শুধুমাত্র একটি ফ্লু নয়। তারপরে ভাবা হয়েছিল – এটি একটি ফুসফুস জনিত সংক্রমণ। কিছুদিন যেতেই চিকিৎসকরা ভাবলো – এটি শুধুমাত্র ভাইরাসজনিত একটি ইনফেকসাস ডিজিজ।

এতটুকুতে থামলে চলতো। কিন্তু ভাইরাসটি শরীরের এমন এমন অংশে আঘাত করতে শুরু করলো, এমন এমন লক্ষণ প্রকাশ করলো, একেক জনের শরীরে একেক রকম তাণ্ডবের চেহারা রেখে গেলো, কিছু পোস্ট মর্টেম করতে গিয়ে চিকিৎসকরা দেখতে পেলো, কিছু রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পর তার দেহ রুটিন পরীক্ষা করতে গিয়ে পেলো, কিছু সমস্যা মৃত্যুর আগে জানান দিয়ে গেলো।

প্রতি সপ্তাহে বিশ্বের কোথাও না কোথাও চিকিৎসকরা নতুন নতুন তথ্য, উপাত্ত, রোগীর শরীরে নতুন নতুন উপসর্গ, মৃতের শরীরে ভাইরাসের ইফেক্ট, এসব পাচ্ছিলো। যে কারণে এখনো পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের প্রভাবে শরীরে কি কি হতে পারে, তার চূড়ান্ত কোনো তালিকা তৈরী করতে পারে নি। যেটা আছে, তা সাময়িক রূপরেখা, প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে। সামনে আরো হবে।

একসময়ে ভাবা হতো – করোনা পেশেন্ট মানে হসপিটালের ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের কাজ। দিন যেতে সমস্যার হাত-পা ছড়ালো। যুক্ত করা হলো ইনফেকসাস ডিজিজ ডিপার্টমেন্ট। আক্রান্তদের অবস্থা বেশি খারাপের দিকে যেতে থাকলে – যুক্ত হলো ক্রিকটিক্যাল কেয়ার ডিপার্টমেন্ট। মৃত্যুগুলো ফুসফুসজনিত দেখে রেসপিরেটরি এবং ইন্টারনাল মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের স্পেশালিস্টদের কাজের গণ্ডিতে ভাবা হয়েছিল। মজার হলো – দিন যত যেতে থাকলো – দেখলো যে, বেশিরভাগ মৃত্যুগুলো হচ্ছে হৃদপিণ্ডের সমস্যার কারণে। অথচ এতদিন ভাবা হতো ফুসফুসের কারণে মৃত্যু হচ্ছে, ভেন্ট্রিলোটরের চাহিদা আকাশচুম্বি হয়ে গেলো। এখন চিকিৎসকরা রোগের ক্লাসিফিকেশনে কোভিড-১৯ -কে কার্ডিয়াক ক্যাটাগরিতে ফেলবে কিনা দোটানায় পড়ে গেলো।

এমনকি কোথাও কোথাও কিডনীজনিত সমস্যা এতদূর ছাড়িয়ে গেছে, ভেন্ট্রিলেটরের চেয়ে ডায়ালাইসিস মেশিন বেশি দরকার হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসটি শরীরের কোথায় তার আঘাত বাকি রেখেছে! হয়তো সামনে আরো নতুন নতুন সমস্যা আসবে, নতুন নতুন উপসর্গ দেখতে পাবে আক্রান্ত রা, সুস্থ হয়ে ওঠার পর নিত্য নতুন সমস্যা নিয়ে হাজির হবে আক্রান্তরা, এসব নিয়েই আজ লিখবো : করোনা ভাইরাস শরীরের কোথায় কোথায় কি করছে, কেন করছে, কিভাবে করছে।

শরীরের উপর থেকে নিচে যে যে অংশগুলো করোনা ভাইরাসের কারণে আক্রান্ত হয়, সংক্ষিপ্ত আকারে তা হলো:

১. মাথা

২. নাক

৩. ঘাড়

৪. ফুসফুস

৫. হৃদপিন্ড

৬. রক্তনালী

৭. পাকস্থলী

৮. কিডনি

৯. লিভার

১০. পা

তালিকা দেখে ঘাবড়ে যাবেন না। একসাথে সবগুলোতে সবাই আক্রান্ত হয় না। বিশদ বললে বিরক্ত লাগবে পড়তে, তাই সংক্ষিপ্ত করে বলবো মূলকথাগুলো।

মস্তিষ্ক :

করোনা আক্রান্তদের ১০% মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগতে পারেন।

সমস্যাগুলো :

► মাথা ব্যথা করা
► মাথা ঝিলিক দিয়ে ওঠা
► মস্তিষ্কের ইনফ্লেমেশন
► ফোকাস করার ক্ষমতা কমে যায়
► মাথা ভার ভার লাগতে পারে
► হঠাৎ হঠাৎ কনফিউশান লাগে
► চিন্তা ভাবনা ঘোলাটে লাগতে পারে

সমস্যাগুলোর কিছু কিছু সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও দেখা দিতে পারে।

করোনা ভাইরাস মস্তিষ্ককে কিভাবে আক্রমণ করে, বিজ্ঞানীরা এখনো তা পরিষ্কার জানে না। কিন্তু যে কারণে আক্রমণ করে – তা জানে। সেটি হলো – করোনা ভাইরাস শরীরের সেই সব অংশকে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে বা সেখানে গিয়ে বসে, যেখানে ACE2 নামের একধরনের রিসেপ্টর প্রোটিন থাকে। ফুসফুসের মতো মস্তিষ্কেও এই ACE2 অনেক বেশি থাকে। ২০০০ সালে ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোলের উপায় জানতে গিয়ে Athony Turner এর গবেষক দল এই প্রোটিন রিসেপ্টরটি সম্পর্কে বিশদ জানতে পারে এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালে আরেকদল মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষের আবরণে এদের উপস্থিতি আবিষ্কার করেন।

ঘাড় :

ঘাড় ব্যথা করতে পারে। আক্রান্ত হবার কিছুদিন পর প্রথমে গলা ব্যথা শুরু হয়। এই গলা ব্যাথার কারণ – গলার একটি গ্লান্ড আক্রান্ত হয় বলে। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড। এতে subacute thyroiditis নামের একটি সমস্যা হয়। এটি একটি ইনফ্লেমেশন। মনে রাখবেন – ইনফ্লেমেশন কিন্তু ইনফেকশন নয়। ইনফেকশনের কারণে ইনফ্লেমেশন হয়। ইনফ্লেমেশন হলো ইনফেকশনের কারণে শরীরের একটি পাল্টা প্রতিক্রিয়া। সচরাচর মামস ভাইরাসের কারণে এই subacute thyroiditis সমস্যাটি হয়। সম্প্রতি ইতালিতে খুব অল্প কিছু করোনা আক্রান্তদের মধ্যে এটি দেখা গেছে। এতে আক্রান্ত হলে প্রথমে গলা বেশি ব্যথা করে, গলার সামনের অংশ একপাশে ফুলে যায়, ঘাড়ের পেশিগুলো ব্যাথা করতে শুরু করে। থাইরয়েডের অন্য কোনো কমপ্লিকেশনের দিকে না গেলে কয়েকদিন পর ব্যথা চলে যায়।

ফুসফুস :

ফুসফুসে কি হয়, সবাই জানে এতদিনে । আগের আর্টিক্যালগুলোতে এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি বলে নতুন করে কিছু বলতে চাইছি না। ফুসফুসে আক্রমণের তিনটি স্তর। প্রথম স্তরে নাক, মুখ দিয়ে ভাইরাসটি শরীরে ঢুকে গলায় বাসা বাঁধে। শুরু হয় হালকা গলা ব্যথা। দ্বিতীয় স্তরে কদিন পর ফুসফুসের গিয়ে বসে। সেখানে মস্তিষ্কের মতো ACE2 প্রচুর থাকে। ফুসফুসের ভিতরের কোষগুলো মিউকাস নামের একটি উপাদান বের করে, যার কাজ হলো ফুসফুসকে ধুলোবালি, জীবাণু এসব থেকে পরিষ্কার রাখা। ফুসফুসে এপিথেলিয়াল ধরনের কোষে সিলিয়া নামক এক ধরণের গঠন থাকে, এদের কাজ হলো – ফুসফুসের কোষের উপর জীবাণু, ধুলাবালু, পরাগরেণু, বাহিরের কোনো কিছুকেই বসতে না দেয়া। ব্যাঙের ছাতার মতো দুলে দুলে জীবাণুদের সরিয়ে দেয় সিলিয়া এবং মিউকাস তখন সেগুলোকে ধুয়ে ফুসফুসের বাহিরে ঠেলে দেয়। আমরা ঠিক এই কারণে যখন কাশি দিয়ে এক দলা কফ ফেলি, এই কফে তাই ভাইরাস থাকতে পারে ! অনেক জীবাণুও থাকে। এই জন্যে যেখানে-সেখানে কফ ফেলবেন না। নিজের কফ দিয়ে নিজের সন্তানকেই আক্রান্ত করবেন। এই লেখাটি পড়ার পর আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করবেন – যেখানে-সেখানে কফ ফেলবেন না, কাশি এলে হাত দিয়ে মুখ ঢাকবেন, পকেটে টিসু থাকলে টিসুতে মুখ মুছবেন, সেই টিসু কোনো ডাস্টবিনে ফেলবেন। দৈনন্দিন জীবনে এমন সামান্য পরিচ্ছন্নতাটুকু আপনাকে যেমন ভালো রাখবে, অন্যকেও ভালো রাখবে।

যা বলছিলাম, এই সিলিয়াগুলোর বাহিরে ACE2 বসে থাকে। করোনা ভাইরাসগুলো এই সিলিয়া গুলোর উপর বসে কোষের ভিতর ঢুকে কোষগুলোকে আক্রান্ত করলে সিলিয়াগুলো আর তাদের কাজটি করতে পারে না। তখন বার বার মিউকাস জমে যায় সামান্য বাতাসে ! ফুসফুস চায় তা বের করে ভালোভাবে বাতাস নিতে, আর তাতেই কাশি শুরু হয়। তখন ঘন ঘন আক্রান্ত হন, ঘনঘন কাশতে থাকেন। আরো ক দিন যেতেই শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। তৃতীয় স্তরে শরীর তেড়ে আসে, এন্টিবডি তৈরী করে, সেই এন্টিবডিগুলো ভাইরাসকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে। ভাইরাস আর এন্টিবডির যুদ্ধ এতো প্রবল হয়ে ওঠে যে cytokines নামের একটি রাসায়নিক উপাদান বেরিয়ে আসে, সে আরো বেশি বেশি এন্টিবডি ডেকে নিয়ে আসে, ঝড়টিকে বলে cytokine storm। এতে ফুসফুসের আলভিওলার প্রকোষ্টগুলো যুদ্ধবিদ্ধস্ত মৃতকোষ, জল, মিউকাস, পুঁজ ইত্যাদিতে ভরে যায়। এই প্রকোষ্টে বাহিরের অক্সিজেন ঢুকে এবং শরীরের কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে যায়। কিন্তু প্রকোষ্টটি মৃত কোষ সহ জল, পুঁজে ভরে যায় বলে বাতাস ঢুকতেও বাধা পায়, আবার বেরও হতে পারে না। নিউমোনিয়া বেড়ে গিয়ে পুরো শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হয়। তখনই দরকার পড়ে ভেন্ট্রিলেটর মেশিন।

বলে নেই একটি কথা। বেঁচে গেলেও এই ভাইরাস ফুসফুসের এমন এমন ক্ষতি করে যায়, যা থেকে বের হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে পারে, এমন কি কারো কারো ক্ষেত্রে বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হতে পারে। সুতরাং, আরেকবার চিন্তা করবেন, এই ভাইরাস যতটা সাময়িক খারাপ করে শরীরকে, তারচেয়ে তার ক্ষত বেশি রেখে যায় ভোগাতে।

হৃদপিণ্ড :

প্রথমে ভাবা হতো শুধুমাত্র ফুসফুসকে এই ভাইরাস সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে। কিন্তু সময় গড়াতে বের হয়ে এলো – আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজনের হৃদপিণ্ডে এটি আঘাত হানে। এমনকি সুস্থ দেহ, পূর্ব থেকে হার্টে কোনো সমস্যা নেই, এমনদের; সাথে তরুণ তরুণীদের হার্টকেও এটি আক্রান্ত করতে পারে। হার্টের কারণে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়

► অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
► হার্ট মাসলের ক্ষতি যা থেকে Myocarditis হতে পারে
► হার্ট এট্যাক বিশেষত Ischemic heart attack হতে পারে
► প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং রক্ত চলাচলে বাধা
► করোনারি হার্ট ডিজিজ হতে পারে ব্লাড ক্লট থেকে
► হার্ট ফেইলিউর

এবং সবশেষে হৃদয় থেমে যেতে পারে।

ভাইরাসটি তিনভাবে হার্টকে আক্রান্ত করে।

► সরাসরি হার্টের কোষে ঢুকে
► ফুসফুসের মাধ্যমে
► Cytokine Storm এর কারণে

ফুসফুস এবং ব্রেইনের মতো হার্টের কোষের আবরণে ACE2 প্রোটিন রিসেপ্টর থাকে প্রচুর। তাই ভাইরাসগুলো তাদের স্পাইক প্রোটিন দিয়ে হার্টের কোষে গিয়ে সহজে বসতে পারে। সাথে রক্তনালির ক্ষতি করে রক্তচলাচলে বাধা দেয়, রক্তনালী সরু করে ফেলে, এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়।

ফুসফুসে বাতাস ঠিকমতো পরিবর্তন না হতে পারলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমান কমে যায়। তাতে হৃদপিণ্ড কম অক্সিজেনের রক্ত পায়। অক্সিজেন কম পেলে হার্টের মাসলগুলো ঠিকমতো পাম্প করতে পারে না, তাতে পুরো রক্ত সরবরাহ হুমকিতে পড়ে। শরীরের সব জায়গায় রক্ত ঠিক মতো যায় না। হার্ট মাসল ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

কিডনি :

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দেখা গেছে যে, প্রতি চারজনের একজন কিডনি সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়। এমনকি সুস্থ হবার পর কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। কিডনি ডেমেজ থেকে কিডনি ফেইলিউর, কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা কমে যাওয়া, কিডনি অনেকাংশে অকোজো হয়ে যাওয়া, এমনসব সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। সমস্যার তীব্রতায় ডায়ালাইসিসের দরকার হয়ে পড়ছে অনেক রোগীর।

হার্টের মতো কিডনিতেও অনেক ACE2 থাকে বলে কিডনির কোষ নেফ্রনের ভেতর ঢুকে কোষ মেরে ফেলে কিডনিকে অকোজো করতে পারে। ফুসফুসের অক্সিজেন সরবরাহের ক্ষমতা কমে গেলে কিডনিতেও অক্সিজেনহীন রক্তের কারণে কিডনির কাজগুলো ঠিক মতো হয় না আর। রক্তে জমাট বাধলে বিশেষ করে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোতে এমন রক্ত জমাট বেঁধে কিডনির ফিল্টারিং কমিয়ে দেয়। তাতে শরীরের বর্জ্য ঠিকমতো বের হতে না পেরে শরীর নিজেই বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

রক্ত এবং রক্তনালী :

শুরুতে ধরা হতো রেসপিরেটরি ফেইলিউরে বেশি মারা যেত করোনা আক্রান্তদের। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে রক্ত জমাট বেঁধে। এই সমস্যাটি চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলেছে। ICU তে রাখা এক তৃতীয়াংশ রোগী এই ব্লাড ক্লটের শিকার হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে মাইক্রো ক্লট, যা মূলত হার্ট, কিডনি, ফুসফুসের খুব ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোতে কোনো এক অজানা কারণে রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। এতে লোকাল এরিয়াতে ক্লগ তৈরী হচ্ছে। লোকাল ফাংশন ব্যাহত হচ্ছে। আস্তে আস্তে চেইন হয়ে অর্গেনকেই আক্রান্ত করছে । মাইক্রো ক্লট কেন হচ্ছে জানে না চিকিৎসকরা। কিন্তু রক্তনালিতে কি করে এমন জমাট বাঁধছে, তা জানে।

রক্ত নালীর ভিতরের দেহ আক্রান্ত হলে তা যে ইনফেকশন তৈরী করে তাতে রক্তনালীর স্ফিত হওয়া কমে যায়, রক্ত ঠিকমতো চলতে পারে না, তাতে রক্ত তার কণিকাগুলো নিয়ে বসে থেকে আরো পিণ্ড তৈরী করে। সেই পিন্ডে অন্য আরো কিছু প্রোটিন যুক্ত হয়ে জমাট পিণ্ড করে ফেলে । তাতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কখনো সেই জমাট পিণ্ড কোথাও গিয়ে আটকে যায় ভালো করে । এমন করে কিডনিতে ফিল্টারিং কমিয়ে দেয়, হার্টে করোনারি ব্লক তৈরী করে, ব্রেইনে রক্ত এবং অক্সিজেনের অভাব ঘটিয়ে স্ট্রোক করায়, তাতে ব্রেইনের যে অংশকে আঘাত করেছে স্ট্রোক করে, সে শরীরের যে অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা প্যারালাইসিস করে দিতে পারে। করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও রক্তের এই জমাট অনেকদিন শরীরে থাকতে পারে।

পাকস্থলী :

বিশ ভাগ আক্রান্তের শরীরে ডায়ারিয়া একটি কমন লক্ষণ। এটি আক্রান্ত হবার প্রথম দিকে হয়ে থাকে। কয়েকদিন থেকে চলে যায়। কিন্তু সুস্থ হবার পর পেটের অনেক সমস্যায় অনেকদিন ভুগতে পারেন। ক্ষুধা মন্দা, বমি বমি ভাব, কারণ ছাড়াই হঠাৎ হঠাৎ ডায়ারিয়া হতে পারে সুস্থ হয়ে উঠবার কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। এসবের কারণ হলো করোনা ভাইরাস শুরু থেকেই পাকস্থলী এবং পরবর্তীতে অন্ত্রকে আক্রান্ত করে। পাকস্থলীতেও ACE2 থাকে বলে করোনা ভাইরাস সহজে সেখানে গিয়ে বসে।

লিভার :

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে লিভারের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের তৈরিতে বাধা তৈরী হয়। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং রক্তের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে বলে যকৃতের কোষগুলোর ঠিকমতো কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। রাসায়নিক উপাদান গুলো উঠানামা করে। ঐসব উপাদানগুলো শরীরে নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে । ফলে নতুন কোষ তৈরিতেও বাধা পায়। সুস্থ হয়ে উঠলেও লিভার ফাংশনের অনেক কিছুতে ব্যাঘাত থেকে যায় অনেক দিন, এমনকি লিভারের কার্যক্ষমতা আগের চেয়ে হ্রাস পায়। লিভারের এফেক্ট গিয়ে পড়ে খাদ্যপরিপাকে এবং শরীরের পুষ্টি জোগানে।

অন্যান্য :

নাকে ঘ্রান নেবার ক্ষমতা কমে যায়, যা করোনা ভাইরাসের একটি স্বীকৃত লক্ষণ এখন। পায়ের কিছু আঙ্গুল অন্য ধরনের লাল হয়ে যেতে পারে, যাকে বলে Covid Toe। খুব অল্প কিছু আক্রান্তের দেহে এই বিচিত্র লক্ষণটি দেখা গেছে। বাচ্চাদের বুক কিংবা পিঠের ত্বকে ফুসকুড়ি ছেয়ে যেতে পারে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে। এটাকে Kawasaki disease বলে।

এক দমে লেখাটি লিখে ভাবছিলাম, নতুন করোনা ভাইরাস শরীরের আর কোন কোন জায়গা তছনছ করে দিতে বাকি আছে। শরীর ভেঙেচুরে দম ফুরিয়ে দেবার সাথে সাথে ভাগ্যবানরা বেঁচে উঠলেও শরীরের কোথাও কোথাও তার ঝড়ের চিহ্ন রেখে যায় অনেক দিন ধরে।

এখন করোনা আক্রান্ত না হওয়া মানে জীবন লটারি পেয়ে বেঁচে থাকা। সুতরাং, এখনো সময় আছে, সতর্ক হোন, নিজেকে নিরাপদ রাখুন, এবং অন্যকে সচেতন করুন। আপনার সচেতনতার সাথে সাথে অন্যকে সচেতনতা আপনাকেই রক্ষা করবে।

সূত্র

1. Scientific American

2. Johns Hopkins Medicine

3. NHS UK & CDC USA

4. Journal of Virology

5. Nature Reviews Cardiology

6. Oxford Academic Cardiovascular Research

7. Preprint Server for Biology – BioRxiv

 

ডা. অপূর্ব চৌধুরী 
চিকিৎসক এবং লেখক
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড
গ্রন্থ ৭
উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাস শরীরের কোথায় কি করছে, কেন করছে, কিভাবে করছে ?

মুগ্ধতা.কম

১৫ মে, ২০২০ , ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস পরবর্তী সমস্যা এবং চিকিৎসা

বেশিরভাগ লোকজন এই মুহূর্তে করোনা ভাইরাসের কারণে COVID-19 থেকে বাঁচতে এবং বাঁচাতে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষ কথা বলছে –  হাত ধোয়া আর সামাজিক দূরত্ব নিয়ে, ডাক্তাররা বলছে উপসর্গ, মেডিসিন আর ভ্যাকসিন নিয়ে। খুব কম খবর নেয়া হচ্ছে যারা আক্রান্ত হলো তাদের কি অবস্থা, কেমন যাচ্ছে শরীর, কি অবস্থা দিয়ে গেলো তারা, কতটুকু সুস্থ্য হয়ে উঠলো, কতদিন লাগে এই অবস্থা থেকে বের হতে, তখন কি কি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আজ এসব নিয়ে বলবো। করোনা পরবর্তী সমস্যা এবং চিকিৎসা।

ক’ দিন আগে বাংলাদেশ থেকে এক তরুণী জানালেন- তাদের পরিবারে তারা তিনজন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। বাবা, মা এবং তরুণী নিজে। বাবা মারা গেলেন, মা এবং তিনি এখনো বেঁচে আছেন, সুস্থ হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। রোজা রাখতে চান, রাখতে পারবেন কিনা, জানতে চাইলেন। একবাক্যে – না করে দিলাম। কোনোভাবেই রোজা রাখা যাবে না। ওনাকে কথা দিয়েছিলাম, সময় পেলে এ নিয়ে লিখবো – করোনা পরবর্তী কি আমাদের করণীয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা কমন গাইড লাইন দিয়েছে যে – লক্ষণ দেখা দেবার পর একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত ভাইরাসটি শরীরে থাকে। এ নিয়ে একটুপর লিখছি।

সহজ করে বলা যায় – এই গাইড লাইন নূন্যতম, কিন্তু সবার জন্যে সমান ভাবে প্রযোজ্য নয়। নিয়মের ছকে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় সমস্যা থেকে বের হতে একেকজনের শরীরের উপর নির্ভর করবে কত দিন লাগবে। এখানে আরেকটি জিনিস বলতে হয় – লক্ষণগুলো না থাকা এবং শরীরে ভাইরাস না থাকা একই নয়। লক্ষণ গুলো আর নেই মানে – ভাইরাস দুর্বল হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো আছে। সুতরাং পরিপূর্ণ সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত ভাইরাস শরীর থেকে যায় না।

COVID-19 একটি নতুন সমস্যা। সত্যিকার অর্থে এখনো ভালো করে কোনো গবেষণা হয় নি, আসলেই কত দিন লাগে এই ভাইরাস থেকে বের হতে। যে সব গবেষণা হয়েছে, তা ছিল ছোট ছোট গ্ৰুপের পর্যবেক্ষণ। সময় গেলে সামনে আরো বড় আকারের গবেষণার ফলাফল হাতে আসবে।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল এটি নরমাল ফ্লু এর মতো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি ফ্লু এর চেয়েও মারাত্মক। COVID-19 এখনো পর্যন্ত প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি করছে আমাদের, চিকিৎসকদের, বিজ্ঞানীদের। তারপরেও এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে এবং হচ্ছে – তার বেশিরভাগ পূর্বের করোনা ভাইরাসগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন হচ্ছে –

» মাইল্ড সিম্পটম হলে রিকোভারি পিরিয়ড এক থেকে দুই সপ্তাহ।

» সিভিয়ার কিংবা ক্রিটিক্যাল হলে তিন থেকে ছয় সপ্তাহ লাগে পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে।

কিন্তু অনেক রিপোর্টে দেখা গেছে যে, অনেক মাইল্ড সিম্পটম যেতে তিন সপ্তাহ লেগে গেছে, অনেক সিভিয়ার কন্ডিশন থেকে নরমাল হতে আট সপ্তাহ লেগে গেছে।

এমনকি সিম্পটমগুলোরও দিনের সাথে দিনের পার্থক্য করে। প্রথমত ভাইরাসটি নতুন। আপনার শরীর জানে না কি করবে এই নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে। একদিন ভালো থাকবেন তো পরের দিন হঠাৎ বেশি অসুস্থ অনুভব করবেন। আগের রাতে দেখলেন জ্বর কমে গেছে, খুশি হয়ে গেলেন। পরের দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখলেন তীব্র জ্বর এসেছে। এমন সুস্থ-অসুস্থর খেলা এই ভাইরাসটির একটি ধাঁধা। এই ভাবলেন সুস্থ হয়েই গেলেন, দুদিন যেতেই দেখলেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

যদি দেখেন আপনার লক্ষণগুলো মারাত্মক নয়, তাহলে লক্ষণ শুরু হওয়া থেকে দুই সপ্তাহ নিজেকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। প্রথম দুই সপ্তাহ যাবার পর ঘরের বাহিরে না যেয়ে ছোটোখাটো কাজে মনোযোগ দিন, সাথে নিজের শরীরকে লক্ষ্য রাখুন। একটি আগাম সতর্কবাণী দেই – ভাইরাসটি চলে যাবার সময় ফুসফুস, পাকস্থলী এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি করে যায়। এ নিয়ে বিস্তারিত অন্য লেখায় লিখবো। এটা বলার কারণ এই জন্যে যে, মূল উপসর্গ গুলো প্রথম দুই সপ্তাহে চলে গেলেও পরের দুই সপ্তাহ নিজের শরীরকে চোখে চোখে রাখবেন, শরীরের কোনো অংশে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন কিনা, সেটাকে লক্ষ্য রাখবেন। তার মানে দু সপ্তাহের মাইল্ড সিম্পটমের যারা, তারা মূলত এক মাস হাতে রাখবেন পূর্ণ সুস্থ হতে।

শুধু মাইল্ড সিম্পটম দেখা দিলে টেস্ট করবার দরকার নেই। কিন্তু মারাত্মক হলে তখন হসপিটালে ভর্তির সাথে সাথে টেস্ট করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মার্কিন CDC র গাইড লাইন হচ্ছে দু ধরনের।

» টেস্টের উপর ভিত্তি করে
» লক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করে

হসপিটালে ভর্তি হবার পর শরীর ঘরে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক অবস্থায় আসার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে ২ বার টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ হতে হবে। একবার নেগেটিভ পর্যাপ্ত নয়, কারণ ফলস নেগেটিভ হতে পারে।

যেখানে টেস্ট করে নিশ্চিত হবার উপায় নেই, সেখানে সিম্পটম দেখা দেয়ার দিন থেকে নূন্যতম ১০ থেকে ১৪ দিন অপেক্ষা করা শরীর স্বাভাবিক হয়ে উঠতে। পরবর্তী আরো ২ সপ্তাহ দেখা যে – শরীরের অন্য অংশে কোনো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে কিনা, তাকে দেখা। সে ক্ষেত্রে শরীর বুঝে – চার থেকে ছয় এমনকি আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিতে হবে পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে।

সাত দিন থেকে আঠাশ দিনের এই রেঞ্জের মধ্যে আপনি অনেকগুলো সমস্যা দেখতে পারেন অথব মুখোমুখি। COVID-19 এর স্বাভাবিক সিম্পটম : গলা ব্যথা, তীব্র জ্বর, কাশি এসব থেকে সেরে ওঠার পর যখন ভাইরাসগুলো কমতে থাকে তখন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন।

খুব দুর্বল অনুভব করতে পারেন, শরীরের পেশীগুলোয় থেকে থেকে ব্যথা। CDC র রিপোর্ট অনুযায়ী এমেরিকান এক মহিলার সিম্পটম দেখা দেয়ার ৫০ দিন পর্যন্ত জ্বর আসা যাওয়া করছিলো। এমনকি তার শরীরে দুবার টেস্ট নেগেটিভ এসেছিলো। আরেকজন রোগীর এমন প্রথম সপ্তাহে পজিটিভ এসেছিলো, পরের সপ্তাহে নেগেটিভ এলো। কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সে হাতে এবং পায়ে ব্যথা, ঝিনঝিন করা, মাঝে মাঝে শ্বাস কষ্ট হওয়া অনুভব করতে লাগলো। এরকম দুই সপ্তাহ যাওয়ার পর পঞ্চম সপ্তাহে গিয়ে সমস্যাগুলো কমে যেতে থাকলো এবং ষষ্ট সপ্তাহে চলে গেলো।

অনেক রোগীর টেস্ট নেগেটিভ আসার দুই-তিনদিন পর হঠাৎ দেখলো সকাল বেলা ঝরঝরে শরীর, দুপুরে দুর্বল লাগতে শুরু করলো, বিকেলে শরীর গরম হয়ে উঠলো, রাতে আবার নরমাল হয়ে গেলো। অনেকে হয়তো ভয় পেয়ে যান, আবার আক্রান্ত হলেন কিনা। এমন সমস্যাও কেউ কেউ ভুগতে পারেন। উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। দু তিন দিন এমন হতে পারে, শরীর যখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী এবং সাঁড়াশি আক্রমণ করে।

কেউ কেউ নিউরোলোজিক্যাল কিছু প্রব্লেম ফেস করতে পারেন আফটার রিকোভারি টাইমে। যেমন, মস্তিষ্ক মনে হবে ভার, কোনো কিছুতে ফোকাস করতে পারছেন না, সকালে কি খেলেন – বিকেলে মনে করতে পারছেন না, উদ্বিগ্নতার চেয়ে কি নিয়ে উদ্বিগ্ন সেটাই বুঝতে পারছেন না। অথচ শরীরে কোনো তাপমাত্রা নেই, শ্বাস কষ্ট নেই।

রাতে ঘুমাতে গেলে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখলেন ঘামছেন, শীত শীত লাগছে, ভয় বেড়ে গেলো তাতে, এরপর ঘুম আর আসছে না। এমন হলে চেষ্টা করবেন ঘুমোতে। এমন দু তিন রাত হতে পারে, তার মানে নয় আপনি আবার আক্রান্ত হয়েছেন বা ভাইরাস এখনো যায় নি।

পেটের সমস্যায় অনেকে ভুগতে পারেন। ক্ষুধা কম লাগবে, খেতে ইচ্ছে করবে না কিন্তু ক্ষুধা লেগেছে, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ পাতলা হয়ে গেলো টয়লেট, দু তিনবার এমন হয়ে আবার ঠিক হয়ে গেলো। পেট ব্যথা না করলেও মনে হবে পেট ফাঁপা। ফুসফুস যে কারণে করোনা ভাইরাস গুলোতে আক্রান্ত হয় বেশি, সেই একই ধরনের কোষ এবং রাসায়নিক উপাদান পেটেও বেশি বলে ফুসফুসের পর করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতে পারে পাকস্থলী। লক্ষণ চলাকালীন ডায়ারিয়া হওয়া এর আরেকটি লক্ষণ।

মাথা ব্যথা থেকে থেকে আসতে পারে, মাথা ভার ভার লাগতে পারে। পেট আপসেট থাকতে পারে তিন চার সপ্তাহ, শরীর জুড়ে ব্যথা থাকতে পারে কয়েক সপ্তাহ, স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস নিতে মাঝে মাঝে কষ্ট হতে পারে,অল্পতে হাঁপিয়ে উঠতে পারেন, অযথা ক্লান্ত লাগবে, মুড্ অফ থাকতে পারে কারণ ছাড়াই, শরীর হঠাৎ হঠাৎউষ্ণ হয়ে উঠতে পারে, ঘুমে ঘামাতে পারেন, হঠাৎ হঠাৎ শীত অনুভব করতে পারেন, সহজে কাশি টা যাচ্ছে না, থেকে থেকে আসছে যাচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে । করোনা পরবর্তী এসব সমস্যা অনুভব করলে উদ্বিগ্ন না হয়ে শরীরকে বিশ্রাম দিন, স্বাভাবিক খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি খান, পূর্ব থেকে শরীরে কোনো সমস্যা থেকে থাকলে যেমন : ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, এসবে নিয়মিত যে মেডিসিনগুলো খেতেন, সেগুলো খান, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, কোনোভাবেই রোজা রাখবেন না এই মুহূর্তে, ভারী ব্যায়ামের চেয়ে হালকা হাঁটা চলা করে পেশীগুলো সচল রাখুন, দেখবেন – শরীর স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ।

আরেকটি জিনিস : সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলে অন্যদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ বাড়িয়ে দেবেন না । সুস্থ্য হয়ে ওঠার সময়টাতেও আপনি ভাইরাসটি ছড়াতে পারেন । সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন ।

সূত্র :

1. WHO
2. CDC
3. CMJ : Chinese Medical Journal
4. Shanghai Public Health Clinical Center
5. NHS
6. American Journal of Respiratory and Critical Care Medicine
7. EID : Emergence of Infectious Diseases Journal

ডা.অপূর্ব চৌধুরী:
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড । পেশায় চিকিৎসক, মননে লেখক । ৭ টি গ্রন্থের প্রকাশ । উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য এবং বৃত্ত ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা সমস্যা এবং চিকিৎসা

মুগ্ধতা.কম

৪ মে, ২০২০ , ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

কোভিড-১৯ এ কৈশোরকালীন করণীয়

করোনাকালে কৈশোরকালে যত্ন অতি প্রয়োজন। কারণ আমরা জানি কৈশোরকাল একটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই সময়টা আপনার সন্তান চঞ্চল হয়ে থাকে। ১০ থেকে ১৮ পর্যন্ত আমরা কৈশোরকাল বলি। এমন বয়সে সন্তানরা একটু স্বাধীন থাকতে পছন্দ করে। বিশেষ করে বয়:সন্ধিকালে। তাঁদের আচরণ পরিবর্তন হয়। গলার স্বর পরিবর্তন হতে থাকে। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসে।

একটি উদাহারণ দিই। ক্লাশ সেভেনে পড়ে ছেলে। মা  একদিন জানতে পারলো তার ছেলে নিয়মিত সিগারেট খায়। তার সাথে আরো বন্ধুরা।এ নিয়ে মায়ের হৈ চৈ। সন্তানকে মারপিট। সমাধান এভাবে করবেন না। এর জন্য এখন বেশী বেশী সময় দিন আপনি মা বাবা ওর আসল বন্ধু সন্তানকে বোঝান

নতুন কিছুর প্রতি আগ্রহ বেশীই থাকে।

এই বয়সটাই এমন।বর্তমান সময়ে অনেকের আছে মোবাইল। গেমে আসক্তি। সুযোগ পেলেই গেমে ডুবে যাচ্ছে। এতো গেলো আচরণের দিক বেশীরভাগ খেতে চায় না। খাওয়াতে অরুচি। কেউবা সারাক্ষণ বাইরে খেলতে পছন্দ করে। ঘুম কম।

কিশোরীদের বড় সমস্যা হয় তারা প্রিয়ড সময়টা মেনে নিতে পারেনা। এ সময়টা অবসন্ন থাকে।খাবারের রুচি থাকে না। শরীর দুর্বল হয়ে যায়।মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা এই বয়সে কারো উপদেশ বা শাসন একদম মেনে নিতে চায় না।

এই যে দীর্ঘ ছুটির সময় চলছে ওরা বাসায় হাঁপিয়ে গেছে কারণ এভাবে ওরা অভ্যস্ত নয়। অনেকের মধ্যে স্বাভাবিক আচরণ নাও থাকতে পারে। ভয় পাবার কিছু নেই।

ছুটির এই সময়টাতে আপনি বাবা মা আপনারা ওদের সময় দিন।

ঘরোয়া খেলাগুলো যে গুলো ওরা খেলবার সময় পায়নি এখন  ওদের নিয়ে বসে পরেন খেলতে লুডু,কেরাম, কিংবা ধরাধরি মানে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন করা উত্তর দেয়া। বাসায় গানের আসর করেন। যারা গান গায় বা শেখে তাঁদের রেয়াজের উৎসাহ দেন। টিভিতে ক্লাশ হচ্ছে ক্লাশ করতে বসিয়ে দেন এবং মনোযোগী হবার পরিবেশ তৈরী করে দেন। ধর্মানুযায়ী প্রার্থনা করতে উৎসাহ দেন। গল্পের ছলে খারাপ দিকগুলো প্রকাশ করুন।ভালো কাজের প্রসংশা করবেন।

পরিবারে টুকিটাকি কাজগুলো করতে শেখান। ছেলেমেয়ের কাজের ভেদাভেদ রাখবেন না। ছেলেকে এক আধটু চা বানানো কিংবা ডিম ভাজা করতে দিন ঘরটাও পরিস্কার করবে। মেয়েও কাপড় পরিস্কার রান্না শেখা সহযোগীতা করা, ফুলের টবে পানি দেয়া। ছেলেমেয়ে কাজের কোন ভেদাভেদ না রেখে বাসাটা জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করালেন ফার্নিচারের পরিস্কারের কাজটাও দিলেন। এও বলবেন ওয়াসরুমটাও পরিস্কার করতে পারে। সবটাই কমান্ড করে নয় আপনার হেল্প হবে এমনভাবে এবং কাজ শিখবে সেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

যারা একক পরিবারে বসবাস করেন অনেকদিন নানা দাদা মামা চাচা ফুফু খালা বা আরো আত্মিয় স্বজনদের সাথে অনেকদিন যোগাযোগ হয়নি সন্তানদের সাথে এখন সময় আছে সবার খোজ খবর নিলো সবার সাথে কথা বললো সুযোগ থাকলে ভিডিও কলে কথা বললো। এতে বন্ধনটা আরও সুদৃঢ় হলো আত্মিয় স্বজনদের সাথে।

কিশোর কিশোরীদের দুরন্ত এ বয়সে নানা রকম অনিয়মের কারণ হয়ে যায়। দেখা যায় অপুষ্টি, কাশি,রক্ত স্বল্পতা, নিউমোনিয়া, ঠাণ্ডাজ্বর, জন্ডিস, ডায়রিয়া, দূর্বল, মাথাব্যথা, জ্বর এগুলো ছাড়াও আরও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।যেহেতু এখন যতটা কম বাইরে যাওয়া যায় ততোই ভালো তাই প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

এই বয়সে ওরা বেশী অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হয়ে থাকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করবেন বাল্যবিয়ে বা কিশোরী মাতৃত্বের কুফল। এই বয়সে যেহেতু খেতে চায়না তাই বিভিন্ন ধরণের পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খেতে হয় বলবেন এবং দিবেন। এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা হাইজিন প্যাড ব্যবহারে উৎসাহিত করুন।বয়:সন্ধিকালিন পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক বোঝাবেন।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কোভিড ১৯ এ কৈশোরকালীন করণীয়

মুগ্ধতা.কম

২৮ এপ্রিল, ২০২০ , ৯:১৭ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা !

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি লেখক ও চিকিৎসক অপূর্ব চৌধুরী লিখেছেন মুগ্ধতা ডট কমে


একটি নতুন রোগ যখন শুরু হয়, চিকিৎসকেরা প্রথমে চেষ্টা করেন প্রচলিত জানা পদ্ধতিতে সারিয়ে তুলতে। যখন বুঝতে পারেন যে, বাঁচানোর যত ওষুধ কিংবা উপায় আছে, তা কাজ হচ্ছে না, নতুন নতুন ওষুধ বা উপায়ে বাঁচাতে চেষ্টা করেন। নতুন জাতের করোনা ভাইরাস SARS-CoV-2 তেমন একটি রোগ COVID-19 এর জন্ম দিলেন।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ! 16

শুরুর দিকে এই SARS-CoV-2 ভাইরাসকে বলা হতো Novel Coronavirus । এই Novel মানে নতুন। যদিও novel মানে উপন্যাস বুঝায়, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই novel মানে নতুন জীবাণু যার নাম এখনো দেয়া হয় নি। WHO ২০১৫ সালে শব্দটি নতুন জীবাণু নামকরণের গাইডলাইনে হিসাবে প্রকাশ করেন প্রথম । অনেকে তিনটি শব্দে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। ভুল শব্দ লিখে ! Novel, Noble, Nobel । শুধু Novel এর এক অর্থ উপন্যাস, আরেক অর্থ নতুন। Noble মানে অভিজাত, আর Nobel নেয়া হয়েছে নোবেল পুরস্কারের প্রণেতা Alfred Bernhard Nobel এর নাম থেকে নেয়া!

কোনো ইনফেকশন হলে চিকিৎসকদের হাতে থাকে জীবানুনাশক ওষুধ, অথবা পরবর্তীতে জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে ভ্যাকসিন, কিংবা দুটোর কোনোটাই না থাকলে – যার হয় নি – তাকে বাঁচাতে – আক্রান্ত থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেন। নতুন করোনা ভাইরাসটি দমনে চিকিৎসকদের হাতে কোনো জানা ওষুধ নেই, কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই শেষ ভরসা হিসাবে বলেন – সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ।

চিকিৎসকরা বসে নেই। রোগী বুঝে নতুন নতুন মেডিসিন এপ্লাই করছেন, পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন বানাতে নেমে পড়েছেন। কিন্তু ওই দুটো কাজ সময় সাপেক্ষ । বসে থাকলে ততদিনে আক্রান্ত বেশিরভাগ মরে যাবে। তাই নতুন পদ্ধতির খোঁজ শুরু করলেন চিকিৎসকরা।

করোনা আক্রান্ত বাঁচাতে এখনো পর্যন্ত ভ্যাকসিন এবং মেডিসিন, এই দুটোর পাশাপাশি সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ভাবা হচ্ছে Convalescent Plasma Therapy । সহজ করে ব্যাপারটি বলবো এখন।

Convalescent শব্দটি খুব একটা প্রচলিত না বলে হুট্ করে কানে লাগতে পারে। এর আরেকটি ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Recovery । মানে সেরে ওঠা বা অরোগ্য লাভ করা।

Convalescent Plasma Therapy হলো কোনো জীবাণু আক্রান্ত রোগী, যিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, সেরে ওঠার পর তার দেহ থেকে Plasma নামক রক্তের উপাদানটি নিয়ে সেই রোগে আক্রান্তের দেহে ঢুকিয়ে সুস্থ করে তোলা।

রক্তে দুটো জিনিস থাকে । অর্ধেক তার জল জাতীয়, অর্ধেক কোষ। এই জলের অংশটাকে বলে Plasma । Plasma দেখতে অরেঞ্জ জুসের মতো হলুদ হয় । রক্ত দেখতে লাল হয় RBC নামের কোষ অনেক বেশি থাকে বলে। আর প্লাজমা দেখতে হলুদ, কারণ হলো বিলিরুবিন নামের একটি প্রোটিন অনেক থাকে বলে । রক্তের এই জলের অংশটি বিজ্ঞানী Vesalius প্রথম ধারনা দেন চারশো বছর আগে।

প্লাজমা থেরাপি দিয়ে কী লাভ তাহলে ?

দেখা গেছে যে, করোনা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে – তার শরীরে ভাইরাসটি প্রতিরোধে যে এন্টিবডি তৈরি হয়, সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ২৮ দিন বা চার সপ্তাহ পর – তার শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে – সেই রক্ত থেকে প্লাসমা পৃথক করে – কোনো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর দেহে ঢুকিয়ে দিলে – তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন, কেউ কেউ বেঁচে যান, কারো উপসর্গগুলো কমে যায়। মেডিসিন কিংবা ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এই প্লাসমা থেরাপি হলো এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সফল চিকিৎসা পদ্ধতি । তবে এটার অনেক কমপ্লিকেশন আছে। এই জটিলতার কারণে সব রোগীকেই এটা যেমন দেয়া যায় না, তেমনি সব সুস্থ হয়ে ওঠা করোনা রোগীর দেহে সঠিক এন্টিবডিটি থাকে না। তাই এটি সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দিয়ে বিভিন্ন রোগীদের উপর এপ্লাই করা হচ্ছে। অনেক সুফল পাওয়া যাচ্ছে। রোগীও বেঁচে উঠছে।

মজার ব্যাপার হলো এই পদ্ধতিটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেবারে নতুন নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল ঠিক এই থেরাপি টির কারণে। ১৯০১ সালে জার্মান ডাক্তার Emil von Behring প্রথম নোবেল পুরস্কার পান এই যুগান্তকারী পদ্ধতিটি আবিষ্কারের কারণে। তখন বাচ্চারা অনেক বেশি ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হতো। যারা সুস্থ হয়ে উঠতো – তাদের শরীর থেকে এমন প্লাসমা নিয়ে অসুস্থ বাচ্চাদের সুস্থ করতেন তিনি। তার পদ্ধতিটির নাম ছিল Serum Therapy। রক্তের প্লাসমা থেকে fibrinogene নামের রক্তজমাটকারী একটি উপাদান কৃত্ৰিম ভাবে সরিয়ে নিলে যে প্লাজমা থাকে, সেটাকে বলে সিরাম।

এই সিরাম থেরাপি অনুসরণ করে পরবর্তীতে অনেক সমস্যাতেই প্লাজমা থেরাপি এপ্লাই করা হয়েছে। গত একশো বছরে ক্যান্সার থেকে আগুনে পোড়া রোগী, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত, প্রথম এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে আহত সৈনিকদের উপর, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সার্স, মার্স এবং ইবোলা রোগীর দেহে এই প্লাজমা থেরাপি দিয়ে সুফল পাওয়া গেছে। ১৯১৮ সালে ঘটে যাওয়া Spanish Flu প্যান্ডেমিক সময়ে HIN1 ভাইরাসে আক্রান্তের শরীরেও প্লাজমা থেরাপি দিয়ে অনেক রোগীকে বাঁচানো হয়েছিল। একশো বছর পর আরেকটি প্যান্ডেমিক থেকে বাঁচতে আবারো ঘুরে এসে দাঁড়িয়েছে সে। কেউ কেউ একে Convalescent Plasma Therapy এর পাশাপাশি – Plasma Antibody Therapy, অথবা Blood Plasma Therapy, এমনকি Plasma Transplant এমনসব বলে থাকে। অন্যভাবে বললে – একজনের Active Immunity দিয়ে অন্যজনের Passive immiunity হওয়াকে বলে Convalescent Plasma Therapy

কেমন করে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয় ?

রক্ত দেবার মতো করে আপনার শরীর থেকে রক্ত নেয়া হবে। সেই রক্ত সরাসরি ব্যাগে না ঢুকে আপনার শরীরের সাথে যুক্ত থাকা একটি মেশিনে ঢুকবে। সেই মেশিন Centrifuged বা ঘুরে ঘুরে সেই রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা করে ফেলবে, সেই প্লাজমা আরেকটি ব্যাগে জমা হবে, বাকি রক্ত আরেকটি সেলাইন জলের সাথে মিশে আপনার শরীরে ফিরে যাবে। পুরো এই কাজটি হতে দু ঘন্টার মতো সময় লাগে। নরমাল রক্ত দেয়ার সাথে সময়টি শুধু পার্থক্য। একবারে এমন সংগ্রহ করা প্লাসমা দিয়ে তিনজনের শরীরে ট্রিটমেন্ট করা যায় । রক্ত দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো, আপনি সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ২৮ দিন পর রক্ত দিতে পারবেন। ২৮ দিন করার কারণ হলো, সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ৩ সপ্তাহের আগে শক্তিশালী এবং অধিক পরিমান এন্টিবডি দেখা যায় না রক্তে।

চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের এই প্লাজমা সংগ্রহে করে দিতে সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট রেড ক্রস প্রায় ১৭০ টি দেশে কাজ করছে এখন। সাথে এক ডজনের বেশি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অনেকগুলো গ্ৰুপের মাঝে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছে। গত দুইমাসে প্রায় আধা ডজনের উপর Peer Review গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো থেকে। যদিও অনেক ডোনার পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তার ১০% মাত্র সঠিক মাত্রার এন্টিবডি সম্পন্ন প্লাসমা পাওয়া যাচ্ছে । ইংল্যান্ডে এতোদিন এটার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি চলছিল। গত সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে রক্ত সংগ্রহ এবং আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ। এটার উপর এতো গুরুপ্ত দেয়া হয়েছে যে, প্রতি সপ্তাহে মিনিমাম ১০ হাজার ইউনিট ব্লাড প্লাসমা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে ৫ হাজার করোনা আক্রান্তকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনের Tooting এ প্রথম একজন সুস্থ হয়ে ওঠার দেহে পাওয়া গিয়েছিলো সঠিক মাত্রার এন্টিবডি। তার রক্ত সংগ্রহ করে ট্রায়াল শুরু করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের চিকিৎসকদের মতে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হতে আরো দেড় দুই বছর সময়ের মধ্যে এই Convalescent Plasma Therapy সবচেয়ে সফল পদ্ধতি হয়ে উঠবে করোনা আক্রান্তদের বাঁচাতে। সমস্যাগুলো পাহাড়সম, কিন্তু চাহিদা সাগর। চায়না ইতালিকে সাহায্য করতে এই মাসে এ রকম চার টনের মতো সুস্থ হয়ে ওঠা করোনা আক্রান্তদের প্লাসমা পাঠিয়েছিল, কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেলো যে- তাদের অর্ধেক দুর্বল এন্টিবডি, অনেকগুলো অন্য ধরনের strains। ইতালিতে করোনা ভাইরাসটির C স্ট্রেইন ছড়িয়েছিলো, চীনে B স্ট্রেইন এবং আমেরিকাতে A স্ট্রেইন। ভাইরাসটির এক একটি স্ট্রেইন যে এন্টিবডি তৈরী করছে সেটি শুধুমাত্র সেই স্ট্রেইন আক্রান্ত করোনা আক্রান্তের দেহে কাজ করবে। এক দেশের লোকের রক্ত আরেকদেশে কাজ করবে না তেমন। চায়নার হেল্পও ইতালির তেমন কাজে লাগে নি।

এখন যারা যারা সেরে উঠছেন, বিভিন্ন দেশে তাদের রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাইক্রফটের chatbot ট্রেসিং এপ্সের পাশাপাশি আমেরিকান CDC র সাথে Plasmabot তৈরি করে সুস্থদের রক্ত সংগ্রহ, ট্রেসিনের কাজ করছে তারা। সাথে একটি প্লাজমা বিষয়ক ল্যাবের সাথে polyclonal hyperimmune globulin বা সংক্ষেপে H-Ig নামের একটি এন্টিবডি সরাসরি আক্রান্তের দেহে দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে কাজ করছে।

চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসার ভাষায় Convalescent Plasma Transfusion নাম ব্যাপারটি পরিচিত। সংক্ষেপে CP বলে । হেমাটোলজিস্ট এবং বায়োকেমিস্টদের কাছে classic adaptive immunotherapy নামে পরিচিত বিষয়টি। এখন এ নিয়ে যা বলবো, এই অংশটি চিকিৎসকদের কাজে লাগবে বেশি, সাধারণের একটু মাথার উপর দিয়ে যাবে। তারপরেও জানা থাকলে ভরসা পাবেন।

করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত থেকে সুস্থ হয়ে উঠলে রোগীর দেহে  neutralizing antibody থাকে। ডোনারের দেহে এই এন্টিবডির titre মাত্রার অনুপাত 1:640 এর উপরে থাকতে হবে। এই মাত্রার CP করোনা আক্রান্তের দেহে ট্রান্সফিউস্ড করার পর ডাক্তাররা যা দেখতে পেয়েছেন, সে সব ট্রায়ালের সারমর্ম তিনটি।

এক . এই মাত্রার CP আক্রান্তের দেহে তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া করছে না।

দুই . তিনদিনের ভিতর ক্লিনিক্যাল সিম্পটমসগুলো কমছে এবং ল্যাবরোটারী প্যারামিটারগুলো, বায়োকেমিক্যাল সূচকগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন : SaO2 বা অক্সিজেন স্যাচুরেশন বেড়ে যায়, Lymphocytopenia বা lymphocyte সংখ্যা বাড়ে, যা রোগীর পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুপ্তপূর্ণ ধরা হয়। C-reactive protein কমে যায়। সাথে alanine aminotransferase, aspartate aminotransferase কমে যায়।

তিন. সাত দিনের মাথায় এক্স রে করে দেখা গেছে ফুসফুসের ক্ষত অনেকাংশে শুকিয়ে গেছে। CT স্ক্যানে দেখা গেছে ফুসফুসের pulmonary parenchymal consolidation ছোট হয়ে গেছে।

চীন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স চিকিৎসকদল এই পদ্ধতিতে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকায় চিকিৎসকদল সহ আরো অনেক দেশই এখন Convalescent Plasma Therapy -কে এই মুহূর্তের সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা ভাবছে। সময় বলে দেবে পদ্ধতিটি কতজন আক্রান্তকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে তুলছে।

সূত্র :

1. PNAS : Proceedings of National Academy of Science
2. The Lancet
3. Nobel Prize Lists
4. NHSBT UK
5. Preprint Health Science : medRxiv
6. SMC: Scientific Media Center
7. NIH Clinical Trials

ডা. অপূর্ব চৌধুরী 
লন্ডন, ইংল্যান্ড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ! 17

মুগ্ধতা.কম

২৭ এপ্রিল, ২০২০ , ৬:০৯ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে কি ?

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি লেখক ও চিকিৎসক অপূর্ব চৌধুরী লিখেছেন মুগ্ধতা ডট কমে


শুক্রুবার, ২৪ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এক বিবৃতিতে বললেন,

“there is currently no evidence that people who have recovered from Covid-19 and have antibodies are protected from a second infection”.

“বর্তমানে কোভিড -১৯ থেকে সুস্থ্য হয়ে ওঠা এবং অ্যান্টিবডি রয়েছে এমন লোকেরা দ্বিতীয়বারসংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকার কোনও প্রমাণ নেই।”
১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো মানুষের দেহে করোনা ভাইরাস 229E পাওয়া গিয়েছিলো ।এটাকে বলে alpha coronavirus । গত ষাট বছরে আরো পাঁচটি করোনা ভাইরাস মানুষের দেহেপাওয়া গেছে । সর্বশেষ এই সাত নাম্বারটি হলো সবার মুখে মুখে থাকা বর্তমান করোনা ভাইরাস। যদিও করোনা ভাইরাস একটি জাত, তার সাতটি ধরন এবং সর্বশেষ টি হলো SARS-CoV-2 ।

করোনা ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে কি ? 18

এই জীবাণুতে আক্রান্ত হলে সে রোগের নাম COVID-19 । যদিও বেশিরভাগ মানুষ সহজেবলতে করোনা ভাইরাস বলে নতুন ভাইরাসটিকেও । এ জাতের সবগুলো ভাইরাস দেখতে মুকুটবা Crown এর মতো । ল্যাটিন Corona শব্দ থেকে ষোলো শতকে ইংরেজি Crown শব্দহয়েছিল । তাই পুরোনো ল্যাটিন নামে তাদের ডাকা হয় । যেকোনো জীবাণুর নাম ল্যাটিন থেকেনেয়া হয়, যাতে একনামে সব ভাষার লোক তাকে চিনতে পারে । যার যার ভাষায় নামকরণকরলে গোলমাল পাকিয়ে ফেলবে । ১৭৫৩ সালে সুইডেনের বিখ্যাত বিজ্ঞানী লিনিয়াস এইনামকরণ পদ্ধতি তৈরী করেন, যার নাম Binomial nomenclature, যা এখনো পর্যন্ত ব্যবহারকরা হয় । এইজন্যে মেডিক্যালের বিভিন্ন শব্দ খটমটে হয় ।

বলছিলাম করোনা ভাইরাসের ইমিনিটির কথা । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি দেখলেন যে, বিভিন্নদেশ লকডাউন শিথিল করতে বা ধীরে ধীরে উঠিয়ে দিতে একটি টেস্ট চালু করার চিন্তা করছে ।সেটি হলো, যারা একবার এই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে, তাদের শরীরে এন্টিবডি পেলে, তাদেরকে শঙ্কামুক্ত ঘোষণা করে – বাহিরে যাওয়া, ভ্রমণ করা, কাজে যাওয়া, এইগুলোর অনুমতিদেবে । এটাকে কেউ বলছে Immunity Passport । WHO এর ভাষায় risk-free certificate !

কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্যের সারমর্ম হলো : একবার করোনা আক্রান্ত হলে তাদের আরদ্বিতীয়বার হবে না, অথবা তাদের ভাইরাসটি প্রতিরোধের ক্ষমতা – যাকে Immunity বলে, সেimmunity তাদের আছে বলে আগে যা ভাবা হতো, অথবা এতদিন যা ধরে নেয়া হতো, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখেছে – সুস্থ্য হয়ে ওঠাদের একেক জনের একেক ধরনের immunity পাওয়া যাচ্ছে । তার মানে – তারা পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে, তাদের শরীরে পর্যাপ্ত এন্টিবডিনেই, অথবা যে এন্টিবডি আছে – সেটি ভাইরাসটি প্রতিরোধে দুর্বল ।

শরীর যখন করোনা ভাইরাস দ্বারা প্রথম আক্রান্ত হয়, তখন শরীর তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ভাইরাসটি মেরে ফেলতে চেষ্টা করে । এই চেষ্টাকে মেডিক্যালের ভাষায় বলে non-specific response । চেষ্টাটি প্রথম এক সপ্তাহ পর্যন্ত ঘটে । তখন হালকা গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বললাগতে থাকে । এই চেষ্টায় শরীরের WBC এর neutrophil নামের একটি রক্তকোষ, সাথেmacrophage এবং dendritic cell নামের কিছু কোষ এগিয়ে এসে ভাইরাসটি মারতে থাকে ।বয়স এবং স্বাস্থ্য ভেদে এই সামর্থ একেকজনের একেক রকম । যাদের দুর্বল, তারা ভাইরাসটিরকাছে হেরে যায় । তখন শরীরের আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা মাঠে নামে । এটাকেমেডিকেলের ভাষায় বলে adaptive response । এই চেষ্টায় শরীরের Thymus নামের একটাগ্ল্যান্ড থেকে T কোষ তৈরী হয় । এই কোষটি ভাইরাসকে মারতে চেষ্টা করে । একদিকে সেভাইরাসটিকে মারে, আরেকদিকে Bone কে খবর পাঠিয়ে সেখান থেকে B কোষ বের করে । সেইB কোষ এক ধরনের Y শেইপের প্রোটিন তৈরী করে । এই প্রোটিনকে বলে immunoglobulins ।সংক্ষেপে লিখে Ig । Y শেইপের এই এন্টিবডি প্রোটিনের ভেতর ১৩০ ধরনের অ্যামিনোঅ্যাসিড থাকে । এই অ্যামিনো অ্যাসিড গুলো Y শেইপের দুই বাহু দিয়ে ভাইরাসটির গায়ে বসে থেকে ভাইরাসটির কোনো কোষে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখে । পরবর্তীতে কখনো শরীরেআরেকবার একই জাতীয় ভাইরাস ঢুকলে এই এন্টিবডি একদিকে T কোষকে খবর পাঠায়ভাইরাস মারতে, আরেকদিকে B কোষকে বলে আরো এন্টিবডি তৈরী করতে । তখন আরভাইরাসটি টিকতে পারে না । দৌড়ে পালায় । তখন দুর্বল হোক-সবল হোক, শরীরের প্রথমদিকের non-specific response -এরও তেমন দরকার পড়ে না । এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে মেডিক্যালের ভাষায় বলে Cellular immunity ।

WHO এর পরীক্ষায় দেখা গেছে, কারো শরীরে এই Cellular immunity বেশ দুর্বল । অথচতারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিল, অসুস্থ হয়েছিল, হসপিটালে ভর্তিও হতে হয়েছিল, টেস্টওপসিটিভ এসেছিলো, বাসায় ফেরার আগে টেস্ট নেগেটিভও এলো, সবকিছু হওয়ার পরেও তাদেরশরীরে যে মাত্রার এন্টিবডি থাকলে পরবর্তীতে আবার ভাইরাসটি আক্রমণ করলে T কোষকেসিগন্যাল পাঠাতে পারে না অথবা B কোষকে পর্যাপ্ত আরো এন্টিবডি তৈরী করতে উদ্দীপ্তকরতে পারে না । এই দুর্বল সমীকরণ বিজ্ঞানীদের ভাবনায় ফেলেছে । এই জটিলতার আরোকিছু গভীর জটিলতা আছে, এখন সেটা বলছি ।

COVID-19 এর এন্টিবডি শরীরে আছে কিনা, এটা জানলে – দুটো জিনিস জানা যায় ।

এক. তিনি আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা ?

দুই. আক্রান্ত হলে তার শরীরে পরবর্তী আক্রান্ত হওয়া ঠেকাতে এন্টিবডি কতটুকু শক্তিশালী ?

ল্যাবে কোভিড-১৯ এর এন্টিবডি পরীক্ষা করার টেস্ট -এর নাম : serological enzyme-linked immunosorbent assay সংক্ষেপে বলে ELISA । সাধারণের ভাষায় সহজ করে বলে rapid immunodiagnostic test । Eva Engvall এবং Peter Perlman নামের দুজন সুইডিশ বিজ্ঞানীএন্টিবডি টেস্টের এই পদ্ধতিটি ১৯৭১ সালে আবিষ্কার করেন ।

এন্টিবডি টেস্ট রেসাল্ট এনালাইসিস করতে গেলে বিশ্ব জুড়েই দুটো সহজ ভুল হয় ডাক্তারদের।

এক. কেউ আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু এন্টিবডি নেই, তখন তাকে বলতে পারে নেগেটিভ বা ভুলকরে তাকে বলা হয় – আপনি কোরোনায় আক্রান্ত হন নি ।

দুই. আবার কারো শরীরে এন্টিবডি পেয়েছে, অথচ আসলে সে কোরোনায় আক্রান্ত হয় নি, কিন্তুতাকে পসিটিভ বলা হলো বা বলা হলো যে – আপনার শরীরে ভাইরাসটি ঢুকেছিলো ।

এটি কি করে সম্ভব ? নিশ্চয়ই অবাক লাগছে ! বলছি সেটি সহজ করে এবার ।

বলেছিলাম শুরুতে কোভিড ১৯ ছাড়াও আরো ছয় ধরনের করোনা ভাইরাস আছে । আমাদেরশরীরে প্রতিবছর যে ঠাণ্ডা, জ্বর, ফ্লু, সর্দি কাশি, এসব হয়, তার পিছনে অনেক ভাইরাসের সাথেবাকি চারটি করোনা ভাইরাস দায়ী । এরা হলো : 229E, NL63, OC43, HKU1 । সাথে বাকিদুটো ২০০৩ সালে এবং ২০১২ সালে হওয়ায় SARS এবং MERS । এই ছয়টি করোনাভাইরাসের কোনো একটিতেও এই সময়ে আক্রান্ত হলে, তার শরীরে যে এন্টিবডি তৈরী হবে, তাকোভিড ১৯ এর তৈরী করা এন্টিবডির সাথে ক্রস রিয়েক্ট করে False Result দিতে পারে ।বছরের এই সময়ে চারটি প্রধান করোনা ভাইরাসগুলোতে আক্রান্ত হওয়া খুব স্বাভাবিক ।

সুতরাং, একবার করোনা ভাইরাস-১৯ এ আক্রান্ত হলে আবার দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবেন কিনা, এখনো পর্যন্ত পরীক্ষায় এটা প্রমাণিত যে, এই ভাইরাসের এন্টিবডি একেকজনের একেকধরনেরএবং অন্য ভাইরাস গুলোর সাথে ক্রিয়ার কারণে পাওয়া ফলাফলে ভুল সিদ্ধান্ত হওয়ারসম্ভাবনা আছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো পর্যন্ত এন্টিবডি টেস্টকে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ারসার্টিফিকেট হিসাবে পর্যাপ্ত মনে করে না ।

সূত্র :

1. WHO
2. Nature
3. Journal of Medical Virology
4. Lancet, March, 2020
5. Science, 2020
6. Journal of Infection

 

ডা. অপূর্ব চৌধুরী

লন্ডন, ইংল্যান্ড

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে কি

মুগ্ধতা.কম

১৪ এপ্রিল, ২০২০ , ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাস: নববর্ষে কিছু আশার কথা 

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। সবাইকে শুভ নববর্ষ। একটা দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখছি, দুঃখিত। স্ট্যাটাস দীর্ঘ হওয়া ও আপনাদের সেটি পড়া- দুটোকেই প্রয়োজনীয় মনে করছি!

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিক থেকে চীন, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু দেশ, মার্চের শুরু থেকে আমেরিকাসহ পুরো পৃথিবী এক বিভিষীকাময় সময় পার করছে। আজ এপ্রিলের ১৪ তারিখে পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষের চিন্তা একটাই- কোভিড-১৯ মহামারী কবে বিদায় নিবে?

এ সংক্রান্ত এক ভিডিও ডকুমেন্টারি ” করোনার ভবিষ্যৎ” এ আমরা ভবিষ্যতের একটা অনুমানভিত্তিক ছবি দিয়েছিলাম। আজকে বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনে আমি আপনাদের কিছু সুখবরের কথা বলতে চাই যেটি হবে এক পূর্নাঙ্গ ছবির মতো!

“মে মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে (বাংলাদেশ সহ) করোনা আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কমে আসবে। বিভিন্ন দেশে লকডাউন আগামী এক/দুই সপ্তাহের মাঝেই খুলে দেওয়া শুরু করতে পারে যা শেষ হতে মে মাসের শেষ সপ্তাহ লেগে যাবে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ/জুনের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ ইউরোপ, আমেরিকা ও  বাংলাদেশের জীবনযাত্রা পরিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক হওয়ার জোর সম্ভাবনা। জুনের প্রথম সপ্তাহের বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝে বাজারে কিছু ওষুধ যেমন এভিগ্যান (ফ্যাভিল্যাভির),  প্লাজমা (থেরাপি) ও রেমডিজিভির চলে আসার সম্ভাবনাও প্রবল। ফলে, এরপর করোনা আবারো যখন সেপ্টেম্বরে বা ডিসেম্বরে আঘাত হানবে বলে অনেকের আশংকা; তখন সেটি আর আমাদের কাবু করতে পারবে না আমাদের কাছে ওষুধ থাকার কারণে। পরবর্তীতে ডিসেম্বর (২০২০) আসতে আসতে টীকাও বাজারে চলে আসার সম্ভাবনা আছে। যেটি করোনার বিরুদ্ধে মানুষের ভবিষ্যতের যুদ্ধে আর একটি মাত্রা যুক্ত করবে।”

আমি কিভাবে এই সময়সীমা সম্মন্ধে জানলাম বা নিশ্চিত হলাম?

কিভাবে জানলাম সেটা বলার আগে বলি, ভবিষ্যৎ আমরা কেউই জানিনা এবং ভবিষ্যৎ ভয়ানক ‘অনিশ্চিত’ যেখানে ‘জানিনা’ সবচেয়ে ‘নিশ্চিত’ উত্তর। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলেই, কেউই এই সম্মন্ধে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চায় না। কারণ ভবিষ্যত বলার জন্য যে বিষয়গুলো জানতে হয় সেগুলোর অনেকগুলোই আমরা (মানবজাতি) জানি না।

তবে, এই অনিশ্চয়তা নতুন কিছু না। এই অনিশ্চয়তার সাথে মানুষের সংসার হাজার বছরের পুরনো। তারপরও,  হাজার বছর ধরেই মানুষকে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় ভবিষ্যৎ  ধরে নিয়েই; কিছুটা আন্দাজের ( ইনকমপ্লিট ইনফরমেশন) উপরই। প্রশ্ন হলো, আমি কিভাবে এসব সময়সীমাগুলো ধরে নিলাম বা আন্দাজ করলাম?

বিজ্ঞানী ও পলিসি মেকাররা স্বাভাবিকভাবেই এই মূহুর্তে বচনে বেশ সতর্ক, তাই নিশ্চিত করে কিছুই তারা বলতে চান না। কিন্তু বাতাসে অনেক ফিসফাস আছে। আমার এই সময়সীমার ভিত্তি বিজ্ঞানী ও নীতি নির্ধারকদের এসব ফিসফাস! তিনটি ফিসফাসের কথা উল্লেখ করছিঃ

প্রথম ফিসফাসঃ

আমার প্রথম বক্তব্য ” মে মাসের প্রথম/দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকহারে কমে যাবে” এর উৎস ডা. ফাউচিসহ  বিখ্যাত বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও বাস্তবতার ( গত ৫/৭ দিনের ডাটা)  সাথে এসব বক্তব্য মিলে যাওয়া!

উদাহরণ,  ডা. ফাউচি ও ডা.  ডেবোরা ব্রিক্স গত প্রায় পাঁচ দিন ধরে বলছেন,” মহামারী আমরা যেসব পাল্লা (প্যারামিটার)  দিয়ে মাপি সেগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কোভিড-১৯ মহামারী চূড়ায় পৌঁছেছে এবং রেখাচিত্র নামা শুরু করেছে।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রেখাচিত্র যদি গত ৩/৪/৫ দিনে দেখেন দেখবেন তাদের এই বক্তব্য সঠিক। অর্থাৎ বেশিরভাগ দেশ ও রাজ্যের মহামারীর রেখাচিত্র চূড়ায় পৌঁছেছে এবং এখন সেটির নামবার পালা। চূড়ায় পৌঁছানোর অর্থ হলো সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়ে গিয়েছে এবং এখন ক্ষতি কমে আসবে ধীরে ধীরে। উল্লেখ্য, ডা. ফাউচি ও ডা. ব্রিক্স আমেরিকার করোনা যুদ্ধে টেকনিক্যাল অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশেও আগামী দুই সপ্তাহের মাঝেই এটি চূড়ায় উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রায় একই সময়ে এটি বাংলাদেশে উঠতে শুরু করেছিলো। তবে বাংলাদেশে আমরা ব্যবস্থা একটু দেরিতে নিয়েছি। সেই হিসেবে এক/ দুই সপ্তাহ দেরি হওয়ার সম্ভাবনা।

কিন্তু  মাত্র তো ৩/৪/৫ দিনের ডাটা। এত কম সময়ে ডাটা থেকে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? না,  যায়না। যায়না বলেই, দ্বিতীয় ফিসফাসের দিকে একটু তাকানো দরকার।

দ্বিতীয় ফিসফাসঃ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নরেরা কিছু কিছু রাজ্যে ( যেমন ওয়াশিংটন) লকডাউন (সেই অর্থে নাই যদিও) বা স্টে হোম অর্ডার তুলে দেওয়ার ব্যাপারে গত দুই দিন ধরে পরিকল্পনা  করেছেন যেটি আগামী ১/২/৩ সপ্তাহের মাঝে বাস্তবায়ন শুরু হবে। ফলে, এদের পরিমাপ মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই করোনা পরিস্থিত সমাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। না দেখলে অন্তত পরিকল্পনা শুরু হতো না। ইউরোপের দেশগুলোও আস্তে আস্তে একই ধরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এসব পরিকল্পনা বলছে, মহামারী মাপার পাল্লাগুলো কোভিড-১৯ এর চলে যাওয়ার ইংগিত দিচ্ছে। এবং সেখান থেকেই আমার ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম অংশের উৎপত্তি।

তৃতীয় ফিসফাসঃ

ওষুধ হিসেবে এভিগ্যানের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সাফল্যের খবর আপনারা জানেন। ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারে ছাড়ার প্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে আনার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মাথাগুলো সর্বোচ্চ রিসোর্স নিয়ে কাজ করছে। যার ফলাফল আমরা ইতোমধ্যেই এভিগ্যানসহ অন্যান্য ওষুধে দেখতে পাচ্ছি। ইতোমধ্যেই অনেক সংবাদপত্রে (স্ট্যাটনিউজ) করোনার ওষুধ আসার ব্যাপারে ৩-৯ মাস লাগার কথা বলেছিলো। সেটি প্রায় তিন সপ্তাহ আগের কথা।

আমার ধারণা, এই সময়টা আরো এগিয়ে আসবে। এমনকি ৩ মাসকেও ধরে নিলে ওষুধ জুনের শেষের দিকে বাজারে আসার সম্ভাবনা প্রবল।

টীকা বা ভ্যাকসিনের ব্যাপারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিনোলজির প্রফেসর সারাহ গিলবার্ট ও বায়োটেক কোম্পানি মডের্নার প্রধান নির্বাহীর আশাবাদকে আমি সম্মান করেছি। সারাহ গিলবার্ট ৮০% নিশ্চিত,  “আগামী ৬ মাসে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসা যাবে”  আর মডের্নার প্রধান নির্বাহীর দাবি এ বছরের (২০২০)  সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িতদের জন্য ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসা যাবে। উল্লেখ্য, মডের্না আমেরিকার একটি বায়োটেক কোম্পানি যেটি এই মূহুর্তে করোনার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসার নেতৃত্ব দিচ্ছে।

উপরের এসব তথ্যই নববর্ষের দিনে আমার আপনাদের সামনে আশাবাদ নিয়ে হাজির হওয়ার মূল কারণ। এগুলোই যে হবে সেটা নিয়ে শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত আমি বা কারোরই হওয়ার সুযোগ নাই। তবে, সম্ভাবনা প্রবল।

এবার আসুন দেখি বাংলাদেশ সরকার লকডাউন তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা ঠিক কবে?

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিৎ তিনটি-

১. তথ্য-উপাত্ত-বিশ্লেষণ (ডাটা)

২. বিজ্ঞান (সায়েন্স)

৩. সত্য ( ফ্যাক্ট)

এটা আমার কথা না, ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের গভর্নর গ্যাভিন নিওসম তার রাজ্যে ” স্টে হোম অর্ডার” কবে  তুলে দিবেন সেই প্রশ্নের উত্তরে এই তিন উপাদানের কথা বলেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিদিন এই বিষয়ে ব্রিফ করছেন। দেশের লিডিং এক্সপার্ট ( ডাক্তার, সায়েন্টিস্ট ও ইকোনমিস্ট)  ও আন্তর্জাতিক কনসাল্টিং এজেন্সীর ( বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) নেতৃবৃন্দের সাথে বসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে, তথ্য- উপাত্ত, বিজ্ঞান এবং সত্য। আমার ধারণা, অন্যান্য দেশগুলোর সাথে মে মাসের প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয় সপ্তাহে সেটি বাংলাদেশেও হতে পারে।

সবাই ভালো থাকবেন ও এতদিন ভাইরাসের বিস্তার বন্ধে যা যা করেছেন সেগুলো চালিয়ে যাবেন। যে ধৈর্য্য এতদিন ধারণ করেছেন, আরো তিন/চার সপ্তাহ সেটি ধারণ করবেন আশা করি। করোনা চলে যাওয়ার পিছনে পুরো সাফল্যটুকুই মানুষের গৃহীত ব্যবস্থাগুলোর।  এর সাথে কিছুটা আমাদের আবহাওয়ার। আশা করছি,  আর ২ মাসের মাঝেই পৃথিবী আবারো পূর্বের মতো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে, ইনশাল্লা!
ফিংগারস ক্রসড (ফার্মলি)…

 

সোহেল রানা

সহকারী সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

এবং

গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিসটেন্ট, ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা ভাইরাস নববর্ষে কিছু আশার কথা