ইদ সংখ্যা ২০২১

কিছু অপ্রকাশিত পাপ

কিছু অপ্রকাশিত পাপ

সহযোগী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ)
প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর
ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ
Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)

আক্কাস কবে প্রথম এসেছিল এই গ্রামে এবং এসে বাড়ি করেছিল কেউ তা বলতে পারে না। কিন্তু তার কথা সবাই জানে। জানে মানে গল্পের আসরে তার নাম উঠে আসবেই। পাকুড় গাছের নীচে যেখানে আক্কাসের দোকান ছিল সেখানে বসলেই তার কথা আসে। এখন সেখানে

আবীরের দুরন্ত বাই-সাইকেল

আবীরের দুরন্ত সাইকেল

বাসা নং-৩২, রোড নং-১/১, মাদ্রাসা রোড, মুনসীপাড়া, রংপুর ৷

কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও রংপুর আইন কলেজের প্রাক্তন ছাত্র৷ খেলাধুলা, নাট্ট চর্চা ও লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবৎ উন্নয়ন কর্মি হিসেবে কাজ করছেন৷
Latest posts by রবীন জাকারিয়া (see all)

আসাদ সাহেব একজন সাধারণ চাকুরীজীবি মানুষ৷ তাঁর উপার্জনে চারজন মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়৷ আটপৌঢ়ে জীবন নিয়েই তিনি নিজেকে পৃথিবীর সুখী মানুষ ভাবেন৷ ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি, নাট্য চর্চাসহ ভালো ফুটবলার ছিলেন৷ ইচ্ছে ছিল

তাজনিন মেরিন লোপার গল্প - ট্র্যাগাস - ৪

জেমি ও ট্রাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

দুইদিন হলো জেলেনের বাসায় থাকছে ওরা। বাসায় জেলেন আর তার কুকুর ট্রাগাস। এই দুইদিনে ট্রাগাসের কেয়ারিং আর কথা বোঝার ক্ষমতা দেখে উষা, সান দুজনেই খুব অবাক। টিভিতে সাপের একটা ভিডিও চলছিল, কেউ খেয়াল

লিপিকা লিপির গল্প - বধু বরণ

বধু বরণ

Latest posts by লিপিকা লিপি (see all)

কানের কাছে চুপি চুপি কথা বলার আকর্ষণ ছাড়ে না মৃত্তিকার। সৃজন ধমকের স্বরে বহুবার সরে যায় মৃত্তিকার কাছ থেকে একবার পড়েই দেখো.. মিনতির সুরে মৃত্তিকার মিনতি। মন্দ লাগছে না। সৃজনের পাষান হৃদয়ও গলে জল হয়ে যায় ভাষা আন্দোলন

গল্প - চোখ

চোখ

সহযোগী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ)
প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর
ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ
Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)

আসরের নামাজ শেষে সবুরকে যখন বৈকুন্ঠপুর বাজারে আনা হলো, তখন সবে জমে উঠেছে বাজার। এখানে সোম আর বৃহস্পতিবার হাটবার। তাছাড়া অন্যদিনগুলো বাজার। শতবর্ষী বটগাছের তলে তাকে যখন বাঁধা হলো তখন উৎসুক ছেলে-ছোকড়ারা মজার আশায় গোল হয়ে ঘিরে থাকল সবুরকে। বটগাছের উত্তর দিকে কয়েকটা রুই আর পুঁটি নিয়ে বসে আছে কজন মাছ বিক্রেতা। কেনাবেচা আজ তেমন […]

গল্প - প্রোপা

প্রোপা

Latest posts by এলাহী মিনহা (see all)

প্রোপা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে! কাঁদলে তাকে কেমন দেখায়, কাঁদলে তার চেহারায় কতটা অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে এটাই সে দেখতে চায়।কারণ তার ধারনা সে কাঁদলে কেউ বুঝতে পারে না! তার কান্নাতে কারো মন একটুও গলে না! হয়তো চেহারায় অতটা অসহায়ত্ব

গল্প- ট্র্যাগাস - ৩

ট্র্যাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

পর্ব-৩ নীল সাপ নীচের লন্ড্রিতে কাজ করছিল উষা। হঠাৎ জেমির আওয়াজ পেয়েই দৌড়ে উঠে গেল। কোথায় ছেলেটা? মা মা করেই যাচ্ছে। তার মনে হলে আওয়াজটা উপর থেকে আসছে। তাকিয়ে দেখল আসলেই তো। সিলিংয়ের কাছের সবচেয়ে উপরের কাবার্ডটায় ঝুলে

মাসুদ বশীরের গল্প - ভালো মানুষ

ভালো মানুষ

জন্মস্হানঃ গোমস্তা পাড়া, রংপুর।
জন্ম তারিখঃ সেপ্টেম্বর ০৪, ১৯৬৭ সাল।
রাশিঃ কন্যা।
পরিচয়ঃ কবি, গল্পকার, লেখক ও উন্নয়ন কর্মী।
লেখালেখির শুরুঃ ১৯৮০ সাল থেকে।
প্রথম প্রকাশিত লেখাঃ কবিতা(প্রতিদান), ১৯৮৪ সাল।
প্রকাশিত বইঃ প্রতীক্ষায় প্রতিদিন(কবিতা), ১৯৯০ সাল।
পুরস্কারঃ দেশব্যাপী অভিযাত্রিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায়(১৯৯১ সাল) কবিতা বিষয়ে ১ম স্হান অর্জন।
প্রিয় ব্যক্তিত্বঃ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)।
প্রিয় কবিঃ কাজী নজরুল ইসলাম।
প্রিয় সঙ্গীতঃ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
প্রিয় বিশ্বাসঃ স্বার্থহীন ভালোবাসা।
নিজের প্রিয় উক্তিঃ "মনের চেয়ে বড় গতি কিছু নেই, সুন্দর মনের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই"
প্রিয় ফুলঃ লাল গোলাপ।
প্রিয় রংঃ সবুজ।
প্রিয় শখঃ খোলা সবুজ প্রান্তরে একাকী বসে থাকা।
মাসুদ বশীর
Latest posts by মাসুদ বশীর (see all)

সামাদ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। যথারীতি এ্যাটেনডেন্স খাতা খুলে রোল কল করতে লাগলেন। এটা চলছে ৫ম পিরিয়ড। এ পিরিয়ডে রোল কল! কারণ হচ্ছে টিফিন আওয়ারের পরে অনেক ছাত্রই ইদানিং স্কুল পালাচ্ছে, তাদের আইডেনটিফাই করতেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

তাজনিন মেরিন লোপার গল্প - ট্র্যাগাস(বাস)

ট্র্যাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

পর্ব-১ বাস থেকে নেমে খেয়াল করলাম, সন্ধ্যাটা আরও অন্ধকার হয়ে উঠেছে । বাস স্টপে দাঁড়িয়ে ভাবছি, বাসা কোনদিকটায়। নতুন বাসায় উঠার পর হারিয়ে যাওয়া বাসা খুঁজে না পাওয়া এমন নতুন কিছু না । সানাউল, আমার স্বামী, মজা করে বলে আমি জিওগ্রাফিতে

মাতৃভাষা দিবস সংখ্যা ২০২১ - পদাবলি

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

১৩ এপ্রিল, ২০২১ , ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

কিছু অপ্রকাশিত পাপ

সহযোগী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ)
প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর
ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ
Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)

আক্কাস কবে প্রথম এসেছিল এই গ্রামে এবং এসে বাড়ি করেছিল কেউ তা বলতে পারে না। কিন্তু তার কথা সবাই জানে। জানে মানে গল্পের আসরে তার নাম উঠে আসবেই। পাকুড় গাছের নীচে যেখানে আক্কাসের দোকান ছিল সেখানে বসলেই তার কথা আসে। এখন সেখানে (more…)

কিছু অপ্রকাশিত পাপ

রবীন জাকারিয়া

৯ মার্চ, ২০২১ , ১০:৫১ অপরাহ্ণ

আবীরের দুরন্ত সাইকেল

বাসা নং-৩২, রোড নং-১/১, মাদ্রাসা রোড, মুনসীপাড়া, রংপুর ৷

কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও রংপুর আইন কলেজের প্রাক্তন ছাত্র৷ খেলাধুলা, নাট্ট চর্চা ও লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবৎ উন্নয়ন কর্মি হিসেবে কাজ করছেন৷
Latest posts by রবীন জাকারিয়া (see all)

আসাদ সাহেব একজন সাধারণ চাকুরীজীবি মানুষ৷ তাঁর উপার্জনে চারজন মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়৷ আটপৌঢ়ে জীবন নিয়েই তিনি নিজেকে পৃথিবীর সুখী মানুষ ভাবেন৷ ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি, নাট্য চর্চাসহ ভালো ফুটবলার ছিলেন৷ ইচ্ছে ছিল (more…)

আবীরের দুরন্ত বাই-সাইকেল

তাজনিন মেরিন লোপা

৯ মার্চ, ২০২১ , ১০:৩৫ অপরাহ্ণ

জেমি ও ট্রাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

দুইদিন হলো জেলেনের বাসায় থাকছে ওরা। বাসায় জেলেন আর তার কুকুর ট্রাগাস। এই দুইদিনে ট্রাগাসের কেয়ারিং আর কথা বোঝার ক্ষমতা দেখে উষা, সান দুজনেই খুব অবাক। টিভিতে সাপের একটা ভিডিও চলছিল, কেউ খেয়াল (more…)

তাজনিন মেরিন লোপার গল্প - ট্র্যাগাস - ৪

লিপিকা লিপি

১ মার্চ, ২০২১ , ১১:৪২ অপরাহ্ণ

বধু বরণ

Latest posts by লিপিকা লিপি (see all)

কানের কাছে চুপি চুপি কথা বলার আকর্ষণ ছাড়ে না মৃত্তিকার। সৃজন ধমকের স্বরে বহুবার সরে যায় মৃত্তিকার কাছ থেকে একবার পড়েই দেখো.. মিনতির সুরে মৃত্তিকার মিনতি। মন্দ লাগছে না। সৃজনের পাষান হৃদয়ও গলে জল হয়ে যায় ভাষা আন্দোলন (more…)

লিপিকা লিপির গল্প - বধু বরণ

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ , ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

চোখ

সহযোগী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ)
প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর
ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ
Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)

আসরের নামাজ শেষে সবুরকে যখন বৈকুন্ঠপুর বাজারে আনা হলো, তখন সবে জমে উঠেছে বাজার। এখানে সোম আর বৃহস্পতিবার হাটবার। তাছাড়া অন্যদিনগুলো বাজার। শতবর্ষী বটগাছের তলে তাকে যখন বাঁধা হলো তখন উৎসুক ছেলে-ছোকড়ারা মজার আশায় গোল হয়ে ঘিরে থাকল সবুরকে। বটগাছের উত্তর দিকে কয়েকটা রুই আর পুঁটি নিয়ে বসে আছে কজন মাছ বিক্রেতা। কেনাবেচা আজ তেমন জমেনি, আজ বুধবার। বটগাছ ঘিরে এ বাজারের দক্ষিণ দিকে  বড়া-পিয়াজুর দোকান। বিহারি সোবহান পিয়াজু ভাজছে আর নজর রাখছে সবুরকে ঘিরে ভিড়ের দিকে। আজ একজন কর্মচারী আসেনি, নাহলে জটলার কাছে যাওয়া (more…)

গল্প - চোখ

এলাহী মিনহা

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ , ১১:৫৪ অপরাহ্ণ

প্রোপা

Latest posts by এলাহী মিনহা (see all)

প্রোপা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে!

কাঁদলে তাকে কেমন দেখায়, কাঁদলে তার চেহারায় কতটা অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে এটাই সে দেখতে চায়।কারণ তার ধারনা সে কাঁদলে কেউ বুঝতে পারে না! তার কান্নাতে কারো মন একটুও গলে না! হয়তো চেহারায় অতটা অসহায়ত্ব (more…)

গল্প - প্রোপা

তাজনিন মেরিন লোপা

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ , ৮:১৫ অপরাহ্ণ

ট্র্যাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

পর্ব-৩

নীল সাপ

নীচের লন্ড্রিতে কাজ করছিল উষা। হঠাৎ জেমির আওয়াজ পেয়েই দৌড়ে উঠে গেল। কোথায় ছেলেটা? মা মা করেই যাচ্ছে। তার মনে হলে আওয়াজটা উপর থেকে আসছে। তাকিয়ে দেখল আসলেই তো। সিলিংয়ের কাছের সবচেয়ে উপরের কাবার্ডটায় ঝুলে (more…)

গল্প- ট্র্যাগাস - ৩

তাজনিন মেরিন লোপা

৮ জানুয়ারি, ২০২১ , ৮:২৬ অপরাহ্ণ

ট্র্যাগাস ২

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

পর্ব ২

** মুগ্ধতা ডট কমের নিয়মিত লেখক তাজনিন মেরিন লোপার আজ জন্মদিন। জন্মদিনে আমরা তাঁকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।**

দোলনচাঁপা
(more…)

ট্র্যাগাস ২ 7

মাসুদ বশীর

৩০ নভেম্বর, ২০২০ , ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

ভালো মানুষ

জন্মস্হানঃ গোমস্তা পাড়া, রংপুর।
জন্ম তারিখঃ সেপ্টেম্বর ০৪, ১৯৬৭ সাল।
রাশিঃ কন্যা।
পরিচয়ঃ কবি, গল্পকার, লেখক ও উন্নয়ন কর্মী।
লেখালেখির শুরুঃ ১৯৮০ সাল থেকে।
প্রথম প্রকাশিত লেখাঃ কবিতা(প্রতিদান), ১৯৮৪ সাল।
প্রকাশিত বইঃ প্রতীক্ষায় প্রতিদিন(কবিতা), ১৯৯০ সাল।
পুরস্কারঃ দেশব্যাপী অভিযাত্রিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায়(১৯৯১ সাল) কবিতা বিষয়ে ১ম স্হান অর্জন।
প্রিয় ব্যক্তিত্বঃ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)।
প্রিয় কবিঃ কাজী নজরুল ইসলাম।
প্রিয় সঙ্গীতঃ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
প্রিয় বিশ্বাসঃ স্বার্থহীন ভালোবাসা।
নিজের প্রিয় উক্তিঃ "মনের চেয়ে বড় গতি কিছু নেই, সুন্দর মনের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই"
প্রিয় ফুলঃ লাল গোলাপ।
প্রিয় রংঃ সবুজ।
প্রিয় শখঃ খোলা সবুজ প্রান্তরে একাকী বসে থাকা।
মাসুদ বশীর
Latest posts by মাসুদ বশীর (see all)

সামাদ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। যথারীতি এ্যাটেনডেন্স খাতা খুলে রোল কল করতে লাগলেন। এটা চলছে ৫ম পিরিয়ড। এ পিরিয়ডে রোল কল! কারণ হচ্ছে টিফিন আওয়ারের পরে অনেক ছাত্রই ইদানিং স্কুল পালাচ্ছে, তাদের আইডেনটিফাই করতেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। (more…)

মাসুদ বশীরের গল্প - ভালো মানুষ

তাজনিন মেরিন লোপা

৩০ নভেম্বর, ২০২০ , ৭:৪৯ অপরাহ্ণ

ট্র্যাগাস

জন্ম রংপুরের এক সাহিত্যানুরাগী পরিবারে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, রংপুরের জনপ্রিয় মুখ। ’যুগের আলো’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হিসেবে লিখেছেন ছড়া, কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প, লিখেছেন কলাম।

ঢাকায় ‘ছোটদের কাগজ’ এ লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে ২০১৯ একুশে বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করছেন 'ডাইনীর ফলবাগান', ২০২০ এ 'অস্ট্রেলিয়ার রূপকথা’ বই নিয়ে।

নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বাংলাদেশে কলেরা হাসপাতালে সামাজিক গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অনেকদিন। খুব সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এর অনুদানে পরিচালিত ’হিপ্পি অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি সংস্থায় টিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। সংস্থাটি  মূলত তাদের নিজেদের কারিকুলামে কমিউনিটির ছোট শিশুদের মানসিক ও ইতিবাচক সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে।

বর্তমান নিবাস আরমিডেল, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)

পর্ব-১

বাস থেকে নেমে খেয়াল করলাম, সন্ধ্যাটা আরও অন্ধকার হয়ে উঠেছে । বাস স্টপে দাঁড়িয়ে ভাবছি, বাসা কোনদিকটায়। নতুন বাসায় উঠার পর হারিয়ে যাওয়া বাসা খুঁজে না পাওয়া এমন নতুন কিছু না । সানাউল, আমার স্বামী, মজা করে বলে আমি জিওগ্রাফিতে (more…)

তাজনিন মেরিন লোপার গল্প - ট্র্যাগাস(বাস)

মুগ্ধতা.কম

২১ আগস্ট, ২০২০ , ৬:৪৫ অপরাহ্ণ

নীচের তলার ওরা

ভারতের রাজধানী, নতুন দিল্লী। এখানেরই একটি পাঁচ-ছ’তলা বিল্ডিং। পুরো এলাকায় এরকম প্রচুর বিল্ডিং আছে। তো রাস্তার ধারেই এটি। রাস্তার ওপাশে একটি বিরাট টেন্ট হাউস। প্রায়ই অনুষ্ঠান হয়। যখন হয় না তখন এটি পাড়ার খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তা…..

এই বিল্ডিং-এর নীচের তলায় ওরা থাকে। এর সামনের অংশটা কার ও বাইক পার্কিং। পিছনের অংশটায় দুটি ওয়ান বি. এইচ. কে. ফ্ল্যাট আছে। দোতলায় সামনের দিকে দুটি টু বি. এইচ. কে. এবং পিছনের দিকে একটি থ্রি বি. এইচ. কে. ফ্ল্যাট আছে। তিন ও চার তলায় দোতলার মতই। আর পাঁচ তলায় সামনের দিকে ছাদ আর পিছনের দিকে একটি থ্রি বি. এইচ. কে. ফ্ল্যাট আছে। এর ওপরে ছাদ। ছ’তলা-টোটাল।

website

নীচের তলার ফ্যামিলির ব্যাপারে তাহলে সত্য গল্পটি এখন প্রকাশ করি, ক্যামন!

এরা পাঞ্জাবি পরিবার। লোকটি প্রপার্টি ডিলারের কাজ করে। নীচের দুটি ফ্ল্যাটই এদের। একটিতে নিজেরা থাকে আর অন্যটি ভাড়া দিয়ে রেখেছে।

প্রথম বউটি সংসারের সব কাজ করে। আবার একটি বিউটি পার্লারে গিয়ে পার্ট টাইম জবও করে। এর একটি মেয়ে। ক্লাস নাইনে পড়ে। ও নাইনে উঠতে এরা এখানে ফ্ল্যাট দুটি কিনে নিয়ে বাস করতে এসেছে। আগে পাঞ্জাবে থাকতো। এখন সেখানে বাবা, মা থাকে।

এই মেয়েটি যখন জন্মালো তখন ওদের বিয়ের পাঁচ বছর হয়েছে। আঁতুরের বোনঝিকে দেখতে মাসি এলো। মাসি অবিবাহিতা। দিল্লীতেই থাকে। একটি সরকারি আদালতে চাকরি করে। তার সঙ্গে দিদিমা ও দাদুও এলো, নাতনির মুখ দেখতে। কয়েকদিন বাদে নানা ও নানি নিজের বাড়ি চলে গেল। মাসি থেকে গেল। এখানে থেকে দিদির দেখাশোনা করতে লাগলো। অফিসের ছুটি নিয়ে রইল। দিদির তো সিজারিয়ান কেস। বোনকে কাছে পেয়ে দিদি খুব খুশি। ওর জামাইবাবুও বেশ আনন্দিত। দিনরাত কেটে যাচ্ছে।

তিনমাস পর শালি খুব বমি করছে। দিদি তো ওর বরকে বলে ডাক্তার ডাকালো, ডাক্তার এলেন। উনি বললেন, ” ইনি তো প্রেগন্যান্ট।” কিছু মেডিসিন প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়ে চলে গেলেন।

দিদি বলল, ” বল কে? আমরা তার সঙ্গে তোর শাদি দিয়ে দেবো, এখনই।”

বোন কী বলবে? দিদি জোর করতে লাগলো।

বোন- দিদিরে তোর বর।

দিদি- হ্যাঁ? কী বলছিস, তুই? এই বোন!

বোন-হ্যাঁ রে দিদি! আই লাভ মাই জামাইবাবু! আমি জিজাজিকেই বিয়ে করবো।

দিদি পাথর দৃষ্টি নিয়ে বোনের দিকে তাকিয়েই রইলো, আকাশ ভেঙে পড়লো যে ওর মাথায়।

এরপর আর বিয়ে হলো না। তবে চিরদিনের জন্য সে সতীন হয়ে রয়ে গেল। চাকরি ছেড়ে দিলো। এরপর এরও এক মেয়ে সন্তান জন্ম নিল।

বর বড়র ঘরে শোয় না। ছোটর ঘরেই রাত কাটায়। দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস যায়। বছর যায়। ছোটর মেয়েটি সাত বছরের হল। নিজের মেয়েরও একে, দুজনকেই বড় লালন পালন করে। সংসারের সব কাজ আবার বিউটি পার্লারের কাজ। বোন পটের বিবি। বর তার কাছে লেপ্টে থাকে। বড় তো একেবারে কঙ্কালসার। আর ছোট টসটসে। বরও লাল্টু। দিনরাত টলছে। পাঁড় মাতাল। সপ্তাহে একদিন করে কাবাড়িওলা এসে খালি বোতলগুলি বস্তায় ভরে কিনে নিয়ে যায়। বিদেশী ব্র্যান্ডের সব, দামি। প্রথমে বিয়ের পর একটি কার কিনেছিল। এবার আর একটি কিনলো। দুটি ফ্ল্যাট। দুটো কার। দুটি বউয়ের তো।

একদিন খুব চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে। বিল্ডিং-এর সবাই নীচে নেমে এসেছে। ধাক্কা দিয়ে ওদের গেট খোলানো হল। বড় বউটি ডাক্তার ডাকছে, ফোন করে। বর ছোটকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে, খাটের ওপরে। মেয়েদুটি কাঁদছে। কভ ব্যাপার? দিদি বলল-

“ছোট এক শিশি ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিয়েছে।”

হ্যাঁ, বর তো রোজ রাতে খেয়ে ঘুমোয়, তাই ঘরে আছেই। ডাক্তার এলেন। চিকিৎসা করার জন্য তাঁর নার্সিং হোমে ভর্তি করে নিয়ে গেলেন। এবার পুলিশকে বড় বউটি ফোন করে নিয়ে এলো। বলল- ” আমাকে আমার বর ও বোন দুজনে মিলে গলা টিপে হত্যা করতে যাচ্ছিল। আমি কোনোপ্রকারে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছি। এরপর তিনজনে খুব ঝগড়া হয়। আর বোন ঝট করে গিয়ে, ঘুমের ওষুধ খায়।” পুলিশের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিল বর। পুলিশ চলে গেল। এর কয়েক দিন পর ছোটও সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে এলো। ওরা একসঙ্গে থাকে।

একজন বঞ্চিতা। ও বলে, ” আমি তো বর থাকতেও বিধবা। ”

আর একজন জবর দখল করে সুখ ভোগ করছে।

চোখের সামনে বর ছোটর মেয়েকে আদর করছে আর তার মেয়েকে বকাবকি করছে। ওরা তিনজন বাইরে কারে করে ঘুরতে যাচ্ছে। ওর মেয়ে কেঁদে ভাসছে। ওর মেয়েকে সাধারণ স্কুলে পড়াচ্ছে। আর ছোটর মেয়ে খুব নামিদামি স্কুলে পড়ছে। ওর মেয়ে মায়ের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যায় ও আসে। আর ছোটর মেয়েকে কারে করে তার বাবা স্কুলে দিতে যায়। নিতেও যায়। ওদের দামি দামি পোশাক। এদের কমদামি। চলছে এভাবেই…।

আর একদিন সেদিনও খুব হৈহল্লা হচ্ছে। সবাই নিচে নেমে দেখলো- বউ দুটির মা  ও বরের মা, দুজনে এসেছে। বর বলছে, ” আপনার বড় মেয়েকে এখান থেকে নিয়ে যান! আমি ওকে আমার এখানে রাখতে চাই না। ”

বড় বউটিকে ওর মা বলল, ” চ, তুই আমার ওখানে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকবি! ” তখন বরের মা বলল, ” না না না, আমি একেই আমার পুত্রবধূরূপে মানি। আমি আমার নাতনী ও বৌমাকে নিয়ে গিয়ে আমার ওখানে রাখবো। ” তখন বড় বলল, ” আমি আমার স্বামীর ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না। মরতে হয় যদি, পতির হাতেই মরব। ” অনেক বোঝালো ওকে, দু মায়েতে মিলে। কিন্তু ও গেল না। ওরা দু মা যে যার আপন ঘরে ফিরে চলে গেল। আর এও নিজের স্বামীর ঘরেই রয়ে গেল।

এ যুগেও এরকম পতিব্রতা রমণী আছে…!

 

নয়াদিল্লি, ভারত থেকে

 

নীচের তলার ওরা-অঞ্জলি দে নন্দী মম.jpg

মুগ্ধতা.কম

১৭ জুন, ২০২০ , ১০:৩১ অপরাহ্ণ

একটি আত্মা এবং অন্যান্য

ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে শ্রীকান্তের গান- মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে যার চোখে/ তাকে আর মনে পড়ে না। শ্রীকান্তের গানের মধ্যে কী যেন একটা যাদু আছে! দুলালের বড় ভালো লাগে। দুলাল মাইক্রোবাসের ভিতরে বসে বসে গান শুনছে। আজ একটা ভাড়াও পায়নি। ওর সহকারী দশ বছরবয়সী লিটু জ্বরে আক্রান্ত বলে আজ আসতে পারেনি। লিটুর সঙ্গ সুপ্রসন্ন। লিটু আছে থেকেই প্রতিদিন তিন-চারটা ভাড়া জুটে যায়। আজ লিটু আসেনি বলেই কি ভাড়ার খরা? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই মাঝবয়সী একটা লোক কাঁচের জানালায় মোবাইলের আলো ফেলে দুলালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জানালার কাঁচ নিচে নামিয়ে হাসি মুখে দুলাল সম্ভাষণ জানায় ভাবী কাস্টমারকে। আসসালামুআলাইকুম চাচা। গাড়ি লাগবে নাকি? লোকটি সালাম নিয়ে বলে, কালীগঞ্জ যাবেন?

– কালীগঞ্জেই না গ্রামের ভিতরে?

– একটু ভিতরে। গেলে বলেন।

কালীগঞ্জ, সে তো এখান থেকে অর্থাৎ রংপুর মেডিকেল থেকে অনেক দূর। যেতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগবে। এখন বাজে রাত নয়টা। ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা বেজে যাবে। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি হয় দুলাল।

– ভাড়া সাড়ে তিন হাজার দেওয়া লাগবে। দুলাল ভাড়া বলার মাধ্যমেই তার সম্মতি জ্ঞাপন করে।

– আনার সময় তো আড়াই হাজার দিয়া নিয়া আসছি। আজ দুপুরেই আনছি। এতো ভাড়া চাইলে কেমন করি হয়!

কাস্টমারকে ফিরানোর কোনো ইচ্ছা নেই দুলালের। শেষ পর্যন্ত ঐ আড়াই হাজারেই থিতু হয় দুলালের চাহিদা। হাসপাতালের গেটের কাছে গাড়ি নিয়ে আসলে উপর থেকে স্ট্রেচার আসে। সঙ্গে আসা মহিলার বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় দুলাল বুঝে নেয় স্ট্রেচারে রোগী নয়, লাশ আর কান্নারত মহিলাটি- লাশটি এতোদিন পৃথিবীতে যে অস্তিত্ব নিয়ে ছিলো তার মা। লাশটা গাড়িতে তোলার সময় দুলালও সাহায্য করে। ধরাধরি করার সময় ঢেকে রাখা মুখটা উন্মোচিত হলে দুলাল দেখতে পায় লাশের মুখের চারপাশে ফেনা। কী রকম একটা চেনা চেনা গন্ধ! কিশোরী মেয়েটি যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে তা আর বুঝতে বাকি থাকে না দুলালের। মেয়েটির চোখ দুটো আধা খোলা। যেন চেয়ে চেয়ে দেখছে ওকে। লাশের সহগামী চারজন।

লালমনিরহাট পেরিয়ে, আদিতমারী পেরিয়ে কালীগঞ্জে মাইক্রোবাস এলে লাশ হওয়া কিশোরীর বোন জামাই পথ বাতলায়। ভিতরে আরো অনেক দূর আসতে হয়। নিতান্ত পল্লী এলাকা। কাঁচা রাস্তা। চারপাশে আবাদী জমি। বসত বাড়ির সংখ্যা কম। বিদ্যুৎ নেই। রাস্তাঘাটও সংকীর্ণ। তাই আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে হয়। বারবার দুলাল জিজ্ঞাসা করে, ভাই আর কতোদূর? পথ প্রদর্শনকারী ‘এই তো আরেকটু সামনে’ বলতে বলতে দুলালের মেজাজটা বিগড়িয়ে দেয় কিন্তু তা প্রকাশের কোনো সুযোগ পায় না সে। এমনিতেই মানুষগুলো শোকে আছে। কিশোরীর মায়ের কান্নার শব্দে কানে তালা লেগে গেছে ওর। মেয়ের ভাই দু’জন একবার ‘আম্মা কাঁদেন না তো’ বললে মা চিৎকার করে ওঠে- চুপ পাষাণের দল।

ইতিমধ্যে বাড়ির লোকজন মোবাইলে খবর পেয়েছে। বিদ্যুৎ না আসলেও এসব এলাকায় মোবাইল ঠাঁই করে নিয়েছে স¦স্থান। হ্যাজাক লাইট জ্বলছে দুইটা। অনেক লোকের সমাগম। গাড়ি আসলে কান্নার শব্দ আরো তীব্র হতে থাকে। পাড়া প্রতিবেশিরা এসে কিশোরির প্রস্থানে তাদের হৃদয়ে কতোটুকু ব্যথা তা প্রদর্শনার্থে গলা জুড়ে দেয় পরিবারের অন্যান্যের সাথে। দু’একজন সান্ত¦না বাক্য শোনায়। কাঁদেন না। আল্লাহর নাম নেও। কলমা পড়ো।

ভাড়া পাওয়ার জন্য বাইরে দেয়া একটা চেয়ারে বসে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় দুলালকে। গ্রামের মানুষদের টাকা-পয়সা সবসময় রেডি থাকে না, তা জানে সে। তাই অপেক্ষা করতে কোনো সমস্যা নেই ওর। তাছাড়া এতোগুলো মানুষের কান্নায় ভারী হওয়া পরিবেশ ওর মনেও ব্যথার সৃষ্টি করে। কতোই বা বয়স হয়েছিলো মেয়েটির? পনের-ষোলোর বেশি নয়। মেয়েটি কেনো আত্মহত্যা করলো তার কারণ প্রেমঘটিত কিছু, একপ্রকার ধারণা পোষণ করলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাশ দিয়ে যাওয়া একটা ছেলেকে ডেকে সে জিজ্ঞাসা করে। ছেলেটি জবাব না দিয়ে নীরবে চেয়ে থেকে ভিতরে চলে যায়।

গাড়ি নিয়ে যখন সে রংপুর অভিমুখে রওনা হয় তখন রাত একটা। কাঁচা রাস্তাই পেরুতে হবে প্রায় দশ মাইল। কিছুদূর আসার পর একটা কান্নার শব্দ দুলালের কানে আসে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কান্নার শব্দ। ছোট্ট মেয়েরা কোনো আবদার করে, না পেলে যেমন নাকি সুরে কান্না জুড়ে দেয় তেমন। শব্দটা আসছে মাইক্রোবাসের পিছন থেকে। শরীরটা হিম হয়ে আসে দুলালের। কান্নার সুর নাকি থেকে তীব্র হলে দুলাল গাড়িটা থামায়। গাড়ি ঐ বাড়িতে রাখার সময় ভিতরে কোনো বাচ্চা ঢুকে বসে আছে না তো? দুলাল ভিতরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিয়ে পিছনের সিটগুলো উঁকি দিয়ে দেখে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কান্নার শব্দটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসে। বড় দোয়া পড়ে আল্লাহর নাম নিয়ে সে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে ব্যাকডালা খুলে চেক করতে গেলে কানের পাশ দিয়ে শো শো করে কী যেন একটা চলে যায়! পাশ দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে কোনো গাড়ি গেলে যেমন মনে হয় তেমন। হঠাৎ গাড়ির লাইট বন্ধ হয়ে যায়। দুলাল যেন আর পৃথিবীতে নেই। সেই সাথে পিঠের মধ্যে একটা আঁচড় অনুভব করে সে। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে একটা ডাল পড়ে আছে পায়ের কাছে। তারপর সে উপরের দিকে তাকায়। একটা বিরাট বড় বটের গাছ। এতোক্ষণ লক্ষ্যই করেনি সে। তখন বটগাছের মধ্যে ঝড় শুরু হয়ে যায়। তীব্র বাতাস। সেই সাথে কতোগুলো সম্মিলিত কণ্ঠের কান্না ভেসে আসে গাছটা থেকে। তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় দুলাল।

যখন জ্ঞান ফেরে তখন রাত দু’টা। বাতাস থেমে গেছে। মাইক্রোবাসের লাইটগুলো জ্বলছে। সে এবার উঠে দাঁড়ায়। আবার বুকে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করে। মরতেই যদি হয় তবে সাহস দেখিয়ে মরবে। পিছনের অংশটা লাগাতে গিয়ে একটা সাদা কাগজ চোখে পড়ে ওর। কাগজের ভিতরে কিছু একটা মোড়ানো আছে। দুলাল খুলে দেখে পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি। সে ছবিটা ওর নিজের। এ ছবি এখানে এলো কী করে? এ ছবি তো সে তোলেনি কখনো! ছবিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে এবার জোরে গাড়ি টান দেয়। সারা রাস্তায় কান্নার আর কোনো শব্দ না পেয়ে আশ্বস্ত হয় সে। আকাশে যখন শুকতারা তখন সে রংপুরে পৌঁছে। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর আর বাধ মানতে চায় না। দু’চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখতে থাকে। এ এক আজব স্বপ্ন। কোনো দৃশ্য নেই শুধু শব্দ। সেই কান্নার শব্দ। এটা স্বপ্ন না বাস্তব- ভ্রম হয় দুলালের।

দুলালের যখন ঘুম ভাঙ্গে ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার ঘরে। ঘুমানোর পর শরীরের অবসাদ কেটে গেলেও জ্বর এসেছে প্রচণ্ড। খাওয়া-দাওয়া সেরে সে সোজা চলে যায় কেরামতিয়া মসজিদে। দানবাক্সে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সে পীরের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে গতকালের সেই ভয়াবহ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চায়।

জ্বর শরীরে নিয়েই সে গাড়ি নিয়ে আসে মেডিকেলে। লিটুও এসেছে আজ। কাছাকাছি একটা ভাড়া খেটে এসে সন্ধ্যা নাগাদ আবার একটা ভাড়া পায়। নীলফামারির ভাড়া। দূরে হলেও লিটু থাকায় কোনো ভয় নেই আজ। কিন্তু রোগী পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার সময় ঐ কান্না আবার তার কানে বাজতে থাকে। এরপর হাসির শব্দ শুনতে পায়। হাসির কোমলতা লাঘব হয়ে তা ধীরে ধীরে হিংস্র আকার ধারণ করে। সে লিটুর কাছে জানতে চায় সে কোনো শব্দ পাচ্ছে কিনা। লিটু না-সূচক জবাব দিলে কথা বাড়িয়ে লিটুকে ভয় দেখাতে আগ্রহ পায় না সে। হাসির শব্দ কানে বাজতে থাকে। এ শব্দ বর্তমানে চলছে নাকি শ্রুতিভ্রম তা ঠাহর করতে পারে না দুলাল।

রাতে মেসে এসে ঘুমালে আবার সেই হাসির শব্দ সে শুনতে পায় ঘুমের মধ্যে, স্বপ্নে। এবার শুধু শব্দ নয়, দৃশ্যও দৃষ্টিগোচর হয়। সেই মেয়েটার মুখ। লাশটা গাড়িতে তোলার সময় কাপড় সরে গেলে যে মুখটা সে দেখতে পেয়েছিলো। মেয়েটা একবার হাসে, একবার কাঁদে। আসতে আসতে তার দিকে এগিয়ে আসে। খুব কষ্ট করে ঘুমটা ভাঙ্গাতে সমর্থ হয় দুলাল। সারারাত আর ঘুমাতে পারে না। পাছে আবার সেই মেয়েটি, মেয়েটির আত্মা তাকে আক্রমণ করে বসে। অপমৃত্যু হলে সে আত্মা আত্মার জগতে ঠাঁই পায় না। ঘুরে বেড়ায়, মানুষের অনিষ্ট করে- এই গল্প সে ছোটবেলায় শুনেছে। মেয়েটির আত্মা কেন তাকে আক্রমণ করেছে তা সে বুঝে উঠতে পারে না। মন না চাইলেও চোখ দু’টি দুলালের জাগরণ মেনে নিতে পারে না। ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে সে।

গভীর ঘুমের মধ্যে আবার মেয়েটির আত্মা সশরীরে ফিরে আসে। চড়ে বসে দুলালের বুকের উপর। দুলাল কিছুতেই ঘুম ভাঙ্গাতে পারে না। মেয়েটি ছড়ানো এলোমেলো চুলের ভিতর থেকে তার মুখটা বের করে আনলে দুলালের পিলে চমকে যায়। মেয়েটির সামনের দাঁত দু’টো বের হয়ে আছে। চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছে। দুলাল তখন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কে তুমি? মেয়েটি উত্তর দেয়, ‘শয়তান আমাকে চিনতে পারিসনি তুই? আমাকে না চেনার ভান করছিস’ বলেই দুলালের গালে-মুখে কিল-ঘুষি দিতে থাকে। কিন্তু কিল-ঘুষির শক্তি অতো তীব্র নয়। দুলাল এবার প্রশ্ন করে, এটা স্বপ্ন না বাস্তব?

– এটাই স্বপ্ন, এটাই বাস্তব। মেয়েটি উত্তর দেয়।

– আমার কাছে কেন এসেছো তুমি?

– তোকে আমি মারতে এসেছিরে শয়তান। বলেই হাসতে থাকে মেয়েটি। সে হাসি বড় ভয়ংকর।

– আমি কী ক্ষতি করেছি তোমার?

– আমার মনের মানুষকে তুই হত্যা করেছিস?

– আমি? না না। আমি কাউকে কোনোদিন হত্যা করি নি। দুলাল কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ভেবে পায় না কখন সে কাকে হত্যা করেছে।

– তুই করিস নি তোর জাত ভাইয়েরা করেছে। সে যখন বাসে রংপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিলো তখন বাসের ড্রাইভার কথা বলছিলো মোবাইলে। একসময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস পড়ে যায় পাশের খাঁদে। সেসহ আরো অনেক মানুষ মারা গেছে সেদিন। কী দোষ করেছিলো তারা? বল শয়তান বল। আবার কিল-ঘুষি মারতে থাকে মেয়েটি।

– এক ড্রাইভারের কারণে তোমার মনের মানুষ মারা গেছে তার প্রতিশোধ নিচ্ছ আরেকজনের উপর? এ কেমন বিচার তোমার? দুলাল শান্ত করতে চায় মেয়েটিকে।

– হ্যাঁ হ্যাঁ তোদের সবাইকে মারবো আমি। তাই তো আমি এপথ বেছে নিয়েছি। তোদের কাউকে বাঁচতে দেবো না।

– তাহলে আমাকে মারছো না কেন?

– কারণ তোর উপর আমার দয়া হচ্ছে।

– দয়া? কীসের দয়া? অবাক হয় দুলাল।

– কেননা তুই হচ্ছিস ওর মতো দেখতে। তাই আমি পারছি না। বলেই মেয়েটি এতোক্ষণ হাতের মুঠিতে ধরে রাখা দুলালের গেঞ্জির কলার ছেড়ে দেয়। যেন হাল ছেড়ে দিলো।

দুলাল এবার মনে করে সেই দিনের সেই ছবিটার কথা। যে ছবিটা ছিলো ঠিক তার মতোই। এরপর আরো অনেক কথা হয় দু’জনের। অনেক তথ্য পায় দুলাল। একসময় মেয়েটি একটা ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। বলে, তোকে আমি না পারছি মারতে, না পারছি ছাড়তে। দুলালের ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন। দেখে সে বিছানার নিচে পড়ে আছে। পুরো শরীর ঘেমে-নেয়ে গেছে।

সকালবেলাই রহস্য উদঘাটনের জন্য দুলাল রওনা হয় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ছেলেটির গ্রামে। ছেলেটির নাম একবারো উচ্চারণ করেনি মেয়েটি। শুধু গ্রামের নামটা বলেছে। আর বলেছে যে ছেলেটি কারমাইকেল পড়তো। মেয়েটি পড়তো ক্লাস টেনে। দুলাল বুঝতে পারে খুব আবেগী ছিলো মেয়েটি। তা নাহলে এভাবে আত্মহত্যা করে কেউ প্রতিশোধ নিতে চায়?

বাসে করে যায় দুলাল। ভোটমারিতে নেমে একটা রিকশা নিয়ে রওনা হয় চামটাহাটের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবে, কিছুদিন আগে যে ছেলেটা এক্সিডেন্টে মারা গেছে তার বাড়ি কোথায়? কাঁচা রাস্তা ধরে রিকশা চলছিলো। একজন মাঝবয়সী মানুষ সাইকেলে করে আসছিলো। দুলাল ভাবে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করবে। রিকশা কাছে আসতেই লোকটা দুলালকে দেখে সাইকেল থেকে নেমে দু’চোখ বিস্ফোরিত করে বলে, জামিল? দুলালের ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগে। সে বুঝতে পারে স্বপ্নটা সত্যি হলে এমনই হওয়ার কথা। সে রিকশা থেকে নেমে লোকটাকে বুঝানোর চেষ্টা করে। বলে যে, সে আসলে জামিল নয়। আরো সামনের দিকে যাওয়া নিরাপদ নয় জেনে সে লোকটাকে নিয়ে বিপরীত দিকে আসে।

আলাপ শেষে দুলাল যা জানতে পারে তার সমীকরণ আরো জটিল। জামিলের বাবার সাত ছেলে। বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। জামিলের বাবা তিন ছেলেকে দত্তক দিয়েছিলো। জামিল ছিলো জমজ। জমজের আরেকজনকে তার বাবা দত্তক দিয়েছিলো। ব্যাপারটা বুঝতে দুলালের আরো কিছু সময় লাগে। দত্তক দিলে সাধারণত এমন পরিবারে দেয়া হয় যারা ভালোভাবে ভরণ-পোষণ দিতে পারে। তারা দত্তক সন্তানকে খুব আদরে রাখে। কিন্তু তার কপালে এমন হবে কেন? দুলালকেই পরিবারের জন্য আয় করতে হচ্ছে। অবশ্য পড়ালেখা করতে না পারার জন্য দুলালই দায়ী। এদিকে জামিল মারা-যাওয়ার পর তার পরিবারের সবাই হতাশ ও শোকগ্রস্থ। কেননা জামিলের উপরই পরিবারটি ভরসা করে ছিলো। জামিলের মেধা ভালো ছিলো। পড়ালেখা ছিলো শেষের দিকে।

দুলাল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। মেয়েটির আত্মাটিকে আর কতোদিন আশ্রয় দিতে হবে? কোনদিকে সে যাবে? আজ যা জানতে পারলো তাতে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। সে ভাবে একবার কী তার প্রকৃত বাবা-মাকে দেখে আসবে। নাকি গিয়ে বলবে, আমিই জামিল। আমি মারা যাই নি। তাহলে কেমন হবে ব্যাপারটা? পরক্ষণেই সে ভাবে কেন সে যাবে। তাকে তো ভরণ-পোষণ দেয় নি তার প্রকৃত বাবা-মা। যারা আদর-স্নেহ দিয়ে এতোদিন তাকে মানুষ করলো তাদের কী হবে? তাই সে ফিরতে চায় তার এতোদিনের স্থানেই। কিন্তু তার পা দুটো ভারি হয়ে আসে।

 

শাহেদুজ্জামান লিংকন
কবি, কথাসাহিত্যিক, চিকিৎসক

শাহেদুজ্জামান লিংকনের গল্প - একটি আত্মা এবং অন্যান্য

মুগ্ধতা.কম

১৩ জুন, ২০২০ , ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ

শিমুর একটি বিকেল

[এক]

ঘড়িরকাটা এখন চারটা ছুঁয়েছে। বিকেল চারটা। চারটার সময়তো বিকেলই হয়। বাড়িতে আমি একা। আব্বা কোথায় গেছে জানিনা। ভুলু মিয়া ফুল গাছে পানি ঢালছে। চারপাশের কোনো ব্যাপারে তার কোন ভাবনা নেই। চিন্তা চেতনাও নেই। এইটাই বোধহয় জীবন। এই লোকটার জীবন নিয়ে একটা গল্প লিখতে হবে। গল্পের নাম হবে -“ভুলু মিয়ার জীবন “।

সাইকেলের বেল বাজার শব্দ পেলাম। সাঈদ আংকেল। পোষ্টাপিসের পিয়ন। পৃথিবীতে যে ক’জন মানুষের হাসি আমার কাছে দারুন রহস্যময় মনে হয় সাঈদ আংকেল তাদের মধ্যে একজন। উনি একেক সময় একেক রকম করে হাসেন। আমার মনে হয় ভদ্রলোক তার একেকটা হাসিতে একেকটা কথা লুকিয়ে রাখেন। যে কথা কেউ বুঝতে পারেনা। আমি বোঝার চেষ্টা করছি। উনার আগমনের কারন কি? বুঝতে পারছিনা।

“আংকেল, ভালো আছেন?”
আংকেল কিছু বললেন না, শুধু একটা হাসি দিলেন।শব্দহীন হাসি। এই হাসির মানে হচ্ছে -“ওই আর কি। ”

সাঈদ আংকেল তার সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলানো কালো ব্যাগের জিপার খুলে একটা খাম বের করলেন। হলুদ খাম। খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ”তোমার চিঠি। ” খামটা হাতে নিয়ে খামের উপরে লেখা দেখলাম পরিচিত হাতের লেখা। খামের ডানদিকে সুন্দর করে লেখা-

প্রাপক
শিমুল বাছের
c/o : শহীদুল্লাহ বাছের
ঈদগাহ আবাসিক এলাকা,
দিনাজপুর।

খামের বামদিকে লেখা-
প্রেরক
বিজলী খালা
রংপুর।

আমি খাম খুলে চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম। বিজলী খালার চিঠি। খালা লিখেছে-

শিমু,
অনেক দিন তোর কোন খবর নেই। খবর নেয়ার কোন উপায়ও নেই। এই যুগেও তোর ক্ষেত্রে আমি কত অসহায়! বাদাম ওয়ালা, রিকশা ওয়ালা সবার হাতে মোবাইল, তোর হাতে নেই! আজিব! অনেক কষ্টে তোর ঠিকানা পেয়েছি। তোর সাথে কথা আছে। দুইটা ঝাড়ু কিনে রেখেছি তোকে জাতে তোলার জন্য ; আয়, দেখাবো মজা।
ইতি
বিজলী খালা
রংপুর।

মায়ের মৃত্যুর পর যে ক ‘জন মানুষ আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে না দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন বিজলী খালা তাদের মধ্যে একজন। মা মারা যাওয়ার পর আমার প্রায় প্রত্যেকটি দিন, প্রত্যেকটি সময়ের খবর রাখতেন তিনি। একটা সময়ে এসে মায়ের অভাবটা ভুলেও গেছি। আগের মত মায়ের জন্য হাউ মাউ করে কাদিনা, দরজা বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা চুপচাপ বসেও থাকিনা। বয়সের কারনে কিনা জানিনা। মা যখন মারা যায় আমার বয়স তখন ষোল, এখন পচিঁশ। নয়টা বছর মাকে ছাড়া কিভাবে কাটালাম সেটাও এক রহস্য!

ভুলু মিয়া ফুল গাছে পানি ঢালা বন্ধ করেছে। মধ্য বয়স্ক লোক। বাসার কাজের জন্য আমদানি করা। কাজ বলতে ওই দু ‘বেলা রান্না বান্না আর মাঝে মাঝে বাজার টাজার করা। বাজার বলতে ওই শাকসবজি। বাসার কাজ কর্ম আর রান্না বান্নার জন্য আব্বা এই মধ্য বয়স্ক লোকটাকে কেন সিলেক্ট করেছে সেটাও এক রহস্য!

ভুলু মিয়া তার ঘাড়ে ঝুলানো গামছা দিয়ে চোখ মুখ মুছতে মুছতে আমার দিকে আসছে। তার এই চোখ মুখ মোছার ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত! চোখ মুখ মোছার সময় সে তার মুখটাকে এমন ভাবে বাঁকায় যেন কারো মরার খবর পেয়েছে। চিৎকার করে কাঁদতে না পেরে গুমরে গুমরে কাঁদছে -এমন অবস্থা।

“ভাইজান, পত্তর আইছে? ” পত্তর মানে-“পত্র “।

“হুম! ”

“আপনের? ”

“হু। ”

“কইতাছি কার পত্তর? ”

আমি কিছু বললাম না। ভুলু মিয়ার তৃতীয় প্রশ্নের জবাব দেয়া মানে বিপদ। আর্থিক বিপদ। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর যাই হোক শোনার পর বলবে, “দশটা টাক দিবেন, চা খামু! ”

ভুলু মিয়া তার তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর পেতে আবার বলল – “ভাইজান কইলেন না কার পত্তর? ”

আমি ভুলু মিয়ার প্রশ্নের উত্তর দিলাম না। পকেট থেকে দশ টাকার একটা চকচকে নোট বের করলাম। ভেবেছিলাম চকচকে দশ টাকার নোটটা দেখে ভুলু মিয়ার মুখটা চকচকে হয়ে যাবে। তা হলোনা। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লোকটা। মনে হচ্ছে ভড়কে গেছে। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর ছাড়া, চাওয়ার আগেই আমি তাকে চকচকে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে দেব সেটা বোধয় ভুলু মিয়ার চিন্তার মধ্যে ছিলনা।
বাসা থেকে বেড়িয়ে অল্প বয়সের একজন বাদামওয়ালাকে দেখতে পেলাম। মতি’র পুকুরের ধারে বড়ই গাছের নিচে দাড়িয়ে বাদাম বেচছে। মাঝে মাঝে বিশেষ সুরে হাক মারছে-“ওই বেদেম। ওই টিপাটিপি। ”

আমি পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করলাম। বাদাম ওয়ালাকে মোটা গলায় বললাম, “ওই,বাদাম টাটকা? ”

“হ, টাটকা।

“আজকের ভাজা? ”

“না, ভাজছি কাইল। টাটকাই আছে। ”

“মচমচে হবে? ”

বাদাম ওয়ালা এবার কিছু বললো না। আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকালো। কি কারনে কে জানে!

“পাঁচ টাকার বাদাম দাও। টাটকা দেখে দিও। ”

ছেলেটা আমার কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লুঙ্গির ভাঁজ থেকে মোবাইল বের করে কার সাথে যেন কথা বলা শুরু করল। আমি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলাম তাঁর কথা শেষ হওয়ার জন্য । বাদাম ওয়ালার কথা শেষ হলোনা। পাঁচ টাকার বাদাম ক্রেতাকে বোধয় তার ঠিকঠাক পছন্দ হয়নি।

বিজলী খালা ঠিক বলেছে। বাদাম ওয়ালা, রিকশা ওয়ালা সবার হাতে মোবাইল ,আমার হাতে নেই। এটা খুব খারাপ কথা। এতদিন খালার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখাও ঠিক হয়নি। খালার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। খালা আমাকে জাতে তোলার জন্য দুইটা ঝাড়ু কিনে রেখেছে , ঝাড়ু দুটা দেখতে হবে। আব্বাকে বলতে হবে আমার জন্য একটা মোবাইল কিনতে। দামি মোবাইল, একেবারে লেটেষ্ট!

[দুই]

মনি’র দোকানে আব্বাকে পাওয়া গেলনা। এই সময় এখানে বসে চা সিগারেট খাওয়ার কথা। প্রতিদিন রুটিন মাফিক এই সময় আব্বা লুঙ্গি পান্জাবী পরে মনি মিয়ার দোকানে আসে। মনি’র দোকানের সামনে পাতা বেন্ঞে বসতে বসতে বলবে, “কি খবর মনি মিয়া,সব ঠিক আছেতো? ”

“কুনু খবর নেই ছ্যার,তয় সব ঠিক আছে। ছ্যারে কি চা খাইবেন না ছিগ্রেট?”

“চা সিগারেট পরে। আগে কথা বলি। চা সিগারেট পরে খাওয়া যাবে কিন্তু কথা বলা যাবেনা। বুঝলা?”

“বুঝলাম। ”

“কি বুঝলা? ”

মনি মিয়া কিছু বলেনা। চুপচাপ চায়ের কাপে চামুচের টুংটাং শব্দে চা বানাতে থাকে। উদ্দ্যেশ্য আব্বাকে চুপ রাখা।

আব্বা চুপ থাকেনা। পান্জাবীর পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরায়। সিগারেটে টান দিয়ে মুখে নাঁকে ধোঁয়া ছারতে ছারতে বলে,”মনি মিয়া বল্লেনাতো-কি বুঝলা? ”

মনি মিয়া আঁড় চোখে আব্বার দিকে তাকায়। বলে, “ঐ আপনে একা মানুষ। ম্যাডামতে নাই, একা একাতো কথা কইবার পারেন না! ”

আব্বা এবার কিছু বলেনা। চুপ করে থাকে। আব্বাকে চুপ করানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়টা মনি মিয়া ভালই জানে। ব্যাটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। উচ্চ শিক্ষা।

বাসায় ফিরে দেখলাম আব্বা বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ দুটা বন্ধ। কেন? আব্বার ডান হাতের আঙ্গুলে চেপে রাখা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ড্যামটা আরেকটু হলেই টুপ করে পরে যাবে। ধরানোর পর ওটাতে টান পরেছে বলে মনে হয়না।

”আব্বা-”

আব্বা চোখ খুলল না -বলল,”হুম।”

“শরীর খারাপ? ”

“না। ”

“মন? ”

“না।”

“মনির দোকানে গিয়েছিলে? ”

আব্বা কিছু বলল না। চুপ করে থাকলো।

“গিয়েছিলে মনির দোকানে? ”

“হুম।”

“চা খেয়েছ? ”

“হুম। ”

“গল্প হয়েছে? ”

“হুম। ”

“জমেনি? ”

আব্বা চোখ খুলল। চেয়ারে সোজা হয়ে বসতে বসতে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছারতে ছারতে বলল, “শিমু,তোর মাকে মনে

আছে?”

“আছেতো, কেন? ”

“এম্নি।”

“এম্নি?”

“তোর মা’র কথা খুব মনে পরছে। ভাবছি একবার রংপুরে যাবো। কবরটা অনেকদিন জিয়ারত করা হয়না। ”

অনেকদিন বাদে আব্বার মুখে মায়ের কথা শুনলাম। মনে হলো দীর্ঘ্যদিন চেপে রাখা একটা কথা খুব কষ্ট করে বলে ফেলেছে। কেন এই চেপে রাখা?

আমার জন্য? হতে পারে।

“শিমু -”

“বলো।”

“যাবি?”

“যাবো। ”

“গুড।”

আব্বা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। বলল-“তোর জন্য একটা জিনিস আছে। তোর ঘরের পড়ার টেবিলে। ”

“কী জিনিস? ”

আব্বা হাসলো। চেনা অথচ অনেক পুরনো। শব্দহীন হাসি। আমার মনে হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসি এটা ! এমন সুন্দর হাসি আব্বার মুখে সচরাচর দেখা যায়না। কি কারনে সেটাও রহস্য ! হাসিটা মুখে রেখেই বলল-“তোর জিনিস তুই দেখে নে। ”

পড়ার টেবিলের উপর একটা মোবাইল সেট। মস্ত সাইজের ঝকঝকে নতুন একটা মোবাইল। ধবধবে সাদা। তাজমহলের মতো। টেবিলের উপর মোবাইল দিয়ে চেপে রাখা একটা চিরকুট। চিরকুটে লেখা –

শিমু,

একটা মোবাইল পাঠালাম তোর জন্য। সীমকার্ড, ফেসবুক একাউন্ট, ফোনবুকে সেভ করা নাম্বার (মেসেজ অপশনের ইনবক্সে ফেসবুকের ইমেইল ও পাসওয়ার্ড পাবি), কমপ্লিট মোবাইল। কি বলিস? স্যামসাং ব্রান্ডের একেবারে লেটেস্ট ! হাতে পাওয়া মাত্র কল দিবি। মিস্ কল। মিস্ কল দিতে পারিসতো?

ইতি
বিজলী খালা
রংপুর।

মিস কল আর মিস কল থাকলো না। হয়ে গেল মিস্টার কল। রিং হতে না হতেই খালা রিসিভ করে ফেললো।

“হ্যালো, শিমু? ”

“হু। ”

“কলটা রিসিভ করে ফেলেছি। তাড়াহুড়ো, বুঝলি? তাড়াহুড়ো! তাড়াহুড়োয় তোর ফোন রিসিভ করে ফেললাম। ”

“ও। ”

“তো তুই ভাল আছিসতো? তোর আব্বা ভালো? ”

“হু ”

“ফোনটা পছন্দ হয়েছে? তোর আব্বা কোথায়? ”

“হয়েছে। আব্বা টয়লেটে। ”

“টয়লেটে? কি করে? ”

“ওই পায়খানা। ”

“ওয়াক! একি, তোর কথাবার্তা একদম রাবিস হয়ে গেছে দেখি। ডাইরেক্ট পায়খানা ! ওয়াক! পটি বলবি, পটি। ঠিক আছে? ”

“ঠিক আছে। ”

“ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিস? ”

“হু।”

“কি স্ট্যাটাস? ”

“আমার হাতে শাহাজাহান-মমতাজ,

মুঠো বন্দি একটা আস্ত তাজমহল।”

“খালা,পড়োনি তুমি? ”

“নারে, ফেসবুক খুলিনি আজ। ”

“ও।”

“আচ্ছা শোন, তোর আব্বার সাথে কথা হয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়। রাখি? ”

“আচ্ছা। ”

টি-সার্ট পড়তে দেখে আব্বা বলল, “কোথায় যাচ্ছিস। ”

“মনি’র দোকানে, চা খাবো। তুমি যাবা? ”

“না, বুকটা ব্যাথা করছে। গ্যাসটিক।”

“ঔষধ খেয়েছ? ”

“খেয়েছি।”

“এবার চা-সিগারেট ছেড়ে দাও। ডাক্তারের নিষেধ আছেতো। ”

“ছেড়ে দেব। ”

“গুড। রংপুর যাচ্ছ কবে? ”

“তোর খালার সাথে কথা হয়েছে? ”

“হয়েছে। কবে যাচ্ছো? ”

“কালকে। সবকিছু গুছিয়ে রাখিস। ”

মনি মিয়া পৃথিবীতে যে ক’জন মানুষকে অতিমাত্রায় ভয় পায়, তাদের মধ্যে আমিও একজন বলে আমার ধারনা। এই ভয়ের পিছনে কারনটা কি-এটা আমার জানা নেই। জানার চেষ্টা করতে হবে।

ইচ্ছে হলেও আজ অবধি মনি’র দোকানের বেন্ঞে আমি বসতে পারিনি। আমার জন্য একটা টুল আছে। আর এফ এল কোম্পানির টুল। দোকানের সামনে দাড়ালেই ওটা আমার জন্য পেতে দেয়া হয়। আমার বসার জন্য মনি মিয়া’র আলাদা ব্যাবস্হা রাখার কারন কি সেটাও এক রহস্য।

মনি মিয়া আমার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে একজনকে চায়ের বদলে পান দিয়ে ফেলেছে। আমি বললাম, “মনি মিয়া, ব্যাপার কি? চায়ের বদলে পান বানায় দিচ্ছ। ঘুম পাইছে? ”

“ব্যাপার কিছুনা। ভিমড়ি খাইছি।”

“ভিমড়ি খেয়েছ খাও। তবে, ভিমড়ি খেয়ে অদব বদল করবা না। ”

“আইচ্ছা। এইবার আপনি কন, কি খাইবেন? চা? ”

“না। ”

“মিষ্টি পান? ”

“না। ”

“তাইলে কি ঠান্ডা খাবেন? ”

“না। সিগারেট দাও। বেনসন সিগারেট। ”

আমি বুঝতে পারছি মনি’র মাথায় বাজ পড়ে গেছে। চোখে মুখে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু কোন প্রশ্ন তার মুখ থেকে বেরুলো না। সম্ভবত সেই সাহস তার নাই। এতগুলো বছরে সে আমাকে মিষ্টি পান খেতে দেখেছে।কিন্তু সিগারেট এই প্রথম। মনি মিয়া সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে আমি সিগারেট ধরালাম। সিগারেটে টান দিয়ে নাকে মুখে ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে বুঝলাম, সিগারেট টেনে নাকে মুখে ধোঁয়া ছাড়াটাও একটা শিল্প। এই শিল্পের প্রদর্শনী যার তার দ্বারা সম্ভব না।

নিজেকে সামলে নিয়ে গলা মোটা করে বললাম, মনি মিয়া, বেনসন সিগারেটটা খুব হালকা। এরপর থেকে গোল্ডলীফ দিবা। বুঝাইতে পারছি? ”

“পারছেন। ”

“এবার একটা চা দাও। কড়া চা। লিকার কম, দুধ বেশি।”

“আইচ্ছা। ”

সিগারেটের টান কমিয়ে দিয়েছি। হালকা একটা টান মেরে মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম, “আব্বা এসেছিল। ”

“হ।”

“গল্প হয়েছে। ”

“হ।”

“জমেছিল? ”

“হ। আপনার আব্বায় যা গল্প কয়, না জমায়া পারে? একেবারে দুধের সরের মত জমছে। ”

“কিন্তু, আমি জানি-গল্প জমেনি। সর জমার আগেই তুমি পানি দিয়ে পাতলা করে দিয়েছ! আর একটা সিগারেট দাও। এবার গোল্ডলীফ দিবা। আর একটা চা বানাও ভাল করে। আগের চা’টা ভাল হয়নি। লিকার পাতলা ছিল। এরকম চা পাবলিকরে খাওয়াইলে দোকান পুকুরে যাবে। বুঝছ? ”

“বুঝছি। সিগারেট হাতে দিয়ে মনি মিয়া বলে, “শিমু ভাই কি আমার সাথে রাগ করছেন। ”

“মনি মিয়া, আমার আব্বা একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক ম্যানেজার। জানো? ”

“জানিতো। কি কন, এইডা না জানার কি আছে?”

“কিছু নেই।”

আমি আবার সিগারেট ধরাই। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে মনি’র দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে  বলি,

“আমার আব্বা একজন অতি সজ্জন ভদ্রলোক।”

“হ, আপনার আব্বার মত মানুষ হয়না। ”

“মানুষটা তোমার কাছে আসে তোমাকে ভালবেসে গল্প করে নিজর একাকিত্বটা তোমার সাথে ভাগ করতে। তুমি তাকে আমার মৃত্য মায়ের কথা মনে করিয়ে দাও, যাতে তিনি চুপ করে থাকেন। মনি, তুমি কি আমার কথা শুনতে পারছো? ”

“শুনতে পারছি।”

“বুঝতে পারছো? ”

“পারছি।”

“বুঝতে পারলে ভালো, না পাররলে সোজা পুকুরে! ”

মনি অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকি থাকে। আমি সিগারেটে একটা ছোট টান দিয়ে আবার বলতে শুরু করি, “তিনি চুপ থাকেন-কারন আমার মাকে উনি ভীষণ ভালবাসতেন। ভবিষ্যতে এমনটা করবা না। যাতে আমার আব্বা কষ্ট পায়। কারন, আমি আব্বাকে ভীষণ রকম ভালবাসি। মনে থাকবে?

“থাকবে স্যার। ”

আমি গোল্ডলীফ সিগারেটে জীবনের শেষ টানটা দিয়ে উঠে পড়ি মনি’র বিশেষ ব্যাবস্হার আর এফ এল কোম্পানির টুল থেকে। হাটতে শুরু করি ইট বিছানো চিকন রাস্তাটা দিয়ে-বাসার দিকে।

সদ্য প্রাপ্ত স্যামসাং ব্রান্ডের মোবাইলটা বেজে উঠল। “আমারো পরানো যাহা চায়” মধুর রিংটোনে। স্কীনের দিকে তাকালাম। তামিসা। বিজলী খালার মেয়ে। অসম্ভব সুন্দর দুটি চোখের এই মেয়েটার সাথে সবশেষ কথা ও দেখা হয়েছিল নয় বছর আগে। নয় বছরে তার অনেক পরিবর্তন হওয়ার কথা। ওর শরীর থেকে অদ্ভুত রকমের সুন্দর একটা গন্ধ বেরুতো। সেই গন্ধটা কি আজও আছে? আশ্চার্য্য জনক হলেও সত্য, তামিসার শরীরের মিষ্টি গন্ধটা আজও মাঝে মাঝে আমার নাকে আসে। কোত্থেকে কেন আর কিভাবে সেটাও এক রহস্য ! অনেক পারফিউম, আতরের দোকানে সেইরকম আতর কিংবা পারফিউম নাকে লাগিয়ে পরখ করেছি, গন্ধটা মেলেনি। কিছু গন্ধ সম্ভবত একবার নাকে ঢুকে সারা জীবনের সাথে মিশে যায়।  ওর সুন্দর দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে এতদিনে ক’টা ছেলের বুকের পাজর ভেঙেছে কে জানে।

আমি মোবাইল রিসিভ করলাম। বললাম, “হ্যালো। ”

“শিমু ভাই? ”

“হুম। ”

“কোথায় আছিসরে? ”

“আগ্রায়। তাজমহল হাতে নিয়ে সেলফি তুলছি, ফেসবুকে আপলোড দেব! ”

“ওই ছোকরা,ফাজলামি করবি না। ফাজিল কোথাকার! সত্যি করে বল কোথায় আছিস? ”

“মতি’র পুকুরের পাড়ে। ”

“মতি? মতি কে? এই বিকেলে পুকুর পাড়ে কি করিস? ”

“সাঁতার কাটবো। আর, মতি হলো ‘নূরবানুর’র ভাই! ”

“নূরবানু? এটা আবার কে? ”

“আমার হবু বউ। নামটা সুন্দর না।”

“না, সুন্দর না। ‘নূর’টা ঠিক আছে -কিন্তু, ‘বানু’টা কেমন জানি!”

“ঠিক আছে, বিয়ের পরে কেটেছেটে ‘নূরী’ বানিয়ে দেব।”

তামিসা কিছু বললো না। চুপ করে থাকলো। আমি বললাম, “হ্যালো তামিসা। ”

“হু।”

“চুপ হয়ে গেলি কেন? ”

“এম্নি। শিমু ভাই, একটা কথা বলব?”

“বল। ”

“সত্যি কি ‘নূরবানু ‘ বলে কেউ আছে? ”

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “না। তেমন কেউই নেই, তোর সাথে মজা করলাম। এবার বল, ফোন করেছিস কেন? ”

“তোকে একটা কথা বলব।”

“কি কথা? ”

“পানের পাতা! ”

“মানে? ”

“মানে তুই বুঝবি না। কোন কালেই বুঝবি না। আর একটা কথা বলি? ”

“বল। ”

“দুটি পাখি এক দেশ, তিন টোক্কায় কথা শেষ। বুঝলি?”

“না। তামিসা, তুই এখনো আগের মত আছিস। আমার মনে হয় পৃথিবীর সব কথা আমি বুঝতে পারি, শুধু তোর কথা ছাড়া। সহজ সরল মানুষ আমি।

সহজ করে বল, ঠিক বুঝে যাবো। ”

“কালকে রংপুর আসছিস? ”

“হুম। ”

“আয়, তোকে নিয়ে চিকলীর পার্কে যাবো। চিকলীর পার্ক চিনিসতো? ”

“চিনি, একবার গেছিলামতো! চাঁরদিকে গাছ, মধ্যিখানে পানি। ‘আম পাতা জোড়া জোড়া’ জাতীয় জায়গা। ”

“হুম, এখন আর গাছ তেমন নাই। ‘জোড়া জোড়া’টা আছে। ”

“তাই?”

“আয়, দেখবি সব। এখানে বসে বাদাম খেতে খেতে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ এবং সরল ভাষায় আমার কথাটা তোকে বলব। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে।”

“তবে একটা শর্ত।”

“কি।”

“আমি বাদাম ছোলাতে পারবোনা। তুই আমাকে বাদাম ছুলে দিবি আর আমি বাদাম খেতে তোর সাথে কথা বলব। আচ্ছা? ”

“আচ্ছা। ”

লাইন কেটে গেল।

[তিন]

বাসার সামনে এসে চমকে গেলাম। এত লোক কেন? ভুলু মিয়া বারান্দার মেঝেতে বসে হেচলি তুলে কাঁদছে আর কাঁধে ঝুলানো গামছা দিয়ে চোখ মুছছে। আমাকে দেখে তার কাঁন্না বেড়ে গেল। আমার বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠল। মানুষের ভীড় ঠেলে বাসার ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। পারলাম না। কেউ একজন আমাকে ধরে ফেলল। বলল, “বাবা, এখন ভিতরে যেওনা। একটু শান্ত হও। এইযে চেয়ারটায় বসো।”

কেউ একজন আব্বার রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তার চোখে পানি! কেন ? বাসার সামনে জড়ো হওয়া মানুষগুলো ক্রমশই ঝাপসা হতে থাকে। শুনতে পেলাম-কেউ একজন বলল, “আত্বীয়দের খবর দেওয়ার ব্যাবস্হা করেন।” কিসের খবর?

নয় বছর আগে এমনি এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এরকমই এক দৃশ্য দেখেছিলাম বাড়ীর আঙিনায়। পরে বুঝেছিলাম মা মারা গেছে। সেদিন আব্বার বুকে মাথা গুজে কেঁদেছিলাম। সেদিনের সেই দৃশ্যের সাথে আজকের দৃশ্যের একটাই পার্থক্য -সবই আছে আব্বা নেই। কোথায় আব্বা? আব্বার কিছু হয়নিতো? নিজের অজান্তেই কেঁদে উঠলাম হু হু করে।

আকাশের দিকে তাকালাম। বিকেলের পরিচ্ছন্ন নীল আকাশ। বিশাল নীল আকাশে বুকে সাদা সাদা মেঘ উড়ে বেরাচ্ছে। একেক সময় একেক ছবি আঁকার খেলায় মেতেছে মেঘগুলো। এই নীল আকাশের নিচে আমার আর একটা বিশাল আকাশ আছে । সে আকাশে বোধয় সাদা মেঘ হয়ে আর কোনদিনও ওড়া হবেনা আমার।

 

সাজ্জাদ মোহাম্মদের গল্প - শিমুর একটি বিকেল
582 Views

মুগ্ধতা.কম

৬ জুন, ২০২০ , ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

মায়া

ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ রিশ আর তৃণা থেমে গেলো। দুজন অবাক। খুশিতে অবাক তারা।তৃণা বলে উঠলো, কিছু কি বুঝতে পারলে?

-হ্যাঁ। শান্তির দীর্ঘশ্বাস মিলে গেলো বোধহয়।

ভালোবাসার রঙ, গন্ধ জানা নেই রিশের। তবে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো তৃণার প্রতি তার মোহের বন্যা বইয়ে চলে যায়। কীভাবে চাইলে এমন দীর্ঘশ্বাসের শান্তি একসাথে উপভোগ করা যায়!হিসেব মিলিয়ে দেখা শেষ। হয়তো বিধাতা তার জন্যেই তৃণাকে সৃষ্টি করেছেন। তৃণা শুধুই তার।

জীবনের হিসেব যোগ, বিয়োগ, গুণ বা ভাগে মেলানো যায় না। ভাগ্যে মেলানো হয়। ভাগ্য কেউ জানে না আর জানার উপায় পর্যন্ত নেই। তাই সময়ের সাথে সাথে ভাগ্যের হিসেব মেলানো হয়।প্রবীণকালে বেঁচে থাকলে হয়তো হিসেব করা সম্ভব তার ভাগ্য তার ইচ্ছে মতো ছিলো কি না। তবে ভাগ্যের উত্থান পতন নিয়েই জীবন চলে সময়ের সাথে তাল দিয়ে।

তৃণা আর রিশের পরিচয় কলেজ থেকে। কলেজের স্মৃতিময় সময়ের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ওদের মতে। তৃণা খুব সাদাসিধে মেয়ে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ। খুব কম কথা বলে। শুধু শুনে যায় তার আশপাশের বিভিন্ন জনের ভিন্ন ভিন্ন কথা। বিশেষত্ব হলো, যে যাই বলুক মুখে একটা হাসি নিয়ে সে শুনে যায়। খুব জোরে হাসি না। হাসির অনেক প্রকারভেদ আছে। খুশিতে একভাবে মানুষ হাসে, আবার উপরে উপরে একভাবে হাসির প্রকার আছে। ভিতরের দুঃখ ঢাকতে যেই হাসি আরকি।এখনকার দিনে যেটা কে ‘ফেইক হাসি’ বলে। কিন্তু তৃণার মুখের হাসিটি ছিল একেবারে অন্য রকমের।হাসিটা ছিল মাত্রাতিরিক্ত মায়াবী হাসি। যেই মায়াবী হাসির জালে জড়িয়ে ভালোবাসতে বাধ্য হয়ে পরে রিশের মন। মেয়েটার সব কিছুই যেন মায়া দিয়ে মোড়ানো। কাজল কালো চোখ, চোখের উপরে একটা চশমা, শ্যামলা গায়ের রঙের মায়াবতী।

রিশ চঞ্চল ছেলে। কলেজ জীবনের যত কিছু উপভোগ্য, তা সব করতে জানে। তবে তৃণার উপস্থিতিতে সব যেন সর্বশান্ত। কেন যেন ইচ্ছে করে চুপ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে তৃণার দিকে।অপলক দৃষ্টি যাকে বলে। কানে যেন কোনো আওয়াজ না হয়। শুধু তৃণার  মাঝে মধ্যে বলা কয়েকটি কথাই যেন তার কান শুনতে পারে।এতসব অনুভূতি আর বন্ধুমহল জানতে পারবে না তাহলে কি হয়! আস্তে আস্তে এর কান, ওর কান হতে হতে তৃণার কানে পৌঁছে গেল রিশের কথা।রিশের প্রতি তৃণারও দুর্বলতা কাজ করে। করবেই না বা কেন! চঞ্চল হলেও রিশের ব্যবহার, কথা বলার ভঙ্গি অন্যসবের চেয়ে আলাদা। যা বলে মুখেই বলে দেয়। তৃণার মতে ভালো যদি বেসেই থাকে, তবে বলতে হবে না, বুঝে নেবে চোখের দিকে তাকিয়ে, বুঝে নেবে মনের সূত্র।

মন বুঝে নিতেই কলেজ জীবন শেষের পথে। রিশ আর অপেক্ষা না করে তৃণাকে সব কথা বলে দিল।আর তৃণা অপেক্ষায় ছিলো কখন তার প্রিয় মানুষ তাকে প্রিয় বলে ঘোষণা করবে। তাই হয়েছে। রিশ তৃণার কথা চিন্তা করে লেখার নেশায় জড়িয়ে পরে। ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসার কথা নানান ভাবে বলতে ভালোই লাগে। কবির মতো ছন্দ হয়তো হয় না, কিন্তু ভালোবাসার কথা পুরোদমে প্রকাশ পায়। যা তৃণা খুব সহজেই বুঝে নেয়।

রিশ নিজেকে ‘অকবি’ বলতো। বন্ধুমহলে কবি উপাধি পেলেও নিজেকে ‘অকবি’ দাবি তার। তার অকবি ভাবের কবিতায় কখনো প্রশান্ত মহাসাগর প্রিয়তমার নামে করে দেয়, আবার কখন দু’জনে পৃথিবীর বাইরে হাতেহাত রেখে হাঁটতে চায়।গোধূলির সূর্যকে কপালের টিপ, আকাশে তার প্রতিচ্ছবি, যেন এক রূপকথার রাজ্য। কবি মন অনেক ভাবায় তাকে। যেখানে একটা ৩.২ ইঞ্চি লম্বা গোল দণ্ডের মাথায় আগুন দিলে প্রিয়তমার জন্য আরও রূপকথার জন্ম নেয় কবির মস্তিষ্কের নিউরনে। এক বসন্তে  তৃণা রিশের হাত ধরে বলল,”আচ্ছা, এই হাত ছাড়বে কখনো?”

“ভালোবাসা চলবে,হাতে হাত থাকবে। তুমি চাইলে সব সম্ভব। আমার দিক থেকে ‘তুমি’ বলতে জীবনে শুধু ‘তুমি-ই’ থাকবে। তুমি চাইলে এমনো কয়েকশো বসন্ত কেটে যাবে। প্রতি বসন্তে তুমি হলুদ শাড়িতে আমার সামনে আসবে। আর আমি প্রতিবারের মতো বলে উঠবো,’তোমার প্রণয়ের ভিড়ে আমি এক মাত্রাতিরিক্ত মাতাল……।”

অকবি মনের মানুষ। কথা বলতে শুরু করলে পুরো কথা বলে দেয় রিশ। অকবিকে সারাদিন রোদের নিচে দাঁড়িয়ে প্রেমিকার বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে বললে ‘না’ উত্তর আসাটা অস্বাভাবিক।তাঁরা তা পারবে। তবে তাদের যদি বলা হয় অনেক গুলো লাল গোলাপ নিয়ে এসো! তখন বলে উঠতে পারে,”প্রিয়,তোমায় গোলাপ দিতে হলে লাল নয়, নীল গোলাপ দেব….।” এটা স্বাভাবিক। নীল গোলাপের জন্ম শুধু কল্পনায় হয়। রিশ তৃণাকে ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে কিছু দেয়নি কখনো-তৃণার মতে। তবে দেখা হলেই একটা চিরকুট দিত, যাতে দু’চার লাইনের কবিতা বুনে দিত সে। তৃণার সেসব পড়তে ভালোই লাগে।ভালোবাসার মানুষের দেয়া বলে কথা।

ভালোবাসা শুরুর কয়েকমাস পরে তৃণার পরিবারে জানতে পারে। তৃণা একবার বলেছিল,”রিশ আমার জন্য হলেও বাস্তবতার কথা চিন্তা করে,কিছু একটা করো। এ-সব কবি ভাবে চলবে কীভাবে!”

রিশ কোনো উত্তর দেয়নি সেদিনের কথায়। এভাবে হঠাৎ নিজেদের মাঝে দূরত্ব বাড়ে। তৃণা নিজেই দূরত্ব বাড়াতে থাকে। হয়তো রিশকে বোঝাতে।ছেলে মানুষির দিন শেষ। এবার কল্পনার ঘোর কাটিয়ে প্রিয়কে আপন করে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। রিশ এটা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল যে, তৃণা দূরে হারিয়ে যাচ্ছে। আর দেরি হলে হয়তো ভাগ্য সীমানার বাইরে চলে যাবে।

একদিন খুব ভোরে তৃণা ফোন করে রিশকে বলল,”সকাল দশটায় বাসার সামনে চলে এসো।”

“আচ্ছা” ঘুমের ঘোরে জবাব দিলো রিশ।

ঘুম ভাঙলে রিশ চিন্তায় পরে যায়। সকাল দশটায় ডাকবেই বা কেন? সে যা ভাবছে তাই হবে কি?

রিশ ভাবছে তৃণার বাসায় তাকে পরিচয় করিয়ে দেবে। হয়তো সম্পর্কটা আরও পাকাপোক্ত করার জন্য। সব ভাবনা চিন্তা ফেলে সে চলল তৃণার বাড়ির উদ্দেশ্যে। দশটার একটু আগেই পৌঁছেছে রিশ। অপেক্ষা করতে খুব বিরক্ত লাগছে তার। এই না জানা কথা শুনতে উদগ্রীব সে। ঠিক দশটা সাতে তৃণা রিশের সামনে দাঁড়িয়ে। রিশ বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে। তৃণার মুখে সেই মায়াবী হাসি নেই, নেই সেই মায়াবতী ভাব। রিশ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তৃণা বলে উঠলো,”ভুলে যাও।”

কী ভুলে যাব?

সব স্মৃতি। সব কথা। সব অনুভূতি। কোনো ভাবেই এগুনো সম্ভব না। যদি ভালোবেসে থাকো, তবে ‘কেন’, ‘কি কারণে’ এসব জানতে চাইবে না।অজান্তেই চলে যাও..।

রিশ কিছু বলতে পারছে না। বাগযন্ত্র বোধহয় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার মন বলতে চাইছে,”আমি ভালোবেসে যাব। আমি সত্যি ভালোবেসে যাব। ষোল আনা জীবন তোমার নামে।এখন শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনা বাকি।”

রিশ তার বাসায় ফিরে এসেছে। নানান চিন্তায় মগ্ন।প্রশ্নের পাহাড় যেন তার মাথায়। আসলে তৃণা কি তাকে ভালোবেসেছে? ভালোবাসলে কি এভাবে চলে যাওয়া যায়। তাদের ওয়াদা করা কয়েকটি বাক্যের কী হবে? ওগুলো কি ভেঙে গেল? কী হলো সেই মিলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসের শব্দের? নাকি রিশের কানে ভুল শব্দ এসেছিল!

এতসবের চিন্তায় নিজেকে শেষ করতে ইচ্ছে করছিল তার। শেষমেশ উৎসর্গ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল নিজেকে ভালোবাসার মানুষের প্রতি। রিশ এটাও বুঝছে দীর্ঘশ্বাস মিলে যাওয়া মানুষ এত সহজে চলে যেতে পারে না। হয়তো মাথায় তৃণার অনেক প্রেসার ছিল পরিবার থেকে। কিন্তু দুম করে একদিনে এত সব পণ ভেঙে দিতে পারে না সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার মানুষ। যদিও তৃণার চলে যাওয়ার কারণ অজানাই রয়ে গেলো। মস্তিষ্ক সায় দেয় সে অভিনয়শিল্পী। খুব নিখুঁত তার অভিনয়। যা ধরার মতো চোখ রিশের ছিল না।সে তো শুধু মনের চোখ দিয়ে দেখে ভালোবেসেছে।অভিমানে তলিয়ে, তৃণা ফিরবে আবারও, এই অপেক্ষা মনে নিয়ে বাসার দারোয়ান চাচাকে বলল,”চাচা, কোনো একদিন একজন চশমা পরা রূপবতী আসবে। আমার খোঁজ করবে খুব আকুলতা নিয়ে। আপনি তখন সহজ ভাবে বলে দিয়েন,’এই বাসায় অভিনেত্রীর সাথে অভিনয় করার মতো অভিনেতা থাকে না। সাদা রঙের ভালোবাসা নিয়ে আসবেন’-রিশবাবা বলেছে……….।”

সাদা নিঃস্বার্থ মোহ-ভালোবাসায় সিক্ত হোক প্রতিটি ‘প্রিয়’ মানুষের মন। অপেক্ষা হয়ে থাক ভালোবাসা, যেমন অপেক্ষা করছি অচেনা, অনিবার্য মৃত্যুর জন্য।

 

মিকদাদ মুগ্ধর গল্প - মায়া

মুগ্ধতা.কম

৬ জুন, ২০২০ , ১০:২১ অপরাহ্ণ

সলিমের মায়ের জেল

সত্তরোর্ধ্ব সলিমের মা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। দারিদ্র্যের কষাঘাত আর অযত্ন অবহেলায় আরো বেশি বয়সী লাগে। সলিমের জন্মের তিন বছরের মাথায় স্বামীহারা। সলিমের জন্মের পর নিজের নাম আম্বিয়া বেগম ভুলেই গেছেন।

মোঃ সলিম উদ্দিনকে যেমন সবাই সলিম ডাকে। তেমনি সলিমের মাকে আম্বিয়া বেগম নামে এখন কেউ চেনেনা।

পঞ্চাশোর্ধ্ব সলিম রিক্সা চালিয়ে আট সদস্যের পরিবার চালাতে গলদঘর্ম। মায়ের ভাত জোটাতে সে ব্যর্থই বটে। এর ওর বাড়িতে খেয়ে, হাত পেতে, ভিক্ষা করে চলে সলিমের মা।

দেশজুড়ে লকডাউনের কারণে এবার ঈদে যাকাত ফিতরাও জোটেনি তেমন। ঈদের পর থেকে শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। হয়ত এবার সলিমের বাপের ডাকে সাড়া দেবার সময় এসেছে। তবুও সলিমের মন মানে না। নিজের সামর্থ্য না থাকলেও মা বলে কথা। নিজের রিক্সায় করে মাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে পা বাড়ায় সলিম। রাস্তায় পুলিশ আটকায়, সলিমের মায়ের মুখে মাস্ক নেই। সলিম রাস্তায় চলাচলের কারণে দশ টাকা দিকে কিনেছিল একটা মাস্ক। সেটা মুখে থাকায় এ যাত্রা রক্ষা পায় সে। কিন্তু তার মাকে ছাড়েনা পুলিশ। হয় ছয়মাস জেল না হলে একলাখ টাকা জরিমানা। পেটের ভাত জোগাতেই মাঝে মধ্যে ব্যর্থ হয় তারা। রেডিও টিভি কেনা তাদের বিলাসিতা, আইন জানবে কখন? করোনা মহামারিতে পুলিশও আইন প্রয়োগে কঠোর। সলিমের সমস্ত সহায়সম্বল বেচেও একলাখ টাকা হবে না। মনে না মানলেও সলিম মায়ের জেলের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। সলিমের গলা ধরে আসে আর চোখের জলও আটকাতে পারেনা। ওর মাও কেঁদে ফেলে আর বলে, “বাবা, জেলত মোক ভাত খোয়াইবে তো?”

সলিমের মায়ের জেল - আবু হানিফ জাকারিয়া

মুগ্ধতা.কম

৪ জুন, ২০২০ , ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

যেদিন জেগেছিলো হৃদয়

বরের দশদিন, কন্যার একদিন। হিসেবটা কান্নার। বিবাহোত্তর শোকপর্বের।

বন্ধুমহলের কানাঘুষা এ কান-ও কান হয়ে আমার কানে এসে পৌঁছায়। ‘শেষ পর্যন্ত তুইও?’ আমার হার মানা তাদের গলায় বুঝি হাঁড় হয়ে বিঁধে। যে দু-একজন আমার পক্ষ নেয় তারা বলে যে, বাকিরা ঈর্ষাকাতর। কিন্তু ঈর্ষার কারণ আমার কাছে ধোয়াশার মতো, অনেকটা অযৌক্তিক। আমার মুখ বন্ধ। আমিও দেয়ালবন্দী।

বিছানায় বসে আছি । পাশের রুমে রঙ্গিন পর্দায় কে কি দেখবে না দেখবে তাই নিয়ে হৈ-হুল্লোড়। অনেক দিনের বাসনা হঠাৎ আরো অনেককিছুর সাথে পূর্ণ হওয়ার আনন্দ। এর-ওর কথা মতো একেক রকম স্বাদ নিতে গিয়ে শেষাবধি কারো ইচ্ছাই পূর্ণ হচ্ছে না।

বাইরে মোটরসাইকেলের হর্ণের শীৎকার। বিশ্রী শব্দ। ছোটভাইকে মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সামনের এস.এস.সি. পরীক্ষার চেয়ে এই মুহূর্তে মোটরসাইকেল চালানো শেখা তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দকর তো বটেই, গর্বেরও। অগ্রগতির হিসেব সে প্রতিদিন পেশ করে। আমি একমনে শুনি অথবা শুনি না। ওর উচ্ছ্বাসে আমি তেমন আগ্রহ দেখাই না বলে ও শেষ পর্যন্ত চুপচাপ চলে যায়, তবে উদ্দীপনায় ভাটা পড়ে না। জীবনের এমন সময়ে আমার উদাসীনতার কারণ হয়তো তাকে হতবাক করে এবং সে নিজে হলে যে সারাদিন দুয়ার লাগিয়ে থাকতো, মুখে সারাক্ষণ হাসি লাগিয়ে রাখতো- এমনটাই হয়তো সে ভাবে। কিন্তু কোনো অবস্থার সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত, সেই অবস্থার অনুভূতি যে কখনোই কেউ ঠিকঠিক অনুভব করতে পারে না এটা-ই বা কে তাকে বোঝায়?

ফ্রিজে রাখা আপেল কেটে এনে সে সামনে ধরে। আমি একবার মুখ তুলে তাকাই। তাকানোর আগমুহূর্তের সামান্য সময়ে অনেকগুলো ঘটনা, দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যেদিন আমার মনে হয়েছিলো শ্যামলী পরিবহন সত্যি সত্যি আজ পরী বহন করছে, টাউন হলের প্রোগ্রামে ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ শুনে যে রাতে আমার ঘুম হয়নি, গতবছর বন্ধু কাজলের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর হঠাৎ একটি কবিতা লিখেছিলাম। এমনি আরো অনেক ঘটনা। অনেক মুখ। নিজেকে সংবরণ করেছি বারবার আর তা নিতান্তই বাধ্য হয়ে। পাছে পুষতে গিয়ে নিজেই পিষ্ট হই। তবু অনেক অনেক ভালো লাগতো আমার। নেই, তবু যেন আছে। নিজের ইচ্ছেমতো ভাবনাকে সাজাতাম। কারো কোনো বাধা নেই। যাকে নিয়ে ভাবনা সে না জানলেও যেন চলে। বরং জানালেই সে অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত হই। এইসব ঘটনা মনে করে আমি আশা নিয়ে মুখ তুলি। শতগুণ হতাশা নিয়ে দৃষ্টি ফেরাই। সে বলে, তাড়াতাড়ি ধরো। সিরিয়াল শুরু হয়ে যাবে।

আগামীর সম্ভাবনার প্রতি আস্থা দেখে আমি হতবাক হই। হয়তো এমনটাই বাস্তব যার মুখোমুখি হইনি বলেই আমার এমন বর্তমান। কতোগুলো সময় আছে যখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে হয়। এই এখন যদি আমি মরে যাই? আমি বোধহয় একবার বলেছিলাম এ কথা যে, আমি যদি মরে যাই? যদি তেমন কিছু করতে না পারি? কিন্তু লাভ হলো না কোনো। আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা এমন বক্তব্যকে নস্যাৎ করে দেয়। আমি আশ্বস্ত হতে পারি না শুধু। ‘যদি’ আর ‘কেন’ নামের রোগ ধরে বসে। কেন আমাকে নিয়ে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী বুক ফোলাতে পারে? আর আমি কেনই বা শেষ পর্যন্ত অটল থাকলাম না। পিতা-মাতার মুখের দিকে চেয়ে এতো যদি মায়া, তার দিকে নয় কেন? যদি আমার বাবাও হতো তার বাবার মতোই? উচ্চতর ডিগ্রীটা না নিলেই নয় কেন? এসব ভেবে ভেবে নিজেকে নৈরাশ্যবাদী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। পরক্ষণে আমার ক্ষোভ ও আক্ষেপ জেগে ওঠে। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার, চাওয়া-পাওয়ার কি কোনো মূল্য নেই? আমি কি মানুষ নই?

আমরা থাকি পিঠের দিকে পিঠ করে অথবা মুখের দিকে পিঠ করে। মুখোমুখি কখনোই নয়। সেও বুঝতে পারে। এইটুকু বোধ তার আছে। তাকে যে একটি পণ্য করে দেয়া হয়েছে তা নিয়ে তার মধ্যেও নিশ্চয় একটা ক্ষোভ আছে, যন্ত্রণা আছে। তাই কোনো বাড়াবাড়ি সে করে না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই সে তা করতে পারে। ডানহাতের একটি অতিরিক্ত আঙ্গুল তার অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। আর মুখশ্রী? খেয়ে-দেয়ে একটা কাজের জন্যই তো কেউ আসেনি। আমার মতোই হয়তো সেও প্রতিদিন একটু একটু করে মরে। উভয়েই সেটা টের পাই কিন্তু প্রতিকার বা প্রতিরোধের সম্মিলিত উদ্যোগে কারো মন সায় দেয় না। আমি বুঝতে পারি আমারই এগিয়ে আসা দরকার। পদক্ষেপ নিতে গিয়ে আমার মনস্খলন হয়, পদস্খলন হয়। আমি পারি না, পারি না। আমার ভাল্লাগে না। কিছু ভাল্লাগে না।

কাজ-কর্মে একটু মনোযোগ দেই। তাও সে জোরপূর্বক। সে জোরের জোর নেই। মাঝখানে সে একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। নিয়ম রক্ষার্থে মাঝখানে আমিও দু’দিন থেকে আসি। তারা কিছুই বুঝতে পারে না। আমি যথাসাধ্য নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। আমি সেই দু’দিন ভীষণ তটস্থ ছিলাম- সে কিছু বলে দেয় কিনা। স্বাক্ষর যেহেতু অজ্ঞানে নয় সজ্ঞানেই করেছি সেহেতু তার অধিকার খর্ব করার অধিকার আমার নেই। এবং তা করলে শাস্তি দেয়ার অধিকারও তাদের আছে। আমাদের দুই পুরুষকে সে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে।

দিন কীভাবে, কখন যায় টের পাই না আমি। তাই সঠিক হিসাব বলতে পারবো না। চারমাস হতে পারে। আমার ঘুম ভাঙ্গে খুব ভোরে। চোখ খুলতেই দেখি সে আমার মুখোমুখি। এ কি সে-ই? আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না। আমার এত্তো ভালো লাগে! এত্তো! আমি কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সকালের সূর্য তার বার্তা পাঠালে তার কাঁধে আমি মৃদু ঝাঁকুনি দেই। সে চোখ খুলে তাকাতেই আমি হাসি। সেও হাসে। তখুনি আমি তার কাছে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব পেশ করি। ‘চলো আমরা হারিয়ে যাই?’ সেও দেখি কোনো প্রশ্ন না করে সম্মতি জানায়- ‘চলো।’ ওখানে আমাদের কেউ পণ্য ভাববে না। আমাদের নিয়ে কোনো কানাঘুষা হবে না। রবিঠাকুরের একটি কবিতার লাইন খুব করে মনে পড়লো আমার- ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’ আমি জানালাটা খুলে দেই। জানালার পাশের মেহগনি গাছটাতে আবার নতুন পাতা গজিয়েছে।

শাহেদুজ্জামান লিংকন
কবি, কথাসাহিত্যিক, চিকিৎসক

 

যেদিন জেগেছিলো হৃদয় - শাহেদুজ্জামান লিংকন

মুগ্ধতা.কম

৩১ মে, ২০২০ , ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

নেশা

ভীষণ রকমের গাছপাগল মেয়ে খেয়া। তার জীবনে একটাই নেশা, বাগান করা। হাতে যেটুকু টাকা আসে তার প্রায় পুরোটাই খরচ করে গাছ কিনে।শুধুই নার্সারি না, অনলাইনেও গাছ কেনে সে।কোথাও বেড়াতে গেলে তার চোখ খুঁজে বেড়ায় কোথায় কী কী গাছ আছে।

অন্যদিকে তার লেখক বরের লেখার নেশা, দিস্তায় দিস্তায় সে লিখে যায়। একটাই ইচ্ছে মনে তার নিজের লেখা বই বের হবে। পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘোরে প্রকাশকের পিছে পিছে। বই তো আর গাছ না যে কুমড়ো খেয়ে বীজটা পুঁতে দিলাম আর চারা বেড়িয়ে পড়লো। বই বের করতে অনেক টাকা লাগে।

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে ভাত জোগাতে যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে বই প্রকাশনা তো এক রকমের বিলাসিতা। তার উপর তার বউ খেয়ার আবার গাছ কেনার মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, আরে বাবা বলিহারি গাছ কি ভাত দেয় নাকি? গাছ না কিনে টাকাটা সে জমিয়ে অভিকে তো বই প্রকাশের জন্য দিতেই পারে নাকি? দিন নাই রাত নাই বাগানের পেছনে পড়েই আছে। আর ফেসবুকে ফুলের ছবি আপলোড করা দেখে গা টা জ্বালা করে অভির। সেইসব ছবি দেখে সবার কী নিদারুণ কমেন্ট! অথচ তার এত সাধের লেখাগুলো না পড়েই লাইক দিয়ে দেয় তারা।

এবার একুশে বইমেলায় বই বের করতে না পারলে লেখক সমাজে অভির ইজ্জতের ছানাবড়া! যে করেই হোক বই বের করতেই হবে। অভি মনে মনে এক ফন্দি আঁটে। খেয়া কিছুদিনের জন্য বাবার বাসায় বেড়াতে যেতে চাচ্ছে। এই সুযোগ। সে খেয়ার গাছগুলো নার্সারি তে বিক্রি করে দিবে, আর অনলাইনেও একটা পেজ খুলে গাছের ছবি দিয়ে ডাল আর বীজ বিক্রি করে যে টাকা পাবে তাতে তার বই প্রকাশ ঠেকায় কে?

খেয়া বাবার বাড়িতে যায়। বেড়ানো আর কোথায়, তার লক্ষ্য নার্সারি নার্সারি ঘুরে নতুন গাছ সংগ্রহ করা। হাতে কিছু  টাকা এসেছে তার। বাসায় থেকে অভির জ্বালায় গাছ কেনাই দায়।

অভি রেডি হয় বাইরে যাবে নার্সারির খোঁজে, গাছগুলো কীভাবে গছানো যায়। সাথে প্রকাশকের কাছে তার জমানো টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে পাণ্ডুলিপিটাও দিয়ে আসবে।

কিন্তুু কোথায় তার পাণ্ডুলিপি? কোথায় তার এত বছরের লেখা দিস্তা দিস্তা কাগজ?

বাইরে কাগজওয়ালার ডাক শোনা যায়, কাগজ দিবেন কাগজ…।

 

মোস্তারী বেগম মিতার গল্প - নেশা

মুগ্ধতা.কম

৩০ মে, ২০২০ , ৯:৩১ অপরাহ্ণ

একটি মৃত্যু ও অন্যান্য অন্ধকার

একটি মৃত্যুর পরপরই ঘটতে শুরু করলো যতসব অদ্ভুত ধরনের ঘটনাসমূহ। শহরের হৃদপিণ্ড ছেড়ে গহিনগ্রামে নেমে এলো যেন বিপুল বিবর্তন। বিবর্তনবাদীদের বিবেক যেন জেগে উঠলো অজস্র অশ্রুঅঞ্জলির পর।

যেখানে সামান্যতম স্বাস্থ্যসেবা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুদীর্ঘ অপেক্ষায় ভাসিয়ে দিতো হতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কদর্য কড়িডোর। সেখানে উন্নত সাস্থ্যসেবার সমূহ সরঞ্জামাদির সৌন্দর্যে ভরে উঠতে থাকলো কড়িডোরের করুণ কদর্যতা ভেঙে।

যেখানে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের জন্য রাতের পর রাত যন্ত্রণাদগ্ধ বিত্রস্ত চিৎকার শুয়ে থাকতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিবর্ণ বেডে। সেখানে বিত্রস্ত চিৎকার চূর্ণ করতে বেডের বিবর্ণতার বাগানে নেমেছে যেন ডাক্তারবৃষ্টি। সেবিকা, স্টেথেস্কোপ, অক্সিজেনভর্তি সিলিন্ডার আর পর্যাপ্ত মেডিসিনে যেন সামান্যতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি হয়ে উঠেছে একটি নাগরিক হাসপাতাল।

যেখানে একজন জনপ্রতিনিধির সাক্ষাৎ পাওয়া মানে ছিলো ঈদের চাঁদ হাতে পাওয়া। যেখানে একজন সিভিল সার্জনের আগমনকে তুলনা করা হতো দূরের কোনো দেবদূতের উপস্থিতির সঙ্গে। সেখানে দল বেঁধে সমবেত হচ্ছেন জনপ্রতিনিধিগণ। সেখানে এসির হাওয়া হাঁকানো মাইক্রোবাস চেপে সুদূর রাজধানী থেকে আসছেন স্বনামধন্য সিভিল সার্জন মহোদয়।

এসব চুম্বকের মতো টেনে এনেছে ওই একটি মৃত্যুই। ওই একটি মৃত্যুর ঘূর্ণিঝড়ে যেন এতদিনের ধ্যান-ধারণা, ধর্ম-কর্ম আমূল বদলে যাচ্ছে।

মৃত্যুতে এত শক্তি থাকে! মৃত্যু কি খুবই শক্তিশালী! কোথায় থেকে পায় সে শক্তি? কেউ জানি না শক্তির সেই উৎস। কেবল টের পাই। কেবল নিজের ভেতরে উপলব্দি করতে পারি তার বলিষ্ঠতা, তার সক্ষমতা, তার উজ্জ্বলতা, তার উদার ঐশ্বর্য যেভাবে টের পেয়েছিলাম বায়ান্নে। যেভাবে উপলব্ধি করেছিলাম উনসত্তরে, একাত্তরে।

বায়ান্নে শুনেছি এই শক্তির পরাক্রমশীল চিৎকার। যার বদলে পেয়েছি কৃষ্ণচূড়ার মতো দুঃখিনী বর্ণমালা। একাত্তরে দেখেছি এই শক্তির প্রবল স্রোত। যার প্রবাহে পেয়েছি রক্তজবার মতো এই ভূখণ্ড।

কতো মহৎ ছিলো সেই মৃত্যুসমূহ। কতো প্রস্তুতি ছিলো সেই মৃত্যুর জন্য। কিন্তু এই মৃত্যুর জন্য সেভাবে কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। এভাবে অনাকাঙ্খিতভাবে ধেয়ে আসবে একটা অচেনা দোটানার মৃত্যু, কেউ ভাবতেই পারি নি। কস্মিনকালেও না।

বিবিধ বিবর্তনে পুরো এলাকা যেন বদলে গেছে এই একটি মৃত্যুর ছোঁয়াচে আলোয়। হাঁচি-কাশি দিলেই রুমালে মুখ ঢাকছেন তারাই, যারা এতদিন এগুলো যৎসামান্যভেবে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন যুগের যুগ। বারবার সাবান, সোডা বা ছাই দিয়ে হাত পরিস্কার করছেন তারাই, যারা গবাদি পশুর মলমূত্র নেড়ে হাত না ধুয়েই আহার করতো এতকাল। মসজিদে না আসতে নিষেধ করছেন তারাই, যারা মসজিদে আসার জন্য ওয়াজের ওজনে কানভারি করে তুলেছেন মুসলমানদের।

যততত্রভাবে চায়ের দোকানগুলো খোলা নেই। বাইরে বেরোলে মুখে মাস্ক পড়ে বেরোচ্ছেন মানুষজন। কতোটা সতর্কভাবে বেঁচে থাকার কৌশল খুঁজছেন, কতোটা কসরত করছেন শহরের হৃদপিণ্ড ছেড়ে গহিনগ্রামের অধিবাসীরা। ও মৃত্যুই যেন পরশ পাথরের মতো ফুটে উঠেছে গহিনের বুকে আজ।

বাবা এভাবে চলে যাবেন মানতেই পারছি না। বিশাল বটবৃক্ষের মতো ছায়ার সিনার ভেতর উনি আমাদের আগলে রেখেছিলেন। আমাদের মুখ ফসকে একটি ‘উঃ’ উদগত হলে উনি উচ্চকিত হয়ে পড়তেন। সেতুর কাজ শেষ হলেই শুভ কাজে হাত দিতে চেয়েছিলেন চায়না আপার। বাবা এভাবে চলে যাবেন মানতেই পারছি না। দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত কালো গোলাপের মতো শোকাচ্ছন্ন সহেলি বলেই মুখে ওড়না আওড়ায়।

সেতুর পাইলিংয়ের কাজ শেষে সেদিন বাবা সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেই খুব অস্বস্তিবোধ করছিলেন। আস্তে আস্তে অচেনা অসুস্থবোধে বোধ হারাচ্ছিলেন। দিগন্তের বলয় থেকে রাতের রেখা মুছতে না মুছতেই এই অচেনা অসুস্থবোধের অশ্ব যেন আরও বিগড়ে গিয়েছিলো। ঘোরের খুর থেকে গোপন সংশয় ফেনায়িত শরু করলো আমাদের অস্থির অন্তরে। আমরা ওনার এ অস্বস্তি আর অসুস্থবোধের নাম দিলাম জ্বর। স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও ওনাকে একই নামে ডাকা হলো। উনি গোঙানির ভেতর থেকে নমুনা পরীক্ষা করবার জন্য বারবার স্বাস্থ্যসেবিকার দিকে অনুরোধের আঙুল তুলছিলেন। আমরাও এগিয়ে এসেছিলাম নমুনা নিয়ে নম্রতায় নুতজানু হয়ে।

এই নাম আমাদের চেনাশোনা। এতে কোনো গুরুতর সমস্যা নেই। আপনি বাড়িতে যান। নিয়মিত ওষুধগুলো খান। আপনার সমস্ত অস্বস্তি আর অসুস্থবোধ বোধহীন হয়ে যাবে বধিরের মতো। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবিকা বলেছিলেন খুব আত্মবিশ্বাসের তরঙ্গে দুলতে দুলতে। কোথায় সে সেবিকা? কোথায় তার সেই আত্মবিশ্বাসের তরঙ্গ? খুব ক্রোধ আর ক্লেদাক্ত কণ্ঠে বলছিলো ঘোড়াশাল কলেজে সদ্য স্নাতকে ভর্তি হওয়া আয়মান নামক কোনো এক টগবগে তরুণ।

বাতাসের বাগান থেকে কেমন হুহু মাতমের গন্ধ ভেসে আসছিলো মৃতের বাড়িতে। সূর্যটা যেন নষ্ট ডিমের কুসুমের মতো মাথার উপর দিয়ে পশ্চিমে প্রবাহমান। বাইরের ধূসর আর ধূ-ধূময়তার ভেতর থেকে কয়েকজন সাংবাদিকের সংঘবদ্ধ পায়ের আওয়াজে তুমুল নৈঃশব্দ্যে ঢলে পড়া বাড়িটা যেন খানিক জিজ্ঞাসাবাদের কোলাহলে কলকলিয়ে ওঠে। আদিবার অনিদ্রিত মুখের দিকে তাকিয়ে পর্যায়ক্রমে প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকলো প্রফেশনাল সন্দেহবাদিরা। আদিবা ঘটনার আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত বিরবির বিবৃতি দিতে দিতে হাঁফিয়ে উঠেছেন হয়রানির হাঁফরে।

সত্য বিবৃতিগুলো ক্রমেই মিথ্যের মিথস্ক্রিয়া ছড়াতে থাকে। হারাতে থাকে সত্যের সহিষ্ণু শক্তি। আমরা মৃতের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে জেনেছি যে, ওনার শরীরে ও ধরনের কোনো আলামত পাওয়া যায় নি। প্রথমে রোগত্বত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হলো এই মিথ।

তাহলে মরে গেলেও অপরাধ পরীক্ষা করবার জন্য কেবল রক্তই যথেষ্ট। রোগত্বত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিবৃতি সম্প্রচারের পর অপরাধীদের ভেতর অদ্ভুত সন্দেহ জেগে উঠতে থাকে।

ওনার মৃত্যু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে। উনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, হেপাটাইটিস আর হৃদরোগসহ সমূহ রোগে ভুগছিলেন। তা ছাড়া বয়স ষাটের উর্ধ্বে হওয়ায় ওনার মৃত্যু হয়েছে। ওনার শরীরে ও ধরনের কোনো আলামত পাওয়া যায় নি, যে ধরনের আলামত আমরা অনুসন্ধান করছিলাম। আপনারা ভীত হবেন না বলেই সার্জন রুমালের রন্ধ্রে নাকের সুড়ঙ্গ বেয়ে উঠে আসা হাঁচিটাকে লুকোনোর চেষ্টা করেন। তখনও এসির হাওয়া হাঁকানো গাড়িতে বসে ড্রাইভার রাজধানীর উদ্দেশে সার্জনের জন্য অধীর অপেক্ষা করছিলেন।

অধিকাংশ রাষ্ট্র নেতাদের বয়সই তো ষাটের উর্ধ্বে। তাহলে আমাদের রাষ্ট্র হুমকির মুখে নয় কি! সিভিল সার্জনের বিবৃতি শোনার পর থেকেই এরকম মনে হতে থাকলো প্রত্যেক নাগরিকের।

সরকার আপানাদের পাশে আছেন। কোনো প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোবেন না। সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে হত দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হবে। অজস্র অশ্রুমঞ্জরির প্রতি দানশীল আচরণ প্রদর্শন করতে করতে শ্লোগানে  রাস্তায় নেমে পড়েন জনপ্রতিনিধিগণ ।

আপনারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। ঘরে থাকুন। প্রবাসফেরতরা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকুন। গুরুতর লক্ষণ দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রশাসন আপনাদের দায়িত্বশীল আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং থাকবেন বলেই ইউএনও মহোদয় মাস্কের মহত্ত্বে মুখ ঢেকে মঞ্চ থেকে নেমে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মৃতের দাফনে।

সাড়ে তিন হাতের শূন্যতা নিয়ে কী এক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কোনো এক গর্তের গহিন। আস্তে আস্তে ক্রেনে করে নামানো হচ্ছে রাতারাতি সব বদলে দেওয়া সেই মহত্তর মরদেহ। অনার্য কোদালের কদর্য কোপের প্রতাপে ঝরছে মিহি মাটিমণ্ডল পৃথিবীর পিঞ্জর খসে খসে। আস্তে আস্তে তার প্রাচীন পালকে ঢেকে যাচ্ছে বিস্মৃত মুখমণ্ডল। সাড়ে তিন হাতের শূন্যতার সুড়ঙ্গে পতিত হচ্ছে সত্যের সৌকর্য। অন্ধকারে মুছে যাচ্ছে বিগত দিনের রেখাবলি। তারই অনন্ত আভা আর আস্তরণে আচড়ে পড়ছে অন্যান্য অন্ধকারও।

এই আশ্চর্য অন্ধকারে ফরিয়াদ করতে করতে পাখিগুলো ম্যাজিশিয়ানের মতো মিলে যায় সান্ধ্য মেঘমণ্ডল বিদীর্ণ করে কোনো এক দূরতমে…

 

রেজাউল ইসলাম হাসু
লেখক : তরুণ সাহিত্যিক।
প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

 

রেজাউল ইসলাম হাসুর গল্প - একটি মৃত্যু ও অন্যান্য অন্ধকার

মুগ্ধতা.কম

২৮ মে, ২০২০ , ১১:১৬ অপরাহ্ণ

নেশা

বর্ষার মাঝামাঝি। তীব্র রোদ। ঝলসে যাচ্ছে চারদিক। দোলার জমিগুলোতে চারাগাছ তুলে কৃষক বোরোধান লাগিয়ে দেয় এখন।

সেই ধান বর্ষা আসার সময় ডুবে যেতে থাকলে আধাপাকা অবস্হায়ও কেটে ফেলে কৃষক। কখনো ধানের শীষের কাছে কেটে নেয়। পানিতে ডুবতে ডুবতে ধানগাছের যতটা পানির ওপরে থাকে সেখান থেকেই কৃষক ফ্যাসাতে থাকে ধান।

নেশা 8

বৈশাখের শুরুতে বেশ বৃষ্টি হলেও এখন তেমন বৃষ্টি নেই। পানিতে টান পড়লে দোলার পাড়ের কেটে নেয়া ধানের নাড়ার কিছুটা অংশ জেগে উঠেছে।
পঁচার বাপ জয়নাল। এই ভরা আগুন ঝরা দুপুরে মাথাল মাথায় দিয়ে বরশি নিয়ে মাছ ধরতে বসে আছে দোলার পাড়ের রাস্তায়- যে রাস্তা চলে গেছে খাতরাপাড়া বরাবর।

দোলার এই নাড়াক্ষেতে পানি কোন জমিতে হাঁটু পরিমাণ, কোন জমিতে উড়ু পরিমাণ। নিচু জমিতে কোমড় ডোবে, কোথাও তো বুক পরিমাণ পানি।
হাঁটু পরিমাণ নাড়া ডোবা ক্ষেতে পঁচার বাপ লুঙ্গিতে মালকোচা মেরে নেমে গিয়ে বরশি ফেলার জায়গায় হাত দুই জায়গার নাড়া, শাপলা গাছ, আগাছা গোড়াসমেত উগলায়ে গোলাকার খলান বানায়। তিনটি বরশির জন্য তিনচার হাত দূরে দূরে তিনটি খলান। জয়নাল এগুলোকে বলে ফুট। ফুট বানানোর পর পাড়ে এসে ধানের কুড়া আর বাসী ভাত মিশিয়ে দলা পাকিয়ে ঢিল দিয়ে দিয়ে ফুটের মাঝখানে ফেলে। টেংরা, টাকি, মাগুর এসব মাছ ফুটের খাবারের লোভে এসে বরশির টোপটাও গিলে নেয়।

জাদুমন্ত্রের মত ভেলকি দিয়ে পঁচার বাপ টপাটপ টাকি, মাগুর বরশির ছিপ চটকা দিয়ে তুলে আনে পানির ওপরে ডাঙ্গায় আর রাস্তার কাছাড় ঘেঁষে পানিতে তলা ডোবানো খলাই ভরতে থাকে সে মাছ জমিয়ে জমিয়ে।

বরশির টোপ গিলে মাছ যখন বরশির ফাতনা ডুবিয়ে নিয়ে দিগবিদিগ ভোঁ দৌঁড় দেয় পানির ভেতর, পঁচার বাপ ছিপ ধরে কিছুটা হেলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে চটকা মেরে মাছের গতিপথ একশো আশি ডিগ্রী বিপরীতে নিজের দিকে নিয়ে আসে।

ছিপের সু্তোর প্রান্তে বরশি গেলা হা করা গোলশা টেংরা, টাকি মাছ ঝ্যাঙ্টাতে থাকে আর কেমন সুতার পাক খুলতে ঘুরতে থাকে।

পঁচার বাপের এই এক গুণ এলাকায় সবার জানা। মাছ যেখানে নাই সেখান থেকেও সে মাছ ধরতে পটু।

আমরা ছেলেরা তারপাশে লোভে লোভে বরশি নিয়ে বসে যেতাম। আমাদেরকে তখন সে নড়াচড়া করতে নিষেধ করতো।

পাছে মাছ টের পেয়ে ভয়ে পালিয়ে যায় তাই চনচনা রোদে এমন চুপচাপ ধ্যান ধরে বসে থাকতো সে। দূর থেকে মনে হতো কাকতাড়ুয়া পানির ওপর হেলে বসে আছে যেন।

চুপচাপ রোদে বসে বা বৃষ্টির ভেতর দোলায় নদীতে পঁচার বাপ কী অদ্ভূতভাবে মাছ ধরতে কামিয়াব হতো আমরা বড়বড় চোখ করে দেখতাম।আমাদেরকে সে বলতো, আমি বরশিত্ সুপারগুলু লাগাইয়্যা দেই। হেই জুন্নে মাছ আইয়া কোনমতে ল্যাজের ছুয়াও যুদি দেয় আমার বশ্শিত্ তালি ওর বাপের ক্ষমুতাও নাই পলাইয়া যায়। আইটক্যা যাবোই।

আমাদের তখন করুণ দশা। ইশ, এরকম আমাদেরও যদি থাকতো বরশি। বুঝতে পেয়ে পঁচারবাপ বলতো, আরে, আমার বশ্শি অইলো জাদুর বশ্শি। তিরিশ টেহা দাম একেকটার। কিনবি নাহি। আচে আমার কাচে আরো কয়ডা।

তখন বরশির দাম চারআনা আটআনা বড়জোর একটাকা ছিলো। বরশি মানে লোহার কলটুকু। আমরা কল কিনে, ঘুড়ি ওড়ানো পাঁচ-সাত হাত সুতার একপ্রান্তে কল বেঁধে অন্যপ্রান্ত বাঁশের লম্বা মোটা কঞ্চির বাঁকানো মাথায় বেঁধে বরশি বানাতাম।

অত টাকা আমাদের থাকতোও না তখন। আমাদের বড় আফসোস হতো। আর লোভাতুর চোখে আমরা পঁচার বাপের মাছ শিকারের ভেলকিবাজি দেখতাম।

বর্ষায় উঁচু জমি থেকে নালা দিয়ে দোলায় পানি নামতো যেখানটাতে সেখানে পঁচার বাপ চটকা জাল ফেলতো। আমরাও ফেলতাম। কী যে জাদুমন্ত্র বলে পঁচারবাপের জালে সব দারকিনা, পু্ঁটি- খলশে মাছের ঝাঁক গিয়ে মুড়িমুড়কির মত উঠতো আমরা ভেবে পেতাম না।

একবার ওলাওঠা রোগ এলো গ্রামে। আরে বাপরে। মানুষ সব যা খায় অবিকল তাই হাগে। পথে-ঘাটে পাটক্ষেত, গমক্ষেতের আইলে মানুষ হাগতো তখন।
ওলাওঠা মানে কলেরায় সয়লাব হয়ে গেলো গ্রাম।

লোকমুখে আমরা শুনি, রাতের অন্ধকারে ওলাওঠা বুড়ি বাড়িবাড়ি নাকি ঘোরে আর রোগ ছড়িয়ে বেড়ায়। রাতে গ্রামের সব মানুষ দরজা জানালা খিল দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকে।

এমন নিস্তব্ধ নিষুত রাতে দোলার পানিতে ঝপঝপ করে জাল পড়ে- ঝাঁকি জাল।

আমরা কাঁথার ভেতর থেকে কান খাড়া করে শুনি সে জাল পড়ার শব্দ।

পরের দিন পঁচারবাপ গল্প মারে আমাদের সামনে, তরা তো হইলি ডরপাদুরা সব। জানোস, আমি রাইতে মাচ মারতাচি, উপুর অইয়া জালের ফাঁস থিকা মাচ খুইলা খালোইয়ে থুইতাচি। সোজা অইয়া আচমকা দেহি আমার সামনে ওলাওঠা বুড়ি খাড়া। শুনে আমাদের ভেতর সে কী উত্তেজনা। -তারপর?

পঁচার বাপ আরো নাটকীয় বর্ণনার অবতারণা করে, -তরা মনে করতাছস ডরাইচি! না আমি ডরাইন্যা বান্দা না। বুড়িরে এমন ধমক দিয়া কইলাম, বুড়ি বাঁচপার চাস তো আমার খালই ধর। মাচ ধরতি অসুবিদা অইতাচে। নইলি এই জাল দিয়া আটকাইয়া তরে ওই পাগারের পানিত্ ডুবাইয়া থুমু। বুড়ি তো তরাশের চোটে কয়, দে দে, খালই দে ধরি। আমারে পাগারে ডুবাইশ না।

আমরা পঁচার বাপের গল্প গিলি হা করে।

কী ঘোর বৃষ্টিতে অথবা বানের পানি নেমে যাওয়া চাষের জমির অল্প অল্প পানিতে মাঝরাতে বাড়ির পেছনে আমরা দেখতাম পাটকাঠির আগুন আর কোচা নিয়ে থপথপ করে মাছের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে পঁচার বাপ।

অল্প পানিতে সদ্য রোপা ধানক্ষেতে কাস্তে- বেকি দিয়ে কুপিয়ে রাতের আঁধারে শিং-টাকি মাছ মারতো পচার বাপ। গ্রামে একে বলতো শোলক কোপানো।

গত সপ্তাহে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। দোলা ভরে উঠেছে উঁচু জমির পানি নেমে। এই পানি কচুরিপানা সমেত স্রোত বয়ে নিয়ে পড়ছে গিয়ে মাদারকুড়ায়। মাদারকুড়া হলো ফুলকুমার নদীর শাখানদী। এই শাখা গিয়ে ধরকা নদী নাম নিয়ে এগিয়ে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ধরলায়।

ঊজানের সীমান্ত এলাকা থেকে একরাতে বানের পানির স্রোতের পাকে গভীর খালের সৃষ্টি হয়েছে নদীর উত্তরদিকের পাড় ঘেঁষে। সেখানে যেতে হয় কুড়ার পানিতে নুয়ে পড়া বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। বাঁশ বনের দু’পাশে ফার্ন গাছের চিরল চিরল পাতা। পাতার গায়ে চিনাজোঁক লকলকে জিহ্বা নিয়ে যেন বুনোঝোঁপ-ঝাড়ের পাতার ওপর দিয়ে সাঁতরে আসতে চায় কোন প্রাণী, বিশেষ করে মানুষের ভাঁজ পেলে।

আমরা পারতপক্ষে কুড়ার ওই এলাকায় যেতাম না। আমরা বড়দের কাছ থেকে কেমন করে জেনে যাই, কুড়ার গভীর পানির নিচে আছে কালা মাশান, তার জটাধরা চুল। সে সুযোগ পেলে নদীতে সাঁতরে নদীর মাঝে চলে যাওয়া ছোটদের পা টেনে কুড়ার গভীর তলদেশে নিয়ে ঘাড় মটকায়।

কুড়ার ওপাড়ে রবি ফসলের ক্ষেত। গম আর মশুর কলাইয়ের আবাদ বিস্তর। কুড়ার কাছাড়ের ওপর দীর্ঘদেহী বেলগাছ। গোড়ায় বেত আর হেলেঞ্চার ঝাড়। বেল গাছের তলায় শুনশান শ্মশান ঘাট।

শ্মশান ঘাটের কাছে কুড়া পড়ায় বাঁশবনের ওই পাড়ে মানুষের আনাগোনা তেমন সচরাচর থাকে না। ফলে মাছের অঘোষিত অভয়ারণ্য যেন কালোজলের টলটলে গভীর এ কুড়া।

সন্ধ্যা থেকেই জমাট মেঘে গুমোট ধারণ করে আছে আকাশ। একটা-দুইটা তারা এই দেখা যায়- এই ঢাকা পড়ে মেঘের আড়ালে।

রাত কিছুটা ভারী হলে ঝমঝম বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই একটানা।

মাঝরাত অব্দি বৃষ্টির তুমুল মাতম। মনে হয় দুনিয়া ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি কখন জানি না।

রাতের শেষ প্রহরে কুড়ার ওপারে কার একটানা ভয়ার্তনাদ পানিতে ভেসে এপাড়ে বসতি এলাকায় আছড়ে পড়ে মানুষের ঘরবাড়ির বেড়ায়-চালে।
-ওরে আসমত রেএএএএএএএএ, ওরে রমজাআআআআন, আমারে নিয়া যা রেএএএএএএএ…..

গ্রামের মানুষ সব জেগে ওঠে এমন বিপদাপন্ন মানুষের আর্তনাদে। সবাই আগুন ও টর্স লাইট নিয়ে ছুটে বের হয়ে কান খাড়া করে আন্দাজ করে বিপদাপন্নের অবস্থান।

হৈহৈ রবে সবে ধুপধাপ ছুটে যায় মাদার কুড়ার পাড়ে।

এপাড় থেকে আসকর আলী মুখে দুই হাত বিশেষ কায়দায় মাইকের হর্নের মত বানিয়ে ডাক ছাড়ে, ক্যারা গোওওওওও।

কুড়ার ওপাড়ে শ্মশান ঘাটের পাশ থেকে জবাব আসে, আমি গোওওওওও, আমি জয়নাল, পঁচার বাআআআআপ। আমারে নিয়া যাইন গোওওও।

বড় অসহায় আর ভয়ার্ত সে অনুনয় ভেসে আসে মাদারকুড়ার পানি ছুঁয়েছুঁয়ে।

কয়েকজন ডাকাবুকো লোক জোট বেঁধে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে লাঠি সোটা হাতে ডানে-বামে ঝাড়-জঙ্গলে, বাঁশের গায়ে ঠংটং পিটন দিয়ে শশব্দে এগিয়ে গিয়ে শ্মশান ঘাটের চাতালে উপস্থিত হয়।

আলো ফেলে নিচে তাকিয়ে দেখে বুকসমান পোঁতা বাঁশের গোঁজ ধরে ভেসে আছে জয়নাল।

কয়েকজন যারা বেলতলায় কোন পুজো শেষে সবাই চলে গেলে নারকোল আর বেল ও অন্যান্য সামগ্রী চুরি করে খায় নানা সময়, যাদের কাছে ভুতুরে এ মাদার কুড়ার শ্মশান ঘাট নস্যি ব্যাপার, তারা রারা করে নেমে গিয়ে তুলে আনে পঁচার বাপ জয়নালকে।

দেখা যায় জয়নালের হাতের কবজিতে বাঁধা ঝাঁকি জালের রশি। আর জাল পড়েছে গিয়ে পানিতে পোঁতা বাঁশের গোঁজের ওপর।

জাল ছাড়িয়ে জয়নালকে নিয়ে সবে এপাড়ে ফিরে এলে উদ্ভ্রান্ত, সন্ত্রস্ত জয়নালের কাছে জানতে চায় এই তুমুল বৃষ্টির মাঝরাতে সে কেন মরতে গেছে বাঁশবন পেরিয়ে শ্মশান ঘাটের ওখানে।

জয়নাল ভুতে পাওয়ার মত বলে, আমি তো জাগনা জাগনা ভাব। কহন চোক্কের ওপর ঘুম নাইমা আইছে। বিষ্টি খানেক কইমা আইলে হুনি, ঘরের বাইরে বেড়ার ফাঁকে বছর আলি ডাহে, অ জয়নাল, বিস্টি নাইকা, বাইরইয়া আয় জাল নিয়া। মাদার কুড়ায় মাচ গাবাইচে। দেরি করিস না। চুপচাপ বাইরইয়া আয়।

আমি জালডা ঘাড়ে ফালাইয়া বছর আলির পাছে পাছে কিবা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া যাইতে থাকলাম। আমি যত কই, বছর বাই, একটু থাম, তোমার কাচাকাচি হইবার পারতাচি না। ততই বছর বাই মুনে অয় পানি আর জমিনের ওপর দিয়া ভাইসা ভাইসা যায়।

আমিও কিবা কইরা জানি হের পাচেপাচে কুড়ার ওইপারে চইলা গেলাম।

যাইয়া যেই খারাইচি কুড়ার ওপর দেহি পানির ওপর বছর ভাই। কয় জাল ফালা জাল ফালা জয়নাল। দেহস না কত বড় বড় মাচ। আমি চাইয়া দেহি, হ, কত বড়বড় মাচের মাতা, বড় বড় হা কইরা পানিত ভাইসা ফাকাত ফাকাত শব্দ করতাচে। এরপর বড় মাচের ঝাকের ওপর যেই না জাল ফালাইছি, বছর ভাই কিবা জানি বিটকইল হাসি হাসতি হাসতি মিলাইয়া গেল আইন্দারের ভিতর। হের পর চাইয়া দেহি, জালের টানে আমি চিতা ঘাটের কাছাড় থিকা নিচের দিকে ছেলচেলাইয়্যা পড়তে আছি।

পচার বাপ জয়নালের এইসব কথা গ্রামের লোকজন ঘিরে ধরে শুনতে থাকে। শুনতে শুনতে কখন পূব আকাশে লাল আভা দেখা যায়।

আর দেওয়ানীবাড়ি থেকে মোরগের কুক্কুরু কুউউউউ ডাকে সবাই সম্বিত ফিরে পায়।

ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে।

 

মারুফ হোসেন মাহবুব
কবি ও গল্পকার, রংপুর।
জন্ম: ১৯৮৪, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত বই: অবিরাম একটি প্রদীপ (কবিতা)

 

মারুফ হোসেন মাহবুব

মুগ্ধতা.কম

২২ মে, ২০২০ , ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

হিমঘরের গল্প

আরেকটু পর আমরা কে কোথায় যাবো কেউ জানি না। আমার শেষ না করতে পারা গল্পটার জন্য খুব মায়া হচ্ছে। আসার সময় স্ত্রীসন্তানের মুখ না দেখতে পেরে যতটা না আফসোস হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে সেই শেষ না করতে পারা গল্পটার জন্য। এমন সময় খুব গুরুগম্ভীর গলায় কোনো এক ভদ্র মহোদয় বলে ওঠলেন, গল্পের কি কোনো শেষ আছে? ভদ্র মহোদয়ের অবলীলাময় প্রকাশ ভঙ্গিতে আমার ভঙ্গিমাও বদলে ফেলি। আরে তাই তো! এতক্ষণ এই বিষয়টা মাথাতেই আসেনি। আসবে কী করে! সেই যে অচেনা জ্বরের টেম্পেচারটা এখনও মাথা থেকে যায়নি।

হিমঘরের গল্প 9

ভদ্র লোকের মিথে মিল লাগিয়ে বললাম, আপনি ঠিক বলেছেন। গল্পের কোনো শেষ নেই। এই যেমন-আমরা এক গল্প থেকে বেড়িয়ে আরেক গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ছি। ঢুকেই যখন পড়েছি, তাহলে চলুন বের হয়ে আসা গল্পগুলো থেকে শেষ মুহূর্তে আরেকবার বেড়িয়ে আসি। গুরুগম্ভীর গলায় সমবেত সকলের উদ্দেশ্যে ভদ্র মহোদয় বললেন। এতক্ষণে পিনপতন নীরবতা ভেঙে সকলেই অদ্ভুতভাবে নড়েচড়ে নিজ নিজ স্থানে ঠিকঠাক হয়ে বসলাম।

কোনো এক বিজ্ঞানী আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো, ভাইসব-পাপ-পুণ্য বলে কিছু নেই। আগুন অথবা শান্তিগাঁথা কেবল এক ধরনের প্রহসন। মৃত্যুই আমাদের মুক্তি। জীবনের শেষ স্তর। এর পরে কোনো শৃঙ্খল নেই। কোনো জন্ম নেই।

বিজ্ঞানীর বিবৃতিতে তীব্র প্রতিবাদ করে আরেকজন চেঁচিয়ে ওঠলো, অনন্তর যাত্রা এই তো শুরু। যেখানে আমরা যাচ্ছি। তোমরা হিসাব-নিকাশের জন্য তৈরি হও। আগুন অথবা শান্তির ফায়সালা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটার গলা থেকে ফাঁসির দাগ এখনও মুছে যায়নি। মাথার টুপিটা ফাঁসির পরেই জল্লাদরা খুলে হয়তো কোনো ডাস্টবিনে ছুঁড়েছে। জিকির আজগার করতে করতে বোধ হয় ফাঁসির মঞ্চে ওঠেছিলেন। এখনও সেই বিশ্বাসের কম্পনটা শরীর ও স্বরে লেগে আছে। আমি লোকটাকে বললাম, আমরা প্রত্যেকের গল্প শুনবো। আপনারা যখন আপনাদের গল্প বলবেন-তখন একটু সংক্ষেপ করবেন। যাতে আমরা আরেকজনকে সুযোগ দিতে পারি। লোকটা হাত তুলে বললো যে, তার গল্পটা এখনও শেষ হয়নি। আমরা তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতে চেয়েও পারি না সময়ের পায়ে বেড়ি দেখে।

আরেকজন বলে ওঠলো, এসব ভয়ের কারণেই আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। বাঁচার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাচ্ছিলাম দালালদের যোগসাজশে। ইতালি গিয়ে ইউরো রোজগার করে আয়েশে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইতালি নৌবাহিনী আমাদের ট্রলার ফিরিয়ে দিলে ভূমধ্যসাগরের অতলান্তে ডুবতে ডুবতে পঁচতে হয়েছে। আরে তাই তো! ওর শরীর থেকে এখনও পঁচাটে গন্ধ ভেসে আসছে। বলেই নাকমুখ চেপে ধরে পাশের জনকে তার গল্পটা বলতে ইশারা করি।

আমাদের মাতৃভূমি থেকে বের করে দেয়া হয়। কারণ আমরা সংখ্যালুঘু ছিলাম বলে। পরে আমরা পৃথিবীতে নিজেদের দেশ হারিয়ে শরণার্থী নামে পরিচিত হয়ে ওঠলাম। কাঁটাতারের বেড়ির উপর আমরা যেন শরণার্থীগোলাপ। আপনাদের নামে যেসব খাদ্য ও ওষুধ সামগ্রী আসতো-সেসব কোথায় যেতো? মাঝখানে ড্যাস চিহ্নের মতো বলে উঠি আমি। লোকটা আবার শুরু করে। হয়তো তার দশ ভাগ আমাদের ক্ষুধা ও রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যয় করা হতো। এতে না মিটতো আমাদের ক্ষুধা আর না নিরাময় হতো আমাদের রোগ। ফলত ক্ষুধা ও রোগের কাছে হেরে যায় আমাদের জীবন। কিন্তু আমরা জিততে চেয়েছিলাম এই যুদ্ধে। বুকের খাঁচাটা তার এখনও দেখা যাচ্ছে। দেহে মাংস বলতে কোনো কোষ নেই বললেই চলে। কেবল জীর্ণশীর্ণ হাড্ডিসার কোনো এক কঙ্কাল যেন বিরবির করছে আমাদের ভেতর।

আমি এবার আমার সামনের জনকে সুযোগ দিই। হ্যাঁ, আপনি বলুন। বোমায় তার ডান হাতটা হাত উড়ে গেছে। বাঁ হাত দিয়ে কোনোরকম রেলিঙ ধরে বসার জায়গাটা ঠিকঠাক করে বলা শুরু করে দেয়। ফাজিল পাশ করেও কোনো চাকুরি পাচ্ছিলাম না। মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা করেছি বলে হয়তো এরকম সমস্যা হচ্ছিলো। বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃসময় কাটাচ্ছিলাম। ওরা জঙ্গি ছিলো বোধ হয়। আমাকে বললো—একটা বোমা ছুড়তে পারলেই এক লাখ। আমি ওদের চিনি না-জানি না। তবু রাজি হয়ে গেলাম। কারণ আমরা বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি জঙ্গি ছিলাম না। আমি জঙ্গি নই। কেবল টানাপোড়েনে পড়েই…। ডান হাত হারানো লোকটার গল্প শেষ না হতেই অনুমতি ছাড়াই পেট চেপে ধরে থাকা একজন ক্ষিপ্ত হয়ে বললো, ও! তাহলে তুমি আছিলা ওই বোমাবাজিতে। আমি রিকসাটা লইয়া খালি বাসা থাইকা বার হইচি। মোড়টা ঘুইরলেও মাংলামটর। অমনি বুম কইরা খালি একখান আওয়াজ হুনলাম। হ্যারপর অর কিচু কইতে পারি না। নাড়িভুড়ি বের হইয়া আইতে চাইতাচে বারবার। তয় পেটে হাত দিয়া চাইপা রাখচি। বাসায় বউডা অহনও মনে অয় আমার ফেরনের লাইগা না খাইয়া রইচে। আমরা জঙ্গিবাজকে ধিক্কার দিতে পারলাম না এই জন্য যে, সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। ভেতরে ক্ষোভানল থাকা স্বত্ত্বেও উসকে না দিয়ে আমরা তার দিকে বিনীত দৃষ্টিতে তাকাই।

আমাদের মাঝে দুজন ভদ্র মহিলা ছিলেন। আমি এবার তাদের একজনকে তার গল্প বলবার জন্য অনুরোধের আঙুল তুললে বুক ও মুখের ক্ষতগুলো ওড়নায় আড়াল করবার চেষ্টা নিয়ে বলে, আমিও বাঁচতে চেয়েছিলাম। খুব নাম করা ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। কদিন পরেই কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিলাম। হুট করে কী থেকে কী হয়ে গেলো বুঝতে পারছি না। সেদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। রাত হলে নাকি শহর মেয়েদের হাত ফসকে পুরুষদের হয়ে যায়-জানতাম না। যখন জানলাম-তখন ওরা আমার বুকের উপর কুত্তার মতো বসে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিলো। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি ঘুপচি গলির ভেতর। তারপর আমাকে টুকরো টুকরো অবস্থায় বুড়িগঙ্গার তীরে আবিস্কার করি। শরীরটা বস্তা দিয়ে জড়িয়ে আছি বলে বোঝা যাচ্ছে না যে, আমি কোনো এক জীবনের টুকরোটাকরা। সমবেত সকল পুরুষ লজ্জায় লাউ পাতার মতো মেয়েটার সামনে নুয়ে পড়ি।

আমাকে একটু চুপচাপ দেখে ভদ্র মহোদয় আমার ডান পাশের যুবকের দিকে ইশারা ছুড়লেন। যার শরীর নির্মলেন্দু গুণের কবিতার একশো একটা পদ্মের মতো নীল আভা ধারণ করে ছড়িয়ে আছে সমবেতদের মাঝে। যুবকটার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছিলো না সহজে। সেজন্য সে সকলের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তার গল্প শুরু করলো। গলাটা বিষে জ্বলে গেছে বলে আমার কথা বলতে অসুবিধে হলেও আপনাদের নিরাশ করবো না। মেহেলেখা নামের কোনো এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয় বাবা-মা। কিন্তু বিয়ের রাতেই মেহেলেখা পালিয়ে যায় তার পুরাতন প্রেমিকের সঙ্গে। এই লজ্জায় বিষের ভেতর জীবনকে ডুবিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম-মেহেলেখার জন্য আমার ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলো না। বিশ^াস করুন, মেহেলেখার বুকে আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। বলেই বুকটা পুড়ে যাচ্ছে চিৎকারে সকলকে আরেকবার ব্যাকুলতায় ভাসিয়ে দেয় নীলাভ যুবক।

ভদ্র মহোদয় যুবকের নীল মেঘ ভেদ করে আরেকজনের কাছে যান। হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি। কোনো লজ্জা পাবেন না। এখানে আমরা পরস্পরের প্রতিবেশীই তো। তাই না? হ্যা, ভাই। এতক্ষণে মুখের মৌনতা সড়িয়ে তার গল্প শুরু করে। লোকটার মাথাটাই নেই। ক্ষেপণাস্ত্রে উড়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা উড়ে কোথায় গেছে বলতে পারি না। আমাদের কোনো অপরাধ ছিলো না। তখন সকাল বেলা। আমি ছেলেমেয়েদের জন্য নাস্তা বানাচ্ছিলাম। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। ওরা আমাদের শহরে অতর্কিত হামলা চালালে আমরা দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করি। তারপর আর কিছু বলতে পারি না। ছেলেমেয়েদের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। লোকটা শ্রাবণের মুষুলধারে কেঁদে ওঠে। তার মাথা না থাকায় আমরা তার কান্না বুঝতে পারি না

এবার আমার পালা। সবাই এবার আমার দিকে তাকায়। আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না। কোথা থেকে শুরু করবো তাও না। জীবনে কখনো এমন হয়নি। বানিয়ে বানিয়ে কতো গল্প লিখেছি বেঁচে থাকতে। একবার ভাবলাম-কিছু একটা বানিয়ে নিজের গল্পটা বলবো। আরেকবার ভাবলাম-ওরা যদি বিশ্বাস না করে। কারণ ওরা সবাই গল্প লেখার সুবাদে কিছুটা হলেও আমাকে চেনে। অতএব আমি এড়িয়ে যেতে চাইলেও কিছু লুকাতে পারবো না। লোকজন বিরক্তবোধ করে। তাড়াতাড়ি বলুন। আমাদের হাতে সময় খুব কম। একটু পর আমরা বিচ্ছিন্ন হবো। কে কোথায় যাবো কেউ জানি না। তাড়াতাড়ি করুন। আমি আমার গল্পটা বলতে যাবো অমনি অদৃশ্য টান অনুভব করি। কারা যেন আমার পিপি পরিহিত শরীরটাকে ক্রেনে করে কোনো এক অন্ধকার সুঁড়ঙ্গে ছুড়ে দিচ্ছে। আমার গল্পটা আর বলা হয় না।

 

রেজাউল ইসলাম হাসু
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।
প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

হিমঘরের গল্প-রেজাউল ইসলাম হাসু

মুগ্ধতা.কম

১৪ মে, ২০২০ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ

হৃদয় সমীকরণ

ধরুন, দেয়াল ঘড়ি এবং আমার ছবিটা উল্টো করে যদি টাঙানো হয় দেয়ালে- তাহলে, মনে এবং চোখে কি রকম প্রতিক্রিয়া হবে? দু’পায়ে দু’রকম কেডস্ পড়লে কেমন দেখা যাবে? শার্ট-প্যান্ট উল্টো করে পড়লে কেমন লাগবে? এরকম অদ্ভুত উল্টাপাল্টা যতসব হিজিবিজি ভাবনা সর্বদা খেলা করে হৃদয়ের মনে এবং বাস্তবিকই সে করেও ফেলে তা নিজেকে জানতে। দেখতে চায় মানুষ কতটা নিজেকে নিতে পারে নিজের মতোন করে।

হৃদয় এপ্লাইড ফিজিক্সের ছাত্র, লেখাপড়ায়ও সে বেশ ভালোই, তবুও তাকে পারিবারিকভাবে পাগলাটে বলেই জানে সবাই।

বন্ধুদের মধ্যে কার কি সমস্যা, কার অর্থের প্রয়োজন, কার পড়া বিষয়ে বুঝতে কি সমস্যা, সবকিছুই হৃদয় তার মেধা ও মনন দিয়ে আন্তরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করে থাকে, তাই বন্ধু মহলেও সে আবার অনেক জনপ্রিয়, তাই তো বন্ধুরা তাকে হ্যালো মিঃ হৃদয় খান বলেই ডাকে। মানে তার আকিকা করা নাম ‘হৃদয় রহমান’ হারিয়ে গিয়ে এখন হয়ে গেছে হৃদয় খান।

জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী হৃদয় খানের পরিচিত গানের কলি প্রায়শই তার চঞ্চল মনে দোলা দিয়ে যায়-

“মন তোরে বলি যতো, তুই চলেছিস তোর-ই মতো… “।

আকাশটা ঘণ-মেঘে ঢেকে গেছে, থেকে থেকে মেঘের গর্জন, বিজলি চমকাচ্ছে, মাঝে মাঝে বাতাসের সাথে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বিরুদ্ধ অবস্থায় কলেজ ক্যাম্পাসে নীলা হন্তদন্ত হয়ে হৃদয় কে খুঁজছে।

নীলা, সাথী, সাগর, শাওন, আগুন এরা আবার সকলেই হৃদয়ের খুব ভালো বন্ধু, “একের জন্য সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” এমন একটা গাঁটছাড়া অমায়িক আদর্শিক বন্ধুত্ব তাদের। তাদের মধ্যে হৃদয়টা একটু আলাদাই, মানে, যে কোন কঠিন সমস্যারও সে  একটা সুন্দর সমাধান দিয়েই দেয় অনায়াসে।

নীলা, ক্যাম্পাসে হৃদয় বাদে সকল বন্ধুদের পেয়ে গেল। সাথী বলছে- কিরে নীলা, তোর একি অবস্থা! কি এমন হয়েছে যে চোখ মুখ সব একরাতেই বসিয়ে ফেলেছিস? বাকী সব বন্ধুরাও বলে- হ্যাঁ তাইতো দেখছি আমরাও কি হয়েছে রে নীলা? নীলা বলে- তোরা চুপ করতো, আগে বল্ হৃদয় কোথায়? সাগর বলে- কি আশ্চর্য, নীলা! এই বিরুদ্ধ আবহাওয়াতেও তো আমরা তাকেই  খুঁজছি নাকি? নীলা বলে- হ্যাঁ তা তো ঠিকই, আসলে আমার মাথাটাই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।

কি এমন হলো সোনা তোমার, যে ছটফট করে শুধু হৃদয়কেই খুঁজছো, কাহিনী কি? এই কথা বলেই আগুন বলে- ও.. হৃদয় তো আবার দার্শনিক মানুষ, তারে তো খুঁজবাই! আমি একবার ঐ ঝিলের ধারে তারে একা বসে থাকতে দেখেছিলাম, একটা অন্যকাজে ব্যস্ত ছিলাম তাই হৃদয়ের সঙ্গে তখন চোখাচোখি হয়েছে কিন্তু কোন কথা হয়নি। চলতো দেখি ভাবুক সাহেব হয়তো ওখানেই আছেন…

যথারীতি হৃদয় কে ওখানেই পেয়ে গেল তারা। আবহাওয়ার দিকে হৃদয়ের যেন কোন মালুমই নেই! সে শুধু অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে হাত তুলছে আর নামাচ্ছে আর বিরবির করে মনে মনে কি যেন বলছে!

শাওন পেছন থেকে হৃদয় কে ধাক্কা দিয়ে বলে- এই যে খান সাহেব, হয়েছে আর উপরে তাকাতে হবেনা, আমার দিকে তাকান, আমরা আপনারে সেই কখন থেকে হন্যে হয়ে খুঁজছি, মানে আপনারে নীলা ম্যাম খুঁজছেন, আর আপনি এখানে বসে বসে কি গুনছেন? সম্বিত হৃদয় পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নীলাসহ সবাই দাঁড়িয়ে। নীলার চোখেমুখে বিষন্নতার ছায়া, যেন বুকের মধ্যে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হৃদয় তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে কি এমন হলো যে আমার খোঁজ? আমিতো আকাশ গুনছিলাম, ভাগ করছিলাম, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ভাগে কতটা হিস্যে পড়লো। নীলা বলে- এই, হেয়ালি রাখ্, আমি বড্ড সমস্যায় পড়েছি। সাথীসহ সবাই নীলাকে বলে- তখন থেকে শুধু সমস্যা সমস্যাই করছিস, কি হয়েছে তাতো একবারও আমাদের বললি না, এখন তো হৃদয় কে পেয়েছিস ওকে বল্, আমরা না-হয় যাই…

নীলা, সকল বন্ধুদের বলে- দোস্ত, তোরা মাইন্ড করছিস কেন্? আমি চেয়েছি হৃদয়সহ সকল বন্ধুরা একসাথে মিলিত হয়ে কথাটা শেয়ার করতে। হৃদয় বলে- এই তোরা থাম্ তো। নীলা বলতো কি হয়েছে বল্? নীলা অশ্রুসিক্ত নয়নে কান্না ভেজা কন্ঠে হরহর করে বলতে থাকে- আমার না বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, কয়েকদিন ধরেই আবছা আবছা শুনছিলাম, কিন্তু গতরাতে মা ভালোভাবেই জানালো। ছেলে, বাবা’র পরিচিত একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কানাডায় থাকে, এই ঈদে দেশে আসবে বিয়ে করতে। হৃদয় মনোযোগ সহকারে নীলার কথাগুলো শুনে বলে উঠলো- এতে আমিতো সমস্যার কিছুই দেখছিনা, কি সমস্যা, বিয়ে করে ফ্যাল্। নীলা বলে- এটা কোন সমাধান হলো? আমার পড়া এখনো শেষ হয়নি, তা ছাড়া আমি নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে এখন বিয়ে করবোনা। হৃদয় স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হৃদয়ে ব্যথাভরা অট্টহাসিতে বলে ওঠে- হা – হা – হা! তাহলে তুই কার পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস্ রে। শোন, একটা কথা বলি- আমিওনা এতক্ষণ বসে বসে ওই দাঁড়িয়ে থাকা নিয়েই ভাবছিলাম, মানে পৃথিবীটা তো কমলালেবুর মতো চ্যাপ্টাসহ গোল, তাই আমি কিছুতেই সমাধান আনতে পারছিনা আমাদের ভূখণ্ডে আমার অবস্থান কি রকম? মানে, আমি কি দাঁড়িয়ে আছি নাকি বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি, এই তোরা কেউ কি জানিস কিছু, একটু বলবি আমায়…

নীলা রেগেমেগে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলে- তুই কি কোনদিন সিরিয়াস হবি না হৃদয়? আমি মরি আমার জ্বালায় আর সে আছে ফান্ নিয়ে! নীলার সঙ্গে অন্য বন্ধুরাও বলে ওঠে- ঠিক-ই তো, এটা তো ঠিক হলোনা হৃদয়। হৃদয় বলে- আমি কি সমাধান দিবো? সাথী তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে- নীলার জন্য তো আমাদের একটা কিছু করতেই হবে। সাগর, আগুন, শাওন ওরাও বলে- একটা কাজ করলে কেমন হয় আমরা খালাখালুকে বুঝিয়ে বললাম যে, নীলা তো এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়, সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা, পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর নাহয়…

নীলা বলে- আমার বাবা-মা রে তোমরা চেনো না, ওগুলো করে কিছুই লাভ হবেনা। হৃদয় নিরবতা ভেঙে বলে- শোন্ নীলা ছেলেটাকে আগে দেশে আসতে দে, তারপর তার সাথে আমরা মিট্ করবো, তোর পড়াশোনার ব্যাপারে তুই তাকে বলবি যে, বিয়ের পরেও পড়তে দিতে হবে, নাহলে এ বিয়েতে তুই রাজি নস। আর বিয়ের পরেও তো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়, কেন এই যে, আমাদের সাথী করছে না। সাথী বলে- হ্যাঁ একটু তো সমস্যা হয়-ই, তবে কথায় বলে নাঃ “ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়”। হৃদয় বলে- ঠিক তাই, তারপরেও যদি বর ব্যাটারে তাড়ানো না যায় তখন দেখবো নে কি করা যায়। নীলা বলে – তোরা যে কি শুরু করলি, আপসোস আমার মনের কথাটা তোরা কেউ-ই ঠিকভাবে বুঝলি না।

হৃদয় বলে- তোমার মনের কথাটা কি বন্ধু, একটু খোলাসা করে বলে ফ্যালো দেখি। নীলা অনুচ্চারিত কন্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে- “এ.. ন্যাকা, যেন কিছুই বোঝেন না”। এদিকে আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। সবাই বলছে এই হৃদয়-নীলা আমরা কি এভাবে বৃষ্টিতে ভিজবো, তাহলে তোরা থাক আমরা যাই, এই বলে- ক্যাম্পাস বিল্ডিংয়ের দিকে তারা দে দৌড়। হৃদয়-নীলাও বলে ওঠে- আমরা থাকবো মানে, কি বলছিস তোরা? এই বলে তারা দু’জনও দৌড়তে যাবে এমন সময় হৃদয়ের আংগুলে থাকা নীলা-পাথরের আংটিতে নীলার ওড়না জড়িয়ে যায়, তখন তারা একে অপরের দিকে অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ! এদিকে মাটিতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি গান গাইছে, যেন উভয়ের চোখস্নাত দৃষ্টিতে বেজে উঠছে অমলিন সুরঃ তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম…

 

হৃদয় সমীকরণ - মাসুদ বশীর

মুগ্ধতা.কম

৮ মে, ২০২০ , ১:৩৬ অপরাহ্ণ

পঁচিশে বৈশাখ

আমন্ত্রণে আসা অতিথি ও আত্মীয়গণের বিদায়-বিউগেল বাজলে মূহুর্তেই গমগমে বিয়ে বাড়িতে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। সদ্য বিয়ে বাড়ির ধকল কাটিয়ে উঠা ক্লেদাক্ত পরিবারটা ড্রয়িংরুমে শেষ সাক্ষাৎটা সেড়ে—যার যার রুমে গিয়ে বিশ্রামের বুকে নিজেদের সমর্পণ করতে এক প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। নকাশাদার ছয়তলা বাড়িটার দো তালার তিন নাম্বার রুমের বর্ণাঢ্য সাজে বরের অপেক্ষারত বিন্তি নামের কোনো এক নববধূ।

সিলভারের অর্গল টেনে রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে নববধূর অভিনব অভ্যর্থনায় ভীষণভাবে ভড়কে যায় কবি। তুমি কি আমাকে খুন করবে? থোতলামি ভাব মিশ্রিত জগাখিচুড়ি ভাষায় নববধূকে জিজ্ঞেস করে কবি। তার হাত দুটো শাথা থেকে এক ফিট উঁচুতে ভাসানো। চোখমুখ—চিবুকে বেগানা ভয়ের ছাপ। ভাবখানা এমন—যেন কোনো এক খুনের কয়েদি—পুলিশের দাবড়ানি খেয়ে শেষমেষ ধরা পড়েছে।

একদম নড়বে না। কোনো আওয়াজ হবে না। চুপচাপ বাবুদের মতো সোফায় বসে পড়ো। কবির কপালে পিস্তল তাকরত অবস্থায় বিন্তি গাম্ভীর্য গলায় শাসায়। না নড়লে সোফায় গিয়ে বসবো কেমন করে? আবার থোতলামি ভাব মিশ্রিত জগাখিচুড়ি ভাষায় ভয় সাঁতরাতে সাঁতরাতে বলে কবি। চুপ শালা। বেশি কথা বলবে না। এখন নড়তে পারো। কান খুলে শুনে রাখো—আমি তোমাকে যখন যা বলবো—তুমি তখন তা-ই করবে। উঠতে বললে উঠবে। বসতে বললে বসবে। কথাগুলো বলেই বিন্তি আরেকবার ডান হাতে আঙুলবদ্ধ পিস্তলটা ঠিকঠাকভবে কবির কপালে তাক করতে থাকে ।

কবি আশ্চর্য হয়। মেয়ে মানুষ এমনও হতে পারে। বিয়ে করা স্বামীর সঙ্গে এমন অসাদাচারণ। এ তো পুরুষ নির্যাতন! এ কেমন যুগ এলো রে বাবা। এর চেয়ে তো শেষের কবিতার বন্যাই ভালো ছিলো। কবির বিরবিরানির গায়ে বিন্তি ধমকের চাবুক লাগিয় দেয় এক ঘা। চুপ শালা। ইঁদুরের মতো ‌র‌্যাটেট-টেট না করে চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসে থাকো। কাছে আসার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবে না। করলেই কিন্তু মেরে দেবো। র‌্যাবের মতো ক্রসয়ায়ারের ভয় দেখায় বিন্তি।

এ তো দেখি সাক্ষাৎ ডাইনি। নজরুলের রাক্ষুসী গল্পের খপ্পড়ে ফেঁসে গেলাম বোধ হয়। মনে মনে ভাবে আর এক পা—দুপা করে ইদুরের মতো সোজা সোফায় গিয়ে বসে পড়ে। বিন্তি ঘড়ির দিকে তাকায়। সুইডিস থেকে কবির মামার পাঠানো ঘড়িটার ইমাজিনেশন ঘণ্টার কাটা রাত বারোটা ছোঁয় ছোঁয়। রাত বারোটা মানে মধ্যরাত। বান্ধবীরা বলতো—বিয়ের রাত যত বাড়তে থাকে প্রেম তত গভীর হতে থাকে। তবে বিন্তির বেলায় আজ তা উল্টো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। রাত যত বাড়ছে ভয় তত গভীর হচ্ছে বিন্তির অনিদ্রিত মনোবনে।

পিস্তলটা এখনো কবির কপাল বরাবর তাক করে ধরে বসে আছে বিন্তি কোনো এক পূর্বাপক্ষায়। কবি তা আঁচ করতে পারে কবি মানুষ বলেই। বিন্তির চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলে দিতে পারে—এই মেয়েটা হত্যাবিজ্ঞান জানে না। হয়তো কোনো এক কারণে সে এসব করছে—কবির অনুমানের জগতে ভাসতে ভাসতে ভাবে। কিছুক্ষণ পর বিন্তির ফোনে কল আসে। সে ডান হাত বদলে বাঁম হাতে পিস্তলটা আঙুলব্ধ করে কবির কপাল বরাবর তাক করে কলটা রিসিভ করে। হ্যালো বাচক সম্ভাষণ জানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেলকোনিতে আসে।

নীলনদের মতো একটা আসমান ঝুলছে অন্ধকারের মাথার উপর। দূরে সিলভারের চাঁদটা একাকীত্বের গাউন মুড়িয়ে বসে আছে আসমানের শিনায়। বেলকোনির রেলিঙ ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া হুঁ-হুঁ হাওয়াটা—জানান দিয়ে গেলো কী যেন ঠিক নেই! সব ঠিক আছে? অপোজিট থেকে কলার ব্যাকুলতার সঙ্গে জানতে চায় বিন্তির কাছে। বিন্তি গলার লিলাবল বি স্কেলে নামিয়ে বলে—সব ঠিক আছে। কোনো প্রোবলেম নেই। তোমার সঙ্গে কাল দেখা হবে। উত্তরা এয়ারপোর্টে। আমরা আর ঢাকায় থাকবো না। সোজা অস্ট্রেলিয়া চলে যাবো। পাপন সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। রাখি। বলেই কলটা ঘ্যাচাং করে কেটে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে আবার কবির কপালে পিস্তল ঠিকঠাকমতো তাক করে ধরে।

আমি কি একবারের জন্য আমার হাত দুটো নামাতে পারি? ভীষণ ব্যথা করছে। ব্যথা ভালো হলে আবার উপরে ভাসিয়ে রাখবো। কবির ছেলেমানুষী কথা শুনে বিন্তির নির্মম মনটা মূহুর্তেই নরোম হয়ে যায়। মুচকি হেসেও ফেলে। আপনার হাসিটা প্রজাপতির মতো সুন্দর। আরেকবার হাসুন না। ড্যাস চিহ্নের মতো মাঝখানে বলে উঠে কবি। তেলবাজি চলছে। হু তেলবাজি। বাবু এসব তেলে আমি সমুচা-সিঙ্গাড়া—পিঁয়াজি কিছুই হবো না। বুঝলে বাবু। কবি আরেকবার তার ভাসানো হাত নামানোর অনুমতি প্রার্থনা করে কেবল জন্য একবারের জন্য। বিন্তি অনুমতি দেয়। অনুমতি দেবার আগে কবিকে একটু ঝাড়ফুঁক দিয়ে নেয়। তোমাকে কে কাকপাখির মতো হাত ভাসিয়ে রাখতে বলেছে। নামাও। নামাও শালা। এতক্ষণে হাত নিচে নামাতে পেরে একটু আরামবোধ করে কবি। লেফট-রাইট—আপ-ডাউন করতে থাকে।

এর মধ্যে বদ্ধ দরজাটা কোনো এক আঙুলাঘাতে ঠকঠক করে চেঁচিয়ে ওঠে। কবি, কোনো প্রয়োজন হলে বলবি। তোর দুলাভাই ও আমি পাশের রুমেই আছি। টেনশন নিস না। বিন্তি ভড়কে যায়। ডান হাতের আঙুলবদ্ধতায় তাক করে ধরে রাখা পিস্তলটাকে আড়াল করবার নিরাপদ আবডাল খুঁজতে শশব্যাস্ত হয়ে পড়ে। হতদম্যতায় খুঁজে না পেয়ে বেডশিটের নিচে কোনোমতো গুঁজে রাখে। তারপর লক্ষ্মি মেয়ের মতো ঘোঙটা টেনে বধূ সেজে বেডের উপর বসে পড়ে। কবি বিন্তির সমস্যাটা বুঝতে পেরে সমাধানে এগিয়ে আসে।

আপু, তুই কোনো চিন্তা করিস না। প্রয়োজন পড়লে আমি তোদের ডেকে নেবো। বিরক্ত করিস না। যা তো এখন—যা। বিয়ের রাতটাও ঠিকমতো…। কোনো প্রোবলেম নেই শুনে আপু ঘুমুতে চলে যায়। কবির অভিনয়লিপি শেষ না হতেই বিন্তি ঘোঙটা সড়িয়ে বেড থেকে লাফ দিয়ে বেডশিটে লুকানো পিস্তলটা বের করেই আবার কবির কপালের দিকে তাক করে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। তারপর এদিক ওদিক তাকায়। বেশ পরিপাটি তোমার ঘরটা। আমার পছন্দ হয়েছে। বিয়ের পর এরকমই একটি বেডরুম আমি চেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে তোমাকে হাজবেন্ড হিসেবে কখনোই কাঙ্ক্ষা করিনি। কষ্মিনকালেও করবো না। কারণ…। কারণটা আমি বলি। বিন্তির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে কবি বলতে শুরু করে। কারণটা হলো—আপনি কাউকে ভালোবাসেন। তবে কারো কথা রাখতে গিয়ে আপনি গাধা মার্কা এই কবিকে—আই মিন আমাকে বিয়ে করেছেন। রাইট? প্রশ্নটা যেন চ্যালেঞ্জের মতো ছুড়ে দেয় বিন্তির উপর কবি।

বিন্তির নিউরোনের ব্যাটারি এমনিতেই ডাউন। তার উপর এমন জ্যোতিষী মার্কা কথাবার্তা শুনে বাকিটাও ডাউন হয়ে যাচ্ছে। মাথা কোনো কাজ করছে না তার। এই শালা তো দেখি অলরাউন্ডার। কখনো অভিনয় করছে। কখনো আমার গোপন চিন্তাদের নাগাল ধরে ফেলছে। শেষে না আমাকেই জাপটে ধরে। পুরুষ মানুষ বলে কথা। এদের জাতপাত নেই—মা-বোন নেই। আবার পিস্তলটা কবির কপালের দিকে তাক করে বলে, খবরদার। নড়বে না। সোফায় বসে থাকো। না হলে মেরে দেবো বলে দিলাম। অভিনয় তো ভালোই শিখেছো। থিয়েটার মিয়েটার করো বুঝি।

পিস্তলটা কপালের খুব কাছাকাছি দেখে ভীষণভাবে ভড়কে যায় কবি। হাফপ্যান্টবেলা থেকেই কবি পিস্তলকে ভয় পায়। কোনো এক মধ্যরাতে—তার চোখের সামনেই এরকম এক পিস্তল দিয়ে আঁততায়ীরা তার বন্ধু ফারহানকে গুলি করেছিলো। ফারহানকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপঅনল এখনও তাকে দগ্ধ করে। সেই থেকে পিস্তল দেখলেই কবির ফারহানের কথা মনে পড়ে। সেই থেকে পিস্তল দেখলেই বুকের ভেতর বিশ্রী ভূ-কম্পন বয়ে যায় তার। না…বলেই চিৎকার করে উঠে সে!

চিৎকার শুনে তার বড় আপা ও দুলাভাই পাশের রুম থেকে ছুটে আসে সাহায্যের তলোয়ার নিয়ে। বিন্তি পিস্তল ফেলে কবির চিৎকারের মুখ টিপে ধরে। চুপ শালা। চিল্লাবে তো মেরেই দেবো সত্যি সত্যি। খোদার কসম করে বলছি। কবিরের দম বন্ধ হয়ে আসে। ছাড়ুন—ছাড়ুন বলতে বলতে নিজেই এক পর্যায়ে বিন্তির জল্লাদের মতো হাতজোড় ঝটকে সড়িয়ে দেয়।

কবি—কবি—ভাই আমার, কী হয়েছে? দরজা খোল। কবি বিন্তির বিত্রস্ত মুখের দিকে তাকায়। বিন্তি ইশারাতে বোঝায় যে, দরজা খোলা যাবে না। কবি আবার রঙ্গমঞ্চে উঠে দাঁড়ায়। অভিনয়ের দক্ষতা জাহির করতে থাকে। না আপু। কিছু হয়নি। ওই ককরোজের বাচ্চা আর-কী। তাই দেখে ভড়কে গিয়েছিলাম। তোমরা ঘুমুতে যাও। কবির কথায় সে যে নিরাপদ আছে—তা আশ্বস্ত হয়ে তার আপা ও দুলাভাই ঘুমুতে যায়।

তখন রাত দুইটা। বিন্তি আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকায়। তার অনিদ্রিত চোখে কেবল একটি অরুণোদয়ের অপেক্ষা। প্রত্যুষ হলে বিন্তি কোথায় যাবে? কবির জানতে ইচ্ছে করে। বিন্তি এবার ঘড়ি থেকে মুখ ফিরিয়ে কবির দিকে তাকায়। ওয়ান্ডারফুল! অভিনয় করলে নির্ঘাত তুমি তো মোশারফ করিমকেও ছাড়িয়ে যাবে। এই আমি হান্ড্রেড পারসেন গ্যারান্টি দিয়ে দিলাম। বিন্তির মুখের ঝিলিকের দিকে তাকালে কবির সব ভয়—রাগ নেমে তড়তড় করে নেমে যাচ্ছে। বিন্তি কেমন যেন একটা মায়াবতী চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে কবির সামনে। তার ইচ্ছে করছে বিন্তিকে একটু ছুঁইয়ে দিই। কিন্তু সে তো কোনো এক পিস্তল আর বেগানা রহস্যের অন্তর্জালে অন্তরীণ।

দেখুন, বিশ্বনাট্যকর উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছেন—

‘পৃথিবী একটা রঙ্গমঞ্চ, আমরা সকলে সেখানে অভিনেতা’।

আমি অভিনয় করছি আপনাকে বাঁচানোর জন্য। আপনি অভিনয় করছেন আপনাকে বাঁচানোর জন্য।

কবির কথা যতই শুনছে বিন্তি ততই মন্তমগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আপনি ঠিক বলেছেন কবির। শেষমেষ কবিকে সম্মানজনক সম্বোধন করে বিন্তি। কবির শুনতে চায় তার অব্যক্ত আখ্যান। ছিঁড়তে চায় সমূহ রহস্যের অন্তর্জাল। বিন্তি প্রথমে বলতে চায় না। আপত্তি তোলে। কবি আশ্বস্ত করে। ভয় নেই। কাউকে বলবো না। কোনো কাকপাখিও জানবে না। এমন কী এই চার দেয়ালের কানেও তালি লাগিয়ে দেবো। আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। বিন্তি বিব্রতবোধ করে। আপনাকে? কবির শেষবারের মতো তাকে আশ্বস্ত করে জানায়—রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—

মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ

শেষমেষ বিন্তি তার রহস্যের অন্তর্জাল ছিঁড়তে থাকে। কুন্ডলী পাঁকানো ধোঁয়াশার ধুলো থেকে বেড়িয়ে আবছা আলোয় আসে আস্তে আস্তে। যেভাবে চারাগাছ মৃত্তিকার অন্ধাকার ভেদ করে বেড়িয়ে আসে আবিরের চকমকে।

আমি একজনকে ভালোবাসি। আমাদের কড়ি মাসের সম্পর্ক। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, একই ছাদের তলে আমাদের বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। হঠাৎ করে বাবা স্ট্রোক করেন। আমাকে না জানিয়েই আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেন। ডাক্তার তাকে উত্তেজিত করতে নিষেধ করেছেন। এতে যেকোনো সময় খারাপ কিছু হতে পারে। বিধায় আমাদের পরিবারের কথা চিন্তা করে বাবা-মায়ের মুখের উপর না করতে পারিনি। কাল আমরা অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে যাবো। পাসপোর্ট-ভিসা সব ব্যবস্থা করা আছে। কেবল এই বাড়ির প্রকাণ্ড প্রাচীরটা টপকাতে পারলেই আমাদের সেই অস্ট্রেলিয়া।

কবিরের অনুমানগুলোয় সত্যি হলো। সত্যি হলো না কেবল বন্ধুদের মুখ ফসকানো অনুমানগুলো। একটা দীর্ঘশ্বাস চড়ুই পাখির মতো ফুরুৎ করে বের হয়ে রাতের গুঁমোট মেশানো হাওয়ার সাথে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। আমি এই বাড়ির প্রাচীর টপকানোর জন্য আপনার মই হবো। অনুগ্রহ করে মিছেমিছি আর টেনশন নিবেন না। টেনশন নিতে নিতে এমনিতেই আপনার চাঁদমুখটা শনির ছায়ায় ছেয়ে গেছে। কফি খাবেন?

আস্তে আস্তে কবিকে বিশ্বাস করতে শুরু করে বিন্তি। পিস্তলটা ছুড়ে দেয় ফ্লোরে। ফ্লোর পিছলে বিশাল রুমটার কোনো এক ফাঁক-ফোঁকড়ে পিস্তলটা লা-পাত্তা হয়ে যায় অনিমেষ। কবিরের হাতজোড় ধরে বিন্তি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে ছোট এক প্রশ্ন ছুড়ে বসে। পারবেন তো? বিন্তির নরোম হাতের ছোঁয়ায় কবিরের ভেতর ইলেক্ট্রিক শকের মতো কোনো এক বেগানা কম্পন বয়ে যায়। তারপর বিন্তির মায়াবতী মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের বেড়ি পড়া রাজহাঁসের মতো বলে, পারবো। কবি কেমন যেন চুপসে যায় কথা দিয়ে। বিন্তি কবির নৈঃশব্দ্যতা ভাঙানোর চেষ্টা করে। কই, আপনি নাকি কফি খাওয়াবেন।

কোনো এক অচেনা ঘোরের বলয় ভেঙে বিন্তি মাধ্যাকর্ষণ বলের ক্ষমতায় বস্তুগত জগতে ধরা দেয় কবি। ও হ্যাঁ। দেখুন না। কথা বলতে বলতে ভুলেই গেছি। এই হলো কবিদের প্রোবলেম। কবি ডান হাতের আঙুলাবলির ছোঁয়া মাথায় ছড়াতে ছড়াতে বিন্তির কাছে ব্যক্ত করে। আপনি কবিতা লিখেন নাকি? বিন্তি এরকম একটা প্রশ্ন ছুড়ে বসবে কবি আগেই আঁচ করতে পেরেছে। তবে এই প্রশ্ন অনেকেই করে কবিকে। কবিরও প্রশ্নটা শুনতে মোটামুটি খারাপ লাগে না।

হ্যাঁ লিখি। তবে একটু আধটু। কোনো এক মুগ্ধতা থেকে কবিতা লেখার শুরু। কী সেই মুগ্ধতা? বিন্তির প্রশ্নের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কবি আপ্লুত হয়ে বিন্তির প্রশ্নাবলির উত্তর দিতে থাকে। আমার সেই মুগ্ধতার নাম রবীন্দ্রনাথ। তিনি আমার প্রেম। তিনি আমার পথ। তিনি আমার সৃষ্টির উৎস। বিন্তিও মুগ্ধ হয়ে কবির উত্তরগুলো শুনে। কবি কিচেনে গিয়ে নিজ হাতে দু কাপ কফি বানিয়ে আবারও ঝিমিয়ে পড়া আড্ডাকে জমিয়ে তোলার রসদ জোগায়। আপনি তো দারুণ কফি বানাতে পারেন। কাপে গোলাপি ঠোঁটের দু এক চুমুক লাগিয়েই কবির কফির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠে বিন্তি।

আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একবার এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিলো। ওই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথকে সাংঘাতিক দুটো প্রশ্ন করেছিলেন। কোন দুটি প্রশ্ন? বিন্তি কফির ধোঁয়ায় উড়তে উড়তে জানতে চায়। আইনস্টাইনকে বলেছিলেন—‘আপনি বিজ্ঞানী না হলে কী হতেন আর রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন—আপনি কবি না হলে কী হতেন?’ উত্তরে তারা কী বলেছিলেন? বিন্তি ধোঁয়াটে উড়াল থেকেই জানতে চায়। আইনস্টাইন বলেছিলেন—আমি বিজ্ঞানী না হলে কবি হতাম। আর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলো—আমি কবি না হলে বিজ্ঞানী হতাম। উত্তর শুনে সাংবাদিকরা স্ট্যাচু হয়ে যায়। যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর। কবি মিহি হাসির রঙ ছড়িয়ে বলতে বলতে থেমে যায়। কবির মিহি হাসির রঙের ছটা গিয়ে বিন্তির ঠোঁটেও ঠেস লেগে থাকা হাসিগুলো মর্মরি তুলে ঝরতে শুরু করে। কবি বিন্তির এই হাসির প্রপাতে প্রোথিত হতে ইচ্ছে করে। তবে অস্ট্রেলিয়া নামক কোনো এক অযাচিত স্বপ্ন দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে কবির জীবনে।

বাকি রাতটা আমরা এভাবেই কফি আর গল্পে কাটিয়ে দেবার প্রস্তাব পেশ করে বিন্তি বিধ্বস্ত কবির কাছে। কবি আপত্তি করে না। পরের গল্পে পা বাড়ায়। একবার মহাত্মা গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ একসাথে বসে নাস্তা করছিলেন। মহাত্মা গান্ধী মজা করে বললেন,

‘এত লুচি খেয়ো না। ঘিয়ে ভেজাল আছে। তখন রবীন্দ্রনাথও মজাটাকে আরও মজাদার করে বললেন, গান্ধীজি—বিশ বছর এই ধরে এই ভেজাল খাচ্ছি কিন্তু মরছি না তো। মনে হয় ভেজালেও ভেজাল আছে।’

কথা শেষ না হতেই দুজনে এক সাথে মিহি গলায় হেসে ওঠলো। রাতের নৈঃশব্দ্যে হাসিগুলো চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটা দ্বিরুক্তি দ্বিরুক্তি ভাব জেগে তুললো। এভাবে একটার পর একটা গল্পফুল ফুটতে থাকলো অজস্র কফির ধোঁয়ায়।

দিগন্তের খোসা ভেঙে কোনো এক দিবসের কুসুম ফেটে পড়ছে চৌহদ্দিতে। কবি ও বিন্তি গল্পঘরে তালা লাগিয়ে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

দুই.

কপালে লাল টিপ পড়নে ঢাকাই শাড়িতে খুব সুন্দর লাগছে আপনাকে। রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু হলো দিনটা। আশা করি ভালোই যাবে। কবির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বিন্তি মিহি গলায় হেসে ওঠে। আরে, আপনি রবীন্দ্রনাথ পড়েন! কবি এমনভাবে কথাগুলো বললো যেন সপ্তম আশ্চর্যের চূড়া ভেঙে তার মাথায় পড়ছে। হ্যাঁ। একটু আধটু। আজ তো পঁচিশে বৈশাখ। সুখি মানুষের মতো প্রতিত্তরগুলো দিতে থাকে বিন্তি।

ইমাজিন। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। যে কিনা সারাক্ষণ অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে—সে কিনা বাংলা তারিখটাও জানে। মাইরি! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। আবেগে আপ্লুত হয়ে আনন্দবোধ প্রকাশ করে কবি। দেখুন কবি সাহেব—

মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ

মধ্যরাতের আড্ডা থেকে বেছে নেয়া রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত উক্তিটির ফিরতি শুনিয়ে দেয় বিন্তি। দুজন দুজনের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসির ঝিলিক ছড়ায়। সেই ঝিলিকের রঙ থেকে উড়ে যায় কতোশতো প্রজাপতির অমিয় ডানা।

সকালের নাস্তাটা সেড়ে বাবামাকে বানোয়াট প্রয়োজনীয়তার অজুহাতে কবি বিন্তিকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। কেউ জানে না বিন্তি তার বধূ না। তাদের বিয়ে হয়েছে কেবল কোনো এক প্রাণ বাঁচানোর প্রয়োজনে। আর এখন তারা বের হয়েছে অস্ট্রেলিয়া নামক কোনো এক অযাচিত স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রায়।

কিছুই ভালো লাগছে না কবির। এরকম একটা দিনে এরকম একটা সিচুয়েশন তৈরি হবে ঘূর্ণাক্ষরে ভাবেনি। মুখে চুইংগামের মতো একটা রেডিমেড হাসি ধরে আছে গতরাত থেকে। এ কথা কেউ জানে না। কবির বাবা-মা—আপা-দুলাভাই—কেউ না। এমন কী বিন্তিও না।

আপনার ফ্লাইট কখন? কবি হাসিমুখে জানতে চায় বিন্তির কাছে। বিকেল পাঁচটায়। বিন্তি ওড়নায় গোপন বিভাকে আড়াল করতে করতে কবিকে জানায়। কবির চোখের ঝিলিক সেখানে পৌঁছানোর আগেই লজ্জায় মুখটা ঘুরিয়ে নেয় সে। এখন কোথায় যাবেন? বলেই একটা খালি রিক্সা ডাক দেয় কবি। বোডানিক্যাল গার্ডেনে। ও একটা কাজ সেরেই ওখানে আসবে। বিন্তি শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে উত্তর দেয়।

কই যাবেন স্যার? খালি রিক্সাটা নিয়ে চালক কবির কাছে জানতে চায়। বোডানিক্যাল গার্ডেন। ভাড়া তয় স্যার একশো টাহা লাইগবো। বিন্তি প্রতিবাদের সুর তুলে বসে হুট করে। মামা—এক শ কেনো। যেটা ভাড়া সেটা দেবো। আমরা তো আর প্রেমটেম করতে  যাচ্ছি না। গতকাল আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমরা হাজবেন্ড-ওয়্যাইফ। প্রেমিক-প্রেমিকা না। বুঝলেন?

চালক বিন্তির কথা শুনে খালি মোশারফ করিম মার্কা একটা হাসি দিয়ে বলে, তয় হইবো না। একশো কইচি। একশোই দিতে অইবো। উডবেন নইলে যামু গা?

উপান্তর না পেয়ে কবি ও বিন্তি রিক্সায় উঠে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ এই জন্য বলেছেন—

বাঙালি করে রেখেছো, মানুষ করোনি

খুব আক্ষেপের সুরে কথাটি বলতে বলতেই মিরপুর এক ক্রস করে ফেলে তাদের রিক্সাটা। ঢাকা শহরে বাস বা প্রাইভেট কারের চেয়ে রিক্সায় ঘুরতে সব থেকে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে কবি। আমারও। বলছিলো বিন্তি। বিন্তির সুদীর্ঘ চুল বেনিহীন বেড়িহীন বাতাসে উড়তে উড়তে কবির গালমুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। কবির এই মূহুর্তে অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ইচ্ছের পায়ে সে বেড়ি পড়িয়ে রাখে। সংযত করে রাখে নিজের পুরুষত্বকে। এখানেই তো পুরুষদের অগ্নি পরীক্ষা।

তিন.

বোডানিক্যাল গার্ডেনে বিন্তি তার অস্ট্রেলিয়ার জন্য অপেক্ষার আঙুলে ঝুলে থাকে। আর তার পাশে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে কবি। প্রেম করেছেন? বিন্তি কবিকে প্রশ্ন ছুড়ে বসে আনমনে। করিনি—তবে করছি। অপ্রস্তুতভাবে উত্তরট দেয় কবি। মেয়ে দেখতে কেমন? বিন্তি সময় কাটানোর প্রয়োজনে প্রশ্নের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। কবি নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিয়ে যায়। হুম, আপনার মতো। নাম কী? বিন্তি প্রশ্ন করতেই থাকে। অধরা। কবিও উত্তর দিয়েই চলে।

বাহ! চমৎকার নাম তো। নামটাতে আর্ট আছে। বিন্তি প্রশ্নের সাথে দার্শনিকতাও ছড়িয়ে যায়। গান শুনবেন? কবি গানের অফার করে বিন্তির একগুঁয়েমি কাটানোর জন্য। কার গান? একটা মিষ্টি হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে জানতে চায় বিন্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীত। বলতে গিয়েই অনিচ্ছাকৃতভাবে বিন্তির ডান হাতের উপর কবির বাঁম হাত ছুঁয়ে যায়। দুজনেই কেমন যেন একটা অচেনা লজ্জার কোড়কে মুড়িয়ে যায়। দু এক মিনিট কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না।

আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে।

এ জীবন পূর্ণ কর দহন-দানে।।

দু লাইন গলা ফসকাতে না ফসকাতেই দাড়ি বসিয়ে চুপসে যায় কবি। পাশ ঘুরে কবির মলিন মুখের দিকে তাকায়। আরে থামলেন কেনো। বেশ তো লাগছিলো। আপনি কবিতা লিখেন শুনেছি। কিন্তু এত ভালো গানও গাইতে পারেন তা তো গতরাতে বলেননি।  বিন্তির কাছে নিজের প্রশংসাধ্বনি হাওয়ায় উড়িয়ে দেয় কবি। পাত্তা দেয় না ওসবে। এ আর এমন কী। ভালো লাগা থেকে একটু আধটু গাই। এই আর কী। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে নিজের ভেতর যেন হারানো আমিকে ফিরে পাই। দেখতে না পাওয়া নৈর্ব্যক্তিক জগতটাকে দেখতে পাই।  বেদনায় বিশুদ্ধ বীজ হয়ে ওঠি।

আপনি ঠিক বলেছেন কবি সাহেব। আজেবাজে গান না শুনে আমাদের বেশি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা উচিত। কারণ তার গানে আছে বিশুদ্ধতার বীজ। পরমের অনুসন্ধান। প্রাণের স্ফূরণ। বসে থাকা অনেক হয়েছে। এবার চলুন হাঁটা যাক। গার্ডেনটা ঘুরে ঘুরে দেখি। এই কর্পোরেট শহরে গার্ডেনগুলোয় হলো এক পশলা সবুজের ঝোপঝাড়। কবি আপত্তি করে না। চলুন তাহলে।

ম্যাডামকে একটা মালা কিনে দিন স্যার। হাঁটার পথে কোনো এক বাচ্চা মেয়ে এসে কবির কাছে আবদার করে বলে। এই শেষ বেলায় বিন্তিকে কিছু একটা দেবার সুযোগের দরজায় দাঁড়িয়ে কবি। সে একবার মালার দিকে তাকাই আরেকবার বিন্তির মায়াবতী মুখের দিকে তাকায়। বিন্তিও যেন এই শেষ বেলায় এসে কবির কাছে কিছু পেতে চাইছে। ম্যাডামকে একটা মালা কিনে দিন স্যার। বাচ্চা মেয়েটা এবার যেন কবির কাছে আবদারটা জোড়ালোভাবে করে বসে। কবি তাকে নিরাশ করে না। মানিব্যাগ থেকে একটা এক শ টাকার নোটের বিনিময়ে বাচ্চা মেয়েটার হাত থেকে জুঁই ফুলের মালাটা কিনে বিন্তির হাতে তুলে দিতে দিতে বলে—অনুগ্রহ করে ফিরিয়ে দিবেন না। অন্তত আমার একটা চিহ্ন আপনার সঙ্গে অস্ট্রেলিযা অব্দি যাক।

বিন্তি না করে না। হাসিমুখে পরম মায়ায় গলায় জড়িয়ে নেয় কবির একমাত্র স্মারক চিহ্ন জুঁই ফুলের মালাটা। তারা আবার হাঁটতে শুরু করে ছোট ছোট পথের বুকে ধীর ধীর পা ফেলে। মালাটা আপনার গলায় খুব সুন্দর লাগছে। কবির প্রশংসা বাক্য শুনে বিন্তি মুচকি হাসির রঙ ছড়ায়। এই মালা দেখে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা লাইন মনে পড়ে গেলো। হাঁটতে হাঁটতেই কবি ব্যক্ত করে। শোনানো যাবে? বিন্তি শুনতে চায়। হোয়াই নট? কবি আনন্দবোধ প্রকাশ করে শোনানোর জন্য। তারপর বিন্তির মায়াবতী মুখের দিকে তাকিয়ে আবৃত্তি করে—

তারি মাঝখানে শুধু একটুকু জুঁই,

একটুকু হাসিমাখা সৌরভের লেশ,

একটু অধর তার ছুঁই কি না—ছুঁই।’

আমাদের মনে হয় আর দেখা হবে না। আবৃত্তির রেশ কাটতে না কাটতেই বিন্তি কবিকে এরকম এক বাক্যে আরো নিরাশার অতলে ডুবিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ তো হাঁটলাম। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। চলুন কোথাও লাঞ্চটা সেড়ে নেই। এসব পাশ কাটানোর জন্য বিন্তিকে  লাঞ্চের অফার করে কবি। ওর মনে হয় আসতে আরও লেট হবে। কবির অফারে সাড়া দিয়ে বলে বিন্তি। চলুন। কবি এক বাক্যেই রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে।

লাঞ্চ শেষ না হতেই বিন্তির সেই অস্ট্রেলিয়া এসে হাজির হয়। কবির সঙ্গে বিন্তি অস্ট্রেলিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সাদাফ, ইনিই হলেন মিস্টার কবি। কবি করমর্দনে বিন্তির অস্ট্রেলিয়াকে মানে সাদাফকে অভ্যর্থনা জানায়। কবি সাদাফকে বসতে বললে সাদাফ ঘড়ির দিকে ইশারা ছুড়ে খুব তাড়া দেখায়। বিন্তির হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে কবিকে বায় বলে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে ওঠে। বিন্তি বারবার কবিকে ঘাড় ফিরে দেখছিলো। কবিও অশ্রুত এক নিবদ্ধ দৃষ্টিতে বিন্তির প্রস্থানে তাকিয়ে আছে। আর শূন্য বুকের ভেতর হুঁ-হুঁ বেহালায় বেজে উঠছে শেষের কবিতার রাগিণী—

কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে

বসন্তবাতাসে

অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,

ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,

সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে

তোমার প্রাণের প্রাণে, বিস্মৃতি প্রাদোষে

হয়তো দিবে সে জ্যোতি,

হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নে মুরতি।

তবু সে তো স্বপ্ন নয়,

সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয়—

সে আমার প্রেম।

তারে আমি রাখিয়া এলেম

অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।

পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে

কালের যাত্রায়।

হে বন্ধু বিদায়।

বিন্তির প্রস্থান সঙ্গীতে কবির পৃথিবীটা যেন রানাপ্লাজার মতো ধ্বসে পড়ছে। প্রাণোচ্ছল পরিবেশটা যেন মূহুর্তেই কুয়াশাকহুকে ভরে গেলো। কবি কেবল জিরাফের মতো সেসবের নিঃসঙ্গ দর্শক। কালো রঙের গাড়িটা যেন শোকবাহী কোনো এক কফিন। গাড়িতে বসে বিন্তির মনের স্ক্রিনে বারবার কবির মসৃণ মুখের ছবিটাই ভেসে ওঠছে। তার সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট স্মৃতিগুলো তাকে তাড়া করছে অন্ধ তিরের মতো। গলায় জড়িয়ে যাওয়া জুঁই ফুলের মালাটাকে মনে হচ্ছে—কবি। কবি যেন তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে জড়িয়ে আছে।

এয়ারপোর্টের কোলাহলে পা রাখে বিন্তির শোকবাহী কালো রঙের গাড়ি নামক কফিন। একটার পর একটা ফ্লাইটগুলো বাজপাখির মতো উড়ে যাচ্ছে অনিমেষ—এইসব চেনাজানার দিগন্ত ছেড়ে সুদূরব্যাপী।

কবির ফুরিয়ে যাওয়া হাসির মতো দিনের আলো নিভে যাচ্ছে। বিপুল বিকেলের রেলিঙ বেয়ে বেয়ে একটা অযাচিত সন্ধ্যা উপচে পড়ছে শহরের কদর্য কোলাহলে। তার ভেতর কান্না ও করুণার বুদবুদে হারানো কোনো এক নিঃসঙ্গ কবি হেঁটে যাচ্ছে এক পা দু পা করে। রবীন্দ্রনাথ কি আমার মতো কখনো কেঁদেছিলো প্রেম হারিয়ে? হয়তোবা।

মিরপুর দশ। রোড নাম্বার ছয়। গলি নাম্বার তিন। এই খালি—যাবে? ভীষণ রকম মন খারাপ নিয়ে একটা রিক্সাকে ডাক দেয় কবি। এমন সময় কোনো এক নরোম গলার আওয়াজ উড়ে আসে পেছন থেকে। কবি।

এ তো বিন্তির গলা। কবি ঘুরে দাঁড়ায়। বিন্তিকে দেখে চোখমুখ আনন্দ-আভায় ঝলমল করে ওঠে। আপনি অস্ট্রেলিয়া যাননি? চোখের কোণে অজান্তে জমে যাওয়া জলের জোয়ার মুছে জানতে চায় কবি। আপনি না—তুমি। বলেই বিন্তি কবির বুকে মাথা গুঁজে কবিতার মতো মিশে যায় তার ধমনী-শিরায়। একজোড় অভিন্ন্ সত্তার সিঁড়ি বেয়ে বেজে ওঠে—

আমার মিলন লাগি তুমি

আসছ কবে থেকে।

তোমার চন্দ্র-সূর্য তোমায়

রাখবে কোথায় ঢেকে।

কতো কালের সকাল-সাঁঝে

তোমার চরণধ্বনি বাজে,

গোপনে দূত গৃহ-মাঝে

গেছে আমায় ডেকে।

 

লেখক : তরুণ সাহিত্যিক।

জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।
প্রকাশিত বই দুইটা।

এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

 

পঁচিশে বৈশাখ - রেজাউল ইসলাম হাসু

মুগ্ধতা.কম

২ মে, ২০২০ , ৮:০২ অপরাহ্ণ

সুমনা একজন ডাক্তার

রাত ১১.৪৯। কন্যাসম মেয়েটির ফোন।

স্যার! টেস্টে আমারও পজেটিভ…! আর কিছুই বলতে পারে না নবীন মেধাবী ডাঃ সুমনা রহমান। চাপা কান্নায় অস্পষ্ট কথাটার মানে বুঝতে; দেরি হয়না আমার। এতটুকু দেরি হবারও কথা নয়!

বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ছোট বেলা থেকেই  ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন যার হৃদয়ে লালিত। অসুস্থ মায়ের সেবা করার শপথ যার, না বোঝার বয়স থেকেই। সফলও হয়েছে সে, তার অদম্য চেষ্টা ও খোদার অপার মহিমায়।

মাত্র এক বছরের ডাক্তারি পেশায়ও পেয়েছে অনেক; স্যারদের স্নেহ, স্টাফদের সম্মান, মানুষের ভালোবাসা; সম্মাননা স্মারক, পদক সবই। মেডিসিন শাস্ত্রেও রেখেছে নিজস্ব মেধার স্বাক্ষর।

কী বলে সান্ত্বনা দিবো তাকে! আমি তো তার অফিসিয়াল অর্ডারে স্বাক্ষর করেছি নিজেই। আমি কী জানতাম না? করোনা হতে পারে সুমনারও মৃত্যুদূত!
নিজেকে সংযত করে নিয়ম মাফিক অভয় দিয়ে; টেনশন না করতে বলি। নিজেকে আপাতত হোম কোয়ারেন্টাইনেই রাখতে বলি। আর নিজেকে শক্ত রেখে কী কী করতে হবে, খেতে হবে, সবই জানা সুমনাকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করি। কথা গুলো বলার সময়, আমি পুরোটাই প্রফেশনালই ছিলাম। কিন্তু আমার ভিতরের আমিটার যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো; তা কারো অনুভব করার কথা নয়। হয়তো সুমনাও অনুভব করতে পারেনি!

সুমনা! আমরা ডাক্তার, আমাদের ভেঙে পড়তে নেই। আমরাই হতাশ হলে সাধারণ মানুষগুলো কী করবে, কোথায় যাবে? কে দেবে তাদের সান্ত্বনা! বেঁচে থাকার স্বপ্ন! চিকিৎসাহীন কোন মানুষ মারা যাক, এটা একজন ডাক্তারের প্রত্যাশা হতে পারে না। আমি জানি, সুমনাও একজন ডাক্তার। তথাকথিত কসাই নয়।

ফোনের ওপ্রান্তের সুমনার পুলকিত জবাব ‘হু স্যার’; আমাকে আবেগে আপ্লুত করে। কোন এক অজানা শক্তি; আমার নিজের ভিতরের আমিটাকেও একজন সুমনা বানিয়ে দেয়।

সুমনা একজন ডাক্তার - এস. এম আরিফ

মুগ্ধতা.কম

২ মে, ২০২০ , ৭:৫৪ অপরাহ্ণ

চলে যাওয়ার ভায়োলিন

আত্মহননের মতো স্বেচ্ছা ছুরিতে নিজেকে রক্তজবা করে কেউ কেউ চলে যায় কখনো সখনো ইডিপাসের মতো। অথবা কোনো এক অদৃশ্য আঙুলের অভ্যাগত ইশারায় মায়ার বিশালতা ছেড়ে কাউকে না কাউকে চলে যেতে হয় কোনো একদিন শূন্যের অভিমুখে।

এই শূন্যতার নাম না থাকা। এই শূন্যতার নাম চলে যাওয়া। আর এইসব প্রাচীনতম সত্যর মহত্তম মিথ মেনে নিশ্চিন্তে চোখভর্তি রাজহাঁসের স্বপ্ন-সমেত বেঁচে থাকার কৌশলের নাম হচ্ছে মানুষ, কসরতের নাম হচ্ছে প্রেম। অথচ মাঝে মাঝে মানুষ ভুলে যায় সে কথা। প্রেমিকের মনে থাকে না সেই মিথ। সেরকমই কোনো এক ভুলে যাওয়া মানুষের নাম হলো আয়মান। সেরকমই কোনো এক অন্ধ প্রেমিকের নাম হলো আয়মানের পিতৃপ্রেম। কোনো এক চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ওর ভেতরের সন্তানসুলভ মানুষটা।

হাবিলের হন্তারক হাতের লালপথ ধরে আদিমকাল থেকেই চলে যাবার মিছিলে নেমেছে  এইসব মানুষের দল। মানুষ কেনো চলে যায়? এই প্রশ্নবোধক দুঃখ তাকিয়ে থাকে চলে যাওয়া মানুষের শূন্যের অভিমুখে। সীমাহীন শূন্যতাও চেয়ে থাকে নিরুত্তর দুঃখের করুণ চোখের অভিমুখে। দুঃখ লজ্জা পায়। অচেনা আড়ালে মুখ লকায়। এই আড়ালের নাম হতাশা। এই আড়ালের নাম দুঃস্বপ্ন।

কোনো এক চলে যাওয়ার হতাশায় ডুবে আছে পঁচিশতম বসন্তে পা ছোঁয়া আয়মান। ওর সে চলে যাবার নাম বিকেলের ঠোঁট থেকে একটি অনিবার্য চুমু খসে যাওয়া। ওর সে চলে যাবার নাম হৃদয়ের অর্গল ফসকে যাওয়া কোনো এক সুখশ্বেতের নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি। ওর সে চলে যাবার নাম জীবনের বেষ্টনী ভেঙে সরে যাওয়া কোনো এক সহিষ্ণু ছায়া। ওর সে চলে যাবার নাম হলো পরম পিতা।

পিতার চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ও। কিছু কিছু চলে যাওয়া মাঝে মাঝে মেনে নেওয়া যায় না। কিছু কিছু চলে যাওয়ার জন্য থাকে না কোনো পূর্ব প্রস্তুতি। হুট করে চলে যাওয়া হারমোনিয়ামের সাদা কালো কিবোর্ডে ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি তুলে। সেরকমই এক চলে যাওয়ার নাম পিতা।  তবু ওকে অঘোষিত চলে যাওয়ার সনদে স্বাক্ষর করে স্বাগত জানাতে হয় ‘উনি চলে গেছেন’। সাক্ষাৎ না করেই বলতে হয় ‘বিদায় পিতা’। টেলিভিশনের প্রত্যেক চ্যানেলে সম্প্রচার করা হচ্ছে সেই বিদায় বিবৃতি। আর বিবৃতিকারীর বিষাদাচ্ছন্ন বিত্রস্ত মুখ।

এমন একজন মানুষের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে চেয়েও সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় না দেখার আফসোসে বারবার ফেটে পড়ছে করুণ কান্নাসমেত ভঙ্গিমায় কতিপয় মুখমণ্ডল। এইসব মুখ কতো কাছের ছিলো, কতো প্রিয় ছিলো চলে যাওয়ার মুখের। এইসব মুখের হাসি পাতায় ছেয়ে থাকতো সেই বিস্মৃত মুখ।

স্মৃতির স্কেচ ঘষতে ঘষতে কাঁচ ও কংক্রিটের দেয়ালে ভেসে ওঠে কোনো এক সাঁটানো আলোকচিত্র। তার অপার আলোর দিকে তাকাতেই অচেনা অন্ধকার কেমন যেন হুঁহুঁ করে উঠে ওদের। সত্যি সত্যি লোকটা এভাবে চলে যাবেন কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি। হায় রে নিয়তি। নিয়তি একটি উত্তর না মেলা জীবনের কোনো এক কঠিন অঙ্ক। পিতার চলে যাওয়ার পর থেকে হিসাবের সঙ্গে নিয়তির কোথায় যেন একটা সংঘাত টের পেতে থাকে ওর পরিবার।

কী থেকে কী হয়ে গেলো কেউ হিসাব মিলাতে পারছে না। কোনো এক ফুরফুরে ছুটির বিকেলে আসরের নামাজ সেড়ে মসজিদ থেকে এসে আর জায়নামাজে দাঁড়াতে পারেন নি ষাটোর্ধ্ব লোকটা। কেমন জানি একটা অস্বস্তিবোধে বিছানায় শুয়ে বিব্রত গোঙানির গহনে ডুবতে থাকেন তুমুলভাবে। এই কেমন থেকে কতো কী হয়ে যাবে কেউ ভাবতেও পারে নি। কেবল হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে শেষমেষ আইসোলেশন থেকে আইসিইউ’র নৈঃশব্দ্যের কড়িডোরে এসেই জায়গা হলো ওনার। কেউই হিসাব মিলাতে পারছে না কোনোভাবে। না গাণিতিক, না রাজনৈতিক, না পারিবারিক, কোনোভাবেই হিসাব কষে উত্তরের কোনো আগামাথা পাওয়া যাচ্ছে না। এই হিসাব না মিলানোর মানেই কি হলো চলে যাওয়া? ঘোরের ঘোড়ায় ছুটে চলেছে যেন যাবতীয় যন্ত্রণা।

সরকারি লোকের গ্লোভসবন্দি আঙুল ধরে হাসপাতাল থেকেই চলে গেলেন লোকটা। শেষ মুহূর্তে একটি বারের জন্যেও এই বাড়িতে পা রাখতে পারলেন না এই শূন্যের অভিমুখী। আহা বাড়ি! মায়ার বিশালতায় ছোট্ট একটি বাড়ি। কতো শ্রম আর সঞ্চয়ে বানানো পিতাহীন বাড়িটা যেন দাঁড়িয়ে আছে শোকের তরঙ্গে প্রবাহিত সমুদ্রের উপর। পলেস্তরা যেন খসে খসে উড়ে যাচ্ছে কান্না ও করুণার পালক হয়ে বাড়ির চোহদ্দিতে। সুবিশাল আম, জাম, সুপুরিগাছগুলো যেন অন্তরঙ্গ আত্মীয়ের মতো আগলে আছে শোকগ্রস্ত বাড়ি ও বাড়ির অধিবাসীদের।

দুপুর বেলা সরকারি লোক এসে পুরো বাড়িটা সিলগালা করে লকডাউন ঘোষণা দিয়ে গেছে। আয়মান, ওর পাঁচ বছরের বাচ্চা তুবা আর একুশ বছরের যুবতী স্ত্রী আদিবা মিলে তিনজন প্রাণি কেবল এই নিস্তব্ধ বাড়ির নির্মম নৈঃশব্দ্যে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। জনসাধারণ থেকে শুরু করে সরকারি লোকজন সবসময় কড়া নজদারি রেখেছে এই একটি বাড়ির গতিবিধির উপর। এই একটি বাড়িই যেন অন্য বাড়িগুলোকে বিভক্ত করে ফেলছে ডিভিশনের মতো। এই একটি বাড়িই যেন সারা শহরে চাঞ্চল্যকর বিশেষ কিছু বহন করে যাচ্ছে। সমূহ সন্দেহের বন্দুক যেন তাক করে আছে সামরিক বাহিনী এই একটি বাড়ির দিকেই। আহা বাড়ি! মায়ার বিশালতায় যেন নিষ্ঠুর একটি সুঁড়ঙ্গ।

ওদের ফোন নাম্বার বার বার ট্রেস করে অবগত হচ্ছে যে ওরা বাইরে গেছে কিনা। বাড়ির বাইরে যাওয়া ওদের সরকারীভাবে সম্পূর্ণ নিষেধ। ঘরের ভেতরেও ওরা যেন পরস্পর থেকে একা। ভীষণ একা। এভাবে অবরুদ্ধতার নৈঃশব্দের ভেতর একা থাকতে হবে ওরা কেউ কস্মিনকালেও ভাবে নি। তিন মিটার সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। খুব একটা কথাবার্তা বলছে না কেউ কারো সঙ্গে। নেহাৎ খুব প্রয়োজন না পড়লে কেউ কারো কাছে যাচ্ছে না। সেভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে না। নিজেরাই নিজেদেরকে সাহায্য করছে। এটা বেঁচে থাকার নতুন কৌশল, কার্যকর কসরত। এভাবেই ওরা বেঁচে আছে। এভাবে বেঁচে থাকার নামও চলে যাওয়া হয়তো। হয়তো সেই অপেক্ষার আঙুল ধরে বেঁচে আছে ওদের বিপন্ন প্রানগুলো।

বাইরের পৃথিবী কেমন আছে? ঝিরিঝিরি হাওয়ায় উঠোনে কী আগের মতো ভোর নামে? পিতার স্বহস্তে লাগানো পারুল গাছে পানি সেচের দায়িত্বটা আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে দেয়া হয়েছে তো? জলপাই, আমলকি, হরতকি আর নিমগাছেরা ভালো আছে তো? বিরিশিরি বিকেলের টেবিলের অব্যক্ত গল্পগুলো কি বুঁদবুঁদি তোলে ধোঁয়া উঠা কবিতাক্যাফে? বিবিধ প্রশ্ন এসে ধাক্কা দিতে থাকে ওদের রুগ্ন হৃদয়ের অবরুদ্ধ দরজায়।

বাইর থেকে লোকজনের যাওয়া-আসা নিষেধ এই বাড়িতে। পিতার চলে যাওয়ার পর কোনো আত্মীয়ই এই বাড়িতে পা রাখেনি। ফোনে দু চারজনের সঙ্গে কথা হয়েছিলো ওদের। তাও দিন দুই তিনেক হবে হয়তো। সরকারি লোকজন চাল ডাল শাকসবজি না দিয়ে গেলে চুলায় কোনো হাড়ি উঠছে না। ফ্রিজে যা ছিলো তা ফুরিয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন আগেই। গতকাল দুপুরের পর থেকে পেটে পানি ছাড়া আর কোনো দাঁনা পড়েনি ওদের।

অসহায় মুরগির বাচ্চার মতো তাকিয়ে আছে তুবা। ওর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তুবা মানে আয়মানের প্রেম ও প্রদীপ। বারবার বাবা বাবা বলে কাছে আসতে চাচ্ছে সপ্তাহখানে থেকে। কতোদিন থেকে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ওর নরোম গালে চুমু খাওয়া হয় না আয়মানের। লাল নীল সাদা কালো কতো রকমের পরির গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হয় না কতো রাত ওকে। ওর কি ঘুম আসে আমাদের ছাড়া? আহা অতোটুকু বাচ্চার উপরও কি ঈশ্বরের দয়া হয় না। ঈশ্বরের উপর মনের ভেতর জন্মানো বিপুল বিতৃষ্ণার বিজ্ঞান থেকে বলে উঠে আয়মান।

তুবাকে নিয়ে তুমি তোমাদের বাড়ি চলে যাও। স্ত্রী আদিবাকে পিতার অসুস্থতার প্রথম দিনেই বলেছিলো আয়মান। মরলে এক সঙ্গে মরবো। আদিবার এরকমই এক বাক্যের সবুজে আয়মানের ধূসর মাঠ সেদিন সবুজে সবুজ হয়ে ওঠেছিলো। হয়তো কোনো এক মহৎ মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েই আদিবা যেতে পারে নি সেদিন। মাঝে মাঝে মায়া মনে হয় দেয়াল ভেঙে এভাবেই একই ছাদের নিচে নিয়ে আসে মায়াশীল মানুষগুলোকে। ভিন্ন ভিন্ন আত্মাগুলোকে একত্রে করে গেয়ে উঠে অভিন্ন আত্মার কোরাস।

কিন্তু তুবা? ও তো কোনো পাপ করেনি। তাহলে ওর কী হবে? মৃতপ্রায় মাছের লাল কানকোর মতো প্রবল হাঁশফাঁশ তুলে আদিবাকে বলে আয়মান। আমি চলে না যাওয়া অব্দি তুবা ও তোমাকে সামলাবো। আর আমি চলে গেলে সরকারি লোক ওর দেখাশোনা করবে। চলে যাবার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে আদিবা। চলে যাবার আগে মানুষ কী সত্যিই এত শক্ত থাকে! এত স্বাভাবিক থাকে! আদিবার কথা শুনে সপ্তম আশ্চার্যের পাথুরে ভাস্করের মতো মূর্ত হয়ে ভাবতে থাকে চলে যাওয়া শূন্যের অভিমুখে চেয়ে থাকা আয়মান।

যে কোনো সময় যে কেউ চলে যেতে পারি। কথা বলতে গিয়ে গলাটা প্রচণ্ড ব্যথা করে ওঠে আয়মানের। কাশের ধাক্কা যেন কোনোভাবে সামলাতেই পারছে না ও। একটু পর পর সর্দি যেন মোমের মতো গলে গলে পড়তে চাইছে ওর নাকের সুঁড়ঙ্গ বেয়ে। টিস্যু পেপার যা ছিলো সব ফুরিয়ে গেছে। একটু চা খাবে সেই চিনিটুকু পর্যন্ত ঘরে নেই। আদিবা সরকারি লোককে ফোন করেছিলো কিছু চাল, ডাল, শাকসবজি, চাচিনি আর বাচ্চাটার জন্য এক লিটার দুধের জন্য। আসি আসি করে সন্ধ্যা হয়ে গেলেও তবু জিনিসপত্র নিয়ে কেউ আসে নি।

ল্যাম্পোস্টের নিচে আবছা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জানালার রেলিঙ ধরে অবচেতনে কখন যেন চোখের পাতা মুদে আসে আদিবার টের পায় না। অশ্রু ভেজা তেলচিটচিটে বালিশে জ¦রে পুড়ে যাওয়া মাথাটা রেখে বিছানায় পড়ে আছে আয়মানের নিস্তেজ দেহ। পঁচে যাওয়ার দুর্গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। একটু পর পর বমি করছে পাঁচ বছরের তুবা। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মা…মা…আব্বু…আব্বু বাচক কান্না মেশানো করুণ আর অবুঝ ধ্বনিগুলো।

কেবল তখনও ল্যাম্পোস্টের নিচে আবছা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আদিবার দীর্ঘশ্বাসসমূহ। তখনও পলেস্তরার মতো খসে খসে উড়ে যাচ্ছে সুখশ্বেতের পালকসমূহ কোনো এক শূন্যের অভিমুখে…

 

লেখক : তরুণ সাহিত্যিক।
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।

প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

 

চলে যাওয়ার ভায়োলিন 10

মাতৃভাষা দিবস সংখ্যা ২০২১ - পদাবলি