মুগ্ধতা.কম

৩ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

দখিগঞ্জ শ্মশান গণহত্যা দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল, শনিবার। রংপুর জেলায় ঘটেছিল এক অকল্পনীয় হত্যাযজ্ঞ। হটাৎ করেই মধ্য রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানের কাছে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে আশপাশের মানুষের। ঠিক ২৫ মার্চের কালো রাত্রির মতোই। রংপুরবাসী কোন দিন কল্পনাও করতে পারেনি হাত পা বাঁধা অবস্থায় এমনভাবে বাঙ্গালীদের হত্যা করতে পারে পাক হানাদার বাহিনী। রংপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সবার প্রিয় জররেজ ভাই (শহীদ এ্যাডঃ ইয়াকুব মাহফুজ আলী, যিনি ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ রংপুর শহরের নবাবগঞ্জ বাজারে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন) সহ ১১ জন বাঙ্গালীকে দখিগঞ্জ শ্মশানে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় লাইন ধরে দাঁড় করে গুলি চালিয়ে হত্যা করে হায়েনার দল। গুলিবিদ্ধ এক জন আর একজনের উপরে ঢলে পরে। নিমিষেই ঝরে যায় তরতাজা প্রাণ।

সেই ধ্বংসযজ্ঞের সময় একজন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তিনি গুলিবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে পড়ে যান এবং তার শরীরের ওপর অন্যরা পড়েছিল বলে তার পায়ে গুলি লাগে। এতে পাক বাহিনী ভাবে তিনি মারা গেছেন। কিছুক্ষণ মৃত আরও দশ জনের সাথে শুয়ে থেকে পাক বাহিনী ঐ এলাকা ত্যাগ করার পরে কোন ক্রমে ঐ এলাকা থেকে বেরিয়ে এসে অন্যদের সহযোগিতায় ভারতে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া সেই ব্যক্তি হচ্ছেন রংপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব তাজহাটের দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক। তিনি এলাকায় পরিচিতি ছিলেন মন্টু ডাক্তার নামে।

পরদিনই দখিগঞ্জ শ্মশানের হত্যাযজ্ঞের ঘটনা রংপুরের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এ খবর মুহূর্তের মধ্যে সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। শত শত মানুষ ছুটে আসে শ্মশানের দিকে নিহতদের এক নজর দেখতে। ঐদিন থেকেই রংপুরের পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ পালাতে শুরু করে শহর ছেড়ে গ্রামে। গ্রাম ছেড়ে আরো নিরাপদ দূরত্বে সীমান্তের ওপারের দেশ ভারতে।

সে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে সৈন্যদের হাতে যারা শহীদ হন তারা হলেন –

১) শহীদ এ্যাডঃ ইয়াকুব মাহফুজ আলী (জররেজ)। সকলের প্রিয় জররেজ ভাই। ২) মোহাম্মদ মহরম ৩) শ্রী গোপাল চন্দ্র, ৪) উত্তম কুমার অধিকারী ৫)দুলাল মিয়া ৬) রফিক আলী ৭) সতীশ হাওলাদার ৮) দুর্গা দাস অধিকারী ও আরো দু’জন যাদের নাম পাওয়া যায়নি।

আজো কালের সাক্ষী হয়ে আছে রংপুরের দখিগঞ্জ শ্মশান বধ্যভূমি। বেশ কয়েক বছর আগে ঐ এলাকায় শহীদদের নাম লেখা একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়েছে। এছাড়া রংপুরের অন্যতম প্রধান এই বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ডিসেম্বর এলেই ফুল পড়ে শহীদদের স্মরণে। কিন্তু আজ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। রংপুরের গনমানুষের দাবী দখিগঞ্জ শ্মশান বধ্যভূমিসহ জেলার প্রতিটি বধ্যভূমিতে একটি করে কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হোক। সরকারীভাবে এখনই উদ্যোগ না নেয়া হলে হয়তো আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না এখানে কেমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিলেন তাদের পূর্বসূরি নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি দখিগঞ্জ বধ্যভূমির সকল শহীদদের।

দখিগঞ্জ শ্মশান গণহত্যা দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুগ্ধতা.কম

২৪ মার্চ, ২০২০ , ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

২৪ মার্চ, ১৯৭১ পাক সেনা অফিসার হত্যার মধ্য দিয়ে রংপুরবাসীর মুক্তিযুদ্ধ শুরু

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন ৭১’র ২৬ মার্চ, আর পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ট্যাংক ডিভিশনের পাঞ্জাবী সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আব্বাসীসহ তিন জন জওয়ানকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার দুই দিন আগে ২৪ মার্চই স্বাধীনতার যুদ্ধ আরম্ভ করে রংপুর জেলার সাবেক সাতগাড়া ইউনিয়নের (এখন সিটি কর্পোরেশনে) দামোদরপুরের সাধারণ, অনাহারী, জীর্ণশীর্ণ মানুষ। রচিত হয় ইতিহাস। এক গর্বের ইতিহাস।

তাই ২৪ মার্চ শুধু রংপুর নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন ‘‘ভাতে মারবো, পানিতে মারবো’’। সেই কথাই যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে রংপুরের বীর জনতা। সেনানিবাসে সকল প্রকার খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে সেনানিবাসে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর একটি জীপ সেনানিবাসের পশ্চিম দিকে দিয়ে বের হয়ে নিসবেতগঞ্জ হাটে উপস্থিত হয় খাদ্য (মুরগী ও ডিম) সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। সেনা সদস্যদের দেখে গ্রাম বাসী হতচকিত হয়ে যায়।

জানা যায় জীপের ড্রাইভার বাঙ্গালী। মুক্তির নেশায় মরিয়া হয়ে উঠেছে মানুষ, কয়েকজন সিদ্ধান্ত নেন আক্রমণের, চলতে থাকে প্রস্তুতি।

সেনা সদস্যদের দেখে যুবক শাহেদ আলী (পেশায় কসাই) সাইকেল চেপে আগেই নিজ গ্রামে চলে যান। দ্রুতই এই খবরটি ছড়িয়ে পরে সম্মানীপুর, দামোদরপুর, বড়বাড়ি, মনোহরপুর গ্রামের মানুষদের কাছে। শত শত গ্রামবাসী দা, বল্লম, কুড়াল, বটি, খুন্তিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাঁশের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে জীপের জন্য।

অবশেষে জীপটি যখন দামোদরপুর বড় ময়দান এলাকায় আসে তখন যুবক শাহেদ আলী এগিয়ে যান এবং জানতে চান তাদের গ্রামের আসার কারণ। গাড়িতে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ট্যাংক ডিভিশনের পাঞ্জাবী লেফটেন্যান্ট আব্বাসীসহ এলএমজি হাতে তিন জওয়ান। এর মধ্যেই বাদশা, সালাম, রফিকুলসহ তিন চার জন গাড়ির কাছে চলে এসেছে।

পাক সেনারা কিছু বুঝে উঠার আগেই শাহেদ আলী জিপের বনেটে উঠে যান এবং এক টানে ছিনিয়ে নেন এলএমজি। ঘটনা এতো দ্রুত ঘটেছিল যে লেঃ আব্বাসী হতভম্ব হয়ে যায়। এই সুযোগে শাহেদ আলী খাপ্পর (বল্লম টাইপের) দিয়ে আব্বাসীকে আঘাত করলে সে লুটিয়ে পরে। অপরদিকে বাদশা, সালাম, রফিকুল তাদের হাতে থাকা দা, কুড়াল, বল্লম দিয়ে আঘাত হানে তিন সেনা সদস্যের উপরে। তিনজনই তখন মৃত্যু পথযাত্রী।

গাড়ি চালক বাঙ্গালী বিধায় সহযোগিতা করেছিল, তাই দায় মুক্তির জন্য তাঁকেও দা দিয়ে আঘাত করা হলো যেন সন্দেহ না করতে পারে। আহত বাঙ্গালী ড্রাইভার নিসবেতগঞ্জ পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে আনেন।

ইতোমধ্যেই খবর পৌঁছে যায় ক্যান্টনমেন্টে। আহতদের সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু জনতা হাসপাতালে পাক সেনাদের চিকিৎসার বিরোধিতা করলে ভীত সন্ত্রস্ত পাক সেনারা গুলি চালায়। তাদের গুলিতে পৌর বাজার (বর্তমান সিটি বাজার) এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন আব্দুর রাজ্জাক নামের একজন। এই ঘটনায় আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাকের সমাধি রয়েছেন নগরীর হনুমান তলা কাজী নজরুল ইসলাম সরণীতে।

এদিকে সেনা সদস্য হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিনই বিকাল বিকাল চারটার দিকে নগরীর গনেশপুর এলাকাকে ঘটনাস্থল ভেবে পুরো এলাকা জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদারেরা। এর ঠিক চারদিন পরেই ২৮ মার্চ সাধারণ জনগণ তীর-ধনুক, বাঁশের লাঠি, দা, কুড়াল নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে আক্রমণ করে। সবার মুখে ছিল গগনবিদারী স্লোগান ‘‘এস ভাই অস্ত্র ধর, ক্যান্টনমেন্ট দখল কর’’।

 

রিয়াদ আনোয়ার শুভ
ইতিহাস গবেষক, রংপুর

 

মুক্তিযুদ্ধে রংপুর: ২৪ মার্চ, ১৯৭১ পাক সেনা অফিসার হত্যার মধ্য দিয়ে রংপুরবাসীর মুক্তিযুদ্ধ শুরু

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরের দিনগুলো ৩

৪ মার্চ ১৯৭১। ৩ মার্চের ঘটনার পর শহরজুড়ে অস্বাভাবিক থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। সান্ধ্য আইন যথারীতি আজ সন্ধ্যা থেকে পুনরায় বলবদ থাকবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের টহল অব্যাহত রয়েছে।

মানুষ জেগেছে পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে। জেগেছে বীর রংপুরবাসী। প্রশাসনের টহল কিংবা রক্তচক্ষু তাঁদের কি এতো সহজে দমাতে পারে !

এ প্রসঙ্গে কথা বলি বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনের সাথে। জনাব আকবর একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে নিয়ে আমার ‘আলোর দ্বীপ ‘সিরিজে বিস্তারিত লেখা আছে। তিনি ৪ মার্চ ১৯৭১-এ রংপুর শহরের অবস্থা নিয়ে জানান,পাকিস্তান প্রশাসনের রক্তচক্ষু দমাতে পারেনি রংপুরের বীর মানুষদের। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যে যেভাবে সম্ভব মিছিল করতে থাকে। কোন নির্দিষ্টভাবে বা কেন্দ্রীয়ভাবে নয় এলাকায় এলাকায় স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে এসব মিছিল বের হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় বক্তব্য রাখার খবরও তিনি জানতে পেরেছিলেন।

কথা হলো রংপুরের বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক জনাব আবদুস সাহেদ মন্টু ভাইয়ের সাথে । তিনি তখন পি পি আই- এর রংপুর প্রতিনিধি ছিলেন। মন্টু ভাই জানালেন, ৪ মার্চ রংপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড মিছিল চলছিল। শহরের পরিস্থিতি থমথমে এবং কড়া প্রশাসনিক তৎপরতার পরেও শহরের সি ও বাজার থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিভিন্নস্থানে হুট-হাট করে মিছিল হচ্ছিল।

রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর গ্রন্থের ২৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘ ৩ মার্চের ঘটনার পর শহরের অনেক বিহারী পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি পরিবার ইতিমধ্যে সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য অবাঙালি সেনা কর্মকর্তারা খুব বিচলিত হয়ে উঠলো। এই কাজে তাদের কারো কারো উদ্বেগ ও ব্যতিব্যস্ততা কখনও কখনও প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে গেল। তারা রেজিমেন্টের খাদ্য ভান্ডার থেকে আশ্রিত বিহারী পরিবারগুলোর জন্য রেশন সরবরাহের ব্যবস্থা করলো।

‘( যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা- মেজর নাসির উদ্দিন)# [লেখক: সাহিত্যিক ও ইতিহাস গবেষক]

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরে এই দিনে

মুগ্ধতা.কম

৩ মার্চ, ২০২০ , ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

০৩ মার্চ ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের প্রথম শহীদ কিশোর শংকু সমজদার

মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের প্রথম শহীদ শংকু সমজদার। স্বাধীনতার ইতিহাসে, মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে রংপুরবাসীর ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭১’র ০১ মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্বনির্ধারিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করায় ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে সারা বাংলা। সারা দেশের মতো রংপুরেও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো বিদ্রোহের আগুন। দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু।

০৩ মার্চ সকালে রংপুরেও হরতালের সমর্থনে কাচারী বাজার এলাকা থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গোলাপ, অলক সরকার, মুকুল মুস্তাফিজ, নূর উর রসুল চৌধুরী, হারেস উদ্দিন সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, মুসলিম উদ্দিন (মুসলিম কমিশনার), আবুল মনসুর আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়।

মিছিলটি শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্বর) এলাকায় আসতেই কলেজ রোড থেকে কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদ মুখতার ইলাহি (কয়েক মাস পরে শহীদ ), জায়েদুল আলম (প্রয়াত), জিয়াউল হক সেবুসহ অন্যান্যদের নেতৃত্বে একটি মিছিল এসে যোগ দেয় মূল মিছিলের সাথে। কথা ছিল মূল মিছিল তেঁতুলতলা থেকে ব্যাক করবে। কিন্তু কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের চাপে নেতৃবৃন্দ মিছিলটি স্টেশন অভিমুখে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। মিছিলটি আলমনগর এলাকার অবাঙ্গালী ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার (ছবির বাসা, ঘোড়াপীর মাজারের পাশে) সামনে যেতেই এক কিশোর ঐ বাসার দেয়ালে একটি উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামিয়ে ফেলতে যান সবার অলক্ষ্যে। আর তখনই বাসার ভেতর থেকে মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন ৭ম শ্রেণীর ছাত্র কিশোর শংকু সমজদার । মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ কিশোরকে মুসলিম উদ্দিন কমিশনার পাঁজাকোলা করে নিয়ে দৌড়লেন হাসপাতালের দিকে। কিন্তু ততোক্ষণে ইতিহাস রচিত হয়ে গেছে। পথেই কিশোর শংকু মারা যান। হয়ে যান ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে রংপুর অঞ্চলের প্রথম শহীদ তো সেই কিশোরই। অনেকের মতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রথম শহীদ এই কিশোরই।

ইতোমধ্যে শংকুর শহীদ হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো রংপুর। কিশোর শংকুর গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ দেখে জনতা উত্তেজিত হয়ে সারা শহরে অবাঙ্গালীদের দোকান ভাংচুর, সামগ্রী রাস্তায় এনে অগ্নি সংযোগ করতে থাকে। যে বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল সেই বাড়িতে অগ্নি সংযোগের চেষ্টা কালে ইপিআর বাহিনী এসে বাঁধা দান করে।

একই দিনে আরও দুইজন নিহত হয়েছেন অবাঙ্গালীদের হাতে। তাঁদের একজনের নাম আবুল কালাম আজাদ, যাকে গিনি এক্সচেঞ্জের (বাটার গলির পাশে, মেইন রোডের সাথেই, এখনকার রেইনবো প্লাজা) সামনে এক অবাঙ্গালী গুলি করে হত্যা করে। অপরজন জেনারেল বুট হাউসের (ঢাকা হোটেলের গলির পাশে, টাইম হাউস, ক্রোকারিজ মার্কেটের বিপরীতে) সামনে ছোড়ার আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। নাম ওমর আলী। বাসা শহরের মুলাটোলে। এছাড়াও সেদিন আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। যাঁদের একজন শরিফুল ইসলাম মকবুল এক মাস হাসপাতালে থেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। পায়ে গুলিবিদ্ধ মোঃ আলী বেঁচে যান। তিনি ছিলেন রংপুর কলেজ ছাত্র সংসদের বিশ্রামাগার সম্পাদক।

৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে রংপুরের ০৩ মার্চের ঘটনা উচ্চারিত হয়েছে গর্বের সাথে। আজকের এই দিন গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি শহীদ শংকু সমজদার, শহীদ ওমর আলী, শহীদ আবুল কালাম আজাদ, শহীদ শরিফুল ইসলামসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া সকল শহীদদের।তোমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, আমরা তোমাদের ভুলবো না।

 

 

কিশোর শংকু সমজদার

মুগ্ধতা.কম

২ মার্চ, ২০২০ , ২:০৬ অপরাহ্ণ

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরে এই দিনে

মার্চ মাস বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় মাস। রক্তঝরা উত্তাল মার্চ। ঐতিহাসিক মার্চ। একটি পতাকার মাস।

উত্তাল রক্তঝরা এই মার্চ মাসে সারাদেশের ন্যায় রংপুরেও ঘটেছিল ঐতিহাসিক বেশকিছু ঘটনাবলী। আমরা অনেকেই বিস্মৃত হয়েছি; অনেকেই জানিনা । এছাড়া এই প্রজন্মের জন্য জানাটাও প্রয়োজন কীভাবে এলো লাল সবুজের পতাকা। রংপুরবাসীর ছিল কতো ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ।

১মার্চ ১৯৭১ এক বেতার ঘোষণার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদের পূর্ব ঘোষিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এভাবে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনসাধারণের ১৯৭০ সালের নির্বাচনী রায়কে পদদলিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অর্জন করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো এই ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা।

বাঙালি জাতি এই অন্যায় আদেশ মাথা পেতে নেয়নি। দেশবাসী অধীর আগ্রহে আশা করছিলো বাঙালির প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় যাচ্ছেন।

ইয়াহিয়ার কূটকৌশল বুঝে ১ মার্চ সংসদীয় দলের বৈঠক ডেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। তিনি এরপর কি করণীয় সে ব্যাপারে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জানিয়ে দেবেন বলে জানালেন।

২ মার্চ রংপুরে ১১ দফা আন্দোলনের নেতা- কর্মীরা শহরের সেন্ট্রাল রোডের পাঙ্গা হাউসের ছাদে ( পাঙ্গা হাউস বর্তমানে অবলুপ্ত। এ সংক্রান্ত রিয়াদ আনোয়ার শুভর একটি পোস্ট আছে। বর্তমান গ্রামীণ ফোন সেন্টারের ওখানে ছিল ওই ভবনটি বলে জানা যায়। ) অনেক রাত অব্দি একটা সভা করে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আব্দুর রউফ। সভায় আরো যাঁদের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন গ্রন্থ ও লেখায় জানা যায় তাঁরা হলেন সর্বজনাব রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সে সময়ের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গোলাপ, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ জাকির আহমেদ সাবু, ছাত্রনেতা হারেছ উদ্দিন সরকার (মুক্তিযুদ্ধে বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে ডেপুটি চিফ হুইপ), অলক সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, আবুল মনসুর আহমেদ, মাহবুবুল বারী, খন্দকার মুখতার ইলাহী, জিয়াউল হক সাবু, জায়েদুল, নূরুল হাসানসহ অন্যান্য নেতা কর্মীবৃন্দ।

রংপুর জেলা আওয়ামী লীগ পর্যায়ের নেতা সিদ্দিক হোসেন এম সি এ ,শেখ আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট এম এ গণি, শাহ আব্দুর রাজ্জাক এম সি এ, হামিদুজ্জামান এম সি এ, গাজী রহমান এম সি এ, তৈয়বুর রহমান, আবুল হোসেন, মীর আনিসুল হক পেয়ারা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ রংপুরে গড়ে ওঠা সে সময়ের প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। তাঁরা ছাত্রদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

পাঙ্গা হাউসের সভা শেষে ছাত্রলীগ সভাপতি এবং ১১ দফা আন্দোলনের ছাত্রনেতা আব্দুর রউফ জানিয়ে দেন যে, সংগ্রাম ছাড়া সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রতিরোধ আন্দোলন করার উদ্দেশ্যে গণসংযোগ শুরু করেন। রংপুর শহর জেলার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এখান থেকে জেলার অন্যত্র সব সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দিক নির্দেশনা দেয়া হতো।

তখনও কেউ জানতেন না কিংবা ধারণাও করতে পারেননি ৩ মার্চ রংপুরে কি অপেক্ষা করছে।

# তথ্যসূত্রঃ রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে শ্রদ্ধেয় শাহ্ আব্দুর রাজ্জাক ও মুকুল মোস্তাফিজ রচিত ‘মুক্তিযুদ্ধে রংপুর ‘,রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ থেকে প্রকাশিত ‘ মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর ‘, ও শ্রদ্ধেয় মুকুল মোস্তাফিজ রচিত ‘ মুক্তিযুদ্ধে রংপুর ‘ গ্রন্থ।

( মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি তখন কোলের শিশু। আমাদের গৌরবের এই রক্তঝরা সময়ের ইতিহাস জানার চেষ্টা আমার প্রবল। আমি চাই আমার ও আমাদের সন্তানরা এই গৌরম্বান্মিত ইতিহাস জানুক। এ কারণে আমার এই প্রচেষ্টা। আমি এসব গ্রন্থে যেভাবে ও যাঁদের নাম পেয়েছি সেভাবেই লিখেছি। কারো নাম বাদ গেলে তা আমার পুরোপুরি অজ্ঞতা ও অনিচ্ছায়।)

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরে এই দিনে