ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ , ১১:৪২ অপরাহ্ণ

জনগণের স্বাস্থ্য দেখার দায়িত্ব কার?

স্বাস্থ্য বলতে আমরা সাধারণ জনগণ বুঝি মোটাসোটা, ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারাকে। বাস্তবে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্য হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা, কেবল রোগ বা দূর্বলতার অনুপস্থিতি নয়। এখানে শুধু শারীরিক সুস্থতার কথা বলা হয়নি।বলা হয়েছে মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতারও কথা। শারিরীক সুস্থতার যখন ঘাটতি ঘটে তখন আমরা স্মরণাপন্ন হই চিকিৎসকের।

চিকিৎসক বা ডাক্তার তারাই যার সরকারি নিবন্ধন আছে এমন সরকারি বা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাঁচ বছর অথবা চার বছর পড়াশুনা করে এমবিবিএস /বিডিএস ডিগ্রি লাভ করে। এর বাইরে যারা, তারা কখনই নামের সামনে ডা.শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পল্লী চিকিৎসক, এলএমএফ, আরএমপি, ডিএমএফ,হোমিও ইত্যাদি এবিসিডি অনেক অনেক পদবীর মানুষ যাদের কারোই রোগী দেখার আইনগত অনুমোদন এবং যোগ্যতা নেই তারা নামের সামনে ডা.পদবী বসিয়ে চুটিয়ে প্রতারণা করছে।

প্রতারণা কোন অর্থে, কারণ তারা মানবদেহ সম্বন্ধে কিছুই না জেনে তিন থেকে ছয়মাসের ট্রেনিং করে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষকে। একথা সবসময় বলা হয় গ্রামে ডাক্তার পাওয়া যায় না,এরাই ভরসা। আসলে এসব কথা আগে প্রযোজ্য হলেও বর্তমানে এসব কথার কোনই গুরুত্ব নাই। এখন প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, যেখানে ডাক্তার, মেডিকেল এ্যাসিষ্টেন্ট কর্মরত। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ, মেডিকেল অফিসার, নার্স পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মরত। যারা ২৪ ঘন্টা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে রোস্টার ডিউটি মতো। এসব সত্ত্বেও অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে ওষুধের দোকান যেখানে দোকানদার ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। এসব ওষুধের দোকানদার নিজেদের নামের আগে ডাক্তার উপাধি বসিয়ে সামান্য সর্দি কাশিতেও নির্বিচারে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে। আমরা জানি সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরে কোনই এন্টিবায়োটিক লাগে না সেখানে পল্লি চিকিৎসক, ওষুধের দোকানদার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে কোনই সংকোচ ছাড়া কারন তার কাজ ওষধ বিক্রি করা। জ্বর আসলেই তারা দুইটি সিফিক্সিম অথবা এজিথ্রোমাইসিন দিয়ে দেয় কিন্তু খাওয়ার কথা সিফিক্সিম ন্যুনতম পাঁচদিনে দশটা আর এজিথ্রোমাইসিন তিনটা। কোর্স কমপ্লিট না করার কারণে জীবানুগুলো ড্রাগ রেজিস্টান্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন দেখা যায়  টাইফয়েড জ্বরে অনেক ওষুধ কাজ করে না, যা কয়েকবছর আগেও কাজ করতো। এ পরিস্থিতিতে ওষধ প্রশাসনের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহন করার কথা থাকলেও তারা নিস্ক্রিয়।

লোক দেখানো বছরে একবার দুবার অভিযান চালালেও বেশীরভাগ সময় তারা বসে সময় কাটায়। আরো করুণ অবস্থা গ্রামে সেখানে সাধারণ বিস্কুট, চায়ের দোকানেও বিক্রি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।  মুড়ি মুড়কির মতো মানুষ সেবন করছে গ্যাসের,কাশের আর ঘুমের ওষুধ। দেশ ওষুধ শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেললেও মানহীন অসংখ্য ওষুধের কারখানা গড়ে উঠেছে। সেসব কারখানায় ওষুধের বদলে দেয়া হয় আটা, যা দিয়ে বানানো হয় ট্যাবলেট। এমনকি খোদ ঢাকার বিএমএ ভবন ওষুধ মার্কেটে বিভিন্ন নামীদামী কম্পানীর মোড়কের আড়ালে বিক্রি হচ্ছে নকল ওষুধ। সেই ওষুধ চলে যাচ্ছে সারাদেশের গ্রামের হাটের ওষুধের দোকানে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি চলছে যত্রতত্র। OTC(over the counter drug) সাধারণত সেসব ওষুধ ক্রয় করতে কোনও প্রেসক্রিপশন লাগে না। এসব ওষুধের মধ্যে আছে প্যারাসিটামল,গ্যাসের ওষুধ, ভিটামিন ইত্যাদি।

এন্টিবায়োটিক ক্রয় করতে প্রেসক্রিপশন লাগলেও বাস্তবে এন্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে মুড়িমুড়কির মতো। না বুঝেই ওষুধের দোকানদার দিচ্ছে এন্টিবায়োটিক সাধারণ জ্বর, কাশি আর ডায়রিয়াতে অথচ এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক দেবার কোনও দরকারই ছিলো না। শুধুমাত্র প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর,কাশিতে মধু, লাল চা আর ডায়রিয়াতে ওরস্যালাইন ব্যবহার করে এসব রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব। আর এক শ্রেণির ওষুধ ব্যবসায়ী গড়ে উঠেছে যারা নিজেদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে দাবী করলেও তারা এলোপ্যাথিক ওষুধ হিসেবে তৃতীয় প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে আর এদের এসব ব্যবহারে উৎসাহী আর সাহসী করে তোলে ওষুধ কম্পানীর প্রতিনিধিরা। উচ্চ শিক্ষিত এসব ওষুধ কম্পানীর প্রতিনিধিরা তাদের ওষুধ বিক্রির জন্য মরিয়া হয়ে ছুটে বেড়ায় গ্রাম,শহরের অলিতে-গলিতে।

স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় আয়ের ছয় ভাগ বরাদ্দ হওয়া উচিত ধরা হয়। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ব্যয় শতকরা এক ভাগেরও কম। এবার বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা আর বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়ায় গিয়ে চিকিৎসা বাবদ বছরে ব্যয় ৩২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে মরার উপর খড়ার ঘায়ের মতো পরেছে ওষুধের বাজারের উত্তাপ। বেড়েছে ৫৩টি ওষুধের দাম। আরও বেশ কিছু বাড়ানোর প্রস্তাব জমা পড়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি,আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিকে দাম বাড়ার কারন বলছে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে দেশে জেনেরিক আছে ১৬৫০ টি। সরকার নিয়ন্ত্রণ করে ১১৭টি। এই ওষুধের ভিতর ৫৩টি ওষুধের দাম পুননির্ধারণ করা হয়েছে। পাইপলাইনে আছে আরও ওষুধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে,বর্তমানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৬৮.৫০%। এরমধ্যে ৬৪% ব্যয় হয় ওষুধে।

খাবারের দাম বাড়লে জনগন কম খেয়ে পুষিয়ে নিতে পারলেও ওষুধ ছাড়া বেঁচে থাকাই সম্ভব না। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে রোগীর কাছে ওষুধ সেবার উপাদান হলেও ব্যবসায়ীদের কাছে এটা একটা পণ্য। এ থেকে মুক্তির পথ বাতলেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর মতে দেশে প্রয়োজন স্বাস্থ্যবীমা এবং ১৯৮২সালের ওষুধ নীতিতে ফেরত যাওয়া। সব কিছু ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনও সভ্য দেশের নীতি হতে পারে না।

মুগ্ধতা.কম

১৪ জুলাই, ২০২০ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে করোনা যুদ্ধে শহিদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গত ১২ জুলাই রোববার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত আবুল কাশেম রংপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীন কেল্লাবন্দ সর্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। করোনাভাইরাস ছাড়াও তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

১২ জুলাই রোববার রাত বারোটার দিকে পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন রংপুরের দাফনসেবা টিমের স্বেচ্ছাসেবীরা। দাফনের আগে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

দেশে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। এপ্রিল মাসের শুরুতে করোনায় মৃতদের ব্যাপারে সাধারণের মনে যখন এক ধরণের নেতিবাচকতা কাজ করছিল, তখন করোনায় মৃতকে যথাযোগ্য ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে এগিয়ে আসে কোয়ান্টাম।

দেশব্যাপী এ পর্যন্ত সহস্রাধিক করোনা ও করোনা সন্দেহে মৃতকে সম্মানজনক শেষ বিদায় জানিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। নারীদের জন্যে এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের জন্যেও কোয়ান্টাম দাফনসেবার আলাদা আলাদা টিম রয়েছে।

রংপুরে এ পর্যন্ত ১৪ জন করোনা শহিদকে পরম মমতায় শেষ বিদায় জানায় রংপুরের দাফনসেবার স্বেচ্ছাসেবীরা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এ সেবায় গিয়ে এসেছেন তারা।

ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের এ দাফনসেবা কার্যক্রম পুরোটাই পরিচালিত হয় সদস্যদের অর্থায়নে ও শ্রমে। তারা জানা, রংপুরে দাফনসেবার প্রয়োজনে মো. রাকিব উদ্দিন আল-মামুন, সিনিয়র প্রো-অর্গানিয়ার, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মোবাইলঃ ০১৭১৭৭১৪৭৬৬- এর সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। 

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

সিরাজুম মনিরা

২ জুলাই, ২০২০ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একটি বৈশ্বিক দূর্যোগ। আর যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা সংকটে বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই বয়সের ব্যক্তিদের জন্য ডিমেনশিয়া একটি কঠিন মস্তিষ্কের রোগ।

বিশ্বব্যাপী ৫০ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। সমগ্র পৃথিবীতে বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য ডিমেনশিয়া একটি মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। ডিমেনশিয়া এবং কোভিড-১৯ মহামারি উভয়ে একত্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য ও উপাত্ত জানার সুযোগ বেশ সীমিত। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে তাদের জন্য কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সুরক্ষা পদ্ধতি যেমন – বারবার হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা ইত্যাদি মনে রাখা বেশ কঠিন। এছাড়া তাদের কগনেটিভ সমস্যা থাকায় প্রচারিত জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য বোঝা ও বেশ কঠিন। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমে অবহেলা এবং কোয়ারেনটাইনের অপর্যাপ্ত ব্যাবস্থা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সংক্রমনের ঝুঁকি বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তুলতে পারে।


কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধে সরকার লকডাউন, কোয়ারেনটাইন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে। আমাদের দেশে বয়স্ক ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রধানত তাদের পরিবারের সাথেই বাস করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করতে হচ্ছে এবং আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এমনকি বাহিরে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রযুক্তি ব্যবহার সম্পর্কে পারদর্শিতা না থাকায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ নেই বললেই চলে। এর ফলে তারা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখছে এবং নিজেদের পরিত্যাক্ত ভাবছে। এসকল বিষয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে করোনা সংক্রমণের ভয় এবং অন্যদিকে লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন ঘরে অবস্থান করা নিয়ে উদ্বেগ ও বিষন্নতা, একই সাথে দুটি বিষয় নিয়ে বেশ চাপ অনুভব করছে। এছাড়া করোনায় কাছের মানুষের মৃত্যু তাদের মানসিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। একইসাথে পরিবারের সদস্যবৃন্দ যারা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক যত্ন করে তাদের মাঝেও উদ্বেগ ও বিষন্নতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গেছে। এছাড়াও সার্বক্ষণিক যত্ন ও সেবা করার কাজে নিয়োজিত থাকার ফলে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ও বার্ন আউটের শিকার হচ্ছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি জটিল ও কঠিন রোগ থাকে যার জন্য তাদের প্রায়শই হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিকট যেতে হয়। কিন্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি বাড়তি চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সেবার সুযোগ সুবিধা নেই পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও অধিক। এসকল বিষয় ও পরিবারের জন্য বেশ উদ্বেগের কারণ।

বর্তমান বৈশ্বিক মহামারিতে বিশেষজ্ঞগণ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তার উপর জোর দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কাউন্সেলিং সেবার উপরও গুরুত্বারোপ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে এতে কোভিড-১৯ এবং ডিমেনশিয়া উভয়ের জটিল প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। আলঝাইমার ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল নামক সংস্থাটি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য অতি দ্রুততার সাথে নানাবিধ সহায়তা প্রদানেরউপর জোর দিয়েছে। এই সংস্থাটির মতে ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী পেশাজীবি, সমাজকর্মী এবং নানাবিধ সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে যৌথভাবে একত্রে কাজ করা প্রয়োজন।

করণীয়:

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের নিজেদের মানসিকভাবে ভালো থাকা ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতার জন্য নিম্ন লিখিত কাজগুলো চর্চা করতে পারে –

» ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্বলিত তথ্যসমূহ ছবিসহকারে সহজ ভাষায় লিফলেট তৈরি করে বাসার কিছু নিদির্ষ্ট জায়গায় লাগিয়ে রাখা। এতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিধি ভুলেগেলেও লিফলেট দেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ হবে।

» গৃহ পরিমণ্ডলে করা সম্ভব এমন কিছু বিনোদনমূলক কাজ বাসার সকলে মিলে আয়োজন করা। এতে লকডাউনের কারনে দীর্ঘদিন বাসায় অবস্থান করার ফলে সৃষ্ট একঘেয়েমি দূর করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে এবং পরিবারের সকলের সাথে ভালো সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

» আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষজনের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যাবস্থা করে দেয়া।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে বাসার ভিতরে কিছু আনন্দদায়ক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি তাদের বিষন্নতা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।

» চাপ কমানোর উপায় হিসেবে শিথিলায়ন চর্চা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার কেয়ারগিভারের জন্য একটি বেশ ফলপ্রসূ উপায়।

» করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য সহজ ভাষায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে জানানো।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির আচরনগত ও আবেগীয় সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনে চিকিৎসামনোবিজ্ঞানী ও মনরোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা।

» পরিবারের একজন ব্যক্তিই সার্বক্ষণিকভাবে দেখাশোনা করার দায়িত্ব না নিয়ে অন্যান্য সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করা । এতে কেয়ারগিভারের বার্ন আউটের সম্ভাবনা ও চাপ কমবে।

সর্বোপরি বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ চাহিদা ও যত্ন সম্পর্কে পরিবার ও সকলের মাঝে সচেতনতা অতীব জরুরী।

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন