কোভিড-১৯

কোভিড-১৯

মুগ্ধতা.কম

১৪ জুলাই, ২০২০ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে করোনা যুদ্ধে শহিদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গত ১২ জুলাই রোববার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত আবুল কাশেম রংপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীন কেল্লাবন্দ সর্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। করোনাভাইরাস ছাড়াও তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

১২ জুলাই রোববার রাত বারোটার দিকে পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন রংপুরের দাফনসেবা টিমের স্বেচ্ছাসেবীরা। দাফনের আগে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

দেশে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। এপ্রিল মাসের শুরুতে করোনায় মৃতদের ব্যাপারে সাধারণের মনে যখন এক ধরণের নেতিবাচকতা কাজ করছিল, তখন করোনায় মৃতকে যথাযোগ্য ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে এগিয়ে আসে কোয়ান্টাম।

দেশব্যাপী এ পর্যন্ত সহস্রাধিক করোনা ও করোনা সন্দেহে মৃতকে সম্মানজনক শেষ বিদায় জানিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। নারীদের জন্যে এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের জন্যেও কোয়ান্টাম দাফনসেবার আলাদা আলাদা টিম রয়েছে।

রংপুরে এ পর্যন্ত ১৪ জন করোনা শহিদকে পরম মমতায় শেষ বিদায় জানায় রংপুরের দাফনসেবার স্বেচ্ছাসেবীরা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এ সেবায় গিয়ে এসেছেন তারা।

ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের এ দাফনসেবা কার্যক্রম পুরোটাই পরিচালিত হয় সদস্যদের অর্থায়নে ও শ্রমে। তারা জানা, রংপুরে দাফনসেবার প্রয়োজনে মো. রাকিব উদ্দিন আল-মামুন, সিনিয়র প্রো-অর্গানিয়ার, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মোবাইলঃ ০১৭১৭৭১৪৭৬৬- এর সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। 

রংপুর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মুক্তিযোদ্ধাসহ করোনায় মৃত ১৪ লাশ দাফন

সাবিনা ইয়াসমিন

৩০ জুন, ২০২০ , ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

করোনা আতঙ্ক ও আত্মহত্যা-প্রবণতা

কোভিড-১৯ সারা বিশ্বে মহামারি আকার ধারণ করেছে। ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে পরাজিত গোটা বিশ্ব এত এত উন্নত প্রযুক্তি একের পর এক গবেষণা তবুও কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, ভয় উদ্বেগ মানুষকে আরও চেপে ধরেছে। মানুষ সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে হাঁফিয়ে উঠেছে দিনের পর দিন। ফলে এইসব মানসিক চাপ, ভয় বা অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। বিগত মহামারিগুলোর (যেমন সার্স, প্লেগ) দিকে তাকালে দেখা যায়, আত্মহত্যার সাথে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। মহামারি বাড়লে বাড়ে। কোভিড-১৯ মাহামারিতেও বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনা দেখা গিয়েছে।

জার্মানীর হোসে প্রদেশের অর্থমন্ত্রী থমাস শেফার, যুক্তরাষ্টের এমিলি এমনকি মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জাহিদুল আত্মহত্যা করে এই করোনার কারনে। মহামারিতে এমনিতেই মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি থাকে সেখানে যদি মানুষ আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তাহলে মহামারির অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথে আত্মহত্যার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। কেন মানুষ আত্মহত্যা করছে তার কারণগুলো জানা দরকার।

আত্মহত্যা-প্রবণতার কারণ

কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, করোনার এই দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা, ভয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একঘেয়েমি ও বন্দি জীবন, বিনোদনের অভাব, মানুষের চাকুরি হারানোর ফলে বাড়তি মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সাথে যখন মানুষের দ্বন্দ্ব দেখা যায় তখন এই ভয়াবহ প্রবণতা আসে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার মানসিক রোগ যেমন বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসওর্ডার পারর্সনালিটি ডিসঅর্ডার, মাদক সেবন বেড়ে যায় ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। আত্মহত্যা একদিনের ফল না। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার ফলে মানুষ একমূহুর্ত এসে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। আত্মহত্যার কারণ জানার পাশাপাশি আত্মহত্যার জন্য কতগুলো পূর্ব সতর্কতামূলক চিহ্ন (ডধৎহরহম ঝরমহ) রয়েছে। তাই একজন মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে কিনা তা নিম্নলিখিত চিহ্ন বা আচরণ দ্বারা আগে থেকেই অনুমান করা যায়।

যেভাবে বুঝবেন কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে

ক. নিজেকে শেষ করে দেয়ার অথবা নিজেকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করা।

খ. সবসময় হতাশ লাগছে বা ভীষণ একা লাগছে, বেঁচে থাকার কোন মানে নাই, মরে যাওয়াই ভালো এসব কথা বললে।

গ. নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা করা যেমন ওষুধ কিনে রাখা, দড়ি কিনে রাখা, ব্লেড সংগ্রহ করে রাখা

ঘ. কোন সমস্যায় পড়লে সমাধান খুঁজে না পাওয়া

ঙ. অন্যদের ওপর বোঝা হয়ে গেছি এমন বললে

চ. প্রায়ই মাদক বা অন্য কোন নেশাজাতীয় দ্রব্য বেশি পরিমানণ সেবন করলে

ছ. সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলে।

জ. উত্তেজিত বা উদ্বিগ্ন আচরণ করলে।

ঝ. সবার কাছ থেকে বিদায় নিলে।

ঞ. নিজের পছন্দনীয় জিনিস বা সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে অন্যদের দান করলে।

ট. অল্পকিছুতেই আত্মহত্যার চেষ্টা করলে।

ঠ. প্রায়ই মরার কথা বললে।

ড. খাওয়া বা ঘুমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসলে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে পরিবার, বন্ধু, সমাজ সবাইকে। করোনা পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষ গৃহবন্দী এবং আতঙ্ক ও ভয় নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কতগুলো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।

আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে যা করতে হবে

» আত্মহত্যার ওয়ার্নিং সাইনগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।

» সারাক্ষণ মোবাইল টিভি, পত্রিকায় করোনার খবর দেখা যাবে না এবং সব তথ্য বিশ্বাস করা যাবে না। গ্রহণযোগ্য মিডিয়া বা সোর্স এর প্রদানকৃত তথ্য বিশ্বাস করতে হবে।

» কারো মধ্যে আগে থেকে মানসিক সমস্যা থেকে থাকলে তাকে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে যে হঠাৎ তার আচরণের কোন পরিবর্তন হয় কি না। যদি হয় তাহলে ততক্ষণাৎ কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

» কারো মধ্যে হঠাৎ হতাশা, মন খারাপ দেখলে তাকে সময় দিতে হবে, তার সাথে কথা বলতে হবে এবং তার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

» যেহেতু বেশিরভাগ সময় বাসায় কাটছে তাই সময়টাকে বিভিন্ন আনন্দদায়ক কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যেমনঃ সিনেমা দেখা, গানশোনা, পরিবারের সবার সাথে গল্প করা, বাচ্চাদের সাথে নিয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে অথবা খেলা করা, শখের কাজ করা, পশুপালন করা, রান্না করা।

» দূরের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধবদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা।

» টিভি/অনলাইনে শারীরিক ও মানসিক সাস্থ্যসেবা দিচ্ছে সেগুলো সম্পর্কে তথ্য গ্রহণ করা বা প্রয়োজনীয় নাম্বার সংগ্রহ করে রাখা।

» যদি কারো পূর্বেই আত্মহত্যার চেষ্টা করার রেকর্ড  থাকে তবে তাদের প্রতি বাড়তি সতর্ক থাকা এবং বাসার ছুরি, দা, ব্লেড, দড়ি ওষুধ সরিয়ে রাখা।

» সবশেষ মহামারি সবসময় একটি মানসিক চাপ। তাই এই চাপে ভেঙে না পড়ে মানসিকভাবে শক্ত থাকার চেষ্টা করা।

আর এই কোভিড-১৯ এর জন্য যেহেতু এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর চিকিৎসা নেই তাই শারীরিক শক্তি বাড়ানো পাশাপাশি মানসিক শক্তিও বাড়াতে হবে যাতে সব ধরনের আতঙ্ক, হতাশা ও আত্মহত্যার মতো বিষয় প্রতিহতো করা সম্ভব হয়।

 

করোনা আতঙ্ক ও আত্মহত্যা-প্রবণতা

মুগ্ধতা.কম

১৭ জুন, ২০২০ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন আবিষ্কার

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন

সতর্কতা: এই ওষুধ শুধু হাসপাতালে ভর্তি, অক্সিজেন বা ভেন্টিলেটর প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য প্রযোজ্য। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এর ব্যবহার উল্টো সর্বনাশ করতে পারে।

সুখবর। একার নয়। পুরো বিশ্বের। প্রতিটি করোনা আক্রান্তের।

বছরের অর্ধেক হয়ে গেলো। নতুন করোনা ভাইরাস অনেকগুলো মৃত্যু কেড়ে নিলো। অনেকে অসুস্থ হলো। এখনো দেশে দেশে চলছে তার তাণ্ডব নৃত্য।

এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ওষুধ এতদিন পর্যন্ত ছিল না। ভ্যাকসিন এখনো সময়ের ব্যাপার। একমাত্র বিকল্প হলো মেডিসিন।

এতদিন কয়েকটি মেডিসিন নিয়ে কথা বললেও, একটিও এই ভাইরাসের কারণে মৃত্যুকে থামাতে পারছিলো না। মাঝে কয়েকটি মেডিসিন নিয়ে যা কথা হচ্ছিলো, সেগুলো শুধুমাত্র কিছু উপসর্গ কমাচ্ছিলো।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের জন্যে নিয়ে এলো সুখবর। ডাক্তারদের জন্যে সুখবর। করোনা আক্রান্তদের জন্যে সুখবর। সম্ভাব্য করোনা আক্রান্তদের জন্যে নিশ্চিত ভালো খবর। করোনা ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই, এটি আর বলা যাচ্ছে না।

Prof Peter Horby এর নেতৃত্বে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি সহ ইংল্যান্ডের আরো কিছু ইনস্টিটিউশনের একদল চিকিৎসক এবং গবেষক বিজ্ঞানী প্রচলিত একটি মেডিসিনের সন্ধান পেয়েছেন, যা করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যুকে সর্বশেষে থামাতে পেরেছে। Dr. Horby হলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির Nuffield Department of Medicine এর Professor of Emerging Infectious Diseases।

মেডিসিনটির নাম : Dexamethasone।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং ইংল্যান্ডের চিফ মেডিকেল অফিসার Prof Chris Whitty এর উদ্ধৃতি দিয়ে অক্সফোর্ড গবেষক দল এক প্রেস কনফারেন্স গতকাল ১৬ জুন এই ঘোষণা দিয়েছেন।

ইংল্যান্ড, এমেরিকা, ইউরোপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মারাত্মক রোগীদের ক্ষেত্রে Dexamethasone ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

এ নিয়ে WHO ডিরেক্টর জেনারেলের কালকের বিবৃতি হলো :

“The World Health Organization (WHO) welcomes the initial clinical trial results from the United Kingdom (UK) that show dexamethasone, a corticosteroid, can be lifesaving for patients who are critically ill with COVID-19.

This is the first treatment to be shown to reduce mortality in patients with COVID-19 requiring oxygen or ventilator support,” said Dr Tedros Adhanom Ghebreyesus, WHO Director-General. “This is great news and I congratulate the Government of the UK, the University of Oxford, and the many hospitals and patients in the UK who have contributed to this lifesaving scientific breakthrough.”

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের একদল এই বছরের মার্চ মাসের শুরুতে University of Oxford -এর নেতৃত্বে RECOVERY নাম দিয়ে একটি ট্রায়াল টিম তৈরী করেন। RECOVERY মানে Rendomised Evolution of COVID-19 Therapy। এই গবেষক দল নতুন করোনা ভাইরাসের উপর প্রভাব ফেলে এবং করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে উপযুক্ত মেডিসিন অনুসন্ধানের কাজে নেমে পড়ে। তারা পাঁচটি প্রচলিত মেডিসিন সিলেক্ট করেন প্রথমে। এই পাঁচটি হলো :

Lopinavir-Ritonavir

Dexamethasone

Hydroxychloroquine

Azithromycin

Tocilizumab

৫ জুন Hydroxychloroquine এর ট্রায়ালের প্রথম রেজাল্ট প্রকাশ করেন এবং Hydroxychloroquine এর অকার্যকারিতা ঘোষণা করে মেডিসিনটি বাতিল করে দেন । ১৫৪২ জন কোভিড-১৯ আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ করে যে ফলাফল মেলে, তার উপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন যে, Hydroxychloroquine থেকে করোনা আক্রান্তদের সুফল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

১৬ জুন Dexamethasone নিয়ে তাদের কার্যকরী ফলাফলটি প্রথম প্রকাশ করেন।

মার্চ মাসের শুরুতে এই টিম গঠিত হয়েছিল । মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ব্রিটেন সরকার তাদের ১০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে সাহায্য করেন । ব্রিটিশ সরকার ছাড়াও বেসরকারি ওয়েলকাম ট্রাস্ট এবং বিল গেটসের গেটস এন্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন থেকে অর্থ সহায়তা পান ট্রায়াল চালিয়ে যেতে । এই গবেষক দলের সাথে আরো আছেন ইংল্যান্ডের প্রধান রিসার্চ ইনস্টিটিউট NIHR এবং MRC।

২৩ মার্চ প্রথম ট্রায়াল শুরু করেন একজন করোনা আক্রান্তের উপর। জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত UK এর ১৭৫ টি হাসপাতালে ১১৫০০ জনের উপর ট্রায়াল করেন মেডিসিনগুলো।

মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে গত ৮ জুন পর্যন্ত ২১০৪ জন করোনা আক্রান্তের উপর রান্ডমলি দৈনিক ৬ মিলিগ্রাম করে Dexamethasone কেউকে ইনজেকশন এবং কেউকে মুখের ট্যাবলেট দিয়েছেন। তাদের পাশাপাশি সমসাময়িক কালে ৪৩২১ জন করোনা আক্রান্ত রোগীদের Dexamethasone না দিয়ে প্রচলিত চিকিৎসা করা হয়েছে। দুটোর তুলনা করে তারা দেখলো যে – যে সব রোগীদের অবস্থা মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়, মৃত্যু অনিবার্য ভাবা হয়, সাথে ভেন্ট্রিলেটর এবং অক্সিজেন দরকার হয় – সে সব রোগীদের প্রতি আট জনের মধ্যে একজন বেঁচে যায় Dexamethasone নিলে। আরেকটু বিশ্লেষণের আকারে বললে – যাদের ভেন্ট্রিলেটর দরকার পড়ে, তেমন প্রতি তিন জনের একজন মৃত্যু থেকে বেঁচে যায় Dexamethasone খেলে। আর যাদের অক্সিজেন দরকার হয় – তাদের পাঁচজনের একজন বেঁচে যায়।

সাথে একটি সতর্ক বাণী আছে। যারা ফুসফুস জনিত সমস্যায় পড়বেন না, অর্থাৎ মারাত্মক হবে না, তাদের উপর Dexamethasone এর কোনো প্রভাব নেই। সুতরাং, যাদের কেবলমাত্র হসপিটালে ভর্তি হয়ে ভেন্ট্রিলেটর লাগবে বা অক্সিজেন লাগবে, শুধুমাত্র তারাই এই মেডিসিন খাবেন বা ডাক্তাররা তাদের দেবেন। মাইল্ড সিম্পটমের কেউ এই ওষুধটি বাজার থেকে কিনে নিজে নিজে খাবেন না দয়া করে। তাতে উল্টো আপনি মারাত্মক স্বাস্থ ঝুঁকিতে পড়বেন, শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে, এমনকি উল্টো ভাইরাসের আক্রমণ বেড়ে যাবে। কোনো ডাক্তার বা রোগী দয়া করে এই নির্দেশটি মানবেন। কোনোভাবেই এই ওষুধটি করোনা ভাইরাস প্রিভেন্ট করে না।

Dexamethasone মেডিসিনটি মারাত্মক করোনা আক্রান্তকে দেয়ার নিয়ম হলো : প্রতিদিন ৬ মিলিগ্রাম করে ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশান অথবা যে মুখে খেতে পারে, তাকে দৈনিক ৬ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ১০ দিন দিতে হবে।

এবার আসি Dexamethasone নিয়ে।

Dexamethasone একধরনের steroid জাতীয় ওষুধ। আরো স্পেসিফিক হলে Corticosteroid জাতীয় ওষুধ বলে। সহজ করে steroid হলো একধরনের হরমোন। মানুষের শরীরে কিডনির উপরে এড্রেনাল নামের একটি ছোট গ্লান্ড থাকে। এই গ্লান্ড হতে ১৭ কার্বন বিশিষ্ট কিছু হরমোন বের হয়, তাদের Corticosteroid Hormone বলে। Dexamethasone হলো এমন কৃত্রিম Corticosteroid হরমোন। খেলাধুলার জগতে অনেক স্ক্যান্ডাল শুনি আমরা কিছুদিন পর পর। তাতে এই steroid নেয়ার খবর থাকে। ১৯৫৮ সালে রাশিয়ান কিছু এথলেট এই কৃত্রিম হরমোন শরীরে গোপনে ঢুকিয়ে তাদের ক্রীড়া কৌশল বৃদ্ধি করেছিল।

আমেরিকান রসায়নবিদ Percy Julian ১৯৩১ সালে আলাদা ভাবে প্রথম steroid আবিষ্কার করেন গাছে। যদিও ১৯২৯ সালে আরেক আমেরিকান রসায়নবিদ Edward Calvin Kendall মানুষের শরীরে Adrenal gland থেকে Corticosteroid বের হওয়া আবিষ্কার করেন এবং তার এই আবিষ্কারের কারণে ১৯৫০ সালে মেডিসিনে তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

Dexamethasone প্রথম তৈরী করা হয় ১৯৫৭ সালে। বিশ্বব্যাপী ওষুধ হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি পায় ১৯৬১ সালে। যদিও ১৯৫৮ থেকে আমেরিকায় ব্যবহার করা হতো।

এটি মূলত এজমা এবং আর্থ্রাইটিস চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এর বাহিরে স্কিন থেকে ক্যান্সার, চোখের কিছু সমস্যা থেকে ফুসফুসের কিছু সমস্যায়, সাথে এলার্জি থেকে যক্ষা রোগে, এমনকি দাঁতের কিছু অপারেশনের পরে Dexamethasone মেডিসিনটি ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত ইনফ্লামেশন কমিয়ে দেয় এবং শরীরের ইমমিউনিটির উপর কাজ করার মাধ্যমে শরীরের উপর প্রভাব ফেলে।

দেশি স্কয়ারের Dexonex কিংবা বেক্সিমকোর Odeson অথবা এরিস্টোফার্মার Sonexa এমন Dexamethasone জাতীয় মেডিসিন । ওষুদের দাম এতই সস্তা যে, দশ দিনের ওষুদের মোট খরচ মাত্র ৫০০ টাকা !

কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ খাবেন না। এই ওষুধের কিছু পাশ্ব প্রতিক্রিয়া আছে । কেউ কোরোনায় আক্রান্ত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হবার পর শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যায় না ভোগা পর্যন্ত ওষুধটি খাবেন না ।

স্মরণ করিয়ে দেই যে, Times Higher Education World University Rankings -এ লাস্ট তিন বছর University of Oxford হলো নাম্বার 1, এর পরেই আছে আমেরিকান Harvard University।

করোনা তাণ্ডবে ভ্যাকসিনের আগেই অক্সফোর্ডের সৌজন্যে Dexamethasone এর কারণে বিশ্ব যেন খানিকটা মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

সূত্র :

1. WHO

2. University of Oxford : RECOVERY Trial

3. BBC

4. The Pharmaceutical Journal

5. NewScientist

6. NIHR : Oxford Biomedical Research Centre

7. Medical Research Council, UK

8. Health Data Research UK

 

অপূর্ব চৌধুরী।
চিকিৎসক এবং লেখক।
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড।
গ্রন্থ ৭
উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত।

 

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অক্সফোর্ডের যুগান্তকারী মেডিসিন আবিষ্কার

মুগ্ধতা.কম

২৯ মে, ২০২০ , ৮:২০ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস টেস্ট: কী, কেন, কীভাবে?

করোনা প্যান্ডেমিক কমে গেলে সামনে একটি ব্যাপার নিয়ে সুস্থদের মধ্যে চাহিদা দেখা দেবে। এই মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব এবং যোগাযোগের অসুবিধার কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তা করতে পারছে না। সেটি হলো : টেস্ট ! করোনা ভাইরাস টেস্ট।

অসুস্থ হয়ে যত না টেস্ট করেছে লোকে, সামনে সুস্থ লোকজন টেস্ট করে নিশ্চিত হতে চাইবে – তার হয়ে গেলো কিনা শেষে। কারণ, অনেকেই মাইল্ড কিছু লক্ষণে ভুগে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। অনেকে হয়তো জানেই না তার শরীরে ভাইরাসটি এসে ঘুরে গেছে। অনেকে নিশ্চিত হতে চাইবে তার হবার সম্ভাবনা আছে কিনা। এমনকি যাদের হয়ে গেলো, তারাও চিন্তিত থাকবে – আবার হতে পারে কিনা।

এমনসব জটিলতার কারণে সামনের দিনগুলোতে করোনা টেস্ট যেমন সবচেয়ে বড় বাজার, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, প্রতিটা দেশের সরকারের মাথা ব্যথা, বিশাল সংখ্যক মানুষের টেস্ট করা এই মুহূর্তে করোনা প্রতিরোধের অন্যতম একটি স্ট্রাটেজি বটে।

এ নিয়ে যেমন প্রতারণার বাজার, এ নিয়ে যেমন সাধারণ মানুষের খুব কম জানা, এ নিয়ে ডাক্তার কিংবা চিকিৎসা কর্মীদেরও সঠিক তথ্যটির অনেক বড় অভাব। আজ এ নিয়ে লিখবো।

কথা হলো : কিসের টেস্ট!

COVID-19 হলে নিশ্চিত হতে তিনটি মাত্র টেস্ট আছে।

এক : জীবাণু টেস্ট
দুই. এন্টিজেন টেস্ট
তিন. এন্টিবডি টেস্ট

প্রতিটির বিশদ বলার আগে মজার একটি কাহিনী বলি। শুধু সাধারণ মানুষ ধরা খায় না। ইংল্যান্ডের মতো স্মার্ট সরকারও অনেক সময় ধরা খায়। ২৪ মার্চ ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার জনগণকে সান্ত্বনা দিতে ঘোষণা দিলেন যে – এপ্রিল থেকে করোনা ভাইরাসের এন্টিবডি টেস্ট কীট ঘরে ঘরে পাঠানো হবে। যাতে করে কারা কারা অলরেডি আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছে। আড়ালে সিভিল সার্ভেন্টরা বিশ্ববাজার যাচাই বাছাই করে চায়নার একটা কোম্পানিকে অর্ডার দিলো দুই মিলিয়ন এন্টিবডি টেস্ট কীটস। চায়না বেশ চালাক। সুযোগ বুঝে অগ্রিম দাম চেয়ে বসলো। কীটস পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে বিশ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করে দিলো ব্রিটিশ সরকার। কীটস হাতে আসার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম পরীক্ষা করে দেখলো যে – এই কীটস প্রচুর ভুল রেজাল্ট দিচ্ছে, অনেক ফলস পজিটিভ নেগেটিভ আসছে, মোটেও রিলায়েবল নয়। ব্রিটিশ সরকার চুপি চুপি এই পরিকল্পনা থেকে সরে গেলো আড়ালে। টেস্ট করাতো দূরের কথা, পয়সাটাই গচ্চা গেলো। সরকার আড়ালে চাইনিজ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে এই স্ক্যান্ড্যাল তেমন বাজারে আসছে না। আরো মজার হলো, শুধু একা ব্রিটেন নয়, আমেরিকা, জার্মানি, ইতালি, তুরস্ক এবং নেদারল্যান্ডও এই কীটস নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ধরা খেয়েছে। প্যান্ডেমিক ডামাডোল এসব ব্যর্থতা আড়ালে রাখছে আপাতত। আন্তর্জাতিক প্রতারণার বাজারের সাথে লোকাল বাজারেও প্রতারণা আছে এবং থাকবে। এ নিয়ে অন্য সময় লিখবো। আজ শুধু করোনা ভাইরাসের টেস্টগুলো নিয়ে লেখা। নিজেদের প্রয়োজনেই ব্যাপারটিতে পরিষ্কার ধারনা থাকলে কখন কোন পরীক্ষাটি কার্যকরী, এ সম্পর্কে জানাটুকু পরিষ্কার হবে।

মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র ২.৫ % এর এই টেস্টগুলো করা হয়েছে। সে হিসাবে এখনো পর্যন্ত টেস্ট করা লোকের সংখ্যা মাত্র ২০ কোটি! পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা এই মুহূর্তে ৮ বিলিয়নের চেয়ে একটু কম। মানে ৮০০ কোটি !

প্রতি হাজারে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করেছে এই পর্যন্ত ডেনমার্ক । প্রতি হাজারে ১৭ জনের মতো।

গত মার্চ মাসের ৭ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত কারো সন্ধান পাওয়া যায় টেস্টে। তারপর থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ২.৫ লক্ষের বেশি লোকের টেস্ট করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের চেয়ে বেশি টেস্ট করা হয় সারাদেশের ৪৯ টি টেস্ট ল্যাবে। আঠারো কোটি মানুষের জন্যে ভেন্ট্রিলেটর আছে মাত্র ৫৫০ টি! ICU বেড আছে দেড় হাজারের মতো। প্রতি এক লক্ষের জন্যে একটির চেয়ে কম বেড।

ব্রিটেনে ছয় কোটি মানুষের জন্যে ICU বেড ছিল ছয় হাজারের বেশি, করোনার কারণে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে চল্লিশ হাজারের বেশি। সারাদেশে হাসপাতাল বেড আছে তিন লক্ষের উপরে। ব্রিটেনে এই মুহূর্তে প্রতিদিন গড়ে আশি হাজারের বেশি করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা হয়।

শুরুতে বলেছিলাম – করোনা ভাইরাস SARS-CoV-2 এ আক্রান্ত হলে জানার উপায় তিনটি। মানে তিন ধরনের টেস্ট। আরেকটু সহজ করতে বলা যায় – আসলে দুই ধরনের টেস্ট।

একটি হলো – শরীর জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা – তার টেস্ট।

আরেকটি হলো – শরীর আগে কখনো জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কিনা – তার টেস্ট।

শরীরে জীবাণুটি আছে কিনা তা জানতে দুটো টেস্ট আছে।

► এক . ভাইরাস টেস্ট
► দুই . এন্টিজেন টেস্ট

আগে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কিনা তা জানতে একটি টেস্ট।

► এন্টিবডি টেস্ট

ভাইরাস টেস্ট

করোনা ভাইরাসের মূল টেস্ট টি ভাইরাস টেস্ট বা জীবাণু টেস্ট। সংক্ষেপে এই টেস্টটিকে বলা হয় PCR টেস্ট।

PCR। ভাঙলে হয় Polymerase Chain Reaction। এটি একটি রাসায়নিক পদ্ধতির নাম, যে পদ্ধতিতে একখণ্ড DNA থেকে হাজার হাজার কপি করা যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় PCR কে মজা করে বলে – মলিকুলার ফটোকপি। একখণ্ড DNA খুব ছোট একটি অংশ। কিন্তু পরীক্ষা করতে হাজার হাজার DNA লাগে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এমনিতেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র, তারও হাজারগুন ন্যানো ক্ষুদ্র এই DNA। কোষের এই DNA এর ভেতর কোষের সব বৈশিষ্ট লুকিয়ে থাকে।

আরো চল্লিশ বছর আগে একখণ্ড DNA পৃথক করে তার থেকে হাজার-লক্ষ কপি করতে কয়েকদিন লেগে যেত। ১৯৮৩ সালে আমেরিকান রসায়নবিদ Kary Banks Mullis অল্প সময়ে অনেকগুলো DNA কপি করার এই PCR পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেন। তার এই অসামান্য আবিষ্কার জেনোমিক গবেষণায় আমূল পরিবর্তন করে দিলো। ১৯৯৩ সালে এ কারণে Mullis -কে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। আজ এই PCR পদ্ধতিটাই করোনা ভাইরাস টেস্ট করার সবচেয়ে বেস্ট পদ্ধতি সারা পৃথিবীতে। কেমন করে এটি করা হয়, বলছি সহজ করে।

PCR পদ্ধতিটি যে মেশিনের মধ্যে করা হয় তাকে PCR মেশিন বলে। এই মেশিন নিয়ে একটু পর বলবো। আগে মলিকুলারের এই কঠিন পদ্ধতিটাকে সহজ করে বুঝে নেই।

যে জীবাণুটি পরীক্ষা করা হবে, তার সেম্পল থেকে তার DNA নিয়ে একটি টেস্ট টিউবে রাখা হয়, সাথে DNA Plymerase নামের একধরনের এনজাইম দেয়া হয়, আর একধরনের লবন মিশিয়ে টেস্ট টিউবটি মেশিনে ঢুকানো হয় । পুরো মেশিনের কাজ অটোমেটেড, মানে স্বয়ংক্রিয় সব হয় একের পর এক।

DNA হলো সাপের মতো প্যাচ করে থাকা দুটো দণ্ড। প্রথমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এটাকে আলাদা করা হয়। তারপর প্রতিটি দণ্ডকে বিশেষ ধরনের লবন জলের মধ্যে থাকা নিউক্লিক অ্যাসিডকে পলিমারেজ এনজাইম গুলো জোড়া লাগিয়ে নতুন আরেকটি পূর্ণাঙ্গ DNA বানায়। এই Polymerase উপাদানটি চেইনের মতো হাজার হাজার নতুন DNA কপি করে তৈরী করে ফেলে। তাই এর নাম PCR বা polymerase chain reaction! এরকম দুই তিন ঘন্টায় কয়েকটি সাইকেলে মিলিয়ন মিলিয়ন নতুন DNA তৈরী করা যায় PCR মেশিন দিয়ে, পরে তা পরীক্ষা করে সহজে জীবাণুটিকে ধরা যায়।

কিন্তু সমস্যা হলো করোনা ভাইরাসের ভেতর কোনো DNA থাকে না। শুধু RNA থাকে। তাই শুধু PCR মেশিন দিয়ে করোনা ভাইরাস নির্ণয় একটু সময় সাপেক্ষ। প্রথমদিকে তাই করা হতো। কিন্তু এখন PCR মেশিনগুলো আরো উন্নত মানের। আগে আলাদা করে ভাইরাসের RNA কে একটি বিশেষ উপায়ে DNA -তে রূপান্তরিত করা হয়। প্রতিটা RNA এর ভিতর থাকে আসলে DNA এর একটি কপি বা ছায়া। Reverse Transcriptase নামের একটি এনজাইম দিয়ে RNA থেকে DNA এর ছায়াটিকে বের করা হয়। এই DNA -কে বলে cDNA বা Complementary DNA। পুরো পদ্ধতিটাকে বলে Reverse transcription।

এই পদ্ধতিতে RNA থেকে DNA বের করে PCR মেশিনে নতুন হাজার হাজার DNA করার পদ্ধতিটিকে বলে RT-PCR। RT মানে Reverse transcription। করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা হয় মূলত বেসিক PCR মেশিনের থেকে আরো উন্নতমানের RT-PCR মেশিনে। এখন আরো উন্নত ব্যবস্থা আছে PCR মেশিনগুলোতে। অ্যাডভান্স টেকলোজিতে কম্পিটারাইজড qPCR এবং RT-qPCR।

জার্মানি, মার্কিন, ইংল্যান্ড, চীন, অনেক দেশের বায়োটেকনোলজির কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের PCR মেশিন বানায়। একটি বেসিক PCR মেশিন পাঁচ লক্ষ থেকে পনেরো লক্ষ টাকা। এডভান্স RT কিংবা RT-qPCR মেশিনগুলো কোম্পানিভেদে বিশলক্ষ থেকে এক কোটি টাকা এক একটি মেশিন। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সম্ভবত ৪৯ টি ল্যাবে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করানো হয়। যতটুকু জানি, বেশিরভাগ মেশিন বেসিক PCR! ঢাকায় হয়তো অল্প কয়টি RT-PCR মেশিন আছে। বিস্তারিত পরিসংখ্যান জানা নেই। করোনা বিষয়ক স্বাস্থ্য অধিদফতর নিজেই জানে কিনা সন্দেহ আছে।

PCR পদ্ধতিটিকে করোনা ভাইরাস টেস্টের গোল্ডেন মেথড ধরা হয়। তাই এই পদ্ধতি WHO কর্তৃক স্বীকৃত এবং পৃথিবীর সবদেশেই করোনা ভাইরাসের একমাত্র ল্যাব টেস্ট ধরা হয়। আরো একটি পদ্ধতি আছে। নাম : Isothermal amplification assays। পদ্ধতিটি কম রিলায়েবল, কিন্তু PCR এর চেয়ে সস্তা এবং দ্রুত করা যায়। PCR পদ্ধতিটি করতে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগে। আলোচনা সংক্ষেপ করতে এই পদ্ধতিটি নিয়ে আর আলোচনা করলাম না।

এন্টিবডি টেস্ট :

এমন অনেকে আছেন -লক্ষণ দেখা দিয়েছিলো, কিন্তু টেস্ট করান নি, কিছুদিন পর ভালো হয়ে গেলেন। তবে নিশ্চিত নন যে আপনার শরীর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল কিনা। আবার এমন অনেকেই আছেন বা ছিলেন বা থাকতে পারেন যে – তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা দেয় নি। এমন অবস্থাগুলোতে আপনার শরীরে করোনা ভাইরাসের কারণে তৈরী হওয়া এন্টিবডি আছে কিনা তা জানার মধ্যে দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই এন্টিবডি টেস্টটিতে রক্ত নিয়ে রক্তের মধ্যে দেখা হয়। আরেকটি বিস্তারিত বললে রক্তের সিরাম নামক অংশে এন্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। আমার আরেকটি আর্টিক্যাল “করোনা ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারে কি ?” এটায় এই এন্টিবডি টেস্ট নিয়ে আলাদা করে বিশদ লিখেছি। পাবলিক পেইজ ‘অপূর্ব চৌধুরী’ র নোটসে করোনা রিলেটেড আর্টিক্যালগুলো দেয়া আছে। অনুসন্ধানী পাঠক খুঁজে নিয়ে এন্টিবডি টেষ্টের বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন।

বাকি রইলো, এন্টিজেন টেস্ট।

এন্টিজেন টেস্ট:

সহজ করে বললে – করোনা ভাইরাসের জীন চিহ্নিত করতে উপরের PCR টেস্ট, করোনা ভাইরাস এট্যাক করে চলে গেছে, কিন্তু চিহ্ন রেখে গেছে শরীরকে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে যুদ্ধকরা এন্টিবডি তৈরী করে, সেই এন্টিবডি চেক করতে – এন্টিবডি টেস্ট করা হয়।

করোনা ভাইরাস শরীরে ঢোকার সাথে সাথে সিমটম ভালোভাবে প্রকাশ পাওয়ার আগেই অথবা পরে শরীরের B সেল থেকে B cell receptor নামের একধরনের প্রোটিন এসে ভাইরাসগুলোর গায়ে এসে বসে। করোনা ভাইরাসের গায়ে কতগুলো স্পাইকের মতো প্রোটিন থাকে । এই স্পাইক প্রোটিন এবং B cell receptor প্রোটিন মিলে করোনা ভাইরাসটিকে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য দেয়। এটার কারণ হলো পরবর্তীতে B সেল থেকে বের হওয়া এন্টিবডি এবং T সেল ডাইরেক্ট যেন জীবাণুটিকে চিনে মেরে ফেলতে পারে! না হলে ভুলকরে শরীরের ভালো কোষগুলোকে যদি এট্যাক করে বসে এন্টিবডি! তো এই বিশেষ ট্যাগ সম্পন্ন ভাইরাসটিকে তখন বলে এন্টিজেন। এন্টিজেন টেস্টে এই বিশেষ প্রোটিনটিকে চিহ্নিত করার মধ্যে দিয়ে করোনা ভাইরাসটি আছে কিনা শরীরে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।

এন্টিজেন পদ্ধতিটি খুব সস্তা, সহজ এবং অল্প সময় লাগে। মাত্র ১০ থেকে পনেরো মিনিট লাগে। কিন্তু একটা কথা আছে – সস্তার তিন অবস্থা ।

পদ্ধতিটি সহজ করে বললে, কথাটির মর্ম বুঝবেন।

এন্টিজেন টেস্ট পদ্ধতিতে নাক থেকে সোয়াব নিলেই চলে। সেই সোয়াব ল্যাবে নিয়ে বিশেষ ধরনের এন্টিজেন প্রোটিন চিহ্নিত করার মেশিনে কিছু ক্যামিক্যাল সহকারে ঢোকানো হয়। দশ মিনিটের মধ্যে ফলাফল জানিয়ে দেয় করোনা ভাইরাসের সেই বিশেষ এন্টিজেন প্রোটিনটি আছে কিনা!

শুনতে মনে হয় কত সহজ এবং দ্রুত। আসলে টেস্টটি মোটেও রিলায়েবল নয়। প্রচুর ফলস পজেটিভ আসে এবং আসতে পারে। এমনকি পজিটিভ ছিল কিন্তু রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে। কারণ হলো, সেই সয়াবে খুব অল্প করোনা ভাইরাস থাকতে পারে, অথবা সেই ভাইরাসগুলর গায়ে B সেল রিসেপ্টর এসে যুক্ত হয়ে এন্টিজেন প্রোটিন হয়ে উঠে নি! ফলে ফলস রেজাল্ট আসতেই পারে সহজে। কিন্তু PCR পদ্ধতিতে একটি DNA পেলেও তাকে মিলিয়ন কপি বানিয়ে নিশ্চিতহতে হয় ভাইরাসের উপস্থিতি। তাই PCR পদ্ধতিটি তুলনামূলক নির্ভুল।

এন্টিজেন টেস্ট খুব একটা করা হয় না। তাৎক্ষণিক এবং দ্রুততার জন্যে অনেক দেশে এন্টিজেন টেস্ট করার অনুমতি আছে এবং করা হয়। যাদের ৱ্যাপিড টেস্ট বলা হয়। কিন্তু নিশ্চিতকরণের জন্যে পরে PCR পদ্ধতিতে করে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস টেস্টে কোন ধরনের ৱ্যাপিড টেস্টকে অনুমোদন করে না।

বাজারে এ নিয়ে অনেক প্রতারণা আছে। এই প্রতারণার শিকার যাতে না হোন, তার জন্যেই এই সচেতনমূলক লেখা।

করোনা ভাইরাসের টেস্টের নাম করে বিভিন্ন হোম কীটস বাজারে দেখবেন। তাদের বেশিরভাগই এই এন্টিজেন্ট টেস্ট পদ্ধতির কীটস! ৱ্যাপিড টেস্ট কীটস! নাক থেকে সোয়াব নিয়ে তাদের ঠিকানায় পাঠালে চব্বিশ ঘন্টায় রেসাল্ট জানায় তারা ! পুরাই ভুয়া একটি ব্যবসা। এই ফাঁদে পা দেবেন না। তারা PCR পদ্ধতিতে চেক করছে কিনা নিশ্চিত হবেন। ইংল্যান্ড আমেরিকা ইউরোপের অনেক প্রাইভেট কোম্পানিও এসব প্রতারণা করে। তারা দাবি করে ষাট থেকে সত্তর ভাগ সঠিক ফলাফল দেয়! বাস্তবে তা হয় না। প্রতিটা সরকার তাই আলাদা করে ল্যাব বেইজড PCR পদ্ধতি ছাড়া করোনা ভাইরাসের রেসাল্টকে পজেটিভ ধরে না। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে হয়তো এই প্রতারণার বাজার শুরু হয়ে গেছে। দেশে থাকি না বলে, দেশের কিছু জানি না। এ প্রসঙ্গে মজার আরেকটি বিষয় বলি!

সম্প্রতি ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্হ্যে কেন্দ্রের করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের কীটস ‘ডট ব্লট’ নিয়ে মিডিয়াতে হৈচৈ দেখলাম। ওনার কীট্স সম্পর্কে কিছুই তেমন জানি না! শুধু জানি, খুব সস্তা এবং দ্রুত, ৱ্যাপিড টেস্ট দাবি করেছেন তারা। খরচ মনে হয় ৩০০ টাকা। সেনেগালেও একই ধরনের একটি ৱ্যাপিড টেস্ট কীটস বাজারে আছে, খরচ এক ডলার!

ঐদিন দেখলাম, জাফরুল্লাহ সাহেব করোনায় নাকি আক্রান্ত হয়েছেন। কি করে বুঝলেন? খবরটি পড়ে যেটা জানতে পেলাম, ডাঃ জাফরুল্লা তার গণস্বাস্থের ডট ব্লট কীটস দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে – তার শরীরে ভাইরাসটির এন্টিজেন পেয়েছেন!! তার মানে তার কীটস এই এন্টিজেন্ট টেস্ট পদ্ধতির কীটস! যদিও কিছুই জানি না এই টেস্ট কীট্স টি সম্পর্কে, তাদের ওয়েবসাইটেও খুঁজেছি এ সম্পর্কে তথ্য, কিন্তু কিছুই পাই নি । যদি এটি সত্যি সত্যি এন্টিজেন টেস্টের কীটস হয়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই কীটস আরেকটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই না! এটি মানুষকে ভুল রেজাল্ট দেবে অনেক বেশি। যে কারণে এটি অনুমোদন দিলে জনগণের আরো ক্ষতি হবে। আক্রান্ত লোকে ভুল রেজাল্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াবে!

সাময়িক কিছু ভুল হোক, তারপরেও সরকারের দেয়া ল্যাবগুলোর উপর আস্থা রাখুন। সেখানেই টেস্ট করাবেন করোনার। বাজারের বা ক্লিনিকগুলোর প্রতারণায় পা দেবেন না।

নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও সচেতন করুন।

সূত্র :

1. The Lancet

2. BMJ – British Medical Journal

3. EJRadiology – European Journal of Radiology

4. Nature

5. Oxford Academic Clinical Chemistry

6. ACP Journals – Annals of Internal Medicine

7. CEBM – The Centre for Evidence-Based Medicine

 

ডা. অপূর্ব চৌধুরী
চিকিৎসক এবং লেখক
জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড
গ্রন্থ ৭
উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত

 

করোনা ভাইরাস টেস্ট: কী, কেন, কীভাবে?